ছয়
হাতঘড়ির দিকে তাকালাম৷ রাত একটা চল্লিশ৷ তিন ঘণ্টার উপর হয়ে গেল, কিন্তু এখনও লোলার পাত্তা নেই৷ ট্রাক-চলাচল একেবারে পাতলা হয়ে এসেছে৷ গত আধঘণ্টার মধ্যে একটা ট্রাকও চোখে পড়েনি৷ চেয়ারে হেলান দিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম—হঠাৎ চোখ পড়ল বাংলোর দরজায়৷ লোলা চুপিসাড়ে বেরিয়ে আসছে৷ অবসন্নভাবে পা ফেলে ও আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল৷ পরনে একটা সাদা শার্ট আর ফিকে সবুজ রঙের স্কার্ট৷
রেস্তোরাঁর বারান্দা অন্ধকারে ঢাকা৷ মরা চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে সামনের খোলা উঠোনে৷ লোলা উঠে এল বারান্দায়, একটা চেয়ার টেনে নিয়ে আমার কাছে বসল৷
মনকে প্রস্তুত করলাম৷ জানি না, কি শর্তের বিনিময়ে ও আমার নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখবে৷ সুতরাং সতর্ক থাকা ভালো৷
অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছেণ আমার সিগারেটের অগ্রভাগ৷ তার হালকা লাল আলোর লোলার মুখটা অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে৷
‘তোমাকে দেখে একেবারে অবাক হয়ে গেছি, কারসন৷ প্রথম থেকেই সন্দেহ করেছিলাম তুমি ছদ্ম-পরিচয়ে এখানে আছ৷ কিন্তু তুমিই যে ফার্নওয়ার্থ থেকে পলাতক—শেট কারসন, তা ভাবতে পারিনি—আর, তোমার সিন্দুক-বিশারদ হওয়াটা নিতান্তই ভগবানের আশীর্বাদ৷’ লোলা তার লোভনীয় পা দুটোকে সামনের দিকে ছড়িয়ে দিয়ে হাসল৷
‘আপনি কি পুলিশে খবর দিতে চান?’
‘এখনও কিছু ঠিক করিনি৷ সেটা তোমার মতামতের ওপর নির্ভর করছে৷ আমার কথায় রাজি হলে ভালো, নয়তো সোজা ফার্নওয়ার্থ৷’
উদ্গ্রীব হয়ে ওর পরবর্তী কথাগুলো শোনার অপেক্ষায় রইলাম৷
‘কাগজে লিখেছে, তুমি ‘লরেন্স সেফস্ কর্পোরেশন’-এ কাজ করতে—তোমাকে একটা সিন্দুক খুলতে হবে, কারসন!’
‘তার মানে?’ সিগারেটের টুকরোটা ছুড়ে ফেলে নিয়ে সোজা হয়ে বসলাম৷
‘কার্লের একটা লরেন্স-সিন্দুক আছে—তোমাকে সেটা খুলতে হবে৷’ লোলার কণ্ঠে নির্বিকার সুর৷ যেন অত্যন্ত একটা ব্যাপার তার চেয়েও সহজভাবে আমাকে বোঝাচ্ছে৷
তাহলে রিক্স দেখছি মিথ্যে কথা বলেনি৷ লোলা শুধুমাত্র টাকার লোভেই জেনসনকে বিয়ে করেছে৷
‘সিন্দুক থেকে কিছু যদি আপনার নেবার থাকে, তো মি. জেনসনকে বলছেন না কেন?’ বোকা সাজলাম৷ কারণ, লোলার উদ্দেশ্যটা আমি ওর মুখ থেকেই শুনতে চাই৷
‘বেশি চালাক সাজবার চেষ্টা করো না, কারসন৷ বিকেলে কি বলেছিলাম তা আশা করি ভুলে যাওনি? এখন থেকে আমি যা ‘বলব—নয়ত—’
‘রিক্সের কথাই দেখছি সত্যি! শুধু টাকার জন্যই অ্যাদ্দিন এখানে পড়ে ছিলেন?’
‘বাজে কথা ছেড়ে কাজের কথা এস৷ সিন্দুক তুমি খুলছ কিনা বল?’
‘খোলার পর—?’
লোলা নড়েচড়ে বসল, অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল, ‘তুমি এক হাজার ডলার পাবে৷ আর চবিবশ ঘণ্টা সময় দেব পালাবার জন্য৷’
সাবাস লোলা, সাবাস! কে বলে মেয়েদের বুদ্ধি নেই! আমি খুলব সিন্দুক, আর এক লাখ ডলার হাতাবে তুমি! তারপর দয়া করে আমাকে ভিক্ষে দেবে এক হাজার ডলার, আর পালাবার জন্য কিছু সময়! আর তাও কিনা, জেনসন থেকে শুরু করে পুলিশ পর্যন্ত সবাই যাতে ভাবে, আমিই সিন্দুকের টাকা হাতিয়ে কেটে পড়েছি! চমৎকার—তোমার জবাব নেই সুন্দরী!
‘আপনি ওই এক লাখ ডলার চুরি করার মতলবে আছেন, আর মি. জেনসন ভেবেছিলেন আপনাকে নিয়ে পৃথিবীভ্রমণে যাবেন, দু-হাতে খরচ করবেন—সব আপনারই জন্য৷’ শ্লেষে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল আমার স্বর৷ লোলাকে যেন আর সহ্য করতে পারছি না৷ আমার কব্জা করেছে বলে ওর উপর যত না রাগ হল, তার চেয়েও বেশি হল জেনসনের মতো লোককে ও ঠকিয়েছে বলে৷
‘কার্ল? ওই পেটমোটা বুড়োটার সঙ্গে বেড়াতে যাব?’ নৃশংস মনে হল লোলার স্বর, ‘হুঁঃ—ওর সঙ্গে ওয়েন্টওয়ার্থ যেতেই আমার গা ঘিনঘিন করে, তার ওপর আমার পৃথিবীভ্রমণ!—যাকগে, সিন্দুকটা খুলতে তোমার কতক্ষণ লাগবে?’
‘খুলতেই পারব কিনা ঠিক নেই, তার আবার কতক্ষণ লাগবে! এই সিন্দুকগুলো খুব মজবুত হয়৷ কম্বিনেশন নম্বর না পেলে খোলা অসম্ভব৷’
‘কারসন, আমার মনে হয় সিন্দুকটা খুললেই তুমি ভালো করবে৷’ অন্ধকারেই অনুভব করলাম লোলা আমার দিকে অপলকে চেয়ে আছে৷
বেশ বুঝতে পারছি, সিন্দুকটা আমাকে খুলতেই হবে৷ এ ছাড়া কোন দ্বিতীয় উপায় আমার নেই৷ কিন্তু জেনসনের কথা ভাবলেই মন বিদ্রোহ করছে৷ সে আমার একমাত্র বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী—আমার জন্য কত করেছে, আর তাকেই এভাবে পথে বসাব? অথচ ফার্নওয়ার্থের কথা মনে পড়লেই ভয়ে আতঙ্কে শিউরে উঠছি৷ ওই দুঃস্বপ্ণের নরকে ফিরে যাবার মতো সাহস আমার নেই৷
‘সিন্দুকটা কোন্ ঘরে আছে?’ লোলাকে প্রশ্ন করলাম৷
‘বাংলোর বসবার ঘরে৷’
‘বসবার ঘরে? তার মানে? আপনি ভাবছেন আমি মি. জেনসনের কোলে বসে সিন্দুক খুলব? আমি টাকার বান্ডিলগুলো বের করব, আর উনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেবেন?’ ব্যঙ্গে বিকৃত হল আমার মুখ৷ কথায় কথা বাড়িয়ে সময় নেবার ফিকির খুঁজতে লাগলাম৷ মুখে কথা বললেও, আমার মনের মধ্যে তখন বয়ে চলেছে চিন্তার ঝড়৷
‘না, না, সে ভয় নেই৷ আগামী শনিবার সন্ধেবেলা কার্ল ওয়েন্টওয়ার্থে একটা মিটিংয়ে যাবে৷ তারপর রাত একটায় ফিরবে৷ ওর মধ্যেই তোমাকে কাজটা সারতে হবে৷’
একটা সিগারেট ধরালাম৷ লাইটারের আলোয় দেখলাম, লোলার চোখজোড়া লোভে চকচক করছে৷ কারও আসন্ন মৃত্যুর প্রত্যাশায় যেন অপেক্ষা করছে এক বিশাল শকুনি৷
‘সে না হয় হল, কিন্তু সিন্দুক খোলার সময় আপনি কোথায় থাকছেন?’
‘শনিবার তোমার জায়গায় সারারাত আমি কাজ করব৷ তুমি যখন সিন্দুক খুলে টাকা নিয়ে হাওয়া হবে, তখন আমি রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত থাকব৷ টাকা যে চুরি গেছে, সেসব কিছু জানতেই পারব না—অন্তত লোকে তাই জানবে৷ তারপর কার্ল ফিরে এসে সিন্দুক খালি দেখলে, ওকে বলব, আমি কাজে ছিলাম, কখন তুমি টাকা নিয়ে ভেগেছ টেরই পাইনি৷’ আধো-আঁধারিতে ঝকঝক করে উঠল লোলার সাদা দাঁতের সারি৷ পৈশাচিক হাসিতে ওর সবুজ চোখ নেকড়ের মতো জ্বলছে৷
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই মতলবটা আমার মাথায় এল৷ এমনিতেই তো আমাকে পালাতে হবে, ক্ষতির মধ্যে শুধু চাকরিটা—, তা যাকগে, কিন্তু জেনসন যাতে আমাকে ভুল না বোঝে, সে-ব্যবস্থা আমাকেই করতেই হবে৷ মতলবটা যে কার্যকর হবে, তাতে আমার কোন সন্দেহ নেই৷
আমি সিন্দুক খোলার পর লোলা যখন টাকাগুলোর নিতে থাকবে, তখন এক ঘুঁষিতে ওকে অজ্ঞান করে সমস্ত টাকা নিয়ে পালাব৷ যাবার আগে কেটে দিয়ে যাব টেলিফোনের তার৷ তারপর ট্রপিকা স্প্রিংস থেকে জেনসনের সমস্ত টাকা ফেরত পাঠাবার ব্যবস্থা করব৷ সঙ্গে লিখব একটা চিঠি৷ জানাব, কিরকম একটা বাজারে-মাগীকে সে বিয়ে করেছে৷ তাহলে নিশ্চয়ই জেনসনের ভুল ভাঙবে৷
মনে মনে হাসলাম৷ দাঁড়া শালী, তোকে আমি আঁটি চোষাব! শেট কারসনকে চিনতে তোর এখনও অনেক দেরি আছে৷
কিন্তু মুখে ন্যাকা সাজলাম, ‘দেখুন, মিসেস জেনসন—মি. জেনসনকে ঠকানোটা আমার ঠিক ভালো লাগছে না৷ তিনি আমার জন্য কত করেছেন, তা ছাড়া—৷’
‘ওসব ন্যাকামো ছাড়, কারসন৷ সোজাসুজি বল, সিন্দুক খুলছ, না ফার্নওয়ার্থে ফিরে যাবে?’
‘আর যেখানেই যাই, ফার্নওয়ার্থে আমি ফিরছি না৷’
‘তাহলে শনিবার দিনই?’
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম৷ যেন মনস্থির করতে চাইছি৷
অবশেষে কাঁধ ঝাঁকালাম, ‘অগত্যা রাজি না হয়ে উপায়ই বা কী!’
লোলা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, ‘ভেব না আমি ইয়ার্কি করছি৷ সিন্দুক না খুলে দেখ কী হয়৷’
লোলার দিকে চোখ তুলে তাকালাম, ‘অতবার করে আপনাকে বলতে হবে না৷ যখন বলেছি খুলব, তখন খুলব৷
‘তাই যেন হয়, মিস্টার শেট কারসন৷’ সিঁড়ি ভেঙে ও বালির ওপর দিয়ে এগিয়ে চলল বাংলোর দিকে৷ চাঁদের আলোর পরিষ্কার দেখলাম, যেতে যেতে ও একবার ঘুরে তাকাল—মুখে জয়ের হাসি৷
সিগারেটের টুকরোটা ছুড়ে দিলাম বালির উপর, ‘দেখা যাক সুন্দরী, কে হারে কে জেতে! তবে মনে রেখো, তোমার রঙের সাহেবের উত্তরে আমার হাতের পাঞ্জায় লুকোনো রয়েছে রঙের টেক্কা!’
পরদিন লোলাকে রান্নাঘরে একা পেয়ে সিন্দুকের নম্বরটা এনে দিতে বললাম৷ কারণ ওটা না পেলে সিন্দুকটা কি ধরনের তা বোঝা যাবে না আর সিন্দুক ভাঙতে হলে সেটা জানা বিশেষ প্রয়োজন৷
পরে বেলার দিকে জেনসনের অনুপস্থিতির সুযোগে, ও একটুকরো কাগজা এনে আমার হাতে দিল৷ নম্বরটা দেখেই বুঝলাম, সিন্দুকটা অত্যন্ত পুরোনো মেডেলের৷ বাজারে এখন আর পাওয়াই যায় না৷ এ-ধরনের সিন্দুকগুলোর দরজা বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গেই আপনা থেকে তালা এঁটে যায়, চাবির আর দরকার হয় না৷ বেশির ভাগ লোকই এ-ধরনের চাবি ছাড়া সিন্দুক অপছন্দ করার কোম্পানি এই সিন্দুক তৈরি বন্ধ করে দেয়৷ তার উপর এই সিন্দুকগুলো খুলতে চোর-ছ্যাঁচড়দের খুব একটা কষ্ট করতে হয় না৷
খুশিই হলাম৷ সিন্দুকটা খুলতে আমার বড় জোর দশ মিনিট লাগবে৷ আর সময় যত কম লাগবে, ততই ভালো—পালাবার জন্য সময় কিছু বেশি পাওয়া যাবে৷
বৃহস্পতিবার সকালবেলা—আমি আর জেনসন গ্যারেজে কাজ করছি, হঠাৎ কাজ থামিয়ে ও বলে উঠল, জ্যাক, শনিবার সাতটায় আমাকে ওয়েন্টওয়ার্থে যেতে হবে—একটা মিটিং আছে৷ ফিরতে ফিরতে ধর, একটা-দেড়টা বাজবে৷—লোলা সেদিন রাত্তিরে কাজ করবে বলছিল, তুমি পার তো ওর দিকে একটু লক্ষ্য রেখ, কেমন? বলা তো যায় না, কখন কোন মাতাল ড্রাইভার উল্টোপাল্টা কাজ করে বসে৷’
বুকের ভিতর একটা চাপা দুঃখ অনুভব করলাম৷ জেনসন আমাকে এতখানি বিশ্বাস করে? একবারও ভাবল না, লোলাকে একা পেয়ে আমিও তো কোন মাতাল ড্রাইভারের মতো কাজ করতে পারি!
মুখে আশ্বাস দিলাম, ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, মি. জেনসন, আমি নজর রাখব’খন৷’
জেনসন হাসল, ‘তোমার মতো একজন বিশ্বাসী লোক পেয়ে আমার অনেক সুবিধে হয়েছে, জ্যাক—তোমাকে চিনতে আমি ভুল করিনি৷’
শুক্রবারে আমার ছুটি থাকায় জেনসনের কাজ থেকে ওর গাড়িটা ধার চাইলাম৷ আর চাইলাম একশ ডলার—বললাম, ট্রপিকা স্প্রিংসে কয়েকটা জিনিস কেনার আছে৷ জেনসন একটু অবাক হলেও টাকাটা এনে দিল, আর কিছু উপদেশও দিল, ‘দেখো জ্যাক, ওখানে গিয়ে সাবধানে থেক৷ রাস্তায় ওত-পেতে-থাকা সুন্দরীদের খপ্পরের যেন পড়ো না৷’
হেসে অভয় দিয়ে গাড়িতে স্টার্ট দিলাম৷ দেখি, লোলা হাসিমুখে রেস্তোরাঁর দরজার দাঁড়িয়ে আমাকে লক্ষ্য করছে৷ যদি জানত ওর জন্য আমি কি ফাঁদ পেতেছি হতে হয়তো অমন করে হাসত না৷ জেনসনের কাছ থেকে তখনকার মতো বিদায় নিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে দিলাম৷
ট্রপিকা স্প্রিংসে পৌঁছতে প্রায় ঘণ্টাচারেক লেগে গেল৷ সেখানে পৌঁছে খোঁজ নিলাম, ন্যু-ইয়র্কের ট্রেন-ক-টায় ছাড়ে৷ প্লেনে করে পালানোর মতলব অনেক ভেবেচিন্তেই ত্যাগ করেছি৷ কারণ লোলা পুলিশে আমার পালানোর খবর দেওয়ামাত্রই ওরা ট্রপিকা-স্প্রিংসের এয়ারপোর্টে আমার খোঁজ করবে৷ তা ছাড়া, রাত্রিবেলা কোন প্লেন পাব কিনা, তারও যথেষ্ট সন্দেহ আছে৷ খোঁজ নিয়ে দেখলাম, রাত সাড়ে বারোটায় ন্যু-ইয়র্কে যাবার একটা ট্রেন আছে৷ অতএব চিন্তিত হওয়ার কোন কারণ নেই৷ জেনসন সাতটায় ওয়েন্টওয়ার্থে রওনা হবে৷ আর সাড়ে সাতটার মধ্যে সিন্দুক খুলে লোলাকে ল্যাং মেরে আমিও কেটে পড়ব৷ তাহলে ট্রপিকা স্প্রিংসে পৌঁছে ট্রেন ধরার জন্য আধঘণ্টারও বেশি সময় পাওয়া যাবে৷
কিন্তু এ-ও আমি জানতাম, লোলা পুলিশে খবর দেবার সময় আমার চেহারার বর্ণনা তো দেবেই, সাজ-পোশাকের বিবরণ দিতেও ছাড়বে না৷ সুতরাং ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’ থেকে পালানোর পরই আমাকে ছদ্মবেশ ধরে পুলিশের চোখে ধুলো দিতে হবে৷
তাই ট্রেনের খোঁজখবর নিতে গেলাম একটা দোকানে৷ একটা হালকা বাদামী প্যান্ট আর একটা চাইরঙের কোট কিনলাম৷ কোটের সামনের পকেটদুটো গাঢ় সবুজ রঙের—যাতে বহুদূর থেকে চোখে পড়ে৷ আরও কিনলাম একজোড়া জুতো, বাদামী রঙের একটা টুপি, এক শিশি কলপ ও একটা গগল্স্৷ এই জিনিসগুলো একটা সুটকেস কিনে তাতে ভরে ফেললাম৷ গাড়ির ক্যারিয়ারে স্যুটকেসেটা বন্ধ করে ফিরে চললাম ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’-এ৷
আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা পার হয়ে মরুভূমিতে এসে পড়লাম৷ দূরে বালিয়াড়ির উপর ইতস্তত ছড়ানো ঘন ক্যাকটাসের ঝোপ৷ গাড়ি থামিয়ে ক্যারিয়ার থেকে স্যুটকেসটা বের করে এগিয়ে চললাম ক্যাকটাস-ঝোপের দিকে৷ একটা ঘন ঝোপের ভিতর ওটাকে লুকিয়ে ফেললাম৷ একমাত্র আমি ছাড়া অন্য কারুর পক্ষে এটা খুঁজে বের করা একেবারেই অসম্ভব৷ ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’ ছেড়ে পালাবার পথে এখানে নেমে চেহারা এবং বেশবাস, সব পালটে নেব৷ তারপর ট্রপিকা স্প্রিংস থেকে ট্রেন ধরে সোজা ন্যু-ইয়র্ক৷ লোলা আমার চেহারার বর্ণনা দিলেও পুলিশ আমাকে ছদ্মবেশে চিনতে পারবে না৷
নিশ্চিন্ত মনে আবার গাড়ি ছুটিয়ে দিলাম৷ সত্যিই, যে নিখুঁত প্ল্যান আমি এঁটেছি, তাতে ভুল হওয়ার কোন জো নেই৷ এখন শুধু শনিবারের অপেক্ষা—
ফিরে এসেই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম৷ আমি, জেনসন এবং লোলা—তিনজনেই কাজ করে চললাম যান্ত্রিক ক্ষিপ্রতায়৷ খদ্দেরদের চেঁচামেচিতে রেস্তোরাঁ জমজমাট৷ এইভাবে চলতে চলতে রাত প্রায় এগারোটার সময় রেস্তোরাঁ একেবারে খালি হয়ে গেল৷ শেষ-খদ্দেরটি চলে যাবার পর আমাকে পেট্রল-পাম্পগুলো দেখতে বলে জেনসন শুতে গেল৷ আর, লোলা রান্নাঘরে ঢুকল এঁটো কাপ-প্লেটগুলো ধুয়ে রাখতে৷
একটা সিগারেট ধরিয়ে বাইরে এসে বসলাম৷ কিছুক্ষণ পর লোলা সামনে এসে দাঁড়াল, ‘ট্রপিকা স্প্রিংসে কি করতে গিয়েছিলে?’
‘তাতে আপনার কী দরকার?’ রুক্ষস্বরে জবাব দিলাম৷
লোলা কাঁধ ঝাঁকাল, ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি, ‘না, দরকার কিছু নেই! তুমি শুধু সিন্দুক খুললেই আমি খুশি৷’
‘সে তো বলেইছি খুলব—’ ভুরু কুঁচকে ওর দিকে তাকালাম৷
লোলা বাংলোর দিকে ফিরে চলল, মুখ না ফিরিয়েই জবাব দিল, ‘না খুললে তোমার কপালে অনেক দুঃখ আছে৷’
চেয়ারে হেলান দিয়ে ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’কে আর-একবার ভালো দেখলাম৷ একটা দিন! আর মাত্র একটা দিন! তারপরই এ-জায়গা ছেড়ে আমাকে চিরকালের জন্য চলে যেতে হবে৷ শুধু স্মৃতিটুকু বেঁচে থাকবে মনের পাতায়—শেষে একদিন তাও মুছে যাবে৷ আজই অনুভব করলাম, ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’-কে আমি ভালোবেসে ফেলেছি৷ এ-জায়গা ছেড়ে যেতে আমার মন চাইছে না৷
শনিবার সন্ধ্যা সাতটা৷ গুমটিঘরে সেই পুরোনো মোটরটা নিয়ে কাজ করেছিলাম, পায়ের শব্দে মুখ তুলে তাকালাম৷ সামনেই দাঁড়িয়ে জেনসন৷
‘জ্যাক, আমাকে এখনই যেতে হবে৷ সাতটা বাজে, আর দেরি করা ঠিক হবে না৷ ফিরতে ফিরতে হয়তো দুটোও বেজে যেতে পারে৷ জানই তো, এসব মিটিংয়ের শেষে একটু-আধটু—’ জেনসন চোখ টিপল, বুড়ো আঙুল তুলে মুখে কিছু ঢালার ভঙ্গি করল, ‘দেখো, লোলাকে আবার এসব বল না যেন?’
তার দিকে চেয়ে হাসলাম, ‘না, না—আপনি যান, ঘুরে আসুন৷ আমি আর মিসেস জেনসন ঠিক সামলাতে পারব, কোন অসুবিধে হবে না৷’
জেনসন রেস্তোরাঁর দিকে পা বাড়াল৷ সম্ভবত লোলার কাছ থেকে বিদায় নিতে৷ একটু পরেই সে রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে এসে সোজা গাড়িতে গিয়ে উঠল৷
ঝড়ের বেগে ছুটে চলল জেনসনের মার্কারি৷ যতদূর দেখা গেল চেয়ে রইলাম৷ তারপর একসময় দূরের বালিয়াড়ির আড়ালে গাড়িটা মিলিয়ে গেল৷
যে স্টেশন-ওয়াগনে করে পালাব ঠিক করেছি, সেটার পেট্রল, মোবিল আর-একবার পরীক্ষা করে সন্তুষ্ট মনে পা বাড়ালাম বাংলোর দিকে৷
প্ল্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এইবার শুরু হবে৷ খুলতে হবে সেই অভিশপ্ত সিন্দুক৷ অভিশপ্ত ছাড়া আর কি? এর জন্যই তো আমাকে জেনসনের মতো লোককে বন্ধুত্ব হারাতে হচ্ছে!
লোলা বাংলোর দরজায় দাঁড়িয়ে আমারই অপেক্ষা করছিল৷ উত্তেজনায় উৎকণ্ঠায় ওর মুখমণ্ডল বিবর্ণ৷ কিন্তু চোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল৷ আমাকে দেখেই চাপা স্বরে ও বলে উঠল, ‘তাড়াতাড়ি শুরু কর, কারসন৷’
‘কোথায় আছে সিন্দুকটা?’
‘বসবার ঘরে—সোফার ঠিক পেছনে৷’
‘ঠিক আছে, আপনি বরং পাম্পের কাছে থাকুন৷ বলা যায় না, হয়তো তেল নেবার জন্য কোন ট্রাক-ফাক এসে পড়তে পারে৷ তা ছাড়া, ঘণ্টা দুয়েকের কমে সিন্দুকটা খোলা যাবে বলে তো মনে হয় না৷’
সন্দেহের কুটিল ছায়া নেচে উঠল লোলার সবুজ চোখের তারায়, ‘অতক্ষণ—?
‘আপনাকে তো আগেই বলেছি, এই সিন্দুকগুলো খুব মজবুত হয়৷ তা ছাড়া মি. জেনসনের কাছ থেকে কম্বিনেশনটাও তো যোগাড় করতে পারেননি৷ অতএব তর্ক না করে যা বলছি তাই করুন গিয়ে৷’
বসবার ঘরে গিয়ে সোফাটা সরিয়ে সিন্দুকটাকে এক নজর দেখলাম৷ যা ভেবেছি ঠিক তাই৷ শুধু কম্বিনেশন ঘোরালেই—সিন্দুকটা খুলে যায়—চাবির আর দরকার হয় না৷ লোলো দরজায় দাঁড়িয়ে আমাকে লক্ষ্য করছিল৷ ওকে বললাম, ‘গ্যারেজ থেকে কয়েকটা যন্ত্রপাতি আনতে হবে৷ আপনি বরং রেস্তোরাঁটা বন্ধ করে দিন৷ নয়তো কোন খদ্দের এসে খাওয়ার জন্য চেঁচামেচি শুরু করে দেবে৷’
‘সে আমি আগেই বন্ধ করে দিয়েছি৷’
আর-কোন কথা না বলে, ওকে পাশ কাটিয়ে বাংলো ছেড়ে বেরিয়ে এলাম৷ গ্যারেজ থেকে গোটা কয়েক যন্ত্রপাতি নিয়ে একটা ক্যাম্বিসের ব্যাগে ভরে বাংলোয় ফিরে চললাম৷ টাকাগুলো এই ব্যাগে করে নিয়েই পালাতে হবে৷ হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, একটা পুরোনো ঝরঝরে প্যাকার্ড ধুঁকতে ধুঁকতে এগিয়ে আসছে৷
লোলা বাংলোর দরজা থেকেই গাড়িটাকে দেখতে পেয়ে পাম্পের দিকে এগিয়ে এল৷ ততক্ষণে গাড়িটা পাম্পের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে৷
আর অপেক্ষা না করে বাংলোর দিকে পা বাড়ালাম৷ যাবার আগে নিছক কৌতূহলবশে গাড়িতে বসে-থাকা লোকদুটোর দিকে একপলক তাকালাম—হাজার হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে গেল শরীরের প্রতিটা শিরা-উপশিরায়—পা দুটো মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেল, যেন কেউ আঠা দিয়ে আটকে দিয়েছে মেঝেতে—শুকনো ঠোঁট দুটো জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নেবার চেষ্টা করলাম—
গাড়িতে বসে দুজন পুলিশ! সাদা পোশাকে থাকলেও ওদের চিনতে অসুবিধে হওয়ার কোন কারণ নাই৷ রোদে-পোড়া বিশাল চেহারা, চৌকো চোয়াল, সতর্ক চোখজোড়া বেজীর মতো চঞ্চল৷
আমি তখন ঘামতে শুরু করেছি৷ অসাড় হাত-পা বশে ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করলাম৷ পায়ে পায়ে বাংলোর দিকে এগোলাম, যেন ওদের খেয়ালই করিনি৷
‘অ্যাই—শোন—’ বাজখাঁই গলায় ডেকে উঠল ওদের একজন৷
সঙ্গে সঙ্গে মনে হল ছুট লাগাই৷ দৌড়ে পালানোর একটা দুর্দম ইচ্ছা আমাকে গ্রাস করল৷ কিন্তু অনেক চেষ্টায় অবাধ্য পা দুটোকে সংযত করে আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়ালাম৷
ওরা দুজনেই তখন গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমাকে লক্ষ্য করছে৷
লোলাও বুঝতে পেরেছিল লোকদুটোর আসল পরিচয়৷ দেখলাম, ও ভয়ার্ত চোখে ওদের দিকে চেয়ে আছে৷
ধীরে ধীরে ওদের কাছে এগিয়ে গেলাম৷ কিছুটা ঝুঁকি আমাকে নিতেই হবে৷ নয়তো, দৌড়ে পালাবই বা কোথায়!
‘আমাদের একটা চাকা আসবার পথে ফেঁসে গেছে৷ গাড়ির ক্যারিয়ারে আছে—এই নাও চাবি,’ লোকটা ক্যারিয়ারের চাবিটা আমার হাতে দিল, ‘চটপট সারাবার ব্যবস্থা কর৷ এখনও অনেকটা রাস্তা যেতে হবে, একটা চাকা হাতে রাখা ভালো৷’
ক্যারিয়ার খুলে চাকাটা বের করলাম৷ অপরজন লোলার দিকে তাকাল, আঙুল দিয়ে দেখাল গাড়িটাকে, ‘এটাতে পেট্রল ভরার ব্যবস্থা কর, আর দেখো, খাবার-দাবার কিছু আছে কিনা৷’
চাকাটা গড়িয়ে গড়িয়ে গুমটিঘরের দিকে নিয়ে গেলাম৷ বাঁ হাতে রইল ক্যাম্বিসের ব্যাগটা৷
লোলা দ্বিতীয় জনের কথায় কিছুক্ষণ ইতস্তত করল৷ রেস্তোরাঁ যে বন্ধ, সে কথা বলতে সাহস করল না৷
‘স্যান্ডউইচ হলে চলবে?’ লোলা প্রশ্ন করল৷
‘খুব চলবে৷ কিন্তু তাড়াতাড়ি কর, এমনিতেই আমাদের অনেক দেরি হয়ে যাবে৷’
আটটা দশের সময় হতচ্ছাড়া পুলিশ দুটোর হাত থেকে রেহাই পেলাম৷ যদি ওরা না আসত, তবে এতক্ষণে স্টেশন-ওয়াগন নিয়ে কোথায় চলে যেতাম! মনে হচ্ছে, ন্যু-ইয়র্ক যাবার ট্রেন বোধ হয় আর ধরা হল না!
শেষ পর্যন্ত তাই হল৷ গাড়ির পর গাড়ি আসতে লাগল৷ খদ্দেরের আর বিরাম নেই৷ অবশেষে বাধ্য হয়ে রেস্তোরাঁ খুলতে হল৷ আমি আর লোলা অক্লান্ত ভাবে খেটে চললাম—
রাত প্রায় দশটার সময় নিশ্বাস ফেলার একটু সুযোগ পেলাম৷ এই গরমে এত পরিশ্রম করে নিজেকে খুব ক্লান্ত মনে হল৷ আজকের গরমটা যেন অন্যদিনের চেয়েও বেশি লাগছে৷ ঘামে সর্বাঙ্গ ভিজে গেছে৷ সামনে এঁটো কাপ-প্লেটের স্তূপ৷ পাশেই দাঁড়িয়ে লোলা৷
‘আমি এগুলো ধুয়ে রাখছি, তুমি সিন্দুক খোল গিয়ে৷’
‘আজ আর হবে না, মিসেস জেনসন, অনেক দেরি হয়ে গেছে৷ আমাদের পরে অন্য একটা দিন ঠিক করতে হবে৷’
লোলা আগুন-ঝরা চোখে আমার দিকে তাকাল, ‘আশা করি আমার কথাটা তোমার কানে গেছে, কারসন৷’
‘আর ঘণ্টা চারেকের মধ্যেই তো মি. জেনসন ফিরে আসবেন, তাহলে পালাবার সময়টা আমি পাব কখন?’
লোলা কোন জবাব না দিয়ে রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল৷ ওকে অনুসরণ করলাম৷ ও সোজা এগিয়ে গেল দেওয়ালে লাগানো টেলিফোনের দিকে, ‘সিন্দুক খুলবে, না পুলিশে ফোন করব?’
‘আপনি বলেছিলেন, আমাকে চবিবশ ঘণ্টা পালাবার সময় দেবেন—’
‘সে-সময় তুমি ঠিকই পাবে৷ কাল সকাল আটটার আগে কার্ল কিছুই জানতে পারবে না—তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পার৷’ লোলা হাত বাড়িয়ে রিসিভারটা তুলে নিল, ‘এখনও ভেবে দেখ, কী করবে৷’
বুঝলাম, ও মিথ্যে ভয় দেখাচ্ছে না৷ সুতরাং আর দ্বিরুক্তি না করে গ্যারেজে গেলামে৷ যন্ত্রপাতির ব্যাগটা নিয়ে আবার ফিরে চললাম বাংলোর দিকে৷
এখন দশটা বেজে দশ মিনিট৷ অর্থাৎ তিনটের আগে ট্রপিকা স্প্রিংসে পৌঁছনো অসম্ভব৷ সেখানে গিয়ে প্রথমেই আমাকে স্টেশন-ওয়াগনটার ব্যবস্থা করতে হবে৷ কারণ, জেনসন পুলিশকে যখনই জানাবে আমি স্টেশন-ওয়াগনে করে পালিয়েছি, ওরা ট্রপিকা স্প্রিংসে এসে আগে ওটারই খোঁজ করবে৷ তারপর আমাকে অপেক্ষা করতে হবে ট্রেনের জন্য৷ ভাগ্য সহায় থাকলে হয়তো পুলিশের চোখে ধুলো দিতে পারব৷
বসবার ঘরে গিয়ে প্রথমেই আলো জ্বেলে দিলাম৷ তারপর যন্ত্রপাতি নিয়ে সিন্দুকের কাছে হাঁটু গেড়ে বসলাম৷
নম্বর-বসানো চাকতিটা একটু একটু করে ঘোরাতে শুরু করলাম৷ ঝুঁকে পড়ে কাপ চেপে রইলাম সিন্দুকের ইস্পাতের দরজায়৷ একটু পরেই ‘খুট’ করে একটা শব্দ হল৷ অর্থাৎ, প্রথম নম্বরটা মিলে গেছে৷ সিন্দুক সম্বন্ধে যাদের অভিজ্ঞতা আছে, তারা এই সামান্য শব্দ শুনেই বুঝতে পারে নম্বরটা ঠিকমতো মিলেছে কিনা৷ এবার দ্বিতীয় সারির চাকতি নিয়ে পড়লাম৷
মিনিট দশেক পর হাতল টেনে সিন্দুকের দরজা খুলে ফেললাম৷ চোখের সামনে থাকে থাকে সাজানো এক-শ ডলার নোটের বান্ডিল৷ এক লাখ ডলার—জেনসনের সারা জীবনের সঞ্চয়!
ক্যাম্বিসের ব্যাগটা টেনে নিয়ে নোটের বান্ডিলের দিকে হাত বাড়ালাম৷
‘এ কি! জ্যাক!! তুমি এখানে কী করছ!!!’
একটা উত্তপ্ত ইস্পাতের ফলা যেন আমার বুকটাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল—সেকেন্ড দুয়েক নিশ্চল হয়ে বসে রইলাম—একটা হাত নোটের বান্ডিলের উপর স্থির—সময়ের তরঙ্গ থেমে রইল এই একটি বিশেষ মুহূর্তে৷ আস্তে আস্তে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম৷
দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে জেনসন, চোখদুটো যেন লাফিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে৷
আমি তখন অসাড় হয়ে গেছি৷ ফ্যালফ্যাল করে জেনসনের বিশাল চেহারার দিকে চেয়ে রইলাম৷ জেনসন ভারী পা ফেলে ঘরের ভিতর এসে দাঁড়াল, ‘জ্যাক! এ তুমি করছ কী?’ সমস্ত যন্ত্রণা, হতাশা ঝরে পড়ল তার কণ্ঠে৷ লজ্জায় ঘৃণায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করল৷ জেনসনের বিশ্বাসের স্বর্গ আমি নিষ্ঠুরভাবে পায়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছি৷
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম, ‘আমি অত্যন্ত দুঃখিত, মি. জেনসন৷ আপনি হয়তো ভাবছেন, আমি আপনার টাকা চুরি করছে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তা নয়৷ যদিও জানি, একথা বিশ্বাস করা আপনার পক্ষে খুব কঠিন, তবু দয়া করে আমাকে ভুল বুঝবেন না৷’
এমন সময় ঘরের দরজায় লোলা এসে দাঁড়াল৷ ওর মুখ মড়ার মতো সাদা, সারা শরীর উত্তেজনায় কাঁপছে৷ জেনসনকে দেখেই তীক্ষ্ণস্বরে ও চেঁচিয়ে উঠল, ‘কী হয়েছে, কার্ল?—একি? ও সিন্দুক খুলছে? আমি আগেই জানতাম৷ তোমাকে বারবার সাবধান করেছি—অচেনা লোককে কখনও বিশ্বাস করো না৷ এখন দেখছ তো! আমি রান্নাঘরে ছিলাম, আর এদিকে—’
লোলার কথাগুলো জেনসনের কানে ঢুকল বলে মনে হল না৷ সে তখন একইভাবে আমার দিকে চেয়ে আছে, ‘জ্যাক! তুমি—তুমি এভাবে—’ তার অর্ধসমাপ্ত কথাগুলো চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল আমার বিবেকের উপর৷
‘কিন্তু মি. জেন—’
‘এরপরেও কি তোমার বলার কিছু আছে?’
‘হ্যাঁ, আছে৷ আমার নাম জ্যাক প্যাটমোর নয়, শেট কারসন৷ দেড় মাস আগে আমিই ফার্নওয়ার্থ থেকে পালিয়ে এসেছি৷’
জেনসনের চওড়া কপালে ভাঁজ পড়ল৷ সে এগিয়ে গিয়ে একটা সোফায় বসল, ‘ও, তুমিই তাহলে কারসন কাগজে দেখেছিলাম বটে৷’
‘হ্যাঁ, ঠিকই দেখেছেন৷ একটা কাগজে আমার ছবি দেখে মিসেস জেনসন আমাকে চিনতে পারেন, এবং আমি যদি আপনার সিন্দুক না খুলি, তবে পুলিশে ধরিয়ে দেবেন বলে ভয় দেখান৷’
‘চোর, মিথ্যেবাদী কোথাকার!’ লোলা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘কার্ল! তুমি এই লোকটার কথায় কান দিও না৷ নিজেকে বাঁচাবার জন্য ও মিথ্যে কথা বলছে! আমি এখনই পুলিশে ফোন করছি৷’
জেনসন ধীরে ধীরে মুখ ফেরাল লোলার দিকে, ‘তুমি এর মধ্যে নাক গলাতে এস না, লোলা৷ পুলিশ ডাকব কি না ডাকব, সেটা আমিই বুঝব৷’
লোলা দেওয়ালে হেলান দিয়ে গোখরো সাপের মতো ফুঁসতে লাগল৷ ওর সবুজ চোখের তারায় ভয়ার্ত সতর্ক দৃষ্টি৷
জেনসন এবার আমার দিকে তাকাল, ‘তারপর?’
একে একে সমস্ত জানালাম৷ টাকাটা যে তাকে ফেরত পাঠিয়ে দিতাম, তা-ও বললাম৷
জেনসন অপলক চোখে আমার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল৷ আমিও স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম তার চোখের তারায়৷
তারপর একসময় সে চোখ ফেরাল লোলার দিকে৷ তার অনুসন্ধানী তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে লোলা যেন কুঁকড়ে গেল৷
‘লোলা, তুমি বলছ, জ্যাক মিথ্যে কথা বলেছে?’
‘নিশ্চয়ই!’ লোলা চোখ সরিয়ে নিল৷
‘তাহলে আমার দিকে তাকাও!’
কিন্তু লোলা পারল না৷ বারবার ও চেষ্টা করল, কিন্তু প্রতিবারই জেনসনের অন্তর্ভেদী দৃষ্টির সামনে ও হেরে গেল৷ জেনসনের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিতে বাধ্য হল৷
আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল জেনসন৷ এই কয়েক মিনিটেই তার বয়স যেন অনে-ক বেড়ে গেছে৷ শালপ্রাংশু চেহারা যেন বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে৷
‘শুয়ে যাও, লোলা,’ থমথমে গলায় জেনসন বলল, ‘এ ব্যাপার নিয়ে কাল আলোচনা করা যাবে৷ আজ আর তোমাকে রাত জাগতে হবে না, আমিই থাকব৷ যাও শুয়ে পড় গিয়ে৷’
‘কিন্তু এ-লোকটার কী হবে? তুমি কি ওকে পুলিশে দেবে না? আমি এখনি ফোন করছি৷’
জেনসন পায়ে পায়ে লোলার কাছ এগিয়ে গেল, ওর হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান মারল, ‘শুতে যাও! ফোন করার ব্যাপারটা আমিই ভাবব৷’
ঘর থেকে এক ধাক্কায় ওকে বের করে দিয়ে জেনসন ফিরে এসে সোফায় বসল৷
তখনও আমি খোলা সিন্দুকের কাছে দাঁড়িয়ে আছি৷
‘কী অদ্ভুত ব্যাপার দেখ, জ্যাক! আমাদের সভাপতি হঠাৎ হার্টফেল করায় মিটিং মাঝপথেই ভেঙে গেল৷ আশ্চর্য! কোথায় একজন মারা গেল, আর তার জন্য আমি আবিষ্কার করলাম, আমার বউ একটি বাজারের-মেয়ে৷’ জেনসন আপন মনেই মাথা নাড়ল৷
তার কথায় চমকে উঠলাম, ‘তার মানে—আপনি আমার কথা বিশ্বাস করেছেন?’
জেনসন হাঁটুতে হাত ঘষে চোখ তুলে তাকাল৷ একটা বিষণ্ণ বেদনার ছায়া ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে৷ চোখের মণির উপর অশ্রুর আস্তরণ৷ সে মৃদুস্বরে বলল, ‘জ্যাক, তোমাকে আগেই বলেছিলাম, লোক চিনতে আমি ভুল করি না৷ কিন্তু স্ত্রীলোকের ব্যাপারে আমি যে সম্পূর্ণ অজ্ঞ, তা এখন বুঝতে পারছি৷’
‘আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ, মি. জেনসন৷ বুঝতেই তো পারছেন, এ ছাড়া আমার আর-কোন উপায় ছিল না৷’ অনেকক্ষণ বাদে বুকভরে শ্বাস নিলাম৷ মনটা যেন অনেক হালকা হল৷
জেনসন খোলা সিন্দুকের দিকে এক পলক দেখে কাঁধ ঝাঁকাল, ‘কিন্তু তোমাকে এ-জায়গা ছেড়ে চলে যেতে হবে, জ্যাক৷ এখানে থাকাটা তোমার পক্ষে আর নিরাপদ নয়৷ লোলা তোমার কথা পুলিশে জানাবেই—এ-বিষয়ে তুমি নিশ্চিত থেকো৷’
‘আপনি ঠিকই বলেছেন৷’
‘তোমাকে কিছু টাকা দিচ্ছি৷ স্টেশন-ওয়াগনটা নিয়ে এখনি বেরিয়ে পড়, নয়তো বিপদে পড়বে৷ লোলাকে বিশ্বাস নেই, কে জানে এর মধ্যেই হয়তো—তা কোথায় যাবে ঠিক করেছ?’
‘ন্যু-ইয়র্ক৷ যেখানে পৌঁছতে পারলে, পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়া সহজ হবে৷’
‘তাহলে এক কাজ কর তোমাকে তিরিশ হাজার ডলার দিচ্ছি, সেখানে গিয়ে যা-হোক একটা ব্যবসা শুরু করতে পারবে—ভালোই হবে৷’
মাথাটা কেমন টলে উঠল৷ আমি কি ভুল শুনছি৷ তি-রি-শ হা-জা-র ডলার! ওই তো জেনসন এখনও হাসছে, কিন্তু বড় বিষণ্ণ সে-হাসি৷ আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে যেতেই আমি উন্মাদের মতো চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘না, মি. জেনসন, না! এ টাকা আমি নিতে পারব না, কিছুতেই না!—ভাববেন না, আমি অকৃতজ্ঞ৷ কিন্তু এত টাকা নেবার জন্য দয়া করে আমাকে অনুরোধ করবেন না৷’
‘জ্যাক, আমি যখন বলেছি, এ-টাকা তোমাকে নিতেই হবে৷ পৃথিবীভ্রমণের শখ আমার মিটে গেছে৷ সুতরাং এ-টাকা দিয়ে আমি কি করব? কিন্তু তোমার এখন টাকার প্রয়োজন, তাই তোমাকে দিচ্ছি৷ আর একটা কথা মনে রেখ, জ্যাক, তোমাকে আগে যেমন ভালোবাসতাম, এখনও তেমনি বাসি৷’ জেনসনের চোখের কোণে চিকচিক করছে দু-ফোঁটা অশ্রু৷ সে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল, ‘তোমার মতো লোককে ভুলে যাওয়া আমার পক্ষে সহজ হবে না৷’
ঠিক তখনই লোলাকে দেখলাম৷ ও দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে৷ পরনে একটা সবুজ পোশাক৷ মুখ শুকনো পাতার মতো বিবর্ণ, চোখদুটো বেড়ালের মতো জ্বলছে৷ আর—
—আর, ওর হাতের মুঠোয় রয়েছে একটা .৪৫ রিভলভার৷ তার নিকষ কালো নলটা যেন নরকের দরজার চাবিকাঠি৷
