২
মাঝে চারদিন কেটে গেল। আজ রবিবার। ই এম বাইপাসে ব্যাগ চুরির ঘটনাটা মাথা থেকে উড়ে গিয়েছে ঝিনুকের। ভদ্রলোক দীপকাকুর সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। করলে, দীপকাকু নিশ্চয়ই একবার জানাতেন ঝিনুককে।
রবিবার ঝিনুকের নিজের ঘর পরিষ্কার করার দিন। ডিভিডি প্লেয়ারে গান চালিয়ে সকাল থেকে তাই করে যাচ্ছে ঝিনুক। বইপত্তর সব নামিয়ে ফেলেছে বিছানায়। এমন সময় বাইরের ঘর থেকে বাবার গলা ভেসে এল, “ঝিনুক, তোর ফোন।”
“যাই!” বলে, হাত ঝাড়তে ঝাড়তে ঘর থেকে বেরিয়ে এল ঝিনুক। ড্রয়িংরুমে এসে দেখল, বাবা সোফায় বসে কাগজ পড়ছেন। ফোনস্ট্যান্ডে চোখ গেল। রিসিভার ক্রেডেল থেকে নামানো আছে। ঝিনুক বাবাকে জিজ্ঞেস করল, “কার ফোন?”
“দীপঙ্করের। ওকে একটু সময় করে আসতে বলিস তো! এ বাড়ির পথই যেন ভুলে গিয়েছে! দাবা না খেলে মাথায় চড়া পড়ে যাচ্ছে আমার।” একটু থেমে আবার বললেন, “ওরও পড়ছে।”
ফোনের দিকে যেতে যেতে ঝিনুক বলল, “কথাগুলো তুমিই তো বলতে পারতে।”
“বলতে যাচ্ছিলাম। এমন তাড়াহুড়ো করে তোকে ডেকে দিতে বলল…”
ফোনটা তার মানে জরুরি। রিসিভার তুলে ঝিনুক বলল, “বলুন।”
ফোনের অন্য প্রান্তে দীপকাকু বললেন, “যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার বাড়ি চলে এসো। আবির বসু আসছেন।”
“কে আবির বসু?” জানতে চাইল ঝিনুক।
উলটোদিকে দীপকাকুর গলায় বিস্ময়, “সে কী! উনি যে ফোনে বললেন, তুমি ওঁকে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলেছ?”
“আমি!” ঝিনুক রীতিমতো ধন্ধে পড়ে গেল। ওই নামে কারও সঙ্গে তার আলাপই হয়নি। ওপার থেকে দীপকাকু মনে পড়ানোর চেষ্টা করলেন, “সল্টলেকে বাইপাসের রাস্তায় ভদ্রলোকের গাড়ি থেকে …
দীপকাকুকে আর বলতে দিল না ঝিনুক। বলল, “মনে পড়েছে, মনে পড়েছে!”
“প্রথমে মনে পড়ল না কেন?”
“আসলে সেদিন ওঁর নামটা জানা হয়নি।”
“ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হল, আমার কার্ড দিলে, আর নামটাই জানলে না?” দীপকাকুর গলায় হতাশা।
ঝিনুক বলল, “সরি, ভুল হয়ে গেছে।”
ওপ্রান্ত খানিক নীরব থাকল। একটু পরে দীপকাকু বললেন, “আবির বসু ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমার বাড়ি আসছেন। তুমি চলে এসো তার আগে। প্ৰথমে তোমার মুখেই শুনতে চাই সেদিনের ঘটনা।”
“ঠিক আছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পৌঁছচ্ছি।” বলে, রিসিভার নামিয়ে রাখল ঝিনুক। বাবা কাগজ পড়তে পড়তে বললেন, “কী হল, বললি না এ বাড়িতে আসার কথা?”
“বললেও আসতে পারতেন না। হঠাৎ একটা কেস এসে পড়েছে। আমাকেও এক্ষুনি যেতে হবে দীপকাকুর বাড়ি।”
“তোকে কেন ডাকল? এমনিতে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টাই তো করে।”
বাবার কথার উত্তরে ঝিনুক বলতে যাচ্ছিল, “কেসটা যে আমার দেওয়া। ডাকতে আমাকে হবেই!” না বলে, একটু গম্ভীর স্টাইলে ঝিনুক বলল, “হয়তো এই বিশেষ কেসে আমাকে জরুরি মনে হয়েছে।”
বাবা হাঁ করে তাকিয়ে থাকলেন ঝিনুকের দিকে। যেন অপরিচিত ঠেকছে নিজের মেয়েকে। অস্বস্তি এড়াতে ঝিনুক বলল, “আশুদাকে নিয়ে যাচ্ছি। তুমি এখন বেরবে না তো?”
“না, আমি আর সকালে বেরচ্ছি না।”
.
ছুটির দিনের সকাল। রাস্তায় ট্রাফিকের তেমন চাপ নেই। আধঘণ্টার মধ্যেই বাড়ি থেকে বাঁশদ্রোণীর পিরপুকুরে পৌঁছে গেল ঝিনুকরা। আসার পথে গাড়িতে বসে ঝিনুক সেদিনের স্মৃতি হাতড়ে গোড়া থেকে দেখে নিয়েছে। ঝিনুকের চিন্তামগ্ন মুখ দেখে আশুদা আন্দাজ করে বলল, “আবার কোনও কেস এসেছে বুঝি দিদি?”
ঝিনুক মাথা উপর-নীচ করে ‘হ্যাঁ’ বলল।
তারপরই আশুদা কেমন যেন চাঙ্গা হয়ে উঠল! ঝিনুককে দীপকাকুর বাড়ির সামনে নামিয়ে বলল, “গাড়িটা গ্যারাজে দেখিয়ে আনি। তোমাদের কেসে কখন কী কাজে লাগবে…”
সিঁড়ি ভেঙে দীপকাকুর ভাড়াবাড়ির দোতলায় চলে এল ঝিনুক। ডোরবেল টিপল। ভিতর থেকে ভেসে এল দীপকাকুর গলা, “খোলাই আছে। চলে এসো।”
দরজা ঠেলে ঘরে এল ঝিনুক। দীপকাকু দাঁড়িয়ে আছেন স্টাডি টেবিলের সামনে। দেওয়ালে ব্ল্যাকবোর্ড। সেখানে চক দিয়ে কীসব লিখে যাচ্ছেন। এতই মগ্ন, আদৌ ঝিনুক এসেছে না অন্য কেউ, ঘুরে দেখার দরকার বোধ করছেন না। উপস্থিতি জানান দিতে ঝিনুক ছোট্ট করে কেশে নিল। বোর্ড থেকে চোখ না সরিয়ে দীপকাকু বললেন, “বোসো, চেয়ারটায় বোসো। কাজটা সেরে কথা বলছি।”
মোড়ায় বসল ঝিনুক। লক্ষ করল, ব্ল্যাকবোর্ডে দীপকাকুর আঁকিবুকি। কোনও একটা অঙ্ক কষছেন বোধহয়। তবে একটু অন্যরকম। বোর্ডের বাঁ পাশে অঙ্কটা লেখা আছে অ্যালফাবেটে, যোগ বলেই মনে হচ্ছে—
FORTY
TEN
TEN
———
SIXTY
অঙ্কটা তো মিলে গেছে। তবু দীপকাকু বোর্ড জুড়ে নানান নম্বর লিখেছেন। এক-একটা অ্যালফাবেটের পাশে এক-একটা নম্বর। যেমন N=5, E=০। আবার মুছে দিয়ে N=০, R=8…। কী যে করতে চাইছেন বোঝা যাচ্ছে না!
ঝিনুক জিজ্ঞেস করল, “এটা ঠিক কীধরনের অঙ্ক বুঝতে পারছি না তো!”
এতক্ষণে দীপকাকু ঝিনুকের দিকে ফিরলেন। মুখে মিটিমিটি হাসি। বললেন, “এই অঙ্ককে বলে ক্রিপ্টেরিম। অক্ষর দিয়ে যে যোগ করা হয়েছে, সেটা সংখ্যায় নিয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ এই অক্ষরগুলোর প্রতিটির মধ্যে লুকিয়ে আছে নির্দিষ্ট একটি সংখ্যা। শূন্য থেকে নয় অবধি। আমাকে বার করতে হবে N ইজকাল্টু কত? S মানে কত? দশটা অ্যালফাবেট ইউজ হয়েছে, প্রত্যেকটা একটা সংখ্যা রিপ্রেজেন্ট করবে। বেরবে সংখ্যার যোগফল।”
দীপকাকুর নাতিদীর্ঘ বক্তৃতায় কপালে ঘাম এসে গেল ঝিনুকের। অঙ্কটা নিশ্চয়ই দীপকাকুর কোনও কেসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ভাগ্যিস সেই কেসে ঝিনুককে অ্যাসিস্ট্যান্ট করেননি দীপকাকু। ঝিনুক যখন এ-কথা ভাবছে, দীপকাকু বলে উঠলেন, “এ পাড়ায় তোমার বয়সি এক অঙ্কপাগল ছেলে আছে। সে আমার কাজের খুব ভক্ত। সে এই অঙ্কটা সল্ভ করতে দিয়ে গিয়েছে আমাকে।”
মনে মনে প্রমাদ গনল ঝিনুক। দীপকাকু নতুন কোনও অ্যাসিস্ট্যান্ট জোটাচ্ছেন না তো? ছেলেটা ম্যাথে ভাল হতেই পারে, ঝিনুকের মতো ক্যারাটে, কুংফু, দৌড় দিতে পারবে না নিশ্চয়ই। গোয়েন্দার অ্যাসিস্ট্যান্ট হতে গেলে অনেক গুণ লাগে। দ্রুত প্রসঙ্গ পালটাল ঝিনুক। বলল, “আমাদের কথাবার্তা বোধহয় সেরে নেওয়া ভাল। আবিরবাবু যে-কোনও মুহূর্তে চলে আসতে পারেন।”
দীপকাকুর যেন ঘোর ভাঙল। বললেন, “ও হ্যাঁ। বলো তো কী হয়েছিল সেদিন?”
স্বভূমি থেকে বেরনোর পর যেমন, যা দেখেছিল, বলতে শুরু করল ঝিনুক। কথা খানিকটা এগোতেই দুটো মুড়ির বাটি নিয়ে ঘরে ঢুকল কাজের মাসি।
বাটি হাতে নিয়ে ঝিনুক বলতে থাকল সেদিনের ঘটনা। মুড়ি গালে ফেলে দীপকাকু মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলেন। বিবরণ এক সময় শেষ হল। মাসি ইতিমধ্যে দু’গ্লাস জল দিয়ে গেছে। জল খেয়ে দীপকাকু প্রশ্ন করলেন, “কী কারণে আমার কার্ডটা ওঁকে দেওয়ার কথা মনে হল তোমার?”
প্রশ্নটা যে আসবে ঝিনুক জানত। উত্তর রেডি করা ছিল। বলল, “ভদ্রলোককে আমি যখন জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ব্যাগে দামি বা দরকারি কিছু ছিল কি?’ উনি কেমন একটু চমকে উঠে সামলে নিলেন। তারপর বললেন, ‘দরকারি অনেক কাগজপত্তর ছিল। অনেক ক্ষতি হয়ে গেল আমার।’ আমার তখনই সন্দেহ হল, ভদ্রলোক চুরি যাওয়া জিনিসটা গোপন করছেন। সত্যিই যদি সেটা তেমন গোপনীয় কিছু হয়, পুলিশের কাছেও বলবেন না। তখনই দরকার পড়বে একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভের। সেই ভেবেই আপনার কার্ডটা দিয়েছিলাম।”
“লজিকটা ভাল।”
দীপকাকুর কথা শেষ হতেই ডোরবেল বাজল। মোড়া ছেড়ে উঠে যেতে যেতে ঝিনুক বলল, “মনে হচ্ছে, এসে পড়েছেন।”
দীপকাকু বললেন, “অর্ণবও হতে পারে!”
“কে অর্ণব?” দরজার দিকে এগোতে এগোতে ঝিনুক জানতে চাইল।
“ক্রিপ্টেরিদমের অঙ্কটা যে দিয়েছে। এই সময় আসার কথা ছিল। প্রায় সল্ভ করে এনেছি, আর-একটু সময় পেলেই….”
দরজা খুলতেই ঝিনুক দেখল, আবির বসু দাঁড়িয়ে আছেন। ঝিনুককে দেখে একটু বুঝি স্বস্তি পেলেন। মাত্র একবার দেখা হলেও, ঝিনুক তো ওঁর পূর্বপরিচিত। জানতে চাইলেন, “কাকা আছেন?”
“আছেন। ভিতরে আসুন।” বলে, ভদ্রলোককে ডেকে নিল ঝিনুক।
.
কাত হওয়া বেতের চেয়ারে বসেছেন আবিরবাবু। নমস্কার বিনিময়, প্রাথমিক পরিচয়পর্ব সারা হয়ে গেছে দীপকাকুর সঙ্গে। আপাতত জানা গেছে, আবিরবাবু বাংলার প্রোফেসর। কলকাতার কলেজে পড়ান। থাকেন ফুলবাগান অঞ্চলের একটা ফ্ল্যাটে।
দীপকাকু এবার সরাসরি প্রসঙ্গে এলেন, “দেখুন, ঝিনুক সেদিন যা দেখেছে এবং শুনেছে সবই বলেছে আমাকে। এবার আপনি বলুন, চুরির পর থানায় কোনও ডায়েরি করেছেন কি?”
“না, করিনি।”
“কেন?”
“চুরির ব্যাপারটা জানাজানি হোক চাইছিলাম না।”
ঝিনুক খুশি হল, আন্দাজ মিলে যাচ্ছে তার।
দীপকাকু মুখে কিছু জিজ্ঞেস না করলেও চোখে প্রশ্ন ঝুলিয়ে রেখেছেন। আবিরবাবু উত্তর দিলেন, “যে জিনিসটা চুরি হয়েছে, তার অর্থমূল্য তেমন কিছু নয়। কিন্তু আমাদের পরিবারের সম্মান জড়িয়ে আছে। পুলিশে ডায়েরি করলেই বিষয়টা জানাজানি হত। পরিবারের লোক ছিঃ ছিঃ করত আমাকে।”
“বুঝলাম।” বলে, চুপ করে গেলেন দীপকাকু। একটু ভেবে নিয়ে বললেন, “জিনিসটার অর্থমূল্য বেশি না হলেও, অন্য কোনও কারণে নিশ্চয়ই মূল্যবান। নইলে এত প্ল্যান খাটিয়ে, ঝুঁকি নিয়ে চুরি করত না।”
“এগ্জ়্যাক্টলি! সেই কারণেই আপনার কাছে আসা। আপনাকে বার করতে হবে জিনিসটা কোন অর্থে মূল্যবান।”
দীপকাকু ফের চুপ করে গেলেন। তাকিয়ে আছেন আবিরবাবুর মুখের দিকে। আবিরবাবু অস্বস্তি বোধ করছেন। কারণটা ঝিনুক জানে। দীপকাকুর চোখে চোখ রাখা যায় না। মোটা কাচের ঘোলাটে চশমার আড়ালে দীপকাকুর দৃষ্টি ঠিক কোথায়, ঠাহর করা মুশকিল। খানিক বিরতির পর দীপকাকু বলে উঠলেন, “ধরা যাক, ইনভেস্টিগেশনের পর জানা গেল, সব অর্থেই জিনিসটার দাম অত্যন্ত কম। তখন কিন্তু আমার ফিজটা আপনার কাছে বেশি মনে হবে।”
দীপকাকুর এই একটা ব্যাপার ঝিনুকের একদম অপছন্দের। টাকার প্রসঙ্গটা বড্ড তাড়াতাড়ি এবং সরাসরি তুলে বসেন। একদিন এটা নিয়ে দীপকাকুকে দু’কথা ঘুরিয়ে শোনাতে হবে। টাকার কথায় আবিরবাবুও একটু হোঁচট খেলেন। গলায় সংকোচের সুর এনে বললেন, “আপনার চার্জ সম্বন্ধে আমার কোনও ধারণা নেই। ইনফ্যাক্ট, জীবনে এই প্রথম আমি কোনও গোয়েন্দার সামনে বসে আছি। চার্জটা যদি সাধ্যের বাইরে হয়, ইনভেস্টিগেশন করতে বলব না।”
ঝিনুক ভাবল, হয়ে গেল! অতিরিক্ত প্রফেশনাল হতে গিয়ে গেল কেসটা কেঁচে! একেই বোধহয় বলে, ‘হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা’। কিন্তু না, দীপকাকু তড়িঘড়ি পরিস্থিতি সামলে নিলেন। বললেন, “আমার কোনও ফিক্সড চার্জ নেই। কেসের মেরিট অনুযায়ী সেটা ঠিক করি। এমনকী, কেসটা যদি আমার তেমন জোরালো মনে না হয়, হাতে নিই না। আপনি আগে আপনার সমস্যাটা বলুন। যদি আমার মনোমতো হয়, কিছু অ্যাডভান্স দেবেন, কাজ শুরু করে দেব।”
আবিরবাবু এবার যেন একটু স্বস্তি বোধ করলেন। মালতীমাসি ট্রে-তে দু’কাপ চা নিয়ে এসেছে। দীপকাকু বললেন, “নিন, চা-টা নিন। এবার প্রথমে আমাকে বলুন, জিনিসটা কী ছিল?”
আবিরবাবু চা নিলেন। কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, “একটা পেতলের বিষ্ণুমূর্তি।”
“সাইজ?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।
“লম্বায় আন্দাজ ছ’-সাড়ে ছ’ইঞ্চি, চওড়ায় তিন।”
“মূর্তিটা নিয়ে আপনি ব্যাঙ্কে কী করতে গিয়েছিলেন?” প্রশ্নের পর চায়ে চুমুক দিলেন দীপকাকু।
আবিরবাবু বললেন, “বিষয়টা প্রথম থেকে বললে আপনার বুঝতে সুবিধে হবে।”
“বলুন।”
চা শেষ করে সিগারেট ধরালেন আবিরবাবু। দীপকাকুকেও দিলেন। বলতে থাকলেন, “আমার পৈতৃক বাড়ি পুরুলিয়ায়। মা-বাবা কেউই বেঁচে নেই। আমরা তিন ভাই। আমি ছোট। আমার দুই দাদা থাকে পুরুলিয়ার বাড়িতে।”
“কী করেন তাঁরা?” জানতে চাইলেন দীপকাকু
আবিরবাবু বললেন, “বড়দা ব্যাবসা করে। মেজদা হোমিয়োপ্যাথ ডাক্তার। খুব ছোটবয়সে আমরা বাবাকে হারাই। আমাদের তিন ভাইকে মানুষ করেছেন মা এবং নায়েবমশাই, যাঁকে আমরা ‘জেঠুমণি’ বলি। উনিও পুরুলিয়ার বাড়িতে থাকেন।”
“নায়েবমশাই মানে? আপনার বাবা কি জমিদার ছিলেন?”
দীপকাকুর প্রশ্নে স্মিত হেসে মাথা নাড়লেন আবিরবাবু। বললেন, “আসলে মুশকিল হচ্ছে কী, জেঠুমণির পরিচয় দিতে গিয়ে আমরা একটু ইতস্তত বোধ করি। হিসেবমতো উনি আমার পিতৃদেবের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কাজের লোক। পরে ওঁর তদারকিতে আমরা বড় হই। উনিই আমাদের অভিভাবক। জেঠু বললে অনেকে ভাবে রক্তের সম্পর্ক। তাই নায়েবমশাই বলি। মা ওই বলেই সম্বোধন করতেন।”
দীপকাকু বললেন, “তবু নায়েব পদটা যখন দেওয়া হচ্ছে, আপনার বাবার আর্থিক অবস্থা নিশ্চয়ই ভাল ছিল?”
“তা ছিল। অসমের ডিব্রুগড়ে বিরাট ব্যাবসা ছিল বাবার। ব্যাবসা যখন তুঙ্গে, বন্ধু-প্রিয়জনরা বাবার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করেন। ওখান থেকে পরিবার নিয়ে পালিয়ে আসেন বাবা। আমি তখন মায়ের কোলে। আমাদের সঙ্গে ট্রেনে ওঠেন জেঠুমণি। বাবা জেঠুমণিকে চোখছাড়া করতে চাইতেন না। এতই নির্ভর করতেন। সেই বিশ্বাসের দাম জেঠুমণি সারা জীবন ধরে দিয়ে চলেছেন।”
“আপনার বাবা মারা গেলেন কীভাবে?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।
“সেটাই এখন বলতে যাচ্ছিলাম। অসম থেকে ট্রেনে আমরা ওয়েস্ট বেঙ্গল ফিরছিলাম, ডাকাত পড়ল আমাদের কম্পার্টমেন্টে। হয়তো ওদের কাছে খবর ছিল, ব্যাবসা গুটিয়ে অনেক টাকা নিয়ে রওনা দিয়েছেন বাবা। সমস্ত কিছু লুটপাট তো করলই। বাবাকেও খুন করে গেল। বাবা সামান্য প্রতিবাদ করেছিলেন বলে ওই পরিণতি হয়েছিল।”
দীপকাকু এতক্ষণ রুদ্ধশ্বাসে শুনছিলেন আবিরবাবুর কথা। দম ছেড়ে বললেন, “স্যাড, ভেরি স্যাড! তারপর কী হল বলুন।”
আবিরবাবু শুরু করলেন, “আমাদের মামার বাড়ি পুরুলিয়ার মুরাডিতে। জেঠুমণির হাত ধরে মায়ের সঙ্গে মামার বাড়িতে উঠলাম। আসার পথেই বাবার পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম শেষ করা হয়েছিল। মা জানতেন বাপের বাড়িতে বেশিদিন ঠাঁই হবে না। কারণ, মামারা খুবই গরিব। ট্রেনে অত বড় ডাকাতির পরও মা কীভাবে যেন কিছু টাকা, গয়না লুকিয়ে আনতে পেরেছিলেন। সেগুলো চুপিচুপি জ্যাঠামশাইকে দিয়ে বলেন, ‘মাথা গোঁজার ঠাঁই এবং ছোটখাটো কিছু ব্যাবসার চেষ্টা করুন। ছেলেগুলোকে মানুষ করতে হবে।’ মালকিনের আজ্ঞা মাথায় নিয়ে পুরুলিয়া শহরে চলে এলেন জেঠুমণি। সাপ্লাইয়ের ব্যাবসা শিখেছিলেন বাবার কাছে, অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই কাঠ সাপ্লাইয়ের বিজনেস দাঁড় করিয়ে ফেললেন। বাগান সমেত বেশ বড় বাড়ি কেনা হল পুরুলিয়া শহরের পাশে নডিহা অঞ্চলে। ব্যাবসা, বাড়ি, সবই কিন্তু মায়ের নামে। জেঠুমণি ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন। মা ব্যাবসা বুঝতেন না, মাথাও ঘামাতেন না। ঘর-সংসার, আমাদের মানুষ করা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। বড়দার লেখাপড়া বেশিদূর এগোল না। জেঠুমণির সঙ্গে ব্যাবসায় যোগ দিল। মেজদা হায়ার সেকেন্ডারির পর হোমিয়োপ্যাথি পড়ে চেম্বার খুলল পুরুলিয়া বাজারে। ঘটনাচক্রে তিন ভাইয়ের মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহ আমার বরাবরই বেশি। রেজাল্ট ভালই করতাম। পুরুলিয়ায় গ্র্যাজুয়েশন করে কলকাতায় এমএ পড়তে চলে এলাম। মেসে থেকে পড়াশোনা চালিয়েছি। খরচ পাঠাতেন জেঠুমণি। পিএইচডি করার পর কলেজে চাকরি পেলাম। ইতিমধ্যে মা মারা গেলেন। সমস্ত সম্পত্তির পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি দিয়ে গিয়েছিলেন জেঠুমণিকে। মা এই কাজটা করেছিলেন মৃত্যুর অনেক আগে। জেঠুমণিকে বলে গিয়েছিলেন, ‘আমি মরে গেলেই ছেলেদের সম্পত্তি ভাগ করে দেবেন না। যেদিন বুঝবেন, আপনি আর সামলাতে পারছেন না, তখনই দেবেন।’ জেঠুমণি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন মায়ের নির্দেশ। এখন ওঁর বয়স প্রায় আশি। কয়েক মাস আগে আমার ফুলবাগানের ফ্ল্যাটে ফোন করে বললেন, ‘আবির, এ বাড়িতে তোমাকে যে একবার আসতে হবে। অন্তত একদিনের ছুটি নিয়ে চলে এসো।’
“জানতে চাইলাম, ‘কেন হঠাৎ?”
“জেঠুমণি বললেন, ‘আমার বয়স হচ্ছে, শরীর ভাল যাচ্ছে না। এবার ভাবছি মায়ের সম্পত্তি তোমাদের বুঝিয়ে দিয়ে যাব।’
“আমি তখনই রাজি হইনি। বলেছি, ‘এত তাড়ার কী আছে? হবে’খন। আপনি এখন অনেক দিন বাঁচবেন।’
“জেঠুমণি বললেন, “তাড়া আছে। তুমি এসো, বলব।”
একটানা কথা বলে একটু থামলেন আবিরবাবু। উনি প্রোফেসর হিসেবে যথেষ্ট ভাল, বাচনভঙ্গিমা দেখেই টের পাচ্ছে ঝিনুক। একটু বেশিই বিরতি নিচ্ছেন দেখে দীপকাকু তাড়া দিলেন, “তারপর? গেলেন আপনি পুরুলিয়ায়?”
“গেলাম। গিয়ে এক আশ্চর্য পরিস্থিতির মধ্যে পড়লাম।”
কথার মাঝে দীপকাকু হঠাৎ বলে উঠলেন, “বাই দ্য ওয়ে, আপনি কিন্তু এখনও বলেননি, বিয়ে করেছেন কি না।”
“সরি, বলা উচিত ছিল। হ্যাঁ, আমি বিবাহিত। একটি ছ’বছরের কন্যাসন্তান আছে।”
“জেঠুমণির ফোন পেয়ে সপরিবার পুরুলিয়ায় গিয়েছিলেন?” জিজ্ঞেস করলেন দীপকাকু।
“না। একাই গিয়েছিলাম। সত্যি কথা বলতে কী, মা মারা যাওয়ার পর থেকে ওই বাড়ি যাওয়া আমাদের প্রায় হয়ই না। টানটা কমে গিয়েছে। একই বাড়িতে আলাদা হয়ে গিয়েছে দু’ভাই। জেঠুমণিও থাকেন অন্য পোরশানে। বয়স্কা কাজের মাসি দেখাশোনা করে তাঁর। একদিনের জন্য যাওয়া। কোনও বিয়ে, পাৰ্বণ কিছুই নয়। তাই আমার স্ত্রী-ই যেতে চাইল না।”
“তারপর বলুন, ওখানে গিয়ে কোন আশ্চর্য অবস্থার মধ্যে পড়লেন?” দীপকাকু প্রসঙ্গে টেনে আনেন আবিরবাবুকে।
বলতে থাকলেন আবিরবাবু, “এমনিতে বাড়ির পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। অনেক দিন পর গিয়েছি, সকলেই খুব খুশি। মিসেস আর মেয়েকে নিয়ে যাইনি বলে রাগ-অভিমান করছিল। এসবের মাঝে জেঠুমণি আলাদা করে ডেকে নিলেন আমাকে। নিজের ঘরে বসিয়ে বললেন, ‘সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আশা করি তুমি এতে দুঃখ পাবে না।’
“জানতে চাইলাম, ‘কী সিদ্ধান্ত?”
“জেঠুমণি বললেন, “এ বাড়ির কোনও অংশই তোমাকে দিচ্ছি না। ব্যাবসা তোমার বড়দা চালাচ্ছে, আমি আর ওই ব্যাপারে কোনও খোঁজ নিই না। ব্যাবসা ওর নামেই করে দিলে হবে। তোমার মায়ের গয়নাগাটি বউয়েরা পেয়েছে। তোমার বউকেও দেওয়া হয়েছিল বিয়ের সময়। যৎসামান্য যা ছিল এ বাড়ির দুই বউ ভাগ করে নিয়েছে।’
“জানতে চাইলাম, “আপনি দিলেন কেন?’
“বিষণ্ণ মুখে জেঠুমণি উত্তর দিলেন, ‘ওদের একটি করে মেয়ে আছে। জন্মদিনে বউমারা গয়নাগুলো চেয়ে নিল। বলল, “দিয়ে রাখুন, বিয়ের সময় লাগবে।’
“জেঠুমণির গলার স্বর শুনেই বোঝা যাচ্ছিল, বউদিদের চাপের মুখে উনি বাধ্য হয়েছেন গয়নাগুলো বিলিয়ে দিতে। জেঠুমণির অসহায়তা উপলব্ধি করেও একটু রাগ হচ্ছিল আমার। বললাম, ‘আমারও তো মেয়ে আছে। সে ঠাকুরমার স্মৃতি কিছু পাবে না?’
“জেঠুমণি বললেন, “তোমার প্রতি যে অবিচার হচ্ছে, জানি। কিন্তু কিছু করার নেই আমার। তুমি যদি এ বাড়িতে বসবাস করতে, এত সমস্যা হত না। হিসেবমতো মায়ের বিজনেসের তোমরা তিন ভাই ভাগীদার। বড় ব্যাবসার ভাগ দেবে না। কেননা, ওই নিয়ে সে পড়ে আছে। মেজো ব্যাবসার ভাগ চেয়েছিল, বড় বোধহয় টাকা দিয়ে ম্যানেজ করেছে।”
“আমি বললাম, “তার মানে যা দাঁড়াল, মায়ের সম্পত্তির উপর কোনও অধিকার আমার রইল না! তা হলে আপনি আমাকে ডেকে পাঠালেন কেন?”
“উত্তরে জেঠুমণি বলেছিলেন, ‘আইন অনুযায়ী অধিকার তোমার আছে। সেই অধিকারটাও ছেড়ে দেওয়ার জন্য তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি।’
“আমি তো অবাক! এ কী অদ্ভুত পরিস্থিতি! আমাকে বঞ্চনা করা হচ্ছে, সেটা মাথা পেতে মেনে নিতে হবে আমাকে? আমার হতাশ মুখ দেখে জেঠুমণি বলতে থাকলেন, ‘দ্যাখো আবির, তুমি হচ্ছ বাবা-মায়ের সুযোগ্য সন্তান। তুমি শিক্ষিত, প্রোফেসর। গাড়ি, ফ্ল্যাট সবই আছে। তোমার কী দরকার মায়ের সম্পত্তির? তোমাকে নিয়ে আমার কত গর্ব জানো!’
“আমি বললাম, ‘আপনি তা হলে বলতে চাইছেন, ভাল পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোটাই আমার অপরাধ হয়েছে? সেই জন্যেই আমি সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হলাম?’
“আমার কথা শুনে জেঠুমণি আরও বিমর্ষ হয়ে পড়লেন। একটু সময় নিয়ে মন খারাপের গলায় বলতে লাগলেন, ‘তোমাকে বঞ্চিত করার কোনও অভিপ্রায় আমার নেই! আমি চাইছি তোমাদের ভাইদের মধ্যে সম্পর্কটা যেন ভাল থাকে। তাই আমি বলি কী, সম্পত্তি ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে আজ রাতে যে মিটিং-এ বসব, তুমি সেখানে সকলকে জানিয়ে দেবে, এই সম্পত্তির সমস্ত অধিকার তুমি ছেড়ে দিচ্ছ।’
“আমি বললাম, ‘এ-কথা তো আমি ফোনেও জানিয়ে দিতে পারতাম। খামোখা এখানে ডেকে আনলেন কেন?’
“জেঠুমণি বললেন, “শুধু মুখে বললে তো হবে না। উইলে সইসাবুদেরও ব্যাপার আছে। তোমার আসাটা তাই জরুরি ছিল। তা ছাড়া তোমার এই বদান্যতা দেখে, বাড়ির মানুষগুলো তোমার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে। তুমি যে সত্যিই মানুষের মতো মানুষ হয়েছ, সেটা প্রমাণ হবে আবার।’
“জেঠুমণি যে ঠিক কার হয়ে কথা বলছেন, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। উনি কি সত্যিই আমার জন্য গর্বিত, নাকি দাদাদের স্বার্থরক্ষার জন্য ব্যস্ত!?… আমার ভাবনার মাঝে জেঠুমণি বলে উঠেছিলেন, ‘তবে তুমি চিন্তা কোরো না। বংশের একটা গুরুত্বপূর্ণ স্মারক তোমাকে আমি দেব। বিষয়টা গোপন রাখবে তুমি। এ বাড়ির কাউকে বলবে না। আজ মিটিং-এ বসে নিজের সম্পত্তি দাদাদের নামে লিখে দেবে।”
থামলেন আবিরবাবু। প্যাকেট থেকে আবার একটা সিগারেট বার করে দীপকাকুকে অফার করলেন। মাথা নেড়ে না করলেন দীপকাকু। বললেন, “আপনি নিশ্চয়ই জেঠুমণির কথা অনুযায়ী কাজ করলেন?”
সিগারেট ধরালেন আবিরবাবু। ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “হ্যাঁ। ভেবে দেখলাম, জেঠুমণি ভুল কিছু বলছেন না। ওখানকার সম্পত্তি ধরে রাখতে পারব না আমি। দাদাদের সঙ্গে যে ক্ষীণ সম্পর্কটা আছে, সেটা নষ্ট করে লাভ নেই। পরে যখন দেশের বাড়ি আসব, খাতিরযত্ন পাব।”
“আপনি সত্যিই নির্লোভ!” বলে উঠলেন দীপকাকু।
আবিরবাবু হেসে ফেলে বললেন, “না, মশাই। ‘নির্লোভ’ তকমা পাওয়ার লোভটা ষোলো আনা আছে!”
দীপকাকুর ঠোঁটেও হাসিটা সংক্রামিত হল। ফের আবিরবাবু বলতে শুরু করলেন, “পরের দিন ব্যাগ গুছিয়ে বিদায় নিতে গেলাম জেঠুমণির কাছে। তখনই উনি আমার হাতে তুলে দিলেন বিষ্ণুমূর্তিটা। বংশসূত্রে পাওয়া ওই আমার একমাত্র স্মারক। মূর্তিটা আমার চেনা। বাড়ির সকলেই এর অস্তিত্ব জানে। জেঠুমণির ঘরের পাশে ঠাকুরঘর। সেখানেই ছোট্ট সিংহাসনে মূর্তিটা থাকে। গৃহদেবতা আমাকে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে দেখে বেশ অবাক হয়েছিলাম। জেঠুমণিকে বললাম, ‘এটা দিয়ে দিচ্ছেন! রোজ এই মূর্তিটার তো পুজো করেন আপনি?”
“জেঠুমণি বললেন, ‘ক’দিন আর বাঁচব? আমি মরে গেলে ঠাকুর আর পুজো পাবেন না। পেতলের দামেই হয়তো মূর্তিটা বেচে দেবে বাড়ির লোক।’
“আমি তখন বললাম, ঠাকুরঘরে মূর্তিটাকে না দেখতে পেয়ে বাড়ির সকলেই তো খুঁজবে। কী বলবেন আপনি? এদিকে আমাকে বলছেন এটার ব্যাপারে কাউকে কিছু না বলতে!’
“জেঠুমণি বললেন, “ওসব আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেব। তুমি শুধু মূর্তিটাকে সুরক্ষিত রেখো। এটা আসলে তোমার বাবার স্মৃতি। অসম থেকে পালিয়ে আসার সময় ট্রেনে যখন ডাকাত পড়ল, তোমার বাবা আমাকে চুপিচুপি এটা দিয়ে বলেছিলেন, “দিবাকর, মনে হচ্ছে এরা আমাদের নিঃস্ব করে ছাড়বে। এই মূর্তিটা আর আমার পরিবার নিয়ে তুমি পাশের কামরায় চলে যাও। হয়তো আমাকে খুনও করতে পারে ডাকাতরা। আমার স্ত্রী, সন্তানদের দেখো। আগলে রেখো বিষ্ণুমূর্তিটাকে। ছেলেরা বড় হলে মূর্তিটা তাদের দিয়ে বোলো, এই দেবতা আমাদের বংশের সৌভাগ্য বহন করছেন। কত দিন করবেন বলা মুশকিল! যদি তেমন দুর্দিন আসে, বুঝবে, দেবতার ক্ষমতা শেষ হয়েছে। মূর্তিটা যেন ভেঙে খানখান করে দেয় তারা।” তোমার বাবার সঙ্গে ওই শেষ কথা আমার। কত করে বললাম, “বাবু, আমি আপনার পাশেই থাকি। ডাকাতদের সঙ্গে যদি লড়তে হয়, একসঙ্গে লড়ব।” বাবু শুনলেন না। বললেন, “তুমি মরে গেলে কেউ দেখার থাকবে না ওদের।” আবিরবাবু চুপ করে গেলেন।
ঝিনুক বলে উঠল, “তারপর? মূর্তিটা নিয়ে এলেন বাড়ি?”
আবিরবাবু মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন। দীপকাকু ফিরে গেলেন গোড়ার প্রশ্নে, “মূর্তিটা নিয়ে ব্যাঙ্কে গিয়েছিলেন কেন?”
আবিরবাবু বললেন, “নিয়ে যাইনি। ব্যাঙ্ক থেকে মূর্তিটা নিয়ে ফিরছিলাম।”
“বুঝলাম!” বললেন দীপকাকু।
আবিরবাবু বলে যেতে লাগলেন, “প্রায় এক মাস হল, মূর্তিটা পুরুলিয়া থেকে নিয়ে এসেছিলাম। দিনচারেক বাড়িতেই ছিল। মূর্তির সঙ্গে যে কাহিনিটা জড়িয়ে আছে, বলেছিলাম স্ত্রীকে। খুব একটা স্বস্তি বোধ করেনি আমার মিসেস। বলেছিল, এসব অলৌকিক ব্যাপার-স্যাপারে তার বেশ ভয় হয়। মূর্তিটা ব্যাঙ্কের ভল্টে রেখে দেওয়া ভাল। আমিও ভেবে দেখলাম, বুদ্ধিটা মন্দ নয়। মূৰ্তিটা সবচেয়ে সুরক্ষিত থাকবে ব্যাঙ্কের ভল্টে। বাড়ি থেকে চুরি হয়ে যাওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা আছে। ই এম বাইপাসের ধারে ব্যাঙ্কটার ম্যানেজার আমার বন্ধু। বাড়ি থেকে কাছে হয়।”
“ওই ব্যাঙ্কের ভল্টে রাখলেন মূর্তিটা? তা হলে সেখান থেকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসছিলেন কেন?”
দীপকাকুর প্রশ্নের উত্তরে আবিরবাবু নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসলেন। বললেন, “রহস্যের শুরু এখান থেকেই। মূর্তিটা ভল্টে রাখার দিন দশেক পর ম্যানেজার-বন্ধু আমাকে ফোন করল। বলল, ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একবার ব্যাঙ্কে আয়।
“গেলাম। দেখলাম, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখ নিয়ে অমিতাভ বসে আছে চেম্বারে। জানতে চাইলাম, ‘কী হয়েছে?’
“বলল, বিচ্ছিরি একটা সমস্যায় পড়েছি। কী করব ভেবে পাচ্ছি না! চাকরিজীবনে এরকম প্রবলেম আগে কখনও ফেস করিনি!’
“আমি ওকে প্রথমে শান্ত হয়ে সব কথা গুছিয়ে বলতে বললাম। অমিতাভ যা বলল তা হচ্ছে, দু’দিন আগে অফিসে ওর চেম্বারে একটা উড়ো ফোন এসেছিল। ফোনে একটি লোক বলে, ‘ম্যানেজারবাবু, আপনার ব্যাঙ্কে একটা বড়সড় চুরির প্ল্যান তৈরি হয়েছে। আপনাকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্য ফোনটা করলাম।’ অমিতাভ ফোনের ওপ্রান্তের লোকটার পরিচয় জানতে চায়। সে বলে, ‘এখন জানানোর অসুবিধে আছে। পরে এক সময় গিয়ে আলাপ করে আসব। আগে চুরির প্ল্যানটা শুনুন, মূলত আপনাদের ব্যাঙ্কের ভল্ট ভাঙা চোরদের উদ্দেশ্য। কাজটা করবে রাতে। ব্যাঙ্কের সিকিউরিটিম্যান সুরেশ থাপার ছেলেকে অপহরণ করা হবে। ছেলেকে ফেরত দেওয়ার শর্ত থাকবে একটাই, চোরদের ভল্ট পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হবে।’ এতদূর শুনে অমিতাভ বলেছিল, ‘আপনি যে ব্যাঙ্কের এত বড় একটা উপকার করলেন, আপনার স্বার্থ কী?’ উত্তরে লোকটা বলেছিল, ‘আমি দেশের একজন সাধারণ নাগরিক। যে-কোনওভাবেই হোক ওদের প্ল্যানটা জেনে ফেলেছি। আমার কর্তব্য আপনাদের সতর্ক করা। রাখছি, পরে আলাপ হবে…।’ তারপরই ফোনটা কেটে দিয়েছিল লোকটা। ভুতুড়ে কলটাকে প্রথমে মন থেকে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল অমিতাভ। কিন্তু একটা খচখচানি লেগেছিল মাথায়। প্রাথমিক সতর্কতা হিসেবে সে ডেকে পাঠায় সুরেশ থাপাকে। সুরেশ ব্রাঞ্চের রাত-দিনের পাহারাদার। বউ-ছেলে নিয়ে থাকে ব্যাঙ্কবাড়ির একটা ঘরে। অমিতাভ সুরেশকে বলে, ‘তোমার ছেলেকে ক’দিন একটু চোখে চোখে রেখো তো!’ স্বাভাবিক কারণেই সুরেশ জিজ্ঞেস করে, ‘কেন স্যার?’ অমিতাভ তক্ষুনি একটা গল্প বানিয়ে বলে, ‘স্কুলের বাচ্চাদের আজকাল খুব অপরহণ করা হচ্ছে। এই তো দু’দিন আগে আমাদের পাড়ার একটা ছেলেকে কারা যেন তুলে নিয়ে গিয়েছে। তাই বলছিলাম, ছেলের দিকে একটু নজর রেখো।’ ম্যানেজারবাবুর কথায় গুরুত্ব দেয়নি সুরেশ। হেসে বলেছিল, ‘আমরা স্যার গরিব লোক। আমাদের ছেলেকে তুলবে না ওরা। টাকা চাইলে তো দিতে পারব না।’
“সেই সুরেশের চেহারা বদলে গেল পরের দিন। ভয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ঢুকল অমিতাভর চেম্বারে। তখন প্রায় বেলা বারোটা। অমিতাভকে বলল, ‘স্যার, আপনার কথা মিলে গেল। আমার ছেলে স্কুলবাসের জন্য দাঁড়িয়ে ছিল বড় রাস্তায়। একটা বাইক এসে থামে ওর সামনে। বাইকের লোকটা ছেলেকে বলে, ‘চলো, স্কুলে পৌঁছে দিই।’ ছেলে রাজি হয়ে যায়। বাইক চড়তে খুব ভালবাসে যে! লোকটা ওকে নিয়ে যখনই স্কুলের রাস্তার বদলে অন্য রাস্তা ধরল, চেঁচাতে শুরু করে দেয় ছেলে। রাস্তায় তখন অনেক লোকজন। তারপরই লোকটা আমার ছেলেকে বাইক থেকে নামিয়ে পালিয়ে যায়।’ গোটা ঘটনা বলার পর সুরেশ অমিতাভকে বলে, ‘আপনি স্যার নিশ্চয়ই জানতেন, এরকম কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। না হলে গতকাল আপনি কেন আমাকে বললেন ছেলেকে চোখে চোখে রাখতে?’ অমিতাভ সুরেশ থাপাকে অনেক করে বোঝায়, এটা নেহাতই একটা কো-ইনসিডেন্ট। ব্যাপারটা মিলে গিয়েছে। তার ছেলেকে নিয়ে এই ধরনের ঘটনা ঘটবে, কোনও আভাস ছিল না অমিতাভর কাছে। সুরেশ থাপা ম্যানেজারের কথা বিশ্বাস করেনি। এক মাসের ছুটি নিয়ে উধাও হয়েছে। এই ঘটনার পর ভীষণ চিন্তায় পড়ে গিয়ে অমিতাভ আমাকে ডেকে পাঠায়। জানতে চায়, এখন ওর কী করা উচিত? ফোনটা ভুয়ো নয়, সে তো বেশ বোঝা যাচ্ছে।”
“বন্ধুকে কী পরামর্শ দিলেন আপনি?” অনেকক্ষণ পরে প্রশ্ন করলেন দীপকাকু।
আবিরবাবু বললেন, “ইউজুয়ালি যা করা উচিত। বললাম, ‘পুলিশকে জানিয়ে দে পুরো ঘটনাটা।’
“আমার যুক্তি মেনে নিল অমিতাভ। বলল, ‘পুলিশের ইনভেস্টিগেশন ভীষণ স্লো। তার আগেই যদি ঘটে যায় কিছু! তুই এক কাজ কর, তোর লকার থেকে জিনিসপত্তর বার করে নিয়ে যা।’
“অমিতাভর সাজেশন মেনে নিলাম। ভল্ট ভাঙার পরিকল্পনাটা আমাকেও একটু ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। বিষ্ণুমূর্তি ছাড়াও আমার স্ত্রীর কিছু গয়নাগাটি লকারে ছিল। চুরির আশঙ্কা আছে জেনেও আমি যদি ওগুলো এখানে রেখে দিই, বিপদ হলে আপশোসের শেষ থাকবে না। ঘটনাচক্রে লকারের যে চাবিটা আমার কাছে থাকার কথা, অফিসব্যাগেই ছিল। কারণ, কিছুদিন আগে বিষ্ণুমূর্তিটা রাখতে এসেছিলাম, বাড়ি ফিরে চাবিটা আলমারিতে তোলা হয়নি। নিয়মানুযায়ী লকারের একটা চাবি ম্যানেজারের কাছে থাকে। আমি আর অমিতাভ লকার রুমে গিয়ে আমার জিনিসপত্তর বার করে নিলাম। তারপর রাস্তায় বেরিয়ে ঘটল ওই ঘটনা।”
থামলেন আবিরবাবু। টানা কথা বলে একটু যেন হাঁপিয়ে গিয়েছেন! দীপকাকু কিন্তু রেস্ট নিতে দিলেন না। বললেন, “তার মানে মূর্তির সঙ্গে আপনার কিছু গয়নাও চুরি গিয়েছে?”
“না, যায়নি। লকারের মধ্যেই গয়নাগুলো সাদা রুমালে বাঁধা ছিল। ওটা আমি জামার ভিতরে নিয়েছিলাম। মূর্তিটা নিয়েছিলাম ব্যাগে।”
নীচের ঠোঁটটা উলটে দীপকাকু বললেন, “এখানে এসে একটা ব্যাপার গুলিয়ে গেল। আপনার ব্যাগ যে চুরি করেছে, তার টার্গেট গয়নার উপর ছিল, নাকি মূর্তির উপর, বোঝা যাচ্ছে না! তবে একটা পজিটিভ সাইড আছে, গয়নাগুলো অন্তত বেঁচে গেল।” একটু থেমে দীপকাকু আবার জানতে চাইলেন, “গয়নার অর্থমূল্য কত হতে পারে?”
“খুব বেশি না। ম্যাক্সিমাম চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ হাজার। তেমন কিছু ছিল না। সুমনার বাপের বাড়ি থেকে পাওয়া একটা সীতাহার, একজোড়া বালা, কিছু আংটি। আমারও বিয়ের আংটি, সোনার বোতাম ছিল। বিশেষ কোনও উৎসব-অনুষ্ঠান উপলক্ষে ওগুলো ব্যাঙ্ক থেকে নিয়ে আসতাম।”
আবিরবাবুর কথা শেষ হয়েছে। দীপকাকুর কপালে পড়েছে গভীর দুটো ভাঁজ। হাত দুটো বুকের উপর জড়িয়ে রেখে তাকিয়ে আছেন মেঝের দিকে। ঝিনুকের এখন একমাত্র টেনশন, কেসটা দীপকাকু নেবেন তো? গোটা ঘটনা শুনে যা মনে হল, যথেষ্ট জটিল সমস্যা। দীপকাকুর পছন্দ হওয়া উচিত।
দীপকাকু চোখ তুললেন। ঝিনুকের মনের কথাই প্রতিফলিত হল ওঁর মুখে, “ইন্টারেস্টিং কেস! এটা সল্ভ করার চেষ্টা করব আমি। এখন অবধি সব শুনে যা বুঝলাম, কেসটা খুব ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায় পড়ে আছে। যোগসূত্র পাওয়া গেছে একটাই। সেটা হল বাইক আরোহী। যে চুরি করেছে আপনার ব্যাগ, অপহরণ করার চেষ্টা করেছে সুরেশ থাপার ছেলেকে।”
দীপকাকুর কথা শেষ হতেই ঝিনুক বলল, “কিন্তু দুটো কাজ যে একই ব্যক্তি করেছে, সেটা নিশ্চিত করে বলা যাবে না।”
“কারেক্ট! তবে দুটো অপরাধের ক্ষেত্রে বাইক ব্যবহার হয়েছে, এই কমন ফ্যাক্টরটা ফেলে দেওয়ার নয়।” বললেন দীপকাকু
আবিরবাবু একবার ঝিনুককে দেখছেন, আর-একবার দীপকাকুকে। বলে উঠলেন, “একটু ইন্টারাপ্ট করছি।” দীপকাকুর দিকে তাকিয়ে বললেন কথাটা। ঝিনুককে আরও একবার দেখে নিয়ে দীপকাকুকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার ভাইঝি কি ইনভেস্টিগেশনে সাহায্য করে আপনাকে? আই মিন, ও কি আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট?”
দীপকাকু বেশ অবাক হলেন। বললেন, “হ্যাঁ। কেন, ও আপনাকে বলেনি?”
“না, সেরকম কিছু বলেনি। বলার মতো সিচুয়েশন ছিল না। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল আমাদের। আপনার কার্ডটা দিয়ে বলেছিল, ‘আমার কাকার সঙ্গে দেখা করতে পারেন।”
দীপকাকু মিটিমিটি হাসছেন। বললেন, “আমার এক সময়ের পাড়াতুতো দাদা, রজতদার মেয়ে ঝিনুক। একপ্রকার জোর করেই আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়েছিল। এখন অবশ্য ওকে এড়ানো মুশকিল। বেশ ক’টা ক্রিটিক্যাল কেসে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছে।”
আবিরবাবু বললেন, “ভাল, খুব ভাল!”
এই ‘ভাল’র মানেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না ঝিনুক। এত অল্পবয়সে একজন পেশাদার ডিটেকটিভের অ্যাসিস্ট্যান্ট হওয়ার জন্য প্রশংসা করছেন, নাকি দীপকাকুর হয়ে সেদিন যে মার্কেটিং (কার্ড দেওয়া) করেছিল, সেটাকে বাহবা দিচ্ছেন?
কী একটু ভেবে নিয়ে দীপকাকু আবিরবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, “চুরির ঘটনাটা কি আপনার ম্যানেজার-বন্ধুকে জানিয়েছেন?”
“না।”
“কেন?”
“জানিয়ে কী হবে? ও তো কিছু করতে পারবে না। মাঝখান থেকে ঘটনাটা জানাজানি হবে। কোনওভাবে যদি কথাটা জেঠুমণির কানে যায়, ভীষণ কষ্ট পাবেন। ভরসা করে জিনিসটা আমাকে দিয়েছিলেন, বিশ্বাসটা রাখতে পারলাম না।” বলে, একটু থামলেন আবিরবাবু। ফের শুরু করলেন, “পৈতৃক সূত্রে জিনিসটা যখন পেয়েছিলাম, খুবই সামান্য মনে হয়েছিল। হারিয়ে যাওয়ার পর বুঝতে পারছি ওটা কত দামি! মা, বাবা দু’জনেই মারা গিয়েছেন। নিজেদের বাড়িতেও থাকি না আমি। ভাগাভাগির পর ওই বাড়িটাও রইল না আমার। বিষ্ণুমূর্তিটাই ছিল আমার একমাত্র পারিবারিক পরিচয়। ওটা চুরি যাওয়ার পর থেকে নিজেকে শিকড়হীন বিচ্ছিন্ন এক মানুষ মনে হচ্ছে।”
আবিরবাবুর অনুভূতিটা ঝিনুককে বেশ স্পর্শ করল। দীপকাকুর যেন বিকার নেই! কেজো গলায় জানতে চাইলেন, “ভল্ট লুটের চক্রান্তটা আপনার বন্ধু কি পুলিশে জানিয়েছেন?”
“বলতে পারছি না। সেই যে ব্যাঙ্ক থেকে মূর্তিটা নিয়ে বেরিয়েছিলাম, তারপর আর ওর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি।”
আবিরবাবুর কথার পর দীপকাকু মাথা নিচু করে কী যেন একটু ভেবে নিলেন! মুখ তুলে বললেন, “ঠিক আছে। আমাদের ইনভেস্টিগেশন শুরু হবে ব্যাঙ্ক থেকে। কাল বিকেল পাঁচটায় ব্যাঙ্কের সামনে থাকবেন। আমি পৌঁছে যাব।”
আবিরবাবু একটু সংকোচের সঙ্গে বললেন, “আপনার অ্যাডভান্সের অ্যামাউন্টটা যদি বলেন, কালই চেকটা দিয়ে দেব।”
“আপনার ইচ্ছেমতো কিছু দেবেন।” বললেন দীপকাকু। হঠাৎ এই উদারতায় ঝিনুক যথেষ্ট বিস্মিত হল।
“ঠিক আছে।” বলে, দরজার দিকে ঘুরে গেলেন আবিরবাবু।
ঝিনুক বলল, “আপনার কন্ট্যাক্ট নম্বরটা দিয়ে রাখুন, নেওয়া ছিল না।”
আবিরবাবু নিজের কার্ড ঝিনুককে দিয়ে পায়ে পায়ে ঘর ছাড়লেন।
ঝিনুক এবার দীপকাকুর দিকে ফিরল। এ কী, উনি যে আবার উঠে গেছেন বোর্ডের সামনে! মনোনিবেশ করেছেন আগের সেই অঙ্কে। ঝিনুকের কেন জানি মনে হল, আবিরবাবুর কেসটায় যথাযোগ্য গুরুত্ব দিচ্ছেন না দীপকাকু। কিন্তু কেন? প্রশ্নটা ঘুরিয়ে তুলল ঝিনুক, “অ্যাডভান্সের ব্যাপারে হঠাৎ আপনি এত উদার হলেন কেন, ঠিক বুঝতে পারলাম না?”
বোর্ড থেকে মুখ ফিরিয়ে দীপকাকু ঝিনুকের দিকে তাকালেন। ঠোঁটে হালকা হাসি। বললেন, “আবিরবাবুর কেসটা মনে হচ্ছে এই অঙ্কটার চেয়েও সরল। আবার সেটা না-ও হতে পারে। আসলে কেসটার মেরিট আমি এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। তাই টাকাপয়সার ব্যাপারটা ঠিক করা যাচ্ছে না। এমনও হতে পারে, কেসটা আগামী কালই সল্ভ হয়ে গেল!” বলে, দীপকাকু ফের বোর্ডের দিকে ঘুরে গেলেন।
যদি দীপকাকুর প্রত্যাশা সত্যি হয়, ঝিনুক খুব হতাশ হবে। কত দিন পর একটা কেস এল! শুনে তো মনে হচ্ছিল, বেশ জটিল সমস্যা। দীপকাকু কেন হালকা করে দেখছেন, কে জানে! ঝিনুক এবার আসল কথায় এল, “আমিও কাল ব্যাঙ্কের সামনে থাকছি তো?”
“না। চারটের সময় বাড়িতে রেডি থেকো। আমি তুলে নেব। তার আগে একটা হোমওয়ার্ক করতে হবে। আবিরবাবু এখানে যা বলে গেলেন, সবিস্তার নোটবুকে লিখবে। তারপর পয়েন্টআউট করবে, ওঁর কথার মধ্যে কী কী অসংগতি আছে। তোমাদের বাড়ি গিয়ে আমি প্রথমে তোমার নোটবুক দেখব। যদি স্যাটিসফ্যাক্টরি মনে হয় তবেই নিয়ে যাব ব্যাঙ্কে।”
চ্যালেঞ্জ অ্যাকসেপ্ট করল ঝিনুক। বলল, “ঠিক আছে। তাই হবে। আমি তা হলে আসি এখন?”
“এসো!” ঝিনুকের দিকে না তাকিয়েই বললেন দীপকাকু। তখনই ঘরে ঢুকল একটি ছেলে। আগে কখনও না দেখলেও, ঝিনুক চেহারা দেখে নিশ্চিত হল, এই হচ্ছে অর্ণব। অবিকল ভাল স্টুডেন্টমার্কা চেহারা। চোখে চশমা। ঝিনুক আরও একটা বিষয়ে শিয়োর হল, অর্ণবের চশমাটা অচিরেই দীপকাকুর চশমার মতো মোটা কাচের হয়ে যাবে।
“কাকু, অঙ্কটা হয়েছে?” জানতে চাইল অর্ণব।
দীপকাকু এতক্ষণ ওকে খেয়াল করেননি। গলা শুনে বিপুল উৎসাহে ঘাড় ফেরালেন, “আরে, এসো অর্ণব। মিলিয়ে দিয়েছি তোমার অঙ্ক।”
বোর্ডে SIXTY-র নীচে দীপকাকু ঘষঘষ করে লিখলেন, 31486. ঝিনুক মাথামুন্ডু কিছুই বুঝল না। অর্ণব বলল, “কারেক্ট! কী করে পারলেন? আগে কখনও করেছেন এ ধরনের অঙ্ক?”
“না, করিনি। ব্যাপারটা খুবই ইন্টারেস্টিং।”
অর্ণব বলল, “সত্যিই, আপনি জিনিয়াস! দেখি, স্টেপ ওয়াইজ অঙ্কটা কীভাবে করেছেন?”
ঘরে যে আর-একটা প্রাণী, মানে ঝিনুক আছে, দু’জনের কারও খেয়াল নেই! বোর্ডের উপর ঝুঁকে পড়েছেন দু’জনেই। অর্ণবের সঙ্গে আলাপ করানোর সৌজন্যটুকু দেখাচ্ছেন না দীপকাকু। খুবই অপমানিত বোধ করছে ঝিনুক। অনাহূত মনে হচ্ছে নিজেকে। খুব একটা রেগেও উঠতে পারছে না। অদ্ভুত একটা আশঙ্কা ঘিরে ধরছে তাকে। দীপকাকু বোধহয় অর্ণবকেই সহকারী হিসেবে বেছে নেবেন এবার থেকে। অর্ণবের তুলনায় ঝিনুক খুবই সাধারণ বুদ্ধির মেয়ে। গলা ভারী হয়ে আসছে। বাই এনি চান্স চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে, সেই ভয়ে ঝিনুক তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে শুনতে পেল, দুই অঙ্কবিদের হাসি। সামনে অঙ্ক নিয়ে মানুষ কী করে যে হাসে, কে জানে!
