ফন্দিবাজ বন্দি – ৪

থানা থেকে অনিমেষবাবুর অফিসটা খুবই কাছে। বাইকে দু’মিনিটও লাগল না পৌঁছতে। কল্লোল সেনও এলেন বাইকে, পিছনের সিটে একজন কনস্টেবলকে নিয়ে।

ছ’তলার কমপ্লেক্স, নাম ‘পরমা’। গেটের কাছেই পাওয়া গেল নির্মল জানাকে। গোল্ডেন ইনভেস্টমেন্ট-এর প্রাক্তন স্টাফ। বয়স পঁচিশের কাছে। তাকে সঙ্গে নিয়ে কল্লোলবাবু কমপ্লেক্সের মাঝের করিডর ধরে চললেন অনিমেষবাবুর অফিসঘর খুলতে। অফিস স্পেসটা একতলায়। একদম শেষ প্রান্তে।

ঝিনুকরা এসে দাঁড়াল তালাবন্ধ দরজার সামনে। তালা খুলল কনস্টেবল। ঘর থেকে বেরিয়ে এল মনখারাপের বাতাস। ভিতরে ঢুকল ঝিনুকরা। সুইচ টিপে ঘরের লাইট, ফ্যান চালিয়ে দিলেন কল্লোলবাবু। চারপাশে চোখ বোলালেন দীপকাকু। পুলিশ ঘরটা সাফসুতরো করে ফেললেও তাণ্ডবের চিহ্ন এখনও দগদগ করছে। বড় টেবিলটার কাচ ভাঙা। উলটো দিকের চেয়ারটাও পিছনে হেলে আছে। টেবিলের ডান দিকে ওয়াল হ্যাঙ্গিং, টেবিলের উপর দুটো কম্পিউটার, দুটোরই মনিটর ক্র্যাক হয়ে আছে। দেওয়ালের উইন্ডো এসি মেশিনটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ঠুকে ঠুকে ভাঙা হয়েছে। সব দেখে দীপকাকু তাকালেন ঘরের পিছনের বন্ধ দরজার দিকে। বললেন, “ওটাই অ্যান্টিচেম্বার?”

“হ্যাঁ।” বলে, কল্লোলবাবু এগিয়ে গেলেন দরজাটা খুলতে। এটায় তালা দেওয়া নেই, মাঝবরাবর ল্যাচ টানা। খুলে ফেলে কল্লোলবাবু বললেন, “আসুন!” দীপকাকু এগোলেন। অনুসরণ করতে ইতস্তত করল ঝিনুক। থানায় দেখা ফোটোটা এখনও মাথায় আছে। মনে হচ্ছে, ওই ঘরে গেলেই দেখবে, ঝুলছে অনিমেষবাবুর বডি।

মনের সঙ্গে লড়াই করে চলেই এল। একফালি ঘর, আলো জ্বালানো হয়েছে। প্রথমেই চোখ গেল সিলিং ফ্যানে, একটা ব্লেড তেড়াবেঁকা হয়ে আছে। মেন রড থেকে ওর পাশ দিয়েই হয়তো নেমেছিল দড়ি।

দীপকাকুর দৃষ্টি চরকির মতো পাক খাচ্ছে ঘরে। জিজ্ঞেস করলেন, “টুলটা কোথায়?”

কোন টুলের কথা বলা হচ্ছে, এক চান্সে বুঝলেন কল্লোলবাবু। আঙুল দেখিয়ে বললেন, “ওই তো! উলটে রাখা আছে বলে চট করে চোখে পড়ছে না।”

ঘরের কোনা থেকে টুলটা নিয়ে ফ্যানের নীচে রাখলেন দীপকাকু। উঠে দাঁড়ালেন টুলটার উপর। বুক ছমছম করে উঠল ঝিনুকের। ওখানে দাঁড়িয়েই দীপকাকু কল্লোল সেনকে জিজ্ঞেস করলেন, “হাইট কেমন ছিল অনিমেষবাবুর? আমার মতো?”

“হ্যাঁ, আপনার হাইটের হবেন।” বললেন কল্লোলবাবু।

ফ্যানের দিকে চোখ তুলে দীপকাকু বললেন, “দড়িটা কোথায়?” ভয়ে হাত-পা রীতিমতো ঠান্ডা হয়ে গেল ঝিনুকের, দীপকাকু কি এখন মহড়া দেবেন?

দেখা গেল উদ্দেশ্য তা নয়। কল্লোলবাবু বললেন, “দড়ি থানার মালখানায় জমা আছে। দেখতে চান তো দেখাতে পারি। এমনি কাপড়জামা শুকোতে দেওয়ার নাইলন দড়ি, দু’পাশে আংটা, আজকাল বেরিয়েছে না! এ ঘরেই খাটানো ছিল। কাজের চাপ থাকলে স্টাফ, কখনও-বা অনিমেষবাবু থেকে যেতেন রাতে। কাপড়জামাগুলো ঝোলাতেন ওই তারে।”

টুল থেকেই দীপকাকু জানতে চাইলেন, “ইলাস্টিসিটি কেমন ছিল দড়িটার?”

“মিনিমাম। টুলটা পা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার পর ফ্লোর থেকে অনিমেষবাবুর সত্তর কেজির শরীরটা ঝুলছিল দেড় ফুট উঁচুতে।”

এবার নেমে এলেন দীপকাকু। বললেন, “দেখছিলাম, এত তাড়াতাড়ি কী করে ঘটনাটা তিনি ঘটাতে পারলেন। হাতের কাছে সব মজুত ছিল দেখছি।”

ডান দিকের দেওয়ালের পাশে ছোট দরজা। দরজাটা দেওয়ালের রঙের বলে এতক্ষণ চোখে পড়েনি ঝিনুকের। ছিটকিনি খুলে ঢুকে গেলেন দীপকাকু। ফাঁক দিয়ে দেখা গেল, ওটা বাথরুম। দীপকাকু বেরিয়ে এসে কল্লোলবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, “বডি যখন নামান, বাথরুমের ছিটকিনি কি বাইরে থেকে লাগানো ছিল?”

অনেকক্ষণ ধরে ভেবে কল্লোলবাবু বললেন, “মনে করতে পারছি না! তবে আপনি যে আন্দাজটা করছেন, সেটা সম্ভব নয়। বাথরুমের জানলাটা এতই ছোট, কোনও মানুষ ঢোকার সম্ভাবনা নেই। আর এগ্‌জস্ট ফ্যানটা যেরকম, তেমনই আছে। ভাঙা হয়নি।”

দীপকাকু এগিয়ে যাচ্ছেন বিপরীত দেওয়ালের দিকে। যেখানে ব্যাঙ্কের লকারের মতো চওড়া আলমারি। যেতে যেতে দীপকাকু বললেন, “আমি এমন একটা কেস জানি, ওই ফাঁক দিয়ে বামন মানুষ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার এতটাই শক্তি, অনায়াসে হ্যাং করিয়ে দিয়েছিল ষাট কেজির এক ভদ্রমহিলাকে।” কল্লোলবাবু আর কোনও উত্তর দিতে পারলেন না। এতক্ষণে হয়তো বুঝলেন, দীপকাকু কী বস্তু!

স্টিলের আলমারিটা বিশেষভাবে তৈরি করা। বড় বড় ড্রয়ার, মুখে চাবি ঢোকানোর গোল জায়গা। দীপকাকু আতশ কাচ বের করে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছেন আলমারির বডি। বলে উঠলেন, “মনে হচ্ছে এখানেই অফিসের কাগজপত্র সব থাকত।”

“হ্যাঁ। টাকাও ছিল অল্পকিছু, এই ড্রয়ারটায়।” বলে, কল্লোল সেন ডান পাশের দেওয়াল ঘেঁষে উপর থেকে সেকেন্ড ড্রয়ারটা দেখালেন।

দীপকাকুর বুকের উচ্চতায় ড্রয়ারটা, টেনে খুললেন কাকু। এবার পকেট থেকে টর্চ বেরল। টর্চ জ্বালিয়ে আতশ কাচ চোখে দিয়ে দেখতে লাগলেন ভিতরটা। ঝিনুক ডিঙি মেরে যতটুকু দেখল, ড্রয়ারটা ফাঁকাই

দীপকাকু আরও কয়েকটা ড্রয়ার খুলে বন্ধ করলেন। সবই ফাঁকা। বললেন, “এখানে যা ছিল সব নিশ্চয়ই আপনার হেফাজতে?”

“হ্যাঁ। আপাতত।” বললেন কল্লোল সেন।

“কী ধরনের কাগজপত্র ছিল?” আলমারিটা পিছনে রেখে মুখোমুখি হলেন দীপকাকু।

কল্লোলবাবু বললেন, “বিশেষ কিছু না। ক্লায়েন্টদের নামে সেপারেট ফাইল, শেয়ারের কাগজ, বিল-ভাউচার আর নগদ আড়াই হাজার টাকা।

“এই ব্যাবসায় অন্য কোনও পার্টনার থাকার সামান্য কোনও আভাস কি পাওয়া গিয়েছে পেপারগুলোয়?” জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকু।

দু’পাশে মাথা নেড়ে কল্লোল সেন বললেন, “আমার চোখে তো পড়েনি। আপনি ইচ্ছে করলে দেখতে পারেন।”

কপালে অজস্র ভাঁজ নিয়ে দীপকাকু অ্যান্টিচেম্বার থেকে বেরতে উদ্যত হলেন। ঝিনুক তখনই ফলো করল না। বাথরুমটা দেখা হয়নি তার। দরজা ঠেলে ঢুকল, চোখ গেল উপরের ফালি জানলাটায়। চমকে উঠল, কার যেন মুখ! পরক্ষণেই বুঝল, মনের ভুল। দু’ফুট বাই একফুট জানলাটার মাঝে আড়াআড়ি কাচের শার্সি। ফাঁক গলে আসছে রোদ, আর কিছু নয়। একটু আগে দীপকাকুর বলা বামন-খুনির মুখটাই ভ্রমবশত দেখল ঝিনুক। এই ধরনের কেসের সঙ্গে বেশিদিন থাকলে মাথাটাই খারাপ হয়ে যেতে পারে ঝিনুকের।

অফিসঘরে ফিরে এসে দেখল, ফাটা মনিটরের নীচে সিপিইউ-এর সামনে হাঁটু মুড়ে বসেছেন দীপকাকু। সিপিইউ দুটোও বিচ্ছিরিভাবে ভাঙা হয়েছে। দীপকাকু এটা-সেটা নাড়ছেন। ইলেকট্রনিক পার্টস তুলে এনে আতশ কাচ দিয়ে দেখছেন খুঁটিয়ে। দীপকাকুর তদন্ত মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ করে যাচ্ছেন কল্লোল সেন। কনস্টেবল অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছে। নির্মল জানার মুখে স্থায়ী ভয়-ভয় ভাব।

বসা অবস্থাতেই দীপকাকু ঘাড় ফিরিয়ে কল্লোলবাবুকে বললেন, “দুটো কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক দেখছি না। আপনারা সিজ করেছেন, নাকি চুরি হয়ে গিয়েছে?”

“আমরা এসে পাইনি। আপনি এখন যে অবস্থায় কম্পিউটার দুটো দেখছেন, আমরা এসে এরকমই দেখেছিলাম। তখন ছড়ানো-ছিটানো ছিল, সামান্য গুছিয়ে রেখেছি।”

“তাতেই আমার কাজটা অনেক কঠিন হয়ে গিয়েছে।” বলে, উঠে দাঁড়ালেন দীপকাকু। বড় টেবিলটার এপারে রিভলভিং চেয়ারে বসে বললেন, “এর জন্য আপনাদের দায়ী করে তো লাভ নেই। পুলিশ নিজের ডিউটি করেছে।”

রিভলভিং চেয়ারের সুবিধে নিয়ে দীপকাকু নির্মল জানার মুখোমুখি হলেন। বললেন, “এই চেয়ারে অনিমেষবাবু বসতেন, তাই না?”

মাথা উপর-নীচ করল নির্মল জানা। দীপকাকু আঙুল নির্দেশ করলেন কম্পিউটার দুটোর দিকে। প্রশ্নটা ধরে নিয়ে নির্মল জানা বলল, “ওখানে বসত পাত্রদা, রায়দা।”

“পুরো নাম?” প্রশ্ন করলেন দীপকাকু।

উত্তরটা দিলেন কল্লোল সেন, “সুকুমার পাত্র, চন্দন রায়।”

দীপকাকু ফের নির্মল জানাকে জিজ্ঞেস করলেন, “ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কথাবার্তা বলত কে?”

“বাবু বলতেন। উনি না থাকলে, রায়দা, পাত্রদার কেউ একজন বলত।”

“অফিসে গন্ডগোল শুরু হতে সেই যে তিনজনে পালিয়েছিলে, তারপর লাস্ট কবে ওদের সঙ্গে দেখা হয়েছে তোমার?”

একটু ভেবে নির্মল জানা বলল, “রায়দা এসেছিল মাসখানেক হল। তখন আমি গার্ডের চাকরিটা সবে পেয়েছি। পাত্রদার সঙ্গে গোলমালের দিনই শেষ দেখা।”

“রায় কেন এসেছিল তোমার কাছে?” প্রশ্নের ভিতর পরিমাণমতো ধমক মিশিয়ে দিলেন দীপকাকু। প্রয়োজন অনুসারে এমনটা করে থাকেন। অপরপক্ষ চট করে মিথ্যে বলতে পারে না।

নির্মল জানা বিশেষ ঘাবড়াল না। বলল, “এসেছিল এখানকার খবরাখবর নিতে, পুলিশ কতদূর কী করল। আমাদের তো এক মাসের মাইনেও বাকি আছে। তবে ও একটা চাকরি জোগাড় করেছে, সেটা বলল।”

“সুকুমারের কথা কিছু বলেনি?” জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকু।

নির্মল জানা বলল, “বলেছে। আমিই খোঁজ নিলাম। পাত্রদা তখনও চাকরি পায়নি। খুব চেষ্টা করছে।

“ওদের দু’জনের ফোন নাম্বার আছে তোমার কাছে?”

দীপকাকুর প্রশ্নের উত্তরটা দিলেন কল্লোলবাবু। বললেন, “আমার কাছে আছে। পরে দিচ্ছি আপনাকে।”

“ঠিক আছে।” বলে, দীপকাকু ফের নির্মল জানাকে বললেন, “আচ্ছা, তুমি একটু ভেবে বলো তো, মারা যাওয়ার ক’দিন আগে অনিমেষবাবু কারও সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি অথবা খুব অনুনয়-বিনয় করছিলেন কি? সেরকম কেউ এসেছিল অফিসে? ক্লায়েন্টদের বাদ দিয়ে বলবে?”

নির্মল জানা মাথা নাড়ল। অর্থাৎ আসেনি কেউ। কল্লোল সেন একটা টুল টেনে টেবিলের এপ্রান্তে বসলেন। মুখ দেখে আন্দাজ করা যাচ্ছে, দীপকাকুর জেরার পয়েন্টগুলো ইন্টারেস্টিং লাগছে তাঁর। দীপকাকু আবার বললেন, “ঠিক মনে করে দ্যাখো, গন্ডগোলের আগের ক’দিন ফোনেও কি কারও সঙ্গে ওরকমভাবে কথা হয়েছিল?”

“হ্যাঁ, হয়েছিল।” একটু ভেবে নিয়ে বলল নির্মল জানা। ঘরের সকলেই বাড়তি মনোযোগী হল। কনস্টেবলও ঝিমুনি কাটিয়ে বড় করল চোখ। দীপকাকু বললেন, “ঘটনাটা কী ঘটেছিল বলো।”

গুছিয়ে বলতে শুরু করল নির্মল জানা, “ক’দিন ধরেই বাবু ফোনে কার সঙ্গে যেন তর্ক-ঝগড়া করছিলেন। ফোনটা বাবুই করতেন। বেশিরভাগ সময় লোকটাকে পেতেন না। বিরক্ত হতেন।”

কথার মাঝে দীপকাকু জানতে চাইলেন, “ওঁদের মধ্যে কী বিষয়ে কথা হত, বুঝেছিলে কিছু?”

“খুব একটা ভাল বুঝতে পারতাম না। ফোনে কথা শুরু হলেই বাবু পিছনের ঘরটায় চলে যেতেন। একদিন দরজায় কান পেতে দু’-তিনটে কথা শুনলাম। বাবু বলছেন, ‘পার্টিরা আমায় আস্ত রাখবে না! যা হোক করে কিছু বন্দোবস্ত কর!’ ওপারের কথা শুনে নিয়ে বললেন, ‘সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে চলে যাব। এভাবে বেইমানি করবি, ভাবিনি।”

নির্মল জানার কথা শেষ হতেই দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, “এই কথা মারা যাওয়ার ক’দিন আগে হয়েছিল?”

“তা ধরুন, দিন পাঁচেক।” বলল নির্মল জানা।

দীপকাকু স্বগতোক্তির ঢঙে বললেন, “ঝগড়া পরে আরও বেড়েছিল। তোমরা শুনতে পাওনি।”

কল্লোলবাবু এবার ফিরে গেলেন পুলিশি ফর্মে। নির্মল জানার উদ্দেশে ঝাঁজিয়ে উঠলেন, “অ্যাই, তুমি আমাকে তো আগে এসব বলোনি?”

মাথা নিচু রেখে অতি বিনয়ে নির্মল জানা বলল, “আপনি তো এভাবে আমার কাছে জানতে চাননি?”

কল্লোল সেন পুরো ফিউজড। দৃষ্টি ঘুরিয়ে আনলেন দীপকাকুর উপর। হাতের ইশারায় দীপকাকু নির্মল জানাকে যেতে বললেন। সে ঘর ছেড়ে চলে যেতে কল্লোলবাবু টেবিলের উপর ঝুঁকে বললেন, “মনে তো হচ্ছে বিজনেসে অন্য পার্টনার ছিল?”

শূন্যে দৃষ্টি রেখে দীপকাকু বললেন, “না-ও হতে পারে। হয়তো ওই লোকটা বা বন্ধুটাকে বিশ্বাস করে অনেক টাকা ধার দিয়েছিলেন অনিমেষবাবু। বিশ্বাসঘাতকতা করেছে সে।”

কল্লোলবাবুর সপ্রশংস দৃষ্টি দীপকাকুর উপর। বললেন, “রঞ্জনদা কিন্তু বাড়িয়ে কিছু বলেননি। আপনি সত্যিই জুয়েল! আমরা এতজন অফিসার মিলে আড়ালে থাকা লোকটার বিষয়ে কিছুই জানতে পারিনি। আপনি জেরা করে ঠিক বের করে ফেললেন।”

দীপকাকু কল্লোল সেনের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। অন্যমনস্কের হাসি। বোঝাই যাচ্ছে, ডুবে আছেন গভীর ভাবনায়।

কল্লোলবাবু এবার একটু কিন্তু-কিন্তু ভাবে বললেন, “আপনি যদি কেসটা সল্ভ করে দেন, উপরওলাকে জবাব দিতে হবে আমায়। প্রচুর কথা শোনাবে।”

“কেন?” প্রশ্নটা করে ফেলল ঝিনুক।

কারণটা সম্ভবত দীপকাকু জানেন। তাই কোনও কৌতূহল নেই।

কল্লোলবাবু তবু উত্তরটা দিলেন। বললেন, “কেসটায় আমি সেরকম ক্রিটিক্যাল কিছু পাইনি বলে লালবাজার ডিডি ডিপার্টমেন্টে প্লেস করিনি। ক’দিন পর কেসটা ফাইনাল করে দিতাম। লালবাজার ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট এসব ফ্রড কেসে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে। এখনও সময় আছে, আপনি যে ব্লুগুলো পেয়েছেন, যদি বলেন, কেসটা ট্রান্সফার করে দিতে পারি।”

ঝিনুক মনে মনে বলল, মামার বাড়ি আর কী! দীপকাকু খেটেখুটে ব্লু বের করবেন, কেস সল্ভ করে ক্রেডিট নেবেন ওঁরা!

দীপকাকু বললেন, “সেরকম সলিড কোনও সূত্র এখনও পাইনি। পাব কিনা তাও জানি না। আমাকেই বরং আপনাদের কাছে অনেক সাহায্য নিতে হবে।”

একেই বলে ডিপ্লোম্যাসি, দেখতে গোবেচারার মতো হলে কী হবে, দীপকাকু এসব ভালই পারেন। ‘হঠাৎ মনে পড়েছে’ এই ভঙ্গিতে দীপকাকু কল্লোল সেনকে জিজ্ঞেস করলেন, “এই কেসটা যখন আপনি ডিল করেন, তার ক’দিন আগেই কি আপনার বিয়ে হয়েছে, নাকি পরে? কেসটা হাতে নেওয়ার মাঝে কোনও ছুটিটুটি নেননি তো?”

ঝিনুক আকাশ থেকে পড়ল, বিয়ের প্রসঙ্গ এ সময় কেন? কল্লোলবাবুর যে সদ্য বিয়ে হয়েছে, দীপকাকুই-বা জানলেন কী করে! রঞ্জনকাকু কি বলেছেন? কিন্তু এই কেসের সঙ্গে কল্লোলবাবুর বিয়ের কী সম্পর্ক?

কল্লোল সেন অবশ্য ঝিনুকের মতো অবাক হননি। মিটিমিটি হাসলেন। বললেন, “আমি জানি, আপনি আমার নতুন ঘড়ি, আংটি, গলায় সোনার চেন দেখে বিয়ের সময়টা আন্দাজ করলেন। না, এই কেসটা চলাকালীন কোনও ছুটি নিইনি। বিয়ে তার আগে হয়েছে। আর এসব পরতে আমি চাই না। পুলিশের তো একগাদা বদনাম। লোকে ভাববে, এগুলো ঘুষের টাকায় হয়েছে। আমার স্ত্রী এ-কথা শুনছে না। বলছে, ওর বাবা-মা দিয়েছেন, কিছুদিন অন্তত পরতে। নয়তো ওঁদের অপমান করা হবে।”

দীপকাকু বললেন, “না, না, পরুন। আপনার যা বয়স, লোকে ঠিকই বুঝবে, বিয়েতে পেয়েছেন। অন্তত আংটিটা তো পরবেনই, দারুণ ডিজাইন!”

একটু যেন লজ্জা পেলেন কল্লোলবাবু! বললেন, “অহনা জুয়েলার্স থেকে কেনা। ডিজ়াইন ভাল তো হবেই। সোনাও বাইশ ক্যারাটের।”

“আংটিটা কি একবার হাতে নিয়ে দেখতে পারি?” কুণ্ঠা মিশ্রিত গলায় বললেন দীপকাকু।

“কেন নয়?” বলে, আংটিটা আঙুল থেকে খুলতে উদ্যত হলেন কল্লোল সেন। ঝিনুক ভারী অবাক হল, দীপকাকুর তো শৌখিনতার কোনও ঝোঁক নেই! হঠাৎ আংটির ব্যাপারে এত আগ্রহী হয়ে উঠলেন কেন?

ঝিনুকের বিস্মিত হওয়া আরও বাকি ছিল। আংটি এক হাতে নিয়ে দীপকাকু অন্য হাতে ধরলেন আতশ কাচ। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখছেন ডিজ়াইন। কনস্টেবলও এতটাই অবাক হল, একটা উঠন্ত হাই গিলে নিল। দীপকাকু আংটিটা কল্লোল সেনকে ফেরত দিয়ে বললেন, “খুব ভাল।” তারপর ঝিনুকের মুখের দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিতময় হাসি হাসলেন।

ঝিনুকের ঠোঁটে হাসি এল না। কেননা, দীপকাকুর এই কাণ্ডটার কণামাত্র অর্থ সে উদ্ধার করতে পারেনি!