৩
পরের দিন সকালে ঝিনুককে বারবার ফোন করতে যেতে এবং সঙ্গে সঙ্গে ফেরত আসতে দেখে বাবা জানতে চান, “কী ব্যাপার রে, কাকে সেই থেকে ট্রাই করছিস?”
অস্থির পায়চারি করতে করতে ঝিনুক বলে, “আর বোলো না, দীপকাকু কাল বিকেল থেকে মোবাইল অফ করে রেখে দিয়েছে। এদিকে আমাকে বলেছে, টোটাল অবজারভেশন এবং তার থেকে যা আইডিয়া হচ্ছে লিখে জানাতে। লেখার সময় দরকার পড়ছিল দীপকাকুকে কন্ট্যাক্ট করার, ডায়াল করলেই বলছে সুইড অফ। এখনও একটা ইনফরমেশন নেওয়া বাকি।”
বাবা আক্ষেপের সুরে বলেন, “তুই তো আমারও ক্ষতি করে দিয়েছিস। কালও দাবা খেলতে আসেনি দীপঙ্কর। আজও মনে হয় আসবে না। ওরকম একটা ট্যালেন্টেড প্লেয়ারের মাথায় কেউ ওইসব বাজে ঝামেলা ঢোকায়, ঘরে তালা দেওয়া অথচ ভিতরে সব ওলটপালট! সব জানবি পুরনো বাড়ির ভূতের কাণ্ড!”
বাবার সহজ সমাধান শুনে হেসে ফেলে ঝিনুক। মনটা একটু হালকা হয়ে যায়। বাবা বলেন, “শোন, তোকে একটা টিপস দিই। ফোনে কাউকে পেতে হলে ফোনসেটের সামনে গিয়ে মনে মনে তার চেহারাটা একবার চিন্তা করবি। যদি নির্ভুল হয়, কানেকশন তুই পাবিই।”
ঝিনুক জানে, এটা বাবার ফ্রেশ হোমমেড কুসংস্কার। বাবা নিজেই এখনও ব্যবহার করেননি। তবু কেন জানি এই সময় বাবাকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে। ফোনস্ট্যান্ডের সামনে গিয়ে চোখ বুজে মনে মনে দীপকাকুর চেহারাটা একবার কল্পনা করে ঝিনুক। অদ্ভুত একটা ছবি ভেসে ওঠে, দীপকাকুর চশমার একটা কাচ দূরবিনের মতো সুচালো, অন্যটা আতশ কাচ। এক হাতে ঝুলছে ইঞ্চি ফিতে, অন্য হাতে জ্বলন্ত টর্চ। চুল উসকোখুসকো। পকেটের মোবাইলটা বিদঘুটে শব্দে বাজছে।
“ধুত্তেরি!” বলে, রিডায়াল সুইচ টিপে দেয় ঝিনুক। এবং কী আশ্চর্য, ওপারে রিং হচ্ছে! কেটে না দেন, কেটে না দেন, কথাটা মনে মনে আওড়াতে থাকে ঝিনুক।
অবশেষে ফোন ধরলেন দীপকাকু, “হ্যাঁ, বলো!”
ঝিনুক বলল, “আমার সব লেখা হয়ে গেছে। শুধু একটা ইনফরমেশন চাই। আপনার বন্ধু কী বলছে, সামনের দুটো বাড়িতে কোনও নতুন লোক এসেছে?”
“না। তুমি যা-যা লিখেছ, তার থেকে শুধু অনুমানগুলো ছোট করে বলো।”
“একটু ধরুন, বলছি।” বলে, ফোনসেটের পাশে রাখা নিজের হাতে লেখা চিরকুটটা তুলে ধরে ঝিনুক। ফোনের ওপ্রান্তে গাড়ির হর্ন, হাতে-টানা রিকশার টুংটাং। দীপকাকু এখন তার মানে রাস্তায়। ঝিনুক বলল, “শুনুন, নম্বর ওয়ান, দুষ্কৃতী কোন কায়দায় ঘরে ঢুকেছিল বোঝা যাচ্ছে না। ঘরে ক’জন ঢুকেছিল এখনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গয়নাগাটি অথবা অন্য কিছুর উপর তার বা তাদের কোনও আগ্রহ ছিল না। দুটো ঘরের কিছুই খোয়া যায়নি। তা হলে কী নিতে এসেছিল?
“পয়েন্ট টু, বাড়ির কাজের লোকেদের অবিশ্বাস করা যাচ্ছে না। ড্রাইভার রঘুকে তো নয়ই। ঘটনার সময় সে অপরাজিতা দেবীর সঙ্গে ছিল। বাকি দু’জন বয়স্ক এবং বিশ্বস্ত। তিনজনের এখন পর্যন্ত কাজে কোনও ব্যাড রেকর্ড নেই।”
ওপাশ থেকে দীপকাকু বললেন, “আত্মীয়স্বজন, মানে শ্রবণার বাবা-মা? অপরাজিতা দেবীর অন্য দুই কন্যা-জামাই?”
“তাঁদের আমি চিনি না। তবে শ্রবণার বাবা-মা কিছুতেই অপরাজিতা দেবীকে লাইফ থ্রেটনিং চিঠি দেবেন না। ওঁদের আমি চিনি।”
“মানুষকে চেনা অত সহজ নয়। তবু বলে যাও।” অপর প্রান্ত থেকে বললেন দীপকাকু।
ঝিনুক বলল, “থার্ড পয়েন্ট, নীচের গেস্টরুম নিয়ে যথেষ্ট জটিলতা থাকলেও, অপরাজিতা দেবীর বিপদের সঙ্গে তেমন কোনও সম্পর্ক নেই। ব্যস, এইটুকু! আর একটা ছোট্ট খটকা আছে আপনার ইনভেস্টিগেশন নিয়ে।”
“যেমন?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।
ঝিনুক বলল, “আপনি শোওয়ার ঘরটা আবার ওলটপালট করতে বললেও, ড্রইংরুমটা বলেননি। কেন?”
“কারণ, শোওয়ার ঘরে আলমারি, বই, পেন্টিং,… এরকম বিভিন্ন ধরনের জিনিস ছিল। সেগুলো কীভাবে ঘাঁটা হয়েছে দেখে বোঝা যাবে দুষ্কৃতী কোন ধরনের জিনিস খুঁজছিল। ড্রয়িংরুমে আইটেম কম। সেখানে যা আছে, শোওয়ার ঘরেও ছিল। বাড়তি খাটনি হত আমাদের।” বলে, একটু থামলেন দীপকাকু। সেই ফাঁকে ওপারের ফোনে ঝিনুক শুনতে পেল কিছু লোকের গলার আওয়াজ। দীপকাকু ফের বললেন, “তোমার অবজারভেশন অত্যন্ত সাধারণ মানের। এই কেসটায় তুমি তেমন কিছু হেল্প করে উঠতে পারবে না। কম্পিউটার ক্লাস, আড্ডা এসব নিয়েই তোমার থাকা ভাল। রজতদাকে বোলো, দিনচারেকের মধ্যে প্রবলেমটা সল্ভ করে, আবার দাবা খেলতে যাব। ছাড়ছি।”
যথেষ্ট অপমানজনক মন্তব্য। অন্য সময় হলে নির্ঘাত কেঁদে ফেলত ঝিনুক। কিন্তু এখন তার মুখে অদ্ভুত খুশির ভাব। রিসিভার রেখে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, বাবা বললেন, “কী ব্যাপার, হাসছিস যে বড়!”
ঝিনুক বলল, “আমি আশুদাকে নিয়ে এক্ষুনি বেরচ্ছি। তুমি আজকেও ট্যাক্সি নিয়ে অফিস যেয়ো।”
“সে তো বুঝলাম। কিন্তু যাচ্ছিস কোথায়? তা ছাড়া মা-কে বলবি তো!”
“দীপকাকুর কাছে যাচ্ছি। তুমি মা-কে ম্যানেজ দিয়ো।” বলে, পা টিপে বেরিয়ে যায় ঝিনুক।
.
আধঘণ্টার মধ্যেই ক্রিক রো পৌঁছে গেল ঝিনুক। শ্রবণার দিদার বাড়ির বেশ কিছুটা আগে আশুদাকে গাড়ি রাখতে বলে নেমে আসে। ওই বাড়ির পাঁচিল-লাগোয়া চা-দোকান লক্ষ করে এগিয়ে যায়। অস্থায়ী চালার নীচে সার দেওয়া বেঞ্চ। সেখানে ইতস্তত কিছু লোক বসে আছে। ঝিনুকের মতো ইয়াং স্মার্ট মেয়েকে এই টাইপের দোকানে ঢুকতে দেখে কাস্টমারদের চোখে বিস্ময়।
চা বানানো মুলতুবি রেখে দোকানি বলল, “বলুন দিদিভাই, কী চাই এখানে? কাকে খুঁজছেন?”
ঝিনুকের চোখের তারা এখন চারপাশে ঘুরছে, ভুল হয়ে গেল না তো? তখনই চোখে পড়ল, চা-দোকানের শেষে বাইরের দিক করে বসে থাকা একজন নিউজ পেপারে মুখ ঢাকছে। দোকানির কথার জবাব না দিয়ে ঝিনুক পেপার ঢাকা লোকটার সামনে গিয়ে বলল, “দীপকাকু, আমি এসে গেছি।”
মুখের সামনে থেকে পেপারটা নামিয়ে রাখল যে, তাকে দেখে মুহূর্তের জন্য বুকটা ধক করে ওঠে, দাড়ি-গোঁফ পাঞ্জাবিতে লোকটা কে? পরক্ষণেই দীপকাকুর হাসি চিনতে পেরে আশ্বস্ত হয় ঝিনুক। তার মানে ছদ্মবেশ। চশমার ফ্রেমটাও অন্যরকম। দীপকাকু বললেন, “বোসো। আমি জানতাম তুমি বুঝতে পেরে চলে আসবে।”
টেবিলে মুখোমুখি বসতে বসতে ঝিনুক বলল, “অমনি আপনি জানতেন, না? বলুন তো কী করে বুঝলাম আপনি এখানে?”
“ওইটুকু গ্রে ম্যাটার মাথায় না থাকলে, তুমি প্রতি বছর ভাল মার্কস নিয়ে ক্লাসে উঠতে পারতে না। আমার টেলিফোনে তুমি গাড়ির আওয়াজ পাচ্ছিলে, রিকশার ঘণ্টি শুনে আন্দাজ করলে পুরনো কলকাতার গলি। আশেপাশে মানুষের গলার আওয়াজ পেয়ে বুঝলে, রাস্তার পাশেই কোনও দোকানে ঢুকেছি। লাস্ট অফ অল ব্লান্ডার করল ওই মাইকের কেত্তন। হঠাৎ শুরু হল ওটা। তুমি আগের দিন জেনেছিলে শিবরাত্রির ক’দিন প্রায়ই মাইক বাজিয়ে নামগান করে ওরা।”
ঝিনুক খুব হাসে। বলে, “তা হলে মানছেন তো, কিছু যোগ্যতা আছে। এবার বলুন, কেন এখানে, এরকম ছদ্মবেশে বসে আছেন?”
“বলছি, তোমার কিন্তু এরকম আগের দিনের ড্রেসে হুট করে চলে আসা ঠিক হয়নি। যাদের ওয়াচ করছি, সতর্ক হয়ে যাবে।”
দীপকাকুর কথা শুনে নিজেকে অপরাধী লাগে ঝিনুকের। বলে, “আশুদাকে দূরে গাড়ি লাগাতে বলেছি। কাদের ওয়াচ করছেন আপনি?”
“ওরে বাবা, আবার গাড়ি নিয়েও এসেছ!” হতাশ সুরে বললেন দীপকাকু।
মিয়ানো গলায় ঝিনুক বলল, “কাদের ওয়াচ করছেন বলুন না?”
এই সময় দু’জনের মাঝে টেবিলে চায়ের গ্লাস রাখল দোকানি। দীপকাকুর দিকে তাকিয়ে বলল, “দিদিভাই যে আপনার লোক বুঝতেই পারিনি!” তারপর ঝিনুককে বলল, “সরি, কিছু মনে করবেন না। চা দেব নাকি আপনাকে?”
ঝিনুক মাথা নাড়ে। দোকানি চলে যায়। ঝিনুক বলে, “দোকানদার আপনাকে আগেই চিনত নাকি?”
“না, আজ সকালেই আলাপ। পুলিশের লোক বলে জানে। পুলিশের এত অল্পবয়সি অ্যাসিস্ট্যান্ট হয় না বলেই তোমাকে সন্দেহ করেছিল।”
কথার ঝোঁকে দীপকাকু অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে তাকে মেনে নিচ্ছেন দেখে মনে মনে আহ্লাদিত হয় ঝিনুক। আগের প্রসঙ্গ ফিরিয়ে দিয়ে বলে, “বললেন না তো, কাদের ওয়াচ করছেন?”
“ওবাড়ির সবাইকে। কে কখন বেরচ্ছে, ঢুকছে। কোনদিকে যাচ্ছে, আসছে, সব। একটু আগে অপরাজিতা দেবীর অন্য এক মেয়ে স্বামী, পুত্রকন্যা সমেত গাড়ি করে ঢুকল।”
“আপনার সন্দেহের তিরটা বারেবারেই কেন অপরাজিতা দেবীর মেয়েদের দিকে যাচ্ছে? তেমন যদি কিছু জিনিস থেকেই থাকে, অপরাজিতা দেবী নিজে জানবেন, মেয়েরাও জানবে। মায়ের মৃত্যুর পর জিনিসটা তাদেরই হবে। এমনকী মায়ের সঙ্গে তাদের যা সম্পর্ক, মৃত্যু অবধি অপেক্ষা করতে হবে না। চাইলেই পেয়ে যাবে। কিন্তু আসল কথা হল, জিনিসটার অস্তিত্ব আদৌ আছে কি না?”
রাস্তার দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক গলায় দীপকাকু বললেন, “আছে। এমন হতেই পারে জেনেও না-জানার ভান করে যাচ্ছেন অপরাজিতা দেবী।
“কারণ?” জানতে চাইল ঝিনুক।
“জিনিসটা হয়তো বেআইনি কিছু। সেই কারণেই উনি পুলিশকে এড়িয়ে যাচ্ছেন।”
“ওরে বাবা, আপনি দেখছি খোদ মক্কেলকেই সন্দেহ করছেন!” বলল ঝিনুক।
দীপকাকু বললেন, “সন্দেহের তালিকার বাইরে আমি কাউকেই রাখছি না। যেমন, আশেপাশের বাড়ির উপর আমার সমান নজর আছে। একটা বিষয় তুমি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ, হুমকির চিঠি পেয়েও অপরাজিতা দেবী তেমন ভয় পেয়ে যাননি। আমার ধারণা, চিঠি কে দিচ্ছে উনি জানেন। এবং এ-কথাও জানেন, প্রেরক যতই হুমকি দিক, খুন করবে না। এক্ষেত্রে মেয়েদের কথাই প্ৰথমে মনে আসে। আমার ধারণা পাশের দুটো বাড়ির সঙ্গে মেয়েদের যেহেতু পুরনো পরিচয় আছে, নীল শাড়ি পরে মা কখন বারান্দায় দাঁড়ায় দেখার জন্য মেয়েরাই দু’বাড়ির কাউকে ফিট করতে পারে।”
কেসটা এবার সত্যিই ভীষণ জটিল মনে হচ্ছে ঝিনুকের। কেন জানি অপরাজিতা দেবীর মেয়েদের অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে না। যেন মেয়েদের পক্ষ নিয়েই ঝিনুক বলে ওঠে, “মেয়েরা যখন জানে জিনিসটা বেআইনি, তবু তারা পেতে চায়। এবং সেটা অপরাজিতা দেবী নিজেও বুঝতে পারছেন, তা হলে তিন মেয়েকে ভাগ করেই দিতে পারেন জিনিসটা।”
উত্তরে দীপকাকু বললেন, “কেসটার এটাই কেন্দ্রবিন্দু। তুমি মোটামুটি ঠিক জায়গায় এসে পৌঁছেছ। কথা হচ্ছে, বস্তুটি এমন কিছু, যা টুকরো করা যায় না, মানে সোনার তাল, হিরের হার এসব কিছু নয়। জিনিসটা বিক্রি করতে গেলে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। কোনও এক জামাইকেও বিশ্বাস করে জিনিসটা বিক্রি করতে দিতে পারছেন না অপরাজিতা দেবী। আবার এটাও হতে পারে, জিনিসটা তিনি বিশেষ কারণে আড়ালে রাখতে চাইছেন। বিক্রি করার ইচ্ছেই নেই।”
উলে ফাঁস লেগে গেলে যেমন হয়, ঝিনুকের মাথার অবস্থা এখন তেমনই। চা শেষ করে দীপকাকু এখন উদাসভাবে সিগারেট ধরিয়েছেন। ঠিক যেন নন্দনচত্বরে বসে থাকা কোনও কবি। ঝিনুক এখন নন্দন লেকের অগাধ জলে। কিছুক্ষণ এভাবে কাটার পর ঝিনুক লক্ষ করে দীপকাকুর ভ্রু দুটো ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। সিগারেটটা মাটিতে ফেলে উঠে দাঁড়ালেন দীপকাকু। তারপর আচমকা বেঞ্চ ডিঙিয়ে সোজা রাস্তায়। দীপকাকুর গতিবিধি লক্ষ করতে গিয়ে ঝিনুকের চোখে পড়ে আর-একজনকে। একটু দূরে হেঁটে যাচ্ছে অপরাজিতা দেবীর ড্রাইভার রঘু। একটু আগেই ক্রস করেছে চায়ের দোকান। তারপরই দীপকাকু বাইরে যান।
ঝিনুক নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে আসতে গিয়ে দেখে, দীপকাকু অনেকটা দূরত্ব রেখে ফলো করছেন রঘুকে। ঝিনুক চা-দোকানের বাইরে আসে। এখন দীপকাকুর পাশে যাওয়া ঠিক হবে না। কাজের ব্যাঘাত হবে। রঘু একবার ঘাড় ফেরাল পিছনদিকে। ঝট করে মুখ ঘুরিয়ে হাঁটার গতিমুখ অন্যদিকে করে নিলেন দীপকাকু। রঘু তার মানে অন্যায় কোনও কাজ করতে যাচ্ছে, তাই পিছন ফিরে দেখে নিচ্ছে কেউ নজর রাখছে কিনা।
বেশিদুর গেল না রঘু। রাস্তার পাশে একটা টেলিফোন বুথে ঢুকে পড়ল। বুথের কাচের দরজা দিয়ে রঘুকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ঝিনুক। ডায়াল করার আগে রঘু আর-একবার পিছনে ফিরল। মাথা নিচু করে বুথের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন দীপকাকু। কিন্তু কাছাকাছি যাচ্ছেন কেন? রঘু তো চিনতে পেরে যাবে। যদিও দীপকাকু এখন ছদ্মবেশে, এই যা ভরসা। ঝিনুক টের পায়, উত্তেজনার বশে তার ঘন ঘন শ্বাস পড়ছে। দীপকাকু একদম কাচের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। পকেট থেকে নোটবুক বের করে কী যেন লিখছেন! দীপকাকু দ্বিতীয়বার কাচের দরজার উপরে তাকাতেই ঝিনুক বুঝতে পারে, ডিজিটাল বোর্ড থেকে রঘু যাকে ফোন করছে, তার নম্বরটা লিখে নিচ্ছেন দীপকাকু। ঝিনুকের বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা এবার লাফাতে শুরু করেছে, খালি মনে হচ্ছে এগিয়ে যায়। অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত রেখেছে। সে তো ছদ্মবেশে নেই।
মিনিটখানেকের মধ্যে ঘটনাটা ঘটে গেল। দীপকাকু নম্বর লিখে নোটবুকটা পকেটে রাখতে যাবেন, বেরিয়ে এল রঘু। ও বোধহয় দেখে নিয়েছে দীপকাকু নম্বর লিখেছেন। প্রথমে ঝাঁজিয়ে প্রশ্ন করল দীপকাকুকে। তারপর সম্ভবত ছদ্মবেশের আড়ালে আসল মানুষটিকে চিনে ফেলে সজোরে ধাক্কা মেরে ছুটতে লাগল।
ব্যাপারটা বুঝতে যা একটু সময় লেগেছে, ঝিনুকও ছুটতে শুরু করেছে রঘুকে লক্ষ করে। স্প্রিন্ট সে খারাপ টানে না। স্কুলে ফার্স্ট অথবা সেকেন্ড প্রাইজ বাঁধা ছিল। ক্রমশ দূরত্ব কমছে রঘুর সঙ্গে। দৌড়তে দৌড়তে রঘু একবার পিছনে ফিরল, অনুসরণকারী পালটে গেছে দেখে, একটু থতমত খেয়ে দৌড় শুরু করল ফের। ফলে দূরত্ব আরও কমল। রঘুও খারাপ দৌড়য় না। দীপকাকু এখন কী অবস্থায়, কে জানে! যেমন বিচ্ছিরিভাবে ধাক্কা মেরেছে, যদি মারাত্মক কোনও আঘাত পান! কানের পাশ দিয়ে গরম হাওয়া ছুটে যাচ্ছে। পথচারীরা এই দৃশ্য দেখে নিশ্চয়ই থমকে গেছে। ঝিনুকের কোনও হুঁশ নেই। সে শুধু রঘুর ঘাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে, দূরত্ব আর একটু কমে গেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু একটু যেন তফাত থেকেই যাচ্ছে। অবশেষে ক্যারাটে ক্লাব থেকে শেখা প্রাথমিক একটা স্ট্রোক মারে ঝিনুক, দৌড়তে দৌড়তে উড়ে গিয়ে বাঁ পা বাড়িয়ে দেয়।
যা আশা করেছিল, তার চেয়ে একটু বেশিই হল। হুড়মুড়িয়ে ফুটচারেক দূরে ছিটকে পড়ল রঘু। ঝিনুকও বিচ্ছিরিভাবে পপাত ধরণীতল। চারদিকে ধুলো উড়ছে। রাস্তায় বসেই ঝিনুক বুঝতে পারে, কী বোকার মতো কাজ করল। রঘুর দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়ে তাকে পালাতে সাহায্য করে ফেলল। রঘু মাটি থেকে উঠে বাঁ পাশের একটা গলিতে উধাও হয়ে গেল।
ঝিনুকের উঠে দাঁড়াতেই বেশ কষ্ট হচ্ছে। ভীষণ জ্বালা করছে ডান হাতের কনুই। ভালই লেগেছে মনে হচ্ছে।
কোনওক্রমে উঠে দাঁড়াতেই ঝিনুক দেখে, তাকে ঘিরে ছোটখাটো ভিড় তৈরি হচ্ছে। কেউ জিজ্ঞেস করছে, কী হয়েছিল, ওভাবে তাড়া করছিলে কেন? কেউ জানতে চাইছে, ছিনতাইবাজ কি না? সবার কথাই অসহ্য ঠেকছে ঝিনুকের কাছে। এ সময় যে মানুষটার সবচেয়ে আগে আসা দরকার, তাঁর দেখা নেই। তাঁর ইনজুরি কী সিরিয়াস! আশুদাই-বা কোথায় গেল? নিশ্চয়ই গাড়িতে বসে ঘুমোচ্ছে।
ডান হাতের কনুইটা কতটা জখম হল দেখতে গিয়ে ঝিনুক টের পায়, ব্যাপারটা বেশ কঠিন। ভিড়ের মধ্যে কোনও একজন বলে, “এঃ, অনেকটা কেটে গেছে। রক্ত বেরচ্ছে।”
লোকটার কথার সঙ্গে সঙ্গে বাঁ হাতটা ডান কনুইয়ে চলে যায়। আঙুলে ভেজা ভেজা ঠেকে। এই প্রথম ভয় পেয়ে যায় ঝিনুক। মা-কে কী উত্তর দেবে!
তখনই কে যেন ঝিনুকের হাত ধরে টান মারে! ঘুরে তাকাতেই দেখে, দীপকাকু। চেহারায় কোনও আঘাতের চিহ্ন নেই। ঝিনুকের কনুইয়ের উপরটা ধরে হাঁটতে শুরু করলেন। পিছন পিছন ভিড়টা আসছে দেখে, লোকগুলোকে ধমকে উঠলেন, “কী হল, আপনারা কেন? যান, যে যার নিজের কাজে যান।”
খুবই হতাশ হল কৌতূহলী জনতা। ধমকের চোটে মানে মানে কেটে পড়ল। খুঁড়িয়ে হাঁটছে ঝিনুক। একটু এগোতেই পাওয়া গেল কর্পোরেশনের কল। অহরহ জল পড়ে যাচ্ছে। দীপকাকু হাত ছাড়েননি, সোজা জলের নীচে গিয়ে ধরলেন ঝিনুকের কনুই। চিরচির করে কাটা জায়গাটা ফের জ্বলে উঠল। ফিরে এল অভিমান। ঝিনুকের বলতে ইচ্ছে করছিল, “কোথায় ছিলেন এতক্ষণ?” কিন্তু গলা আটকে আসছে। উলটে দীপকাকু বলে উঠলেন, “অযথা দৌড়তে গেলে, ওকে ধরা যেত না।”
“কেন?” রাগের সুরে জানতে চায় ঝিনুক।
হাতটা ছেড়ে দিয়ে দীপকাকু বললেন, “রঘুও ভাল অ্যাথলিট। ওর ঘর সার্চ করার সময় দু’-চারটে মেডেল দেখেছি। আমিও হয়তো ওর সঙ্গে দৌড়ে পারতাম না।”
ঝিনুকের ঠোঁটে বাঁকা হাসি খেলে যায়। মনে মনে বলে, “আপনিও বুঝি ভাল দৌড়ন! জানতাম না তো!”
হাসিটা খেয়াল করেননি দীপকাকু। বললেন, “চলো, ফার্স্টএড আর একটা অ্যান্টি-টিটেনাস ইনজেকশন নিতে হবে।”
.
লেনিন সরণির একটা ওষুধের দোকানে ফার্স্টএড নিচ্ছে ঝিনুক। কম্পাউন্ডার সাদা ব্যান্ডেজ বেঁধে দিচ্ছেন কনুইয়ে। দীপকাকু অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে আছেন রাস্তার উপর। ঝিনুক বলে, “এখন নিশ্চয়ই আমরা অপরাজিতা দেবীর বাড়ি যাব। রঘুর ব্যাপারে সতর্ক করতে হবে।”
“সে পরে গেলেও চলবে। আপাতত ওই বাড়িমুখো হবে না রঘু।”
ঝিনুকের ব্যান্ডেজ বাঁধা হয়ে গেছে। দোকানদার কয়েকটা ওষুধ দিলেন। সম্ভবত পেনকিলার। বিল মিটিয়ে দিলেন দীপকাকু। ঝিনুকরা রাস্তায় নেমে দাঁড়াল। দীপকাকু বললেন, “তোমাদের গাড়িটা কিন্তু আরও ঘণ্টাখানেকের জন্য লাগবে। রজতদার অসুবিধে হবে না তো?”
“হবে না। আমরা এখন কোথায় যাব?” জানতে চায় ঝিনুক।
দীপকাকু বললেন, “লালবাজার।”
“কেন, পুলিশের কাছে কেন? অপরাজিতা দেবী কিন্তু চাইছেন না পুলিশ কেসটাকে হ্যান্ডেল করুক।” শর্তটা খেয়াল করিয়ে দেয় ঝিনুক।
দীপকাকু বললেন, “দরকারমতো পুলিশের সাহায্য নেওয়াই উচিত। অপরাধ দমনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে পুলিশ। তাদের বাদ দিই কীভাবে?”
গোমড়ামুখে হাঁটতে থাকে ঝিনুক। দীপকাকুর কথাটা তার মনে ধরেনি। রহস্যটা তারাই সমাধান করে ফেলবে এরকম একটা ধারণা হয়েছিল। পুলিশের দ্বারস্থ হওয়া মানে, সাফল্য অর্ধেক হয়ে যাওয়া।
দেখতে দেখতে গাড়ির কাছে পৌঁছে গেল ঝিনুকরা, এবং দেখে, সত্যিই পিছনের সিটে শুয়ে দিব্যি ঘুম লাগিয়েছে আশুদা।
.
লালবাজারের ভিতরটা যে এত বড়, কোনও ধারণাই ছিল না ঝিনুকের। সত্যিই কি কোনও এককালে বাজার বসত এখানে? তবে বাজার বলতে যেরকম হইচই বোঝায়, এখানে কিন্তু একদম তা নয়। সবাই ভীষণ সিরিয়াস এবং কর্মব্যস্ত। একসঙ্গে এত পুলিশ, বড় বড় প্রিজন ভ্যান দেখলে যে-কোনও সৎ, সত্যবাদী মানুষও ঘাবড়ে যাবে। নকল দাড়িগোঁফ, চশমার ফ্রেম বদলে দীপকাকু এখন আগের চেহারায়। গাড়িতে আসতে আসতে লালবাজার যাওয়ার কারণটা জানতে চেয়েছিল ঝিনুক। দীপকাকু যা বলেছেন, খুবই রোমাঞ্চকর। ধাক্কা মেরে রঘু পালিয়ে গেলেও দীপকাকু গ্রাহ্য করেননি। রাস্তা থেকে উঠে টেলিফোন বুথে ঢোকেন। রিডায়াল সুইচ টিপতেই ওপারের ফোন বাজে। নম্বরটা মোবাইল ফোনের। ওপ্রান্তের পুরুষকণ্ঠ চাপাস্বরে বলে, “কী হল, আবার ফোন করছ কেন? সব তো বুঝিয়ে বললাম!”
এদিক থেকে কোনও উত্তর না পেয়ে ওপ্রান্তের ফোন অফ হয়ে যায়। এর থেকে বোঝা গেল, কেউ একজন রঘুকে কাজে লাগিয়েছে। ধরেই নেওয়া যায় লোকটা বাঙালি। বাংলা উচ্চারণে কোনও আড়ষ্টতা ছিল না। পরক্ষণেই দীপকাকু বন্ধু রঞ্জনকে ফোন করে লিখে রাখা নম্বরটা দেন। বলেন, মোবাইল ফোনের কোম্পানিতে খোঁজ করতে, কানেকশনটা কার নামে নেওয়া। এসব করতে যা একটু সময় লেগেছিল দীপকাকুর। ততক্ষণে ঝিনুক মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
ঝিনুকরা এখন যে ঘরে এসেছে, সেটা লালবাজার কন্ট্রোলরুম। একসঙ্গে এত ফোন আগে কখনও দেখেনি ঝিনুক। একরাশ ফোন নিয়ে একজন ইনস্পেকটর বসে আছেন। একটা না-একটা ফোন বেজেই যাচ্ছে। আশ্চর্য দক্ষতায় যে ফোনটা বাজছে, সেটাই তুলে ধরছেন ইনস্পেকটর। গুলিয়ে যাচ্ছে না।
ঝিনুকদের দেখে ইনস্পেকটর হাত তুলে ডেকে নিলেন, নিশ্চয়ই রঞ্জনবাবু! ভদ্রলোকের মুখে আড্ডা মারার হাসি। লালবাজারে ইনিই বোধহয় একমাত্র হাস্যমুখ অফিসার। ঝিনুকরা ওঁর টেবিলের সামনে যেতে দীপকাকুর উদ্দেশে বললেন, “কী রে দীপঙ্কর, মুখ দেখে মনে হচ্ছে ভালই প্যাঁচে পড়েছিস। তার উপর পাজামা-পাঞ্জাবি! ছদ্মবেশ নিয়েছিলি?”
বিষণ্নমুখে চেয়ারে বসলেন দীপকাকু। ঝিনুককেও ইশারা করলেন বসতে।
রঞ্জনবাবু বললেন, “অ্যাসিস্ট্যান্টটি তো ভালই পেয়েছিস দেখছি! ইতিমধ্যেই রহস্য অভিযানের ছাপ হাতে পড়ে গেছে।”
ঝিনুক লাজুক হাসল।
দীপকাকু বললেন, “হ্যাঁ, আলাপ করিয়ে দিই। এ হচ্ছে ঝিনুক। আমার পাড়ার এক দাদার মেয়ে। প্রায় জোর করে এই তদন্তে আমাকে সাহায্য করতে নেমে পড়েছে।”
ঝিনুকের বলতে ইচ্ছে করছিল, কেসটা কিন্তু আমিই দিয়েছি। এখানে সেটা বলা মানায় না। ফলে আগের হাসিটাই মুখে ধরে রাখে। দীপকাকু দ্রুত আসল প্রসঙ্গে ফিরে গেলেন। রঞ্জনবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু ট্রেস করতে পারলি?”
“পেরেছি। তবে কাজ হবে না তোর। কানেকশনটা মিথ্যে নামে নেওয়া, রাজেশ সাংভি। অ্যাড্রেসটাও ঝুটো।”
“কোথাকার অ্যাড্রেস?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।
“বউবাজারের ইমপ্রেশন নামে একটা সাইবার কাফের। মালিক একজন ইয়াং ছেলে, সৌগত ভট্টাচার্য। তারও মোবাইল সেট আছে। সেটা অন্য কোম্পানির।” ঝিনুক অবাক হয়ে ভাবে, সত্যি কত তাড়াতাড়ি এত ইনফরমেশন জোগাড় করে ফেলল লালবাজার কন্ট্রোল! পুলিশের উপর ভরসা রাখাই যায় তা হলে। অযথা পুলিশের বদনাম করে লোকে।
কী একটু ভেবে নিয়ে দীপকাকু বললেন, “মোবাইল সেটটা এখন কোথায়, কোন অঞ্চলে আমাদের কল রিসিভ হয়েছিল, বলতে পারছে কোম্পানি?”
“সেটটা এখন কোথায়, ট্রেস করা যাচ্ছে না। কোনওভাবে ডিসকানেক্ট করে দিয়েছে। তবে কাজের লোকটা এবং তুই যখন ফোন করেছিলি, কল রিসিভ হয়েছিল সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ অঞ্চলে।”
ঝিনুক অবাক হয়ে ভাবে, টেকনোলজি কোথায় পৌঁছে গেছে! এর সঙ্গে পাল্লা দিতে গেলে অপরাধীকেও জবরদস্ত হতে হবে। এরই মধ্যে বেশ ক’টা ফোন রিসিভ করলেন রঞ্জনবাবু। মেঝের দিকে তাকিয়ে গভীরভাবে কী যেন চিন্তা করছেন দীপকাকু। হঠাৎ ঘোর ভেঙে রঞ্জনবাবুকে বললেন, “তালতলা থানার ওসি-র সঙ্গে আমার একবার আলাপ করিয়ে দিতে পারবি?”
“তা কেন পারব না! পার্থ ওখানকার ওসি। আমরা একসঙ্গেই পুলিশের চাকরিতে ঢুকেছিলাম। খুব ভাল ছেলে। অনেস্ট পুলিশ অফিসার।” একটু থেমে রঞ্জনবাবু জানতে চাইলেন, “হঠাৎ তালতলা থানা কেন?”
দীপকাকু বললেন, “আমার মক্কেলের বাড়ি ক্রিক রো-তে। তালতলা থানার আন্ডারে। ওসি পার্থকে আমার কাজে লাগবে। যাক, এখন উঠি।”
দীপকাকুর দেখাদেখি ঝিনুকও উঠে দাঁড়ায়। রঞ্জনবাবু ঝিনুককে বললেন, “তোমার ভাল নাম নিশ্চয়ই ঝিনুক নয়?”
“না, আঁখি সেন।”
“বাঃ! সুন্দর নাম। কিন্তু কথা হচ্ছে, এরকম ঝুঁকিপূর্ণ হবি তুমি বেছে নিলে কেন? টাইমপাস করার জন্য আরও কত কিছুই তো ছিল। নাচ, গান, ডিবেট, ফ্যাশন…”
“সেগুলোতে এরকম থ্রিল নেই।” গর্বের সঙ্গে বলে ঝিনুক।
কথার পিঠে দীপকাকু বললেন, “না রে, এটাই ওর লাস্ট চান্স। আর সঙ্গে নেব না। ভীষণ ছটফটে।”
আর একটা ফোন রিসিভ করে রঞ্জনবাবু বললেন, “তুই চিন্তা করিস না। ক’দিন পর ওর গার্জেনরাই আর অ্যালাউ করবেন না। আমাদের দেশে কে আর স্বেচ্ছায় মেয়েকে এসব কাজে ঠেলে দেয়!”
ঝিনুক বলে ফেলে, “আমার মা একটু ভিতু প্রকৃতির হলেও বাবা কিন্তু মোটেই তা নন। বাবা ছিলেন প্যারাট্রুপার। আগ্রায় আকাশগঙ্গা ফ্রন্টের এক্স-কমান্ডার।” কথাটা শুনে বেশ খানিকটা সম্ভ্রম দেখা দিল রঞ্জনবাবুর মুখে। দীপকাকু বললেন, “আমার সেই রজতদাকে দেখলে তুই এখন বুঝতে পারবি না, এককালে কী সাংঘাতিক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল! এখন আয়েশি বাঙালি। ছোটখাটো একটা সিকিউরিটি এজেন্সি আছে। আর দাবা খেলতে খুব ভালবাসে।”
আবার ফোন বেজে ওঠে। সম্ভ্রমের ঘোর নিয়েই রিসিভার তোলেন রঞ্জনবাবু। ইশারায় ‘চলি’ বলে বেরিয়ে আসেন দীপকাকু। ঝিনুক পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই বলেন, “কেসটার পঁচিশ ভাগ এগোতে না-এগোতে এত কনফিডেন্স নিয়ে কথা বলছ!”
মৃদু তিরস্কারের যথার্থতা অনুভব করে ঝিনুক বলে, “সরি।”
.
বাড়ির উদ্দেশে গাড়ি চালিয়েছে আশুদা। থিয়েটার রোড পেরিয়ে গেল। আগের দিনের মতো অফিসে নামলেন না দীপকাকু। স্নান-খাওয়া করে আবার নাকি বেরবেন। ভালই হল ঝিনুকের, মা-কে একা ফেস করতে হবে না।
গাড়িতে যেতে যেতে ঝিনুকের মাথায় একটা প্রশ্ন খোঁচা মারতে থাকে। দীপকাকুকে জিজ্ঞেস করে, “ঘর তছনছের সঙ্গে রঘুর কি কোনও সম্পর্ক ছিল?”
“অবশ্যই ছিল!”
“কী করে? রঘু তো তখন বাইরে, অপরাজিতা দেবীর সঙ্গে।”
দীপকাকু বললেন, “রঘু আগেই ওই বাড়ির চাবি ডুপ্লিকেট করিয়ে রেখেছিল। সাবানে ছাপ নিয়ে অথবা অন্য কোনওভাবে। সারাদিন বাড়ি থাকার সুবাদে যা ওর পক্ষে করা অত্যন্ত সহজ। তারপর সেই ডুপ্লিকেট চাবি তুলে দেয় দুষ্কৃতীর হাতে। এরকম একটা আশঙ্কার কথা আমার মাথায় আগেই এসেছিল। কিন্তু সেটা যে রঘুই করেছে সেটা আন্দাজ করতে পারিনি।”
চিন্তান্বিত মুখে ঝিনুক জানতে চায়, “আর একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না, আপনি কেন রঘুর ব্যাপারটা ওদের বাড়িতে জানাতে দেরি করছেন?”
উত্তরে দীপকাকু বললেন, “আমি চাইছি সামনের কয়েক ঘণ্টায় আরও কিছু ঘটুক। সেই ব্লু নিয়ে আমাকে এগোতে হবে। তুমি বাড়ি গিয়ে প্রথমেই শ্রবণার মোবাইলে একটা ফোন করবে।”
“সে তো আপনার মোবাইল থেকেও করতে পারি।” বলে, ঝিনুক।
“না। আমার মোবাইল থেকে নয়। নম্বরটা দেখে বুঝে যাবে তুমি আমার সঙ্গেই আছ। আমি সেটা চাইছি না। তুমি যেন এমনিই ফোন করেছ ভাব করবে।”
“ফোন করে কী বলব?” জানতে চায় ঝিনুক।
দীপকাকু বললেন, “তোমাকে কিছু বলতে হবে না। ও-ই বলতে শুরু করবে। শ্রবণা এখন দিদার বাড়িতেই আছে।”
“কী করে বুঝলেন?”
“অনুমান। রঘু ফিরছে না দেখে, ওরা অনেকবার আমার মোবাইলে ট্রাই করেছে। সুইচ অফ করে রেখেছি আমি। ব্যস্ততা দেখে বুঝতে অসুবিধে হয়নি অপরাজিতা দেবী ইতিমধ্যেই দুই মেয়েকে বাড়িতে ডেকেছেন। একজন সকালেই এসেছিল। আর শ্রবণারা তো সবসময় ওঁর পাশে থাকছে।” বলে, থামলেন দীপকাকু।
ঝিনুক বলল, “শ্রবণা নিশ্চয়ই প্রথমে ‘রঘু বেপাত্তা’ খবরটা দেবে। তারপর যখন জানতে চাইবে, আপনি কোথায়, কন্ট্যাক্ট করা যাচ্ছে না কেন, তখন কী বলব?”
“বলবে, তুমি কিছু জানো না। তার সঙ্গে আমাকে খুঁজে বের করার আশ্বাস দেবে। তারপর কথায় কথায় ওদের বাড়ির পরিস্থিতি জানবে। কে কে এসেছেন, আসেননি, মেসোমশাইরা কোথায়, সবকিছু।”
ঝিনুক অবাক কণ্ঠে বলল, “আপনি কি এখনও অপরাজিতা দেবীর মেয়েদের উপর থেকে সন্দেহটা সরাতে পারছেন না? রঘুর ঘটনায় তো বোঝাই গেল, বাইরের কেউ এসব করাচ্ছে।”
“সে কতটা বাইরের, এ ব্যাপারে আমার ধন্ধ এখনও কাটেনি। এমন কিছু ব্লু ওই বাড়ি থেকে আমি পেয়েছি, যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কথায় কথায় ঝিনুকদের গেটে পৌঁছে গেল গাড়ি। ঝিনুকের টেনশন শুরু হয়ে যায়। যথেষ্ট বেলা হয়েছে।
কে জানে, মায়ের মুড কেমন!
গেট পেরিয়ে মেন দরজার বেল বাজাতে খুললেন মা। নাঃ, চেহারায় কোনও দুশ্চিন্তার ছাপ নেই। বরং উৎফুল্ল হয়ে জানতে চাইলেন, “কী রে, অ্যাডমিশন হল?”
ঝিনুক ধরতে পারে না, কীসের অ্যাডমিশন! বাবা নির্ঘাত কিছু ভুলভাল বুঝিয়ে রেখেছে। কিন্তু সেটা ঝিনুককে জানিয়ে রাখবে তো! দীপকাকু সামাল দেন, “হ্যাঁ, বউদি, অ্যাডমিশন হয়ে গেছে। কিন্তু যা টাফ কোর্স! তার উপর অতদূর যাওয়া, পারবে?”
পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে দীপকাকু আন্দাজে ম্যানেজ দিচ্ছেন, বাবা দীপকাকুকে ও কিছু বলার সুযোগ পাননি।
মা বললেন, “ও ঠিক পারবে। আমার মেয়ে যথেষ্ট পরিশ্রমী। তা ছাড়া আমার অনেক দিনের ইচ্ছে…”
কথা থেমে গিয়ে মায়ের দৃষ্টি এখন ঝিনুকের কনুইয়ের উপর স্থির। চোখ ক্রমশ বড় হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অটোমেটিক্যালি দু’চোখ বেয়ে জল গড়াতে শুরু করল।
দীপকাকু অপ্রস্তুত। কী বলবেন ভেবে না পেয়ে চটজলদি বলে ফেললেন, “ও কিছু না, বাস থেকে নামতে গিয়ে পা স্লিপ করে রাস্তায় পড়ে গেছে। আমি রিস্ক নিইনি, তক্ষুনি ওষুধের দোকানে গিয়ে অ্যান্টি-টিটেনাস ইনজেকশন দিইয়ে ড্রেস করিয়ে নিয়েছি। আপনি চিন্তা করবেন না। সামান্য ইনজুরি।”
মায়ের চিন্তা করার শক্তি নেই। সোফায় শরীরটা ছেড়ে দেন। অথচ একটু মাথা খাটালেই দীপকাকুর মিথ্যেটা ধরা পড়ে যেত। ঝিনুকরা বেরল গাড়ি নিয়ে, দীপকাকু বলছেন, বাস থেকে পড়ে গেছে। সিলি মিসটেক। যে-কোনও গোয়েন্দার এটা ক্ষমার অযোগ্য ভুল। আসলে বড় বড় চিন্তায় দীপকাকু এতই ব্যস্ত, ছোটখাটো ব্যাপার খেয়ালই করছেন না।
ঝিনুক মায়ের পাশে গিয়ে বসল। পিঠে হাত রেখে সান্ত্বনার ভঙ্গিতে বলল, “কিছু হয়নি মা, সামান্য একটু কেটেছড়ে গেছে। ব্যান্ডেজ বাঁধা দেখে তুমি ঘাবড়ে যাচ্ছ।”
কান্নাভেজা গলায় মা বললেন, “তোর বাবা বলল, তুই নাকি হঠাৎ ঠিক করেছিস গান শিখবি। ভরতি হবি শ্যামবাজারের সুরবিতানে। দীপঙ্করের চেনাজানা আছে, ও-ই নিয়ে গেছে ভরতি করাতে। তারপর থেকে ঠাকুরকে ডাকছি, ভালয় ভালয় যেন অ্যাডমিশন হয়ে যায়। আমার অনেক দিনের শখ তুই গান শিখিস, এত সুন্দর গানের গলা তোর। কিন্তু প্রথম দিনই এসব কী বাধালি!”
কথা অন্যখাতে বইয়ে দেওয়ার জন্যই দীপকাকু বলে উঠলেন, “আচ্ছা বউদি, রজতদা সার্ভিস পিরিয়ডে ওরকম একটা ঝুঁকির কাজ করতেন, প্লেন থেকে প্যারাসুট পিঠে নিয়ে ঝাঁপ দিতেন মাটিতে, তখন কীভাবে মানিয়ে নিতেন আপনি?”
ঝিনুকের অনেকবার শোনা কথাটা মা আবার বলতে শুরু করলেন, “মিলিটারিতে ওর কাজটা ঠিক কী, প্রথম দিকে বুঝতাম না আমি। আমাকে বলত, যুদ্ধে যেতে হয় না। খরা, বন্যা, ভূমিকম্প হলে উদ্ধারকার্যে নামতে হয়। পরে অবশ্য সবই জেনেছিলাম। তাই ছুটিতে এলেই বায়না জুড়তাম, চাকরিটা ছাড়ো। ভাগ্যিস মিলিটারি সার্ভিস বেশিদিনের হয় না। এক্সটেনশন পেয়েছিল, আমি নিতে দিইনি। চাকরি শেষ করে যদি-বা ওর বাবা বাড়িতে থিতু হল, মেয়ের দস্যিপনা দিন দিন বাড়ছে…”
আরও হয়তো কিছু বলতেন মা। ফোন বেজে উঠল। মা বললেন, “ধর। বোধহয় শ্রবণা করেছে। এর আগেও দু’বার করেছিল। আমি দীপঙ্করের জন্য চা করি। তুইও কি খাবি?”
মায়ের কথার উত্তর না দিয়ে ঝিনুক ফোন ধরতে ওঠে। মা রান্নাঘরে চলে যান। “হ্যাঁ, বল।” ফোনের এপাশ থেকে বলল ঝিনুক।
ঝিনুকের আন্দাজ নস্যাৎ করে ওপারের বাজখাঁই পুরুষকণ্ঠ বলে উঠল, “তোমার গোয়েন্দাকাকাকে দাও।”
থতমত ভাব কাটিয়ে ঝিনুক জানতে চায়, “কে আপনি?”
“এত সহজেই বলে দেব? দাও, ফোনটা কাকাকে দাও।”
দীপকাকু উঠে এসেছেন। ইশারায় জানতে চাইলেন, “কার ফোন?”
ঝিনুক কাঁধ ঝাঁকিয়ে ঠোঁট ওলটায়। ঝিনুকের হাত থেকে রিসিভার নিলেন দীপকাকু। কানে ঠেকিয়ে ‘হ্যালো’ বললেন। তারপর শুধু অন্য প্রান্তই কথা বলে গেল। দীপকাকু রা কাড়লেন না। মুখ থমথমে হয়ে উঠেছে। একটু পরে রিসিভার নামিয়ে রাখলেন।
ভীষণ উদ্বেগে ঝিনুক জানতে চাইল, “কে ছিল ফোনে?”
মাথা নাড়লেন দীপকাকু। চিন্তিত মুখে বললেন, “বুঝতে পারছি না!”
“কী বলল?”
“যা হয়। হুমকি দিল। বলল, টিকটিকিমশাই, লাইনে তো নতুন। অপরাজিতা দেবীর কেসটায় বেশি এগিয়ো না। শেষ হয়ে যাবে।”
“আপনি কিছু বললেন না!” উষ্মা প্রকাশ করল ঝিনুক।
দীপকাকু বললেন, “ফোনে ঝগড়া মানে তো ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করা। আমি চুপ থেকে ওর গলাটা চেনার চেষ্টা করছিলাম। এই কেসটার সূত্রে যাদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে, তাদের মধ্যে কেউ কিনা।”
“কিছু আন্দাজ করতে পারলেন?”
সোফায় গিয়ে বসলেন দীপকাকু। অন্যমনস্ক কণ্ঠে বললেন, “সম্ভবত স্বর পালটে কথা বলছিল।”
মুখোমুখি বসে ঝিনুক বলল, “রঘু যাকে ফোন করেছিল, সেই লোকটা নয়তো? গলাটা তো আপনি শুনেছিলেন।”
“হতেও পারে। তবে এ গলাটা একদম অন্যরকম। ফোনে রুমাল চাপা দিয়ে কথা বলছিল হয়তো। আমার মোবাইলে ফোন করলে নম্বরটা জানা যেত। করল ল্যান্ড ফোনে। তবে এটা প্রমাণ হয়ে গেল, অপরাধী কাছাকাছির মধ্যেই আছে। আমাদের গতিবিধির উপরেও লক্ষ আছে তার। এমনকী এ বাড়ির ফোন নম্বরও জোগাড় করেছে।” বলে, গুম মেরে গেলেন দীপকাকু। খানিক পরে বললেন, “ওঠো, শ্রবণাকে ফোন করে নাও।”
তখনই চা হাতে ঘরে ঢুকলেন মা। বিস্মিত কণ্ঠে জানতে চাইলেন, “সে কী রে, এই তো শ্রবণা ফোন করল! আবার ফোন করতে হবে কেন?”
“আগেরটা ফল্স কল ছিল মা।” বলে, আবার ফোন করতে যায় ঝিনুক। মা দীপকাকুর সঙ্গে সম্ভবত গানের স্কুলে অ্যাডমিশন নিয়ে কথা বলছেন। আরও একগাদা মিথ্যে কথা বলতে হবে দীপকাকুকে। ঝিনুকের সে-সব কথায় কান নেই। ওপারে শ্রবণার মোবাইলে রিং হচ্ছে। দীপকাকুর অনুমান ঠিক হলে দিদার বাড়িতেই থাকার কথা শ্রবণার। ফোন কানে তুলল শ্রবণা, “হ্যাঁ রে, তোরা কী রে, সেই থেকে তোর বাড়িতে ফোন করছি, তোর কাকার মোবাইলও দেখছি অফ। কাকিমা বললেন, তুই নাকি গানের স্কুলে অ্যাডমিশন নিতে গেছিস।”
“হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছিস। এখন বল, ফোন করছিলি কেন?” জানতে চায় ঝিনুক।
শ্রবণা বলে, “তোর দীপকাকু এখন কোথায় রে?”
দীপকাকুর নির্দেশ মাথায় রেখে ঝিনুক বলে, “এইমাত্র আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেলেন।”
“তাঁর সঙ্গে ইমিডিয়েট কন্ট্যাক্ট করা যায় কীভাবে? উনি মোবাইল সেটটা অফ করে রাখেন কেন?” একটু যেন বিরক্তির সুরে বলে শ্রবণা।
ঝিনুক বলে, “কী হয়েছে আমাকে বল। দেখছি, যোগাযোগ করা যায় কি না।”
“আবার একটা চিঠি এসেছে।”
“তাই নাকি!” বেশ জোরেই বলে ওঠে ঝিনুক। তারপরে জানতে চায়, “তুই এখন কোথায়?”
“দিদার বাড়ি। চিঠি পেয়েই দিদা ডেকে পাঠিয়েছে।”
“কী লেখা আছে চিঠিতে?”
ওপার থেকে শ্রবণা বলে, “আগের মতোই হুমকি। এবার আর একটা জিনিস অ্যাড হয়েছে। মনে হয়, আমরা যে গোয়েন্দা লাগিয়েছি, জানতে পেরেছে কোনওভাবে।”
শেষ কথাটা অবশ্য ঝিনুকের কাছে অপ্রত্যাশিত নয়, আগের ফোনেই সে সেটা জানতে পেরেছে। যেটা জানা দরকার, জিজ্ঞেস করে, “এবারের চিঠিতে কী লেখা আছে?”
শ্রবণা বলে, “এসব চিঠি কি ফোনে শুনে সমাধান করা যায়! তোরা কখন আসছিস?”
“আসছি। দীপকাকুর সঙ্গে যোগাযোগ করি। তুই চিঠির বয়ানটা বল।” ঝিনুকের গলায় উৎকণ্ঠা।
শ্রবণা একটু সময় নেয়। সম্ভবত চিঠিটা কারও থেকে নিল। তারপর বলে, “শোন, লিখেছে—
মিছিমিছি দেরি করছেন ম্যাডাম। মৃত্যু কিন্তু এগিয়ে আসছে। আর মাত্র দু’দিন। গোয়েন্দার পিছনে অযথা টাকা ঢালছেন। নীল শাড়ি পরে বারান্দায় দাঁড়ান।”
সাদা পাতায় কালো অক্ষরগুলো কী ভয়ংকর বার্তা বয়ে নিয়ে এসেছে, ফোনের এপ্রান্ত থেকেই তা টের পায় ঝিনুক। গলাটা একটু শুকনো শুকনো লাগে। গলা ঝেড়ে নিয়ে বলে, “ঠিক আছে, তুই এখন রাখ। দেখছি কত তাড়াতাড়ি দীপকাকুকে নিয়ে তোদের ওখানে যাওয়া যায়।”
ফোন রেখে সোফায় ফিরে আসে ঝিনুক। মা ঘরে নেই। দীপকাকু সোফায় বসে চা খাচ্ছেন। ঝিনুকের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখ দেখে জানতে চাইলেন, “কী বলল?”
ঝিনুক পুরোটাই বলল। দীপকাকুর কপালে ভাঁজ বাড়ে একটার পর একটা। ঝিনুকের বলা শেষ হলে ভাঁজগুলো মিলিয়ে যায়। তারপর বললেন, “আমি বলেছিলাম না, আরও কিছু ঘটনা ঘটবে? তবে চিঠির ব্যাপারটা আশা করিনি। আর একটা জিনিস তুমি ওদের জানাতে ভুলে গেলে।”
তৎক্ষণাৎ কথাটা ঝিনুকের মনে পড়ে যায়। বলে ওঠে, “ওঃ হো, রঘুর কথাটাই বলা হল না! করব আর একবার?”
দীপকাকু বললেন, “না। এখন থাক। আমাদের নিয়েও ওঁরা যথেষ্ট ধন্ধে পড়ে যাবেন। এক্ষুনি বললে, গানের স্কুলে গিয়েছিলে, পরের ফোনে অন্য গল্প— তার চেয়ে ঘণ্টাখানেক ভেবে নিই। একসময় আমিই ফোন করে নেব।”
কথা শেষ করে উঠে দাঁড়িয়েছেন দীপকাকু। ঝিনুক বলল, “তা হলে চিঠিটা কখন দেখতে যাওয়া হবে?”
“যাব। চিঠি তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না।” বলে, দরজার দিকে পা বাড়ালেন দীপকাকু।
অধীর কণ্ঠে ঝিনুক বলল, “আমরা বোধহয় সময় বেশি নিয়ে ফেলছি। কেসটা ঘুরেফিরে একই জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে আছে।”
কথাটাকে গ্রাহ্য না করে দীপকাকু বললেন, “রজতদাকে বোলো, সন্ধেবেলা দাবা খেলতে আসব। জমিয়ে দু’-চার দান খেললে, মাথাটা কাজ করে ভাল।”
দীপকাকু চলে যাওয়ার পর, দোলায়িত পরদার দিকে তাকিয়ে থাকে ঝিনুক, এই লোকটিও কম রহস্যজনক নন! এরকম গভীর সংকটজনক অবস্থাতেও দাবা খেলার ইচ্ছেটা রয়ে গেছে!
.
সন্ধে প্রায় সাতটা। এখনও দীপকাকুর দেখা নেই। বাবা অফিস থেকে ফিরেছেন অনেকক্ষণ। ইতিমধ্যেই ওবাড়ির সমস্ত ঘটনা জানা হয়ে গেছে ঝিনুকের থেকে। কিন্তু সে জানায় বাবা সন্তুষ্ট নন। ঝিনুকের বর্ণনায় অজস্র কোয়েশ্চেন মার্ক। বাবা একসময় বললেন, “তোকে না নিয়েই দীপঙ্কর হয়তো তদন্ত চালাচ্ছে। নইলে এতক্ষণে এসে যেত।”
উত্তরে ঝিনুক বলেছে, “আমাকে না নিলে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে কেস সল্ভ করতে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা তথ্য এখন আমার কাছে আছে।”
“কী ইনফরমেশন? আমাকে বুঝি বলিসনি!”
মাথা নেড়ে ঝিনুক বলল, “এটা তোমাকে বলে কোনও লাভ নেই। তুমি তো কেসটা হ্যান্ড্ল করছ না।”
“তা হলে তোর দীপকাকুকেই আসতে দে।” বলে, টিভি-র খবরে মনোনিবেশ করলেন বাবা।
তথ্যটা আজ দুপুরেই পেয়েছে ঝিনুক। দীপকাকু মানা করে গেলেও, ঝিনুক দুপুরে খেয়েদেয়ে উঠে শ্রবণাকে আবার ফোন করে। বলে, “দীপকাকুর সঙ্গে এখনও কন্ট্যাক্ট করা যায়নি। তোর দিদার বাড়ির পরিস্থিতি কীরকম, আর কিছু ঘটেছে?”
শ্রবণা বলে, “এমনি সব ঠিকই আছে। নতুন কিছু ঘটেনি। আমরা তোদের অপেক্ষায় আছি।”
আসলে যেটা জানার, শ্রবণা কিছুতেই বলছে না দেখে, ঝিনুক সন্তর্পণে জিজ্ঞেস করেছিল, “বাড়ির কাজের লোকেদের কী খবর?”
শ্রবণা সরল মনের মেয়ে। প্রশ্নটাকে সন্দেহ না করেই বলে ফেলে, “আর বলিস না, আজ আবার রঘুদা দেশে চলে গেল!”
“সে কী! কেন?” প্রায় আঁতকে উঠে জানতে চেয়েছিল ঝিনুক।
শ্রবণা বলে, “খবর এসেছে, ওর বাবার নাকি খুব শরীর খারাপ।”
হতাশ কণ্ঠে ঝিনুক মনে করিয়ে দেয়, “দীপকাকু যে তোদের বলেছিল, কাজের লোকেদের এখন ছুটিছাটা না দিতে?”
ওপ্রান্তে শ্রবণা বলে, “বাবার শরীর খারাপ বললে দিদা আর কী বলবে! ছেড়ে দিতেই হল।”
“ওর জিনিসপত্তর সব নিয়ে গেছে?” জানতে চেয়েছিল ঝিনুক।
উত্তরে শ্রবণা বলে, “ওদের আর জিনিস কী বল? একটা ব্যাগেই সব ধরে যায়।”
শ্রবণাকে সামান্য চমকে দিতে ঝিনুক বলেছিল, “রঘু চলে যাওয়ার সময় একটু খোঁড়াচ্ছিল, না রে?”
শ্রবণা যে কতটা অবাক হয়েছে, ফোনে ওর চেঁচানি শুনেই বোঝা যাচ্ছিল, “এই, তুই কী করে জানলি রে? সত্যিই খোঁড়াচ্ছিল রঘুদা। গা, হাত-পা দু’- এক জায়গায় ছড়ে গেছে। বলছিল কোন গাড়ি নাকি গা ঘেঁষে ধাক্কা মেরেছে, মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। বাবার শরীর খারাপের চিন্তায় অন্যমনস্ক ছিল হয়তো। কিন্তু এসব তো তোর জানার কথা নয়!”
ঝিনুক গম্ভীরভাবে বলেছিল, “দেখা হলে সব বলব।
তারপরই ঝিনুক ফোন করে দীপকাকুর বাড়িতে। ফোন তুলল কাজের মাসি। এই মাসিই দীপকাকুর দেখাশোনা করে। দীপকাকুর মা-বাবা থাকেন মেদিনীপুরে দেশের বাড়িতে। মাসি কানে কম শোনে। দীপকাকুকে চাইছে, বোঝাতে বেশ সময় লেগেছিল ঝিনুকের। বোঝার পর মাসি বলল, “তিনি এখন ঘুমোচ্ছেন। ডাকা মানা।”
ঝিনুক তো অবাক, বলে গেল ঘণ্টাখানেক ধরে ভাববে, তার বদলে ঘুমোচ্ছে! এ কী রে বাবা! বিকেলে আবার বাড়িতে ট্রাই করেছিল ঝিনুক। মাসি বলল, “বেরিয়ে গেছেন।” সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে ফোন করে ঝিনুক, যথারীতি সুইচ অফ। তারপর থেকে আর স্বস্তি পাচ্ছে না ঝিনুক। মাঝেমধ্যেই মাথায় ঘুরেফিরে আসছে রঘুর কথা। ব্যাটার কী সাহস, ওই অবস্থায় ওবাড়ি ঢুকে নিজের জিনিস গুছিয়ে হাওয়া! ইস, তখন যদি দীপকাকু আমার কথা শুনে ওবাড়িতে একটা ফোন করে দিতেন, কখন ধরা পড়ে যেত রঘু!…
ঝিনুকের ভাবনার মাঝেই ডোরবেল বেজে ওঠে। নিজের স্টাডি থেকে ছিটকে ড্রয়িং-এ আসে ঝিনুক। বাবা দরজা খুলছেন।
খুবই ঢিলেঢালা ভঙ্গিতে ঘরে ঢোকেন দীপকাকু। যেমন অন্যদিন আসেন দাবা খেলতে। নতুনের মধ্যে আজ শুধু হাতে একটা ডায়েরি। দরজার পাশে কাবলি জুতো ছেড়ে ঝিনুকের দিকে তাকালেন। ঝিনুকের দৃষ্টিতে একগাদা কথা জমে আছে। মিটিমিটি হেসে দীপকাকু বললেন, “রঘুবীর না বীররঘু, কী উপাধি দেবে তোমার প্রতিদ্বন্দ্বীকে?”
দীপকাকুর কথা শুনে ঝিনুক বুঝতে পারে রঘুর ব্যাপারটা জেনে গেছেন। নিজের অসতর্কতা ঢাকার জন্য কটাক্ষ করছেন ঝিনুককে। ঝিনুক তবু দৌড়ে প্রায় ধরে ফেলেছিল রঘুকে। উনি তো রঘুর যেন কোনও ক্ষতি না হয়, সেভাবে পালিয়ে যেতে সাহায্য করলেন।
দীপকাকুর উপস্থিতিতে বাবার মুখে খুশির আমেজ।
সেন্টার টেবিলে দাবার বোর্ড পেতে বাবা বললেন, “এখন কিন্তু শুধু তোমাদের তদন্ত নিয়ে কথা চলবে না। সঙ্গে খেলাও থাকবে।”
দীপকাকু বাবার মুখোমুখি সোফায় গিয়ে বসলেন। ডায়েরিটা রাখলেন টেবিলের উপর। বড়সড়, বেশ অভিজাত দেখতে ডায়েরিটা। নিশ্চিন্তে দীপকাকুকে ঘুঁটি সাজাতে দেখে ঝিনুক আর ধৈর্য রাখতে পারল না। কাছে গিয়ে বলল, “রঘুর ব্যাপারটা কখন জানলেন?”
“কিছুক্ষণ আগে। ওদের বাড়িতে ফোন করেছিলাম।” বলে, চুপ করে গেলেন দীপকাকু।
ঝিনুক বলল, “ওরা কিন্তু খুব টেনশনে আছে। অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।”
“জানি। ফোনে বলেছে। বলেছি, কাল দুপুরে যাব।” কেটে কেটে জবাব দিলেন দীপকাকু। উত্তর দেওয়ার যেন কোনও ইচ্ছেই নেই।
ঝিনুকও ছাড়বার পাত্রী নয়। বলল, “হাতে মাত্র দু’দিন সময়। একজন অপরাধীকে যদি-বা চিহ্নিত করা গেল, আমাদের ভুলে সেও হাতের বাইরে। এত অল্পসময়ের মধ্যে আপনি পারবেন রহস্যের কিনারা করতে? আর সত্যিই যদি অপরাজিতা দেবীর কিছু হয়ে যায়, কী জবাব দেব আমরা!”
এবার যেন একটু সিরিয়াস দেখায় দীপকাকুকে। বাবার দানের উত্তরে দান দিয়ে বললেন, “রঘু যে আবার ওবাড়ি ফিরে যাবে, এটা আমি এতটুকু আন্দাজ করতে পারিনি। সাধারণ বুদ্ধির কোনও অপরাধীই এই কাজ করবে না। সে ধরেই নেবে আমরা ফোন করে ওবাড়িতে জানিয়ে দেব। রঘু বোকা নয়। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, রঘু জানত, আমরা ফোন করে যা-ই বলি, অপরাজিতা দেবী ওকে আটকাবেন না। অর্থাৎ অপরাজিতা দেবীর কোনও এক দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে রঘু। কী সেই দুর্বলতা?”
খুবই সূক্ষ্ম ও ন্যায্য প্রশ্ন। ঝিনুক এইভাবে ভেবে দেখেনি।
দীপকাকু আবার বললেন, “রঘুর ব্যাপারটাই আমার তদন্তের শৃঙ্খলাটা একটু ভেঙে দিল, নয়তো ঠিকই এগোচ্ছিলাম।”
“তুমি আপাতত দানটা দাও।” বাবা তাড়া দেন। খেলার দিকে দীপকাকুর আর মন নেই। চাল না দিয়ে গভীরভাবে কী যেন ভেবে যাচ্ছেন!
অদম্য কৌতূহলে ঝিনুক জানতে চায়, “কতদূর এগিয়েছিলেন?”
“অনেকটা। বিকেলে গিয়েছিলাম তালতলা থানায়। রঞ্জনের বন্ধু ওসি পার্থ মজুমদার খুব হেল্প করল।”
“থানায় যাওয়ার কারণ?” জানতে চায় ঝিনুক।
দীপকাকু বললেন, “অপরাজিতা দেবীর ভাড়াটে সত্যবান মিত্রর আত্মহত্যা এবং তাঁর দুই ছেলের বাবার সম্পত্তির উপর অনীহা আমাকে কিছুটা অবাক করেছিল। সত্যবান মিত্রর ফ্ল্যাটটা ভালভাবে লক্ষ করতে গিয়ে আমার চোখে এমন কিছু পড়েছে, যার সঙ্গে অপরাজিতা দেবীর কেসের সামান্য হলেও যোগসূত্র আছে।”
“কী সেটা?” জানতে চেয়ে সোফার পাশে ছোট টুলটায় বসে পড়ে ঝিনুক।
দীপকাকু বললেন, “এক্ষুনি সেটা বলছি না। থানায় গিয়ে যা জানলাম সেটা আগে শোনো।” বলে, একটু থামলেন। সম্ভবত কথাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছেন। বাবাও ক্রমশ মনোযোগী হয়ে পড়ছেন ঝিনুকদের আলোচনায়।
দীপকাকু বলতে শুরু করলেন, “অপরাজিতা দেবীর বাড়িটা তালতলা থানার আন্ডারে পড়ে বলে সত্যবান মিত্রর আত্মহত্যার এনকোয়ারি করতে এসেছিল পার্থ। ইয়াং এনার্জেটিক সৎ পুলিশ অফিসার। খুবই বিশ্বস্তভাবে কেসটা ইনভেস্টিগেট করেছে সে। প্রমাণিত হয়েছে মৃত্যুটি হত্যা নয়, আত্মহত্যাই। সত্যবানবাবুর সম্বন্ধে তথ্য হচ্ছে, উনি একজন ভাষাবিদ। দিল্লিতে ভাষাতত্ত্ব পড়াতেন। ভদ্রলোক চাকরিজীবনেই স্ত্রীকে হারিয়েছেন। ওঁর দুটি পুত্রসন্তান, দু’জনেই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। রিটায়ারমেন্টের পর সত্যবান মিত্র সঞ্চিত অর্থ নিয়ে মিশরে যান। ভারতীয় ভাষায় আরবি ভাষার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছিলেন তিনি। আরবি ভাষার প্রকৃত রূপ জানার জন্যই তাঁর মিশর যাত্রা। আলেকজান্দ্রিয়া ইউনিভার্সিটির যথেষ্ট সাহায্যও তিনি পাচ্ছিলেন। কোনও এক অজ্ঞাত কারণে তিনি হঠাৎ সব কিছু ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন। ওঁর ছোটছেলে দিল্লিতে সেটল্ড। ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু তিনি দিল্লি যাননি। বড়ছেলে কয়েক বছর হল কলকাতায় এসে ব্যাবসা করছে। অ্যাড এজেন্সি আছে তার। তার কাছেও যাননি। অর্থাৎ সত্যবান মিত্র কোনও ছেলের কাছেই এসে ওঠেননি। একলা বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন। স্বাভাবিক কারণেই এই আচরণ ছেলেদের পছন্দ হয়নি। তারপর থেকেই বাবার ব্যাপারে তারা আগ্রহ হারায়। এর আর একটা কারণও আছে, ভদ্রলোক তেমন কিছু বিষয়-সম্পত্তি রেখে যেতে পারেননি।” এতদূর বলে দীপকাকু একটু থামলেন।
এখন পর্যন্ত সত্যবান মিত্রর সঙ্গে ওবাড়ির বিপদের কী সম্পর্ক, বের করতে পারেনি ঝিনুক। তবে সত্যবান মিত্রর ব্যাপারটাও কম ইন্টারেস্টিং নয়। যদিও কোথাও কিছু অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে। সেটাই দীপকাকুকে বলে ঝিনুক, “সত্যবান মিত্র যে একলা থাকতে চেয়েছেন, এটা তো অপরাধ নয়। উনি তো সে-অর্থে ছেলেদের কোনও বঞ্চনা করেননি। তা হলে ছেলেদের কীসের এত রাগ?”
দীপকাকু বললেন, “এই জায়গাটা আমার কাছেও ধোঁয়াশার মতো। মনে হচ্ছে এর পিছনে আরও কোনও কারণ লুকিয়ে আছে। বিশেষ করে সত্যবান যখন আত্মহত্যা করেন, শারীরিক, মানসিক দু’ভাবেই যথেষ্ট বিপর্যস্ত ছিলেন। বেশ কিছুদিন অন্তর হলেও, বড়ছেলে বাবাকে দেখতে আসত। বাবার শরীরের অবস্থা তার কাছে অজানা ছিল না। জোর করে নিজের কাছে নিয়ে যেতে পারত বাবাকে। অথবা ভদ্রলোক খুবই জেদি প্রকৃতির ছিলেন। লো প্রেশার, ক্ষীণ স্বাস্থ্য, তার উপর নিয়মিত মদ্যপান। শেষ দিকে তাঁর মাথাটাও ঠিকমতো কাজ করছিল না। তারই কিছু প্রমাণ এই ডায়েরিতে পাওয়া যাবে।”
টেবিলের উপর থেকে ডায়েরিটা তুলে নিলেন দীপকাকু। অর্থাৎ মৃতের ডায়েরি। বুকটা ছমছম করে ওঠে ঝিনুকের। ডায়েরির পাতা ওলটাতে ওলটাতে দীপকাকু বললেন, “ওসি পার্থ মজুমদার এই ডায়েরিটা সংগ্রহ করে সত্যবান মিত্রর ফ্ল্যাটে তদন্ত করতে গিয়ে। আরও দু’-চারটে জিনিস যা আত্মহত্যাকে প্রমাণ করে, সেগুলো ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টে পাঠিয়ে দিলেও ডায়েরিটা রাখে নিজের কাছে।”
“কারণ?” জানতে চাইলেন বাবা।
দীপকাকু বললেন, “ডায়েরিতে এমন কিছু লেখা আছে, যা খুব এলোমেলো অথচ আকর্ষক। এবং সত্যবান মিত্রর কেসে ডায়েরিটা একটা কথাই বলে, ভদ্রলোক শেষ বয়সে সম্ভবত পাগল হয়ে গিয়েছিলেন।”
আবার থেমে গেলেন দীপকাকু। ঝিনুকের তর সইছে না, এক্ষুনি ডায়েরির লেখাগুলো পড়তে ইচ্ছে করছে। কিচেনের দিকে উঁকিঝুঁকি মেরে দীপকাকু বললেন, “কী ব্যাপার রজতদা, বউদি চা দিচ্ছেন না কেন? অনেকক্ষণ তো এসেছি!”
“তিনি পাশের বাড়ির মেয়ের বিয়ের মার্কেটিং দেখতে গেছেন।”
দীপকাকু বললেন, “তা হলে ঝিনুক চা করুক।”
ঝিনুক বলল, “এই ব্যান্ডেজ-বাঁধা হাতে চা করা যায়?”
“খুব যায়। এমন কিছু লাগেনি।” বললেন দীপকাকু।
বাবা বাঁচিয়ে দিলেন, “ওর চা তুমি মুখে দিতে পারবে না। তার চেয়ে যা বলছিলে বলো।”
ঝিনুক মনে মনে হাসে। চা সে মোটেই খারাপ করে না।
চায়ের আশা ছেড়ে দীপকাকু শুরু করলেন, “ডায়েরিটা পড়ার আগে ভদ্ৰলোক কীভাবে সুইসাইড করেছিলেন বলে নিই। মদের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খেয়েছিলেন। লো প্রেশারের রুগির পক্ষে ওই ওষুধ মারাত্মক। ফরেনসিক থেকে জানা গেছে, ওই ট্যাবলেট মদ-জাতীয় তরলে মেশালে কোনও স্বাদ পরিবর্তন হয় না, মানে তিতকুটে লাগে না। ফলে বমি হয়ে ওষুধটা উঠে যাওয়ার কোনও চান্স নেই। নিরবচ্ছিন্ন শান্তি নিয়ে চিরনিদ্রায় চলে যাওয়া যায়। পদ্ধতি দেখে বোঝাই যাচ্ছে আত্মহত্যার পরিকল্পনা উনি অনেকটা সময় নিয়েই করেছিলেন।”
“অন্য কেউ তো তাঁর ড্রিঙ্কে ওষুধটা মিশিয়ে দিতে পারে?” বলল ঝিনুক
“তা নিশ্চয়ই পারে। কিন্তু বোতলের গায়ে, গ্লাসে সত্যবানবাবু ছাড়া অন্য কারও হাতের ছাপ পাওয়া যায়নি। তবে মেঝেতে দু’জন বাইরের মানুষের পায়ের ছাপ ছিল।”
বাবা সোজা হয়ে বসে বললেন, “কাদের পায়ের ছাপ সেগুলো?”
“সত্যবানের বড়ছেলে এবং তার এক ডাক্তার-বন্ধুর। বড়ছেলে নিজেই পুলিশকে বলেছে, সেদিন সন্ধেবেলা ডাক্তার-বন্ধু নিয়ে বাবার কাছে গিয়েছিল। বাবার শরীর চেকআপ করানোই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। বাবা সেটাও তাকে করতে দেননি। ছেলে বেরিয়ে যায় সন্ধে সাতটা-সাড়ে সাতটা নাগাদ। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী মৃত্যু হয় রাত সাড়ে আটটায়।”
আরও কীসব বলে যাচ্ছেন দীপকাকু। এই প্রথম ঝিনুক একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে। তার মন পড়ে আছে ডায়েরির পাতায়। কী লেখা আছে সেখানে?
বেশ খানিকক্ষণ কথা বলার পর আঙুল ডুবিয়ে রাখা পাতাটা খোলেন দীপকাকু। ফাঁকা পাতায় দু’-চার লাইন বাংলা অক্ষর লেখা। দীপকাকু বললেন, “ভদ্রলোক নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন না। দিনপঞ্জি তো নয়ই। যখন যা মনে এসেছে, মন্তব্যের মতো দু’-চার লাইন লিখে রেখেছেন। এর মধ্যে বেশকিছু প্রসঙ্গ বাদ দেওয়াই যায়। যেমন, এক জায়গায় ফর্দ করে বাজারদর লেখা, তার নীচে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করা আছে। ‘নীল নদের জোলো হাওয়ার সঙ্গে গঙ্গার হাওয়ার কোথায় পার্থক্য’, তাও বর্ণনা করা আছে ডায়েরির এক পাতায়। আবার কিছু হাস্যকর মন্তব্যও লিখেছেন। যেমন, ‘যে মানুষ চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে খায়, তার মনের গভীরতা কম’, ‘মোজা ছাড়া জুতো পরা মানুষ সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে”, আর এক জায়গায় লেখা, ‘স্যাকরাবাড়ির বেড়াল ঠুকঠুকুনিতে ভয় পায় না’— এই সব হিজিবিজি। কী মানে হয় এসবের! শুধু একটা বিশেষ প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে এসব লেখার মাঝে ঢুকে আছে, কোনও এক দুঃখী রানির কথা। …এই যে এখানে লিখেছেন—” বলে, পাতা উলটে পড়তে শুরু করলেন দীপকাকু, “…‘রানির কান্না নীল নদে মিশে যায়’… খানিকটা বাদ দিয়ে সম্ভবত অন্যদিন লেখা, ‘আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরের লাইটহাউসের আলো যেন রানির অস্থির অসহায় চোখ।’”
পাতা উলটে দীপকাকু বললেন, “এখানে লিখেছেন, ‘রানির কান্না ধরা আছে আমার কাছে।’ আর এক জায়গায় লেখা, ‘ইতিহাসকে ফাঁকি দিতে পেরেছেন রানি, তস্করদের নয়।” বেশকিছু পাতা বাদ গিয়ে দীপকাকু বললেন, “দ্যাখো, এখানে লেখা আছে, ‘রানির কান্না নিরাপদে রাখলাম। সত্যিই কি নিরাপদ?” ডায়েরি বন্ধ করলেন দীপকাকু।
ঝিনুকের বুদ্ধিশুদ্ধি ঘেঁটে একশা। দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, “কী বুঝলে?”
ঝিনুক মাথা নাড়ে। মানে কিছুই বোঝেনি।
বাবা বললেন, “লোকটা বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল। আর এই ডায়েরি নিয়ে
পড়ে থাকলে তোমাদেরও তদন্তের দফারফা হবে।”
দীপকাকু বললেন, “না। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে ডায়েরির লেখাগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে আসল রহস্য। সেটা ভেদ করে উঠতে পারলেই অপরাজিতা দেবীর কেসটা সমাধান হয়ে যাবে।”
ভীষণ কৌতূহলে ঝিনুক বলল, “ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলবেন?”
“এখন বলা ঠিক হবে না। কেননা সবকিছুই অনুমাননির্ভর। তবে এটুকু বলা যেতে পারে, ডায়েরির আপাত-অসংলগ্ন মন্তব্যগুলো আমাদের রহস্য উদ্ঘাটনের নির্দেশ দিচ্ছে।”
দীপকাকুর কথা শেষ হতেই বাবা বলে উঠলেন, “আমি একটা কথা বুঝে উঠতে পারছি না! ভদ্রলোক, মানে সত্যবান মিত্র, তোমাকে চিনতেন না, জানতেন না, খামোখা তোমার কেরিয়ারের উন্নতির জন্য গুটিকয় ধাঁধা লিখে যাবেন কেন?”
বাবার কথা শুনে হেসে ফেললেন দীপকাকু। ঝিনুকও মজা পাচ্ছে। দীপকাকু বললেন, “ঠিক ধাঁধা লিখব বলে লেখেননি সত্যবান। এসবই তাঁর আত্মকথন। একা থাকলে নিজের সঙ্গে কথা বলা ছাড়া উপায় থাকে না। আর স্পষ্ট করে না-লেখার কারণ, মনের কথাগুলো গোপন রাখতে চেয়েছেন।”
দীপকাকুও তো কিছু কম হেঁয়ালি করছেন না। ঝিনুক অসহায়ভাবে বাবা আর দীপকাকুর দিকে তাকায়। বাবা চিন্তামগ্ন। দীপকাকু ডায়েরির পাতার দিকে চেয়ে বসে আছেন। ওইখানে লেখা আছে, আলেকজান্দ্রিয়া বন্দর, রানির কান্না, নীল নদ… সত্যিই কি ওর মধ্যে লুকিয়ে আছে রহস্যের আশু সমাধান? ঝিনুকের আশ্চর্য লাগে।
একটুক্ষণ পর দীর্ঘ একটা শ্বাস ছেড়ে বাবা বললেন, “দ্যাখো দীপঙ্কর, তোমার এই কেস সম্বন্ধে আমি যতটুকু ঝিনুকের মুখে শুনেছি এবং এতক্ষণ যা শুনলাম, তাতে আমার মনে হচ্ছে, রহস্যটি ভীষণ জটিল এবং বেশ উঁচুমানের। এর সমাধান যদি তুমি করে ফেলতে পারো, জানবে, এই কেসটাই হবে তোমার কেরিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। আত্মবিশ্বাস তো বাড়বেই তোমার, তার সঙ্গে একজন সত্যিকারের গোয়েন্দা হিসেবে স্বীকৃতি পাবে তোমাদের মহলে।”
একটু বোধহয় আবেগতাড়িত হয়ে দীপকাকু বলে ফেললেন, “এসবই নির্ভর করছে আপনার আশীর্বাদ, শুভ কামনার উপর।”
বাবাকে বেশ ভালই বোঝে ঝিনুক। মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোনও প্যাঁচ কষছেন। ঝিনুকের অনুমানই ঠিক হয়। বাবা বলে ওঠেন, “আমার শুভেচ্ছা সবসময় তোমার সঙ্গে আছে। তবে এই কেসটার তদন্তের তুমি উপযুক্ত কি না, সেটার একটা পরীক্ষা নিতে চাই।”
“কীরকম বলুন?” জানতে চান দীপকাকু।
বাবা বললেন, “সত্যবানবাবুর সব লেখার মানে আমি জানতে চাইছি না। শুধু একটা লাইন আমার খুব চেনা লেগেছে, ‘স্যাকরাবাড়ির বেড়াল ঠুকঠুকুনিতে ভয় পায় না’, এর কী মানে করছ বলো?”
ফের মিটিমিটি হাসি ফিরে আসে দীপকাকুর মুখে। বললেন, “এটা একটা পুরনো প্রবাদ। আপনিও হয়তো ছেলেবেলায় শুনেছিলেন।”
“ঠিক তাই। কিন্তু এ-কথা উনি হঠাৎ লিখলেন কেন?” জানতে চান বাবা।
দীপকাকু বললেন, “সম্ভবত ভদ্রলোককে মৃদু ভয় অথবা হুমকি দেওয়া হচ্ছিল, তারপরই উনি প্রবাদটি লেখেন।”
বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে গেছে ঝিনুকের। বাবারও একই অবস্থা। সত্যিই কী অসম্ভব অনুমানশক্তি দীপকাকুর!
হাসতে হাসতেই দীপকাকু বললেন, “রজতদা, আপনি যতই ওসকান, আর কিছু বলছি না। এই কেসটার জন্য আরও দু’-একজনের সাক্ষাৎকার আমার প্রয়োজন, আর সামান্য কিছু ব্লু, আশা করছি আগামী দু’-তিন দিনের মধ্যেই রহস্য সমাধান করে দেব।”
“তিন নয়, দু’দিন সময় দেওয়া আছে চিঠিতে।” খেয়াল করিয়ে দেয় ঝিনুক।
ডোরবেল বাজে। ঝিনুক উঠে গিয়ে দরজা খোলে। একমুখ হাসি নিয়ে মা ঢুকলেন, “কী দারুণ বেনারসি হয়েছে পুতুলের! ওই রংটায় তোকেও খুব মানাবে, জানিস ঝিনুক।” বলে, দীপকাকুর দিকে চোখ যায় মায়ের। বললেন, “আরে দীপঙ্কর, কখন এলে! চা দিয়েছে ঝিনুক?”
“কই আর দিল! এদিকে আপনার হাতে চা, ভাজাটাজা না খেয়ে উঠতেও পারছি না।”
দীপকাকুর কথার পিঠে মায়ের উদ্দেশে বাবা বললেন, “এতদিন তো দীপঙ্কর তোমার হাতে খেয়ে গেল, এবার একদিন আমাদের চিনেপাড়ায় খাওয়াবে। অনেক টাকার একটা কেস প্রায় সল্ভ করে এনেছে।”
অবাক গলায় মা বললেন, “তাই নাকি দীপঙ্কর! কবে খাওয়াচ্ছ?”
দীপকাকু কিন্তু মোটেই অপ্রস্তুত হলেন না। বললেন, “দু’-চার দিনের মধ্যেই। তবে তার আগে একটা ব্যাপারে আপনার ছোট্ট অনুমতি চাই।”
ভ্রু কুঁচকে মা জানতে চাইলেন, “কীসের পারমিশন?”
দীপকাকু বললেন, “আমার কেসটা সল্ভ হতে বড়জোর দিন তিনেক সময় লাগবে। এই ক’টা দিন আমার সহকারী হিসেবে ঝিনুককে একটু দরকার। এখন আপনি যদি অনুমতি দেন…”
মুহূর্তের মধ্যে মায়ের মুখ থেকে খুশি উধাও। বিষণ্ণ গলায় বললেন, “মেয়ে হয়ে ও আর তোমাকে কী সাহায্য করবে বলো? এই তো দেখলে, সামান্য বাস থেকে নামতে গিয়ে হাত-পা কেটে এল।”
দীপকাকু আশ্বাস দিয়ে বললেন, “ওসব নিয়ে আপনাকে চিন্তা করতে হবে না, এবার থেকে আমি ভালমতো খেয়াল রাখব। আসলে ওর মতো একটা সফ্ট লুকিং মেয়ে সঙ্গে থাকলে নিজের পরিচয় লুকোতে সুবিধে হয়।”
‘সফ্ট লুকিং’ প্রশংসাটা মোটেই ভাল লাগেনি ঝিনুকের। আপত্তি জানিয়ে ও লাভ নেই। দীপকাকু এখন যা বলছেন সবই তো ঝিনুকের পক্ষেই যাচ্ছে।
গভীর আশঙ্কায় মা জানতে চাইলেন, “তোমার এই কেসে গুলি-বন্দুকের ব্যাপার নেই তো?”
“না, না, ওসবের কোনও প্রয়োজনই হবে না। তা ছাড়া পিস্তল ব্যবহার করার মতো কেস আমার কাছে আসতে যাবে কেন?”
দীপকাকুর নিরীহ চেহারা অথবা বোঝানোর গুণেই মা নিমরাজি হয়ে বললেন, “দ্যাখো, যা ভাল বোঝো। ওর বাবা নিশ্চয়ই অনেক আগেই রাজি হয়ে আছেন।”
মা কিচেনের দিকে চলে যেতেই ঝিনুক হাত ঝাঁকিয়ে ‘ইয়া’ বলতে যাবে, চোট পাওয়া কনুইটা চিনচিন করে উঠল। মনে পড়ল রঘুর চেহারা। ঝিনুক মনে মনে বলল, ব্যাটাকে যদি আর একবার বাগে পাই, দেখে নেব!
