দুই
বহুদূর থেকে ভেসে আসা কথাবার্তার শব্দ শুনতে পেলাম৷ যেন কেউ ফিসফিস করে কথা বলছে—অনেক—অনে—ক দূর থেকে—
ক্রমশ চেতনা ফিরে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুকে একটা অসহ্য যন্ত্রণা অনুভূত হল৷ যতই সময় যেতে লাগল, ততই যেন তীক্ষ্ণতর হয়ে উঠল ব্যথাটা৷
আস্তে আস্তে চোখ ফেললাম৷ দুধ-সাদা-চারদেয়ালে-ঘেরা একটা ঘরের মধ্যে আমি শুয়ে আছি৷ আমার মুখের উপর ঝুঁকে রয়েছে একটা মুখ৷ দুটো উদ্গ্রীব চোখ স্থিরলক্ষ্যে চেয়ে আছে আমার দিকে৷ এক সময় সেই মুখের ছবিটা অস্পষ্ট হয়ে, কেঁপে কেঁপে মিলিয়ে গেল৷ বুকের মধ্যে তীব্রতর হয়ে উঠল সেই অসহ্য যন্ত্রণা৷ থর থর করে কেঁপে উঠলাম৷ আপনা থেকেই চোখ বুঝে এল৷
কিন্তু ঘটে-যাওয়া ঘটনাগুলো, মনের পর্দায় ছবির মতো পর পর ভেসে উঠতে লাগল৷ মনে পড়ল, উন্মাদের মত সিঁড়ি ভেঙে দৌড়নোর কথা৷ দ্বাররক্ষীর সঙ্গে ধবস্তাধবস্তি, মেয়েটির বীভৎস আর্ত চিৎকার, অন্ধের মতো রাস্তা লক্ষ্য করে আমার ছুটে যাওয়া—সব—স—ব একে একে এসে ভিড় করল আমার মনের আয়নায়৷ এমন কি রিভলবারের সেই ভয়ঙ্কর শব্দগুলোও যেন আবার শুনতে পেলাম—
রাতারাতি বড়লোক হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে এই হল পরিণতি৷—হুঁঃ—আমি আজ শুয়ে আছি হাসপাতালের বিছানায়—আহত অবস্থায়, আর আমার সামনে দাঁড়িয়ে ভীষণদর্শন এক পুলিশ-সার্জেন্ট—একেই বলে নিয়তি!
আপনি তো বলছেন, এর আঘাত নাকি ততটা গুরুতর নয়৷ তাহলে ব্যাটা নিশ্চয়ই মটকা মেরে পড়ে আছে৷ কলার ধরে তুলে, এক লাথি ঝাড়লেই সুড়সুড় করে জ্ঞান ফিরে আসবে—৷’ সাজেন্টের শ্লেষ-ভরা অধৈর্য কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম৷
‘না—না, —তাড়াহুড়ো করাটা ঠিক হবে না, সার্জেন্ট, লোকটা অল্পের জন্য বেঁচে গেছে৷ গুলিটা আর একটু বাঁদিক ঘেঁষে গেলেই—৷’ শান্ত ভদ্র কণ্ঠস্বর—সম্ভবত ডাক্তারের৷
‘তাই নাকি! আমার তো মনে হয়, আমার দাওয়াই খাওয়ার পর ওর মনে হবে, গুলিটা একটু বাঁদিকে ঘেঁষে গেলেই ওর পক্ষে ভালো ছিল—হাঃ—হাঃ—হাঃ—হাঃ—৷’ হায়েনার হিংস্র হাসি ভেসে এল সার্জেন্টের গলা দিয়ে৷
পরিস্থিতির গুরুত্ব বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছি৷ চোখ পিটপিট করে তাকালাম৷ বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে দুজন লোক৷ প্রথমজনের চেহারা মেদবহুল, মুখে প্রশান্তির ভাব৷ গায়ে একটা সাদা আলখাল্লা৷—এ শালাই তাহলে ডাক্তার৷
দ্বিতীয়জন ছোটখাটো পাহাড়ের মতো৷ ভোঁতা নাক, পাতলা, ঠোঁট, আর ছোট ছোট হিংস্র চোখ৷ পরনে তেলচিটে ময়লা পোশাক৷ কিন্তু তার টুপি পরার ধরন দেখেই বুঝলাম, এ ব্যাটা নিঃসন্দেহে পুলিশের লোক—৷
চুপচাপ শুয়ে বুকের যন্ত্রণা সহ্য করছি—হঠাৎ মনে পড়ল রয়ের কথা! শেষ পর্যন্ত ও কি পালাতে পেরেছে? ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লাম৷
অবশ্য রয় আমার মতো ভয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েনি৷ বরং বুদ্ধিমানের মতোই উপরে ছুটেছিল৷ আর আমি গাঁথার মতো দৌড়েছিলাম নীচে—সোজা পুলিশের হাতে৷
রয় যদি ঠিকমতো সবার অলক্ষ্যে অ্যাশলি আর্মস ছেড়ে পালাতে পেরে থাকে, তবে ওর আর জড়িয়ে পড়ার কোন ভয় নেই৷ কারণ কুপারের টাকা প্রথম দিন আমিই দেখেছিলাম, দ্বাররক্ষীর সঙ্গে গল্প করেছিলাম আমিই, এবং আমাকেই সিঁড়ি ভেঙে উন্মাদের মতো ছুটতে দেখেছে লোকেরা৷ সুতরাং রয় সম্পূর্ণ বিপদ-মুক্ত৷
তারপরেই মনে হল সেই ‘ঠকাস—’ শব্দটার কথা৷ ভাবতেই পারিনি, রয় ঐ ভারী ফুলদানিটা ওরকম আসুরিক শক্তিতে বসিয়ে দিতে পারবে কুপারের মাথায়৷
এক অজানা আতঙ্কে শিউরে উঠলাম৷ কুপারের কি হল? ব্যাটা টেঁসে যায়নি তো—?’
হঠাৎ একটা বিশ্রী ঘামের গন্ধে আর তামাকের ধোঁয়ায় চমকে উঠলাম৷ এত কাছে গন্ধটা—ধীরে ধীরে চোখ খুললাম—আমার সামনেই সার্জেন্টের হিংস্র লালচে মুখ৷
দেখলাম, ঘরে ডাক্তার নেই অর্থাৎ আমরা দুজন একা৷
সার্জেন্টটি তার বীভৎস মুখ আরো নামিয়ে আনল, ‘ঢের হয়েছে! এবার দয়া করে মুখ খুলুন দেখি, বাবা যুধিষ্ঠির! আপনার শ্রীমুখের বাণী শোনার জন্য গত দুদিন ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছি!—নে শালা, চটপট মুখ খোল!’ নেকড়ের মতো দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসল সে৷ তামাকে কালো হয়ে যাওয়া চকচকে দাঁতের সারি কিড়মিড় করে উঠল৷—শুরু হল পুলিশের হাতে নরক-যন্ত্রণা৷
ওদের একটা অস্পষ্ট ধারণা ছিল, কাজটা আমি একা করিনি৷ তাই হাজার রকম প্রশ্ন করে, ভয় দেখিয়ে, আমার মুখ থেকে সে-কথাটা বের করতে চাইল৷ কিন্তু আমি ঘাড় নেড়েই চললাম৷ কারণ, ওদের কথা থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম, রয়ের উপস্থিতির কোন প্রমাণই পুলিশের হাতে নেই৷ এমনকি কুপারের খুনের দায়ে আমাকেই পড়তে হবে বলে ভয় দেখালেও, আমি মুখ খুললাম না৷
অবশেষে উপায়ান্তর না দেখে ওরা ক্ষান্ত হল৷ এ কথাও জানাল, কুপার সেরে উঠেছে৷ কুপারের সেরে ওঠাটা, ওরা যে ভালো চোখে দেখছে না, সেটা বুঝতে কষ্ট হল না৷ কারণ ও বেঁচে যাওয়ার জন্যই, আমি গ্যাস-চেম্বারের হাত থেকে রেহাই পেলাম৷
‘কুপার বেঁচে গেছে বলে ভেব না, তুমি বেঁচে যাবে৷’ সার্জেন্ট দাঁত খিঁচিয়ে আমার দিকে তাকাল, ‘ওই আঘাতে কুপার মারাও যেতে পারত৷—তবে ঘাড়বার কোন কারণ নেই বাছাধন, তোমার দশ বছরের ঘানি ঘোরানো কেউ রুখতে পারবে না—হাঃ হাঃ—’ হায়েনা-হাসির সঙ্গে সঙ্গে ওর বিশাল দেহটা কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল৷
হাসপাতাল থেকে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল জেল-হাজতে৷
সেখানে তিন মাস কাটানোর পর জানতে পারলাম, কুপার সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছে৷ অর্থাৎ, বেশ বহাল তবিয়তেই সে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে পারবে৷
ক্রমে এগিয়ে এল বিচারের দিন৷ দিনটা আমার চিরকাল মনে থাকবে, কোনদিন ভুলব না৷
আদালতে এসে চারদিকে চোখ বোলালাম৷ যদি কোন পরিচিত মুখ নজরে পড়ে৷ হঠাৎ চোখে পড়ল, দর্শকদের ভিড়ে জ্যানি দাঁড়িয়ে আছে৷ আমাকে দেখেই, ও হেসে ফেলল৷ খুব অবাক হলেও, মুখে একটা চেষ্টাকৃত হাসি ফুটিয়ে তুললাম৷ সত্যি—আর যেই আসুক না কেন, ভাবতেই পারিনি, জ্যানি এখানে আসবে আমার সঙ্গে দেখা করতে৷
তারপরই চোখ পড়ল, আমার বস—ফ্রাঙ্কলিনের উপর আর তার পাশে ভিজে বেড়ালের মতো চুপটি করে বসে আছে রয়৷
রয়ের সঙ্গে চোখাচোখি হল৷ ওর মুখ পাণ্ডুর, এ তিন মাসে চেহারা অনেক খারাপ হয়ে গেছে৷ হয়তো দিনরাত খালি ভেবেছে ওর নাম আমি পুলিশকে জানিয়েছি কিনা৷
এবার চোখ ফেললাম বিচারপতির দিকে৷ হাড়-বের-করা মুখ৷ কোটরগত অনুভূতিহীন চোখ৷ সারা মুখ জুড়ে একটা অদ্ভুত কাঠিন্য৷
কেন জানি না, হঠাৎ মনে হল, এর হাত থেকে আমার আর নিস্তার নেই! দেখলাম, শাস্তির কাঠগড়ার দিকে এগিয়ে আসছে কুপার৷ মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা, চোখমুখ বিবর্ণ, আগের চেয়ে অনেক রোগা হয়ে গেছে৷
কুপার শপথ নিল৷ তারপর সিন্দুক খোলার জন্য আমাকে ডেকে পাঠানো থেকে শুরু করে,—নকল চাবির কথা, ওকে আক্রমণ করার কথা—একে একে সব বলে গেল৷ কিছুই বাদ দিল না৷
এরপর কাঠগড়ায় এসে উপস্থিত হল, কুপারের ফ্ল্যাটে দেখা সেই মেয়েটি৷ ওর পরনে একটা চাপা আকাশ-নীল পোশাক৷ আদালতের সমস্ত লোক, এমনকি বিচারপতি পর্যন্ত ওর দিকে হাঁ করে চেয়ে রইল৷
মেয়েটির বিবৃতি থেকে জানা গেল, ও কুপারের একটা নাইট-ক্লাবে গান গায়৷ সেদিন একটা গানের রিহার্সাল দিতে ও কুপারের ফ্ল্যাটে গিয়েছিল, এরকম ও মাঝেমধ্যেই যায়৷ গানের না কিসের রিহার্সাল, সেটা দর্শকরা বেশ ভালোই বুঝতে পারল৷ সম্ভবত কুপারকে হিংসাও করতে লাগল মনে মনে৷
সেদিন কুপার ফোন ধরতে পাশের ঘরে গেলে, আমি যে সিন্দুক খুলে টাকাগুলো দেখেছিলাম, সে-কথার উপর মেয়েটা একটু বেশি জোর দিল৷
কিন্তু ফ্রাঙ্কলিনের সাক্ষ্য আমাকে অবাক করল৷ তিনি কাঠগড়ায় উঠে আমার প্রশংসাই করলেন৷ আমি যে তার কোম্পানির একজন বিশ্বাসী ও সুদক্ষ কর্মচারী, সে-কথা তিনি বিচারপতিকে বার বার জানালেন৷ কিন্তু কা কস্য পরিবেদনা! মুখ দেখেই বুঝতে পারলাম, ফ্রাঙ্কলিনের কথা তার এক কান দিয়ে ঢুকে আর এক কান দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে৷
আমার উকিল উঠে দাঁড়িয়ে, আদালতের কাছে আমার জন্য করুণা ভিক্ষা করলেন৷ অর্থাৎ, এই আমার প্রথম অপরাধ৷ সুতরাং বিচারপতি যেন শাস্তির ব্যাপারটা একটু ভেবে দেখেন৷ তাঁর কৃপা-প্রার্থনার ভঙ্গি দেখে মনে হল, আমি দোষী সাব্যস্ত হওয়াতে তিনি বেশ আনন্দিত হয়েছেন৷ তারপর তিনি চেয়ারে বসে কতকগুলো কাগজপত্র ওল্টাতে লাগলেন৷ দূর থেকে তার লেখাগুলো পড়তে না পারলেও, আমি বাজি রেখে বলতে পারি, ওগুলো তাঁর পরবর্তী মামলার নথি৷ এক কথায় উকিলটি বেশ বুদ্ধিমান৷ আমার মামলা নিয়ে ফালতু সময় নষ্ট করে যে আর লাভ নেই, সেটা তিনি বেশ বুঝতে পেরেছেন৷
এরপরই কানে এল বিচারপতির গম্ভীর কণ্ঠস্বর, ‘শেট কারসন, সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণাদি বিচার করে একথাই প্রমাণিত হচ্ছে, তুমি দোষী৷ এ-বিষয়ে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই৷ যেহেতু এটাই তোমার প্রথম অপরাধ, সেহেতু অনিচ্ছাসত্ত্বেও তোমাকে লঘুদণ্ড দিতে আমি আইনসঙ্গতভাবে বাধ্য৷ তুমি যেভাবে মি. হেনরি কুপারকে আক্রমণ করেছ, তাতে তোমার হিংস্র মনোভাবেরই পরিচয় পাওয়া যায়৷ ভুলে যেও না, তোমার আঘাতে মি. কুপার মৃত্যুমুখে পতিত হতে পারতেন৷
‘এছাড়া, একটি সুপ্রতিষ্ঠিত কোম্পানির সুনাম তুমি ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছ, কারসন! যে কোম্পানিতে তোমার বাবা এবং ঠাকুর্দা বিশ্বস্তভাবে কাজ করে গেছেন, তুমি তাদেরই বংশধর হয়ে এই হীন-কাজ করেছ, একথা ভাবতেও তাঁরা লজ্জাবোধ করবেন—’
বিচারপতির কোন কথাই আমার কানে ঢুকল না৷ আমি শুধু ব্যাটার মুখের দিকে চেয়ে রইলাম শেষ লাইনটার অপেক্ষায় যেটা আমার কাছে সবচেয়ে জরুরী৷ অর্থাৎ ক’বছর? পাঁচ—দশ—না পনেরো?
‘—সমস্ত বিচার করে আমি তোমাকে ফার্নওয়ার্থ বন্দীশিবিরে দশ বছরের নির্বাসন দণ্ড দিলাম৷’ বিচারপতি উঠে দাঁড়ালেন৷
থর থর করে কাঁপতে লাগল আমার পা দুটো৷ ফার্নওয়ার্থ?! ওঃ—ভগবান! আমি—আমি তো একথা কল্পনাও করিনি! মনে হল গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠি—দোহাই হুজুর, আমাকে কুড়ি—পঁচিশ—যত বছর খুশি কারাদণ্ড দিন! কিন্তু ফার্নওয়ার্থ—না—না—না!
প্রচণ্ড ক্ষোভ আর আফসোসের রুদ্ধ কান্না যেন সমস্ত সত্তাকে ভেঙে খান খান করে দিল৷ আগামী দশটা বছরের কথা চিন্তা করে, হৃৎপিণ্ড আতঙ্কে কুঁকড়ে এতটুকু হয়ে গেল৷—উঃ—! মাথা রাখলাম কাঠগড়ার রেলিঙের উপর৷
হঠাৎ এক অদ্ভুত চিন্তা ভেসে উঠল আমার ভয়ার্ত হৃদয়ে৷ রয়—রয়ই তো এসবের জন্য দায়ী! ও যদি কুপারকে না মারত, তাতে তো আমাকে ফার্নওয়ার্থে যেতে হত না৷ হয়ত পাঁচ বছর জেল খেটেই রেহাই পেতাম!—শুধু রয়ের জন্যই আজ আমাকে ফার্নওয়ার্থে যেতে হচ্ছে৷
এখনও সময় আছে, কারসন,—মন বলে উঠল, বিচারপতিকে রয়ের নাম বলে দাও৷ এ ছাড়া তোমার মুক্তির আর-কোন পথই খোলা নেই—
মন স্থির করে নিয়ে এক ঝটকায় সিধে হয়ে দাঁড়ালাম৷ মুখ তুলতেই চোখ পড়ল রয়ের চোখে৷ ফ্রাঙ্কলিনের পাশে সোজা হয়ে, রুদ্ধশ্বাসে বসে আছে রয়৷ আতঙ্ক-উৎকণ্ঠায় ওর মুখ মৃতের মতো বিবর্ণ, সমস্ত রক্ত কেউ যেন শুষে নিয়েছে৷ রয়ের দিকে চেয়ে আমার মনে পড়ল আমাদের ছেলেবেলার কথা৷ সেই যখন আমরা একসঙ্গে সুকলে যেতাম—গাছ থেকে ফল পাড়তাম—মাছ ধরতাম৷ এমনি আরও কত ছোট ঘটনা ছবির মতো ভেসে উঠল মনের পর্দায়৷—রয়ই ছিল আমার একমাত্র বন্ধু—এবং এখনও আছে৷ ওর দিকে চেয়ে আশ্বাসের হাসি হাসলাম৷ বোঝাতে চাইলাম, ‘তোর কোন ভয় নেই রে, রয়! যতক্ষণ আমি বেঁচে আছি, এতটুকু বিপদের ছোঁয়া তোর গায়ে লাগতে দেব না৷—আচ্ছা রয়,—মনে পড়ে, একবার আমরা পাশের সেই জঙ্গলটায় শিকার করতে গিয়েছিলাম? তারপর—অবাধ্য চোখের জল গাল বেয়ে পড়ল৷ রয়েরর দিকে চেয়ে হেসে হাত নাড়লাম৷ ওর মুখ ঝাপসা হয়ে এল৷
পিছন থেকে কে যেন একটা ধাক্কা মারল, ‘এই চল্ চল্—৷’ তাকিয়ে দেখি একজন কনস্টেবল৷ ধীরে ধীরে এগিয়ে চললাম আদালত ছেড়ে৷ শেষবারের মত জ্যানির দিকে তাকালাম৷ ও কাঁদছে—৷ হ্যাঁ—হ্যাঁ, সত্যিই ও আমার জন্য কাঁদছে—! জ্যানি! ডুকরে কেঁদে উঠলাম৷ জলভরা চোখে ফিরে তাকালাম রয়ের দিকে৷ ওর চোখেও জল৷ মুখে কৃতজ্ঞ হাসি৷ যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না, ও মুক্ত—আমি ওকে রেহাই দিয়ে গেলাম৷
বোধহয় মুহূর্তের জন্য নিজের অজান্তেই দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম৷ কনস্টেবলের ধাক্কায় মুখ ফিরিয়ে নিয়ে এগিয়ে চললাম৷ স্পষ্টই দেখতে পেলাম, সামনে অপেক্ষা করছে অন্ধকার ভবিতব্য আর অসীম নরকযন্ত্রণা—ফার্নওয়ার্থ—! রক্তজমানো একটা হিমেল স্রোত বয়ে গেল শিরদাঁড়া দিয়ে৷ ইচ্ছে হল, কনস্টেবলের হাত ছাড়িয়ে এখুনি ছুট লাগাই—কিন্তু—৷
একটা কথা ভেবে সান্ত্বনা পেলাম—আমার বন্ধু রয়ের সঙ্গে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করিনি৷ আমি ওকে বাঁচাবার সুযোগ দিয়েছি৷ নিজের বিবেকের কাছে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে না৷ পরিষ্কার অনুভব করলাম ঃ এই একটা কথাই আমাকে ফার্নওয়ার্থের নরক-যন্ত্রণায় সান্ত্বনা দেবে৷ —রয়ের সঙ্গে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করিনি—ও আমার বন্ধু ছিল—আছে—এবং থাকবে—৷
জমাট দুঃস্বপ্নের কুৎসিত নরক এই ফার্নওয়ার্থ বন্দীশিবির৷
কাগজপত্রে এর বীভৎসতা নিয়ে বহুবার লেখালেখি হয়েছে৷ রাষ্ট্রপ্রধানকে বারংবার অনুরোধ করা হয়েছে, এই অমানুষিক বন্দীশিবির বন্ধ করার জন্য৷ তিনি ব্যাপারটা ভেবে দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন৷ ভাবতে ভাবতে বছর তিনেক এর মধ্যেই পার হয়ে গেছে৷ কিন্তু রাষ্টপ্রভধানের ‘ভেবে দেখা’ আজ আজও শেষ হয়নি৷
জার্মান-সৈন্যরা নাৎসী বন্দীশিবিরের জন্য আজও বিখ্যাত৷ সেখানে তারা অকথ্য অমানুষিক অত্যাচরের যেসব উপার বের করেছিল, তা শুনে আজও সাধারণ মানুষের বুক কেঁপে ওঠে৷
কিন্তু এহেন কুখ্যাত নাৎসী বন্দীশিবিরকেও হার মানতে হয়েছিল ফার্নওয়ার্থের কাছে৷ এর বীভৎসতা নাকি কল্পনা করা যায় না৷
খবরের কাগজে লেখা প্রবন্ধগুলো আমি পড়েছিলাম৷ সে-লেখার অর্ধেকও যদি সত্যি হয়, তবে ফার্নওয়ার্থকে নরক ছাড়া আর কিছু বলা যায় না৷ সাধারণ জেলের মতো ফার্নওয়ার্থের চারদিকে বিশাল উঁচু পাঁচিল এবং কয়েদীদের কুঠরি আছে, একথা ভাবলে ভীষণ ভুল করা হবে৷ ওসবের কোন বালাই ফার্নওয়ার্থের নেই৷ এখানে কয়েদখানা বলতে, ধু-ধু করছে এক বিশাল তেপান্তরের মাঠ—তার মাঝে একটা ঘর৷ পঞ্চাশ ফুট লম্বা, দশ ফুট চওড়া৷ ঘরে ঢোকবার একটাই দরজা৷ নিরেট লোহার তৈরি৷ এছাড়া মোটা লোহার গরাদ বসানো একটা ছোট্ট জানলা আছে—তাও প্রায় মাটি থেকে বিশ ফুট উঁচুতে৷ সেটা দিয়ে যা আলো আসে, তা আর কহতব্য নয়৷
পাহারাদার হিসেবে দিনের বেলায় আছে বন্দুক-বাজ প্রহরী দল এদের মধ্যে ছ-জন অশ্বারোহী৷ তাদের শক্তিশালী রাইফেল দিয়ে দু-মাইল দূর থেকেও লক্ষ্যভেদ করা যায়৷
বাইরের মাঠে লুকোবার ছিটেফোঁটা জায়গাও নেই৷ দূরে—বহুদূরে দেখা যায় এক চিলতে রুপোলী রেখা—নদী৷ তার তীরে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত নলখাগড়ার ঝোপ৷ এছাড়া আর-কিছু চোখে পড়ে না৷ অর্থাৎ দিনের বেলা যদি কেউ ফার্নওয়ার্থ থেকে পালাবার চেষ্টা করে, তবে পিছন পিছন হাওয়ার বেগে ধেয়ে যাবে ঘোড়ার চড়া প্রহরী৷ চারদিকের নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে ছুটে যাবে রাইফেলের গুলি—ফটাস—৷ নাঃ—দিনের বেলা ফার্নওয়ার্থ ছেড়ে পালানো অসম্ভব৷
আর রাতের প্রহরী? রাতের প্রহরী একপাল রক্তলোলুপ, হিংস্র শিকারী কুকুর৷ তাছাড়া কয়েদীদের পায়ে তলা দিয়ে লাগানো থাকে ভারী লোহার শেকল৷
এ সব জেনেও, প্রথমদিন ফার্নওয়ার্থে পা দিয়েই ঠিক করলাম, যেভাবেই হোক এই জীবন্ত নরক ছেড়ে আমাকে পালাতেই হবে৷ এখানে দশ বছর থাকলে, আমি নির্ঘাত পাগল হয়ে যাব৷ এই নরককুণ্ডে দশ বছর কাটানোর চেয়ে মৃত্যুও অনেক ভালো—নাঃ—পালাতে আমাকে হবেই—সে যেমন করেই হোক—কিন্তু কেমন করে?—
দেখতে দেখতে দশটা দিন কেটে গেল৷ দশ-দশটা বীভৎস দুঃস্বপ্নের দিন! সকাল হলেই প্রহরীরা এসে আমাদের নিয়ে যায় মাঠে৷ প্রত্যেকের নাম ডাকা হয়ে গেলে পোশাক ছেড়ে খালি গায়ে আমাদের যেতে হয়৷ সে এক অদ্ভুত দৃশ্য! সাতাত্তর জন বিভিন্ন চেহারার কয়েদী, সার বেঁধে এগিয়ে চলেছি—আর আমাদের দু-পাশে ঘোড়ার চড়ে তিনজন করে ছ-জন প্রহরী৷
এরপর চলে পাথর ভাঙার কাজ৷ কাটফাটা রোদ্দুরে, খালি গায়ে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাঙতে হয় পাথর৷ দূরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সেই ছ-জন ঘোড়ায়চড়া প্রহরী৷ এছাড়া আর যে ছ-জন আছে, তারা পায়চারি করে বেড়ায়, হাতে তাদের শঙ্করমাছের লেজ দিয়ে তৈরি লিকলিকে চাবুক৷ কারো কাজে সামান্যতম ঢিলেমি দেখলেই, সেই চাবুক সপাং করে এসে আছড়ে পড়ে তার পিঠে৷ চামড়া কেটে দরদর করে রক্ত ঝরে পড়ে৷ উঃ—কি পৈশাচিক!
ঘণ্টার পর ঘণ্টা অমানুষিক পরিশ্রমের পর, শ্রান্ত ক্লান্ত আমরা, রক্তাক্ত দেহে ফিরে চলি, কয়েদখানার দিকে—তেলচিটে পোশাকে, শ্লথ পায়ে, টলতে টলতে৷ বেলা শেষের আলো ক্রমশই স্তিমিত হতে থাকে৷ তারপর একসময় চিল তার ডানা থেকে রোদ্দুরের গন্ধ মুছে ফেলে আশ্রয় নেয় নীড়ে৷ চারদিকে কেমন একটা শ্রান্ত অথচ স্নিগ্দভাব ফুটে ওঠে৷ দূরের কোন গির্জা থেকে ভেসে আছে—ঢং—ঢং—ঢং সাতটা বাজে৷ ঠিক সেই কন্যাসুন্দর বেলায় ফার্নওয়ার্থকে ততটা নৃশংস মনে হয় না—৷
কিন্তু সামনে পড়ে থাকা লম্বা রাতের কথা ভেবে শিউড়ে উঠি৷ রাত কাটানোর কথা চিন্তা করলেই গায়ের রক্ত হিম হয়ে আসে আতঙ্কে৷ কারণ ফার্নওয়ার্থের দিনগুলো যেমন বীভৎস, তার চেয়ে ভয়াবহ এর রাতগুলো!
কয়েদখানার ভিতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে, দেওয়ালে গাঁথা, লোহার জালের তৈরি শোবার তাক৷ একটার নীচে একটা—এরকম অসংখ্য তাক৷ ঘরে টিমটিম করে জ্বালা থাকে কয়েকটা মাত্র লণ্ঠন৷ যার আলো কয়েদখানার পরিবেশকে আরো করে তোলে ভয়ঙ্কর৷ লোহার জালের ছায়াগুলো, ঘরের নোংরা তেলচিটে দেওয়ালে কেঁপে উঠে একটা অমানুষিক নারকীয় পরিবেশের সৃষ্টি করে৷
সাতাত্তর জন কয়েদীকে গরু-ছাগলের মতো ঢোকানো হয় সেই ঘরে৷ দুর্গন্ধে ভরে ওঠে গোটা ঘরটা৷ স্নানের অভাবে আর অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রত্যেককেই তখন পাগলের মতো দেখায়৷ একরাশ ধুলো-ভরা মাথার চুলে জট, গালভরা খোঁচাখোঁচা দাড়ি-গোঁফ৷ চোখে-মুখে হতাশা৷
যে যার তাকে উঠে পড়ে শোবার আশায়৷ অবশ্য যদি সেটাকে শোওয়া বলা যায়৷ প্রহরীরা এগিয়ে এসে প্রত্যেকের পায়ে শেকল লাগিয়ে তালা এঁটে দেয়৷ তারপর লণ্ঠনগুলো নিয়ে তারা চলে যায়৷ রেখে যায় ঘরভর্তি জমাট, নিঃসীম অন্ধকার৷
তার বের করা লোহার জালের উপরেই গা এলিয়ে দিতে হয়৷ এতটুকু নড়বার উপায় নেই৷ কারণ প্রত্যেকের পায়ের শেকলই একটা বিরাট লম্বা শেকলের সঙ্গে বাঁধা৷ এই বিরাট শিকলটা, কয়েকটা আংটার সাহায্যে, সেই পঞ্চাশ ফুট লম্বা ঘরের চার দেওয়ালের গায়ে আটকানো—এমনভাবে, যে কেউ যদি একটুও নড়াচড়া করে, তবে বড় শেকলের টান পড়ার জন্য, অন্যান্য সমস্ত কয়েদীর পায়েই টান পড়বে, এবং তাদের ঘুম ভেঙে যাবে৷ নরকেও বোধ করি এর চেয়ে আরামে থাকা যায়!
সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর, ঘুমের ঘোরে কোন কয়েদী যদি আচমকা পাশ ফেরে, তবে শেকলে টান পড়ে ঘুম ভেঙে যাওয়ার জন্য, পাশের কয়েদী হিংস্রভাবে তার সঙ্গে মারামারি শুরু করে দেয়৷ ক্রমে এক তাক থেকে আরেক তাকে ছড়িয়ে পড়ে সেই মারামারি৷ ওই অন্ধকারেই, পা-বাঁধা অবস্থায়, যে যার তাকে বসেই অন্যকে লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি ঘুঁষি চালায়৷ আঁচড়ে, কামড়ে, গলা টিপে, তারা জন্তু-জানোয়ারের মতো লড়াই করে চলে৷ অন্ধকারেই ভেসে আসে গর্জন,—আর্তচিৎকার—হাঁপানির শব্দ—৷
না, প্রহরীরা এসব মারপিট নিয়ে একদম মাথা ঘামায় না৷ যদি কেউ মরে যায়, তবে ভোরবেলা এসে, ওরা সেই লাশটাকে একটা জায়গায় নিয়ে ফেলে দেয়৷ আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে লাশটাকে ছিঁড়েখুঁড়ে শেষ করে দেয় শকুনের দল৷ অর্থাৎ ফার্নওয়ার্থ থেকে বেঁচে ফেরার আশা আর নেই!
সুতরাং পালাবার চিন্তাটা মনের মধ্যেই ঘোরাফেরা করতে লাগল৷
ফার্নওয়ার্থে রক্ষীর সংখ্যা মোট বারোজন৷ রাত হলে ওরা সকলেই ঘরে ফিরে যায়—শুধু একজন বাদে৷ তার নাম বাইফ্লিট৷ ওর কাজ, কুকুরগুলোকে দেখাশোনা করা৷ বাইফ্লিটের চেহারায় এমন একটা আদিম হিংস্র ভাব আছে যে রক্ত-লোলুপ হাউন্ডগুলো পর্যন্ত ওকে দেখলে ভয় পায়৷
দিনের বেলা কুকুরগুলো একটা বড়সড় লোহার খোঁয়াড়ে বন্ধ থাকে৷ আর ওদের খাওয়ানো হয় দিনে মাত্র একবার৷ যার জন্য হাউন্ডগুলো বাঘের চেয়েও হিংস্র হয়ে থাকে৷
রাত আটটার সময় অন্য প্রহরীরা চলে গেলে বাইফ্লিট পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় কুকুরের খোঁয়াড়ের দিকে৷ ওর হাতে তখন থাকে একটা ভারী মোটা লাঠি৷ সেটা ঘোরাতে ঘোরাতে ও গিয়ে খুলে দেয় খোঁয়াড়ের দরজা৷ একে একে বেরিয়ে আসে হিংস্র হাউন্ডের দল৷ ওদের ক্ষুধার্ত, হিংস্র শ্বাপদের মতো চোখ ধকধক করে ওঠে রক্ত লালসায়৷
বাইফ্লিটের চেহারা চৈত্যের মতো বিশাল, শুয়োরের মতো বীভৎস, কুৎসিত মুখ, নিশাচরের মতো জ্বলজ্বলে চোখ৷ রাত্রিবেলাটা যেন ওরই রাজত্ব৷ খেয়ালখুশিমতো ও কুকুরগুলো নিয়ে ঘুরে বেড়ায়৷ কারোর সাহস হত না, সেই রাজত্বে অনধিকার প্রবেশ করে৷
ভোর সাড়ে চারটের সময় বাইফ্লিট কুকুরগুলোকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ওদের খোঁয়াড়ে৷ তারপর অন্যান্য প্রহরীরা আসে তাদের দৈনন্দিন প্রহরায়৷
ঘুম আমার আসে না৷ তাই রাতের পর রাত জেগে কাটাই, আর শুনি ক্ষুধার্ত সারমেয়দলের রক্ত-হিম করা গর্জন৷ তখন ভেঙে গুঁড়িয়ে যায় আমার পালাবার স্বপ্ন৷ ইস্—শুধু যদি কুকুরগুলো না থাকত, তাহলে—
পায়ের তালা-লাগানো শেকল বা ঘরের লোহার দরজা এ দুটোর কোনটাই আমার কাছে কোন সমস্যা নয়৷ কারণ প্রথম রাতেই, আমার লোহার জাল দিয়ে তৈরি শোবার তাক থেকে অতিকষ্টে ইঞ্চিতিনেক লম্বা একটুকরো তার ভেঙে রেখেছিলাম৷ আঙুল কেটে রক্ত বেরোলেও মন ভরে গিয়েছিল আনন্দে৷ ওই তার এবং সামান্য সময় পেলে, ফার্নওয়ার্থের যে-কোন তালাই আমি খুলে ফেলতে পারি৷ সিন্দুক কোম্পানি আমার মন ভরার মতো পয়সা নিতে দিতে পারলেও, পৃথিবীর কঠিনতম তালা কিভাবে খুলতে হয়, সেটা শিখিয়ে দিয়েছে৷ তারপর থেকেই পালাবার চিন্তাটা আরো জমাট বেঁধেছে আমার উর্বর মস্তিষ্কে৷ বারবার মনে হয়েছে, তালা খুলে ছুটে পালাই৷ রক্ষীদের গুলি খেয়ে যদি মরেও যাই, কোন দুঃখ নেই কিন্তু এই ফার্নওয়ার্থ আমার পক্ষে অসহ্য! আমি পাগল হয়ে যাব!
রাতে শুয়ে শুয়ে পালাবার কথা চিন্তা করলেই, শুনতে পাই হাউন্ডগুলোর হিংস্র গর্জন৷ নাঃ—যে করে হোক এই কুকুরগুলোকে বোকা বানাতেই হবে৷ নয়তো পালানো অসম্ভব! দিনরাত খালি ভাবি, কিভাবে কুকুরগুলোর একটা ব্যবস্থা করা যায়, কিন্তু নিরেট মাথা থেকে কিছুই আর বেরোয় না৷
রোজ ভোরবেলা নাম-ডাকার সময়, খোঁয়াড়ের পাশ দিয়ে যেতে যেতে অসহায় ভাবে অর্ধভুক্ত কুকুরগুলোর দিকে চেয়ে দেখি৷ আমাদের দেখেই ওরা শিকার দেখার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ধোঁয়াড়ের গরাদের রগায়ে৷
চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা দৃশ্য—একটা লোক রাতের অন্ধকারে ছুটছে আর তার পিছন পিছন নিঃশব্দে বিদ্যুৎগতিতে ছুটে চলছে দশটা হাউন্ড! মুহূর্তের মধ্যে কুকুরগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর৷ দাঁতে নখে ফালা ফালা করে ফেলল তার দেহ৷—ওঃ—কি ভয়ানক!
ফার্নওয়ার্থে প্রায় একমাস কাটানোর পর মুশকিল আসান হল৷ সমাধান হল সারমেয়-সমস্যার৷
আমাকে বাইরের কাজ থেকে রেহাই দিয়ে ঢোকানো হল রান্নাঘরের কাজে৷ সেখানে আমাকে জল তুলতে হয়, বাসন মাজতে হয়, মসলা পিষতে হয়—মসলা বলতে শুধু মরিচ৷
প্রত্যেকটি কয়েদীই ভয় করে এই কাজটাকে৷ এর চেয়ে বাইরে পাথর ভাঙাই ওদের কাছে শ্রেয়ঃ মনে হত৷
বন্দীদের জন্য যা খাবার তৈরি হয়, তা আর বলার নয়৷ রোজ দু-বেলা একই খাবার চলে৷ অখাদ্য পচা আলুর পাতলা ঝোল, আর তার মধ্যে ভাসছে আধপচা বাসী মাংসের ডেলা৷ অসহ্য গরম এবং রান্না-করা খাবারের বিটকেল দুর্গন্ধে পেটের নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসে৷ তবুও ওর মধ্যেই ঠায় দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়৷ সে এক বিশ্রী অভিজ্ঞতা৷
মাংসের পচা গন্ধটাকে চাপা দেওয়ার জন্য, পাচক ওই ঝোলের মধ্যে প্রাণভরে মরিচ ঢালে৷ কিন্তু তবু কি সেই পচা বিটকেল গন্ধকে চাপা দেওয়া যায়?—একদিন এই মরিচ পিষতে পিষতেই কুকুরগুলোকে বোকা বানানোর মতলব আমার মাথায় এল৷—সত্যি,—ভাগ্যিস এই রান্নাঘরের কাজটা আমাকে দিয়েছিল,—তা সে যত খারাপরই হোক! মনে মনে বেশ উৎসাহ পেলাম৷ এতদিনে খুঁজে পাওয়া গেল একটা উপায়ের মতো উপায়৷
পরপর কয়েকদিন, রান্নাঘরের কাজ সেরে কয়েদখানায় ফেরার সময় লুকিয়ে পকেটভর্তি করে মরিচের গুঁড়ো নিয়ে এলাম৷ পাচক ব্যাটা জানতেই পারল না৷ সেই মরিচকে একটা ছোট পুঁচলি করে, আমার শোবার তাকের এককোণায় লুকিয়ে রাখলাম৷ কারণ এই মরিচই এখন আমার প্রাণ৷
এইভাবে পালাবার পথে দু-ধাপ এগিয়ে গেলাম৷ প্রথমত, দরজা খুলতে আমার অসুবিধে হবে না৷ আর দ্বিতীয়ত, কুকুরগুলোকে অনুসরণ থেকে বিভ্রান্ত করার জন্য আমার সঙ্গে রয়েছে মরিচ৷ অতএব এ দুটো জিনিসের সাহায্যে আমি মাঠ ছাড়িয়ে অন্তত দূরে নদীর কাছে পৌঁছতে পারব৷ আর তারপর লুকোবার জন্যে নদীর পারেই তো রয়েছে ঘন নলখাগড়ায় ঝোপ৷ সুতরাং ফাঁকা মাঠ পার হয়ে নদী পর্যন্ত আমাকে পৌঁছতেই হবে৷ তারপর ভরসা ওই নলখাগড়া৷
কিন্তু কুকুরগুলো যদি পালাবার সময় আমাকে দেখতে পায়, তবে আর মরিচ-ফরিচ দিয়ে কোন কাজই হবে না—ছুটে এসে ওরা আমাকে ছিঁড়ে টুকরো করে ফেলবে৷ কিন্তু কোনরকমে যদি ওই হিংস্র জীবগুলোর অলক্ষ্যে পালাতে পারি, তবেই মরিচে কাজ হবে৷ কারণ মরিচের উগ্রগন্ধে, কুকুরগুলো আমার গন্ধ আর পাবে না ওদের অনুসরণের হাত থেকে রেহাই পাব৷
হাউন্ডগুলোর অলক্ষ্যে আমাকে নদী পর্যন্ত পৌঁছতেই হবে৷ কিন্তু কী করে—? শুধু এই প্রশ্নের উত্তর জানতে পারলেই আমি পালাতে আর দ্বিধা করব না৷
ভাবতে ভাবতে চার রাত্তির পার হয়ে গেল৷ কোন সমাধানেই পৌঁছতে পারলাম না৷ তারপর একদিন—রয়ের কাছ থেকে শেখা, দারোয়ানকে পটানোর বুদ্ধির কথা মনে পড়ল—আর দেরি করলাম না৷
পরদিন সকালে রান্নাঘরে পৌঁছেই রাধুঁনি ব্যাটার সঙ্গে সুযোগ বুঝে
সুখ-দুঃখের গল্প জুড়ে দিলাম৷ লোকটা এই পচা রান্নাঘরের পচা মাংস রেঁধে তিতিবিরক্ত হয়ে উঠেছিল৷ দুটো সুখ-দুঃখের কথা বলতে পেরে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল৷ আমার জানবার ছিল শুধু রাতের প্রহরায় ব্যাপারটা—বাইফ্লিটের গতিবিধির কথা৷ ওর থেকেই কায়দা করে জেনে নিলাম৷
প্রতিদিন রাত আটটায় অন্যান্য প্রহরীরা বাইফ্লিটের ঘাড়ে সব দায়দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে ঘুমোতে চলে যায়৷ বাইফ্লিট কয়েদখানার দরজায় তালা দিয়ে, খোঁয়াড়ে গিয়ে কুকুরগুলোকে ছেড়ে দেয়৷ তারপর এগিয়ে যায় অদূরেই অবস্থিত একটা ছোট্ট কুড়েঘরের দিকে৷ সেখানে গিয়ে শুয়ে পড়ে—সম্ভবত ঘুমিয়েও পড়ে৷ কারণ দশ-দশটা হিংস্র জীব সেখানে পাহারা দিচ্ছে, ষেখানে মানুষের আর কী দরকার?
রাত পৌনে চারটের সময় বাইফ্লিট কুড়েঘর ছেড়ে বেরিয়ে রান্নাঘরে যায়৷ সেখানে কুকুরগুলোর জন্যে দুটো ঝুড়িতে মাংসের ছাঁট রাখা থাকে৷ সেই ঝুড়ি দুটো নিয়ে বাইফ্লিট খোঁয়াড়ে যায়৷ কুকুরগুলোও ওকে অনুসরণ করে৷ খোঁয়াড়ের ভিতর ঢোকার পর ওদের খাওয়া শুরু হয়৷
রাঁধুনির কথামতো, শুয়ে শুয়ে শুনতে পাই কুকুরগুলোর বীভৎস চিৎকার৷ নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি করার ফ্যাঁসফ্যাঁসে চাপা গর্জন শুনে বুঝতে পারি, ওরা মাংসের টুকরো নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে৷ আর মাঝে-মধ্যে শোনা যায় বাইফ্লিট ওদের ধমক দিচ্ছে৷ কেঁউ কেঁউ চিৎকার শুনলেই বুঝি, বাইফ্লিট লাঠি দিয়ে প্রয়োজন মতো ওদের ঠ্যাঙাচ্ছে৷ এমনি করে বেশ কিছুক্ষণ যাওয়ার পর চারটে কুড়ির সময় ও খোঁয়াড় বন্ধ করে দেয়৷ তারপরেই শোনা যায় বৈদ্যুতিক বাঁশির কানফাটানো শব্দ—একবার-দুবার, এটা ছিল বাইফ্লিটের রোজকার সংকেত৷ অর্থাৎ, অন্যান্য রক্ষীদের জানানো কুকুরগুলো খোঁয়াড়ে ফিরে গেছে৷ সেই সঙ্গে কয়েদীরাও জেগে ওঠে—
এই নিয়মের কোন ব্যতিক্রম হয় না৷ ঠিক করলাম, যখনই বাইফ্লিট পৌনে চারটের সময় কুকুরগুলোকে খাওয়াতে শুরু করবে, তখনই কয়েদখানার দরজা খুলে ছুট লাগাব—সোজা নদীর দিকে—৷
পালাবার জন্য সময় খুবই কম পাওয়া যাবে বড়জোর আধঘণ্টা—কি তার চেয়েও কিছু কম৷ তবু তার মধ্যেই পালাতে হবে৷ এখনও পর্যন্ত আমার শরীর বেশ সুস্থ সবল আছে, তাছাড়া প্রচণ্ড জোরে ছুটতেও পারি৷ মাথা ঠিক রেখে দৌড়তে পারলে, নদী পর্যন্ত পৌঁছতে মিনিট কয়েকের বেশি সময় লাগবে না৷ তার পর থেকেই কুকুরগুলোকে ধোঁকা দেবার জন্য মরিচের গুঁড়ো কাজে লাগাব—তার আগে নয়৷
প্রহরীরা যদি খুঁজতে বেরোয়, তখনকার মতো নলখাগড়ার ঝোপে গা ঢাকা দেব৷ তারপর যদি বরাত জোরে ওদের হাত থেকে রেহাই পাই, তবে আমার পথ চলা শুরু হবে৷ সকলেরই চোখ এড়িয়ে চলার পক্ষে, রাতের অন্ধকার আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করবে৷ এইভাবে, শুধুমাত্র রাতের অন্ধকারেই পথ চলে, পৌঁছতে হবে রেললাইন পর্যন্ত৷ জানি না ক-রাত লাগবে! ফার্নওয়ার্থ থেকে রেললাইনের দূরত্ব কুড়ি মাইল৷ সেখানে পৌঁছতে পারলে আর কোন ভয় নেই৷ যে-কোন একটা চলতি ট্রেনে সোজা গিয়ে নামব ওকল্যান্ডে৷ এই জেলার মধ্যে ওকল্যান্ডই সবচেয়ে বড় শহর৷ সেখানে লোকের ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে আমার বেশি সময় লাগবে না৷
কিন্তু এখনও একটা বিরাট সমস্যা আমার সামনে রয়েছে৷
পায়ে লাগানো শেকলের তালা খুলতে আমার কয়েক সেকেন্ড সময় লাগবে৷ কিন্তু কয়েদখানার ভারী দরজা—উঁহু—ওটা তো আর অল্পসময়ে হবে না৷ ওই দরজা খোলার সময় অন্য কোন কয়েদী যদি জেগে উঠে চেঁচামেচি শুরু করে দেয়?—আর সেই চিৎকার যদি বাইফ্লিট শুনতে পায় তাহলেই সর্বনাশ! তীরে এসে তরী ডুববে—৷ আর এছাড়াও নিজের নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য,আরও একটা লোক আমার বিশেষ প্রয়োজন, যার পিছনে হাউন্ডগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করাব৷ কিন্তু কাকে?—নাঃ—এ ব্যাপারটার একটা ব্যবস্থা করতেই হবে—
পালাবার পথে এতটা এগিয়ে আমি কোন অনিশ্চয়তার মধ্যে যেতে চাইছি না৷ প্রথম থেকেই যখন এত কষ্ট করে, এত নির্ভুলভাবে পালাবার জন্য তৈরি হয়েছি, তখন এই সামান্য সমস্যার নিখুঁত সমাধান না করে এক পা-ও এগোচ্ছি না৷ তা দু একদিন যদি দেরি হয় তো হোক!
হঠাৎ মনে হল বয়েডের কথা৷—ওকে দিয়েই কাজ হবে!
প্রত্যেক কারাগারেই এমন একজন কায়েদী থাকে, যাকে অন্যান্য কয়েদীরা তার দৈহিক শক্তির জন্য ভয় পায়৷ মাস্তান গোছের আর কি! এখানেও এমনি একটি মাস্তান আছে৷ তার নাম জো বয়েড৷
বয়েড লম্বায় পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির বেশি হবে না, কিন্তু চওড়ায় সাধারণ মানুষের দ্বিগুণ৷ মুখভর্তি কাটা দাগ৷ সমস্ত ছুরির আঘাতেই হয়েছে৷ নাকটা মুষ্টিযোদ্ধাদের মতো চ্যাপটা—মুখের উপর ছড়ানো, যেন লেপটে আছে৷ লোমশ ভুরু জোড়ার নিচে জ্বলজ্বলে কুতকুতে চোখ৷ মোটের উপর বয়েডের চেহারা অনেকটা গরিলার মতো৷ এবং গরিলার মতো শক্তিও রাখে দেহে৷
ওর চেহারা দেখেই বোঝা যায়, বাকি কয়েদীরা কেন ওকে এত ভয় করে৷ বয়েডের শোবার তাক আমার ঠিক নিচেই৷ জানতাম, যদি ভজিয়ে ভাজিয়ে ওকে আমার সঙ্গে টানতে পারি, তবে দরজার তালা খোলার সময় কেউ যদি জেগেও যায়, বয়েডকে দেখলে আর চেঁচাতে সাহস করবে না৷
কিন্তু বয়েডকে কি বিশ্বাস করা চলে?—ও যদি রাজি না হয়?—যদি ডেকে পাঠায় বাইফ্লিটকে?
বয়েডকে বোঝা মুশকিল৷ কারণ ও কারো সঙ্গেই কথা বলে না৷ সবসময় নিজের মনে চুপচাপ বসে থাকে৷ দু-একজন শক্তি দেখিয়ে ওর উপরে টেক্কা দিতে চেয়েছিল কিন্তু বয়েডের ঘুঁষি খেয়ে ঠান্ডা হয়ে গেছে৷ তাতে কেউ কেউ অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল৷ সেই থেকে কেউ আর ওর কাছ ঘেঁষে না৷
ভাবতে ভাবতে অর্ধেক রাত হয়ে গেল৷ শুয়ে শুয়ে বয়েডের শ্বাস-প্রশ্বাসের গভীর শব্দ শুনতে লাগলাম৷ ওকে কি বলব আমার মতলবের কথা? হাজার হলেও বন্দী তো! মুক্তির স্বাদগ্রহণের ইচ্ছে কি ওর হবে না?—কিন্তু—
রাত প্রায় দুটোর সময় ঠিক করলাম বয়েডকে বলব৷ এটুকু ঝুঁকি আমাকে নিতেই হবে, নয়ত পালানো অসম্ভব৷
মনস্থির করে পায়ে লাগানো শেকলের তালা খুলে ফেললাম৷ উপুড় হয়ে লোহার জালের ফাঁক দিয়ে তাকালাম৷ নিকষ মিসমিসে অন্ধকারে কিছু চোখে পড়ে না৷ শুধু শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দে আর তেলচিটে দুর্গন্ধে বুঝলাম বয়েড ওর তাকে শুয়ে আছে৷
‘অ্যাই—বয়েড!’ চাপা ফিসফিস স্বরে ওকে ডাকলাম৷
সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল শ্বাস-প্রশ্বাসের ভারী শব্দ—বয়েড জেগেছে! এক ডাকেই ও উঠে পড়বে, ভাবতে পারিনি একটু অপেক্ষা করলাম—
‘বয়েড! শুনতে পাচ্ছ?’ অন্ধকারে কিছু দেখা না গেলেও বুঝলাম ওর সন্দিগ্দ ঘন জ্বলজ্বলে চোখজোড়া আমারই দিকে চেয়ে আছে৷
‘কী ব্যাপার?’ চাপা হালকা স্বরে ভেসে এল কথাগুলো৷
‘আর ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে আমি এখান থেকে পালাচ্ছি৷ তুমি কি আমার সঙ্গে আসবে?’
‘পা-লা-চ্ছ?’ বয়েড যেন আমার কথা বিশ্বাসই করতে পারছে না৷
‘হ্যাঁ, বাইফ্লিট যখন কুকুরগুলোকে খাওয়াতে শুরু করবে, তখন৷—কি, আসবে?’
‘তুমি কি পাগল! কয়েকখানা থেকে বেরোবে কেমন করে?’
‘পায়ের শেকল আমি এর মধ্যেই খুলে ফেলেছি! তুমি রাজি থাকলে বল তোমারটাও খুলে দিই—আর দরজা? ওটা খুলতে আমার মিনিট দুয়েকের বেশি লাগবে না৷ তুমি কি আসছ?’
‘কিন্তু বাইরের কুকুরগুলো?’
‘বললাম না, বাইফ্লিট যখন কুকুরগুলোকে খাওয়াবে, তখন আমরা পালাবো৷’
‘কিন্তু পালিয়ে যাবটা কোথায়?’
‘নদীর দিকে৷ সেখান থেকে রেললাইন৷ তারপর ভাগ্য ভালো থাকলে, কোন চলতি ট্রেনে উঠে—যাকগে, তুমি রাজি কিনা বল?’ উত্তেজনায় হাঁপাতে লাগলাম৷
‘এই শালার শেকলটা তুমি খুলতে পারবে৷’ বয়েড শেকলটা ধরে আস্তে টান মারল৷
‘হ্যাঁ—’
‘তাহলে আগে এটা খোল!’
তাকে ভর দিয়ে নিঃশব্দে মেঝেয় নামলাম৷ অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে, হাত পড়ল বয়েডের পায়ে—ওর লোমশ পেশীবহুল পা—এই তো শোকলটা! তারের টুকরোটা দিয়ে কাজ শুরু করলাম৷ অন্ধকারে অসুবিধে হলেও, মিনিটখানেকের মধ্যেই তালাটা খুলে ফেললাম৷ শেকলটা খুলে ঠং করে জালের ওপর পড়ল৷
তালাটা খুলে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই, দুটো উত্তপ্ত ঘামে ভেজা বলিষ্ঠ হাত এসে পড়ল আমার গায়ে৷ ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই, সেই থাবা আমার কণ্ঠদেশ স্পর্শ করল৷ পরমুহূর্তেই একটা অসহ্য চাপা অনুভব করলাম গলায়৷ কানে এল বয়েডের চাপা গর্জন, ‘শোন্ শালা, যদি আমাকে বিপদে ফেলার কোন মতলব করে থাকিস, একেবারে খাল খিঁচে নেব!’ অন্ধকারেই চোখে পড়ল ওর সাদা ঝকঝকে দাঁতের সারি৷
দমবন্ধ থাকায় বুকে বাতাস নেবার জন্য খাবি খাচ্ছিলাম৷ হাঁপাতে হাঁপাতে ওর শক্ত হাতের বাঁধন ছাড়াবার চেষ্টা করলাম, ‘ফোট শালা গরিলার বাচ্চা! তুই না-যাবি তো সেকথা বল্—আমি তাহলে একাই যাব৷’
আমার চাপা ক্রুদ্ধ হিসহিসে স্বরে বয়েড একটু থতিয়ে গেল৷ এরকম জবাব ও কারো কাছ থেকেই আশা করেনি৷ ওর হতভম্ব ভাবটার সুযোগে, এক ঝটকায় নিজেকে ছানিয়ে নিলাম৷ ফেরার উপক্রম করতেই, কানে এল, ‘অ্যাই—আমিও যাব!’
‘তাহলে শোন্, বাইরে বেরিয়েই আমরা একসঙ্গে নদীর দিকে ছুটব৷ সেখানে পৌঁছে দুজনে দুদিকে যাব৷ বাইফ্লিট সম্ভবত কুকুরগুলোকে আমাদের পেছনে লেলিয়ে দেবে, কিন্তু কোনরকমে যদি নদীটা পার হতে পারি, তবে কুকুরগুলো আর আমাদের গন্ধ পাবে না—তুই সাঁতার জানিস?’
‘আমি কি জানি না জানি, সেটা তোকে ভাবতে হবে না, শালা৷’ বয়েড খেঁকিয়ে উঠল, ‘তুই শুধু দরজাটা খুলবি, তারপর আমারটা আমি বুঝব৷’
আর কথা না বাড়িয়ে শোবার তাকে উঠে পড়লাম৷ শুয়ে শুয়ে গলায় হাত বোলাতে লাগলাম, আর অপেক্ষায় রইলাম আসন্ন মাহেন্দ্রক্ষণের৷
ভোরের হালকা রুপোলী আলোর আভা, জানলা দিয়ে এসে পড়েছে কয়েদখানার দেওয়ালে৷ আর ঘণ্টাখানেক পরেই দরজার তালায় হাত লাগাব৷
মরিচের পুঁটলিটা তাকের কোনা থেকে বের করে জামার ভিতর গুঁজে নিলাম৷ ভুলেও এর একটি কণা আমি বয়েডকে দিচ্ছি না৷ কুকুরগুলোকে বোকা বানাতে হয়তো এর প্রতিটি কণাই আমার কাজে লাগবে৷ এই মরিচের গুঁড়োর উপরেই নির্ভর করছে আমার মরণ-বাঁচন৷
স্থিরচোখে চেয়ে আছি জানলার দিকে৷ কখন দেখতে পাব সোনালী রোদের আভা৷ কানে আসছে বয়েডের শ্বাস-প্রশ্বাসের গভীর শব্দ৷
হঠাৎ ওর ফিসফিসানি শুনতে পেলাম, ‘দরজাটা কি তুই সত্যিই খুলতে পারবি?’
আমি ঘুরে উপুড় হয়ে শুলাম, ‘কোন ভয় নেই, ঠিক খুলতে পারব৷’
‘তোর কি মনে হয়, আমরা পালাতে পারব?’
‘এই নরকে দিন কাটানো ছাড়া, আমি সব-কিছু করতে রাজি আছি—তাছাড়া একবার চেষ্টা করতে ক্ষতি কি?’
‘হুঁ—’
অনেকক্ষণ চুপচাপ৷ কানে এল হাউন্ডগুলোর হিংস্র গর্জন৷ ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল৷
‘ওই—ওই হাউন্ডগুলো—’ বয়েডের স্বর ভয়ে কাঁপছে৷
‘বাইফ্লিট ওদের খাওয়াতে শুরু করলে, ওরা আর ঝামেলা করবে না৷’
‘সেটা তুই ভাবছিস—কিন্তু যদি—’ বয়েডের গলা দিয়ে স্বর বেরোল না৷ বুঝলাম, ও ভীষণ ভয় পেয়েছে৷ আশ্চর্য! বয়েডের মত বুনো গরিলা পর্যন্ত এই কুকুরগুলোকে ভয় পায়!
সময় যেন আর কাটতেই চায় না৷ এক একটা মিনিট মনে হয় এক এক ঘণ্টার সমান৷ ক্রমে অবসান হল উৎকন্ঠিত প্রতীক্ষার৷ কয়েদখানার ছোট্ট জানলা দিয়ে, ঘরের ভিতরে ঠিকরে পড়ল এক ফালি সোনালী রোদ৷ যতই সময় যেতে লাগল, ততই জোরালো হল সেই রশ্মি-রেখা৷ একসময় বুঝলাম, পালাবার সময় ঘনিয়ে এসেছে৷
মুঠো-করা হাত ঘামে ভিজে উঠেছে৷ উত্তাল হৃৎপিণ্ড আছড়ে পড়ছে বুকের খাঁচায়—ঢিপ—ঢিপ—ঢিপ—ঢিপ৷ আর অপেক্ষা করতে হল না৷ কানে এল কুকুরগুলোর উল্লসিত চিৎকার৷ অর্থাৎ বাইফ্লিট ওর কুড়েঘর ছেড়ে রান্নাঘরে যাচ্ছে৷ না—আর দেরি নয়—!
লাফিয়ে ঘরের মেঝেয় নামলাম, ‘বয়েড, লক্ষ্য রাখিস—যখন দরজা খুলব, তখন যেন কেউ চেঁচামেচি না করে৷’
‘ঠিক আছে, তুই চটপট হাত লাগা,’ বয়েডও তাক থেকে মাটিতে নামল৷
ঘরসুদ্ধ সব কয়েদীই ঘুমে অচেতন৷ যদি কেউ আচমকা জেগে ওঠে, তবে বয়েডই তাকে রুখবে, আমাকে আর ভাবতে হবে না৷
বেড়ালের মতো নিঃসাড়ে দরজার দিকে এগোলাম৷
নাঃ—তালাটা যতটা শক্ত হবে ভেবেছিলাম, ততটা নয়৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজা খুলে গেল৷ ভাগ্য ভালোই বলতে হবে, কারণ কয়েদীরা কেউ জেগে উঠল না৷ বাইরে বাইফ্লিটের ধমকানির শব্দ শুনে বুঝলাম, কুকুরগুলো এখন খেতে ব্যস্ত৷
‘বয়েড—তাড়াতাড়ি—৷’ আস্তে আস্তে দরজা ফাঁক করে,বাইরের ঠান্ডা হাওয়ায় পা রাখলাম৷ ডানদিকে, গজ পঞ্চাশেক দূরে দেখা যাচ্ছে কুকুরের খোঁয়াড়টা৷ বাইফ্লিট আমাদের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে, ঝুড়ি থেকে মাংসের ছাঁট একটা পাত্রে ঢালছে৷ আর কুকুরগুলো খাওয়ার রজন্য পরস্পরকে আঁচড়াচ্ছে, কামড়াচ্ছে,—মাংসের টুকরো নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে৷
আমার পিছন পিছন বয়েড বাইরে এল৷ ভয়ার্ত দৃষ্টিতে দূরে খোঁয়াড়ের দিকে তাকাল৷ ও যে মুহূর্তের জন্যে ভীত হয়ে পড়েছে সেটা বুঝতে পেরেই ওকে এক ধাক্কা মারলাম, ‘বয়েড, চটপট—৷’ সঙ্গে সঙ্গে শুরু করলাম দৌড়৷ জীবনে কখনও এত জোরে দৌড়োইনি৷ লম্বা লম্বা পা ফেলে হাওয়ার বেগে ছুটে চললাম৷
শুনতে পাচ্ছি, পিছন পিছন ধুপধাপ করে ছুটে আসছে বয়েড৷ ওর হাঁপানোর শব্দ পর্যন্ত আমার কানে আসছে৷ ও আমার মতো জোরে দৌড়তে পারে না, যার জন্য অনেক পিছিয়ে পড়েছে৷
চারদিকে ধু-ধু প্রান্তর৷ তার উপর দিয়েই ছুটে চলেছি৷ লক্ষ্য দূরের নদী৷ নিজেকে বড্ড বেশী অসহায় মনে হতে লাগল৷
দূরে অস্পষ্ট নলখাগড়ার ঝোপ ক্রমেই স্পষ্টতর হয়ে চোখে ধরা দিচ্ছে৷ প্রতি মুহূর্তেই নতুন আশায় উদ্দীপিত হয়ে, যথাসম্ভব জোর দৌড়বার চেষ্টা করছি—হঠাৎ—
ভোরের শান্ত পরিবেশের নিস্তব্ধ পর্দা বিদীর্ণ করে ভেসে এল রিভলবারের শব্দ—ফটাস৷
ছুটতে ছুটতেই চকিতে পিছনে তাকালাম৷
বাইফ্লিট খোঁয়াড়ের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছে৷ ওর হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা একটা .৪৫ বোবের রিভলবার৷ ও আবার গুলি করল—ফটস৷
বয়েড এঁকেবেঁকে দৌড়চ্ছিল৷ ওর ঠিক হাত পাঁচেক দূরে, ধুলো উড়িয়ে গুলিটা বেরিয়ে গেল৷ ও আরও জোরে ছুটতে শুরু করল৷
বাইফ্লিটের রিভলবারের তাক যদি আর-একটু ভালো হত, তবে বয়েডকে আর দৌড়তে হত না৷
আরও জোরে ছুটতে শুরু করলাম৷ নলখাগড়ার ঝোপ আর বেশি দূরে নেই—পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে—নলখাগড়ায় ছাওয়া নদীর তীর—আমার বিপদের আশ্রয়স্থল৷
ছুটতে ছুটতে আর-একবার পিছনে তাকালাম৷ বয়েড প্রায় দু-শ গজ পিছিয়ে পড়েছে, কিন্তু উন্মাদের মতো পড়িমরি করে দৌড়ে আসছে—
পরমুহূর্তেই কানে এল সেই বৈদুতিক বাঁশির কানফাটানো শব্দ—বেজেই চলল, আর থামে না৷ অর্থাৎ আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই অশ্বারোহী রক্ষীরা আমাদের পিছনে ধেয়ে আসবে!
হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লাম নলখাগড়ার ঝোপের মধ্যে৷ তাড়াতাড়ি ঝোপ ভেদ করে নদীর কিনারায় পৌঁছে, বাঁদিকে এগিয়ে চললাম৷ পাড় ধরে এক-শ গজ মতো গিয়ে আমার ঢুকে পড়লাম দুর্ভেদ্য নলখাগড়া-ঝোপে৷ লুকিয়ে পড়লাম৷
কয়েক সেকেন্ড বাদে বয়েড ঝোপ ভেদ করে নদীর পাড়ে এসে দাঁড়াল৷ আমার থেকে প্রায় বিশ গজ দূরে৷ এদিকে-ওদিক চাইতে লাগল, সম্ভবত আমাকে খুঁজছে৷ কিন্তু নলখাগড়ার ঝোপ এত ঘন, ওর পক্ষে আমাকে দেখা সম্ভব হল না৷
হাঁপাতে হাঁপাতে চাপা স্বরে ও ডাকল, ‘অ্যাই! অ্যাই কারসন,—তুই কোথায়?’
পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে পড়ে রইলাম৷ বয়েড আমার সঙ্গে আসুক তা আমি মোটেই চাই না৷ কারণ, প্রহরীরা যখন বয়েডের পিছু নেবে, তখন আমি পালাবার সুযোগ পাব৷ আর ওরা যদি আমাকে দেখতেই পায়, তবে বয়েড থাকলেই বা কী, আর না থাকলেই বা কী৷
বয়েড নদীতে নামতে শুরু করল৷ দু-একবার থেমে পিছনে তাকাল৷ তারপর জলে পা দিল—বলিষ্ঠ হাতে জল কেটে, সাঁতরে এগিয়ে চলল ওপারে৷
এবার মরিচের পুঁটলিটা বের করে, প্যান্টের গোড়ালির ভাঁজগুলো ওই গুঁড়ো দিয়ে ভর্তি করলাম৷ যাতে ছোটবার সময় মরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে পড়ে আর পায়ের গন্ধ ঢেকে দেয়৷
ঝোপ ছেড়ে বেরিয়ে দ্রুত পায়ে নদীর পাড় ধরে এগিয়ে চললাম৷ বেশ কিছুটা যাবার পর নিঃসন্দেহ হলাম, বয়েড আমার পায়ের শব্দ আর শুনতে পাবে না৷ তখন আবার ছুটতে শুরু করলাম৷
মুহূর্ত পরেই কানে এল ঘোড়ার ঘুরের শব্দ৷ ঝড়ের বেগে নদীর দিকে ছুটে আসছে প্রহরীরা৷ এখুনি লুকোতে হবে৷ চারদিকে চোখ বুলিয়ে লুকোবার একটা ভালো জায়গা খুঁজতে লাগলাম—ওই তো!—
তড়িৎগতিতে এগিয়ে চললাম নলখাগড়া-ঝোপের দিকে৷ ঝোপের যে-জায়গাটা সবচেয়ে বেশি ঘন সেদিকে ছুটলাম৷ বুকপেছলা দিয়ে আশ্রয় নিলাম ঝোপের অনেকটা ভিতরে, উপুড় হয়ে পড়ে রইলাম৷ বুকের ভিতর কেউ যেন হাতুড়ি পিটছে—ঘামে ভিজে উঠেছে সর্বাঙ্গ৷ অপেক্ষা করতে লাগলাম প্রহরীদের—ওরা কি খুঁজে পাবে আমাকে?
একটু পরেই শুনতে পেলাম খস-খস শব্দ৷ অশ্বরোহী রক্ষীরা দুদ্দাড় করে, ঝোপ ভেদ করে নদীর পাড়ে আসছে৷ শব্দ শুনে বুঝলাম, আমি যেখানে লুকিয়ে আছি, সেখান থেকে দূরে ওর নেই৷ রুদ্ধশ্বাসে প্রতীক্ষায় রইলাম৷ ওরা কি এদিকেই এগিয়ে আসছে৷
হঠাৎ এক প্রচণ্ড উল্লসিত চিৎকারে চমকে উঠলাম৷ পরক্ষণেই কানে এল জলে কারুর ঝাঁপিয়ে পড়ার শব্দ৷ হয়ত কোন প্রহরীর ঘোড়া নিয়ে নদী পার হয়ে ওপারে যাচ্ছে৷
‘ওই তো—ওই তো শালাকে দেখা যাচ্ছে—৷’ গলা ফাটিয়ে একজন চিৎকার করে উঠল৷—ফটাস—নিঃসন্দেহে রাইফেলের শব্দ৷
আর-একটা ঘোড়া নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ কানে ভেসে এল একাধিক গুলির শব্দ৷—উৎকণ্ঠায়-আতঙ্কে মাথা গুঁজে পড়ে রইলাম৷
ওরা কি তাহলে বয়েডকে দেখতে পেয়েছে?
অদম্য কৌতূহলে মাথা তুললাম৷ বয়েড কি শেষে ধরাই পড়ল? নলখাগড়াঝোপের গোড়ার দিকের আগাছা আর সরিয়ে উঁকি মারলাম৷ দেখি, একজন অশ্বারোহী প্রহরী ঘোড়া নিয়ে সাঁতরে ওপারে যাচ্ছে—হাতে তার স্বয়ংক্রিয় রাইফেল৷
ওপারে পৌঁছে সে পাড় বেয়ে উপরে উঠতে লাগল৷ সঙ্গে সঙ্গে কানে এল একটা কানফাটানো শব্দ—আগের চেয়ে অনেক কাছে৷ প্রহরীরা কি আমার দিকেই আসছে? হঠাৎ দেখি, বয়েড ওর লুকোনোর জায়গা ছেড়ে এক লাফে নদীতে এসে পড়ল৷ উন্মাদের মতো সাঁতরে—আমি যেখানে লুকিয়ে ছিলাম, সেদিক লক্ষ্য করে এগিয়ে আসতে লাগল৷ দুরু-দুরু বুকে, চোখ গোল-গোল করে চেয়ে রইলাম৷ বয়েড যদি এপারে এসে ওঠে, তাহলে আবার আমাকে নিয়ে টানাটানি শুরু হবে৷
কিন্তু লক্ষ্য করলাম, ওপারের রক্ষীটি তার ঘোড়া থেকে নেমে পড়েছে৷ হাঁটু গেড়ে বসে, রাইফেল বাগিয়ে তাক করছে বয়েডকে লক্ষ্য করে৷ সাঁতরাতে থাকলেও, বয়েড বোধহয় আন্দাজ করেছিল এই আসন্ন বিপদের কথা৷ কারণ হঠাৎ-ই জলের মধ্যে ডুব দিল৷ সঙ্গে সঙ্গে রাইফেলের গর্জন—গুলির আঘাতে খানিকটা জল ছলকে উঠল শূন্যে৷
আর-একজন প্রহরী নলখাগড়া-ঝোপ ভেদ করে এপারে এসে দাঁড়াল৷ তাকে দেখেই প্রথম জন চিৎকার করে উঠল, ‘ব্যাটা সাঁতরে ওপারে ফিরে যাচ্ছে৷ শীগগিরই জলে নেমে শালাকে তাড়া কর! আমি এখান থেকে ব্যাটাকে লক্ষ্য রাখছি—৷’ ততক্ষণে নিশ্চিত হলাম, মাত্র-দুজন প্রহরীই আমাদের ধরতে এসেছে, তার বেশি নয়৷
এপাশের প্রহরীটি দেরি না করে ঘোড়া নিয়ে জলে নেমে পড়ল৷ ঘোড়াটা সাঁতরে বেশ কিছুটা এগিয়েছে, এমন সময় বয়েড ভেসে উঠল৷ প্রহরীটি বয়েডকে দেখতে পেয়েই ঘোড়াটাকে সেদিকে এগিয়ে নিয়ে চলল৷ মুহূর্তমধ্যে বয়েড আবার ডুব দিল৷ বেশ বুঝলাম, এভাবে ও আর বেশিক্ষণ যুঝতে পারবে না৷
বয়েড বোধহয় বুঝতে পেরেছিল, এভাবে সাঁতরে ও নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছতে পারবে না৷ তার আগেই প্রহরীটি ওকে ধরে ফেলবে৷ সেইজন্যই ও ডুবসাঁতার দিয়ে প্রহরীটির দিকে এগিয়ে আসছিল৷ কারণ, একটু পরেই দেখলাম, ও লোকটার ঠিক পিছনে ভেসে উঠেছে৷—সাবাস! মনে মনে বয়েডের বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারলাম না৷
প্রহরীটি বয়েডকে দেখতে পায়নি, কিন্তু ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা ওকে দেখতে পেয়েই বিকট চিৎকার করে উঠল, ‘ওই যে, তোর পেছনে—৷’ বয়েড অশ্বারোহী রক্ষীর এত কাছে ভেসে উঠেছে, যে ওপার থেকে সে গুলিও করতে পারছে না, পাছে নিজের লোকের গায়ে লেগে যায়৷
জলের অশ্বারোহী রক্ষীটি বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে রাইফেলের বাঁট সজোরে নামিয়ে আনল বয়েডের মাথায়৷ কিন্তু বয়েড অসামান্য ক্ষিপ্রতায় মাথা সরিয়ে নিয়ে, লোকটার কব্জি করে এক হ্যাঁচকায় জলে নামিয়ে আনল৷ জল তোলপাড় করে শুরু হল ধবস্তাধবস্তি—৷
কিন্তু বয়েডের পশু-শক্তির কাছে লোকটা অসহায় হয়ে পড়ল৷ যেন কোন বেড়াল ইঁদুর নিয়ে খেলা করছে৷ ওরা দুজনেই জলে তলিয়ে গেল৷ ভীষণ ভাবে জল তোলপাড় শুরু হল৷ বয়েড কি লোকটাকে ডুবিয়েই মারবে?
একটু পরে বয়েড একা ভেসে উঠল৷ তাড়াতাড়ি গিয়ে সাঁতরে-যাওয়া ঘোড়াটাকে ধরে, এমনভাবে তার আড়ালে ভেসে এগিয়ে চলল, যাতে ওপারের প্রহরীটি গুলি করতে না পারে৷ মাঝে মাঝে, তাড়াতাড়ি সাঁতরাবার জন্যে ঘোড়াটাকে খোঁচা মারতে লাগল৷
লোকটা বয়েডের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ল৷ কিন্তু পরমুহূর্তেই একলাফে ঘোড়ায় চাপল৷ তীরের বেগে ঘোড়াসুদ্ধ নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে বয়েডকে অনুসরণ করল৷
ওদিকে বয়েড তখন ওর ঘোড়াটাকে নিয়ে ভীষণ অসুবিধায় পড়েছে৷ বারবার ধাক্কা মেরে ওটাকে প্রহরীর দিকে ফিরিয়ে নিজেকে আড়াল করছে৷
আমি যেখানে লুকিয়ে ছিলাম, ঠিক তার সামনে দিয়ে বয়েড ভেসে এগিয়ে চলল৷ ওর বীভৎস মুখ আতঙ্কে পাণ্ডুর—চোখ দুটো যেন ঠেলে বেরিয়ে আসবে৷ ভিজে চুল থেকে জলের ফোঁটা টপটপ করে মুখের উপর গড়িয়ে পড়েছে৷ মাঝে মাঝে খিস্তি দিয়ে ঘোড়াটাকে তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাবার জন্য ধাক্কা মারছে৷
ওদিকে অনুসরণরত রক্ষীটি বয়েডের দিকে বেশ তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলেও ঘোড়াটার আড়াল থাকার জন্য গুলি করতে পারছে না৷ তাই চেষ্টা করছে পাশে সরে যেতে৷ যদি সেখান থেকে বয়েডকে গুলি করা যায়৷
হঠাৎ ঘোড়া ছেড়ে জলের মধ্যে ডুব দিল বয়েড৷ কী ব্যাপার? আগের প্রহরীর মতো এটাকেও শেষ করবে নাকি?
ও ডুব দেওয়ামাত্রই অনুসরণরত অশ্বারোহী প্রহরীটি সতর্ক হয়ে হাতে রাইফেল তুলে নিল৷ চারদিকে নজর রাখতে লাগল—কোথায় বয়েড ভেসে ওঠে৷
বয়েড ডুব-সাঁতারে প্রহরীর দূরত্বটা ঠিক আন্দাজ করতে পারেনি৷ ভুলক্রমে ও লোকটার ঠিক পাশেই ভেসে উঠল৷ মাথা ঝাঁকিয়ে জল ঝেড়ে, বিদ্যুৎগতিতে তাকে ধরতে গেল৷ কিন্তু আগের ব্যাপারটার পর লোকটা খুবই সতর্ক ছিল৷ উদ্যত রাইফেলের বাঁট দিয়ে সজোরে আঘাত করল বয়েডের মাথায়৷ বয়েড মাথা সরিয়েও সে আঘাত এড়াতে পারল না৷ সোজা তলিয়ে গেল৷ ক্রমে সেখানকার জল ফিকে লাল—লাল—গাঢ় লাল হয়ে উঠল৷
লোকটা ঘোড়া নিয়ে চটপট এপারে এসে উঠল৷ অনুসন্ধানী দৃষ্টি মেলে বয়েডের ভেসে ওঠার অপেক্ষা করতে লাগল৷
খানিকক্ষণ পরেই বয়েডকে দেখা গেল৷ ওর দেহটা উপুড় হয়ে ভাসছে—এগিয়ে চলেছে স্রোতের টানে৷ ভাসতে ভাসতে কিছুদূর গিয়ে দেহটা নদীর পাড়ে ঠেকে রইল৷
ওদিকে অন্য প্রহরীর মৃতদেহটাও ওপারে ভেসে উঠেছে৷
অপেক্ষামাণ রক্ষীটি চোখ বুলিয়ে মৃতদেহ দুটো দেখল৷ তারপর চুকচুক শব্দ করে নদীতে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়াটাকে ডাকল৷ ঘোড়াটা উঠে আসতেই সে গিয়ে তার লাগাম চেপে ধরল—দুটো ঘোড়াই ছুটিয়ে দিল৷
নলখাগড়ার ঝোপ ভেদ করে, ঝড়ের বেগে ওরা ছুটে চলল৷ ছুটে চলল ফার্নওয়ার্থের দিকে৷
ঘোড়ার খুরের শব্দ মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম৷ তারপর অতি সন্তর্পণে লুকনো জায়গা ছেড়ে বাইরে এলাম৷ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নদী পার হয়ে পালাতে হবে৷ কারণ এই মৃতদেহ দুটোর ব্যবস্থা করেই ওরা সদলবলে আমার পিছু নেবে৷ নিঃসন্দেহে সঙ্গে থাকবে ওই কালান্তক হাউন্ডগুলো৷
তা ছাড়া, বেতারে ছড়িয়ে পড়বে আমার পালানোর কথা৷ জেলার প্রতিটি পুলিশ আমাকে খুঁজে বেড়াবে৷ রাষ্ট্রের প্রতিটি পুলিসফাঁড়িকে আমার চেহারার বিবরণ জানিয়ে সতর্ক করে দেওয়া হবে—নাঃ, দেরি করা চলবে না, যেমন করেই হোক একটা নিরাপদ আশ্রয়ের পৌঁছতে হবে৷
প্যান্টের ভাঁজে ছাড়া যে অবশিষ্ঠ মরিচটুকু পুঁটলিতে ছিল, সেটাকে ভালো করে বাঁধলাম৷ এর মধ্যে সূর্য মাথার উপর চলে এসেছে৷ রোদের অসহ্য উত্তাপ এমনই অনুভব করতে পারছি৷ আর দেরি না করে ছুটলাম৷ প্যান্টের ভাঁজ থেকে মরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে পড়তে লাগল৷ যাক, কুকুরগুলোর জন্য আর চিন্তা নেই৷ অক্লান্তভাবে ছুটে চললাম৷
নদীর পাড় ধরে মাইল দুয়েক দৌড়বার পর ঠিক করলাম, এবার নদী পার হতে হবে৷ এখান থেকে রেললাইন প্রায় ষোল মাইল দূরে৷
হাঁপাতে হাঁপাতে প্যান্ট খুলে, তার মধ্যে মরিচের পুঁটলিটা রেখে, ভালো করে ভাঁজ করলাম৷
অন্তর্বাস পরেই পায়ে পায়ে এগোলাম নদীর দিকে৷ ভাঁজ-করা প্যান্টটা মাথার উপর রেখে, কোমরের বেল্ট দিয়ে শক্ত করে বাঁধলাম৷ মরিচটুকু ভিজলে চলবে না৷ কারণ এখনও এর প্রয়োজন আছে৷
গা ভাসিয়ে দিলাম নদীর শীতল জলে—সর্ব শক্তি দিয়ে সাঁতরে চললাম—নদী পার হয়ে পালাতে হবে৷—তবে জানি না, সফল হব কিনা!
