গল্প
উপন্যাস

শুধু যাওয়া আসা – ৮

আট

লোলার দিকে একনজরে তাকিয়ে বুঝলাম, গত রাতে ওর ভালো ঘুম হয়নি৷ চোখের কোলে কালি, মুখে কেমন একটা শ্রান্ত, অবসন্ন ভাব৷

ও যে ওইরকম স্বল্প পোশাকে কোন অচেনা লোকের সামনে বেরিয়ে আসবে, ভাবতে পারিনি৷ এখন ড্রাইভারটা পাঁচজনকে একথা-সেকথা বলে বেড়াবে৷ ঠিক যে ভয়টা করছিলাম, তাই হয়েছে৷

টেবিলের উপর রাখা গাউনটা নিয়ে ওর মুখের উপর ছুড়ে দিলাম, ‘নাও, দয়া করে এটা পরে নাও৷ এই পোশাকে বেরিয়ে তোমাকে প্রমাণ করতে হবে না, তুমি মেয়েছেলে৷ গাউনটা পরা থাকলেও লোকে সেটা বেশ বুঝতে পারবে!’

‘কেন, কি হয়েছে?’ ওর চোখে শূন্য দৃষ্টি—আমার কথা যেন কিছুই বুঝতে পারেনি৷

‘দোহাই তোমার, একটু মাথা খাটাবার চেষ্টা করো৷’ অধৈর্য স্বরে থমকে উঠলাম, ‘ড্রাইভারটা একটু আগেই তোমাকে ওই পোশাকে দেখেছে৷ তারপর আমাকে কি বলেছে জান? আমার কাজটা নাকি খুব রসালো! এভাবে কথাগুলো ছড়াতে ছড়াতে, কোন্দিন দেখবে পুলিশ এখানে এসে হাজির হয়েছে!’

মুখ গোমড়া করে ও গাউনটা পরে নিল৷ তারপর আমার দিকে না তাকিয়েই প্রশ্ন করল, ‘কার্লের কি করলে?’

‘ওর দেহটা আমি পুঁতে ফেলেছি৷—যাকগে, শোনো—এখন থেকে আমরা দুজনে মিলেই এ জায়গাটা দেখাশোনা করব৷ কিন্তু কেউ কারুর ব্যাপারে নাক গলাব না৷ যখন সময় হবে, আমি চলে যাব৷ যাবার আগে সিন্দুক খুলে দিয়ে যাব৷’

লোলার চোখে ঝিলিক দিল হায়েনার লোভাতুর দৃষ্টি, ‘কিন্তু সেটা কবে?’

‘তা বলা সম্ভব নয়৷ যদ্দিন না পুলিশ আমার খোঁজ করা বন্ধ করছে, আমি এ জায়গা ছেড়ে নড়ছি না৷’

মুহূর্তই বড় হতাশ দেখাল লোলাকে৷ বুঝলাম, টাকার জন্য একটা দিনও অপেক্ষা করতে ও রাজি নয়৷

‘কিন্তু কার্লের বন্ধু-বান্ধব আছে, তারা জানতে চাইবে কার্ল কোথায় গেছে৷’

‘সেসব আমার অকে আগেই ভাবা হয়ে গেছে৷ তোমাকে কেউ কিছু জিগ্যেস করলে বলবে, সে অ্যারিজোনায় গেছে৷ মাস দুয়েকের আগে ফিরবে না৷ এ ক-মাস তুমিই এসব দেখাশোনা করবে, আর আমি তোমাকে সাহায্য করছি৷’

‘সে না হয় হল৷ কিন্তু দুমাস পর কি হবে? কার্লকে তো ওরা আর ভুলবে না তখনও একই কথা বার বার জিগ্যেস করবে৷ কি জবাব দেব তখন?’

‘দু’মাস পর তুমি কার্লের একটি চিঠি পাবে৷ তাতে লেখা থাকবে, সে ওখানে গিয়ে আরেকটি মেয়ের প্রেমে পড়েছে এবং তাকে শিগগিরই বিয়ে করছে৷ এখানে সে আর ফিরবে না৷ তোমাকে যাতে খাওয়া-পরার কষ্টে না পড়তে হয়, সেজন্য এখানকার পেট্রল-পাম্পটা তোমাকে দিয়ে দিচ্ছে৷ এই দুঃসংবাদটা প্রত্যেকেই নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করবে৷ ব্যস—ঝামেলা চুকে গেল৷ তারপর চারদিক ঠান্ডা হলে আমিও কেটে পড়ব৷ তখন ইচ্ছে করলেও এ জায়গাটা বেচে, তুমি অন্য কোথাও চলে যেও৷’

‘তার চেয়ে এক কাজ করো কার্ল তোমাকে যে তিরিশ হাজার ডলার দিচ্ছিল, সে-টাকাটা তুমি এখনই সিন্দুক খুলে নিয়ে নাও৷ তাহলে ন্যু-ইয়র্কে পৌঁছতে তোমার অসুবিধে হবে না৷ তারপর বাকি টাকাটা—’

‘না৷ জেনসনের একটা টাকাও আমি ছোঁব না৷ তা ছাড়া এ জায়গাটা আমার পক্ষে বেশ নিরাপদ৷ আর কিছুদিন না দেখে পালানোটা ঠিক হবে না৷ বলেছি তো, যখন যাব তোমার টাকা তুমি পেয়ে যাবে—তার আগে নয়৷’

লোলা উত্তেজিত হয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় বাইরে একটা গাড়ির শব্দ পেলাম৷ চটপট রান্নাঘর ছেড়ে বেরোতেই দেখি, একজন লম্বা, থলথলে চেহারার পুরুষ রেস্তোরাঁর দরজায় দাঁড়িয়ে—চুলের রঙ সোনালী, গাঢ় নীল চোখ, বয়স আন্দাজ চল্লিশ হবে৷

লোকটা অনেকক্ষণ ধরে আমাকে দেখল৷ তারপর দরজা ছেড়ে কয়েক পা এগিয়ে এল, ‘জেনসন কোথায়?’

আচমকা এই সরাসরি প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেলাম৷ কোনরকমে জবাব দিলাম, ‘তিনি—তিনি বেরিয়েছেন৷’

‘বেরিয়েছেন!! এই সাতসক্কালে!! কোথায় গেছে ও?’

‘কিছু দরকার থাকলে আমাকে বলতে পারেন৷’ তারপর কি মনে হতেই আবার বললাম, ‘মিসেস জেনসনকে ডেকে দেব?’

কথাবার্তার শব্দ শুনে লোলা রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল৷ আগন্তুকের দিকে চোখ পড়তেই মিষ্টি হাসিতে ওর মুখ ভরে গেল, ‘ও, মি. ল্যাশ! এত সকাল সকাল যে—কি ব্যাপার?’

লোলাকে দেখে ল্যাশের মুখ থেকে সন্দেহের ছায়াটা মিলিয়ে গেল৷ সে টুপি খুলে লোলাকে অভিবাদন জানাল, সুপ্রভাত মিসেস জেনসন৷ ওয়ালেসের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যাপারে কার্লের সঙ্গে কয়েকটা কথা ছিল৷ ও বোধ হয় আপনাকে বলেছে, আমাদের সভাপতি ওয়ালেস কাল রাতে হার্টফেল করে মারা গেছে৷ তাঁর শোকসভায় কার্লেরই বক্তৃতা দেবার কথা৷ কিন্তু এ আমাকে বলল, কার্ল নাকি এখানে নেই!’

চোখ ফেরালাম লোলার দিকে৷ ওয়ালেসের মৃত্যুসংবাদ শোনামাত্রই, হাসি মিলিয়ে গিয়ে ওর মুখে একটা দুঃখ-দুঃখ ভাব ফুটে উঠল৷ ওফ, অভিনয় জানে বটে মেয়েটা!

‘হ্যাঁ, ও ঠিকই বলেছে৷ একটু আগেই এলেই কার্লের সঙ্গে আপনার দেখা হত৷ এই আধঘণ্টা হল ও ট্রপিকা স্প্রিংসে রওনা হয়েছে৷’

ল্যাশ অবাক হয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকাল, ‘অসম্ভব! এই তো ঢুকবার সময় দেখলাম, ওর গাড়িটা গ্যারেজেই রয়েছে, তাহলে—’

ল্যাশের কথায় হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠল গলার কাছে! তাই তো, গাড়িটার কথা তো ভাবিনি!

কিন্তু দেখলাম মিথ্যে কথা বলতে লোলার জুড়ি নেই৷ ল্যাশের কথায় ওর মুখের ভাবে এতটুকু পরিবর্তন হল না৷ ও হাসল—ছোটদের নির্বুদ্ধিতায় বড়রা যেমন হাসে, সেইরকম হাসি৷ ‘ঠিকই দেখেছেন, মি. ল্যাশ৷ কার্ল বলে গেছে, ফিরতে ওর মাস দুয়েক লাগবে৷ এতদিন গাড়ি ছাড়া আমার অসুবিধে হবে ভেবে, গাড়িটা আর নিয়ে যায়নি৷ অ্যাডাম ওকে তার ট্রাকে করে ট্রপিকা স্প্রিংসে নিয়ে গেছে৷’

‘ও—!’ ল্যাশ চোয়ালে হাত বোলাতে লাগল৷ বুঝলাম, সে ভীষণ অবাক হয়ে গেছে৷ কার্লের হুট করে উধাও হয়ে যাওয়াটা তার কাছে ভালো ঠেকছে না৷

‘কেন গেছে কিছু জানেন?’ একটা ক্ষীণ সন্দেহ কি ল্যাশের মনে উঁকি মারছে?

‘গতরাতে মিটিং থেকে ফেরার পর কার্লের একটা ফোন আসে৷ কে যেন খবর দেয়, অ্যারিজোনায় একটা পেট্রল-পাম্প নাকি জলের দরে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে৷ ব্যস, এই খবর পেয়েই ও সাত-তাড়তাড়ি বেরিয়ে পড়েছে৷ কাউকে জানাবার আর সময় পায়নি৷’

‘অ্যারিজোনা! সে তো অনেক দূর! তা— ওকি জায়গা ছেড়ে একেবারে চলে যাবার মতলব করছে নাকি?’

‘না, না৷ আমার মনে হয়, ওখানে দেখাশোনার জন্য কোন লোক ঠিক করেই ও ফিরে আসবে৷ এসে হয়ত আপনাকে সব বলবে৷’

সত্যি, লোলার প্রশংসা করতে হয়৷ গল্পটা এর চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যভাবে বলতে আমিও পারতাম না৷

লোলার উত্তরে ল্যাশ যেন কিছুটা অপ্রস্তুত হল, ‘মানে—ব্যাপার কি জানেন, আমি ভাবতেই পারিনি, কার্ল এমনি না বলে-কয়ে হুট করে চলে যাবে৷ যাকগে, ও ফিরে এলেই আমাকে ফোন করতে বলবেন—’

যেতে গিয়েও ল্যাশ থমকে দাঁড়াল, ঘুরে তাকাল আমার দিকে, ‘একে তো চিনলাম না, মিসেস জেনসন?’

‘ওর নাম জ্যাক প্যাটমোর—আমাদের এখানে নতুন চাকরিতে ঢুকেছে৷ কার্লই ওকে এনেছে৷’

‘হুঁ—’ ল্যাশের চাউনি দেখে বুঝলাম, আমাকে তার একটুও পছন্দ হয়নি৷ একটু ইতস্তত করে সে দরজার দিকে পা বাড়াল, ‘আচ্ছা—মিসেস জেনসন, চলি—৷ কার্ল ফিরে এলে আমাকে অবশ্যই খবর দেবেন৷’

ল্যাশ চলে যেতেই লোলা রান্নাঘরে ফিরে গেল৷ এতক্ষণে সাহস ফিরে পেলাম৷ জেনসনের অ্যারিজোনায় যাওয়ার গল্পটা ল্যাশ যখন বিশ্বাস করেছে, অন্য লোকেও করবে৷ তবে আমার সঙ্গে লোলাকে জড়িয়ে যে অনেক কথা উঠবে, সে-বিষয়ে আমি নিশ্চিত৷ অতএব সাবধান থাকতে হবে৷

আজ রবিবার৷ কাজের চাপ অত্যধিক৷ সারা দিনে লোলা আমার সঙ্গে একটা কথাও বলেনি৷ রাত বারোটার সময় কাজের হাত থেকে রেহাই পেলাম৷ একটু ফুরসত হওয়ায় গেলাম রান্নাঘরে৷

গিয়ে দেখি রান্না শেষ হয়ে যাওয়ায় লোলা ওর গাউনটা খুলতে শুরু করেছে৷ আমাকে দেখেই ও থমকাল৷ কিন্তু সে মুহূর্তের জন্য৷ আবার গাউন খোলায় মন দিল৷

হঠাৎ যেন প্রচণ্ড ধাক্কা খেলাম৷ শরীরে বয়ে গেল বিদ্যুতের স্রোত৷ বুকের মধ্যে লকলক করে জ্বলে উঠল কামনার লেলিহান শিখা৷ মুহূর্তে বিদ্রোহ করতে চাইল আমার অশান্ত যৌবন৷ কিন্তু প্রচণ্ড চেষ্টায় নিজেকে সংযত করলাম৷

লোলা গাউনটা খুলে একটা বাক্সে রাখল৷ তারপর রান্নাঘরের খিড়কি-দরজা খুলে বেরিয়ে গেল৷

আলো নিভিয়ে ঘিরে ফিরে গেলাম৷ দেখা যাক এইভাবে কদ্দিন চলে! শোবার আগে জানালা বন্ধ করতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালাম৷

লোলার শোবার ঘরে জানালা হাট করে খোলা৷ ঘরে আলো জ্বলছে৷ শুধু তাই নয়, লোলা দাঁড়িয়ে রয়েছে আলোর ঠিক নিচেই৷ পরনের চোলিটা ওর বাঁ ঝুলছে৷ একটু পরেই ও ঝুঁকে পড়ে প্যান্টটা মেঝে থেকে তুলে নিল৷ বোধহয় প্রয়োজনের একটু বেশিই অপেক্ষা করল৷ তারপর লঘুছন্দে এগিয়ে চলল বাথরুমের দিকে—বন্ধ হয়ে গেল বাথরুমের দরজা৷

অবশ হাতকে প্রাণপণ চেষ্টায় জানলা বন্ধ করতে বাধ্য করলাম৷

এভাবে আর কতদিন? মনে মনে প্রশ্ন করলাম নিজেকে৷

একই ভাবে দিন যায়৷

সারাটা দিন লোলার রান্নাঘরেই কাটে৷ আমার দিকে একবার তাকানো তো দূরের কথা, একটা কথাও বলে না৷ অর্থাৎ, রান্না ছাড়া সব কাজ আমাকে একাই করতে হয়৷

রাতের নিয়মেরও কোন হেরফের নেই৷

রাত এগারটা বাজলেই লোলা বাংলোয় ফিরে যায়৷ ওর শোবার ঘরের জানালা এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ হয় না৷ এই চূড়ান্ত প্রলোভন এড়াবার জন্য এই সময়টা রেস্তোরাঁ ছেড়ে একদম বেরোই না৷ যখন দেখি বাংলোর আলো নিভে গেছে, তখন শুতে যাই৷ কিন্তু শয়নে-স্বপনে-জাগরণে চোখের সামনে যদি একই ছবি ভাসতে থাকে—ঘুমোব কখন?

এইভাবে চারদিন কেটে গেল৷ গরমটা যেন হঠাৎ বেড়ে গেছে৷ উত্তপ্ত মরুভূমির হাওয়া হয়ে উঠল অসহ্য৷ ট্রাক-গাড়ির চালাচল কমে আসতে লাগল৷ কারণ মালপত্র পরিবহনের পক্ষে এইরকম আবহাওয়া অত্যন্ত ক্ষতিকর৷ অতএব স্বাভাবিকভাবেই কাজের চাপ একেবারে কমে এল৷ অলসভাবে বসে থাকার ফলে মাথায় শয়তান এসে বাসা বাঁধে৷ অতিকষ্টে তাকে মন থেকে সরিয়ে রাখি৷

জেনসন মারা যাবার পর আটদিনের দিন লোলা গাড়ি নিয়ে ওয়েন্টওয়ার্থে গেল৷ সম্ভবত সাপ্তাহিক কেনাকাটা করতে৷ একবারও ভাবল না কাজকর্ম আমি একা সামলাব কেমন করে!

ও চলে যাওয়ার পর যা হোক কিছু-একটা করার জন্য, স্টেশন-ওয়াগনটার ডিস্ট্রিবিউটর হেড নিয়ে নাড়াচাড়া করছি, হঠাৎ লক্ষ্য করলাম গুমটিঘরের দরজায় একটা মানুষের ছায়া৷ চমকে মুখ তুলে তাকালাম৷ মুহূর্তে পায়ের নীচে মাটি যেন দুলে উঠল৷

দরজায় দাঁড়িয়ে জর্জ রিক্স৷

এতদিন ওর কথা আমার মনেই ছিল না৷ আসন্ন বিপদের জন্য মনে মনে সতর্ক হলাম৷ রিক্সের পরনে সেই নোংরা পোশাক৷ পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে ওর সেই কুকুরটা—বিষণ্ণ দৃষ্টিতে আমাকে দেখছে৷

রিক্সের চোখে শকুনের চাউনি—ঝুঁকে পড়ে যেন কোন মড়া খুঁজে বেড়াচ্ছে৷

‘সুপ্রভাত!’ আড়চোখে আমার দিকে তাকাল সে, ‘কার্ল কোথায়?’

ঘর্মাক্ত হাতদুটো কাপড়ে মুছতে মুছতে জবাব দিলাম, ‘মি. জেনসন এখানে নেই, বাইরে গেছেন৷’

‘বাইরে!’ ঘরের ভিতর কয়েক পা এগিয়ে এল রিক্স, ‘কি বলছ তুমি?—বাইরে গেছে?’

‘কী চাই আপনার?’

‘শোন ছোকরা, বেশি ফড়ফড় করো না৷ আমার দরকার আমি বুঝব৷ তুমি এখানে চাকরি কর বলেই তো জানতাম! নাকি হঠাৎ মালিক হয়ে বসেছ?’

‘আমি তো তা বলিনি৷ আপনার কি দরকার, তা জানতে চেয়েছি৷’ মেপে মেপে উত্তর দিলাম৷ কারণ, একে চটালে চলবে না৷

‘তা রঙ্গিণী কোথায়? এখানে নেই নাকি?’

‘রঙ্গিণী? আপনি কী বলছেন—’

‘আমার কাছে আর ন্যাকা সেজ না৷ কার্লের বউয়ের কথা বলছি—কোথায় সে?’

‘কিছুক্ষণ আগে ওয়েন্টওয়ার্থে গেছেন—’

রিক্স ঝুঁকে পড়ে কুকুরটার মাথায় হাত বোলাতে লাগল৷ কিন্তু কেন জানি না, কুকুরটা লেজ নাড়তে নাড়তে সরে যেতে চাইল৷

‘কার্ল কোথায় গেছে?’

‘ব্যবসার ব্যাপারে অ্যারিজোনায় গেছেন৷’

‘অ্যারিজোনা! কি কাজে?’

বলার সঙ্গে সঙ্গে সে কুকুরটার পেটে ক্যাঁৎ করে লাথি মারল৷

‘সেটা মি. জেনসনকেই জিগ্যেস করবেন৷’

‘কবে ফিরবে ও?’

‘ঠিক জানি না৷ হয়ত মাস দুয়েক লাগবে৷’

‘দু মাস?’ বিস্ময়-রহস্য যুগপৎ খেলে গেল রিক্সের চোখে, ‘অথচ ওর বউ এখানে পড়ে রইল! ব্যাপারটা কী?’

‘দেখুন, আমার কাজ আছে৷’ বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘আপনার কিছু দরকার থাকলে তাড়াতাড়ি বলুন৷’

‘কার্লের সঙ্গে আমায় দেখা করা ভীষণ জরুরি—ওর ঠিকানাটা আমাকে দাও৷’

‘ঠিকানা আমি জানি না৷’

‘তাহলে মিসেস জেনসন নিশ্চয়ই বলতে পারবেন, হুঁ?’

‘বলছি না, ঠিকানা আমরা জানি না৷ শুধু জানি, তিনি অ্যারিজোনায় গেছেন৷’

‘আমরা!’ রিক্সের চোখে মুখে ব্যঙ্গের কৌতুক নেচে উঠল, ‘এর মধ্যেই ‘আমরা’! কার্ল যে বোকা তা জানতাম, কিন্তু এতবড় গর্দভ, তা তো ভাবিনি! নাঃ, তোমার ভাই বুদ্ধি আছে৷ ওজনদার আস্লি মাল চিনতে তোমার জুড়ি নেই৷’ জিভটা ঠোঁটের উপর একবার বুলিয়ে নিল রিক্স, শেয়ালের চাউনি নিয়ে হাসল, ‘যাকগে, ওসব তোমাদের ব্যাপার তোমরা বুঝবে—কার্লের ঠিকানাটা শুধু আমাকে দাও৷ আমার পেনসনের কাগজে ওর সই দরকার৷ সবসময় কার্লই ওটা সই করে৷ তাই ওর সই না হলে পেনসনের টাকা পাওয়া যাবে না৷’

‘তার আমি কি করতে পারি? ঠিকানা জানা থাকলে আপনাকে আগেই দিয়ে দিতাম, একবারের বেশি দুবার বলতে হত না৷ মি. জেনসন না ফেরা পর্যন্ত আপনাকে অপেক্ষা করতেই হবে৷’

রিক্স টুপি খুলে মাথায় হাত বোলাল—চোখের মণি অচল, অনড়৷ কুকুরটাও অবাক হয়ে আমাকে দেখতে লাগল৷

‘তার মানে দু-মাস অপেক্ষা করতে হবে?—তা, এতদিন কি হাওয়া খেয়ে বেঁচে থাকব?’

‘সে আমি কি জানি, হাওয়া খাবেন কি জল খাবেন!’ রাগে বিরক্তিতে অধৈর্য হয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম৷ কিন্তু পরমুহূর্তেই স্বরকে সংযত করে বললাম, ‘এ ক দিন একটা কাজ-টাজও তো করতে পারেন!’

‘তোমার কাছ থেকে কোন উপদেশ শুনতে আমি আসিনি, খোকা!’ দাঁত কিড়মিড় করে উঠল রিক্স, ‘আমার হার্টের অসুখ আছে৷ কোনরকম কাজ করা ডাক্তারের বারণ—তাহলে ঠিকানা লোলাও জানে না?’

‘কতবার আপনাকে বলতে হবে! আমরা কেউই জানি না৷’

রিক্স ঝুঁকে পড়ে কুকুরটার মাথায় হাত বোলাতে লাগল৷ হঠাৎ যেন জবাব খুঁজে পেয়ে চোখ তুলে তাকাল, ‘মনে কর যদি সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটে যায়? যদি লোলা অসুস্থ হয়ে পড়ে? ধর, এই পেট্রল পাম্পে যদি আগুন লাগে, তাহলে? কখন কার্লকে নিশ্চয়ই খবর দেবে? জরুরী প্রয়োজনে খবর দেওয়ার জন্যে কার্ল নিশ্চয়ই একটা ঠিকানা দিয়ে গেছে?’

‘না! মিসেস জেনসনও অসুস্থ হচ্ছেন না, আর এখানে আগুনও লাগছে না! অতএব ভালোয় ভালোয় কেটে পড়ো! আমার কাজ আছে৷’

‘কিন্তু সই না পেলে পেনসনের টাকা তো পাব না!’ ভাঙা ফ্যাঁসফ্যাঁসে স্বরে রিক্স যেন আবেদন জানাল৷

দিয়ে দিই না গোটা কয়েক ডলার, ব্যাটার হাত থেকে যদি নিষ্কৃতি পাওয়া যায়?—কিন্তু নাঃ, আজ যদি টাকা দিই, তবে রিক্স যেরকম নাছোড়বান্দা, রোজ এসে টাকার জন্য ঘ্যানঘ্যান করবে৷ ভাগিয়ে দেওয়াই ভালো৷

‘যাও, যাও—কেটে পড়! আর ঝামেলা করো না৷’ একটু বেশিই রুক্ষ হলাম৷

তারপর স্টেশন-ওয়াগনটার কাছে ফিরে গিয়ে ডিস্ট্রিবিউটর হেডটা আটকে বনেট বন্ধ করে দিলাম৷

‘মিসেস জেনসন কখন ফিরবে?’

‘বলতে পারছি না—তবে মনে হয় দেরি হবে৷’

কিছুক্ষণ নীরবতা৷ অবশেষে রিক্সের ভাঙা স্বর কানে এল, ‘আমাকে কুড়িটা ডলার ধার দিতে পারবে?’

‘টাকা তো আর আমার নয়, সে ইচ্ছেমতো ধার দেব! যাও, আর বিরক্ত করো না৷’

কিন্তু রিক্সের নড়বার কোন লক্ষণ দেখা গেল না৷

উবু হয়ে বসে রেঞ্চ দিয়ে গাড়িটার একটা চাকা খুলতে শুরু করলাম৷ চাকাটায় একটু টাল থাকায় গাড়ি চালাবার সময় স্টিয়ারিং কাঁপে, তাই—

‘ভাবছি অ্যারিজোনা পুলিশকে খবর দেব৷ ওরা হয়ত কার্লের ঠিকানা খুঁজে বের করতে পরবে৷’

একটা শক্ত নাট প্রাণপণ শক্তিতে খোলার চেষ্টা করছিলাম, রেঞ্চটা নাটের গা থেকে পিছলে যেতেই সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম৷ রিক্স বলে কি!

ও কিন্তু কথাগুলো অত্যন্ত সাধারণভাবেই বলেছে৷ হয়তো তেমন কিছু ভেবে বলেনি৷ কিন্তু পুলিশ যদি রিক্সের কথায় সত্যি সত্যি জেনসনের খোঁজ শুরু করে দেয়! তাহলেই কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়বে! মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে উঠল৷ সব-কিছু যেন গুলিয়ে যেতে লাগল৷

‘তাই কর!’ গলারস্বর যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টা করলাম, ‘পুলিশ দিয়ে খোঁজ করাচ্ছ শুনলে মি. জেনসন হয়তো বেশি খুশি হবেন—হয়তো তোমার কাগজে একটার জায়গায় দুটো সই করে দেবেন!’

ছড়ে-যাওয়া আঙুলটা চুষতে চুষতে রিক্সের উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম৷

‘তা কি আর করব! তুমি যখন কার্লের ঠিকানা জানই না, তখন এ ছাড়া আর উপায় কি! কার্ল যা খুশি ভাবে ভাবুক, ওর সই আমাকে পেতেই হবে৷—তবে আমার কি মনে হয় জান? লোলা হয়ত জানে৷ তোমার কাছে চেপে গেছে৷ লোলা ফিরলে ওকে বলো৷ শেষ পর্যন্ত ও যদি ঠিকানা না-ই দেয়, তবে অ্যারিজোনা পুলিশকেই জানাব৷ কার্লকে খুঁজে বের করতে ওদের বেশি সময় লাগবে না৷’

এবার রিক্সের দিকে ঘুরে তাকালাম, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে—মিসেস জেনসন ফিরলে তাঁকে বলব৷ আমি যতদূর জানি—ঠিকানা তিনিও জানেন না,—তবু একবার জিগ্যেস করব৷’

রিক্সের মতো লোককে একথা বলা মানে, হার স্বীকার করে নেওয়া৷ কিন্তু কি করব? কোন পুলিশ অফিসার এখানে এসে জেনসনের খোঁজ করবে, একথা ভাবলেই হাত পা অসাড় হয়ে আসছে৷

আমার কথায় রিক্স হাসল৷ ধূর্ত শেয়ালের হাসি, ‘তাই বলো৷ আমি কাল রাতে আবার আসব৷ ঠিকানাটা জোগাড় করে রেখো কিন্তু—’

রিক্স ওর কুকুরটাকে নিয়ে গাড়িতে ফিরে চলল৷

ওরা চলে যেতেই ভীষণ ক্লান্ত লাগল নিজেকে৷ তাড়াতাড়ি চাকাটা সারিয়ে রেস্তোরাঁয় গেলাম৷ একটা গ্লাসে কিছুটা হুইস্কি ঢেলে, চুমুক দিলাম৷ রিক্সের কথাগুলো মাথার মধ্যে ঘোরাফেরা করতে লাগল৷

হুইস্কি শেষ করে একটা সিগারেট ধরিয়ে পায়চারি করতে লাগলাম৷ সত্যি, মহা বিপদে ফেলল এই বুড়ো শকুনটা!

অ্যারিজোনা পুলিশ কি রিক্সের চিঠির কোন গুরুত্ব দেবে? হয়তো দেবে না৷ কিন্তু ও যদি জানায়, জেনসন উধাও, আর—তার স্ত্রী ওর কর্মচারীর সঙ্গে রাত কাটাচ্ছে, তাহলে? অনেক সময় এরকম সামান্য খবর পেয়েই পুলিশ তদন্ত শুরু করে৷ ওরা যদি জেনসনকে অ্যারিজোনায় খুঁজে না পায়, তাহলে নির্ঘাত এখানে লোক পাঠাবে৷ তারপর এখানে এসে আমার ঠিকুজি-কুষ্ঠি জানতে চাইবে—অর্থাৎ আমার চিতা সাজাবে৷

নাঃ, যেভাবে হোক, রিক্সের মুখ বন্ধ করতেই হবে৷ এবং তার একমাত্র পথ ওকে টাকা দেওয়া৷ এভাবে টাকা দিয়ে হয়ত মাস দুয়েক ওকে ঠকিয়ে রাখা যাবে৷ তারপর? জেনসন যে অন্য একটা মেয়েকে নিয়ে ভেগে পড়েছে, সেকথা কি ও বিশ্বাস করবে? উঁহু—রিক্স যেরকম স্বভাবের লোক, নিঃসন্দেহে চিঠিটা দেখতে চাইবে৷ কিন্তু চিঠিটা জাল বলে কি বুঝতে পারবে? মনে হয় চিনে ফেলার সম্ভাবনাই বেশি৷ কারণ ওর পেনসনের কাগজে সবসময় জেনসনই সই করত! সুতরাং ও সহজেই বুঝতে পারবে চিঠিটা জেনসনের লেখা নয়৷ স্রেফ জালিয়াতি! তারপর!—

যতই ভাবছি, পরিস্থিতি ততই জটিল মনে হচ্ছে৷ রিক্সের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে বুঝে শুনে প্রতিটি পা ফেলতে হবে৷ হঠাৎ সাময়িক উত্তেজনাবশে কিছু করে বসা ঠিক হবে না৷

লোলার সঙ্গে এ নিয়ে একটা আলোচনা করা দরকার৷ কারণ জর্জ রিক্স আমাদের দুজনেরই শত্রু৷

রাত দশটায় লোলা যখন ফিরল, তখনও রিক্সকে ঠেকাবার কোন সমাধান আমি খুঁজে পাইনি৷

রান্নাঘরে কাজ করছিলাম৷ লোলার গাড়ির আওয়াজে বাইরে এলাম৷ গাড়ির থেকে নেমেই ও হনহন করে বাংলোর দিকে হেঁটে চলল৷ ছুটে ওর পাশে গিয়ে হাজির হলাম, ‘তোমার সঙ্গে জরুরী কথা আছে৷’

কোন ভ্রূক্ষেপ না করেই ও দরজা খুলে বাংলোয় ঢুকে পড়ল৷ পিছন পিছন আমিও ঢুকলাম৷ লোলা ঘাড় ফেরাল, ওর সবুজ চোখজোড়ায় যেন সবুজ আগুন ঠিকরে বেরোল, ‘বেরিয়ে যাও! বেরিয়ে যাও!’

‘তাই নাকি! কপট কৌতুকে ওর দিকে তাকালাম, ‘তোমার পেয়ারের দোস্ত—রিক্স—আজ সকালে এখানে এসেছিল যে!’

লোলা ভীষণভাবে চমকে উঠল৷ ওর মুখের রেখা কঠিন হল৷ রাগের বদলে চোখে ফুটে উঠল একটা সতর্ক ভাব৷ আমি নির্বিকারভাবে বসবার ঘরে গিয়ে একটা চেয়ারে বসলাম৷ লক্ষ্য করলাম, কার্পেটের উপর যে রক্তের দাগ ছিল, সেটা লোলা পরিষ্কার করে ফেলেছে৷ চোখ তুলে তাকাতেই দেখি ও দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে৷ টুপিটা মাথা থেকে খুলে, ও চুলের ভেতর আঙুল চালাল৷ সবুজ পোশাক আর লাল চুল—দুয়ে মিলিয়ে ওকে দেখাচ্ছে দারুণ!

‘রিক্স মি. জেনসনের খোঁজ করছিল৷ ওর পেনসনের কাগজে তার সই দরকার—তাই কার্লের ঠিকানা চাইছিল৷’

লোলা নির্বিকার—যেন শুনতে হয় তাই শুনছে৷

‘ঠিকানা জানি না বলার পর ও বলেছে, অ্যারিজোনা পুলিশকে জেনসনের খোঁজ করতে বলবে৷ কারণ তাঁর সই না হলে রিক্স পেনসনের টাকা পাবে না৷’

লোলা এবার একটু চিন্তিত হয়েছে মনে হল৷ ও দরজা বন্ধ করে আমার মুখোমুখি একটা চেয়ারে এসে বসল৷

‘তোমার এই মাথামোটা বুদ্ধির জন্যেই এ অবস্থা হয়েছে!’ ও চেঁচিয়ে উঠল, ‘এখন বোঝ ঠ্যালা!’

‘ষাঁড়ের মতো চেঁচিও না৷ রিক্স আমাদের দুজনেরই শত্রু৷ ও কাল রাতে আবার আসবে বলেছে৷ এর মধ্যেই আমাদের ভেবে ঠিক করতে হবে রিক্সকে নিয়ে কি করব৷’

লোলা শান্তভাবে একটা সিগারেট ধরাল, নাক দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল, ‘এতে ভাববার কী আছে? সিন্দুকটা খুলে তোমার টাকা নিয়ে তুমি ভেগে পড় বাকি টাকাটা নিয়ে আমিও কেটে পড়ব৷ রিক্স এসে দেখবে, আমরা কেউ নেই৷’

‘বাঃ, চমৎকার বুদ্ধি! কে বলে তোমার বুদ্ধি মাথামোটা!’ অধৈর্য হয়ে খেঁকিয়ে উঠলাম, ‘কিন্তু ভেবে দেখছ কি, কোন লোক পেট্রল নিতে এসে যদি দেখে জায়গাটা খালি তবে কী হবে? রিক্স যখন দেখতে আমরা কেউ নেই, ও কি পুলিশে খবর দেবে না মনে করছ? আর তখনই আমাদের পেছনে ফেউ লাগবে৷’

‘জায়গাটা বিক্রি করে দিলে কেমন হয়?’

ওর নির্বুদ্ধিতায় মাথায় রক্ত চড়ে গেল, ‘এ কি তোমার বাপের জায়গা, বেচে দেবে? তোমাকে প্রমাণ করতে হবে, জেনসন মৃত৷ প্রমাণ করতে হবে সে উইল করে জায়গাটা তোমাকে দিয়ে গেছে৷ পারবে প্রমাণ করতে? তখন আর জানতে কারা বাকি থাকবে না, কার্লকে তুমি খুন করেছ!’

‘না না—ওকে আমি খুন করিনি! আচমকা গুলি বেরিয়ে গিয়ে—’

‘পুলিশকে তাই বলে দেখ কি হয়!’

লোলার দু-হাতের চেটো চেয়ারের হাতলদুটোকে নিষ্ফল আক্রোশে নিষ্পেষিত করতে লাগল৷ ওর মুখের ভাব দেখে বুঝলাম, ও হাড়ে হাড়ে অনুভব করছে, কি ফাঁদে আমরা জড়িয়ে পড়েছি৷

‘তাহলে তুমি এখানে থাক, আর সিন্দুক খুলে আমার টাকা আমাকে দিয়ে দাও— আমি চলে যাব৷ কেউ জিগ্যেস করলে বলো, আমি অ্যারিজোনায় কার্লের কাছে গেছি—না ফেরা পর্যন্ত এই ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন-এর দায়িত্ব তোমার ওপরেই রয়েছে৷’

‘তুমি কি ভেবেছ রিক্সের মতো লোক সে-কথা বিশ্বাস করবে? প্রথমে জেনসন উধাও হল, তারপর তুমি—পেট্রল-পাম্পে আমি একা৷ ও সোজা পুলিশকে গিয়ে বলবে, আমি তোমাদের দুজনকে খুন করে এখনকার মালিক হয়ে বসেছি৷ রিক্সের কথা পুরোপুরি বিশ্বাস না করলেও, ওরা তদন্ত করতে এখানে আসবেই৷ তারপর হয়তো জানতে পারবে আমার পরিচয়—খুঁজে পাবে জেনসনের মৃতদেহ৷’

লোলা তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল, ‘কী! তুমি কার্লকে এখানে কবর দিয়েছ? পাগলামোর একটা সীমা থাকা দরকার!’

‘তা ছাড়া আর কোথায় কবর দেব?—তুমি কি আমাকে সাহায্য করেছিলে? ভেবেছিলে, এই তিনমণী লাশটাকে আমি একা স্টেশন-ওয়াগনে তুলে নিয়ে যাব? চমৎকার! কার্লকে আমি গুমটিঘরে পুঁতে ফেলেছি৷ পুলিশ যদি রিক্সের কথায় এখানে এসে খোঁড়াখুড়ি শুরু করে দেয়, তবে নির্ঘাত ওর দেহ খুঁজে পাবে৷’

লোলা তীক্ষ্ণ স্বরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘তার মানে! তোমার সঙ্গে আমাকে এখানে চিরদিন থাকতে হবে?’

‘চিরদিন কিনা জানি না, তবে থাকতে হবে৷’ দৃঢ়স্বরে জবাব দিলাম, ‘এ ছাড়া আমাদের আর-কোন পথ নেই৷’

‘তুমি থাকলে থাক, আমি এখানে এক মুহূর্তও থাকছি না৷’ লোলা চেয়ারের হাতলে এক ঘুষি বসিয়ে দিল, ‘অনেক সহ্য করেছি, আর নয়৷ এখুনি আমার টাকা আমাকে দিয়ে দাও৷’

হাত বাড়িয়ে সিন্দুকটাকে দেখালাম, ‘তাহলে যাও, আর দেরি করছ কেন? সিন্দুক খুলে টাকা নিয়ে চলে যাও!—তবে আমার কথাগুলো আর-একটু ভেবে দেখো, তাহলেই বুঝতে পারবে, এ ছাড়া আমাদের আর পথ নেই৷’

বাংলো ছেড়ে বেরিয়ে এলাম৷ লোলা চেয়ারেই বসে রইল—চোখে আতঙ্ক আর ঘৃণা নিয়ে৷

রাত বারোটা পর্যন্ত পাম্পের কাছে বসে রইলাম৷ রিক্সের চিন্তাকে কিছুতেই মন থেকে তাড়াতে পারছি না৷ চেয়ে দেখি বাংলোর আলো জ্বলছে, অর্থাৎ লোলার মনেও একই ভাবনা৷ অবশেষে চিন্তার হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য ঘরে ফিরে গেলাম৷ হাতমুখ ধুয়ে, জামাকাপড় ছেড়ে শুয়ে পড়লাম৷ কিন্তু বুঝলাম ঘুমোবার চেষ্টা নিরর্থক৷

হঠাৎ ঘরের দরজা খোলার মৃদু শব্দে চমকে উঠলাম৷ রিক্সের চিন্তা মুহূর্তে মন থেকে মিলিয়ে গেল৷ কাঠ হয়ে শুয়ে দরজার দিকে চেয়ে রইলাম—

দরজা-পথে ঘরে এসে ঢুকল এক ছায়ামূর্তি৷ জানালা দিয়ে ঠিকরে-পড়া চাঁদের আলোয় তাকে চিনতে পারলাম—লোলা!

ওর গায়ে সবুজ সিল্কের চাদর৷ চাঁদর রুপোলী আলো সেটা গায়ে পড়ে পিছলে যাচ্ছে৷ লোলা আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে আমার পাশে বসল৷ ওর চাপা ফিসফিস স্বর কানে এল, ‘শেট, যদি আমাদের একসঙ্গেই থাকতে হবে, তবে আর মিছিমিছি শত্রুতা করে লাভ কী?’

ও আমার দেহের উপর ঝুঁকে এল—আমার মুখের উপর নামিয়ে আনল ওর মুখ—ওর তৃষ্ণার্ত ঠোঁট ডুবিয়ে দিল আমার ঠোঁটে—