৫
রাত আটটা বেজে দশ। গতকাল মা-কে অনেক কষ্টে রাজি করিয়ে ঝিনুক, দীপকাকু এখন শিয়ালদা এনকোয়ারির সামনে। দার্জিলিং মেল আটটা চল্লিশে। অপরাজিতা দেবী এখনও এসে পৌঁছননি। অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন দীপকাকু। ঝিনুকেরও টেনশন হচ্ছে। আদৌ এসে পৌঁছবেন তো? দীপকাকু ফোনে অপরাজিতা দেবীকে বলেছিলেন, “আপনাকে বাড়ি থেকে তুলে নেব।” উনি রাজি হননি। বলেছেন, “আমি চাই না, আপনারা সঙ্গে যাচ্ছেন, এটা কেউ জানুক। মেয়ে-জামাইদের এখনও কিছু বলিনি। ভাবছি, চিঠি লিখে লক্ষ্মীর কাছে রেখে যাব। আর বিনায়ককে সঙ্গে নিয়ে আটটার সময় শিয়ালদা এনকোয়ারির সামনে পৌঁছচ্ছি।”
তার মানে মেয়ে-জামাইদের উপর সন্দেহ তাঁর যথেষ্ট। দীপকাকুও তাঁদের সন্দেহের বাইরে রাখেননি। ঘটনা কোনদিকে গড়াবে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। এদিকে হুমকির চিঠি অনুযায়ী আজই শেষ দিন। বদমাইশ লোকটা অপরাজিতা দেবীকে টার্গেট করেছে বেশিবার। তুলনায় জয়ন্ত মিত্রকে কম। উনি মোটামুটি সাবলীল আছেন। তা হলে কি মহামূল্যবান জিনিসটা অপরাজিতা দেবীর কাছেই আছে?
প্রশ্নটা উলটে দীপকাকুই করেছিলেন ঝিনুককে। শিয়ালদা আসার সময় গাড়িতে বসে বলেছিলেন, ‘তুমি তো কাল অপরাজিতা দেবীর জিনিসগুলো দেখলে। কী মনে হল, ওগুলোর মধ্যে সেই দুর্মূল্য বস্তুটি আছে?”
উত্তরে ঝিনুক বলেছিল, “আমি কি অত সব বুঝি? দলিল, পুরনো কাগজগুলোর মধ্যে কিছু থাকলেও থাকতে পারে। আর মুক্তোর মালাটাও একটু অন্যরকম, নবাবি আমলের গয়না হতেই পারে।”
“কিন্তু ওর মধ্যে কি ‘রানির কান্না’ লুকিয়ে আছে মনে হল?”
দীপকাকুর কথায় অবাক হয়ে ঝিনুক বলেছিল, “ঠিক বুঝলাম না। তবে ‘রানির কান্না’ কথাটা বেশ চেনা লাগছে।”
“চেনা লাগারই কথা। এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাওয়াটা কাজের কথা নয়। সত্যবান মিত্রর ডায়েরিতে লেখা ছিল ‘রানির কান্না নিরাপদে রাখলাম।” বলে, গুম মেরে গিয়েছিলেন দীপকাকু।
ঝিনুক তো অবাক, ডায়েরির আর একটা কথার মানে করে ফেলেছেন দীপকাকু! মুক্তোর মালাটা কোনও এক রানির কাঙ্ক্ষিত জিনিস হতেই পারে! সম্ভাবনার কথা সঙ্গে সঙ্গে দীপকাকুকে বলেছিল ঝিনুক।
উত্তরে দীপকাকু বললেন, “হলে তো ভালই হত। কাজটা সহজ হয়ে যেত আমাদের। কিন্তু সত্যবানবাবু আরও অনেক কথা লিখেছেন, ‘রানির কান্না নীল নদে মিশে যায়’, ‘আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরের লাইটহাউসের আলো যেন রানির অস্থির অসহায় চোখ’… এরকম আরও অনেক মিশরের অনুষঙ্গ। যার সঙ্গে মুক্তোর মালাটার কোনও সম্পর্ক নেই। মালাটার বয়স বড়জোর কুড়ি-তিরিশ বছর। নবাবি আমলেরও নয়। গয়নাগুলো দেখার পর তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা আমার এক চেনা স্বর্ণকারের কাছে দিই, উনি আমাকে এইসব তথ্য দেন। যদিও সবটাই আমার কথা শুনে।”
ঝিনুক আবার গাড্ডায় পড়ল। রহস্য উন্মোচনের যদি-বা একটু আশা দেখা দিচ্ছে, পরক্ষণেই তলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে। ঝিনুকের কাছে এখনও পরিষ্কার নয়, তারা আসলে কী খুঁজছে, কাকেই-বা দিচ্ছে প্রোটেকশন!
ঘড়িতে এদিকে সাড়ে আটটা। হাতে মাত্র দশ মিনিট। দীপকাকু ক্রমপর্যায়ে নিজের ঘড়ি, পরেরবার স্টেশনের ঘড়ি দেখে যাচ্ছেন। অনেক আগে অ্যানাউন্স হয়ে গেছে, দার্জিলিং মেল ছ’নম্বর প্ল্যাটফর্মে। ঝিনুক প্রায় ধরেই নিয়েছে অপরাজিতা দেবী আসবেন না। এখন চিন্তা হচ্ছে, খারাপ কিছু ঘটে গেল না তো?
কোনও ডাউন লোকাল এসেছে প্ল্যাটফর্মে। সেই ভিড়টা স্টেশন চত্বর থেকে বেরিয়ে যেতেই দেখা গেল অপরাজিতা দেবীকে। পাশে ব্যাগ হাতে হাঁটছে বিনায়ক। আজ অপরাজিতা দেবীর চেহারাটা কেমন যেন ভীত, সন্ত্রস্ত লাগছে।
ঝিনুকদের কাছে এসে অপরাজিতা দেবী বললেন, “আমি খুবই সরি, আপনাদের অনেকক্ষণ উৎকণ্ঠায় রেখেছি।”
প্ল্যাটফর্মের দিকে যেতে যেতে দীপকাকু বললেন, “কিন্তু আপনার এত দেরি হল কেন? জ্যামে পড়েছিলেন নাকি?”
উত্তরটা দেয় বিনায়ক, “না, না, জ্যাম নয়। ট্যাক্সিতে মায়ের শরীরটা হঠাৎ খারাপ করতে লাগল, গাড়ি থামিয়ে ওষুধ কিনে মা-কে সুস্থ করে তারপর এলাম।” একটু দম নিয়ে বিনায়ক আবার বলে, “মা-কে একটু সাবধানে নিয়ে যাবেন বাবু। ইদানীং শরীরটা একদম ভাল যাচ্ছে না।”
প্ল্যাটফর্মের গেটের কাছে এসে বিনায়ককে বিদায় দিলেন দীপকাকু। অপরাজিতা দেবীর সুটকেস এখন ঝিনুকের হাতে। সেই জিনিসটা হয়তো এতেই আছে। সুটকেসের হ্যান্ডেল যথাসম্ভব চেপে ধরে ঝিনুক।
গাড়ি পাঁচ মিনিট লেট করে ছাড়ল। ঝিনুকদের আরএসি টিকিট কনফার্মড হয়ে গেছে। নির্দিষ্ট জায়গায় বসে অপরাজিতা দেবী এখন একটু ধাতস্থ সুটকেসটা লোয়ার বার্থের নীচে না রেখে জানলার কোণে রেখেছেন। ছোট স্টেশনগুলোকে পাত্তা না দিয়ে ছুটে চলেছে ট্রেন। এতক্ষণে অপরাজিতা দেবী বলতে শুরু করেছেন শরীর খারাপের আসল কারণ, যা শুনতে শুনতে ঝিনুক একেবারে থ! বুকের মধ্যে একটা অজানা ভয় খামচে ধরেছে। অপরাজিতা দেবীর ট্যাক্সিটা যখন সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ সিগন্যালে দাঁড়িয়ে ছিল, কে যেন একটা খাম ট্যাক্সির জানলা দিয়ে অপরাজিতা দেবীর কোলে ফেলে পালিয়ে যায়। খাম খুলে অপরাজিতা দেবী আবার একটা চিঠি পান।
সেই চিঠি এখন দীপকাকুর হাতে। ঝিনুক পাশ থেকে ঝুঁকে পড়ে নেয় বয়ানটা, ‘পালিয়ে বাঁচতে পারবেন না। জিনিসটা ট্রেনেই ছিনিয়ে নেব।’
দীপকাকু চিন্তিতস্বরে বললেন, “সেই এক কাগজ, ফন্টটাও দুর্গা। লোকটা হয় নিজে ট্রেনে আছে অথবা গুন্ডা রেখেছে জিনিসটা লুঠ করার জন্য। আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে।” চিঠিটা ভাঁজ করে পকেটে ঢুকিয়ে বললেন, “আজ রাতটা সবাইকে জেগে কাটাতে হবে। কী ঝিনুক, পারবে তো?”
সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় হেলায় ঝিনুক। মনে মনে বলে, “আপনি পারলে হয়, যা ঘুমকাতুরে!”
নিচুগলায় অপরাজিতা দেবী জানতে চান, “দীপবাবু, আপনার কাছে পিস্তল আছে তো?”
কথাটা যেন শুনতেই পাননি, এইভাবে দীপকাকু বললেন, “যাই, একটু পায়চারি করে আসি। দেখি, আড়ালে থাকা বন্ধুদের চিনতে পারি কি না।”
দীপকাকু বেরিয়ে গেলেন। পিস্তল আছে কি নেই, জানা গেল না। ঘটনা যেদিকে টার্ন নিচ্ছে, কেন জানি ঝিনুকের মনে হচ্ছে পিস্তলের দরকার পড়বে। বাবা সকালে একবার বলেছিলেন, “কী রে, আমার পিস্তলটা রাখবি নাকি? যদি দরকার পড়ে।”
ঝিনুক ইতস্তত করে নেয়নি। পিস্তল চালানোর প্রাথমিক ট্রেনিংটাও ঝিনুকের নেওয়া হয়নি। অথচ বাবার কাছে কবে থেকে লাইসেন্সড পিস্তলটা পড়ে আছে। ট্রেনিংটা যদি আজ সকালে নিতে যেত, মা নির্ঘাত পণ্ড করে দিত আজকের যাওয়া। এবারের কেসটা ভালয় ভালয় মিটে গেলে বাড়ি ফিরেই বাবার কাছে পিস্তল চালানোর ট্রেনিংটা নিয়ে নেবে। আপাতত মার্শাল আর্টের সামান্য শিক্ষাই ঝিনুকের ভরসা।
সিটের উপর পা মুড়ে, সুটকেসে হেলান দিয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে আছেন অপরাজিতা দেবী। ভীষণ আর্ত, অসহায় লাগছে তাঁকে। ঝিনুক আড়চোখে আশেপাশের সহযাত্রীদের উপর নতুন করে সন্ধানী দৃষ্টি বোলায়। আপার বার্থে দুটি নেপালি মেয়ে অনেকক্ষণ আগে উঠে গেছে। অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে দু’জনে। ভাবসাব দেখে আন্দাজ করা যায় কলকাতার কোনও কলেজে পড়ে, ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছে। অপরাজিতা দেবীর বার্থের শেষ প্রান্তে ফ্রেঞ্চকাট দাড়িকে খুব একটা সুবিধের মনে হচ্ছে না। বয়স মধ্যতিরিশ। গলায় সোনার মোটা চেন। হাতে সোনালি ব্যান্ডের ঘড়ি। চোখে রিমলেস চশমা। বাবু হয়ে বসে, এক থাইয়ের উপর নোটবুক রেখে কী যেন হিসেব করছেন, হিসেবটা মিলিয়ে নিচ্ছেন অন্য থাইয়ে রাখা ক্যালকুলেটর থেকে। সবই হয়তো ভড়ং। সময়মতো আসল চেহারাটা বেরিয়ে পড়বে।
এবার প্যাসেজের ওপারে সাইড বার্থ দুটোয় চোখ বোলায় ঝিনুক। আপারে সব চুল সাদা এক বৃদ্ধ ট্রেন ছাড়ার আগে সেই যে শুয়েছেন, আর ওঠেননি। বুকের উপর রাখা একটা ইংরেজি ম্যাগাজিন। কখনও পড়ছেন, কখনও-বা চশমাটা খুলে একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছেন। ভদ্রলোককে ট্রেনে তুলে দিতে দু’জন এসেছিল। সম্ভবত ওঁর দুই ছেলে।
নীচের বার্থে স্বামী-স্ত্রী। বেশিদিন বিয়ে হয়নি। দু’জনের চেহারা দেখে বোঝা যায় আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য নেই। চোখে-মুখে সন্ত্রস্ত ভাব। হঠাৎ কোনও দুঃসংবাদ পেয়ে বাড়ি ফিরছে হয়তো। রিজার্ভেশন এখনও কনফার্মড হয়নি, একটা বার্থই দু’জনকে শেয়ার করতে হবে।
সব মিলিয়ে যা দেখা গেল, ফ্রেঞ্চকাটই সন্দেহজনক। ভাবনাটা সেরে ফ্রেঞ্চকাটের দিকে তাকাতে গেছে ঝিনুক, দেখে, লোকটা তার দিকেই চেয়ে আছে। ঝিনুক চোখ সরানোর আগেই লোকটা বলে বসে, “কী, দার্জিলিং? ক’বার হল?”
ভদ্রলোকের মুখে আলাপী হাসি। ঝিনুক কিছু বলতে যাবে, দীপকাকু এসে পড়লেন। ঝিনুক জানতে চায়, “কাউকে চোখে পড়ল?”
কিছু না বলে ঝিনুকের পাশে বসলেন দীপকাকু। অপরাজিতা দেবীও উত্তরের অপেক্ষায়। দীপকাকু দু’পাশে মাথা নাড়লেন।
.
দারুণ স্পিডে চলছে ট্রেন। ঠান্ডা হাওয়া আসছিল বলে জানলার কাচ নামিয়ে দিয়েছেন দীপকাকু। বাইরে ঘন অন্ধকার। অপরাজিতা দেবী একই রকম ভাবে বসে আছেন। ঝিনুকেরও কিচ্ছু করার নেই। একটা গল্পের বই এনেছে বটে, এই সময় বের করতে কেমন জানি কুণ্ঠা হচ্ছে। তুলনায় দীপকাকু অনেক স্বচ্ছন্দ, ফ্রেঞ্চকাটের সঙ্গে আলাপ জমিয়ে নিয়েছেন। ভদ্রলোক চা-ব্যাবসার সঙ্গে জড়িত। দীপকাকু চা-ব্যাবসা সংক্রান্ত অনেক কথা বলে যাচ্ছেন। কী করে পারছেন কে জানে! নাকি দু’জনেই দক্ষ অভিনেতা!
অপরাজিতা দেবী সিট থেকে নেমে দাঁড়ালেন। বললেন, “মুখে-চোখে একটু জল দিয়ে আসি।”
ঝিনুক তৎক্ষণাৎ বলে ওঠে, “চলুন, আমি সঙ্গে যাই।”
অপরাজিতা দেবী বাধা দেন, “না, না, আসতে হবে না, এই তো দুটো কুপ পরেই বাথরুম। তা ছাড়া এখানেই তো সব রইল।”
ঠিকই বলেছেন অপরাজিতা দেবী। সুটকেসটা পাহারা দেওয়াই বেশি জরুরি। ওঁর হাতে এখন শুধু প্লাস্টিকের সুদৃশ্য টয়লেট ব্যাগ। বোধহয় বিদেশি। বেশ
পছন্দ আছে বলতে হবে।
অপরাজিতা দেবীর একা যাওয়ার ব্যাপারে দীপকাকুও কিছু বললেন না। আগের মতোই আলোচনায় মত্ত। কারও যখন কোনও টেনশন নেই, ঝিনুক খামোখা কেন দুশ্চিন্তা করতে যাবে! উপরের বার্থের দুটো মেয়ে খিলখিল করে হাসছে। ওদের সঙ্গে আলাপ জমাতে পারলে বেশ হত। এই সব যখন ভাবছে ঝিনুক, দীপকাকু কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন, “দুটো কোচ পরে একজন আছে। ছদ্মবেশে। বাকিদের এখনও চিনতে পারছি না। অপরাজিতা দেবীকে এখন কিছু বলার দরকার নেই।”
বুকটা ধক করে ওঠে ঝিনুকের। ভয়-ধরা গলায় বলে, “একজনকেই-বা আপনি কী করে চিনলেন? কে সে?”
“রঘু।” বললেন দীপকাকু।
নামটা আর একবার উচ্চারণ করতে যাচ্ছিল ঝিনুক, অপরাজিতা দেবীকে ফিরে আসতে দেখে চুপ করে যায়। এখন ওঁকে বেশ ফ্রেশ লাগছে। সিটে গিয়ে বসলেন। ঝিনুকের মনের মধ্যে তোলপাড় চলছে, দীপকাকু যদি একবার রঘুকে দেখিয়ে দেন, ঝিনুক একাই মোকাবিলা করতে পারবে। কিন্তু সঙ্গে আর ক’জন আছে, তারা সশস্ত্র কিনা কিছুই জানা যাচ্ছে না।
প্যান্ট্রি কারের বয় ডিনারের অর্ডার নিতে এসেছে। দীপকাকু অর্ডার দিতে যাচ্ছিলেন, মানা করলেন অপরাজিতা দেবী। বললেন, “আমি তিনজনের খাবার নিয়ে এসেছি। আপনারা হাত-মুখ ধুয়ে আসুন।”
প্রথমে দীপকাকু, পরে ঝিনুক গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে এল। কাগজের প্লেটে খাবার বেড়ে দিয়েছেন অপরাজিতা দেবী। পরোটা, মাংস, আচার, মিষ্টি। দারুণ রান্না! একেবারে মহাভোজ। চেটেপুটে খেলেন দীপকাকু। ঝিনুক ততটা তৃপ্তি করে খেতে পারল না। এই টেনশনে খাওয়া যায়!
রাত প্রায় বারোটা। কম্পার্টমেন্ট প্রায় অন্ধকার। প্যাসেজে শুধু নাইট ল্যাম্প জ্বলছে, আর সবাই ঘুমোলেও শুয়ে থেকে জেগে আছে ঝিনুকরা। মিড্ল বার্থ থেকে ঝিনুক যখনই লোয়ার বার্থের দিকে ঝুঁকেছে, দেখছে চোখ চেয়ে আছেন অপরাজিতা দেবী। দীপকাকু ইতিমধ্যে দু’বার পায়চারি করে এসেছেন। শেষবার এসে বললেন, “ভেস্টিবিউলের দরজা টেনে দিয়েছে। এখন কম্পার্টমেন্টগুলো আলাদা। সম্ভবত রঘু আগের কোচেই রয়ে গেছে। অতএব রাতটুকু নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। দরজাও সব লক করা আছে।”
দীপকাকুর আশ্বাসবাণীর কারণেই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল ঝিনুক! এমনকী ছোট্ট একটা স্বপ্নও দেখে ফেলল।
…মরুভূমির রাত। এদিক-ওদিক নানান উচ্চতার পিরামিড। মাথার উপর নক্ষত্রখচিত কালো আকাশ, কেউ কোত্থাও নেই। তবু কোথা থেকে যেন একটি মেয়ের কান্না ভেসে আসছে …
দীপকাকুর ডাকে ঘুম ভাঙল ঝিনুকের। বললেন, “লাগেজ গুছিয়ে নাও। আর একঘণ্টা পরেই নিউ জলপাইগুড়ি।”
অপরাধী মুখে মিড্ল বার্থ থেকে নেমে আসল ঝিনুক। আশপাশের প্যাসেঞ্জাররা যে যার লাগেজ গোছাচ্ছে। জানলার বাইরে এখনও অন্ধকার। ভোর পাঁচটায় এনজেপি পৌঁছনোর কথা ট্রেনটার।
দীপকাকু, অপরাজিতা দেবী অনেক আগেই রেডি হয়ে বসে আছেন। মিড্ল বার্থ নামিয়ে, হাওয়া বালিশ, চাদর লাগেজে পুরে নেয় ঝিনুক। আর মাত্র এইটুকু পথ, আশা করা যায় কিছু ঘটবে না। ফ্রেঞ্চকাটকে এখন আর ততটা সন্দেহজনক মনে হচ্ছে না। ঘুম থেকে উঠেই আবার হিসেব নিয়ে বসে গেছে। সাইড বার্থের স্বামী-স্ত্রীকে দেখা যাচ্ছে না। আগের কোনও স্টেশনে নেমে গেছে বোধহয়। উপরের বার্থের বৃদ্ধ লোকটি নিজের ব্যাগ গোছাচ্ছেন। দীপকাকু হঠাৎ উঠে গিয়ে ভদ্রলোকের কাছে কী যেন চাইলেন! ট্রেনের আওয়াজে শোনা গেল না। ঝিনুক দেখল, ট্রেনে উঠে থেকে যে ম্যাগাজিনটা ভদ্রলোক পড়ছিলেন, সেটাই এগিয়ে দিলেন।
নিজের জায়গায় ফিরে এসে বইটার পাতা ওলটাচ্ছেন দীপকাকু। পুরো জার্নিটায় তেমন কিছু ঘটল না দেখে এক ধরনের আপশোস হচ্ছে ঝিনুকের। অপরাজিতা দেবী নিজের সিট থেকে উঠে এলেন, মনে হচ্ছে বাথরুম যাবেন। হাতে সেই স্টাইলিশ টয়লেট ব্যাগ। ঝিনুক ঠিক করেছে শিলিগুড়ি পৌঁছে অপরাজিতা দেবীর কাছে জেনে নেবে এই টাইপের ব্যাগ কোথায় পাওয়া যায়। এমন হতেই পারে, ঝিনুকের ভাল লাগা দেখে অপরাজিতা দেবী ব্যাগটা ঝিনুককে গিফ্ট করে দিলেন।
অপরাজিতা দেবী বাথরুমের দিকে চলে যাওয়ার পর প্যান্ট্রি কারের চাওয়ালা এল। ফ্রেঞ্চকাট চাওয়ালাকে দাঁড় করিয়ে বলল, “চার কাপ শুধু দুধ-জল ঢালো, টি ব্যাগ আমার কাছে আছে।”
চাওয়ালা নির্দেশমতো কাজ করছে। ফ্রেঞ্চকাট এবার দীপকাকুকে বলল, “আমাদের বাগানের চা খাওয়াব আপনাদের। সমস্ত বড় বড় হোটেলে আমাদের কোম্পানির টি ব্যাগ ইউজ হয়।”
দীপকাকুর মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, প্রস্তাবে অরাজি নন। ঝিনুক সতর্ক। বলল, “আমি কিন্তু চা খাই না।”
ফ্রেঞ্চকাট হেসে বলল, “খাও। এখন খেতে চাইছ না। নিশ্চয়ই বাড়ি থেকে বেরনোর আগে মা বলে দিয়েছেন, ট্রেনে অচেনা কারও থেকে কিছু খাবি না।”
লোকটার কথায় গা জ্বলে গেলেও কোনও উত্তর দেয় না ঝিনুক। একটা কাপ ফেরত দিয়ে তিনটে কাপে টি ব্যাগ ডোবায় ফ্রেঞ্চকাট। অপরাজিতা দেবীরটা সিটে রেখে দীপকাকু ও ফ্রেঞ্চকাট মেজাজে চা খেতে থাকে। কেন যে দীপকাকু এত বড় ঝুঁকি নিচ্ছেন, কে জানে! টি ব্যাগে কিছু একটা মেশানো থাকতেই পারে। ফ্রেঞ্চকাট নিজের কাপে সেই চা ব্যাগটা ডোবাবে না, মার্ক করা আছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝিনুকের ভাবনা প্রায় সত্যে প্রমাণিত হল। চা শেষ করে বিশাল একটা হাই তুললেন দীপকাকু। বইটা কোলের উপর রেখে চোখ বুজলেন। এবার নিশ্চয়ই নাক ডেকে ঘুমোবেন। ঝিনুক একা কী করে ফ্রেঞ্চকাটকে সামলাবে! এদিকে অনেকক্ষণ হয়ে গেল অপরাজিতা দেবী ফিরছেন না।
দীপকাকুকে ঠেলা দেয় ঝিনুক। ওষুধটা বোধহয় তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি, চট করে ঘুম ভেঙে যায় দীপকাকুর। বললেন, “কী হল?”
“উনি অনেকক্ষণ হল বাথরুমে গেছেন। এতক্ষণে ফিরে আসা উচিত।” ঝিনুকের গলায় উৎকণ্ঠা।
সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসলেন দীপকাকু। কেন জানি প্রথমেই সাইড বার্থের আপারটা দেখে বলে উঠলেন, “মাই গড! নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে ওঁর।”
ঝিনুক আশ্চর্য হয়ে দেখে, সাইড আপার এখন বেমালুম ফাঁকা। বৃদ্ধ ভদ্রলোক দীপকাকুর কাছ থেকে বই ফেরত না নিয়েই নেমে গেছেন। কিন্তু কী করে নামবেন! ট্রেন তো এর মধ্যে কোথাও থামেনি।
দীপকাকু বাথরুমের দিকে দৌড়েছেন। ঝিনুক যেতে গিয়েও যায় না, এখানে অপরাজিতা দেবীর ব্যাগ। এই সুযোগে ফ্রেঞ্চকাট এসব নিয়ে সটকে যাক আর কী!
বেশ খানিকক্ষণ কাটল, দীপকাকুও ফিরছেন না। ভীষণ টেনশন হচ্ছে ঝিনুকের। এমন সময় ফ্রেঞ্চকাট বলে উঠল, “কী ব্যাপার বলো তো, ভদ্রমহিলার কিছু হল নাকি? বাথরুমে পড়ে-টড়ে গেলেন না তো? যাই দেখি, মিস্টার বাগচী হয়তো একা সামলাতে পারছেন না।”
ফ্রেঞ্চকাট চলে যাওয়ার পর একা প্রবল উৎকণ্ঠায় বসে থাকে ঝিনুক। খানিকক্ষণ পরেই দেখা যায়, দীপকাকু আর ফ্রেঞ্চকাট পাঁজাকোলা করে অপরাজিতা দেবীকে নিয়ে আসছেন। অপরাজিতা দেবী সম্পূর্ণ অচৈতন্য।
.
মিনিট পনেরোর মধ্যেই জ্ঞান ফিরে এল। সামান্য ধাতস্থ হতে না-হতেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন অপরাজিতা দেবী। ঝিনুক তো কিছুই বুঝতে পারছে না। দীপকাকু সান্ত্বনার সুরে অপরাজিতা দেবীকে বলছেন, “ঘাবড়ে যাবেন না। কী হয়েছে খুলে বলুন? আমরা তো আছি। আপনার সেই ব্যাগটাই-বা কোথায়?”
একটু সময় নিয়ে অপরাজিতা দেবী বললেন, “আমার ভুলেই এত বড় সর্বনাশটা হয়ে গেল! ওই ব্যাগেই সব কিছু রেখে, সঙ্গে নিয়ে ঘুরছিলাম। আপনাদের উপর পুরোপুরি ভরসা রাখতে পারিনি। লাস্ট যখন বাথরুমে ঢুকলাম, কে যেন মুখে হাত চাপা দিয়ে কোমরে ইনজেকশন ফুটিয়ে দিল। তখনই বুঝেছি শেষ হুমকিটা মিথ্যে দেয়নি বদমাইশটা। তারপর আর কিছু মনে নেই।”
দীপকাকু জানতে চাইলেন, “লোকটাকে কি একটুও মনে পড়ছে? সামান্য বর্ণনা দিতে পারেন?”
“হ্যাঁ, মাথার সব চুল সাদা। আর কিছু মনে পড়ছে না।”
সোজা হয়ে দাঁড়ালেন দীপকাকু। বললেন, “বুঝেছি। আজ ভোরেই লোকটাকে আমি চিনেছি। মুহূর্তের অসতর্কতায় কাজটা সেরে ফেলল। তবে ট্রেন যখন থামেনি, এখনও কোথাও ঘাপটি মেরে আছে। দেখি পাওয়া যায় কি না।”
দীপকাকু বেরিয়ে গেলেন। ঝড়ে বিধ্বস্ত ফুলগাছের মতো বসে আছেন অপরাজিতা দেবী। ফ্রেঞ্চকাট হতভম্ব। ট্রেনের স্পিড কমছে। জানলার বাইরে আবছা শহরতলি। অপরাজিতা দেবীর উপর বেশ অভিমান হচ্ছে ঝিনুকের। কেন যে উনি দীপকাকুর উপর ভরসা রাখতে পারলেন না!
একটু পরেই ফিরে এলেন দীপকাকু, দু’হাতে দুটি জিনিস। একটা সাদা পরচুলো, অন্যটা সেই টয়লেট ব্যাগ। বললেন, “বাথরুমের পাশেই পড়ে ছিল। আসল জিনিসগুলো নিয়ে ব্যাগটা ফেলে গেছে। লোকটা ছদ্মবেশ নিতে এক্সপার্ট। পরচুলোটা বদলে এখন হয়তো অন্য ড্রেস নিয়েছে। সব কম্পার্টমেন্ট ঘুরলাম, টয়লেটগুলো দেখেছি। কোথাও নেই। দেখি, স্টেশনে যদি ধরতে পারি।” একটু থেমে দীপকাকু আবার বললেন, “আপনারা প্ল্যাটফর্মে নেমে রেল পুলিশে একটা ডায়েরি করবেন। আমি ততক্ষণ লোকটাকে খুঁজব।”
খুবই হতাশ ভঙ্গিতে কথাগুলো শুনলেন অপরাজিতা দেবী। আশা পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছেন। দীপকাকু টয়লেট ব্যাগ আর পরচুলো নিজের লাগেজে ভরে নিলেন। টয়লেট ব্যাগটাকে এখন আর ভাল লাগছে না ঝিনুকের। পরচুলোটাকেও সে চিনতে পেরেছে। সাইড বার্থের আপারে যে লোকটা শুয়েছিল, জিনিসটা তার।
ট্রেনের গতি একদমই কমে এসেছে। অল্প একটু প্রসাধন সেরে নিচ্ছেন অপরাজিতা দেবী। এরকম একটা মারাত্মক ঘটনার পর যা একটু বেমানান। দীপকাকুর কানের কাছে গিয়ে ঝিনুক জিজ্ঞেস করল, “রঘু কোথায়?”
“একই জায়গায় বসে আছে।” ফিসফিস করে বললেন দীপকাকু।
ঝিনুক বলল, “চলুন, গিয়ে ধরি।”
“না। ও যেমন আছে, থাক।”
ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকে পড়েছে। দীপকাকু কথামতো চলে গেছেন দরজার কাছে। নিজের লাগেজ তুলে নিয়েছেন অপরাজিতা দেবী। ঝিনুক নিজের আর দীপকাকুরটা নেয়।
প্ল্যাটফর্মে নামতেই একজন বয়স্ক ভদ্রলোক অপরাজিতা দেবীর দিকে এগিয়ে আসলেন। সম্ভবত ইনিই অপরাজিতা দেবীর দূর সম্পর্কের ভাশুর। সঙ্গে একজন কাজের লোক, যে অপরাজিতা দেবীর হাত থেকে সুটকেসটা নিয়ে নিল। ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, “পথে কোনও অসুবিধে হয়নি তো?”
একমুখ হেসে অপরাজিতা দেবী বললেন, “না, না, কোনও অসুবিধেই হয়নি। এই মেয়েটি ঝিনুক, আর ওর কাকা সঙ্গে ছিলেন।”
ঝিনুকদের ব্যাপারে ভদ্রলোক কিছুই জানেন না। ফলে চোখে প্রশ্ন।
অপরাজিতা দেবী বললেন, “চলুন, বাইরে গিয়ে ওর কাকার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিচ্ছি।”
ঝিনুক দুটো ব্যাগ বইছে দেখে, ভদ্রলোক কাজের লোকটাকে ধমক দিলেন। কাজের লোক ঝিনুকের লাগেজ নিতে এগিয়ে এল। ঝিনুক প্রথমে দিতে রাজি হয় না। অপরাজিতা দেবীর মিথ্যাভাষণ তার পছন্দ হয়নি। গোটা ব্যাপারটাই কেমন যেন গোলমেলে লাগছে! একটা ব্যাগ পীড়াপীড়িতে দিতেই হয়।
ওভারব্রিজ পার করে ঝিনুকরা এখন স্টেশন কম্পাউন্ডের বাইরে। এখানে এসে দীপকাকুকে দেখা গেল মোবাইলে কার সঙ্গে যেন কথা বলছেন। এগিয়ে এলেন কথা সেরে।
দীপকাকু কিছু বলার আগেই অপরাজিতা দেবী আলাপপর্ব শুরু করে দিলেন, “ইনি হচ্ছেন দীপঙ্কর বাগচী, আমাদের পাড়ায় থাকেন। বিজনেসের কাজে শিলিগুড়ি আসছিলেন, সুযোগ বুঝে আমি ওঁর সঙ্গ নিয়েছি। আর এই মিষ্টি মেয়েটির ভাল নাম আঁখি। শ্রবণার বন্ধু, ছুটিতে কাকার সঙ্গে বেড়াতে বেরিয়েছে।”
এরপর ভদ্রলোকের সঙ্গে ঝিনুকদের আলাপ করিয়ে দিলেন অপরাজিতা দেবী। ভদ্রলোকের নাম অভয় বসু। অভয়বাবু সবাইকে দাঁড় করিয়ে রেখে ড্রাইভারের খোঁজে গেলেন।
সেই ফাঁকে দীপকাকুর সামনে দাঁড়িয়ে অপরাজিতা দেবী বললেন, “মিথ্যে পরিচয় দিলাম বলে কিছু মনে করবেন না। জিনিসগুলো চুরি গেছে জানলে ভদ্রলোক ভীষণ কষ্ট পাবেন। আমাদের বাড়ির সব কিছুর প্রতি ওঁর গভীর মমতা।”
ভুরু কুঁচকে দীপকাকু বললেন, “আপনি ওঁর কাছে কী কারণে আসছেন জানাননি?”
“না। জিনিসগুলো হারানোর আশঙ্কা ছিল বলে ফোনে জানিয়েছিলাম, এমনিই বেড়াতে যাচ্ছি।” কথা বলতে বলতে অপরাজিতা দেবী হ্যান্ডব্যাগ থেকে একটা চেক বের করে দীপকাকুর হাতে দিয়ে বললেন, “এটা রাখুন। আপনার বাকি পেমেন্ট। চার্জটা তো বলেননি, সাধ্যমতো দিলাম।”
দীপকাকু অপ্রস্তুত। বললেন, “সে কী, আপনার কাজটাই তো হল না!”
“সেটা না হওয়ার জন্য আমিই দায়ী। আপনি তো চেষ্টার ত্রুটি করেননি।”
অপরাজিতা দেবীর কথার মাঝে ফিরে আসলেন অভয়বাবু। দীপকাকু চেকটা তড়িঘড়ি শার্টের পকেটে রেখে দিলেন। অভয়বাবু বললেন, “চলুন দীপঙ্করবাবু, কোথায় নামবেন, নামিয়ে দেব।”
“না। থ্যাঙ্ক ইউ। আমাদের নিতে একজনের আসার কথা।” বলে, গুম মেরে গেলেন দীপকাকু। অপরাজিতা দেবীরা চলে যাচ্ছেন। দীপকাকুর দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানো। কাজ শেষ করতে না দিয়ে টাকা মিটিয়ে দেওয়াটা নিশ্চয়ই ওঁর সম্মানে লেগেছে। লাগারই কথা। ঝিনুকেরও ভীষণ খারাপ লাগছে।
কিন্তু এখন ঝিনুকদের করণীয় কী? কলকাতায় ফিরে যাবে? এসব ভাবনার মাঝে ঝিনুক দেখে, দীপকাকু চোখে বাইনোকুলার লাগিয়েছেন। লক্ষ্য অপরাজিতা দেবীদের যাওয়ার পথে। দূরবিন দিয়ে দেখার কী আছে বুঝতে পারে না ঝিনুক। এই তো বেশ খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে, অভয়বাবুরা কার পার্কিং থেকে একটু দূরে দাঁড়ানো একটা সুমো গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। অপরাজিতা দেবী হাঁটছেন খুঁড়িয়ে। কোমরে ইনজেকশনের ব্যথাটা লুকোতে পারছেন না। তবে ভদ্রমহিলার মনের জোর দেখার মতো!
ঝিনুক দীপকাকুকে জিজ্ঞেস করল, “দূরবিন দিয়ে কী দেখছেন? গাড়ির নম্বর?”
দীপকাকুর তরফে কোনও উত্তর নেই। নিবিষ্ট মনে দেখেই যাচ্ছেন। অপরাজিতা দেবীদের নিয়ে সুমো গাড়িটা এগিয়ে যাচ্ছে, বড় একটা টার্নের মুখে থামল। আর একটা লোক উঠছে। তখনই দীপকাকু বলে উঠলেন, “দূরবিনটা চোখে লাগিয়ে দ্যাখো তো, লোকটাকে চিনতে পারো কিনা?”
বাইনোকুলার চোখে দিয়েই ঝিনুক বলে ওঠে, “আরে! ও তো রঘু! অপরাজিতা দেবীর গাড়িতে উঠছে কেন?”
দীপকাকু বললেন, “রঘুর ক্রিয়াকলাপ গোড়া থেকেই আমার অনুসন্ধানকে ভুল পথে চালিত করার চেষ্টা করেছে। এই মুহূর্তে সেই জট ছাড়ল।”
“কীরকম?” জানতে চাইল ঝিনুক।
“রঘুই হচ্ছে অপরাজিতা দেবীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত কাজের লোক। যাকে ভাল বাংলায় বলে, বশংবদ। তিন নম্বর চিঠির বয়ানটা অপরাজিতা দেবী নিজে লিখে রঘুকে দিয়ে ইমপ্রেশনে টাইপ করাতে পাঠিয়েছিলেন। বাংলা ফন্টের ব্যাপারে অপরাজিতা দেবীর সুস্পষ্ট ধারণা নেই। বড়জোর টাইপের সাইজটার জন্য কোনও ম্যাগাজিনের পাতা কেটে পাঠিয়েছিলেন। আগের চিঠিগুলো ‘দুর্গা’ ফন্টে ছিল, উনি জানতেন না। তিন নম্বর চিঠিতে ‘বিদিশা’ ফন্ট দেখে আমি সহজেই ধরে ফেলি, এটা অন্য কারও পাঠানো। ব্যক্তিটি রঘু নয়। তোমার কথামতো রঘুর পক্ষে সম্ভব নয় অত ভাল বাংলা লেখা। সে ফোন বুথ থেকে ইমপ্রেশনের মালিক সৌগত ভট্টাচার্যকে তাগাদা দিচ্ছিল চিঠির ব্যাপারে। অপরাজিতা দেবীর বাড়ি থেকে ফোন না করার কারণ— সৌগতর মোবাইলের পরদায় ভেসে উঠবে ওবাড়ির নম্বর, অপরাজিতা দেবী কোনও সাক্ষী রাখতে চাননি।
“তারপর তোমার চেজ়িং-এর চোটে রঘু বাড়িছাড়া হল। তবে মাঝে এসে ওকে জিনিসপত্তর নিয়ে যেতে দেখে আমার সন্দেহ হয়, রঘুর সঙ্গে অপরাজিতা দেবীর নিশ্চয়ই আঁতাত আছে।”
দীপকাকুর কথার পিঠে ঝিনুক জানতে চাইল, “অপরাজিতা দেবী নিজেই কেন নিজেকে চিঠি দিলেন? আর একটা ব্যাপার আশ্চর্য লাগছে, ট্রেনে রঘু কেন ছদ্মবেশে ছিল!”
দীপকাকু বললেন, “তোমার প্রশ্ন দুটোর উত্তর হচ্ছে, অপরাজিতা দেবীর কাছে সত্যিই সেই মূল্যবান জিনিসটা আছে। কোনও কারণে জিনিসটা তাঁর শিলিগুড়িতে নিয়ে আসার দরকার পড়েছে। এখানে আসাটা যুক্তিসংগত করার জন্যই ওই চিঠিটার ব্যবস্থা করেন উনি। পাহারা দেওয়ার জন্য আমাদেরই বহাল করেন। দাড়িগোঁফ লাগিয়ে পাহারায় রঘুও ছিল দুটো কোচ পরে। বেশ কয়েকবার আমাদের কম্পার্টমেন্টে ঘুরেও গেছে। বেচারা জানত না, রাত্তিরবেলা ভেস্টিবিউলের দরজাগুলো বন্ধ হয়ে সে তার মালকিনের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। আমাদের সাইড বার্থের সাদা পরচুলো লোকটা অনায়াসে কাজটা সারল। এখানে দুটো প্রশ্ন খচখচ করছে, বদমাইশ লোকটা কী করে আমাদের পাশেই রিজার্ভেশন পেল? রঘুর রিজার্ভেশন দুটো কোচের পরে কেন? উত্তর দুটো সম্ভবত এরকম,; আমাদের টিকিট কেটেছে বিনায়ক। তার সঙ্গে নিশ্চয়ই অপরাধীর যোগাযোগ আছে, পরচুলো লোকটার বার্থ তাই আমাদের কাছাকাছি পড়েছে। অপরাজিতা দেবীর নির্দেশমতো রঘু টিকিট কাটে আলাদা।”
রূদ্ধশ্বাসে ঝিনুক বলে ওঠে, “বিনায়ককে তো এক্ষুনি অ্যারেস্ট করা উচিত!”
“এইমাত্র ফোনে তালতলার ওসি পার্থ মজুমদারকে সেটাই করতে বলেছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিনায়ক অনেক কথা কবুল করবে। রঞ্জন মারফত শিলিগুড়ি পুলিশের সঙ্গেও কথা হয়ে গেল, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে অপরাধীকে ধরে ফেলছি আমরা।”
“কী করে?” বিস্ময়ের কণ্ঠে জানতে চাইল ঝিনুক।
দীপকাকু বললেন, “ট্রেন থামার সঙ্গে সঙ্গে প্ল্যাটফর্মে নেমে লোকটাকে খোঁজার চেষ্টা করি আমি। কিছুতেই পাই না। শেষমেশ স্টেশনের বাইরে গিয়ে দাঁড়াই, প্রত্যেকটি যাত্রীর উপর নজর রাখতে গিয়ে দেখি, সাদা পরচুলোর সুটকেস নিয়ে এক পঞ্জাবি ভদ্রলোক ভাড়ার গাড়িতে উঠছে। এবং শুনলে অবাক হবে, লোকটা মোজা ছাড়া জুতো পরে ছিল।”
এতে অবাক হওয়ার কী আছে, বুঝতে না পেরে তাকিয়ে থাকে ঝিনুক। দীপকাকুর মুখে আগের সেই মিটিমিটি হাসি ফিরে এসেছে। বললেন, “সত্যবানবাবুর ডায়েরির একটা জায়গায় লেখা ছিল, ‘মোজা ছাড়া জুতো পরা মানুষ সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে।”
ঝিনুক সত্যিকারের হাঁ হয়ে গেছে, ওই তুচ্ছ কথাটার মধ্যে এত বড় সূত্র লুকিয়েছিল! দীপকাকু বলে যাচ্ছেন, “অতএব প্রমাণ হয়ে গেল, অপরাধীকে সত্যবান মিত্র আগেই চিনতেন। আর সে যে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে, সেটা বোঝা যায়, অত ক’টা চিঠি লেখা এবং একবার সত্যবানবাবুর ফ্ল্যাট, অন্যবার অপরাজিতা দেবীর ঘর তছনছ করা দেখে।”
ঝিনুক বলল, “সে না হয় হল, কিন্তু তাকে ধরবেন কীভাবে? আমরা তাকে ফলো না করে সেই থেকে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি!”
“শিলিগুড়ির পুলিশকে গাড়ির নম্বরটা ফোনে জানিয়েছি। ওরা খোঁজ নিচ্ছে গাড়িটা কোন হোটেল বা বাড়িতে গেছে। পুলিশ যখনই ফোনে আমাদের জানাবে, আমরা বেরিয়ে পড়ব। চলো, আপাতত চা খাওয়া যাক।” বলে, দীপকাকু চায়ের দোকানের খোঁজে চললেন। ঝিনুক ব্যাগ কাঁধে তুলে অনুসরণ করল।
.
হোটেল ‘হিমকন্যা’। এখানেই উঠেছে অপরাধী। একজন ওসি, দু’জন কনস্টেবল সঙ্গে নিয়ে দীপকাকু আর ঝিনুক হোটেলের সিঁড়ি ভেঙে তিনতলায় উঠছেন। একশো কুড়ি নম্বর রুম বুক করেছে লোকটা।
স্টেশনের টি-স্টলে বসে যখন চা খাচ্ছিল ঝিনুকরা, তখনই শিলিগুড়ি পুলিশের ফোন আসে দীপকাকুর মোবাইলে। গাড়িটা কোন হোটেলে গেছে, লোকটা কোন ঘরে উঠেছে, সব জানায়। দীপকাকু পুলিশকে হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে ট্যাক্সি ধরেন। ট্যাক্সিতে আর একটা কল আসে মোবাইলে। এ প্রান্তটুকু শুনে ঝিনুক যতটা বুঝেছে, ফোনটা ওসি পার্থ মজুমদারের ছিল। বিনায়ক বোধহয় অনেক কথাই স্বীকার করেছে। ফোনে কথা বলতে বলতে দীপকাকুর চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল।
অবশেষে একশো কুড়ি নম্বর ঘর। দরজায় লাঠি দিয়ে টোকা মারছেন ওসি। খানিক পরেই দরজা খুলে যায়। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁকে এখানে আশাই করেনি ঝিনুক। ভদ্রলোক হলেন জয়ন্ত মিত্র। সত্যবানবাবুর বড়ছেলে। পুলিশ এবং ঝিনুকদের দেখে জয়ন্তবাবুও ভীষণ অবাক। বিস্ময়ের কণ্ঠে বলেন, “এ কী, আপনারা এখানে!”
কোনও ভণিতা না করে দীপকাকু বললেন, “জিনিসটা দিন।”
“কী জিনিস? কীসের কথা বলছেন? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!” বললেন জয়ন্ত মিত্র।
“এক্ষুনি বুঝতে পারবেন।” বলে, দীপকাকু নিজে এগিয়ে যান বিছানায় রাখা সুটকেসের দিকে। ডালা খোলাই ছিল। জয়ন্তবাবু হয়তো এইমাত্র পোশাক বদলেছেন। একটু ঘাঁটাঘাঁটির পর জিনিসটা দীপকাকুর হাতে উঠে এল, আয়তাকার পোড়ামাটির একটা টালি। জিনিসটা পরিষ্কার করা হলেও তার প্রাচীনত্ব মোছা যায়নি। টালিটা আট বাই ছ’ইঞ্চি মতো হবে।
পুলিশ এবং ঝিনুক ঘিরে দাঁড়িয়েছে দীপকাকুকে। টালিটা খুঁটিয়ে দেখছেন দীপকাকু। একপিঠে পেরেকের মতো দেখতে অনেকগুলো আঁচড় খোদাই করা। আঁচড়ের উপর হাত বুলিয়ে দীপকাকু বলে ওঠেন, “কিউনি ফর্ম, বাণমুখ লিপি।”
কথাটা চেনা চেনা ঠেকে ঝিনুকের। পুলিশ অফিসার বললেন, “তার মানে এনশিয়েন্ট কিছু?”
“ইয়েস, অ্যাট লাস্ট আই গট ইট।” বলে, জয়ন্তবাবুর দিকে ফেরেন দীপকাকু। বিছানায় হাল ছেড়ে দেওয়া অবস্থায় বসে আছেন জয়ন্ত মিত্র। দীপকাকু বললেন, “জয়ন্তবাবু, এই মাটির ট্যাবলেটটা কতটা মূল্যবান, কোনও ধারণা আছে আপনার?”
মাথা নাড়েন জয়ন্ত মিত্র।
দীপকাকু আবার বললেন, “এর মূল্য না জেনেই বাবাকে খুন করে ফেললেন!”
চমকে মাথা তুললেন জয়ন্ত মিত্র। সঙ্গে সঙ্গে অস্বীকার করলেন, “কে বলেছে, বাবা খুন হয়েছেন?”
“আমি বলছি। আপনি যেদিন ডাক্তার-বন্ধু নিয়ে বাবার শরীর পরীক্ষা করাতে যান, প্রথমবার ডাক্তারকে নিয়ে বেরিয়ে এলেও, আবার ঢোকেন একা। অপরাজিতা দেবীর কাজের লোক বিনায়ক সেটা দেখেছিল। বাবার সঙ্গে আপনার কথা কাটাকাটি হয়। কোনও একফাঁকে মদের বোতলে ঘুমের ট্যাবলেটগুলো ফেলে দেন। এমনই ট্যাবলেট, যাতে মদের স্বাদ বদলায় না। তালতলা থানায় সত্যবানবাবুর আত্মহত্যা নিয়ে খোঁজ করতে গিয়ে একটা ব্যাপারে আমার খটকা লাগে, যিনি আত্মহত্যা করবেন, বোতলে ওষুধ ঢালতে যাবেন কেন? গ্লাসে ঢাললেই তো কাজ মিটে যায়। তখন থেকেই আত্মহত্যাটাকে আমার হত্যা মনে হয়েছে। বিনায়ক যদিও আপনাকে ট্যাবলেটগুলো ফেলতে দেখেনি। সে দেখেছিল, অচৈতন্য সত্যবানবাবুর প্রতি দৃপাত না করে, সারা ফ্ল্যাট ওলটপালট করে কী যেন খুঁজছেন আপনি! বিনায়ক যে আপনাকে দেখে নিয়েছে, অচিরেই টের পান। এবং খুব দ্রুত টাকা খাইয়ে তাকে বশ করেন। বিনায়কের যে অবস্থা হঠাৎ ফিরেছে, লক্ষ্মীকে আলাদা জেরা করে তা জানতে পারি। বিনায়কই আপনাকে ওবাড়ির চাবিগুলোর ডুপ্লিকেট করে দিয়েছে। আমরা যে তদন্তে নেমেছি, আমাদের গাড়ির নম্বর সে-ই আপনাকে দিয়েছিল। মোটর ভেহিকল্সে গাড়ির নম্বর দিয়ে আমাদের বাড়ির ফোন নম্বর জোগাড় করেন আপনি। ফোনে হুমকিও দেন। আমাদের ভড়কে দিতে অপরাজিতা দেবীর পাওয়া চিঠির মতো একটা চিঠি দেখান। যেটা নাকি আপনি পেয়েছেন। আপনার সমস্ত পরিকল্পনা নিখুঁত ছিল। ভুল একটাই, ঘুমের ট্যাবলেটের ফয়েলটা আপনি বাবার ওষুধের ড্রয়ারে ফেলে যান। ভেবেছিলেন কারও সন্দেহ হবে না। আমি যখন থানায় গিয়ে জানতে পারি লো-প্রেশারের রুগি সত্যবানবাবুর কাছে ওই ওষুধ বিষবৎ, তৎক্ষণাৎ সত্যবানবাবুর ঘরে ফিরে গিয়ে ফয়েলটা নিয়ে থানায় জমা দিই। ওটা এখন ফরেনসিকে। আশা করি, ওতে আপনার হাতের ছাপই পাওয়া যাবে।”
দীপকাকুর একটানা কথায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়লেন জয়ন্ত মিত্র। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলতে লাগলেন, “বিশ্বাস করুন, আমি বাবাকে মারতে চাইনি। কিছুক্ষণ ঘুম পাড়াতে চেয়েছিলাম। সেই গ্যাপে ঘরটা খুঁজে দেখার ইচ্ছে ছিল। জিনিসটা তো পেলামই না, বাবাও ওষুধটা সহ্য করতে পারলেন না। এই দুর্ঘটনার জন্য বাবাও অনেকাংশে দায়ী। বহুবার জিনিসটা আমি বাবার কাছে চেয়েছিলাম। উনি ওটার অস্তিত্ব স্বীকার করেননি।”
“জিনিসটা যে বাবার কাছে আছে, আপনি কীভাবে জানলেন?” জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকু।
জয়ন্তবাবু বললেন, “বাবা মিশর থেকে ফিরে আসার পর কলকাতায় একপ্রকার আত্মগোপন করেন। আমার কাছে হঠাৎই একদিন কায়রো থেকে ফোন আসে। একজন বিদেশির ফোন। ইংরেজিতে কথা বলছিল। সে জানায়, আমার বাবা নাকি অসৎ উপায়ে একটা দুর্মূল্য জিনিস হাতিয়ে ভারতে পালিয়ে এসেছেন। জিনিসটা যদি তাকে আমি দিতে পারি, সে আমায় পঞ্চাশ হাজার টাকা দেবে। লোকটা বোধহয় ততটা বড়মাপের অপরাধী নয়। না হলে সে অনায়াসে ভারতের গুন্ডা হাত করে কাজটা সারতে পারত। আবার এটাও ঠিক, আমি যত সহজে বাবার কাছাকাছি পৌঁছতে পারব, ওরা পারবে না। দিন পনেরো পরে আবার ফোন করে লোকটা। টাকার অঙ্ক বাড়ায়। আরও বেশ কয়েকবার ফোন করেছে, এখন দাম দাঁড়িয়েছে দেড় কোটি।”
পোড়ামাটির টালির এত দাম! জিনিসটা যদি ঝিনুকের হাতে থাকত, দাম শোনার পর নির্ঘাত হাত থেকে পড়ে যেত। দীপকাকু কিন্তু অবিচল। আবার প্রশ্ন করলেন, “আপনি কী করে আন্দাজ করলেন, জিনিসটা অপরাজিতা দেবীর কাছে আছে?”
“বিনায়ক খবরটা দেয়। সে নাকি দেখেছে, এই মাটির ট্যাবলেট আর বই নিয়ে সারারাত জেগে কাটিয়ে দেন বাড়ির মালকিন। জিনিসটা তারপর কোথায় লুকিয়ে রাখেন, জানতে পারেনি বিনায়ক। বাবার মৃত্যুর পর নীচের ঘরে ঢুকে বাবার বই নিয়ে আসতেন অপরাজিতা দেবী। উনিও নিশ্চয়ই জানতে চাইছিলেন জিনিসটার প্রকৃত দাম।”
জয়ন্ত মিত্রর কথার শেষে দীপকাকু বললেন, “আপনার একবারও জানার ইচ্ছে হয়নি, বিদেশি লোকটা জিনিসটার জন্য কেন এত দাম দিতে চাইছে, কী আছে এতে?”
“না। টাকাটাই আমার কাছে বেশি প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে।” জয়ন্ত মিত্রর সোজাসাপটা জবাব।
পুলিশ অফিসার দেরি না করে অ্যারেস্ট করলেন জয়ন্ত মিত্রকে। দীপকাকু ছোট্ট একটা পারমিশন নিলেন অফিসারের থেকে, পোড়ামাটির টালিটা আপাতত নিজের কাছেই রাখতে চান তিনি। এর রহস্যটুকু ভেদ করে জিনিসটা তিনি ফেরত দেবেন। অফিসার সাগ্রহে রাজি হলেন।
.
থানায় লাগেজ রেখে ঝিনুক, দীপকাকু এখন ট্যাক্সিতে। চলেছে মাটিগাড়ায়। জিনিসটা হাতে পাওয়ার পর দীপকাকু কলকাতায় তাঁর এক পরিচিতকে ফোন করেন। সুমিত ঘোষ। যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে হিস্ট্রি পড়ান। তাঁর কাছে দীপকাকু জানতে চান, “বাণমুখ লিপি পড়তে পারার মতো লোক কলকাতায় কে আছেন?”
দু’-একজনের নাম করার পর সুমিত ঘোষের হঠাৎ মনে পড়ে নিজের স্যারের কথা। এবং সবচেয়ে যেটা সৌভাগ্যের, সেই শিক্ষক রিটায়ারমেন্টের পর শিলিগুড়িতেই থাকেন। নাম জীবনময় গুপ্ত। বাণমুখ লিপি নিয়ে প্রচুর রিসার্চ করেছেন, বিদেশেও গেছেন বেশ কয়েকবার। শিলিগুড়ির মাটিগাড়া অঞ্চলে বাড়ি কিনে প্রায় একা অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। ভদ্রলোক নাকি ভীষণ মুডি, বুঝে-শুনে কথা চালাতে হবে। জীবনময় গুপ্তর ঠিকানা জেনে নিয়ে ঝিনুকরা ট্যাক্সি ধরেছে। দীপকাকুর হাতে খবরের কাগজে মোড়া সেই পোড়ামাটির ট্যাবলেট। কত হাজার বছরের পুরনো, কে জানে!
ট্যাক্সিতে দীপকাকু বলে উঠেছিলেন, “ভাবতে পারো, এই বাণমুখ লিপিগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রত্নযুগের কোনও এক রানির কান্না। যার প্রায় অনেকটাই উদ্ধার করেছিলেন সত্যবান মিত্র। এত বড় একটা আবিষ্কারের পর বেশ বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন তিনি। জিনিসটা যেহেতু অসৎ উপায়ে হাতিয়েছিলেন, সরকারের কাছে জমা দিতে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছিলেন। ওদিকে বড়ছেলে জেনে গেছে জিনিসটার অস্তিত্ব। বারবার চাইতে আসছে। সত্যবান মিত্র জিনিসটা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখেন। এ-কথাও তিনি ডায়েরিতে লেখেন। নিরাপদ স্থানটি হচ্ছে অপরাজিতা দেবী। যদিও এ ব্যাপারেও তাঁর সংশয় ছিল, তাই ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘নিরাপদ কি?”
ডায়েরির সব লেখারই মানে বেরিয়ে এসেছে, শুধু একটা মন্তব্য ছাড়া, ‘চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে যে খায়, তার মনের গভীরতা কম।’ কার উদ্দেশে লেখা, এখনও বোঝা যায়নি। হয়তো মজা করেই লেখা। দীপকাকুর অনুসন্ধান পর্বের কয়েকটা জায়গা ঝিনুকের অজানা ছিল, গাড়িতে আসতে আসতে সেটুকুও জেনে নিয়েছে। সত্যবানবাবুর মৃত্যুর সঙ্গে অপরাজিতা দেবীর কেসের সম্পর্ক রয়েছে, এটা আবিষ্কার হয় অপরাজিতা দেবীর বুকশেলফে সত্যবানবাবুর নাম লেখা কিছু বই দেখে। বইগুলো বেশিরভাগই মিশরের ইতিহাস এবং ওই সময়ের ভাষাতত্ত্বের উপর। বইগুলো সত্যবানবাবু নিজে দেননি। উনি মারা যাওয়ার পর অপরাজিতা দেবী সত্যবানবাবুর ঘর থেকে নিয়ে এসেছিলেন। জয়ন্তবাবুর কথাতে তার সমর্থন মিলেছে। এর পরের অনুসন্ধান পর্বটি চমকপ্রদ! অপরাজিতা দেবীকে দেওয়া হুমকির চিঠিগুলোতে দুর্গা ফন্ট লক্ষ করা ছাড়াও আর একটা জিনিস আতশ কাচ দিয়ে দেখেছিলেন দীপকাকু, বন্ড পেপারের উপর আবছা স্ক্র্যাচ। একই দাগ পেয়েছিলেন জয়ন্ত মিত্রর পাওয়া চিঠিতে। জয়ন্ত মিত্রর অফিসে ইচ্ছে করেই চায়ের কাপ ফেলে দেন দীপকাকু। গোলমালের মাঝে জয়ন্ত মিত্রর কম্পিউটারের প্রিন্টার থেকে ছাপা একটা পাতা তুলে নেন। হোটেলে খেতে বসে সেই কাগজে একই দাগ আবিষ্কার হতে দীপকাকু বলে উঠেছিলেন, ‘আমার সঙ্গে চালাকি!” অর্থাৎ ইমপ্রেশনে ছাপানো চিঠি ছাড়া বাকি সব জয়ন্তবাবুর কম্পিউটার থেকে বেরিয়েছে।
শুধু একবারই জয়ন্ত মিত্র অনেকক্ষণ দীপকাকুকে বোকা বানিয়েছেন। ট্রেনপথে। ছদ্মবেশ নিখুঁত ছিল। ভোরবেলা ভদ্রলোকের পা দেখে দীপকাকুর প্রথম সন্দেহ হয়, মুখের তুলনায় পা অনেক ইয়াং। সন্দেহটা নিশ্চিত করতে ভদ্রলোকের কাছে ম্যাগাজিন চেয়েছিলেন দীপকাকু। তখনই ভদ্রলোকের আঙুলে মা কালীর আংটি দেখে জয়ন্ত মিত্রকে চিনতে পারেন। ম্যাগাজিনে চোখ বোলাতে না-বোলাতেই জয়ন্ত মিত্র কাজটা সারেন। জয়ন্ত মিত্র শিয়োর ছিলেন জিনিসটা অপরাজিতা দেবীর টয়লেট ব্যাগেই আছে, কারণ ট্যাবলেটের সাইজ জয়ন্তবাবুর জানা ছিল। দীপকাকুর কাছে অজানা। এখন শুধু বাকি রইল পোড়ামাটির ট্যাবলেটটা কত পুরনো এবং কী লেখা আছে ওতে, সেটা জানা।
বসতি ক্রমশ ফাঁকা হচ্ছে। রাস্তা কিন্তু একই রকম চওড়া আর মসৃণ। জায়গাটার সঙ্গে সল্টলেকের বেশ মিল আছে। হাইওয়ে ছেড়ে গাড়ি ঢুকে পড়ল পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে পাড়ায়। বেশিরভাগই বাগানসমেত একতলা বাড়ি। এ রাস্তা-ও রাস্তা ঘুরে ট্যাক্সি পৌঁছল পাড়ার শেষ প্রান্তে একটা বিশাল বাগানওলা একতলা বাড়ির গেটে। থামের উপর বড় বড় অক্ষরে জীবনময় গুপ্ত-র নাম লেখা।
দীপকাকু, কেন কে জানে, তখনই গাড়ি থেকে না নেমে ড্রাইভারকে ট্যাক্সিটা পিছোতে বললেন। অনেকটা পিছিয়ে আসার পর গাড়ি থেকে নেমে ভাড়া মেটানো হল। কারণটা জানতে চাইতে, দীপকাকু আঙুল তুলে জীবনময় গুপ্তর বাগানটা দেখালেন। সেখানে একটা সুমো গাড়ি দাঁড়িয়ে। দীপকাকু বললেন, “গাড়িটা চিনতে পারছ?”
মাথা নাড়ল ঝিনুক। দীপকাকু বললেন, “অভয়বাবুর গাড়ি। একই নম্বর। যে গাড়িতে অপরাজিতা দেবীকে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে নিয়ে যান অভয়বাবু।”
“অভয়বাবু এখানে কী করছেন?” অবাক হয়ে জানতে চাইল ঝিনুক।
দীপকাকু বললেন, “অভয়বাবু না অন্য কেউ, সেটা জানার জন্য আমাদের পাঁচিল টপকাতে হবে। চলো, বাড়ির পিছনের দিকে যাই।”
.
পাঁচিল ডিঙিয়ে ঝিনুকরা পৌঁছে গেছে জীবনময় গুপ্তর স্টাডিরুমের জানলায়। ঘরটা বাগানের পাশে। জানলার পাল্লাগুলো অল্প ফাঁক করা। তার মধ্যে দিয়ে দেখা গেল অপরাজিতা দেবীকে। চেয়ারে বসে আছেন, হতাশ ভঙ্গি। টেবিলের ওপ্রান্তে রাগত আচরণে পায়চারি করছেন জীবনময় গুপ্ত। হাতে ধরা আছে একটা কাগজ। ছোটখাটো চেহারা জীবনময় গুপ্তর। বয়স নিশ্চয়ই সত্তর পেরিয়ে
গেছে। মাথায় পাকা এলোমেলো লম্বা চুল। চোখেমুখে প্রখর জ্ঞানের ছাপ।
দীপকাকু ঝিনুকের কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন, “অপরাজিতা দেবী মনে হচ্ছে ডক্টর গুপ্তর ছাত্রী ছিলেন। জীবনস্যারের হাতে যে কাগজটা দেখছ, যতদূর মনে হয় মাটির ট্যাবলেটের প্রতিলিপি।”
দীপকাকুর কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল। পায়চারি থামিয়ে ডক্টর গুপ্ত হঠাৎ অপরাজিতা দেবীর উদ্দেশে বলে উঠলেন, “এই কপিটাই তো তুমি আমার কাছে পোস্ট করে দিতে পারতে। তা হলে ইতিহাসের ওই দুর্লভ জিনিসটা এভাবে খোয়া যেত না।”
উত্তরে অপরাজিতা দেবী বললেন, “আমি আসলে সেটুকু ঝুঁকিও নিতে চাইনি। এমনিতে কোনও একজন জেনে গিয়েছিল জিনিসটা আমার কাছে আছে। বারবার হুমকির চিঠি দিচ্ছিল। শেষমেশ অবশ্য তারই জিত হল।”
আবার পায়চারি শুরু করলেন ডক্টর গুপ্ত। হাঁটতে হাঁটতেই কথা চালাতে লাগলেন, “তুমি বলছ সত্যবান মিত্র তোমার বাড়িতে ভাড়া উঠেছিল। এ কি সেই সত্যবান যে কলেজ লাইফে চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে খেত, আমরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা করতাম? তুমি কখনও তাকে সামনে বসে চা খাইয়েছ?”
অপরাজিতা বলে উঠলেন, “আপনি ঠিকই ধরেছেন, ভদ্রলোক চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে খেতেন।”
একই সঙ্গে ঝিনুক বুঝতে পারে ডায়েরির এখন অবধি অজানা মন্তব্যটি নিজের প্রতিই করেছিলেন সত্যবানবাবু। রসিক মানুষ ছিলেন বলতে হবে! ঝিনুক ক্রমশ ধৈর্য হারাচ্ছে, পোড়ামাটির টালিতে কী লেখা আছে, এখনও পর্যন্ত জানা যাচ্ছে না। ঝিনুকের প্রশ্নটা অপরাজিতা দেবীই করে বসলেন, “স্যার, ওটাতে কী লেখা আছে?”
“সেটা জেনে এখন আর কী হবে! সত্যবানটাও এমন ইডিয়ট, জিনিসটা পেয়েও নিজের কাছে আটকে রাখল! এটা এক ধরনের স্বার্থপরতা। অগভীর মনের পরিচয়। আমি নিশ্চিত ও এই লিপির পুরোটাই পাঠোদ্ধার করতে পেরেছিল।” বলে, একটু থামলেন ডক্টর গুপ্ত। চেয়ারে গিয়ে বসলেন। অপরাজিতা দেবীর দিকে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি ওই জিনিসটা নিয়ে কী করবে ভেবেছিলে?”
উত্তরে অপরাজিতা দেবী বললেন, “কিছুই ভাবিনি। জিনিসটা কতটা অমূল্য জানার জন্যই তো আপনার কাছে নিয়ে আসছিলাম।”
“তা হলে শোনো, শুনলেই বুঝতে পারবে, কী দুষ্প্রাপ্য বস্তু তোমার বোকামিতে হাত থেকে বেরিয়ে গেছে।” বলে, টেবিলে রাখা গ্লাস থেকে জল খেলেন জীবনময় গুপ্ত। তারপর বলতে শুরু করলেন, “ওই পোড়ামাটির ট্যাবলেটে লেখা ছিল একটা করুণ চিঠি। তুতেনখামেনের মাত্র সতেরো অথবা আঠারো বছর বয়সে মৃত্যু হয়। দুর্ভাগ্যক্রমে তুতেনখামেনের কোনও সন্তান ছিল না। পরে রাজা হওয়ার দাবিদার ছিলেন ষাট বছরের বৃদ্ধ সামন্তরাজা আই। অত্যন্ত কুচক্রী বাজে লোক। এদিকে মিশরীয় রীতি অনুসারে নতুন রাজা, পুরনো রাজার স্ত্রীকে বিয়ে করতে পারেন। স্বামীর শোকে মূহ্যমান আঁখেসোনামুনের মনে তখন আর-এক আতঙ্ক, বুড়ো রাজা আইকে বিয়ে করতে হবে! সত্তর দিনের অশৌচ চলাকালীন রানি এক দুঃসাহসিক কাজ করেন, দূত মারফত নিকটবর্তী দেশ হিত্তি রাজ্যের রাজাকে একটা চিঠি পাঠালেন। তাতে লেখা ছিল, “আমি মিশরের সদ্যবিধবা রানি। কোনও সন্তানাদি নেই। আপনি যদি আপনার কোনও এক পুত্রকে মিশরে পাঠিয়ে দেন, তাকে আমি বিয়ে করব, সে-ই হবে মিশরের রাজা!’
“মিশরের রাজধানী তখন থিস। হিত্তির রাজধানী হাটুসাস। দুটি শহরের দূরত্ব সাতশো মাইল। তখনকার দিনে কীভাবে অতদূর চিঠিটা পাঠিয়েছিলেন, সেটাই আশ্চর্যের!
“সে যাই হোক, হিত্তিরাজ তো চিঠি পড়ে হতভম্ব। কোনও রানি এরকম নির্লজ্জ বিবাহপ্রস্তাব দিতে পারেন, তিনি ভাবতেই পারেন না! মনে হয়, এটা নিশ্চয়ই তাঁকে বোকা বানানোর প্রচেষ্টা। মন্ত্রীপরিষদ নিয়ে মিটিং-এ বসলেন রাজা। মিশরে ভালমতো খোঁজ নেওয়ার জন্য দূত পাঠানো হল। দূত ফিরে এল রানির দ্বিতীয় চিঠি নিয়ে। তাতে লেখা হয়েছে, ‘আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন। আমার কোনও সন্তান থাকলে কোনও সমস্যাই হত না। সে-ই হত মিশরের রাজা। কিন্তু এখন আমায় অধীনস্থ দাসকেই বিয়ে করতে হবে। যা আমার পক্ষে অত্যন্ত অপমানজনক। শুনেছি আপনার বেশ ক’টি সুপুত্র আছে, তাদের একজনকে আমায় গ্রহণ করতে বলুন। সে-ই হবে মিশরের রাজা!’ এই দুটো চিঠি ১৯০৭ সালে তুরস্কের বোঘাজকোই গ্রামে খননকার্যের সময় পাওয়া যায়। জার্মান প্রত্নবিদ হুগো উইঙ্কলার চিঠি দুটি আবিষ্কার করেন। তোমার কাছে ছিল সম্ভবত তৃতীয় চিঠি, যেটা এতদিন ইতিহাসবিদদের কাছে অজ্ঞাত ছিল।”
এত প্রাঞ্জলভাবে কথাগুলো বলছেন ডক্টর গুপ্ত, পুরনো মিশরটাই যেন চোখের সামনে ফুটে উঠছে ঝিনুকের। ইচ্ছে করছে ঘরে ঢুকে পড়ে, বাকিটা শোনে। উপায় নেই। দীপকাকুও গভীর মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনছেন। জীবনবাবু আবার বলতে শুরু করলেন, “দ্বিতীয় চিঠি পড়ে হিত্তিরাজ নিঃসন্দেহ হন। তাড়াতাড়ি তিনি তাঁর এক ছেলেকে মিশরে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু রাজপুত্রটি মিশরের সীমানা পেরতেই গোপন আততায়ীর হাতে খুন হয়।
“মিশরের সেনাপতি হোরেমহাব চিঠি চালাচালির ব্যাপারটা টের পেয়েছিলেন। তোমার কাছে যে চিঠিটা ছিল, তাতে রানি সম্ভবত সতর্ক করেছিলেন রাজপুত্রকে। অন্য পথে আসার নির্দেশ দেওয়া ছিল মনে হচ্ছে। চিঠিটা লোপাট হওয়ার জন্যই রাজপুত্র কোনওদিনই আঁখেসোনামুনের কাছে পৌঁছতে পারেনি। সেই চিঠি তোমার মূর্খামির জন্য তিন হাজার বছর পর আবার হারিয়ে গেল! চিঠিটার নিশ্চিত পাঠোদ্ধার আমার পক্ষে কতটা সম্ভব হত জানি না। আমিও হয়তো বিদেশি বিশেষজ্ঞদের হাতে তুলে দিতাম।”
জানলায় দাঁড়িয়ে ঝিনুক একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল, হঠাৎ দেখে ডক্টর গুপ্তর স্টাডিতে ঢুকছেন দীপকাকু! কখন যে পাশ থেকে সরে গেছেন, টেরই পায়নি। ঝিনুকও প্রায় দৌড়ে ডক্টর গুপ্তর ঘরে ঢুকল। শুনল, দীপকাকু গভীর আবেগে বলছেন, “মাস্টারমশাই, জিনিসটা হারায়নি। অনেক কষ্টে মাটির ট্যাবলেটটা আমি রক্ষা করেছি।”
হঠাৎ দীপকাকু কোথা থেকে উদয় হলেন, কী তাঁর পরিচয়, সে-সবের ধার দিয়েই গেলেন না জীবনময় গুপ্ত। দীপকাকুর হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিলেন কাগজে মোড়া মাটির ট্যাবলেট। টেবিলের উপর রেখে এমনভাবে দেখছেন, যেন তিন হাজার বছর পূর্বে থিসের রাজপ্রাসাদের কোনও এক গোপন কুঠুরিতে টর্চের আলো ফেলছেন।
অপরাজিতা দেবী লজ্জায় মাথা তুলতে পারছেন না। দু’জনকেই বিরক্ত না করে বারান্দায় বেরিয়ে এলেন দীপকাকু। মোবাইল ফোন মারফত শিলিগুড়ি পুলিশকে জীবনময় গুপ্তর বাড়িতে আসতে বললেন। ডক্টর গুপ্তই জানাবেন জিনিসটার গুরুত্ব।
.
ঝিনুকরা ডক্টর গুপ্তর বাড়ি, বাগান ঘুরে দেখছিল, মিনিট দশেকের মধ্যেই জিপ নিয়ে পুলিশ হাজির। পিছনে আর একটা গাড়ি। টিভি কোম্পানির। আজকাল সব বড় শহরে টিভি চ্যানেলের লোক রাখা থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই টিভির লোক আর পুলিশে ছয়লাপ হয়ে গেল গোটা বাড়ি। এদিকে দীপকাকু বেপাত্তা। ঝিনুকের সামনেই চলে এল টিভি ক্যামেরা। রিপোর্টার বললেন, “তুমিই তো গোটা অভিযানে দীপঙ্কর বাগচীর সঙ্গে ছিলে?”
সলজ্জভাবে ঘাড় হেলায় ঝিনুক।
পরের প্রশ্ন, “দীপঙ্করবাবু কোথায়?”
“আছেন হয়তো আশপাশে।” বলে ঝিনুক।
আবার প্রশ্ন, “তোমার নাম?”
ডাকনামটা বলতে গিয়েও চেপে যায় ঝিনুক। টিভি, কাগজে ভাল নামটাই যাওয়া উচিত। বলে, “আঁখি সেন।”
“মিশরের কোনও এক রানির চিঠি উদ্ধার করেছ তোমরা। রানির নাম কী?”
“আঁখেসোনামুন!” বলার সঙ্গে সঙ্গে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে ঝিনুকের, নিজের ভাল নামের সঙ্গে কী আশ্চর্য মিল! গলা আটকে আসছে ঝিনুকের, বাকিটা গুছিয়ে বলতে পারবে তো?
.
[কাহিনিতে কিছু ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে আমার কল্পনা মিশেছে। তথ্যগুলির জন্য আমি সুবোধকুমার মজুমদারের কাছে কৃতজ্ঞ।]
