অদৃশ্য নজরদার – ৭

দীপকাকু বোধহয় হার মেনে নিলেন। সপ্তাহ ঘুরে গেল, কোনও সাড়াশব্দ নেই। ফোন করলে হয় তুলছেন না, নয়তো কেটে দিচ্ছেন লাইন। ঝিনুক যখন ধরেই নিয়েছে, দীপকাকু তো অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী নন, বুদ্ধিমান মানুষের মধ্যে একজন। প্রত্যেক মানুষের জীবনেই হার-জিত আছে। হাল ছেড়ে দেওয়া ভাবটা হোঁচট খায় আজ সকালের খবরের কাগজ দেখে। জুতোর বিজ্ঞাপনটা বেরিয়েছে। প্রস্তুতকারক রোডস্টার কোম্পানি নয়। এই কোম্পানিটার নাম ‘নেক্সট স্টেপ’। অ্যাডটা তৈরি করেছে রূপরেখা এজেন্সি। তার মানে আবার চুরি! কী করলেন তা হলে দীপকাকু? দায়িত্ব নিয়েছিলেন, রোডস্টার কোম্পানিকে পছন্দ করানো থেকে প্রচার অবধি দেখাশোনা করবেন। ওঁর হেফাজত থেকেও চুরি হয়ে গেল! ফোটোর আইডিয়াটা এক, জুতোর মধ্যে বিড়াল বসে আড়মোড়া ভাঙছে। কিন্তু ঝিনুক যে চারটে ফোটো দেখেছিল, তার কোনওটাই এটা নয়। সুজয়বাবুর ক্যাপশনটা একেবারে হুবহু টুকে দিয়েছে, ‘আপনার পা জোড়া/ দেবে শুধু আড়মোড়া।’

বিজ্ঞাপনে অগুনতিবার চোখ বুলিয়ে ঝিনুক উঠে যায় দীপকাকুকে ফোন করতে। আশ্চর্য ব্যাপার, একবার ডায়াল করতেই পাওয়া গেল। দীপকাকু বললেন, “আর কিছুক্ষণ পর আমিই তোমাকে ফোন করতাম। রেডি হয়ে নাও। তোমাকে নিয়ে সুজয়বাবুর বাড়ি যাব।”

“সকালের কাগজটা দেখেছেন?” ফোনের এপার থেকে জিজ্ঞেস করে ঝিনুক। ওপ্রান্ত থেকে দীপকাকু বলেন, “দেখেছি।”

দীপকাকুর গলায় কোনও উদ্বেগ ধরা পড়ল না। ঝিনুক বলে, “কী বুঝলেন?”

“সুজয়বাবুর বাড়িতে গিয়ে সব বলব। তার আগে কোনও প্রশ্ন করবে না। লাইন কেটে দিলেন দীপকাকু।

.

যোধপুর পার্কে সুজয়বাবুর ফ্ল্যাটে আজ প্রথম এল ঝিনুক। দীপকাকু আগে একদিন এসেছিলেন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। বেল টিপতে দরজা খুললেন স্বয়ং সুজয় ঘোষ। দীপকাকুকে দেখে বললেন, “কাগজ দেখেছি। আলোচনাটা অফিসে বসে সবাই মিলে করলে হত না?”

ঝিনুক বুঝতেই পারে, এখানে আসার আগে দীপকাকু ফোন করে দিয়েছিলেন সুজয়বাবুকে। ঘরে ঢুকে এসে দীপকাকু বললেন, “না। আমার মনে হয়েছে এই চুরির ঘটনাটায় আপনার সঙ্গে প্রথমে কথা বলা উচিত।”

সুজয়বাবু আর না করতে পারলেন না। নিমরাজি ভঙ্গিতে বললেন, “আসুন তা হলে।”

ড্রয়িং স্পেসটা কাঠের পার্টিশান দিয়ে ঘেরা। দীপকাকু, ঝিনুক বসার পর সুজয়বাবু বসলেন মুখোমুখি লম্বা সোফাটায়। দীপকাকু বললেন, “আপনার ফ্ল্যাটে এই মুহূর্তে কে কে আছেন?”

“কেন বলুন তো?” কপালে ভাঁজ ফেলে জানতে চান সুজয়বাবু।

“এখন যে কথাগুলো আপনাকে বলব, খুবই পার্সোনাল। আমরা তিনজন ছাড়া অন্য কেউ সেটা জানুক, আমি চাই না।

একটু ভেবে নিয়ে সুজয়বাবু বললেন, “বাড়িতে এখন আমি, আমার স্ত্রী, মেয়ে আর কাজের লোক। ছেলে সকালে অফিসে বেরিয়ে গিয়েছে।”

“আমাদের কথা চলাকালীন তারা যেন কেউ না আসে, ব্যবস্থা করতে পারবেন?”

সুজয়বাবু সোফা ছেড়ে উঠলেন। মুখে চিন্তার প্রলেপ। বললেন, “দাঁড়ান, ওদের বলে আসি। চা হয়ে গেলে যেন আমাকে ডেকে দেয়।”

সুজয়বাবু চলে গেলেন পার্টিশানের ওপারে। ঝিনুকের কৌতূহল মাত্ৰা ছাড়াচ্ছে। কী এমন কথা বলতে এসেছেন দীপকাকু, যার জন্য এত গোপনীয়তা দরকার? বাড়ি থেকে বেরনোর আগে দীপকাকুর মতিগতি বোঝার জন্য ঝিনুক বলেছিল, “রূপরেখা এজেন্সির সঙ্গে অপরাধীর যোগাযোগ বেশি। রূপরেখাকে নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু করলে হয় না?”

শর্ত অনুসারে দীপকাকু কোনও উত্তর দেননি। যা বলার এখন বলবেন।

সুজয়বাবু ফিরে এসে বসলেন সোফায়, “বলুন, আপনার পার্সোনাল কথা।”

বেশ খানিকটা সময় ধরে দীপকাকু তাকিয়ে আছেন সুজয়বাবুর দিকে। ব্যাপারটা অস্বস্তিকর। হঠাৎ বলে উঠলেন, “আপনাদের অ্যাড প্ল্যান কোথা থেকে ফাঁস হচ্ছে, বের করে ফেলেছি।”

“ওঃ, রিয়েলি?” বিস্মিত কণ্ঠে বললেন সুজয়বাবু। ঝিনুক তো হতবাক। সত্যি, দীপকাকু একখানা মানুষ বটে! কীরকম কথা চেপে রাখতে পারেন। এত বড় সাফল্যে অদ্ভুত নির্বিকার!

দীপকাকু বলতে শুরু করেছেন, “আপনাদের কেসটা খুবই কঠিন ছিল। বেশ কিছুদিন কোনও নাগাল পাচ্ছিলাম না আমি। তখনই ঠিক করি অপরাধীর ছায়া অনুসরণ করে লাভ নেই। বরং এমন একটা ফাঁদ তৈরি করা যাক, কালপ্রিট নিজে সেখানে এসে ধরা দেবে।”

“ধরা কি দিয়েছে?” জানতে চাইলেন সুজয়বাবু।

দীপকাকু বললেন, “হ্যাঁ, দিয়েছে। আজ সকালের নিউজ পেপারে।”

উত্তেজনায় দম বন্ধ করে বসে আছে ঝিনুক। এক্ষুনি ঘোষিত হবে অপরাধীর নাম। সুজয়বাবুর চেহারায় পড়েছে বিপুল টেনশনের ছাপ। দম নিয়ে দীপকাকু বললেন, “আমার ফাঁদটা ছিল এরকম, জুতোর বিজ্ঞাপনের তিনটে ক্যাপশন আপনাদের তিনজনের কাছে নিয়েছিলাম। কথামতো রোডস্টার কোম্পানির সঙ্গে দেখা করিনি। দিনপাঁচেক পর আপনার কাছে এসে মিথ্যে বলেছিলাম, আপনার ক্যাপশনটাই পার্টির পছন্দ হয়েছে। তবে এ নিয়ে এখন আলোচনার দরকার নেই। আপনারা যেমন এই অ্যাডের ব্যাপারটা ভুলে আছেন, থাকুন। বিজ্ঞাপনটা নির্বিঘ্নে প্রচার হোক। তারপর একসঙ্গে বসা যাবে। কী, বলেছিলাম কিনা?”

ঘাড় হেলান সুজয়বাবু। দৃষ্টিতে দীপকাকুকে বুঝতে না পারার অসহায়তা। ফের শুরু করেন দীপকাকু, “ঠিক একই রকমভাবে আমি পার্থবাবু, গৌতমবাবুর সঙ্গে আলাদা দেখা করেছি, বলেছি, তাঁদের ক্যাপশনটা সিলেক্ট করেছে পার্টি। বাকি আপনাকে যা বলেছি, ওঁদেরও তাই। অর্থাৎ, আপনারা তিনজনই জানলেন, নিজের দেওয়া ক্যাপশনটা সিলেক্টেড। আমি কৃতজ্ঞ, আপনারা রোডস্টার কোম্পানির সঙ্গে এই নিয়ে আর কোনও কথা বলেননি। আমার নির্দেশমতো বিজ্ঞাপনটা ভুলে ছিলেন। আমি অপেক্ষা করছিলাম, অ্যাড প্ল্যানটা চুরি হওয়ার। আপনাদের মধ্যে যিনি অপরাধী, পাচার করবেন নিজের ক্যাপশনটাই। কেননা, তিনি জানেন তাঁর স্লোগানটাই পছন্দ করেছে পার্টি। আজ সকালে দেখা গেল আপনার দেওয়া ক্যাপশন চুরি হওয়া বিজ্ঞাপনে বেরিয়েছে। অৰ্থাৎ…”

কথা আটকে গেল দীপকাকুর। সুজয়বাবু ঢলে পড়েছেন সোফায়। “সর্বনাশ করেছে!” বলে, দীপকাকু উঠে গেলেন সুজয়বাবুর কাছে। ঝিনুকের মনে হচ্ছে অ্যাক্টিং। ধরা পড়ে গিয়ে অভিনয় করছেন সুজয়বাবু। উনি যে পাকা অভিনেতা, এ ব্যাপারে এখন আর কোনও সংশয় নেই। ঝিনুক এতটুকু আঁচ করতে পারেনি, সুজয়বাবুই অপরাধী। বরং পার্থবাবু, গৌতমবাবুকেই সে সন্দেহের তালিকায় রেখেছিল।

সুজয়বাবুর রিস্ট ধরে পাল্স দেখছেন দীপকাকু। মেলাচ্ছেন নিজের ঘড়ির সঙ্গে। মুখে উদ্বেগের সঙ্গে জিজ্ঞাসাও জমা হচ্ছে। সুজয়বাবুর হাত সোফায় নামিয়ে রেখে দীপকাকু ডেকে ওঠেন, “মিসেস ঘোষ! মিসেস ঘোষ! প্লিজ, একবার আসবেন!”

দীপকাকুর ডাকে প্রবল উৎকণ্ঠা মিশেছিল। এক মহিলা ছুটতে ছুটতে তড়িঘড়ি ঘরে এসে দাঁড়ালেন, “কী হয়েছে?”

দীপকাকুকে উত্তর দিতে হল না। মহিলার চোখে পড়েছে স্বামীর অচেতন লুটিয়ে থাকা। প্রায় আর্তনাদ করে ওঠেন, “মিঠু! ও মিঠু! দেখে যা তোর বাবার…”

স্লিপিং গাউন, হাই পাওয়ারের চশমা পরা মিঠু দৌড়ে আসে। মা, মেয়ে দু’জনেই পৌঁছে যান সুজয়বাবুর মুখের সামনে

ঝিনুকের এবার বেশ নার্ভাস লাগছে। দীপকাকুরও অপ্রতিভ অবস্থা। মিঠু আচমকাই ঘুরে তাকায় ঝিনুকদের দিকে। চাউনিতে রাগ গনগন করছে। চাপা হিসহিসে কণ্ঠে জানতে চায়, “কী হয়েছে বাবার? আপনারা কারা?”

দীপকাকু সঙ্গে সঙ্গে নিজের কার্ড বের করে মিঠুর হাতে দেন। বলেন, “ওঁর পাল্স রেট একদম ঠিক আছে। সেটা বোধহয় পেসমেকার বসানো আছে বলে। তাও কেন…?” কথা অসম্পূর্ণ রেখে দীপকাকু অন্য প্রসঙ্গে যান, “কলকাতার সবচেয়ে নামী নার্সিংহোমের এক ডাক্তার আমার বন্ধু। আমি ওকে অ্যাম্বুল্যান্স পাঠাতে বলছি।”

দীপকাকুর কার্ড দেখে একটু দমেছে মিঠু। বলে, “বাবার পেসমেকার লাগানো আছে, আপনারা জানেন?”

কথাটা যেন শুনতেই পেলেন না দীপকাকু, সেলফোন বের করে নম্বর টিপতে শুরু করেছেন। পাওয়া গেল বন্ধুকে। এখানকার পরিস্থিতি, ঠিকানা জানিয়ে তাড়াতাড়ি অ্যাম্বুল্যান্স পাঠাতে বললেন। ফোনসেট পকেটে রেখে মিঠুকে নির্দেশ দিলেন, ঠান্ডা জল নিয়ে আসতে। মিঠু জানতে চাইল, “আপাতত কোনও ওষুধ দিতে হবে কিনা কিছু বললেন আপনার বন্ধু?”

“না, এখন কিছু দিতে হবে না।” বলে, দীপকাকু এগিয়ে গেলেন সুজয়বাবুর কাছে। ঝিনুকও গেল। দু’জনে মিলে সুজয়বাবুকে সোজা করে শোয়ানো হল সোফায়। সুজয়বাবুর স্ত্রীকে আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন দীপকাকু, “ঘাবড়ে যাবেন না। নিজেকে শক্ত রাখুন। উনি খুব একটা খারাপ নেই। এটা অত্যন্ত সাময়িক ব্যাপার। তা ছাড়া অ্যাম্বুল্যান্স তো আসছেই। আমার বন্ধু হার্ট স্পেশ্যালিস্ট…”

ইতিমধ্যে বোতলে ঠান্ডা জল নিয়ে এসেছে মিঠু। ছেটানো হচ্ছে সুজয়বাবুর মুখে। চোখ কুঁচকে রেসপন্স করছেন। মিঠু, মিঠুর মা দু’জনেই সুজয়বাবুকে ডাকছেন। উঃ, আঃ শব্দে সাড়াও দিচ্ছেন সুজয় ঘোষ।

ফ্যান চলছে ফুল স্পিডে। ঝিনুক বলল, “কোনও টেবিল ফ্যান নেই? আরও যদি হাওয়া দেওয়া যেত….”

“বাবার লিভিংরুমে এসি লাগানো। নিয়ে যাব ধরাধরি করে?” মিঠু অনুমতি চায় দীপকাকুর কাছে।

এমন সময় ডোরবেল বেজে ওঠে। ঝিনুক অবাক হয়, “এত তাড়াতাড়ি এসে গেল অ্যাম্বুল্যান্স!”

বাইরে একটি মানুষের গলা। কথা বলছেন কাজের লোকের সঙ্গে। মানুষটি ঘরে আসেন। ঝিনুক দ্যাখে, ডা. অজিত রায়। সুজয়বাবুর বন্ধু।

ডা. রায় ঘরে ঢুকতেই মিঠু বলে ওঠে, “ডাক্তারকাকু দ্যাখো, বাবার কী হয়েছে!”

ঝিনুকদের লক্ষ করার অবকাশ ডা. রায়ের নেই। সুজয়বাবুর দিকে হেঁটে যেতে যেতে বলছেন, “আমি সুজয়ের কাছে এসেছি একটা কাজে। তোমাদের কাজের লোক দরজা খুলে বলল, এই ঘটনা।”

স্টেথোস্কোপ ঝুলছিল গলায়, নামিয়ে পরীক্ষা করছেন বন্ধুকে। এই অবস্থাতেই মিঠুর কাছে জানতে চাইলেন, “অল অফ আ সাডেন এরকম হয়ে গেল! এনি শক?”

মিঠু চোখের ইশারায় দীপকাকুকে দেখায়। দৃষ্টি অনুসরণ করে ডা. রায় দেখলেন দীপকাকুকে। বললেন, “ও, আপনি! আপনাদের সেই কেস। কেন ওইসব নিয়ে আলোচনা করেন সুজয়ের সঙ্গে! বেচারার হার্টের অসুখ। আলোচনা যদি করারই থাকে, ওর দুই বন্ধুকে সঙ্গে রেখে করুন।”

দীপকাকু মাথা নিচু করে নিয়েছেন। প্রাথমিক পরীক্ষা সাঙ্গ করে ডাক্তারবাবু বললেন, “আপাতত দিনদুয়েক আমার নার্সিংহোমে রাখি। মনে হচ্ছে মেজর কিছু নয়। দু’-একটা টেস্টফেস্ট করে ছেড়ে দেব।”

দীপকাকু বললেন, “আমি যে রেমিশন নার্সিংহোমের অ্যাম্বুল্যান্স আনতে বলে দিলাম। হয়তো এক্ষুনি এসে পড়বে!”

আচমকা খেপে গেলেন ডা. রায়। বললেন, “কে আপনাকে রেমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে?”

“কেউ বলেনি। ওঁকে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যেতে দেখে আমিই করলাম। আমার এক ডাক্তার-বন্ধু…”

কথার মাঝখানে ধমকে ওঠেন ডা. রায়, “রাখুন আপনার ডাক্তার-বন্ধু! সুজয়ের পেসমেকার আমি বসিয়েছি, আমাকে প্রথমে ডাকা উচিত ছিল আপনার। ভাগ্যিস এসে পড়লাম!”

দীপকাকু চুপ করে গেলেন। ডা. রায় এবার মিঠুকে বললেন, “আমার গাড়িতেই সুজয়কে নার্সিংহোমে নিয়ে যাচ্ছি। তোমাদের কোনও আপত্তি নেই তো?”

“না, না, আপত্তি কেন থাকবে? আপনি যেমন ভাল বুঝবেন..!” বললেন সুজয়বাবুর স্ত্রী।

দীপকাকু ফের বলে ওঠেন, “স্ট্রেচার থাকলে ভাল হত না। এই কন্ডিশনে পেশেন্টকে ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়া, মানে আমরা তো তেমন ট্রেন্ড নই!”

“আপনাকে তো ধরতে হবে না। গাড়িতে আমার নার্সিংহোমের দু’জন স্টাফ আছে। আমি ডেকে নিচ্ছি তাদের।” বলে, ডাক্তারবাবু নিজের সেলফোন বের করলেন। ঝিনুক লক্ষ করল, দীপকাকু ঘরের কোণের দিকে গিয়ে মোবাইল ফোন বের করে সুইচ টিপছেন। ডা. রায় স্টাফ দু’জনকে উঠে আসতে বললেন চারতলার এই ফ্ল্যাটে। দীপকাকু বন্ধুকে অ্যাম্বুল্যান্স ফিরিয়ে নিতে বললেন।

.

এর আগে কোনও কেসে নিজেদের এত অবাঞ্ছিত মনে হয়নি। ডা. রায়ের রিপোজ অন নার্সিংহোমের কোর্ট ইয়ার্ডে ঘুরঘুর করছেন ঝিনুক, দীপকাকু সুজয়বাবু অ্যাডমিট হয়েছেন। রাখা হয়েছে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে। জ্ঞান পুরোপুরি ফেরেনি।

সুজয়বাবুকে যখন আইসিইউ-তে নিয়ে যাওয়া হল, খটকা লেগেছিল ঝিনুকের, দীপকাকুকে জিজ্ঞেস করেছিল, “ডা. রায় যে বললেন মেজর কিছু নয়, তা হলে কেন ভেন্টিলেশনে রাখা হচ্ছে?”

দীপকাকু বলেছিলেন, “এই ধরনের হার্ট পেশেন্টকে প্রথমে আইসিইউ-তে নিয়ে যাওয়া হয়। চব্বিশ ঘণ্টা অবজার্ভ করার পর কাল হয়তো জেনারেল বেডে দেবে।”

ঝিনুকের ভয় কাটেনি। খালি মনে হচ্ছে, ডা. রায় রোগীর বাড়ির লোকেদের সান্ত্বনা দিয়েছেন। অবস্থা আসলে খুবই জটিল। যদি খারাপ কিছু হয়ে যায় সুজয়বাবুর, দীপকাকুকে দায়ী করবে সুজয়বাবুর আত্মীয়স্বজন। মুখে না বললেও দীপকাকু ভালমতোই সেটা টের পাচ্ছেন। তাই এত অন্যমনস্ক, ঝিনুকের পাশে থেকেও যেন নেই! এরই মধ্যে দীপকাকুর একটা নতুন উপসর্গ লক্ষ করেছে ঝিনুক, কখনও-সখনও নিজের মনে বিড়বিড় করে কথা বলছেন। ঝিনুকের একবার মনে হয়েছিল বাবার কথা। বাবাকে ডেকে পাঠালে কেমন হয়। প্রস্তাবটা তক্ষুনি নাকচ করেছেন দীপকাকু। বলেছেন, “খামোখা ওঁকে ব্যস্ত করে লাভ নেই। কাজের ক্ষতি হবে রজতদার।”

তারপর থেকে ঝিনুক আর কোনও কথা বলেনি। দীপকাকুর পাশে পাশে হেঁটে বেড়াচ্ছে। পার্থবাবু, গৌতমবাবু খবর পেয়ে চলে এসেছেন নার্সিংহোমে। সুজয়বাবুর ছেলেও এসেছেন। বাড়ির লোক ছাড়াও সুজয়বাবুর আত্মীয়স্বজনরা জড়ো হয়েছেন। কেউ কোনও কথা বলছেন না ঝিনুকদের সঙ্গে। সবাই একরাশ উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ভিজিটর্স জোনে। ঝিনুকরাই শুধু বাইরে। দীপকাকু একফাঁকে নার্সদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

পার্থবাবুকে দেখা গেল স্বজনদের জটলার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে। ঝিনুক প্রমাদ গোনে। সুজয়বাবুর অসুস্থতার কারণ হিসেবে পার্থবাবু নিশ্চয়ই দীপকাকুকেই দুষবেন। তবে খুব বেশি কিছু বলতে পারবেন বলে মনে হয় না। এলোমেলো চুল, থমথমে মুখ, মোটা কাচের ঘোলাটে চশমায় দীপকাকু যেন বিষণ্ণতার প্রতিমূর্তি!

পার্থবাবু সামনে এসে দাঁড়ালেন। একটু সময় নিয়ে ঠান্ডা গলায় জানতে চাইলেন, “সুজয়ের সঙ্গে আলাদা কী দরকার পড়ল আপনার?”

“কেসটার ব্যাপারেই কথা বলতে গিয়েছিলাম।” বললেন দীপকাকু

“কী কথা?”

সরাসরি উত্তর না দিয়ে দীপকাকু অন্য প্রশ্নে গেলেন, “জুতোর অ্যাডটা দেখেছেন কাগজে?”

“দেখেছি। একটা জিনিস আশ্চর্য লাগছে! আপনি বলেছিলেন আমার ক্যাপশন ‘বেডরুম কমফোর্ট’ পার্টি পছন্দ করেছে। সুজয়ের স্লোগান চুরি হল কেন তা হলে?”

“চোরেদের সুজয়বাবুর ক্যাপশনটাই পছন্দ হয়েছে।” উত্তর দিলেন দীপকাকু। পার্থবাবু আর কোনও প্রশ্ন করলেন না। অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে আছেন নার্সিংহোমের দিকে। একসময় বললেন, “চলুন, চা খাওয়া যাক। বিজনেস, কেস, এসব নিয়ে পরে ভাবলেও চলবে। আগে সুজয় ভাল হয়ে ফিরুক।”

“আমি একটু আগেই চা খেলাম। আপনি খেয়ে আসুন।” বললেন দীপকাকু। সম্পূর্ণ মিথ্যে কথা! এড়িয়ে গেলেন পার্থবাবুকে।

পার্থ বর্মন একাই হেঁটে যাচ্ছেন গেটের দিকে। দীপকাকু ঝিনুককে বললেন, “চলো, আমরা একবার বাড়ির চারপাশটা ঘুরে দেখি। আগের দিন সামনের দিকটাই দেখা হয়েছে শুধু।”

পাঁচিলের বাইরে না গিয়ে বাড়ির চৌহদ্দি ধরে হাঁটতে লাগল ঝিনুকরা। বিল্ডিং এরিয়া এতটাই বড়, রাউন্ড কমপ্লিট করতে মিনিটপাঁচেক লেগে যাবে মনে হয়। বাড়ির সামনের দিক এক পাড়ায়, পিছন দিক আর-এক পাড়ায়।

একটা জিজ্ঞাসা অনেকক্ষণ ধরে মাথায় ঘুরঘুর করছে। এই অবসরে প্রশ্নটা করে ফেলে ঝিনুক, “আমি একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না, প্রমাণ যখন হয়েই গিয়েছে, সুজয়বাবুর থেকে ফাঁস হচ্ছে অ্যাড প্ল্যান, আপনি কেন বাকি দুই পার্টনারকে সে-কথা জানাচ্ছেন না?”

মাথা নিচু করে হাঁটতে হাঁটতে দীপকাকু বললেন, “সেই একটাই পয়েন্ট, মোটিভ। আমি এখনও উদ্দেশ্যটা খুঁজে পাইনি। কেন সুজয়বাবু এই কাজটা করছেন? কী স্বার্থ আছে তাঁর?”

“হয়তো রিভেঞ্জ। দুই পার্টনারের উপর রাগ জমা রয়েছে কোনও কারণে।”

“নিজের ক্ষতি করে প্রতিশোধ বড় একটা কেউ নেয় না। তা ছাড়া অনেক অনুসন্ধান করেও এমন কোনও ঘটনা-সূত্র আমি পাইনি, যেখানে সুজয় ঘোষ নিজেদের কোম্পানির শত্রু হয়ে উঠতে পারেন।” একটু থামলেন দীপকাকু। পরে বললেন, “একটা জিনিস মনে রাখবে, জল ছাড়া যেমন মাছ হয় না, উদ্দেশ্য ছাড়া অপরাধ সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। আমি সেই কারণটা জানতেই প্রথম গিয়েছিলাম সুজয়বাবুর কাছে। ওঁকে দোষী সাব্যস্ত করার পর, চাপের মুখে যদি উদ্দেশ্যটা বলে ফেলেন। কিন্তু তার আগেই….”

কথা শেষ না করে ধীর লয়ে হেঁটে যাচ্ছেন দীপকাকু। ঝিনুক ভাবে, সুজয়বাবুর যদি খারাপ কিছু হয়ে যায়। তাদের কেসটাও অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। খুবই ইন্টারেস্টিং ছিল এবারের কেস।

দীপকাকু বলে ওঠেন, “উনি অসুস্থ হয়ে অবশ্য আমার একটা সুবিধে করে দিয়েছেন।”

“কী সুবিধে?” জিজ্ঞেস করে ঝিনুক।

উত্তরে দীপকাকু একদম নিজস্ব মিচকে হাসিটা হাসেন। ঝিনুক জানে, ওই হাসিটার আড়ালে দীপকাকু লুকিয়ে রেখেছেন রহস্যভেদের অব্যর্থ নিশানা।

হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির পিছনে এসে থমকে দাঁড়াতে হয় ঝিনুকদের। চিত্রা অ্যাড এজেন্সির বোর্ড! তার মানে একই বাড়িতে নার্সিংহোম, বিজ্ঞাপন কোম্পানি এবং বসবাস। পুরো বাড়িটাই যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে।

সামনের অংশের সঙ্গে এদিকটার কোনও মিল নেই। গেট অবধি মোরাম বিছানো রাস্তা ছাড়া পুরোটাই বাগান। পুরনো গাছপালায় জায়গাটা বেশ নির্জন, ছায়াঘেরা।

ঝিনুকের মতো দীপকাকুও চারপাশে চোখ বোলাচ্ছেন। রিস্টওয়াচ দেখে নিয়ে বললেন, “চলো, দশটা তো বাজতে চলল। চিত্রার মালকিন অফিসে ঢুকেছেন কিনা দেখি। ওঁর সঙ্গে একটু আলাপ করে আসি।”

অফিস স্টাফরা এখনও কেউ আসেনি। পুরো হল ফাঁকা। একটা লোক টেবিল-চেয়ার ঝাড়পোঁছ করছিল। তাকে জিজ্ঞেস করতে জানা গেল, ম্যাডাম উপর থেকে নামবেন একটু পরেই। লোকটা ঝিনুকদের ম্যাডামের চেম্বারেই বসতে বলল। বোঝাই যাচ্ছে, এখানকার সিকিউরিটি নিয়ে তেমন কড়াকড়ি নেই।

এমডি-র ঘরে ঢুকতেই ঝিনুকের দৃষ্টি কেড়ে নিল একটা পোস্টার। চকলেটের বিজ্ঞাপন। বাচ্চা মডেলটি ঝিনুকের ভীষণ চেনা। খুবই উত্তেজিত হয়ে ঝিনুক দীপকাকুকে বলল, “ছেলেটাকে চিনতে পারছেন?”

চেয়ারে বসে দীপকাকু বললেন, “পেরেছি। ডা. রায়ের প্রয়াত সন্তান।”

“ছেলেটা যে মডেলিং করেছে, ডা. রায় তো বলেননি আগের দিন।”

“এ আর বলার কী আছে? মায়ের এজেন্সিতে ছেলে মডেল হবে, অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। বিশেষ করে ছেলেটিকে যখন এত সুন্দর দেখতে ছিল!”

দীপকাকুর কথা শেষ হতে না-হতে ঘরে ঢোকেন স্নানস্নিগ্ধ এক মহিলা। বলেন, “আপনারা দেখা করতে এসেছেন আমার সঙ্গে? বলুন কী ব্যাপার?”

ভদ্রমহিলার উপস্থিতিতে ঘরে একটা মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। নিশ্চয়ই বিদেশি পারফিউম। নিজের সিটে গিয়ে বসলেন। দীপকাকু যথারীতি নিজের কার্ড বের করে মহিলার হাতে দিলেন। বললেন, “একটা রুটিন এনকোয়ারির জন্য আপনার কাছে আসতে হল।”

কার্ডটা পড়ে টেবিলের কাচের তলায় রাখলেন চিত্রাদেবী। নামটা ঝিনুক জেনেছে তদন্তসূত্রে। ডা. রায় স্ত্রীর নামে এজেন্সি খোলেন। চোখ তুলে ভ্রু কুঁচকে চিত্রাদেবী জিজ্ঞেস করলেন, “আমার কাছে কীসের এনকোয়ারি?”

সংক্ষিপ্ত আকারে অ্যারোর কেসটা বলতে থাকলেন দীপকাকু। জানাতে ভুললেন না, চিত্রা এজেন্সি একবার অজান্তে অ্যারোর অ্যাড হাতিয়েছিল। সুজয় ঘোষ অসুস্থ হয়ে চিত্রাদেবীদের নার্সিংহোমে ভরতি আছেন, সেটাও বললেন। চেপে গেলেন অসুস্থ হওয়ার আসল কারণ।

সব শুনে চিত্রাদেবী বললেন, “রিয়েলি স্যাড! আমি এইমাত্র সুজয়দাকে দেখে, বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলে, অফিসে ঢুকলাম। একে হার্টের অসুখ, তার উপর বিজনেস নিয়ে এত ঝড়ঝাপটা… কিন্তু এসবের জন্য আমরা আর কতটা দায়ী বলুন? একবারই অ্যারোর কপি করেছিলাম। আপনিও জানেন, সেটা হয়েছিল আমাদের অজ্ঞাতে।”

কথার পিঠে দীপকাকু বললেন, “এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাচ্ছি। আপনার পিছনের দেওয়ালে যে অ্যাড কপিটা লাগানো আছে, মডেল সম্ভবত আপনার ছেলে?”

“হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। কী করে বুঝলেন?”

“এই কেসের সূত্রে আমরা একবার ডা. রায়ের সঙ্গে দেখা করি…”

বাকিটুকু বলে দেন চিত্রাদেবী, “ওঁর চেম্বারে সানির ফোটো দেখেন। এটা আমারই আন্দাজ করা উচিত ছিল। কেননা, আমার মিস্টার আপনাদের আগমনের খবর আমাকে জানিয়েছিলেন।”

“আপনার ছেলের ভাল নাম?” এই ফাঁকে জিজ্ঞেস করে নেয় ঝিনুক।

“সায়ন্তন। সায়ন্তন রায়।” শেষ উচ্চারণে গলা ভারী হয়ে আসে চিত্রাদেবীর।

দীপকাকু নিরাসক্ত কণ্ঠে পরের প্রশ্নে যান, “এই কেসের তদন্তে নেমে যতটুকু জেনেছি, ছেলের মৃত্যুর পর এজেন্সিটা খোলা হয়। তার আগে কী করে অ্যাডটা তৈরি হল?”

চিত্রাদেবী ম্লান হাসেন। রিভলভিং চেয়ারের সাহায্যে ফোটোর দিকে ঘুরে গিয়ে বললেন, “এটা অ্যারোর তৈরি করা বিজ্ঞাপন। ফোটোশুটের একদিন পরেই আমার ছেলে মারা যায়।”

ফের মুখোমুখি হলেন ঝিনুকদের। বললেন, “এরকম একটা মিসহ্যাপ হয়ে যাওয়ার কারণে সুজয়দারা বিজ্ঞাপনটা মার্কেটে ছাড়েননি। ইনফ্যাক্ট, আমি জানতাম না কাজ এতটা হয়ে গিয়েছিল। ক’দিন আগে আমার হাজব্যান্ড এই ফোটোটা আমাকে দিলেন।”

দীপকাকু কোনও প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন, দরজায় ঠকঠক শব্দ। চিত্রাদেবী বললেন, “এসো।”

যে লোকটি ঘরে ঢুকে এল, তাকে দেখে ঝিনুকের চক্ষু চড়কগাছ। সেই হ্যান্ডবিলওলা! লোকটাও হতভম্ব হয়ে গিয়েছে ঝিনুকদের দেখে। তাড়াতাড়ি ঘোর কাটিয়ে, চাবি এগিয়ে দেয় চিত্রাদেবীর দিকে। বলে, “গাড়ি রেখে গেলাম ম্যাডাম।”

মালকিনের উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে বেরিয়ে যায় লোকটা। দীপকাকু চোখের ইশারায় ঝিনুককে কিছু বলেন। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় ঝিনুক চিত্রাদেবীকে বলে, “এক্সকিউজ মি, আমি একটু আসছি।”

বারান্দায় এসে ঝিনুক দ্যাখে, ভোঁ-ভাঁ। প্রায় পঁচিশ ফুট মোরাম বিছানো রাস্তার পর গেট। কেউ কোথাও নেই। লোকটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল নাকি!

বারান্দা থেকে নেমে আসে ঝিনুক, দীপকাকু ইশারায় লোকটাকে ফলো করতে বলেছেন। বাগানের চারপাশে চোখ বোলায়, কোনও অস্তিত্ব নেই। উঁচু গাছের ডালে খোঁজে ঝিনুক, যদি উঠে গিয়ে থাকে। পায় না। ফিরতে থাকে অফিসের দিকে।

চৌকাঠ ডিঙোলেও চেম্বারে গেল না ঝিনুক। দরজার আড়াল থেকে লক্ষ রাখল গেটের উপর। এবং যা ভেবেছিল তাই, একটা মোটাসোটা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল লোকটা। এপাশ-ওপাশ দেখে নিয়ে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে চলল গেটের দিকে।

সময় নষ্ট করা চলবে না। বড় বড় স্টেপিংয়ে দৌড় শুরু করে ঝিনুক। নুড়ি বিছানো রাস্তায় দৌড় প্রায় হাঁটার শামিল। পায়ের শব্দ পেয়ে লোকটা ঘুরে তাকায়। সে-ও পড়িমড়ি করে ছুটতে থাকে। ঝিনুকের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে আছে। গেটের বাইরে চলে গেলে ওকে আর ধরা যাবে না। সেখানে নুড়ি বিছানো নেই। বাঁ পা সামনে রেখে আপ্রাণ জাম্প দেয় ঝিনুক।

দু’জনেই এখন গেটের বাইরে ফুটপাতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। খুব তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায় ঝিনুক। লোকটা উঠতে যাচ্ছে, ঝিনুক নির্মম একটা কিক ছোড়ে। কী অনায়াসে হাত দিয়ে সেটা আটকে সোজা হয় লোকটা!

প্রতিপক্ষের হাইট বেশি, ঝিনুক পরের স্ট্রোক নেয় পা দিয়েই। এটাও প্রতিহত হয়। ঝিনুক বুঝতে পারে লোকটা কুংফু জানে। অসম্ভব দ্রুত নাইফ হ্যান্ড স্ট্রোক নেয় ঝিনুক। মুহূর্তে সরে যায় লোকটা। ফ্লেক্সিবিলিটি দারুণ! এ মা, লোকটা হাসছে কেন! ভাবটা এমন, যেন ফ্রেন্ডশিপ কনটেস্ট। ঝিনুক পরের পর স্ট্রোক নিতেই থাকে। প্রতি-আক্রমণে না গিয়ে লোকটা শুধু মার আটকায়। লোক জমা হচ্ছে, লোকটার হাসিমুখ দেখে দর্শকবৃন্দ নিশ্চয়ই ভাবছে, কুংফুর টিচার তালিম দিচ্ছেন তাঁর ছাত্রীকে। এক সময় সত্যিই টিপ্‌স দিতে শুরু করে লোকটা, “ডান পা সামনে রাখো, বাঁ হাতে, বাঁ হাতে নাও স্ট্রোক। এ কী হচ্ছে? হাঁটু ভাঙছে কেন?…” ঝিনুক প্রায় বোর হয়ে যাচ্ছে, কোনও আক্রমণেই কাজ হচ্ছে না। পাবলিক ভুল বুঝে সমানে উৎসাহ জুগিয়ে যাচ্ছে। আচমকা কে যেন লোকটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল! দীপকাকু! হ্যান্ডবিলওলাও হকচকিয়ে গিয়ে ফুটপাতে বসে পড়েছে। দীপকাকু কলার ধরে তুলতে যাবেন, লোকটা বুঝিয়ে দিল, সে কত বড় প্লেয়ার! এক লাথিতে দীপকাকুকে ছিটকে ফেলে দিল প্রায় ফুটপাঁচেক দূরে। উঠে দাঁড়িয়ে লাগাল চোঁ-চাঁ দৌড়।

ঝিনুক ছুটে যায় দীপকাকুর কাছে। যে কিক্‌টা কষিয়েছে লোকটা, কুংফুর ভাষায় ডেথ-কিক। ফুটপাতে শুয়ে ছটফট করছেন দীপকাকু। কপাল কেটে রক্ত বের হচ্ছে, আরও হয়তো কোথাও কেটেছে, ফেটেছে।

ব্লিডিং দেখে নার্ভাস হওয়ার মেয়ে নয় ঝিনুক। দীপকাকুর মাথা তুলে নিয়েছে কোলে। পেটে হাত চেপে দীপকাকু গোঙাচ্ছেন। লাথিটা মারা হয়েছে তলপেটে।

রাস্তায় জমা হওয়া লোকগুলো ঘিরে ধরেছে ঝিনুকদের। এতক্ষণে মালুম হয়েছে, আগের লড়াইটা ফ্রেন্ডশিপ ছিল না।

ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ একজন বলে ওঠে, “চলুন, হসপিটালে নিয়ে যাই।”

ঝিনুক ভাবছে কী করা উচিত, আঘাত কতটা গুরুতর? দীপকাকুর সেলফোন থেকে বাবাকে ফোন করবে কি?

যন্ত্রণারত অবস্থাতেই দীপকাকু নির্দেশ দেন, “ডা. রায়ের নার্সিংহোমেই অ্যাডমিট করো আমায়।”