৪
কাল যতটা তাড়া দেখিয়েছিলেন দীপকাকু, আচরণে এখন তার কোনও প্রতিফলন নেই। ঝিনুকদের বাড়ি সময়মতো এসেছিলেন। ড্রেস করে রেডি ছিল ঝিনুক। বাবা বারবার বলা সত্ত্বেও ড্রয়িংয়ে বসেননি। বলেছেন, “কাজ সেরে আপনার সঙ্গে কথা বলব।”
ঝিনুককে নিয়ে চলে এসেছেন আবিরবাবুর পাড়ায়, ফুলবাগানে। এখানে এসেই কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়লেন! বড় একটা গাছের নীচে বাইক স্ট্যান্ড করে বললেন, “দাঁড়াও, চায়ের দোকানের খোঁজ করি। ঘুম থেকে উঠে একবারই মাত্র চা খাওয়া হয়েছে।”
ঝিনুক বলল, “আমাদের দেরি হয়ে যাবে না? আবিরবাবু যদি বেরিয়ে যান!”
“কিন্তু চা না খেলে যে আমার মাথা কাজ করবে না।” বললেন দীপকাকু ঝিনুক বলল, “ওঁদের বাড়িতে গেলে নিশ্চয়ই চা অফার করবেন। “যদি না করেন? সুমনা বসুর মেজাজ-মর্জি তো আমাদের অজানা। তখন ভারী মুশকিলে পড়ে যাব।”
ঝিনুক আর কথা বাড়াল না। কিছু ক্ষেত্রে দীপকাকু জোর করে যুক্তি খাড়া করেন। চা-দোকানের খোঁজে সঙ্গ নিয়েছিল দীপকাকুর। বেশিদূর যেতে হয়নি। রাস্তার ধারে ঝুপড়িতে চা-দোকান পাওয়া গেছে। সামনের বেঞ্চে বসেছেন দীপকাকু। দোকানির সঙ্গে আলাপ জমিয়েছেন। ঝিনুক দাঁড়িয়ে আছে একটু এগিয়ে, যাতে এখান থেকে দীপকাকুর বাইকটা নজর রাখা যায়।
কেন কে জানে, এবারের কেসটা ঝিনুক ঠিক আয়ত্তে নিতে পারছে না। বারেবারে মনে হচ্ছে, তার বোধবুদ্ধির বাইরে থেকে যাচ্ছে আসল রহস্যটা। কাল বাড়ি ফিরে প্রায় বাধ্য হয়ে বাবার শরণাপন্ন হয়েছিল ঝিনুক। একেবারে প্রথম থেকে কেসটা বাবাকে বলল। দীপকাকু কী কী পর্যায়ে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, পুঙ্খানুপুঙ্খ জানাল। সব শুনে বাবা বললেন, “কেসটা অতীব সরল। দীপঙ্করের উচিত হয়নি এই কাজটা হাতে নেওয়া। যে-কোনও সাধারণ মানের ডিটেকটিভ এই রহস্য সমাধান করে দিতে পারবে।”
“কেন এ-কথা বলছ?” অবাক হয়ে জানতে চাইল ঝিনুক।
বাবা বললেন, “এটা সিম্পল একটা চুরির ঘটনা। চোর এবং চোরাই বস্তুটা দীপঙ্করকে খুঁজে বার করতে হবে। কেসটা একটা জায়গায় একটু কঠিন। চুরির পর বেশ ক’টা দিন কেটে গিয়েছে। তদন্তে নামা হয়েছে দেরিতে। সময়ের কারণে চোর ও চোরাই জিনিসটা চলে গিয়েছে নাগালের অনেকটা বাইরে। তবু আমি বলব, দীপ যদি মনে করে, কালই মূর্তিটা উদ্ধার করতে পারে।”
“কীভাবে?” সাগ্রহে জানতে চাইল ঝিনুক।
বাবা বলতে থাকলেন, “অ্যান্টিক জিনিস বিক্রির যে-সব দোকান আছে কলকাতায়, সেখানে ঘুরলেই মূর্তিটার দেখা পাওয়া যাবে। চোর যেদিন চুরি করেছে ওটা, সেদিনই বিক্রি করে দিয়ে ঝাড়া হাত-পা হয়েছে।”
“চোর কলকাতাতেই বিক্রি করবে কেন? অন্য কোথাও তো করতে পারে।” বলল ঝিনুক।
বাবা বললেন, “চোরাই জিনিস বেশিক্ষণ কাছে রাখে না চোরেরা। মূর্তিটার উপযুক্ত মূল্য পেতে গেলে, যেতে হবে কলকাতার মতো বড় কোনও শহরে। যেমন, দিল্লি, মুম্বই। যেতে সময় লাগবে। পুলিশ যদি ফলো করে, বিষ্ণুমূর্তি সমেত ধরা পড়ে যাবে চোর। তাই ঝুঁকিটা নেবে না।”
বাবার দেওয়া যুক্তিতে কোনও ফাঁক খুঁজে পেল না ঝিনুক। বলল, “অ্যান্টিকের দোকান ঘুরে মূর্তিটা না হয় পাওয়া গেল। চোরকে ধরা যাবে কী করে?”
“এটা এমন কিছু ব্যাপার নয়। দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলেই বিক্রি করতে আসা লোকটার চেহারার বর্ণনা দেবে। বাকিটুকু বার করা দীপের কাছে জলভাত।”
“তা হলে দীপকাকু কেন এই রাস্তায় হাঁটছেন না?”
ঝিনুকের প্রশ্নের উত্তরে বাবা বললেন, “আমার মনে হয় এই কেসটাকে নেট প্র্যাকটিস হিসেবে নিয়েছে দীপ। অনেক দিন হয়তো হাতে কোনও কাজ নেই, তাই ইচ্ছে করেই জটিল পদ্ধতিতে রহস্য সমাধানের চেষ্টা করছে। ও টার্গেট করেছে, মূর্তিটা উদ্ধার এবং চোরকে ধরা দুটো কাজ একসঙ্গে করবে। সেই জন্যেই জালটা বড় করে বিছিয়েছে।”
বাবার মতামত এখনও দীপকাকুকে জানানোর সুযোগ পায়নি ঝিনুক। কাকু এতটুকু সময় নষ্ট করেননি ঝিনুকদের বাড়িতে, ঝিনুককে বাইকে তুলে সোজা চলে এসেছেন এখানে। বাবার দৃষ্টিকোণটা দীপকাকুকে একবার জানিয়ে রাখা ভাল। কঠিন কেস হ্যান্ডেল করতে অভ্যস্ত দীপকাকু বোধহয় সোজা কেসটাকে জটিল করে ফেলছেন। ঘুরে দাঁড়িয়ে ঝিনুক চায়ের দোকানের দিকে পা বাড়াল। দীপকাকুর হাতে চায়ের গ্লাস। এগিয়ে আসতে আসতে ঝিনুক শুনতে পেল দীপকাকু চা-দোকানিকে জিজ্ঞেস করছেন, “এ পাড়ায় কোনও হোটেল বা লজ টাইপের কিছু নেই?”
পা থেমে গেল ঝিনুকের। হোটেল, লজের খোঁজ করছেন কেন দীপকাকু? কেসটা সল্ভ করার জন্য এ পাড়ায় ক’দিন থাকার প্ল্যান করছেন নাকি?
দোকানি উত্তর দিল, “হোটেল নেই। লজ আছে। খুব ভাল কিছু নয়। পেশেন্ট পার্টির লোক, স্কুল-কলেজের ছাত্ররা, কখনও তাদের বাবা-মায়েরা এসে থাকেন।”
“কোন বাড়িটা গো?” জানতে চাইলেন দীপকাকু
চা-দোকানি হাত তুলে হলুদ রঙের চারতলা একটা বাড়ি দেখাল। বাড়িটা পুরনো। রং নতুন। কিছুদিন আগে করানো হয়েছে মনে হয়। ঝিনুক এগিয়ে এসে দীপকাকুর পাশে বেঞ্চিতে বসল। গ্লাসে চুমুক দিয়ে দীপকাকু ফের দোকানিকে জিজ্ঞেস করলেন, “এখানে ‘নিরালা অ্যাপার্টমেন্ট’-টা কোথায়?”
এবার উলটো দিকে হাত তুলল দোকানি। বলল, “ওই যে, দুটো বাড়ি পরেই ছ’তলার ফ্ল্যাটবাড়ি।”
নিরালা অ্যাপার্টমেন্ট হচ্ছে আবিরবাবুর ঠিকানা। চারতলার ফ্ল্যাটে থাকেন। লোকেশনটা এত পরে কেন জানতে চাইলেন দীপকাকু! এতক্ষণ কী কথা বলছিলেন দোকানির সঙ্গে? ঝিনুক যা বলতে এসেছিল, গুলিয়ে গেল সবটাই। চায়ের গ্লাস মাটিতে নামিয়ে সিগারেট ধরালেন দীপকাকু। দোকানিকে পয়সা দিয়ে দীপকাকু পা বাড়ালেন নিরালা অ্যাপার্টমেন্টের দিকে। পাশে চলল ঝিনুক।
.
প্রায় মিনিট খানেকের উপর হয়ে গেল, আবিরবাবুর ফ্ল্যাটে বেল বাজিয়ে বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ঝিনুকরা। ধৈর্য হারিয়ে ঝিনুক বলল, “কী হল রে বাবা, খুলছে না কেন!”
দীপকাকু বললেন, “বিষ্ণুমূর্তিটা চুরি যাওয়ার পর প্রাথমিক কিছু সাবধানতা নিচ্ছেন সুমনা। ঘরে আবিরবাবু নেই। আই হোলে চোখ রেখে আমাদের দেখেছেন। উনি আমাদের চেনেন না। কর্তার মুখে শুনেছেন দু’জনের কথা। একবার বোধহয় ফোন করে নিলেন আবিরবাবুকে।”
দীপকাকু এমনভাবে কথাগুলো বলে যাচ্ছেন, যেন দেখতে পাচ্ছেন দরজার ওপারের সমস্ত ঘটনা। এদিকে আবার চোখে মোটা কাচের চশমা। দরজা খুলে গেল। সম্ভবত ইনিই সুমনা বসু। জানতে চাইলেন, “আপনি কি দীপঙ্কর বাগচী?”
দীপকাকু বললেন, “হ্যাঁ, আবিরবাবু বুঝি নেই?”
“বাজারে গেছেন। চলে আসবেন এক্ষুনি। আপনারা ভিতরে এসে বসুন।”
আন্তরিক আমন্ত্রণ। ঝিনুকরা ঘরে এসে বসল। ড্রয়িংটা সুন্দর করে সাজানো। আবিরবাবুর স্ত্রীর চেহারাটাও ভারী মিষ্টি। দীপকাকু যথারীতি ঘরের চারপাশটায় চোখ বোলাচ্ছেন। সুমনা জিজ্ঞেস করলেন, “কী খাবেন, চা না কফি?”
দীপকাকু বললেন, “কিছুক্ষণ আগেই চা খেয়েছি। এখন থাক। আপনি প্লিজ বসুন না, কয়েকটা কথা জানার আছে।”
ডানহাতি সিঙ্গল সোফায় এসে বসলেন সুমনা। দীপকাকু শুরু করলেন, “আপনি নিশ্চয়ই জানেন আবিরবাবু আমাকে কোন কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন?”
অল্প ঘাড় হেলিয়ে “জানি” বললেন সুমনা। আর কোনও ভূমিকায় না গিয়ে সরাসরি প্রসঙ্গে চলে এলেন দীপকাকু, “বিষ্ণুমূর্তিটা তো আপনি দেখেছেন। ক’দিন আপনার ঠাকুরের জায়গায় মূর্তিটা ছিল। হাতেও নিয়েছেন জিনিসটা। খুব ভারী ছিল কি?”
“না। সাইজ অনুযায়ী যেমন ওজন হওয়ার কথা, তেমনই ছিল।”
“মূর্তিটার বিশেষ কোনও বৈশিষ্ট্য চোখে পড়েছে, মানে আমি বলতে চাইছি, মূর্তিটার চোখ-মুখ ভারতীয়দের মতো, নাকি মঙ্গোলিয়ান?”
উত্তর দিতে একটু সময় নিলেন আবিরবাবুর স্ত্রী। বললেন, “মুখ-চোখ ইন্ডিয়ান টাইপের। শুধু একটু বেশি কালচে মতো। কোনও কোনও জায়গায় শ্যাওলা-সবুজ। সব মিলিয়ে মূর্তিটাকে আমার ভক্তির চেয়ে ভয় করত বেশি। তার আসল কারণ হয়তো মূর্তির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মিথটা। আবিরদের বংশের সৌভাগ্য বহন করছে ওই বিষ্ণুমূর্তি। সেই দেবতার আবার একসময় ক্ষমতা লোপ পাবে। তা যদি আমার বাড়িতে থেকেই পায়! এসব অশুভ আশঙ্কার কথা ভেবেই আমি আবিরকে বলেছিলাম মূর্তিটা ব্যাঙ্কের ভল্টে রাখতে।”
কথা কেড়ে নিয়ে দীপকাকু বললেন, “জিনিসটা খোয়া গিয়ে একদিক থেকে ভালই হয়েছে, কী বলুন? আর কোনও ভয়, আশঙ্কা রইল না আপনার।
মুহূর্তে বিষণ্ণতার ছায়া নামল সুমনা বসুর মুখে। দৃষ্টি নিজের জোড় করা হাতের দিকে রেখে বললেন, “ভয়টা তো আমার ব্যক্তিগত। সেটা অমূলকও হতে পারে। যেমন, মূর্তি নিয়ে যে গল্পটা আমরা শুনেছি, সেটা বানানো হওয়ার চান্স বেশি। এ ধরনের অন্ধ বিশ্বাস বহু পরিবারে চালু আছে। এই সব ভিত্তিহীন ব্যাপার-স্যাপারের জন্য মূর্তিটা খোয়া যাওয়া মোটেই কাম্য নয়। বিশেষ করে ওটা যখন পরিবারসূত্রে পাওয়া আবিরের একমাত্র স্মৃতিস্মারক। সত্যি কথা বলতে কী, মূর্তিটা চুরি যাওয়ার পর থেকে আমি মরমে মরে আছি। লকারে না পাঠালে মূর্তিটা হয়তো চুরি যেত না।”
“চুরি যেতই।” বলে, বড় করে শ্বাস ছাড়লেন দীপকাকু। একটু সময় নিয়ে বললেন, “এই চুরিতে আপনারা কেউ আক্রান্ত হননি। বাড়ি থেকে হলে তেমন কিছু একটা ঘটে যেতে পারত।”
দীপকাকুর কথার বিরুদ্ধে গিয়ে সুমনা বললেন, “আক্রান্ত হইনি আমরা! গাড়ির ব্রেক কেটে দিয়েছে, বিচ্ছিরি অ্যাকসিডেন্ট হতে পারত আবিরের।”
এই সব কথার সূত্রে ঝিনুকের মনে পড়ে গেল, এ-বাড়ির আর-এক সদস্যের কথা। সুমনা বসুকে বলল, “আপনার মেয়ে কোথায়? তাকে তো দেখছি না!”
“স্কুলে গিয়েছে। মর্নিং স্কুল ওর।” বললেন সুমনা।
কথা ফুরিয়ে গিয়েছে দেখে সুমনা বললেন, “কেন যে এখনও আসছে না! একটু আগে ফোন করে আপনাদের আসার কথা বললাম। বলল, ‘এখনই আসছি।”“
সুমনা ঝিনুকদের সামনে কাউকে ফোন করেননি, অর্থাৎ মিলে গেল দীপকাকুর আন্দাজ। ঝিনুক চোখের ভাষায় দীপকাকুকে প্রশংসা করবে বলে তাকাল। দেখল, দীপকাকু একেবারে নিজস্ব উদাসীন ভঙ্গিতে বসে আছেন। সুমনাদেবী বললেন, “না, এবার আপনাদের জন্য একটু চা করি।”
কথা শেষ হল, বাজল ডোরবেল। সুমনা বলে উঠলেন, “ওই বুঝি এল!”
দরজা খুলতে উঠে গেলেন সুমনা। দীপকাকু একটু চাপা গলায় ঝিনুককে জিজ্ঞেস করলেন, “ভদ্রমহিলার সবচেয়ে কোন ব্যাপারে ইন্টারেস্ট বলো তো?”
“চা তৈরি করতে।” বলল ঝিনুক।
“না, ঘর সাজানোয়। এই ঘরটা দারুণ সাজিয়েছেন! বইয়ের র্যাকে দ্যাখো, প্রত্নতত্ত্বের বই, ইন্টিরিয়র ডেকরেশনের বিলিতি ম্যাগাজিন। যার মানে দাঁড়াল, বিষ্ণুমূর্তিটার মূল্য কিছুটা হলেও সুমনাদেবীর পক্ষে আন্দাজ করা সম্ভব। ঘর সাজাতে গেলে অনেক ধরনের শো পিস লাগে।”
দীপকাকু হয়তো আরও কিছু বলতেন, সন্দেহের তিরটা ফের বাগিয়ে ধরেছেন সুমনা বসুর দিকে, ঘরে এসে দাঁড়ালেন আবিরবাবু। হাতে বাজারের ব্যাগ। আক্ষেপের সুরে বললেন, “আই অ্যাম সো সরি। আপনারা এসেছেন শুনে রিকশা নিলাম। তাড়াতাড়ি আসা যাবে। তিনবার চেন পড়ল রিকশাটার। আপনাদের অনেকক্ষণ বসে থাকতে হল!”
“ইটস্ অল রাইট। কোনও অসুবিধে হয়নি আমাদের। আপনার স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল।” বললেন দীপকাকু।
বাজারের ব্যাগ স্ত্রীর হাতে চালান করে আবিরবাবু বসলেন সোফায়। বললেন, “আপনারা যদি একটু জানিয়ে আসতেন, বাজারে পরে বেরতাম।”
দীপকাকু বললেন, “আমরা ঠিক আপনার বাড়ি আসব বলে বেরইনি। এদিকে একটা কাজে এসেছিলাম, ভাবলাম দেখা করে যাই।”
সারপ্রাইজ ভিজিটের প্ল্যানটা ম্যানেজ দিলেন দীপকাকু।
আবিরবাবু বললেন, “ভালই করেছেন। আমার ফ্ল্যাটটা আপনাদের দেখা হয়ে গেল!”
স্বামী-স্ত্রী দু’জনের ব্যবহার খুব আন্তরিক। স্বভাবও মার্জিত। দীপকাকু কেন যে এঁদেরকেও সন্দেহের তালিকায় রেখেছেন! ঝিনুকের মনে হল বাবার কথাই ঠিক। দীপকাকু কেসটাকে অযথা জটিল করে দেখছেন! এতসব ভাবনার মাঝে দীপকাকু বলে উঠলেন, “আপনাদের পাড়ায় একটা লজ আছে না?”
ঝিনুক ভাবল, আবার লজ নিয়ে পড়লেন দীপকাকু! নাঃ, ব্যাপারটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না!
আবিরবাবু বললেন, “আছে তো! রামকৃষ্ণ লজ। আপনি কী করে জানলেন?” প্রশ্নটা পাশ কাটিয়ে দীপকাকু জানতে চাইলেন, “আপনার ফ্ল্যাট থেকে লজটা দেখা যায়?”
“বারান্দায় দাঁড়ালে দেখা যায়।” বললেন আবিরবাবু।
সোফা ছেড়ে উঠে পড়লেন দীপকাকু। বললেন, “চলুন, একবার দেখব।”
“বেশ তো! কারণটা জানতে পারি কি?”
“এখন নয়। সময় হলেই বলব।” বললেন দীপকাকু।
আবিরবাবুর পিছন পিছন ঝিনুকরা বারান্দায় এসে দাঁড়াল। আবিরবাবু আঙুল দেখিয়ে বললেন, “ওই যে লজটা!”
চারতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে লজের পুরোটাই দেখা যাচ্ছে। দীপকাকু একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। ঝিনুক সবে ভাবছিল, এবার নিশ্চয়ই দীপকাকুর প্যান্টের পকেট থেকে বেরবে ছোট্ট অথচ জোরালো দূরবিনটা। এবং ঠিক তখনই দূরবিনটা বেরল। ওটা চোখে দিয়ে দীপকাকু লজটা দেখছেন। দেখা যেন ফুরোচ্ছে না। লজের লোক ন্যায্য কারণে কমপ্লেন করতেই পারে। একসময় দেখা শেষ হল। দীপকাকু বললেন, “লজটায় একবার যেতে হবে। ম্যানেজারকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করার আছে।”
আবিরবাবু বললেন, “চলুন। ম্যানেজারের সঙ্গে ভাল আলাপ আছে আমার।”
“তা হলে যাওয়া যাক।” বলে, ঘরের দিকে ফিরলেন দীপকাকু। ড্রয়িং-এ এসে ঝিনুকরা দেখল, সেন্টার টেবিলে সাজানো আছে চা ছাড়াও আরও অনেক কিছু। কেক, বিস্কুট, চিপ্স, যাকে বলে একেবারে হাই টি!
.
রামকৃষ্ণ লজটা বাইরে থেকে যতটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন লাগছিল, ভিতরে এসে দেখা গেল উলটো। ভাঙা উঠোন, ফাটা দালান। ম্যানেজারবাবু মানুষটি যেন পুরনো বাংলা সিনেমার পার্শ্বচরিত্র। মাথায় টাক, চোখে চশমা, পরনে আধময়লা ধুতি-পাঞ্জাবি। দীপকাকুর কার্ড পড়ে রীতিমতো ঘাবড়ে গেলেন। বললেন, “আমাদের লজে কি কোনও কুখ্যাত লোক লুকিয়ে আছে স্যার?”
দীপকাকু বললেন, “এখন নেই। কিছুদিন আগে হয়তো ছিল।”
“কোন লোকটা স্যার?” কাঁপা গলায় প্রশ্ন করলেন লজ-ম্যানেজার বিনোদ সামন্ত। আলাপপর্বের গোড়ায় নামটা জানা গিয়েছে। দীপকাকু বললেন, “আপনাদের চারতলার পুবমুখো ঘরটায় এখন কোনও বোর্ডার আছে?”
“আছে, স্যার। মানে বুক আছে। একটু আগে লোকটা বেরিয়ে গেল, ফিরবে রাতে।”
“কবে এসেছে লোকটা?”
“কাল, স্যার।”
“তার আগে কে ছিল?”
“মাঝে তিনদিন ফাঁকা ছিল। তার আগে বুকিং ছিল গোপাল রায়ের।”
“কতদিন ছিলেন উনি?”
“দশ দিন।”
“দশ দিন!” বিস্ময়ের সঙ্গে কথাটা রিপিট করলেন দীপকাকু।
বিনোদবাবু বললেন, “অবাক হওয়ার কিছু নেই। এখানকার বোর্ডাররা অনেক দিন ধরেই থাকে। কলকাতায় যাদের আত্মীয়স্বজন নেই, এখানে উঠতেই পছন্দ করে বেশি। রেট অনেক সস্তা যে! কলকাতায় যারা কাজেকম্মে আসে, তারাই ওঠে।”
“গোপাল রায়ের বয়স কত?” জানতে চাইলেন দীপকাকু।
বিনোদবাবু বললেন, “তিরিশের নীচেই হবে। কালোর উপর সুঠাম চেহারা।”
“কী কাজে এসেছিল, জানেন?”
“তা কিছু বলেনি। মাঝেমধ্যে বাইক নিয়ে বেরিয়ে যেত।”
‘বাইক’ শুনে ঝিনুকরা তিনজনেই হোঁচট খেল। কপালে ভাঁজ ফেলে দীপকাকু জিজ্ঞেস করলেন, “কী রঙের বাইক নিশ্চয়ই খেয়াল আছে আপনার?”
“কালো।” বললেন বিনোদবাবু
হার্টবিট বেড়ে গেল ঝিনুকের। অপরাধী তার মানে এখানে এসেই ডেরা বেঁধেছিল। কিন্তু দীপকাকু সেটা জানলেন কী করে? ঝিনুক যতটা আশ্চর্য হয়েছে, তার চেয়েও বেশি অভিমান হচ্ছে দীপকাকুর উপর। মনে হচ্ছে, এই কেসে দীপকাকু অনেক কিছু গোপন করে যাচ্ছেন ঝিনুকের কাছে। অ্যাসিস্ট্যান্টকে ইনফর্ম করার মতো সৌজন্যটুকুও দেখাচ্ছেন না।
“আপনার রেজিস্টার খুলে গোপাল রায়ের নাম-ঠিকানাটা একবার দেখান তো!” বিনোদবাবুকে বললেন দীপকাকু।
টেবিলের উপর রাখা রেজিস্টার খুললেন লজ-ম্যানেজার। পাতায় আঙুল রেখে বললেন, “এই যে!”
দীপকাকু ঝুঁকে পড়ে দেখলেন, তারপর দেখল ঝিনুক। নাম গোপাল রায়, ঠিকানা ১৯বি, ডায়মন্ড হারবার রোড, কলকাতা-৭০০ ০০৮। কোনও ফোন নম্বর দেওয়া নেই
“আমি চারতলার ওই ঘরটা একবার দেখতে চাই।” প্রায় আদেশের সুরে বলে উঠলেন দীপকাকু।
বিনোদবাবু আমতা-আমতা করে বললেন, “কিন্তু স্যার, ওটা তো এখন অন্য লোকের ভাড়া নেওয়া। তা ছাড়া ঘরে তালা দিয়ে গেছে।”
“আপনাদের কাছে ডুপ্লিকেট চাবি থাকে। সেটা দিন। আর ওই ঘরে যে বয় সার্ভিস দেয়, তাকে ডাকুন।”
“নান্টু, নান্টু!” বলে, দু’বার হাঁক দিয়ে বিনোদবাবু ড্রয়ার খুলে ডুপ্লিকেট চাবি বার করে দিলেন।
“বলুন, বাবু!” বলে, বছর কুড়ির একটা ছেলে এসে দাঁড়াল বিনোদবাবুর সামনে।
বিনোদবাবু বললেন, “এঁদের একশো আট নম্বর ঘরটা খুলে দে।”
চাবিটা ম্যানেজারবাবুর কাছ থেকে নিয়ে নান্টু চাপা গলায় জানতে চাইল, “পুলিশ?”
“ওরকমই। তোকে যা বললাম কর।” বলে, রেজিস্টার বন্ধ করলেন বিনোদবাবু। নান্টুকে ফলো করে ঘুরে গিয়েছিলেন দীপকাকু। কী মনে পড়তে, দাঁড়িয়ে গেলেন। বিনোদবাবুর দিকে ফিরে বললেন, “একটা কাজ করুন তো! যে পাতায় গোপাল রায়ের নাম-ঠিকানা লেখা আছে, ওটা জেরক্স করে রাখুন। আমি উপর থেকে ঘুরে এসে নিয়ে যাব।”
“আচ্ছা, ঠিক আছে।” বললেও, মুখে বিরক্তি গোপন করতে পারলেন না ম্যানেজার।
নান্টুর সঙ্গে সিঁড়ি ধরে উঠতে থাকল ঝিনুকরা। চারতলায় এসে রুমের তালা খুলল নান্টু। চারজনই ঘরে ঢুকে দাঁড়ালেন। এ এক ধরনের অনধিকার প্রবেশ রুমটা একজন বুক করে নিশ্চিন্ত মনে তালা দিয়ে গিয়েছে। লোকটা খুবই অগোছালো প্রকৃতির। বেডকভার ঘাঁটা, দেওয়ালের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত দড়ি টাঙানো। গামছা, গেঞ্জি শুকোতে দেওয়া আছে। মেঝেয় লুটোচ্ছে খবরের কাগজ। সস্তার লজের আদর্শ রূপ। এই বোর্ডারটিকে নিয়ে ঝিনুকদের মাথাব্যথা নেই। ইনফরমেশন দরকার আগের লোকটার। দীপকাকু চলে গিয়েছেন জানলার কাছে। খোলা আছে পাল্লা। আবিরবাবুর ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে যেমন বাইনোকুলার লাগিয়েছিলেন চোখে, এখানেও তাই করলেন। তবে এখানে শুধু আবিরবাবুর ফ্ল্যাটটা দেখছেন না, রাস্তা, আশপাশ সবটাই দেখছেন। ওই ভঙ্গিতেই বললেন, “দশ দিন ধরে যে লোকটা এখানে ছিল, সে হামেশাই এই জানলার সামনে দাঁড়িয়ে থাকত, তাই না নান্টু?”
হঠাৎ প্রশ্ন এসে যাওয়ায় নান্টু একটু থতমত খেল। সামলে নিয়ে বলল, “বোর্ডাররা তো স্যার বেশিরভাগ সময় দরজা বন্ধ রাখে। তবে লোকটাকে বেশ কয়েকবার ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। সিগারেট খেত ওখানে দাঁড়িয়ে।”
“লোকটা ধূমপায়ী।” স্বগতোক্তি করে দীপকাকু বললেন, “কোন ব্র্যান্ডের সিগারেট খেত বলতে পারবে? ঘর পরিষ্কারের সময় নিশ্চয়ই প্যাকেট দেখেছ?”
“উইল্স খেত, স্যার।”
দূরবিন পকেটে পুরে ঘুরে দাঁড়ালেন দীপকাকু। নান্টুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কলকাতায় লোকটা কী কাজে এসেছিল জানো? ব্যাবসার কাজে, নাকি ওঁর কোনও আত্মীয় ভরতি ছিল এখানকার হসপিটালে?”
“লোকটা স্যার খুব কম কথা বলত। কিছুই জানতে পারিনি। চা-জলখাবার খেয়ে সকাল ন’টা নাগাদ বেরিয়ে যেত। কোনওদিন দুপুরে ফিরত, বেশিরভাগ দিন রাতে।”
“লোকটার সঙ্গে কেউ দেখা করতে আসত কি?”
“না, স্যার। একবারই মোটামতো একটা লোক এসেছিল দেখা করতে।”
“বয়স? দেখতে কেমন?” পরপর দুটো প্রশ্ন করলেন দীপকাকু।
নান্টু বলল, “চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে হবে। প্যান্ট-শার্ট পরে এসেছিল। দেখতে ভদ্রসভ্য। চোখে চশমা। আপনার মতোই হাইট।”
“গুড। এবার বলো তো গোপাল রায়ের কথার মধ্যে একটু হিন্দির টান ছিল কি?”
“না, স্যার। তবে বাংলার মধ্যেই একটু অন্যরকম টান ছিল। গ্রামের দিকে যেমন থাকে।”
“হুম!” বলে, চুপ করে গেলেন দীপকাকু। পায়চারি শুরু করলেন ঘরে। ঝিনুক এখনও নোটবুক বার করেনি। কিন্তু পয়েন্টস যে হারে বেড়ে যাচ্ছে, পরে মনে রাখতে পারলে হয়। দীপকাকু ফের নান্টুর কাছে জানতে চাইলেন, “লোকটা কি কিছু ফেলে গিয়েছে? যেমন ধরো, প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ, গেঞ্জি, জামা…”
নান্টু বলল, “না, স্যার। বোর্ডাররা কিছু না-কিছু ফেলে যায়। এই লোকটা একটা দেশলাই বাক্সও ফেলে যায়নি। আর এমন কিপটে, যাওয়ার সময় মাত্র দশ টাকা টিপ্স দিয়েছে।”
নান্টুর ক্ষোভ শুনে আর-একটু হলে হেসে ফেলত ঝিনুক। দীপকাকুর গম্ভীর মুখ দেখে সামলে নিল। আবিরবাবুও বেশ থমকে আছেন। নিবিষ্ট মনে জীবনের প্রথম গোয়েন্দা তদন্ত দেখছেন।
দীপকাকু বললেন, “বাইকের নম্বরটা বলতে পারবে নান্টু?”
উত্তর দিতে সময় নিল নান্টু। মাথা চুলকে কপালে টোকা মেরে বলল, “কিছুতেই মনে পড়ছে না স্যার। তবে একটা কথা বলতে পারি, লোকটা গাড়িটাকে খুব যত্ন করত। একদিন অন্তর ধুত গাড়িটা। টুকটাক সারাইয়ের কাজ জানত।”
“ওকে, ফাইন!” বলে, ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন দীপকাকু। ঝিনুকরাও বেরিয়ে এল। নান্টু তালা লাগাচ্ছে দরজায়। সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে দীপকাকু আবিরবাবুকে বললেন, “একটা কথা আপনার কাছে আগে জানা হয়নি, মূর্তিটা বসা অবস্থায় ছিল, না দাঁড়ানো ভঙ্গিতে?”
“পদ্মাসনে বসা।” বললেন আবিরবাবু।
“পদ্মফুলের উপর বসা ছিল কি?”
“রাইট! একদম ঠিক বলেছেন। পায়ের নীচে পদ্মপাপড়ির মোটিফ ছিল।” উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলেন আবিরবাবু।
ঝিনুক অবাক হল দীপকাকুর কল্পনাশক্তি দেখে। তদন্তের কাজ তেমন কিছু এগোয়নি। দীপকাকু এখনই যেন দেখতে পাচ্ছেন মূর্তিটা!
.
রামকৃষ্ণ লজ থেকে বেরিয়ে ঝিনুকরা তিনজন চলে এল গাছতলায়। লজ-ম্যানেজার গোপাল রায়ের নাম লেখা পাতাটার জেরক্স দিয়েছেন। বাইকে বসে দীপকাকু আবিরবাবুকে চিন্তান্বিত গলায় বললেন, “মনে হচ্ছে পুরুলিয়ায় একবার যেতে হবে।”
প্রস্তাব লুফে নিলেন আবিরবাবু। বললেন, “কোনও অসুবিধে নেই। কবে যাবেন বলুন?”
প্রশ্নটা যেন শুনতেই পেলেন না দীপকাকু! যেন নিজেকেই বলছেন সেইভাবে বলে গেলেন, “মূর্তিটার ইতিহাস জানা খুব জরুরি। আমার ধারণা মূর্তিটার ইতিহাসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সূত্র। যা ধরে আমরা সহজেই পৌঁছে যাব সমাধানে। চোরাই জিনিসটা না পেলেও, চোরকে অন্তত শনাক্ত করতে পারব।”
কথা কেটে আবিরবাবু বলে উঠলেন, “কিন্তু একটা মুশকিল আছে। মূর্তিটার ইতিহাস জানতে গেলে জেঠুমণির শরণাপন্ন হতে হবে আমাদের। সেক্ষেত্রে বিষ্ণুমূর্তিটা যে চুরি গিয়েছে, বলা চলবে না।”
“বলব না।” বললেন দীপকাকু।
আবিরবাবু বললেন, “তা হলে তো আপনার আসল পরিচয় গোপন করতে হয় জেঠুমণির কাছে?”
“করবেন। বলবেন, বন্ধুকে নিয়ে বেড়াতে এসেছেন।”
আবিরবাবু ফের জানতে চাইলেন, “তা হলে কবে যাওয়া হচ্ছে?”
“কাল বলব আপনাকে। এখানে আরও কিছু ইনভেস্টিগেশন বাকি আছে।” বলে, হেলমেটটা পরে নিলেন দীপকাকু। ঝিনুক সিটের পিছনে উঠে বসল।
বাইপাসে উঠে এল বাইক। এই মুহূর্তে ঝিনুকের জানার ইচ্ছে হচ্ছে না কোথায় যাচ্ছে। মাথায় ঘুরছে পুরুলিয়া। কোনওদিন যাওয়া হয়নি। বন্ধুরা কয়েকজন গিয়েছে, গল্প করেছে অযোধ্যা পাহাড়ের। এই কেসে খানিকটা অযোধ্যা পাহাড়ের পোরশান থাকলে ভাল হয়। ডাকিনী গুহায় হয়তো কোনও কাপালিক বিষ্ণুমূর্তিটা পুজো করছে। ঝিনুকরা গিয়ে পৌঁছতেই তেড়ে এল ত্রিশূল নিয়ে….। কল্পনা বেশ তরতর করে এগোচ্ছে। গল্পের মতো করে লিখলে কেমন হয়! আগে একবার ডিটেকটিভ গল্প লেখার চেষ্টা করেছিল ঝিনুক। সফল হয়নি। সাহায্য নিতে হয়েছিল দীপকাকুর। গল্পটা নিজের থাকছিল না। এখন বোধহয় পারবে। দীপকাকুর সঙ্গে থেকে মাথাটা আগের থেকে শার্প হয়েছে নিশ্চয়ই!
রোদ চড়ছে। রীতিমতো গরম করছে ঝিনুকের। দীপকাকুর এবার একটা গাড়ি কেনা উচিত। কথাটা একবার তুলেছিল ঝিনুক। দীপকাকু বললেন, “বাইকে চোর-বদমাশদের যেরকম চেজ করা যায়, কারে সেটা সম্ভব নয়।”
কথাটায় যুক্তি আছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত দীপকাকু বাইক নিয়ে কাউকে তাড়া করেছেন বলে শোনেনি ঝিনুক। এই কেসটায় হয়তো দরকার হতে পারে। কেননা, বাইক ব্যবহার করে অপরাধী।
.
দীপকাকুর পিছনে বসে ভবানীপুর অঞ্চলে চলে এসেছে ঝিনুক। মিন্টো পার্ক পেরিয়ে একটা দোকানের সামনে গাড়ি থামালেন। দোকানের নাম পড়ে হতাশ হল ঝিনুক। এত ঘোরাঘুরির পর অবশেষে এখানে! দোকানের নাম ‘অ্যান্টিক ওয়ার্ল্ড’। বাবা অনেক আগেই বলেছিলেন, এই সব দোকানে মূর্তিটার খোঁজ নিতে। দীপকাকুর এত পরে সেটা মাথায় এল!
কোনও কমেন্ট না করে দীপকাকুর সঙ্গে দোকানে এসে ঢুকল ঝিনুক। এই ধরনের দোকানে ঝিনুক এই প্রথম এল। কারুকার্যময় নানান জিনিস! বিশাল দেওয়ালঘড়ি, ঝাড়লণ্ঠন, মোমদানি, পিলসুজ, ওয়েল পেন্টিং, পুরনো ডিজাইনের কালচে চেয়ার, টেবিল, সোফা। নানান সাইজের মূর্তি। এত জিনিসের মধ্যে দোকানদার উধাও। ঘর জুড়ে অতীত-অতীত গন্ধ।
দীপকাকু ডাক দিলেন, “মিস্টার সাংভি, হ্যালো! মিস্টার সাংভি!”
“ইয়েস স্যার। আই অ্যাম হেয়ার।” বলে, আদ্যিকালের আসবাবের পিছন থেকে বেরিয়ে এলেন এক বৃদ্ধ। মাথার চুল পুরো সাদা। কাউন্টারে এসে দীপকাকুকে বললেন, “বলুন, মিস্টার বাগচী, হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ?”
ঝিনুক বুঝতে পারল এঁরা দু’জনেই পূর্বপরিচিত। দীপকাকু শুরু করলেন, “একটা বিশেষ দরকারে আপনার কাছে এলাম। আপনি তো অনেক মূর্তি কেনাবেচা করেছেন, চার হাতওলা বুদ্ধমূর্তি কখনও দেখেছেন?”
“দেখিনি, শুনেছি। ভেরি রেয়ার থিং। অনেক দাম হবে। আছে নাকি আপনার কাছে?”
দীপকাকু মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, “চার হাতের বিষ্ণুমূর্তি নিশ্চয়ই কমন?”
“কমন হলেও পুরনো জিনিস আজকাল পাচ্ছি কোথায়?”
ঝিনুক আন্দাজ করছে, মূর্তিটা এখানেই বিক্রি হয়েছে কি না সেটাই ঘুরপথে ভেরিফাই করছেন দীপকাকু। কিন্তু বুদ্ধমূর্তির কথাটা কেন এল বুঝতে পারছে না! দীপকাকু ফের সাংভিকে বললেন, “আপনার কাছে ছোট সাইজ়ের, এই ধরুন, ছ’ইঞ্চির কোনও বুদ্ধ বা বিষ্ণুমূর্তি আছে?”
“আছে। ছয়, আট, বারো, সব সাইজের একটা-দুটো করে পাবেন।”
“আপনি ছোট সাইজের দুটো অন্তত দেখান।”
“ওকে!” বলে, ধীর পায়ে আসবাবের আড়ালে চলে গেলেন সাংভি। একটু পরেই ফিরে এলেন দু’হাতে দুটো মূৰ্তি নিয়ে। দুটোই রাখলেন কাউন্টারের উপর। মূর্তি দুটো দেখতে প্রায় এক। দুটোরই দুটো করে হাত। বুদ্ধদেবের বিখ্যাত কাৰ্ল হেয়ার। বিষ্ণুর মাথায় মুকুট। মূর্তিগুলো হাতে নিয়ে উলটেপালটে দেখলেন দীপকাকু। আন্দাজে ওজনও নিলেন। সাংভিকে বললেন, “কলকাতার নামী পয়সাওলা লোক এই সব মূর্তি কালেকশন করে, তাই না?”
“ইয়েস। তারাই আমার অ্যাকচুয়াল কাস্টমার। লো ইনকাম গ্রুপের এক-দু’জন ঘর সাজানোর জন্য কিনতে আসে, কস্ট অ্যাফোর্ট করে উঠতে পারে না।” বললেন সাংভি।
ঝিনুকের খারাপ লাগে সেই সব রুচিশীলদের কথা ভেবে, যাঁদের শখ থাকলেও সাধ্য নেই। দীপকাকু জানতে চাইলেন, “যাঁরা এসব কেনেন, কালেকশনের পরিমাণটা কীরকম?”
“প্লেন্টি। না দেখলে আপনার বিশ্বাস হবে না। আমি একবার এক ভদ্রলোকের গণেশমূর্তির কালেকশন দেখতে গিয়েছিলাম। চার হাজার গণেশ দেখিয়েছিলেন। ইচ ওয়ান ওয়াজ ডিফারেন্ট ফর্ম দ্য আদার। রেয়ার কোনও পিসের খোঁজ পেলেই ওঁরা টাকার বান্ডিল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। একেবারে নেশার মতো ব্যাপারটা।”
ঝিনুক ভাবল, হয়ে গেল! যে মূর্তিটার খোঁজে তারা হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কলকাতার কোনও টাকার কুমিরের সংগ্রহশালায় নিশ্চয়ই ঢুকে গিয়েছে এতক্ষণে। সেখান থেকে জিনিসটা বার করা সহজ কাজ নয়। প্রথমে ধরতে হবে চোরকে, জানতে হবে, কার কাছে বিক্রি করেছে মূর্তিটা? কিন্তু চোরের নাগাল পাওয়া কি আদৌ সম্ভব? চুরি হয়েছে অনেক দিন হয়ে গেল।
বুদ্ধ আর বিষ্ণুমূর্তি দুটো আরও একবার ভাল করে দেখে নিয়ে দীপকাকু বিদায়ের অনুমতি নিলেন সাংভির কাছে। বললেন, “আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত।”
সাংভি বললেন, “কী বলছেন! আপনার মতো গুণী মানুষ এলে দোকানের প্রেস্টিজ বেড়ে যায়। ইউ আর অলওয়েজ ওয়েলকাম। আই উইল বি অ্যাট ইয়োর সার্ভিস।”
“থ্যাঙ্ক ইউ!” বলে, সৌজন্যের হাসি হাসলেন দীপকাকু। ঘুরে গেলেন দরজার দিকে। ঝিনুক তাঁকে অনুসরণ করল।
ঝিনুক এখন অ্যান্টিকের দোকানের বাইরে, মাথায় একশো প্রশ্ন। সব একসঙ্গে জিজ্ঞেস করা যায় না। তাই এক কথায় দীপকাকুর কাছে জানতে চাইল, “কী বুঝলেন?”
বাইকের সামনে দাঁড়িয়ে দীপকাকু বললেন, “জটিল রহস্য!”
“একটা সত্যি কথা বলব? পারমিশন চাইল ঝিনুক। হেলমেট পরতে পরতে দীপকাকু বললেন, “বলো।”
“এবারের কেসটায় আপনি কেমন যেন একটু এলোমেলো তদন্ত করছেন অথবা আমিই আপনাকে ঠিকমতো ফলো করতে পারছি না।”
“শেষের কথাটাই সঠিক। আমার ইনভেস্টিগেশনের প্রতিটি পদক্ষেপে জোরালো লজিক আছে। আজকের দিনটা ভাবো। কাল বিকেলে যাব তোমাদের বাড়ি। রজতদাকে নিয়ে বসব আলোচনায়। মনে হচ্ছে আমি সঠিক পথেই এগোচ্ছি।”
“পুরুলিয়ায় যাচ্ছি কবে?” জানতে চাইল ঝিনুক।
“কাল তোমাদের বাড়িতে বসেই ডিসিশন নেব।” বলে, বাইকে উঠে বসলেন দীপকাকু। ঝিনুকও হেলমেট পরে পিছনে বসল। কী মনে হতে অ্যান্টিকের দোকানের দিকে একবার তাকাল। সাদা চুলের সাংভি কাচের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে কেমন একটা দৃষ্টিতে ঝিনুকদের দেখছেন! ভঙ্গিটা সন্দেহজনক। ইনিও কি সন্দেহের তালিকায় চলে এলেন? দীপকাকু বাইক স্টার্ট দিয়েছেন। ভাবনাটা মাথা থেকে তাড়ানোর চেষ্টা করল ঝিনুক। দীপকাকুর সঙ্গে কাজ করে সন্দেহ করাটা ক্রমশ অভ্যেসে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।
