এক
ওরা চারজন—
তাস খেলার গোল টেবিলটাকে ঘিরে বসে আছে ওরা চারজন।
টেবিলের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে ‘পোকার’ খেলার প্লাস্টিকের চাকতি। দুটো অ্যাশট্রে। পোড়া সিগারেটের টুকরোয় ঠাসা। এক বোতল হুইস্কি; আর তার পাশে চারটে শূন্য কাচের গেলাস।
ঘরটা আলো-আঁধারিতে ঢাকা। শুধু মাথার ওপরে ঝোলানো একটা শেড দেওয়া আলো টেবিলের একটা বৃত্তাকার অংশকে সবুজ আলোয় আলোকিত করে তুলছে। সিগারেটের সাদা ধোঁয়ার কুণ্ডলী সেই সবুজাভ আলোর বৃত্ত ছাড়িয়ে ভেসে চলেছে অন্ধকারের উদ্দেশ্যে।
চারজনের মধ্যে অপেক্ষাকৃত দশাসই চেহারার লোকটা তার হাতের চারটে তাস টেবিলে চিৎ করে নামিয়ে রাখল। তারপর চেয়ারে গা এলিয়ে ভাবলেশহীন মুখে অন্য তিনজনের দিকে তাকাল। তার ডান হাতের তর্জনী ও মধ্যমা চঞ্চল হয়ে উঠল টেবিলের ওপর। আঙুলের টোকায় সৃষ্টি হল এক বিচিত্র ছন্দোময় শব্দের।
অন্য তিনজন কিছুক্ষণ স্থিরভাবে বসে রইল। তিনজোড়া চোখই টেবিলে পড়ে থাকা চারটে সাহেবের দিকে নিবদ্ধ। অবশেষে বিরক্তিভরে তারা নিজেদের তাসগুলো টেবিলে ছুড়ে ফেলল।
ফ্ল্যাঙ্ক মরগ্যানের চঞ্চল, শীতল চোখের তারা হয়ে উঠল আরও চঞ্চল। পাতলা ঠোঁটে ফুটে উঠল বিজয়ীর হাসি; সে হাসি বুঝি ধূর্ত নেকড়ের হাসির সঙ্গেই তুলনীয়।
‘জিপো, আরও একবার তাহলে আমার কাছে তোমাদের হারতে হল?’ তার বিপরীত দিকে বসে থাকা জিশেপ ম্যানডিনির দিকে তাকিয়ে কৌতুক ভরে প্রশ্ন করল মরগ্যান।
জিশেপ ম্যানডিনির কালো কোঁকড়ানো চুলে রগের কাছে সামান্য পাক ধরেছে। ছোট তীক্ষ্ণ নাক। গায়ের রঙ বাদামি। মরগ্যানের কথায় সে ঝকঝকে সাদা দাঁতের সারি বের করে বিষণ্ণভাবে হাসল। তারপর অস্বাভাবিক স্থূলকায় শরীরটাকে সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে তার প্লাস্টিকের চাকতিগুলো ঠেলে দিল মরগ্যানের দিকে, ‘আমি আর নেই, ফ্রাঙ্ক। আজ আমার ভাগ্য-টাগ্য সব খরচের খাতায় জমা পড়ে গেছে। শালা, সন্ধে থেকে একটা নওলার বেশি কোনও তাস পেলাম না।’
এডওয়ার্ড ব্লেক মরগ্যানের মুখ থেকে চোখ সরিয়ে নিজের চাকতিগুলোর দিকে তাকাল; আলতো করে আঙুল চালাল সাজানো চাকতির স্তূপে। তারপর চারটে চাকতি টোকা মেরে এগিয়ে দিল মরগ্যানের দিকে। তার মুখ ভাবলেশহীন, নির্বিকার।
এডওয়ার্ড ব্লেক লম্বা, সুদর্শন। সূর্যস্নাত দেহের রঙ ঈষৎ বাদামি। তার সৌন্দর্যের আতিশয্য মহিলাদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও পুরুষের মনে জাগিয়ে তোলে সতর্কতার সংকেত। ব্লেকের পরনে নিভাঁজ রঙের স্যুট। গাঢ় সবুজ টাইয়ের ওপর আঁকা সোয়ালো পাখির ছবি।
উপস্থিত চারজনের মধ্যে তার বেশবাসই একমাত্র চোখে পড়ার মতো।
চারজনের চতুর্থজন কিটসন—আলেক্স কিটসন। বয়েস বছর তেইশ হবে। শক্ত সমর্থ বলিষ্ঠ চেহারা। কঠিন চৌকো চোয়াল। ভাঙা গালের হনু দুটো সামান্য উঁচু। নাকটা পেশাদার মুষ্টিযোদ্ধাদের মতোই চ্যাপ্টা। কালো চোখের তারায় সতর্ক ভাব। মোটের ওপর তেইশ বছরের সরলতা তার মুখ থেকে একেবারে মিলিয়ে গেছে।
কিটসনের পরনে একটা বুক-খোলা শার্ট এবং সস্তা দামের মোটা সুতির প্যান্ট। সে তার অবশিষ্ট চাকতিগুলো মরগ্যানের দিকে ঠেলে দিয়ে মুখভঙ্গি করল, ‘আমিও আর নেই। ভেবেছিলাম এ দানটা জিতে যাব। শালা, চারটে বিবি পড়েছিল, কিন্তু…’ কথা শেষ না করেই মাঝপথে থেমে গেল কিটসন। হঠাৎই তার নজরে পড়ল ব্লেক এবং জিপো তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে মরগ্যানকে লক্ষ করছে। কিটসন কথা ওদের কানেও ঢুকছে না।
জিপো, ব্লেক এবং কিটসনের এগিয়ে দেওয়া চাকতিগুলোকে মরগ্যান ততক্ষণে তিনটে ভাগে সাজিয়ে ফেলেছে। তার পাতলা ঠোঁটের কোনা থেকে অবহেলাভাবে ঝুলে রয়েছে একটি জ্বলন্ত সিগারেট। তার শ্বাস-প্রশ্বাসের গভীর শব্দ অন্য তিনজন পরিষ্কার শুনতে পেল।
নিজের খুশিমতো চাকতিগুলোকে সাজানো হয়ে গেলে মরগ্যান চোখ তুলে তাকাল। তার সাপের মতো কালো, শীতল চোখজোড়া প্রত্যেকের মুখে খেলে বেড়াতে লাগল।
ব্লেক আর সইতে পারল না। অবৈধভাবে বলে উঠল, ফ্র্যাঙ্ক, তোমার মতলবটা কী খুলে বলো তো? সেই সন্ধে থেকে দেখছি কিছু একটা বলার জন্যে তুমি উসখুস করছ!’
মরগ্যান কোনও জবাব না দিয়ে টেবিলের ওপর টোকা মেরে বাজিয়ে চলল বাজনার ছন্দ। তারপর হঠাৎই একসময় প্রশ্ন করল, ‘দু-লাখ ডলার করে পেলে তোমরা নিতে রাজি আছ?’
ওরা তিনজনেই চমকে উঠল। কঠিন হল ওদের মুখভাব। কারণ মরগ্যানকে ওরা চেনে। ওরা নিশ্চিতভাবে জানে, এরকম একটা ব্যাপার নিয়ে মরগ্যান কখনও ঠাট্টা করছে না—কখনও করেওনি।
আগ্রহে অবিশ্বাসে সামনের দিকে ঝুঁকে এল জিপো। চাপা স্বরে প্রশ্ন করল, ‘কী বললে?’
‘দু-লাখ ডলার করে প্রত্যেকে।’ শেষ শব্দটার ওপর অযথাই জোর দিল মরগ্যান, ‘টাকাটা বলতে গেলে সাজানো রয়েছে নাকের ডগায়, কিন্তু কাজটায় প্রচণ্ড ঝুঁকি আছে।’
ব্লেক নিঃশব্দে পকেট থেকে বের করে আনল এক প্যাকেট সিগারেট। আঙুলের স্বচ্ছন্দ টোকায় একটা সিগারেট বের করে চোখ তুলে তাকাল মরগ্যানের দিকে। নিষ্প্রাণ স্বরে প্রশ্ন করল, ‘তার মানে, মোট টাকার পরিমাণ আট লক্ষ ডলার?’
‘না, দশ লাখ। এবং সে টাকাটা ভাগ হবে পাঁচ ভাগে … অর্থাৎ তোমরা যদি এ ব্যাপারে আমার সঙ্গী হও।’
‘পাঁচ-ভাগে!…তা পঞ্চম ব্যক্তিটি কে? তীক্ষ্ণস্বরে জানতে চাইল ব্লেক।
‘সে কথায় আমরা পরে আসছি।’ কথা শেষ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল মরগ্যান। তার ফ্যাকাসে মুখমণ্ডল সুপ্ত উত্তেজনায় টলমল। দু-হাতের লোমশ থাবায় সে টেবিলে ভর দিয়ে সামনে ঝুঁকে পড়ল, ‘এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সুযোগ, এড—যদিও কাজটা নেহাত সোজা নয়। কিন্তু ভেবে দ্যাখো ওই দশ লাখ ডলারের কথা; যে টাকা আমরা পরম নিশ্চিন্তে পকেটে রেখে ঘুরতে পারব, যে টাকায় নেই কোনও বিপদের সম্ভাবনা! কারণ দশ ডলারের চেয়ে বড় নোট ওতে নেই। …তবে একটা বিষয়ে তোমরা নিশ্চিত থেকো; কাজটা কিন্তু সত্যিই কঠিন।
‘দশ-লক্ষ-ডলার!’ জিপো অবাক বিস্ময়ে তখন মরগ্যানের দিকে তাকিয়ে, ‘অসম্ভব! গোটা পৃথিবী চষলেও অত টাকা পাওয়া সম্ভব নয়।’
মরগ্যান হাসল; ক্ষুধার্ত হায়েনার হাসি, ‘বললাম তো, এই আমাদের সবচেয়ে বড় দাঁও মারার সুযোগ। দু-লক্ষ ডলার করে পেলে এই পৃথিবী থাকবে আমাদের হাতের মুঠোয়।’
‘ফ্র্যাঙ্ক, তুমি কি রকেট রিসার্চ স্টেশনের সাপ্তাহিক মাইনের কথা বলছ?’ আচমকা প্রশ্ন করল ব্লেক।
মরগ্যান বসল। মুখে বিজ্ঞের হাসি। ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল ব্লেকের কথায়, ‘তোমার বুদ্ধি আছে ,এড। হ্যাঁ …আমি ওই টাকার কথাই বলছি। তুমি তো জানো, রকেট রিসার্চ স্টেশনের মাইনের টাকায় দশ ডলারের চেয়ে বড় কোনও নোট থাকে না; অথচ মোট টাকার পরিমাণ দশ লক্ষ ডলার! কেমন, রাজি!
কথা শেষ করে মরগ্যান কিটসনের দিকে তাকাল। কিটসনের দু-চোখের তারায় হতচকিত, শূন্য দৃষ্টি।
‘কী হল, আলেক্স, একেবারে বোবা হয়ে গেলে যে!’
আলেক্স কিটসনের বলিষ্ঠ আঙুল উত্তেজনায় হাওয়া আঁকড়ে ধরল, ‘তুমি কি পাগল হয়েছ, ফ্র্যাঙ্ক! আর যাই করি, এ কাজে আমরা নামছি না। নেহাত বুদ্ধিভ্রংশ না হলে এ ধরনের কথাও কেউ চিন্তা করতে পারে না!’
মরগ্যান হাসল; সে হাসি ছোটদের নির্বুদ্ধিতায় বয়স্ক অভিভাবকের করুণার হাসি। তার চোখ কিটসনের মুখ থেকে পিছলে গেল ব্লেকের চোখে। এ কাজে ব্লেকের যদি সম্মতি থাকে তাহলে বুঝতে হবে কাজটা একেবারে অসম্ভব নয়। কারণ বুদ্ধি-সুদ্ধি বলতে যা কিছু, তা এদের মধ্যে একমাত্র ব্লেকেরই আছে। কিটসন ছেলেটা সাহসী বটে, কিন্তু ঘুঁষি আর গাড়ি ছোটানো ছাড়া ওর মাথায় আর কিছু ঢোকে না। অথচ এ কাজে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বুদ্ধির। সুতরাং মরগ্যান প্রশ্ন করল ব্লেককেই, ‘তুমি কী বলো’ এড? কাজটা করা কি আমাদের পক্ষে অনুচিত হবে?’
মাথা ঝুঁকিয়ে সিগারেট ধরাল ব্লেক। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে ভুরু কুঁচকে তাকাল মরগ্যানের দিকে, ‘টাকার ওজন যতই হোক না কেন, এ ধরনের কাজে অন্তত আমি হাত দিতাম না, ফ্র্যাঙ্ক। কিন্তু তোমার যদি কোনও প্ল্যান থেকে থাকে, তাহলে আমি সানন্দে শুনতে রাজি আছি।’
এই হচ্ছে এডওয়ার্ড ব্লেক। সমস্ত ঘটনা না জেনে সম্ভব-অসম্ভব কোনওরকম মতামতই প্রকাশ করতে রাজি নয়।
জিপো তার স্থূলকায় শরীরটাকে টান টান করে সোজা হয়ে বসল। কিটসনের দিক থেকে চোখ সরিয়ে তাকাল মরগ্যানের দিকে। চোখের দৃষ্টিতে অনিশ্চয়তার ছায়া। অস্বস্তিভরে সে প্রশ্ন করল, ‘কাজটার মধ্যে গণ্ডগোলটা কোথায়?’
মরগ্যান সে প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়েই হাত দুলিয়ে দেখাল কিটসনের দিকে, ‘তুমিই বলো, আলেক্স। তোমারই তো জানার কথা! তুমি কিছুদিন চাকরিও তো করেছিলে ওদের ওখানে—।’
‘হ্যাঁ, করেছিলাম, ‘নিস্পৃহস্বরে বলল কিটসন, ‘সুতরাং আমি জানি—এবং ভালোভাবেই জানি গণ্ডগোলটা কোথায়। মাসের পর মাস প্রত্যেকেই এই রকেট রিসার্চ স্টেশনের টাকাকে সযত্নে এড়িয়ে গেছে। কেন জানো? কারণ তারা সকলেই সুস্থ মাথার বুদ্ধিমান লোক; আমাদের মতো বোকা আর পাগল নয়।’ কিটসন আলতো করে একেবারে চোখ বুলিয়ে নিল তিনজন শ্রোতার ওপর । কয়েকজন বয়স্ক লোকের সামনে এভাবে কথা বলতে তার অস্বস্তি লাগছিল; কিন্তু সে নিরুপায়। এই কাজটায় যে কতখানি বিপদের সম্ভবনা, সেটা কিটসন ওদের বেশ ভালো করেই সমঝে দেবে।
‘না, আমি ঠাট্টা করছি না । ফ্র্যাঙ্ক জানে, ‘ওয়েলিং আর্মার্ড ট্রাক এজেন্সির’র প্রতিটি ভাঁজে লুকিয়ে রয়েছে বিপদের অশুভ সংকেত। আমাদের নিয়তির করাল ইঙ্গিত।’
জিপো গালে হাত ঘষল। তারপর ভুরু উঁচিয়ে তাকাল মরগ্যানের দিকে, ‘তুমি নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে কিছু একটা ভেবেছ, ফ্র্যাঙ্ক?’
মরগ্যান জিপোর কথা কানেই তুলল না। স্থিরচোখে চেয়ে রইল কিটসনের দিকে, ‘থামলে কেন, আলেক্স? বলে যাও—ওদের জানিয়ে দাও এ কাজে কতটা ঝুঁকি আছে?’
কিটসন নিঃশব্দে হাত বাড়িয়ে মরগ্যানের সামনের থেকে তুলে নিল একটা পোকারের চাকতি। মনোযোগ সহকারে সেটাকে দু-আঙুলে ঘোরাতে লাগল। মুখমণ্ডলে দ্বিধার ছায়া।
‘আমি ওই এজেন্সির চাকরি যখন ছেড়ে দিই, সেই সময়ে ওরা একটা নতুন ধরনের ট্রাক আমদানি করে।’ হঠাৎই মুখ খুলল কিটসন, ‘তার আগে ওরা যে ট্রাকটা ব্যবহার করত, নতুন ট্রাকটার তুলনায় সেটাকে একটা রদ্দি টিনের বাক্স বললেও বেশি বলা হয় না। আর যাতে থাকত সশস্ত্র চারজন রক্ষী। তারা তীক্ষ্ম নজর রাখত টাকার বাক্সর দিকে।…কিন্তু এই নতুন ট্রাকের মজাটা কী জানো?’ মুচকি হাসল কিটসন। সে হাসিতে বুঝি সামান্য ব্যঙ্গের ছোঁয়া, কোনও সশস্ত্র রক্ষীর প্রয়োজন এ ট্রাকে নেই। তার ওপর ওয়েলিং কোম্পানি এই ট্রাকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে এতই নিশ্চিন্ত যে টাকাটাকে আগের মতো ইনসিওর করার কথাও ওরা আর ভাবে না।’
‘তাহলে ট্রাকটার কিছু বিশেষত্ব আছে, কী বলো?’ মরগ্যান জানতে চাইল।
কিটসন আলগোছে আঙুল চালাল চুলের ফাঁকে। কিছুটা অস্বস্তি হলেও সে মরগ্যানের কাছে প্রমাণ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে কাজটা তাদের পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব। মরগ্যানের সান্নিধ্যে এতদিন কাটিয়ে কিটসন তাকে বিশ্বাস করতে শিখেছে । পেরেছে মরগ্যানের কথায় ভরসা করতে। কিন্তু তবুও এ কাজে সে মন থেকে মরগ্যানকে সায় দিতে পারছে না।
মরগ্যান, ব্লেক, জিপো, কিটসন—ওরা চারজন জোট বেঁধেছে গত ছ-মাস আগে; এবং এর মধ্যেই ছোটখাটো বেশ কয়েকটা কাজ নির্বিঘ্নে গুছিয়ে নিয়েছে। বলাবাহুল্য, প্রতিটি ক্ষেত্রেই ওদের সাহস জুগিয়েছে দলনেতা মরগ্যানের ক্ষুরধার, নিখুঁত পরিকল্পনা। না, দু-লাখ ডলারকে কিটসন কখনই পায়ে ঠেলবে না …তবে এখন অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে ওই টাকা লুট করার কথা চিন্তা করাই একরকম বোকামি৷ মরগ্যান বলছে বটে কাজটা তেমন কঠিন নয়, কিন্ত কিটসন নিশ্চিত, মরগ্যান ভুল করছে, এতবড় ভুল সে বোধহয় সারা জীবনেও করেনি? টাকার অঙ্ক শুনে সম্পূর্ণ উন্মাদ হয়ে গেছে ফ্র্যাঙ্ক মরগ্যান৷ নইলে প্রকৃতিস্থ অবস্থায় এ ধরনের প্রস্তাব কখনই সে করত না৷
‘কী হল ছোকরা—থামলে কেন?’ ব্যঙ্গভরে প্রশ্ন করল মরগ্যান৷ দু-চোখের তারায় পলকের জন্যে ঝিলিক মারল উপহাসের হাসি৷
কিটসন বুক ভরে শ্বাস নিল৷ মনস্থির করে আবার বলতে শুরু করল, ‘দশলাখ ডলার তো দূরের কথা, তুমি ওই ট্রাকের ধারে কাছেও পৌঁছতে পারবে না, ফ্র্যাঙ্ক৷’ কিটসনের স্বর কেঁপে উঠল দৃঢ়তায়, ‘একটা নতুন ধরনের শঙ্কর ধাতুর চাদর দিয়ে তৈরি ওই ট্রাকটা৷ বাইরে থেকে সেই ধাতব দেওয়াল কেটে ভেতরে ঢোকা সম্পূর্ণ অসম্ভব৷ হয়তো অ্যাসিটিলিন টর্চ ব্যবহার করলে সে দেওয়ালকে গলানো যেতে পারে, কিন্তু তাতেও সময় লাগবে কম করে এক সপ্তাহ৷ দ্বিতীয়ত, ট্রাকটার দরজায় লাগানো আছে, একটা সময়-নির্ভর তালা৷ ট্রাকে টাকা বোঝাই করার পর ওরা দরজায় তালা দিয়ে দেয়৷ তুমি তো জানো, এজেন্সি থেকে রিসার্চ স্টেশনে পৌঁছতে সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা৷ সুতরাং সেই সময়-নির্ভর তালাকে এমন যান্ত্রিক উপায়ে বন্ধ করা হয়, যাতে চার ঘণ্টার জন্যে সেই তালা হয়ে পড়বে সম্পূর্ণ অকেজো৷ কেবলমাত্র চার ঘণ্টা পরেই খোলা যাবে সেই অদ্ভুত তালাকে৷ বুঝতেই পারছ, ড্রাইভারের সুবিধের জন্যেই এক ঘণ্টা সময় বেশি দেওয়া হয়৷’
পোকারের চাকতিটা টেবিলে নামিয়ে রাখল কিটসন৷ চোখ বুলিয়ে নিল উৎকণ্ঠিত ব্লেক ও জিপোর মুখে৷ অসীম আগ্রহে ওরা দুজনেই ঝুঁকে পড়েছে টেবিলের ওপর৷ মুখের প্রতিটি পেশি টান-টান৷ ‘এছাড়া ট্রাকের ড্যাশবোর্ডে রয়েছে একটা বিশেষ বোতাম, যার সঙ্গে সরাসরি যোগ রয়েছে ওই বিশেষ তালার৷ কোনও বিপদের সামান্যতম আভাস পেলেই ড্রাইভারের কাজ হল ওই বোতামটি টিপে দেওয়া, এবং তাহলেই চিত্তিরি!’
“তার মানে?’ মরগ্যান কপট কৌতূহলে জানতে চাইল৷
‘অর্থাৎ ওই সময়-নির্ভর তালা চিরতরে বন্ধ হয়েই থাকবে৷ চার ঘণ্টা কেন, চার বছর অপেক্ষা করলেও সে তালা আর খুলবে না৷ হ্যাঁ, উপায় একটা আছে—তবে সে কাজ কোনও যে সে লোকের নয়৷ একজন রীতিমতো দক্ষ কারিগরের পক্ষেই সে তালা আবার খোলা সম্ভব!’ কিটসন সিগারেট ধরিয়ে নাক দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল? হাত নেড়ে ব্যাপারটা সকলকে বোঝাতে চাইল, ‘শুধু এই নয়, আরও আছে৷ এতসব বন্দোবস্ত সত্ত্বেও সব সময় ওদের সঙ্গে থাকে একটা শর্ট ওয়েভ ট্রান্সমিটার৷ এজেন্সি থেকে ট্রাক বেরোনো মাত্রই ট্রাক ড্রাইভার ও এজেন্সির সঙ্গে চলে ট্রান্সমিটারের মাধ্যম কথাবার্তা৷ আর সেই যোগাযোগ বন্ধ হয় একেবারে রিসার্চ স্টেশনে ট্রাক পৌঁছনোর পর৷ কিটসন চোখ না তুলেও বুঝতে পারল মরগ্যান তার দিকে চেয়ে বিদ্রুপের হাসি হাসছে৷ কিছুটা অপমানিত ও উত্তেজিত হয়ে সে জিপোর দিকে আঙুল উঁচিয়ে ধরল, শোনো জিপো, মনে করো কোনও গর্দভ এই ট্রাকটা লুট করতে চায়৷ তারপর মনে করো সেই অতিবুদ্ধিমান ব্যক্তিটি রাস্তা আটকে যে করে হোক ট্রাকটাকে থামাল৷ তারপর?… তখন ড্রাইভার ও রক্ষী এজেন্সির নিদের্শমতো ওদের কর্তব্য করে যাবে৷ প্রথমেই ড্রাইভার বোতাম টিপে সময়-নির্ভর তালাটার বারোটা বাজিয়ে দেবে, আর একই সঙ্গে ড্রাইভারের সঙ্গী টিপে দেবে আরও একটা বোতাম, যার ফলে ট্রাকের জানলা, দরজা, উইন্ডশিল্ড—সব ঢাকা পড়ে যাবে দুর্ভেদ্য ইস্পাতের চাদরে৷ অর্থাৎ ট্রাকটা হয়ে দাঁড়াবে একটা অভেদ্য ধাতব বাক্স—যা কোনও মানুষের পক্ষেই খোলা সম্ভব নয়৷ এরপরও বাকি থাকবে আর একটা বোতাম৷ ওটা টিপলে ওদের শর্ট ওয়েভ ট্রান্সমিটার প্রচার করে যাবে এক অদৃশ্য সংকেত, যার কোনও বিরাম নেই, ক্লান্তি নেই৷ তখন পুলিশের যে কোনও ওয়্যারলেস ভ্যানই ট্রাকটাকে খুঁজে বের করতে পারবে৷ মোটের ওপর ড্রাইভার ও তার রক্ষীর কাজ হচ্ছে সন্দেহজনক কিছু দেখলেই ওই তিনটে বোতাম টিপে নিজেদের জায়গায় গ্যাঁট হয়ে বসে থাকা—এবং পুলিশের অপেক্ষা করা৷’ টোকা মেরে সিগারেটের ছাই ঝাড়ল কিটসন৷ স্নায়বিক উত্তেজনায় তার কপালে ঘামের ফোঁটা, কাঁপছে হাতের আঙুল, ‘সুতরাং বুঝতেই পারছ, এ ধরনের ট্রাক থেকে দূরে থাকাই বাঞ্চনীয়৷ তা টাকার পরিমাণ যাই হোক না কেন, ইলেকট্রিক চেয়ারে যাবার ইচ্ছে আমার নেই, তোমাদের আছে কি না জানি না৷’
জিপোর মুখে নেমে এল হতাশার কালো মেঘ। মুখ ব্যাজার করে সে ঘাড় চুলকোতে লাগল। ব্লেক এক প্যাকেট তাস নিয়ে আনমনাভাবেই ভেঁজে চলল; কিন্তু তার স্বচ্ছ চোখের তারা মরগ্যানের চোখে নিবদ্ধ।
‘আচ্ছা, ড্রাইভার আর রক্ষীটাকে কোনওরকমে কায়দা করা যায় না?’ মরগ্যান প্রশ্ন করল কিটসনকে।
কিটসন জোরালোভাবে হাত নাড়ল, ‘কায়দা?! ওদের সঙ্গে? তুমি কি পাগল হয়েছ, ফ্র্যাঙ্ক? কে তোমাকে বলেছে যে ওদের কায়দা করার ব্যাপারটা এতই সহজ?’
মরগ্যানের চোখজোড়া হঠাৎই ঝলসে উঠল কুৎসিত ক্রোধে, ‘আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করেছি, আলেক্স—জ্ঞান দিতে বলিনি। আমি পাগল হয়েছি কি না সেটা আমি বুঝব। বেশি মুখ না ছুটিয়ে কথার জবাব দাও।’
মরগ্যানকে চটতে দেখে তড়িঘড়ি বলে উঠল ব্লেক, ‘রাগ কোরো না, ফ্র্যাঙ্ক। ছোকরার কোনও দোষ নেই। ও যতটুকু জানে সেইটুকুই বলছে। তাই বলে ওর চিন্তাধারার সঙ্গে যে আমাদের মিল থাকতে হবে, তার কী মানে আছে?’
মরগ্যান সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল, ‘ ঠিক আছে এড, আগে আলেক্সের কথাই তাহলে শেষ হোক।’ তারপর কিটসনের দিকে ফিরে তাকাল মরগ্যান, ‘বল হে ছোকরা, ওই ড্রাইভার আর প্রহরীকে কাবু করতে অসুবিধেটা কোথায়?’
আলেক্স কিটসন ততক্ষণ ঘামতে শুরু করেছে। ঘামের ছোট ছোট ফোঁটাগুলো তার থ্যাবড়া নাকে চকচক করছে।
‘আমি একসময় ওদের সঙ্গে কাজ করেছি।’ কঠিন চোখে মরগ্যানের দিকে চেয়ে বলতে শুরু করল কিটসন, ‘ওদের আমি ভালোমতোই চিনি। ড্রাইভারের নাম ডেভ টমাস, আর বন্দুকবাজ প্রহরীর নাম মাইক ডার্কসন। ওরা দুজনেই রিভলভার চালাতে ওস্তাদ, এবং বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ ওদের চোখের নজর। এ ছাড়া, ওই ট্রাকলুটের যে কোনও পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করতে পারলেই ওরা প্রত্যেকে পাবে দু-হাজার ডলার করে পুরস্কার। ওরা জানে, কারও পক্ষেই ট্রাকের তালা ভেঙে ওই দশ লাখ ডলার হাতানো সম্ভব নয়; সুতরাং ওরা যে টাকার লোভে আমাদের দলে যোগ দেবে, সেরকম চান্সও কম। মানে টমাস ও মাইক ডার্কসন আমাদের পক্ষে এক শক্ত বাধা। ওদের সঙ্গে মোকাবিলা হলেই তোমরা সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারবে।’
কিটসনকে বাধা দিয়ে জিপো হঠাৎ বলে উঠল, ‘ওরে বাবা, এত ঝামেলা থাকলে ও টাকায় আমার কোনও প্রয়োজন নেই। মানছি দু লাখ ডলার অ-নে-ক টাকা, কিন্ত সে টাকায় ফুর্তি করার জন্যে যদি বেঁচেই না থাকি, তবে দু-ডলার আর দু-লাখ ডলারে তফাতটা রইল কী?’
জিপোর কথায় হেসে ফেলল মরগ্যান।
জিপোর যথেষ্ট গুণ আছে। কিন্ত সাহস আর বুদ্ধির ব্যাপারে সে আর সকলের চেয়েই পিছিয়ে। তাছাড়া যখন সে বোঝে, জয়ের কোনও সম্ভাবনাই নেই, তখন পরাজয়কে মেনে নিতে সে দ্বিধা বোধ করে না। কিন্তু তালা খোলার ব্যাপারে জিপো পয়লা নম্বরের ওস্তাদ। তার পেশাদার অভিজ্ঞ আঙুলের কাছে পরাজিত না হয়েছে এমন তালা পৃথিবীতে নেই। তবে এ পর্যন্ত যত তালা জিপো খুলছে, সবই নিজের খুশিমতো, ধীরে সুস্থে, ঠান্ডা মাথায়। কখনও তাড়াতাড়ি খোলার জন্যে চাপ দেওয়া হয়নি; সে যেমন ভালো বুঝেছে সেভাবেই খুলেছে। কিন্ত মরগ্যান জানে, এবারের কাজটায় জিপোকে প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করতে হবে। তাই মরগ্যান চিন্তিত। জিপো কি পারবে সফল হতে? অবশ্য ওকে বলে কয়ে রাজি করাবার ব্যাপারে মরগ্যান একটুও ভাবছে না। কারণ জিপো কখনওই তার কথা ফেলাতে পারবে না। কিন্ত তাতে লাভ হবে কতটুকু? যখন সময় আসবে জিপোর আসল অগ্নিপরীক্ষার, তখন কিছুই যাবে আসবে না। তখন যদি জিপো মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে তাহলে তাদের সমস্ত স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে—মিলিয়ে যাবে করুণ হতাশায়।
চিন্তিত হওয়ার কোনও কারণ নেই, জিপো৷’ মরগ্যান জিপোর কাঁধে হাত রেখে আশ্বাস দিল, ‘যেদিন থেকে আমরা চারজন এক হয়েছি, তোমাদের সমস্ত দায়িত্ব আমিই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছি, তোমাদের জুতসই কাজের সন্ধান দিয়েছি, তোমাদের পরিচালনা করেছি—তাই তো?’
জিপো ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল৷ কিটসন ও ব্লেক অপলকে মরগ্যানের দিকে তাকিয়ে৷
‘কাজগুলো খুব বড় ছিল না বটে, কিন্তু মোটামুটি তোমরা প্রত্যেকেই বেশ কিছু করে টাকা পেয়েছ৷ কিন্তু আজ হোক, কাল হোক, পুলিশের নজর আমাদের ওপর পড়বেই৷ অনির্দিষ্ট সময়ের জন্যে আমরা এইসব ছোটখাটো লুটপাট চালিয়ে যেতে পারি না৷ তাতে টাকাও আসবে কম, এবং পুলিশের হাতে ধরা পড়ার চান্সও বেশি৷ সুতরাং আমার মনে হয়, একচোটে বেশ কিছু টাকা হাতিয়ে যে যার রাস্তায় কেটে পড়াই ভালো৷ তাতে ভবিষ্যতে আর বিপদের মুখোমুখি হতে হবে না৷ দুলক্ষ ডলার নেহাত কম-টাকা নয়৷ বলতে গেলে, আমরা হব দুনিয়ার সম্রাট৷ আমি আবারও বলছি, এই কাজটা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়৷ এর পেছনে আমাদের প্রচুর মাথা খাটাতে হবে৷ আলেক্স মোটামুটি তোমাদের সবই বলেছে৷ ওর কথা মিথ্যে তা আমি বলছি না, কিন্তু একটা ব্যাপার ও একেবারে বাদ দিয়ে গেছে৷’ মরগ্যান একবার দেখল তিনজনকে৷ জিপো অস্বস্তিভরে উসখুস করছে৷ কিটসনের মুখে এখনও সেই একরোখা ছাপ৷ হয়তো কিছুটা আশঙ্কাও৷ ব্লেক নির্বিকার৷ কারণ একমাত্র গ্রহণযোগ্য যুক্তি পেলেই সে মরগ্যানের কথা মানতে রাজি৷’
‘যা বলেছিলাম আলেক্স এ কথা একবারও বলেনি যে ট্রাকটা গত পাঁচ মাস ধরে প্রতি সপ্তাহেই টাকা আনা-নেওয়া করছে৷ এবং প্রত্যেকেই ট্রাকটাকে দুর্ভেদ্য বলে মেনে নিয়েছে৷ যেমন, আমাদের আলেক্স কিটসন৷ ওর মতো আরও অনেকেরই ধারণা, ওই ট্রাকটাকে লুট করার চিন্তা পাগল হওয়ার পূর্বলক্ষণ৷ এ ধরনের কোনও বদ্ধমূল ধারণাকে নাছোড়বান্দার মতো আঁকড়ে বসে থাকা মানেই প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে নিজেকে অরক্ষিত করা৷ তারপর প্রয়োজন শুধু একটা ক্ষিপ্র রাইট হুক—ব্যস্! চতুর সুযোগসন্ধানী প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে নির্বোধ মুষ্টিযোদ্ধার শোচনীয় পরাজয়৷’
মরগ্যান ইচ্ছে করেই কিটসনকে ঠেস দিয়ে উদাহরণ দিল এই মুষ্টিযুদ্ধের৷ কারণ জিপোর মতো কিটসনকেও তার নিজের দলে টানা দরকার৷ সে লক্ষ করল, কিটসনের মুখে চোখে ঝিলিক মারছে কৌতূহল৷ একরোখা ভাবটা আগের চেয়ে অনেকটা কমে এসেছে৷ মরগ্যান বুঝল, কিটসনকে রাজি করাতে হলে এই সুবর্ণসুযোগ৷ সুতরাং এক মুহূর্ত ও সময় নষ্ট না করে সে বলে চলল, ‘আলেক্স তোমাদের যা যা বলেছে সবই আমি খবরের কাগজে মাসকয়েক আগে পড়েছি৷ ওয়েলিং কোম্পানি এই বিশেষ ট্রাকটা নিয়ে প্রচারের লোভটুকু পর্যন্ত সামলাতে পারেনি৷ অবশ্য নিজেদের ক্ষমতা জাহির করার এমন সুযোগ কেউই ছাড়ে না৷ তাছাড়া ওরা ভাবছে, ওদের এই দুর্ভেদ্য ট্রাকের কথা খবরের কাগজে পড়ে অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানই তাদের টাকা পয়সা আনা নেওয়ার ব্যাপারে ওদের সাহায্য নেবে৷ যাকগে, যা বলছিলাম যেদিন থেকে ওই ট্রাকটার কথা আমি কাগজে পড়েছি, সেদিন থেকেই ওটাকে লুট করার চিন্তা আমার মাথায় ঘুরছে৷ আমাদের পক্ষে কাজটা মোটেও অসম্ভব নয়৷ তোমারা যদি সামান্য সাহস এবং দক্ষতা দেখাতে পার, তবে পৃথিবীর নবম আশ্চর্য ওই ট্রাকটাকে কিভাবে বোকা বানাতে হয় তা এই শর্মা তোমাদের দেখিয়ে দেবে৷ ভুলে যেও না, তোমাদের সাফল্যের দাম দু-লক্ষ ডলার৷
ব্লেক সিগারেটের টুকরোটাকে টেবিলে ঘষে নিভিয়ে ফেলল৷ এবং পরক্ষণেই অভ্যস্ত হাতে ধরিয়ে ফেলল আর একটি৷ তার চোখজোড়া মরগ্যানের মুখে স্থির৷ যেন মরগ্যানের অভিসন্ধি বুঝতে চাইছে৷
‘অর্থাৎ এই বক্তব্যের সপক্ষে তোমার কোনও জোরালো প্ল্যান আছে?’
‘হ্যাঁ, আছে৷’ মরগ্যান সিগারেট ধরিয়ে শ্রান্তভাবে ধোঁয়া ছাড়ল৷ আবছা সবুজাভ ধোঁয়া ভেসে চলল বিপরীত দিকে বসে থাকা জিপোর মুখের দিকে, ‘মোটামুটি একটা পরিকল্পনা আমি ছকে রেখেছি৷ কিন্তু সেটাকে বার-বার যাচাই করে নিখুঁত করতে হবে৷ তাছাড়া আমার পরিকল্পনাটা নিয়ে ভাববার সময় পাব যথেষ্ট৷ কারণ এখন থেকে প্রতি সপ্তাহেই ট্রাকটা রকেট রিসার্চ স্টেশনের মাইনের টাকা নিয়ে যাবে৷ আর এইভাবে যত দিন যাবে, ওরা ততই নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে অসাবধানী হয়ে পড়বে৷ তারপর ঝোপ বুঝে কোপ মারলেই কাজ হাসিল!’
আর সহ্য করতে পারল না কিটসন৷ সামান্য ঝুঁকে পড়ে কর্কশস্বরে বলে উঠল, ‘থামো ফ্র্যাঙ্ক! গাঁজায় দম দিয়ে আর উল্টো পালটা বোকো না! একটা বোতাম টিপতে কতটা সময় লাগবে জান? কোনও লোক যদি ঘুমিয়েও থাকে, তাহলে জেগে উঠে বোতাম টিপতে তার ন-সেকেন্ডের বেশি সময় লাগতে পারে না৷ অর্থাৎ তিনটে বোতাম টিপতে মাত্র ছ-সেকেন্ড—ব্যস! তারপর ট্রাকটা হয়ে দাঁড়াবে একটা ইস্পাতের চৌকা বাক্স, আমাদের কফিনের শেষ পেরেক! তোমরা কি ধারণা মাত্র ছ-সেকেণ্ডের মধ্যেই ট্রাক থামিয়ে, দরজা খুলে টমাস আর ডার্কসনকে তুমি কাবু করতে পারবে? হুঁ ঃ উর্বর মস্তিষ্ক ছাড়া এ ধরনের দিবাস্বপ্ন দেখা অসম্ভব৷’
‘তোমার তাই মনে হয় বুঝি?’ ঠাট্টার সুরে প্রশ্ন করল মরগ্যান৷
‘মনে হয়’ নয়, আমি নিশ্চিতভাবে জানি বলেই বলছি৷ ট্রাক থামিয়ে তার দিকে এক পা-এগোনোর আগেই পুরো ট্রাকটা ঢাকা পড়ে যাবে ইস্পাতের চাদরে, সময় নির্ভর তালা হয়ে যাবে ওলট-পালট, ট্রান্সমিটারে শুরু হবে সাহায্য-প্রার্থী অবিরাম বিপদ সংকেত৷’
‘সত্যি বলছ আলেক্স?’ কপট বিস্ময় ভুরু উঁচিয়ে জানতে চাইল মরগ্যান৷ কিটসনের ইচ্ছে হল সপাটে একখানা ঘুঁষি বসিয়ে দেয় মরগ্যানের নাকে৷
‘হ্যাঁ—সত্যি৷’ অতিকষ্টে রাগ চেপে চিৎকার করে উঠল কিটসন, ‘তুমি যতই বল না কেন, এই অসম্ভব ব্যাপারকে বিশ্বাস করতে আমি কোনওরকমেই রাজি নই৷
‘অনেক হয়েছে, আলেক্স৷ জ্ঞানদানের কাজটা তুমি ভালোই পার দেখছি৷ তা, এখানে না এসে পাদ্রিগিরি করলেই পারতে৷’ ব্লেকের ব্যঙ্গের ছুরি যেন কেটে বসল কিটসনের গায়ে, ‘আর ফ্র্যাঙ্কের চেয়ে নিজেকে যখন এত বেশি বুদ্ধিমান বলেই মনে করছ, তাহলে আজ থেকে তুমিই দলের ভার গ্রহণ করে আমাদের বাধিত করো!’
অপমানে কিটসনের মুখ লাল হয়ে উঠল৷ রাগতভাবে কাঁধ ঝাঁকিয়ে সে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল৷ গম্ভীরভাবে একবার ব্লেককে, আর একবার মরগ্যানকে দেখতে লাগল৷ অবশেষে সংক্ষিপ্তভাবে সে বলল, ‘ঠিক আছে৷ কিন্তু আমি আবারও বলছি, কাজটা অসম্ভব৷’
ব্লেক সপ্রশ্ন দৃষ্টি মেলে ধরল মরগ্যানের দিকে, ‘এবারে ঝেড়ে কাশো ফ্র্যাঙ্ক৷’
‘গতকাল আমি এজেন্সি থেকে রিসার্চ স্টেশন পর্যন্ত গিয়েছিলাম৷’ বলতে শুরু করল মরগ্যান, ‘গাড়ির মাইলমিটার অনুসারে দুটো জায়গার দূরত্ব ঠিক তিরানব্বই মাইল৷ তিরানব্বইয়ের মধ্যে সত্তর মাইল বড় রাস্তা, দশ মাইল সাধারণ রাস্তা, দশ মাইল একটা নির্জন কাঁচা সড়ক এবং শেষ তিন মাইল রিসার্চ স্টেশনের নিজস্ব রাস্তা: যে রাস্তা ধরে সোজাসুজি রিসার্চ স্টেশনে পৌঁছনো যায়৷ আমি ট্রাকটাকে থামাবার জন্যে একটা উপযুক্ত জায়গা খুঁজছিলাম৷ সুতরাং প্রথমেই বড় রাস্তা এবং দশ মাইল সাধারণ রাস্তাকে একেবারে বাদ দিতে হয়৷ কারণ ওই দুটো রাস্তায় লোকজন এবং যানবাহন বেশি৷ রকেট রিসার্চ স্টেশনের নিজস্ব রাস্তাটায় দিন রাত, সবসময় সশস্ত্র প্রহরা থাকে৷ সুতরাং হাতে রইল দশ মাইল লম্বা কাঁচা সড়কটুকু৷’ সিগারেটের ছাই ঝাড়ল মরগ্যান৷ তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে একবার দেখল তিনজনকে। তারপর আবার বলতে শুরু করল, ‘সাধারণ রাস্তা থেকে কাঁচা সড়ক ধরে চার মাইলটাক এগিয়ে গেলে পড়বে দশ নম্বর জাতীয় সড়কে যাবার একটা শর্টকাট রাস্তা। এই রাস্তাটাই রিসার্চ স্টেশন হয়ে দশ নম্বর বড় রাস্তায় গিয়ে মিশেছে৷ অনেক গাড়িই, যদিও তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়, সময় কম লাগে বলে এই রাস্তা দিয়েই যাতায়াত করে৷ এই রাস্তাটা কাঁচা সড়কের মতো অতটা খারাপ নয়৷ কিন্তু রিসার্চ স্টেশনের মাইল দুয়েক আগে রাস্তাটার প্রস্থ প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে৷ পাথর ছাড়াও জায়গাটা ছোট বড় নানান ঝোপে ছেয়ে আছে৷ অর্থাৎ লুকোনোর করার অথবা কোনও মোটর দুর্ঘটনার পক্ষে জায়গাটা একটা আদর্শ জায়গা৷’
ব্লেক সমর্থন জানাল মরগ্যানের কথায়, ‘ঠিক বলেছ, ফ্র্যাঙ্ক। একবার ওই রাস্তা দিয়ে যাবার সময় আমি শালা আরেকটু হলেই গিয়েছিলাম আর কী! মোড় ঘোরবার সময় সামান্য অসর্তক হলেই খেল খতম?…এমন অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে এখানে ওখানে বিপদসূচক রোড-সাইন লাগানো হয়েছে।’
‘হ্যাঁ, দেখেছি।’ সম্মতি জানাল মরগ্যান, ‘আচ্ছা, এবার ট্রাকে বসে থাকা টমাস এবং ডার্কসনের অবস্থাটা একবার ভেবে দেখা যাক।’এখনকার যা আবহাওয়া তাতে ওই বদ্ধ ট্রাকে গরম হবে অসহ্য। তাছাড়া প্রতি সপ্তাহে ওই একই রাস্তা ধরে যাতায়াত করার ফলে ওদের রাস্তার সমস্ত খুঁটিনাটি পর্যন্ত মুখস্থ হয়ে গেছে। এককথায় বিরক্তি, ক্লান্তি আর একঘেয়েমি ওদের ট্রাকভ্রমণের নিত্যসঙ্গী। মনে করো ওরা এসে পৌঁছল সেই বিপজ্জনক বাঁকের মুখে। এবার মোড় ঘুরেই ওরা দেখতে পাবে এক অভাবনীয় দৃশ্য। একটা গাড়ি পাথরের গায়ে ধাক্কা লেগে রাস্তার ধারে উলটে পড়ে আছে। বলা বাহুল্য গাড়ির অবস্থা শোচনীয়। আর রাস্তার ঠিক মাঝখানে ভেসে যাওয়া রক্তের সমুদ্রে পড়ে আছে একটি সুন্দরী যুবতী। তার সর্বাঙ্গ রক্তে ভেজা। জামাকাপড়ের অবস্থা তথৈবচ।’ আচমকা ব্লেকের মুখের সামনে ঝুঁকে পড়ে মরগ্যান। চাপা স্বরে হিসহিস করে বলে উঠল, ‘এখন একটা কথা আমি জানতে চাই, এড। টমাস ও ডার্কসন এ অবস্থায় কী করবে? ওরা কি মেয়েটাকে চাপা দিয়ে চলে যাবে, না নেমে দেখবে বেঁচে আছে কি না, বা কতখানি আহত হয়েছে?’
সাদা দাঁতের সারি বের করে শয়তানের হাসি হাসল ব্লেক। তাকাল কিটসনের দিকে, ‘কী হে স্বামী জ্ঞানানন্দ, শুনছ তো? উর্বর মস্তিষ্কের দিবাস্বপ্ন—কী বল?’
‘বলো, ওরা কী করবে?’ মরগ্যানের প্রশ্নে কিটসন নড়েচড়ে বসল। তার রক্তিম মুখে পরাজয়ের ইঙ্গিত।
অগত্যা ব্লেকই উত্তর দিল, ‘ওরা নামতে বাধ্য। সম্ভবত একজন নেমে মেয়েটাকে দেখতে যাবে, আর অন্যজন ট্রাকে বসেই ট্রান্সমিটারে সাহায্য চেয়ে পাঠাবে—অর্থাৎ কিটসনের কথা অনুযায়ী সত্যিই যদি ওরা অতটা সাবধানি চরিত্রের লোক হয়।’
মরগ্যান ফিরল কিটসনের দিকে, ‘তোমার কী মনে হয়? কী করবে টমাস আর ডার্কসন?’
কিটসন বেশ কিছুক্ষণ ইতস্তত করল। অবশেষে অনিচ্ছাভরে কাঁধ ঝাঁকাল, ‘এড ঠিকই বলেছে। টমাস নিজের জায়গাতেই বসে থাকবে, আর ডার্কসন নেমে দেখতে যাবে পড়ে থাকা মেয়েটাকে। রাস্তার মাঝখান থেকে তাকে সরিয়ে ওরা ট্রান্সমিটারে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে পাঠাবে। তারপর ট্রাকে উঠে আবার চলতে শুরু করবে রিসার্চ স্টেশনের দিকে।’
‘আমারও তাই ধারণা।’ বলল মরগ্যান। এ ব্যাপারে জিপোর মতামত নেওয়ার কোনও প্রয়োজন সে অনুভব করল না। কারণ তালা বা সিন্দুক খোলার ব্যাপার ছাড়া অন্য কোনও ব্যাপারে জিপো সাধারণত কোনও মতামত প্রকাশ করে না। আর করলেও মরগ্যানের কাছে সে মতামতের মূল্য সামান্যই। সুতরাং সে বলে চলল, ‘তাহলে অবস্থাটা মোটামুটি কী দাঁড়াচ্ছে? টমাস রইল গাড়ির ভেতরে, ডার্কসন রইল রাস্তায়। এবার আমার আরেকটা প্রশ্নের উত্তর দাও, আলেক্স—‘মরগ্যানের চোখ সরাসরি কিটসনের দিকে, ‘টমাস কি এক্ষেত্রে ড্যাশবোর্ডের বোতাম টিপে সময় নির্ভর তালাকে অকেজো করে দেবে? নাকি ইস্পাতের আড়ালে ট্রাকটাকে ঢেকে ফেলার চেষ্টা করবে?’
কিটসন পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছল৷
‘সম্ভবত নয়৷’ ধীরস্বরে জবাব দিল সে৷
মরগ্যান ঘুরে তাকাল ব্লেকের দিকে, ‘তোমার কী মনে হয়, এড?’
‘কক্ষনও টিপবে না!’ দৃঢ়স্বরে বলে উঠল ব্লেক, ‘কিটসনের কথা অনুযায়ী অকেজো সময়-নির্ভর তালাকে আবার ঠিক করতে একজন দক্ষ কারিগরের প্রয়োজন৷ সুতরাং যতক্ষণ না টমাস বুঝতে পারছে যে ওরা বিপদে পড়েছে, ততক্ষণ সে কিছু করবে না৷ বরং খোলা জানলা দিয়ে ঝুঁকে পড়ে দেখতে চেষ্টা করবে ডার্কসন কী করছে, বা মেয়েটা বেঁচে আছে কি না৷’
মরগ্যান মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানাল, ‘যাক, অবশেষে আমরা কিছুটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি৷ কারণ ট্রাকটাও থামানো গেছে, এবং টমাসও বোতাম টেপেনি৷ তাহলে আমরা দেখছি, আলেক্সের কথামতো সম্পূর্ণ অসম্ভব ব্যাপারটাকে আমরা সম্পূর্ণ সম্ভব করতে সক্ষম হয়েছি৷’ কিটসনের দিকে আঙুল উঁচিয়ে ধরল মরগ্যান, ‘তুমি বলেছিলে, সবটাই আমার উর্বর মস্তিষ্কের উদ্ভট দিবাস্বপ্ন! তাহলে এখন কী মনে হচ্ছে তোমার?’
‘এতে এত হাসাহাসি করার কী আছে বুঝতে পারছি না!’ রাগতস্বরে বলে উঠল কিটসন, ‘মামলায় তুমি জিতেছ, কিন্তু তাতে হয়েছেটা কী?’
মরগ্যান মুখ তুলে হালকা ধোঁয়া ছাড়ল৷ তাকে দেখে মনে হল, কিটসনের হতবুদ্ধি অবস্থাটা সে বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে৷
‘তার মানে আমার বক্তব্য তুমি মেনে নিচ্ছ?’ হাসল মরগ্যান, ‘যাক, তাহলে ট্রাকটাকেও আমি থামিয়েছি, এবং ডার্কসনকেও গাড়ির বাইরে বের করেছি৷ আচ্ছা, এবার তোমরা ভাব সেই বিপজ্জনক বাঁকটার কথা৷ ট্রাকটাকে ঠিক ওই জায়গাতেই আমি থামাতে চাই৷ তার কারণ অবশ্য একটা আছে৷ তা হল, ওই জায়গাটা রাস্তার দু-পাশ ছেয়ে আছে ছোট বড় অসংখ্য বুনো ঝোপে৷ তার আড়ালে দু-তিনজন লোক অনায়াসেই লুকিয়ে থাকতে পারে৷ এবার ডার্কসন নিশ্চয়ই নেমে এগিয়ে যাবে পড়ে-থাকা মেয়েটার দিকে৷ এখন কথা হচ্ছে, টমাস কি জানলা বন্ধ করে দেবে? কী মনে হয় তোমার?’ প্রশ্নটা কিটসনকে লক্ষ করেই৷ সুতরাং অনিচ্ছাসত্ত্বেও কিছুক্ষণ ইতস্তত করে মাথা নাড়ল কিটসন, ‘এই গরমে জানলা বন্ধ করে তিরানব্বই মাইল ওরা পাড়ি দেবে বলে মনে হয় না৷’
শুধু ‘মনে হয় না’ নয়, জানলা খোলা রাখতে ওরা বাধ্য৷ কারণ বাইরের চেয়ে ইস্পাতের তৈরি ট্রাকের ভেতরে গরম হবে আরও বেশি৷ অতএব ট্রাকটা থামছে রাস্তার ধারের ঝোপগুলোর কাছে, যার আড়ালে দুজনে লোক সহজেই লুকিয়ে থাকতে পারে, ড্রাইভার উইন্ডশিল্ড দিয়ে তার সঙ্গীর কার্যকলাপ লক্ষ করছে এবং ডার্কসন এগিয়ে চলেছে পড়ে থাকা মেয়েটার দিকে৷ ওরা দুজনের কেউই বিপদের আশঙ্কা করছে না; কারণ এই বিপজ্জনক বাঁকের কথা ওরা ভালোভাবেই জানে৷ জানে, যে গত ছ-মাসে এখানে পাঁচ-পাঁচটি দুর্ঘটনা ঘটেছে৷ অতএব এই দুর্ঘটনাটাও ওদের কাছে নিতান্ত স্বাভাবিক ব্যাপার৷ ট্রাক থেকে ফুটদশেক দূরে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকব আমি৷ ডার্কসন যেই পড়ে থাকা মেয়েটার ওপর ঝুঁকে পড়বে, আমি ঝোপের আড়াল ছেড়ে ট্রাকের জানলার কাছে গিয়ে ড্রাইভারের রগে একটা রিভলভার চেপে ধরব৷ এবং ওই একই সময়ে পড়ে থাকা মেয়েটা লাফিয়ে উঠে ডার্কসনের পেটে রিভালভার ঠেসে ধরবে৷’ হাত বাড়িয়ে সিগারেটের ছোট টুকরোটা ছাইদানে গুঁজে দিল মরগ্যান, ‘এবার বলো, ডার্কসন এবং টমাস কী করবে? আত্মসমর্পণ করবে, না গুলি-ভরা রিভলভারের সামনেও ওরা বীরত্ব দেখাতে যাবে?’
‘যেতেও পারে, ওদের বিশ্বাস নেই৷’ শান্তস্বরে জবাব দিল কিটসন, ‘টমাস এবং ডার্কসন বড় সাংঘাতিক লোক?’
‘হতে পারে সাংঘাতিক, কিন্তু পাগল তো আর নয়৷ খোলা রিভলভারের সামনে অহেতুক বীরত্ব দেখানোর নির্বুদ্ধিতার পরিচয়৷ এবং সেটা ওরা ভালোভাবেই জানে৷’
কিছুক্ষণ কেটে গেল অখণ্ড জমাট নিস্তব্ধতায়৷ অবশেষে কাঁপাস্বরে বলে উঠল জিপো, ‘কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক, এত সহজে যদি ওরা হার না মানে?’
মরগ্যান চোখ রাখল জিপোর চোখে৷ শয়তানি জিঘাংসায় পলকের জন্যে চকচক করে উঠল তার কালো চোখের তারা, ‘তাহলে ওদের দুঃখজনক ভবিষ্যতের কথা ভেবে সমবেদনা জানানো ছাড়া আমার আর কোনও উপায় নেই!…যেখানে আমরা প্রত্যেককে দু-লক্ষ ডলার করে টোপে গাঁথছি, সেখানে সামান্য একটু আধটু রক্তপাত কিস্যু নয়!’
আরও কিছুক্ষণ নিটোল নিস্তব্ধতা৷ অবশেষে জিপোই আমার মুখ খুলল, ‘ফ্র্যাঙ্ক এসব আমার ঠিক ভালো লাগছে না৷ আমার মনে হয়, শেষ পর্যন্ত এ কাজটা হয়তো আমরা পেরে উঠব না৷’
মরগ্যান অধৈর্যভাবে হাত নাড়ল, ‘ঘাবড়ে যেও না, জিপো, তোমাকে অকুস্থলে থাকতে হবে না৷ তোমার জন্যে আমি একটা বিশেষ কাজ ঠিক করে রেখেছি, এবং সে কাজ তোমার সামর্থ্যের বাইরে নয়৷ আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি৷’
কিটসন ঝুঁকে এল টেবিলের ওপর ‘আর আমি? ওসব খুনোখুনির ঝামেলায় জড়াতে আমি একেবারেই রাজি নই, সেটা কিন্তু তোমাকে আগে থাকতেই বলে দিচ্ছি!’
মরগ্যান ফিরল ব্লেকের দিকে৷ সে তখন মাথা নিচু করে একটা সিগারেট ধরাতে ব্যস্ত৷
‘তোমরা বক্তব্য কী, এড? দু-দুজন বীরপুরুষের কথা তো শুনলাম, এবার তোমারটা শুনি?’ কেটে কেটে বলল মরগ্যান৷
ব্লেক ঠোঁক বেঁকিয়ে হাসল৷ জ্বলন্ত দেশলাইয়ের কাঠিটাকে ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে ছুড়ে দিল অন্ধকারে৷
‘দুধের খোকাদের কথা ছেড়ে দাও, ফ্র্যাঙ্ক৷ তবে আমার মনে হচ্ছে টমাস আর ডার্কসন কোনও ঝামেলা করবে না৷ আর নেহাতই যদি সাহস দেখাতে যায়, তাহলে একটা ট্র্যাজিক নাটকের শেষ দৃশ্যের জন্যে ওদের প্রস্তুত থাকতে হবে৷’
ব্লেকের কথায় মরগ্যান খুশি হল, বলল, ‘বাস্তবকে অস্বীকার করার মতো নির্বোধ আমি নই, এড৷ টমাস এবং ডার্কসনের নিয়তি স্বয়ং ভগবানের হাতে, আমরা নিমিত্ত মাত্র৷ তাহলে তুমি, আমি এবং মেয়েটি—এই তিনজনেই ট্রাক থামানোর ব্যাপারটা সামলাব৷ জিপো আর কিটসনের জন্যে কোনও হালকা কাজ ঠিক করা যাবে—তবে একটা কথা, সেই সঙ্গে ওদের পাওনা টাকার পরিমাণও কিন্তু কমে যাবে৷ কারণ আমরাই যখন সমস্ত ঝুঁকি নিচ্ছি, তখন স্বাভাবিকভাবে আমাদের পাওনা কিছু বেশি হওয়া উচিত, তাই না?’
কিটসনের ভুরু কুঞ্চিত হল সংশয়ে৷ দু-লক্ষ ডলারের ভাবনা এর মধ্যেই তার মনে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে৷
‘তাহলে আমাদের ভাগে কত করে পড়ছে জানতে পারি?
‘নিশ্চয়ই৷’ সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল মরগ্যান, ‘এক লক্ষ পঁচিশ হাজার ডলার পাবে তুমি৷ আর জিপোর কাজ যেহেতু কলকবজা সংক্রান্ত—’ হাত দিয়ে চাবি ঘোরানোর ইশারা করল মরগ্যান, ‘তাই সে পাবে এক লক্ষ পঁচাত্তর হাজার৷ তোমাদের দুজনের থেকে যে এক লক্ষ ডলার বাঁচবে, সেটা ভাগ হবে আমার আর এডের মধ্যে৷’
কিটসন ও জিপোর মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় হল৷ সবাই নীরব৷ শেষে কিটসনই উত্তেজিতভাবে বলে উঠল, ‘কিন্তু ওরা যদি কোনও ঝামেলা বাধায়, তাহলে আমাদের কেউ মারা যেতে পারে, মারা যেতে পারে টমাস অথবা ডার্কসন৷ নাঃ, কাজটা আমার মোটেই ভালো লাগছে না৷ এতদিন যে সব কাজ আমরা করে এসেছি, সেগুলো ছোট হলেও তাতে কোনও ঝঞ্ঝাটের ভয় ছিল না৷ ধরা পড়লে বড়জোর বছর দুয়েক জেল খাটতাম৷ কিন্তু এবার ধরা পড়লে আমাদের আর নিস্তার নেই, সোজা ইলেকট্রিক চেয়ার! না, এসব খুনোখুনির মধ্যে আমি নেই৷’
‘আলেক্স ঠিকই বলেছে, ফ্রাঙ্ক,’ ভয়ার্তস্বরে বলল জিপো, খুনের দায় বড় দায়! আমি তাতে জড়াতে চাই না৷’
মরগ্যান হিংস্রভাবে হাসল, ‘ঠিক আছে, তাহলে ভোট হোক৷ কোনও কাজ নিয়ে মতের ফারাক দেখা দিলে আমরা বরাবরই ভোটের মাধ্যমে তার মীমাংসা করেছি৷ এক্ষেত্রেও তাই করা যাক৷’
‘তার আর কোনও প্রয়োজন নেই,’ তীক্ষ্ণ বলে উঠল কিটসন, ‘এড যদি তোমার পক্ষেও যায় তবু তুমি জিততে পারবে না, ফ্র্যাঙ্ক৷ কারণ তাহলে ভোটের ফলাফল দাঁড়াবে দুই-দুই৷ এবং তোমারই তৈরি নিয়ম অনুযায়ী কোনও কাজে ভোটের ফলাফল সমান-সমান হলে সে কাজটা আমরা করি না৷ আশা করি নিয়মটা তুমি ভুলে যাওনি?’
মরগ্যানের দাঁতের সারি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল৷ অর্ধস্ফুট শব্দে হেসে উঠল সে, ‘না, ভুলিনি৷ কিন্তু তাতে ভোটাভুটি করায় বাধাটা কোথায়? নিয়মমাফিক সব কাজ করাই আমি পছন্দ করি৷ তারপর নির্বাচনের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হবে আমাদের সিদ্ধান্ত, রাজি?’
কিটসন কাঁধ ঝাঁকাল, ‘আমার কোনও আপত্তি নেই৷ শুধু শুধু সময় নষ্ট হবে বলেই বলছিলাম…’
মরগ্যান চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল৷ তার সুগঠিত পেশিবহুল দেহের বিশাল ছায়া টেবিলে আচমকা আছড়ে পড়ল৷
‘ভোটের কাগজগুলো তৈরি করো, জিপো৷’
জিপোর বৃত্তাকার মুখে পরিষ্কার হতবুদ্ধি ভাব৷ একটা নোটবই বের করে তার একটা পাতা ছিঁড়ল সে৷ তারপর সেটাকে ছুরি দিয়ে সমানভাবে চার-টুকরো করে কাটল৷ টুকরো কাগজগুলো এগিয়ে দিল টেবিলের ওপর, ‘এই নাও—’
মরগ্যান হালকা স্বরে কয়েকটা শব্দ ছুড়ে মারল, ‘মাত্র চারটে কাগজ কেন, জিপো?’
জিপো শূন্য চোখ মেলে তাকাল মরগ্যানের দিকে, তাকিয়েই রইল, ‘কেন, আমাদের তো বরাবর চারটেই কাগজ লাগে?’
মরগ্যান হাসল নরম করে, ‘দশ লক্ষ ডলার হবে পাঁচ ভাগ—মনে আছে? সুতরাং মেয়েটারও ভোট আছে একটা৷’
কথা শেষ করে মরগ্যান এগিয়ে গেল দরজার দিকে৷ এক ঝটকায় দরজা খুলে সে উষ্ণস্বরে কাউকে আহ্বান জানাল, ‘ভেতরে এসো জিনি৷ ওরা ওই কাগজটার ব্যাপারে ভোটাভুটি করতে চায়৷ সুতরাং বুঝতেই পারছ, তোমার ভোটটা আমার একান্ত প্রয়োজন৷
অন্ধকারের ছায়া ছায়া আবর্ত থেকে যেন হাওয়ায় ভর দিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল জিনি৷ চোখ ঝলসানো সবুজ আলোর বৃত্তে মরগ্যানের পাশে দাঁড়িয়ে ও দেখতে লাগল হতবাক তিনজনকে৷ তারা অপলকে জিনিরই দিকে তাকিয়ে৷
জিনির বয়স খুব বেশি নয়; বাইশ তেইশের মধ্যে৷ সাধারণের তুলনায় লম্বা একটু বেশিই হবে৷ মাথার একরাশ তামাটে চুল যত্ন-সহকারে ফিতে দিয়ে বাঁধা৷ ওর আয়ত ধূসর-সবুজ চোখ সমুদ্রের মতোই গভীর অথচ অভিব্যক্তিহীন,স্ফুরিত ওষ্ঠাধরে এক অদ্ভুত নেশা৷ উদ্ধত চিবুকে দৃঢ়তার ভাষা সোচ্চার৷ সব মিলিয়ে এক জীবন্ত চাবুক৷
জিনির পরনে একটা রঙচঙা রেশমি শার্ট, আর কালো স্কার্ট৷ স্ফীত বক্ষসৌন্দর্যের তুলনায় কটিদেশ অত্যন্ত ক্ষীণ৷ সুঠাম নিতম্বের ঢাল গিয়ে মিশেছে আকষর্ণীয়; সুগঠিত দুপায়ের প্রান্তে৷ রুই মাছের টোপ গেলার মতো বিস্ফারিত চোখে ব্লেক, জিপো এবং কিটসন তখনও জিনির দিকে তাকিয়ে৷ যেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে কোনও ইতালীয় অভিনেত্রীর দেহসৌষ্ঠব৷
মরগ্যানের শীতল কালো চোখজোড়া খেলে বেড়াল হতভম্ব তিনজনের মুখে, হেসে উঠল সে৷ মরগ্যান জানত, জিনির আকস্মিক উপস্থিতি ওদের স্বাভাবিক চিন্তাধারাকে পঙ্গু করে দেবে৷ সেই আকস্মিক মানসিক সংঘর্ষের পরিণতি দেখার জন্যে মরগ্যান যথেষ্ট কৌতূহলী ছিল, এখন দেখল৷
জিপোর ডান হাত যান্ত্রিকভাবে এগিয়ে গেল তার লাল টাইয়ের দিকে৷ টাইয়ের নটটাকে নেড়েচেড়ে ঠিক করল৷ আর একই সঙ্গে পুরু ঠোঁটের আবরণ সরিয়ে তার ঝকঝকে সাদা দাঁতের সারি আত্মপ্রকাশ করল। বাঁকা চোখে জিনির দিকে চেয়ে হেসে উঠল জিপো।
ব্লেক এরকম অবস্থার জন্যে মোটেই প্রস্তুত ছিল না। সে ভুরু উঁচিয়ে ঠোঁট কুঁচকে শিস দেওয়ার ভঙ্গি করল। তার বিবর্ণ চোখের তারায় শূন্য দৃষ্টি।
কিটসনের অবস্থা পুরোপুরি আচ্ছন্ন। যেন একটা বিশমনি হাতুড়ি কেউ সপাটে বসিয়ে দিয়েছে তার ব্রহ্মতালুতে। সে যেন নীরবে গুনে চলেছে আসন্ন মৃত্যুর প্রহর।
মরগ্যানের স্বরে ওদের চমক ভাঙল, ‘এই হল জিনি গর্ডন।’
এক মুহূর্তের দ্বিধা। পরক্ষণেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ব্লেক, দেখাদেখি জিপোও। কিন্তু কিটসন বসে রইল। তার বলিষ্ঠ হাতের আঙুল উৎকণ্ঠায় মুষ্টিবদ্ধ। চোখের তারা স্বচ্ছ কাচের মতো, মুখের ভাব তখনও হতচকিত, অনিশ্চিত।
‘ডান দিক থেকে শুরু করছি।’ বলে চলল মরগ্যান, ‘এ হল এডওয়ার্ড ব্লেক। আমার অনুপস্থিতিতে দলের ভার থাকে ওরই হাতে।…জিপো ম্যানডিনি, আমাদের কলকবজা বিশারদ প্রতিভাধর—‘মরগ্যান হাসল, ‘আর সবশেষে আলেক্স কিটসন—গাড়ি চালাতে ওর জুড়ি নেই।’
বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে হঠাৎ যেন সম্বিত ফিরে পেল কিটসন। এক ঝটকায় সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার ধাক্কায় আরেকটু হলেই উল্টো পড়ছিল টেবিলটা। কিন্তু কিটসন সেদিকে কোনও ভ্রুক্ষেপই করল না। সম্মোহিতের দৃষ্টি নিয়ে সে তখনও জিনিরই দিকে তাকিয়ে, হাতের তালু মুষ্টিবদ্ধ।
জিনির চঞ্চল চোখ পলকের জন্যে থামল তিনজনের চোখে। তারপর একটা চেয়ার টেনে সে বসল মরগ্যানের পাশে।
‘প্ল্যানটা আমি মোটামুটি ওদের খুলে বলেছি।’ জিনির পাশে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করল মরগ্যান, ‘ওদের দুজনের ধারণা কাজটা নাকি আমাদের পক্ষে অসম্ভব। আমাদের নিয়ম হল,কোনও কাজ নিয়ে নিজেদের মধ্যে মতের ফারাক হলে আমরা ভোটের সাহায্যে ব্যাপারটা মেটাই। সুতরাং এক্ষেত্রেও ভোট নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।’
জিনিস মুখমণ্ডলে ফুটে উঠল সংশয়ের রেখা, সেই সঙ্গে একটু অবিশ্বাসের হাসি, ‘ তার মানে? তুমি বলতে চাও, দুলাখ ডলার নিতে রাজি নয় এমন গর্দভও পৃথিবীতে আছে?’ জিনির স্বর শীতল, অচঞ্চল।
‘না, ঠিক তা নয়,’ হাসল মরগ্যান, ‘ওদের ধারণা, এ কাজটায় রক্তপাতের আশঙ্কা রয়েছে। তাই…’
জিনি গর্ডন অবাক চোখে তাকাল জিপোর দিকে, তারপর ওর ধূসর-সবুজ চোখের তারা স্থির হল ব্লেকের চোখে; সবশেষে গিয়ে থামল কিটসনের মুখমণ্ডলে। যেন মনে মনে প্রত্যেককে জরিপ করে দেখল, ‘ও—তোমার দলের যে এই অবস্থা তা কে জানত?’ কথাটা মরগ্যানকে লক্ষ করেই। কিন্তু তার খোঁচা গিয়ে লাগল কিটসনের পৌঁরুষে। সে অস্বস্তিভরে মুখ ফিরিয়ে নিল; অপমানে তার কান দিয়ে যেন ছুটল আগুনের হলকা।
সেটা তো আমিও ভাবছি।’ মরগ্যানের হাসি আরও বিস্তৃত হল, ‘আমাদের হাতে এই প্রথম একটা বড় কাজের সুযোগ এসেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য এমন, জিপো আর কিটসনের কাজটা মোটেই পছন্দ হচ্ছে না।’
এবার উত্তেজিতভাবে চেঁচিয়ে উঠল জিনি, ‘হ্যাঁ শুধু সুযোগ নয়—সুবর্ণ সুযোগ। দশ লক্ষ ডলার ছেলেখেলার কথা নয়! তুমি বলছিলে, এ কাজে তোমার দল আমাকে সবরকমের সাহায্য করবে। এবং তাও বিনাস্বার্থে নয়; কিন্তু এখন যা দেখছি, তাতে বুঝতে পারছি এখানে আসাই আমার ভুল হয়েছে। এখন তুমি আবার ভোট দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছ কাজটা করবে কি না? হুঁ যত সব ন্যাকামো!’
ওরা তিনজনে চমকে উঠল। মেয়েটার মুখে এমন রুক্ষ, অপমানজনক কথা শুনে মনে মনে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়ল।
মেয়েদের সঙ্গে পশুসুলভ আচরণের ব্যাপারে ব্লেকের যথেষ্ট কুখ্যাতি আছে। সে আর থাকতে না পেরে বলে উঠল,—‘বক্তৃতার পরিমাণটা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না, সুন্দরী! এবার দয়া করে একটু চুপ করো দেখি!’
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল জিনি ওর সুন্দর মুখে বরফের কাঠিন্য।
‘মনে হয় এখানে এসে আমি ভুল করেছি।’ মরগ্যানকে লক্ষ করে বলল, ‘আচ্ছা—তাহলে ব্যাপারটা এখানেই শেষ হোক। এই প্ল্যানটা নিয়ে আমি সাহায্য চাইব এমন লোকের কাছে, যাদের শরীরের প্রতিটি শিরায় বইছে রক্ত। তোমাদের মতো অপদার্থ কাপুরুষদের সঙ্গে কথা বলে আমি খামোখা সময় নষ্ট করতে চাই না।’
কথা শেষ করে দ্রুতপায়ে দরজার দিকে এগোল জিনি।
হাত বাড়িয়ে ওর হাত চেপে ধরল মরগ্যান—ওকে থামাল৷
‘উত্তেজিত হয়ো না, জিনি৷’ হাসল সে, ‘এতে ওদের কোনও দোষ নেই৷ এ ধরনের কাজ একেবারে প্রথম বলে একটু অস্বস্তি বোধ করছে৷ কিছু সময় দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে৷ এই জিপো ম্যানডিনি তালা খোলায় এ শহরের সবচেয়ে সেরা কারিগর৷’ জিপোর পিঠে হাত রাখল মরগ্যান, ‘এড বুদ্ধি-বিবেচনায় আমার চেয়ে কিছু কম যায় না৷ আর আলেক্সের মতো গাড়ি চালাতে জানে এমন লোকের সংখ্যা পৃথিবীতে খুব বেশি নেই৷ তবে রক্তারক্তি ব্যাপারটা ওরা ঠিক পছন্দ করে না৷’
‘তাই নাকি?’ অপলকে তিনজনের মুখে চোখ বুলিয়ে নিল জিনি, ‘তাহলে দশ লাখ ডলারের বেলায় ওদের পছন্দ-অপছন্দ যাচ্ছে কোথায়? বুক পকেটে? … হুঁ, এইসব হরিদাস পালের গোয়াল নিয়ে তুমি দল তৈরি করেছ? তোমার লজ্জা হওয়া উচিত, ফ্র্যাঙ্ক!’ জিনির কর্কশ স্বর প্রত্যেকের কানে ঢেলে দিল গরম সীসে, ‘এ দু-দশ ডলারের ব্যাপার নয়, পুরো দশ লক্ষ ডলার৷ সেক্ষেত্রে কার কী হল না হল, অত দেখতে গেলে চলে না, সেটা ওদের ভালো করে বুঝিয়ে দাও৷’
মরগ্যানের হাত ছাড়িয়ে আলোর আওতায় এসে দাঁড়াল জিনি৷ সরাসরি চোখ রাখল কিটসনের চোখে, ‘দু-লক্ষ ডলারের চেয়ে আহত হবার ভয়টাই কি তোমার কাছে বেশি হল? উত্তর দাও আমার প্রশ্নের?’
জিনির আগুনঝরা অন্তর্ভেদী দৃষ্টির সামনে কুঁকড়ে গেল কিটসন৷ মৃদুস্বরে জবাব দিল, কাজটা আমাদের পক্ষে অসম্ভব৷ ওয়েলিং কোম্পানিতে আমি কিছুদিন চাকরি করেছিলাম৷ সুতরাং টমাস এবং ডার্কসনকে আমি ভালোমতোই চিনি৷ এত সহজে ওরা হার মানবে না৷…যেখানে খুনোখুনির সম্ভাবনা আছে, সেখানে আমি নেই৷’
‘ঠিক আছে, তাহলে তোমাকেও আমাদের কোনও প্রয়োজন নেই৷’ নিরুত্তাপ কণ্ঠে বলল জিনি, ‘অতএব তোমার এই হারকিউলিস মার্কা চেহারা নিয়ে নিঃসঙ্কোচে কেটে পড়তে পার৷ আমরা কেউ বাধা দেব না৷’
কিটসনের মুখে নেমে এল অপমানের কালো ছায়া৷ উত্তেজিতভাবে সে বলে উঠল, ‘মুখ সামলে কথা বলো৷ আমি বলছি এ কাজটা অসম্ভব৷ তোমরা মিথ্যে স্বপ্ন দেখছ৷
হাওয়ায় তর্জনী নাচিয়ে দরজার দিকে ইশারা করল জিনি, ‘দেখছিই তো! নইলে তুমি এখনও এখানে বসে রয়েছ কেমন করে? যাও, বাড়ি গিয়ে মায়ের কোলে বসে ‘ডুডু’ খাও৷ তোমাকে আমাদের কোনও প্রয়োজন নেই৷’
চেয়ার ঠেলে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল কিটসন৷ তার শ্বাস-প্রশ্বাসের গভীর শব্দ স্পষ্ট কানে এল৷ দাঁতে দাঁত চেপে সে আস্তে আস্তে এগিয়ে এল জিনির কাছে৷ ও তখনও একইভাবে সোজা হয়ে দৃপ্তভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে৷ চোখের দৃষ্টি কিটসনের চোখে নিবদ্ধ৷
অবশিষ্ট তিনজন রুদ্ধশ্বাসে ওদের দেখতে লাগল৷ ব্লেকের চোখে চিন্তার ছায়া৷ কারণ সে জানে, উত্তেজিত হলে কিটসনের আর মাথার ঠিক থাকে না৷ জিপো ভুরু কুঁচকে অস্বস্তিভরা দৃষ্টিতে ওদের লক্ষ করছিল৷ কিন্তু মরগ্যানের মুখের হাসি তখনও মিলিয়ে যায়নি৷
কোনও শালা আজ পর্যন্ত এভাবে আমার সঙ্গে কথা বলতে সাহস পায়নি৷’ জিনির মুখোমুখি এসে থামল কিটসন৷ দু-হাতের আঙুল অস্থির উত্তেজনায় হাওয়া আঁকড়ে ধরছে৷
কিটসনের বিশাল চেহারার কাছে জিনি যেন এক ছোট্ট পুতুল৷ কিন্তু ওর দৃপ্ত চাবুকের মতো ভঙ্গি মনে করিয়ে দেয় কেউটের শীতল চাউনিকে৷ আর আলেক্স কিটসনের অপমানিত পৌঁরুষ বুঝি আহত বাঘের মতোই ক্ষিপ্ত ভয়ঙ্কর৷ সে এক অদ্ভুত দৃশ্য!
ঘৃণাভরা চোখে কিটসনকে দেখল জিনি৷ শান্তস্বরে বলে উঠল, ‘তুমি যদি আমার কথা বুঝতে না পেরে থাক, তাহলে আবার বলছি৷ যাও, বাড়ি গিয়ে মায়ের কোলে বসে ‘ডুডু’ খাও৷ তোমাকে আমাদের কো-ন-ও প্রয়োজন নেই৷’
এক চাপা গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে কিটসনের ডান হাত ক্ষিপ্রবেগে এগিয়ে এল জিনির দিকে—কিন্তু মাঝপথেই সে নিজেকে সামলে নিল, নামিয়ে নিল, তার উদ্যত হাত৷
‘কী হল, থামলে কেন, মারো৷’ তীক্ষ্ণস্বরে বলে উঠল জিনি, ‘তোমার মতো অত প্রাণের ভয় আমার নেই!’
মরগ্যান হঠাৎ হেসে উঠল হো হো করে৷
কিটসন মাথা নিচু করেই আপন মনেই কী যেন বিড় বিড় করল৷ তারপর শ্লথপায়ে এগিয়ে চলল ঘরের দরজার দিকে৷
‘কিটসন!’ মরগ্যানের কর্কশ স্বরে সকলে চমকে উঠল, ‘এখানে এসে বসো৷ ভোট তোমাকে দিতেই হবে৷ তুমি যদি এই মুহূর্তে দল ছেড়ে চলে যাও, তবে এর পরিণতির জন্যে আমি কিন্তু দায়ী থাকব না!’
কিটসন ইতস্তত করল কিছুক্ষণ তারপর ধীরে ধীরে ফিরে এল টেবিলের কাছে৷ বসল চেয়ারে৷ মুখভাব গম্ভীর দ্বিধাগ্রস্ত৷
মরগ্যান ঘুরল জিপোর দিকে, ‘আর একটা ভোটের কাগজ জিপো—’
নোট বইয়ের পাতা কেটে আর এক টুকরো কাগজ মরগ্যানের দিকে এগিয়ে দিল জিপো৷
ব্লেক বেশ কিছুক্ষণ ধরে উসখুস করছিল, এবারে বলে উঠল, ‘ভোট দেবার আগে কাজটা সম্বন্ধে আরও কয়েকটা কথা আমি জানতে চাই, ফ্র্যাঙ্ক৷ এই মেয়েটা এ সবের মধ্যে জড়িয়ে পড়ল কেমন করে?’ জিনির দিকে বুড়ো আঙুল ঝাঁকিয়ে ইশারা করল ব্লেক৷
‘গত পাঁচ মাস ধরে আমি শুধু এই ট্রাকটাকে সাফ করার মতলব ভেঁজেছি!’ মরগ্যান বলল, কিন্তু অনেক ভেবেও কোনও উপায় খুঁজে পাইনি৷ হঠাৎ মাস তিনেক আগে জিনি এল আমার কাছে৷ এবং ট্রাক লুটের একটা সাজানো-গোছানো প্ল্যান ফেলে দিল আমার কোলে৷ সত্যি বলতে কী এর পুরো কৃতিত্বই জিনির৷ যে কারণে দশ লাখ ডলারকে ভাগ করা হচ্ছে পাঁচ ভাগে৷ ও সমস্ত দৃষ্টিকোণ থেকেই ব্যাপারটাকে ভেবেছে এবং সেই অনুযায়ী তৈরি করেছে ওর নিখুঁত প্ল্যান৷ আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ওর প্ল্যানে কোনও ফাঁক নেই৷’
ব্লেক একবার তাকাল জিনির দিকে৷ বলল, ‘তোমার বাড়ি কোথায়, খুকি… আর এই ট্রাক-লুটের দুর্বুদ্ধিই বা তোমার মাথায় এল কেমন করে?’
মেয়েটি ওর সস্তা ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে এক প্যাকেট সিগারেট বের করে আনল। সেই সঙ্গে একটা দেশলাই। সিগারেট ধরিয়ে অভিব্যক্তিহীন শীতল দৃষ্টিতে ও তাকাল ব্লেকের দিকে, ‘আমার বাড়ির খবর জেনে তোমার কী লাভ হবে তা বুঝতে পারছি না?’ দৃঢ়স্বরে বলল জিনি, ‘আর ট্রাক লুটের পরিকল্পনার কথা জিজ্ঞেস করছ?…টাকার প্রয়োজন হঠাৎ খুব বেড়ে ওঠায় প্ল্যানটা হঠাৎই মাথায় গজিয়ে উঠেছে। এবং আমাদের যখন পরস্পরের নামটা অজানা নয়, তখন নাম ধরে ডাকাটাই আমি পছন্দ করি। ওই ন্যাকা-ন্যাকা স্বরে খুকু বলাটা ছাড়ো দেখি!’
ব্লেক দাঁত বের করে হাসল। মেয়েমানুষের তেজ বরাবরই তাকে আকর্ষণ করেছে।
‘নিশ্চয়ই, তুমি যখন পছন্দ করো না সেটা কি আমার করা সাজে? কিন্তু একটা কথা—আমাদের দলের খবর তোমাকে কে দিল? আর আমরাই যে এই কাজের জন্যে সবচেয় উপযুক্ত লোক, সেটাই বা জানলে কেমন করে?’
আঙুল তুলে জিনি দেখাল জিপোর দিকে, ‘তার কারণ জিপো। আমি খোঁজ-খবর করে জেনেছিলাম, তালা খোলার ব্যাপারে ওর চেয়ে ওস্তাদ কারিগর এ শহরে আর নেই; এবং এ কাজে আমাদের সব থেকে প্রয়োজন সেটাই। আর শুনলাম তোমার কথা। তোমার মতো ঠান্ডা রক্তের দুঃসাহসী লোক নাকি খুব কমই আছে। মরগ্যানের আছে বুদ্ধি, সেই সঙ্গে দল পরিচালনার অদ্ভুত ক্ষমতা। তাছাড়া গাড়ি চালানোর কথা ওঠায় কিটসনের নামটাই সব আগে ওদের মনে এসেছে। সুতরাং তোমাদের এখানে না এসে পারি কী করে?’
জিপোর মুখমণ্ডলে অস্বস্তির মেঘ কেটে গিয়ে ফুটে উঠল হাসির রেখা। প্রশংসা শুনতে সে বরাবরই ভালোবাসে; বিশেষত একজন সুন্দরী তরুণীর মুখ থেকে। নাঃ, জিনি মিথ্যে বলেনি—ভাবল জিপো। তার সঙ্গে অন্য কোনও কারিগরের কোনওরকম তুলনাই হয় না। কারণ জিপো ম্যানডিনি তালার লাইনে একমেবাদ্বিতীয়ম!
কিটসনের মুখ থেকে ক্রোধের ইশারা মিলিয়ে গেল। অপ্রতিভভাবে সে চোখ নামিয়ে নিল টেবিলের দিকে। চেয়ে রইল হুইস্কির গ্লাসের বৃত্তাকার ভিজে ছাপটার দিকে।
‘ওরা, মানে কারা?’ সন্দেহাকুলকণ্ঠে জানতে চাইল ব্লেক।
‘বহু জায়গায় আমি উপযুক্ত লোকের খোঁজ করেছি। তারপর জেনেছি তোমাদের নাম। সেক্ষেত্রে বেছে বেছে কারও নাম করা মুশকিল।’ ডিনি ব্লেকের এই অর্থহীন অবান্তর প্রশ্নে বিরক্তি হল, ‘আমরা শুধু শুধুই সময় নষ্ট করছি । আমি ভেবেছিলাম বুঝি ঠিক লোকের কাছেই এসেছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমার হয়তো ভুল হলেও হতে পারে। আর তা যদি হয়, তাহলে আমাকে অন্য কোথাও দেখতে হবে!’
জিনির দিকে চোখ রেখে একটি সিগারেট ধরাল ব্লেক ‘আমি কিন্তু অন্য কথা ভাবছি। ওই ট্রাকটাকে থামাতে তোমাকেই যদি রাস্তায় শুয়ে অভিনয় করতে হয়, তাহলে মানতে দ্বিধা নেই, সবচেয়ে দুঃসাহসিক কাজটাই তুমি নিজের জন্যে বেছে নিয়েছ৷ এটাও কি তোমারই প্ল্যান নাকি?’
‘নিশ্চয়ই!’
‘আচ্ছা, আবার দেখা যাক তোমাকে কী-কী করতে হবে৷… তুমি রাস্তার ঠিক মাঝখানে শুয়ে থাকবে৷ তোমার কাছে লুকোনো থাকবে একটা রিভলভার৷ ডার্কসন যেই তোমার কাছে এগিয়ে আসবে, অমনি তুমি রিভলভার চেপে ধরবে ওর তলপেটে—তাই তো?’
জিনি মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানাল৷
‘এতে কিন্তু যথেষ্ট বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে৷ এবং ব্যাপারটা যতটা সহজ ভাবছ, ততটা সহজ নাও হতে পারে৷’ ব্লেক বলল, ‘এক্ষেত্রে দুটো জিনিস ঘটতে পারে৷ হয় ডার্কসন সরাসরি হাত তুলে তোমার কাছে আত্মসমর্পণ করবে, নয়তো তোমাকে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে রিভলভারটা কেড়ে নেবার চেষ্টা করবে৷ ডার্কসন সম্বন্ধে আমি যতটুকু শুনেছি অত সহজে হাল ছাড়ার লোক সে নয়৷ ও হয়তো ঝাঁপিয়ে পড়ে তোমার রিভলভারটা কেড়ে নিতে চাইবে’ তখন?
জিনি শান্তভাবে নাক দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল৷
‘দশ লক্ষ ডলার নেহাত অল্প নয়—’ শীতল, নির্বিকার স্বরে জবাব দিল জিনি গর্ডন, ‘অতএব ডার্কসন যদি ভালোয় ভালোয় পোষ না মানে, তবে ওকে গুলি করা ছাড়া আমার আর উপায় থাকবে না৷’
জিপো পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছল৷ জিভটাকে একবার বুলিয়ে নিল শুকনো ঠোঁটের ওপর, অস্বস্তিভরে একবার দেখল মরগ্যানের দিকে, তারপর তাকাল কিটসনের দিকে৷
‘জিনি ঠিকই বলেছে৷’ মরগ্যান ওদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল, ‘দশ লক্ষ ডলারের জন্যে ওসব সামান্য ব্যাপারে নজর দিলে চলে না৷ তাছাড়া বাস্তবকে অস্বীকার করার চেষ্টা করে কোনও লাভ নেই৷’
ব্লেক গভীর দৃষ্টিতে জিনিকে লক্ষ করছিল৷ না, মেয়েটা মিথ্যে কথা বলছে না৷ বাপ রে! এ যে দেখছি কেউটের বাচ্চা। ডার্কসন যদি কিছু গড়বড় করার চেষ্টা করে, তবে ওর কপালে অশেষ দুর্গতি আছে দেখছি৷ অবশ্য মেয়েটার চোখের দিকে তাকালেই সে বুঝতে পারবে মেয়েটা রিভলভার হাতে নিছক মশকরা করছে না৷ আর একান্তই যদি বুঝতে না পারে তবে যিশুই ভরসা৷ অন্তত আমি হলে সে চেষ্টা করতাম না৷ নড়াচড়া তো দূরের কথা, ওর রিভলভারের সামনে নিঃশ্বাস ফেলতেও ভয় পেতাম৷
‘না, তা নয়—আমি শুধু খোলাখুলি ব্যাপারটা জানতে চাইছি৷’ একটা সিগারেট নিয়ে টেবিলে বার কয়েক ঠুকল ব্লেক, ‘এবার তোমার মতলবের বাকিটা শোনা যাক, ফ্র্যাঙ্ক৷’
মরগ্যান মাথা নাড়ল, ‘উঁহু, ভোট দেওয়ার আগে সে বিষয়ে আর একটা কথাও জানার উপায় নেই৷ জিনির সঙ্গে আমার সেইরকম শর্তই হয়েছে৷ তবে ও বলেছে, ট্রাক-লুটের প্ল্যান নিয়ে আমাদের বিন্দুমাত্রও মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই৷ সবটাই ও দাবার ছকের মতো পরিষ্কার করে সাজিয়ে রেখেছে৷ আমি তোমাদের এখন যা বললাম সেটা মোটামুটি প্ল্যানের মূল ব্যাপারটা৷ যদি আমরা জিনিকে সাহায্য করতে রাজি থাকি, তবেই ও বাকি অংশটা আমাদের শোনাবে; তার আগে নয়৷ আর যদি আমরা রাজি না হই, তবে তো মিটেই গেল৷ ও তখন অন্য কোনও দলের কাছে যাবে৷… আমি তো এই প্রস্তাবে আপত্তি করার কিছু দেখছি না৷ তোমরা কী বল?’
‘কিন্তু সত্যিই কি প্রত্যেকটা সমস্যার সমাধান করতে পেরেছে?’ ব্লেক প্রশ্ন করল, ‘আমার তো মনে হয় সেটা সম্ভব নয়৷ এখন পর্যন্ত আমরা শুধু ট্রাকটা থামাতে পেরেছি, আর টমাস আর ডার্কসনকে কব্জা করেছি, তার বেশি কিছু নয়৷ অবশ্য খানিকক্ষণ আগে এটাকেও আমরা অসম্ভব বলে মনে করছিলাম৷ কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক, তোমার কথা যদি সত্যি হয়, মানে ট্রাকটা যদি ট্রান্সমিটারের সাহায্যে এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে থাকে, তাহলে তো ব্যাপারটা ভীষণ ঘোরালো হয়ে দাঁড়াবে৷ যে মুহূর্তে ট্রাকের সঙ্গে ট্রান্সমিটারের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে এজেন্সির লোকেরা পুলিশে খবর দেবে৷ আর ওরা তো জানেই ট্রাকটাকে কোথাও পাওয়া যাবে৷ তাছাড়া শুধু পুলিশ নয়, সেনাবাহিনীর লোকেরা পর্যন্ত আমাদের পেছনে লাগবে৷ মানে শয়ে শয়ে লোক হেলিকপ্টার ও গাড়ি নিয়ে আমাদের খুঁজে বেড়াবে৷ আর এই সামান্য তিরানব্বই মাইল চক্কর দিয়ে আমাদের খুঁজে বের করতে একটা হেলিকপ্টারের মিনিট কয়েকের বেশি লাগবে না৷ তুমি তো ভালোভাবেই জানো, ওই রাস্তায় ট্রাক নিয়ে লুকোবার কোনও জায়গাই নেই, যাও আছে, তাও প্রায় পঁচিশ মাইল দুরে৷ আমি তো বুঝতেই পারছি না, কেমন করে আমরা ট্রাক লুট করে টাকা নিয়ে সরে পড়ব৷ নাঃ, ওদের চোখে ধুলো দেওয়া একেবারেই অসম্ভব৷’
মরগ্যান কাঁধ ঝাঁকল, ‘আমিও সেই কথাই ভাবছিলাম৷’ কিন্তু জিনি বলছে, জিনির দিকে মাথা নেড়ে ইশারা করল মরগ্যান, ‘ও নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার কোনও দরকার নেই৷ সমস্ত কিছু ও ছকে রেখেছে৷’
ব্লেক তাকাল জিনির দিকে, ‘তাই নাকি? এই জটিল সমস্যার উত্তরও তুমি জানো?’
‘হ্যাঁ, নির্বিকার শীতলস্বরে বলল জিনি, ‘এইটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমিই জিতেছি৷ আমি জানি ট্রাকটাকে নিয়ে কিভাবে পুলিশের চোখে ধুলো দিতে হবে৷’
জিনির আশ্বাসভরা দৃঢ়স্বরে কিটসন পর্যন্ত বিচলিত হল৷ সে এতক্ষণ নির্বিকারভাবে চুপচাপ বসে শুনছিল ওদের কথাবার্তা৷ কিন্তু এই মুহূর্তে তার মনে হল নাঃ, কাজটা জিনির পক্ষে অসম্ভব নাও হতে পারে!
ব্লেক সামনে হাত ছড়িয়ে কাঁধ ঝাঁকা, ‘ঠিক আছে৷ ঠিক আছে৷ তোমার কথাই আমি বিশ্বাস করলাম৷ কিন্তু এই অদ্ভুত সমস্যার সমাধান কেমন করে করলে তাই ভাবছি৷…অবশ্য এখনও দুটো জিনিস আমরা ভেবে দেখিনি৷ এক নম্বর হল, আমরা ট্রাক থামিয়ে যখন টমাস আর ডার্কসনকে কায়দা করব, তখন যদি অন্য কোনও গাড়ি ঘটনাস্থলে এসে পড়ে, তাহলে? মানছি, এমনিতে ওই রাস্তা দিয়ে খুব একটা গাড়ি-টাড়ি যায় না, কিন্তু হঠাৎ এসে পড়তে কতক্ষণ৷ ব্যস, তাহলেই চিত্তির৷’
জিনির মুখে নেমে এল বিরক্তির আভাস৷ ভাবলেশহীন মুখে ও চেয়ারে গা এলিয়ে দিল৷’ আঁটোসাঁটো লাল শার্টের নীচে প্রকট হয়ে উঠল ওর উদ্ধত বুক৷
‘সে নিয়ে ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই৷ তুমি তো জানো, দুটো রাস্তা পাশাপাশি গিয়ে দশ নম্বর সড়কে মিশেছে৷ এখন ট্রাকটা যেই ওর রোজকার রাস্তায় ঢুকবে, অমনি আমরা একটা রোড-সাইন বসিয়ে দেব জোড়া রাস্তার মুখে৷ তাতে তীরচিহ্ন দিয়ে অন্যান্য গাড়িদের নির্দেশ করা হবে পাশের রাস্তা ব্যবহার করার জন্যে, তাহলেই অন্য আর কোনও গাড়ি ওই রাস্তা দিয়ে আসবে না৷ অর্থাৎ, ব্যাপারটা খুব একটা কঠিন নয়, তাই না?’
ব্লেক একগাল হাসল৷ খুশি উপচে পড়ল ওর চোখমুখে৷
‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছ, একেবারে জলের মতো সহজ৷ কিন্তু মেহেবুব, এই সমস্যাটার সমাধান করো দেখি ঃ ধরে নিলাম ট্রাকটা দখল করে আমরা বেশ একটা জুতসই জায়গায় গা ঢাকা দিলাম৷ কিন্তু তারপর ট্রাকের তালাটা খুলব কী করে? ফুসমন্তরে? কিটসন বলছে, ওটার তালা খোলার চেয়ে যুদ্ধ জয় করা অনেক সহজ৷ তাছাড়া আমাদের খুব তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে৷ উঁহু, ব্যাপারটা নেহাত সহজ নয়!’
জিনি মাথা ঝাঁকাল৷
‘সেটা ওর মাথাব্যথা ও বুঝবে৷’ জিপোর দিকে ইশারা করে বলে উঠল জিনি, তালার ব্যাপারে ও একজন ওস্তাদ! সুতরাং সে দায়িত্বটা ওরই, আমাদের নয়৷ আমরা শুধু ট্রাকটা ওর কাছে এনে দেব, তারপর যত সময় লাগে লাগুকা ইচ্ছে হলে এক মাস, চাই কী দু-মাসও জিপোকে দেওয়া হবে৷’ জিনির ডাগর সবুজ চোখ ঘুরল জিপোর দিকে, ‘কী হে,পারবে না এক মাসে ওই ট্রাকের তালাটা খুলে ফেলতে?’
জিপোর অবস্থা তখন দেখে কে! প্রশংসায়-প্রশংসায় সে যেন রঙিন শূন্যে ভাসছে৷ জিনির প্রশ্নের উত্তরে সাততাড়াতাড়ি ঘাড় নাড়ল সে, ‘পারব না মানে? এক মাস সময় পেলে আমি নক্স দুর্গের সমস্ত দরজা খুলে ফেলতে পারব৷’
‘তোমাকে একমাস সময়ই দেওয়া হবে৷’ বলল জিনি, ‘এবং তাতেও যদি না হয়, তবে আরও এক মাস৷ সময় আমাদের ভাবনার কারণ হবে না৷’
‘ব্যস, এ নিয়ে আর কথা নয়৷’ মরগ্যান বলল, ‘আগেই তো বলেছি, জিনি সব সমস্যার সমাধান করে রেখেছে, এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ওর প্ল্যানে কাজ হবে৷ এসো, এবার ভোট দেওয়া যাক৷ তবে আবারও বলছি, একটু-আধটু রক্তপাতের জন্যে প্রত্যেককেই তৈরি থাকতে হবে৷ অর্থাৎ দু-পক্ষেরই কেউ-না-কেউ আহত হতে পারে, এমনকি মারাও যেতে পারে৷ যদি টমাস বা ডার্কসনের কেউ মারা যায় তবে, আমরা জড়িয়ে পড়ব খুনের জালে৷ অথবা যদি সামান্য কোনও ভুলের জন্যে আমরা ধরা পড়ি, তবে নির্ঘাত দশ থেকে বিশ বছরের জেল—সে বিষয়ে আমার একটুও সন্দেহ নেই৷ আর অন্যদিকে রয়েছে সোনালি দুনিয়ার হাতছানি ঃ নগদ দু লাখ ডলার৷ মোটামুটি আমাদের অবস্থাটা এই৷… তোমাদের যদি আর কোনও প্রশ্ন না থাকে, তাহলে এবার ভোট নেবার কাজ শুরু করা যাক৷’ মরগ্যান থামল৷ একবার দেখন তিনজনের দিকে৷ ‘তবে একটা কথা মনে রেখো, ভোটের মাধ্যমে যে সিদ্ধান্ত আমরা নেব, সেটাই কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত৷ আমাদের দলের নিয়ম-কানুন তো তোমরা ভালোমতোই জানো, ভোটে যে পরাজিত হবে, তাকে আমাদেরই সঙ্গে কাজ করতে হবে, নয়তো চিরদিনের জন্যে দল ছেড়ে চলে যেতে হবে৷ তোমাদের তাড়াহুড়ো করার কোনও প্রয়োজন নেই৷ বেশ ধীরেসুস্থে ভেবেচিন্তেই তোমরা সিদ্ধিান্ত নাও৷ মনে রেখো জমার খাতায় দু-লাখ ডলার, আর খরচের খাতায় দশ-বিশ বছরের জেল—হয়তো বা ইলেকট্রিক চেয়ার! অতএব ইচ্ছে করলে তোমরা আরও কিছুক্ষণ সময় নিতে পার—পুরো ব্যাপারটা খতিয়ে দেখো ভালো করে৷’
কথা শেষ করে মরগ্যান প্রথমে তাকাল ব্লেকের দিকে, সে তখন জিনির দিকে তাকিয়ে—দুচোখে শ্রদ্ধা ও অভিনন্দনের দীপ্তি৷ জিপোর দিকে ফিরল মরগ্যান৷ জিপো মাথা নিচু করে, ভুরু কুঁচকে, এক গভীর চিন্তায় মগ্ন৷ শূন্য দৃষ্টি টেবিলে নিবদ্ধ৷
আলেক্স কিটসন একদৃষ্টে চেয়ে আছে জিনির দিকে৷ কানে আসছে তার ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ৷
‘এসো তাহলে ভোট দেওয়া যাক৷’ ব্লেক আহ্বান জানাল, এবং একই সঙ্গে হাত বাড়িয়ে এক টুকরো কাগজ তুলে নিল।
জিনিও নিঃশব্দে তুলে নিল এক টুকরো কাগজ। বাকি তিন টুকরো কাগজ হাতে তুলে নিল মরগ্যান। একটা এগিয়ে দিল কিটসনের দিকে, আর একটা জিপোর দিকে, তারপর পকেট থেকে একটা কলম বের করে অবশিষ্ট কাগজের টুকরোয় কী যেন লিখতে লাগল। লেখা হয়ে গেলে কাগজটা ভাঁজ করে রাখল টেবিলের মাঝখানে।
জিনি ফ্র্যাঙ্কের কলমটা চেয়ে নিল। লেখা শেষ করে কাগজটা এগিয়ে দিল মরগ্যানের রাখা কাগজের পাশে।
হাতের কাগজটার দিকে তাকিয়ে মুহূর্ত কয়েক কী যে ভাবল জিপো। অবশেষে একটা ভোঁতা পেনসিল বার করে দ্রুত হাতে লিখতে শুরু করল। লেখা হয়ে গেলে কাগজটা ভাঁজ করে টোকা মেরে এগিয়ে দিল অন্য কাগজগুলোর কাছে।
রইল বাকি শুধু কিটসন। দ্বিধাগ্রস্তভাবে সে তখনও তার হাতের কাগজের দিকে তাকিয়ে। জিনি এবং অন্য তিনজন তাকে একাগ্র দৃষ্টিতে লক্ষ করছে।
‘সময় নিয়ে ঠান্ডা মাথায় ভাব, আলেক্স। তাড়াহুড়ো করে কিছু করে বসো না।’ ঠাট্টার সুরে বলে উঠল মরগ্যান, ‘ভাববার জন্যে এখনও গোটা রাতটাই পড়ে আছে!’
কিটসন চোখ তুলে তাকাল তার দিকে। তারপর চোখ রাখল জিনির মুখে। কয়েক মুহূর্ত ওরা চেয়ে রইল পরস্পরের দিকে; তারপর হঠাৎ মরগ্যানের কলমটা তুলে নিল কিটসন। হিজিবিজি কী সব লিখে কাগজটা ভাঁজ করল, রাখল অন্য কাগজগুলোর ওপর।
কিছুক্ষণ বরফ-শীতল নিস্তব্ধতা। তারপর একসময় মরগ্যানই হাত বাড়িয়ে দিল কাগজগুলোর দিকে। খুলে দেখল একটা। ‘রাজি।’
অনেকটা কাগজ খুলল মরগ্যান।
‘রাজি। চমৎকার! এবার দেখা যাক অন্যগুলো কী বলে।’
ক্ষিপ্রহাতে অন্য কাগজগুলো খুলে ফেলল মরগ্যান। পড়ে দেখল, ‘রাজি, রাজি এবং রাজি।’
মরগ্যান চোখ বুলিয়ে নিল প্রত্যেকের মুখ। তার মুখে ফুটে উঠল নেকড়ের হিংস্র হাসি, ‘তাহলে এই কাজটার ব্যাপারে কারোরই আপত্তি নেই দেখছি। আমিও সেরকমই ভাবছিলাম। দু-লক্ষ ডলারকে পায়ে ঠেলার মতো লোক এই পৃথিবীতে নেই—আমাদের এখানে তো দূরের কথা! কাজটা কঠিন মানছি, কিন্তু টাকাটাও যে নেহাত অল্প নয়-!’
কিটসন চোখ রাখল জিনির চোখে। জিনিও তাকাল তার দিকে, উদ্ধত চিবুকের কঠিন রেখা সামান্য নরম হল। কিটসনের দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসল জিনি। নীরব অথচ কোমল হাসি।
