গল্প
উপন্যাস

শুধু যাওয়া আসা – ৭

সাত

মুহূর্তে ঘরের পরিবেশে নেমে এল মৃত্যুর নিস্তব্ধতা৷ শুধু টেবিল-ঘড়ির টিক টিক, আর লোলার উত্তেজিত শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ৷

লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল জেনসন—চোখে ভূত দেখার চাউনি, ‘এ কি? লোলা!—’ বলার সঙ্গে সঙ্গে জেনসন ওর দিকে এগোতে গেল৷

‘খবরদার! এক পা নড়বে না! কর্কশ স্বরে শাসিয়ে উঠল লোলা, ‘সিন্দুকের সমস্ত টাকা আমি নেব৷ কাউকে এর একটা পয়সাও আমি দিচ্ছি না৷’

‘লোলা! তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? গুলি-ভরা রিভলভার নিয়ে আর ছেলেমানুষি করো না—ওটা নামিয়ে রাখ৷’

‘শোন কার্ল, তোমার ওই ন্যাকামো আমি বহুদিন সহ্য করেছি,—আর নয়৷ মনে করো না, তোমরা আমাকে আটকাতে পারবে৷ চুপচাপ নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাক, নয়তো—’

জেনসনের চোয়ালের রেখা কঠিন হল, ‘ছি, ছি—তোমার লজ্জা হওয়া উচিত, লোলা৷ দীর্ঘ তিরিশ বছর ধরে এ-টাকা আমি কার জন্য সঞ্চয় করছি? শুধু তোমার আর আমার জন্যই তো! আর তুমি কিনা—নাও, এসব পাগলামি ছেড়ে বন্দুক নামিয়ে রাখ৷’

‘ওসব বাজে ফিরিরে কোন কাজ হবে না, কার্ল! আমাকে আটকালে পরে কি হবে ভেবে দেখেছ? আমি পুলিশকে বলে দেব—একজন জেল-পালানো কয়েদীকে তুমি এতদিন ধরে জেনেশুনে আশ্রয় দিয়েছ৷ জানাব, আয়কর ফাঁকি দিয়ে জমানো এই একলাখ ডলারের কথা, তখন?’

রাগে জেনশনের চোখমুখ লাল হয়ে উঠল৷ সে এক পা এক পা করে লোলার দিকে এগোতে লাগল, ‘ছেনাল মাগী, দাঁড়া—তোকে এমন শিক্ষা দেব, জীবনে ভুলবি না! এতদিন ভালো ব্যবহারের এই প্রতিফল? জুতিয়ে আমি তোকে লম্বা করব!’

‘সাবধান, মি. জেনসন—’, তীক্ষ্ণ চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে সিন্দুকের দরজার হাঁটু দিয়ে মারলাম এক ধাক্কা৷ দরজা সশব্দে বন্ধ হওয়ামাত্রই স্বয়ংক্রিয় তালা ‘ক্লিক’ করে এঁটে গেল৷

লোলা হিংস্র দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে৷ পলকে বুঝতে পাল, সিন্দুকের দরজায় স্বয়ংক্রিয় তালা এঁটে গেছে৷ অন্ধ ক্রোধে উত্তেজিত হয়ে, হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রোগিণীর মতো হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে ও এগিয়ে এল—ফটাস—রিভলভারের বিকট শব্দে জানালার সার্সীগুলো ঝনঝন করে কেঁপে উঠল৷

জেনসন লোলার সামনেই দাঁড়িয়েছিল৷ ভয়ার্ত চোখে তার দিকে তাকালাম৷ কয়েক সেকেন্ড পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে রইল জেনসনের বিশাল দেহ, পরমুহূর্তেই হাঁটু ভেঙে দড়াম করে আছড়ে পড়ল মেঝেতে৷ পড়বার সময় হাতদুটো পাশের টেবিলটা আঁকড়ে ধরার সেটাও হুড়মুড় করে উলটে পড়ল৷ গোটা বাংলোটাই কেঁপে উঠল থরথর করে৷

লোলা ভয়ার্ত চিৎকারে সংবিৎ ফিরে পেলাম৷ তখন ওর হাত থেকে কুৎসিত দর্শন রিভলভারটা খসে পড়েছে৷ পিছন ফিরে দু-হাতে মুখ ঢেকে ও বসে আছে—যেন নিষ্ঠুর বাস্তবকে অস্বীকার করতে চাইছে৷

কাঁপতে কাঁপতে জেনসনের উপর ঝুঁকে পড়লাম৷ ওর বুকের বাঁ দিকটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে৷ দেহ নিথর নিষ্পন্দ৷ সামান্য সীসের টুকরো ওর জীবনীশক্তি নিঃশেষে শুয়ে নিয়েছে৷ প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরা, হাসিখুশি কার্ল জেনসন যে আর বেঁচে নেই, এই সরল সত্যটুকু যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না৷

‘তুমি—তুমি ওকে মেরে ফেলেছ!’ আমার গলা দিয়ে ভাঙা-বিকৃত স্বর বেরিয়ে এল৷

লোলা একটা আর্তনাদ করে উঠল৷ তারপর আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল৷ পরমুহূর্তেই অন্ধের মতো ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে৷ কানে এল ওর শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করার শব্দ৷

বিমূঢ়ভাবে জেনসনের মৃতদেহের কাছে বসে রইলাম৷ কী করব এখন? পুলিশে খবর দেওয়ার মতো গর্দভ আমি নই৷ লোলা যদি বলে বসে, জেনসনকে আমিই গুলি করেছি, আর আমার আসল পরিচয়টা জানিয়ে দেয়, তবে ওরা—আর কোন প্রমাণ চাইবে না৷

হঠাৎ বাইরে একটা গাড়ি দাঁড়ানোর শব্দ পেলাম৷ পরক্ষণেই অধৈর্যভাবে তার হর্ন বেজে উঠল—একবার—দুবার—তিনবার৷

চটপট উঠে দাঁড়ালাম৷ বাইরে যেই আসুক না কেন, তাড়াতাড়ি যাওয়া দরকার৷ নয়তো, ঘরের আলো দেখে কেউ যদি জানালা দিয়ে উঁকি মারে, তবে সর্বনাশের আর-কিছু বাকি থাকবে না৷

দ্রুতপায়ে দরজার দিকে এগোতেই পায়ে ঠেলক রিভলভারটা৷ ওটা কুড়িয়ে নিয়ে পকেটে রাখলাম৷ বাংলো থেকে বেরিয়ে এগিয়ে চললাম পাম্পের দিকে৷

বাইরে বেরুতেই চোখে পড়ল একটা বিরাট সবুজ রঙের ক্রাইসলার পাম্পের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে৷ গাড়ির আরোহী একজন মোটাসেটা বয়স্ক লোক, সঙ্গিনী একটি অল্পবয়সী মেয়ে৷ আমাকে আসতে দেখেই লোকটা গাড়ি থেকে নেমে এল, ‘বিশ লিটার পেট্রল আর দু-লিটার মোবিল—আচ্ছা, খাবার-দাবারের কিছু ব্যবস্থা হবে?’

লোকটার একটা কথাও আমার কানে ঢুকল না৷ আচ্ছন্নের মতো যান্ত্রিকভাবে গাড়ির ট্যাঙ্কে তেল ঢালতে শুরু করলাম৷

‘কী হল?’ দাঁত বের করে খেঁকিয়ে উঠল লোকটা, ‘কানে গেল না আমার কথা? আমাদের ক্ষিদে পেয়েছে৷’

‘দুঃখিত, আজ রেস্তোরাঁ বন্ধ আছে৷’ সবিনয়ে তাকে জানালাম৷

‘বন্ধ আছে বললেই হবে! ক্ষিদে পেয়েছে, খাবার চাই—ব্যস!’

ট্যাঙ্কের ঢাকনা বন্ধ করে বিরক্তি দৃষ্টিতে বুড়োটার দিকে তাকালাম৷ যেমন করেই হোক এই লোকটাকে তাড়াতে হবে৷ যত সব ঝুট-ঝামেলা—

‘আমার কথা কানে যায়নি আপনার?’ ঠিক ওর মতো করেই খেঁকিয়ে উঠলাম, ‘রেস্তোরাঁ এখন বন্ধ আছে!’

‘ও—’ কিছুক্ষণ গম্ভীরভাবে আমাকে দেখল সে৷ তারপর বলল, ‘তোমার মনিবকে ডাক৷ আমি খোদ মালিকের সঙ্গেই দেখা করতে চাই৷’

‘হ্যারি, কী করছ—’ মেয়েটি প্রতিবাদ করার চেষ্টা করল৷

‘তুমি চুপ করবে? আজ ওর একটা হেস্তনেস্ত আমি করবই! মালিকের সঙ্গে কথা না বলে আমি যাচ্ছি না৷’

লোকটা লম্বা লম্বা পা ফেলে বাংলোর দিকে এগোতে লাগল৷ জানলার আলো দেখে হয়তো ভেবেছে ওটাই মালিকের ঘর৷ সর্বনাশ!!

দৌড়ে গিয়ে তার পথরোধ করে দাঁড়ালাম, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে—উত্তেজিত হবেন না৷ দেখছি, আপনাদের খাওয়ার কী ব্যবস্থা করা যায়৷ মি. জেনসন এখন ঘুমোচ্ছেন—৷’

লোকটা কটমট করে আমার দিকে চাইল, যেন গিলে ফেলবে৷ আমার আপাদমস্তক ভালো করে চোখ বুলিয়ে বলল, ‘ঘুমোচ্ছেন?—ঠিক আছে, কি করছেন সেটা গিয়েই দেখছি৷’

সে পা বাড়াতেই আবার বাধা দিলাম, ‘আসুন, আসুন—রেস্তোরাঁয় চলুন৷’

অনেক কষ্টে ওদের খেতে বসিয়ে বাইরে এলাম৷ ঠান্ডা হাওয়ায় বসে একটু ভাববার সময় পেলাম৷

যেভাবেই ধরা যাক না কেন, আমার অবস্থা এখন কলে-পড়া ইঁদুরের মতো৷ অবশ্য লোলারও একই অবস্থা৷ তবে জেনসনের মৃত্যুটাকে নেহাত আকস্মিক দুর্ঘটনা ছাড়া আর-কিছু বলা যায় না৷ লোলা হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে আসার সময় আচমকা ট্রিগার চাপ পড়ে গুলি বেরিয়ে গেছে৷ নিঃসন্দেহে দুর্ঘটনা৷ কিন্তু পুলিশ কি তা মানবে? ওরা জানতে চাইবে, লোলা রিভলভার নিয়ে অত রাতে কি করেছিল? তখনই লোলাকে টাকার কথা বলতে হবে, আর তাহলেই একে একে স—ব বেরিয়ে পড়বে৷ লোলা খুনের দায়ে জড়িয়ে পড়বে৷

তবে পুলিশের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার একটা উপায় ওর আছে? তা হল, জেনসনের হত্যার দায়টা স্রেফ আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া৷ এবং ও যে তাই-ই করবে, সে-বিষয়ে আমি নিশ্চিত৷ তার উপর আমার আসল পরিচয় ফাঁস হওয়ার পর পুলিশ আর একটুও দেরি করবে না৷ সোজা নিয়ে জেলে পুরে দেবে৷

ইচ্ছে হল, স্টেশন-ওয়াগন নিয়ে এখুনি পালাই৷ কিন্তু লোলা যদি পুলিশে ফোন করে জানিয়ে দেয়? অতএব প্রথমেই ফোনের তার কাটতে হবে৷ তারপর ওর হাত-পা বেঁধে রেখে কেটে পড়বে—কিন্তু না, তাতেও বিপদ আছে৷ হয়তো কোন গাড়ির চালক তেল নিতে এসে কাউকে না দেখে, বাংলোয় গিয়ে খোঁজ করতে পারে৷ তারপর লোলাকে হাত-পা বাঁধা-অবস্থায় দেখতে পেলেই ফোনের তার কাটার আর কোন মূল্য থাকবে না৷ ওই ড্রাইভার ব্যাটাই পুলিশে খবর দেওয়ার ব্যবস্থা করবে৷

হঠাৎ একটা অদ্ভুত চিন্তা মাথায় ভর করল৷ লোলা যদি আমাকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়, দিক না৷ আমিও তাহলে পুলিশকে এই এক লাখ ডলারের কথা জানিয়ে দেব৷ বলব, ওই টাকার কোন আয়কর জেনসন দেয়নি৷ তাহলেই লোলার বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন হু-উ-স করে মিলিয়ে যাবে৷ আর লোলার যা টাকার লোভ, ও কখনই এটা চাইবে না৷ তাছাড়া বন্ধ সিন্দুক খোলার জন্য লোলার এখন আমাকে প্রয়োজন৷ কারণ সিন্দুকের কম্বিনেশনটা জেনসন ছাড়া আর-কেউই জানে না৷ সুতরাং সিন্দুক ভাঙতে হলে আমি ছাড়া উপায় নেই৷

এই প্যাঁচেই লোলাকে কায়দা করব ঠিক করলাম৷ কিন্তু জেনসনের মৃতদেহটা কি হবে? নাঃ, দেশেশুনে কোন-একটা জায়গায় পুঁতে ফেলব৷ আর সেই সঙ্গে ওর অনুপস্থিতির জন্য একটা সুতসই গল্প ফাঁদতে হবে৷ খদ্দেরদের শোনাতে হবে না? নয়তো ওরা সে সন্দেহ করবে, রাতারাতি জেনসন গেল কোথায়!

বসে বসে ভাবছি এমন সময় সেই বুড়োটা আর মেয়েটা রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে এল৷ টাকা-পয়সা মিটিয়ে ওরা গাড়ি ছেড়ে দিল৷ যাবার আগে বুড়োটা বলে গেল, ‘ওহে, তোমার এই এঁড়ে রেস্তোরাঁয় আমি আর কোনদিন আসছি না৷’

‘কে তোমাকে আসতে বলছে, বাবা?’ মনে মনে জবাব দিলাম৷

ওদের হাত থেকে রেহাই পেতেই ছুটলাম বাংলোর দিকে৷ দরজা ঠেলে ঢুকতেই কানে এল রিসিভার তুলে নেওয়ার শব্দ—টুং—দেখি, লোলার হাতে টেলিফোনের রিসিভার৷

ও পুলিশে ফোন করছে৷

আমাকে দেখেই টেলিফোন ডায়ালের উপর থমকে দাঁড়াল ওর হাত৷

এই মধ্যেই লোলার চেহারা ভেঙে পড়েছে৷ ভয়ার্ত চোখজোড়া কোটরাগত৷ ঠোঁটদুটো পর্যন্ত সাদা শরীরের সমস্ত রক্ত কেউ যেন শুষে নিয়েছে৷

পাথরের চোখের মতো স্থিরদৃষ্টিতে একজন আরেকজনের দিকে চেয়ে রইলাম৷ যেন দুই প্রতিদ্বন্দ্বী আসন্ন সঙ্কেতের অপেক্ষা করছে সামান্য অঙ্গুলি-হেলনেই বুঝি ঝাঁপিয়ে পড়বে পরস্পরের উপর৷

লোলার হাতে রিসিভার, আর আমার হাতে .৪৫ রিভলভার—ওরই দিকে তাক করা৷

‘রিসিভার নামিয়ে রাখ, লোলা৷’ দাঁতে দাঁত ঘষে বলে উঠলাম, ‘না হলে—’

সিভলভারের দিকে চোখ পড়তেই লোলা শিউরে উঠল৷ মুহূর্তের জন্য হয়তো ভাবল, আমি ওকে নৃশংসভাবে খুন করব৷ কাঁপা হাতে ও রিসিভার নামিয়ে রাখল৷

‘শোবার ঘরে চলো, তোমার সঙ্গে কথা আছে৷’ রিভলভার নাচিয়ে ওকে এগোতে ইশারা করলাম৷ ও আস্তে আস্তে পিছোতে শুরু করল—

শোবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে, তার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম৷ লোলা এগিয়ে গিয়ে খাটের উপর বসল৷ হাঁটুতে হাত রেখে ভয়ার্ত চোখে চেয়ে রইল আমার হাতের রিভলভারের দিকে৷

‘তুমি কোথায় ফোন করছিলে, লোলা—পুলিশে?’ দাঁত বের করে হাসলাম, ‘ভালো—ভালো! হয়তো ভেবেছ, জেনসনকে খুন করার দায়টা আমার ঘাড়েই চাপিয়ে দেবে, কি বলো না, ফন্দিটা মন্দ নয়! কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছ, পুলিশে খবর দিলে তোমার অবস্থাটা কী হবে? ওরা যদি আমাকে এই খুনের দায়ে গ্রেপ্তার করে, তবে ওই টাকার কথা আমাকে বলে দিতে হবে৷ আর, ওরা সমস্ত আয়কর হিসেব করে বুঝে নেওয়ার পর, তোমার ভাগ্যে থাকবে লবডঙ্কা! তোমাকে আঙুল চুষতে হবে!’

লোলার চাউনি দেখে বুঝলাম, আমার কথায় ও ভয় পেয়েছ৷ অত টাকা হারাবার আশঙ্কায় ওর মনের ভিতর শুরু হয়ে গেছে প্রচণ্ড সাইক্লোন৷

‘এ ছাড়া আর-একটা উপায় আছে৷ তা হল জেনসনের দেহটা লুকিয়ে ফেলতে হবে৷ রটিয়ে দিতে হবে, ও জরুরি কাজে হঠাৎ বাইরে গেছে৷ তারপর যখন নিরাপদ মনে করব, সিন্দুক খুলে দিয়ে আমি এখান থেকে চলে যাব, এবং তোমার টাকা তুমি পেয়ে যাবে৷—এবার যাও,ইচ্ছে হলে পুলিশে ফোন করো, আর সেই সঙ্গে নিজের পায়েও কুড়ুল মারো৷’

‘কার্ল দুর্ঘটনায় মারা গেছে!’ লোলা চাপাস্বরে ফিসফিস করে উঠল, ‘আমি—আমি—’

‘দুর্ঘটনা? তুমি প্রমাণ করতে পারবে? উঁহু—৷ ওটা যে দুর্ঘটনা নয়, তার সাক্ষী আমি৷ আমি স্বচক্ষে দেখেছি, তুমি নৃশংসভাবে কার্লকে খুন করেছ৷ অতএব ওসব বাজে কথা ছেড়ে কাজের কথায় এসো৷ তুমি যদি টাকা না চাও—তো ফোন করো পুলিশে—আমি বাধা দেব না আর যদি টাকা পেতে চাও, তবে আমার কথায় তোমাকে রাজি হতেই হবে৷’

লোলা ইতস্তত করল হয়তো আমার উদ্দেশ্য বুঝতে চাইল৷ ধৈর্য ধরে ওর উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম—উত্তেজনায় স্নায়ুতন্ত্রী যেন ছিঁড়ে পড়ছে৷ জানতাম, এত সবের পর ও আর পুলিশে খবর দেবে না, তবু রিভলভার হাতে সতর্ক রইলাম যদি—

অবশেষে ও মুখ খুলল, ‘টাকাগুলো এখনই দিয়ে দাও, আমি এখনই চলে যাচ্ছি৷ কথা দিচ্ছি, কাউকে তোমার কথা বলব না৷’

‘না! আমি যখন ভালো বুঝব, তখনই তুমি টাকাগুলো পাবে—তার আগে নয়৷ আর যদি এটুকু ধৈর্য না ধরতে পার, তো যাও, পুলিশকে ডাকো—৷’

এতক্ষণে নিজের বর্তমান অবস্থাটা ও বোধহয় উপলব্ধি করতে পারল৷ বুঝল, একটা অদৃশ্য ফাঁদ ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে, যার হাত থেকে ওর আর মুক্তি নেই৷ হতাশা, ক্ষোভ, ক্রোধ একসঙ্গে জড়িয়ে পড়ল ওর মুখের উপর৷ প্রাণপণ শক্তিতে ও চিৎকার করে উঠল, ‘বেরিয়ে যাও ঘর থেকে৷’ ওর গলার শিরা রাগে উত্তেজনায় ফুলে উঠল-কাঁপতে লাগল তিরতির করে৷ উপুড় হয়ে বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে লোলা কান্নায় ভেঙে পড়ল৷ থেকে থেকে কেঁপে উঠতে লাগল ওর বিস্রস্ত দেহ৷ এবারের যুদ্ধে লোলা হেরে গেছে৷

ওকে কিছুক্ষণ সময় দেবার জন্য ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম৷ আগে আঘাতটা সামলে উঠুক, তারপর দুজনে মিলে জেনসনের মৃতদেহটার ব্যবস্থা করব৷

ঘড়ি দেখলাম—সাড়ে এগারটা৷ নাঃ, অন্ততপক্ষে রাত একটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে৷ তার আগে ট্রাকের ভিড় কমবে বলে মনে হয় না৷ সময় কাটাবার জন্য রেস্তোরাঁয় গিয়ে কাজে লেগে গেলাম৷

রাত সোয়া একটায় আবার বাংলোয় ফিরে এলাম৷ গত একঘণ্টায় আর-কোন ট্রাক বা গাড়ি আসেনি৷ সুতরাং এই উপযুক্ত সময়৷

লক্ষ্য করলাম, লোলার ঘরে এখনও আলো জ্বলছে৷ ঘরের দরজায় পৌঁছে হাতল ঘোরাতেই বুঝলাম, দরজা ভিতর থেকে বন্ধ৷

‘লোলা! আর দেরি করো না—এসো—’ ওকে ডাকলাম৷

‘চলে যাও! চলে যাও এখান থেকে!’ বন্ধ দরজার ও-পিঠ থেকে ওর চিৎকার ভেসে এল, ‘আমি ওসবের মধ্যে নেই! তোমার যা ইচ্ছে তাই করো!’

বুঝলাম, ও এখনও প্রকৃতিস্থ হয়নি৷ কিন্তু আর সময় নষ্ট করলে চলবে না৷ ও যখন আসবে না, তখন একাই সব করতে হবে৷

প্রথমে ভেবেছিলাম, জেনসনকে বাইরে মরুভূমির মধ্যে কোথাও পুঁতে ফেলব৷ কিন্তু ভেবে দেখলাম গর্ত খোঁড়ার সময় কেউ আমাকে দেখে ফেলতে পারে৷ তারই ঠিক করলাম, গুমটিঘরেই ওকে কবর দেব৷ তাহলে, কেউ যে দেখে ফেলবে, এমন সম্ভাবনা কম৷

একটা কোদাল আর একটা বেলচা নিয়ে গুমটিঘরে গেলাম৷ কোণের দিকে পুরোনো লোহালক্কড়ের স্তূপের পাশে একটা জায়গা দেখে খুঁড়তে শুরু করলাম৷

প্রায় সাড়ে তিনটের সময় গর্ত খোঁড়া শেষ করে ফিরে চললাম ঘরের দিকে৷ এই অমানুষিক পরিশ্রমে একেবারে ঘেমে নেয়ে উঠেছি৷ ঘরে গিয়ে জামাকাপড় ছেড়ে কাজ করার ঢোলা অ্যাপ্রনটা গায়ে চড়িয়ে বাংলোয় ফিরে গেলাম৷

বসবার ঘরে ঢুকে হাতড়ে হাতড়ে আলোর সুইচ জ্বেলে দিলাম৷ জেনসনের পর্বতপ্রমাণ দেহ তখনও একইভাবে পড়ে রয়েছে৷ গায়ে হাত দিয়ে বুঝলাম, মৃতদেহ শক্ত হতে শুরু করেছে৷ আর ঘণ্টাখানেক দেরি হলেই নড়ানো কঠিন হবে৷

তাই আর দেরি না করে গুমটিঘরে ফিরে গেলাম৷ ভারী-ভারী ইঞ্জিনগুলোকে নাড়াচাড়া করার জন্য একটা ছোট ঠেলাগাড়ি ছিল৷ সেটাকে ঠেলে নিয়ে চললাম৷ তার লোহার চাকাদুটো ঢিলে থাকায়, বিশ্রী ঘড়-ঘড় শব্দ হতে লাগল৷ বাংলোর কাছে পৌঁছে ওটাকে টেনে-হিঁচড়ে সিঁড়ি দিয়ে তুললাম৷ তারপর বারান্দা পার হয়ে এগোলাম বসবার ঘরের দিকে৷ চাকাদুটোর বিরক্তিকর শব্দের এতটুকু বিরাম নেই৷ কিন্তু আমি কি করছি লোলা একবারও দেখতে এল না৷

বসবার ঘরে পৌঁছে জেনসনের ভারী দেহটাকে অনেক কষ্টে টেনে গাড়িতে তুললাম৷ উফ, কম করে তিন মণ ওজন হবে৷ রক্ত এর মধ্যেই জমাট বেঁধে কালো হয়ে গেছে৷ ওর মরা-মুখে নেমে এসেছে প্রশান্তির ভাব৷ আর-একবার বুঝি বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল৷ কিন্তু দুঃখ করে লাভ নেই৷ এ তো সামান্য একটা মৃতদেহ! এর মধ্যে কোন কার্ল জেনসন নেই!

গাড়িটা বসবার ঘরে রেখে, বাইরে এসে দুপাশে তাকালাম৷ না, কোন গাড়িই দেখা যাচ্ছে না৷ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম৷ দূরের কোথাও কোন আলো চোখে পড়ছে না৷ শুধু বিষণ্ণ চাঁদ ভেসে রয়েছে পাহাড়ের মাথায়৷

ফিরে এসে গাড়িটা দরজার দিকে ঠেলে নিয়ে চললাম৷ সিঁড়ির কাছে পৌঁছেই মহা বিপদ! গাড়িটাকে এক-এক ধাপ নামানোর কোন সাড়া পাওয়া গেল না৷ একটু ভয় পেলাম৷ মনে হল, কেউ হয়তো শুনে ফেলছে এই হতচ্ছাড়া শব্দগুলো৷ উৎকণ্ঠিত হৃদয়ে গাড়ি নিয়ে গুমটিঘরের দিকে এগোলাম৷

গর্তের পাশে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে, জেনসনের দেহটা ঠেলে ফেললাম গর্তের ভিতর৷ বেলচা দিয়ে মাটি চাপা দিতে শুরু করলাম৷

গর্ত ভরাট করে, উপরটা সমান করতে করতে প্রায় একঘণ্টা লেগে গেল৷ তারপর কাজ করার যে বড় ভারী টেবিলটা ছিল, সেটাকে টেনে নিয়ে এসে রাখলাম জেনসনের কবরের উপর৷ কারুর পক্ষে জানা তো দূরের কথা, আন্দাজ করাও সম্ভব নয় যে ওটার তলায়—মাটির চার ফুট নিচে জেনসন শুয়ে আছে৷

গুমটিঘরের আলো নিভিয়ে ঘরে ফিরে গেলাম৷ স্নান করে, জামাকাপড় ছেড়ে শুয়ে পড়লাম৷ এর মধ্যেই আকাশ পরিষ্কার হয়ে উঠেছে৷ পাহাড়গুলোকে আকাশে পটভূমিকায় আবছাভাবে দেখা যাচ্ছে৷ আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পাহাড়ের ফাঁকে উঁকি দেবে ভোরের সূর্য৷

শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলাম৷ জেনসনের অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে একটা বিশ্বাসযোগ্য গল্প তৈরি করতে হবে৷ যদি তেমন বিশ্বাসযোগ্য না হয়, তবে কেউ হয়তো সন্দেহ করে পুলিশে যেতে পারে৷ না, গল্পটা ভালো হওয়া চাই-ই—

সকাল সাড়ে ছ-টার সময় ট্রপিকা স্প্রিংসে যাবার প্রথম ট্রাকটা এসে দাঁড়াল৷ ট্যাঙ্কে তেল ভরছি, ড্রাইভারটা হঠাৎ জিগ্যেস করে বসল, ‘মি. জেনসনকে যে দেখছি না?’

এরকম অবস্থায় যে পড়তে হবে, জানতাম৷ এখান থেকে দিনের পর দিন শুনতে হবে এই একই প্রশ্ন—‘জেনসন কোথায়!’

‘মি. জেনসন এখানে নেই, অ্যারিজোনায় গেছেন৷ ওখানে আরেকটা পেট্রল-পাম্প খুলবেন, তাই জায়গা দেখতে গেছেন৷’

গত রাতে ভেবে ভেবে এই গল্পটাই তৈরি করেছি৷ এর চেয়ে ভালো কিছু আর মাথায় আসেনি৷

‘তাই নাকি?’ লোকটাকে বেশি কৌতূহলী মনে হল, ‘তাহলে এটা এখন কে দেখাশোনা করবে, তুমি?’

‘হ্যাঁ—’ একটু ইতস্তত করে বলেই ফেললাম, ‘আমি আর মিসেস জেনসন৷’

‘মিসেস জেনসন!’ লোকটা চমকে উঠল৷ চকিতে ভুরু কুঁচকে মুখ তুলে তাকাল—যেন ওর কানে কেউ একটা জ্যান্ত সাপ ঢুকিয়ে দিয়েছে, ‘তার মানে—উনি এখানে রয়েছেন? বাঃ, বেশ—বেশ৷ —জেনসনের বউটা ভালোই দেখতে—কি বলো?’ আমার দিকে আড়চোখে চেয়ে ব্যাটা মুচকি হাসল৷

রাগ হলেও চেপে গেলামে৷ এ তো সবে শুরু—এভাবেই চলবে দিনের পর দিন—মাসের পর মাস৷ ভাব শালা, যা খুশি ভাব! ভাবতে তো আর পয়সা লাগে না! তবে প্রমাণ তুমি করতে পারছ না৷

লোকটা রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া সেরে, দাম মিটিয়ে ট্রাকে এসে উঠল৷ একথা-সেকথা বলতে বলতে আমিও ট্রাক পর্যন্ত এলাম৷ আর ঠিক তখনই ঘটে গেল চরম বিপর্যয়৷

বাংলোর দরজা খুলে লোলা বেরিয়ে এল৷ পরনে সেই ছোট্ট লাল প্যান্ট, গায়ে সাদা চোলি৷

লোলাকে দেখেই লোকটা সড়াৎ করে জিভে জল টানল৷ বিরাট হাঁ করে চেয়ে রইল ওর দিকে৷ তারপর আমার দিকে চেয়ে হাসল—কান-এঁটো-করা হাসি৷ ‘তোমার জায়গায় কাজ করতে পারলে আমি খুশি হতাম, দোস্ত৷ চালিয়ে যাও, চালিয়ে যাও! তোমার কাজটা বেশ রসালো মনে হচ্ছে!’

দড়াম করে ট্রাকের দরজা বন্ধ করে সে আমার দিকে চেয়ে চোখ টিপল, তারপর গাড়ি ছেড়ে দিল৷ লোলার পাশ দিয়ে যাবার সময় তীক্ষ্ণ কান-ফাটানো শব্দে শিস দিয়ে উঠল হতচ্ছাড়া ড্রাইভারটা৷