গল্প
উপন্যাস

হাতের মুঠোয় পৃথিবী – ২

দুই

পরদিন সকাল। প্রায় আটটা বাজে। ওয়েলিং আর্মার্ড ট্রাক এজেন্সির প্রবেশ পথের কাছে এসে থামল একটা ধূলিধূসর বুইক সেঞ্চুরি।

রাস্তার দু-পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির ভিড়ে নিজেকে মিশিয়ে ফেলতে কালো গাড়িটার একটুও সময় লাগল না।

গাড়ির চালকের আসনে বসেছিল ফ্রাঙ্ক মরগ্যান। মাথায় তেলচিটে ময়লা টুপিটা চোখের ওপর নামানো। পাতলা ঠোঁটে অলসভাবে ঝুলছে একটা জ্বলন্ত সিগারেট। তার পাশে স্থিরভাবে বসে এড ব্লেক।

এজেন্সির উঁচু কাঠের দরজার দিকে দেখল তারা: দরজার ওপরে কাঁটাতারের বেড়া। ডানদিকের পাল্লার ঘন্টি বাজাবার ঝকঝকে পেতলের বোতাম, এবং তার পাশেই একটা বড় সাদা পেরেক দিয়ে আঁটা। তাতে লাল রঙের বড় বড় হরফে পরিষ্কার করে লেখা :

দ্য ওয়েলিং আর্মার্ড ট্রাক এজেন্সি

আপনার নিরাপত্তা আমাদের নিতে দিন৷ পৃথিবীর

সবচেয়ে সেরা এবং নিরাপদ ট্রাক পরিবহন ব্যবস্থা৷

‘নিজেদের সম্বন্ধে ওরা একটা বিরাট ধারণা করে বসে আছে দেখছি৷’ ফলকের লেখা পড়ে বলল, ব্লেক, ‘ঠিক আছে, আর কটা দিন৷ তারপরেই ওরা দেখবে ওস্তাদের কেরামতি৷’

‘বলা যায় না এর উল্টোটাও ঘটতে পারে—’ ব্যঙ্গের হাসি হাসল মরগ্যান।

‘তো পারে, তবে আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে, এ কাজটায় আমরা সফল হবই, ‘ব্লেক বলল, ‘মেয়েটা এমন সুন্দরভাবে প্রত্যেকটা সমস্যার সমাধান করে রেখেছে যে ভাবলে অবাক হতে হয়, তাই না?’

‘হ্যাঁ৷’ ঠোঁট থেকে সিগারেট আলতো করে তুলে নিল মরগ্যান, ‘ওর প্ল্যানে কোনও খুঁত নেই, কিন্তু সেই অনুযায়ী সবকিছু করতে পারলে হয়৷ কারণ আমাদের কতকগুলো জটিল ঝামেলার মোকাবিলা করতে হবে৷ বিশেষ করে জিপোকে নিয়েই আমরা ভাবনা৷ মেয়েটা বলছে বটে আমাদের হাতে অফুরন্ত সময়, কিন্তু সেটা নিছকই একটা কথার কথা, বড়জোর বলতে পার, ট্রাকের তালা ভাঙবার জন্যে আমরা বেশ কিছুদিন সময় পাব, তার বেশি কিছু নয়৷ একবার যদি পুলিশ আমাদের খোঁজ শুরু করে, তাহলেই হাতের সময় কমতে থাকবে৷ তখন যত তাড়াতাড়ি তালা খোলা যায় ততই মঙ্গল৷ অর্থাৎ জিপোকে মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করতে হবে, যা সে আগে কখনও করেনি৷ বলা যায় না, এতে ওর মনের ব্যালেন্স নষ্ট হয়ে যেতে পারে৷’

‘জিপোর যাতে সে অবস্থা না হয়, তার দায়িত্ব আমাদের৷’ ঠান্ডা স্বরে জবাব দিল ব্লেক, ‘জিপোর জন্যে আমি একটুও চিন্তিত নই৷’ ব্লেক আড়চোখে দেখল মরগ্যানের দিকে৷’ বিবর্ণ চঞ্চল চোখের তারায় কঠিন দৃষ্টি, ‘বুঝলে ফ্র্যাঙ্ক, ব্যাপারটা নিয়ে যতই ভাবছি, ততই মনে হচ্ছে টমাস আর ডার্কসনকে বাঁচিয়ে রাখা ঠিক হবে না৷ কারণ, যদি ওরা পরে পুলিসের কাছে আমাদের চেহারার বর্ণনা দেয়, তাহলে স-ব গুবলেট হয়ে যাবে৷’

মরগ্যান কাঁধ ঝাঁকাল, ‘হুঁ—আমি ও তাই ভাবছি৷ কিন্তু এ কথা যেন আর কাউকে বোলো না৷ খুনের ব্যাপারে জড়িয়ে পড়ার ভয়ে ওরা দুজন এখন থেকেই তটস্থ হয়ে আছে, তার ওপর এ কথা জানতে পারলে ওদের সামলানো মুশকিল হয়ে পড়বে৷’

‘কিন্তু জিনির তো সে ভয় নেই৷’ ব্লেকের ঠোঁটের কোণে হাসির ছোঁয়া৷

‘তা ঠিক৷’

‘মেয়েটা কে, ফ্র্যাঙ্ক?’

মরগ্যান ঠোঁট উল্টো কাঁধ ঝাঁকাল, ‘কী করে বলব? যদ্দূর জানি এ শহরে থাকে না৷ তবে একটা কথা বাজি রেখে বলতে পারি, ও এর আগেও অন্য কোনও দলের হয়ে কাজ করেছে৷’

‘আমারও তাই মনে হয়৷’ ব্লেক চোখ নামিয়ে হাত ঘড়িতে সময় দেখল, ‘তবে একটা ব্যাপার কী জান? এই ট্রাক-লুটের প্ল্যানটা যে জিনির একার মাথা থেকে বেরিয়েছে আমার মোটেই বিশ্বাস হয় না৷ ওর বয়েসি একটা কচি মেয়ের মাথায় এ মতলব আসতেই পারে না৷ আর যেভাবে সমস্ত জটিল সমস্যাগুলো ও সমাধান করেছে, তা এককথায় অবিশ্বাস্য৷ যদি শুনি যে এই ট্রাকটার ব্যাপারে অন্য কোনও দলও মাথা ঘামাচ্ছে, তাহলে আমি একটুও অবাক হব না৷ কারণ, আমার ধারণা, অন্য কোনও দলের কাছ থেকে জিনি এই ট্রাক-লুটের প্ল্যানটা চুরি করেছে৷ হয়তো বেশি বখরার লোভেই ও সেই দল ছেড়ে আমাদের দলে এসে যোগ দিয়েছে৷ অতএব জিনি সম্বন্ধে সর্তক থেকো, ফ্র্যাঙ্ক৷ পরে হয়তো দেখা যাবে আমাদের মতো অন্য আরেকটা দলও একই দিনে, একই সময়ে ট্রাকটাকে খালি করার মতলব ভাঁজছে—সেটা আমাদের পক্ষে খুব একটা সুবিধের হবে না, বিশেষ করে যদি তারা সে ব্যাপারে আমাদের টেক্কা দেয়৷’

‘হুঁ৷ অস্বস্তিভরে টুপিটাকে মাথার পিছনে ঠেলে দিল মরগ্যান৷ ভুরু কুঁচকে তাকাল ব্লেকের দিকে, ‘সবই আমি ভেবেছি৷ কিন্তু তবু আমাদের একটা সুযোগ দিতে হবে আগামী শুক্রবারের আগে কিছুতেই একাজে হাত দেওয়া সম্ভব নয়৷ কারণ এর পেছনে প্রচুর প্রস্তুতি দরকার৷… আচ্ছা, কটা বাজল?’

‘ঠিক সাড়ে আটটা৷’

‘তাহলে তো বাস এসে পড়ার সময় হল৷’

‘হ্যাঁ৷’

সামনের বাসস্টপে অপেক্ষারত লোকগুলোর দিকে তাকাল ওরা৷ সেদিকে স্থিরচোখে চেয়ে রইল ব্লেক৷ অস্ফুটস্বরে বলল, ‘যাই বল ফ্র্যাঙ্ক, জিনির চেহারায় চটক আছে৷… ওফ, একখানা জিনিস বটে৷’ অন্যমনস্কভাবেই ঠোঁট কামড়াল ব্লেক৷’

মরগ্যানের মুখ থেকে নেমে এল বরফের কাঠিন্য৷ তার কালো সাপ-চোখজোড়া ধীরে ধীরে এসে স্থির হল ব্লেকের চোখে৷ কর্কশস্বরে সে বলে উঠল, ‘কথা যখন উঠলই তখন একটা কথা ভালো করে জানিয়ে দিই এড৷ জিনির কাছে ঘেঁষবার চেষ্টা তোমরা কোরো না৷ কারণ, ওকে নিয়ে কোনও রকম বাঁদরামি আমি সহ্য করব না৷ সপ্তা-দুয়েক, কি তারও বেশি ও আমাদের সঙ্গে থাকবে৷ দিনের মধ্যে চব্বিশ ঘণ্টাই হয়তো ওকে আমাদের পাশে কাটাতে হবে—কিন্তু তাই বলে ওর সম্বন্ধে কোনওরকম ভুল ধারণা তোমাদের মনে গড়ে উঠুক, তা আমি চাই না৷ সুতরাং প্রথম থেকেই ব্যাপারটা নিজেদের মধ্যে পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো৷ কোনওরকম লক্কাবাজি আমি সহ্য করব না৷’

ব্লেক ভুরু উঁচিয়ে তাকাল মরগ্যানের দিকে৷ তার সুন্দর মুখমণ্ডল ঘৃণায় বিকৃত, ‘তাহলে কি আমি ধরে নেব, জিনিকে তুমি নিজের জন্যে রেখেছ?’

মরগ্যান মাথা নাড়ল, ‘না! আমি তোমাকে আবার সাবধান করে দিচ্ছি, এড—জিনির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শুধু লেনদেনের, তাছাড়া কোনও নারীঘটিত ঝঞ্ঝাট নিয়ে আপাতত আমরা মাথা ঘামাতে চাই না—আমাদের সামনে রয়েছে এক বিশাল ঝুঁকি, এক বিরাট কাজের দায়িত্ব। সুতরাং এই রিপুসংক্রান্ত ব্যাপারে নষ্ট করার মতো সময় আমাদের নেই৷ যদি কারও মধ্যে সামান্যতম বেচাল দেখি, তাহলে চাবকে ছাল ছাড়িয়ে নেব৷ জিনিকে নিয়ে তোমার যদি ফষ্টি-নষ্টি করার কোনও মতলব থেকে থাকে, তাহলে এক্ষুনি মতলব ঝেড়ে ফ্যালো৷ কারণ তার পরিণতি খুব একটা সুখের হবে না৷’

মরগ্যানের শীতল নিষ্প্রাণ কালো চোখের তারা যেন ঝিলিক মেরে উঠল৷ সেদিকে চেয়ে অস্বস্তিভরে হাসতে চেষ্টা করল ব্লেক, ‘আমাকে এসব না বলে কিটসনকে গিয়ে বলো৷ যদি কিছু করার হয় ও-ই করবে, আমি নয়৷ কাল রাতে কিরকম করে জিনিকে দেখছিল মনে আছে?’

‘তোমাদের তিনজনের ওপরেই নজর রাখা দরকার৷’ সংক্ষিপ্তভাবে বলল মরগ্যান, ‘তুমি কিংবা জিপো—কিটসনের চেয়ে এমন কিছু সাধু নও৷’

ব্লেকের চোখে ফুটে উঠল ক্রোধের ঝলক৷

‘তোমার মাথা থেকে দেখছি যিশুখ্রিস্টের মতো জ্যোতি বেরোচ্ছে৷’

মরগ্যান ক্রুদ্ধভাবে কী একটা জবাব দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু বাসটাকে আসতে দেখে চুপ করে গেল৷

‘ওই যে বাস আসছে৷ চুপচাপ নজর রাখো!’

দুজনেই ঝুঁকে পড়ল উইন্ডশিল্ডের ওপর৷ একদৃষ্টে চেয়ে রইল সামনের রাস্তার দিকে৷ বাসটা এজেন্সির সামনে এসে থামল৷ তার থেকে নেমে দাঁড়াল দুজন লোক৷ একজনের চেহারা খাটো, রোগা, কিন্তু অন্যজন প্রায় ছ-ফুট লম্বা—বৃষস্কন্ধ, শক্তসমর্থ চেহারা৷ চলাফেলার ভঙ্গি সাপের মতো ক্ষিপ্র অথচ নিশ্চিত৷ তার পরনে ওয়েলিং আর্মাউ ট্রাক এজেন্সির ইউনিফর্ম৷ মাথায় লম্বা টুপি—তাতে বসানো চকচকে ইস্পাতের ব্যাজ৷ কোমরে ঝোলানো পিস্তল৷ অভ্যাসবশতই বাঁ হাতটা পিস্তলের খাপের ওপর রাখা৷

লোকটা ঘাড় ঘুরিয়ে একবার চারপাশে দেখল৷ তারপর ক্ষিপ্র পায়ে এগিয়ে গেল এজেন্সির দরজার কাছে৷ আঙুল চেপে ধরল ঘণ্টির বোতামে৷

‘এই নাকি?’ ব্লেক প্রশ্ন করল৷

‘হ্যাঁ৷’ মরগ্যান তখন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লোকটার আপাদমস্তক লক্ষ করতে ব্যস্ত৷ অস্বস্তিভরে সে জবাব দিল, হ্যাঁ, এই মাইক ডার্কসন৷ টমাস হয়তো এর পরের বাসেই এসে পড়বে৷’

‘শালাকে দেখে তো মনে হচ্ছে এক নম্বরের হারামজাদা৷’ ডার্কসনকে দেখে ব্লেক ঠিক খুশি হতে পারল না৷ এক অজানা আশঙ্কায় তার মন দুলে উঠল, ‘নাঃ, ব্যাটা যে সাহসী, তা ওর চেহারা দেখলেই বোঝা যায়৷’

ডার্কসন ঘুরে দাঁড়িয়ে অন্যমনস্কভাবেই কালো বুইকটাকে দেখছিল৷ ওর বয়স বছর পঁচিশের বেশি বলে মনে হল না৷ দেখতে সুশ্রী না হলেও ডার্কসনের মুখে রয়েছে সাহস ও দৃঢ়তার আভাস, এবং সেটা মরগ্যানেনর চোখ এড়াল না৷

‘ডার্কসনকে খুন করা ছাড়া জিনির আর কোনও উপায় নেই৷’ ধীরে ধীরে কথাকটা উচ্চারণ করল ব্লেক৷ হঠাৎ সে যেন মাথা ঘামাতে শুরু করেছে, ‘আচ্ছা, জিনি কি ডার্কসনকে একবারও দেখেছে?’

‘হ্যাঁ, গতকাল দেখেছে৷ কিন্তু একবারও মেয়েটা ভয় পায়নি৷ বার বারই বলেছে, ডার্কসনকে ও ঠিক কবজা করতে পারবে৷ তারপর জানি না কী করবে৷’

এমন সময় খুলে গেল এজেন্সির দরজা৷ ডার্কসন ঢুকে পড়ল ভেতরে৷ তারপর আবার দরজা বন্ধ হয়ে গেল৷ ‘কিটসন দেখছি ঠিকই বলেছে’ এ-তো সহজে হার মানবার পাত্র নয়৷’ শান্তস্বরে বলল ব্লেক, ‘প্রথমেই একে শায়েস্তা করতে হবে, ফ্র্যাঙ্ক৷ তা নইলে, পরে বিপদ হতে পারে৷’

‘হ্যাঁ, এবং সেই শায়েস্তা করার দায়িত্বটা তোমার৷’ জিনির ওপর এ দায়িত্ব দেওয়া যাবে না, কারণ ও হয়তো ডার্কসনের ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ঠিক পেরে উঠবে না৷’ সামনের দিকে চেয়ে মরগ্যান বলে চলল, ড্রাইভারকে আমিই টিট করব৷ তোমার কাজ হবে৷ একটা রাইফেল নিয়ে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা৷ ডার্কসন যেই ট্রাক ছেড়ে বেরোবে তখনি তুমি রাইফেল তাক করবে ওর দিকে৷ এক মুহূর্তের জন্যও অন্যমনস্ক হবে না৷ জিনির রিভলভারের সামনে ওর চালচলনের এতটুকু এদিক-ওদিক দেখলেই গুলি করবে৷ কোনওরকম ইতস্তত করবে না, বুঝেছ?’

ব্লেকের মনে হল তার গলাটা হঠাৎ যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে৷ একটা তিক্ত স্বাদ অনুভবের সঙ্গে সঙ্গে শুকনো জিভটাকে মুখের চারপাশে বুলিয়ে নিল সে, ঘাড় নাড়ল, নিশ্চয়ই, সেজন্য তুমি ভেবো না৷ ডার্কসনকে আমি চোখে-চোখে রাখব৷’

‘ওই যে দ্বিতীয় বাসটা আসছে৷ সেই সঙ্গে আসছে আমার শিকার—ডেভ টমাস৷’ দাঁতে দাঁত চেয়ে বলল মরগ্যান৷

ওয়েলিং এজেন্সির ট্রাক ড্রাইভার টমাস বেশ লম্বা-চওড়া লোক৷ মুখভাব এবং চলাফেরায় ডার্কসনের সঙ্গে যথেষ্ট সাদৃশ্য আছে৷ সেই একই রকম উদ্ধত চিবুক, শীতল-অচঞ্চল চোখ৷ পাতলা টানা ঠোঁট৷ কিন্তু টমাসের বয়স একটু বেশিই হবে—তিরিশ বত্রিশের কাছাকাছি৷ বাস থেকে নেমে সেও এগিয়ে চলল এজেন্সির দরজার দিকে৷

টমাসের দৃঢ় বলিষ্ঠ পদক্ষেপে মুহূর্তের জন্যে অনিশ্চয়তার দোলায় দুলে উঠল মরগ্যানের মন৷ একদৃষ্টে, সরীসৃপ শীতল চোখে মরগ্যান টমাসকে দেখতে লাগল৷ তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল৷

‘এই হল দু-নম্বর হারামজাদা৷’ বিরক্তিভরে বলে উঠল মরগ্যান, ‘নাঃ, লোক বাছাই করার ব্যাপারে ওয়েলিং এজেন্সির তুলনা নেই! কোথেকে যে এই লোক দুটোকে জোগাড় করল কে জানে? তবে একটা ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ এড, টমাসকে আমাদের খুনই করতে হবে, তাছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই৷’

মাথা থেকে টুপি নামিয়ে কপালের ঘাম মুছল এড ব্লেক৷ তার বুকের স্পন্দন যেন হঠাৎ বেড়ে উঠল৷

‘আমাদের এই প্ল্যানের একটু এদিক-ওদিক হলেই আমরা কিন্তু জালে আটকা পড়ব ফ্র্যাঙ্ক৷ সুতরাং আমাদের ভীষণভাবে সাবধান হতে হবে৷’

‘এ কাজে সাফল্যের পুরস্কার দশ লক্ষ ডলার৷’ স্বপ্নাচ্ছন্ন স্বরে বলে চলল মরগ্যান, ‘আর সেই কারণে আমার দৃষ্টিভঙ্গি একটু আলাদা৷ এড, আমার বয়েস এখন বিয়াল্লিশ বছর—তার মধ্যে পনেরো বছরই কেটেছে জেলের আবদ্ধ বাতাসে৷ যে ক-বছর বাইরে ছিলাম, সে কটা-বছরও পুলিসের নজর বাঁচিয়ে লুকিয়ে চলতে হয়েছে৷ এই করে জীবনের প্রতি আমার ঘেন্না ধরে গেছে৷ এত দিনে সার যা বুঝেছি, তা হল টাকা৷ টাকা না থাকলে তোমাকে কেউ পুঁছবেও না৷ কিন্তু যদি তোমার গাড়ি, বাড়ি, অঢেল টাকা থাকত—লোকে তোমাকে সম্মান করত, এ সমাজে তুমি হয়ে উঠতে একজন কেউকেটা৷ দু-লক্ষ ডলার আমার নোংরা জীবনে হবে এক পূর্ণচ্ছেদ, বাঁচার মতো করে আমি বাঁচতে পারব৷ তা যদি না পারি তাহলে বেঁচে থেকে লাভ কী? অতএব ওই ট্রাকের টাকা হাতানোর ব্যাপারে কোনও বাধাই আমাকে রুখতে পারবে না—টমাস, ডার্কসন তো দূরের কথা! তোমার কথা আমি মেনে নিচ্ছি৷ মেনে নিচ্ছি ধরা পড়লে আমাদের ভাগ্যে আছে চরম দণ্ড৷ কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছ এড, আমরা এখন ঠিক কী অবস্থায় আছি৷ আমরা মরলাম কি বাঁচলাম, তাতে কার কী এসে যায়? সূর্য যেমন উঠছিল তেমনি উঠবে, শহরের কর্মব্যস্ত জীবনে এতটুকু চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হবে না৷ আমরা একেবারে ফালতু৷ কিন্তু যখন দু-লক্ষ ডলারকে আমরা নিজেদের সঙ্গী করব, তখনই আমাদের রঙিন চোখের তারায় এই দুনিয়ার চেহারাটাই পালটে যাবে৷ আমরা হয়ে উঠব দশজনের একজন—ব্লেকের মুখের কাছে এগিয়ে এল মরগ্যানের ঘর্মাক্ত লালচে মুখ, ‘আর আমি তাই হতে চাই…তুমি চাও না?’

টুপিটা আবার পরে নিল ব্লেক৪। শান্তস্বরে বলল, ‘চাই না যে তা নয়। তবে আমি কী ভাবছি জান? আমি ভাবছি কিটসন আর জিপোর কথা। জিনির সামনে বাহাদুরি দেখাবার জন্যে ওরা তো রাজি হল—ভোটও দিল আমাদের সপক্ষে, কিন্তু পরে কী হবে সেটা কি চিন্তা করে দেখেছ?’

‘ও নিয়ে ভাববার কী আছে? রাজি যখন ওরা হয়েছে, তখন কাজটা ওদের করতেই হবে।’ মরগ্যানের কণ্ঠে দৃঢ়তার সুর।

‘অবশ্য যদি শেষ পর্যন্ত ওদের মাথার ঠিক থাকে—’

‘থাকতেই হবে। না হলে…’

‘তোমার কথা যেন সত্যি হয়।’ হাওয়ায় হাত নাড়ল ব্লেক, ‘তবে বলা যায় না, শেষ পর্যন্ত হয়তো ওরা…’

মরগ্যানের অচঞ্চল চোখের তারা স্থির হল ব্লেকের চোখে। কর্কশ স্বরে দাঁতে দাঁত চেপে সে উচ্চারণ করল, ‘একবার যদি ট্রাকটা আমরা দখল করতে পারি,তবে ওটা আমরা খুলবই–ওদের দুজনের সাহায্য নিয়েই হোক, বা না নিয়েই হোক! এতটা পথ এসে ফ্র্যাঙ্ক মরগ্যান কোনও মতেই হাল ছাড়তে রাজি নয়।’

ব্লেক মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানাল, ‘কিন্তু এ ছাড়া আরও একটা ব্যাপার আছে, ফ্র্যাঙ্ক। এই কাজের প্রাথমিক খরচ হিসেবে অন্তত দু-হাজার ডলার আমাদের দরকার। কাল রাতে আলোচনার সময় আমরা কিন্তু এ কথাটা একবারও ভেবে দেখিনি। টাকাটা জোগাড় হবে কোত্থেকে বলো দেখি?’

‘আমাদের একটা ছোট কাজে হাত দিতে হবে—যে কাজে বিপদের কোনও সম্ভাবনা নেই। কারণ আমাদের সামনে পড়ে রয়েছে আসল কাজ—দশ লক্ষ ডলার; তার আগেই যদি পুলিশ আমাদের পিছু নেয় তবে এত পরিশ্রম, এত সাবধানতা সব পণ্ড হবে। সেই জন্যেই আমরা যে ছোট কাজটায় হাত দেব, সেটা সহজ, সরল, নির্ঝঞ্ঝাট হওয়া দরকার। আমি কাল রাত থেকেই এ নিয়ে ভাবছি—’

ব্লেক সিগারেটে এক জোরালো টান দিল, ‘দশ নম্বর সড়কের পেট্রল পাম্পটা লুট করলে কেমন হয়? ওই যে ডুকাস যাবার পথে—’

‘হ্যাঁ, করা যায়। তবে আমি ভাবছিলাম আরও নির্জন কোনও জায়গার কথা—মানে ঠিক বড় রাস্তার ওপর কোনওরকম ঝামেলা করতে চাইছি না। আচ্ছা এড, ম্যাডক্স স্ট্রিটের ওই কাফেটার কথা তোমার মনে পড়ছে, যেটা সারারাত খোলা থাকে—?’

‘হ্যাঁ, কিন্তু কেন?’

‘আমি ওটার কথাই মনে মনে ভাবছি। রাত্রিবেলা থিয়েটার-সিনেমার শেষে বেশির ভাগ লোকই ওই কাফেটায় যায়; আর পকেট তাদের ভারীই থাকে। ঠিক সেই সময় আমরা যদি ওদের ওপর গিয়ে পড়তে পারি, তাহলে দু-হাজার কেন, তার চেয়ে অনেক বেশি টাকাই আমাদের হাতে আসবে। তাছাড়া কাজটায় কোনও উটকো ঝামেলার ভয় নেই।’

ব্লেক আমতা-আমতা স্বরে বলল, কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক, কাজটা কি সত্যিই সহজ? আমার তো মনে হয় না। হঠাৎ যদি কোনও খদ্দের অতিমাত্রায় সাহসী হয়ে ওঠে, তাহলে?’

‘তাহলে তো খুব ভালো হয়, আমরা আসল কাজের মহড়া দিতে পারব।’ ধূর্ত হাসি হাসল মরগ্যান, ‘কারণ তুমি ভালোভাবেই জানো, টমাস ও ডার্কসন—ওরা দুজনেই খোলা রিভলভারের সামনে দুঃসাহসী হয়ে উঠতে পারে। তাছাড়া জিনিকেও একটু পরীক্ষা করা যাবে৷ মুখে তো খুব লম্বা চওড়া কথা বলছিল, এই কাজের সময় দেখা যাবে ওর কত সাহস৷’

‘তার মানে মেয়েটা এ কাজেও আমাদের সঙ্গে থাকবে?’

‘হ্যাঁ৷ আর থাকবে কিটসন, ওর ওপরে থাকবে গাড়ির দায়িত্ব৷ রিভলভার নিয়ে তুমি এবং আমি কাফের লোকগুলোকে সামলাব, জিনির কাজ হবে প্রত্যেকের কাছ থেকে টাকাগুলোর আদায় করা—ব্যস!

ব্যঙ্গভরে প্রশ্ন করল ব্লেক, ‘ট্রাকের ব্যাপারটা না হয় মেনে নিলাম, কিন্তু জিপো কি এই কাজেও কোনও গতর খাটাবে না, ফ্র্যাঙ্ক?’

‘শোনো এড, জিপোকে নিয়ে তোমার এই চুকলিপনা বন্ধ করো৷ এ কাজে জিপোকে আমাদের প্রয়োজন হবে না৷ কেবলমাত্র এজেন্সির ট্রাকের তালা খুলতে আমরা ওর সাহায্য নেব৷ কারণ জিপো ছাড়া আর কারও পক্ষে যে ওই তালা খোলা সম্ভব নয়, সেটা তুমি বেশ ভালোভাবেই জানো৷ সুতরাং এই সব ছোটখাটো ঝামেলায় ওকে না জড়িয়ে আসল কাজের জন্যে রেখে দেওয়াই ভালো৷ তুমি কী বলো?’

‘নিশ্চয়ই৷ তবে ভাবছি, জিপোর মতো আমিও যদি তালা-বিশারদ হতাম তাহলে বেশ পায়ের ওপর পা তুলে আয়েস করে দিন কাটাতে পারতাম৷’ কাঁধ ঝাঁকাল ব্লেক, ‘যাক গে, এবার বলো ক্যারাভানটা আমরা কোত্থেকে জোগাড় করছি?’

‘শুনেছি মার্লোয় একটা দোকান আছে, তারা ক্যারাভ্যান বিক্রি করে৷ টাকাটা হাতে আসামাত্রই আমি কিটসন আর জিনিকে সেখানে পাঠিয়ে দেব৷ ওরা গিয়ে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেবে; বলবে হানিমুন কাটানোর জন্যে একটা ক্যারাভান ওদের দরকার৷’

ব্লেক হাসল, ‘কিটসনের দিকে নজর রেখো, ফ্র্যাঙ্ক৷ ও যেন এই হানিমুনের ব্যাপারটাকে আবার সত্যি বলে না ভেবে বসে৷’

‘এক কথা বার বার বলা আমি পছন্দ করি না, এড৷ ‘খিঁচিয়ে উঠল মরগ্যান, ‘এমনিতেই আমাদের হাতে সমস্যার অন্ত নেই, তা সত্ত্বেও যদি কেউ জিনির ব্যাপারে কৌতূহল দেখাতে যায় তবে ভুল করবে৷ তোমাকে আগেও বলেছি, এখনও বলছিঃ কোনওরকম লক্কাবাজি আমি বরদাস্ত করব না৷ কিটসন আমাদের চেয়ে বয়েসে ছোট, সুতরাং সদ্য-বিবাহিত স্বামীর ভূমিকায় সে-ই অভিনয় করবে৷ তবে সেটা কেবলমাত্র অভিনয়, তার বেশি কিছু নয়৷ আর আলেক্সের মাথায় যদি এই ব্যাপারটা না ঢোকে, তবে সবার আগে ওকে আমার কাছে জবাবদিহি করতে হবে৷’

‘কিন্তু জিনি?’ ব্লেক প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি এ সম্বন্ধে ওকে সাবধান করে দিয়েছ? বলেছ, কিভাবে ওকে সংযত হয়ে চলতে হবে?’

মরগ্যান ধীরে ধীরে গভীরভাবে শ্বাস নিল৷

‘আমি জানতাম, একসময় কথাটা উঠবে৷’ চাপা হিংস্র স্বরে উত্তর দিল সে, ‘যখনই জিনিকে আমি দেখেছি, তখনই জানি তোমরা তিন ভেড়্‌য়া ওর পেছনে লাগবে৷ সেইজন্যে প্রথম থেকেই আমি বলেছি, কোনওরকম ছেনালিপনা দেখলেই সোজা তাড়িয়ে দেব৷’ ঠোঁট বেঁকিয়ে ব্যঙ্গভরে হাসল মরগ্যান, ‘আমার কথায় ও কী বলেছিল জানো?’ ‘ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয় না৷ আমার শুধু টাকার দরকার৷ অতএব তোমার পেয়ারের কুত্তাদের তুমি সামলাবে৷’ সুতরাং বুঝতেই পারছ, টাকা ছাড়া মেয়েটা আর কিছু বোঝে না! তার মানে জিনির দিক থেকে তোমরা খুব একটা উৎসাহ পাবে না৷ ওর জীবনে প্রথম এবং শেষ কথা টাকা৷ কিটসন যদি মেয়েটাকে নিয়ে কোনও গণ্ডগোল বাধাতে চায়, তবে ও নিজেই বিপদে পড়বে৷ তোমার আর জিপোর বেলাতেও তার ব্যতিক্রম হবে না৷ সুতরাং মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দাও৷…আশা করি কথাগুলো এবারে তোমার মাথায় ঢুকেছে৷

ব্লেক জোরালো গলায় হেসে উঠল, নিশ্চয়ই৷ আমারও মনে হয় এক্ষেত্রেও সেরকম কিছু ঘটবার কোনও চান্স নেই৷’

বিদ্যুৎ ঝলকের মতো মরগ্যান শীতল, সরু পাঁচ আঙুলে আঁকড়ে ধরল ব্লেকের কবজি৷ চমকে উঠে সে চোখ রাখল মরগ্যানের কালো হায়েনা চোখে৷

‘আমি ঠাট্টা করছি না, মিস্টার এডওয়ার্ড ব্লেক৷’ নরম স্বরে চিবিয়ে-চিবিয়ে বলল মরগ্যান, ‘আমার ছকে বাঁধা অন্ধকার জীবন থেকে বেরিয়ে আসার এই একমাত্র সুযোগ৷ এবং সম্ভবত শেষ সুযোগ৷ তুমি যদি ভেবে থাক একটা বিশ বছরের মেয়ের সঙ্গে লেপটা-লেপটি করে আমার প্ল্যানে ফাটল ধরাবে, তবে আরও একটা কথা তোমার মনে রাখা দরকার৷ যদি আমি দেখি, তোমার রিপুসংক্রান্ত দুর্বলতার জন্যে আমাদের এই সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট হতে যাচ্ছ, তবে তোমাকে কুকুরের মতো গুলি করে মারব৷ মনে কোরো না, তোমার, জিপোর বা কিটসনের যৌন-তাড়নার জন্যে আমি আমার ভবিষ্যতের গোড়ায় কুড়ুল মারব৷ আশা করি আমার কথা বুঝতে তোমার অসুবিধে হচ্ছে না?’

ব্লেক প্রাণপণ চেষ্টায় শুকনো মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলল, বলল, ‘তোমার হল কী, ফ্র্যাঙ্ক? আমি এমনি ইয়ারকি করছিলাম৷’

মরগ্যান সামান্য ঝুঁকে এল ব্লেকের দিকে৷ তার তামাকের গন্ধভরা নিঃশ্বাস ঝাপটা মারল ব্লেকের মুখে, ‘ইয়ারকিই যেন হয়!’

এক দীর্ঘ উৎকণ্ঠাময় নিস্তব্ধতা৷ দুজনের স্থির, কঠিন দৃষ্টি পরস্পরের ওপর নিবদ্ধ৷ অবশেষে পরিস্থিতি হালকা করার উদ্দেশ্যে ব্লেক বলে উঠল, ‘তোমার কি মনে হয় এই গাড়িটা ক্যারাভানটাকে টানতে পারবে?’

‘পারতেই হবে—অবশ্য ক্যারাভানটা যে ভারী হবে না তা আমি বলছি না৷’ মরগ্যান সিটে গা এলিয়ে দিল৷ তার নিকোটিনের তোপে-ভরা আঙুল গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বাজনা বাজিয়ে চলল, ‘তবে রাস্তাও খুব একটা উঁচু-নিচু নয় যে ক্যারাভানকে টেনে নিয়ে যেতে গাড়িটার অসুবিধে হবে৷ শুধু প্রথম তিরিশ-চল্লিশ মিনিট আমাদের একটু কষ্ট হবে৷ কারণ ওই সময়ের মধ্যেই অকুস্থল থেকে যতটা দুরে যাওয়া যায় আমাদের সরে পড়তে হবে৷ তারপর ভাবনার আর কিছু নেই৷… শোনো এড, তুমি এই গাড়িটাকে একবার ভালো করে পরীক্ষা করে রেখো৷ নয়তো রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ যদি খারাপ হয়ে পড়ে তাহলে বিপদের আর কিছু বাকি থাকবে না৷ একেবারে খুঁটিনাটি সমস্ত পরখ করে দেখবে৷’

‘নিশ্চিন্ত থাকো: গাড়ি নিয়ে কোনও গোলমালে আমাদের পড়তে হবে না৷ কিন্তু জিনির জন্যে একটা গাড়ি যে আমাদের দরকার? সেটা জোগাড় হচ্ছে কী করে?’

‘আসল কাজের দিন-দুয়েক আগে কোনও একটা কার-পার্ক থেকে একটা গাড়ি লোপাট করলেই হবে৷ তুমি দুটো নকল নাম্বার-প্লেট আগে থাকতেই তৈরি করে রেখো, আর জিপোর কাজ হবে চোরাই গাড়িটার রং-পালটে নতুন রঙ লাগানো৷ জিনি যখন গাড়িটা চালাবে, তখন যেন ওটা চোরাই গাড়ি বলে কোনও পুলিশের চোখে ধরা না পড়ে৷’

হঠাৎ ব্লেক কনুই দিয়ে মরগ্যানের পাঁজরে এক খোঁচা মারল৷ মরগ্যান চমকে ফিরে তাকাতেই এজেন্সির কাঠের দরজার দিকে ইশারা করল ব্লেক, ‘ওই যে ট্রাকটা আসছে…’

আর্মার্ড ট্রাক এজেন্সির চওড়া কাঠের দরজা হাট করে খুলে গেল৷ তখনই চোখে পড়ল ট্রাকটা৷

মরগ্যান বা ব্লেক আগে কখনও ট্রাকটাকে স্বচক্ষে দেখেনি৷ ওরা ট্রাকের প্রতিটি অংশের ছবি নিখুঁত করে মনে এঁকে নিল৷

ব্লেক ভেবেছিল এই অদ্ভুত যুগান্তকারী জিনিসটা বেশ বড়-সড়ই হবে৷ কিন্তু ওটার আকৃতি ওকে অবাক করল৷ চারটে চাকার ওপর বসানো একটা ছোট ইস্পাতের বাক্স—আর তার সামনে ড্রাইভারের কেবিন—ব্যাস! টমাসের হাতজোড়া স্টিয়ারিংয়ের ওপর সহজ অথচ পেশাদারি ভঙ্গিতে আলতো করে রাখা; চোখের সতর্ক দৃষ্টি সামনের রাস্তার ওপর৷ টমাসের পাশেই টান-টান হয়ে বসে আছে মাইক ডার্কসন৷

ট্রাকটা আস্তে আস্তে নেমে এল রাস্তায়৷ মরগ্যানও তার গাড়ির ইঞ্জিন চালু করল৷ রাস্তাটায় এমনিতেই হাজারও গাড়ির জটলা৷ মরগ্যান অনেক চেষ্টায় চলন্ত ট্রাকটার কাছাকাছি এগিয়ে গেল—মাঝখানে শুধু দুটো গাড়ির ব্যবধান৷

‘আমি ভেবেছিলাম ট্রাকটা অনেক বড় হবে৷’ কথা বলতে বলতে ব্লেক উঁচু হয়ে সামনের লিংকন গাড়িটার বাধা কাটিয়ে ট্রাকটাকে দেখতে চেষ্টা করল, ‘দেখে তো জিনিসটাকে খুব একটা শক্ত-পোক্ত বলে মনে হচ্ছে না৷’

‘তাই নাকি? তোমার মতো অনেকেই ট্রাকটার এই ছোট আকার দেখে ভুল করে৷’ হাসল মরগ্যান৷

রাস্তা একটু ফাঁকা হতেই অভ্যস্ত ক্ষিপ্রতায় লিংকন গাড়িটার পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে গেল মরগ্যান৷ এবারে ট্রাকের পিছনটা পরিষ্কার দেখতে পেল, কারণ মরগ্যানের বুইক আর ওয়েলিং এজেন্সির ট্রাকের মধ্যে এখন ব্যবধান শুধু একটা হুড-খোলা স্পোর্টস কার৷

ট্রাকের পিছনের দরজায় ছাপা হরফে লে খাঃ

দ্য ওয়েলিং আর্মার্ড ট্রাক সার্ভিস

—আবিষ্কারের জগতে এক নতুন আলোড়ন—

পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে নিরাপদ

ট্রাক আপনার সামনে উপস্থিত৷

মূল্যবান জিনিসপত্র পরিবহনের দায়িত্ব

আমাদের হাতে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন৷

ব্লেকের শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে এল৷ মসৃণ দ্রুতগতিতে ছুটে-চলা ট্রাকটার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল সে৷ দূর থেকে মনে হল যেন একটা নিরেট ইস্পাতের বাক্স চার চাকার ওপর গড়িয়ে এগিয়ে চলেছে৷ ব্লেকের মনে হল, এই ছোট্ট ইস্পাতের বাক্সটা শুধু তার ভবিষ্যৎ নয়, তার জীবনের বিরুদ্ধেও এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ৷

‘ডানদিকে দ্যাখো৷’ বলে উঠল মরগ্যান৷

ব্লেকের বিবর্ণ চোখ চকিতে ফিরে তাকাল ডানপাশে৷

একজন মোটর বাইক পুলিশ গাড়ির ভিড় কাটিয়ে এগিয়ে চলেছে অপসৃয়মান ট্রাকের দিকে৷

‘এবার কেটে পড়াই ভালো৷’ মরগ্যান বলল, ‘এই শালা এখন থেকে শহরের শেষ পর্যন্ত ট্রাকটার পেছনে আঠার মতো লেগে থাকবে৷ আর আমরা যদি এখুনি ওই ট্রাকের পিছু না ছাড়ি, তবে মোটরবাইকওয়ালা সন্দেহ করবে৷’

‘গাড়ি ঘুরিয়ে পাশের একটি রাস্তায় ঢুকে পড়ল মরগ্যান?

শেষবারের মতো ব্লেকের চোখে পড়ল ওয়েলিং এজেন্সির ট্রাকটা—তার পাশাপাশি এগিয়ে চলেছে সেই মোটর বাইক পুলিশ অফিসার৷ দৃষ্টিপথ থেকে ট্রাকের দৃশ্য সরে যেতেই অনেকটা নিশ্চিন্তবোধ করল সে; তার শ্বাস-প্রশ্বাস আবার সহজ হয়ে এল৷

সামনে একটা গাড়ি রাখার জায়গা খালি দেখে বুইকটা সেখানে থামাল মরগ্যান, ‘যাক, ট্রাকটা তাহলে তোমার দেখা রইল…’

‘তা রইল; কিন্তু তাতে সুবিধে কিছু হল বলে তো মনে হয় না। শুধু একটা ইস্পাতের বাক্স—ব্যস! ওহ-হো, তুমি সময়টা লক্ষ করেছিলে তো, কখন ট্রাকটা এজেন্সি ছেড়ে বেরোল?’

‘হ্যাঁ। ঠিক আটটা বেজে তেতাল্লিশ মিনিট।’ মরগ্যান একটা সিগারেট ধরাল, ‘এখন থেকে মোটামুটি তিন ঘণ্টা ট্রাকটা সেই বিপজ্জনক বাঁকের কাছে পৌঁছবে। আমি বাজি রেখে বলতে পারি, জিপো আর কিটসন এই গরমে ঝোপের পেছনে বসে গলদঘর্ম হয়ে ট্রাকটার জন্যে অপেক্ষা করছে।’

‘তুমি ঠিকই বলেছ, ফ্র্যাঙ্ক, কাজটা যে বড় সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই—তবে একেবারে সোজা নয়। এর জন্যে আমাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হব।’

‘যদি ভাগ্য সহায় থাকে, তাহলে চিন্তার কোনও কারণ নেই। ভালো কথা—এখন একবার সেই কাফেটায় গিয়ে চোখ বুলিয়ে আসতে হবে। কারণ ওটা লুট করার পর আমরা কোন রাস্তা দিয়ে পালাব সেটা আগে থাকতেই দেখে রাখা দরকার।…শোনো এড, এই ছোট কাজটায় আমাদের কোনও রকম—কোনও রকম ভুল করলে চলবে না; এর ওপরেই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।’

‘শুধু এটা কেন, আসল কাজেও আমাদের কোনও গলতি হবে না।’ আধবোজা চোখে মরগ্যানকে দেখল ব্লেক, ‘এখন থেকে আর কোনও ভুল নয়।’

মরগ্যান মাথা নাড়ল, তারপর গাড়ি ছুটিয়ে দিল সামনের রাস্তা ধরে…।

সাড়ে এগারোটার কিছু পরে কিটসন আর জিপো পৌঁছল সেই বিপজ্জনক বাঁকের কাছে৷ রিসার্চ স্টেশন থেকে বাঁকের দূরত্ব মাইল দুয়েক হবে৷ কিটসন গাড়ি থামাতেই জিপো নেমে পড়ল৷ ঝরঝরে লিংকনটা চালিয়ে নিয়ে কিটসন চলল আশ্রয়ের খোঁজে৷ কিছুদূর গিয়ে একরাশ বুনো ঝোপের আড়ালে জিপোর গাড়িটা লুকিয়ে ফেলল সে৷ তারপর ধীরে ধীরে আবার পা-বাড়াল বাঁকের দিকে—যেখানে দাঁড়িয়ে জিপো তার জন্যে অপেক্ষা করছে৷

সূর্যের প্রখর রোদের তাপ কিটসনের কাছে অসহ্য বলে মনে হয়৷ অল্পক্ষণের মধ্যে সে ঘামাতে শুরু করল৷

কিটসনের পরনে বুক-খোলা গাঢ় নীল রঙের শার্ট, আঁটোসাঁটো কালো প্যান্ট৷ এতক্ষণ গাড়িতে বসে থাকার পর হাত-পা ছড়ানোর সুযোগ পেয়ে তার ভালোই লাগল৷ স্বচ্ছন্দ পদক্ষেপে সে এগিয়ে চলল ধুলোভরা রাস্তা ধরে৷

বাঁকটার সামনে এসে থমকে দাঁড়াল কিটসন৷ চারিদিকে চোখ বুলিয়ে জায়গাটাকে কৌতূহলভরে দেখতে লাগল৷

রাস্তাটা সোজা এসে এই জায়গায় হঠাৎ খানিকটা সরু হয়ে গেছে৷ রাস্তার দু-ধারে পড়ে রয়েছে দুটো বিশাল পাথর, সম্ভবত দু-পাশের পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে এসেছে রাস্তায়৷ পাথরগুলো ঘন ঝোপঝাড়ে ঢাকা—অর্থাৎ গা-ঢাকা দিয়ে অপেক্ষা করার পক্ষে চমৎকার জায়গা৷

কিটসনের হঠাৎ খেয়াল হল, জিপোর যেখানে অপেক্ষা করার কথা সেখানে সে নেই৷ কিন্তু একটা হালকা অস্বস্তিকর অনুভূতি তাকে জানিয়ে দিল জিপো আশেপাশেই কোথাও লুকিয়ে আছে—লক্ষ করছে কিটসনকে৷

কিটসন খুশিই হল৷ জিপোর মতো কোনও স্থূলকায় লোকও যে এত নিখুঁতভাবে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে পারে, তা না দেখলে সে বিশ্বাস করতে পারত না৷ তার হারানো আত্মবিশ্বাস আবার ফিরে এল৷

প্রথম থেকেই এই কাজটায় কিটসনের আপত্তি ছিল৷ কেমন যেন একটা অজানা আতঙ্ক ওর সমস্ত সাহসকে শুষে নিচ্ছিল৷ বারবারই ওর মনে হয়েছে, টমাস অথবা ডার্কসন কিছু একটা গণ্ডগোল না বাঁধিয়ে ছাড়বে না৷

বক্সিং ছাড়বার পর থেকে গত ছ-মাস ধরে কিটসন রয়েছে মরগ্যানের কাছে৷ কিটসনের শেষ লড়াই ছিল একজন বেঁটে-খাটো অনামী মুষ্টিযোদ্ধার সঙ্গে৷ কিন্তু এমনই অদ্ভুত অবাক ব্যাপার, সবাইকে অবাক করে দিয়ে সেই ক্ষিপ্র, খর্বকায় ব্যক্তিটি কিটসনের মতো সা-জোয়ানকে রিংয়ের ভেতর একেবারে তুলোধনা করে ছাড়ল৷

ড্রেসিংরুমে ফেরার পর কিটসনের ম্যানেজার দুটো দশ ডলারের নোট তার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল৷ তারপর মুচকি হেসে, ‘বিদায়, মিঃ হারকিউলিস’ বলে বিদায় নিয়েছিল৷ এবং প্রায় একই সঙ্গে ড্রেসিংরুমে উপস্থিত হয়েছিল ফ্র্যাঙ্ক মরগ্যান৷

ভীষণভাবে আহত কিটসনকে পোশাক পরতে সাহায্য করেছে মরগ্যান৷ তারপর ওকে হাত ধরে নিয়ে গেছে নিজের গাড়িতে৷ গাড়ি করে কিটসনকে ওর বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে সে৷

‘তাহলে রিংয়ের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক শেষ, কী বলো?’ বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে থাকা অবসন্ন কিটসনকে লক্ষ করে প্রশ্ন করেছে মরগ্যান৷ সে কিটসনের শোবার ঘরে একটা ভাঙা চেয়ারে বসেছিল৷ কিটসন জবাব দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না৷ বিষণ্ণভাবে হেসে মাথা নেড়েছে৷

‘তাতে কী হয়েছে?’ মরগ্যানের স্বরে আশ্বাসের সুর, ‘তুমি আর আমি দুজনে এখন থেকে একসঙ্গে কাজ করতে পারি৷ তোমার গাড়ি চালানো আমি দেখেছি: ওরকম গাড়ি চালাতে খুব কম লোকই পারে৷ আমি জনাকয়েক লোক নিয়ে একটা ছোট দল করতে চাই৷ এমন লোক, যারা দ্রুত অথচ নিখুঁতভাবে যে কোনও কাজ হাসিল করতে পারবে, আর সেই সঙ্গে বেশ কিছু টাকাও রোজগার করতে পারবে৷ তোমার কী মত?’

সেই তেইশ বছর বয়েসেই কিটসন হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছে, তার উচ্চাশার কৃষ্ণচূড়া আলোর অভাবে শুকিয়ে গেছে৷ ওর বড় সাধ ছিল নাম করবে, বক্সিংয়ে বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন হবে, কিন্তু সে সবই এখন দুঃস্বপ্নের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, অন্য সব ব্যর্থ মুষ্টিযোদ্ধাদের মতো সেও আজ আশ্রয় নিয়েছে পথপার্শ্বের আবর্জনায়৷ বিবর্ণ ভবিষ্যৎ নিঃসঙ্গ জীবন এবং পকেটের কুড়ি ডলারের কথা ভেবে তার কান্না পেল৷ কিন্তু তবুও তার ইতস্তত ভাব মরগ্যানের চোখ এড়াল না৷

মরগ্যানের কুখ্যাতির কথা কিটসনের অজানা ছিল না৷ মরগ্যান যে পনেরো বছর জেলও খেটেছে, সেকথাও সে জানত৷ তাই সে ইতস্তত করছিল৷ মরগ্যানের দলে যোগ দেওয়া মানে যে অন্ধকার জগতে চিরনির্বাসন সেটা বুঝতে তার দেরি হল না৷ কিন্তু তার চেয়েও ভয়ঙ্কর যে অনিশ্চিত, নিঃসঙ্গ জীবন৷ কিটসন একা একা কী করে আবার নিজের পায়ে দাঁড়াবে৷ কী করে গড়ে তুলবে তার বিবর্ণ ভবিষ্যৎ? সুতরাং নিরুপায় এবং মরিয়া হয়েই মরগ্যানের দলে যোগ দিয়েছিল৷ পরাজিত মুষ্টিযোদ্ধা আলেক্স কিটসন৷

এ পযন্ত যে পাঁচটা কাজ সে মরগ্যানের দলের হয়ে করেছে, তা থেকে তার আর্থিক উন্নতি নেহাত কম হয়নি৷ অবশ্য সে কাজগুলোয় তেমন একটা ঝুঁকি ছিল না; তার ওপর মরগ্যানের সরল অথচ নিখুঁত প্ল্যান সে কাজগুলোকে করে তুলেছিল আরও সহজ। কিটসন জানত, ধরা পড়লে প্রথম অপরাধ হিসেবে তার শাস্তি হবে অত্যন্ত হালকা : বড়জোর তিন থেকে ছ-মাসের জেল।

এ কাজগুলো যে চূড়ান্ত কাজের মহড়া, সেটুকু বোঝবার মতো বুদ্ধি কিটসনের ছিল। কারণ মরগ্যান সম্পর্কে যতটুকু সে জেনেছে,তাতে মনে হয় না, তার মতো লোক এইসব ছোটখাটো কাজ করেই সন্তুষ্ট থাকবে। আজ হোক-কাল হোক, মরগ্যান একটা বড় কাজে হাত দেবেই; এবং ধরা পড়লে তখন শাস্তির পরিমাণও হবে বিশাল—হয়তো বিশ বছরের কারাদণ্ডও হতে পারে। কিটসনের কেন যেন মনে হয়েছে সেই চূড়ান্ত নিয়তি তাকেও রেহাই দেবে না।

উচ্চাশার শেষ ধাপে পৌঁছবার জন্যে সে যখন প্রাণপণে মুষ্টিযুদ্ধ অভ্যাস করছে, তখনই হঠাৎ ওয়েলিং এজেন্সির ড্রাইভারের চাকরিটা কিটসন পেয়ে যায়। কিন্তু হলে কী হবে, সে চাকরি তার কপালে টিকল মাত্র দশদিন। কারণ এজেন্সির নিয়মশৃঙ্খলার সঙ্গে কিটসন পাল্লা দিতে পারেনি। রোজ সময়মতো কাজে আসা তো দূরের কথা, ট্রাক চালাতে গিয়েও তেমন দক্ষতার পরিচয় সে দিতে পারেনি। রিভলভার ছোঁড়া অভ্যাস করার সময় তার এলোমেলো লক্ষ্যভেদ শিক্ষকের বিরক্তিকর কারণ হয়েছে। সুতরাং অনিবার্যভাবেই এজেন্সির ফোরম্যান একদিন কিটসনকে ডেকে তার হিসেব-পত্তর চুকিয়ে দিল এবং উপদেশ দিল রাস্তা দেখতে। সেইখানেই কিটসনের এজেন্সি-অধ্যায়-এর ইতি।

কিন্তু এজেন্সি সম্পর্কে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা লাভের পক্ষে কিটসনের কাছে ওই দশদিনই ছিল যথেষ্ট। এ কাজে হাত দেওয়া মানে যে শঙ্খচূড়ের লেজে পা দেওয়া, সে বিষয়ে তার মনে কোনও সন্দেহ নেই। মরগ্যানের আত্মবিশ্বাস এবং স্পর্ধার কথা ভেবে কিটসনের অবাক লাগল। যেন মুখোমুখি মুষ্টিযুদ্ধে সে জর্জ ফোরম্যানকে চ্যালেঞ্জ করতে চলেছে। সেই লড়াইয়ে কিটসনের জয়লাভের সম্ভাবনা যতটুকু, এই কাজেও মরগ্যানের সাফল্যের সম্ভাবনা ঠিক ততটুকুই—তার বেশি নয়।

কিটসন জানে,টমাস ও ডার্কসন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে হার স্বীকার করবে না, বরং রিভলভার চালাবার চেষ্টা করবে—হয়তো কেউ মারাও পড়বে। আর তারপর যদি কিটসন পুলিশের হাতে ধরা পড়ে, তাহলে বিশ বছরের জেল, নয়তো সোজা ইলেকট্রিক চেয়ার।

কিটসন ঠিক করেছিল, এ কাজে হাত দেওয়ার চেয়ে সে দল ছেড়েই চলে যাবে৷ চলেও হয়তো যেত, যদি না এর মধ্যে জিনি এসে উপস্থিত হতো৷

জিনির মতো করে কোনও মেয়ে আজ পর্যন্ত কিটসনের সঙ্গে কথা বলেনি, এমন অদ্ভুতভাবে কোনওদিন তাকায়নি৷ মেয়েটার এই বিশেষত্বই কিটসনকে মুগ্ধ করেছে৷ এমন কী প্রথম সাক্ষাতের নেশাটুকুও সে কাটিয়ে উঠতে পারছে না৷ তার চোখের সামনে ভাসছে জিনির একরাশ তামাটে চুলের জলছবি, ও সাগর-সবুজ চঞ্চল চোখজোড়া…

অর্থাৎ জিনির জন্যে, কেবলমাত্র জিনির জন্যেই সে এই কাজে মরগ্যানকে সমর্থন করছে৷ কিটসন জানে, এই দুঃসাহসের পরিণতি তেমন মধুর হবে না; হয়তো চরম পরিণতির মুখোমুখি তাকে দাঁড়াতে হবে—কিন্তু তবুও সে পিছিয়ে আসতে পারছে না৷ পারছে না জিনির উপহাসের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে৷

চারদিকে চেয়ে আরও একবার জিপোকে খুঁজল কিটসন, কিন্তু কোথাও ওকে দেখতে পেল না৷’

‘ঠিক আছে, জিপো—এবার বেরিয়ে এসো৷’ কিটসন উঁচু গলায় ডেকে উঠল৷

একটা ঘন ঝোপের আড়াল থেকে হাসিমুখে উঠে দাঁড়াল জিপো৷ কিটসনের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ল৷

‘কিরকম লুকিয়েছি বলো? এক্কেবারে হাপিস!’ তুড়ি বাজিয়ে এক অদ্ভুত ইশারা করল জিপো৷

কিটসন এগিয়ে গেল জিপোর কাছে৷

‘লুকোবার একটা জায়গা বটে!’ উবু হয়ে জিপোর পাশে বসে জায়গাটা দেখতে লাগল সে৷ তারপর একপলক হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আর মিনিট কুড়ির মধ্যেই ওরা এসে পড়বে—যদি অবশ্য রাস্তায় কোথাও না থামে৷’

জিপো চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল মাটির ওপর৷ ওপরের অবতল নীল আকাশের দিকে শূন্য চোখে চেয়ে একটা কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচাতে লাগল৷

‘নীল আকাশের দিকে তাকালেই আমার দেশের কথা মনে পড়ে, আলেক্স৷ মনে পড়ে সেখানকার আকাশ যেন এর চেয়েও সুন্দর এর চেয়েও নীল৷’

‘কিটসন তাকাল জিপোর দিকে৷ জিপোকে তার ভালো লাগে৷ এই সাদাসিধে লোকটার সহানুভূতি ভরা মন সবাইকে কাছে টানে৷ না, জিপোর স্বভাব মোটেই ব্লেকের মতো নয়৷ ব্লেকের মুখে সবসময় মাগী চরানোর গল্প৷ তাছাড়া কথায়-কথায় হাত চলে৷ আর যে সব রসিকতা সে করে, তা সবসময়েই প্র্যাকটিক্যাল জোক৷

এমনিতে এডের সাহস আছে, বুদ্ধি আছে—কিন্তু তার বন্ধুত্ব কিটসন কেন, আরও অনেকেরই কাম্য নয়৷ অথচ জিপো একেবারে আলাদা৷ কারও বিপদে সাহায্য করার জন্যে সে সর্বদা এগিয়ে আসে৷ নিজের পকেটের শেষ ডলারটা পর্যন্ত ধার দিতে সে দ্বিধা করে না৷ কিন্তু ব্লেকের কাছ থেকে কোনও সাহায্য নেওয়া মানে বঁড়শি গেলা৷

‘কোথায় দেশ তোমার জিপো?’ কিটসন উপুড় হয়ে শুয়েছিল৷ অতি সন্তর্পণে মাথা উঁচিয়ে সে সামনের রাস্তার দিকে দেখল৷

‘ফিসোলে৷ ইটালির ফ্লোরেন্সের কাছাকাছি৷’ মুখে গভীর চিন্তার ভাব ফুটিয়ে জিপো বলল, ‘তুমি কোনওদিন ইটালিতে গেছ, আলেক্স?’

‘উঁ—হুঁ—’

‘যাওনি? গেলে বুঝতে পারতে পৃথিবীতে তার চেয়ে সুন্দর দেশ আর নেই৷’ জিপোর বুক ঠেলে বেরিয়ে এল একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস, ‘আর বিশ বছর হল আমি দেশের মুখ দেখিনি৷ বি-শ-ব-ছ-র! এই টাকাটা পেলে কী করব জানো? সোজা দেশে ফিরে যাব৷ প্রথমেই জাহাজের ফার্স্ট ক্লাসের একটা টিকিট কাটব৷ ইটালি পৌঁছে একটা চোখ ঝলসানো গাড়ি কিনব৷ সেটা চালিয়ে সোজা গিয়ে হাজির হব বাড়িতে—মার কাছে। আমাকে দেখে ভীষণ অবাক হয়ে যাবে৷…তারপর একটা বাগানবাড়ি কিনব পাহাড়ের ওপরে৷ যেখান থেকে পুরো ফ্লোরেন্স শহরটাকে দেখা যাবে৷ … আলেক্স, আমার বাবা মারা গেছে প্রায় বারো বছর হল, কিন্তু মা আজও আমার ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে৷ ভাবছি, ফিরে গিয়ে একটা বিয়ে-টিয়ে করে ফেলব৷ ছেলে-মেয়ে নিয়ে কাটিয়ে দেব বাকি জীবনটা৷…টাকা থাকলে সবই হয়৷ ফ্র্যাঙ্ক ঠিক বলেছেঃ হাতের মুঠোয় পৃথিবী! সত্যিই তো ইচ্ছে করলে দশ লাখ ডলার দিয়ে আমরা পৃথিবীটাকে কিনে ফেলতে পারি৷’

যদি না পুলিশের গুলিতে মারা যাও—ভাবল কিটসন৷ যদি না জাহাজে ওঠার আগে পুলিশের হাতে ধরা পড়৷

জিপো খুশিভরা চোখে তাকাল কিটসনের দিকে৷ হাতের ওপর মাথা রেখে প্রশ্ন করল, ‘তোমার টাকা নিয়ে কী করবে ভাবছ? কিভাবে খরচ করবে কিছু ঠিক করেছ?’

জিপোর কথা শুনে কিটসনের মনে হল সে যেন কোনও অপরিণতিবুদ্ধি কিশোরের সঙ্গে কথা বলছে৷

‘আমার মনে হয় টাকাটা হাতে পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাই ভালো৷ সাত-তাড়াতাড়ি এতসব পরিকল্পনা করার কোনও মানে হয় না৷ বলা যায় না, শেষ পর্যন্ত হয়তো আমরা হেরে গেলাম—তখন সমস্ত স্বপ্ন এক ঝাপটায় মিলিয়ে যাবে৷’

জিপো একটু যেন অস্বস্তিবোধ করল, ‘একটা কথা কী জান আলেক্স? জীবনে স্বপ্ন দেখাটাই সবচেয়ে সুন্দর জিনিস৷ জানি, সে স্বপ্ন হয়তো কোনওদিন বাস্তবে রূপ নেবে না৷ কিন্তু তবুও স্বপ্ন দেখার এক অদ্ভুত আনন্দ আছে৷ আমি সবসময় আসন্ন ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল ভাবতে ভালোবাসি৷ এ আমার বহু বছরের স্বভাব৷ স্বীকার করছি, আজ পর্যন্ত আমার সমস্ত স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে, কিন্তু এবারের কথা আলাদা৷ দু-লক্ষ ডলার!…এত টাকা কিভাবে খরচ করব ভেবে পাচ্ছি না!’

কিটসন কাঁধ ঝাঁকল, হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হচ্ছে৷ কিন্তু আসল কথাটা কী জানো? টাকাটাই এখন আমরা হাতে পাইনি৷’ কথা শেষ করে হাসল কিটসন৷

‘আমি বাজি রেখে বলতে পারি তুমি প্রথমেই একটা গাড়ি কিনবে৷’ জিপো শুকনো মাটি মুঠো করে তুলে হাত মেলে ধরল৷ তার মোটাসোটা আঙুলের ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়ল ধুলোর ঝরনা৷ সেদিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘বলো আলেক্স, ঠিক বলছি কি না? আমি জানি, তুমি গাড়ি চালাতে ভালোবাস৷ তোমার মতো গাড়ি চালাতে আমি কাউকে দেখিনি৷ সুতরাং প্রথমেই তোমার একটা স্পোর্টস কার কেনা উচিত। তারপর খুঁজে পেতে নিজের জন্যে একটা সুন্দরী বউ জোগাড় করো—তারপর বাকি জীবনটা সুখে কাটিয়ে দাও। মাথা দুলিয়ে হাসল জিপো, ‘আচ্ছা, জিনিকে তোমার কেমন লাগে বলো তো? দারুণ দেখতে, না? একটা কথা শুনে রাখো আলেক্স—ইটালির মতো জায়গাতেও জিনির মতো সুন্দরী খুব কমই আছে। তবে মেয়েটা আমার তুলনায় বড্ড বাচ্চা; তা না হলে ওকে নিয়ে আমি ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখতাম।…তোমার সঙ্গে জিনিকে কিন্তু দারুণ মানাবে আলেক্স। ওর রুক্ষ ব্যবহারকে তেমন আমল দিও না। ও সবই ওপর-ওপর। তুমি যদি ওর হৃদয়ে পৌঁছতে পার, তবে দেখবে ওর ভেতরটা আর সব মেয়ের মতোই সুন্দর নরম। আমার তো মনে হয়, তোমাকে ও কিছুতেই ফেরাতে পারবে না ।’

কিটসন চুপচাপ শুনল। উন্মুক্ত ঘাড়ে অনুভব করল উত্তপ্ত সূর্যের পরোক্ষ স্পর্শ। জিপো ছাড়া যদি অন্য কেউ তাকে এ ধরনের কথা বলত,তাহলে সে মোটেই আমল দিত না। কিন্তু জিপো একেবারে তার মনের কথা বলছে। কথাগুলো ভেবে কিটসনের অবাক লাগল। কে জানে, হয়তো জিপোর কথাই ঠিক।

জিনিকে বুঝতে কিটসন হয়তো ভুল করেছে। হয়তো… কিন্তু যখনই জিনির ঠান্ডা সবুজ চোখজোড়া চোখের সামনে ভেসে উঠছে, তখনই কিটসনের মনে দ্বিধার ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে। সত্যিই কি জিনি তার আহ্বানে সাড়া দেবে?

‘আলেক্স, আমার একটা কথার খোলাখুলি জবাব দাও তো? ‘সূর্যের আলো সরাসরি মুখে এসে পড়ায় চোখ বুজল জিপো, ‘তুমি সত্যি-সত্যি কি ভাবছ জিনির কথা?—জানো, তোমার জন্যে মাঝে মাঝে আমার চিন্তা হয়। এই কথায় তোমার হয়তো হাসি পাবে, কিন্তু আমি ঠাট্টা করছি না, আলেক্স। কাল রাতে ফ্র্যাঙ্কের কথায় যখন মনে মনে রাজি হলাম, তখনও আমি তোমার কথা ভেবেছি। আমি জানতাম, আমার মতো তোমারও এ কাজে অন্তরের সায় নেই। তুমি এ কাজটা চাওনি,তাই না? আমিও চাইনি। কিন্তু পর মুহূর্তেই তুমি হঠাৎ মনস্থির করে বসলে, তুমি রাজি। কেন? আমাকে সোজাসুজি জবাব দাও।’

হাতের উলটোপিঠ দিয়ে কিটসন কপালের ঘাম মুছল, ‘আগে বলো তোমার রাজি হওয়ায় কারণ কী?’

‘মেয়েটার কথায় কী যেন একটা আছে।’মৃদু স্বরে উত্তর দিল জিপো, ‘ও যখন ঘরে ঢুকল, তখন ওকে দেখে অবাক হলাম। ওর কথা বলার জোরালো ভঙ্গি, আত্মবিশ্বাস আমাকে অবাক করল। আমি যেন নিজের ওপর আস্থা ফিরে পেলাম। ফ্র্যাঙ্কের কাছে যখন কাজটা সম্পর্কে শুনেছি, তখন একেবারেই রাজি হইনি। সমস্ত প্ল্যানটাকে কেমন খেলো আর অবাস্তব বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু জিনি এসে সব ওলট-পালট করে দিল। মনে হল মেয়েটার প্ল্যান নেহাত পলকা নয়। তার ওপর দু-লক্ষ ডলারের হাতছানি আমাকে পাগল করে তুলল। এতদিনকার বাড়ি-গাড়ির স্বপ্ন—সব যেন এসে ভিড় জমালো ব্রেনের কোষে কোষে! আমাকে দামি স্যুট পরে, চোখ-ঝলসানো গাড়ি থেকে নামতে দেখে মায়ের অবিশ্বাস-ভরা খুশি-খুশি মুখটা যেন চোখের সামনে দেখতে পেলাম। কী জানি কী হয়ে গেল, রাজি হয়ে গেলাম।’

‘হুঁ, তুমি ঠিকই বলেছ। মেয়েটার মধ্যে কী যেন একটা আছে।’ কিটসনের স্বরে অস্বস্তির সুর, ‘তাই তোমার মতো আমিও রাজি হয়ে গেলাম।’

সে যে জিনির ঘৃণার মুখোমুখি দাঁড়াতে না পেরে মরগ্যানের সপক্ষে ভোট দিয়েছে, সে-কথা কিটসন মরে গেলেও স্বীকার করতে পারবে না। জিপোর মতো সে অত আশাবাদী নয়। বারবারই তার মনে হয়েছে, এ কাজে হাত দিয়ে ফ্র্যাঙ্ক ভালো করেনি—এবং এই প্রথম যে তাদের পরাজয় স্বীকার করতে হবে, সে বিষয় কিটসন মোটামুটি নিশ্চিত। শুধু তার দুঃখ হচ্ছে জিপোর জন্যে। গো-বেচারা লোকটা এখন থেকেই খোয়াব দেখতে শুরু করেছে। কিন্তু কিটসন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, নিয়তি তার সূক্ষ্ম জাল অতি সন্তর্পণে তাদের চারিদিকে গুটিয়ে আনছে।

‘আশ্চর্য ব্যাপার, তাই না? ওইটুকু একটা বাচ্চা মেয়ে কি না আমাদের রাজি করিয়ে ছাড়ল? এখন মনে হচ্ছে…’ আচমকা থেমে গেল জিপো। মাথা তুলে ক্ষুদে-ক্ষুদে কালো চোখ সতর্কভাবে মেলে ধরল। চকিতে দেখল চারপাশের ঝোপঝাড়ের দিকে।

কিটসন অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘কী, ব্যাপার?’

‘কিসের যেন একটা শব্দ হল না?’ জিপোর কান খাড়া করে স্থিরভাবে বলে, ‘যেন কিছু একটা চলে বেড়াচ্ছে? সাপ নয়তো, আলেক্স?’

‘সাপ? তো কী হয়েছে? সাপ আমাদের ধারে কাছেও ঘেঁষবে না৷’ জিপোর বিবর্ণ ভয়ার্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বলল কিটসন৷ সে চাইছিল জিনি সম্পর্কিত কথাবার্তা চালিয়ে যেতে৷ জিনিই এখন তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷

‘বলা যায় না, এসব জায়গায় সাপের উপদ্রব থাকতে পারে, আলেক্স৷’ জিপোর জলহস্তী চেহারা ভয়ে কাঠ৷ শুকনো গলায় ও বলে চলল, ‘আর এমনিতেই সাপকে আমি খুব ভয় পাই৷ আমার যেন মনে হল ও-পাশ দিয়ে কী একটা চলে গেল৷’

মুখভাবে বিরক্তি প্রকাশ করে কিটসন ঘুরে তাকাল জিপোর নির্দেশিত জায়গার দিকে৷ কিন্তু কিছুই তার চোখে পড়ল না৷

‘আলেক্স, আমার ছোট ভাই সাপের কামড়ে মারা গিয়েছিল৷ আমি এইমাত্র যেভাবে শুয়েছিলাম সেও ঠিক এইভাবেই শুয়েছিল৷ আর কোত্থেকে হঠাৎ একটা সাপ এসে ছোবল মারল ওর মুখে৷ ওকে কোলে করে বাড়ি পৌঁছবার আগেই ও মারা গেল৷ দশ বছরের মাখন-নরম বাচ্চা ছেলেটা দেখতে দেখতে নীল হয়ে গেল—ওর চোখে মুখে ফুটে উঠেছিল অমানুষিক যন্ত্রণার ছাপ৷ এই সাপটা…’

কিটসনের রুক্ষ স্বরে চুপ করে গেল জিপো৷

“ভগবানের দোহাই, জিপো৷ দয়া করে তোমার বকবকানি বন্ধ করো৷ কে তোমার ছোট ভাইয়ের কথা শুনতে চেয়েছে? মানলাম সে সাপের কামড়ে মারা গেছে, কিন্তু সাপের কামড়ে কি কেউ মারা যায় না?’

জিপো মুখ তুলে তাকাল কিটসনের দিকে৷ চোখের দৃষ্টিতে ঘৃণা৷

‘তোমার ভাই যদি এইভাবে সাপের ছোবলে মারা যেত, তাহলে তুমি আর এ ধরনের কথা বলতে না, আলেক্স৷ আমার ছোট ভাইয়ের সেই করুণ মৃত্যুর কথা আমি কি কোনওদিন ভুলতে পারব? তারপর থেকেই কেন জানি না, সাপ দেখলেই আমার ভীষণ ভয় করে৷’

‘কোথায় মেয়েটাকে নিয়ে দিব্যি কথা বলছিলাম, আর মাঝখান থেকে তুমি এই সাপের ব্যাপারটা টেনে আনলে!’ অধৈর্য সুরে বলে উঠল কিটসন৷

‘না, আমার মনে হল যেন কিসের একটা শব্দ শুনলাম; তাই।’

‘ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে—মেনে নিলাম তুমি একটা অদ্ভুত শব্দ শুনেছে৷ কিন্তু তাই বলে ধরে নিলে ওটা সাপের চলাফেলার শব্দ? তোমার এই কল্পনার বলিহারি যাই—হুঁঃ!’

জিপো একটা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বহুদূরে চলন্ত ধুলোর মেঘ চোখে পড়ায় চুপ করে গেল৷ হাত বাড়িয়ে কিটসনের কাঁধে হাত রাখল৷ আঙুল দেখাল ধুলোর কুণ্ডলীর দিকে৷

‘ওরাই আসছে বলে মনে হচ্ছে না৷’

কিটসন একচোখে চেয়ে রইল সুদূরপ্রসারী আঁকাবাঁকা রাস্তার দিকে৷ একটা জমাট আতঙ্কের পিণ্ড তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে দিতে চাইল৷

সহজাত অনুভূতিবশেই মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল সে৷ হাত বাড়িয়ে জিপোকে নিচু হতে বলল৷ জিপো শুনতে পেল তার চাপা উত্তেজিত ফিসফিসে কণ্ঠস্বর, ‘লুকিয়ে পড়ো! ওরাই আসছে!’

পাথরের মতো নিশ্চলভাবে পড়ে থেকে ওরা লক্ষ করতে লাগল দ্রুত এগিয়ে আসা ট্রাকটাকে৷

সামনের একটা বাঁকে ট্রাকটা মুহূর্তের জন্যে অদৃশ্য হল। কিন্তু পরমুহূর্তেই আবার হাজির হল ওদের অপলক চোখের সামনে। ওরা লক্ষ করল, এবারে ট্রাকটার গতি যেন কিছুটা কমে গেছে। সম্ভবত বিপজ্জনক বাঁকের কাছে পৌঁছে ওরা কোনওরকম দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিতে চাইছে না। ট্রাকটা ওদের অতিক্রম করার সময় কিটসন হাতঘড়িতে সময় দেখল।

হাওয়ায় ঝাপটা দিয়ে ধুলো উড়িয়ে ট্রাকটা বেরিয়ে যাওয়ার সময় পলকের জন্যে ওরা দেখতে পেল টমাস এবং ডার্কসনকে।

চলন্ত ট্রাকের ছবিটা মনের পরদায় খোদাই করে জিপো উঠে বসল।

ট্রাকটা একটা বাঁকের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যেতেই ওরা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ধুলোর মেঘ থেকে চোখ সরিয়ে অস্বস্তিভরা চোখে তাকাল পরস্পরের দিকে।

‘একটা ট্রাক বটে!’ জিপো গাল চুলকোতে লাগল, ‘কিন্তু লোক দুটোকে দেখেছ? যেন শয়তানের চ্যালা!’

চলন্ত ট্রাকে বসে থাকা টমাস ও ডার্কসনকে কিটসন বেশ ভালোভাবেই দেখতে পেয়েছে। মোটামুটি ভালোভাবেই সে ওদের দুজনকে চেনে। তাই মরগ্যানকে বারবার সে সাবধান করে দিয়েছে। এখন ওদের দেখার পর কিটসনের সেই পুরোনো ভয়টা আবার ফিরে এল। উইন্ডশিল্ডের ও-পিঠে বেজির চোখ নিয়ে বসে-থাকা টমাস ও ডার্কসনের ছবি তার মনে টেনে দিল এক আতঙ্কের পরদা। কিটসনের মনে পড়ল, আর কিছুদিনের মধ্যেই ওদের সামনে তাকে মুখোমুখি চ্যালেঞ্জে দাঁড়াতে হবে। কেউ যেন একমুঠো বরফ-কুচি ছড়িয়ে দিল তার মস্তিস্কে।

‘তুমি এ জন্যে ভেবে ভয় পাচ্ছ, জিপো? সহজ হওয়ার চেষ্টা করল কিটসন, ‘তোমাকে তো আর ওদের সামনে আসতে হচ্ছে না! আর তাছাড়া, আমরাই কি কম নাকি? ওরা যদি শয়তানের চ্যালা হয় তবে আমরাও অনুবিসের অনুচর।’

জিপো অস্বস্তিভরে মাথা নাড়ল, ‘ওদের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে না ভেবে আমি সত্যিই হালকা বোধ করছি। ওরা নেহাত সহজ লোক নয়!’

কিটসন পকেট থেকে একটা নোটবই বের করল। তাতে ট্রাকের বিপজ্জনক বাঁক অতিক্রম করার সময়টা টুকে নিল।

‘তোমাকে কিছু ভাবতে হবে না। মরগ্যান আর ব্লেকই ওদের সামলাবে।’ বিরক্তিভরে জবাব দিল কিটসন।

‘কিন্তু জিনি? ওর কথাটা একবার ভেবে দেখেছ? ওইটুকু একটা মেয়ে, সে বলে কি না দরকার পড়লে গুলি চালাবে! আমার তো বিশ্বাসই হতে চায় না! তোমার কি মনে হয় ও সত্যি-সত্যিই তাই করবে?

কিটসন বারবার এই কথাটাই ভাবছিল। ভাবছিল, জিনি সত্যিই কি তা পারবে। সে যেন দেখতে পেল জিনির অতলান্ত সবুজ চোখ, উৎকণ্ঠাময় অভিব্যক্তি।

ঠোঁট উলটে জিপোর কথায় জবাব দিল কিটসন, ‘কী জানি?’ যাকগে, এবার চলো।’ হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে বসল সে। চোখ চেয়ে রাস্তাটা একবার এদিক-ওদিক দেখে নিল, কিন্তু জিপো, ট্রাকটাকে তুমি খুলতে পারবে তো?’

‘ফ্র্যাঙ্ক তো বলেছে ট্রাকটা খুলতে আমাকে তিন-চার সপ্তাহ সময় দেবে। তাহলে তো ভাবনার কোনও কারণ নেই। যন্ত্রপাতি আর সময় ঠিক মতো পেলে আমি খুলতে পারব না এমন তালা আজ পর্যন্ত তৈরি হয়নি। অতএব ফ্র্যাঙ্ক যদি আমাকে তিন-চার সপ্তাহ সময় দিতে পারে তবে নির্ভাবনায় থাকো। ওই শালার ট্রাক আমি খুলবই! আমারও নাম জিপো ম্যানডিনি!’

‘ফ্র্যাঙ্কও সেই কথাই বলছিল; কিন্তু মনে করো যদি কিছু একটা গোলমাল হয়ে যায়। যদি তোমাকে তাড়াহুড়োর মধ্যে ট্রাকের তালা ভাঙতে বলা হয় তাহলে কি তুমি পারবে, জিপো?’

জিপোর ভরাট মুখে পলকের জন্যে কেঁপে উঠল অস্বস্তির ছায়া, ‘এ কথা কেন বলছ, আলেক্স? ফ্র্যাঙ্ক তো আমাকে কথা দিয়েছে তিন-চার সপ্তাহ সময় দেবে। তাহলে আর ভয় কী? এতদিন ধরে তা দেখছি ফ্র্যাঙ্কের কথার কোনও নড়চড় হয়নি! তোমার তালা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা না থাকলেও বেশ বুঝতে পারছ এই ট্রাকটা খোলা ছেলেখেলার কথা নয়। ধীরে, অথচ নিখুঁতভাবে এই তালা খুলতে হবে—আর তার জন্যে সময় চাই। সুতরাং তাড়াহুড়ো করে সম্ভব নয়।’

‘তুমি এখানে অপেক্ষা করো,আমি গাড়িটা নিয়ে আসছি।’ কিটসন এগিয়ে চলল গাড়ির সন্ধানে।

জিপো চিন্তিতভাবে তাকিয়ে রইল কিটসনের দিকে। কিন্তু মনে মনে ভেবে চলল জিনির কথা, ওর প্রতিটি ভাব-ভঙ্গি, কিটসনের সঙ্গে ওর কথা বলার ধরন। শেষ পর্যন্ত নিশ্চিন্ত বোধ করল জিপো!

এই কাজটা নিয়ে এত আলোচনার কী আছে? ভাবল সে অনুভব করল সূর্যের অসহ্য উত্তাপ। ফ্র্যাঙ্ক যখন ওদের আশ্বাস দিয়েছে, তখন কোনও ভয় নেই। তার ওপর ওই পুঁচকে মেয়েটা যেন ধরেই নিয়েছে দু-লক্ষ ডলার ওর হাতের মুঠোয়। তাছাড়া, এ কাজে জিপোর ভূমিকা খুব একটা বিপজ্জনক নয়! তাকে শুধু ট্রাকের তালাটা খুলতে হবে। আর ফ্র্যাঙ্ক যখন বলেইছে, ওকে তিন-চার সপ্তাহ সময় দেওয়া হবে, তখন আর চিন্তার কী আছে? তালা এবং বিভিন্ন ধাতু সম্বন্ধে যাদের একটু অভিজ্ঞতা আছে, তারা ওই সময়ে যে কোনও তালাই খুলে ফেলতে পারবে—তা সে যত শক্তই হোক!

ওয়েলিং আর্মার্ড ট্রাক নিঃশব্দে এগিয়ে গেল রিসার্চ স্টেশনের দিকে। তার চালক অথবা রক্ষী, কেউই জানতে পারল না চারজোড়া অনুসন্ধানী চোখ তাদের দৈনন্দিন কর্মপন্থাকে ব্যবচ্ছেদ করে দেখছে। সাদা ধুলোর কুণ্ডলীকে পিছনে ফেলে ওরা এগিয়ে চলল…