হেঁয়ালির অন্ধকারে – ৭

পরের দিন ঝিনুকের ঘুম ভাঙল অদ্ভুতভাবে। চোখ খুলে গেল, শরীর নড়ছে না। পাথরের মতো ভারী লাগছে। কী ব্যাপার হল! প্যারালিসিস হয়ে গেল নাকি? কাল ওই জাম্পটা দেওয়ার পর চোট লেগে কোনও নার্ভ বিকল হয়ে যায়নি তো? ঘরে ঢুকে পড়েছে ধবধবে রোদ। ভালই বেলা হয়েছে মনে হচ্ছে। কেউ তাকে ডাকেনি! ঝিনুক নার্ভাস গলায় ডেকে উঠল, “মাসি! সরলামাসি!”

কোনও সাড়া নেই। শরীরের সমস্ত শক্তি জড়ো করে পাশ ফিরল ঝিনুক। এ কী! মেঝেয় শুয়ে মাসি এখনও ঘুমোচ্ছে। রাতে মাদুর, চাদর পেতে মেঝেতেই শুয়ে ছিল। ঝিনুক বিছানায় আসতে বললেও রাজি হয়নি। কিন্তু এত বেলা পর্যন্ত মাসিও কেন ঘুমোচ্ছে?

জেঠুমণির ঘর থেকে বিগবেন ঘড়ির ঘণ্টা ভেসে আসছে। গুনতে থাকল ঝিনুক। উরি বাবাঃ, দশটা বাজল! পুরো দোতলাটা যেন ঘুমিয়ে আছে! কোথাও কোনও আওয়াজ নেই। বিছানা থেকে নিজেকে প্রায় ছাড়িয়ে নিয়ে মেঝেতে নামল ঝিনুক। মাসিকে ঠেলা দিয়ে ডাকল, “মাসি, ওঠো, অনেক বেলা হল!”

চোখ খুলল মাসি। মনে হল ঝিনুকের মতোই অবস্থা! এত আলো দেখে অবাক হয়েছে, অথচ শরীর নাড়াতে পারছে না। কোথাও কোনও একটা গন্ডগোলের গন্ধ পেল ঝিনুক। মাসিকে হাত ধরে তুলল। মাসি দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না, টলে গিয়ে বসে পড়ল মেঝেয়। বলল, “কী হল বলো দিকিনি, মাথা এমন পাক দিচ্ছে কেন?”

মাসিকে ছেড়ে ঝিনুক দৌড়ল জেঠুমণির ঘরে। দীপকাকু কী করছেন দেখতে হবে। ঝিনুকের রীতিমতো সন্দেহ হচ্ছে, যে ঘুম থেকে তারা উঠল, সেটা স্বাভাবিক নয়। কেউ তাদের ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল। ঘুমের ওষুধ স্প্রে করে দিয়েছে কি? ঘুম থেকে উঠে অন্যরকম একটা গন্ধও পেয়েছে ঝিনুক।

জেঠুমণির ঘরে দীপকাকু নেই। ঝিনুক ধরে নিল, বাথরুমে গিয়েছেন বোধহয়। কিন্তু ঘরে এসে দাঁড়াতেই আশপাশের জিনিসপত্তর যেন অন্য কথা বলল। বইপত্তর ছড়িয়েছিটিয়ে আছে ঘরে। স্টাডির চেয়ারটা উলটে পড়ে আছে। মেঝেয় বেশকিছু চটিজুতোর ছাপ। একই সঙ্গে ঝিনুক লক্ষ করল, দরজায় পরদাটা উপর থেকে অনেকটা ছিঁড়ে লুটোচ্ছে। দীপকাকুকে কেউ কি তুলে গিয়ে গেল! ঘর থেকে বেরনোর সময় আঁকড়ে ধরেছিলেন পরদা!

বুক ফাঁকা হয়ে গেল ঝিনুকের। গলা শুকিয়ে কাঠ। অনেক কষ্টে ডেকে উঠল, “আবিরবাবু! আবিরবাবু!”

.

দীপকাকু অপহৃত হয়েছেন। কারণটা সহজেই অনুমেয়। কাল রাতে দোতলার জানলার বাইরে থেকে দীপকাকুর সমস্ত কথা শুনেছিল দুষ্কৃতী। মূর্তির প্রকৃত দাম ঠিক করা দীপকাকুর পক্ষেই সম্ভব, বুঝতে পেরে অপহরণ করেছে তাঁকে। রাতে সদর দরজা বন্ধ ছিল। তবু ওরা কীভাবে যেন ঢুকে পড়ে! বাড়ির অন্ধিসন্ধি সবই তার মানে জানা। ধরে নেওয়া যায়, অপরাধীর এ বাড়িতে যাতায়াত আছে। অত্যন্ত নিপুণভাবে গোটা কাজটা সেরেছে তারা। প্রথমে ঘুমের ওষুধ স্প্রে করে ঝিনুক, সরলামাসি এবং আবিরবাবুকে অচৈতন্য করে দিয়েছিল। জেঠুমণির ঘরে দাঁড়িয়ে আবিরবাবুকে বারবার ডেকেও সাড়া পায়নি ঝিনুক। ঘরে গিয়ে ঘুম ভাঙাতে হয়েছিল। অপহৃত হওয়ার সময় দীপকাকুও হয়তো ঝিনুকদের ডেকেছিলেন অথবা আওয়াজ তুলেছিলেন চেয়ার ফেলে। শুনতে পায়নি কেউ। দীপকাকুকে উদ্ধার করতে পুলিশের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। ঝিনুক, আবিরবাবু এখন পুলিশের জিপে। শুনশান রাস্তা ধরে অযোধ্যা পাহাড়ের দিকে এগিয়ে চলেছে জিপ। পথের দু’পাশে ফসলের খেত, দূরে ছোট ছোট টিলা।

অপরাধীদের পান্ডার নামটা ঝিনুকের কাছ থেকে পেয়েছে পুলিশ। দ্রুত তদন্ত করে পুলিশ বার করেছে, দীপকাকুকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হতে পারে।

আজ সকালে আবিরবাবুকে যখন অপরাধীর নামটা বলেছিল ঝিনুক, ঘুমের আচ্ছন্নতা পুরোপুরি কেটে গিয়েছিল ওঁর। অবিশ্বাসের কণ্ঠে বলেছিলেন, “আমার বড়দা এসব কাণ্ড ঘটাচ্ছে! তুমি শিয়োর?”

ঝিনুক বলেছিল, “সেন্ট পারসেন্ট।”

“কী করে বুঝলে?”

“দীপকাকুর রেখে যাওয়া একটা সংকেত দেখে।” বলে, একটা কাগজ দেখিয়েছিল ঝিনুক। তাতে বড় বড় করে লেখা চারটে সংখ্যা, 29০1. কাগজটা ঝিনুক পেয়েছিল জেঠুমণির টেবিল থেকে। রাতে ওই টেবিল-চেয়ারে বসে কাজ করছিলেন দীপকাকু। দুষ্কৃতীরা এসে দাঁড়াতেই বুঝতে পারেন, হেঁয়ালি লেখা চিরকুট এবং এতক্ষণ ধরে লেখা কাজকর্ম কিছুই বাঁচানো যাবে না। তখনই দীপকাকু একটা কাগজে তাড়াহুড়ো করে চারটে সংখ্যা ঝিনুকের জন্য লিখে যান। অনুমান মিলে গিয়েছিল, ওরা সমস্ত কাজকর্ম সমেত দীপকাকুকে নিয়ে উধাও হয়ে যায়। অদরকারি ভেবে ফেলে যায় সংখ্যা লেখা কাগজটা। ঝিনুকেরও একটু সময় লেগেছিল কাগজটার গুরুত্ব বুঝতে। যখনই বুঝল, দৌড়ে গিয়ে লাগেজ থেকে বার করল নোটবুক। পরিষ্কার হয়ে গেল 29০1-এর মানে। আবিরবাবুকে ডেকে তুলে, অপরাধীর নাম বলার পর ঝিনুক বলল, “আপনি দাদার পোরশানে গিয়ে ওঁর খোঁজ করুন। যদি না পান, ইমিডিয়েট পুলিশে খবর দিন। এই সংকেতের মানে পরে আপনাকে বুঝিয়ে দেব।”

আবিরবাবুর বড়দাকে পাওয়া গেল না বাড়িতে। কখন বেরিয়েছেন কেউ বলতে পারল না। সময় নষ্ট না করে আবিরবাবুকে নিয়ে থানায় গেল ঝিনুক। দীপকাকু একজন ডিটেকটিভ জানার পর পুলিশ অফিসারের তৎপরতা বেড়ে গেল। ঝিনুক সহজেই অফিসারকে বুঝিয়ে দিল সংকেতের মানে। বলল, “কাজের গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্য আমরা কিছু কোড ল্যাঙ্গোয়েজ ব্যবহার করি। প্রতিটি সংখ্যার ক্ষেত্রে একটা অ্যালফাবেট ঠিক করা আছে আমাদের। সেই অনুযায়ী 2=F, 9=O, ০=N, 1=I। অর্থাৎ ‘ফণিভূষণ’। আবিরবাবুর বড়দা।”

আবিরবাবু তখন বললেন, “ফণি তো Phani হবে।”

ঝিনুক বলল, “কোড অত ডিটেলে করলে চলে না। আমরা আমেরিকান ইংলিশের বানান ফলো করি।”

আর কোনও প্রশ্ন ওঠেনি। ঝিনুক মনে মনে ধন্যবাদ দিয়েছিল অঙ্ক-পাগল অর্ণবকে। ভাগ্যিস দীপকাকুকে ক্রিপ্টেরিদমের অঙ্কটা দিয়েছিল সে। অর্ধেকটা সল্ভ করেছিল ঝিনুক। তখনই দীপকাকু বলেছিলেন, “পুরো অঙ্কটা লিখে রাখো। পরে কোড হিসেবে আমাদের কাজে লাগতে পারে।”

এত তাড়াতাড়ি কাজে লেগে যাবে, সেটা অবশ্য ভাবতে পারেনি ঝিনুক অপরাধীর নাম যেহেতু ঝিনুক বলে দিয়েছে, সহজ হয়ে গিয়েছে পুলিশের কাজ। প্রথম যাওয়া হয়েছিল ফণিবাবুর কাঠগোলায়। সেখানে চৌকিদার ছাড়া আর কেউ নেই। সে জানাল, ফণিবাবু গত চারদিন গোলায় যাননি। চৌকিদার বলল, “আপনারা স্টেশন রোডে বাবুর গ্যারাজে গিয়ে খোঁজ করতে পারেন।”

পেট্রল পাম্পের পিছনেই গাড়ি সারানোর গ্যারাজ। সেখানেও পাওয়া গেল না ফণিবাবুকে। কিন্তু একটা জিনিস দেখা গেল, কালো বাইক। মডেলটা ভোলেনি ঝিনুক। রং নিয়ে কনফিউশন ছিল। কাল রাতের অন্ধকারে কালো না নীল বোঝা যায়নি। লোকটা বোধহয় ফণিবাবুর গ্যারাজে কাজ করে। রামকৃষ্ণ লজের নান্টু বলেছিল, “গোপাল রায় নিজেই গাড়ি ঠিকঠাক করত। বাংলা উচ্চারণে কেমন একটু টান ছিল। লোকটা এই অঞ্চলের, ফণিবাবুর ডান হাত। ওঁর নির্দেশেই গিয়েছিল কলকাতায়। আবিরবাবুর গাড়ির ব্রেক এই লোকটাই কেটেছিল। সুমনকে বাইকে চাপায় সে-ই। চিন্তাসূত্র সাজিয়ে নেওয়ার পর গ্যারাজে কর্মরত কর্মীকে ঝিনুক জেরা করল, “বাইকটা কার?”

“স্বপনের।”

“সে কোথায়?”

“বাবুর সঙ্গে কাজে গিয়েছে।”

“কোথায়? কোন কাজে গিয়েছে?”

“বলতে পারছি না।”

লোকটার কথা শেষ হতেই ঝিনুক পুলিশ অফিসার মিস্টার পাণ্ডেকে বলল, “মিথ্যে কথা বলছে।”

সত্যি বলানোর সবচেয়ে সহজ পন্থা নিলেন অফিসার। দু’-চারটে চড়থাপ্পড় লোকটাকে মারতেই গড়গড় করে বলতে শুরু করল, “পাহাড়ে ছোট একটা বাড়ি আছে বাবুর। কাঠের ব্যাবসা যখন রমরম করে চলত, জঙ্গলের চোরাই কাঠ জমা হত ওখানে। এখন মাঝেমধ্যে সেখানে বেড়াতে যান। কাল সন্ধের দিকে গ্যারাজে ছিলেন বাবু। রাতের বেলায় গাড়ি করে স্বপনকে নিয়ে বেরন।”

“কী গাড়ি?” জানতে চাইলেন অফিসার।

লোকটা বলল, “জিপগাড়ি।”

অফিসার বললেন, “জিপ যখন নিয়েছে, পাহাড়ে গিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।” লোকটার কাছে বাড়ির লোকেশন জানতে চাইলেন অফিসার।

কর্মীটি বলল, সে নিজে কখনও যায়নি। শুনেছে, বাঘমুণ্ডির রাস্তা দিয়ে যেতে হয়। বড় ঝরনার কাছাকাছি।

“বুঝেছি। টুরগা ফল্স!” বলে, লোকটাকে নিয়ে জিপে উঠলেন অফিসার। আবিরবাবু তখন বললেন, “ওকে আবার নিচ্ছেন কেন? ও তো জায়গাটা চেনে না বলল।”

অফিসারের হয়ে উত্তর দিল ঝিনুক, “একে রেখে গেলে ফোন করে দেবে মালিককে। দীপকাকুকে নিয়ে আপনার দাদা চলে যাবেন অন্য কোথাও।”

সঙ্গে সঙ্গে ঝিনুকের বুদ্ধির তারিফ করলেন অফিসার। বললেন, “তুমি দেখছি তোমার কাকার যোগ্য অ্যাসিস্ট্যান্ট। এই তো চাই!”

কিছুক্ষণ হল ঝিনুকরা সমতল রাস্তা ছেড়ে পাহাড়ে উঠে পড়েছে। জিপে মোট যাত্রী সাতজন। ড্রাইভার নিয়ে চারজন পুলিশ, গ্যারাজের কর্মী সহ ঝিনুকরা তিনজন। দুষ্কৃতীরা কতজন এখনও জানা যাচ্ছে না। ঝিনুকরা পারবে তো পাল্লা দিতে! গ্যারাজের লোকটা বিমর্ষ হয়ে বসে আছে। ওকে অবশ্য নির্দল হিসেবে ধরা উচিত। গাড়িতে উঠে একটু ধাতস্থ হওয়ার পর বলল, “আমার চাকরিটা আর থাকবে না স্যার। বাবু ভাববেন, আমিই আপনাদের পথ চিনিয়ে নিয়ে এসেছি।”

উত্তরে পাণ্ডে বললেন, “মালিক জেলে গেলে চাকরি তোমার এমনিই থাকবে না। দেখব, অন্য কোথাও ব্যবস্থা করা যায় কি না।”

জিপ পাহাড়ি রাস্তা ধরার পর থেকে ঝিনুক লক্ষ করছে, মিস্টার পাণ্ডের মধ্যে টেনশনে টানটান ব্যাপারটা আর নেই। কেমন যেন একটু ঢিলেঢালা ভাব এসে গিয়েছে! সম্ভবত প্রাকৃতিক শোভার প্রভাবে। পথের একপাশে খাদ। দূরে দেখা যাচ্ছে ফেলে-আসা গ্রাম, মাঠ, পুকুর। অন্য পাশে পাহাড়ের গায়ে বড় বড় গাছ। অফিসার এখন প্রায় গাইডের ভূমিকা নিয়েছেন। ড্রাইভারের পাশে বসে বলে চলেছেন, “এই সব গাছ সরকারের লাগানো। দেখুন, কেমন ফাঁকা করে দিচ্ছে গ্রামের মানুষ! ওরাই-বা কী করবে? বড্ড গরিব! জঙ্গল থেকেই ওদের রুটিরুজি চালাতে হয়। ওই দেখুন, শিয়াল! গ্রামের দিকেও এখন এদের খুব কম দেখা যায়। এই জঙ্গলে শজারু দেখতে পাবেন। ময়ূরও দেখা যায়। ওই যে, বামনি নদীর ঝরনা! দারুণ না?”

হয়তো ভাল। ঝিনুকের মনে কোনও কিছুরই ছাপ পড়ছে না। দীপকাকুর জন্য চিন্তা হচ্ছে শুধু। মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাননি। চটিজুতো পড়ে আছে জেঠুমণির ঘরে। কেমন অবস্থায় আছেন কে জানে! কাকুর সেলফোনটা সঙ্গে নিয়েছে ঝিনুক। মনে ক্ষীণ আশা, যদি কোনওভাবে পালাতে পারেন দুর্বৃত্তদের ঘেরাটোপ থেকে, এসটিডি বুথে পৌঁছে গেলে ফোন করবেন প্রথমেই এই নম্বরে। জানেন, ঝিনুক অবশ্যই সেটটা সঙ্গে রাখবে।

“ব্যস, আর নয়! এখানে থামতে হবে।”

অফিসারের নির্দেশে জিপ থামাল ড্রাইভার কনস্টেবল। গাড়ির আওয়াজ থেমে যেতে নিস্তব্ধ হয়ে গেল চরাচর। শুধু কিছু পাখির ডাক। দূরে নির্দিষ্ট বিরতিতে কাঠ কাটার শব্দ ভেসে আসছে। খাড়াই পাহাড়ের দিকে আঙুল তুলে মিস্টার পাণ্ডে বললেন, “এখান থেকে প্রায় দুশো ফুট উঁচুতে টুরগা ফল্স। পিছনে গভীর জঙ্গল। বাড়িটা মনে হচ্ছে ওখানেই। এখান থেকে ট্রেক করে যেতে হবে। জিপে আরও কিছুটা রাস্তা যাওয়া যেত। গাড়ির আওয়াজ পেয়ে অ্যালার্ট হয়ে যাবে ওরা। আপনারা ট্রেক করতে পারবেন তো?”

কথাটা ঝিনুকদের উদ্দেশে বলা। ঝিনুক উত্তর দেওয়ার আগে আবিরবাবু বললেন, “নিশ্চয়ই পারব।”

দলটা গাছপালা সরিয়ে পাহাড় বেয়ে উঠতে থাকল। অফিসারের পাশে পাশে চলেছেন আবিরবাবু। কে বলবে, এই মানুষটিই ট্রেনের রং সাইড গেট দিয়ে নামার সময় পড়ে গিয়েছিলেন।

সূর্য এখন প্রায় মাথার উপরে। গাছের ছায়ার জন্যে ততটা গরম লাগছে না। পাহাড় ক্রমশ খাড়াই হচ্ছে। দমে টান পড়ছে সকলেরই। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে পড়ল একটু রেস্ট নিতে। ঝিনুক নিচ্ছে না। ও এখন সকলের আগে।

চড়াই শেষে বেশ খানিকটা জুড়ে সমতল। ইতস্তত বড় বড় গাছ। তার ফাঁক দিয়েই দেখা গেল বাড়িটা। কটেজ টাইপের। মাথায় অ্যাসবেসটসের ছাদ। বাড়ির একপাশের দেওয়াল দেখতে পাচ্ছে ঝিনুকরা। সেখানে দুটো বড় জানলা। বাড়ির মুখ অন্যদিকে। দূর থেকে বাড়িটাকে এত নিঝুম লাগছে, মনেই হচ্ছে না কেউ থাকতে পারে! ঝিনুকের আপশোস হল, দীপকাকুর বাইনোকুলারটার জন্য। নিয়ে এলে কাজে লাগত।

পাশে এসে দাঁড়ালেন পাণ্ডেবাবু। বললেন, “এবার কিন্তু আরও কসাসলি এগোতে হবে। বাড়িটার দিকে চোখ রেখে, দৌড়ে চলে যেতে হবে গাছের আড়ালে। ওরা যেন আমাদের দেখতে না পায়!”

অফিসারের নির্দেশমতো খানিকটা দৌড়ে গাছের আড়াল ধরে এগোতে লাগল দলটা। এমনকী ফণিবাবুর গ্যারাজের কর্মীটিও।

একসময় গাছ ফুরিয়ে গেল। ফিট তিরিশ দূরে কটেজের দুটো জানলা। প্ৰায় হামাগুড়ি দিয়ে ঝিনুক আর পাণ্ডেবাবু জানলা লক্ষ করে এগোতে লাগলেন। পায়ের নীচে শুকনো পাতার খসখস আওয়াজটা এড়ানো যাচ্ছে না। অবশেষে দু’জনে পৌঁছলেন দুটো আলাদা জানলায়। প্রথমে কাচ, তারপর ভারী পরদা। ঘরের ভিতরটা দেখার উপায় নেই। ঝিনুক এপাশ-ওপাশ সরে গিয়ে পরদার ফাঁক খুঁজল। পেয়েও গেল। দেখা গেল দীপকাকুকে। আছেন খুবই খারাপ অবস্থায়। চেয়ারের সঙ্গে পিছমোড়া করে বাঁধা হয়েছে। চশমাটা ঝুলছে নাকের ডগায়। চুল এলোমেলো। কী অসহায় লাগছে তাঁকে! এত কিছু সত্ত্বেও একটু যেন স্বস্তি পেল ঝিনুক। দেখতে যখন পাওয়া গিয়েছে, উদ্ধার করে আনবেই।

দীপকাকুর সামনে দাঁড়িয়ে তড়পাচ্ছেন ফণিভূষণ। কাচের জানলার জন্যে আওয়াজ বাইরে আসছে না। ফণিভূষণের দু’পাশে দুই চ্যালা। এদের মধ্যে একজন অবশ্যই স্বপন। কিন্তু কোনজন? ফণিভূষণের হাতে একটা কাগজ। ওটা দেখিয়ে দীপকাকুকে কীসব বলছেন। মনে হচ্ছে, নারায়ণবাবুর লেখা সেই চিরকুটটা। ফণিবাবু নিশ্চয়ই হেঁয়ালির মানে জানতে চাইছেন।

জানলা থেকে সরে এসে ঝিনুক অফিসারকে খুঁজল। উনিও পাশের জানলা থেকে চোখ তুলে ঝিনুকের দিকে হাত তুলে ‘থামস আপ’ করলেন। দলের বাকি সদস্যরা গাছের শেষ সারির আড়ালে অপেক্ষা করছেন। অফিসার ইঙ্গিতে তাঁদের নিজের নিজের পজিশনে থাকতে বললেন। বাড়ির দরজার দিকে পা বাড়ানোর আগে হাতের ইশারায় ডেকে নিলেন ঝিনুককে।

কটেজের সামনে নিচু বারান্দা। সন্তর্পণে অফিসারকে ফলো করে উঠে এল ঝিনুক। একটু পরে আর-একজন যোগ দিল তাদের সঙ্গে, আবিরবাবু। নির্দেশ অমান্য করেছেন বলে আকারে-ইঙ্গিতে ক্ষমা চাইলেন অফিসারের কাছে।

দরজার দু’পাশে আবিরবাবু, ঝিনুক। মাঝে পুলিশ অফিসার। আবিরবাবু ফিসফিস করে বললেন, “নক করবেন নাকি?”

মাথা নাড়লেন অফিসার। চাপা স্বরে বললেন, “পার্টির হাতে পিস্তল আছে, ফট করে চালিয়ে দিতে পারে!”

“তা হলে ভেঙে ফেলুন দরজা!” আবারও ফিসফিসিয়ে বললেন আবিরবাবু।

অফিসার বললেন, “অত সোজা নয়! দেখছেন না, মোটা সেগুন কাঠের পাল্লা। বললেই ভাঙা যায় নাকি!”

গলা খাদে রেখে বিস্ময়ের সঙ্গে আবিরবাবু বললেন, “পুলিশ তো হামেশাই কাঁধের ধাক্কায় দরজা ভাঙে দেখেছি!”

“সিনেমায় দেখেছেন। এক ধাক্কায় ভেঙে গেল দরজা। ওসব পিচবোর্ডে তৈরি। এই দরজা ভাঙুক দেখি! ভাঙতে হলে এক চান্সেই সাকসেস হতে হবে। সেকেন্ড চান্স দেবে না ক্রিমিন্যালরা।”

ঝিনুক ধৈর্য হারাল। এঁরা দু’জন তো গল্পগাছা শুরু করে দিলেন! বারান্দা থেকে নেমে গেল ঝিনুক। কিছুটা গিয়ে ফের ঘুরে দাঁড়াল। দরজার দিকে মুখ করে দৌড়তে থাকল। কালকেই চোট লেগেছিল পায়ে, কষ্ট হচ্ছে স্প্রিন্ট টানতে। হোক কষ্ট! বারান্দায় উঠেই জাম্প দিল। অফিসারের কাঁধে দু’হাতের ভর রেখে ডান পায়ে পাল্লার উপর সজোরে স্ট্রোক নিল। একটা পাল্লা সমেত ঝিনুক ছিটকে পড়ল ঘরের মেঝেয়। কোমর থেকে পিস্তল বার করার বদলে পাণ্ডে চেঁচিয়ে উঠলেন, “ওঃ, মাই গড়!”

পুলিশকে দেখেই দুষ্কৃতীরা হাত তুলে দাঁড়িয়ে পড়ল। অফিসার এবার পিস্তলটা বার করলেন। কটেজের বাইরে পাখিরা তুমুল কিচিরমিচির লাগিয়েছে। পাল্লা ভেঙে পড়ার আওয়াজে ঘাবড়ে গিয়েছে ওরা। ঝিনুক এগিয়ে এসে দীপকাকুর বাঁধন খুলতে থাকল। দীপকাকু বললেন, “দুটো পা-ই তো জখম করে ফেললে!”

কাকুর কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল, চোখের কোণটা শিরশির করে উঠল ঝিনুকের। জলটল আবার গড়িয়ে না আসে!