গল্প
উপন্যাস

আলোছায়ার খেলা – ৩

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

‘গার্ল কোভ’ -এর ওপরে নরম ঘাসে ছাওয়া সমতলে পাশাপাশি বসেছিলেন রোজামন্ড ডার্নলি ও কেনেথ মার্শাল৷ দ্বীপের পূর্বদিকে অবস্থিত এই গোল কোভ৷ নির্জনে স্নান করতে ভোরের দিকে লোকে এখানে আসে৷

রোজামন্ড বলল, ‘লোকজনের সঙ্গ ছেড়ে নির্জনে কাটাতে বেশ ভালো লাগে৷’

নিচু স্বরে বিড়বিড় করলেন মার্শাল, ‘ম্‌-ম্‌-হুঁ৷

উপুড় হয়ে ছোট ছোট ঘাসের গন্ধ নিলেন তিনি৷

‘আ-হ—চমৎকার গন্ধ! শিপলির সেই মাঠগুলোর কথা মনে পড়ে?’

‘পড়ে৷’

‘দিনগুলো কি সুন্দর ছিলো৷’

‘হুঁ৷’

‘তুমি বেশি বদলাওনি, রোজামন্ড৷’

‘হ্যাঁ, বদলে গেছি৷ অনেক বদলে গেছি৷”

‘এখন তোমার অনেক নাম হয়েছে, অনেক টাকা-পয়সা হয়েছে, কিন্তু তুমি সেই পুরনো রোজামন্ডই আছো৷’

রোজমন্ড মৃদুস্বরে বলল, ‘যদি তাই থাকতে পারতাম—’

‘তার মানে?’

‘কিছু না৷ ভাবতে দুঃখ হয়, কেনেথ, যে ছোটবেলাকার সুন্দর স্বভাব উঁচু আদর্শ, কোনটাই আমরা চিরকাল ধরে রাখতে পারি না, তাই না?’

‘তোমার স্বভাব যে কোনকালে সুন্দর ছিলো, তার পরিচয় অন্তত আমি পাইনি, বৎসে৷ মাঝে মাঝেই যেভাবে রেগে উঠতে তুমি? একদিন তো রাগে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার গলাই টিপে ধরেছিলে৷’

রোজমণ্ড সশব্দে হাসলো, যেদিন টোবিক নিয়ে আমরা ভোঁদর ধরতে গিয়েছিলাম, সে দিনটা তোমার মনে আছে?…’

অতীত অভিযানের স্মৃতিচারণে এভাবেই কেটে গেলো বেশ কিছু সময়৷

অবশেষে নেমে এলো কয়েক মুহূর্তের নীরবতা৷

রোজামন্ডের আঙুল ওর ব্যাগের ফিতে নিয়ে খেলা করতে লাগলো৷ অবশেষে ও বললে, ‘কেনেথ?’

‘উঁ—’ কেনেথ মার্শালের উত্তর এলো অস্পষ্ট স্বরে৷ তিনি তখনও নরম ঘাসে মুখ ডুবিয়ে শুয়ে আছেন৷

‘যদি আমি এমন কিছু বলি, যা হয়তো পুরোপুরিই অনধিকার চর্চা, তাহলে কি তুমি আমার সঙ্গে আর কথা বলবে না?’

কেনেথ মার্শাল ঘুরে উঠে বসলেন৷

‘আমার মনে হয় না,’ তিনি আন্তরিক সুরেই বললেন, ‘যে তোমার কোন কথাকে আমি কখনও অনধিকার চর্চা বলে-ভাবতে পারি৷ তুমি তো জানো, তোমার সে অধিকার আছে৷’

রোজামন্ড নিঃশব্দে ঘাড় নেড়ে কেনেথে মার্শালের শেষ কথাগুলোর অর্থ মেনে নিলো৷ ও শুধু গোপন করলো এই মুহূর্তে পাওয়া ওর ক্ষণিকের সুখটুকু৷

‘কেনেথ, তোমার স্ত্রীর কাছে তুমি বিবাহ-বিচ্ছেদ চাইছো না কেন?’

কেনেথ মার্শালের মুখমণ্ডলে পরিবর্তন এলো৷ খুশি খুশি অভিব্যক্তিটুকু ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে নেমে এলো কঠিনতার ছোঁয়া৷ পকেট থেকে পাইপ বের করে তিনি নিঃশব্দে তামাক ভরতে লাগলেন৷

রোজামন্ড বললো, ‘তোমাকে আঘাত দিয়ে থাকলে দুঃখিত৷’

তিনি শান্ত স্বরে বললেন, ‘না, আঘাত তুমি আমাকে দাওনি৷’

‘তাহলে, কেন তা করছো না?’

‘ও তুমি বুঝবে না, রোজামন্ড—’

‘তুমি কি ওকে খুব ভালোবাসো?’

‘এটা শুধু ভালোবাসাবাসির প্রশ্ন নয়৷ আমি ওকে বিয়ে করেছি৷’

‘জানি৷ কিন্তু ওর—ওর অনেক বদনাম আছে৷’

সতর্ক হাতে তামাক ঠুকতে ঠুকতে কথাটা কিছুক্ষণ ভাবলেন তিনি৷

‘কি জানি, হয়তো আছে৷’

‘তুমি ওকে ডিভোর্স করতে পারো, কেন৷’

রোজামন্ড সোনা, এ নিয়ে তোমার মাথা না ঘামানোই ভালো৷ পুরুষেরা ওকে দেখে জ্ঞানগম্যি হারিয়ে ফেলে বলে এ কথা মনে করার কোন কারণ নেই, যে ওর ও ওই একই অবস্থা হয়৷’

রোজামন্ড মুখের মতো একটা জবাব দিতে গিয়েও থেমে গেলো৷ তারপর বললে, ‘তবে এমন একটা ব্যবস্থা করো যাতে ও তোমাকে ডিভোর্স করে—যদি তুমি সে ভাবেই চাও৷’

‘তা বোধহয় সম্ভব নয়৷’

‘কিন্তু তোমাকে পারতেই হবে, কেন৷ আমি ঠাট্টা করে বলছি না৷ তোমার মেয়ের কথাটাও ভাবতে হবে৷’

‘লিন্ডা?’

‘হ্যাঁ, লিন্ডা৷’

‘এর সঙ্গে লিন্ডার কি সম্পর্ক?’

লিন্ডার পক্ষে আর্লেনা মোটেই ভালো নয়৷ আমার ধারণা, লিন্ডা আজকাল অনেক কিছু বেশ বুঝতে পারে৷’

কেনেথ মার্শাল দেশলাই জ্বেলে পাইপে অগ্নিসংযোগ করলেন, ধোঁয়া ছাড়বার ফাঁকে তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, সে কথা মিথ্যে নয়৷ আমারও মনে হয় আর্লেনা ও লিন্ডা ঠিক মানিয়ে চলতে পারছে না৷ একটা ছোট মেয়ের পক্ষে এটা ভালো নয়৷ সেই জন্যেই আমার দুশ্চিন্তা হয়৷’

রোজামন্ড বললো, ‘লিন্ডাকে আমার খুব ভালো লাগে৷ ওর মধ্যে ভালো লাগার মতো কি যেন একটা আছে৷’

কেনেথ বললেন, ‘ও ঠিক ওর মায়ের মতো৷ সব কিছু ভীষণ গভীরভাবে নেয়, যেমন রুথ নিতো৷’

রোজামন্ড বললো, এরপরে কি তোমার মনে হয় না, আর্লেনাকে তোমার ত্যাগ করা উচিত?’

‘বিবাহ-বিচ্ছেদের মামলা সাজিয়ে?’

‘হ্যাঁ৷ আজকাল সবাই তাই করে৷’

আকস্মিক রুক্ষ স্বরে বলে উঠলেন, কেনেথ মার্শাল, ‘হ্যাঁ করে, আর ঠিক ওই জিনিসটাই আমি সবচেয়ে বেশি ঘেন্না করি৷’

‘ঘেন্না করো?’ ও ভীষণ চমকে গেলো৷

‘হ্যাঁ৷ জীবন যেন আজকাল বড় খেলো হয়ে গেছে৷ যদি কোন জিনিস নিয়ে পরে সেটা ভালো না লাগে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সেটাকে ত্যাগ করতে আজ আর কোন বাধা নেই! আশ্চর্য! মানুষের মনে বিশ্বাস বস্তুটা অন্তত থাকা উচিত৷ তুমি যদি কোন মেয়েকে বিয়ে করে তার ভরণপোষণের ভার নাও, তাহলে সেই কর্তব্য পালনের দায়িত্ব একমাত্র তোমার৷ কারণ, তুমিই এ খেলা শুরু করেছো৷ সহজ বিয়ে এবং আরও সহজ বিবাহ-বিচ্ছেদে আমার ঘেন্না ধরে গেছে৷ আর্লেনা আমার স্ত্রী, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় কথা৷’

রোজামন্ড সামনে ঝুঁকে এলো, নিচু স্বরে বললো, ‘তাহলে ব্যাপারটা তোমার কাছে অনেকটা সেইরকম? ‘যতদিন না মৃত্যু আমাদের বিচ্ছিন্ন করে?’

কেনেথ মার্শাল মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন৷

তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক তাই৷’

রোজমণ্ড বলল, ‘ও!’

একটি সঙ্কীর্ণ সর্পিল পথ ধরে লেদারকোম্ব উপসাগরে ফেরার পথে একটা বাঁকের মুখে মিসেস রেডফার্নকে আর একটু হলেই চাপা দিচ্ছিলেন হোরেস ব্ল্যাট৷

ক্রিস্টিন রাস্তার পাশে সারি দেওয়া ঝোপের গা ঘেঁষে দাঁড়াতেই সশব্দে ব্রেক কষে সানবীম থামালেন মিঃ ব্ল্যাট৷

‘এই যে!’ উৎফুল্ল কণ্ঠে বললেন মিঃ ব্ল্যাট৷

মিঃ ব্ল্যাট বিশাল চেহারার পুরুষ৷ মুখের রঙে লালচে আভাস৷ হালকা লাল চুলের আস্তরণ তাঁর চকচকে টাককে বৃত্তাকার পথে ঘিরে রেখেছে৷

ঘটনাচক্র তাঁকে যে জায়গাতেই নিয়ে যাক না কেন, সে জায়গার মধ্যমণি হয়ে থাকার ইচ্ছেটাই মিঃ ব্ল্যাটের একমাত্র উচ্চাশা৷ তাঁর মতে, বেশ সোচ্চারেই তিনি এ মত প্রকাশ করেছেন, জলি রজার হোটেলের কিঞ্চিৎ আনন্দ-সঞ্জীবনীসুধার প্রয়োজন আছে৷ কোন ঘটনাস্থলে তিনি যখনই উপস্থিত হন, তখন সেখানকার অন্যান্য লোকেরা যে বিচিত্র পদ্ধতিতে ক্রমশ দ্রবীভূত এবং অদৃশ্য করে ফেলে তাতে তাঁর রীতিমতো অবাক লাগে৷

‘আরেকটুকু হলেই আপনাকে স্ট্রবেরীর আচার বানিয়ে ফেলেছিলাম, কি বলেন?’ খুশির সুরে বললেন, মিঃ ব্ল্যাট৷

ক্রিস্টিন জবাব দিলো, ‘হ্যাঁ, সে আর বলতে’

‘ঝটপট উঠে আসুন৷’ মিঃ ব্ল্যাট বললেন৷’

‘না, ধন্যবাদ—আমার হাঁটতে ভালোই লাগছে৷’

‘যত্তো সব!’ বললেন, মিঃ ব্ল্যাট, ‘তাহলে গাড়ির জন্ম হয়েছে কি করতে?’

নিরুপায় হয়েই গাড়িতে উঠলো ক্রিস্টিন রেডফার্ন৷

আচমকা ব্রেক কষে রোখার ফলে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো, মিঃ ব্ল্যাট বোতাম টিপে তাকে আবার চালু করলেন৷

মিঃ ব্ল্যাট প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা, এখানে একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন কেন বলুন তো? উহুঁ, এ ঠিক নয়, অন্তত আপনার মতো সুন্দরী মেয়ের পক্ষে৷’

ক্রিস্টিন তাড়াতাড়ি বললে, ‘এমনিই৷ একা থাকতে আমার ভালো লাগে৷’

মিঃ ব্ল্যাট কনুই দিয়ে ওকে প্রচণ্ড এক খোঁচা মারলেন, এবং একই সঙ্গে গাড়িটা নিয়ে আর একটু হলে পাশের ঝোপে ধাক্কা মারছিলেন৷

‘মেয়েরা সবসময় ওই কথাই বলে!’ তিনি বললেন, ‘ওদের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না৷ আসলে ওটা ওদের মনের কথা নয়৷ এই যে আমাদের জলি রজার হোটেল, ওটাকে ঘষে মেজে একটু চাঙ্গা করে তোলার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে৷ নামের সঙ্গে চরিত্রের কোন মিল নেই৷ কোন প্রাণ নেই৷ শুধু একগাদা বাজে লোক এসে হোটেলটায় ভিড় করেছে৷ প্রথমেই ধরুন, ওই একপাল বাচ্চা-কাচ্চা, আর নীরস বুড়োবুড়িগুলো৷ এছাড়া রয়েছে ভারতবর্ষ ঘুরে আসা ওই বিরক্তিকর বুড়োটা, আমাদের শরীর সাধক পাদ্রী সাহেব, ঘ্যানঘ্যানে মার্কিনগুলো আর ওই অদ্ভুত গোঁফওয়ালা বিদেশীটা—ওর গোঁফ দেখলেই আমার হাসি পায়৷ মনে হয়, লোকটা নির্ঘাত নাপিত-টাপিত না হয়ে যায় না৷’

ক্রিস্টিন মাথা নাড়ালো৷

‘উহুঁ, উনি একজন গোয়েন্দা৷’

মিঃ ব্ল্যাটের গাড়ি আবারও অল্পের জন্য সংঘর্ষের হাত থেকে রেহাই পেলো৷

‘পোয়ান্দা? আপনি বলতে চান উনি এখন ছদ্মবেশে রয়েছেন?’

ক্রিস্টিন হালকাভাবে হাসলো৷

ও বললো, ‘না, না, ওঁকে দেখতেই ওইরকম৷ ওঁর নাম এরকুল পোয়ারো৷ আপনি নিশ্চয়ই ওঁর নাম শুনে থাকবেন৷’

মিঃ ব্ল্যাট বললেন, ‘নামটা প্রথমে ঠিক বুঝতে পারিনি৷ ওহ্ হ্যাঁ, ভদ্রলোকের নাম আমি শুনেছি৷ কিন্তু আমার ধারণা ছিলো তিনি মারা গেছেন…৷ যাই বলুন, এরকম গোঁফওয়ালা গোয়েন্দার মরে যাওয়াই উচিত৷ তা উনি এখানে এসেছেন কি মতলবে?’

‘কোন উদ্দেশ্য নিয়ে আসেন নি—এমনিই ছুটিতে বেড়াতে এসেছেন৷’

‘হুঁ—হতে পারে৷’ মিঃ ব্ল্যাটকে এ ব্যাপারে বেশ সন্দিহান বলে মনে হলো, ‘লোকটা একটু কাঠখোট্টা ধরনের, তাই না?’

‘হ্যা, মানে—’ কিস্টিন ইতস্তত করে বললো, ‘একটু অদ্ভুত ধরনের বলতে পারেন৷’

‘আমার কথা হলো’, মিঃ ব্ল্যাট বললেন, ‘স্টটল্যান্ড ইয়ার্ড কি ঘুমিয়ে রয়েছে? এসব কাজে ইংরেজ ছাড়া আর কাউকে আমি ভরসা করি না৷’

পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছে বিজয়ীর ভঙ্গীতে ঘনঘন হর্ন বাজিয়ে মিঃ ব্ল্যাট তাঁর সানবীমকে জলি রজারের গ্যারেজে ঢুকিয়ে দিলেন; গ্যারেজটা সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসের কারণে, হোটেলের ঠিক বিপরীত দিকে, মূল ভূখণ্ডে অবস্থিত৷

যে ছোট দোকানটা লেদারকোম্ব উপসাগরের অতিথিদের প্রয়োজন মেটায় সেই দোকানে দাঁড়িয়ে ছিলো লিন্ডা মার্শান৷ দোকানের একটা অংশ জুড়ে রয়েছে সারি সারি বই সাজানো কতকগুলো বইয়ের তাক৷ দু’পেনির বিনিময়ে অতিথিরা এই বই পড়তে নিতে পারেন৷ বইগুলোর নতুনতম সংস্করণটি অন্তত দশ বছরের পুরনো, কয়েকটা বিশ বছর আগেকার, আর বাকিগুলো আরও পুরনো৷

লিন্ডা দ্বিধাগ্রস্তভাবে প্রথমে একটা, তারপর আর একটা বই নামালো তাক থেকে, এক পলক উল্টোপাল্টে দেখলো বই দুটো, ওর মনে হলো ‘দি ফোর ফেদার্স’ অথবা ‘ভাইঝি ভার্সা’, কোনটাই ওর পড়তে ভালো লাগবে না৷ তাই ও ছোটখাটো বাদামি মলাটের আর একটা বই নামিয়ে নিলো৷

সময় গড়িয়ে চললো…

হঠাৎ পেছন থেকে ক্রিস্টিন রেডফার্নের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েই চমকে উঠলো লিন্ডা, নিমেষের মধ্যে বইটাকে আবার তাকে গুঁজে রাখলো৷

‘কি বই পড়ছো, লিন্ডা?’

লিন্ডা তাড়াতাড়ি জবাব দিলো, ‘না, কিছু না৷ একটা ভালো বই খুজছি৷’

ও এবার ভালো করে না দেখেই টেনে বার করলো ‘দি ম্যারেজ অফ উইলিয়াম অ্যাশ’ বইটা এবং বিব্রতভাবে দুপেনি হাতড়াতে এগিয়ে গেলো কাউন্টারের দিকে৷

ক্রিস্টিন বললো, মিঃ ব্ল্যাট এইমাত্র আমাকে পৌঁছে দিলেন—অবশ্য তার আগে আমাকে প্রায় চাপাই দিয়েছিলেন৷ ভেবে দেখলাম, তাঁর সঙ্গে পাশাপাশি হেঁটে সেতুটা পার হাওয়া আমার সাহসে কুলোবে না, তাই কিছু কেনাকাটা করার আছে বলে চলে এসেছি৷’

লিন্ডা বলল, ‘ভদ্রলোক বড় সাংঘাতিক, তাই না? সব সময় খালি টাকার গরম দেখানো আর যতসব বীভৎস রসিকতা করেন৷’

ক্রিস্টিন বললে, ‘বেচারা! ওঁর জন্যে দুঃখ হয়৷’

লিন্ডা কিন্তু একমত হতে পারলো না৷ মিঃ ব্ল্যাটের জন্য দুঃখিত হওয়ার কোন কারণ ও খুঁজে পেল না৷ ও বয়েসে কিশোর এবং নির্মম৷

ক্রিস্টিন রেডফার্নের সঙ্গে দোকান ছেড়ে বেরিয়ে এলো লিন্ডা, ঢালু রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল, কংক্রিটের সেতুর দিকে৷

নিজের চিন্তায় লিন্ডা তখন ব্যস্ত৷ ক্রিস্টিন রেডফার্নকে ওর ভালো লাগে৷ ওর মতে সারা দ্বীপে রোজমন্ড ডার্নলি এবং ক্রিস্টিন, এই দুজনকেই কেমন সহ্য করা যায়৷ প্রথমত, ওরা কেউই লিন্ডার সঙ্গে বেশি কথা বলে না৷ এবং এই মুহূর্তেও ক্রিস্টিন নীরবে ওর পাশে পাশে হাঁটছে৷ এটাই বুদ্ধিমতীর পরিচয়, লিন্ডা ভাবলো৷ যদি সত্যিই তেমন কিছু বলার না থাকে তাহলে শুধু শুধু বকবক করার দরকারটা কি?

নিজের সমস্যার জটিলতায় কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গেলো ও৷

তারপর হঠাৎই একসময় ও বললো, ‘মিসেস রেডফার্ন, আপনার কখনও মনে হয়নি, এখানে সবকিছু এত বিশ্রী—এত ভয়ঙ্কর যেন ঠিক ফেটে পড়ার মতো…?’

কথাগুলো প্রায় হাস্যকর, কিন্তু লিন্ডার চিন্তা-কুটিল কঠিন মুখে হাসির লেশমাত্র নেই৷ ক্রিস্টিন রেডফার্ন অনিশ্চিত অবুঝ চোখে ওর দিকে তাকালো, কিন্তু উপহাস করার মতো কিছু ওর নজরে পড়লো না৷

ওর শ্বাস প্রশ্বাস স্তব্ধ হলো মুহূর্তের জন্য৷

ও বললো, ‘হ্যাঁ—হ্যাঁ—মনে হয়েছে ঠিক এই জিনিসটাই…’

মিঃ ব্ল্যাট বললেন, ‘তাহলে আপনিই মশাই সেই বিখ্যাত গোয়েন্দা, অ্যাঁ?

ওঁরা বসেছিলেন জলি রজারের পানশালায়, মিঃ ব্ল্যাটের প্রিয় বিচরণ ক্ষেত্রে৷

এরকুল পোয়ারো তাঁর স্বভাবসিদ্ধ নাতিবিনীত ভঙ্গীতে ব্ল্যাটের বক্তব্যকে সমর্থন করলেন৷

মিঃ ব্ল্যাট বলে চললেন, ‘এখানে আপনি কি জন্যে এসেছেন কোন কাজে?’

‘না, না৷ আমারও তো মাঝে মাঝে বিশ্রামের প্রয়োজন৷ এমনি ছুটিতে বেড়াতে এসেছি৷’

মিঃ ব্ল্যাট চোখ টিপলেন৷

‘আপনি তো মশাই ওই কথাই বলবেন, তাই না?’

পোয়ারো জবাব দিলেন, বিনা প্রয়োজনে মিথ্যে বলে লাভ কি৷’

হোরেস ব্ল্যাট বললেন, ‘ওঃ হো! বলেই ফেলুন না৷ সত্যি কথা বলতে কি, আমার কাছ থেকে আপনি অন্তত নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন৷ আমি যা শুনি, সব সেরেফ হজম করে ফেলি! বহু বছর আগেই এ বিদ্যেটা মশাই রপ্ত করেছি৷ তা যদি না পারতাম, তাহলে আমার আজকের এই অবস্থায় পৌঁছতে পারতাম না৷ কিন্তু বেশির ভাগ লোকই কি রকম জানেন—খালি বকবক বক, যা শোনে তা উগরে না দিতে পারলে যেন স্বস্তি পায় না৷ অবশ্য আপনাদের পেশায় তো আর এ জিনিসটাকে প্রশ্রয় দেওয়া যায় না! অতএব সেই কারণেই আপনাকে ভান করতে হবে যে আপনি এখানে শুধু ছুটি কাটাতেই এসেছেন, অন্য কোন কারণে নয়৷’

পোয়ারো প্রশ্ন করলেন, ‘কিন্তু আপনি এর উল্টোটাই বা ভাবছেন কেন?’

মিঃ ব্ল্যাট আবারও চোখ টিপলেন, বললেন, ‘আমি মশায় ঘোড়েল লোক৷ চেহারা দেখেই চরিত্র বুঝতে পারি৷ আপনার মতো লোকের পক্ষে “দাভিল’, “লা টোকে” অথবা “জুয়ান-লা-প্রিন্স”-এ যাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিলো৷ অর্থাৎ যে জায়গাগুলোর সঙ্গে আপনার—কি যেন বলে?—আত্মিক যোগ থাকা সম্ভব৷

পোয়ারা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন৷ জানলা দিয়ে বাইরে চোখ রাখলেন তিনি৷ কুয়াশাঘেরা দ্বীপে শুরু হয়েছে অঝোর বর্ষণ৷ তিনি বললেন, ‘সম্ভবত আপনার কথাই ঠিক৷ সেখানে অন্তত বর্ষার আবহাওয়ায় সময় কাটানোর বিভিন্ন আয়োজন রয়েছে৷

‘যথা, আমার প্রিয় জুয়ার আড্ডা!’ বললেন মিঃ ব্ল্যাট, ‘জানেন, আমার জীবনের বেশির ভাগ সময়ই কেটে গেছে কঠোর পরিশ্রমে৷ বেড়াবার বা ফুর্তি করবার, কোনটারই সময় পাইনি৷ চেয়েছিলাম সম্মান এবং প্রতিষ্ঠা—আজ তো পেয়েছি৷ এখন আমি যা মন চায় করতে পারি৷ আমার টাকার দাম কারও চেয়ে কিছু কম নয়৷ গত কয়েক বছরে অন্তত কিছু কিছু সুখ আনন্দ যে আমি চেখে দেখেছি, এটুকু আপনাকে বলতে পারি৷’

পোয়ারো অস্পষ্ট স্বরে বললেন, ‘ও, তাই নাকি?’

‘জানি না, এখানে আমি কেন এলাম—’ মিঃ ব্ল্যাট বলে চললেন৷

পোয়ারো মন্তব্য করলেন, ‘সে কথা ভেবে আমিও অবাক হয়েেছি৷’

‘অ্যাঁ, কি বললেন?’

পোয়ারো অর্থপূর্ণভাবে হাত নাড়লেন৷

‘কিঞ্চিৎ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা যে আমরও নেই তা নয়৷ আমার বিশ্বাস, পছন্দের প্রশ্ন উঠলে, আপনি সহজেই এ জায়গার চেয়ে “দ্যভিল” অথবা “বিয়্যারিৎস”কে বেছে নিতেন৷’

‘আর তার বদলে আমরা দুজনেই এসে হাজির হয়েছি এখানে৷’

কর্কশ স্বরে হেসে উঠলেন মিঃ ব্ল্যাট৷

‘সত্যিই ভেবে পাই না, এখানে কেন এলাম৷’ তিনি আনমনা ভাবেই বলে চললেন, ‘আমার মনে হয়, এ জায়গাটার নামের সঙ্গে কেমন একটা অলীক গন্ধ জড়িয়ে ছিলো৷ জলি রজার হোটেল, স্মাগলার্স দ্বীপ৷ এগুলো যেন আপনাকে চঞ্চল করে তোলে, ছেলেবেলার কথা মনে করিয়ে দেয়, তাই না? জলদস্যু চোরাচালান, এই সব৷’

অপ্রতিভভাবে হাসলেন তিনি, ‘ছোটবেলা থেকে নৌকো নিয়ে প্রচুর ঘুরে বেড়িয়েছি৷ অবশ্য একদিকটায় নয়৷ পূর্ব উপকূল অঞ্চলে৷ আশ্চর্য, এ এমনই এক নেশা, যা কখনও পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায় না৷ ইচ্ছে করলে সাজানো-গোছানো একটা প্রমোদতরীও কিনে ফেলতে পারতাম, কিন্তু ও জিনিসটা ঠিক আমার মনে ধরে না৷ তার চেয়ে আমার ছোট পালতোলা নৌকোয় ভেসে বেরিয়ে মজা আছে৷ রেডফার্নও নৌকো বাইতে ভালোবাসে৷ বার দুয়েক আমার সঙ্গেও বেরিয়েছে৷ এখন তো ওর পাত্তাই পাওয়া যায় না—দিনরাত খালি মার্শালের লালচুলো বউটার পেছনে ঘুরঘুর করছে৷’

একটু থামলেন ব্ল্যাট৷ তারপর গলা নামিয়ে বলে চললেন, ‘হোটেলের বেশির ভাগ লোকই তো মশাই রসকষহীন শুকনো মাল! ওই মধ্যে মিসেস মার্শালের কাছেই যা একটু প্রাণের ছোঁয়া পাওয়া যায়৷ আমার ধারণা বউয়ের পেছনে দেখাশোনা করতেই মার্শালের গোটা দিনটা পার হয়ে যায় মিসেস যখন অভিনয়-জগতে ছিলেন তখন তাঁর নামে সবরকম গপ্পো চালু ছিলো—এবং এখনো আছে৷ ওঁকে দেখলে পুরুষদের মাথার আর ঠিক থাকে না৷ দেখবেন, এই নিয়েই এখানে একটা কেলেঙ্কারি হবে৷’

পোয়ারো প্রশ্ন করলেন, ‘কি কেলেঙ্কারি?’

হোরেস ব্ল্যাট উত্তর দিলেন, ‘সেটা অবস্থার ওপর নির্ভর করছে৷ মার্শালকে দেখে আমার অন্তত মনে হয়, সে একটু অদ্ভুত মেজাজের লোক৷ সত্যি কথা বলতে কি, “মনে হয় নয়’’ আমি ভালোভাবেই জানি৷ কারণ তার সম্বন্ধে কয়েকটা কথা আমার কানে এসেছে৷ এ ধরনের শান্ত কম কথার লোক আমি আগেও দেখেছি৷ মুখ দেখে এদের মনের ভাব কখনও জানা যায় না৷ রেডফার্নের সাবধান থাকা উচিত—’

তাঁর বক্তব্যের নায়কের পানশালায় প্রবেশ করতে দেখে মাঝপথেই থেমে গেলেন তিনি৷ তারপর অপ্রতিভ উঁচু স্বরে আলোচনার খেই ধরলেন, ‘আর আপনাকে যা বলছিলাম, এখানকার সমুদ্রে নৌকা চালিয়ে সত্যিই মজা আছে৷ আরে, রেডফার্ন যে, এক গেলাস করে হয়ে যাক? কি খাবেন বলুন? ড্রাই মার্টিনি? আচ্ছা মঁসিয়ে পোয়ারো আপনি?

পোয়ারো মাথা নেড়ে অসম্মত্তি প্রকাশ করলেন৷

প্যাট্রিক রেডফার্ন বসলো, বললো, ‘নৌকো চালানোর কথা বলছিলেন? পৃথিবীতে এর চেয়ে মজার নেশা আর নেই৷ ইচ্ছে হয়, এর পেছনে আরও বেশিসময় কাটিয়ে দিতে৷ ছোটবেলায় বেশির ভাগ সময় তো এখানকার উপকূলে নৌকো নিয়েই কাটিয়ে দিতাম৷’

পোয়ারো বললেন, ‘আপনি তাহলে এইদিকটা ভালোভাবেই চেনেন?’

‘তা বলতে পারেন৷ এ হোটেল তৈরি হবার আগে থেকেই এ জায়গাটা আমার চেনা৷ তখন লেদারকোম্ব উপসাগরে পুরনো আমলের একটা পোড়ো বাড়ি আর কয়েক ঘর জেলে ছাড়া এ দ্বীপে কেউ ছিলো না৷’

‘একটা বাড়ি ছিলো এখানে?’

‘হ্যাঁ, বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত এক পোড়ো বাড়ি৷ বলতে গেলে প্রায় ধ্বংসাবশেষই বলা যায়৷ তখন নানারকম সব গল্প চালু ছিলো যে ওই বাড়ি থেকে পিক্সির গুহায় যাওয়ার নাকি অনেকগুলো গুপ্ত পথ আছে৷ এখনও মনে পড়ে, আমার সব সময় সেই গুপ্ত পথ খুঁজে বেড়াতাম৷’

হোরেস ব্ল্যাটের হাতে ধরা গেলাস কেঁপে উঠলো, ছলকে পড়লো পানীয়৷ শাপ-শাপান্ত করে রুমাল দিয়ে ভেজা জায়গাটা মুছে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘এই পিক্সির গুহাটা কি জিনিস?’

প্যাট্রিক বললো, ‘ও, আপনি জানেন না? ওটা পিক্সি কোভে আছে৷ গুহায় ঢোকবার পথটা কিন্তু চট করে খুঁজে পাবেন না৷ এক কোণে স্তূপাকারে রাখা একগাদা পাথরের মাঝে লুকানো রয়েছে পথটা৷ শুধু লম্বা একটা সরু ফাটল৷ একজন কোনরকমে কাত হয়ে ঢুকতে পারে৷ ভেতরে ওটা ক্রমশ চওড়া হয়ে বেশ বড়সড় একটা গুহার সৃষ্টি করেছে৷ বুঝতেই তো পারছেন, ছোট ছেলেদের কাছে সেটা কিরকম মজার জিনিস ছিলো৷ একজন বুড়ো জেলে আমাকে ওটা দেখিয়ে দিয়েছিলো৷ আজকাল এখানকার জেলেরাও ওটার খবর জানে না৷ এই তো সেদিন একজনকে জিগ্যেস করলাম, জাযগাটাকে পিক্সি কোভ কেন বলা হয়—তা সে কোন জবাবই দিতে পারলো না৷’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘আমি কিন্তু এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না৷ এই পিক্সিটা কি জিনিস?’

প্যাট্রিক রেডফার্ন বললো, ‘একে আপনি খাস ডেভনশায়ারে চীজ বলতে পারেন৷ শীপস্টরের জলাভূমিতে একটা পিক্সির গুহা আছে৷ পিক্সির জন্যে উপহার হিসেবে লোকে সেখানে একটা করে আলপিন রেখে আসে৷ পিক্সি হলো এক ধরনের আত্মা, যা জলাভূমিতে বসবাস করে৷’

এরাকুল পোয়ারো বললেন, ‘হুঁ বেশ কৌতূহলের ব্যাপার৷’

প্যাট্রিক রেডফার্ন বলে উঠলো, ‘ডার্টমুরে এই পিক্সি নিয়ে এখনও অনেক কিংবদন্তী চালু আছে৷ সেখানে অনেক পাহাড়ের চূড়ায় পিক্সি আছে বলে মনে করা হয়৷ শুনেছি কুয়াশা-ঘেরা রাতে দেরি করে বাড়ি ফেরার পর কৃষকেরা এখনও অনুযোগ করে যে পিক্সি তাদের পথ ভুলিয়ে দিয়েছিলো৷’

হোরেস ব্ল্যাট বললেন, ‘তার মানে, যখন তারা দু-এক বোতল চড়িয়ে টং হয়ে থাকে?’

প্যাট্রিক হাসলো৷

‘এছাড়া সাধারণ বুদ্ধিতে এর আর কি ব্যাখ্যা হতে পারে, বলুন?’

ব্ল্যাট হাতঘড়িতে চোখ রাখলেন, বললেন, ‘আমি এবার চলি ডিনার সারতে৷ মোটের ওপর, রেডফার্ন যা-ই বলুন পিক্সিদের চেয়ে জলদস্যুদের আমি ঢের বেশি পছন্দ করি৷’

তিনি বেরিয়ে যেতেই প্যাট্রিক রেডফার্ন সশব্দে হেসে বললো, ‘সত্যি বলছি, পিক্সির পাল্লায় পড়লে ভদ্রলোকের কি হাল হয় সেটা আমার দেখতে ভীষণ ইচ্ছে করে!’

পোয়ারো আত্মগতভাবে মন্তব্য করলেন, ‘একজন কঠোর সংগ্রামী ব্যবসায়ীর পক্ষে মঁসিয়ে ব্ল্যাটের চিন্তাধারা একটু বেশি মাত্রায় কল্পনাবিলাসী৷’

রেডফার্ন বললো, ‘তার কারণ ভদ্রলোক অর্ধশিক্ষিত৷ অন্তত আমার স্ত্রী তাই বলে৷ ভদ্রলোক এখনও কি সব বই পড়েন, দেখুন! শুধু রহস্য-রোমাঞ্চ আর কাউবয়দের কাহিনী।’

পোয়ারো বললেন, অর্থাৎ, আপনি বলতে চান তাঁর মন এখনও ছোট ছেলের মতো?’

‘কেন, আপনার কি তা মনে হয় না?’

‘আমি? আমি ওকে কতটুকুই বা জানি৷’

‘সে তো আমিও জানি না৷ কেবল বারকয়েক তাঁর সঙ্গে নৌকো নিয়ে বেরিয়েছি—কিন্তু দেখলাম তিনি সঙ্গীসাথী খুব একটা পছন্দ করেন না৷ একা একা থাকতেই ভালোবাসেন৷’

‘ব্যাপারটা আমার কাছে একটু অদ্ভুত লাগছে৷ এটা তাঁর ডাঙার ব্যবহারে সম্পূর্ণ বিপরীত৷’

রেডফার্ন সশব্দে হাসলো, বললো, ‘জানি৷ ওঁর কাছ থেকে সর্বদা শত হস্তেন থাকতে আমাদের রীতিমতো অসুবিধায় পড়তে হয়৷ এ জায়গাটাকে ‘ম্যারগেট’ এবং ‘লা টোকে’র মাঝামাঝি কিছুতে তৈরি করতে পারলে তিনি খুশি হন৷’

কয়েক মিনিট পোয়ারো নীরব রইলেন৷ তিনি একান্ত মনোযোগের সঙ্গে তাঁর সঙ্গীর হাস্যময় মুখমণ্ডল পর্যবেক্ষণ করছিলেন৷ তারপর আকস্মিক এবং অপ্রত্যাশিতভাবে বলে বসলেন, ‘আমার মনে হয়, মঁসিয়ে রেডফার্ন, আপনি জীবনকে উপভোগ করতে ভালোবাসেন৷’

প্যাট্রিক অবাক হয়ে তাঁর দিকে চেয়ে রইলো৷

‘নিশ্চয়ই ভালোবাসি৷ কেন বাসবো না?’

‘সত্যিই তো, কেন বাসবেন না৷’ পোয়ারো সমর্থন করলেন, ‘এ জন্যে আমি আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি৷’

‘এবং এই প্রসঙ্গে, একজন বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে, অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে, আপনাকে আমি একটা ছোট্ট উপদেশ দিতে সাহস করছি৷’

‘বলুন?’

‘আমার পুলিশ-বাহিনি জনৈক বিচক্ষণ বন্ধু বহু বছর আগে আমাকে বলেছিলেন, ‘ভাই এরকুল, জীবনে যদি শান্তি চাও তাহলে স্ত্রীলোকদের এড়িয়ে চলবে৷’

প্যাট্রিক রেডফান বললো, ‘তা যদি বলেন, তাহলে আমার ক্ষেত্রে আপনার একটু দেরি হয়ে গেছে৷ আপনি তো জানেন, আমি বিবাহিত৷’

‘হ্যাঁ, জানি৷ আপনার স্ত্রী একজন মর্জিত রুচির সুন্দরী মহিলা৷ আমার ধারণা, তিনি আপনাকে যথেষ্ট ভালোবাসেন৷’

প্যাট্রিক রেডফার্ন তীব্র স্বরে বলে উঠলো, ‘আমিও ওকে যথেষ্ট ভালোবাসি৷’

‘যাক’, বললেন, এরকুল পোয়ারো, ‘এ কথা শুনে বড় সুখী হলাম৷’

প্যাট্রিক অকস্মাৎ রাগে ফেটে পড়লো, ‘কি বলতে চাইছেন আপনি?’

‘নারী ছলনাময়ী৷’ পোয়ারো চোখ বুজে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন, ‘তাঁদের সম্পর্কে কিছু কিছু অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে৷ জীবনকে জটিল করে তুলতে ওঁরা পারদর্শিনী৷ এবং ইংরেজরা তাঁদের প্রণয়ঘটিত ব্যাপারে বড় অদ্ভুতভাবে আচরণ করে৷ মঁসিয়ে রেডফার্ন, এখানে আপনার আসাটা যদি এতই জরুরি ছিলো তাহলে, কোন্ সুবাদে আপনি স্ত্রী সঙ্গে নিয়ে এলেন?’

রেডফার্ন রাগী সুরে বললো, ‘আপনি কি বলেছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছি না৷’

এরকুল পোয়ারো শান্ত স্বরে বললেন, ‘আপনি বেশ স্পষ্টই বুঝতে পারছেন৷ মোহাচ্ছন্ন কোন পুরুষের সঙ্গে তর্ক করার মতো নির্বোধ আমি নই৷ আমি শুধু আপনাকে সতর্ক করে দিচ্ছি৷’

‘ও আপনি তাহলে ওই বেহদ্দ মেয়েছেলেগুলোর কথা শুনেছেন৷ মিসেস গার্ডেনার, ওই ব্রুস্টার মেয়েটা—দিনরাত জিভ চালানো ছাড়া ওদের আর কোন কাজ নেই৷ যেহেতু একটা মেয়েকে দেখতে সুন্দর ব্যস্ অমনি ওরা তাকে ঘিরে নোংরা গালগল্প নিয়ে মুখিয়ে উঠেছে৷’

এরকূল পোয়ারো উঠে দাঁড়ালেন৷ তিনি মৃদুস্বরে বললেন, ‘সত্যিই কি আপনার এখনও এসব করার বয়েস আছে?’

ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে পানশালা ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন পোয়ারো৷ প্যাট্রিক রেডফার্ন আগুনঝরা দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে রইলো তাঁর গমনপথের দিকে৷

খাবার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে হল ঘরে এসে থমকে দাঁড়ালেন এরকুল পোয়ারো৷ ঘরে সব ক’টা দরজাই খোলা—রাতের এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া এসে অনধিকার প্রবেশ করলো ঘরে৷

বৃষ্টি থেমে গেছে৷ ঘন কুয়াশাও এখন মিলিয়ে গেছে৷ আবার আত্মপ্রকাশ করেছে৷ তারা ঝলমলে রাতে৷

পাহাড়ের কিনারায় ওর প্রিয় আসনে ক্রিস্টিন রেডফার্নকে আবিষ্কার করলেন এরকুল পোয়ারো৷ তিনি ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন, বললেন, ‘আপনি ভিজে আসনে বসেছেন, মাদাম৷ এখানে আপনার বসা ঠিক নয়—ঠান্ডা লাগবে৷’

“উহুঁ, কিচ্ছু হবে না৷ আর হলেই বা কি যায় আসে?’

‘আপনি তো আর অবুঝ শিশু নন, মাদাম! আপনি একজন শিক্ষিত মহিলা৷ আপনার অন্তত সবকিছু বুঝে শুনে করা উচিত!’

শীতল স্বরে উত্তর দিলো ও, ‘নিশ্চিন্ত থাকুন, মঁসিয়ে পোয়ারো, ঠাণ্ডায় আমার কিছু হয় না!’

পোয়ারো বললেন, ‘আজকের দিনটা ছিলো বৃষ্টি-ভেজা দিন৷ ঝড় উঠে ছিলো, এসেছিলো বর্ষা, ঘনকুয়াশা আমাদের দৃষ্টিশক্তিকে সাময়িকভাবে করে দিয়েছিলো অন্ধ… কিন্তু এখন? কুয়াশা মিলিয়ে গেছে, আকাশ আবার আগের মতোই পরিষ্কার এবং তারারা চিকমিক করে জ্বলছে৷ জীবনও অনেকটা এইরকম, মাদাম৷’

ক্রিস্টিন চাপা স্বরে বললো, ‘জানেন, এখানে আমার সবচেয়ে অসহ্য লাগে কোন জিনিসটা?

‘কি, মাদাম?’

‘দয়া!’

ওর তীক্ষ্ণ স্বরে শব্দটা যেন চাবুকের মতো আছড়ে পড়লো৷

ও বলে চললে, ‘আপনারা ভাবেন, আমি কিছু বুঝি না? কিছু দেখি না? সবাই সর্বক্ষণ বলে বেড়াচ্ছে, ‘বেচারা মিসেস রেডফার্ন—ইস, ওকে দেখলে কষ্ট হয়৷’ অর্থাৎ আমার অবস্থা দেখে তাঁদের করুণা হচ্ছে৷ আর, ঠিক এই জিনিসটাই আমি সহ্য করতে পারি না৷’

পকেট থেকে রুমাল বের করে অতি সাবধানে পাথরের আসনে বিছিয়ে দিলেন পোয়ারো, বসলেন৷ তারপর তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্য রাখলেন, ‘আপনার কথা একেবারে মিথ্যে নয়৷’

‘ওই মেয়েটা—’ মাঝপথেই থেমে গেলো ক্রিস্টিন৷

পোয়ারো গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে কয়েকটা কথা বলি, মাদাম? যে কথা আকাশের ওই উজ্জ্বল নক্ষত্রদের মতোই সত্যি? এই পৃথিবীর আর্লেনা স্টুয়ার্টরা—অথবা আর্লেনা মার্শালরা—কখনও ধর্তব্যের মধ্যে আসে না৷

ক্রিস্টিন রেডফার্ন বললো, ‘বাজে কথা৷’

‘উঁহু—সত্যি, আমি আপনাকে আশ্বাস দিচ্ছি৷ তাদের রাজত্ব হয় ক্ষণস্থায়ী, শুধু কয়েক মুহূর্তের জন্যে৷ মনে সত্যিকারের স্থায়ী দাগ কাটেন একমাত্র তাঁরাই যাঁদের মধ্যে প্রশংসনীয় গুণ আছে, আছে বুদ্ধি৷’

ঘৃণাভরা স্বরে ক্রিস্টিন বললো, ‘আপনি কি ভাবেন পুরুষেরা গুণ বুদ্ধি—এসবের কোন গুরুত্ব দেয়?’

পোয়ারো শান্ত স্বরে বললেন, নিশ্চয়ই দেয়৷’

ক্রিস্টিন সংক্ষেপে হাসলো, বললো, ‘আমি কিন্তু একমত হতে পারলাম না৷’

পোয়ারো বললেন, ‘আপনার স্বামী আপনাকে ভালোবাসেন, মাদাম৷ আমি জানি৷’

‘আপনার পক্ষে তা জানা সম্ভব নয়৷’

‘হ্যাঁ, আমি জানি৷ আমি তাঁকে আপনার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছি৷’

হঠাৎই ভেঙে পড়লো ক্রিস্টিন৷ পোয়ারোর কাঁধে মাথা রেখে ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগলো ও৷

ও বলে উঠলো, ‘আমি আর সইতে পারছি না… আর সইতে পারছি না…’

পোয়রো ওর পিঠে হাতে রেখে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলেন৷ আশ্বাসের সুরে বললেন, ‘ধৈর্য ধরুন, মাদাম… শুধু একটু ধৈর্য ধরুন৷’

অবশেষে নিজেকে সামলে নিয়ে ও উঠে বসলো৷ রুমালে চোখ মুছে রুদ্ধ স্বরে বললো, ‘মসিয়ে পোয়ারো, আপনি এখন যান৷ আমি—আমি একটু একা থাকতে চাই৷’

পোয়ারো সে অনুরোধ রাখলেন৷ ক্রিস্টিনকে একা রেখে আঁকাবাঁকা পথ ধরে তিনি ফিরে চললেন হোটেলের দিকে৷

হোটেলের কাছাকাছি পৌঁছে হঠাৎই তাঁর কানে চাপা কথাবার্তার শব্দ৷

পথ ছেড়ে পাশে কিছুটা এগোতেই তিনি দেখলেন, ঝোপের সারির মাঝে একটা ফাঁকা অংশে পাশাপাশি বসে আছে আর্লেনা মার্শাল ও প্যাট্রিক রেডফার্ন৷

তিনি শুনতে পেলেন পুরুষটির আবেগকম্পিত কণ্ঠস্বর, ‘আর্লেনা, তোমার জন্যে আমি সবকিছু ভুলে বসে আছি—তুমি আমাকে—আমাকে পাগল করে দিয়েছো… কিন্তু তুমি কি আমার জন্যে একটুও ভাবো না, আমাকে ভালোবাসো না, বলো?’

পোয়ারো আর্লেনা মার্শালের মুখমণ্ডল স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন—তাঁর মনে হলো, যেন কোন বেড়াল আদরে উত্তাপে বসে সুখ অনভব করছে—সে ভঙ্গীর সঙ্গে মানুষের চেয়ে পশুর সাদৃশ্য অনেক বেশি৷ আর্লেনার হালকা কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘নিশ্চয়ই, প্যাট্রিক সোনা, আমি তোমাকে ভালোবাসি৷ তুমি তো জানো…’

পোয়ারো এই প্রথম তাঁর অপশ্রবণে ক্ষান্তি দিলেন৷ সরু ঢালু পথ ধরে আবার ফিরে চললেন হোটেলের দিকে৷

মাঝপথে হঠাৎ একজন তাঁর সঙ্গ নিলেন৷ তিনি ক্যাপ্টেন মার্শাল৷

মার্শাল বললেন, চমৎকার রাত, কি বলেন? বিশেষ করে ওরকম একটা জঘন্য দিনের পর৷’ তিনি চোখ তুলে তাকালেন আকাশের দিকে, ‘মনে হচ্ছে, কালকের আবহাওয়া ভালো থাকবে৷’