পাঁচ
পরদিন সকালে যখন খাবার ঘরে এলাম, তখন সাতটা বাজে৷ দেখি, লোলা এক টুকরো কাপড় দিয়ে কাউন্টারের ওপরটা ঘষে ঘষে পরিষ্কার করছে৷ ওর পরনে খুব খাটো একটা লাল প্যান্ট, গায়ে হলদে চোলি৷ এই পোশাক লোলাকে যেন আরও দশগুণ বেশি আকর্ষণীয়া করে তুলছে৷ আমার চোখ খেলে বেড়াতে লাগল ওর দেহের উপর৷ এই স্বল্প পোশাকের বিরুদ্ধে যেন বিদ্রোহ করছে ওর উদ্ধত যৌবন! মনে মনে জেনসনকে হিংসা করলাম৷ ওফ্-যে-কোন মুহূর্তে তার সঙ্গে জায়গা বদল করতে আমি রাজি!
লোলা প্রথমে আমাকে দেখতে পায়নি৷ হঠাৎ খেয়াল হওয়াতে চোখ তুলে তাকাল—মুখে বিরক্তির ভাব৷ তারপর আবার কাজে মন দিল৷
‘সুপ্রভাত, মিসেস জেনসন—দিন, আমিই ওটা পরিষ্কার করে দিচ্ছি৷’
ঘৃণাভরা চোখে আমাকে দেখল লোলা, ‘প্রয়োজন হলে তোমাকে বলা হবে৷’
কাউন্টারের উপর ঝুঁকে পড়ে ও সামনের দিকটা ঘষতে লাগল৷ ঝুঁকে পড়ায় চোখের পড়ল ওর সুগঠিত দুই স্তন—অন্তর্বাসের অনুপস্থিতি৷
হঠাৎ কি মনে হতে লোলা মুখ তুলে তাকাল, বুঝতে পারল আমার মনোযোগের কারণ, ‘হাঁ করে কী দেখছ?’
‘কই, কিছু না তো?’ চটপট কাউন্টার পার হয়ে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকলাম৷
রান্নাঘরের টেবিলের কাছে জেনসন বসেছিল৷ টেবিলের উপর স্তূপীকৃত নোট আর খুচরো পয়সা৷ একপাশে একটা খালি প্লেট, ছুরি, কাঁটা-চামচ, আর এক কাপ কফি৷ আমাকে দেখে সে হাসল, ‘এস, জ্যাক, ভেতরে এস৷ কী খাবে বলো? স্যান্ডউইচ, ডিম?’
‘না, মি. জেনসন, শুধু এক কাপ কফি৷’ স্টোভে বসানো কফির কেটলির দিকে এগিয়ে গেলাম৷
‘এদিকের সব কাজ সারা হয়ে গেলে, আমি আর লোলা ওয়েন্টওয়ার্থে যাব, কিছু জিনিসপত্র কেনার আছে৷ গতকাল যা বিক্রি হয়েছে, গত ক-বছরের কোন দিন ওর অর্ধেকও বিক্রি হয়নি৷ জ্যাক, ঠিক করেছি এবার থেকে রেস্তোরাঁর বিক্রির ওপর তোমাকে পাঁচ পার্সেন্ট কমিশন দেব, খুশি তো?’
‘ধন্যবাদ, মি জেনসন৷’ কফির কাপ নামিয়ে রাখলাম৷
‘ওয়েণ্টওয়ার্থ থেকে ফেরার সময় একটা অ্যাপ্রণ নিয়ে আসব— তোমার কাজ করার সুবিধে হবে৷ আর-কিছু লাগবে’
‘কিছু জামাকাপড়ের প্রয়োজন ছিল—থাকগে, ও আমি নিজে গিয়েই কিনে আনব৷’
‘সেই ভালো৷ কাল গাড়ি নিয়ে যেও তোমার পছন্দমতন কিনে এনো৷ এই নাও—এই একশ ডলার রাখ৷ রেস্তোরাঁর কমিশন হিসেবে আগাম দিলাম৷ এতে হবে তো?’ পাঁচটা বিশ ডলারের নোট সে আমার দিকে এগিয়ে দিল৷
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ—খুব হবে৷ আপনাকে কি বলে যে ধন্যবাদ দেব—’ হাত বাড়িয়ে টাকাগুলো নিলাম৷
‘আরে ধন্যবাদের কি আছে? এ তো তোমারই পাওনা টাকা থেকে দিলাম!—তাহলে কালই তুমি ওয়েন্টওয়ার্থে যাচ্ছ?’
‘হ্যাঁ৷’
চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল জেনসন, ‘জ্যাক, কাল যে পুরোনো ইঞ্জিনটা দেখলে, ওটা ওজন-দরেই কিনে এনেছি, কিন্তু ভাবছি ইঞ্জিনটার পেছনে একটু খাটলে, হয়তো ওটাকে চালু করা যাবে৷ তুমি কি বল?’
‘আমি একটু পরেই যাচ্ছি—ওটাকে নেড়েচেড়ে দেখব’খন৷’
‘কিন্তু ঘণ্টাখানেকের মধ্যে যে আমি আর লোলা বেরিয়ে পড়ছি, তুমি একা কি পারবে?’
‘কেন পারব না?’
কফির কাপটা ধুয়ে রাখলাম৷ একটা সিগারেট ধরিয়ে খাবার ঘরে গেলাম৷
লোলা পিছন ফিরে ফ্রুট পাই-এর জারে লেবেল লাগিয়ে রাখছিল—যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালাম৷ শরীরের রক্ত-চলাচল দ্রুত হয়ে উঠল৷ যেন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, গত রাতে জানালায় দাঁড়িয়ে-থাকা লোলাকে৷
ও হয়তো আমার উপস্থিতি টের পেয়েছিল৷ কারণ লেবেল লাগাতে লাগাতে ওর হাত থমকে গেল,—কিন্তু ঘুরে তাকাল না৷ আর অপেক্ষা না করে বাইরে বেরিয়ে এলাম৷
সকালে হালকা রোদে বেশ ভালোই লাগছে৷ রাতের ঠান্ডা আমেজটা যেন যাই-যাই করেও যায়নি৷ একটা ঝাঁটা নিয়ে পাম্পের কাছটা ঝাঁট দিতে শুরু করলাম৷
একটু পরেই দুটো ট্রাক এসে দাঁড়াল তেল নেবার জন্য৷ তেল দেওয়া হয়ে গেলে ট্রাক-চালকদের ব্রেকফাস্ট সেরে নিতে অনুরোধ করলাম, কিন্তু তাড়া থাকায় ওরা রাজি হল না৷
ঝাঁট দেওয়া শেষ করে গুমটিঘরে গেলাম—সেখানে ইঞ্জিনটা নিয়ে পড়লাম৷
প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে জেনসন আমার পাশে এসে দাঁড়াল, ‘আমরা বেরোচ্ছি, জ্যাক৷ তোমার কোন অসুবিধে হবে না তো?’
‘না, না আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আমি ঠিক পারব৷’
জেনসন ওর পেশীবহুল হাত আমার কাঁধে রাখল, ‘আগে মরচেটা তুলে ফেলার ব্যবস্থা কর, তারপর বাকিটা আমি দেখব৷ আচ্ছা জ্যাক—তাহলে চলি৷’
জেনসনের পিছন পিছন গুমটিঘরের দরজা পর্যন্ত এলাম৷ দেখি, বাংলো থেকে লোলা বেরিয়ে আসছে৷ পরনে একটা সবুজ রঙের আঁটসাঁট সুতী পোশাক৷
জেনসন আমার কোমরে এক খোঁচা মারল, ‘কি হে, একেবারে বোবা হয়ে গেলে যে! দেখেছ, কিরকম সেজেছে আমার বউ?’
বোকার মতো হাসলাম, ‘আপনার স্ত্রী সত্যিই সুন্দরী, মি. জেনসন৷’
‘সবাই তো তাই বলে’ জেনসনের মুখে গর্বের হাসি, ‘যাক্ গে, চলি—আবার দুপুরে দেখা হবে৷’
ওদের গাড়ি একরাশ ধুলো উড়িয়ে বেরিয়ে গেল৷
একটা সিগারেট ধরিয়ে চারপাশে তাকালাম—খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্নকে’৷ সত্যিই, এরকম একটা জায়গা যদি আমার থাকত! আর থাকত লোলার মতো সুন্দরী স্ত্রী!
নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল৷ আবার ইঞ্জিনটার কাছে ফিরে গেলাম৷—কি হবে এসব ভেবে? কিন্তু নাঃ, লোলার চিন্তাকে মন থেকে মুছে ফেলা অসম্ভব৷ গত রাতের কথা বারে বারেই মনে পড়ছে—কিছুতেই স্থিরভাবে কাজ করতে পারছি না৷
এইভাবে ঘণ্টাখানেক কেটে গেল৷ এক সময় দেখি, একটা লড়ঝড়ে শেভ্রলে গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে গুমটিঘরের দরজায়৷ আরোহী গাড়ি থেকে নামল৷ বয়স বছর চল্লিশেক হবে৷ লম্বা, রোগা চেহারা৷ পরনে রঙ-ওঠা একটা নীল প্যান্ট, ময়লা কালো জামা৷ গলায় বাঁধা একটা লাল রুমাল৷ মাথার বাদামী রঙের টুপি—রোদে তার রঙ জ্বলে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে৷
আগন্তুক গুমটিঘরে এসে ঢুকল৷ কাছ থেকে আরও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাকে দেখলাম—রোদে-পোড়া চেহারা, হনু বের করা মুখ, চোখ নাক, পাতলা ঠোঁট৷ ঘন ভুরুজোড়ার নিচে স্থির অন্তর্ভেদী চোখ৷
তাকে দেখেই কেমন একটা অস্বস্তি বোধ করলাম৷ মনে হল, লোকটার চেহারার কেমন একটা পুলিশি ভাব৷ বিশেষ করে, ওই অন্তর্ভেদী, সন্দেহে ভরা শিকারী চোখজোড়ায়৷
আমরা পরস্পরের দিকে চেয়ে রইলাম৷ শেষে আমিই চোখ সরিয়ে নিলাম, ইঞ্জিনটা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম, ‘কী চাই?’ তার চোখে সেই একই চাউনি—যেন আমার ভিতরটা তন্নতন্ন করে দেখছে৷
লোকটা আয়েশ করে দরজার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল৷ হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, ওর পায়ের কাছে, চুপটি করে লেজ গুটিয়ে বসে আছে একটা হলদে কুকুর, রোগা হাড়জিরজিরে চেহারা, লাল চোখ দুটোয় বিষাদভরা দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে চেয়ে আছে৷ গলায় বকলসও রয়েছে একটা৷
প্যান্টের পকেটে দু-হাত ঢুকিয়ে ঘাড় কাত করে আমার দিকে তাকাল লোকটা, ‘চাই তো অনেক কিছুই! যেমন ধর, জানতে চাই তোমার পরিচয় এখানে তুমি কী করছ,—হয়ত জানতে চাই—মি. জেনসন এখন কোথায় আছেন৷—হয়ত তোমার মুখ থেকেই শুনতে চাই, ‘নিজের চরকায় তেল দিন’ উপদেশটা, কী বল?’ শেয়ালের মতো খিকখিক করে হেসে উঠল লোকটা৷
রাগে আমার আপাদমস্তক জ্বলে গেল৷ কিন্তু না,—লোকটা কে, সেকথা না জেনে কিছু বলে বসা ঠিক হবে না৷ ঠান্ডা স্বরেই জবাব দিলাম, ‘মি. জেনসন ও মিসেস জেনসন ওয়েন্টওয়ার্থে গেছেন৷ আর আমি জ্যাক প্যাটামোর, এখানে নতুন চাকরিতে ঢুকেছি৷’
‘তাই নাকি!’ দরজা ছেড়ে সে দু-পা এগিয়ে এল৷ ‘তার মানে কার্ল তোমাকে চাকরি দিয়েছে?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷’
‘হুঁ—ভারি অদ্ভুত ব্যাপার! আমি তো ভাবতেই পারিনি ওর বউয়ের অমতে কার্ল এখানে লোক রাখবে৷’ কথা বলার সময় তার সন্দেহভরা চোখ আমার ময়লা পোশাক, ছেঁড়া জুতো, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল, এমন সময় আপমনমনেই মাথা নাড়ল, ‘উঁহু—ভারি আশ্চর্য!’ চোয়ালে হাত বুলিয়ে কি যেন ভাবল, তারপর বলল, ‘আমি কার্লের শ্যালক৷ আমার নাম রিক্স—জর্জ রিক্স৷’
অনুমানে মনে হল, এ নিশ্চয়ই জেনসনের মৃতা স্ত্রীর ভাই, লোলার কেউ নয়৷ সুতরাং বাজে কথায় সময় নষ্ট করে লাভ নেই ভেবে ইঞ্জিনটার দিকে মনোযোগ দিলাম৷
‘কার্লের সঙ্গে ওর বউও ওয়েন্টওয়ের্থে গেছে?’ পিছন থেকে রিক্সের স্বর ভেসে এল৷
‘হ্যাঁ৷’ মুখ না ফিরিয়েই জবাব দিলাম৷
‘তার মানে তুমি এখানে একা?’
‘ঠিক ধরেছেন৷’
শ্লেষটা রিক্স বুঝতে পারল কিনা জানি না, হঠাৎ ঘাড়ের উপর তার উত্তপ্ত নিশ্বাস অনুভব করলাম৷ গিয়ার-বক্সের উপর থমকে দাঁড়াল আমার কর্মব্যস্ত হাত৷
‘এসবে পুরোনো মাল কেনা-বেচার ব্যাপারে কার্লের বুদ্ধি আছে, কিন্তু মানুষ চিনতে ওর সময় লাগে—সেরকম বুদ্ধি ওর নেই?’
ইঞ্জিনটার উপর ঝুঁকে থাকায় সে আমার মুখের পরিবর্তন দেখতে পেল না৷ কারণ, রিক্স কি করে জানবে, সবসময় আমি শুধু লোলার কথাই ভাবছি!
‘ভালোই—’ স্ক্রু-ড্রাইভার নিয়ে ক্লাচ-প্লেট খুলতে শুরু করলাম৷
‘ভালো? তোমার তাই মনে হয়? কিন্তু জেনে রেখো চাঁদ, লোলা তোমাকে পছন্দ তো করেই না, এখানেই কেউ কাজ করুক তা-ও সে চায় না—আমাকেই বলে তাড়াতে পারলে বাঁচে! হু—ওরমক একটা উটকো মেয়েকে কার্ল যে হুট করে বিয়ে করে বসবে তা ভাবতেই পারিনি৷ কিন্তু লোলা সেয়ানা মেয়ে৷ কার্লের মতো পয়সাওয়ালা লোককে ও হাতছাড়া করতে চায়নি৷ তাই ওর সামনে যৌবনের মায়াজাল বিছিয়ে টোপ ফেলেছে৷ আর কার্লটাও তেমনি বুড়ো গর্দভ, সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে করে বসল,—কিন্তু, তুমি সাবধানে থেকো বৎস, মনে রেখো, তোমাকে বেশিদিন এখানে থাকতে হচ্ছে না৷ কার্লকে যেমন করে হোক রাজি করিয়ে, ও তোমাকে তাড়াবেই—কেন জান?’
যেন খুব অবাক হয়ে গেছি, এরকম একটা ভাব করে, বোকা-বোকা চোখে বেশ কিছুক্ষণ রিক্সের দিকে চেয়ে রইলাম, ‘আপনি কী বলছেন! কিছুই তো বুঝতে পারছি না!— আমি এখানে শুধু চাকরিতে ঢুকেছি৷’
রিক্স দাঁত বের করে হাসল, পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে আবার দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল, ‘হ্যাঁ, তুমি এখানে চাকরিতে ঢুকেছ ঠিক কথা, কিন্তু কেউ কার্লের টাকায় ভাগ বসাক, তা লোলা চাইবে না৷ সমস্ত টাকা ও একাই নিতে চায়৷—আমি জানি৷ আমার চোখকে ও ধোঁকা দিতে পারবে না৷ শুধু টাকার জন্যই ও কার্লকে বিয়ে করেছে৷ লোলাকে চিনতে তোমার এখনও অনেক বাকী আছে৷’
‘তাছাড়া, তুমি হয়ত জানা না, কার্ল অত্যন্ত মিতব্যয়ী৷ বছরের পর বছর ও শুধু টাকা জমিয়ে গেছে৷ বিনা প্রয়োজনে একটা পয়সাও খরচা করেনি৷ তাই বলে ভেব না ও কঞ্জুস৷ কারুর উপকার করার সুযোগ পেলে, কার্ল টাকা ছড়াতে কখনোই দ্বিধা করবে না, আর লোলা সেটা ভালোভাবেই জানে৷ তাই সবসময়—তুমি জান, লোলা এখানে আসার আগে কার্ল আমাকে কত খাতির করত৷ এমনকি ডেকে খাওয়াত পর্যন্ত! কিন্তু আজ? —হুঁ আমি এলেই শ্রীমতী লোলা বিরক্ত হন৷ আর, কার্ল যদি ওর অমতে আমাকে খেতে দেয়—তবে কি হয় জান? রাত্রিবেলা শোবার ঘরের দরজা লোলা বন্ধ করে দেয়৷’ রিক্স হাত দিয়ে চাবি ঘোরানোর একটা ভঙ্গি করল, ‘কার্লটাও তেমনি ভোঁদাই, বউয়ের সঙ্গে এক খাটে জড়াজড়ি করে না শুলে ওর না ঘুমই আসে না! এবার বুঝেছ, প্যাঁচটা কোথায়? লোলার অমতে কোন কাজ করলেই শোর ঘরের দরজায় তালা, ব্যস!’ আবার শেয়ালের মতো খিকখিক করে হেসে উঠল রিক্স, ‘তবে তুমিও এখানে আর বেশিদিন নেই৷ লোলা হয়ত ভাবছে, ওর মতো তুমিও কার্লের টাকা হাতানোর ধান্দায় আছ৷’
কোন জবাব না দিয়ে কাজ করে চললাম৷ ক্লাচ-প্লেটগুলো পেট্রলে ভিজিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালাম৷ যন্ত্রপাতির তাক থেকে একটা কাপড় নিয়ে হাতের কালি মুছতে লাগলাম৷
রিক্স তখনও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমাকে লক্ষ্য করছিল, কিন্তু আমার মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া না দেখে যেন একটু অস্বস্তি বোধ করল৷
‘আচ্ছা—শুধু শুধু আর তোমার সময় নষ্ট করব না,’ দরজা ছেড়ে রিক্স এগিয়ে এল, ‘বাড়িতে একটা কাজের জন্য আমার কয়েকটা যন্ত্রপাতি দরকার৷ অন্য সময় কার্লের থেকেই নিয়ে যাই—কিন্তু সে তো এখন নেই, কি আর করা—,’ বলতে বলতে সে যন্ত্রপাতির তাকের কাছে এগিয়ে গেল, ‘দেখি, কোনটা লাগবে—৷’ হাত বাড়িয়ে রিক্স দুটো স্ক্রু-ড্রাইভার আর একটা হাতুড়ি তুলে নিল, তারপর হাত বাড়াল একটা ড্রিল-এর দিকে৷
‘মি. রিক্স, ওগুলো আপনাকে দিতে পারছি না বলে দুঃখিত৷’
থমকে দাঁড়াল রিক্স, ভাবলেশহীন মুখে ফিরে তাকাল, ‘তার মানে?’
‘মি. জেনসন তো এখানে নেই, তাঁর অনুমতি ছাড়া যন্ত্রপাতি দেওয়াটা ঠিক হবে না৷ আপনি অপেক্ষা করুন, তিনি ফিরে এলে তাঁকে বলে নিয়ে যাবেন৷’
রিক্স আমার কথায় কর্ণপাত না করে ড্রিলটা তুলে নিল৷ আবার হাত বাড়াল একটা করাতের দিকে, ‘ওর জন্য ভেব না, দোস্ত৷ আমি কার্লের আত্মীয়৷ হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ অচেনা কাউকে যন্ত্রপাতি দেওয়াটা ঠিক নয়—কিন্তু আমার কথা সম্পূর্ণ আলাদা৷ আমি এগুলো নিলে কার্ল কিচ্ছু মনে করবে না৷’
আমার ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল৷ রাগে, বিরক্তিতে রিক্সের দিকে এগিয়ে গেলাম, ‘আমি দুঃখিত, মি. রিক্স! মি. জেনসনের অনুমতি ছাড়া আমি কোন জিনিস কাউকে দিতে পারি না৷
দপ করে জ্বলে উঠল রিক্সের শিকারী চোখজোড়া, ‘শোন দোস্ত, তুমি এখানে নতুন চাকরিতে ঢুকেছ সেটা কি খোয়াতে চাও? আমি যদি কার্লকে বলি—’
‘দয়া করে তাই বলুন গিয়ে! মি. জেনসন না বললে একটা যন্ত্রপতিও আপনি নিয়ে যেতে পারবেন না—আমি নিরুপায়৷ আর আপনার যদি সেরকম দরকার থাকে, তবে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করুন, মি. জেনসন এসে পড়বেন৷’
‘ও—এই ব্যাপার!’ রিক্সের সারা মুখ ঘেমে উঠেছে, মুখটা যেন হয়ে উঠেছে আরও কুংসিত৷ আর কুকুরটা ভয় পেয়ে গাড়ির দিকে ছুটল, ‘তাহলে তুমিও লোলার সঙ্গে ভিড়েছ, অ্যাঁ? কার্লের টাকার লোভ তোমার আছে বলে তো মনে হচ্ছে না! তাহলে কি লোলার সঙ্গে খাটবাজি করছ?’
মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল৷ খামচে ধরলাম রিক্সের জামার কলার৷ দুবার ঝাঁকানি দিয়ে এক ঝটকায় দরজার দিকে ছিটকে ফেলে দিলাম, ‘বেরো শালা এখান থেকে! বেরো—’
রিক্সের হাত থেকে যন্ত্রপাতিগুলো ছিটকে পড়ল৷ গলায় হাত বোলাতে বোলাতে সে উঠে দাঁড়াল৷ মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেছে, চোখে জ্বলন্ত দৃষ্টি, ‘ঠিক আছে!—দাঁড়া শালা, কার্লকে তোর ব্যবস্থা করছি—’
কিন্তু আমি তেড়ে যেতেই, ও ছুট লাগাল গাড়ির দিকে৷ কুকুরটা তখন লেজ গুটিয়ে গাড়িতে বসে জুলজুল করে তাকিয়ে রয়েছে৷ রিক্স মুহূর্তমাত্র দেরি না করে গাড়ি ছুটিয়ে দিল৷ একরাশ ধুলোর মেঘে ওর গাড়িটা ঢাকা পড়ে গেল৷
একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম৷ এ-ব্যাপারটা জেনসনের কানে গেলে কি হবে কে জানে! তবে ভরসা এই, রিক্সের নালিশ শোনার আগেই, আমি আমার সাফাই গাইতে পারব৷
দুপুরের দিকে মালপত্তর কিনে জেনসন ফিরে এল৷ গাড়ি থেকে মাল নামাতে নামাতে তাকে রিক্সের ব্যাপারটা বললাম৷ কিন্তু লোলার সম্বন্ধে যে-কথাগুলো শুনেছি, সেগুলো চেপে গেলাম, ‘—তার সঙ্গে শেষে একটু খারাপ ব্যবহার করতে হয়েছে, মি. জেনসন৷ মি. রিক্স কিছুতেই আমার কথা না শোনায় তাকে আমি তাড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়েছি৷’
জেনসন সশব্দে হেসে উঠল, ‘ঠিক করেছ৷ জর্জ ব্যাটা এক নম্বরের বদমাশ৷ আগে যতবারই জিনিসপত্র নিয়ে গেছে, একবারও ফেরত দেয়নি৷ এখন লোলা আসাতে ব্যাটা ঢিট হয়েছে, এদিক আর মাড়ায় না৷ বহুদিন ওর দেখা পাইনি—কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ও আবার আসবে৷—তবে তোমাকে বলে রাখছি জ্যাক, আমি না থাকলে ওকে একটা জিনিসও দেবে না৷’
নিশ্চিন্ত হলাম৷ জেনসন যে আমার উপর রাগ করেনি তাতেই আমি খুশি৷ কিন্তু মনে হল রিক্সকে রাগিয়ে আমি বোধহয় ভালো করিনি—৷ এবার থেকে ওর উপর নজর রাখতে হবে৷ বলা যায় না, কোনদিন হয়তো আমার অজান্তেই ও আমার বিপদ ডেকে আনবে!
পুব আকাশে দেখা দিয়েছে ভোরের সূর্য৷ একটা হালকা কুয়াশা ছড়িয়ে রয়েছে মরভূমির আবহাওয়ায়৷ তারই আস্তরণ ভেদ করে চোখে পড়ছে ভোরের বিবর্ণ, রক্তিম আভা৷ দূরের ধূসর পাহাড়ের ছায়া যেন পরম নিশ্চিন্তে শুয়ে রয়েছে মরুভূমির বালির উপর৷ দুপুরের রৌদ্রকরোজ্জ্বল চোখধাঁধানো বালির সমুদ্র এখন আবিরে রাঙানো, স্নিগ্ধ৷
বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলাম গত তিন সপ্তাহের কথা—জেনসনের কথা—লোলার কথা৷ এ তিন-সপ্তাহ এখানে কাটানোর পর ফার্নওয়ার্থকে মনে হয় এক মিথ্যে দুঃস্বপ্ন৷ জীবনের সেই অধ্যায়টা যেন কেউ সযত্নে মুছে ফেলেছে স্মৃতির পৃষ্ঠা থেকে৷ হয়ত ওরাও ভুলে গেছে শেট কারসন নামে কয়েদীর কথা৷ কে জানে?
লোলা আমাকে এখনও সহজভাবে নিতে পারেনি৷ খুব প্রায়াজন ছাড়া কথা বলে না৷ কিন্তু ওর প্রভাবকে আমি কাটিয়ে উঠতে পারিনি—পারব কিনা জানি না৷
জেনসনকে যতই দেখছি, ততই ভালো লাগছে৷ এত চমৎকার, সরল মানুষ আমি জীবনে আর দেখিনি৷ শ্রদ্ধায় মন ভরে গেছে৷ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুজনে কাজ করেছি, আর শুনেছি তার জীবনের কাহিনী৷
একথা ঠিক, লোলাকে জেনসন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে৷ কিন্তু আড্ডা দেওয়া, তাস খেলা ইত্যাদির জন্য কোন পুরুষ সঙ্গী ওর প্রয়োজন ছিল৷ তাই আমাকে নিয়ে একেবারে মেতে উঠেছে৷
নাঃ, এরকম লোকের প্রতি অকৃতজ্ঞ হতে পারব না—মরে গেলেও না৷
জেনসনের মুখ থেকেই শুনেছি, কিভাবে আয়কর ফাঁকি দিয়ে বছরের পর বছর সঞ্চয় করে, সে এক লাখ ডলার জমিয়েছে৷ এ টাকাটার একটা মোটা অংশ যে পুরোনো লোহালক্কড় থেকে এসেছে, তা জেনসন নিজেই বলেছে৷ ওর একমাত্র ইচ্ছে, আরও কিছু জমিয়ে, বছর দুয়েক পর এসব ছেড়েছুড়ে, লোলাকে নিয়ে পৃথিবীভ্রমণে বেরিয়ে পড়বে৷ রাজার হালে থাকবে, খাবে৷ তারপর বেড়ানো হয়ে গেলে, ফিরে এসে কিছু মূলধন নিয়ে আবার একটা ব্যবসা ফাঁদবে৷
একদিন মুখ ফসকে বলেই ফেলেছি, ‘মিসেস জেনসন কি একথা জানেন?’
‘কত টাকা জমিয়েছি তা জানে, কিন্তু তা দিয়ে কি করব, সেটা এখনও বলিনি৷ শেষ সময়ে বলে একেবারে চমকে দেব৷’ জেনসন আত্মতৃপ্তির হাসি হেসেছে৷ কিন্তু একটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠেছি মনে পড়েছে রিক্সের কথাগুলো—লোলা টাকার জন্যেই জেনসনকে বিয়ে করেছে!
বিছানা ছেড়ে উঠতেই নজর পড়ল রেস্তোরাঁর বারান্দার দিকে৷ লোলা একটা চেয়ারে বসে ছুরি দিয়ে তরকারি কুটছে৷ এমন সময় দৈনন্দিন জিনিসপত্র নিয়ে একটা ট্রাক এসে দাঁড়াল৷ রোজ সকাল ছ-টায় এই ট্রাকটা এসে রান্নার জিনিসপত্র দিয়ে যায়৷ ট্রাক-চালক জিনিসপত্র-ভর্তি বাক্সটা নিয়ে রেস্তোরাঁর দিকে চলল৷ লোলাও অনুসরণ করল তাকে৷
আজ আমার মাইনের দিন৷
বাথরুমে স্নান করতে করতে ভাবছিলাম, কোথায় ফার্নওয়ার্থ আর কোথায় জেনসনের আন্তরিকতা—নেহাত ভাগ্য আর বুদ্ধির জোরে আজ এই সুখের স্বর্গে পা রাখতে পেরেছি৷ এবং এই ভাবেই বাকি জীবনটা আমি কাটিয়ে দিতে চাই৷
প্রাতরাশ সেরে গুমটিঘরে গেলাম৷ আগের দিন জেনসন একটা পুরোনো মোটর কিনে এনেছিল, সেটা সারাতে বসলাম৷ কিছুক্ষণ বাদেই জেনসন এসে উপস্থিত হল, হাতের মুঠোয় একগোছা নোট, ‘জ্যাক, নাও—ধর৷ এখানে আড়াই-শ ডলার আছে—মাইনের চল্লিশ, রেস্তোরাঁর কমিশন এক-শ দশ, আর সেই খাজা ইঞ্জিনটার জন্য এক-শ৷ —জান, সেই ইঞ্জিনটা আমি দু-শ ডলারে বেচেছি?’
‘কিন্তু—মি. জেনসন—এত টাকা—’
‘শোন ছেলের কথা! আরে, তোমার জন্যই তো আজ আমার ব্যবসা এত ফুলে ফেঁপে উঠেছে! তুমি আসার পর থেকেই লাভের অঙ্ক দ্বিগুণ হয়ে গেছে—নাও, নাও, যা দিচ্ছি ধর, আর তর্ক করো না!’
‘আপনি যখন বলছেন—’ হাত বাড়িয়ে টাকাগুলো নিলাম, ‘কিন্তু—’
‘আবার কিন্তু কি?’
‘না—বলছিলাম, এগুলো নিয়ে আমার কাছে মোট পাঁচ-শ দশ ডলার হল, কিন্তু টাকাগুলো খরচ করার তো কোন রাস্তা দেখছি না৷ বরং, যদি আপনার ব্যাঙ্কের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেন, তাহলে টাকাগুলো ওখানেই রাখতে পারি—৷’
‘ব্যাঙ্ক? হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ—’ জেনসনের হাসির দমক আর থামতেই চায় না—, ‘ব্যাঙ্কে কখনও কেউ টাকা রাখে? পাগল নাকি! কখন কোন ব্যাঙ্ক লালবাতি জ্বালবে কেউ বলতে পারে? আমি আমার সমস্ত টাকা একটা সিন্দুকে রাখি৷ বুঝলে হে, একেবারে হাতের কাছে—যখন ইচ্ছে খরচ করতে পারব৷ তাছাড়া আমার ভালোমন্দ কিছু একটা হলে, লোলা সহজেই টাকাটা পেয়ে যাবে৷ সইসাবুদের কোন ঝামেলায় পড়তে হবে না৷ তুমি ইচ্ছে করলে তোমারটাও আমার কাছে জমা রাখতে পার, জ্যাক৷ যখন খুশি চেয়ে নেবে৷ এর চেয়ে ভালো ব্যবস্থা আর কি আছে, বল? হয়ত সুদের লোভে ব্যাঙ্কে রাখতে গেলে, আর ব্যাঙ্কও লালবাতি জ্বালাল—ব্যস—পুরো টাকাটাই জলে!’
হাতের কাজ ফেলে উঠে দাঁড়ালাম, নির্বাক বিস্ময়ে চেয়ে রইলাম জেনসনের দিকে৷
‘তার মানে—ওই লাখ ডলার আপনি একটা সিন্দুকে রেখেছেন?’
‘হ্যাঁ, তাতে হয়েছে কি?—হুঁ হুঁ বাবা, যে-সে সিন্দুক নয়, রীতিমতো লরেন্স কোম্পানির সিন্দুক—বাজারের সেরা!’ জেনসনের মুখে গর্বের হাসি আর ধরে না, তুমি তো সিন্দুকের কাজে ছিলে, তুমিই বল—ওর চেয়ে ভালো সিন্দুক আর আছে?’
ভালোই বটে! খুলতে দু-মিনিটের বেশি লাগবে না—ভালো নয়?
কিন্তু জেনসনকে তো আর সেকথা বলা যায় না৷ তাই ওর কথায় সায় দিলাম, ‘সত্যিই, ওর চেয়ে ভালো সিন্দুক বাজারে আর নেই৷’
আনন্দে সে আমার পিঠে এক চাপড় কষিয়ে দিল, ‘যাও, টাকাগুলো নিয়ে এস৷ সিন্দুকে জমা করে একটা রসিদ দিয়ে দিই৷ দরকার পড়লেই চাইবে, লজ্জা করবে না—সঙ্গে-সঙ্গে পেয়ে যাবে৷’
আমি আর কিছু না বলে তোশকের তলা থেকে সব টাকা বের করে এনে জেনসনের হাতে তুলে দিলাম৷ সে আমাকে পাঁচ-শ দশ ডলারের একটা রসিদ দিল৷ রসিদটাও এক পলক দেখে নিয়ে পকেটে ভরলাম৷
টাকাগুলো পকেটে রেখে জেনসন ঘড়ি দেখল, ‘বেলা হয়ে এল৷ একটু পরেই বাস এসে পড়বে৷ প্রায় ৩০-৩৫ জনের খাওয়ার যোগাড় করতে হবে৷ জ্যাক, তুমি বরং রান্নাঘরে গিয়ে লোলাকে সাহায্য কর টাকাটা রেখে এসে আমি এদিকটা সামলাচ্ছি৷ যাও, এখন থেকেই লেগে পড়, পরে আর থৈ পাবে না৷’
সম্মতি জানিয়ে রেস্তোরাঁর দিকে পা বাড়ালাম৷
লোলা ফ্রুট পাইগুলো জারে জারে সাজিয়ে রাখছিল, আমি ঘরে ঢুকতেই পায়ের শব্দে ঘুরে তাকাল৷ ওর সবুজ চোখে ব্যঙ্গ ঝরে পড়ছে৷ সারা মুখে খেলা করছে একটা চাপা কৌতুক৷
‘কোন কাজ আছে নাকি, মিসেস জেনসন?’
হাসল লোলা৷ সঙ্গে সঙ্গে আমার বুক ধড়াস করে উঠল! কী ব্যাপার? আজ পর্যন্ত একদিনও আমাকে দেখে হাসেনি৷ তাহলে আজ কেন—
‘অনেক-ক কাজ আছে, ——মি-স-টা-র প্যা-ট-মো-র৷’ লোলার হাসি আরো ক্রূর হয়ে উঠল৷
মুহূর্তে বিপদের লাল সংকেত ভেসে উঠল চোখের সামনে৷ মিস্টার প্যাটমোর? কথা বলার সুরটা কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকছে না!
‘রান্নাঘরে যাও৷ সকালে যে জিনিসপত্রের বাক্সটা দিয়ে গেছে, ওটা আমি টেবিলের ওপর তোমার জন্য খুলে রেখে এসেছি৷ গেলেই দেখতে পাবে, স—ব রয়েছে,’ লোলা স্থিরদৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে রইল, ‘ভেতরের জিনিসগুলো গুছিয়ে রাখ দিয়ে৷’
রান্নাঘরে গেলাম৷ দেখি, টেবিলের উপর ছড়ানো রয়েছে কতকগুলো খাবারের টিন, পলিথিনে মোড়া দু-ডজন মুরগি, তাছাড়া অন্যান্য কিছু জিনিসপত্র৷
খাবারের টিনগুলোর উপরে রাখা রয়েছে, একটা ভাঁজ করা খবরের কাগজ—সম্ভবত কোন-কিছু মোড়া ছিল৷ ওটা তুলে নিয়ে আস্তে আস্তে খুলতে শুরু করলাম৷ অর্ধেকটা খুলতেই বুকের ভিতর বিস্ফোরণ ঘটল—চোখের সামনে যেন মৃত্যু এসে দাঁড়িয়েছে—
কাগজের প্রথম পাতাতেই বড় বড় হরফের লেখা—
—কুখ্যাত সিন্দুক লুণ্ঠনকারী আজও পলাতক—
তার নিচে আমার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস৷ ছাপানো ফটোটার দিকে চোখ পড়তেই অনুভব করলাম মৃত্যুর অশরীরী স্পর্শ৷ এমনিতে ফটোটা অত্যন্ত বাজে ছাপা হয়েছে বলতে গেলে আমাকে চেনা যায় না৷ কিন্তু লোলার তাতে এতটুকু অসুবিধে হয়নি৷
ফটোটার উপর পেন্সিল দিয়ে ও আমার গোঁফটা নিখুঁতভাবে এঁকে দিয়েছে৷
ফার্নওয়ার্থকে আর মিথ্যে দুঃস্বপ্ন বলে মনে হল না৷ চোখের সামনে ভেসে উঠল তার বীভৎস অত্যচারের দৃশ্য!
ওকল্যাণ্ডের খবরের কাগজ কি করে ওয়েন্টওয়ার্থের দোকানে গেল, তা বলতে পারি না৷ আর সেটা যেভাবে ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’-এ এসেছে, তাকে নিয়তির নির্মম পরিহাস ছাড়া আর কি বলা যায়!
আমার শান্তি, নিরাপত্তার সুখ-স্বপ্ন মুহূর্তে মিলিয়ে গেল৷
লোলা কি জেনসনকে একথা বলেছে?
না, এখনও বোধহয় বলেনি৷ বলে থাকলে, জেনসনের কথাবার্তায় তা বুঝতে পারতাম৷ এখন তাহলে লোলার ফোন করার অপেক্ষা৷ ফোন পেয়েই পুলিশভ্যান এসে আমাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাবে ফার্নওয়ার্থে৷ তারপর?—হয়তো বাকি জীবনটা বিকলাঙ্গ হয়েই কাটাতে হবে—
তাড়াতাড়ি খবরের কাগজটা নিয়ে জ্বলন্ত স্টোভে গুঁজে দিলাম৷ দেখতে দেখতে ওটা পুড়ে ছাই হয়ে গেল৷
কিন্তু এবার কি করব? পালব?—কিন্তু কেমন করে?
তাছাড়া পালানোর পর লোলা যদি ফোন করে পুলিশকে জানিয়ে দেয়, আমি এখানে ছিলাম, তাহলে প্রথমেই ওরা যে-শহরে আমার খোঁজ করবে, তা হল ট্রপিকা স্প্রিং৷ আর ওকল্যান্ডে ফিরে যাব, সে-সাহসও আমার নেই৷ তাহলে উপায়?
না, তার চেয়ে বরং ট্রপিকা স্প্রিংসেই যাওয়া যাক৷ তারপর সেখান থেকে অন্য কোথাও পালানো যাবে৷ পাঁচ-শ ডলার তো আছেই সে-টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ন্যু-ইয়র্কের প্লেন ধরে—৷ কিন্তু পাঁচ-শ ডলার? মনে হল, কেউ যেন বরফশীতল হাতে আঁকড়ে ধরেছে আমার হৃদপিণ্ড! কোথায় টাকা? সে তো জেনসনের হাতে আধঘণ্টা আগেই তুলে দিয়েছি! আমার এখনই যদি টাকা চাই, তবে কি জেনসন সন্দেহ করবে না?
বিস্ময়-বিভীষিকায় পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম৷ চিন্তাশক্তি যেন লোপ পেয়ে গেছে৷
এমন সময় রান্নাঘরের দরজা খুলে ভিতরে এসে ঢুকল লোলা৷ ওর চোখের স্থিরদৃষ্টি যেন আমার মনোভাব আন্দাজ করতে চাইছে৷
‘কী হল, এখনও ওগুলো গুছিয়ে রাখনি?’ গলার স্বরে কি ব্যঙ্গের আভাস রয়েছে? নাকি আমার শোনবার ভুল?
‘এই যে, রাখছি৷’
হারামজাদী মাগী! তুই কি এর মধ্যেই পুলিশে ফোন করেছিস নাকি?
লোলা এগিয়ে এসে পলিথিনে মোড়া মুরগিগুলোকে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখতে লাগল—গুনগুন করে গাইতে লাগল একটা গানের কলি৷
কাজ শেষ করেই ও হঠাৎ ঘুরে তাকাল, ‘আমাদের দুজনের একটা অলোচনা হওয়া দরকার৷ আজ তো তোমাকে সারারাত কাজ করতে হবে, তাই না?’
‘হ্যাঁ৷’ অনুসন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে ওকে দেখতে লাগলাম৷
‘রাতে কার্ল ঘুমোলে, আমি আসব৷’
বুঝলাম, ও পুলিশে খবর দেয়নি৷ আমার সঙ্গে আলোচনা করে কোন রফা করতে চায়৷ কিন্তু আমার নিরাপত্তার বিনিময়ে ও কি চাইবে?
‘আপনি যা বলবেন, আমি তাতেই রাজি,’ কেমন যেন ভিক্ষে চাওয়ার মতো শোনাল নিজের কথাগুলো—কিন্তু আমি নিরুপায়৷
‘আপাতত রান্নাঘর থেকে কেটে পড়ুন, মি. শেট কারসন৷ আমি একাই সব সামলাতে পারব৷ আপনার সাহায্যের আর প্রয়োজন নেই৷’
আমি এখন লোলার মুঠোয়৷ ও যা বলবে, তা করতে আমি বাধ্য, এবং লোলাও সেটা জানে৷ তাই বিনা বাক্যব্যয়ে রান্নাঘর ছেড়ে খাবার ঘরে পা বাড়ালাম৷ যাবার আগে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম ওর হলদে চোলি আর লাল প্যান্টের উপর৷ অবশেষে ওর চোখে চোখ রাখলাম, ‘আপনি যা বলবেন—’
লোলা হাসল—বড় নিষ্ঠুর সে-হাসি, ‘হুঁ—ঠিক বলেছ, কারসন৷ এখন থেকে আমি যা—বলব—’
ভারাক্রান্ত মনে বাইরে এলাম৷ লোলার মনে কি আছে তা কে জানে? ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়া ছাড়া আর উপায় দেখছি না!
একটু পরেই বাস এসে পড়ায় আমরা তিনজনেই ব্যস্ত হয়ে পড়লাম৷ রেস্তোরাঁয় খদ্দেরের ভিড় বাড়তে লাগল—
ঘণ্টাখানেক পর বাস চলে গেলে জেনসন ঘাম মুছতে মুছতে আমার দিকে এগিয়ে এল, ‘জ্যাক, এই এঁটো প্লেটগুলো আমি আর লোলা ধুয়ে রাখতে পারব৷ তুমি বরং বাইরে বসে পাম্পগুলোর দিকে খেয়াল রাখ, খাটুনিটা কম পড়বে৷ তোমাকে তো আবার রাতেও জাগতে হবে৷’
জেনসনের কথামতো বাইরে বারান্দায় এলাম৷ এখানে বসে অন্তত একটু ভাববার সময় পাওয়া যাবে৷ এতক্ষণ পর সেই ভয়টা আবার আমাকে আঁকড়ে ধরল৷ সম্ভব অসম্ভব নানান চিন্তা এসে ভিড় করল মাথার মধ্যে৷ একটা সিগারেট ধরিয়ে আয়েশ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলাম৷
হঠাৎ কেমন একটা অস্বস্তি হতেই ঘাড় ফিরিয়ে তাকালাম৷ দেখি লোলা রেস্তোরাঁর বাইরে বেরিয়ে এসেছে৷ স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে আছে আমার দিকে৷ লোভে চকচক করছের ওর সবুজ চোখ৷ জেনসনসও এসে দাঁড়িয়েছে লোলার পিছনে, হাতে একগাদা প্লেট, চোখে অপ্রস্তুত দৃষ্টি৷
‘এই অপোগণ্ড লোকটাকে এখানে এনেছ কিজন্য? লোলা তীক্ষ্ণ স্বরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘কাজের নামে দেখা নেই, খালি বসে বসে গিলবে! আমাকে একাই কি সব কাজ করতে হবে নাকি?’
‘ছিঃ লোলা, জ্যাককে সারারাত—’
‘সারারাত কাজ করতে হবে!’ জেনসনকে ভেংচে উঠল লোলা, ‘তাতে আমার বয়েই গেল৷’ তারপর ও আমার দিকে ফিরল, ‘যাও, হাঁ করে দেখছ কি? প্লেটগুলো ধুয়ে ফেলার ব্যবস্থা কর গিয়ে৷ তোমাকে মাইনে দেওয়া হয় গতর খাটানোর জন্য, হাওয়া খাওয়ার জন্য নয়৷’
‘লোলা!’ চাপা স্বরে ধমকে উঠল জেনসন৷
আমি চেয়ার ছেড়ে রেস্তোরাঁর দিকে এগোলাম, ‘ভুল হয়ে গেছে মিসেস জেনসন, এবারকার মতো মাপ করুন৷’
‘লোলা৷’ জেনসন রাগে ফেটে পড়ল, ‘ভদ্রভাবে কথা বলতে শেখ৷ আমি জ্যাককে বলেছি এখানে বসতে, পাম্পগুলো দেখতে৷’
‘তাহলে আমার কথার কোন দাম নেই? তাতে কি জন্য আমি এখানে রয়েছি? রান্না করা, আর রাতে তোমার পাশে শোবার জন্য?’ লোলার মুখ চোখ রাগে লাল হয়ে উঠল৷ কথা শেষ করেই ও ঝড়ের মতো চলে গেল বাংলোর দিকে৷ ভিতরে ঢুকে দড়াম করে বন্ধ করে দিল সদর দরজা৷
লোলা চলে গেলে হাতের প্লেটগুলো নামিয়ে রেখে জনসন ফিরে এল, মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ৷ তার মনের ভাব অনুমান করে সান্তনা দিলাম, ‘ওঁর জন্য ভাববেন না, মি. জেনসন৷ সারাটা দিন খাটাখাটনি করে মাথার আর ঠিক নেই, কালই সব ঠিক হয়ে যাবে৷’
‘তুমি তো বলছ, কিন্তু এর আগে লোলা কোনদিন আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলেনি৷’ চোয়ালে হাত বোলাতে বোলাতে মাথা নাড়ল জেনসন৷
সবই আমি বুঝেছি৷ কিন্তু কি করে জেনসনকে বলি, এ-ব্যাপারটা পুরোটাই একটা সাজানো নাটক, আজ রাতে আলাদা শোবার ব্যবস্থাটা পাকাপাকি করার জন্যই লোলার এই অভিনয়৷
‘যাকগে,—চলুন, প্লেটগুলো ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে রাখা যাক৷’
‘তুমি খুব ভালো লোক, জ্যাক৷’ জেনসনের বুক ঠেলে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল, ‘অন্য কেউ হলে এই মুহূর্তে এ-চাকরি ছেড়ে চলে যেত৷ লোলা বলে তোমাকে এমন কথা বলতে পারল৷ এম্মি—আমরা আগের স্ত্রী—কখনও কারুর সঙ্গে এভাবে কথা বলত না—চল, কাজ ফেলে রেখে লাভ নেই৷’
রান্নাঘরে দুজনে কাজ করছি, হঠাৎ কানে এল গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ৷ উঠে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে উঁকি মারলাম—লোলা গাড়ি নিয়ে বেরোচ্ছে৷ পরনে সেই সবুজ পোশাক৷ ও গাড়ি ছুটিয়ে দিল ওয়েন্টওয়ার্থের দিকে৷
চমকে উঠলাম৷ কোথায় যাচ্ছে লোলা? থানায় না তো?
পাশেই কর্মরত জেনসনকে সেকথা জানালাম, ‘মি. জেনসন, আপনার স্ত্রী গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন৷’
‘আমার সঙ্গে ঝগড়া হলেই লোলা ওরকম করে৷’ বিষণ্ণ্ স্বরে জবাব দিল, জেনসন, ‘জান জ্যাক, মাঝে মাঝে ওর জন্য আমার দুঃখ হয়৷ ভাবি, প্রথম জীবনে ওকে হয়ত খুব কষ্ট করতে হয়েছে, তাই ওর ব্যবহার এইরকম৷ এখানে আসার আগে ও কোথায় থাকত, কি করত,—সে-কথা অনেকবার জিগ্যেস করেছি, কোন জবাব দেয়নি৷ ভেবে ছিলাম, তুমি আসার পর আমরা দুজনে একটু নিশ্বাস ফেলার সুযোগ পাব, কিন্তু কোথায় কি? দেখেছ তো, কতদিন ওকে সিনেমায় যাওয়ার জন্য সেধেছি, রাজি হয়নি! হয় মাথাধরা, নয় ক্লান্ত, এমনি নানান অজুহাত দিয়ে এড়িয়ে গেছে৷ কিন্তু ও যখন ওয়েন্টওয়ার্থে একা যায়, তখন বড় চিন্তা হয়, জ্যাক৷ মাঝে মাঝে মনে হয়, ও হয়ত অন্য-কোন—যাকগে, বাদ দাও ওসব কথা৷’ দীর্ঘশ্বাস পেলে সে আবার কাজে মন দিল৷
খুলে না বললেও, জেনসন কি বলতে যাচ্ছিল আমি আঁচ করলাম৷ ও হয়ত সন্দেহ করে, লোলা ওয়েন্টওয়ার্থে গিয়ে ছেলে-ছোকরার সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়৷ হাতেও পারে—অসম্ভব কিছু নয়!
এরপর গাড়ির ভিড় বাড়তে শুরু করায় কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম৷
রাত প্রায় সোয়া এগারোটার সময় লোলা ফিরল৷ গাড়ি থেকে নেমে সোজা গিয়ে ঢুকল নিজের ঘরে৷ সশব্দে বন্ধ করে দিল ঘরের দরজা৷
জেনসন আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল, মাথা নাড়ল, ‘মাঝে মাঝে আমার এমন রাগ হয়, মনে হয়, দুটো থাপ্পড় মেরে লোলাকে ভদ্রতা জিনিসটা শিখাই৷ কিন্তু—যাক, রাত তো অনেক হল, চলি, জ্যাক—শুভরাত্রি৷’ জেনসন ভারী পদক্ষেপে বাংলোর দিকে এগিয়ে চলল৷ বিষাদের ছায়া তখনও মিলিয়ে যায়নি ওর মুখ থেকে৷
ভাবলাম, লোলার গায়ে হাত তোলা, আর কালো-কেউটের ল্যাজে পা দেওয়ার মধ্যে কোন তফাত নেই! জেনসন জানে না, এক ক্রূর সাপিনীকে ও বিয়ে করে বসেছে৷
রেস্তোরাঁয় বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে শ্রীমতীর অপেক্ষায় রইলাম৷ জেনসন ঘুমিয়ে না পড়লে লোলা আসতে পারবে না৷ সুতরাং সময় লাগবে৷ একটা সিগারেট ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছাড়লাম৷ ভাবতে লাগলাম নিজের বর্তমান অবস্থার কথা৷
যদি জেনসনের কাছে টাকাগুলো না রাখতাম, তো কখন হাওয়া হয়ে যেতাম৷ কেউ আমার খোঁজও পেত না৷ কিন্তু এই কপর্দকহীন অবস্থায় পালাবার চিন্তা করা নেহাতই পাগলামি৷
সুতরাং, মাথায় হাজার চিন্তার মেলা নিয়ে লোলার আসার অপেক্ষায় বসে রইলাম৷ চোখদুটো আটকে রইল বাংলোর আলোকিত জানালার দিকে৷
