গল্প
উপন্যাস

শুধু যাওয়া আসা – ১

এক

এগারোটা বাজতে মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি, হাতের কাগজপত্তর সব গুছিয়ে অফিস থেকে কেটে পড়ার তাল করছি, এমন সময় বেরসিকের মতো বেজে উঠল টেলিফোনটা৷ আর যদি মিনিট পাঁচেক পরেও ফোনটা আসত, তবে ওটা ধরার জন্য আমার মাথাব্যথা থাকত না৷

আমি লরেন্স সেফস্ কর্পোরেশনের নৈশ-বিভাগের কর্মচারী৷ রাত এগারোটা বাজলেই আমার ছুটি, অর্থাৎ ডিউটি শেষ হতে এখনও পাঁচ মিনিট বাকি৷ তা ছাড়া, নৈশ-টেলিফোনটা একটা টেপরেকর্ডারে যোগ করা থাকে, ফোন বাজতে আরম্ভ করার সঙ্গে সঙ্গেই স্বয়ংক্রিয়-রেকডিং শুরু হয়ে যায়, সুতরাং না ধরলেই নয়৷

‘মালিকের শ্যেনচক্ষু সবসময় তোমাকে লক্ষ্য করছে’—এ কথাটা যাতে আমাদের অর্থাৎ কর্মচারীদের মনে থাকে, তার জন্যই এই অদ্ভুত রেকর্ডিং-এর ব্যবস্থা৷ কাজে একটু ফাঁকি দেবার জো নেই৷

অনিচ্ছাসত্ত্বেও এগিয়ে গিয়ে রিসিভার তুলে নিলাম, ‘লরেন্স সেফস্ কর্পোরেশন—নৈশ-বিভাগ৷’

‘কি, ব্যাপার কি! অফিসসুদ্ধ, ঘুমোচ্ছে নাকি সবাই?—ফোন ধরতে এত দেরি হয় কেন?’ টেলিফোনে ঝংকৃত হল বিরক্ত উদ্ধত কণ্ঠস্বর৷ নিঃসন্দেহে কোন লাখপতির৷

‘আপনি কে কথা বলছেন?—’

‘হেনরি কুপার, অ্যাশলি আর্মস থেকে বলছি৷ চটপট একজন লোক আমার এখানে পাঠিয়ে দিন৷ সিন্দুকটা নিয়ে বড্ড অসুবিধেয় পড়েছি৷’

বুঝলাম, আজ রাতে জ্যানিকে সঙ্গে নিয়ে বেরোবার যে প্রোগ্রাম করেছি, তার বারোটা বেজে গেল৷ আর এ নিয়ে, এই এক মাসে তিন-তিনবার ওর সঙ্গে কথার খেলাপ করতে হল৷ রাগে বিরক্তিতে মেজাজ খিঁচড়ে উঠল৷ একটা অপ্রিয় কথা বলতে গিয়েও টেপটার কথা মনে রেখে জিভকে সংযত করলাম৷

একবার এই টেপের কথা খেয়াল না থাকায় একজন খদ্দেরকে খেঁকিয়ে উঠেছিলাম৷ তার জন্য পরদিন ‘বস’ আমাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন৷ তাই এবারে আর সে ভুলটা করলাম না৷ গলার স্বর যতটা সম্ভব মোলায়েম করলাম, ‘সিন্দুকটা নিয়ে কি অসুবিধেয় পড়েছেন যদি বলেন—’

‘সিন্দুকের চাবিটা আমি হারিয়ে ফেলেছি৷ শীগগিরই লোক পাঠাবার ব্যবস্থা করুন৷’ সশব্দে রিসিভার নামিয়ে রাখার শব্দ হল৷ আমিও ঠকাস করে নামিয়ে রাখলাম রিসিভারটা৷ যাঃ-শা-লা—

জ্যানিকে কথা দিয়েছিলাম, ওকে সোয়া এগোরোটার সময় ওর বাড়ির কাছ থেকে তুলে নেব৷ তারপর দুজনে মিলে একটা নতুন ক্লাবে যাব নাচবার জন্য৷ এতক্ষণে ও হয়ত সেজেগুজে আমার জন্য অপেক্ষা করছে৷

শহরের একেবারে অপর প্রান্তে একটি প্রকাণ্ড ফ্ল্যাটবাড়ি—অ্যাশলি আর্মস৷ শহরের নাম-ডাকওয়ালা ধনী মহাজনদের বসবাস এই বাড়িটিতে৷ ওখানে গিয়ে, ওই হতচ্ছাড়া সিন্দুক খুলে, ফিরে এসে বাস ধরে জ্যানির বাড়ি যেতে যেতে সাড়ে বারোটা বেজে যাবে৷ আর জ্যানি ততক্ষণে আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে বলে মনেও হয় না৷ ও আমাকে বলেছিল, আর কোনদিন যদি এভাবে কথার খেলাপ করি, তবে ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কের সেইখানেই ইতি৷

ভাবলাম, অফিস থেকেই জ্যানিকে একটা ফোন করি৷ কিন্তু ব্যক্তিগত ব্যাপারে অফিসের ফোন ব্যবহার করা নিষিদ্ধ৷ সুতরাং সামনের রাস্তায় কিছুটা এগিয়ে যে ফোন-ঘরটা আছে, সেখান থেকেই ফোন করতে হবে জ্যানিকে৷

অগত্যা যন্ত্রপাতির ব্যাগটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম৷ অফিস বন্ধ করে যখন গ্যারেজ থেকে অফিসের ট্রাক বের করছি, বাইরে তখন ঝিরঝির বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে৷ বর্ষাতি না আনার জন্য নিজেকে ধিক্কার দিলাম৷

ফোন-ঘরের কাছে পৌঁছেই দেখি মহা বিপদ! গাড়ি দাঁড় করাবার মতো একটু জায়গাও খালি নেই৷ গোটা রাস্তাটাই গাড়িতে গিজগিজ করছে৷ গাড়ি রাখবার আশায় এ-রাস্তা ও-রাস্তা ঘোরাঘুরি করতে শুরু করলাম৷ প্রায় দশ মিনিট বাদে একটা গাড়ি তার জায়গা ছেড়ে বেরোতেই, গোটা কয়েক গাড়িকে রেসে হারিয়ে ট্রাকটা সেইখানে দাঁড় করালাম৷ তারপর রাস্তা পার হয়ে এগিয়ে চললাম ফোনঘরের দিকে৷

জ্যানির ফোন-নাম্বার ডায়াল করে হাতঘড়ির দিকে তাকালাম৷ এগারোটা কুড়ি৷ ফোন বাজামাত্রই ওপ্রান্ত থেকে জ্যানির কণ্ঠস্বর ভেসে এল৷ ও যেন সারা সন্ধে বসে আমার ফোনটারই অপেক্ষা করছিল৷

আমি যে কেন যেতে পারছি না, সেকথা ওকে ভালো করে বুঝিয়ে বলবার আগেই ও রাগে ফেটে পড়ল, ‘তুমি না এলে না আসবে, কোন ক্ষতি নেই৷ আমি আর একজনকে চিনি, যাকে সিন্দুক সারাতে যেতে হচ্ছে না৷ শেট, আমি গতবারই সাবধান করে দিয়েছিলাম৷ রোজ রোজ তোমার এই কথার খেলাপ আমি আর বরদাস্ত করতে পারছি না৷ তোমাকে বলেছিলাম, পরের বারই শেষ বার—অর্থাৎ এটাই!’

‘কিন্তু—জ্যানি, আমার—আর কোন—৷’ আমি আবার রিসিভারের সঙ্গে কথা বলছিলাম৷ জ্যানি অনেকক্ষণ আগেই লাইন কেটে দিয়েছে৷ ওকে আবার ফোন করলাম৷ কিন্তু ফোন বেজেই চলল, কেউ ধরল না৷ মিনিট দুয়েক অপেক্ষা করে নামিয়ে রাখলাম৷ ফোন-ঘর ছেড়ে শ্লথ পায়ে এগিয়ে চললাম ট্রাকের দিকে৷

এদিকে তখন তোড়ে বৃষ্টি নেমেছে৷ অঝোর ধারায় ঝরে চলেছে বড় বড় জলের ফোঁটা৷ অবসাদে ভরা মনে ট্রাক ছুটিয়ে চললাম অ্যাশলি আর্মসের দিকে৷ মনে মনে লরেন্স সেফস্ কর্পোরেশনকে আর হেনরি কুপারকে যথেচ্ছ খিস্তি করলাম৷ শালার একটা সময়জ্ঞান পর্যন্ত নেই! অফিসে ফিরে, সেখান থেকে বাড়িতে আমাকে হেঁটেই যেতে হবে৷ এসব জেনেও কেন যে বর্ষাতিটা আনলাম না৷

শহরের অভিজাত অঞ্চলে বিশাল জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ‘অ্যাশলি আর্মস’৷ ট্রাক থেকে নেমে বৃষ্টির মধ্যেই বাড়িটার দিকে পা বাড়ালাম৷

দালান ধরে সোজা এগোলাম দ্বাররক্ষীর ঘরের দিকে৷ তার কাছ থেকেই জানা গেল, মি. কুপার চারতলায় থাকেন৷

লিফটে চারতলায় পৌঁছে, ফ্ল্যাটের বেল বাজালাম৷ দরজা খুললেন স্বয়ং হেনরি কুপার৷ লম্বা, বিশাল চেহারার পুরুষ৷ ভাবভঙ্গিতে ঔদ্ধত্যের প্রকাশ সুস্পষ্ট৷ অতিরিক্ত মদ্যপানের প্রভাবে মুখে ঈষৎ নীলচে আভা৷ তার স্ফীত উদর ভোজনবিলাসের সাক্ষ্য বহন করছে৷ আমি ঘরে ঢোকামাত্রই বাজখাঁই গলায় ফেটে পড়লেন, ‘এই সামান্য রাস্তা আসতে তোমার এতক্ষণ লাগল?’

বৃষ্টিতে রাস্তায় যে প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে আসতে হয়েছে, সেকথা জানিয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা চাইলাম৷ তিনি সেকথা গায়েই মাখলেন না৷ আপন মনেই গজগজ করতে করতে বসবার ঘরের দিকে এগোলেন৷ আমিও তাঁকে অনুসরণ করলাম৷ শৌখিনভাবে সাজানো ঘরের সর্বত্রই আভিজাত্যের ছাপ৷

কুপার দ্রুতপায়ে দেওয়ালে টাঙানো একটা অয়েল-পেন্টিং-এর দিকে এগিয়ে গেলেন৷ ছবিটা জনৈক স্থূলকায় মহিলার নগ্‌গ্ন-মূর্তি৷ দেখে রুবেনস-এর আঁকা মনে হলেও সম্ভবত নকল৷ ছবিটাকে একপাশে সরিয়ে ধরতেই চোখে পড়ল, আমাদের কোম্পানির তৈরি একটা সুপার-ডি-লাক্স দেয়াল-সিন্দুক৷

যন্ত্রপাতির ব্যাগটা মেঝেতে নামিয়ে রাখার সময় লক্ষ্য করলাম, পাশের লম্বা সোফাতে একটি মেয়ে শুয়ে আছে৷ পরনে সাদা সান্ধ্য পোশাক৷ পোশাকের গলার কাছটা এত বেশি উন্মুক্ত যে মেয়েটির উদ্ধত গোলাপী স্তনের ঊধর্বাংশ সহজেই নজরে পড়ছে৷ মেয়েটি একটি ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাচ্ছিল৷ মাদকতায় পরিপূর্ণ রক্তিম ঠোঁটের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট৷ চোখ তুলে কৌতূহলী দৃষ্টিতে ও আমার দিকে তাকাল৷

মেয়েটিকে দেখে আমার মনে পড়ল জ্যানির কথা৷ কারণ ওর চুলের রং ও পায়ের সুন্দর গড়ন অনেকটা জ্যানিরই মতো৷ কিন্তু এই মেয়েটির মধ্যে এমন একটা আভিজাত্যের ছাপ লক্ষ্য করলাম, যা জ্যানির মধ্যে নেই৷ মানছি, জ্যানির দৈহিক গঠন চঞ্চল করে তোলে দেহের প্রতিটি রক্তকণিকা৷ ওর ব্যক্তিত্ব, ভারী নিতম্বের ছন্দোময় হিল্লোল পুরুষের হৃদয়ে তোলে তুমুল ঝঞ্ঝা৷ রাস্তার লোকে স্তব্ধ বিস্ময়ে চেয়ে থাকে জ্যানির গমনপথের দিকে৷ সবই মানলাম, কিন্তু সেটা সম্পূর্ণই নিছক সস্তা চটক৷

এই মেয়েটির মধ্যে সেরকম কিছু নজরে পড়ল না৷

‘এটা খুলতে তোমার কতক্ষণ লাগবে? আমার হাতে একদম সময় নেই?’ কুপারের বাজখাঁই গলায় আমার চমক ভাঙল৷

প্রায় একরকম জোর করেই মেয়েটির দিক থেকে চোখ সরিয়ে সিন্দুকের কাছে এগিয়ে গেলাম, ‘কম্বিনেশনটা পেলে বেশিক্ষণ লাগবে বলে মনে হচ্ছে না—৷’

একটুকরো কাগজে কম্বিনেশনটা খসখস করে লিখে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন তিনি৷ তারপর সোজা এগিয়ে গেলেন বিপরীত দিকের দেওয়ালে গাঁথা ছোট একটা কাঠের আলমারির কাছে৷ পাল্লা সরাতেই চোখে পড়ল ভিতরের তাকে সাজানো সারি সারি মদের বোতল৷ একটা গেলাস টেনে নিয়ে নিজের জন্য হুইস্কি আর সোডা মেশাতে লাগলেন কুপার৷

যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করতে শুরু করেছি, এমন সময় পাশের কোন ঘর থেকে টেলিফোনের শব্দ ভেসে এল৷ ক্রি—রি—রি—রিং—রি—রি—রিং—

‘মনে হয় জ্যাক ফোন করছে,’ মেয়েটিকে লক্ষ্য করে কুপার বললেন৷ এবং দরজা খোলা রেখেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন৷

কুপার বেরিয়ে যেতেই মেয়েটি চাপা স্বরে হিসহিস করে উঠল, ‘চটপট হাত চালাও, চাঁদ৷ ব্যাটা বুড়ো আজ একটা মুক্তোর নেকলেস কিনে দেবে বলেছে৷ ভয় হচ্ছে, এর মধ্যে বুড়ো আবার মত না পাল্টে ফেলে!’

আমি অবাক হয়ে, হাঁ করে চেয়ে রইলাম৷ মেয়েটির কাছ থেকে এ-ধরনের কথা আশা করিনি৷ ও সোজাসুজি আমার চোখের দিকে তাকিয়েছিল৷ ওর চোখজোড়ায় সাপের চাউনি৷ জ্যানি যখন আমার কাছ থেকে কোন দামী উপহার আদায়ের চেষ্টা করত, তখন ওর চোখও ঠিক একই চাউনি লক্ষ্য করেছি৷

‘মিনিট তিনেকের বেশি লাগবে না, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন৷’ হেসে ওকে আশ্বাস দিলাম৷

তিনি মিনিটের কিছু কম সময়ের মধ্যেই সিন্দুকটা খুলে ফেললাম৷

‘হুঁঃ, ভারি তো একটা সিন্দুক! এ তো একটা বাচ্চা ছেলেও খুলতে পারে!’ মেয়েটির গলায় তাচ্ছিল্যের সুর৷

কিন্তু আমার চোখ তখন লেহন করে বেড়াচ্ছিল সিন্দুকের ভিতরটা৷ তিনটে তাকেই থরে থরে সাজানো একশ ডলার নোটের বান্ডিল৷ একসঙ্গে এত টাকা আমি জীবনে কোনদিন দেখিনি৷ সব মিলিয়ে ঠিক কত হবে তা আন্দাজ করতে না পারলেও, পাঁচ লাখ ডলালের কম হবে না, সেটা বুঝতে পারলাম৷

মেয়েটি সোফা ছেড়ে, ক্ষিপ্র পায়ে সিন্দুকের সামনে এসে দাঁড়াল—ঠিক আমার পাশে৷ ওর গা থেকে সেন্টের একটা উগ্র মিষ্টি গন্ধ এসে ঝাপটা মারল আমার নাকে৷ ও আমার এত কাছে এসে দাঁড়িয়েছে যে ওর বাহুর স্পর্শ অনুভব করলাম৷

‘উফ্, এত টাকা! এ যে আলাদিনের রত্নগুহা!’ চাপা উত্তেজনায় আমার হাত খামচে ধরল মেয়েটি৷ তারপর হাত ছেড়ে আমার চোখে চোখ রাখল, ‘আচ্ছা, আমরা দুজনেই যদি একটা খালি করার ব্যবস্থা করি, তাহলে কি রকম হয়?’

পাশের ঘরে রিসিভার নামিয়ে রাখার শব্দ শুনতে পেলাম—টুং—৷ বুঝলাম কুপারের কথা বলা শেষ হয়েছে৷

‘এই রে, বুড়ো আসছে!’ ও চটপট ফিরে গেল সোফার কাছে৷

আমিও সিন্দুকের দরজাটা বন্ধ করে দিলাম, সঙ্গে সঙ্গেই কুপার এসে ঘরে প্রবেশ করলেন৷

‘কী হল? এখনও ওটা খুলতে পারনি?’ খেঁকিয়ে উঠলেন তিনি৷

‘এক সেকেন্ড, স্যর,’ লকটা সরিয়ে দিলাম, ‘এই তো খুলে গেছে৷’

কুপার এগিয়ে এসে হাতল ঘুরিয়ে সিন্দুকের দরজাটা ইঞ্চি কয়েক ফাঁক করলেন, ‘হুম—৷ তুমি বরং একটা নকল-চাবির ব্যবস্থা করে দিও—যত তাড়াতাড়ি সম্ভব৷’

‘আচ্ছা, স্যর৷’ সম্মতি জানিয়ে ঘাড় নাড়লাম৷ অতঃপর যন্ত্রপাতি গুছিয়ে নিয়ে এগোলাম দরজার দিকে৷

বেরোবার পথে সোফাতে-বসে থাকা মেয়েটিকে শুভরাত্রি জানালাম৷ প্রত্যুত্তরে ও ঘাড় হেলাল৷ দরজার কাছ অবধি পৌঁছে কুপার দুটো এক ডলারের নোট আমার দিকে এগিয়ে দিলেন৷ নোট দুটো নেবার সময় তাঁর মুখের ভাবে পরিষ্কার বুঝতে পারলাম অনিচ্ছাসত্ত্বেও তিনি টাকাটা আমাকে দিচ্ছেন৷

শেষে বললেন, ভবিষ্যতে আবার যদি কখনও তাঁর আমাকে দরকার পড়ে, তবে যেন এবারের মতো এত দেরি না করি৷ আর নকল-চাবিটার কথা বারবার মনে করিয়ে দিলেন৷

ট্রাক চালিয়ে ফিরে চললাম অফিসে৷ কুপারের টাকায় ঠাসা সিন্দুকটা চোখের সামনে ভাসতে লাগল—ইস্, যদি ওই টাকাগুলো আমার হত—কীভাবে খরচ করতাম—

অফিসের মাইনেতে আমি কোনদিনই সন্তুষ্ট নই, আমি নিরুপায়৷ জানি, ওই মাইনেতে আমাকে চিরকাল এই একই ভাবে কাঁটাতে হবে, ভবিষ্যৎ বলে কোন বস্তু আমার জীবনে নেই৷

‘আচ্ছা! ইচ্ছে করলে কুপারের ফ্ল্যাটে ঢুকে কত নির্ঝঞ্ঝাটেই না হাতানো যায় ওই টাকাগুলো! ভারি তো সিন্দুক! হুঁ,—সিগারেটের কৌটো খোলার মতন টুক্ করে খুলে ফেলব—!’

বারবার মনকে বুঝালাম, এসব চিন্তা পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়৷ কিন্তু তবুও মন থেকে ওটাকে মুছে ফেলতে পারলাম না৷

পরদিন রাতে ডিউটি বদলের সময় রয় ট্রেসি এল আমার জায়গায়৷ তখনও কিন্তু ওই সর্বনাশা চিন্তা উঁকি মারছে আমার মনের কোনায়৷

রয়কে আমি অনেকদিন ধরেই জানি৷ ছোটবেলায় আমরা একসঙ্গে সুকলে পড়েছি৷ ওকে এই সিন্দুক-কোম্পানির চাকরিতে ঢুকিয়েছিল ওর বাবা, আর ওই একই দিনে আমার বাবাও, আমার ভবিষ্যতের গাঁটছড়া এই হতচ্ছাড়া কোম্পানির সঙ্গে বাঁধবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—দুর্ভাগ্য আর কাকে বলে!

এমনিতে আমার সঙ্গে রয়ের চেহারার অনেকখানি মিল আছে৷ রয় লম্বা চেহারার শক্তসমর্থ পুরুষ৷ গায়ের রং বাদামী৷ ঠোঁটের উপর সরু টানা গোঁফ থাকায় মুখে একটা ইতালীর আদল ফুটে উঠেছে৷ এছাড়া দুজনের মধ্যে আর যে মিল, তা হল অসীম অর্থলিপ্সা৷

তবে রয়ের জীবনে মেয়েদের কোন স্থান নেই৷ আমার সঙ্গে একখানেই ওর সবচেয়ে অমিল৷ উনিশ বছর বয়সে বিয়ে করেছিল রয়৷ কিন্তু সুখী হতে পারেনি৷ বছরখানেক পরেই মেয়েটা ওকে ছেড়ে পালিয়ে যায়৷ এবং সেইখানেই ওর জীবনের কামিনী-অধ্যায় হয়েছে সমাপ্ত৷ একটা নেশা ওর আছে, তা হল ঘোড়া-রোগ৷ মাইনের প্রায় সব টাকাই উড়িয়ে দেয় ঘোড়ার পিছনে৷ যার জন্য সর্বদাই ওর পকেট খালি থাকে, আর আমার থেকে ধার নেবার চেষ্টা করে৷

ওকে কুপারের টাকার কথা বললাম৷

আমরা দুজন ছাড়া অফিসে আর কেউ নেই৷ বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে৷ জলের ছাট এসে আছড়ে পড়ছে জানলার সার্সির উপর৷ সাপের মতো এঁকেবেঁকে জলের ধারা সার্সি বেয়ে নেমে চলেছে৷ আমার বাড়ি যাওয়ার কোন তাড়া নেই৷ রয়কে কুপারের ফ্ল্যাটে যাওয়া থেকে আরম্ভ করে সব বললাম৷ এমনকি মেয়েটার কথাও বাদ দিলাম না৷

‘দেখে মনে হল সিন্দুকটায় প্রায় পাঁচ লাখ ডলার আছে, জানিস৷ সবই একশো ডলারের নোট৷’ পায়চারি করতে করতে ঘাড় ফিরিয়ে রয়ের দিকে তাকালাম, ‘ইস্—যদি এত টাকা পেতাম, তবে কি হত একবার ভেবে দেখ তো!’

রয়ের হাতে জ্বলন্ত সিগারেট৷ ও ডেস্কের কাছে বসে একমনে ধোঁয়া ছাড়ছিল, ‘এরকম ভাগ্য সকলের হয় না৷’

‘হুঁ—, যা বলেছিস৷’ জানালার কাছে এগিয়ে গেলাম৷ বাইরে বর্ষণসিক্ত রাতের দিকে তাকালাম৷ বৃষ্টি তখনও অবিশ্রান্ত ঝরে চলেছে৷ রাস্তার ধারের নর্দমাগুলো জলে ভরে গেছে৷ নির্জন রাস্তায় মধ্যে-মধ্যে জল ছিটিয়ে ছুটে যাচ্ছে দু-একটা গাড়ি৷

‘মনে হয় আর বেশি রাত করা ঠিক হবে না৷ উঃ—যা অবস্থা৷ বৃষ্টি বটে একখানা!’

‘আরে যাবি—যাবি৷ অত তাড়ার কি আছে৷’ রয় জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল, ‘পাঁচ লাখ ডলার?’—তুই ঠিক বলছিস?’

‘তার চেয়ে কম হবে বলে তো মনে হয় না৷—তিনটে তাকই ছিল পুরো ভর্তি৷’

‘আয়—বোস৷ ব্যাপারটা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক৷’

রয়ের চোখের দিকে তাকালাম৷ উৎকণ্ঠার ছায়া কাঁপছে ওর চোখের তারায়৷

‘শেট, ওরকম বেশ কিছু টাকা পেলে আমার কাজে লাগত৷’

‘কাজে আমারও লাগত৷’ ওর কাছে এসে বললাম৷

‘জানিস, মাত্র পাঁচশো ডলারের জন্য আমাকে তাড়া-খাওয়া কুকুরের মতো পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে?’ টেবিলের ওপর একটা ঘুঁষি মারল রয়, ‘যেমন করেই হোক, কিছু টাকা আমাকে যোগাড় করতেই হবে—আচ্ছা মনে কর যদি আমরা ওই সিন্দুকটা—’ চোখ নাচিয়ে হাতের একটা ভঙ্গি করল রয়৷ তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে সরীসৃপের মতো শীতল দৃষ্টিতে চেয়ে রইল আমার দিকে, ‘শুধু সামান্য একটু হাতের কাজ—’

অসম্ভব কিছু নয়৷’ আমার হৃৎস্পন্দন দ্রুততর হল৷

তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা৷ আমরা দুজনেই জানলার দিকে চেয়ে রইলাম৷ শুনতে লাগলাম বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ৷

‘আমি বহুদিন ধরে শুধু এইরকম একটা সুযোগের অপেক্ষা করেছি, শেট৷ যেভাবে এখন আমাকে দিন কাটাতে হচ্ছে, তাতে জীবনের ওপর আমার ঘেন্না ধরে গেছে৷ তোরও তো এই একই অবস্থা, তাই না?’

‘হ্যাঁ—’

‘তবে আর ভাবছিস কি? তোর কি কাজটা করার ইচ্ছে নেই?’

‘না,—ইচ্ছে ঠিক নেই৷ কিন্তু তবুও করতেই হবে৷ কারণ কাজটা বড্ড বেশি সহজ৷’

রয় দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসল, ‘আরে এত ভয় পাওয়ার কি আছে? ঠিকমতো বুদ্ধি করে করতে পারলে, কেউ আমাদের টিকিটি পর্যন্ত ছুঁতে পারবে না৷’

উত্তেজনায় উঠে বসলাম ডেস্কের উপর, ‘সুতরাং—’

‘ব্যাপারটা একটু ভেবে দেখা যাক৷ আয়, দুজনে বসে ঠান্ডা মাথায় একটু আলোচনা করি৷’

একটা ঘণ্টা দেখতে দেখতে কেটে গেল৷ যতই আমরা নিজেদের মধ্যে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করতে লাগলাম, কাজটা ততই সোজা বলে মনে হতে লাগল৷

‘প্রথমেই আমাদের খোঁজ নিতে হবে, এই কুপার লোকটা রোজ ক’টার সময় ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরোয়৷ এটা আমাদের জানতেই হবে৷ আর সময়টা জানতে পারলেই আমাদের কাজ শুরু হবে,—অর্থাৎ ফ্ল্যাটে ঢুকে, সিন্দুক খুলে, চটপট মাল হালকা করা৷’ আত্মপ্রত্যয়ের একটুকরো বাঁকা হাসিতে রয়ের ঠোঁট নেচে উঠল, ‘এবার তোকে যা করতে হবে, তা হল ওই নকল-চাবিটা নিয়ে, কুপারের বাড়িতে গিয়ে দরজায় যে দারোয়ানটা থাকে, ওর সঙ্গে কিছুক্ষণ গপ্পো মারবি৷ কথায় কথায় ওর থেকেই কুপারের বেরোবার সময়টা জেনে নিবি৷ কাজটা খুব একটা শক্ত হবে না৷ কারণ দারোয়ানরা সাধারণত গল্প করতে ভালোবাসে৷ তুই কথা বলার সময় খুব অন্তরঙ্গ ভাব দেখাবি, আর ওর সব কথায় সায় দিয়ে যাবি৷ রয় আমার মুখ লক্ষ্য করে পর পর কতকগুলো ধোঁয়ার রিং ছাড়ল, ‘ব্যস—৷ একবার যদি জানতে পারি কুপার বাড়িতে নেই, তো সোজা ওর ফ্ল্যাটে গিয়ে ঢুকব এবং—’ উত্তেজনায় প্রায় আস্ত সিগারেটটা ছাইদানে গুঁজে দিল রয়৷

ব্যাপারটা আলোচনা করার পর মনে হল পৃথিবীতে এর চেয়ে সহজ কাজ আর হতে পারে না৷

পরদিন রাতে নকল চবিটা নিয়ে অ্যাশলি আর্মসে গেলাম৷ আমার পরনে অফিসের ইউনিফর্ম—বাদামী রঙের জ্যাকেট আর গাঢ় সবুজ প্যান্ট৷ মাথায় বসানো ব্যাজ-লাগানো টুপি৷

রয় বলেছে, হাতের কাজ শেষ করেই ও অ্যাশলি আর্মসে ট্রাক নিয়ে চলে আসবে৷ বাইরে অপেক্ষা করবে আমার জন্য৷

অ্যাশলি আর্মসে যখন পৌঁছুলাম, সাড়ে দশটা বেজে গেছে৷ ট্রাক ছেড়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম দ্বাররক্ষীর ঘরের দিকে৷ দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারলাম৷

দেখি, লোকটা বসে একটা পকেট-বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছে৷ মুখে বিরক্তির ভাব৷ হয়ত জীবনের একঘেয়েমিই এই বিরক্তির কারণ৷

আমাকে দেখেই চিনতে পারল৷ বই বন্ধ করে ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকাল, ‘ও—তুমি? মি. কুপারের সঙ্গে দরকার বুঝি?’

‘হ্যাঁ৷’

‘তোমার কপাল খারাপ,—উনি বেরিয়ে গেলেন৷’

কাউন্টারে হেলান দিয়ে, পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করলাম, ‘কখন ফিরবেন উনি?’

দ্বাররক্ষী দেওয়াল-ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মনে মনে কি একটা হিসেব করল, ‘আধঘণ্টার মধ্যেই ফিরার কথা৷’

‘কি আর করা যাবে—অপেক্ষাই করতে হবে৷ ওনাকে একটা দরকারী জিনিস দেবার ছিল৷’

‘আমার কাছে রেখে যাও—মিঃ কুপার এলে তাঁকে দিয়ে দেব৷’

‘উঁহু,—তা সম্ভব নয়৷—মানে ওঁর সিন্দুকের চাবি তো, আর কাউকে দেওয়াটা ঠিক হবে না৷ একেবারে ওঁর হাতে দিয়ে রসিদ নিয়ে যেতে হবে৷’

দ্বাররক্ষী কাঁধ ঝাঁকাল, ‘তোমার যা ইচ্ছে—৷’

ওর দিকে একটা সিগারেট এগিয়ে দিলাম, ‘তুমি ঠিক জান, আর আধঘণ্টার মধ্যেই মি. কুপার ফিরে আসবেন?’

‘সে-বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই৷ কোনদিনই তাঁর দেরি হয় না৷ ঠিক আটটার সময় বেরোন আর রাত এগারোটায় ফেরেন৷’

‘হ্যাঁ,—কিছু কিছু লোককে দেখেছি একদম ঘড়ির কাঁটা ধরে চলে৷’

‘মি, কুপারও ওই দলের৷ তিন তিনটে নাইটক্লাবের মালিক৷ প্রত্যেক দিন রাতে, নিজের ক্লাবে যান এমন কি রোববারও বাদ দেন না৷ দেখাশোনা করে, এগারোটায় ডিনার খেতে আসেন৷ ডিনার সেরে, একটার সময় আবার বেরিয়ে পড়েন৷ দৈনিক বিক্রির হিসেব চুকিয়ে, ক্লাব বন্ধ করে, তারপর ফেরেন৷ কোনদিন এর একটুও হেরফের হয় না৷’

‘তোমাকে কি সারারাতই থাকতে হয় নাকি?’ ঘনিষ্ট হবার চেষ্টায় কপট সহানুভূতি দেখালাম৷

‘না—না৷ একটা বাজলেই আমি দরজায় তালা দিয়ে কেটে পড়ি৷ এ-বাড়ির প্রত্যেকের কাছেই দরজার নকল-চাবি আছে৷’ একটু থেমে অপেক্ষাকৃত নিচু স্বরে ও বলল, ‘আরে, তুমি বিশ্বাস করবে না দোস্ত, কতদিন মাঝরাতে ঘুম ভাঙিয়ে আমাকে টেনে তুলেছে৷ কি হয়েছে, না কোন শালা মাল টেনে, দরজার চাবি হারিয়ে বসে আছে৷’

এ সুযোগটা আমি হেলায় হারালাম না৷ রয়ে নির্দেশমতো গলায় একটা অন্তরঙ্গ সুর ফুটিয়ে তুললাম, ‘এই তো সেদিন রাতে কুপার ওর সিন্দুকের চাবি হারিয়ে আমাকে ডেকে পাঠাল৷ তখন সবেমাত্র এগারোটা৷ তারপর সিন্দুক সারিয়ে ফিরতে ফিরতে সাড়ে বারোটা বেজে গেল৷ শালা, পুরো সন্ধেটা মাটি!’

‘ও ব্যাটা রোজরোজই চাবি হারাচ্ছে,’ বিরক্তিতে মুখ বেজার করল দ্বাররক্ষী, ‘এই তো গত সপ্তাহেই দরজার চাবি হারিয়ে, আমাকে বিছানা থেকে টেনে তুলল৷ তখন ভোর পাঁচটা৷ হতভাগা চাবি হারানোর আর সময় খুঁজে পেল না! যত্তো সব—৷’

‘কুপার কি পাঁচটার সময় ফেরে নাকি?’

‘হ্যাঁ—৷ তারপর সারাদিন তো পড়ে পড়ে ঘুমোয়৷ একেবারে অপদার্থ—’

আনন্দে আমার চোখ চকচক করে উঠল৷ আমার আশা পূর্ণ হয়েছে৷ যা জানবার ছিল, তা জানা হয়ে গেছে৷ সুতরাং কায়দা করে প্রসঙ্গ পাল্টালাম৷ একথা-সেকথা নিয়ে বকর-বকর করে চললাম৷ ভুলেও দ্বাররক্ষীর কোন কথার প্রতিবাদ করলাম না৷ রয়ের নির্দেশমতো ওর সব কথাতেই সায় দিয়ে গেলাম৷ তারপর একসময় লক্ষ্য করলাম, লম্বা লম্বা পা ফেলে হেনরি কুপার এগিয়ে আসছেন৷ দেয়াল-ঘড়িটার দিকে তাকালাম৷ এগারোটা বাজতে এক মিনিট বাকি৷

দ্রুতপায়ে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলাম, ‘আপনার নকল-চাবিটা নিয়ে এসেছি, স্যর৷’

মুহূর্তখানেক তিনি তাঁর ছোট ছোট চোখ দিয়ে আমার আপাদমস্তক জরিপ করলেন৷ তারপর চিনতে পেরে বললে, ‘ওহ্—তুমি!—ঠিক আছে, চাবিটা দাও৷’

‘স্যর, আমার মনে হয় চাবিটা ঠিক হয়েছে কিনা, সেটা একবার পরখ করা দরকার৷ অপনি যদি বলেন—’

‘হ্যাঁ—হ্যাঁ নিশ্চয়ই৷’ আমাকে অনুসরণ করতে বলে তিনি লিফটের দিকে পা বাড়ালেন৷

চারতলায় পৌঁছে কুপার তাঁর ফ্ল্যাটের দরজার কাছে এগিয়ে গেলেন৷ চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলে আমাকে আহ্বান জানালেন৷ তাঁর পিছন পিছন আমিও বসবার ঘরে প্রবেশ করলাম৷

হেনরি কুপার ছবিটা সরিয়ে, আমাকে চাবিটা পরীক্ষা করার জন্য ইশারা করলেন৷ আমি চাবি ঘুরিয়ে সিন্দুকটা খোলার চেষ্টা করলাম৷ কুপার ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়েছিলেন৷ তাঁর খুদে চোখজোড়া সিন্দুকের উপর নিবদ্ধ৷

হাতল ঘুরিয়ে টান মারতেই খুলে গেল সিন্দুকের দরজা৷ চোখের সামনে আবির্ভূত হল চোখ-ধাঁধানো কুবেরের সম্পদ৷ একটা অবাস্তব চিন্তা বিদ্যুৎ-ঝলকের মতো ঝলসে উঠল আমার মনের আকাশে৷ ঘরে কুপার একা! যদি এখানেই ওকে আক্রমণ করি? ওই ফুলদানিটার বাড়ি মেরে ওকে অজ্ঞান করে, টাকা নিয়ে কেটে পড়তে আমার মিনিট পাঁচেকের বেশি সময় লাগবে না৷ তারপর—কিন্তু না!

অসীম সংযমে দমিয়ে রাখলাম এই অদম্য স্পৃহাকে৷ সিন্দুকটা আবার বন্ধ করে কুপারকে চাবিটা এগিয়ে দিলাম, ‘এই নিন, স্যর৷’

‘হুম—’ চাবিটা তিনি পকেটে রাখলেন৷ আপন মনেই বিড়বিড় করে বললেন, ‘ঠিক আছে—৷’ তারপর ডান পকেটে হাত ঢোকালেন কিন্তু এই পর্যন্তই৷ তাঁর কপালে ভাঁজ পড়ল৷ পকেটের ভিতরেই থেকে রইল তাঁর ডান হাত, বাইরে আর এল না৷ কুপারের মনের ভাব কিন্তু আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম৷ আগের দিন আমাকে যে দু-ডলার দিয়েছিলেন, সেটার কথাই তিনি এখন ভাবছেন৷ এবং আমার এই সামান্য কাজের বিনিময়ে দু-ডলারই যে যথেষ্ট, সম্ভবত সেকথা বলে মনকে প্রবোধ দিচ্ছেন৷

লোকটার এই মাক্ষিচুসের মতো ব্যবহার দেখে রাগে আমার ব্রহ্মতালু পর্যন্ত জ্বলে গেল৷ গত চবিবশ ঘণ্টা ধরে আমি শুধু দোমনা হয়ে ভেবেছি, রয়ের কথায় রাজি হব কি হব না৷ শুধু শুধু একটা লোকের সিন্দুক ভেঙে—কিন্তু না! সেই মুহূর্তেই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম৷ এরকম হাড়কিপটের সিন্দুক হাতালে কোন পাপ হয় না৷

কুপারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লিফটে পা দিলাম৷ রাস্তায় নেমে বৃষ্টির বেগকে উপেক্ষা করে ক্ষিপ্রপায়ে হেঁটে চললাম৷ বৃষ্টির ফোঁটার ঝাপসা পর্দা ভেদ করেও দেখা যাচ্ছিল, অদূরে দাঁড়ানো ট্রাকটাকে৷

ট্রাকে বসে রয় আমার জন্য অপেক্ষা করছিল৷ আমাকে দেখেই দরজা খুলে ধরল, ‘ওই লালমুখো মোটা লোকটাই বুঝি কুপার?’

‘হ্যাঁ,’ রয়ের পাশে উঠে বসলাম৷ রয় স্টার্ট দিয়ে ট্রাক ছুটিয়ে চলল বৃষ্টিভেজা রাস্তা ধরে৷

‘রোববার দিনই ব্যাটাকে কোপ দেওয়া যাবে, বুঝলি রয়৷ কোন ঝামেলার ভয় নেই৷’

রোববার দিন আমার এবং রয়ের, দুজনেরই ছুটি৷ তাই ওই দিনটাই ঠিক করলাম৷

দেখতে দেখতে এসে গেল সেই আকাঙ্ক্ষিত, উৎকণ্ঠাময় দিন৷ রয় আগেই একটা গাড়ি ভাড়া নিয়ে রেখেছিল৷ রাত প্রায় সাড়ে বারোটায় ও আমার বাড়িতে এল৷

আমি প্রস্তুত হয়েই ছিলাম৷ বৃষ্টির মধ্যেই দৌড়ে গিয়ে উঠলাম গাড়িতে৷ মুহূর্তমাত্রও দেরি না করে রয় গাড়ি ছুটিয়ে দিল অ্যাশলি আর্মসের দিকে৷

বৃষ্টির ফোঁটা নিষ্ফল আক্রোশে মাথা খুঁড়ছে গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনে৷ রয় একমনে গাড়ি চালাচ্ছে৷ ওর চোয়ালের রেখা কঠিন৷ কেমন একটা নিঃশব্দ উৎকণ্ঠা অনুভূত হচ্ছিল গাড়ির আবহাওয়ায়৷ আমরা দুজনেই চুপ৷ কারো মুখেই কোন কথা নেই৷ শুধু অনুভব করলাম বুকের মধ্যে অশান্ত হৃৎপিণ্ডের দাপাদাপি—ঢিপ ঢিপ—ঢিপ—ঢিপ৷

বৃষ্টির জন্য আমাদের সুবিধেই হল৷ রাস্তায় জনমানবের চিহ্ণমাত্র নেই৷ ঠিক একটা বাজতে পাঁচ মিনিটের সময় আমরা অ্যাশলি আর্মসে পৌঁছলাম৷

সারি সারি গাড়ি পার্ক করা রয়েছে রাস্তাটায়৷ একটা ক্যাডিলাক এবং একটা প্যাকার্ডের মাঝে গাড়িটা ঢুকিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করল রয়৷ তারপর শুরু হল আমাদের উদ্গ্রীব প্রতীক্ষা! বৃষ্টির ফোঁটা ঝমঝম করে আছড়ে পড়ছে গাড়িগুলোর ছাদে৷

রয়ের দিকে তাকালাম৷ পলকহীন চোখে ও চেয়ে রয়েছে অ্যাশলি আর্মসের সদরদরজার দিকে৷ ওর শ্বাস-প্রশ্বাসের গভীর শব্দ পরিষ্কার ছন্দে শোনা যেতে লাগল৷

 চোখ ফেরালাম অ্যাশলি আর্মসের দিকে৷ কখন বেরোবে কুপার? উত্তেজনায় শরীরের প্রতিটি স্নায়ু কাঁপছে৷

ড্যাশবোর্ডে লাগানো ঘড়ির দিকে তাকালাম৷ রাত একটা৷ চোখ তুলে তাকাতেই দেখলাম, একজন লোক বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছে৷ আমি রয়ের দিকে ঘাড় ফেরাতেই দুজনের চোখাচোখি হল৷ রয়ের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি৷

কুপার রাস্তায় এসেই মাথা ঝুঁকিয়ে দৌড়তে শুরু করল৷ আমাদের গাড়ি থেকে কিছুটা দূরে রাখা ছিল একটা সাদা জাগুয়ার৷ হাত দিয়ে বৃষ্টির বেগ প্রতিহত করতে করতে জাগুয়ারটার দিকে এগিয়ে চলল কুপার৷ কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা গিয়ে উঠে বসল গাড়িতে৷ তারপর গাড়ি ছুটিয়ে দিল৷

কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টিভেজা অন্ধকার গ্রাস করল সাদা জাগুয়ারটাকে৷

‘এখনও আর একজন বাকি—৷’ কাঁপা স্বরে বলল রয়৷

‘হ্যাঁ—৷’ অ্যাশলি আর্মসের থেকে চোখ না সরিয়ে জবাব দিলাম৷ কিন্তু নিজের গলাই কেমন অপরিচিত ঠেকল নিজের কাছে৷

কয়েক মিনিট পর সেই দ্বাররক্ষীকে এগিয়ে আসতে দেখলাম৷ ও এসে দাঁড়াল কাচের দরজার কাছে৷ পকেট হাতড়ে একটা চাবি বের করল৷ তারপর চাবি ঘুরিয়ে বন্ধ করে দিল সদরদরজা৷

দরজার কাচের পাল্লার ভিতর দিয়ে দেখা যাচ্ছিল লোকটাকে৷ ও ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল বাড়ির অপর প্রান্তে৷ সিঁড়ি ভেঙে নামতে শুরু করল৷ বুঝলাম, ও ফিরে যাচ্ছে ওর কোয়ার্টারে৷ হয়ত বৃষ্টিভেজা ঠান্ডার রাতে একটা গভীর ঘুম দেবার মতলব ভাঁজছে৷

‘চল, আর দেরি করে লাভ নেই৷’ চমক ভাঙল রয়ের কথায়৷ কাঁপা হাতে আঁকড়ে ধরলাম যন্ত্রপাতির ব্যাগটা৷ রয় ততক্ষণে দরজা খুলে নেমে দাঁড়িয়েছে৷ অশান্ত মনকে কিছুতেই পারছি না শান্ত করতে৷ শ্বাস-প্রশ্বাসে কেমন একটা কষ্ট অনুভব করছি৷ রয়ের কথায় সায় না দিলেই হত! কিন্তু এখন আর ফিরে যাবার উপায় নেই৷

গাড়ি ছেড়ে বাইরে বেরোতেই বৃষ্টির জল ঝাঁপিয়ে পড়ল গায়ে, মাথায়৷ ঠাণ্ডা জলের ফোঁটায় সাময়িক ভাবে প্রশমিত হল রক্ত-উত্তাল করা উত্তেজনা৷ আঃ—পরমুহূর্তেই আমরা ছুটলাম সদরদরজা লক্ষ্য করে৷ প্রথমে রয়, আর তার পিছন পিছন আমি৷

আগে থেকেই আমরা সব-কিছু ছকে রেখেছিলাম৷ আমার কাজ হবে তালাটা খোলা, আর রয় চারপাশে লক্ষ্য রাখবে৷ কোন বিপদের আশঙ্কা দেখলেই আমাকে সতর্ক করে দেবে৷

দরজার কাছে পৌঁছে হাঁপাতে হাঁপাতে পকেট থেকে চাবি-ভর্তি রিংটা বের করলাম৷ সদরদরজার কাছ থেকে বাড়ির ভিতরের দরজাটা দেখা যাচ্ছে না৷ যদি কেউ বাড়ির ভিতর থেকে হঠাৎ বেরিয়ে আসে? একথা ভাবতেই আতঙ্কে অবশ হয়ে গেলাম৷ পাঁচ আঙুলের ফাঁক থেকে স্খলিত হয়ে পড়ে গেল চাবির রিংটা৷

‘কী, করছিস কী?’ রয়ের চাপা ধমকানিতে সংবিত ফিরে পেলাম৷ চটপট রিংটা তুলে নিয়ে তালাটার দিকে মনোযোগ দিলাম৷

এমনিতে এ-ধরনের তালা খোলা আমার কাছে কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার৷ কিন্তু থরথর করে আমার হাত কাঁপছিল৷ তাই প্রয়োজনের অনেক বেশি সময়ই লাগল দরজাটা খুলতে৷ রয় ততক্ষণে উত্তেজনায় অধীর হয়ে উঠেছে৷

হাতল ঘুরিয়ে অতি সন্তর্পণে দরজাটা ফাঁক করলাম৷ তারপর আমি আর রয় নিঃশব্দে ভিতরে পা বাড়ালাম৷ বেড়ালের মতো ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে চললাম সিঁড়ির দিকে৷

আগে থেকেই ঠিক করেছিলাম, লিফট ব্যবহার করব না৷ কারণ দ্বাররক্ষী যদি হঠাৎই বিছানা ছেড়ে উঠে আসে, তবে লিফটের আলো দেখে ঠিক সন্দেহ করবে৷ আর যদি হই-চই শুরু করে দেয়, তবে তো হয়েই গেল৷

সিঁড়ি বেয়ে উপড়ে উঠতে শুরু করলাম৷ ভাগ্য সুপ্রসন্নই বলতে হবে, কারণ মাঝপথে কারো মুখোমুখি পড়তে হল না৷

যখন কুপারের ফ্ল্যাটের সামনে উপস্থিত হলাম, তখন আমরা দুজনেই হাঁপাচ্ছি৷ পকেট থেকে চাবির রিংটা বের করে, একটা চাবি লাগাতেই খুলে গেল ফ্ল্যাটের দরজা৷ ভয় অনেকটা কমে এসেছিল৷ এতটা যখন নির্বিঘ্নে পার হয়ে এসেছি, তখন—৷

সিন্দুকের টাকার কথা মনে পড়তেই হারানো সাহসের অনেকখানি ফিরে পেলাম৷ হাতের চাপে ফাঁক হয়ে গেল দরজার পাল্লা৷

ঘরের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার আমাদের গ্রাস করতে এগিয়ে এল৷ দেহের প্রতিটি ইন্দ্রিয় সজাগ রেখে, ঘরে পা দিয়েই থমকে দাঁড়ালাম৷ কান খাড়া করে শুনতে চেষ্টা করলাম সামান্যতম শব্দ৷

শুধু ভেসে এল দেওয়াল ঘড়ির টিক-টিক-টিক—আর রেফ্রিজারেটরের মৃদু টানা গুঞ্জন—

‘কি হল তোর? দাঁড়িয়ে রইলি কেন?’ পিছন থেকে আমাকে ঠেলা মারল রয়৷

বুঝলাম এই অসহ্য উৎকণ্ঠায় ওর স্নায়ু ভেঙে পড়তে চাইছে৷

অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে সুইচবোর্ডের কাছে এগিয়ে গেলাম, আলো জ্বেলে দিলাম৷ ধবধবে মার্কারি ল্যাম্পের চোখ-ঝলসানো আলোয় ঘর ভেসে গেল৷ রয় ভিতরে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে দিল৷ ইয়েল লক দরজা ‘ক্লিক’ শব্দ তুলে বন্ধ হয়ে গেল৷

‘একখানা ঘরের মতো ঘর বটে!’ ঘরের চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিল রয়, ‘কুপার ব্যাটা দেখছি টাকার কুমির!—যাকগে, সিন্দুকটা কোথায়?’

 কোন জবাব না দিয়ে, অয়েলপেন্টিংটার কাছে গিয়ে উপস্থিত হলাম৷ ছবিটা সরিয়ে ধরলাম একপাশে৷ সামনেই সিন্দুকটা—৷

‘নে, চটপট কাজ শুরু কর৷’ ঘরের এককোণে রাখা দামি টেলিভিশন সেটটার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই রয় তাড়া লাগাল৷’

কম্বিনেশন-নম্বরটা আমার মুখস্থই ছিল৷ তা ছাড়া, সঙ্গে ছিল সিন্দুকের নকলচাবি৷ কুপারের চাবিটা তৈরির সময় এটাও তৈরি করিয়ে নিয়েছিলাম৷ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই খুলে ফেললাম সিন্দুকের দরজা, ‘রয়, দেখবি আয়—’

বিস্ময়ে হতবাক দুজন, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, হাঁ করে চেয়ে রইলাম টাকার পাহাড়ের দিকে৷

‘একি স্বপ্ন দেখছি!’ রয়ের পাঁচ আঙুল ওর অজান্তেই শক্ত হয়ে চেপে বসল আমার হাতে, ‘শেট বাকি জীবনটা তাহলে পায়ের ওপর পা তুলেই কাটিয়ে দেওয়া যাবে, কি বলিস?’

‘সত্যিই, পৃথিবীতে এর চেয়ে সহজ কাজ আর হতে পারে না৷ আনন্দের ঢেউ তখন আছড়ে পড়ছে বুকের ভিতরে৷

আড়াই—লাখ—ড—লা—র!—সম্পূর্ণ—আমার—এও কি সম্ভব?

কতক্ষণ যে ওইভাবে একটা ঘোরের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না হঠাৎ একটা মৃদু শব্দ শুনতে পেলাম৷ রয়ের দিকে চেয়ে দেখি, ও তখনও লুব্ধ চোখে তাকিয়ে আছে টাকার বান্ডিলগুলোর দিকে৷ অবচেতন মনে শব্দটাকে ততটা আমল দিইনি৷ কিন্তু পুরমুহূর্তেই, ওই শব্দের অর্থ বুঝতে পেরে আতঙ্কে জমে পাথর হয়ে গেলাম৷ রয়কে এক ধাক্কা মারতেই ও সংবতি ফিরে পেল৷ ঘাড় ঘুরিয়ে আমরা দুজনেই দরজার দিকে তাকালাম৷

একটা ছবির অগ্রভাগ বেরিয়ে আছে চাবির ফুটো দিয়ে৷ আস্তে আস্তে ঘুরছে চাবিটা৷ আমাদের আতঙ্ক-বিস্ফোরিত চোখের সামনেই ‘ক্লিক’ করে একটা শব্দ হল এবং চাবিটা ফুটো থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল৷

আমি তখন জড়পদার্থের মতো অচল, অনড়! দেহের সমস্ত অনুভূতি যেন জমে বরফে পরিণত হয়েছে৷ সাধারণ বুদ্ধিটুকুও যেন লোপ পেয়েছে৷

দেখলাম রয় হঠাৎ পাগলের মতো ছুটে গেল সুইচবোর্ড লক্ষ্য করে, আর একই সঙ্গে ঘুরতে শুরু করল দরজার হাতলটা৷ অর্থাৎ বাইরে থেকে কেউ দরজা খুলছে!

রয় সুইচ অফ করার সঙ্গে-সঙ্গেই একরাশ অন্ধকার ঝাঁপিয়ে পড়ল ঘরের মধ্যে৷ পরমুহূর্তেই ধীরে ধীরে খুলতে লাগল ফ্ল্যাটের দরজা৷ বারান্দার একফালি আলো দরজার ফাঁক দিয়ে ঘরে এসে পড়ল৷ দরজা যতই খুলতে লাগল, ততই চওড়া হতে লাগল সেই আলোর রেখা৷ ক্রমশ আমার গায়ে এসে পড়ল সেই আলো, এবং আমাকে অতিক্রম করেও বেশ কিছুটা গিয়ে তারপর থামল৷ অর্থাৎ দরজা সম্পূর্ণটাই খুলে গেছে আর ঠিকরে-পড়া বারান্দার আলোর বৃত্তে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছি আমি৷

রয়কে অন্ধকারে দেখতে পেলাম না৷ শুধু দেখলাম, দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই আগের দিনের দেখা মেয়েটি৷ মুহূর্তমাত্র আমরা তাকিয়ে রইলাম পরস্পরের দিকে৷

পরক্ষণেই মেয়েটির তীক্ষ্ণ আর্ত চিৎকারে চমকে উঠলাম, ‘চোর—চোর! হেনরি—ঘরে চোর ঢুকেছে—৷’ আমি স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে, পা দুটো যেন আটকে আছে মেঝের সঙ্গে৷ মনে হল, কানের ভিতর কেউ যেন ঢেলে দিয়েছে গরম সীসে৷

দেখলাম, কুপার এসে দাঁড়িয়েছে মেয়েটির পিছনে৷ এক ঝটকায় ওকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে, কুপার আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল৷ দুহাতের দশ আঙুল যেন চিতার থাবার মতো রক্ত-পিপাসায় বাঁকানো৷ চোখের অগ্নিক্ষরা দৃষ্টিতে জ্বলছে আক্রোশের লেলিহান শিখা৷

আমি তখন বোবা-আতঙ্কে কিংকর্তব্যবিমূঢ়৷

মেয়েটা ঝড়ের বেগে ছুটে গেল সিঁড়ি লক্ষ্য করে৷ ওর তীক্ষ্ণ কানফাটানো আর্ত চিৎকারে গোটা বাড়িটা কেঁপে উঠতে লাগল৷

এবার আমি রয়কে দেখতে পেলাম৷ জাগুয়ারের মতো গুঁড়ি মেরে, দেয়াল ধরে ও এগিয়ে চলল দরজার কাছে, কুপারের ঠিক পিছনে৷ কুপার রয়কে দেখতে পায়নি৷ সে সোজা এগিয়ে আসছিল আমারই দিকে৷ দু-হাত বাড়িয়ে সে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ আর ঠিক সেই মুহূর্তেই কিছু একটা ঝলসে উঠল রয়ের হাতে৷ একটা শব্দ হল—ঠকাস! কুপারের বিশাল দেহ গোড়াকাটা কলাগাছের মতো লুটিয়ে পড়ল আমার পায়ের কাছে৷

লক্ষ্য করলাম, রয়ের দুহাতে, বজ্রমুষ্টিতে ধরা রয়েছে সেই ভারী ফুলদানিটা৷ অর্থাৎ হাতের কাছে আর-কিছু না পেয়ে, ওই ফুলদানিটাই কুপারের মাথায় বসিয়ে দিয়েছে রয়৷

‘শেট—’ আমার হাত ধরে ও এক হ্যাঁচকা টান মরল, ‘শীগগির—’

আমি যেন এতক্ষণ দেখা দুঃস্বপ্নের ঘোর কাটিয়ে উঠলাম৷ সমস্ত বোধশক্তি লোপ পেয়ে, শুধু একটা চিন্তাই ঘুরতে লাগল মনের মধ্যে—পালাতে হবে৷

কোন-কিছু ভাববার আগেই টের পেলাম, আমি উন্মাদের মতো দরজা লক্ষ্য করে দৌড়চ্ছি৷ পিছন থেকে রয়ের চাপা ধমক শুনতে পেলাম, ‘অ্যাই শেট, নিচে নয়—ওপরে—!’ ভয়ে ওর গলা কাঁপছে৷

আমি তখন আতঙ্কে দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে সিঁড়ির দিকে ছুটে চলেছি৷ নিচ থেকে মেয়েটির গলাফাটানো আর্তচিৎকার তখনও শোনা যাচ্ছে৷ কিন্তু আমার মনে তখন একটাই চিন্তা—যে করে হোক আমাকে গাড়ির কাছে পৌঁছতে হবে৷

‘শেট, নীচে নয়—ওপরে আয়—ওপরে—৷’ রয়ের অধৈর্য চাপা গলা শুনতে পেলেও, ওর কথা আমার আচ্ছন্ন মনে কোন রেখাপাত করল না৷ এক এক লাফে তিনটে করে সিঁড়ি ভেঙে অন্ধের মতো ছুটে চললাম৷

সেকেন্ড কয়েকের মধ্যেই তিনতলায় পৌঁছলাম৷ দোতলায় সিঁড়ি লক্ষ্য করে দৌড়চ্ছি, একটা ফ্ল্যাটের দরজা খুলে গেল৷ একজন রোগা, সানাচুলওয়ালা বুড়ো বেরিয়ে এল৷ কিন্তু পরমুহূর্তেই একলাফে ফ্ল্যাটে ঢুকে, দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল৷ একটুও না থেমে ছুটে চললাম৷

পরের সিঁড়িগুলো তিন লাফে পার হয়ে, দৌড়তে শুরু করলাম নিচের তলার সিঁড়ি লক্ষ্য করে৷ কিন্তু হঠাৎই পা পিছলে যাওয়ায়, মুখ থুবড়ে আছড়ে পড়লাম মেঝেতে৷ কোনরকমে উঠে দাঁড়িয়ে, আঘাত গ্রাহ্য না করে আবার দৌড়লাম৷ ছুটতে ছুটতে অবশেষে এসে উপস্থিত হলাম দালানে৷

মেয়েটা তখন দ্বাররক্ষীর অফিসের কাছে দাঁড়িছে, দরজার হাতল ধরে টানাটানি করছে৷ আমাকে দেখে আতঙ্ক-বিস্ফারিত চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল৷ তারপরই ওর গলা দিয়ে বেরিয়ে এল হাঁড়িচাঁচা-কণ্ঠে এক অমানুষিক আর্ত চিৎকার৷

এমন সময় লক্ষ্য করলাম, দ্বাররক্ষী ওর কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে আসছে৷ প্রথমে ও চোখ গোল গোল করে কিছুক্ষণ আমাকে দেখল, পরক্ষণেই সংবিত ফিরে পেয়ে, হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে বুনো মোষের মতো ছুটে এসে লাফিয়ে পড়ল আমার ঘাড়ে৷ জাপটাজাপটি করে দুজনেই ছিটকে পড়লাম মেঝেয়৷ ওর শক্ত হাতের বাঁধন ছাড়িয়ে আমি শুধু কোনরকমে পালাতে পারলেই বাঁচি!

ভয়ে মরিয়া হয়ে, লোকটার চুলের মুঠি ধরে মেঝেতে সজোরে ঠুকে দিলাম৷ তাতেও যখন কিছু হল না, তখন দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে একটা ঘুঁষি বসিয়ে দিলাম ওর মুখে৷ লোকটা আচ্ছন্ন ভাবটা কাটিয়ে ওঠার আগেই ওকে ঠেলে সরিয়ে টলতে টলতে উঠে, আবার ছুটতে শুরু করলাম—লক্ষ্য সদর দরজা৷

দরজা খুলে ঠিক বাইরে পা দিচ্ছি, এমন সময় বেজে উঠল কানফাটানো এক পুলিশহুইহল্৷ নিশ্চয়ই দ্বাররক্ষীর কাণ্ড! মেয়েটির বীভৎস চিৎকার আর এই হুইশল্-এর কানফাটানো শব্দে তড়িৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠলাম৷ পড়িমরি করে দৌড়লাম রাস্তা লক্ষ করে৷

বৃষ্টির মধ্যেই ছুটে চলেছি কানে তখনও ভেসে আসছে সেই চিৎকার৷ কিন্তু তাকে ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছে বাঁশির তীক্ষ্ণ শব্দ৷

এই বৃষ্টিতেও আমি তখন কুলকুল করে ঘামছি৷ হৃৎপিণ্ড যেন বুক ফেটে বেরিয়ে আসছে চাইছে৷ কিন্তু আমার পা আমাকে ছুটিয়ে নিয়ে চলল৷

‘হে—ই—ই—’ ছুটতে ছুটতেই পিছনে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালাম৷ একটা ছায়ামূর্তি আমার পিছনে পিছনে দৌড়ে আসছে৷ তার মাথায় টুপি কোটের বোতামগুলো অন্ধকারেও ঝকঝক করছে৷—পুলিশ! ভয়ে আমার দেহ অবশ হয়ে এল৷

কিন্তু ওই তো—সামনেই দেখা যাচ্ছে আমাদের গাড়িটা৷ একবার গাড়িতে গিয়ে উঠতে পারলেই—

নতুন উদ্যমে ছুটে চললাম! কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই রাত্রির নিস্তব্ধতাকে খান খান করে ভেসে এল রিভলভারের শব্দ—ফটাস!

‘উঃ—’ আমার গাল ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল একটা আগুনের হালকা৷ গালের চামড়া যেন পুড়ে যাচ্ছে৷ যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করলাম৷

চট করে মাথা নিচু করে, রাস্তার অপর প্রান্ত লক্ষ্য করে ছুটে চললাম৷ সেদিকটা সম্পূর্ণ অন্ধকার৷ যদি একবার ওখানে পৌঁছুতে পারি, তবে এখনও পালাবার আশা আছে৷

দৌড়তে দৌড়তেই আবার শুনতে পেলাম সেই কালান্তক রিভলবারের শব্দ—উঃ—! পরমুহূর্তেই প্রচণ্ড এক ধাক্কায় ভিজে রাস্তার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম৷ যেন কেউ একটা উত্তপ্ত লৌহ-শলাকা বিঁধিয়ে দিয়েছে আমার পিঠে৷ যন্ত্রণায় চিৎকার করতে গেলাম, কিন্তু গলা দিয়ে কোন স্বরই বেরোল না৷ অজান্তেই হাত চলে গেল পিঠে, আহত জায়গাটা চেপে ধরতে৷ হাত সামনে আনতেই দেখলাম, হাতময় চটচটে ভিজে রক্ত৷ বৃষ্টির জলে ধুয়ে ধুয়ে, সেই রক্ত টপ টপ করে পড়ছে পাঁচ আঙুলের ফাঁক দিয়ে৷—প্রতিটি অনুভূতি অবশ হয়ে আসতে লাগল—

শুনতে পাচ্ছি কয়েক জোড়া ভারী বুটের শব্দ—খট—খট—খট—খট৷ তীরবেগে কারা যেন দৌড়ে আসছে আমারই দিকে—খট—খট—খট—খট—

—উঃ—কি অন্ধকার—!—মাগো—

তারপর আমার আর কিছু মনে নেই৷