গল্প
উপন্যাস

শুধু যাওয়া আসা – ৩

তিন

বিকেল হয়ে গেছে৷ রোদের তাপ অনেকটা কমে এসেছে৷ একটা বিশাল গাছের ছায়ায় অবসন্ন দেহে শুয়ে আছি৷ সামনেই পাহাড় ঢালু হয়ে নেমে গেছে—তার কোল ঘেঁষে বড় রাস্তা৷ মাঝে-মাঝে দু একটা মালবোঝাই ট্রাক হাওয়ার বেগে ছুটে যাচ্ছে৷ হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, একজন পুলিশ অফিসার মোটরবাইকে চড়ে ঝড়ের গতিতে ছুটে চলেছে তাঁর পিছন পিছন একটা ওয়্যারলেসের গাড়ি—সম্ভবত আমারই খোঁজে—

ঝোপঝাড়ের আড়ালে থেকে, অন্যের চোখ বাঁচিয়ে এতখানি রাস্তা পার হয়ে এসেছি, কেউ আমাকে অনুসরণ করেনি৷ মরিচের গুঁড়ো সত্যিই আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে৷

রেললাইন এখনও পাঁচ মাইল দূরে৷ অপেক্ষা না করে দৌড়লে হয়ত অনেক আগেই ওখানে পৌঁছে যেতাম, কিন্তু দিনের বেলায় এ জায়গাটা পার হওয়া উচিত হবে না৷ চারিদিক খাঁখাঁ করছে৷ অদূরে একটা গোলাবাড়ি ছাড়া লুকোবার আর কোন জায়গাই নেই৷ অগত্যা রাত পর্যন্ত অপেক্ষা না করলেই নয়৷

চারদিকে বুকসমান উঁচু কাঠের বেড়ার মাঝখানে অবস্থিত এই গোলাবাড়িটা আর তার পাশেই টিনের চালা-দেওয়া একটা গুমটিঘর৷ চারদিকের বেড়ার এককোণে একটা কাঠের দরজা৷

হঠাৎ দেখি সেই গোলাবাড়ি থেকে একটি মেয়ে বেরিয়ে আসছে৷ প্রথমে মেয়েটিকে ততটা গুরুত্ব দিইনি—কিন্তু ওর হাতের দিকে নজর পড়তেই আমার জিভে জল এল৷—সেই সকাল থেকে না খেয়ে আমি—একবিন্দু জল পর্যন্ত পেটে পড়েনি—তরমুজের ঝুড়িটা দেখে মনে হল ছুটে যাই মেয়েটির কাছে৷ ও তরমুজের ঝুড়িটা নিয়ে গুমটিঘরে ডুকে পড়ল৷ একটু পরেই খালি হাতে বেরিয়ে এল৷ আবার ফিরে চলল গোলাবাড়ির দিকে৷

ঠিক করলাম, সন্ধ্যার অন্ধকারে ওই গুমটিঘরে ঢুকে গোটাকয়েক তরমুজ সাবাড় করতে হবে৷ কারণ, পেটে কিছু না পড়লে পথ চলা অসম্ভব৷

সময় গড়িয়ে চলল—

এমনি করে আরও ঘণ্টা দুয়েক কেটে গেল৷ সন্ধ্যার ধূসর ছায়া নেমে এল চারদিকে৷ বড় রাস্তার যানবাহনের চলাচল ফিরে হয়ে এল৷ গোলাবাড়ির ভিতর কতকগুলো ঘরে আলো জ্বলে উঠেছে৷ আকাশে তাকালে চোখে পড়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অসংখ্য তারা৷

এর মধ্যে পুলিশের গাড়ি আর চোখে পড়েনি৷ হয়ত অন্য কোন অঞ্চলে ওরা আমার খোঁজ করছে৷

অন্ধকারে কারুর নজরে পড়ার ভয় নেই দেখে নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে এগিয়ে চললাম৷ পাহাড়ি ঢালু জমি ধরে একছুটে গিয়ে পৌঁছলাম বড় রাস্তায়৷ নাঃ—কোন গাড়িই নজরে পড়ছে না৷ ক্ষিপ্রগতিতে রাস্তা পার হয়ে মেঠো পথ ধরলাম৷ বিকেল থেকেই লক্ষ্য করেছি, বাড়িটায় কোন পোষা কুকুর নেই৷ সুতরাং নির্ভয়ে এগিয়ে চললাম৷ বেড়ার কোনায় কাঠের দরজাটা বন্ধ ছিল৷ একটুও দ্বিধা না করে ওটা টপকে ভিতরে নামলাম৷ ছুটে গিয়ে আশ্রয় নিলাম টিনের চালা-দেওয়া গুমটিঘরে৷ অন্ধকারেই নাকে এল তরমুজের সুস্বাদু গন্ধ৷ খিদেটা যেন মাথা চাড়া দিয়ে উঠল৷

অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে এগোলাম৷ একটু এগিয়েই হাত ঠেকল তরমুজের স্তূপে৷ এতক্ষণে বুঝলাম, এ ঘরটায় তরমুজ রাখা হয়৷ এরা বোধহয় তাহলে তরমুজের চালানদার৷ একটা বড়সড় তরমুজ তুলে নিয়ে দাঁত বসালাম৷ অসুবিধে হলেও, সে অসুবিধে বিশ্বগ্রাসী ক্ষুধার কাছে হার মানল৷

গোটা তিনেক তরমুজ শেষ করার পর, পেটের খিদে শান্ত হল৷ কিন্ত ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়লাম৷ চোখের পাতা ভারী হয়ে এল৷ ভাবলাম, একটু ঘুমিয়ে নিই নয়ত এই ক্লান্ত অবসন্ন দেহে রেললাইন পর্যন্ত পৌঁছতে পারব না৷

হাতড়ে হাতড়ে, তরমুজের স্তূপের পিছনে আশ্রয় নিলাম৷ শুয়ে পড়তেই চোখ বুঝে এল৷ কানে এল বাড়ির ভিতর ভেসে-আসা কোন যন্ত্রসঙ্গীতের সুর৷ শুয়ে শুয়ে মনে পড়ল ফার্নওয়ার্থের কথা৷ এতখানি পথ নির্বিঘ্নে পালিয়ে এসেছি, কোন বিপদের মুখোমুখি হইনি৷ ভাগ্য ভালো থাকলে হয়ত কোন ট্রেনেও উঠতে পারব—তারপর—যদি—

হঠাৎ ঘুম ভাঙতেই ভীষণভাবে চমকে উঠলাম৷ উঠে দাঁড়ালাম একলাফে৷ গুমটিঘরের খোলা দরজা দিয়ে চোখে পড়ল দূরের ধূসর পাহাড়৷ তার পিছন থেকে উঁকি মারছে ভোরের সূর্য৷ আবিরে রাঙানো আকাশে গা ভাসিয়ে উড়ে চলেছে একঝাঁক পাখি৷ ভোরের বিবর্ণ আলো এসে ঠিকরে পড়েছে ঘরের ভিতরে৷

একটা অজানা ভয় আমাকে আঁকড়ে ধরল৷ সেই সন্ধ্যা থেকে মড়ার মতো ঘুমিয়েছি৷ কেউ আমাকে দেখে ফেলেনি তো?

আমার পরনে কয়েদীর ডোরাকাটা পোশাক৷ এই পোশাকে যদি দিনের বেলায় বেরোই, তবে নির্ঘাৎ ধরা পড়তে হবে৷ সুতরাং রাত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে উপায় নেই৷ ইতিমধ্যে চারদিকের খোঁজ-খোঁজ বর অনেকটা ঠান্ডা হয়ে আসবে৷ বেশ নিশ্চিন্তেই পথ চলতে পারব৷

আরও কয়েকটা তরমুজ সাবাড় করে, একটা ছেঁড়া বস্তা মাথায় দিয়ে শুয়ে পড়লাম৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখে ঘুম নেমে এল৷

—ঘণ্টাখানেক পরে আচমকা জেগে উঠলাম৷ ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন বলে উঠল—ঘরে কেউ ঢুকেছে৷

কানে এল কারও নড়াচাড়ার শব্দ৷ অতি সপ্তর্পণে মাথা তুলে উঁকি মারলাম৷ আগের দিন দেখা মেয়েটি তরমুজগুলোকে বেছে, একপাশে সরিয়ে রাখছে৷ ওর বয়স বছর সতেরো হবে৷ গায়ের রঙ বাদামী, দেখতে খুব একটা সুন্দরী না হলেও কেমন যেন একটা আলগা আকর্ষণ আছে৷ হয়তো ওর উদ্দাম সপ্তদশী যৌবনই এর জন্য দায়ী৷ চটপটে অভ্যস্ত হাতে মেয়েটি কাজ করে চলল৷ আমাকেও দেখতে পায়নি৷ ঝুঁকে পড়ে, বড় তরমুজগুলো ও আলাদা করে রাখছে৷ ওর লম্বা ছাই-রঙা চুল কাঁধ বেয়ে ঝুলে পড়েছে বুকের কাছে৷

মেয়েটির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে করতে লাগলাম৷ ওকে কি আমার উপস্থিতির কথা জানাব? হঠাৎ বুঝলাম, সেকথা জানানোর আর-কোন প্রয়োজন নেই৷ ও বুঝতে পেরেছে, আমি ওকে লক্ষ্য করছি৷ মেয়েটির কাজের নিটোল ছন্দ কেটে গেল৷ পলকের জন্য ওর হাত দুটো থেমে রইল—পরমুহূর্তেই আবার কাজ করতে শুরু করল৷ কিন্তু আগের মতো অভ্যস্ত হাতে নয়৷ পরিষ্কার বুঝলাম, ও ভয় পেয়েছে৷

এখুনি কিছু করা দরকার৷ নয়তো বাইরে বেরিয়ে মেয়েটি যে চেঁচিয়ে লোক জড়ো করবে, তাতে আর সন্দেহ নেই৷ ওর মুখে কেমন একটা চাপা উত্তেজিত ভাব৷

আড়াল ছেড়ে বাইরে এলাম, ‘ভয় পেয়ো না৷’

বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে দাঁড়াল মেয়েটি৷ ওর মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেছে৷ আতঙ্কে ওর গলা দিয়ে কোন স্বর বেরোল না—ভয়ার্ত চোখে আমার দিকে চেয়ে রইল৷

আমার মুখে দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল, গায়ে ছেঁড়া, নোংরা পোশাক—এসব দেখে মেয়েটা আরও বেশি ভয় পেয়েছে৷ মনে মনে ওর জন্য দুঃখ হল৷

‘ভয় নেই, আমি তোমার কোন ক্ষতি করব না৷’ স্থির চোখে ওকে লক্ষ্য রেখে আশ্বাস দিলাম৷ কিন্তু ও এক পা এক পা করে পিছিয়ে চলল৷ টিনের দেওয়ালে পিঠ ঠেকতেই ভয়ে সিঁটিয়ে গেল৷ যেন দেওয়ালের গায়ে মিশে যাবে৷

মেয়েটির পরনে একটা চাপা প্যান্ট আর লাল-সাদা চেক-টানা শার্ট৷ ও দেওয়ালে হেলান দিয়ে উত্তেজনায় হাঁপাতে লাগল৷ শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে ওর পীবর স্তনদ্বয় একবার উঠছে, একবার নামছে৷

‘খবরদার, আমার কাছে এসো না!’ চাপা তীক্ষ্ণ স্বরে ও আর্তনাদ করে উঠল৷

‘তুমি আমাকে দেখে ভয় পেয়েছ?—আমিও তা তোমাকে দেখে ভয় পেয়ে ছিলাম৷’ আশ্বাসের নরম সুরে ওকে বোঝাতে চাইলাম, ‘পুলিশ আমাকে খুঁজছে—আমিই ফার্নওয়ার্থ থেকে পালিয়ে এসেছি৷ তুমি কি আমাকে সাহায্য করবে?’ কথা বলে কোনরকমে ওকে আটকে রাখার চেষ্টা করলাম৷ ভয় হচ্ছে, হঠাৎ না আবার বাইরে দৌড় লাগায়—তাহলেই সর্বনাশ!

‘আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে,—তাছাড়া কিছু জামাকাপড়ও দরকার,—তুমি কি আমাকে সাহায্য করবে?’

দেখলাম, এতক্ষণে মেয়েটির ভয় অনেকটা কমে এসেছে৷ ও সোজা হয়ে দাঁড়াল, ‘তুমি এখানে কি করতে ঢুকেছ?’

‘দূর থেকে তরমুজগুলো দেখে, খিদের জ্বালায় নিজেকে আর সামলাতে পারিনি৷ খাওয়াদাওয়ার পর ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম৷ ভেবেছিলাম, রাতের অন্ধকারে রেললাইন পর্যন্ত গিয়ে, কোন চলতি ট্রেনে উঠে পালাব, কিন্তু—’

‘পুলিশ রেললাইন পাহারা দিচ্ছে—’ আমাকে বাধা দিয়ে ও বলে উঠল, ‘গত রাতে রেডিয়োতে বলেছে, তুমি রেললাইনের দিকে যাবে বলেই পুলিশ সন্দেহ করছে—৷ কিন্তু ফার্নওয়ার্থে যাবার মতো তুমি কী করেছিলে?’ মেয়েটা তার সন্দেহকুটিল দৃষ্টি আমার চোখে রাখল৷

‘তাহলে শোন—’ ওকে একে একে সব খুলে বললাম৷ কিছুই গোপন করলাম না৷ মেয়েটি চোখ গোল গোল করে, স্তব্ধ বিস্ময়ে, হাঁ করে শুনতে লাগল৷ শুনতে শুনতে ওর মুখে কেমন একটা করুণার ভাব ফুটে উঠল৷ মমতায় ছলছল করে উঠল ওর দুই গভীর চোখ৷ সব বলতে পেরে মনটা যেন হালকা হল৷

‘ফার্নওয়ার্থে আমি কিছুতেই ফিরে যাব না৷ তুমি যদি সাহায্য না কর, তাহলে আমার আর-কোন উপায় নেই৷ ওখানে ফিরে যাওয়ার চেয়ে আমি আত্মহত্যা করব৷’

মেয়েটি অনেকক্ষণ একদৃষ্টে আমার দিকে চেয়ে রইল৷ তারপর আস্তে আস্তে কাছে এগিয়ে এল, ‘ফার্নওয়ার্থ সম্বন্ধে আমিও কাগজে পড়েছি৷ সব কথা শোনার পর তোমাকে ওখানে ফেরত পাঠাতে আমার বিবেকে বাঁধছে৷ আমি তোমাকে সাহায্য করব—তোমার কি খিদে পেয়েছে?’

মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম৷

‘তাহলে এখানে অপেক্ষা কর, আমি এখুনি আসছি৷’ গুমটিঘর ছেড়ে ও বেরিয়ে গেল৷ মুহূর্তের জন্য দ্বিধাগ্রস্ত মন ভয় পেল—ওকে বিশ্বাস করা কি ঠিক হল? কিন্তু এছাড়া কোনও পথ তো আমার নেই৷ ও যদি পুলিশে খবর দেয়, তবে সেটাকে দুর্ভাগ্য বলে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় কি? দেখা যাক—

বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল, মেয়েটি আর ফেরে না৷ একবার মনে হল, গিয়ে দেখব নাকি, ও কী করছে? এমন সময় মেয়েটি আসছে৷ ডান হাতে ঝোলানো একবালতি গরম জল, আর বাঁ-হাতে একটা তোয়ালে, সাবান, ক্ষুর আর কিছু জামাকাপড়৷

বালতিটা সামনে রেখে, জামাকাপড়গুলো ও আমার হাতে দিল, ‘হাত-পা ধুয়ে এগুলো পরে নাও৷ আমি খাবার নিয়ে আসছি৷’

মিনিট দশেক পরে ও ফিরে এল৷ ততক্ষণে আমার হাত-পা ধোয়া, দাড়িকামানো—সব হয়ে গেছে৷ কয়েদীর পোশাক ছেড়ে, ওর দিয়ে-যাওয়া পোশাকগুলো পরে ফেলেছি৷ লক্ষ্য করলাম, ওর হাতে খাবারের ট্রে৷ তাতে মাংস, ডিমসেদ্ধ আর কফি৷ আমার কাছে সেটাই যথেষ্ট মনে হল৷ হুমড়ি খেয়ে, গোগ্রাসে গিলে চললাম৷ ও একটা ভাঙা প্যাকিং বাক্সের উপর বসে আমাকে লক্ষ্য করতে লাগল৷

খাওয়া-দাওয়া শেষ হতে, মেয়েটি আমার দিকে একপ্যাকেট সিগারেট এগিয়ে দিল৷ সিগারেট ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছাড়লাম৷ নিজেকে বেশ সুস্থ সতেজ মনে হল৷ এতদিন পরিশ্রমের পর বোধহয় এই বিশ্রামটুকু প্রয়োজন ছিল৷

‘তুমি রেললাইনের দিকে গেলেই ধরা পড়বে৷—যদি ওকল্যান্ডে যেতে চাও তো তোমাকে সাহায্য করতে পারি৷’

‘আমি ট্রেন ধরে ওকল্যাণ্ডেই যাব ঠিক করেছিলাম৷ ওখানে যেতে চাওতো তোমাকে সাহাহ্য করতে পারি৷’

‘আমি ট্রেন ধরে ওকল্যান্ডেই যাব ঠিক করেছিলাম৷ ওখানে যেতে পারলে আমার পক্ষে খুব সুবিধে হয়৷—কিন্তু যাব কি করে?’

‘ঘণ্টাখানেকের মধ্যে, এই তরমুজগুলো নিয়ে যাবার জন্য, একটা ছেলে ট্রাক নিয়ে আসবে৷ রোজ এই একই সময়ে ও এখানে আসে৷ এখানেই খাওয়াদাওয়া সেরে আবার ট্রাক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে৷ সোজা যায় ওকল্যান্ডের বাজারে৷ সেখানে ট্রাক রেখে, টাকার তাগাদায় যায়৷ ও এসে যখন বাড়িতে খেতে ঢুকবে, তখন তুমি গিয়ে ওর ট্রাকের পেছনে লুকিয়ে পড়বে৷ তারপর ওকল্যান্ডে পৌঁছে, চুপিসাড়ে নেমে পড়বে৷’

মেয়েটির কথা রাজি হলাম৷

রাজি না হয়ে উপায়ই বা কি! ও একটা পাঁচ ডলারের নোট এনে আমার হাতে দিল—আর তার সঙ্গে দু-প্যাকেট সিগারেট৷ ওকে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে চোখ সজল হয়ে উঠল৷

একটু পরে ট্রাকটা এসে পৌঁছল৷ চালক একটি অল্পবয়সী ছেলে৷ সে ট্রাক রেখে ভিতরে যেতেই,গাড়ির পিছনে উঠে পড়লাম৷

তারপর একসময় ট্রাক ছেড়ে দিল৷

কিছুক্ষণ পর তরমুজের বাক্সগুলো সরিয়ে, অতিসন্তর্পণে তার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারলাম—বিকেলের রোদ তখন ঝিমিয়ে এসেছে—দূরে দেখা যাচ্ছে সেই গোলাবাড়িটা৷ তার দরজায় দঁড়িয়ে রয়েছে মেয়েটি৷ পড়ন্ত রোদ ওর লাল-সাদা ডোরাকাটা শার্টের গা থেকে ঠিকরে পড়ছে৷ মেয়েটি আস্তে আস্তে হাত তুলে আমাকে উদ্দেশ্য করে নাড়তে লাগল৷ ট্রাক ক্রমশ এগিয়ে চলল—ক্রমে মিলিয়ে আসতে লাগল—মেয়েটি—গোলাবাড়ি৷ ট্রাক ছুটে চলল৷

নিজের অজান্তেই গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দু-ফোঁটা অশ্রু৷

এই সুন্দর স্মৃতিটুকু একান্ত আমার করেই সযত্নে তুলে রাখব মনের মণিকোঠায়৷ অনিশ্চয়তায় ভরা জীবনের পথে এ স্মৃতিটুকুই হোক আমার একমাত্র সঙ্গী৷

ফার্নওয়ার্থ থেকে পালাবার চারদিন পরে লিটল ক্রিকে এসে পৌঁছলাম৷ ওকল্যান্ড থেকে একটা মালগাড়ি ধরে প্রায় এক হাজার মাইল পার হয়ে, এসে উপস্থিত হয়েছিল এই লিটল ক্রিকে৷

মাথার উপর দুপুরের চড়া রোদ৷ রাস্তাঘাট নির্জন৷ মাঝে মাঝে দু-একজন পথচারী চোখে পড়ছে৷

মেয়েটি যে পাঁচ ডলার দিয়েছিল, তা থেকে এখন অবশিষ্ট মাত্র এক ডলার৷ ওকল্যান্ড থেকে ট্রেনে করে এখানে আসবার পথে কিছুই পেটে পড়েনি৷ চারপাশে চোখ বোলালাম—যদি কোন দোকান চোখে পড়ে৷ অদূরেই একটা স্ন্যাক-বার দেখতে পেলাম৷ এগিয়ে চললাম পায়ে পায়ে—দেখি সামান্য কিছু যদি পেটে দেওয়া যায়৷ সম্বল তো মাত্র এক ডলার!

ঢুকে পড়লাম দোকানে৷ কোণের দিকের একটা চেয়ার দখল করে বেয়ারাকে স্যান্ডউইচ আর কফি আনতে বললাম৷

—এরপর কোথায় যাব? এই শহরের সীমান্তে যে পাহাড় আছে, তার ওপারেই ট্রপিকা স্প্রিংস৷ যদি একবার ওখানে পৌঁছতে পারি, তবে আর-কোন ভয় নেই—একেবারে নিশ্চিন্ত৷ কিন্তু যাব কেমন করে?

ট্রপিকা স্প্রিংসের দূরত্ব এখান থেকে দু-শ মাইল৷ সেখানে পৌঁছবার একমাত্র উপায় কোন চলতি গাড়ি বা ট্রাকে আশ্রয় নেওয়া৷ কিন্ত আমার এই নোংরা পোশাক, মুখে দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল—নাঃ—এ অবস্থায় কারো গাড়িতে আশ্রয় পাওয়ার আশা আমাকে ছাড়তে হবে৷ তার চেয়ে দেখি, কোন ট্রাকে যদি জায়গা পাই৷

খাওয়া-দাওয়া সেরে কাউন্টারে দাঁড়িয়ে-থাকা লোকটির দিকে এগিয়ে গেলাম, ‘আচ্ছা ভাই, এখান থেকে ট্রপিকা স্প্রিংস যাব—কোন গাড়ি-টাড়িতে জায়গা পাওয়া যাবে?’

‘উঁহু—’ লোকটি মাথা নাড়ল, ‘সেরকম আশা খুবই কম৷ এখান দিয়ে অনেক গাড়িই যায় বটে, কিন্তু কেউ থামে না৷ আর থাকবে—সে-আশাও খুব কম৷ তুমি বরং এক কাজ কর—এখান থেকে পঞ্চাশ মাইল দূরে একটা পেট্রল-পাম্প আছে—তার নাম ‘পয়েন্ট অফ নো রির্টান’৷ তুমি সোজা সেখানে চলে যাও৷ ওখানে প্রত্যেকটা গাড়িই তেল, মোবিল নেবার জন্য থামে৷ দেখ, যদি কোন ড্রাইভারকে বলেকয়ে রাজি করাতে পার—’

‘পেট্রল-পাম্পটার অদ্ভুত নাম তো!’

‘তা বটে, কিন্তু তার একটা কারণও আছে৷ এর পরের পেট্রল-পাম্পটা একেবারে পাহাড়ের ওপারে—একশ ষাট মাইল দূরে৷ সেইজন্যই এর মালিক কার্ল জেনসন এর নাম দিয়েছে ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’—অর্থাৎ, ‘শেষ সীমান্ত’৷ তা ছাড়া, এর সঙ্গে লাগোয়া একটা রেস্তোরাঁও আছে—জেনসনই তার মালিক৷

‘তুমি তো বলেই খালাস কিন্তু এতটা রাস্তা কি হাঁটব নাকি?’

লোকটা হাসল, ‘আরে না, না,—হাঁটতে যাবে কোন দুঃখে? মি. জেনসন প্রতিমাসে পুরোনো লোহালক্কড় কিনতে শহরে আসেন৷ প্রতিবারই ফেরার পথে আমার দোকান হয়ে যান৷ তোমার ভাগ্য ভালো, আজই তিনি এদিকে এসেছেন৷ ফেরার পথে আমার দোকানে এলে, তাঁকে বরং একবার বলে দেখো—তিনি খুব ভালো লোক, আমাকে বহুবার সাহায্য করেছেন৷ দেখ, হয়তো তোমাকে সঙ্গে করে নিতেও যেতে পারেন৷’

‘কখন আসবেন তিনি?’

লোকটা নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল, ‘এই এসে পড়লেন বলে—৷’

অল্পক্ষণের মধ্যেই দোকানের খোলা দরজায় আবির্ভূত হল এক বিশাল চেহারার পুরুষ৷ যে কাউন্টারের দিকে দ্রুতপায়ে এগিয়ে এল, ‘ঝটপট এক কাপ কফির ব্যবস্থা কর মাইক, এখুনি আবার বেরিয়ে পড়তে হবে৷’ কথা শেষ করে লোকটি আমার দিকে এক পলক তাকাল৷ তারপর আবার চোখ ফেরাল মাইকের দিকে, ‘ তোমার বউ কেমন আছে হে? তাকে যে দেখছি না?’

‘ও ওয়েন্টওয়ার্থে গেছে, মি. জেনসন৷ আপনার সঙ্গে দেখা হল না বলে খুব দুঃখ পাবে৷’ মাইক আমার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করল৷ অর্থাৎ, এই কার্ল জেনসন৷

জেনসন লম্বায় প্রায় সাড়ে ছ-ফুট৷ গায়ের রঙ তামাটে৷ মুখ দেখে বেশ হাসিখুশি মনে হয়৷ বয়স পঞ্চান্নর কাছাকাছি হবে৷ কিন্তু হলে কি হবে—দেখে মনে হয়, এখনও দু-জন লোকের মহড়া নেবার ক্ষমতা রাখে৷

মাইকে কফির কাপ এগিয়ে দিল জেনসনের দিকে, ‘মি, জেনসন, এই লোকটি পাহাড় পেরিয়ে ট্রপিকা স্প্রিংসে যেতে চায়৷ আমি বলেছি, আপনার ওখানে যেতে,—সেখানে যদি কোন ট্রাক ধরতে পারে৷ এখানে তো আর-কোন গাড়ি থামবে না৷’

জেনসন আমার দিকে ফিরে হাসল, ‘মাইক ঠিক বলেছে৷ ও ছাড়া তোমার উপায় নেই৷ তুমি ইচ্ছে করলে আমার সঙ্গে যেতে পার, কিন্তু ওই পর্যন্তই—! কোন ট্রাক-চালকের রাজি করানোর ভার তোমার৷ জানই তো, কেউই আজকাল অচেনা লোককে ট্রাকে তুলতে চায় না—দেখ, যদি ভাগ্য ভালো থাকে—৷’

‘কিন্তু আপনার কোন অসুবিধে হবে না তো?’

অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল জেনসন, ‘পাগল নাকি! এতখানি রাস্তা যে একজন সঙ্গী পাব, তাই যথেষ্ট৷’

হঠাৎ কি মনে হতেই জেনসন আর পেশীবহুল হাত আমার দিকে বাড়িয়ে ধরল, ‘আমার নাম কার্ল জেনসন—৷’

জেনসনের হাতে হাত মেলালাম, ‘আমি জ্যাক প্যাটমোর—৷’ প্রথমেই যে নামটা মনে এল, সেটাই বলে দিলাম৷

‘চল, আর দেরি করে লাভ কি?’ জেনসন কফির কাপ নামিয়ে রাখল, পকেট থেকে একটা দশ সেন্ট বের করে মাইকের হাতে দিল, ‘চলি মাইক—আবার দেখা হবে—’ তারপর দরজার দিকে এগিয়ে চলল৷

মাইককে ধন্যবাদ জানিয়ে তাকে অনুসরণ করলাম৷

বাইরে একটা বড়সড় ট্রাক দাঁড়িয়ে ছিল৷ জেনসন এগিয়ে গিয়ে তার চালকের আসনে বসল৷ আমিও তার পাশে গিয়ে বসলাম৷ ওঠবার সময় লক্ষ্য করলাম—ট্রাকটা পুরোনো লোহালক্কড়ে ভর্তি৷

ট্রাকের ভিতরটা অসহ্য গরম৷ আমরা দুজনেই গায়ে কোট খুলে ফেললাম৷ জেনসন সিগারেট বের করে নিজে ধরাল, আমার দিকে একটা এগিয়ে দিল৷ তারপর স্টার্ট দিয়ে ট্রাক ছেড়ে দিল৷

শহরের বাইরে পৌঁছতেই চোখে পড়ল দিগন্তপ্রসারী মরুভূমি৷ চারদিকে শুধু বালি আর বালি৷ মাঝের সরু পিচঢালা রাস্তা ধরে জেনসন ট্রাক ছুটিয়ে চলেছে৷ দূরে—বহুদূরে চোখে পড়ছে পাহাড়—তার ওপারেই ট্রপিকা স্প্রিংস৷ মাথার উপরে সূর্য কিছুটা ঢলে পড়লেও গরম কমেনি৷ ট্রাকের চলন্ত চাকা উড়িয়ে দিচ্ছে ধুলোর মেঘ—

হঠাৎ জেনসন প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি এখানে এই প্রথম এলে?’

‘হ্যাঁ৷’

‘কোত্থেকে আসছ?’

‘ওকল্যান্ড থেকে—’

স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে আড়চোখে আমাকে দেখল জেনসন, ‘যদি কিছু মনে না কর জ্যাক, তবে একটা কথা জিজ্ঞেস করি—তুমি কোথায় কাজ কর?’

‘আমাদের তালার ব্যবসা আছে, আমার বাবাও এই ব্যবস্থা করতেন৷’ সত্যি মিথ্যে মিলিয়ে একটা জবাব দিলাম৷

‘তালার ব্যবসা? তাহলে তো লোহা সম্বন্ধে তোমার বেশ জ্ঞান আছে,—কি বল?’

‘হ্যাঁ—তা একটু আছে৷’

বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ৷ একসময় জেনসনই প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা জ্যাক, তুমি গাড়ির ইঞ্জিন-টিঞ্জিনের ব্যাপার বোঝ?’

‘খুবই সামান্য—’ তার একটানা প্রশ্নে বিব্রত বোধ করলাম, ‘দু-একবার কয়েকটা গাড়ির কাজ করেছি—এ সেলফ ঠিক করা, ডিস্ট্রিবিউটর হেডের পয়েন্ট সারানো—এরকম সামান্য কয়েকটা কাজ৷’

জেনসন তার নীল চোখের দৃষ্টি স্থিরভাবে মেলে ধরল আমার দিকে, ‘তার মানে গাড়ির কাজ জান—৷—তুমি কি ট্রপিরকা স্প্রিংসে থাকবে বলে ঠিক করেছ, জ্যাক?’

‘হ্যাঁ—’ জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম৷ রোদ-ঝলসানো উজ্জ্বল আকাশে চক্রাকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে গোটাকয়েক চিল৷

‘ওখানে কোন চাকরি নিয়ে যাচ্ছ নাকি?’

এবার আমার মুখে বিরক্তির ভাব ফুটে উঠল৷ সেটা লক্ষ্য করে জেনসন একটু বিব্রত হল, ‘মানে—যদি কোন চাকরির ব্যাপারে হয়, তবে আমিই তোমাকে একটা চাকরি দিতে পারি৷’

অবাক হয়ে জেনসনের দিকে তাকালাম, ‘আপনি আমাকে চাকরি দেবেন? কি চাকরি?’

‘লোহালক্কড় সম্বন্ধে অভিজ্ঞ, গাড়ির কাজও জানে, এমন একজন লোকই আমার দরকার৷ আমি আর আমার স্ত্রী—লোলা—সব কাজ সামলে উঠতে পারি না৷ তোমার মতো একজন লোকই আমি খুঁজছি৷ তবে সপ্তাহে তিন-চারদিন কিন্তু রাত্তিরে কাজ করতে হবে—অবশ্য দিনে বিশ্রাম পাবে৷ আমার ওখানেই থাকবে, খাবে৷ আমার বউ ভারি চমৎকার রান্না করে৷ সে তুমি খেলেই বুঝতে পারবে—আর হ্যাঁ, মাইনে সপ্তাহে চল্লিশ ডলার—কি রাজি?’

ভাবলাম—গা-ঢাকা দেবার এমন একটা সুযোগ ছাড়ি কেন! এই পাণ্ডব-বর্জিত মরুভূমির দেশে পুলিশ আমার খোঁজও পাবে না৷ আর এখানে মাইনের টাকা কিসেই বা খরচ করব! বরং জমাতে পারলে, কিছু অন্তত সঙ্গে নিয়ে পালানো যাবে—ভালোই হবে!

হেসে জেনসনের চোখে চোখ রাখলাম, ‘রাজি—অবশ্য আমার কাজ যদি আপনার পছন্দ হয়—’

অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল জেনসন, প্রচণ্ড এক চাপড় কষিয়ে দিল আমার ঊরুতে, ‘ওসব বিনয়-টিনয় ছাড় জ্যাক—আজ থেকে তুমি আমার ওখানে চাকরিতে ঢুকলে—কোন আপত্তি চলবে না৷’

অদ্ভুত নামের এক পেট্রল-পাম্পে অদ্ভুতভাবেই চাকরি পেলাম!