দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
১
‘পিকনিক, মঁসিয়ে পোয়ারো?’
এমিলি ব্রুস্টার এমনভাবে পোয়ারোর দিকে তাকালেন যেন পোয়ারো তাঁর সুস্থতার সীমারেখা পার হয়ে গেছেন৷
মুগ্ধ একাগ্র স্বরে বললেন পোয়ারো, ‘আপনার কাছে ব্যাপারটা অত্যন্ত খারাপ লাগছে, তাই না? কিন্তু আমার ধারণা, এই মুহূর্তে এর চেয়ে সুন্দর প্রস্তাব সত্যিই আর নেই৷ বর্তমান পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করে তুলতে গেলে আমাদের প্রয়োজন স্বাভাবিক, নিত্যনৈমিত্তিক আচরণের৷ ডার্টমুর অঞ্চলে বেড়াতে যাবার জন্য আমি বিশেষ উদগ্রীব, তাছাড়া আবহাওয়া এখন চমৎকার৷ এতে—ঠিক কিভাবে বলবো?—এতে সকলেই অত্যন্ত খুশি হবে৷—সুতরাং, এব্যাপারে আমাকে সাহায্য করুন, মাদমোয়াজেল৷ প্রত্যেককে এ পিকনিকে রাজি করান৷’
অপ্রত্যাশিত সাফল্যের সঙ্গে প্রস্তাব গৃহীত হলো৷ প্রথম প্রথম প্রত্যেকেই একটু ইতস্তত করলেন, তারপর অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্বীকার করলেন, প্রস্তাবটা নেহাত মন্দ নয়৷
ক্যাপ্টেন মার্শালকে অনুরোধ করার কথা উত্থাপিত হয়নি৷ তিনি নিজেই বলেছেন সেইদিন তাঁকে প্লিমাউথ যেতে হবে৷ মিঃ ব্ল্যাট পিকনিকের প্রস্তাবে রাজি হলেন অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে৷ অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হয়ে উঠতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন৷ তিনি ছাড়া আরও ছিলেন এমিলি ব্রুস্টার, রেডফার্নরা স্টিফেন লেন, গার্ডেনাররা, যাঁদের আরও একদিন থেকে যেতে রাজি করানো হয়েছে, রোজামণ্ড ডার্নলি ও লিন্ডা৷
পোয়ারো তাঁর কথার মায়াজালে আচ্ছন্ন করেছেন রোজমণ্ডকে এবং বারংবার এই কথাটাই ওকে বুঝিয়েছেন যে এই পিকনিক লিন্ডাকে ওর বর্তমান মানসিক অবস্থা থেকে অন্তত সাময়িকভাবে হলেও মুক্তি দেবে৷ রোজমণ্ড তাঁকে সমর্থন জানালো৷ ও বললো, ‘আপনার কথাই ঠিক৷ ওই বয়েসের একটা বাচ্চার কাছে এই মানসিক আঘাত ভীষণ ক্ষতিকর৷ এতে ওর মনের বাঁধুনি অনেক দুর্বল হয়ে গেছে৷’
‘সেটা নিছকই স্বাভাবিক, মাদমোয়াজেল৷ কিন্তু ওই বয়সে মানুষ সহজে সবকিছু ভুলে যেতে পারে৷ ওকে আসতে রাজী করান৷ আপনি পারবেন, আমি জানি৷’
মেজর ব্যারী দৃঢ়তার সঙ্গে এ প্রস্তাবে অসম্মতি জানিয়েছেন৷ তিনি বলেছেন, পিকনিক তিনি পছন্দ করেন না৷ ‘একগাদা বাক্স বয়ে নিয়ে যাওয়া,’ তিনি বলেছেন, ‘আর অসুবিধের তো অন্ত নেই! টেবিলে সে খাওয়াটাই আমার বেশি পছন্দ৷’
সকাল দশটায় সকলে জমায়েত হলেন৷ তিনটে গাড়ির ব্যবস্থা করা ছিলো৷ মিঃ ব্ল্যাট সরব এবং উৎফুল্ল কণ্ঠে জনৈক ট্যুরিস্ট গাইডের অনুকরণ করছেন।
‘এইদিকে আসুন, ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ—ডার্টমুরে যাবার পথ এইদিকে৷ এখানে রয়েছে বুনো ঝোপ ও জাম গাছের ছায়া, রয়েছে, ডেভনশায়ারের বৈশিষ্ট্য ও অভিযুক্ত অপরাধীদের সমাবেশ৷ আপনাদের স্ত্রীদের সঙ্গে নিয়ে আসুন, ভদ্রমহোদয়গণ, অথবা সঙ্গে নিন, সুন্দরী সঙ্গিনীদের৷ প্রত্যেককে স্বাগত জানাই৷ জানাই স্বর্গীয় প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখানোর প্রতিশ্রুতি৷ তাড়াতাড়ি চলুন৷ তাড়াতাড়ি চলুন৷’
শেষ মুহূর্তে চিন্তার ছায়া চোখে নিয়ে নিচে নেমে এলো রোজমণ্ড ডার্নলি৷ ও বললো, ‘লিন্ডা আসবে না৷ ও বলছে ওর নাকি ভীষণ মাথা ধরেছে৷’
পোয়ারো বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘কিন্তু এলে ওর পক্ষে ভালো হতো৷ ওকে রাজি করান, মাদমোয়াজেল৷’
রোজামণ্ড দৃঢ় কণ্ঠে বললো, কোন লাভ নেই৷ ও একেবারে মনস্থির করে ফেলেছে৷ আমি কয়েকটা অ্যাসপিরিনি দিয়েছি, সেগুলো খেয়ে ও শুয়ে পড়েছে৷’
রোজমণ্ড একটু ইতস্তত করলো, তারপর বললো, ‘মনে হয়, আমার যাওয়াটা হয়তো ঠিক হবে না৷’
সেটি হচ্ছে না, দেবী সেটি হচ্ছে না৷’ ইয়ার্কির ছলে ওর হাত চেপে ধরে চেঁচিয়ে উঠলেন মিঃ ব্ল্যাট, ‘আনুষ্ঠানকে মধুর করে তুলতে আপনার উপস্থিতি একান্ত প্রয়োজন৷ উহুঁ, কোন আপত্তি শুনছি না৷ আপনাকে আমি বন্দী করলাম, হা, হা৷ ডার্টমুরের কারাগারে আপনাকে নির্বাসন দেওয়া হবে৷’
অচ্ছেদ্য বন্ধনে ওকে সঙ্গী করে প্রথম গাড়িটার দিকে এগিয়ে গেলেন ব্ল্যাট৷ যেতে যেতে পোয়ারোর দিকে একটা ক্রুদ্ধ দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে গেলো রোজামণ্ড৷
‘আমি লিন্ডার কাছে থাকছি৷’ বলল, ক্রিস্টিন রেডফার্ন, ‘আমার কোন আপত্তি নেই৷’
প্যাট্রিক বলল, ‘কি হচ্ছে, ক্রিস্টিন—চলো৷’
এবং পোয়ারো বললেন, ‘না, না, আপনি আসবেন বৈকি, মাদাম৷ মাথা ধরলে কারও পক্ষে একা থাকাটাই ভালো৷ চলুন, রওনা হওয়া যাক৷’
তিনটে গাড়ি চলতে শুরু করলো৷
ওঁরা প্রথমে গেলেন শীপস্টরের আসল পিক্সির গুহায়, তার প্রবেশপথ অনুসন্ধান করে যথেষ্ট আনন্দ পেলেন, অবশেষে, একটা ছবি-পোস্টকার্ডের সাহায্য পথটা খুঁজে পেলেন৷
বড় বড় পাথরে পা ফেলে চলার পথটা ছিলো অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং এরকুল পোয়ারো সে চেষ্টা করলেন না৷ তিনি অসংযত চোখে অনুসরণ করে চললেন পাথর থেকে পাথরে হালকাভাবে লাফিয়ে যাওয়া ক্রিস্টিন রেডফার্নকে এবং লক্ষ্য করলেন, ওর স্বামী কোন সময়েই ওর থেকে খুব একটা পিছিয়ে নেই৷ রোজামণ্ড ডার্নলি ও এমিলি ব্রুস্টার অনুসন্ধানের কাজে যোগ দিয়েছিলেন, অবশ্য শেষোক্ত জন একবার পা ফস্কেছেন এবং ফলস্বরূপ নিজের গোড়ালিতে সামান্য মোচড় দিয়েছেন৷ স্টিফেন লেন ছিলেন অক্লান্ত অভিযাত্রী, তাঁর দীর্ঘকায় কৃশ শরীর সুবিশাল পাথরের সমাবেশ সর্বদাই ছিলেন কর্মব্যস্ত৷ মিঃ ব্ল্যাট কিছুটা পথ এগিয়ে ক্ষান্ত হলেন এবং সরবে উৎসাহবাণী জানিয়ে চললেন; কিন্তু সেই সঙ্গে অনুসন্ধানকারীদের ছবি তুলতে ভুললেন না৷
গার্ডেনাররা এবং পোয়ারো পথের একপাশে স্থিরভাবে বসে রইলেন, এবং মিসেস গার্ডেনারে মসৃণ কণ্ঠস্বর সরব হলো সুষম লয়ের ভাষণে, যে ভাষণে—তাঁর স্বামীর অনুগত ‘হ্যাঁ, সোনা’ দিয়ে থেকে থেকে যতিচিহ্নিত৷
‘আর সব সময় আমার যা মনে হয়েছে, মঁসিয়ে পোয়ারো, এবং মিঃ গার্ডেনারও আমার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত, তা হলো, আচমকা তোলা ছবি, ভীষণ অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়৷ অবশ্য, যদি না সেগুলো কেবল বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে তোলা হয়৷ ওই মিঃ ব্ল্যাটের সত্যিই কোন কাণ্ডজ্ঞান নেই৷ তিনি প্রত্যেকের সামনে গিয়ে হঠাৎ করে হাজির হন, একনাগাড়ে কথা বলতে থাকেন আর ছবি তুলতে শুরু করেন—এ অত্যন্ত অশিক্ষিত আচরণ, মিঃ গার্ডেনারকেও আমি সেই কথাই বলেছি৷ কি, বলিনি, ওডেল?’
‘হ্যাঁ, সোনা৷’
‘সেদিন সমুদ্রতীরে তিনি আমাদের সকলের বসা অবস্থায় একটা ছবি তুলেছেন৷ তা, তুলেছেন ভালোই করেছেন, কিন্ত প্রথমে তাঁর জিগ্যেস করা উচিত ছিলো৷ কারণ, ঠিক তখনই মিস ব্রস্টার হোটেলে ফিরে যাবেন বলে উঠে দাঁড়াচ্ছিলেন, সুতরাং তাঁর সেই অবস্থায় তোলা ছবি যে অত্যন্ত কিম্ভূতকিমাকার হবে তাতে আর আশ্চর্য কি!’
‘কথাটা মিথ্যে নয়৷’ আকর্ণ হেসে বললেন মিঃ গার্ডেনার৷
‘আর মিঃ ব্ল্যাট কোনরকম জিজ্ঞাসাবাদ না করেই সেই ছবির একটা করে কপি সকলকে দিয়ে বেড়াচ্ছেন৷ আপনাকেও একটা দিয়েছেন মঁসিয়ে পোয়ারো, আমি দেখেছি৷’
পোয়ারো মাথা নেড়ে সমর্থন জানালেন৷ তিনি বললেন, ‘ওই ছবির মূল্য আমার কাছে অনেক৷’
মিসেস গার্ডেনার বলে চললেন, ‘আর তাঁর আজকের ব্যবহার দেখুন—মামুলি হৈ-হুল্লোড়ে সর্বক্ষণ মেতে আছেন৷ দেখেশুনে আমার তো কাঁপুনি দিচ্ছে৷ এই লোকটাকে বাড়িতে রেখে আসার ব্যবস্থাই আপনার করা উচিত ছিলো, মঁসিয়ে পোয়ারো৷’
এরকুল পোয়ারো অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘হায়, মাদাম, সেটা অত্যন্ত কঠিন কাজ হতো৷’
‘কঠিন বলে কঠিন৷ ওই লোকটা সর্বক্ষেত্রে গুঁতোগুঁতি করে হলেও নিজের জায়গা করে নেয়৷ ভদ্রলোকের কাণ্ডজ্ঞান বলে কোন পদার্থ নেই৷’
সেই মুহূর্তে নিচে থেকে ভেসে আসা সমবেত উল্লাস-চিৎকার জানিয়ে দিলো পিক্সি গুহার প্রবেশপথ আবিষ্কৃত হয়েছে৷
এরকুল পোয়ারোর পরিচালনায় পিকনিক দল এবার উপস্থিত হলো এমন একটা জায়গায় যেখানে গাড়ি রেখে পাহাড়ি ঝোপের পাশ দিয়ে সামান্য এগোলেই চোখে পড়ে একটা ছোট নদীর তীরে মনোরম এক সবুজ প্রান্তর৷
নদী পার হওয়ার সেতু একটা সরু কাঠের তক্তা এবং পোয়ারো ও মিঃ গার্ডেনার মিসেস গার্ডেনারকে সেতু পার হতে রাজী করালেন৷ নদীর পরেই গুল্মঝোপে ঘেরা চোখজুড়ানো একটা ছোট্ট সবুজ জায়গা, সেখানে আগাছার চিহ্নমাত্র নেই এবং পিকনিকের পক্ষে আদর্শ স্থান৷
সরু সেতু অতিক্রম করার সময় তাঁর বিচিত্র অনুভূতি সম্পর্কে উচ্চ স্বরে ভাষণ দিতে দিতে মিসেস গার্ডেনার গুছিয়ে বসলেন৷ হঠাৎ শোনা গেলো সামান্য কোলাহল৷
অন্যান্যরা খুব সহজেই দৌড়ে পার হয়েছে কাঠের সেতুটা, কিন্তু এমিলি ব্রুস্টার সেই সরু তক্তার ঠিক মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে রয়েছেন, তাঁর দু চোখ বোজা, শরীরটা অনিশ্চিতভাবে এপাশ-ওপাশ দুলছে৷
পোয়ারো এবং প্যাট্রিক রেডফার্ন ব্যস্তভাবে ছুটে গেলেন তাঁকে উদ্ধার করতে৷
এমিলি ব্রুস্টার লজ্জিত কণ্ঠে সংক্ষিপ্তভাবে উত্তর দিলেন, ‘ধন্যবাদ ধন্যবাদ৷ দুঃখিত৷ খরস্রোতা নদী পার হওয়ার ব্যাপারে কোনদিনই তেমন পটু ছিলাম না৷ কেমন যেন মাথা ঝিমঝিম করে৷ নেহাৎই বোকার মতো৷’
খাবার ভাগ করে দেওয়া হলো এবং পিকনিক শুরু হলো৷
উপস্থিত প্রত্যেকেই এই ছোট্ট অনুষ্ঠানটুকু কত ভালো লাগছে ভেবে ভেতরে ভেতরে অবাক হলেন৷ এর কারণ, সম্ভবত, এই অনুষ্ঠান সন্দেহ ও ত্রাসে ঘেরা এক পরিবেশ থেকে তাঁদের সাময়িক মুক্তি দিয়েছে৷ এখানে চঞ্চল জলের স্বনন, জলজ উদ্ভিদের নেশা ধরানো হালকা গন্ধ এবং গুল্প পর্ণের উষ্ণ রঙিন ছটা, হত্যা পুলিশি তদন্ত ও সন্দেহভরা পৃথিবীকে নিঃশেষে মুছে দিয়েছে, যেন কোনদিনই সে পৃথিবীর অস্তিত্ব ছিলো না৷ এমন কি মিঃ ব্ল্যাট পর্যন্ত অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হয়ে উঠতে ভুলে গেলেন৷ খাওয়া-দাওয়ার পর কাছাকাছি একটা শোবার জায়গা বেছে নিলেন তিনি এবং তাঁর সুখের অচেতন অবস্থায় সাক্ষ্য দিয়ে চললো চাপা নাক ডাকার শব্দ৷
অবশেষে জিনিসপত্রর গোছগাছ করে প্রত্যেকেই পোয়ারোকে তাঁর সুন্দর পরিকল্পনার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন৷
সরু আঁকাবাঁকা গলিপথ ধরে যখন তাঁরা ফিরে আসছেন তখন সূর্য অস্ত যেতে বসেছে৷ লেদারকোম্ব উপসাগর সংলগ্ন পাহাড়ের চূড়া থেকে দূরে দ্বীপের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা হোটেলবাড়িটাকে তাঁরা ক্ষণেকের জন্য দেখতে পেলেন৷
অস্তায়মান সূর্যের আলোয় বাড়িটাকে শান্ত নিষ্পাপ বলে মনে হলো৷
মিসেস গার্ডেনার এই প্রথম বাকসংযমের পরিচয় দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আপনাকে সত্যিই ধন্যবাদ জানাই, মঁসিয়ে পোয়ারো৷ আমার নিজেকে ভীষণ শান্ত লাগছে৷ আজকের দিনটা একটা কথায় কাটলো চমৎকার৷’
২
হোটেল পৌঁছলে মেজর ব্যারী তাঁদের সম্বর্ধনা জানাতে বেরিয়ে এলেন৷
‘এই যে!’ তিনি বললেন, ‘দিনটা ভালো কাটলো তো?’
মিসেস গার্ডেনার বললেন, ‘নিশ্চয়ই৷ খোলা সবুজ মাঠগুলোর তুলনা হয় না৷ একেবারে খাস ইংরেজি আর সাবেকী৷ সেখানকার সতেজ বাতাসে শুধু তৃপ্তির ছোঁয়া৷ আলসেমি করে না যাওয়ার জন্যে আপনার লজ্জা হওয়া উচিত৷’
মেজর চাপা হাসি হাসলেন৷
‘জলার মেঝে বসে স্যান্ডউইচ খাওয়া—ও সবের বয়েস কি আর আছে৷’
একজন পরিচারিকা তখন হোটেল থেকে বেরিয়ে এসেছে৷ তার শ্বাসপ্রশ্বাস ছন্দহীন, গভীর৷ এক মুহূর্ত ইতস্তত করে সে ক্ষিপ্র পায়ে এসে উপস্থিত হলো ক্রিস্টিন রেডফার্নের সামনে৷
এরকুল পোয়ারো তাকে গ্ল্যাডিস ন্যারাকট বলে চিনতে পারলেন৷ ওর এলোমেলো দ্রুত কণ্ঠস্বর কানে এলো৷ ‘মাপ করবেন, মাদাম, ছোট দিদিমণির জন্যে আমার ভীষণ দুশ্চিন্তা হচ্ছে৷ মিস মার্শালের জন্যে৷ এইমাত্র তাঁর ঘরে চা নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু তাঁকে জাগাতে পারলাম না, আর তাঁকে এত—এত অদ্ভুত দেখাচ্ছে…’
ক্রিস্টিন দিশেহারা হয়ে চারপাশে তাকালো৷ মুহূর্তের মধ্যে পোয়ারো ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন৷ ওর কনুই ধরে শান্ত স্বরে তিনি বললেন, ‘চলুন, গিয়ে দেখা যাক৷’
চঞ্চল পায়ে সিঁড়ি ভেঙে বারান্দা পেরিয়ে ওঁরা দুজনে লিন্ডার ঘরে উপস্থিত হলেন৷
লিন্ডার দিকে এক পলক তাকিয়েই ওঁরা স্পষ্ট বুঝতে পারলেন কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে৷ ওর মুখের রঙ কেমন অদ্ভুত ধরনের আর শ্বাস-প্রশ্বাসের লক্ষণ চোখে পড়ছে না বললেই চলে৷
পোয়ারো ওর নাড়ি দেখলেন৷ একই সঙ্গে তাঁর নজরে পড়লো বিছানার পাশে টেবিল-ল্যাম্পের নিচে চাপা দেওয়া একটা খাম৷ খামটা তাঁর নামেই৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল ত্রস্ত পায়ে ঘরে এসে ঢুকলেন৷ তিনি বললেন, লিন্ডার নামে এসব কি শুনছি? কি হয়েছে ওর?’
শঙ্কা মেশানো এক টুকরো চাপা কান্না বেরিয়ে এলো ক্রিস্টিন রেডফার্নের মুখ দিয়ে৷
এরকুল পোয়ারো বিছানার কাছ থেকে ঘুরে দাঁড়ালেন৷ মার্শালকে বললেন, ‘একজন ডাক্তার ডেকে নিয়ে আসুন—যত শীগগির পারেন৷ কিন্তু আমার আশঙ্কা হচ্ছে—ভীষণ আশঙ্কা হচ্ছে—আমাদের হয়তো অনেক দেরি হয়ে গেছে৷’
নিজের নাম লেখা খামটা তুলে নিলেন, তিনি, খামের মুখ ছিঁড়ে চিঠিটা বের করলেন৷ তাতে রয়েছে লিন্ডার ছিমছাম কিশোরী হাতে লেখা কয়েকটি লাইন৷
আমার মনের হয় এটাই মুক্তির সবচেয়ে সহজ পথ৷ বাবাকে বলবেন তাঁর বিচারে আমাকে ক্ষমা করতে৷ আর্লেনাকে আমিই খুন করেছি৷ এতে আমার খুশি হওয়ার কথা—কিন্তু হইনি৷ সব কিছুর জন্যে আমার ভীষণ দুঃখ হচ্ছে৷
৩
ওঁরা সকলে জমায়েত হয়েছেন বিশ্রাম কক্ষে—মার্শাল রেডফার্নরা রোজমণ্ড ডার্নলি এবং এরকুল পোয়ারো৷
প্রত্যেকেই চুপচাপ বসে—প্রতীক্ষারত…
দরজা খুলে ডাঃ নীসডন ভেতরে এলেন৷ তিনি সংক্ষিপ্তভাবে বললেন, ‘যতটুকু করা সম্ভব করেছি৷ এ যাত্রা মেয়েটা টিকে গেলেও যেতে পারে—তবে এ কথা না বলে পারছি না, আশা খুব বেশি নেই৷’
তিনি একটু থামলেন৷
কঠিন মুখে কুয়াশাঘন শীতল নীল চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন মার্শাল, ‘কিন্তু জিনিসটা ও হাতে পেলো কেমন করে?’
দরজা খুলে নীসডন কাকে যেন ডাকলেন৷
পরিচারিকাটি ঘুরে ঢুকলো৷ ওর চোখে মুখে কান্নার স্বাক্ষর৷
নীসডন বললেন, ‘তুমি যা দেখেছো আমাদের আর একেবারে বলো৷’
বার কয়েক শব্দে নাক টেনে মেয়েটি বললো, ‘আমি মোটেই ভাবিনি—এক মুহূর্তের জন্যেও ভাবিনি ভেতরে ভেতরে কোন গলদ রয়েছে—অবশ্য ছোড়দিদিমণিকে দেখে তখন একটু অবাক লেগেছিলো৷’ ডাক্তারের কাছ থেকে সামান্য অধৈর্যসূচক ইঙ্গিত পেয়ে ও আবার শুরু করলো, ‘মিস মার্শাল তখন অন্য দিদিমণির ঘরে ছিলেন৷ মিসেস রেডফার্নের ঘরে৷ আপনার ঘরে মাদাম৷ বেসিনের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি, একটা ছোট শিশি হাতে নিয়ে৷ আমাকে ঢুকতে দেখেই তিনি ভীষণ চমকে ওঠেন, আর আপনার ঘর থেকে মিস লিন্ডার না বলে কোন জিনিস নেওয়াটা আমার কাছে কেমন অদ্ভুত ঠেকেছে, অবশ্য, এও হতে পারে, ওটা হয়তো তাঁরই জিনিস—আপনাকে ব্যবহারের জন্য দিয়েছিলেন৷ তিনি শুধু বললেন, ‘এই তো, এটাই খুঁজছিলাম—’ এবং ঘর ছেড়ে চলে গেলেন৷’
ক্রিস্টিন প্রায় ফিসফিস করে বললো, ‘আমার ঘুমের ট্যাবলেটগুলো৷’
ডাক্তার রূঢ় স্বরে বললেন, ‘সে খবর মিস লিন্ডা পেলো কি করে?’
ক্রিস্টিন বললো, ‘আমি ওকে একটা দিয়েছিলাম৷ আর্লেনা মারা যাওয়ার দিন রাতে৷ ও বলছিলো ঘুম আসছে না৷ ও আমার মনে আছে ও বলেছিলো—‘একটাতেই হবে তো?’—আর আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ, এই ট্যাবলেটগুলো খুব জোরালো—আমাকে কখনও একসঙ্গে দুটোর বেশি খেতে বারণ করা হয়েছে৷’
নীসডন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন৷
মেয়েটা ভুল-ভ্রান্তি হওয়ার কোন পথ রাখেনি, তিনি বললেন, ‘একসঙ্গে ছ-ছ’টা ট্যাবলেট গিলেছে৷’
ক্রিস্টিন আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো৷
‘ওঃ, এ সবই আমার দোষে হলো, ট্যাবলেটের শিশিটা আমার তালাচাবি দিয়ে রাখা উচিত ছিলো৷’
ডাক্তার কাঁধ ঝাঁকালেন৷
‘হয়তো সেটাই বুদ্ধিমানের কাজ হতো, মিসেস রেডফার্ন৷’
ক্রিস্টিন হতাশ সুরে বলে উঠলো, ‘ও মারা যাচ্ছে—সম্পূর্ণ আমার দোষে…’
কেনেথ মার্শাল নিজের চেয়ারে নড়েচড়ে বসলেন৷
তিনি বললেন, ‘না আপনার কোন দোষ নেই৷ লিন্ডা যা করেছে জেনেশুনে করেছে৷ ও ট্যাবলেট খেয়েছে স্ব-ইচ্ছায়৷ হয়তো—হয়তো এ-ই সবচেয়ে ভালো হলো৷’
তিনি চোখ নামিয়ে দেখলেন তাঁর হাতে ধরা ভাঁজ করা চিঠিটার দিকে—যে চিঠিটা পোয়ারো নীরবে তাঁর হাতে তুলে দিয়েছেন৷
রোজামন্ড ডার্নলি চিৎকার করে উঠলো, ‘আমি বিশ্বাস করি না৷ আমি বিশ্বাস করি না লিন্ডা আর্লেনাকে খুন করেছে৷ কারণ সেটা পুরোপুরি অসম্ভব—অন্তত সাক্ষ্যপ্রমাণ অনুয়ায়ী৷’
ক্রিস্টিন আগ্রহের সুরে বললো, ‘হ্যাঁ, সে কাজ ওর পক্ষে করা সম্ভব নয়৷ হয়তো অতিরিক্ত মানসিক দুশ্চিন্তায় পুরো ব্যাপারটা ও কল্পনা করে নিয়েছে৷’
দরজা খুলে গেলো এবং কর্নেল ওয়েস্টন ঘরে ঢুকলেন৷ তিনি বললেন, ‘এ সব কি শুনছি?’
ডাঃ নীসডন মার্শালের হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে পুলিশ-প্রধানের হাতে তুলে নিলেন৷ শেষোক্ত ব্যক্তি সেটা পড়লেন৷ তিনি অবিশ্বাসী বিস্ময়ভরা স্বরে বলে উঠলেন, ‘কি? কিন্তু এর কোন মানে হয় না—একেবারে অর্থহীন৷ সম্পূর্ণ অসম্ভব!’ নিশ্চিত সুরে তিনি পুনরাবৃত্তি করলেন, ‘অসম্ভব! তাই না, পোয়োরো?’
এরকুল পোয়ারো এই প্রথম নড়েচড়ে বসলেন৷ ধীর বিষণ্ণ কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘না, আমার ধারণা অসম্ভব নয়৷’
ক্রিস্টিন রেডফার্ন বললো, ‘কিন্তু আমি ওর সঙ্গে ছিলাম, মঁসিয়ে পোয়ারো৷ পৌনে বারোটা পর্যন্ত আমরা একসঙ্গে ছিলাম৷ আমি পুলিশকেও তাই বলেছি৷’
পোয়ারো বললেন, ‘আপনার সাক্ষ্যই ওকে অ্যালিবাই জুগিয়েছে—হ্যাঁ৷ কিন্তু আপনার সাক্ষ্য কিসের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে? লিন্ডা মার্শালের হাতঘড়ির ওপর ভিত্তি করে৷ আপনি নিজে থেকেই নিশ্চিত করে বলতে পারেন না যে ঠিক পৌনে বারোটার সময় আপনি মিস মার্শালকে ছেড়ে চলে আসেন—ও আপনাকে যা যা বলেছে আপনি শুধু সেইটুকুই জানেন৷ আপনি নিজে বলেছেন, সময় খুব তাড়াতাড়ি অতিবাহিত হয়েছে বলে আপনার মনে হয়েছিলো৷’
বিস্ময়াহত অপলক চোখে ও তাকিয়ে রইলো৷
তিনি বললেন, ‘এবারে ভাবুন মাদাম, যখন আপনি বেলাভূমি ছেড়ে চলে আসেন, তখন হোটেলে তাড়াতাড়ি না ধীরে ধীরে ফিরে গিয়েছিলেন?’
‘আমি—যতদূর মনে পড়ছে—বেশ ধীরে সুস্থেই ফিরে গিয়েছিলাম৷’
‘ওই ফিরে যাওয়ার ঘটনাটা আপনার ভালোমতো মনে আছে?’
‘না, খুব বেশি মনে নেই৷ আমি—আমি চিন্তা করছিলাম৷
পোয়ারো বললেন, ‘এ প্রশ্ন করার জন্য আমি দুঃখিত, মাদাম, কিন্তু দয়া করে বলবেন, সে সময়ে আপনি কি চিন্তা করেছিলেন?’
ক্রিস্টিনের গালে রক্তের ঝলক ছায়া ফেললো৷
‘আমি—যদি সেটা একান্তই জানতে চান… আমি এখান থেকে—চলে যাওয়ার কথা ভাবছিলাম৷ আমার স্বামীকে না জানিয়ে চুপচাপ চলে যাওয়ার কথা৷ সেই সময়ে আমার—আমার ভীষণ খারাপ লাগছিলো, জানেন৷’
প্যাট্রিক রেডফার্ন অপেক্ষাকৃত উঁচু গলায় বলল, ‘ও ক্রিস্টিন৷ আমি জানি… আমি জানি…’
পোয়ারো নিখুঁত কণ্ঠস্বর এই আলোচনার মাঝে নিজের জায়গা করে নিলো, ‘ঠিক তাই৷ আপনি তখন একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেবার কথা ভাবছিলেন৷ আমি বলবো, আপনি সেই মুহূর্তগুলোয় আপনার পারিপার্শ্বিকের প্রতি সম্পূর্ণ বধির এবং অন্ধ ছিলেন৷ সম্ভবত আপনি অত্যন্ত ধীর পায়ে হাঁটছিলেন এবং সময়ে সময়ে মিনিটখানেকের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে আপনার মানসিক সমস্যার সমাধান খুঁজছিলেন৷’
ক্রিস্টিন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো৷
আপনার তো দারুণ বুদ্ধি৷ সত্যি তাই হয়েছিলো৷ হোটেলের দরজায় পৌঁছে আমি যেন এক অদ্ভুত স্বপ্ন নিয়ে জেগে উঠি এবং দেরি হয়ে যাবে ভেবে তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢুকি, কিন্তু হঠাৎ লাউঞ্জের ঘড়িটা আমার নজরে পড়লো তখন বুঝলাম হাতে তখনও অনেক সময় রয়েছে৷
এরকুল পোয়ারো আবার বললেন, ‘ঠিক তাই৷’
তিনি ফিরলেন মার্শালের দিকে৷
‘খুনের পরে আপনার মেয়ের ঘর থেকে এমন কতকগুলো জিনিস আমি পেয়েছি৷ যেগুলো আপনাকে এখন বলা প্রয়োজন৷ ঘরের চুল্লীতে আমি পেয়েছি বিশাল এক টুকরো গলা মোম, কিছু পোড়া চুল, পিচবোর্ড ও কাগজের কিছু ছেঁড়া অংশ এবং একটা সাধারণ আলপিন৷ কাগজ ও পিচবোর্ডের টুকরোগুলো হয়তো অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু অন্য তিনটে জিনিস যথেষ্ট ইঙ্গিতবহ—বিশেষ করে যখন বইয়ের তাকে স্থানীয় পাঠাগারের ডাকিনীবিদ্যা ও মায়াবিদ্যাসংক্রান্ত একটি বই আমি লুকনো অবস্থায় আবিষ্কার করলাম৷ একটা বিশেষ পৃষ্ঠায় খুব সহজেই বইটা খুলে গেলো৷ সেই পৃষ্ঠায় মোমের পুতুলের সাহায্যে, যা ইপ্সিত শত্রুর প্রতীক, মত্যু সাধনের বিভিন্ন প্রক্রিয়া বর্ণনা করা আছে৷ তারপর সেই মোমের পুতুলকে ধীরে ধীরে গলিয়ে ফেলা হয় উত্তাপের সাহায্যে—অথবা বিকল্প হিসেবে একটা আলপিন আপনি বসিয়ে দিতে পারেন ওই পুতুলের হৃৎপিণ্ডে৷ ফলে ইপ্সিত ব্যক্তির আসন্ন মৃতুক্ষণ নির্ধারিত হয়ে যাবে৷ পরে মিসেস রেডফার্নের কাছে আমি শুনেছি যে সেইদিন ভোরে লিন্ডা মার্শাল ওর ঘরে ছিলো না, বেরিয়েছিলো, এবং কিনে এনেছিলো এক প্যাকেট মোমবাতি, আর ওর সেই কিনে আনা জিনিস প্রকাশ হয়ে পড়লে ওকে দেখে অত্যন্ত বিহ্বল হয়ে পড়েছে বলে মনে হয়৷ তারপরে কি ঘটেছে সে বিষয়ে আমার মনে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই৷ মোমবাতির মোম দিয়ে লিন্ডা কাঁচা হাতে একটা পুতুল তৈরি করে—সম্ভবত আর্লেনার মাথা থেকে কেটে নেওয়া লাল চুল দিয়ে সেটাকেও সাজিয়ে নেয় যাদুশক্তি জাগিয়ে তোলার জন্য—তারপর একটা আলপিন বসিয়ে দেয় পুতুলটার হৃৎপিণ্ডে এবং সবশেষে পিচবোর্ডের টুকরো জ্বেলে পুতুলটাকে ও গলিয়ে ফেলে৷
‘এটা অপরিণত শিশুসুলভ মনের কুসংস্কার কিন্তু একটা জিনিস এ থেকে স্পষ্ট হয় : খুনের আকাঙ্ক্ষা৷
‘এই আকাঙ্ক্ষার চেয়ে বেশি কিছু থাকার সম্ভাবনা কি সেখানে রয়েছে? লিন্ডা মার্শালের পক্ষে ওর সৎমাকে খুন করা কি সত্যি সম্ভব ছিলো?’
‘প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, ওঁর নিখুঁত অ্যালিবাই রয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, একটু আগেই যেটা আমি আপনাদের নজরে এনেছি, সেই সময়ের সাক্ষ্য লিন্ডা নিজেই আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে৷ সঠিক সময়কে সিকি ঘণ্টা বাড়িয়ে খুব সহজেই ও সময় বলে থাকতে পারে৷
‘মিসেস রেডফার্ন সৈকত ছেড়ে চলে যেতেই তাঁকে অনুসরণ করে ওপরে উঠে আসা লিন্ডার পক্ষে অসম্ভব ছিলো না, অসম্ভব ছিলো না দ্বীপের গ্রীবাসৃদশ অংশটুকু অতিক্রম করে পিক্সি কোভের লোহার মইয়ের কাছে পৌঁছনো, মই বেয়ে তাড়াহুড়ো করে নেমে যাওয়া, সৎমার সঙ্গে দেখা করা, তাঁকে খুন করা এবং মিস ব্রুস্টার ও প্যাট্রিক রেডফার্ন নৌকো নিয়ে দৃশ্যপটে উপস্থিত হওয়ার আগেই মই বেয়ে ফিরে আসা৷ তারপর ও হয়তো ফিরে আসে গাল কোভে, স্নান সেরে ধীরেসুস্থে ফিরে যায় হোটেলে৷
‘কিন্তু দুটো জিনিস এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে৷ আর্লেনা মার্শাল যে পিক্সি কোভে থাকবেন সেটা ওর পক্ষে নিশ্চিতভাবে জানা প্রয়োজন, এবং দৈহিক শক্তির দিক থেকে সেই বিশেষ কর্ম সম্পাদনে ওকে হতে হবে সক্ষম৷
‘হ্যাঁ, এই দুয়ের প্রথমটি সম্পূর্ণ সম্ভব—যদি লিন্ডা মার্শাল অন্য কারও নামে আর্লেনাকে কোন চিঠি দিয়ে থাকে৷ আর দ্বিতীয়টির কথা যদি বলেন, লিন্ডার হাত যথেষ্ট প্রশস্ত এবং শক্তিশালী৷ কোন পুরুষের মতোই সুদীর্ঘ ওর হাত৷ শক্তির কথা যদি বলেন, ও এখন এমন একটা বয়েসে রয়েছে যখন মানসিক অস্থিরতার প্রবণতার দেখা দেয়৷ প্রায়শই এই মানসিক বিশৃঙ্খলার সঙ্গী হয় অমানুষিক শক্তি৷ এছাড়া একটা ছোট ঘটনা আমাদের চোখের সামনে উপস্থিত৷ লিন্ডা মার্শলের মাকে খুনের দায়ের অভিযুক্ত করা হয় এবং আদালতে তাঁর বিচারও হয়৷’
কেনেথ মার্শাল মাথা তুললেন৷ ভয়ঙ্কর সুরে তিনি বলে উঠলেন, ‘বিচারে ও মুক্তি পেয়েছিলো৷’
‘বিচারে উনি মুক্তি পেয়েছিলেন৷’ পোয়ারো একমত হলেন৷
মার্শাল বললেন, ‘আর—একটা কথা আপনাকে বলে রাখি, মঁসিয়ে পোয়ারো৷ রুখ—আমার স্ত্রী—সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিলো৷ সে কথা আমি নির্ভুল এবং নিশ্চিতভাবে জানি৷ আমাদের দাম্পত্যজীবনের অন্তরঙ্গতায় ওর পক্ষে আমাকে প্রতারিত করা সম্ভব ছিলো না৷ ও পরিস্থিতির এক নির্দোষ শিকার হয়ে পড়েছিলো৷’
তিনি একটু থামলেন৷
‘আর লিন্ডা আর্লেনাকে খুন করেছে, এ আমি বিশ্বাস করি না৷ এ সম্পূর্ণ অসম্ভব—অবাস্তব৷’
পোয়ারো বললেন, ‘তাহলে আপনি মনে করেন, ওই চিঠিটা জাল?’
মার্শাল চিঠিটার জন্য হাত বাড়ালেন এবং ওয়েস্টন সেটা তাঁর হাতে তুলে দিলেন৷
মার্শাল মনোযোগ দিয়ে চিঠিটা পরীক্ষা করলেন৷ তারপর মাথা নাড়লেন৷
‘না’, অনিচ্ছার সুরে তিনি বললেন, ‘আমার ধারণা, এটা লিন্ডারই লেখা৷’
পোয়ারো বললেন, ‘চিঠিটা যদি ও লিখে থাকে, তাহলে এর মাত্র দুটো ব্যাখ্যা হতে পারে৷ হয় চিঠিটা ও নির্ভেজাল বিশ্বাসে লিখেছে, নিজেকে সত্যি খুনী জেনে, অথবা—আমার ধারণা; এই চিঠি ও লিখেছে অন্য কাউকে রক্ষা করার জন্য— এমন কাউকে, যাকে পুলিশ সন্দেহ করছে বলে ওর আশঙ্কা ছিলো৷’
কেনেথ মার্শাল বললেন, ‘আপনি আমার কথা বলছেন?’
‘সেটা খুবই সম্ভব, নয় কি?’
মার্শাল কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করলেন, তারপর শান্ত স্বরে বললেন, ‘না, আমার মনে হয়, সে ধারণা নিতান্ত অসম্ভব৷ লিন্ডা প্রথম প্রথম হয়তো ভেবে থাকবে, পুলিশ আমাকে সন্দেহ করছে৷ কিন্তু এখন ও নিশ্চিতভাবেই জানতো, সে সন্দেহ ধুয়েমুছে মিলিয়ে গেছে—জানতো, পুলিশ আমার অ্যালিবাই মেনে নিয়েছে এবং তাদের মনোযোগ এখন অন্যদিকে৷’
পোয়ারো বললেন, ‘আর যদি ধরে নেওয়া যায়, লিন্ডা শুধু ভাবেনি যে পুলিশ আপনাকে সন্দেহ করছে, বরং জানতো, আপনিই প্রকৃত অপরাধী?’
মার্শাল অবাক চোখে চেয়ে রইলেন তাঁর দিকে৷ তিনি শব্দ করে ছোট্ট হাসলেন৷
‘এ রীতিমতো হাস্যকর৷’
পোয়ারো বললেন, ‘কি জানি৷ মিসেস মার্শালের মৃত্যু সম্পর্কে একাধিক সম্ভাবনা রয়েছে, জানেন৷ একটা ব্যাখ্যা বলছে, তাঁকে কেউ ব্ল্যাকমেল করছিলো, সেদিন সকালে তিনি সেই ব্ল্যাকমেলারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন এবং সে তাঁকে খুন করে৷ দ্বিতীয় ব্যাখ্যা বলছে, পিক্সি কোভ ও পিক্সি গুহাকে মাদকদ্রব্য চোরাচালানের কাজে ব্যবহার করা হতো, এবং তিনি ঘটনাচক্রে সে সম্পর্কে কিছু জেনে ফেলায় তাঁকে খুন করা হয়৷ একটা তৃতীয় সম্ভাবনা রয়েছে—যে কোন ধর্ম-উন্মাদ ব্যক্তির হাতে তাঁর মৃত্যু হয়৷ আর চতুর্থ সম্ভাবনাও একটা আছে—আপনার স্ত্রীর মৃত্যুতে আপনার আর্থিক লাভের পরিমাণ নেহাৎ কম নয়, ক্যাপ্টেন মার্শাল?’
‘আমি তো একটু আগেই আপনাকে বললাম—’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ—মানছি, আপনার পক্ষে আপনার স্ত্রীকে খুন করা সম্পূর্ণ অসম্ভব ছিলো—যদি অবশ্য, আপনি একাই এ কাজে নেমে থাকেন৷ কিন্তু কেউ যদি আপনাকে সাহায্য করে থাকে?’
‘কি বলতে চাইছেন আপনি?’
শান্ত মানুষটা এতক্ষণে বিক্ষুব্ধ হলো৷ তিনি চেয়ার ছেড়ে অর্ধেক উঠে দাঁড়ালেন৷ তাঁর কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে ভয়ঙ্কর৷ একটা কঠিন ক্রুদ্ধ রোশনাই তাঁর দু চোখে জ্বলছে৷
পোয়ারো বললেন, ‘আমি বলতে চাই, এটা সে ধরনের অপরাধ নয়, যা সংঘটিত হয়েছে কারো একার হাতে৷ দুজন মানুষ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে৷ একথা সত্যি যে একই সঙ্গে আপনার পক্ষে পিক্সি কোভে যাওয়া ও সেই চিঠিটা টাইপ করা সম্ভব ছিলো না—কিন্তু চিঠিটা শর্টহ্যান্ডে লিখে রাখার মতো সময় আপনার হাতে ছিলো—এবং যখন আপনি নিজে অনুপস্থিত ছিলেন, ব্যস্ত ছিলেন জল্লাদ কর্মে, তখন অন্য কেউ হয়তো সে চিঠি আপনার ঘরে বসে টাইপ করে থাকবে৷’
এরকুল পোয়ারো তাকালেন রোজামণ্ড ডার্নলির দিকে৷ তিনি বললেন, ‘মিস ডার্নলি বলেছেন, তিনি এগারোটা দশে সানি লেজ ছেড়ে চলে আসেন৷ এবং আপনাকে আপনার ঘরে টাইপ করতে দেখেন৷ কিন্তু মোটামুটি এই সময়েই মিঃ গার্ডেনার হোটেলে এসেছিলেন তাঁর স্ত্রীর জন্য একটা উলের বল নিয়ে যেতে৷ মিস ডার্নলির সঙ্গে তাঁর কথা অথবা দেখা হয়নি৷ ব্যাপারটা একটু অসাধারণ৷ দেখেশুনে মনে হচ্ছে যে হয় মিস ডার্নলি কখনও সানি লেজ ছেড়ে আসেননি, নয় তিনি অনেক আগেই সে জায়গা ছেড়ে চলে আসেন এবং আপনার ঘরে পরিশ্রমের সঙ্গে টাইপ করতে থাকেন৷ আর একটা কথা, আপনি বলেছেন যে মিস ডার্নলি সওয়া এগারোটার সময় আপনার ঘরে উঁকি মারলে আপনি সামনের আয়নায় তাঁকে দেখতে পান৷ কিন্তু খুনের দিন আপনার টাইপরাইটার, কাগজ, সমস্ত ঘরের এক কোণে লেখার টেবিলে রাখা ছিলো, অথচ আয়নাটা ছিলো দু-জানলার মাঝখানে৷ সুতরাং আপনার সেই বিবৃতি নিছকই সাজানো মিথ্যে৷ পরে, আপনি টাইপরাইটারটা সরিয়ে নিয়ে যান আয়নার সামনে রাখা টেবিলটায়, আপনার গল্পকে প্রমাণ করার জন্য—কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে৷ আমি জানতাম, আপনি এবং মিস ডার্নলি, দুজনেই মিথ্যে কথা বলছেন৷’
রোজামণ্ড ডার্নলি মুখ খুললো৷ ওর স্বর নিচু অথচ স্পষ্ট৷
‘ও বললো, কি সাংঘাতিক চালাক আপনি৷’
উঁচু পর্দায় স্বর তুলে এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘কিন্তু আর্লেনা মার্শালের খুনীর মতো অত সাংঘাতিক এবং অত চালাক নই৷ একটিবার ভেবে দেখুন৷ সেদিন সকালে আর্লেনা মার্শাল কার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন বলে আমি ভেবেছিলাম—আপনারা প্রত্যেকে ভেবেছিলেন? আমরা সকলে একই সিদ্ধান্তে একমত হয়েছি৷ প্যাট্রিক রেডফার্ন৷ কোন ব্ল্যাকমেলারের সঙ্গে দেখা করতে তিনি যাননি৷ তাহলে তাঁর মুখের চেহারাই সেকথা আমাকে জানিয়ে দিতো৷ উঁহু, তিনি দেখা করতে যাচ্ছিলেন কোন প্রেমিকের সঙ্গে—অন্তত তিনি তাই ভেবেছিলেন৷
‘হ্যাঁ, সে বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই৷ আর্লেনা মার্শাল যাচ্ছিলেন প্যাট্রিক রেডফার্নের সঙ্গে দেখা করতে৷ কিন্তু তার মিনিটখানেক পরেই প্যাট্রিক রেডফার্ন সৈকতে উপস্থিত হন এবং তাঁর চোখ বেশ স্পষ্টভাবেই আর্লেনা মার্শালের খোঁজ করতে থাকে৷ সুতরাং তাহলে?’
প্যাট্রিক রেডফার্ন চাপা ক্রোধের সুরে বললো, ‘কোন বদমাইস আমার নাম ব্যবহার করে থাকবে৷’
পোয়ারো বললেন, ‘মিসেস মার্শালের অনুপস্থিতিতে আপনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই বিরক্ত এবং বিস্মিত হন৷ সম্ভবত, বড় বেশিরকম স্পষ্টভাবে৷ আমার মত হলো, মিঃ রেডফার্ন, যে তিনি পিক্সি কোভে আপনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন, আপনার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়, এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী আপনি তাঁকে সেখানে খুন করেন৷’
প্যাট্রিক রেডফার্ন হতবাক হয়ে চেয়ে রইলো৷ তারপর তার খোশ মেজাজী আইরিশ সুরে উঁচু গলায় বললো, আপনি কি মশাই পাগল হয়ে গেলেন? মিসেস ব্রুস্টারের সঙ্গে নৌকো নিয়ে বেরিয়ে ওর মৃতদেহ খুঁজে পাওয়ার আগে পর্যন্ত আমি তো সৈকতে আপনার সঙ্গে ছিলাম৷’
এরকুল পোয়ারো বললেন, মিস ব্রুস্টার নৌকো নিয়ে পুলিশ ডাকতে গেলে পর আপনি আর্লেনা মার্শালকে খুন করেন৷ আপনি যখন পিক্সি কোভে নামেন তখন তিনি বেঁচে ছিলেন, গুহায় লুকিয়ে থেকে রাস্তা পরিষ্কার হওয়ার অপেক্ষা করছিলেন৷’
কিন্তু সেই দেহটা৷ মিস ব্রুস্টার এবং আমি, দুজনেই সেটা দেখেছি৷’
দেহ—ঠিক কথা৷ কিন্তু মৃহদেহ নয়৷ সেই মহিলার জীবন্ত দেহ, যিনি আপনাকে সাহায্য করেছেন৷ তাঁর হাতে পায়ে ছিলো বাদামী রঙের প্রলেপ, মুখ ঢাকা ছিলো সবুজ পিচবোর্ডের টুপিতে৷ ক্রিস্টিন, আপনার স্ত্রী (অথবা, সম্ভবত আপনার স্ত্রী নয়—কিন্তু তবুও আপনার দুষ্কর্মের সাথী) আপনাকে এ খুনে সাহায্য করেছেন, যেমন করেছিলেন অতীতে যখন তিনি অ্যালিস করিগানের দেহ ‘আবিষ্কার’ করেন অ্যালিস করিগানের মৃত্যুর কুড়ি মিনিট আগে—অ্যালিসকে খুন করেছিলো তার স্বামী, এডওয়ার্ড করিগান—আপনি৷’
ক্রিস্টিন কথা বললো৷ ওর স্বর তীক্ষ্ণ—শীতল৷ ও বললো, ‘সাবধান, প্যাট্রিক, মাথা গরম কোরো না৷’
পোয়ারো বললেন, ‘শুনলে হয়তো খুশি হবেন, এখানে তোলা একটা গ্রুপ ফটো দেখে সারে পুলিশ খুব সহজেই আপনাকে এবং আপনার স্ত্রী ক্রিস্টিনকে চিনতে পেরেছে৷ তারা সঙ্গে সঙ্গে আপনাদের সনাক্ত করেছে, এডওয়ার্ড করিগান ও ক্রিস্টিন ডেভারিল বলো—ক্রিস্টিন ডেভারিল, অর্থাৎ সেই মহিলাটি, যিনি অ্যালিসের মৃতদেহ আবিষ্কার করেছিলেন৷’
প্যাট্রিক রেডফার্ন উঠে দাঁড়িয়েছে৷ তার সুন্দর মুখ অনেক বদলে গেছে৷ সে মুখে ফেটে পড়ছে রক্ত, সে মুখ ক্রোধে অন্ধ৷ সব মিলিয়ে সে মুখ কোন খুনীর—কোন বাঘের৷ সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলো, শালা হতচ্ছাড়া নাকগলানো টেকো গুঁফো গোয়েন্দা!’
সে সামনে ঝাঁপিয়ে পড়লো, তার হাতের আঙুল হাওয়া আঁকড়ে ধরছে, তার ক্ষিপ্ত স্বরে অশ্রাব্য শব্দের ফুলঝুরি, এবং তার দু’হাতের দশ আঙুল এরকুল পোয়ারোর গলায় চেপে বসলো…
