৫
আংটির রহস্য আজ অনেকটাই ক্লিয়ার। গতকাল বিষয়টা নিয়ে যথেষ্ট নাকাল হতে হয়েছে ঝিনুককে। অনিমেষবাবুর অফিস থেকে বেরনোর পর কল্লোলবাবুর থেকে বিদায় নিয়ে ঝিনুকরা যখন ফিরছে, চলন্ত বাইকে বসে ঝিনুক দীপকাকুকে জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনি হঠাৎ কল্লোল সেনের আংটিটা নিয়ে পড়লেন কেন? ওটার সঙ্গে কেসের কী সম্পর্ক?”
বাইক চালাতে চালাতে দীপকাকু বললেন, “ভাবো। ভেবে বের করো কারণটা। তোমাকে তো আমি শুধু প্রশ্ন করার জন্য সঙ্গে নিই না, আমার পাশাপাশি একটা বুদ্ধিদীপ্ত মাথা সক্রিয় থাকুক, এটা চাই। যে আমার ভুলত্রুটিগুলো শুধরে দেবে।”
ঝিনুক আর কথা বাড়াল না। মনে মনে বেশ আহত হল। এই যে এত কেসে দীপকাকুকে সে অ্যাসিস্ট করল, শুধু প্রশ্নই করে গিয়েছে? কোনও কন্ট্রিবিউশন নেই তার? দীপকাকুর সঙ্গে যখনই কোনও কেসে জয়েন করে ঝিনুক, তদন্তের পর্যায়ক্রম প্রথম থেকে লিখে রাখে। দীপকাকু ভুলোমানুষ, হামেশাই ছোটখাটো পয়েন্টস মাথা থেকে বেরিয়ে যায়। ঝিনুকের নোটগুলো তখন কাজে লাগে। নোট নেওয়ার ব্যাপারে ঝিনুক এতটাই দক্ষ হয়ে উঠেছে, গত কেসটা, বড়লোক ভদ্রমহিলার খুন হয়ে যাওয়া, দীপকাকু বলেছেন ওটা গল্পের মতো করে লিখতে। এখনও অবশ্য লেখাটায় হাত দেওয়া হয়নি। ঝিনুক নোটসের খাতা নিয়ে দীপকাকুর সঙ্গে যখন কেস অ্যানালিসিস করতে বসে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রশংসাই জোটে তার। সূক্ষ্ম কিছু পয়েন্টস দীপকাকু আলাদা করে ধরিয়ে দেন। আলোচনার সময় অনেক প্রশ্ন করে ঝিনুক, দীপকাকু কখনওই বলেন না, ‘প্রশ্নগুলো বোকা বোকা।’ যথেষ্ট আগ্রহের সঙ্গে উত্তর দেন। একমাত্র দীপকাকু যখন তদন্তের কাজে ডুবে থাকেন, কোনও ধরনের প্রশ্ন শুনতে পছন্দ করেন না। ঝিনুক নিষেধটা মেনে চলে। কিন্তু অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে দীপকাকু যদি একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে যান, তখন তো কৌতূহল দমন করা খুবই কঠিন। তাও তো আংটির প্রশ্নটা অনেক পরে করেছিল ঝিনুক। দীপকাকুর কখনওই উচিত হয়নি এভাবে ভর্ৎসনা করা। ঝিনুক দীপকাকুর তদন্তের একটা পোরশানে বারবার নিজের পারদর্শিতা প্রমাণ করেছে, সেটা হল ফিজিক্যাল স্কিল। ক্যারাটে, কুংফু, দৌড় দিয়ে চেজিং…। একবার তো শত্রুর ডেরা থেকে দীপকাকুকে বের করে এনেছিল। যদিও এসব স্কিলে ঝিনুকের চেয়ে দীপকাকু অনেকটাই এগিয়ে, খুব প্রয়োজন ছাড়া এই দক্ষতা ব্যবহার করতে চান না, তবে এটা তো মানতে হবে, দুটো শক্তি একত্রিত হলে তদন্তের তীব্রতা বাড়ে। এ ছাড়াও তদন্তের কিছু কিছু কাজ ঝিনুকের উপর ছেড়ে দেন কাকু, সেখানেও ব্যর্থতার হার প্রায় নেই। এসব ভাবনার মাঝেই দীপকাকু ঝিনুককে ওদের বাড়ির গেটে নামিয়ে “চলি!” বলে, বাইক স্টার্ট দিলেন। বলে গেলেন না, পরে কখন, কীভাবে যোগাযোগ হবে।
বাড়ি ঢোকার পর মনখারাপটা কাটতে সময় লাগল না। সিডিতে গান চালিয়ে স্নান-খাওয়া করতে করতে ভেবে উঠতে পারল, দীপকাকুর মাথায় এখন জটিল, সূক্ষ্ম সব চিন্তাভাবনা খেলে বেড়াচ্ছে। এসময় ব্যবহারিক আচরণগত সমস্যা দেখা দিতেই পারে। তা ছাড়া ঝিনুক তো ওঁর সবচেয়ে কাছের এবং স্নেহের পাত্রী। ওঁর সঙ্গে এত ফরমাল হয়ে কথা বলতে হবে কেন? বরং দীপকাকুর প্রোপোজালটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেওয়া যাক। ঝিনুক নিজেই বুদ্ধি খাটিয়ে বের করবে, কেন কল্লোলবাবুর আংটি পরীক্ষা করছিলেন দীপকাকু?
বেরল না। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হয়ে গেল। ঝিনুক আলাদা একটা ডায়েরিতে অনিমেষবাবুর কেসটার পুঙ্খানুপুঙ্খ লিখল। বেশকিছু প্রশ্ন-উত্তর তৈরি হল। কিন্তু কিছুতেই আংটির সঙ্গে কেসের সম্পর্ক বের করা গেল না।
বাবা বাড়ি ফিরেই ঝিনুককে জিজ্ঞেস করলেন, “তোদের কেসের কতদূর?” ঝিনুক বলল, “আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, দীপকাকু কেসটার রহস্য কতটা ভেদ করতে পেরেছেন। তবে একটা জিনিস বোঝা যাচ্ছে, টাকাটা অনিমেষবাবু আত্মসাৎ করেননি। কোনও একজন তাঁকে বিপদে ফেলেছিল।”
বাবা বললেন, “বাঃ, তার মানে তো তদন্তের অনেকটাই অগ্রগতি হয়েছে। আমি প্রথমেই বোল্ড আউট। অনিমেষ সোম নির্দোষ? দাঁড়া, বাথরুম ঘুরে চা-টা নিয়ে বসি, তারপর তোদের তদন্তপর্ব শুনব।”
কোলে ডায়েরি নিয়ে বসে গতকালের সমস্ত ঘটনা বাবাকে বলল ঝিনুক। তার থেকে উঠে আসা প্রশ্ন-উত্তর, বিশ্লেষণ তুলে রেখেছিল দীপকাকুর জন্য। ঝিনুক যে এত খেটেখুটে হোমওয়ার্ক করল, সেটা তো দেখাতে হবে!
আংটির বিষয়টা ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন বাবা। বললেন, “ওটার সঙ্গে কেসের কোনও যোগাযোগ নেই। দীপঙ্করের হয়তো কোনও ক্লোজ রিলেটিভের বিয়ে-থা আছে, গয়না দিতে হবে, তাই আংটিটা দেখছিল। অথবা ও নিজে বিয়ে করার কথা ভাবছে।”
কারণটা মনঃপূত হল না ঝিনুকের। বাবার কথাই যদি ঠিক হয়, দীপকাকু ওরকম গম্ভীর স্বরে ভাবতে বলতেন না। ঝিনুক বলল, “আংটির ব্যপারটা ছাড়া এখন পর্যন্ত যা শুনলে, তাতে কী মনে হচ্ছে? লোকটাকে তাড়াতাড়ি ধরা যাবে, যে অনিমেষবাবুর কাছ থেকে ধার নিয়ে ডুবিয়েছিল? সম্ভবত এই লোকটাই বিজনেসে নামিয়েছিল অনিমেষবাবুকে।”
বাবা বললেন, “এমনটা না-ও হতে পারে। অপরাধটার পিছনে একাধিক লোক থাকার চান্স বেশি। তোর থেকে যা শুনলাম, জাহাজে আসা বিদেশি জিনিস ছাড়ানোর জন্য লোন দিতেন অনিমেষবাবু। আশা করা যায়, তিনি এত নির্বোধ ছিলেন না যে, সব টাকা একজনকে দেবেন। সে কোনও কারণে যদি ডোবে বা ধরা যাক মারা যায়, অনিমেষবাবুও তো শেষ! বিশ্বাস করে ধার দেওয়ায় কোনও আইনি কাগজপত্র থাকে না। আমার মনে হচ্ছে, উনি অন্তত চার-পাঁচজনকে ধার দিতেন। একজন ডোবালেও বাকি ক’জনের কাছে যে ইন্টারেস্ট পাবেন, সারভাইভ করে যাবেন ওতেই। এই ধরনের লোনে হাই ইন্টারেস্টে টাকা খাটানো হয়। আমার বুদ্ধিতে যতটুকু বুঝতে পারছি, চার-পাঁচজন মিলে ডুবিয়েছে অনিমেষবাবুকে। ওরা একটা গ্রুপ। পাকেচক্রে অনিমেষবাবু ওদের মধ্যে গিয়ে পড়েছিলেন।” একটু দম নিয়ে বাবা ফের বললেন, “নির্মল জানা তার বাবুকে একটা পার্টির সঙ্গে কথা বলতে শুনেছিল। বাকিদেরটা শোনেনি। সে যেহেতু একটি ব্যক্তির কথা বলছে, তোরাও ধরে নিয়েছিস অপরাধী একজন।”
বাবার বিশ্লেষণে কোথাও এতটুকু যুক্তির অভাব দেখল না ঝিনুক। আবার এটাও ঠিক, দীপকাকু কিন্তু এখনও একবারও বলেননি অপরাধী একজন। ওঁর মাথায় কী ঘুরছে কে জানে? বাবার চিন্তার অ্যাঙ্গেলটা ওঁকে জানাতে হবে। ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল ঝিনুক
বাবা বললেন, “তোদের তদন্তের পর্যায়টা এখন অচেনা পাহাড়ি পথের বাঁকে দাঁড়িয়ে। এই সময় তোরা যদি সূত্র বাছতে ভুল করিস, অপ্রয়োজনীয় ক্লু ধরে এগিয়ে যাস, গন্তব্য হারিয়ে অন্য পাহাড়ে চলে যাবি।”
বাবার সঙ্গে আলোচনা করার এই একটা লাভ, কঠিন বাস্তবের একঘেয়েমি থেকে চট করে কল্পনার জগতে নিয়ে যেতে পারেন। ঝিনুক কাল রাতে শুতে গিয়েছিল বাবার বলা অদেখা পাহাড়ের ছবি মাথায় নিয়ে। কিন্তু নিস্তার পেল কোথায়? ভোরবেলা স্বপ্ন দেখল, নির্জন পাহাড়ি পথে একা দাঁড়িয়ে আছে সে। নীচের পাকদণ্ডী বেয়ে হাত ধরাধরি করে নেমে যাচ্ছেন দীপকাকু, আর-একটা বেঁটে লোক। একটু পরেই কুয়াশায় মিশে যাবেন ওঁরা। হঠাৎ বামন-মানুষটি ঝিনুকের দিকে মুখ ফিরিয়ে বিচ্ছিরিভাবে হাসল। চমকে উঠে ঘুম ভাঙল ঝিনুকের। সেই লোকটা, যাকে আর-একবার মনের ভুলে দেখেছিল অনিমেষবাবুর অফিসের বাথরুমে।
ভোরবেলা ছাদে ফ্রি-হ্যান্ড সেরে সবে যখন মায়ের দিয়ে যাওয়া হেল্থ ড্রিঙ্কে চুমুক মেরেছে ঝিনুক, বাইকের চেনা শব্দটা থামল বাড়ির গেটে। দরজা খুলতে গিয়েছিল ঝিনুক। দীপকাকু এত সকাল সকাল, কী ব্যাপার?
বড়সড় চারটে প্যাকেট নিয়ে দীপকাকু ঢুকলেন ঘরে। বাবা তখন চা খেতে খেতে কাগজ দেখছেন। বাবার কপালেও পড়ল ভাঁজ। দীপকাকুর চোখেমুখে হাসিখুশি ভাব। হাঁক দিলেন, “বউদি, আজ ব্রেকফাস্ট আমি নিয়ে এসেছি। পিৎজ়া। একটা নতুন ‘পিৎজ়া হাট’ হয়েছে বাঁশদ্রোণী বাজারে।”
ব্যস্তসমস্ত হয়ে ড্রয়িং-এ এলেন মা। অভিমানী গলায় বললেন, “পরপর দু’দিন আমার হাতে জলখাবার খেতে লজ্জা করছিল বুঝি তোমার? তাই এসব কিনে নিয়ে এলে?”
মায়ের হাতে প্যাকেটগুলো চালান করে দীপকাকু বললেন, “আরে না না বউদি, আজ যেহেতু সকালবেলায় কাজে বেরিয়ে যেতে হবে, রজতদার গাড়িটাও চাই। তাই ভাবলাম, এখন আর আপনাকে জ্বালাতন করা ঠিক হবে না। আমি তো প্রায়ই খাই আপনার কাছে, আজ না হয় খাওয়ালাম!”
প্যাকেটগুলো নিয়ে মা চলে গেলেন ভিতরে। দীপকাকু গুছিয়ে বসলেন সোফায়। বাবা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছিলেন দীপকাকুর দিকে। মুখে কিছু বলছেন না।
একটু অস্বস্তির সঙ্গে দীপকাকু জানতে চাইলেন, “কী হল, ওভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”
বাবা বললেন, “মনে হচ্ছে কেসটা সল্ভ করে এনেছ।”
“কোথায় সল্ভ? এখনও অথই জলে।” বাংলা খবরের কাগজ টেবিল থেকে তুলে নিয়ে বললেন দীপকাকু।
বাবার বিশ্বাস হল না। মাথা নেড়ে বললেন, “হতেই পারে না। বিনা অ্যাডভান্সে কাজটা নিয়েছ। সমাধানের ইঙ্গিত না পেলে সক্কালবেলায় এত খরচ করে কেউ!”
দীপকাকু হেসে বললেন, “ফর গড সেক, বিলিভ মি। এখন যার কাছে যাব, ন’টার মধ্যে যেতে বলেছে। আমি, ঝিনুক ছাড়া আরও দু’জন যাবে। সেজন্যই গাড়িটা পেলে সুবিধে হয়।”
“গাড়ির জন্য এত বড় ভেট না নিয়ে এলেও চলত। তোমাদের কাজের জন্য গাড়ি তো আমি না চাইতেই দিই।”
খোঁচাটা মেরে বাবা নিজেই হেসে ফেললেন। দীপকাকুর মুখেও তখন হাসি। দু’জনের সম্পর্কটা মধুর বন্ধুত্বের। বয়সের এতটা তফাত বোঝাই যায় না। ঝিনুক ওঁদের হাসিতে যোগ দেয়নি। দীপকাকুর আগের দিনের ব্যবহারটা যে তার পছন্দ হয়নি, সেটা বোঝানোর জন্য গম্ভীর হয়েছিল। দীপকাকু ঠিক পড়ে নিয়েছিলেন ঝিনুকের মনের কথা। হালকা সুরে জানতে চাইলেন, “কী, আংটির রহস্যটা ভেদ করতে পারলে?”
ঝিনুক মাথা নাড়ল। বাবা যে কারণটা বলেছেন, অতি সরল। বলা ঠিক হবে না। দীপকাকুর বিয়ের কথাটা তো নয়ই।
মা তিনটে প্লেটে পিৎজ়া নিয়ে এলেন। বললেন, “এতে হবে, নাকি আরও কিছু তৈরি করব?”
দীপকাকু তড়িঘড়ি নিবৃত্ত করলেন মা-কে, “এতেই হবে বউদি। আপনি জমিয়ে কফি তৈরি করুন। এর সঙ্গে কফি ভাল যায়।
মা চলে যেতে ঝিনুক সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল, “এখন পর্যন্ত কেসটার যতটুকু আমি জানি, বলেছি বাবাকে। বাবা একটা মতামত দিয়েছেন।”
পিৎজ়ার টুকরো মুখে পুরে দীপকাকু ঝটকা খেলেন, “ওরে বাবা, কী গরম! বউদি মাইক্রোওয়েভে দিয়েছিলেন।” মুখের খাবার সামলে বললেন, “বলো, রজতদা কী ভাবছেন?”
বাবার বলা একাধিক অপরাধীর তত্ত্বটা গুছিয়ে বলল ঝিনুক। মন দিয়ে শুনে দীপকাকু বললেন, “গুড অ্যানালিসিস। আই গো উইদ দ্য ভিউ। কিন্তু ওই চক্রের মধ্যে অনিমেষবাবুকে নিয়ে গিয়েছে কোনও একজন। সেই ব্যক্তিটি কে?”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে পিৎজ়া খেতে থাকলেন দীপকাকু। একটু পরে ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, “হোয়াট ডু ইউ থিঙ্ক অ্যাবাউট দিস?”
ঝিনুক বলল, “আমি এখন পর্যন্ত কিছুই ভেবে পাচ্ছি না। কয়েকটা কোয়েশ্চেন এসেছে মাথায়। সেটা ক্লিয়ার করলে ভাবতে সুবিধে হয়।”
দীপকাকুর খাওয়া শেষ। হাত ঝেড়ে বললেন, “প্রসিড।”
ঝিনুক শুরু করল, “কোয়েশ্চেন নম্বর ওয়ান, সূর্যেন্দুবাবুকে অফিসে আসতে না বলে বাড়িতে ডেকেছিলেন কেন? দুই, অনিমেষবাবুর বাড়িতে গিয়ে কোন বইয়ের খোঁজ করছিলেন? তিন, গোল্ডেন ইনভেস্টমেন্ট-এর অফিসে গিয়ে আলমারি এবং কম্পিউটারে কীসের প্রমাণ খুঁজছিলেন টর্চ, আতশ কাচ দিয়ে? চার, পার্স, হাতঘড়ি বাদ দিয়ে শুধু মোবাইল ফোনটা কেন চুরি গেল? পাঁচ, আমি এখনও অন্ধকারে, কেন আপনি হঠাৎ কল্লোল সেনের আংটির ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠলেন?”
প্রশ্ন শেষ করে ঝিনুক খাওয়ায় মন দিল। দীপকাকু বললেন, “তোমার প্রশ্নগুলো সুচিন্তিত। বোঝাই যাচ্ছে হোমওয়ার্ক ভালই হয়েছে। আবার এটাও আমি জানি, এই প্রশ্নগুলোর কিছু উত্তর তোমার কাছেও আছে। কনফিডেন্সের অভাবে বলতে পারছ না।”
ঠিক কথাই বলেছেন দীপকাকু। ঝিনুক সত্যিই উত্তর বলার ঝুঁকি নেয়নি, পাছে ভুল হয়ে যায়!
দীপকাকু বলতে শুরু করলেন, “সূর্যেন্দুকে অফিসে না ডাকার কারণ, চিঠি পড়ে বুঝেছিলাম আর্থিক সংগতি নেই, আমার চকচকে অফিস দেখে যদি হীনম্মন্যতায় ভোগে? অ্যাডভান্স পর্যন্ত দেওয়ার সামর্থ্য নেই তার। উত্তর নম্বর দুই, অনিমেষবাবুর বাড়ির বইগুলো দেখে বোঝার চেষ্টা করছিলাম, ওঁর শেয়ার-প্রীতি কতটা? শেয়ার, বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, ব্যাঙ্কিং-এর কোনও বই আছে কিনা দেখছিলাম।”
“কী দেখলে?” আগ্রহভরে জানতে চাইলেন বাবা।
“ওই সংক্রান্ত একটাও বই নেই। সাহিত্য, দর্শনের বই ঠাসা, রবীন্দ্রনাথ খুব প্রিয় ছিলেন। ওঁর বই-ই বেশি।”
একটু থেমে দীপকাকু ফের বললেন, “অফিসের আলমারির গায়ে খুঁজছিলাম হাতের ছাপ এবং আরও যদি কিছু তথ্য-প্রমাণাদি পাওয়া যায়। সুবিধে হল না, পুলিশ এমন তন্নতন্ন করে তল্লাশি করেছে, কোনও প্রমাণ আর নেই। খুব ভাল হত, যদি টাকার লকারে অনিমেষবাবু ছাড়া আর-একজনের হাতের ছাপ পাওয়া যেত। ওরকম পার্সোনাল জায়গায় পার্টনার ছাড়া কেউ হাত দেবে না। কম্পিউটারের সিপিইউ-টা পরীক্ষা করে দেখলাম, হার্ডডিস্কটা বের করে নেওয়ার জন্যই ভাঙা হয়েছে। মোবাইল ফোন এবং হার্ডডিস্ক সরানো দেখে আন্দাজ করা যায়, ওই দিনের গন্ডগোলে অপরাধীর পাঠানো লোক ছিল। দুটো জিনিস সরিয়ে নিলেই অপরাধী হাতের বাইরে চলে যাবে। ওর কাছে পৌঁছনোর সূত্র ওই দুটো জিনিসেই ছিল।” দম নিতে থামলেন দীপকাকু। ফের বললেন, “পড়ে রইল কল্লোলবাবুর আংটির প্রসঙ্গটা। ওটার কারণেই আজ গাড়ি নিয়ে বেরচ্ছি। উদ্দেশ্যটা সফল হোক, তারপর আংটির রহস্যটা ভাঙব।”
ট্রে-তে চার মগ কফি নিয়ে ঢুকলেন মা। টেবিলে নামিয়ে রেখে নিজের মগটা তুলে বললেন, “আজও তা হলে ঝিনুকের কলেজ বাঙ্ক?”
প্রশ্নটা বলা যেতে পারে তিনজনকেই করা। কে কী উত্তর দেবেন, সেই ভরসায় না থেকে ঝিনুক বলল, “আজ তো মাত্র দুটো ক্লাস মা!”
রাগী-রাগী চোখে তাকিয়ে মা ঘর ছাড়লেন। বিপদ নিয়ে খেলার কাজটা আজও মন থেকে মেনে নিতে পারেননি।
কফির মগে চুমুক দিয়ে দীপকাকু ফিরে গেলেন আগের প্রসঙ্গে। বললেন, “এই কেসটা নিয়ে আমার কিছু অবজারভেশন বলি?”
“অবশ্যই বলো। সেটা শোনার জন্য আমি উদ্গ্রীব হয়ে আছি।” বলে, বাবা তুলে নিলেন কফির মগ। ঝিনুকও নিল। কফিটা মা ভালই তৈরি করেন। চা না খেলেও মায়ের হাতের কফি মিস করতে চায় না ঝিনুক
দীপকাকু বললেন, “এখন পর্যন্ত অনিমেষবাবুর সম্বন্ধে যা আমরা জেনেছি, উনি অত্যন্ত নিরীহ, ভালমানুষ ছিলেন। তার মানে কিন্তু বোকা নন। উঁচুমানের বইপত্তর পড়তেন। যথেষ্ট শিক্ষিত মানুষ। এহেন এক ব্যক্তিকে কুইক মানি মেকিং-এর মতো বিজনেসে জড়িয়ে ফেলতে পারে, তাঁর একান্ত বিশ্বাসভাজন কেউ। অর্থাৎ কাছের লোক। লোকটা এতই ধুরন্ধর, কোম্পানিটা যে চিটফান্ডের সেটা অনিমেষবাবুকে বুঝতে দেয়নি। জানে, মধ্যবিত্ত ‘চিটফান্ড’ শব্দটাকে যথেষ্ট সন্দেহের চোখে দেখে। চিটফান্ড লাটে ওঠার অনেক উদাহরণ আছে। লোকটা অনিমেষবাবুকে বুঝিয়েছিল, শেয়ারের মাধ্যমে বেশি ইনকাম করে একটা অংশ প্রফিট হিসেবে ক্লায়েন্টদের দেবে। লোকটা শেয়ার মার্কেট ভালই বোঝে, এ ব্যাপারে অবহিত ছিলেন অনিমেষবাবু। বিশ্বাসটা আরও জোরদার করার জন্য বিজনেসে নামার আগে অনিমেষবাবুর অ্যাকাউন্টে দশ লাখ টাকা ফেলেছিল লোকটা। ব্যাবসায় যদি ঘাটতি দেখা যায়, কোম্পানি যেন ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ব্যাঙ্কের পাসবইটা সূর্যেন্দুর কাছে দেখতে চেয়েছিলাম। সন্ধেবেলা বাড়িতে এসে দেখিয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন সময় টাকা তোলার পর পাসবইয়ে পড়ে আছে এখন দেড় হাজার। ব্যাবসার অজুহাতে টাকা বের করে নিয়েছে লোকটা। প্রাথমিকভাবে ওই দশ লাখ অনিমেষবাবুকে বিজনেসে নামতে সাহস জুগিয়েছিল। খুব দ্রুত টাকা ডবল, ট্রিপল করে দিয়ে আরও বেশি বেশি ক্লায়েন্ট ধরা চিটফান্ডগুলোর প্রধান কৌশল। প্ৰথম দু’বছরে টাকা দ্বিগুণ হয়ে যেতে অনিমেষবাবুর মনে নিশ্চয়ই একটা আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কেননা, খবরের কাগজ খুললেই জানা যায় শেয়ার বাজারের অবস্থা কেমন। দু’বছর আগে মোটেই ভাল ছিল না। তখনই অনিমেষবাবুর পার্টনার জাহাজে জিনিস আমদানি করা ব্যবসায়ীদের গল্প ফাঁদে।”
“গল্প কেন বলছ? এরকম তো হয়!” বললেন বাবা।
উত্তরে দীপকাকু বললেন, “এক্ষেত্রে আমার নেপালবাবুর পর্যবেক্ষণ পুরোপুরি ঠিক মনে হয়েছে। যে মানুষটি শেয়ার-টেয়ার তেমন ভাল বোঝেন না, আগ্রহ ছিল না কোনওদিন, তিনি ওসব ঘাঘু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ডিলিং-এ যাবেন না। অনিমেষবাবুর বন্ধু বাজারে টাকা খাটানোর দায়িত্ব নিয়েছিল। অফিসে বসে ক্লায়েন্টদের থেকে টাকা জমা নিতেন অনিমেষবাবু। অন্ধ বিশ্বাসে সেই টাকা তুলে দিতেন বন্ধুর হাতে। সত্যিই যদি জাহাজ থেকে জিনিস তোলার ব্যবসায়ীরা বেইমানি করে থাকত, দু’বন্ধু মিলে টাকা উদ্ধারে নামতেন। তা না হয়ে অনিমেষবাবুর পার্টনার ক্রমশ চলে গেল আড়ালে। শেষ পর্যন্ত তাকে বোধহয় ফোনেও পেতেন না অনিমেষবাবু। উনি মারা যাওয়ার পর হার্ডডিস্ক, মোবাইল ফোন চুরি দেখেই মোটিভটা পরিষ্কার হয়ে গেল। জমা টাকা নিয়ে গা-ঢাকা দেওয়াই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। এ ব্যাপারে সে তিনটে জিনিস ব্যবহার করেছিল। অনিমেষবাবুর মতো ভদ্র, বিপদে পড়া মানুষ। তাঁর নামে নেওয়া অফিসঘর এবং অনিমেষবাবুর প্রথম বিজনেসের ট্রেড লাইসেন্স। একটু সাবধানি ক্লায়েন্টরা কোম্পানির স্থায়িত্ব এবং স্বীকৃতি বুঝে নিতে চাইলে অনিমেষবাবু অফিসঘরের এগ্রিমেন্ট, কপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স দেখাতেন। তাতেই যথেষ্ট নির্ভরতা পেত লগ্নিকারীরা। এই পয়েন্টে এসে বড্ড আপশোস হয়, ইনভেস্টাররা কখনওই খোঁজ নিত না, এসব কোম্পানির রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অ্যাফিলিয়েশন আছে কিনা। মনে মনে জানে, নেই। থাকলে বেশি প্রফিট পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। মানুষগুলো লোভের বশবর্তী হয়ে টাকা ঢালে ওইসব কোম্পানিতে। দুর্ভাগ্যক্রমে অনিমেষবাবুর মতো সজ্জন লোক নিজের অজান্তেই তাঁর পার্টনার এবং ক্লায়েন্টদের লোভের জালে জড়িয়ে পড়লেন।”
“তুমি তা হলে শিয়োর, অনিমেষবাবুকে ফাঁদে ফেলেছিল একজন, কোনও গ্রুপ নয়?” জানতে চাইলেন বাবা।
দীপকাকু বললেন, “মোটামুটি নিশ্চিত। এর কিছু ইঙ্গিতও আমার কাছে আছে। যেমন, মেয়ের বিয়েতে স্বামীর উপকারী বন্ধু আসছেন না দেখে প্রশ্ন করেছিলেন মীরাদেবী। অনিমেষবাবু পাশ কাটানো উত্তর দিয়ে অদ্ভুতভাবে হেসেছিলেন। এই হাসিটার একটাই মানে হয়, তুমি তাকে চেনো অন্য পরিচয়ে। হয়তো বিয়ের অনুষ্ঠানে লোকটি উপস্থিত ছিল। কুরিয়ারে গিফ্ট পাঠানোটা নিজের পরিচয় গোপন করার একটা চাল। এবার আসি নেপালবাবুর বয়ানে, অনিমেষবাবুর সঙ্গে যখনই বিজনেসের আলোচনা করেছেন, ‘আমাদের কোম্পানি’ কথাটা প্রায়ই বলেছেন অনিমেষবাবু। ‘আমাদের’ শব্দটা কোম্পানিকে বড় এবং প্রতিষ্ঠানটা স্টাফদেরও বোঝাতে অনেক মালিক ব্যবহার করেন। আমার মনে হয় না অনিমেষবাবু সেই অর্থে ব্যবহার করেছেন, কুইক মানি-র ব্যাবসাটা তাঁর ব্রেনচাইল্ড ছিল না। ‘আমাদের’ অর্থে অসতর্কে তিনি বন্ধুর অস্তিত্বই স্বীকার করে নিতেন। যদিও এ ব্যাপারে পার্টনারের কড়া নিষেধ ছিল। যে কারণে নিজের স্ত্রীর কাছেও বন্ধুর পরিচয় দিতে পারেননি। আর-একটা ইঙ্গিত হল, নির্মল আড়ি পেতে শুনেছিল, ফোনে ‘তুই’ সম্বোধন করে কাকে যেন বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ জানাচ্ছিলেন অনিমেষবাবু। অবশ্য ‘তুই’ বলে বয়সে ছোট কাউকেও ডাকা যায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেস রিড করে সেরকম কারও অস্তিত্ব পাইনি।”
কথা শেষ করে দীপকাকু যতটা শ্বাস ছাড়লেন, তার চেয়ে দ্বিগুণ দম ছেড়ে বাবা বললেন, “ওরে বাবা, এ তো দেখছি সাংঘাতিক চালাক লোক! এর টিকি ছুঁতে তোমায় বেশ বেগ পেতে হবে দীপঙ্কর।”
দীপকাকু সহমত হলেন না। বললেন, “আমার ধারণা ঠিক উলটো। লোকটার এত প্ল্যান-প্রোগ্রামই ওর কাছে পৌঁছতে আমায় সাহায্য করবে। লোকটা বুদ্ধিগুলো খাটিয়েছে, অপরাধ করেও যাতে পূর্বপরিচয়ে থাকতে পারে। যেখানে মানুষ তাকে সৎ নাগরিক হিসেবে জানে, অর্থাৎ লোকটা আছে কলকাতাতেই। টাকা আত্মসাৎ করে সে যদি বিদেশে, নিদেনপক্ষে অন্য রাজ্যে পালিয়ে যেত, এত সাবধানতা অবলম্বন করত না।”
দীর্ঘ পর্যালোচনার পর দীপকাকু থামলেন। ঝিনুকের মাথা ঝনঝন করছিল। তবে এসব আলোচনা নিতান্ত অ্যাকাডেমিক। প্র্যাকটিক্যাল ফিল্ডে অপরাধীকে ধরার কাজটা প্রায় শুরুই হয়নি। ঘরে বসে নিপুণভাবে বিশ্লেষণ করলে দুষ্কৃতী খুশি হয়ে নিজে এসে ধরা দেবে না। সশরীরে তাকে গিয়ে ধরতে হবে। ভিতর ভিতর অধৈর্য হচ্ছিল ঝিনুক। ওদিকে ভোরের স্বপ্নের অস্বস্তিটা তখনও মাথা থেকে যায়নি। সেটা থেকে রেহাই পেতে বলে উঠল, “আমার একটা লাস্ট কোয়েশ্চেন, বাথরুমের জানলা গলে বামন-খুনির আসা কি সম্ভব? পুলিশ অফিসার তো নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না, দরজাটা আদৌ বন্ধ ছিল কি না?”
“আসা সম্ভব নয়। জানলার মাঝে শার্সি থাকার জন্য ফাঁক অত্যন্ত অল্প। আমি নাড়াচাড়া করে দেখে নিয়েছি, শার্সিটা যে লোহার ফ্রেমে বসানো আছে, জানলায় ফিটিং করার পর থেকে সেটা খোলা হয়নি। ব্যবহার করা হয়নি এগজস্ট ফ্যানের গর্ত। ফ্যান ইনট্যাক্ট আছে।” বললেন দীপকাকু।
নিশ্চিন্ত হল ঝিনুক, যাক, এই অ্যাঙ্গেলটা নিয়ে ভাবার আর কোনও প্রয়োজন নেই।
ডোরবেল বেজে উঠল। দীপকাকু হাতঘড়ি দেখে নিয়ে বললেন, “বিফোর টেন মিনিটস।”
ঝিনুক না বুঝেই উঠে গিয়েছিল দরজা খুলতে। খোলার পর যে দু’জনকে দেখল, একেবারেই আশা করেনি। সূর্যেন্দুবাবু এবং নির্মল জানা। ঝিনুক ডেকে নিয়েছিল তাঁদের। দীপকাকু বাবার সঙ্গে দু’জনের আলাপ করিয়ে দিলেন। সূর্যেন্দুবাবুকে বললেন, “একটু বোসো। এক রাউন্ড চা হয়ে যাক, তারপর বেরচ্ছি।”
সূর্যেন্দুবাবুর কাঁধে আজ কবি-টাইপ সুতির ব্যাগ। ঝিনুক তখনও জানত না ওর মধ্যে সব অর্থে এক মহার্ঘ জিনিস আছে। সূর্যেন্দুবাবুরা সোফায় বসার পর দীপকাকু বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এবার আমি আংটি-রহস্যটা ভাঙি। পুলিশ অফিসার কল্লোল সেনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমার চোখে পড়ল ওঁর নতুন ঘড়ি, আংটি, গলার হারের উপর। আন্দাজ করেছিলাম সদ্য বিয়ে হয়েছে। বিয়ের সূত্রে মনে পড়ল অনিমেষবাবুর মেয়ের বিয়ের প্রসঙ্গ। যে আসরে উপকারী বন্ধু না এসে দামি গয়না পাঠিয়েছিল। কল্লোল সেনের আংটিটা দেখেই মালুম হল, নামী দোকানের তৈরি। কথা প্রসঙ্গে উনি নিজেও সেটা বললেন। আংটিটা ম্যাগনিফায়িং গ্লাস দিয়ে দেখলাম, অহনা জুয়েলার্সের ছোট্ট লোগো ইংরেজি ‘এ’ আংটিতে খোদাই করা আছে। তখনই মাথায় এল, অনিমেষবাবুর বন্ধুর উপহারে যদি এরকমই কোনও লোগো পাই, কোন দোকান থেকে কেনা হয়েছে সেটা অন্তত বোঝা যাবে।”
দীপকাকু আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, বাধা দিয়ে ঝিনুক বলে উঠল, “গয়নার বাক্স দেখেও তো দোকানের নাম জানা যায়?”
বাবা সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকালেন ঝিনুকের দিকে।
দীপকাকু বললেন, “নামী দোকানের বাক্সে কমদামি গিফ্ট দেওয়ার ফাঁকিবাজিটা অনেকেই করে। তা ছাড়া ধরো, গয়না যদি ব্যাঙ্কের লকারে রাখে, জায়গার অভাবে লোকে বাক্স ঢোকায় না। আমাদের লাক ভাল, হারটা লকারে ছিল না। থাকলে আজ বিকেল হয়ে যেত ওটা ছাড়িয়ে আনতে। গয়নাটা ছিল বাক্সে এবং বাড়িতে। আমার নির্দেশমতো আজ ভোরবেলা বোনের শ্বশুরবাড়ি গিয়ে বাক্সসুদ্ধ হারটা নিয়ে এসেছে সূর্যেন্দু, যেটা এখন ওর কাঁধব্যাগে রয়েছে।”
কথাটা শোনার পর ঝিনুক একবার সূর্যেন্দুবাবুর দিকে তাকাল। সঙ্গে দামি জিনিস থাকার কারণেই সম্ভবত একটু আড়ষ্ট হয়ে বসে আছেন। মুখটা খুব সিরিয়াস। হয়তো বাবার আততায়ীকে ধরার সংকল্প। নির্মল জানা কেন এসেছে এখনও বুঝে ওঠা যাচ্ছে না। ভয়-ভয় ভাবটা মনে হয় ওর মুখের স্থায়ী অভিব্যক্তি।
দীপকাকু ফের বলতে শুরু করলেন, “বোনের বাড়ি থেকে সূর্যেন্দু আমায় জানাল গয়নাটা ‘পহেলি’ জুয়েলার্সের। বাক্সটা ওই দোকানের, হারে ইংরেজি ‘পি’ লেখা লোগোও আছে। ঘটনাচক্রে ‘পহেলি’ জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে রজনীশ শর্মা আমার কলেজমেট ছিল। দোকানে ফোন করলাম। রজনীশ ধরল। পারিবারিক ব্যাবসায় ঢুকে গিয়েছে। বলল, ‘এক ডিজ়াইনের গয়না তো ডেলি ডজন ডজন বিক্রি হয় না? টেনটেটিভ একটা ডেট বললে ওরা বের করে দেবে কাস্টমারের সই এবং ফোটো।”
“ফোটো, সই পাবে কী করে?” জানতে চাইলেন বাবা।
দীপকাকু বললেন, “গয়না ডেলিভারির সময় ওদের রসিদে কাস্টমারের সই, পুরো নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর লিখিয়ে নেয়। জিনিসটা বুঝে নিল, সেটার প্রমাণ রইল। কার্ডফার্ড পাঠানোর জন্য রইল ঠিকানা। আর ফোটোটা পাব আমি ওদের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার কন্ট্রোল রুম থেকে। গত এক বছরের প্রত্যেক দিনের ফোটো ওদের কম্পিউটারে সেভ করা আছে।”
বাবা উল্লসিত হয়ে বললেন, “বাঃ, তা হলে তো কেল্লা ফতে! অপরাধীকে আজই চিনে ফেলবে তুমি।”
একটু অন্যমনস্ক গলায় দীপকাকু বললেন, “চেহারাটা হয়তো দেখতে পাব। চিনতে পারব না। সেই কারণেই সূর্যেন্দু, নির্মলকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি। ওরা অনিমেষবাবুর আশপাশের লোকজনকে চিনত। আর যদি কপাল খারাপ থাকে, ওরাও যদি না চেনে লোকটাকে, তখনই কাজটা কঠিন হয়ে যাবে আমার।”
একটা দোলাচল নিয়ে বাড়ি থেকে বেরল ঝিনুকরা। বাবারও ইচ্ছে ছিল আসার, অফিসে কিছু জরুরি কাজ আছে বলে এলেন না। হঠাৎ কী মনে হল, দীপকাকুকে বললেন, “আজ তোমার বাইকটা নিয়ে অফিস যাই। এদিক-ওদিক কয়েকটা জায়গায় ভিজিটও করতে হবে।”
দীপকাকু বললেন, “যান না! মিলিটারি সার্ভিস ছেড়ে আসার পর তো আর চালাননি।”
“চালিয়েছি, কম। এখন বুঝছি, কলকাতার রাস্তায় বাইকই ভাল। বড় গাড়ি পার্কিং করা একটা বিরাট ঝামেলা।”
অনেক দিন পর বাবা বাইক চালাবেন, অল্প একটু টেনশন রয়ে গিয়েছে ঝিনুকের মনে। এর আগে তদন্তের প্রয়োজনে দীপকাকু গাড়ি নিলে বাবা ট্যাক্সিতে অফিস যেতেন। আজকেরটা মনে হচ্ছে নিতান্ত শখ। পার্কিং-এর সমস্যাটা অজুহাত।
