হেঁয়ালির অন্ধকারে – ১

আজ কলেজে দুটো ক্লাসের পর অপ্রত্যাশিত একটা ছুটি পেয়ে গেল ঝিনুকরা। প্রোফেসররা নিজেদের মধ্যে মিটিং-এ বসবেন। ঝিনুকদের গ্রুপ চলে এসেছে স্বভূমি বেড়াতে। গ্রুপ বলতে শ্রবণা, রুদ্রাণী, এলা, রাহুল আর অয়ন। মাধ্যমিকের আগে থেকে একই কোচিং ক্লাসে পড়ে এসেছে। স্বভূমি আসার হুজুগটা তুলল রুদ্রাণী। ওর এক পিসতুতো দিদি স্বভূমিতে নতুন শোরুম খুলেছে। ওপেনিং-এর দিন ওর আসা হয়নি। দুঃখ পেয়েছে দিদি। “আজ যাই চল সব একসঙ্গে!” বলেছিল রুদ্রাণী।

দোকান দেখা হল। টুকটাক কেনাকাটা, আইসক্রিম খাওয়া, আউটিং জমেছিল ভালই। ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে স্বভূমি থেকে বেরিয়ে এসেছে ঝিনুকরা। বাইপাসের ফুটপাত ধরে হাঁটছে। ঝিনুক ছাড়া সকলেই খুব বকবক করছে। এলার চোখ গেল ঝিনুকের উপর। বলল, “কী ব্যাপার, তুই হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলি!”

ঝিনুক বলতে গেল, ‘কই, না তো! ঠিক আছে…’ তার আগেই রাহুল বলে বসল, “ও নিশ্চয়ই স্বভূমিতে সন্দেহজনক কিছু দেখে এসেছে। সেটা নিয়েই ভাবছে এখন। গোয়েন্দা দীপঙ্কর বাগচীর অ্যাসিস্ট্যান্ট বলে কথা!

‘ঈশ্বর এদের ক্ষমা করে দাও!’-মার্কা হাসি হাসে ঝিনুক। গল্প ফুরিয়ে গেলে বন্ধুরা তার এই বিশেষ কাজটাকে নিয়ে মজা করে। ওদের দোষ দ্যাখে না ঝিনুক, বেচারাদের লাইফে এরকম এক্সাইটিং কোনও কাজ নেই। একটু হিংসে তো হবেই।… হঠাৎই কানে ভেসে এল চিৎকার। কে যেন “চোর চোর” বলে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। আওয়াজের উৎসস্থল খুঁজে পেল ঝিনুকরা। প্রায় পঞ্চাশ ফিট দূরে বনেট খোলা একটা গাড়ি। তার সামনে সুবেশ এক ভদ্রলোক হাত তুলে “চোর! হেল্প!” জাতীয় নানা শব্দে চিৎকার করে যাচ্ছেন।

ঝিনুক বন্ধুদের বলল, “চল তো দেখি, কী হয়েছে!”

বন্ধুরা তক্ষুনি রাজি। ভদ্রলোকের কাছে পৌঁছতে গেলে রাস্তা ক্রশ করতে হবে। বাইপাসে গাড়ির স্পিড থাকে মারাত্মক। ঘনঘন গাড়ি পাস করছে। ঝিনুকরা সতর্কভাবে রাস্তা পার হয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছল। ভদ্রলোকের বয়স চল্লিশের নীচেই হবে। চেহারায় শিক্ষিত, আভিজাত্যের ছাপ আছে। এই সব সিচুয়েশনে বন্ধুদের মধ্যে ঝিনুক এগিয়ে যায় প্রথমে। এখন যেমন ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে আঙ্কল?”

ঝিনুকদের বয়স দেখে ভদ্রলোকের বোধহয় তেমন ভরসা জাগল না। এদিকে আশপাশে হেল্প করার কেউ নেই। বলতে হবে বলেই বললেন, “গাড়ি থেকে ব্যাগ চুরি হয়ে গেছে আমার।”

“কীভাবে? কোথায়?” জানতে চাইল ঝিনুক।

জেরার ধরনে এমন একটা ম্যাচিয়োর ভাব ছিল, একটু যেন আস্থা পেলেন ভদ্রলোক। ঝিনুককে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে হাত তুললেন পিছনের দিকে। বললেন, “ওই যে ব্যাঙ্কটা দেখছ, ওখানে একটা কাজ সেরে গাড়িতে বসেছি। দিব্যি এত দূর চালিয়ে নিয়ে এলাম। আচমকা একটা কুকুর ক্রশ করল রাস্তা। ব্রেক কষতে গিয়ে দেখি, ধরছে না। ভীষণ ঘাবড়ে গেলাম। ব্যাঙ্কে ঢোকার আগে তো ব্রেক ঠিকই ছিল। তাড়াতাড়ি হ্যান্ডব্রেক মেরে গাড়ি দাঁড় করালাম। এত দিন গাড়ি চালাচ্ছি, এরকম সিচুয়েশনে আগে কখনও পড়িনি। প্রথমেই মাথায় এল ব্রেক অয়েলের কথা। অনেক দিন ভরা হয়নি। গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে বনেট খুললাম।”

“আপনার ব্যাগটা তখন কোথায় ছিল? সাইজ কীরকম?” কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল ঝিনুক।

“ব্যাগ ছিল ড্রাইভিং সিটের পাশেই। সাইজ, অফিস ব্যাগের মতন। ব্রেক ধরছে না দেখে ব্যাগের কথা মাথায় ছিল না। গেট খুলে বাইরে আসি। ব্রেক অয়েল কন্টেনার দেখি একদম ফাঁকা। এরকমটা তো হওয়ার কথা নয়! তখনই সন্দেহ হয় কেউ হয়তো ব্রেকের তার কেটে দিয়েছে। নিচু হয়ে দেখি, ঠিক তাই। রাস্তার এপাশ-ওপাশ দেখছি, কাছাকাছি কোনও গাড়ি সারানোর গ্যারাজ আছে কি না। তখনই একবার চোখ গেল গাড়ির ভিতরে। দেখি, ব্যাগ উধাও!”

মুখ নিচু করে কী একটু ভেবে নিয়ে ঝিনুক জিজ্ঞেস করল, “গাড়ি যখন চালাচ্ছিলেন, রিয়ারভিউ গ্লাসে যে-সব গাড়ি দেখা যাচ্ছিল, তার মধ্যে কোনও একটা কি ফলো করছিল আপনাকে? সেরকম কিছু মনে করতে পারছেন?”

ভদ্রলোক নীচের ঠোঁট উলটে মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, “আমি যখন গাড়িটা চেক করছিলাম, একটা বাইক এসে দাঁড়িয়েছিল পাশে। জিজ্ঞেস করল, ‘কী হল দাদা, কী প্রবলেম?’ বললাম, ‘ব্রেকটা লাগছে না।”

ভদ্রলোককে থেমে যেতে দেখে ঝিনুক জিজ্ঞেস করল, “উত্তরে বাইকের লোকটা কী বলল?”

“কিছু বলল না। বাইক স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল।”

“মনে হচ্ছে ওই লোকটাই চুরি করেছে।” কপাল কুঁচকে যেন নিজেকেই বলল ঝিনুক! তারপর জানতে চাইল, “লোকটার চেহারাটা মনে আছে?”

ভদ্রলোক বললেন, “সে তো হেলমেট পরে ছিল। মুখ দেখতে পাইনি।”

“হয়ে গেল!” বলল এলা।

ঝিনুক কিন্তু হাল ছাড়ল না। জানতে চাইল, “বাইকের নম্বরটা দেখেছিলেন? যদিও দেখার কথা মাথায় আসবে না। অন্তত কোন কোম্পানির বাইক সেটা কি বলতে পারেন?”

ঝিনুকের প্রশ্নে ভদ্রলোক ক্ষণিকের জন্য চোখ বুজলেন, মনে করার চেষ্টা করলেন বাইকের মডেল। চোখ খুলে বললেন, “বাইকটা নতুন। কোন কোম্পানির বলতে পারব না। তবে ডিজ়াইনটা মনে আছে। রং কালো।”

“ব্যাগে খুব দামি বা দরকারি কিছু ছিল কি?”

ঝিনুকের এই প্রশ্নটায় ভদ্রলোক একটু যেন চমকালেন! সামলে নিয়ে বললেন, “অবশ্যই দরকারি কাগজপত্তর ছিল। বড় ক্ষতি হয়ে গেল আমার।”

“কী আর করা যাবে! চোর তো এখন আওতার বাইরে। লোকাল পুলিশ স্টেশনে ডায়েরি করতে হবে আপনাকে।”

ঝিনুকের কথায় হতাশ হল বন্ধুরা। অয়ন বলল, “কেসটা তুই একটু দ্যাখ না। এত তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিচ্ছিস কেন!”

অয়নের কথায় ভদ্রলোক বেশ অবাক হলেন। ধরতে পারছেন না ঝিনুকের আসল পরিচয়। এইটুকু মেয়ে কেস ছেড়ে দেবে মানে! ঝিনুক ইতিমধ্যে নিজের ব্যাগ খুলে ভিজিটিং কার্ড বার করেছে। দীপকাকুর কার্ড। ভদ্রলোকের দিকে বাড়িয়ে বলল, “পুলিশ ছাড়াও যদি এক্সট্রা কোনও হেল্প লাগে এই ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করতে পারেন। ইনি আমার কাকা হন।”

কার্ডটা হাতে নিয়ে চোখ বোলালেন ভদ্রলোক। বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ!” জামার বুকপকেটে রাখলেন কার্ডটা। গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললেন, “হ্যান্ডব্রেকের উপর নির্ভর করে বেশিক্ষণ ড্রাইভ করা যাবে না। গাড়িটা আগে গ্যারাজে দিতে হবে।”

ভদ্রলোক গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিলেন। ঝিনুক একপলক ওঁকে দেখল, দুশ্চিন্তার ঘন ছায়া ঘনিয়ে আছে ওঁর চোখে-মুখে।

গাড়িটা এগিয়ে গেল। মডেল মারুতি ৮০০, রং নীল।

ঝিনুক বন্ধুদের বলল, “চল, যাওয়া যাক।”

রাস্তা আড়াআড়ি পেরিয়ে ওরা ফের চলে এল এদিকের ফুটপাতে। ঝিনুক একমনে চিন্তা করছে আগের ঘটনাটা। পাশে হাঁটতে থাকা রুদ্রাণী বলল, “হ্যাঁ রে ঝিনুক, তোর দীপকাকু এখন কি কেসটেস তেমন পাচ্ছেন না?”

ঝিনুক বুঝতেই পারল কোনও একটা বাঁকা মন্তব্য করার জন্যই প্রসঙ্গটা তুলেছে রুদ্রাণী। তবু বলল, “কেন বল তো?”

“না, আসলে কী, তুই তো প্রায় স্পোকেন ইংলিশ কোচিং-এর হ্যান্ডবিলের মতো দীপকাকুর কার্ড বিলি করছিস। তাই ভাবলাম…”

রুদ্রাণীর কথা শেষ হওয়ার আগেই অন্য বন্ধুরা একসঙ্গে হেসে উঠল। গা জ্বালা করছে ঝিনুকের। অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত রাখল। দীপকাকু যে এখন যথেষ্ট ব্যস্ত গোয়েন্দা, বন্ধুদের বোঝাতে চাইলেও বুঝবে না। চুরির ঘটনাটা বুঝেশুনে ঝিনুকের মনে হয়েছে, কেসটা সাদা-সরল নয়। গোয়েন্দার দরকার হতে পারে। তাই দীপকাকুর কার্ডটা দিয়েছে ঝিনুক। ভদ্রলোক যদি দেখা করেন দীপকাকুর সঙ্গে, তা হলেই প্রমাণ হবে ঝিনুকের আন্দাজ কত অভ্রান্ত। তখনই বন্ধুদের টিটকিরির জবাব দেবে ঝিনুক।