গল্প
উপন্যাস

হাতের মুঠোয় পৃথিবী – ৯

নয়

পরবর্তী দুটো দিন একই ভাবে কেটে গেল৷ প্রতিদিন খুব ভোরে ব্লেক আর জিপো চলে যায় ক্যারাভ্যানে, আর কিটসন ফিরে আসে কেবিনে৷ ঘণ্টাকয়েক বিশ্রামের পর সে আর জিনি বেরিয়ে পড়ে কেবিনের বাইরে—তাদের দৈনন্দিন অভিনয় পর্বকে বাস্তবানুগ করে তুলতে তারা হাতে-হাত রেখে ঘুরে বেড়ায় হ্রদের ধারে, নৌকো করে ভেসে বেড়ায় হ্রদের নীল জলে, অথবা সাঁতারে হয় পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী৷

জিপো সারাটা দিন লেগে থাকে ট্রাকের দরজার পিছনে৷ আর সেই সময়টা খবরের কাগজ পড়েই কাটিয়ে দেয় ব্লেক৷

দৈনন্দিন খবরগুলো ব্লেকের মনে রীতিমতো আশার উদ্রেক করল৷ কারণ পুলিশ ও সৈন্যবাহিনীর লোকেরা উধাও ট্রাকটাকে খুঁজতে দিশাহারা হয়ে পড়েছে৷ অবশ্য তারা এখনও অনুসন্ধানে ক্ষান্ত হয়নি, কিন্তু কাগজওলাদের কাছে পুলিশের বক্তব্যে হতাশার সুরটাই প্রকট হয়ে উঠেছে৷ শেষ পর্যন্ত তারা এই সিদ্ধান্তে এসেছে যে, ট্রাকটাকে অন্য কোনও গাড়িতে উঠিয়ে সরিয়ে ফেলা হয়েছে৷ কিন্তু অতবড় জিনিসটা কী করে যে বেমালুম অদৃশ্য হল সেটা তারা এখনও ভেবে পাচ্ছে না৷ তাদের ধারণা, ইতিমধ্যেই ট্রাকটাকে আমেরিকার বাইরে পাচার করে ফেলা হয়েছে৷ প্রায় পাঁচশো মাইল জায়গা জুড়ে তারা তন্নতন্ন করে অনুসন্ধান চালাচ্ছে এবং পুরস্কারের অঙ্ক বাড়িয়ে করা হয়েছে পাঁচ হাজার ডলার৷

দুশো সৈনিক ও পুলিশ মিলে ফক্স উডকে চিরুনির মতো আঁচড়ে দেখেছে, উধাও ট্রাকের কোনও হদিশ পাওয়া যায় কি না৷ তাছাড়া রাস্তায়-রাস্তায় শ্যেনচক্ষু মেলে টহল দিচ্ছে উড়ন্ত হেলিকপ্টার৷

সৈন্যবাহিনীর প্রধান কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, আজ হোক কাল হোক, ট্রাক তারা খুঁজে বের করবেই৷ কারণ ট্রাকটা যেভাবে অদৃশ্য হয়েছে, এবং এখনও পর্যন্ত হয়ে আছে, তা বাস্তবে সম্পূর্ণ অসম্ভব৷

পুলিশ ও সৈন্যবাহিনী যে হারে পরিশ্রম করে চলেছে, সেই একইভাবে পরিশ্রম করে চলেছে ব্লেক ও জিপো—ক্যারাভ্যানের ভেতরে, লোকচক্ষুর আড়ালে৷

গত দু-দিন ধরে জিপোর সমস্ত প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে৷

সারাদিন সে ক্যারাভ্যানের বদ্ধ আবহাওয়ায়, অসহ্য গরমের মধ্যে ধৈর্য ধরে কাজ করে গেছে৷ টুলে বসে ঘর্মাক্ত দেহে একমনে কান পেতে থেকেছে৷ মাঝে মাঝে বিরক্তিভরে ট্রাকের তালাকে অভিসম্পাত করেছে জিপো৷ কিন্তু কোনও ফল হয়নি৷ দ্বিতীয় কম্বিনেশন নম্বরটা তার অজ্ঞাতই থেকে গেছে৷

খবরের কাগজ পড়া আর জিপোর কার্যকলাপ লক্ষ করা ছাড়া ব্লেকের আর কোনও কাজ ছিল না৷ সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই যতই সময় গেছে, সে ততই চিন্তিত হয়ে পড়েছে৷ ক্যারাভ্যানের প্রচণ্ড গরম, তালা খোলার সমস্যা—ইত্যাদি চিন্তায় ব্লেকের স্নায়ুমণ্ডলী একেই ভারাক্রান্ত, তার ওপর জিনি ও কিটসনের কথা মনে হতেই সে অন্ধ ক্রোধে আরও উত্তেজিত হয়ে উঠেছে৷ কোথায় এখানে তারা গলদঘর্ম হয়ে পরিশ্রম করে চলেছে, আর কিটসন কি না জিনিকে নিয়ে ঘুরে ফিরে মজা লুটছে৷

কিটসন যতই নির্বোধ হোক না কেন, একদিনের একান্ত অবসরে জিনির মনের ওপর মোটামুটি একটা ছাপ সে রাখতে পেরেছে বলেই ব্লেকের ধারণা৷ কারণ পুরো তিন-তিনটে দিন হাতে পেয়ে কোনও মানুষই এমন সুযোগ হাতছাড়া করবে না৷ ব্লেক নিজে যদি মাত্র বারো ঘণ্টাও সময় পেত, তাহলে ওই সময়ের মধ্যেই জিনি তার কাছে আত্মসমর্পণ করত৷ সুতরাং বিরক্তি ও মানসিক অস্বস্তির মধ্যেও জিনি-কিটসনের ভাবনা তার মনে ঈর্ষা জাগিয়ে তুলল৷

তৃতীয় দিন সন্ধে ছটা নাগাদ জিপো ভেঙে পড়ল৷ অপরাহ্নের সূর্য তখন সুদুর পর্বতশ্রেণির আড়ালে আশ্রয় নিচ্ছে৷ বেলাশেষের রক্তিম আভা প্রতিফলিত হয়েছে হ্রদের স্বচ্ছ জলে৷ ঠিক সেই সময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে উন্মাদ হয়ে পড়ল জিপো৷

গত তিনদিন ধরে এই অসহনীয় পরিবেশে জিপো একটানা কাজ করে গেছে৷ কিন্তু এই মুহূর্তে সে উপলব্ধি করল, সে সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত হয়েছে৷

দ্বিতীয় কম্বিনেশন নম্বরটা সে মেলাতে পারেনি৷ কম্বিনেশন চাকতিটা সে একচুল-একচুল করে পুরোটা ঘুরিয়েছে, কিন্তু তবুও দ্বিতীয় নম্বরটা মেলেনি৷ কারণ জিপোর তীক্ষ্ণ কানে নম্বর মেলানোর অস্ফুট ধাতব শব্দটা ধরা পড়েনি৷ অর্থাৎ চাকতিটাকে সে প্রয়োজনমতো সতর্ক হাতে ঘোরাতে পারেনি৷ যার ফলে দ্বিতীয় নম্বরের বিশেষ জায়গাটা সে বরাবরই পার হয়ে গেছে৷ অর্থাৎ যে দক্ষ হাতজোড়া জিপোর গর্বের বস্তু ছিল, তারা কম্বিনেশন চাকতিকে তেমন সূক্ষ্মভাবে ঘোরাতে পারেনি৷

‘না, এ আমার দ্বারা সম্ভব নয়৷’ হঠাৎই চিৎকার করে উঠেছে জিপো৷ ট্রাকের দরজার গায়ে অবসন্নভাবে গা-এলিয়ে দিয়েছে৷ ‘এ তালা খোলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, এড! এভাবে বেগার খেটে কোনও লাভ নেই৷ বিশ বছর ধরে চেষ্টা করলেও এই ট্রাকের দরজা আমি খুলতে পারবও না! আমাকে ছেড়ে দাও, এড৷ আর কিছুক্ষণ থাকলে আমি পাগল হয়ে যাব৷’

জিপোর কণ্ঠস্বরে অপ্রকৃতিস্থতার আভাস ব্লেককে চঞ্চল করে তুলল৷ চট করে উঠে দাঁড়াল সে, রিভলভার হাতে এগিয়ে এল জিপোর কাছে৷

‘থামো!’ রিভলভারের নলটা জিপোর পাঁজরে চেপে ধরে খিঁচিয়ে উঠল ব্লেক, ‘যদি এই ট্রাকের তালা তুমি না খোলো, তাহলে তোমাকে আমি খুন করব!’

জিপো অসহায়ভাবে কান্নায় ভেঙে পড়ল৷ তার স্থূল দেহ কান্নার দমকে কেঁপে-কেঁপে উঠতে লাগল৷

‘তাই করো! খুন করো আমাকে৷ তুমি কি ভেবেছ মরতে আমি ভয় পাই?’ ভাঙা কর্কশ স্বরে জিপো চিৎকার করে উঠল, ‘কিন্তু এই শালার ট্রাকের তালা তুমি আমাকে খুলতে বোলো না! তার চেয়ে মেরেই ফেলো আমাকে! আমি আর পারছি না!’

রিভলভারের নল দিয়ে নৃশংসভাবে জিপোকে আঘাত করল ব্লেক—সরাসরি মুখের ওপর৷ জিপো ছিটকে পড়ল মেঝেতে৷ তার গাল কেটে দরদর করে রক্ত বেরোতে লাগল৷ সেই রক্তের ধারা গলা বেয়ে নেমে এল তার বুকের ওপর৷ ট্রাকের পাশেই অবসন্নভাবে পড়ে রইল সে চোখ দুটো যন্ত্রণায় বোজা৷

‘মেরে ফেলো! শেষ করে দাও আমাকে৷ আমি এসব আর সইতে পারছি না?’ জিপো হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রোগীর মতো আতঙ্কে আর্তনাদ করে উঠল৷ তার রক্তাক্ত মুখ বীভৎস হয়ে উঠেছে৷

‘থাম বলছি শাল কুত্তির বাচ্চা৷ নয়তো গলা টিপে তোকে শেষ করে দেব?’ মরিয়া হয়ে চিৎকার করে উঠল ব্লেক৷ জিপোর অবস্থা দেখে সে তখন চিন্তিত হয়ে পড়েছে৷ সত্যিই যদি জিপো শাসনের বাইরে চলে যায়, তাহলে তাদের সমস্ত পরিকল্পনাই ভেস্তে যাবে৷ তাছাড়া এই চেঁচামেচির শব্দ বাইরের লোকের কানেও তো যেতে পারে৷

‘আমি আবারও বলছি এড, আমাকে তুমি ছেড়ে দাও৷ এ তালা আমি খুলতে পারব না৷’ কান্নাভেজা স্বরে আকুতি জানাল জিপো৷ তারপর দু-হাতে মুখ ঢাকল৷

ঠিক সেই মুহূর্তে ক্যারাভ্যানের দরজায় কে যেন টোকা মারল একবার… দু-বার৷ ব্লেকের হৃৎপিণ্ড যেন হোঁচট খেল৷ কে এল এই অসময়ে?

জিনি আর কিটসনকে সে দেখেছে বুইক নিয়ে শহরের দিকে যেতে—সম্ভবত কিছু কেনাকাটা করতে৷ না, বর্তমান আগন্তুক যে ওদের দুজনের কেউ নয়, সে বিষয়ে সে নিশ্চিত৷ তাহলে…?

জিপো আবার তার গোঙানি শুরু করতেই ব্লেক তার হাত চেপে ধরে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিল, হিংস্র ফিসফিস স্বরে ধমকে উঠল, ‘চুপ করো৷ ক্যারাভ্যানের দরজায় কেউ এসেছে!’

জিপোর সারা শরীর আতঙ্কে কুঁকড়ে গেল৷ সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে গেল সে৷

ওরা দুজন নিশ্চল; শুধু কান খাড়া করে পরবর্তী ঘটনার অপেক্ষায় রইল৷

আবার শোনা গেলে দরজায় টোকা মারার শব্দ৷

হাতের ইশারায় জিপোকে তার জায়গায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে বলল ব্লেক৷ তারপর রিভলভারটা শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে পা টিপে-টিপে এগিয়ে চলল পরদা-ঢাকা জানলার দিকে৷ একপাশে দাঁড়িয়ে অতি সন্তর্পণে পরদার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারল সে৷

ক্যারাভ্যানের দরজায় দাঁড়িয়ে একটা বছর দশেকের বাচ্চা ছেলে৷ ক্যারাভ্যানটার দিকে সংশয়াপন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে মাঝেমাঝেই সে টোকা মেরে চলেছে৷ তার হাতে একটা খেলনা পিস্তল, দরজার দিকে তাক করা৷

ব্লেক চুপচাপ ছেলেটাকে লক্ষ করতে লাগল৷ তার ঠোঁটজোড়া নৃশংস হাসিতে সরে এসেছে দাঁতের ওপর থেকে৷ চোখে ক্রূর দৃষ্টি৷

ছেলেটার পরনে সুতির প্যান্ট, আর সাদা লাল ডোরাকাটা একটা জামা৷ পায়ে জুতো বা চটি কিছুই নেই৷ মাথায় অবহেলাভরে বসানো একটা ভাঙাচোরা শোলার টুপি৷ কৌতূহলভরা স্থির চোখে ছেলেটা তাকিয়ে আছে ক্যারাভ্যানের দরজার দিকে৷ তার সূর্যস্নাত মুখে কেমন একটা হতবুদ্ধি ভাব৷

বেশ কিছুক্ষণ ধরে ছেলেটা অবাক চোখে ক্যারাভ্যানটার দিকে চেয়ে রইল৷ তারপর যেন মনস্থির করে দরজার আরও কাছে এগিয়ে এল৷ হাত বাড়িয়ে জানলার চৌকাঠ চেপে ধরল সে৷ হাতের চাপে নিজের শরীরটাকে জানলা পর্যন্ত তুলতে চেষ্টা করল—সম্ভবত জানলা দিয়ে ক্যারাভ্যানের ভেতরটা দেখবার আশায়৷

ব্লেকের মুখের ভয়ার্ত, হিংস্র ভাব জিপোর চোখ এড়াল না৷ কিছু একটা বিপদের আশঙ্কায় তার বুক কেঁপে উঠল৷ ঝটপট উঠে দাঁড়িয়ে ব্লেকের কাছে এগিয়ে এল সে৷ ছেলেটাকে দেখেই জিপো যেন আঁতকে উঠল৷ তার হাত সজোরে আঁকড়ে ধরল ব্লেকের রিভলভার ধরা হাতের কবজি৷

‘না! একটা বাচ্চাকে তুমি গুলি করতে যাচ্ছ? তুমি কি পাগল হয়েছ, এড?’ জিপো তীব্রস্বরে ফিসফিস করে বলল৷

প্রচণ্ড এক ঝাঁকুনিতে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল ব্লেক৷ কিন্তু যখন সে দেখল, ছেলেটা শত চেষ্টাতেও জানলা পর্যন্ত উঠতে পারছে না, তখন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল৷

ছেলেটা জানলার চৌকাঠ ছেড়ে মাটিতে নেমে পড়ল৷ আবার অবাক চোখে তাকাল ক্যারাভ্যানের দিকে৷ চোখে মুখে হতাশা৷

কয়েক মুহূর্ত ক্যারাভ্যানের দিকে তাকিয়ে থেকে সে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল৷ ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে হ্রদের কিনারা ধরে হাঁটতে শুরু করল৷ বারকয়েক চিন্তিত ভাবে মাথা নেড়ে এগিয়ে চলল ছেলেটা৷

‘তোমার কি মনে হয় ও আমাদের কথা শুনতে পেয়েছে?’ উদগ্রীব স্বরে জানতে চাইল ব্লেক৷

‘কী জানি!’ ছেলেটার আকস্মিক উপস্থিতির মানসিক সংঘাতে জিপোর বিচার বিবেচনা হঠাৎই আবার ফিরে এসেছে৷

‘ওঃ, আমি তো ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম৷’ হাতের উলটোপিঠ দিয়ে মুখ মুছল ব্লেক, ‘জিপো তুমি এখানে এসে বসো; একটু বিশ্রাম নাও, আমি বরং তালাটা খোলবার চেষ্টা করি৷’

‘তুমি খুলবে তালা?’ অবিশ্বাস-বিরক্তিতে জিপো মুখ বিকৃত করল, ‘খবরদার বলছি, ওই তালায় তুমি হাত দেবে না৷ কাজের কাজ তো কিছুই পারবে না, উলটে যে নম্বরটা মিলিয়েছি সেটাকেও নষ্ট করে দেবে৷’

ব্লেক ক্ষিপ্রগতিতে হাত বাড়িয়ে চেপে ধরল জিপোর জামা৷ এক প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে রাগে চেঁচিয়ে উঠল, ‘তুমিও খুলবে না, আমাকেও খুলতে দেবে না, তাহলে তালাটা খুলবে কে?’

‘তুমি কি এখনও বুঝতে পারছে না, এড? এ তালা আমরা কোনওদিনই খুলতে পারব না৷ গত তিনদিন ধরে আমি এই তালাটার পেছনে লেগে থেকেছি৷ ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটানা পরিশ্রম করেছি৷ কিন্তু তাতে লাভ কী হল? শুধু একটা নম্বর মিলল, আর বাকিগুলো যেমনকে তেমনই রয়ে গেল, অথচ এই তালাটায় কম করে ছ-টা নম্বর আছে৷ অর্থাৎ পাঁচ-পাঁচটা নম্বর এখনও আমাকে খুঁজে বের করতে হবে৷ মেনে নিলাম, হয়তো সপ্তাহের চেষ্টার পর-একটা নম্বর আমি মেলাতে পারলাম—অবশ্য পারবই যে তেমন কোনও কথা আমি দিতে পারছি না৷ যদি খুঁজে পাই, তবে তখনও বাকি থাকবে চারটে সংখ্যা৷ ততদিনে আমি নির্ঘাত পাগল হয়ে যাব, এড!’ এই প্রচণ্ড গরমে কারও পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়৷ আমার পক্ষে তো নয়ই৷ অতএব, আমাকে বিদায় দাও৷ আমার যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে; আর নয়৷ শত টাকা দিলেও এ কাজ আমার পোষাবে না, বুঝেছো? এই অমানুষিক পরিশ্রমের মূল্য কখনও টাকা দিয়ে শোধ করা যায় না—যাবে না!’

‘আঃ থামো তুমি!’ ভীষণভাবে চিৎকার করে উঠল ব্লেক, ‘কী সব বকছ আবোল-তাবোল!’

কিন্তু ব্লেকের আত্মবিশ্বাসও টলে উঠল জিপোর কথায়৷ সে বুঝল, জিপোর কথায় যুক্তি আছে৷ ক্যারাভ্যানের ভেতরে এই উত্তপ্ত পরিবেশে তিন-চার সপ্তাহ কাটানোর কথা চিন্তা করতেই শিউরে উঠল ব্লেক৷

জিপো হতাশভাবে বসে পড়ল টুলে৷ যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখে হাত চাপা দিয়ে, নিরাশ চোখে চেয়ে রইল কম্বিনেশন চাকতিটার দিকে৷

‘দরজাটা কেটে ফেলা যায় না? জানতে চাইল ব্লেক৷

‘এই ক্যারাভ্যানে বসে? অসম্ভব৷ লোকেরা বাইরে থেকে অ্যাসিটিলিন টর্চের আলো দেখতে পাবে৷ তাছাড়া কিরকম গরম হবে একবার ভেবে দেখো তো৷ আর তার ওপর ক্যারাভ্যানে আগুন লাগবার ভয় তো রয়েছেই!’

‘আচ্ছা, ক্যারাভ্যানটাকে যদি পাহাড়ের ওপর নিয়ে যাওয়া যায়? ফ্র্যাঙ্ক বলেছিল, প্রয়োজন হলে ক্যারাভ্যানটাকে আমরা পাহাড়ের ওপর নিয়ে যাব৷ এখন আমারও মনে হচ্ছে, ও ছাড়া আর উপায় নেই৷ সেখানে তুমি ক্যারাভ্যানের দরজা খোলা রেখেই বেশ নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবে৷ কোনও অসুবিধে হবে না কী বলো?’

রক্ত বন্ধ করার আশায় রুমাল বের করে গালের ক্ষতস্থান চেপে ধরল জিপো, ‘আমার যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে৷ আর নয়৷ এবারে আমি বাড়ি ফিরতে চাই৷ এই হতচ্ছাড়া তালা খোলা কারোর কম্মো নয়? এ তালাকে কেউই শায়েস্তা করতে পারবে না!’

‘ঠিক আছে, ওদের দুজনের সঙ্গে কথা বলে দেখা যাক৷’ ব্লেকের গলায় হঠাৎই ফুটে উঠল শ্লেষের সুর, ‘কিন্তু তোমার সাহস গেল কোথায়? এই ট্রাকের ভেতরে রয়েছে দশ লক্ষ ডলার! দশ লাখ ডলার! একবার ভালো করে ভেবে দেখো, জিপো!’

‘ঢের ভেবে দেখেছি৷ দশ লাখ কেন, দশ কোটি হলেও আমি এর মধ্যে নেই৷’ জিপোর গলা উত্তেজনায় কাঁপতে লাগল, ‘তোমাকে তো বার বার একই কথা বলছি৷ তুমি কি বাংলাও বোঝ না?’

ব্লেক বসে পড়ল ক্যারাভ্যানের মেঝেতে, ‘থামো, অনেক হয়েছে৷ আগে ওদের দুজনের সঙ্গে কথা বলে দেখি৷’

ওদিকে জিনি আর কিটসন পনেরো মাইল দুরের শহরে সারা বিকেল ধরে কেনাকাটা করে ফিরে আসছে বুইক চালিয়ে৷ ওরা জানেও না ক্যারাভ্যানে ঘটে যাওয়া নাটকের কথা৷

স্থানীয় দোকান থেকে খাবার জিনিসপত্র কেনাকাটায় যে বিপদের সম্ভাবনা আছে, সেটা জিনি সহজেই বুঝতে পেরেছিল৷ কারণ দোকানদার খাবারের পরিমাণ দেখেই আন্দাজ করতে পারবে এ খাবার স্বামী-স্ত্রীর প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি৷ তখনই প্রশ্ন উঠবে অতিরিক্ত লোক সম্পর্কে৷ অর্থাৎ ব্লেক ও জিপোর উপস্থিতি সর্বসমক্ষে প্রকাশিত হয়ে পড়বে৷ তাই ওরা ঠিক করেছিল, রোজকার কেনাকাটা ওরা শহরে গিয়েই নিশ্চিন্তে সেরে আসবে৷

গত দুদিন ধরে কিটসন ও জিনি পরস্পরকে সঙ্গদান করেছে৷ এসেছে পরস্পরের মনের কাছাকাছি৷

নিজের অংশের টাকা পাওয়ার পর ও কিটসনের সঙ্গিনী হবে কি না, এ নিয়ে বেশ দ্বিধায় পড়ে গেছে জিনি৷ ও জানে, কিটসন ওকে ভালোবাসে৷ এবং ক্রমে ক্রমে জিনিও আবিষ্কার করেছে, কিটসনকে ও ভালোবেসে ফেলেছে৷ কারণ ব্লেকের মতো কিটসনের ব্যবহার অভদ্র বা রুক্ষ নয়৷ বরং কিটসনের সান্নিধ্য ওকে নিরাপত্তার ইঙ্গিত এনে দেয়৷

ওরা গাড়ি ছুটিয়ে চলেছে বড় রাস্তা ধরে—ফন হ্রদ অভিমুখে৷ থেকে থেকেই আড়চোখে কিটসনকে দেখছে জিনি৷ না, ভাঙা নাক বাদ দিয়ে কিটসনকে সুদর্শনই বলা চলে—ভাবল ও৷ হঠাৎই ওর ভীষণ ইচ্ছে হল আলেক্সকে সব কথা খুলে বলে—যে কথা বারবারই জানতে চেয়েছে সে, কিন্তু জবাব পায়নি৷

‘আলেক্স…’

কিটসন এক পলক দেখল জিনির দিকে; তারপর আবার চোখ রাখল সামনের রাস্তায়৷ জিনি পাশে থাকলে সে খুবই সতর্কভাবে গাড়ি চালায়৷

‘কী ব্যাপার? কিছু বলবে?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ—’ ইতস্তত করে কাঁধ ঝাঁকাল জিনি৷ কাঁধের ওপর বিশ্রস্তভাবে পড়ে থাকা চুলের গোছা হাত দিয়ে সরিয়ে নিল স্বস্থানে, ‘একদিন তুমি জানতে চেয়েছিলে কী করে ট্রাক বা তার টাকার খবর আমি পেলাম তাইতো?’

‘হ্যাঁ৷’

‘তুমি কি এখনও জানতে চাও, আলেক্স?’

কিটসন অবাক হল৷ আমতা আমতা করে জবাব দিল সে, ‘না মানে আমার এমনিই মনে হয়েছিল৷ তাছাড়া তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমার নাক গলানো উচিত হয়নি৷…কিন্তু এখন আবার তোমার সে কথা মনে হল কেন?’

‘তুমি আমার সঙ্গে অত্যন্ত ভালো ব্যবহার করেছ, আলেক্স৷ তোমার জায়গায় অন্য কেউ হলে আমার কাছে অসহ্য ও বিরক্তিকর হয়ে উঠত৷ কিন্তু তোমার মার্জিত, ভদ্র ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করেছে৷ তাই আমার সব কথা আমি তোমাকে খুলে বলতে চাই৷…আলেক্স, এর আগে আমি অন্য কোনও দলের হয়ে কখনও কাজ করিনি—’

কিটসন মাথা নাড়াল, ‘আমি তো কখনও তা ভাবিনি৷’

‘তুমি ভাবনি, কিন্তু মরগ্যান ভাবত৷ সে ভাবত, আমি অন্য কোনও দলের কাছ থেকে ট্রাক লুটের এই মতলবটা চুরি করে বেশি বখরার লোভে তোমাদের দলে এসে যোগ দিয়েছি: সে মুখে কখনও প্রকাশ না করলেও আমি জানতাম মরগ্যান মনে মনে কী ভাবছে৷’

অস্বস্তিভরে নড়েচড়ে বসল কিটসন৷ কারণ সে জানে, জিনির ধারণা বর্ণে-বর্ণে সত্যি৷ সত্যিই মরগ্যান তাই ভাবত৷

‘কী জানি। হতে পারে। তবে আমি কখনও ভাবিনি, তুমি আগে অন্য কোনও দলের হয়ে কাজ করেছ।’

‘আমি ওই ট্রাক এবং দশ লক্ষ ডলারের কথা জানতে পারি আমার বাবার কাছ থেকে। আমার বাবা ছিলেন রিসার্চ স্টেশনের প্রহরী।’ শান্ত স্বরে বলল জিনি।

‘তাই নাকি!’ চকিতে জিনির দিকে দেখল কিটসন, ‘তবে তো সবই তোমার জানা থাকার কথা।’

‘মনে কোরো না, আমি নিজেকে সতী সাধ্বী বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করছি।’ গাড়ির সিটে গা এলিয়ে দিল জিনি। চোখের দৃষ্টি সামনের রাস্তায় স্থির। ‘আমার মায়ের স্বভাব চরিত্র খুব একটা ভালো ছিল না। তার কিছু কিছু দোষ আমি যে পাইনি তা নয়।আমার বয়েস যখন দশ বছর, তখন মা বাবাকে ছেড়ে চলে যায়। মা সর্বদাই আমাকে বলত, টাকা ছাড়া এই দুনিয়া ফাঁকা। দিন-রাত সব সময় মায়ের মুখে কেবলই টাকার কথা শুনেছি। আমার বাবা ছিল ভালো লোক; কিন্তু হলে কী হবে, তার আয় ছিল খুব সামান্য। বাবা কোনওদিন আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি; কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার টাকার লোভ ক্রমশ বেড়ে চলল। যত বড় হতে লাগলাম, মনের সেই অদম্য লোভ ক্রমশ ততই বিরাট আকার ধারণ করতে লাগল। আমার মনে বয়ে যেত চিন্তার ঝড়—শুধুই ঐশ্বর্য কামনায়। ভালো জামাকাপড় কাকে বলে জানতাম না। ন-মাসে ছ-মাসে মাত্র একবার সিনেমা দেখার সুযোগ পেতাম। বেশির ভাগ সময়ই আমার কেটে যেত বিভিন্ন মনোহারি দোকানের শো-কেসের দিকে তাকিয়ে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম দামি দামি জিনিসগুলো—সেগুলো চিরকালই থেকে যাবে আমার নাগালের বাইরে; আর ঈর্ষা করতাম সেই লোকগুলোকে, যারা গোছা গোছা ডলারের নোট বের করে কিনে নিয়ে যেত শৌখিন প্রসাধনের জিনিসগুলো। আমার বাবা প্রায়ই বলত এই দশ ডলারের কথা। যতই শুনতাম ততই স্বপ্ন দেখতাম ওই দশ লক্ষ ডলারের। এমন সময় এল ওই নতুন ট্রাকটা। তখন এজেন্সি টাকাটাকে বিমা করবার প্রয়োজনও মনে করল না। বাবা বলত, নতুন ট্রাকের ওপর এত ভরসা করা ভালো নয়; কারণ ওই ট্রাকটাকে লুট করা এমন কিছু দুরূহ ব্যাপার নয়। আমি আর বাবা প্রায়ই ট্রাক লুটের ব্যাপারে পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা করতাম। ট্রাকটাকে ক্যারাভ্যানের ভেতরে ঢুকিয়ে চম্পট দেবার মতলবটা বাবারই। কিন্তু তা বলে ভেব না, বাবা সত্যি সত্যিই ট্রাক লুটের মতলবে ছিল। নেহাত সময় কাটানোর জন্যেই আমরা ও নিয়ে আলোচনা করতাম। কিন্তু আমি মাঝে মাঝে গভীরভাবে ভাবতাম ট্রাকটা লুট করার কথা। এবং ক্রমে ক্রমে ওই সর্বনাশা চিন্তা আমার মস্তিষ্ককে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল।’

কিটসন গাড়ির গতি অনেক কমিয়ে এনেছে। একমনে সে শুনছে জিনির কথা। দূরে পাহাড়ের মাথায় গোলাকার রক্তাক্ত সূর্য যেন শেষবারের মতো খুশির আবির ছড়িয়ে দিচ্ছে ওদের মনে। একসময় পাহাড়ের আড়ালে আশ্রয় নিল বেলাশেষের ক্লান্ত সূর্য।

‘আমার বাবা অত্যন্ত রুগ্ন ছিল।’ হাঁটুর ওপর আঙুল চালাতে-চালাতে বলে চলল জিনি, ‘চাকরি থেকে অবসর নিতে তখনও তার বছর দুয়েক বাকি ছিল। ওই অসুস্থ শরীর নিয়েও কাজ করে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারল না কোম্পানি তাকে ছুটি দিল কয়েক মাসের। কিন্তু নির্ধারিত ছুটির পরও ভালো হল না বাবার শরীর। কোম্পানি দিনকয়েক অপেক্ষা করে বাবাকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করে দিল; এবং একই সঙ্গে বাবার পেনসন পাওয়ার আশাও শূন্যে মিলিয়ে গেল। আমি কোম্পানির ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করে তাকে বুঝিয়ে বলতে চেয়েছিলাম, আমাদের অবস্থাটা; কিন্তু সে আমার কথায় কোনও কানই দিল না। আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করল, যেন আমি কোনও রাস্তার ভিখিরি। সুতরাং বাবা যখন মারা গেল, তখন স্থির করলাম, এ অবিচারের প্রতিশোধ আমি নেবই। তাই মনে মনে এক ঢিলে দু-পাখি মারার মতলব করলাম : বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়া হবে, আর সেইসঙ্গে আমিও হয়ে উঠব টাকার কুমির। সমস্ত প্ল্যানটাই আমার ছকে রাখা ছিল, কিন্তু সাহায্যের অভাবে অপেক্ষায় রইলাম। একদিন রাতে একটা কাফেতে বসে আছি, কানে এল দুজন লোকের কথাবার্তা। ওরা মরগ্যান সম্পর্কে কথা বলছিল। তাদের কথা শুনে বুঝলাম, মরগ্যানের মতো লোকের সাহায্যই আমার দরকার। সুতরাং তার কাছেই গেলাম। এই হল আমার কাহিনি। ট্রাক লুটের প্ল্যানটা বাবার মাথাতেই এসেছিল, কিন্তু ওটাকে কাজে লাগাবার কথা স্বপ্নেও কোনওদিন ভাবেনি।’

‘তোমার বাবার কথা শুনে দুঃখ পেলাম, জিনি।’

‘হ্যাঁ—পাওয়ারই কথা।’ কিটসন দেখল উত্তেজনায় জিনির হাত মুষ্টিবদ্ধ, ‘আলেক্স, এতসব ঝঞ্ঝাট বাধানোর জন্যে আমি দুঃখিত। আমি জানি, আমি অত্যন্ত নিষ্ঠুর, খারাপ মেয়ে; অর্থ-লালসায় আমার নারীসুলভ কোমলতা পর্যন্ত আচ্ছন্ন। এতসব জেনেশুনেও আমি তোমাদের এ কাজে নামতে বাধ্য করেছি। কিন্তু কখনও ভাবিনি অবস্থা এত খারাপের দিকে যাবে, এত জটিল হয়ে উঠবে। একটা লোককে খুন করার কথা বলা কত সহজ। আমরা সিনেমায় যখন নৃশংস হত্যার দৃশ্য দেখি, তখন সেটা আমাদের মনে বিন্দুমাত্রও রেখাপাত করে না। কিন্তু সত্যি-সত্যি যখন চোখের সামনে কোনও লোককে খুন করা হয়…।’

‘শোনো, জিনি, কিটসনের স্বরে ফুটে উঠল আগ্রহের সুর, ‘তুমি আর আমি এ কাজ ছেড়ে দেব। কী, রাজি? আমরা চলে যাব মেক্সিকোয়। এখনও বাঁচবার সময় আছে, জিনি। একবার ভেবে দেখো—।’

জিনি কিছুক্ষণ ইতস্তত করে মাথা নাড়ল, ‘না এখন আর তা হয় না। টমাস ও ডার্কসনকে খুন করার আগে আমাদের এ কথা ভাবা উচিত ছিল। ভাবা উচিত ছিল মরগ্যান মারা যাবার আগে। এখন এর শেষ দেখা ছাড়া আমার উপায় নেই, আলেক্স। কিন্তু ইচ্ছে হলে তুমি ছেড়ে দিতে পার। তুমি ছেড়ে দিলে আমি অন্তত খুব খুশি হব। আমার জন্যে তুমি ভেব না। আমার মনে হয়, দশ লাখ ডলার পাওয়ার আশা এখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তাছাড়া, আমি এখন চরম সীমায় এসে পৌঁছেছি। এর চেয়ে বেশি ক্ষতি আর আমার কী-বা হবে? কিন্তু তুমি ছেড়ে দাও, আলেক্স। তোমার এর মধ্যে আসাই উচিত হয়নি।’ জিনি তাকাল কিটসনের দিকে, ‘কিন্তু কেন তুমি এলে, আলেক্স? তুমি তো এ কাজে মন থেকে সায় দাওনি,আমি জানি। তুমি কেন আমাদের হয়ে ভোট দিলে, আলেক্স?’

কিটসন কাঁধ ঝাঁকাল, ‘একমাত্র তোমার জন্যে৷ যে মুহূর্ত থেকে তোমাকে দেখেছি, আমি আমার মন প্রাণ সব হারিয়ে বসে আছি৷’

‘আমি দুঃখিত, আলেক্স৷ আমি সত্যিই দুঃখিত৷’

‘আচ্ছা জিনি, টাকাটা পাওয়ার পর আমরা পরস্পরের সঙ্গী হলে কেমন হয়?’ সামনের ছুটে আসা পিচ ঢালা পথের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে প্রশ্ন করল কিটসন, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, জিনি৷ তোমার আগে কাউকে কোনওদিন এমন করে ভালো লাগেনি৷’

‘কী জানি…হয়তো তাই৷ টাকাটা পাওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করব, আলেক্স৷ যে কোনওরকম জটিলতাকে আমি ভীষণ ভয় করি৷ তুমি যদি আমাকে ব্যাপারটা ভাববার জন্যে কয়েকদিন সময় দাও, তাহলে খুব ভালো হয়৷’

আরেকটু হলেই বুইকটা রাস্তার ধারের পাহাড়ে গিয়ে ধাক্কা মারছিল! কিটসনের আকস্মিক অফুরন্ত আনন্দ, বিস্ময় যেন আর বাঁধ মানতে চাইছে না৷

‘তার মানে,—তার মানে তুমি…৷’

‘হ্যাঁ আলেক্স—’ কিটসনের হাতে হাত বোলাল জিনি, আমাকে একটু ভাববার সময় দাও৷’

ক্যারাভ্যানের ঘাঁটিতে ওরা যখন ফিরে এল, তখন সন্ধের অন্ধকার নেমে এসেছে৷

কিটসন কিনে আনা জিনিসপত্রগুলো রান্নাঘরে গুছিয়ে রাখল৷ তারপর চলল ক্যারাভ্যানের দিকে৷ খুশিতে তার মনে আর ধরে না৷ জিনি যে তার প্রস্তাবে সম্মত হবে তা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি৷

হ্রদের কাছটা এখন একেবারে নির্জন৷ সুতরাং ব্লেক ও জিপোকে বাইরে আনায় কোনও ভয় নেই৷

ক্যারাভ্যান থেকে ওরা দুজন যখন বেরুল, কিটসন বুঝল, কোথাও কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে৷

কারণ জিপো শ্লথ, অবসন্ন পায়ে মাথা নিচু করে এগিয়ে চলেছে কেবিনের দিকে৷ তার ডান গালে একটা লম্বা ক্ষত, তার থেকে এখনও অল্প-অল্প রক্ত বেরচ্ছে৷

কিটসন এ সবের কারণ জানতে চাইলে, জিপো কোনও জবাব দিল না৷ সোজা কেবিনে ঢুকে একটা আরাম-কেদারায় ধপ করে বসে পড়ল৷

ব্লেক বিবর্ণ মুখে সোফার দিকে বসল৷ তার চোখে এক কুৎসিত দ্যুতি৷ হাত বাড়িয়ে হুইস্কির বোতল আর একটা গেলাস তুলে নিল সে৷ কিছুটা নির্জলা তরল সে এক চুমুকে শেষ করে দিল৷ গা-এলিয়ে দিল সোফায়৷

‘একটা বাচ্চা ছেলে আমাদের ক্যারাভ্যানের চারপাশে ঘুরঘুর করছিল৷’ কিটসনকে লক্ষ করে বলল ব্লেক, কিটনস তখন কেবিনের দরজা বন্ধ করে তাতে তালা এঁটে দিচ্ছে, ছোঁড়াটা দরজা বেয়ে উঠে ভেতরটা দেখবার চেষ্টা করছিল৷’

আবহাওয়ার অস্বস্তির আভাস পেয়ে প্রশ্ন করল জিনি, ‘কিন্তু ট্রাকের তালার কী হল?’

ব্লেক হতাশভাবে কাঁধ ঝাঁকাল, ‘কিছুই হয়নি৷’ জিনির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলে চলল সে, ‘দ্বিতীয় কম্বিনেশন নম্বরটা মেলার কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না৷ তাছাড়া জিপোও আর প্রকৃতিস্থ নেই৷’

‘প্রকৃতিস্থ? তীক্ষ্ণস্বরে চিৎকার করে উঠল জিপো, ‘আমি এই মুহূর্তেই এ সব ছেড়েছুড়ে চলে যাচ্ছি৷ এ তালা খোলা আমার কর্ম নয়৷ আমার কথা তোমার কানে ঢুকেছে? আমি এর মধ্যে নেই৷’

জিনি শান্ত স্বরে জবাব দিল, ‘এখন আর তা হয় না, জিপো৷…কিন্তু ব্যাপারটা কী খুলে বলো তো?’

‘ব্যাপার?’ চেয়ারের হাতলে সজোরে এক ঘুষি বসিয়ে দিল জিপো, ‘এই প্রচণ্ড গরমে ওই বদ্ধ ক্যারাভ্যানের ভেতরে কাজ করা কারও সাধ্য নয়৷ সে যে কী অসহ্য গরম তা তুমি বুঝতে পারবে না৷ গত তিনদিন ধরে একটানা আমি তালার পেছনে লেগে থেকেছি, কিন্তু কোনও ফল হয়নি৷ সুতরাং এর ভেতরে আমি আর নেই৷’

‘তুমি ফ্র্যাঙ্ককে বলেছিলে তালাটা খুলতে প্রায় মাসখানেক লাগবে৷ কিন্তু এখন মাত্র তিনদিনের চেষ্টার পরই তুমি হাল ছেড়ে দিতে চাও?’

‘যাকগে, ওকে আর ঘাঁটিয়ো না৷’ জিনিকে লক্ষ করে বলল ব্লেক, ‘সকাল থেকে এই এক কথা নিয়ে বকর বকর করে আমি হন্যে হয়ে গেছি৷ তবে ক্যারাভ্যানের ভেতরটা বীভৎস গরম—ওই গরমে কাজ করা যায় না৷ আমার মনে হয়, শেষ পর্যন্ত হয়তো ফ্র্যাঙ্কের কথামতো আমাদের পাহাড়ের দিকে যেতে হতে পারে৷ ওই নির্জন জায়গায় ক্যারাভ্যানের পেছনটা খোলা রেখেই আমরা কাজ করতে পারব৷ নইলে এভাবে ওই বদ্ধ জায়গায় কারও পক্ষেই কাজ করা সম্ভব নয়—অন্তত আমাদের পক্ষে তো নয়ই৷’

‘কিন্তু পাহাড়ের ওপরে ওঠাতে বিপদের সম্ভাবনাও প্রচুর,’ জিনিকে যেন একটু চিন্তিত দেখাল, ‘এখানে কয়েকশো ক্যারাভ্যানের মধ্যে অতি সহজেই আমরা গা-ঢাকা দিতে পারি, কিন্তু ওই নির্জন পাহাড়ি এলাকায় কেউ যদি আমাদের সন্ধান পায় তবে সন্দেহ করতে বাধ্য৷’

‘কিন্তু সে ঝুঁকি নেওয়া ছাড়া আর তো উপায় দেখছি না৷’ ব্লেক অধৈর্য স্বরে বলে উঠল৷ ‘জিপো যদি একান্তই ওই তালা খুলতে না পারে, তাহলে বাধ্য হয়েই আমাদের হয়তো অ্যাসিটিলিন টর্চ ব্যবহার করতে হবে—এবং সেটা এই ফন হ্রদ এলাকায় বসে করা সম্ভব নয়৷’

‘পুলিশ এখনও প্রতিটি রাস্তায় টহল দিচ্ছে৷’ অস্বস্তিভরে বলল কিটসন, ‘রাস্তায় তারা আমাদের বাধা দিতে পারে, এড৷ তাছাড়া আরই একটা অসুবিধে আছে, আমরা এখনও নিশ্চিতভাবে জানি না, বুইকটা অতো ভারী ক্যারাভ্যানটাকে পেছনে নিয়ে পাহাড়ি রাস্তায় উঠতে পারবে কি না৷ ওই রাস্তায় আমি আগেও গেছি৷ রাস্তাট ঢালু তো আছেই, তার ওপর এবড়ো-খেবড়ো—কিছুদিন আগে রাস্তাটার কিছু অংশ ঝড়ে ভেঙে গেছে বলে শুনেছি৷’

‘আমাদের দ্বিতীয় কোনও পথ নেই, আলেক্স৷ এ ঝুঁকি আমাদের নিতেই হবে৷ আগামীকাল দুপুরে যদি আমরা রওনা দিই, তাহলে সন্ধে নাগাদ আমরা পাহাড়ি রাস্তায় পৌঁছে যাব৷ কিন্তু আমাদের একটা তাঁবু আর কিছু খাবারের প্রয়োজন৷ অর্থাৎ জিপো ট্রাকের তালা না খোলা পর্যন্ত আমাদের বেশ কষ্ট করেই দিন কাটাতে হবে৷’

‘আমি থাকছি না, এড৷’ ভয়ঙ্কর স্বরে চেঁছিয়ে উঠল জিপো, ‘আমি বাড়ি ফিরে যাচ্ছি৷’

ব্লেক কিছু একটা জবাব দিতে যাচ্ছিল, এমন সময় শোনা গেল দরজায় কারও টোকা মারার শব্দ৷

কিছুক্ষণ উৎকণ্ঠাময় নিস্তব্ধতা৷ তারপর রিভলভার উঁচিয়ে ধরে আস্তে-আস্তে উঠে দাঁড়াল ব্লেক৷

জিপো বিবর্ণ মুখে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল, দেখতে চেষ্টা করল দরজার দিকে৷

জিনি চাপা উত্তেজিত স্বরে ফিসফিস করে উঠল, ‘লুকিয়ে পড়ো৷ যাও, শিগগির তোমরা শোবার ঘরে গিয়ে লুকিয়ে পড়ো৷’

ব্লেক জিপোর হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টানে তাকে দাঁড় করাল তারপর টানতে টানতে নিয়ে গেল শোবার ঘরে৷ কিটসন দুরুদুরু বুকে এগিয়ে গেলে কেবিনের দরজার দিকে৷ খুলে দিল দরজা৷

দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ফ্রেড ব্র্যাডফোর্ড৷

‘এই যে, মিঃ হ্যারিসন, অসময়ে বিরক্ত করলাম বলে মাপ চাইছি৷ মিসেস হ্যারিসন কোথায়? রান্নাঘরে বুঝি?’

‘হ্যাঁ৷’ দরজাটা পুরোপুরি আগলে দাঁড়াল কিটসন, ‘কিন্তু ব্যাপার কী বলুন তো?’

‘সামান্যই৷ চলুন, ভেতরে গিয়ে বসি, বেশিক্ষণ আপনাকে আটাকাব না৷’

কিটসনকে ইতস্তত করতে দেখে জিনি দ্রুতপায়ে এগিয়ে এল দরজার কাছে, মিঃ ব্র্যাডফোর্ডকে অভ্যর্থনা জানাল জিনি৷

ব্র্যাডফোর্ড এসে ঢুকল বসবার ঘরে৷ তাকে দেখে একটু দ্বিধাগ্রস্ত মনে হল৷

‘বলুন কী খাবেন? হুইস্কি না জিন?’ কিটসন ভদ্রতার খাতিরে প্রশ্ন করল৷

‘ধন্যবাদ৷ এখনই ঠিক ভালো লাগছে না৷’ ব্র্যাডফোর্ড বসল একটা চেয়ারে৷ হাঁটুতে হাত ঘষতে লাগল একমনে৷ ‘শুধু শুধু আপনাদের দেরি করাব না, মিঃ হ্যারিসন৷ আমার ছেলে বিকেলের দিকে হ্রদের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছিল৷’ ব্র্যাডফোর্ড সরাসরি চোখ রাখল কিনসনের চোখে, ‘ও বলছে, আপনাদের ক্যারাভ্যানের ভেতরে নাকি দুজন লোক ছিল৷’

কিটসনের হৃৎপিণ্ড আচমকা লাফিয়ে উঠল গলার কাছে৷ সে বিহ্বল চোখে তাকাল জিনির দিকে৷ ব্র্যাডফোর্ডের কথার কী উত্তর দেবে ভেবে পেল না৷

শান্তস্বরে জবাব দিল জিনি, হাসল ব্র্যাডফোর্ডের দিকে চেয়ে, ‘তারা আমাদের পরিচিত লোক, মিঃ ব্র্যাডফোর্ড৷ আমরা তাদের বলেছিলাম, ছুটি কাটানোর জন্যে আমাদের ক্যারাভ্যানটা তাদের দিনকয়েকের জন্যে ব্যবহার করতে দেব৷ হয়তো আমরা যখন বাইরে ছিলাম তখন তারা এসেছিল ক্যারাভ্যানটা ঘুরেফিরে দেখতে৷’

ব্র্যাডফোর্ডের মুখ থেকে সংশয়ের ছায়াটা মিলিয়ে গেল, ‘আরে আমিও তো তাই বলছিলাম, কিন্তু কে শোনে কার কথা? ও ঘুরিয়ে ফিরিয়েই কেবলই বলছে, লোক দুটো নাকি চিৎকার করে বিশ্রীভাবে ঝগড়া করছিল৷ বাচ্চা ছেলে তো, তাই একটুতেই ভয় পেয়ে গিয়েছিল৷ ও ভেবেছে ওরা বোধ হয় কোনও ডাকাত-টাকাত হবে৷’

জিনি হাসল, ‘না, ডাকাত-টাকাত না হলেও ওই লোক দুজনের স্বভাবচরিত্র তেমন ভালো নয়৷ অন্তত আমি তো ওদের একটুও বিশ্বাস করি না৷ দিন-রাতই কেবল নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছে!…কিন্তু তা হলে কী হবে, বেড়াতে যাবার সময় দুজনেই হরিহর আত্মা!’

‘কিন্তু আমার ছেলে ওদের দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল৷ তাই ভাবলাম, ব্যাপারটা আপনাদের জানিয়েই যাই৷ বলা যায় না, কী থেকে কী হয়ে যায়; জানেন, এই ফন হ্রদের মতো জায়গাতেও বেশ কয়েকবার ডাকাতি হয়ে গেছে৷ অবশ্য ওরা যখন আপনাদের পরিচিত লোক বলছেন, তখন আর…’

‘চিন্তার কিছু নেই৷’ ব্র্যাডফোর্ডের কথার খেই ধরে দিল জিনি, ‘তবু আপনি এসে ব্যাপারটা জানিয়ে ভালোই করেছেন৷ কিন্তু আপনি কি একেবারে শুধু মুখেই ফিরে যাবেন?’

‘না, না, ওর জন্যে ব্যস্ত হবেন না৷ পরে একদিন হবেখন৷’ নাকে বার দুয়েক হাত ঘষে ভুরু কোঁচকাল ব্র্যাডফোর্ড, ‘যাক, আর আপনাদের সময় নষ্ট করব না, মিসেস হ্যারিসন, এখন চলি৷ বাচ্চা ছেলে তো, তাই সবকিছুতেই রহস্যের গন্ধ পায়৷ এই যে কাগজে ট্রাক লোপাটের যে খবর দিয়েছে, সেটা পড়ে আমার ছেলে কী ভাবছে জানেন? বলছে, ট্রাকটা কোথায় লুকোনো আছে তা ধরে ফেলেছে৷ ট্রাকটাকে নাকি লুটেরার দল একটা বড়সড় ক্যারাভ্যানে লুকিয়ে রেখেছে…বুঝুন কাণ্ড! হাঃ, হাঃ৷’

ব্র্যাডফোর্ডের হালকা কথাগুলোর কিটসনের কানের কাছে যেন বাজ পড়ল৷ আচমকা মুষ্টিবদ্ধ হল তার হাত৷ চটপট পকেটে হাত ঢুকিয়ে সে টান-টান হয়ে দাঁড়াল৷

জিনির নির্বিকার মুখে নেমে এল কাঠিন্যের সামান্য আভাস৷ নিষ্প্রাণ স্বরে ও বলে উঠল, ‘ক্যারভ্যানের ভেতরে? এ ধারণা তার কেমন করে হল?’

সাধে কি আর বলি এঁচোড় পাকা ছেলে! হাসতে-হাসতেই জবাব দিল ব্র্যাডফোর্ড, ‘আমার মনে হয়, এখানে এসে এই ক্যারাভ্যানের ছয়লাপ দেখে আমার সুপুত্তুরের মাথায় বুদ্ধি গজিয়েছে৷…কিন্তু একটা কথা কী জানেন, ওর ধারণাটা খুব একটা অযৌক্তিক নয়৷ ও বলছে, এই ক্যারাভ্যানগুলো খুঁজে দেখার কথা পুলিশ ভেবেও দেখবে না৷ না দেখাটা খুব একটা আশ্চর্য নয়, কী বলেন৷’

‘হ্যাঁ, আমার তাই ধারণা৷ তবে মিঃ ব্র্যাডফোর্ড, আপনার ছেলের কল্পনাশক্তির তুলনা নেই!’

‘তা সত্যি বলেছেন৷ ও কেবলই আমাকে বলছে, পুলিশের কাছে গিয়ে এই সন্দেহের কথা জানাতে৷ ও ভাবছে, ট্রাকটাকে যদি কোনও ক্যারাভ্যানের ভেতরে লুকোনো অবস্থায় খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে পুরস্কারের টাকাটা সেই পাবে৷ কাগজে দেখেছেন, পুরস্কারের টাকাটা বাড়িয়ে পাঁচ হাজার করে দেওয়া হয়েছে? নাঃ, টাকার পরিমাণটা নেহাত কম নয়৷’

কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর জিনি মুখ খুলল, ‘পুরস্কারের টাকাটা পুলিশ ওকে দেবে বলে তো মনে হয় না৷ আপনার কি মনে হয়? শেষে বাচ্চা ছেলে বলে ঠকাবে না তো?’ জিনির হাসিতে ঈষৎ যান্ত্রিক ছোঁয়া৷’

হ্যাঁ—-তা বলতে পারেন৷’ ইতস্তত করে বলল ব্র্যাডফোর্ড, ‘আসলে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না পুলিশে খবর দেওয়া উচিত হবে কি না৷ তবে আপনাকে বলে রাখছি, মিসেস হ্যারিসন, ছোঁড়াটা কিছু না কিছুর সন্ধান পেয়েছেই৷ অবশ্য পুলিশ এসব কথাকে বিশেষ পাত্তা দেবে বলে মনে হয় না৷’

‘আপনারও তো একটা ক্যারাভ্যান আছে, মিঃ ব্র্যাডফোর্ড, তাই না?’ তাহলে পুলিশ যদি ট্রাক লুটের ব্যাপারে আপনাকেই সন্দেহ করে বসে, তবে আমি কিন্তু অবাক হব না৷ শেষে হয়তো আপনার ক্যারাভ্যান নিয়েই ওরা টানাটানি করবে৷… জানেন, একবার বাবারও অমনি হয়েছিল৷ তিনি কতকগুলো মুক্তো খুঁজে পেয়ে থানায় জমা দিতে গিয়েছিলেন; ভেবেছিলেন কিছু পুরস্কার টুরস্কার পাওয়া যাবে, কিন্তু উল্টো পুলিশ তাঁকেই গ্রেপ্তার করল৷ তারপর মাসখানেক ধরে কোর্ট-কাছারি, টানা-হ্যাঁচড়ার পর তিনি ছাড়া পান৷ তারপর থেকে বাবা ভুলেও কোনওদিন পুরস্কারের কথা উচ্চারণ করেননি৷’

ব্র্যাডফোর্ডের চোখ বিস্ফারিত হল বিস্ময়ে, ‘বলেন কী? আমি তো এদিকটা একেবারেই ভাবিনি৷ না ম্যাডাম, আমি আর ওর মধ্যে নেই৷ ভাগ্যিস আপনার সঙ্গে আলোচনা করছিলাম৷ শখ করে জেলে যাওয়ার সাধ আমার নেই৷’

ব্র্যাডফোর্ড চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল৷

‘এই বোধ হয় আমাদের শেষ দেখা’, মিঃ ব্র্যাডফোর্ডের দিকে চেয়ে হাসল জিনি, ‘কারণ কালই আমরা এ জায়গা ছেড়ে চলে যাচ্ছি৷’

‘তাই নাকি কেন, ফন হ্রদ বুঝি আপনাদের ভালো লাগল না? আমার কিন্তু বেশ লাগে জায়গাটা—কেমন খোলামেলা, সুন্দর—’

‘না, জায়গাটা আমাদের ভালোই লেগেছে, তবে আরও অনেক জায়গায় তো বেড়াবার কথা আছে, তাই৷ এবারে আমরা যাব স্ট্যাগ হ্রদের দিকে, তারপর ডিয়ার হ্রদে বেড়াতে যাব৷’

‘তাহলে তো আপনাদের বিরাট প্ল্যান রয়েছে দেখছি! যাক, আপনাদের দিনগুলো সুখে কাটুক সেই কামনাই করি৷’ জিনির সঙ্গে হাত ঝাঁকাল ব্র্যাডফোর্ড৷ দরজায় দাঁড়িয়ে আরও কিছুক্ষণ কথা বলল ওর সঙ্গে৷ কিটসন তখন অধৈর্য হয়ে উঠেছে৷ মনে মনে চাইছে, ব্র্যাডফোর্ড এখুনি চলে যাক৷ কিন্তু ভবি ভোলবার নয়৷

অবশেষে, মিনিট দশেক পর হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে চলে গেল ব্র্যাডফোর্ড৷ চাঁদের আলোয় আলোকিত বাঁধানো রাস্তা ধরে সে এগিয়ে চলল তার কেবিনের দিকে৷

দরজা বন্ধ করে তালা এঁটে দিল জিনি, ‘তাহলে আর দ্বিতীয় কোনও চিন্তার অবকাশ নেই৷ চলে আমাদের যেতেই হবে৷’

‘হ্যাঁ—তাছাড়া উপায় নেই৷’ কিটসন চিন্তিত মুখে জবাব দিল, ‘কিন্তু ব্র্যাডফোর্ডের তুমি দারুণ বোকা বানিয়েছ! সত্যি, তোমার তুলনা নেই৷’

‘থাক্, থাক্—অনেক হয়েছে৷ শোবার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে এড ব্লেক, ‘অত বেশি উচ্ছ্বাসের প্রয়োজন নেই, আলেক্স৷ ওই ব্র্যাডফোর্ডের ব্যাটাই আমাদরে সমস্ত পরিকল্পনাটা ওলট-পালট করে দিল৷ ও বোধ হয় আমাদের গলা শুনতে পেয়েছিল৷’

জিপো এগিয়ে এল শোবার ঘরের দরজায়, দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে শুনতে লাগল৷

‘তাহলে কালই আমরা রওনা দিচ্ছি৷’ ব্লেক বলে চলল, নইলে ওই ছোঁড়াটা আবার কিছু গণ্ডগোল বাঁধিয়ে বসতে পারে৷’ সে ফিরে তাকাল কিটসনের দিকে, ‘আলেক্স, তুমি বরং ক্যারাভ্যানে গিয়ে থাকো৷ বলা যায় না, ওই হতচ্ছাড়া ছোঁড়াটা হয়তো রাতের অন্ধকারে ফিরে আসতে পারে—হয়তো ক্যারাভ্যানের ভেতরে ঢোকবার চেষ্টা করবে৷’

কিটসন সম্মতি জানিয়ে এগিয়ে গেল দরজার কাছে৷ চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলে বাইরে চলে গেল৷

জিপো নিলিপ্ত স্বরে বলে উঠল, ‘আগামীকাল আমি বাড়ি যাচ্ছি৷ বুঝেছ? অনেক সহ্য করেছি… আর নয়৷ আমি এখন শুতে চললাম৷’

শোবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল জিপো৷

‘কালই শালাকে টিট করব৷’ ব্লেকের চোখের তারায় ঝলসে উঠল কুৎসিত ক্রোধ, ‘তখন থেকে ওর বকবকানি শুনে আমি একেবারে হদ্দ হয়ে গেছি৷’

জিনি ফিরে গেল রান্নাঘরে রাতের খাবার তৈরি করতে৷

ব্লেক এসে দাঁড়াল দরজার কাছে, হেলান দিয়ে দাঁড়াল, ‘ব্র্যাডফোর্ডকে তুমি বেশ কায়দা করেই বোকা বানিয়েছ, জিনি—তোমার বুদ্ধি আছে৷…কিন্তু আমার প্রস্তাব সম্পর্কে তুমি কি কিছু ভেবে দেখেছ? তোমার এবং আমার মধ্যে বেশ মিল আছে৷ সুতরাং আপত্তির কী আছে তা-তো বুঝতে পারছি না৷—কী বলো, রাজি?’

দুটো স্টেক ফ্রাইং প্যানে ছেড়ে দিল জিনি৷

‘তুমি যদি পৃথিবীর শেষ জীবিত পুরুষ হও, তবুও তোমার সম্পর্কে আমি বিন্দুমাত্রও কৌতূহলী হব না!’ ব্লেকের দিকে না তাকিয়েই জবাব দিল জিনি৷

‘আচ্ছা—সময় এলেই দেখা যাবে—’

হাসতে হাসতে আরাম-কেদারায় গিয়ে বসল ব্লেক, তার হাসির অন্তরালে বুঝি কোনও গোপন রসিকতার ইঙ্গিত৷

পরদিন খুব ভোরে কিটসন গাড়ি নিয়ে গেল শহরের দিকে৷ জিনি রইল ক্যারাভ্যানের পাহারায়; ব্লেক ও জিপো তখন কেবিনে৷

এতে ঝুঁকি আছে জেনেও ব্লেক কেবিনেই থেকেছে৷ কারণ ক্যারাভ্যানের ভেতরে ওই স্বল্প পরিসরে জিপোর গোঁয়ার্তুমির মোকাবিলা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়৷

জিপোর মানসিক অবস্থা এতই চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শেষ পর্যন্ত কিটসন ও ব্লেক বাধ্য হয়েছে তাকে খাটের সঙ্গে বেঁধে রাখতে৷ এমন কি মুখে কাপড় গুঁজে দিতেও ভোলেনি৷

জিপোকে বিছানার সঙ্গে বাঁধা হয়ে গেলে হাঁপাতে-হাঁপাতে উঠে দাঁড়িয়েছে ব্লেক৷ মুখে এক নৃশংস অভিব্যক্তি৷ কিটসনের দিকে ফিরে হাত নেড়ে ইশারা করেছে সে, ‘তুমি যাও৷ ওকে আমি দেখছি৷ কী করে ওর মত বদলাতে হয়, সেটা ওকে হাড়ে হাড়ে সমঝে দেব৷ তুমি ফিরে এসেই হয়তো শুনবে, জিপো আমাদের সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় যেতে এক পায়ে খাড়া৷’

অনিচ্ছাসত্ত্বেও নিরুপায় হয়ে কিটসনকে চলে যেতে হয়েছে৷ জিপোকে ওইভাবে ব্লেকের কাছে ছেড়ে যেতে তার কষ্ট হল৷ কিন্তু কিটসন জানে জিপোর সাহায্য ছাড়া ওই ট্রাকের তালা খোলা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়৷ আর জিপো সাময়িকভাবে বেহেড হয়ে পড়ায়, ওকে সামলানোর দায়িত্ব নিয়েছে ব্লেক৷ কিটসন যেন একটু নিশ্চিন্ত বোধ করল৷

শহরে গিয়ে একটা বড়সড় তাঁবু কিনল কিটসন, এবং সেই সঙ্গে নিল প্রচুর খাবার৷ কারণ অনেক চিন্তা-ভাবনার পর ওরা বুঝেছে পাহাড়ি অঞ্চলে পৌঁছনোর পর শহরে গিয়ে রোজকার কেনাকাটা সেরে ফিরে আসা তাদের পক্ষে অসম্ভব, এবং একই সঙ্গে বিপজ্জনক৷ অতএব যদ্দিন না জিপো ট্রাকের তালা খুলছে, তদ্দিন তাদের অপেক্ষা করতে হবে ওই পাহাড়ি অঞ্চলেই৷ সেই বুঝে পর্যাপ্ত খাবার সঙ্গে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে কিটসন৷

কেনাকাটা সেরে কেবিনে ফিরে এল কিটসন৷ বুইকের পিছনটা জিনিসপত্রে ঠাসা৷ সে গাড়ি থেকে নামতেই জিনি এগিয়ে এল তার কাছে৷

‘কোনও গণ্ডগোলো হয়নি তো?’ কিটসন প্রশ্ন করল৷

মাথা নাড়ল জিনি, ‘না৷ কিন্তু তুমি ফিরে আসতে আমি খুশি হয়েছি৷ তখন থেকে কেবলই ভাবছি ওই ছেলেটার কথা৷ আমার মনে হয়, যত তাড়াতাড়ি আমরা এখান থেকে সরে পড়তে পারি ততই ভালো৷’

ওরা দুজনে একসঙ্গে এসে ঢুকল কেবিনে৷

একটা আরাম কেদারায় বসে রয়েছে জিপো৷ মুখ শুকনো ঘাসের মতো বিবর্ণ, কোটরাগত চোখের কোলে কালি৷ ওদের ঢুকতে দেখেও একইভাবে মাথা নিচু করে বসে রইল সে৷

ব্লেক উত্তেজিতভাবে ঘরময় পায়চারি করছে—হাতে জ্বলন্ত সিগারেট৷

‘সব ঠিকমতো হয়েছে৷’ কিটসনকে লক্ষ করে প্রশ্ন করল সে৷

‘হ্যাঁ—জিনিসপত্র সবই কিনেছি৷’

কিটসন তাকাল জিপোর দিকে তারপর সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চোখ রাখল ব্লেকের চোখে৷

‘জিপোর মত বদলেছে৷’ গম্ভীরভাবে ব্লেক জবাব দিল কিটসনের নীরব প্রশ্নের, ‘ওর সঙ্গে আমার খোলাখুলি কথা হয়েছে৷ ট্রাকের তালা খুলতে ও রাজি৷’

‘তোমরা আমাকে দিয়ে গায়ের জোরে কাজ করিয়ে নিতে চাইছ৷’ কাঁপা স্বরে ব্লেকের কথার প্রতিবাদ করল জিপো, ‘এর ফল কখনওই ভালো হবে না৷ আমি এ কথা তোমাদের আগেও বলেছি—এখন বলছি৷’ হঠাৎই কিটসনের দিকে মুখে তুলে তাকাল জিপো, ‘তুমি আমার বন্ধু ছিলে আলেক্স৷ হুঁঃ—বন্ধুই বটে৷ তুমি আর আমার কাছে এসো না৷ তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কের এখানেই শেষ৷’

‘কী হয়েছে? ব্যাপার কী, এড?’ ঘুরে দাঁড়িয়ে ব্লেককে লক্ষ করে বলে উঠল কিটসন৷

‘ওর সঙ্গে একটু খারাপ ব্যবহার করতে হয়েছে৷ ও আমাদের ট্রাকের তালা খোলায় সাহায্য না করলে যে ভীষণ বিপদে পড়বে সেটা ওকে স্পষ্টাস্পষ্টি বলে দিয়েছি৷’

‘এড বলেছে ট্রাকের তালা না খুললে ও আমার হাত ভেঙে ফেলবে৷’ চাপা গলায় অনিশ্চিত সুরে কিটসনকে বোঝাতে চাইল জিপো, ‘হাত ছাড়া কোনও মানুষ কি কখনও বাঁচতে পারে?’

কিটসন কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ব্লেক মাথা নেড়ে ইশারা করতেই সে চুপ করে গেল৷

‘চলো, যাওয়া যাক৷ দেখো তো, বাইরে কেউ আছে কি না৷’

জিনি ও কিটসন কেবিনের বাইরে এসে দাঁড়াল৷

সামনের হ্রদে যথারীতি ভাসমান নৌকোর ইতস্তত আনাগোনা৷ তবে খুব একটা কাছাকাছি কেউই নেই৷

কিটসন ক্যারাভ্যানটা বুইকের সঙ্গে জুড়ে চালিয়ে নিয়ে এল কেবিনের দরজার সামনে৷ গাড়ি ঘুরিয়ে ক্যারাভ্যানের পিছনের দরজা রাখল কেবিনের মুখোমুখি৷

‘এড, তোমরা প্রস্তুত?’

 ব্লেক জিপোকে সঙ্গে নিয়ে দরজার কাছে এগিয়ে এল৷

কিটসন হাতলে চাপ দিয়ে ক্যারাভ্যানের দরজা খুলতেই জিপো আর ব্লেক চটপট ঢুকে পড়ল ভেতরে৷ কিটসন আবার বন্ধ করে দিল ক্যারভ্যানের দরজা৷ পুরো কাজটা করতে সেকেন্ড কয়েকের বেশি লাগল না৷

‘আমি এখানেই আছি, তুমি অফিসে গিয়ে বরং হিসেব-পত্তর চুকিয়ে এসো৷’ পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে জিনির হাতে তুলে নিল কিটসন৷

ক্যারাভ্যানের গায়ে হেলান দিয়ে একটা সিগারেট ধরাল সে৷ তারপর জিনির ফেরবার অপেক্ষায় রইল৷ কিটসনের প্রতিটি স্নায়ু এখন ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার ভাবনায় উত্তেজিত৷ এবার তারা গিয়ে পড়বে সম্পূর্ণ খোলা জায়গায়—যেখানে নেই সহস্র ক্যারাভ্যানের আড়াল৷ এ যেন যেচে বিপদকে ঘরে টেনে আনা৷ কিন্তু ট্রাকের তালা খুলতে গেলে এ ছাড়া আর কোনও উপায়ও তাদের হাতে নেই৷

‘এই যেন শুনুন!’

কিটসন চমকে উঠল৷ পলকে ঘুরে দাঁড়াল৷

একটা বাচ্চা ছেলে তার খুব কাছেই দাঁড়িয়ে৷ পরনে সুতির প্যান্ট, লাল সাদা ডোরাকাটা জামা৷ মাথায় একটা শোলার টুপি৷ সম্ভবত ক্যারাভ্যানের পাশ ঘুরেই তার সামনে এসে হাজির হয়েছে ছেলেটা৷

‘কী ব্যাপার—’

ছেলেটা ঘাড় কাত করে কিটসনকে দেখতে লাগল৷

‘আমার বাবা আপনাকে চেনে৷ আমি ফ্রেড ব্র্যাডফোর্ড জুনিয়র৷’

‘তাই নাকি!’ কিটসন স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল৷

ছেলেটা ভুরু কুঁচকে তাকাল কিটসনের দিকে, তারপর চোখ ফেরাল ক্যারাভ্যানে৷

‘এটা আপনার?’ ক্যারাভ্যানের দিকে আঙুল ঝাঁকিয়ে শ্রাগ করল ছেলেটা৷

‘হ্যাঁ৷’

বেশ কিছুক্ষণ ধরে ক্যারাভ্যানটাকে পরখ করল ছেলেটা৷ করতে লাগল৷ এতক্ষণ ধরে কী করছে ও! সে মনে প্রাণে চাইল, জিনি যেন এখুনি ফিরে আসে, তাহলে তারা এই মুহূর্তে ফন হ্রদ ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে পারে৷

ছেলেটা এবার উবু হয়ে ঝুঁকে পড়ল মাটিতে৷ ঘাড় কাত করে দেখতে চেষ্টা করল ক্যারাভ্যানের তলাটা৷

‘ওরে বাপ৷ আপনাদের ক্যারাভ্যানের তলাটা দেখছি লোহার চাদরে মোড়া!’ কিটসনের দিকে চোখ তুলে তাকাল সে, এত লোহা দিয়েছেন কেন? শুধু শুধু এটার ওজন বাড়ছে, তাই না?’

‘কী জানি, জানি না৷ যখন এটা কিনেছি তখন এই রকমই ছিল৷’ অস্বস্তিভরে চোয়ালে হাত বোলাল কিটসন৷

‘বাবা বলছিল, গতকাল আপনাদের দুজন বন্ধু এর মধ্যে ছিল; সত্যি?’

‘হ্যাঁ৷’

‘কিন্তু ওদের মধ্যে একটা গোলমাল আছে৷’

‘না তো—’

ছেলেটা কিটসনের আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করল৷ কিটসন লক্ষ করল, ছেলেটার চোখের দৃষ্টি আশ্চর্যরকম সপ্রতিভ৷

‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ওদের মধ্যে কিছু একটা হয়েছিল, নয়তো ওরকমভাবে ঝগড়া করছিল কেন?’

‘ওরা সব সময়েই ওরকম ঝগড়া করে—ও কিছু নয়৷’

ছেলেটা কয়েক পা পিছিয়ে ক্যারাভ্যানটাকে ভালো করে দেখতে লাগল৷

‘এর ভেতরটা আমাকে একবার দেখতে দেবেন?’

‘ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই৷’ কিটসনের স্বর ঈষৎ উত্তপ্ত, ‘কারণ চাবিটা আমার স্ত্রীর কাছে৷’

ছেলেটা যেন অবাক হল৷

‘আমার বাবা কিন্তু মাকে কখখনো চাবি রাখতে দেয় না৷ মা সব সময় চাবি হারিয়ে ফেলে৷’

‘আমার স্ত্রী চাবি-টাবি খুব সাবধানে রাখে৷ কখনও হারায় না৷’

ছেলেটা আবার উবু হয়ে বসে পড়ল মাটিতে৷ সবুজ ঘাসগুলো দু-হাতে টেনে ছিঁড়তে লাগল৷ ঘাসের শিষগুলো ইতস্তত ছড়িয়ে পড়ল৷

‘আপনার বন্ধুরা কি এখনও এর ভেতরেই আছে?’

‘না৷’

‘তাহলে কোথা আছে?’

‘বাড়িতে৷’

‘বাড়ি কোথায়?’

‘সেন্ট লরেন্স—’

‘তারা তাহলে একসঙ্গেই থাকে?’

‘হ্যাঁ৷’

‘কিন্তু ওরা যেরকম বিশ্রীভাবে ঝগড়া করছিল, আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম৷’

ছেলেটা মাথা থেকে টুপিটা খুলে হাতে নিল৷ তারপর সেটাকে ঘাস দিয়ে ভর্তি করতে লাগল৷

‘ওদের একজন আর একজনকে কিছু করতে পা পারার জন্যে গালাগাল দিচ্ছিল৷ কী করতে বলছিল আপনি জানেন?’

‘উঁহু—’ কিটসন নতুন করে আর একটা সিগারেট ধরাল৷

‘ওদের কথা শুনে মনে হচ্ছিল, এখুনি বোধ হয় একটা মারপিট বাঁধিয়ে বসবে৷’

‘ওদের নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না৷ ওদের বন্ধুত্ব অনেক দিনের—অত সহজে ভাঙবার নয়৷’

টুপিটা ঘাসে ভর্তি হয়ে গেলে ছেলেটা সামনে মাথা ঝাঁকাল৷ টুপিতে মাথা ঢুকিয়ে সেটা চেপে মাথায় ঢুকিয়ে দিল৷

‘এতে আমার মাথা ঠান্ডা থাকে৷’ কিটসনকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকতে দেখে সে ব্যাখ্যা করল, ‘এটা আমারই আবিষ্কার। এই আবিষ্কার থেকে বেশ কিছু টাকা রোজগার করা যেতে পারে৷’

‘হুঁ৷’ কিটসন নির্লিপ্ত স্বরে জবাব দিল, ‘শোনো খোকা, তুমি এবারে বাড়ি যাও৷ তোমার বাবা হয়তো তোমাকে খুঁজে না পেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন৷’

‘না, আমি বাবাকে বলেই এসেছি৷ বলেছি, আমি চুরি যাওয়া ট্রাকটাকে খুঁজতে বেরোচ্ছি—ওই যে, যেটা প্রচুর টাকাসুদ্ধ উধাও হয়ে গেছে৷ ঘণ্টাখানেকের মধ্যে বাবা আমার খোঁজ করবে না৷ আপনি কাগজে ওই ট্রাক লুটের খবরটা পড়েছেন?’

‘হ্যাঁ, পড়েছি৷’

‘জানেন, আমি কী ভাবছি?’

‘হ্যাঁ—তোমার বাবা আমাকে বলেছে৷’

ছেলেটো ভুরু কুঁচকে তাকাল, ‘বাবার বলা উচিত হয়নি৷ এইভাবে যদি শহরসুদ্ধ লোককে বলে বেড়ায় তাহলে পুরস্কারের টাকাটা আমি পাব কী করে?’

হঠাৎ কিটসনের নজর পড়ল, সামনের রাস্তা ধরে জিনি দ্রুতপায়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে৷

‘যে করেই হোক পুরস্কারের টাকাটা আমার চাই৷’ ছোট ব্র্যাডফোর্ড বলে চলল, ‘পাঁচ হাজার ডলার৷ টাকাটা পেলে কী করব জানেন?’

কিটসন মাথা নাড়ল, ‘না তো—’

‘বাবাকে আমি ওর একটা পয়সাও দিচ্ছি না—আমি আগে থাকতেই ঠিক করে রেখেছি৷’

জিনি এসে দাঁড়াল ওদের সামনে৷

‘এই যে ব্র্যাডফোর্ড জুনিয়র৷’ কিটসন জিনিকে বলল৷

‘কেমন আছ?’ হেসে প্রশ্ন করল জিনি৷

‘আপনার কাছে কি ক্যারব্যানের চাবিটা আছে?’ ছেলেটা পালটা প্রশ্ন করল, ‘ইনি আমাকে বলেছেন ভেতরটা দেখতে দেবেন৷’ কিটসনের দিকে আঙুল দেখাল সে৷

জিনি ও কিটসন পরস্পরের দৃষ্টি বিনিময় করল৷

‘আমি দুঃখিত!’ ছোট ব্র্যাডফোর্ডকে লক্ষ করে বলল জিনি, ‘চাবিটা আমি স্যুটকেসে ভরে ফেলেছি৷ এখন বের করা খুব মুশকিল৷’

‘আপনি নিশ্চয়ই চাবিটা হারিয়ে ফেলেছেন৷’ অবজ্ঞার সুরে সে বলে উঠল, ‘ঠিক আছে, আমি তাহলে চলি৷ বাবা বলছিল, আপনারা নাকি এ জায়গা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন!’

‘হ্যাঁ৷’

‘এখুনি?’

‘হ্যাঁ৷’

‘আচ্ছা, বিদায়৷’ হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে ঘুরে দাঁড়াল ছেলেটা৷ তারপর রাস্তা ধরে হেঁটে চলল৷ হাত দুটো প্যান্টের পকেটে ঢোকানো৷ বেসুরোভাবে শিস দিতে দিতে সে এগিয়ে চলল৷

‘তোমার কি মনে হয়…’ কথা শেষ না করেই থেমে গেল কিটসন, ‘ঠিক আছে, চলো৷ আর দেরি না করে রওনা হওয়া যাক৷’

ওরা উঠে বসল বুইকে৷

ওদের গাড়ি ছেড়ে দিতেই ঝোপের আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এল ছোট ব্র্যাডফোর্ড৷ সম্ভবত রাস্তার মোড় ঘুরেই জঙ্গলের মধ্যে সে আবার ফিরে এসেছে৷ অপসৃয়মান বুইক ও ক্যারাভ্যানের দিকে তাকিয়ে সে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে রইল৷ তারপর পকেট থেকে একটা ময়লা নোটবই বের করল সে৷ একটুকরো পেনসিল দিয়ে বুইকের লাইসেন্স নম্বরটা লিখে নিল নোট বইয়ের পাতায়৷