গল্প
উপন্যাস

হাতের মুঠোয় পৃথিবী – ৮

আট

একটা শোবার ঘর, একটা বসবার ঘর, একটা ছোট রান্নাঘর, এবং তার চেয়েও ছোট একটা স্নানঘর—এ নিয়েই গোটা কেবিনটা৷

শোবার ঘরে দুটো বিছানা—আধুনিকভাবে সাজানো-গোছানো, তাছাড়া প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র তো আছেই৷ বসবার ঘরটাও চেয়ার, সোফা ইত্যাদিতে ছিমছামভাবে সাজানো৷ অর্থাৎ সামান্য কষ্ট সহ্য করলে চারজনের শোবার পক্ষে কোনওরকম অসুবিধা হওয়ার কথা নয়৷

হ্রদের একপান্তে অবস্থিত এই কেবিনটা; এবং অন্যান্য কেবিনগুলোর থেকে একেবারেই বিছিন্ন৷ কেবিন ভাড়া দেওয়ার জন্যে ভারপ্রাপ্ত কর্মচারীটি বেশ সবজান্তার হাসি ফুটিয়ে জিনিকে বলেছে, এই কেবিনটা বিশেষভাবে মধুচন্দ্রিমা যাপনের জন্যই তৈরি৷ নেহাত ওদের ভাগ্য ভালো, তাই খালি পেয়েছে৷ কারণ এই কেবিনে আগে যারা ছিল, তারা গতকাল রাতেই ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে৷

কর্মচারীটির নাম হ্যাডফিল্ড৷ জিনি আর কিটসন যখন এখানে এসে পৌঁছল, তখন সে সোজা বুইকে, ওদের পাশে এসে বসেছে৷ রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে গেছে ওদের ঈপ্সিত কেবিনের দিকে৷

মাঝে মাঝে অবাক চোখে কিটসনের দিকে দেখছিল হ্যাডফিল্ড৷ ভাবছিল, ভদ্রলোককে কেমন যেন উত্তেজিত দেখাচ্ছে, সেই তখন থেকে প্রায় চুপচাপ বসে রয়েছেন—ব্যাপার কী? কে জানে, হয়তো আসন্ন ফুলশয্যার রাতের কথা ভেবে বিব্রত হয়ে পড়েছেন৷ কিন্তু এরকম সুন্দরী বউয়ের সঙ্গে একান্ত সহবাসে বিব্রত বোধ করার কোনও কারণ খুঁজে পেল না হ্যাডফিল্ড৷

মেয়েটাও যেন কেমন বিচলিত হয়ে পড়েছে৷ অবশ্য সেটা স্বাভাবিক৷ কারণ প্রত্যেক সুন্দরী মেয়েই মধুচন্দ্রিমার নামে কিছুটা অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে৷ আবেগভরে ভাবল হ্যাডফিল্ড৷ জিনিকে সহজ করার অনেক চেষ্টাই করল সে৷ ওদের দেখিয়ে দিল কোথায় ক্যারাভ্যান রাখতে হবে, কোথায় হ্রদে বেড়ানোর জন্যে নৌকা ভাড়া পাওয়া যাবে—কেবিনটা তো দেখিয়ে দিলই৷ আরও বলল, কেউ কখনও তাদের বিরক্ত করবে না৷ মোটের ওপর নিজেদের খুশিমতো তারা দিন কাটাতে পারবে৷

‘এখানকার লোকেরা বেশ মিশুকে মিসেস হ্যারিসন৷’ দরজা খুলে কেবিনটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ওদের দেখাল হ্যাডফিল্ড৷ জিনিকে যেন আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল, ‘তারা সবসময়েই আপনাদের সুখ-সুবিধের দিকে নজর রাখবে, গল্প-সল্প করবে… তবে আমার মনে হয়, আপনার বোধ হয় নির্জনতাই বেশি পছন্দ করবেন—অন্তত প্রথম কয়েকদিন, কী বলেন?’ কিটসনের দিকে ফিরে চোখ টিপল হ্যাডফিল্ড৷ কিন্তু কিটসন নির্লিপ্তভাবে অপলকে তার দিকে চেয়ে রইল৷ হ্যাডফিল্ড বলে চলল, ‘যাকগে ও নিয়ে ভাববেন না, কেউই আপনাদের বিরক্ত করবে না৷’

একমাত্র অন্ধকারের প্রতীক্ষা করা ছাড়া ওদের চারজনের আর কোনও উপায় ছিল না৷ এবং ঘটনাবহুল সারাদিনে ওই প্রতীক্ষার সময়টুকুই তাদের কাছে অসহ্য এবং ক্লান্তিকর বলে মনে হয়েছে৷ জিনি কেবিনে পৌঁছেই সোজা শোবার ঘরে গিয়ে ঢুকেছে: সটান শুয়ে পড়েছে বিছানায়৷ সারাদিনের পরিশ্রমে অল্পক্ষণের মধ্যেই ও গভীর ঘুমে ঢলে পড়েছে৷ কিটসন বাইরে বসে পাহারায় থেকেছে৷ একের পর এক সিগারেট ধ্বংস করেছে, আর তীক্ষ্ণ নজর রেখেছে ক্যারাভ্যানের ওপর৷ ব্লেক ও জিপোকে নিরুপায় হয়েই ক্যারাভ্যানের ভেতর থাকতে হয়েছে৷ সেখানে ওদের সঙ্গী হয়েছে টমাস ও মরগ্যানের মৃতদেহ, না সময়টা খুবই খারাপ কেটেছে ওদের৷

অন্ধকার নেমে আসার পর জিপো বা ব্লেক আর দেরি করেনি৷ চলে এসেছে কেবিনের ভেতর৷

পরিশ্রান্ত জিপোর অবস্থা তখন ব্লেকের চেয়েও খারাপ৷ সে এসেই ধপাস করে একটা চেয়ারে বসে দু-হাতে মুখ ঢাকল৷ চার চোয়ালের পাশ বরাবর একটা লম্বা কাটা দাগ৷ ব্লেকের আঘাতের ফলেই ওই ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে৷ ফন হ্রদে আসার পথে জিপো হঠাৎ ক্যারাভ্যানের দরজা খুলে বাইরে লাফিয়ে পড়ার চেষ্টা করেছিল৷ গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে সে ক্যারাভ্যানের ধাতব দেওয়ালে পাগলের মতো মাথা খুঁড়ছে৷ হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রোগীর মতো একরোখাভাবে ব্লেকের সঙ্গে সমানে যুঝে গেছে৷ কোনও বাধা শোনেনি৷

অবশেষে ব্লেক তার চোয়ালে লক্ষ করে সজোরে ঘুষি মেরেছে৷ এছাড়া জিপোকে সামলানোর কোনও উপায় ছিল না৷ তারপর যখন তার জ্ঞান ফিরছে, সে চুপচাপ অবসন্নভাবে বসে থেকেছে ক্যারাভ্যানের মেঝেয়৷ আটটি ঘণ্টা ওদের কাটাতে হয়েছে ক্যারাভ্যানের ভেতরে—অন্ধকারের প্রতীক্ষায়৷ মাছির দৌরাত্ম্য থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে ওরা শক্ত করে এঁটে দিয়েছে ক্যারাভ্যানের জানলাগুলো৷ তারপর বসে বসে সময় গুনছে৷ না, এ অভিজ্ঞতার কথা ওরা সহজে ভুলবে না৷

মরগ্যান ও টমাসের মৃতদেহ নিয়ে ব্লেক আর কিটসন গেছে অন্ধকার ঘন জঙ্গলের ভেতরে৷ ওদের করব দেওয়ার জন্যে খুঁজে বের করছে উপযুক্ত জায়গা৷ জিপোর নানান যন্ত্রপাতির মধ্যে ছিল একটা বেলচা—সুতরাং জায়গা খুঁজে বের করার পর ওরা পালা করে মাটি খুঁড়তে শুরু করেছে—বলা বাহুল্য ওই বেলচা দিয়েই৷

বিষণ্ণ চাঁদের মরা আলোয় ব্লেক ও কিটসন চুপচাপ, নিঃশব্দে কাজ করে চলল৷ কিন্তু দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠাকে সঙ্গী করে সর্বদাই ওদের সতর্ক থাকতে হল৷ কারণ অদূরেই খোলা হ্রদের নীল জলে নৈশবিহারে ব্যস্ত দম্পতিদের কথোপকথন নৌকো থেকেই স্পষ্ট কানে আসছে৷ তাছাড়া হ্রদের পাড়ে পায়চারিরত অতিথিদেরও তারা দেখতে পাচ্ছে৷ হঠাৎই ওরা কাজ থামিয়ে মাথা নিচু করে লুকিয়ে পড়ল—বুকের ধুকপুক শব্দ আচমকা বেড়ে উঠল৷ ব্লেক ও কিটসনের ঠিক পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে গেল একজোড়া তরুণ-তরুণী৷ এই স্বপ্নিল আঁধারে ওরা জঙ্গলের নির্জনতাকেই বেছে নিয়েছে৷ ওরা চলে যেতেই আবার কাজ শুরু করল কিটসন৷ ব্লেক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল…৷

ওদের কাজ যখন শেষ হল, তখন মাঝরাত৷ ওপরের মাটি সমান করে তার ওপর ভাঙা ডালপালা ও শুকনো পাতা ছড়িয়ে দিল ব্লেক৷ যখন বুঝল, সন্দেহ করার মতো কিছুই নজরে পড়ছে না, তখন ওরা শ্রান্ত দেহে ফিরে চলল কেবিনের দিকে৷

.৩৮ রিভলভারটা কোলের ওপর রেখে একটা আরাম কেদারায় গা-এলিয়ে অপেক্ষা করছিল জিনি৷ আর লক্ষ রাখছিল সোফার ওপর ঘুমন্ত জিপোর দিকে৷

কেবিনে ঢুকতেই দরজা বন্ধ করে দিল ব্লেক৷ তারপর এগিয়ে এসে বসল একটা চেয়ারে৷

কিটসনও বিনা বাক্যব্যয়ে আর একটা চেয়ার বেছে দিল৷ তার মুখের রং ঠান্ডা চর্বির মতো ফ্যাকাসে—রক্তহীন৷ তার গালের একটা পেশি থেকে থেকেই কেঁপে উঠছে৷ মুখে ঘামের ফোঁটা চকচক করছে৷

‘কোনও গোলমাল করেনি তো?’ জিনিকে প্রশ্ন করল ব্লেক৷

জিনির মুখমণ্ডল পাণ্ডুর, চোখের নীচে কালি! দেখে মনে হচ্ছে, ওর বয়সে যেন অনেক বেড়ে গেছে, শরীরের জৌলুসও কমে এসেছে অনেকটা৷ কিন্তু উত্তর দেওয়ার সময় ওর স্বর এতটুকু কাঁপল না৷ বরাবরের মতোই নির্বিকার শীতল স্বর, ‘না,… তবে বারবারই বলছিল, আমাকে ছেড়ে দাও, আমি বাড়ি যাব—৷’

‘ট্রাকের তালা খোলার পর বাড়ি কেন, ও নরকে গেলেও আমার কোনও আপত্তি নেই৷’ কঠিন স্বরে বলে উঠল ব্লেক৷

ওদের কথাবার্তার শব্দে জিপো পাশ ফিরে হঠাৎই চোখ খুলল৷ ঘরের উজ্জ্বল আলোয় কিছুক্ষণ চোখ পিটপিট করে চারপাশে দেখল৷ তারপর ওদের তিনজনের দিকে চোখ পড়তেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বসল সোফার ওপর৷ জিপোর হাত কাঁপতে লাগল উত্তেজনায়, মুখের মাংসপেশি সংকুচিত হল৷

‘এড, আমাকে তোমারা ছেড়ে দাও…’ শব্দগুলো যেন ছিটকে পড়ল জিপোর মুখ থেকে, আমারে ভাগের টাকা আমি চাই না, ওটা তোমরাই নিয়ে নিও৷ আমি এতক্ষণ ধরে শুধু এই কথাই ভাবছি! ওই হতচ্ছাড়া ট্রাকের সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক রাখতে চাই না৷ তাই বলছি, আমার প্রাপ্য দু-লাখ ডলার নিয়ে আমাকে তোমরা রেহাই দাও৷ ফ্র্যাঙ্ক যদি এত করে না বলত, তাহলে এ কাজে আমি হাতও দিতাম না৷ ও আমাকে একরকম জোর করেই রাজি করিয়েছিল৷ তোমাদের যদি এখনও রাজা হবার সাধ থাকে তো লেগে থাকো—আমি ওর মধ্যে নেই৷ আমি সোজা আমার কারখানায় ফিরে যাচ্ছি৷’

ব্লেক কিছুক্ষণ ধরে জিপোর আপাদমস্তক জরিপ করল, ‘কিন্তু আমার তা মনে হয় না, জিপো৷’ শান্তস্বরে সে বলল৷

জিপো হাঁটুতে হাত ঘষল৷ ওর থলথলে মুখমণ্ডল ঘামে চকচক করছে৷ ঈষৎ আশঙ্কার ইঙ্গিত৷

‘শোনো—এড, একটু ভালো করে ভেবে দেখো৷ আমার অংশের সমস্ত টাকাই আমি তোমাদের দিয়ে দিচ্ছি৷ দু-লাখ ডলার নেহাত কম কথা নয়৷ কিন্তু তার বদলে আমি শুধু বাড়ি যেতে চাইছি৷’

একইভাবে শান্তি, নির্লিপ্ত স্বরে জবাব দল ব্লেক, ‘উঁহু—আমার ধারণা, সেরকম ছেলেমানুষি তুমি করবে না৷’

জিপো এবার কিটসনের দিকে ফিরল, আবেদন জানাল করুণ সুরে, ‘আলেক্স, তুমি তো জানো এ কাজটা কিরকম বিপজ্জনক! আমরা কেউ প্রথমে রাজি হইনি, মনে আছে? কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক আমাদের একথা সেকথা বলে রাজি করিয়েছিল৷ চলো, আমরা চলে যাই৷ এড আর জিনিই ট্রাকের সমস্ত টাকা ভাগ করে নিক৷ ও টাকায় আমাদের কোনও প্রয়োজন নেই৷ তুমি আর আমি দুজনে একসঙ্গে কাজ করব, আমাদের কোনও অসুবিধেই হবে না৷ তুমি আমার সঙ্গে কারখানায় কাজ করবে৷ আমাদের দিন সচ্ছলভাবেই কেটে যাবে… বিশ্বাস করো আলেক্স, বাকি জীবনটা আমরা নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দিতে পারব৷’

‘ন্যাকামো ছাড়ো, জিপো!’ ব্লেক নরম স্বরে বলল, ‘তুমি এখানেই থাকছ, এবং ট্রাকের তালা খুলছ—এই আমার শেষ কথা৷’

জিপো পাগলের মতো মাথা নাড়িয়ে চলল, ‘না, না—এড, আমাকে যেতেই হবে! এই কাজের শেষ দেখার মতো সাহস আমার নেই; তবে কী করে ট্রাকের তালা খুলতে হয় সে আমি তোমাদের বলে দিয়ে যাব৷ তখন তুমি আর জিনি সহজেই ওই ট্রাকের তালা খুলে ফেলতে পারবে, কিন্তু আমাকে আর থাকতে বলো না। আমাদের ভাগের পাঁচ লাখ ডলার তোমরা এমনিতেই পেয়ে যাচ্ছ, কারণ আমার টাকাটা আমি তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি: আর আলেক্স ওর অংশটা জিনিকে দিয়ে যাবে৷ আমাদের তুমি ছেড়ে দাও, এড৷ আমরা চলে যাচ্ছি…৷’

ব্লেক ফিরে তাকাল কিটসনের দিকে, ‘তুমিও কি চলে যেতে চাও?

মরগ্যানের আকস্মিক ভয়ঙ্কর মৃত্যুতে কিটসন সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে পড়েছিল, কিন্তু এখন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যে ফিরে পাচ্ছে তার হারানো সাহস৷ রাত্রির অন্ধকারে দু-দুটো মৃতদেহকে কবর দেওয়ার দুঃস্বপ্নের প্রভাবকে সে ক্রমশ কাটিয়ে উঠেছে৷ এবং এই আকস্মিক উৎকণ্ঠাময় ঘটনাগুলো কিটসনকে দুর্বল করার পরিবর্তে যেন বেপরোয়া করে তুলেছে৷ সে বেশ বুঝতে পারছে, এখন তারা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে সেখান থেকে ফেরা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়৷ একমুখী রাস্তা ধরে তারা এগিয়ে চলেছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে৷ এখন কিটসনের নিজের প্রাণ ছাড়া আর কিছু হারাবার নেই, কিন্তু লাভের দিকে রয়েছে আড়াই লাখ ডলার, সোনালি ভবিষ্যৎ আর জিনির সঙ্গ৷ না, সে এখন চাক বা না চাক, ফিরে যাওয়ার প্রশ্ন এখন অবান্তর৷

‘নাঃ’ ব্লেকের চোখে-চোখ রেখে নিষ্কম্প জবাব দিল কিটসন৷

‘শোনো, আলেক্স—তুমি কী বলছ, তা তুমি নিজেই জানো না৷’ মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করল জিপো, ‘তুমি এদের সঙ্গে এই বিপদের মধ্যে থেকে কী করবে? তার চেয়ে চলো আমার সঙ্গে—আমার কারখানায়৷ মনে কোরো না এ কাজ করে তোমরা রেহাই পেয়ে যাবে৷ শেষ পর্যন্ত বিপদে তোমরা পড়বেই! তার চেয়ে এখনই সংস্রব ত্যাগ করা ভালো৷ আলেক্স, তুমি চলে এসো আমার সঙ্গে—৷’

‘না জিপো, তা হয় না৷’ জিনির দিকে আড়চোখে তাকাল কিটসন৷ জিপো গভীরভাবে সশব্দে শ্বাস নিল, ‘তাহলে আমি চললাম৷ কিন্তু মনে রেখো, এখানে থেকে তোমার ভালো কোনওদিনই হবে না৷ তিন তিনটে লোক এই ট্রাকের কারণেই মারা গেছে, তাদের রক্তের দাম কোনওদিনই তোমরা শুধতে পারবে না—পারবে? ফ্র্যাঙ্ক বলেছিল, ‘পৃথিবীটাকে ধরবে এই হাতের মুঠোয়৷ হুঁ… ওর অন্তিম পরিণতির কথা তোমাদের কি দ্বিতীয়বার মনে করিয়ে দিতে হবে? একরাশ ভিজে মাটির নীচে স্যাঁতস্যাঁতে একটা গর্তে ও নিশ্চিন্তে শুয়ে রয়েছে৷ ওর রাজা হবার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে৷ এখনও কি তুমি বুঝতে পারছ না, আলেক্স? তোমরা কেউ কি বুঝতে পারছ না, যে এসবের শেষ কোনওদিনই ভালো হয় না, হতে পারে না?’ হঠাৎই উত্তেজিত হয়ে উঠল জিপো, ‘ঠিক আছে, তাহলে আমাকে তোমরা ছেড়ে দাও—আমি চললাম৷’

ব্লেক চট করে হাত বাড়িয়ে জিনির কোলে পড়ে থাকা .৩৮ টা তুলে দিল৷ নিষ্ঠুরভাবে উঁচিয়ে ধরল জিপোর বুক লক্ষ করে৷

‘ট্রাকটা তোমাকে খুলতেই হবে, জিপো৷ নইলে ফ্র্যাঙ্কের পাশে তোমাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলব৷’

ব্লেকের শান্ত স্বরে চরম, শীতল সুর জিপোর কান এড়াল না৷ সে বুঝল, ব্লেক ঠাট্টা করছে না৷

এক দীর্ঘ মুহূর্ত ধরে জিপো একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল, স্থির চোখে চেয়ে রইল .৩৮ এর কালো নলটার দিকে৷ তারপর নিরাশ হয়ে হতাশার একটি ভঙ্গি করে ধপ করে বসে পড়ল৷

‘আচ্ছা তাহলে তাই হোক৷’ জিপোর মুখে অপ্রসন্নতার স্পষ্ট ছায়া, ‘তুমি আমাকে গায়ের জোরে আটকাতে চাইছ, কিন্তু এতে কিছু লাভ হবে না৷ কারণ আমি জানি, এ কাজের শেষ পরিণতি মোটেই ভালো হবে না—হতে পারে না৷’

বন্দুকটা নামিয়ে রাখল ব্লেক৷

‘তোমার বকবকানি শেষ হয়েছে৷’ বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করল সে৷

‘আমার আর কিছু বলার নেই৷’ জিপো মাথা ঝুঁকিয়ে বসল, ‘কিন্তু আমি তোমাকে বার বার সাবধান করে দিয়েছি, এড; সেটা মনে রেখো৷ এ কাজের শেষ পরিণতি কখনওই ভালো হতে পারে না৷’

‘ঠিক আছে৷’ অন্য দুজনের দিকে চোখ রাখল ব্লেক, ‘তাহলে জিপো যখন রাজি হয়েছে, এবারে আমরা আলোচনায় বসতে পারি৷ এখন আমরা মোট চারজন৷ তার মানে আমরা প্রত্যেকে যা পেতাম তার চেয়ে এখনও আরও পঞ্চাশ হাজার ডলার বেশি পাব৷ কারণ ফ্র্যাঙ্কের ভাগের টাকাটা আমরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিচ্ছি৷ আর পরিকল্পনা যা ছিল সেই মাফিকই কাজ চলবে৷ কিটসন—তুমি আর জিনি নতুন বিয়ে করা স্বামী-স্ত্রী মতোই অভিনয় চালিয়ে যাও৷ আমি আর জিপো ক্যারাভ্যানের ভেতরে ট্রাক নিয়ে লড়ে যাব৷ টাকাটা হাতে আসামাত্রই আমরা চারজন চারদিকে কেটে পড়ব রাজি?’

ওরা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল৷

‘ঠিক আছে, তাহলে এই কথাই রইল৷’ ব্লেক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল৷ এগিয়ে গেল দরজার দিকে৷ তালা থেকে চাবিটা বের করে পকেটে রাখল, ‘আচ্ছা আমি তাহলে শুতে চললাম৷ আজকের মতো যথেষ্ট পরিশ্রম হয়েছে৷’ ব্লেক এগিয়ে গেল জিপোর কাছে৷ পেটে খোঁচা মারল, ‘ওঠো মোটুরাম—চেয়ারে গিয়ে শুয়ে পড়ো৷ সোফাটা আমাকে ছেড়ে দাও৷ আমার মনে হয় সোফাতে শোবার অধিকার বর্তমানে একমাত্র আমারই আছে৷’

জিপো উঠে শ্লথ পায়ে একটা চেয়ারের দিকে এগিয়ে চলল৷ ব্লেক বসে পড়ল সোফার ওপর৷ নিচু হয়ে পা থেকে জুতো খুলতে খুলতে কিটসনকে লক্ষ করে সে বলে উঠল, ‘পাশের ঘরে তোমার জন্যে খাট পাতা আছে, আলেক্স৷ যাও গিয়ে শুয়ে পড়ো—স্বামীর কর্তব্য পালনে মন দাও৷’

ব্লেকের টোপ গেলবার মতো মনের অবস্থা কিটসনের ছিল না৷ সে পরিশ্রান্তভাবে একটা চেয়ারে গা-এলিয়ে দিল—হাই তুলে ঘুমোবার চেষ্টা করল৷

পাশের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল জিনি৷ ওরা শুনতে পেল দরজায় চাবি দেওয়ার শব্দ৷’

‘তোমার দুর্ভাগ্য, আলেক্স!’ ব্যঙ্গের সুরে বলে উঠল ব্লেক৷ হাত বাড়িয়ে ঘরের আলোটা নিভিয়ে দিল, ‘মনে হচ্ছে, তোমার মতো স্বামীকে জিনির ঠিক পছন্দ হয়নি৷’

‘ও—তুমি থামবে!’ বিরক্তিভরে ধমকে উঠল কিটসন৷

পরদিন সকাল সাতটার কিছু পরেই জিনির ঘুম ভাঙল৷ বসবার ঘরে এসে ও জানলার পরদাগুলো সরিয়ে দিল৷ বাইরের আলো এসে ঘরে ঢুকতেইে ওরা তিনজন জেগে উঠল৷

একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে পলকের মধ্যে উঠে বসল ব্লেক, রিভলভারের খোঁজে পকেট হাতড়াতে শুরু করল৷

কিটসনের ঘুমের আমেজ তখনও কাটেনি৷ সে মাথা তুলে পিটপিট করে তাকাল জিনির দিকে৷ ও তখন নির্বিকারভাবে এগিয়ে চলেছে রান্নাঘরের দরজা লক্ষ করে৷

জিপো শরীরের ম্যাজম্যাজে ভাবটা কাটাতে আড়মোড়া ভাঙল৷ সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে আহত চোয়ালে হাত বোলাতে লাগল৷ একটা অস্ফুট যন্ত্রণার শব্দ বেরিয়ে এল তার মুখ থেকে৷

জিনি রান্নাঘর থেকে ডেকে বলল, ‘তোমরা তাড়াতাড়ি ক্যারাভ্যানে যাবার তোড়জোড় করো, এর মধ্যেই কিন্তু হ্রদের ধারে লোকজন ভিড় করতে শুরু করেছে৷’

ব্লেক একটা দুর্বোধ্য শব্দ করে পা-বাড়াল কলঘরের দিকে৷ মিনিট দশেক পরে সে দাড়ি কামিয়ে স্নান সেরে বেরিয়ে এল৷ জিপোকে লক্ষ করে বলল, ‘যাও স্নান সেরে নাও৷ তোমার গা-থেকে মোষের মতো বোটকা গন্ধ বেরচ্ছে৷’

জিপো থমথমে মুখে ব্লেককে একবার দেখল, তারপর এগিয়ে গেল কলঘরের দিকে৷

জিপো স্নান সেরে সোজা ঘরে ঢুকতেই সে দেখল, একটা ট্রেতে প্রাতরাশ সাজিয়ে বসবার ঘরে নিয়ে এসেছে জিনি৷

‘এগুলো নিয়ে ক্যারাভ্যানের ভেতরেই তোমরা খাওয়া-দাওয়া সেরে নাও৷’ ট্রে-টা ব্লেকের হাতে ধরিয়ে দিল জিনি৷

ব্লেক এক-পলকে দেখল ট্রের মধ্যে কফি, ডিম সেদ্ধ কমলালেবুর রস ও স্যান্ডউইচের দিকে৷ তার চোখে নেমে এল কুৎসিত ঝলকানি৷ ট্রে-টা জিনির হাত থেকে নিল সে, শোনো সুন্দরী, এখন থেকে তোমরা আমার কথামতো চলবে৷ কারণ এ দলের পরিচালনার ভার এখন আমার!’

জিনির চোখে খেলা করল তাচ্ছিল্যের কৌতুক৷

‘পরিচালনার ভার? তার মানে?…এ দলের পরিচালনার দায়িত্ব কারোরই নেই—মরগ্যানেরও ছিল না৷ আমরা শুধু প্ল্যান মাফিক কাজ করে যাব৷ প্রথম থেকেই ঠিক ছিল, তুমি আর জিপো কেবলমাত্র রাত্রিবেলাতেই কেবিনে আসবে৷ এবং সারাটা দিন তোমাদের ক্যারাভ্যানের ভেতরই লুকিয়ে থাকতে হবে৷ এখন যদি তুমি তোমার মত বদলে থাকো, তো সে কথা বলো৷’

‘আচ্ছা—খুব কথা শিখেছ দেখছি!’ ব্যঙ্গভরে বলে উঠল ব্লেক, ‘তার মানে ক্যারাভ্যানে বসেই আমাদের খানাপিনা সারতে হচ্ছে? ব্যাপার কী, তোমাদের দাম্পত্য জীবনযাত্রায় অসুবিধে ঘটাচ্ছি বলেই কি আমাদের তাড়িয়ে দিচ্ছ?

জিনি কোনও জাবাব না দিয়েই ঘুরে দাঁড়াল, ফিরে চলল রান্নাঘরের দিকে৷

‘এড, সব সময়ে জিনির পেছনে লাগাটা আমি পছন্দ করি না৷’ উঠে দাঁড়াল কিটসন৷

‘থামো! আর সাফাই গাইতে হবে না!’ খিঁচিয়ে উঠল ব্লেক, ‘যাও, বাইরে গিয়ে দেখো, আশেপাশে লোকজন আছে কি না৷ না থাকলে ক্যারাভ্যানের দরজাটা চটপট খুলে দেবে৷’

সামান্য ইতস্তত করে বাইরের রোদ্দুরে গিয়ে দাঁড়াল কিটসন৷ তাকাল চারপাশে৷ না, কেউই তাকে লক্ষ করছে না৷ তখন সে ডাকল ব্লেককে, আর সঙ্গে সঙ্গেই খুলে দিল ক্যারাভ্যানের পিছনটা৷

ব্লেক আর জিপো ক্ষিপ্রগতিতে ঢুকে পড়ল ক্যারাভ্যানের ভেতরে৷

‘যাও, এবার মৌজ করো গিয়ে৷’ ব্লেকের চোখ চকচক করে উঠল, ‘সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে তুমি ছাড়বে বলে তো মনে হয় না৷’

কিটসন হাতলে চাপ দিয়ে সশব্দে বন্ধ করে দিল ক্যারাভ্যানের দরজা৷ ব্লেক ও জিপো বন্দি হল ক্যারাভ্যানের ভেতরে৷ কাজ শেষ হলে কিটসন ফিরে এল কেবিনে৷

জিনি তখন আরও কয়েকটা স্যান্ডউইচ তৈরি করছে৷

কিটসন এসে সোজা গিয়ে ঢুকল কলঘরে৷ স্নান করে, দাড়ি কামিয়ে নতুন পোশাক পরে সে বেরিয়ে এল৷

বসবার ঘরে এসেই সে দেখল, জিনি টেবিলের ওপর ডিম সেদ্ধ ও স্যান্ডউইচ সাজিয়ে রাখছে৷

‘ও—চমৎকার হয়েছে৷’ নাক দিয়ে গভীর শ্বাস টানল কিটসন, ‘কিন্তু কার জন্যে তা তো ঠিক বুঝতে পারছি না৷ তোমার—না আমার?’

‘সকালে আমার কিছু খাওয়ার অভ্যেস নেই৷’ সংক্ষিপ্তভাবে জবাব দিল জিনি৷ এক কাপ কফি ঢেলে গিয়ে বসল অদূরেই একটা আরাম কেদারায়৷ কিটসনের দিকে আংশিকভাবে পিছন ফিরে৷

কিটসন টেবিলের কাছে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল৷ এমনিতেই সে বেশ ক্ষুধার্ত ছিল, তার ওপর স্যান্ডউইচের লোভনীয় সুবাস তাকে যেন পাগল করে তুলল৷ চটপট খেতে শুরু করল সে৷ মনে মনে জিনির রান্নার প্রচুর তারিফও করল৷

‘ভাবছি, খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেলে একটু বেরব৷’ প্রস্তাবের সুরে বলল কিটসন, নৌকো করে হ্রদটা একটা চক্কর দেওয়া যাবে—কী বলো?’

‘হুঁ৷’

জিনির সংক্ষিপ্ত উত্তরে হতাশ হল কিটসন৷

‘ক্যারাভ্যানে ওদের দুজনের খুব কষ্ট হবে৷’ জিনির সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল কিটসন, ‘বাইরে তেমন ছায়া-টায়াও নেই৷ দুপুরের মধ্যেই ক্যারাভ্যানের ভেতরটা উনুনের মতো গরম হয়ে পড়বে৷’

‘সে ওরা বুঝবে৷’ নির্লিপ্ত স্বরে উত্তর দিল জিনি৷

‘হ্যাঁ—তা ঠিক৷…আচ্ছা, তোমার কী মনে হয়? জিপো ট্রাকের তালা খুলতে পারবে?’

হাতের একটা অধৈর্য ভঙ্গি করল জিনি, ‘সে আমি কী করে জানব?’

‘না—মানে, বলছিলাম শেষ পর্যন্ত জিপো যদি সেটা পেরে না ওঠে তাহলে আমরা কী করব?’

 ‘সে কথা আমাকে জিগ্যেস করছে কেন? নিজে যদি বুঝতে না পার তবে ব্লেককে গিয়ে জিজ্ঞেস করো৷’

আচমকা চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল জিনি৷ কফির কাপ হাতে তুলে দিয়ে চলে গেল রান্নঘরে৷

কিটসন অনুভব করল, অসহ্য উত্তাপ যেন তার মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়েছে৷ হঠাৎই তার খাওয়ার ইচ্ছেটা নষ্ট হয়ে গেল৷ বিকৃত মুখে কয়েক চুমুকে কাপের কফিটা শেষ করল সে৷ কাপ-প্লেটগুলো হাতে তুলে নিয়ে এগোল রান্নঘরের দিকে৷

রান্নাঘরের টেবিলে এঁটো বাসনগুলো নামিয়ে রাখল কিটসন, ‘শোনো, জিনি, আমি কিন্তু তোমাকে বিরক্ত করতে চাইনি৷ তবে ভেবে দেখো, আমাদের একসঙ্গে অন্যান্য লোকেদের সামনে একটু ঘোরাফেরা করা দরকার৷ কারণ ওদের বোঝাতে হবে, আমরা হানিমুনে এসেছি৷ আমাদের আসল সম্পর্কটাকে কয়েকদিনের জন্যে ভুলে থাকা যায় না? বুঝতেই পারছ, শুধু…’ খেই হারিয়ে আচমকা থেমে গেল কিটসন৷

‘দোহাই তোমার৷ আমাকে একটু একা থাকতে দাও৷ দয়া করে পাশের ঘরে যাও৷’ জিনি কিটসনের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়াল৷ ওর গলার স্বর শেষ দিকটায় কেমন কেঁপে গেল৷

জিনির কথা বলার সুরে দুঃখ পেল কিটসন৷ সে ঘুরে এসে দাঁড়াল জিনির মুখোমুখি৷ তখনই তার নজরে পড়ল জিনির বাহ্যিক পরিবর্তনটা৷ ওর মুখটা কেমন লম্বাটে, চোয়াড়ে দেখাচ্ছে৷ সজীবতার রেশটুকু মিলিয়ে গিয়ে ফুটে উঠেছে গ্রীষ্মের আকাশের বিবর্ণতা৷ নাঃ, মেয়েটা নিজেকে যতটা সমর্থ মনে করে ততটা নয়—ভাবল কিটসন৷ গত দিনের বীভৎস ঘটনাগুলো ওর মনে ভীষণভাবে আঘাত করেছে৷ যেমন করেছে কিটসনের মনকে৷

‘ঠিক আছে আমি এক্ষুনি চলে যাচ্ছি৷’ বসবার ঘরে এসে বসল কিটসন৷ মাথার কালো চুলে আলতো করে আঙুল চালাল৷

দীর্ঘ এক নীরব মুহূর্তের পর জিনির কান্না শুনতে পেল কিটসন৷ কিন্তু সে বসেই রইল৷ এ কাজের হতাশ পরিণতির ইঙ্গিতেই যেন বয়ে এল সেই হালকা, অস্ফুট কান্নার সুর৷ শেষ পর্যন্ত জিনিও তাহলে কাঁদছে? কিটসন বুঝল, তাদের সাফল্যের আশা এখন সুদূর পরাহত৷

কিটসন নীরবে ধূমপান করে চলল৷ মুহূর্তের পর মুহূর্ত কেটে গেল অস্বস্তিকর প্রতীক্ষায়৷ হঠাৎ একসময় রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল জিনি৷ কিটসন ভালো করে ওকে দেখবার আগেই ও সোজা গিয়ে ঢুকল শোবার ঘরে৷

আবার কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা৷ অবশেষে শোবার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল জিনি৷

‘চলো, যাওয়া যাক৷’ সংক্ষিপ্তভাবে বলল ও৷

কিটসন মুখ ফিরিয়ে তাকাল জিনির দিকে৷

জিনির সাজসজ্জায় কোথাও কোনও খুঁত নেই, শুধু ওর সবুজ চোখের অস্বাভাবিক দ্যুতি এবং দাঁড়াবার সংযত ভঙ্গি জানিয়ে দিচ্ছে ওর অস্থির মানসিক অবস্থার কথা৷

কিটসন উঠে দাঁড়াল৷

‘একটা খবরের কাগজ পেলে মন্দ হতো না৷’ ইচ্ছে করেই জিনির দিক থেকে চোখ সরিয়ে রাখল কিটসন৷

‘হ্যাঁ, মনে হয় বাইরেই পাওয়া যাবে৷’

বসবার ঘর অতিক্রম করে দরজার দিকে এগিয়ে গেল জিনি৷ ওর পরনে একটা হালকা সোয়েটার এবং শ্যাওলা-সবুজ স্ল্যাক্স৷ এই পোশাকে ওর নিখুঁত কমনীয় দেহ-সৌন্দর্য যেন ফুটে বেরচ্ছে৷ আজ এই মুহূর্তে জিনিকে আরও ভালো লাগল কিটসনের৷

সে ওকে অনুসরণ করে বাইরে এল৷

কেবিনের বাইরে পা-রাখতেই সূর্যের প্রখর তাপ ওদের শরীরে আছড়ে পড়ল৷ ওরা একবার তাকাল রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যারাভ্যানটার দিকে৷ মনে মনে অনুমান করার চেষ্টা করল ক্যারাভ্যানের আভ্যন্তরীণ উত্তাপ৷

সামনের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একটা রাস্তা সোজা চলে গেছে হ্যাডফিল্ডের অফিসের দিকে৷ তার অফিসের পাশেই আছে একটা মুদিখানার দোকান৷ জঙ্গলের ছায়াঘেরা অঞ্চল পার হয়ে ওরা যখন কাঠের অফিসে বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল, তখন জিনি একহাতে আঁকড়ে ধরল কিটসনের হাত৷ ওর ঠান্ডা স্পর্শে কিটসনের মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে এল এক অদ্ভুত যন্ত্রণায় অনুভূতি৷ সে চমকে ঘুরে তাকাল জিনির দিকে৷

জিনি বিষণ্ণভাবে হাসতে চেষ্টা করল, ‘আমার ব্যবহারের জন্যে কিছু মনে করো না৷ মাঝে মাঝে আমার অমনি হয়৷ এখন বেশ আছি৷’

‘না না—ঠিক আছে৷ সত্যিই তো, কাল সারাটাদিন ধরে কম ধকল গেছে!’ জিনির নরম হাতে চাপ দিল কিটসন৷

এমন সময় হ্যাডফিল্ড বেরিয়ে এল তার অফিস থেকে৷ ওদের দেখেই আকর্ণ বিস্তৃত হাসিতে মুখ ভরিয়ে কাছে এগিয়ে এল, ‘এই যে মিঃ হ্যারিসন,’ কিটসনের দিকে হাত বাড়িয়ে ধরল হ্যাডফিল্ড, ‘কেমন লাগছে জায়গাটা, বলুন…আমি বেশ বুঝতে পারছি মশায়, আপনি দারুণ সুখে রয়েছেন৷ হুঁ-হুঁ—আপনি না বলতেই কিরকম ধরে ফেলেছি দেখলেন? আরে মশায়, আপনার মুখ দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, জায়গাটা আপনার খুব ভালো লেগেছে৷ আর, তাছাড়া—মিসেস হ্যারিসনের মতো সুন্দরী স্ত্রী পেলে আপনি কেন, যে কোনও স্বামীই সারাটা জীবন সুখে কাটিয়ে দেবে—কী বলেন মিসেস হ্যারিসন?’

‘আপনাকে ধন্যবাদ, মিঃ হ্যাডফিল্ড৷’ হাসতে-হাসতেই বলল জিনি, ‘এত প্রশংসাও করতে পারেন আপনি!…যাকগে, আমরা কিন্তু খবরের কাগজের খোঁজে এসেছিলাম৷ আছে নাকি?’

‘খবরের কাগজ?’ হ্যাডফিল্ডের ঘন ভুরুজোড়া ঊর্ধ্বমুখী হল, ‘বলেন কী মিসেস? আজ পর্যন্ত কোনও খদ্দেরকে আমি খবরের কাগজের খোঁজ করতে শুনিনি? কারণ হানিমুন কাটাতে এসে কেউ বাইরের খবরে নজর দেয় না৷ তবে খবরের কাগজ যে নেই তা নয়, আছে৷ আর আজকের সবচেয়ে জোর খবর ওই ট্রাক লুটের ব্যাপারটা৷’ হ্যাডফিল্ডের খুশি খুশি মুখে ফুটে উঠল দোঁতা হাসি, ‘আপনাকে চুপি চুপি বলে রাখছি মিঃ হ্যারিসন, আমি কিন্তু লোকগুলোকে তারিফ না করে পারছি না৷ একেবারে নিঃশব্দে দশ লাখ ডলার নিয়ে চম্পট! একবার ভেবে দেখুন তো! দশ লক্ষ ডলার! আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, টাকাটা নিয়ে ওরা কোথায় গেল, কী করল তা কেউই আন্দাজ করতে পারছে না৷ মানে গোটা ট্রাকটা একেবারে বেমালুম হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে৷ নাঃ, সাহস আছে লোকগুলোর৷’ মাথার টুপিটা পিছন দিকে সামান্য ঠেলে দিয়ে হাসল হ্যাডফিল্ড, ‘এরকম ঘটনা আমার জীবনে এই প্রথম শুনছি৷ খবরের কাগজে যখন ব্যাপারটা পড়লাম, তখন ভাবছিলাম, কী পরিমাণ বুদ্ধি আর সাহস থাকলে ওই ট্রাককে হাওয়া করা যায়৷ একেবারে উবে গেল? অতবড় একটা ট্রাক, তার ওপর পুলিশ আর সৈন্যবাহিনীর লোকেরা এখনও একশো মাইল জায়গা জুড়ে তন্নতন্ন করে খুঁজে চলেছে, তবু তার কোনও সন্ধান নেই? আশ্চর্য!”

খবরের কাগজ আনতে অফিসের দিকে পা-বাড়াল হ্যাডফিল্ড৷

জিনি ও কিটসন অর্থপূর্ণ চোখে তাকাল পরস্পরের দিকে৷

কিছুক্ষণ পরেই চার চারটে খবরের কাগজ হাতে নিয়ে ওদের সামনে এসে হাজির হল হ্যাডফিল্ড৷

‘ভাবলাম, আপনারা হয়তো সবক’টাই দেখতে চাইবেন, তাই নিয়ে এলাম৷ তবে সাচ্চা খবর যদি পেতে চান, তাহলে পাবেন হোরাল্ড-এ৷’

‘না, আমি সবকটা কাগজই নেব৷’ রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল কিটসন ‘মানে—খবরগুলো একটু যাচাই করে দেখব আর কি৷’

বিনাবিলম্বে হ্যাডফিল্ডকে কাগজের দাম মিটিয়ে দিল সে৷

‘আপনাদের কোনওরকম অসুবিধে হচ্ছে না তো মিসেস হ্যারিসন?’ হ্যাডফিল্ড তাকাল জিনির শরীরের বিশেষ অংশের দিকে, ‘কিছু করার থাকলে বলুন, আমি এখুনি—’

‘না, তার কোনও প্রয়োজন নেই, মিঃ হ্যাডফিল্ড৷’ হ্যাডফিল্ডকে বাধা দিল জিনি, ‘আমাদের কোনও অসুবিধেই হচ্ছে না৷’

কথা শেষ করে জিনি গিয়ে ঢুকল সামনের মুদি দোকানের দিকে, আর কিটসন কাগজের প্রথম পৃষ্ঠার জোরদার খবরগুলোর ওপর চোখ বোলাতে লাগল৷

প্রতিটি কাগজের প্রথম পৃষ্ঠাতেই বড় বড় হরফে ছাপা হয়েছে ট্রাক লুটের খবর৷ সেই সঙ্গে ট্রাকটার ছবিও ছাপা হয়েছে৷ এমন কি ডার্কসন ও টমাসের ছবিও বাদ যায়নি৷ সৈন্যবাহিনীর তরফ থেকে ট্রাক উদ্ধারের সম্পর্কিত খবরের জন্যে এক হাজার ডলার পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে৷

পুলিশের তরফ থেকে ট্রাকের ড্রাইভার ডেভ টমাসকে লুটেরাদের একজন বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে৷ বলাবাহুল্য টমাসের নিরুদ্দেশ হওয়াটাই এই সন্দেহের একমাত্র কারণ৷

কিটসন একমনের কাগজ পড়ছিল, বুকের দ্রিম দ্রিম শব্দ ক্রমশ বেড়েই চলেছে—হঠাৎ ফ্রেড ব্র্যাডফোর্ডের ডাকে তার চমক ভাঙল৷ গতকাল এই ভদ্রলোকই তাকে চাকা পালটানোর কাজে সাহায্য করতে চেয়েছিল৷ সম্ভবত সেও তার খবরের কাগজ সংগ্রহ করতে এ সময়ে হ্যাডফিল্ডের অফিসের দিকে এসেছে৷

‘এই যে—মিঃ হ্যারিসন, কেমন লাগছে এখানে? সুন্দর জায়গা তাই না?… তা খবরের কাগজ এর মধ্যেই পেয়ে গেছেন দেখছি?’

‘হ্যাঁ, এইমাত্র পেলাম৷’

‘আপনি নিশ্চয়ই ট্রাক লুটের খবরটা পড়ছিলেন? আজ সকালেই আমি রেডিওতে পুরো ঘটনাটা শুনলাম৷ ওরা সন্দেহ করছে, ট্রাকটাকে নিশ্চয়ই আশেপাশের কোনও জঙ্গলে লুকিয়ে রাখা হয়েছে৷ তাই সার্চ-টিম বের করা হচ্ছে ট্রাকের খোঁজে৷ হেলিকপ্টারে করে প্রতিটি রাস্তার ওপর নজর রাখা হচ্ছে—কিন্তু কোথায় কী? ট্রাকের কোনও পাত্তাই নেই!’

‘হুঁ৷’ কাগজগুলো ভাঁজ করে ফেলল কিটসন৷

‘কিন্তু আমি এখনও ভেবে পাচ্ছি না, মিঃ হ্যারিসন, যে এতগুলো চোখকে ফাঁকি দিয়ে কী করে ওরা ট্রাকটাকে লুকিয়ে রেখেছে? আমার কিন্তু সন্দেহ হয় ওই ড্রাইভারটাকে—ব্যাটা নিশ্চয়ই ওদের লোক৷ আপনার কী মনে হয়?’

‘হতে পারে৷’ নিষ্পৃহ স্বরে জবাব দিল কিটসন৷

কিন্তু রক্ষীটার কী দশা হল দেখুন তো! কী নাম যেন লোকটার? …ওঃ, হ্যাঁ, ডার্কসন,… আমার মতে ওয়েলিং কোম্পানির তরফ থেকে ওর পরিবারকে নিয়মিত সাহায্য করা উচিত৷’

হ্যাডফিল্ড এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ব্র্যাডফোর্ডের কথাগুলো গিলছিল৷ হঠাৎ বলে উঠল, ‘পুলিশের ধারণা ওই গাড়ি দুর্ঘটনার ব্যাপারটা নাকি পুরোপুরি সাজানো৷ তার মানে, লুটেরাদের দলে একটা সোমত্ত মেয়েও আছে৷ ডার্কসন মারা যাবার আগে বেতারে ওই দুর্ঘটনার কথা এজেন্সিকে জানিয়েছিল৷ তাই পুলিশ টমাসের ব্যক্তিগত জীবন আতিপাতি করে খুঁজে দেখছে, যদি কোনও নারীঘটিত ব্যাপারের আভাস পাওয়া যায়৷ অবশ্য ওর স্ত্রী জানিয়েছে, টমাস সেরকম চরিত্রের লোকই নয়—কে জানে শেষ পর্যন্ত কী হবে!’

‘নাঃ, ওই পুরস্কারের টাকাটা পেলে নেহাত মন্দ হয় না৷’ ব্র্যাডফোর্ড তার মনের ইচ্ছে খুলে জানাল, ‘আমার ছোট ছেলেটা তো ভীষণ লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে৷ বলছে, ও নাকি জঙ্গলের ভেতর টহল মেরে ট্রাকটাকে খুঁজে বার করবে৷’ হাসল সে, ‘যাক, তবু কদিনের জন্যে ওর বায়নাক্কার হাত থেকে একটু রেহাই পাওয়া যাবে৷ যা-দুরন্ত ছেলে মশাই কী বলব! ওর মাকে একেবারে অস্থির করে ছাড়ে৷’

হ্যাডফিল্ড মাথা নাড়ল, ‘উঁহু—ট্রাকটা এখানকার জঙ্গলে লুকিয়ে রাখার মতো বোকামি ওরা করবে না৷ কারণ সময়ে অসময়ে, সব সময়েই এই জঙ্গল দিয়ে লোকজন চলাফেরা করে৷ আমার মনে হয় ট্রাকটাকে ওরা অন্য কোথাও লুকিয়ে রেখেছে৷ হয়তো এখান থেকে আরও ওপরে, ফক্সউডেই লুকিয়ে রেখেছে৷৷ ওই রাস্তায় লোকজনের চলাচলও অনেক কম, আর বড় রাস্তা থেকে জায়গাটা অনেক দূরেও বটে৷’

‘কিন্তু খবরদার৷ ভুলেও আমার ছেলেকে এ সংবাদ দেবেন না, মশাই! শেষ পর্যন্ত পাহাড় বেয়ে সে হয়তো ফক্সউড পর্যন্তই ছুটবে৷ কী যে ভূত চেপেছে মাথায়…’

জিনিসপত্র ভর্তি একটা প্যাকেট নিয়ে মুদিখানার দোকান থেকে বেরিয়ে এল জিনি৷

‘সুপ্রভাত, মিসেস হ্যারিসন৷’ টুপি খুলে জিনিকে অভিবাদন জানাল ব্র্যাডফোর্ড, ‘পথে আর কোনও অসুবিধে হয়নি তো?’

‘না৷’ হাসল জিনি৷ জিনিসপত্রের প্যাকেটটা কিটসনের হাতে দিয়ে অন্তরঙ্গভাবে তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল৷ আঁকড়ে ধরল কিটসনের বাহু৷ ভুরু উঁচিয়ে প্রশ্ন করল, ‘হ্রদে বেড়াবার জন্যে নৌকো পাওয়া যাবে, মিঃ হ্যাডফিল্ড?’

‘নিশ্চয়ই; কেন নয়৷ এই তো বেড়াবার সময়৷ একটু পরেই রোদের তাপ অসহ্য হয়ে উঠবে৷ আপনি তো জানেন কোথায় নৌকো ভাড়া পাওয়া যায়, সেখানে চলে যান, জো আপনাকে সমস্ত ব্যবস্থা করে দেবে৷’

‘আচ্ছা, তাহলে চলি৷’

‘দরকার মনে করলেই চলে আসবেন, মিসেস হ্যরিসন৷’ আমন্ত্রণ জানাল ব্র্যাডফোর্ড, ‘কুড়ি নম্বর কেবিনেই আমরা আছি৷ আপনাদের ঘর থেকে বড় জোর সিকি মাইল দূর হবে৷ মিলি খুব খুশি হবে আপনাদের দেখলে৷’

হ্যাডফিল্ড কনুইয়ের খোঁচা মারল ব্র্যাডফোর্ডকে, ‘আরে মশাই, আপনার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? কোথায় ওনারা এসেছেন হানিমুনে আর আপনি বলছেন কি না আপনার ঘরে গিয়ে সময় নষ্ট করতে?’

হেসে কিটসনের হাত ধরে এগিয়ে গেল জিনি৷ কিটসনের কাঁধে মাথা রেখে রাস্তা ধরে হেঁটে চলল৷

ব্র্যাডফোর্ড ও হ্যাডফিল্ড একদৃষ্টে চেয়ে রইল ওদের গমন পথের দিকে৷ সম্ভবত কিছুটা ঈর্ষাও বোধ করল কিটসনের সৌভাগ্যে। নাঃ, জিনির মতো সুন্দরী-স্ত্রী পেলে হ্যাডফিল্ড এই মুহূর্তেই কিটসনের সঙ্গে জায়গা বদল করতে রাজি।

ব্র্যাডফোর্ড ও হ্যাডফিল্ড পরস্পরের দিকে চেয়ে হাসল৷

ঘরে পৌঁছে জিনিসপত্রের প্যাকেট রান্নাঘরে নামিয়ে রাখল জিনি৷ কিটসন অতি সন্তর্পণে বাইরে ক্যারাভ্যানের পাশে এসে দাঁড়াল৷ যখন দেখল কেউ তাকে লক্ষ করছে না, তখন আস্তে আস্তে টোকা মারল জানলায়৷

ঘর্মাক্ত রক্তিম মুখে জানলা খুলে ধরল ব্লেক, ‘কী চাই?’ দাঁত খিঁচিয়ে উঠল সে, ‘ওঃ, ভেতরে যা গরম! তার ওপর হতচ্ছাড়া মাছিগুলোর জ্বালায় একটু স্থির হয়ে কাজ করার জো নেই! তা—কী চাই তোমার?’

‘তোমাদের জন্যে খবরের কাজ নিয়ে এসেছি৷’ কাগজগুলো জানলা দিয়ে ভেতরে গুঁজে দিল কিটসন, ‘আর কিছু দরকার থাকলে বলো৷’

‘না, কিছু দরকার নেই৷ যাও কাটো৷’ কথা শেষ করেই সশব্দে জানলা বন্ধ করে দিল ব্লেক৷

সে ঘুরে গিয়ে দাঁড়াল ট্রাকের পিছন দিকে—দরজার কাছে৷ কেবিন থেকে নিয়ে আসা একটা টুলে বসে জিপো তখন একমনে কাজ করে চলেছে৷ তার দক্ষ আঙুল নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে কম্বিনেশন চাকতির ওপর ট্রাকের দরজার গায়ে কান পেতে সে ঈপ্সিত শব্দের প্রতীক্ষা করছে৷

ক্যারাভ্যানের ভেতরে অসহ্য গরম৷ ব্লেক বাধ্য হয়েই খুলে ফেলেছে তার কোট, জামা—সব৷ তার লোমশ বুক ঘামে সপসপ করছে৷ কয়েক সেকেন্ড সে লক্ষ করল জিপোকে তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বসে পড়ল ক্যারাভ্যানের মেঝেতে, কাগজ পড়তে শুরু করল৷

প্রায় আধঘণ্টা পর কাগজপত্তর একপাশে ছুড়ে ফেলে উঠে দাঁড়াল ব্লেক৷ জিপোর কাজ দেখতে লাগল৷

চোখ বুজে, একাগ্র মুখে, পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে রয়েছে জিপো৷ কান খাড়া করে সে এক মনে শুনে চলেছে৷ অতি সন্তর্পণে সে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চলেছে কম্বিনেশন চাকতি৷

‘সেই তখন থেকে কী শুরু করেছ?’ বিরক্তিতে ফেটে পড়ল ব্লেক, ‘তুমি কি মনে করছ, টানা দশ দিন ধরে শুধু এই করে যাবে?’

চমকে উঠে চোখ খুলল জিপো৷ রাগত কণ্ঠে বলল, ‘থামো! কানের কাছে এমনি বকবক করলে কী করে কাজ করব বলতে পার?’

‘আমি আর এই বন্ধ ক্যারাভ্যানে থাকতে পারছি না৷ একটু হাওয়া না পেলে আমি মারা যাব৷’ হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে মুখের ঘাম মুছল ব্লেক, ‘আচ্ছা এক কাজ করলে হয় না, জানালার পরদাটাকে ক্যারাভ্যানের গায়ে সেঁটে, যদি জানলাটাকে খুলে দিই? তাহলে হাওয়াও আসবে অথচ মাছিও ঢুকতে পারবে না—’

‘যা করবার তুমি করো৷ যদি আমাকে দিয়ে ট্রাকের তালা খোলাতে চাও, তাহলে আর বিরক্ত কোরো না৷’

ব্লেক আগুনঝরা চোখে তাকাল জিপোর দিকে৷ তারপর যন্ত্রপাতি রাখার তাকের কাছে এগিয়ে গেল৷ সেখান থেকে একটা হাতুড়ি আর কিছু পেরেক বের করে সে পরদাটাকে ক্যারাভ্যানের দেওয়ালে গেঁথে দিল৷ হাত-বাড়িয়ে খুলে দিল জানলার পাল্লা৷

পরদার ফাঁক দিয়ে ব্লেকের চোখে পড়ল অদূরে বিশাল হ্রদ৷ পরমুহূর্তেই সে দেখতে পেল জিনি ও কিটসন একটা নৌকোয় উঠছে; কিটসন বলিষ্ঠ হাতে বৈঠা চালিয়ে নৌকো নিয়ে এগিয়ে চলল আর তখনই ঈর্ষার অন্ধ ক্রোধ আছড়ে পড়ল ব্লেকের মনের গহনে৷

‘শালা, খুব ফুর্তি লুটছে৷’ চাপা আক্রোশে ফেটে পড়ল ব্লেক, ‘ওর জায়গায় আজ আমারই থাকা উচিত ছিল৷ ওই যে শালা জিনিকে নিয়ে মৌজ করছে…’

জিপো গলা বাড়িয়ে ট্রাকের পাশ দিয়ে তাকাল৷ কর্কশ স্বরে বলে উঠল, ‘তুমি কি দয়া করে একটু চুপ করবে!’ এভাবে বিরক্ত করলে কাজ করব কী করে?’

‘আচ্ছা, আচ্ছা বাবা—ঠিক আছে৷’ খেঁকিয়ে উঠল ব্লেক, ‘ষাঁড়ের মতো আর চেঁচিয়ো না!’

যন্ত্রণাক্লিষ্ট আঙুলগুলোকে কিছুটা বিশ্রাম দেওয়ার ইচ্ছায় প্যান্টের গায়ে হাত ঘষতে লাগল জিপো; স্থির চোখে চেয়ে রইল কম্বিনেশন চাকতিটার দিকে৷

এতক্ষণ ধরে শুধু তার পরিশ্রমই সার হয়েছে কম্বিনেশনের একটা নম্বরও সে মেলাতে পারেনি৷ হয়তো এইভাবে দিনের পর দিন তাকে এই কম্বিনেশনের চাকতি নিয়েই পড়ে থাকতে হবে—শেষ পর্যন্ত ক্লান্তি ও হতাশার শিকার হয়ে পড়বে জিপো৷ হয়তো কোনওদিনই এই ট্রাকের তালা সে খুলতে পারবে না৷

‘নাঃ, এবারে একটু বিশ্রাম নেওয় দরকার৷ হাতের আঙুলগুলোয় যেন খিল ধরে গেছে৷’

এগিয়ে এসে খোলা জানলার সামনে দাঁড়াল জিপো৷ বাইরের বাতাসের স্পর্শ পেয়ে বুকভরে শ্বাস নিল সে৷ বায়ু চলাচলের ফলে ক্যারাভ্যানের ভেতরটা এখন কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে৷

‘ওই তালাটাকে অন্য কোনওভাবে তাড়াতাড়ি খোলা যায় না?’ জানতে চাইল ব্লেক, কিন্তু তার চোখজোড়া হ্রদে ভাসমান বিশেষ নৌকোটার ওপর নিবদ্ধ৷ কিটসনের বলিষ্ঠ হাতের চালনায় জল কেটে নৌকোটা দ্রুত বেগে এগিয়ে চলেছে৷

‘ফ্র্যাঙ্ককে তো আমি আগেই বলেছিলাম, তালা খোলার কাজটা নেহাত সহজ হবে না৷ হয়তো শেষ পর্যন্ত আমি নাও পেরে উঠতে পারি৷’

‘তাই নাকি?’ জিপোর চোখে-চোখ রাখল ব্লেক, ‘তবে আমার মনে হয়, তালাটা খুললেই তুমি ভালো করবে, জিপো! আমার কথা তোমার কানে ঢুকেছে? তালা তোমাকে খুলতেই হবে!’

ব্লেকের চোখের করাল দৃষ্টির সামনে যেন কুঁকড়ে গেল জিপো৷ কোনওরকমে বিড়বিড় করে সে জবাব দিল, ‘আমি তো আর ম্যাজিক জানি না—!’ হয়তো এ তালা পৃথিবীর কারও পক্ষেই খোলা সম্ভব নয়৷’

‘অন্তত এই একটা ক্ষেত্রে ম্যাজিক তোমাকে দেখাতেই হবে, জিপো৷’ হিংস্র স্বরে বলে উঠল ব্লেক, ‘যাও৷ কাজ শুরু করো৷ যত বেশি সময় কাজ করবে তত তাড়াতাড়িই খুলবে ট্রাকটা তালাটা… যাও৷’

জিপো আবার ফিরে গেল ট্রাকের দরজার কাছে৷ বসে পড়ে কান চেপে ধরল দরজার গায়ে৷ তারপর সেই আগের মতো আবার ঘোরাতে শুরু করল কম্বিনেশন চাকতি প্রথম নম্বরটা মেলানোর আশায়৷

সন্ধ্যার আগেই জিপো পুরোপুরি ক্লান্ত হয়ে পড়ল৷ টুলে বসে ট্রাকের দরজায় হেলান দিয়ে সে চুপচাপ বসে রইল৷ তালা খোলার আর কোনও চেষ্টাই করল না৷

জিপোর উদভ্রান্ত অবস্থা দেখে ব্লেক তাকে আর বিরক্ত করল না৷ কিন্তু ট্রাকের তালার ব্যাপারে ভেতরে ভেতরে সে বেশ শঙ্কিত হয়ে পড়ল৷

এই গরমে একটানা বারো ঘণ্টা কাজ করে গেছে জিপো৷ মাঝখানে শুধু বিশ্রাম পেয়েছে মাত্র এক ঘণ্টা৷ এখনও পর্যন্ত সে কেবল একটা নম্বর মেলাতে সক্ষম হয়েছে৷ তার অনুমান, কম করে আরও পাঁচ পাঁচটা নম্বর তাকে খুঁজে বের করতে হবে৷ কিন্তু তবু ভালো যে বারো ঘণ্টা পরিশ্রম একেবারে বৃথা যায়নি৷ এবং সেই কারণেই জিপোর সাফল্য সম্পর্কে ব্লেক হয়ে উঠেছে আরও আশাবাদী৷ হয়তো আগামীকালই আরও দুটো নম্বর জিপো খুঁজে পাবে৷ হয়তো এ সপ্তাহেই খুলে যাবে ট্রাকের তালা৷

অন্ধকার একটু ঘন হয়ে আসতেই কিটসন ক্যারাভ্যানের দরজা খুলে দিল৷ ওরা ক্ষিপ্রগতিতে ঢুকে গেল কেবিনের ভেতরে।

জিনি ওদের খাবার ব্যবস্থা করেই রেখেছিল, সুতরাং দেরি না করে খেতে বসল ওরা। গোগ্রাসে খেতে শুরু করল। মাঝে মধ্যে গম্ভীরভাবে কিটসনকে দেখছিল ব্লেক। কিটসনের মুখ সারাদিনের উত্তাপে তামাটে হয়ে উঠেছে। তার মানে জিনিকে নিয়ে সারাটা দিনই বাইরে বাইরে কাটিয়েছে। মুহূর্তের জন্য ঈর্ষা ও ক্রোধের তরঙ্গ ছুঁয়ে গেল ব্লেকের মনকে।

জিপো একমনে খেয়ে চলল। খাওয়া শেষে ওর মুখমণ্ডল থেকে মিলিয়ে গেল ক্লান্তি ও হতাশার ছাপ। সে আবার আগের মতোই সুস্থ, সতেজ হয়ে উঠল।

খাওয়া শেষ করে একটা আরাম কেদারায় গা-এলিয়ে দিল ব্লেক। একটা সিগারেট ধরিয়ে চোখ ফেরাল অবশিষ্ট তিনজনের দিকে, ‘শোনো, আজ কিছু না হলেও সামান্য এগোনো গেছে। একটা কম্বিনেশন নম্বর মেলাতে পেরেছে জিপো। কিন্তু আমার মনে হয়, এখন থেকে রাতেও ক্যারাভ্যানের পাহারায় থাকা দরকার। কারণ, কেউ অতিরিক্ত কৌতূহলী হয়ে ক্যারাভ্যানের জানলা দিয়ে উঁকি মারুক, বা দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করুক তা আমরা চাই না। কিটসন, এই রাতে পাহারা দেবার দায়িত্বটা তোমাকেই নিতে হবে। সারাদিন তোমার কোনও কাজই থাকে না, সুতরাং আশা করি রাতে এই সামান্য কষ্টটুকু তুমি সইতে পারবে।’

কিটসন কাঁধ ঝাঁকাল; বোঝাতে চাইল, এ আর বেশি কথা কী।

সে উপলব্ধি করল, ব্লেকের কথায় যুক্তি আছে। রাতে কোনও চোর-ছ্যাঁচোড়ের মাথায় ক্যারাভ্যান লুট করার মতলব গজিয়ে ওঠাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। আর সত্যিই যদি কেউ সে মতলব করে, তাহলে তাদের সমস্ত পরিকল্পনাটাই ভেস্তে যাবে।

‘ঠিক আছে।’ চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল কিটসন, ‘আমি তাহলে ক্যারাভ্যানেই যাচ্ছি।’

কিটসন বিনা প্রতিবাদে তার কথা মেনে নেওয়ায় ভীষণ অবাক হল ব্লেক। সে চেয়ে রইল প্রস্থানরত কিটসনের দিকে। বাইরে বেরিয়ে দরজাটা আবার টেনে বন্ধ করে দিল কিটসন। আজ সকালটা তার ভালোই কেটেছে। বাইরের লোকের সামনে অভিনয় হলেও সে অন্তরঙ্গভাবে জিনিকে কাছে পেয়েছে। তার মনের কোণে একটা ক্ষীণ আশাও শেষ পর্যন্ত জন্মাতে শুরু করেছে : জিনি কি তাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে?

কিন্তু সে প্রশ্নের যথাযথ উত্তর কিটসন পায়নি। একেক সময় জিনির চোখে চেয়ে তার মনে হয়েছে এর সবটাই বুঝি অভিনয়—তার বেশি কিছু নয়। কিন্তু তবুও হাল ছাড়েনি কিটসন। এখন তার একমাত্র নেশা জিনি গর্ডন।

কিটসন বেরিয়ে যেতেই ব্লেক ফিরে তাকাল জিনির দিকে, ‘আজ আমি আর জিপো বিছানায় শোব; তুমি সোফায় শোবে। কারণ সারাদিন ধরে আমরা কম পরিশ্রম করিনি—সুতরাং আমাদের বিশ্রামের প্রয়োজন আছে। তোমার এতে আপত্তি আছে নাকি?’

নির্লিপ্তভাবে কাঁধ ঝাঁকাল জিনি, ‘না—আপত্তি থাকবে কেন?’

ব্লেক অচঞ্চল চোখে চেয়ে রইল, ‘অবশ্য জিপো যদি সোফায় শুতে চায়, তবে—’

‘ধন্যবাদ—তার কোনও প্রয়োজন হবে না; আমি সোফাতেই শুতে পারব।’ সংক্ষিপ্ত স্বরে বাধা দিল জিনি। ব্লেকের ইঙ্গিত ধরতে তার অসুবিধে হয়নি।

ব্লেক হাসল, ‘তোমার যা ইচ্ছে।’ উঠে দাঁড়াল সে। ঘরের তাকে রাখা তাসের একটা প্যাকেট নামিয়ে নিয়ে এল। চেয়ারে বসে তাস ভাঁজতে শুরু করল, ‘কী এক হাত হবে নাকি?’

‘না, আমি এখন একটু বাইরে হাঁটতে যাব। ফিরে এসে এ ঘরটা যেন খালি পাই।’

ঘরের থমথমে পরিবেশ জিপোর অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াল। একমনে সে শুনতে লাগল ওদের কথাবার্তা।

‘নিশ্চয়ই খালি পাবে।’ ব্লেক তখনও হাসছে, ‘এই জিপো, চলো আমরা শোবার ঘরে গিয়ে তাস খেলি। বিছানায় বসেই তাস পাতা যাবে—।’

জিপো উঠে গেল শোবার ঘরে।

‘যাক, তোমার ঘর তাহলে খালি করে দিলাম, জিনি। কিন্তু আলেক্সের সঙ্গে দিনটা কী রকম কাটল বলো, শুনি। শেষ পর্যন্ত কি ওর গলায় ঝুলেই পড়লে?’

জিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল, দু-চোখে নগ্ন ঘৃণা, ‘আমার সঙ্গে ফ্র্যাঙ্কের কি সেই কথাই ছিল?’ শান্ত স্বরে পালটা প্রশ্ন করল ও।

‘না, তা নয়, কিন্তু বলা তো যায় না, তোমার কোমল হৃদয়ের মধ্যে কখন কী ঘটে যায়৷ অবশ্য কিটসনকে পছন্দ করার মতো মেয়ে এই আমেরিকাতে খুব কমই আছে৷ তবে সে যে তোমাকে মন প্রাণ সঁপে দিয়ে বসে আছে তাতে কোনও সন্দেহই নেই৷’

জিনি উঠে এগিয়ে গেল সদর দরজার দিকে৷

ব্লেকের চোখ ওকে অনুসরণ করল, ‘আমরা দুজনে জুটি বাঁধলে কেমন হয়, সুন্দরী? ব্যাপারটা একবার ভেবে দেখলে হয় না?’ দরজা খুলতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল জিনি৷

‘তোমার মাথার ঠিক নেই৷’ কথাটা বলেই ও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল বাইরের অন্ধকার পরিবেশে৷ একবার পিছন ফিরে তাকাবার প্রয়োজনও অনুভব করল না৷ যাওয়ার আগে সশব্দে বন্ধ করে দিয়ে গেল দরজাটা৷

দু-চোখে শীতল, কুৎসিত দ্যুতি নিয়ে ইতস্তত করল ব্লেক৷ একবার মনে হল, এখুনি ছুটে যায় জিনির পিছনে, তার সঙ্গে ওই ভাবে কথা বলার পরিণতি যে ভালো নয়, সেটা ভালো করে ওকে সমঝে দেয়—কিন্তু… কিন্তু কিটসন তাহলে বেরিয়ে আসবে ক্যারাভ্যান থেকে; আর কিটসনের সঙ্গে চরম বোঝাপড়ার জন্যে ঠিক এই মুহূর্তে সে প্রস্তুত নয়৷

সুতরাং নিজেকে সংযত করে উঠে দাঁড়াল ব্লেক৷ কাঁধ ঝাঁকিয়ে চলে এল শোবার ঘরে৷

জিপো বিছানার ওপরেই বসে ছিল৷ সে যে খুব একটা স্বস্তি বোধ করছে না, সেটা তার মুষ্টিবদ্ধ হাত দেখেই বোঝা যাচ্ছে৷

ব্লেককে দেখেই সে বলে উঠল, ‘এড, তুমি মেয়েটাকে ছেড়ে দাও৷ একেই আমাদের হাতে সমস্যার অন্ত নেই, তার ওপর আবার এই মেয়ের ঝামেলা!’

‘ওঃ থামো দেখি!’ খিঁচিয়ে উঠল ব্লেক৷ তারপর বিছানায় বসে তাস বাঁটতে শুরু করল৷

রাত এগারোটা নাগাদ ওরা জিনির ফিরে আসার শব্দ পেল৷ মিনিট কয়েক পরেই ওদের কানে এল কলঘরে জল পড়ার শব্দ—সম্ভবত জিনি স্নান করছে৷

সিগারেটের টুকরোটা ঘষে নিভিয়ে তাসগুলো প্যাকেটে ভরে ফেলল ব্লেক, ‘এসো জিপো, এবার শুয়ে পড়া যাক, কাল অন্ধকার থাকতে থাকতেই আমরা ক্যারাভ্যানে ঢুকে পড়ব৷’

জিপো একেই ভীষণ ক্লান্ত ছিল, সুতরাং আলো নিভিয়ে দেওয়ার মিনিট দশেক পরেই সে নাক ডাকতে শুরু করল৷

অন্ধকারে চোখ মেলে কান খাড়া করে শুয়ে রইল ব্লেক৷ বসবার ঘরে জিনির নড়াচড়ার শব্দ সে পরিষ্কার শুনতে পাচ্চে৷ মিনিট কয়েক পরেই পাশের ঘর থেকে আলো নেভানোর শব্দ পেল সে৷

নারী-সংক্রান্ত ব্যাপারে সরাসরি পদ্ধতিতেই ব্লেকের বিশ্বাস, তার মতে ধীরে ধীরে অন্তরঙ্গ হওয়ার চেষ্টা সময়ের অপব্যবহারেরই নামান্তর৷ সুতরাং—

সুতরাং গায়ের চাদর ছুড়ে ফেলে উঠে বসল ব্লেক৷ নিঃশব্দে বিছানা থেকে নেমে এগিয়ে চলল ঘরের দরজার দিকে৷ একমুহূর্তে থমকে সে ফিরে তাকাল নিদ্রামগ্ন জিপোর দিকে৷ তারপর আশ্বস্ত হয়ে দরজার হাতল ঘোরাতে শুরু করল৷ অতি সন্তপর্ণে দরজা খুলে বসবার ঘরে পা-রাখল ব্লেক৷ আস্তে আস্তে বন্ধ করে দিল শোবার ঘরের দরজা৷

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জ্বলে উঠল ঘরের আলো৷ জিনি উঠে বসল সোফায়৷ ওর পরনের ফিকে নীল রাত্রিবাস ব্লেকের কামনাকে করে তুলল দুর্দম৷ সে একগাল হাসিতে মুখ ভরিয়ে এগিয়ে গেল জিনির দিকে… সোফার কাছে গিয়ে থামল ব্লেক৷ চোখ নামিয়ে তাকাল জিনির তেইশ বসন্তের যৌবনের দিকে৷

‘ভাবলাম, তোমার সঙ্গে একটু গল্প গুজব করি৷ দেখি—সরে বোসো একটু৷’ হাতের একটা ভঙ্গি করে সোফায় জিনির পাশে বসতে গেল ব্লেক৷

জিনি স্থির ভাবে বসে রইল; ওর সাগর-সবুজ চোখ ভাবলেশহীন, নিষ্পলক৷

‘বেরিয়ে যাও৷’ চাপা স্বরে আদেশ দিল জিনি৷

‘ওহ-হো—তুমি দেখছি এখনও আমার ওপর রাগ করে আছ?’ সোফার হাতলে বসে পড়ল ব্লেক, ‘কিন্তু জানো, তোমার জন্যে আমি কত কী ভেবে রেখেছি? লক্ষ্মীটি, জিনি, একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখো৷ নিজেদের ভাগের টাকা পেয়ে গেলে আমরা দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াব৷ আমি তোমাকে নিয়ে যাব লন্ডনে, প্যারিসে৷ তুমি কি আমার সঙ্গী হতে রাজি নও?’

‘আমি তোমাকে বেরিয়ে যেতে বলেছি৷’ জিনি আবার বলল৷ ওর মুখের নির্লিপ্ত, শান্ত ভাব ব্লেকের উত্তেজনাকে আরও অধৈর্য করে তুলল৷

‘না, তেমন করে না বললে তুমি শুনবে না দেখছি…’ ব্লেক হাত বাড়িয়ে জিনিকে জড়িয়ে ধরল৷ ওকে কাছে টানতে যেতেই সে অনুভব করল, তার বুকে কোনও ধাতব বস্তুর কঠিন পরশ৷

চোখ নামাতে তার হৃৎপিণ্ডর গতি পলকের জন্যে স্তব্ধ হয়েই উন্মাদের মতো ছুটতে শুরু করল৷ তার বুকে একটা .৩৮ চেপে ধরেছে জিনি৷

‘আস্তে আস্তে হাত সরিয়ে নাও৷’ ইস্পাত শীতল স্বরে আদেশ করল জিনি৷ ব্লেক ভয় পেল৷ ‘খুব ধীরে ধীরে হাত সরাবে—নয়তো একেবারেই ঝাঁঝরা করে দেব৷’

অতি সাবধানে, ধীরে ধীরে জিনির শরীর থেকে হাত সরিয়ে নিল ব্লেক৷ আতঙ্কে তার গলা শুকিয়ে কাঠ৷ কেন যেন তার মনে হল, এতটুকু বেচাল দেখলেই জিনি সত্যি সত্যি তাকে নৃশংসভাবে খুন করবে৷ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সন্তর্পণে হাত তুলে ধরল ব্লেক, চোখের দৃষ্টি .৩৮ এর শীতল নলের ওপর৷

‘এবার উঠে দাঁড়াও৷ আস্তে, আস্তে—হাত দুটো মাথা থেকে নামাবে না৷’

ধীরে-ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল ব্লেক৷ পায়ে-পায়ে পিছোতে শুরু করল৷

‘বেরও ঘর থেকে!’ রিভালভারটা সোজাসুজি ব্লেকের বুক লক্ষ করে উঁচিয়ে ধরল জিনি, ‘যদি দ্বিতীয় দিন এরকম সুযোগ নেবার চেষ্টা করো, তাহলে তোমাকে কুকুরের মতো গুলি করে মারব৷ এবারে নিজের ঘরে কেটে পড়ো, দরজার বাইরে আর এসো না৷’

ব্লেক গভীরভাবে শ্বাস নিল, ‘আচ্ছা, সুন্দরী৷ তোমাকে আমি দেখে নেব৷ এখন থেকে সাবধান থেকো৷ এডওয়ার্ড ব্লেক কখনও অপমানের বদলা নিতে ছাড়ে না৷’

‘থাক, থাক—অনেক হয়েছে৷’ জিনি ব্যঙ্গভরে বলে উঠল, এখন রাস্তা দেখুন, শ্রীমান৷ এরপর থেকে প্রস্তুত হয়ে অভিসারে আসবেন৷’

শোবার ঘরে ফিরে এসে ব্লেক দরজা বন্ধ করে দিল৷ রাগে অপমানে তার সর্বশরীর কাঁপছে৷

জিনি যদি এরপরও ভেবে থাকে যে ওর ভাগের দু-লাখ ডলার ওকে দেওয়া হবে, তাহলে ভীষণ ভুল করবে৷ বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগল ব্লেক৷

জিনিকে সে উচিত শিক্ষা দেবে৷ তাকে বন্দুক দেখানোর পরিণাম যে কত ভয়ঙ্কর, সেটা সে ওকে হাড়ে-হাড়ে সমঝে দেবে৷

কিটসনকেও ব্লেক ছাড়বে না৷ জিনি আর ওই মাথামোটা কিটসনকে সে এমন দাওয়াই দেবে, যা ওরা কোনওদিনই ভুলবে না৷

হঠাৎই অন্ধকারের মধ্যে হিংস্রভাবে দাঁত বের করে হেসে উঠল ব্লেক৷

আড়াই লাখ ডলারের চেয়ে সাড়ে সাত লাখ ডলারের আবেদন যে কোনও মানুষের কাছেই অনেক বেশি—ব্লেকের কাছে তো গোটা সাম্রাজ্য৷

টাকাটা নিয়ে সে কিভাবে খরচ করবে, সেটা শুয়ে-শুয়ে বহুক্ষণ ধরে ভাবল ব্লেক৷

হঠাৎ একসময় আরও একটা অদ্ভুত চিন্তা ব্লেকের মাথায় এসে জমাট বাঁধল৷ জিপোকেও যদি সে সরিয়ে দেয়, তাহলে কেমন হয়? তখন পুরো টাকাটাই সে একা ভোগ করবে—কোনও অংশীদারই থাকবে না৷

সাড়ে সাত লাখের চেয়ে পুরোপুরি দশ লাখ অনেক বেশি৷ ফ্র্যাঙ্ক বলেছিল পৃথিবীকে সে রাখবে হাতের মুঠোয়৷

‘হুঁঃ…দশ লাখ ডলার থাকলে এই পৃথিবীটাকে এক হাটে কিনে আরেক হাটে বেচতে পারে ব্লেক৷ সে সহজেই হতে পারে এই পৃথিবীর অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাট৷