গল্প
উপন্যাস

হাতের মুঠোয় পৃথিবী – ৪

চার

পরদিন সকাল এগোরোটায় কিটসনকে দেখা গেল মরগ্যানের বুইক নিয়ে ছুটে চলেছে মার্লো অভিমুখে৷ দশ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে টানা ষাট মাইলের রাস্তা মার্লো৷ কিটসনের হাতে বুইক যেন উড়ে চলল শহরতলি ছাড়িয়ে৷

কিটসনের পাশে বসে জিনি গর্ডন৷ কিন্তু এ জিনির সঙ্গে বুঝি আগের জিনির কোনও মিলই নেই৷ রঙিন আঁটোসাঁটো ফ্রকটা পরে জিনিকে মনে হচ্ছে কোনও উচ্ছল কিশোরী৷ ওর সুন্দর সতেজ মুখে অবাধ খুশির রাজত্ব: যেন নববিবাহিত কোনও বধূ মধুচন্দ্রিমার আসন্ন সুখস্বপ্নে বিভোর! ওর চোখের ইশারায় উদ্দাম চঞ্চলতা, মুখের ভাব হয়ে উঠেছে কোমল, আর সেই সঙ্গে তোতাপাখির মতো অনর্গল কথা বলে চলেছে৷

জিনির এই অভাবনীয় আকস্মিক পরিবর্তনে কিটসন একেবারে হতবাক৷ নিজেকে এক সদ্যবিবাহিত যুবকের ভূমিকায় খাপ খাওয়াতে তাকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে৷ তবে এখন কিটসনকে দেখলে মনে হবে, কোনও মধ্যবিত্ত, উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুবক বিয়ের পরে স্ত্রীকে নিয়ে চলেছে মধুচন্দ্রিমা যাপনের উদ্দেশ্যে৷ এবং ব্যাপারটা জানাজানি হওয়ার ভয়ে সে বেশ চিন্তিত৷

সকালবেলা মরগ্যান তার বুইক এবং ক্যারাভ্যান টানার শেকল বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেছে; এবং কথামতো জিপোও মরগ্যানকে অনুসরণ করে লিংকন নিয়ে যথাসময়ে হাজির হয়েছে৷ তারপর জিনি ও কিটসন যখন মরগ্যানের বুইকে চড়ে রওনা দিল, তখন কোনও এক অজ্ঞাত কারণে জিপো হঠাৎই ভাবপ্রবণ হয়ে পড়ল৷

দ্রুত মিলিয়ে যাওয়া বুইকের দিকে তাকিয়ে সে মরগ্যানকে লক্ষ করে বলে উঠল, ‘ওদের দুটিকে ভারী সুন্দর মানিয়েছে, তাই না?’ আসলে জিনিকে আমরা যতটা কঠিন ভাবি ততটা ও নয়৷ ওর চেহারার মতো কোনও মেয়ে ভালোবাসা ছাড়া থাকতে পারে না…ওদের দেখাচ্ছিলও ঠিক নতুন বিয়ে করা বর-বউয়ের মতো, তাই না ফ্র্যাঙ্ক?’

‘তুমি তো দেখছি বুড়ি বিধবার মতো উল্টোপাল্টা ভাবতে শুরু করেছ, অ্যাঁ? তোমার হল কী জিপো? হঠাৎ কি মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি?’

জিপো দুপাশে হাত ছড়িয়ে কাঁধ ঝাঁকাল, ‘ঠিক আছে আমার না হয় মাথা খারাপ হয়েছে, প্রলাপ বকছি—কিন্তু বলতে পার ফ্র্যাঙ্ক, ভালোবাসা ছাড়া এই দুনিয়ার সুখটা কোথায়?’

‘ও হো—এসব রাখো এখন!’ প্রায় ধমকে উঠল মরগ্যান, ‘আমাদের অনেক কাজ পড়ে রয়েছে…শুধু শুধু সময় নষ্ট কোরো না; চলো, এডের ফ্ল্যাটে আমাকে নিয়ে চলো৷

জিপোর এই ধরনের মেয়েলি ভাবপ্রবণতা খুব একটা ভালো কথা নয়, ভাবল মরগ্যান৷ তাদের সামনে রয়েছে দুরূহ, দুঃসাহসিক কাজ৷ সুতরাং, সে ক্ষেত্রে ভাবাবেগের পিছনে নষ্ট করার মতো সময় তাদের নেই৷

নদীর খুব কাছে দৃপ্ত ভঙ্গিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে পাথরের তৈরি একটা বিশাল বাড়ি৷ এই বাড়িতেই একটা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকে এড ব্লেক৷

লিফটে করে পাঁচতলায় পৌঁছল মরগ্যান৷ নির্জন বারান্দায় জুতোর মস্ মস্ শব্দ তুলে সে এগিয়ে চলল ব্লেকের ঘরের দিকে৷ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অধৈর্যভাবে কলিংবেলের বোতাম টিপে ধরল মরগ্যান৷

কিছুক্ষণ পরে দরজা খুলে গেল৷ এড ব্লেক দরজায় দাঁড়িয়ে৷

ব্লেকের পরনে কালো পাজামা, শার্ট৷ তার বুকের কাছটায় সাদা সুতোয় লেখা ঃ এ, বি—অর্থাৎ এড ব্লেক৷ এডের মাথার চুল উসকো খুসকো, চোখের পাতা ভারী, দৃষ্টি আংশিক আচ্ছন্ন৷

‘আরে কী ব্যাপার?! তোমারা এত সকাল-সকাল?’ মরগ্যানকে লক্ষ করে বলল সে, ‘কটা বাজে এখন?’

মরগ্যান সামনে এগিয়ে গেল৷ ব্লেককে ঠেলে নিয়ে ঢুকল বসবার ঘরে৷ ঘরটা ছোট হলেও আধুনিক ভাবে সাজানো-গোছানো৷ কিন্তু ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা জিন এবং হুইস্কির খালি বোতল ঘরের চেহারা পালটে দিয়েছে৷

সিগারেটের ধোঁয়া আর সেন্টের গন্ধে ঘরের আবহাওয়া ভারী হয়ে উঠেছে৷ মরগ্যান সেটা টের পেতেই নাক কোঁচকাল, ‘ওঃ ঘর তো নয়, যেন বেশ্যাবাড়িতে এসে ঢুকেছি! একটা জানলা খুলে রাখলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে?’

‘তা কেন?’ বলে এগিয়ে গিয়ে একটা জানলা ধাক্কা দিয়ে খুলে দিল ব্লেক৷ দেওয়াল-ঘড়ির দিকে এক পলক তাকিয়ে সে সময় দেখলঃ এগারোটা কুড়ি৷ ‘তোমরা দেখছি অনেক আগেই এসে পড়েছ!…তা কিটসন কি রওনা হয়ে গেছে?’

‘হ্যাঁ, ওরা অনেকক্ষণ বেরিয়ে পড়েছে৷’ মরগ্যান চোখ ফেরাল শোবার ঘরের দরজার দিকে৷ প্রশ্ন করল, ‘শোবার ঘরে কে আছে?’

ব্লেক চতুর হাসি হাসল, ‘ওর জন্যে ভেব না—মেয়েটি এখন ঘুমে অচেতন৷’

মরগ্যান ঝটিতি আঁকড়ে ধরল ব্লেকের জামা৷ এক হ্যাঁচকায় তাকে সামনে টেনে আনল, ‘শোনো এড, আমাদের সামনে এক বিরাট কাজের দায়িত্ব৷ তাছাড়া, কাল রাতে তুমি খুব একটা ভালো ফল দেখাতে পারনি৷ মনে রেখো, আসল কাজের সময় তোমাকে ওর চেয়ে বেশি সাবধান হয়ে কাজ করতে হবে; নইলে তোমার সাহায্য আমাদের কোনও প্রয়োজন নেই৷ যদ্দিন পর্যন্ত না আমরা ওই ট্রাকের ব্যাপারটা নিষ্পত্তি করছি, তদ্দিন মদ খাওয়া আর মাগী চরানো ছাড়ো৷ প্রত্যেক জিনিসেরই একটা সীমা আছে!’

ব্লেক ঝটকা মেরে নিজেকে সরিয়ে নিল, ওর মুখের রেখা হয়ে উঠল কঠিন৷

‘মুখ সামলে কথা বলো, ফ্র্যাঙ্ক৷’

‘তাই নাকি?’ যদি মিষ্টি কথায় চিঁড়ে না ভেজে, তবে অন্য রাস্তা নিতে হবে দেখছি…৷ মিঃ এডওয়ার্ড ব্লেক, আমার কথা তোমার মগজে ঢুকলে ভালো, নইলে গলা ধাক্কা দিয়ে দল থেকে মেরে তাড়াব এ-কথা মনে রেখো৷ ফ্র্যাঙ্ক মরগ্যান কারও চোখ রাঙানিকে ভয় করে না৷’

মরগ্যানের স্থির, উজ্জ্বল কালো চোখের সংকেত ব্লেকের সমস্ত সত্তাকে যেন বরফ করে দিল৷ তাড়াতাড়ি সে বলে উঠল, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে—তোমার কথা আমার মনে থাকবে৷’

‘থাকলেই ভালো৷’

ব্লেক একটু সরে দাঁড়াল, বলল, ‘খবরের কাগজে গত রাতের ব্যাপারটা নিয়ে কিছু লিখেছে নাকি?’

‘সাধারণত যা লেখে তাই৷ কাফেতে প্রত্যেকে এত ভয় পেয়েছিল যে পুলিশের কাছে আমাদের চেহারার কোনও সঠিক বর্ণনাই দিতে পারেনি৷ আমার মনে হয় এ ব্যাপারে নিয়ে শত মাথা ঘামালেও পুলিশ আমাদের খোঁজ পাবে না৷ আচ্ছা, এবার কাজের কথায় আসা যাক৷ তুমি এখন সোজা চলে যাও জিপোর ওখানে, ওকে কাজে সাহায্য করো গিয়ে৷ আমাকে একটু ডুকাসে যেতে হবে৷’

ঠিক আছে, ‘যাচ্ছি’ গজগজ করতে করতে জবাব দিল ব্লেক৷ আজ যে তার কাজ করার মেজাজ নেই, সেটা পরিষ্কার বোঝা গেল তার মুখভাবে৷

‘নাও চটপট করো৷ ফালতু দেরি কোরো না৷’ খেঁকিয়ে উঠল মরগ্যান, ‘আমি চললাম, আর্নির সঙ্গে দেখা করতে৷’ ওর কাছে একটা অটোমেটিক রাইফেল আছে; সেটা ও বেচতে চায়৷ দেখি, যদি দরে পোষায় তাহলে কিনে নেব৷’

‘আমি তৈরি হয়ে এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ছি৷’ তড়িঘড়ি বলে উঠল ব্লেক৷

মরগ্যান চলে যেতেই ব্লেক চাপা স্বরে একটা অশ্রাব্য খিস্তি করল, তারপর এগিয়ে গেল শোবার ঘরের দিকে৷ আধো আঁধারিতে ডুবে থাকা ঘরের পরিবেশ তার কাছে এই মুহূর্তে বিরক্তিকর মনে হল৷ বিছানার কাছাকাছি একটা জানলা খুলে দিতেই রোদের উষ্ণ ঝলক এসে পড়ল বিছানার ওপর শুয়ে থাকা মেয়েটির মুখে৷

‘ওঃ-হো… এডি, জানলাটা বন্ধ করে দাও৷’ প্রতিবাদ ও বিরক্তির সুরে বলে উঠল মেয়েটি, বিছানায় উঠে বসে পিট-পিট করে তাকাল ব্লেকের দিকে৷’ মেয়েটির গায়ের রং ঘোর বাদামি, মাথায় কালো চুলের গুচ্ছ কপালের ওপর নেমে এসেছে৷ আয়ত চোখের তারা ঘন নীল৷ পরনে হলদে রাত্রিবাস৷ তার ফিকে আচ্ছাদনের আড়ালে ওর সুঠাম তনুর ইঙ্গিত৷

‘চটপট লম্বা দাও সোনা, এক্ষুনি আমাকে কাজে বেরোতে হবে৷’ রাত্রিবাস ছেড়ে পোশাক পরতে পরতে বলল ব্লেক, ‘নাও পা-দুটোকে একটু কাজে লাগাও।’

‘কিন্তু এড, আমার ভী-ষ-ণ ক্লান্ত লাগছে৷ তোমার কাজ থাকলে তুমি যাও না, আমি না হয় একটু ঘুমিয়েই নিলাম৷ কী, আপত্তি আছে?’

‘পুরোপুরি৷ তোমাকে এখানে একা থাকতে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়৷ এসো জলদি উঠে পড়ো৷’

মেয়েটা বিরক্তসূচক শব্দ করে গায়ের চাদরটা ছুড়ে ফেলল পায়ের কাছে৷ তারপর ঘুম চোখে টলতে টলতে নেমে দাঁড়াল মেঝেতে৷ হাত টান-টান করে আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলল ও৷ শ্লথ পায়ে এগোল বাথরুমের দিকে৷

‘কিন্তু হঠাৎ এত তাড়াহুড়ো কেন এডি?’ ঘন কালো চুলে আলতোভাবে আঙুল চালাতে চালাতে প্রশ্ন করল মেয়েটা, ‘তোমাকে কে ডাকতে এসেছিল?’

ব্লেক তখন ইলেকট্রিক রেজার দিয়ে একমনে দাড়ি কামাচ্ছে৷ উষ্ণ স্বরে বলে উঠল, ‘জামাকাপড় পরে যত তাড়াতাড়ি পার কেটে পড়ো সোনা৷ কতবার বলব আমাকে এক্ষুনি কাজে বেরোতে হবে?’

রাত্রিবাস ছেড়ে জলের ঝাঁঝরির নীচে দাঁড়াল মেয়েটা৷ কল খুলে দিল৷

‘মাঝে মাঝে ভাবি, সব জেনেশুনেও কেন বার বার তোমার কাছে ফিরে আসি৷’ জলের একঘেয়ে ঝির-ঝির শব্দকে ছাপিয়ে বাথরুম থেকে ভেসে এল মেয়েটার কণ্ঠস্বর, ‘সেই বহু প্রচলিত ছকে বাঁধা রাস্তায় তোমার নাটক শুরু; যন্ত্র-সংগীতের হালকা সুর, নরম আবছা আলো, কানের কাছে ফিসফিস করে কত কথা…তারপর হঠাৎ জামাকাপড় পরে রাস্তা দেখো৷ মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার কী ছিরি! অথচ, এডি, তুমিই আবার আমার স্বপ্নের রাজপুত্র! হৃদয়ের নায়ক৷’

ব্লেক বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, ‘ছেনালি রাখো, গ্লোরি! যা করছ জলদি করো৷ ফালতু সময় নষ্ট কোরো না৷’

দাড়ি কামানো হয়ে গেলে ব্লেক চলল রান্নাঘরের দিকে কফি তৈরি করতে৷ তার মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা, মুখ শুকিয়ে কাঠ—যেন কেউ একমুঠো তুলো গুঁজে দিয়েছে৷ কাল রাতে অত মদ না গিললেই পারতাম—ভাবল ব্লেক৷ কিন্তু না গিলেও কোনও উপায় ছিল না৷ কারণ গত রাতের ব্যর্থতা তার আত্মবিশ্বাসকে দলে পিষে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে৷…না গ্লোরিকে কাল রাতে না ডাকলেই ভালো করত৷ মরগ্যান যে ব্যাপার-স্যাপার দেখে খুব একটা খুশি হয়নি, তা সে ভালোই বুঝতে পারল৷

একটা কাপে কফি ঢালল ব্লেক৷ অ্যাসপ্রোর শিশি বের করে তিনটে ট্যাবলেট খেয়ে নিল৷ সেই সময় অস্বস্তির সঙ্গে সে লক্ষ করল, তার হাত কাঁপছে৷ ব্লেক কফির কাপে শেষে চুমুক দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রান্নাঘরে এসে ঢুকল গ্লোরি ডসন৷ পোশাক থেকে শুরু করে সাজসজ্জা—সবই ওর সম্পূর্ণ৷

‘উম-ম…কফি৷’ আমার জন্যে এক কাপ ঢালো, এডি৷’ আবদারের সুরে বলল গ্লোরি৷

‘উঁহু—এখন সময় নেই৷ যাবার সময় পথে কোনও রেস্তোরাঁ থেকে অনায়াসেই কফি খেয়ে নিতে পারবে৷ চলো—এবার যাওয়া যাক৷’

‘এক মিনিট, এডি৷’ গ্লোরির স্বরের তীক্ষ্ণতায় চমকে ওর দিকে ফিরে তাকাল ব্লেক, ‘একটু আগে তোমার কাছে মরগ্যান এসেছিল, তাই না? কী যেন বলছিল সে… কী সব বিরাট কাজের দায়িত্ব… ব্যাপার কী, এড? খারাপ কিছু নয়তো?’

ব্লেক চমকে উঠল৷ কয়েক মুহূর্ত সে অবাক চোখে চেয়ে রইল গ্লোরির দিকে৷ তারপর দাঁত খিঁচিয়ে বলে উঠল, ‘আমার ব্যাপারে নাক গলাতে এসো না, গ্লোরি৷ নিজের চরকায় তেল দাও৷ এ ব্যাপারে দ্বিতীয়বার কৌতূহল দেখাতে গেলে ফল ভালো হবে না৷’

‘এডি, লক্ষ্মীটি আমার কথা শোনো৷’ গ্লোরি আঁকড়ে ধরল ব্লেকের হাত, ‘মরগ্যান সংঘাতিক লোক৷ তার সম্বন্ধে নানা কথাই আমার কানে এসেছে৷ সারাটা জীবন সে পুলিশের ভয়ে পালিয়ে পালিয়ে কাটিয়েছে৷ মানুষ খুন ছাড়া হেন কাজ নেই যা মরগ্যান করেনি৷ তবে যেভাবে সে এগোচ্ছে, তাতে খুনটা খুব বেশিদিন বাকি থাকবে বলে আমার মনে হয় না৷ এডি, আমার এই একটা কথা রাখো; মরগ্যানের সঙ্গ তুমি ছেড়ে দাও৷ নইলে শুধু-শুধু তুমি নিজের বিপদ ডেকে আনবে—৷’

গত তিনমাস ধরে ব্লেকের একমাত্র নৈশসঙ্গিনী এই গ্লোরি ডসন৷ ওকে যে ব্লেকের তেমন একটা অপছন্দ তা নয়৷ তাছাড়া গ্লোরিই প্রথম—এবং সম্ভবত শেষ মানুষ যে ব্লেকের মঙ্গল কামনা করে, ওর ভালোমন্দের জন্যে চিন্তা করে, নিছক ব্লেককে ভালোবাসে বলেই, অন্য কোনও কারণে নয়৷ কিন্তু তবুও গ্লোরির এই গায়ে পড়ে উপদেশ দেওয়ার ব্যাপারটা ব্লেকের একেবারেই পছন্দ হল না৷ সে খেঁকিয়ে উঠল, ‘যাক, আর লম্বা-চওড়া উপদেশ দিতে হবে না৷ আমার ভালোমন্দ আমিই বুঝব৷ নাও, চলো—৷’

গ্লোরি নিরুপায় হয়ে কাঁধ ঝাঁকাল, ‘ঠিক আছে, তোমার যা ইচ্ছে তাই করো৷ অনুরোধ করা ছাড়া আর কী-ই বা আমি করতে পারি? কিন্তু আবারও বলছি এডি, মরগ্যান মোটেই ভালো লোক নয়৷ ওর দলে যোগ দিলে তুমি নিজেরই বিপদ ডেকে আনবে৷’

‘আচ্ছা বাবা, আচ্ছা—এবার থামো দেখি৷’ অধৈর্য হয়ে গ্লোরিকে বাধা দিল ব্লেক, ‘দোহাই তোমার এবারে চলো৷ আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে৷’

‘আজ রাতে কি তাহলে তোমার সঙ্গে দেখা হবে না৷’

‘না৷ এ কটা দিন আমি কাজে ব্যস্ত থাকব৷ কাজ মিটে গেলে তোমাকে ডেকে পাঠাব৷ হয়তো সামনের সপ্তাহেই সব চুকে বুকে যাবে—তবে তার আগে নয়৷’

মেয়েটি তাকাল ব্লেকের চোখে৷ মুখের ভাবে সংশয় ও সন্দেহ, ‘তুমি আর মরগ্যান মিলে কোনও বদ মতলব আঁটছ না তো? ওঃ এডি ভগবানের দোহাই…’

গ্লোরির হাত ধরে চেপে ধরল ব্লেক৷ টানতে টানতে ওকে নিয়ে এল ফ্ল্যাটের বাইরে৷ চাবি ঘুরিয়ে বন্ধ করে দিল ফ্ল্যাটের দরজা৷ চাবিটা পকেটে ভরে সে বলল, ‘তুমি একটু থামবে? বার বার এক কথা বলা আমি পছন্দ করি না৷ ভেব না, তুমি না হলে আমার চলবে না! এই বাজারে ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয় না৷ কথাটা মনে রেখো৷’

‘ঠিক আছে এডি৷ তোমার ভালোর জন্যেই আমি তোমাকে সাবধান করতে চেয়েছিলাম৷ কিন্তু তাতে যদি তুমি বিরক্ত হও, তাহলে…’

‘হ্যাঁ, আমি বিরক্তই হচ্ছি৷’ প্রায় ভেংচে উঠল ব্লেক৷ তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল, ‘এখন দয়া করে একটু থামবে?’

সদর দরজায় পৌঁছে গ্লোরি বলল, ‘তোমার জন্যে আমি কিন্তু অপেক্ষা করে থাকব৷ বেশিদিন দেরি করো না লক্ষ্মীটি৷’

‘আচ্ছা, আচ্ছা!—’ অধৈর্যভাবে হাত নেড়ে নিস্পৃহ স্বরে জবাব দিল ব্লেক৷ তারপর দ্রুত পায়ে হাঁটতে শুরু করল বাসস্টপের অভিমুখে৷

বাসে বসে ব্লেকের মনে হল জিনির কথা৷ চোখ-মুখে সোনালি রোদের উষ্ণতা অনুভবের সঙ্গে সঙ্গে, জিনি ও গ্লোরির মধ্যে বিশাল পার্থক্যটা তার কাছে ধরা পড়ল! জিনির চেহারা এবং সাহসের কথা ভেবে সে আরও একবার অবাক হল৷ ওকে পাশে নিয়ে পথ চলার স্বপ্ন দেখল ব্লেক৷ এই মুহূর্তে গ্লোরিকে তার ঘৃণা করতে ইচ্ছে হল৷

কিটসনের অবস্থাটা মনে মনে কল্পনা করার চেষ্টা করল ব্লেক৷ জিনির পাশে একা বসে নব-বিবাহিত স্বামী হিসেবে কেমন অভিনয় করছে সে, সেটা দেখতে ভীষণ ইচ্ছে করল তার৷ তার মানে অবশ্য এই নয় যে ঘুষি খাওয়া, থ্যাবড়ামুখো ছোঁরাটাকে সে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছে৷ নিছক কৌতূহলভরেই ব্লেক জানতে চাইল কিটসনের অবস্থাটা৷

আনমনাভাবে আহত চোয়ালে হাত বোলাল ব্লেক৷ যন্ত্রণার অনুভব তাকে মনে করিয়ে দিল গত রাতে কিটসনের সঙ্গে তার মারামারির কথা৷ ব্লেকের চোখজোড়া প্রতিহিংসার জ্বালায় জ্বলে উঠল, দৃষ্টি হয়ে উঠল ক্রূর৷ না এই অপমানের কথা কোনও দিনই সে ভুলবে না৷ এর শোধ এডওয়ার্ড ব্লেক তুলবেই তুলবে, আর সেদিন কিটসনকে দুঃখ করতে হবে তার ভুলের জন্যে৷

জিপোর কারখানার কাছে বাস যখন থামল, তখনও ব্লেক জিনির ভাবনায় মগ্ন৷ কারখানায় যাওয়ার উঁচু-নিচু রাস্তা ধরে পথ চলতে চলতে সে ভাবল কিটসনের কথা জিনির পাশে বসে সে কী নিয়ে কথা বলছে মেয়েটার সঙ্গে?

জিনির সঙ্গে কথাবার্তা খুব কমই বলছিল কিটসন৷ ষাট মাইল রাস্তা এইভাবে চুপচাপ ওর পাশে বসে পাড়ি দিতে হবে ভেবে সে হতাশ হল৷ সাধারণত মেয়েদের সামনে কিটসন একেবারেই চুপচাপ থাকে না৷ বরং প্রগল্‌ভতার চূড়ান্ত নিদর্শন হিসেবেই হাজির হয় ওদের কাছে৷ কিন্তু জিনির পাশে বসে নিজের এই অভাবনীয় পরিবর্তনে কিটসন নিজেও অবাক হল৷ সম্ভবত জিনির তেজস্ক্রিয় ব্যক্তিত্বের কাছে হীনমন্যতার শিকার হয়ে পড়েছে—তাই তার জিভ আড়ষ্ট৷ অথচ জিনির মতো করে আর কোনও মেয়ের সঙ্গ সে কোনওদিন কামনা করেনি৷

জিনি কিন্তু একনাগাড়ে বকবক করেই চলেছে৷ হঠাৎ হঠাৎ একটা প্রশ্ন করে কিটসনকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলছে৷ বেশিরভাগ প্রশ্ন কিটসনের মুষ্টিযোদ্ধার অধ্যায় সংক্রান্ত৷ বিভিন্ন মুষ্টিযোদ্ধা সম্পর্কে তার ব্যক্তিগত মতামত, এবং তাঁদের সম্ভাবনাময় জীবনে হঠাৎ ইতি পড়ার কারণ—এই সব জানতে চেয়ে ও কিটসনকে ভীষণ বিব্রত করে তুলল! কিটসন বারকয়েক ইতস্তত করে বুদ্ধিদৃপ্ত উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে৷ চোখেজোড়া গভীর একাগ্রতায় সামনের রাস্তার দিকে নিবদ্ধ৷ পরবর্তী তিন-চার মাইল হয়তো কেটে গেল অখণ্ড নীরবতায়৷ তারপর আবার হয়তো শুরু হল জিনির অস্বস্তিকত প্রশ্নবাণের পালা৷

একসময় জিনি আচমকা বলে উঠল, ‘দু-লাখ ডলার পেলে সেটা নিয়ে কী করবে ভাবছ?’

কিটসনের মুখের দিকে উৎসুকভাবে চেয়ে ও পায়ের ওপর পা-তুলে বসল৷ এক ভগ্নমুহূর্তে দেখা গেল জিনির সুঠাম উরু৷ নিখুঁত ভঙ্গিমায় অবাধ্য স্কার্টকে আবার যথাস্থানে স্থাপন করল ও ব্যাপারটা কিটসনের চোখ এড়াল না৷ মনঃসংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় দিগভ্রান্ত বুইকের স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে আবার আয়ত্তে আনল সে৷

‘এখনও তো টাকা পাইনি৷ সুতরাং এত আগে থেকে স্বপ্ন দেখার কোনও মনে হয় না৷’

‘তার মানে আমাদের এই প্রাপ্তিযোগ সম্পর্কে তোমার মনে এখনও সন্দেহ আছে?’ একটু অবাক হল জিনি৷

সে ইতস্তত করল, রাস্তার দিকে নজর রেখে ধীর স্বরে জবাব দিল, ‘যদি সত্যিই আমরা টাকাটা পাই, তবে নিজেদের ভাগ্যবান বলে মনে করব৷ কারণ টমাস আর ডার্কসনের সঙ্গে আমি কাজ করেছি, আমি ওদের ভালো করেই চিনি৷ ওরা আমাদের সহজে রেহাই দেবে না৷’

‘সেটা পুরোপুরি আমাদের ওপর নির্ভর করছে৷’ শান্তস্বরে বলল জিনি, ‘টমাস ও ডার্কসনকে যদি ঠিকভাবে সমঝে দেওয়া যায় যে আমরা নেহাত ছেলেখেলা করতে আসিনি, তাহলে ওরা আর বাধা দেবে বলে মনে হয় না৷…তাছাড়া, ওদের জন্যে আমি এতটুকু চিন্তিত নই৷ প্ল্যানমাফিক কাজ হলে আর কোনও ভয় নেই৷ টাকা আমরা পাবই—অন্তত আমি এ ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত৷’

‘বললাম তো সে ক্ষেত্রে ভাগ্যকে ধন্যবাদ দেওয়া ছাড়া উপায় নেই৷’ কিটসন একই কথার পুনরাবৃত্তি করল, ‘আমাদের প্ল্যানটা যে খারাপ তা আমি বলছি না৷ বিশেষ করে একটা গোটা ট্রাককে একটা ক্যারাভ্যানের মধ্যে লুকিয়ে ফেলার বুদ্ধিটা তো এক কথায় অপূর্ব! কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে তাহলেই আমরা ট্রাকটার তালাটা খুলে ফেলতে পারব! আচ্ছা ধরে নেওয়া যাক, যেভাবেই হোক ট্রাকটা আমরা খুললাম এবং যার-যার টাকা ভাগ করে নিলাম৷ তারপর? দু-লাখ ডলার নেহাত চাট্টিখানি ব্যাপার নয়? অত টাকা তুমি ব্যাঙ্কে রাখতে পারবে না, কারণ পুলিশ সারাক্ষণ তক্কে তক্কে থাকবে৷ সুতরাং ওই এক বস্তা ক্যাশ টাকা নিয়ে আমরা করব কী?’

‘কেন? টাকাটা একটা সেফটি ভল্টে রেখে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়! তাতে তো আর পুলিশের ভয় নেই৷’

‘নেই যে তা বলি কেমন করে? গত বছর সেই ব্যাঙ্ক লুটের ব্যাপারটা তোমার মনে আছে? তারাও ঠিক তোমার কথামতো লুটের টাকা সেফ ডিপোজিট ভল্টে লুকিয়ে রেখেছিল৷ কিন্তু পুলিশ তো আর ঘাস খায় না৷ ওরা শহরের প্রতিটি ভল্ট একে একে খুলে দেখতে লাগল, এবং শেষ পর্যন্ত ঠিক খুঁজে পেল ব্যাঙ্ক লুটের সমস্ত টাকা৷’ কিটসনের আঙুল চেপে ধরল স্টিয়ারিং হুইলের ওপর৷ চোখের দৃষ্টি স্থির৷

‘তাই যদি হয়, তবে টাকাটা নিয়ে সোজা চলে যাব ন্যু-ইয়র্ক অথবা সানফ্রানসিসকোয়—অথবা তার চেয়েও আরও দূরে, ছোট্ট কোনও শহরে৷ সেখানে তো পুলিশ আর আমাদের খোঁজ পাবে না৷ তা ছাড়া পুলিশের পক্ষে গোটা আমেরিকার প্রতিটা ভল্ট খুলে দেখা তো সম্ভব নয়৷’

‘সে না হয় হল; কিন্তু অবস্থাটা একবার ভেবে দেখো; দু-লক্ষ ডলার সঙ্গে নিয়ে তোমাকে দেশান্তরী হতে হবে৷ অর্থাৎ টাকাটা সঙ্গে করে বইতে গেলে একটা বড় সুটকেস ভর্তি হয়ে যাবে৷ মনে কর সুটকেস নিয়ে ট্রেনে ওঠার পর পুলিশ হঠাৎ ট্রেনের তল্লাশি নিতে শুরু করল, তখন? কারণ ট্রাক লুটের পর পুলিশ হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না, তারা আপ্রাণ চেষ্টা করবে দশ লক্ষ ডলার উদ্ধার করতে৷ সুতরাং…’

‘ওঃ তুমি দেখছি ভীষণ ভীতু!” জিনির কথায় সহানুভূতির আভাস পেয়ে কিটসন অবাক হল, ‘অতই যদি ভয় তাহলে এ কাজের পক্ষে ভোট দিলে কেন?’

 এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ইচ্ছে কিটসনের বিন্দুমাত্রও ছিল ন৷ তাই আলোচনায় পূর্ণচ্ছেদ টানতে চাইল সে, ‘যাকগে ওসব কথা বাদ দাও৷ ফ্র্যাঙ্ক আমার কথা শুনলে হয়তো বলে বসত, প্রলাপ বকছি৷ তাছাড়া আমার মনে হয় একাজে আমরা সফল হব৷’ অস্বস্তিকর চিন্তা মন থেকে সরিয়ে দিয়ে জিনিকে আশ্বাস দিল কিটসন, ‘এবার তুমি বলো তোমার টাকা নিয়ে তুমি কী করবে?’

সিটের গায়ে হেলান দিয়ে বসল জিনি৷ ওর উদ্ধত চিবুক এগিয়ে এল সামনের দিকে৷ উইন্ডশিল্ডের গায়ে জিনির সুন্দর মুখমণ্ডলের প্রতিটি প্রতিবিম্ব কিটসনকে আরও একবার মুগ্ধ করল৷

‘ও, সে সব অনেক আগে থেকেই আমার ঠিক করা আছে৷ অবশ্য তোমার তা ভালো নাও লাগতে পারে৷ টাকা থাকলে মানুষ যা খুশি তাই করতে পারে, যা খুশি!…গত বছর আমার বাবা মারা গেছেন৷ যদি বাবার কিছু টাকা থাকত, তাহলে বোধহয় তিনি আজ বেঁচে থাকতেন৷ বাবা মারা যাওয়ার সময় আমি কাজ করতাম একটা সিনেমা হলে, অতি সাধারণ চাকরি৷ সুতরাং দামি ওষুধ-পত্রের সংস্থান করা সম্ভব ছিল না৷ বাবা মারা যাওয়ার পর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, টাকার অভাবের জন্যে এ পৃথিবীকে ছেড়ে যেতে আমি রাজি নই৷ বাবার মতো শুয়ে থেকে নির্জীবের মতো হার মেনে নিতে আমি রাজি নই৷ তাই অনেক মাথা খাটিয়ে এই ট্রাক-লোপাটের প্ল্যানটা আবিষ্কার করলাম৷’

জিনির অভাবিত অপ্রত্যাশিত এই আত্ম-উন্মোচনে কিটসন বিচলিত হল। এই ট্রাক-লোপাটের ব্যাপারে জিনির মন যে স্থির প্রতিজ্ঞ, তা জানতে পেরে সে যেন স্বস্তিবোধ করল। কিটসন বুঝল, জিনি ক্রমশই তার ওপরে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।

‘কিন্তু এই ট্রাক ও দশ লাখ ডলারের খবর তুমি পেলে কেমন করে?’ সে প্রশ্ন করল।

কিছু বলতে গিয়ে চুপ করে গেল জিনি।

কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতার পর কিটসন চোখ ফেরাল ওর দিকে। দেখল, ওর মুখে ফিরে এসেছে আগের সেই বরফ-কঠিন নির্বিকার অভিব্যক্তি। কিটসন হঠাৎ যেন দমে গেল। সাত তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘ভেব না আমি তোমার হাঁড়ির খবর জানতে চাইছি! এমনি কৌতূহল হল, তাই জিজ্ঞেস করলাম৷ যাক গে, কিছু মনে কোরো না—কোনও ভুল হয়ে থাকলে মাপ চাইছি৷’

জিনি তাকাল কিটসনের চোখে৷ ওর সমুদ্র-সবুজ চোখে শূন্য দৃষ্টি৷ তারপর ঝুঁকে পড়ে ও অন করল রেডিওর সুইচ৷ কিছুক্ষণ নবগুলো নাড়াচাড়া করার পর রেডিওতে ভেসে এল আধুনিক যন্ত্র-সংগীতের সুর৷ সিটে গা এলিয়ে বাজনার তালে তালে পা নাচাতে লাগল জিনি৷

কিটসন বুঝল, তাদের আলোচনায় পূর্ণচ্ছেদ টানার এ এক সুস্পষ্ট ইঙ্গিত৷ নিজের ওপর মনে মনে বিরক্ত হল সে; অ্যাকসিলারেটরে চাপ দিয়ে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল কিটসন৷

মিনিট কুড়ি পর ক্যারাভ্যান-মার্ট-এর সামনে এসে থামল কিটসনের বুইক৷ দোকানের নাম ‘দ্য কোয়ালিটি কার অ্যান্ড ক্যারাভ্যান সেন্টার৷’ মার্লো থেকে মাইলখানেক দূরে বড় রাস্তার ওপরেই অবস্থিত দোকানটা৷

কিটসনের চোখে পড়ল একটা সবুজ-সাদা রঙের কাঠের ঘর—সম্ভবত অফিসঘর৷ তার পাশেই বিরাট গ্যারেজ—পুরোনো গাড়ি, লরি, ক্যারাভ্যান সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড় করানো৷ ওদের গাড়ি দোকানের কাছে থামতেই অফিস ঘর থেকে পড়িমড়ি করে দৌড়ে এল এক অল্পবয়সি যুবক৷ তাকে দেখেই কিটসনের বিরক্তি আরও বেড়ে গেল৷ যে ধরনের ছেলেদের সে সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করে, লোকটা দুর্ভাগ্যবশত সেই দলের৷ তার মুখশ্রী সাধারণের চেয়ে সুন্দর, গায়ের রঙ তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ, মাথায় কোঁকড়ানো কালো চুল, গভীর নীল চোখের তারা সজীব, প্রাণবন্ত৷ লোকটার পরনে সাদা গরম স্যুট, একটা ঘিয়ে রঙের শার্ট এবং একটা রক্ত-লাল টাই৷ ডান হাতের শক্ত কবজিতে একটা দামি ওমেগা ঘড়ি সোনার ব্যান্ড দিয়ে আটকানো৷

লোকটা কিটসনের গাড়ির কাছে উদগ্রীব হয়ে এগিয়ে এল৷ একটা মোটা দাঁও মারার প্রত্যাশায় তার মুখে চোখে আশার আলো জ্বলজ্বল করছে৷

গাড়ির দরজার কাছে পৌঁছে সে থমকে দাঁড়াল৷ তারপর চট করে এগিয়ে গেল ওপাশের দরজার দিকে—যে দিকে জিনি বসে আছে৷ লোকটা দরজা খুলে ধরতে জিনি গাড়ি ছেড়ে নামল৷ তার একগাল হাসি ভরা প্রিয়জনসুলভ অভ্যর্থনার বহর দেখে কিটসনের মুষ্টিবদ্ধ হাত নিশপিশ করতে লাগল আক্রোশে৷

‘ক্যারাভ্যান সেন্টারে এসেছেন বলে ধন্যবাদ ম্যাডাম৷’ মাথা ঝুঁকিয়ে লোকটা নাটকীয় ঢঙে বলে উঠল, ‘এখানে এসে ভালোই করেছেন৷

আপনাদের একটা ক্যারাভ্যান চাই, এই তো? আমাদের চেয়ে ভালো ক্যারাভ্যান এ চত্ত্বরে কোত্থাও পাবেন না! আসুন—দেখবেন আসুন—’

কিটসন ইতিমধ্যে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে৷ লোকটার কথায় সে মুখ দিয়ে হুম করে একটা অস্পষ্ট শব্দ করল৷ লোকটার গায়ে পড়া স্বভাব দেখে তার অস্বস্তি হল৷

‘আমার নাম হ্যারি কার্টার৷’ নিজের পরিচয় দিল লোকটা৷ বুইকের চারপাশে একটা চক্কর দিয়ে কিটসনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে—কাঁধ ঝাঁকাল৷

‘আপনি ঠিকই ধরেছেন মিঃ কার্টার, আমরা একটা জুতসই ক্যারাভ্যানের খোঁজ করছি—তাই না, আলেক্স?’ জিনির স্বর কিশোরীর মতো খুশি খুশি শোনাল৷

হ্যারি কার্টার জিনির হাসির প্রত্যুত্তরে আকর্ণবিস্তৃত হাসি হাসল, ‘তাহলে বলতে হবে, আপনারা ঠিক উপযুক্ত জায়গাতেই এসেছেন৷ আপনাদের জীবনে এ এক স্মরণীয় অধ্যায়—এর গুরুত্ব আপনাদের কাছে অনেকখানি,… কিন্তু নিশ্চিন্ত থাকুন, ক্যারাভ্যান নিয়ে আপনাদের এতটুকু অসুবিধেয় পড়তে হবে না৷ যেটা পছন্দ হয় সেটা বেছে নিন—সব রকম ক্যারাভ্যান আমাদের দোকানে রয়েছে৷ আপনাদের কিরকম চাই, সেটা খালি আমাদের বলুন৷’

কার্টারের হাত থেকে হাত ছাড়িয়ে কিটসন গম্ভীরভাবে বলে উঠল, ‘একটু কম দামের মধ্যে চাই৷’

‘দাম নিয়ে বিন্দুমাত্রও ভাববেন না,’ তড়িঘড়ি কিটসনকে বাধা দিল কার্টার৷ কিন্তু তার চোখ-জোড়া জিনির সুঠাম পায়ের দিকে, ‘কম দামের ক্যারাভ্যানও এখানে অনেক আছে৷ আসুন না, ঘুরে ফিরে দেখবেন৷ যেটা আপনাদের পছন্দ হয় বলুন, দামের জন্যে ভাববেন না৷’

কার্টারকে অনুসরণ করে ওরা এগিয়ে গেল দাঁড়িয়ে থাকা ক্যারাভ্যানগুলোর দিকে৷

মনমতো ক্যারাভ্যানটাকে খুঁজে পেতে কিটসনের বেশ কিছু সময় লাগল৷ কারণ জিপোর নির্দেশমতো ক্যারাভ্যানটা কম করে ষোলোফুট লম্বা হওয়া দরকার, এবং তাতে অতিরিক্ত সাজ-সরঞ্জাম না থাকাই বাঞ্চনীয়৷ কিটসন বেশ কিছুটা ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যারাভ্যানটাকে হঠাৎই লক্ষ করল৷ সে থমকে দাঁড়াল ওটা পরীক্ষা করে দেখার আশায়৷

ক্যারাভ্যানটা সাদা রঙের, কিন্তু ছাদের রং আকাশ-নীল৷ দু-পাশে এবং সামনে পিছনে দুটো করে জানলা৷

‘এটায় কাজ চলতে পারে৷’ জিনিকে লক্ষ করে বলল কিটসন৷ জিনি প্রত্যুত্তরে সংক্ষিপ্ত মাথা দোলাল৷ ‘মিঃ কার্টার, এটার মাপ কত?’

‘কোনটা? এই সাদাটা?’ কার্টার যেন অবাক হল, ‘আমার মনে হয় আপনাদের পক্ষে তেমন জুতসই হবে না, মিঃ…’ কার্টার চোখ রাখল কিটসনের চোখে, ‘আপনার নামটা কিন্তু এখনও জানি না, মিঃ…’

‘হ্যারিসন৷’ কিটসনের মুখে কোনওরকম ভাব পরিবর্তন হল না, ‘মাপ কত ক্যারাভ্যানটার?’

‘সাড়ে ষোলো বাই ন-ফুট৷ সত্যি বলতে কী মিঃ হ্যারিসন, এই ক্যারাভ্যানটা আসলে শিকার-টিকার করার জন্যে তৈরি—এবং সেই কারণেই বেশ শক্তপোক্ত৷ তাছাড়া ভেতরে সেরকম কোনও সুব্যবস্থাও নেই—বুঝতেই তো পারছেন৷ আপনার স্ত্রী সম্ভবত এটা একেবারেই পছন্দ করবেন না, তাই না মিসেস হ্যারিসন?’ কার্টারের চোখজোড়া আবার গিয়ে থমকাল জিনির সুগঠিত পায়ের ওপর, ‘অবশ্য এটার মতো অন্য ক্যারাভ্যানও আছে—তাতে সবরকম বন্দোবস্তই করা রয়েছে—দেখবেন আসুন, একেবারে ‘এ’ ক্লাস জিনিস৷’

কিটসন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল৷ তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে দেখতে লাগল ক্যারাভ্যানটার চাকা, স্বয়ংক্রিয় ব্রেক… বুঝল ক্যারাভ্যানটার ওজন বইবার ক্ষমতা৷ তাছাড়া জিপো বার বার বলে দিয়েছিল স্বয়ংক্রিয় ব্রেকের কথা৷ নাঃ, এ জিনিসই তাদের চাই৷

‘আমার স্বামী দেবতা হাতের কাজে ওস্তাদ৷’ ঠাট্টার সুরে বলে উঠল জিনি, ‘আমাদের আসল মতলবটা তাহলে আপনাদের খুলেই বলি, মিঃ কার্টার৷’ কার্টারের নীল চোখে কপট কৌতূহল৷ আমরা ঠিক করেছি, একটা ক্যারাভ্যান কিনে সেটাকে নিজের মনমতো করে সাজিয়ে গুছিয়ে নেব৷ এর ভেতরটা একবার দেখতে পারি?’

কার্টার কিছুটা দমে গেলেও চটপট জবাব দিল, ‘ও নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই৷ তবে এটা দেখা হয়ে গেলে আরও একটা ক্যারাভ্যান আপনাদের কষ্ট করে দেখতে হবে৷ তাহলেই বুঝবেন আমি ‘এ’ ক্লাস বলতে কী বোঝাতে চাইছি৷ এটা নিছকই একটা বাক্স বুঝলেন কি না?’

কার্টার ক্যারাভ্যানের দরজা খুলতেই জিনি ও কিটসন ভেতরে উঁকি মারল৷

সেই মুহর্তেই কিটসন তার ধারণা সম্পর্কে নিশ্চিত হল৷ ক্যারাভ্যানের ভেতরে দু-একটা হালকা শেলফ, র‌্যাকে দিয়ে সাজানো৷ এগুলোকে মিনিট কয়েকের চেষ্টাতেই খুলে সাফ করে দেওয়া যায়৷ কিটসন এবার ঢুকল ক্যারাভ্যানের ভেতর৷ নাঃ, মেঝেটা ভীষণ মজবুত; তাছাড়া দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও কিটসনের মাথার ওপর প্রায় ইঞ্চিকয়েক জায়গা রয়েছে৷

এরপর হ্যারি কার্টারের অনুরোধে দ্বিতীয় ক্যারাভ্যানটাও ওরা দেখল, এবং সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দিল, প্রথমটাই ভালো৷

নীল-সাদা ক্যারাভ্যানটা দিকে পা চালাতে চালাতে কিটসন জানাল, ‘মিঃ কার্টার, প্রথমটাই আমাদের বেশ পছন্দ হয়েছে৷ কত দাম পড়বে ওটার?’

ক্যারাভ্যানটার পাশে দাঁড়িয়ে ওটার ওপর চোখ বোলাতে লাগল কার্টার৷ বোধহয় মনে মনে কিটসনের পকেটের জোর আন্দাজ করতে চাইল৷

‘এই ক্যারাভ্যানটা বেশ মজবুত, মানে টেঁকসই, বুঝলেন মিঃ হ্যারিসন৷’ কার্টার তার গৌরচন্দ্রিকা শুরু করল, ‘বহু বছর পর্যন্ত এটা আপনাদের কাজে আসবে৷ না, এটা নিয়ে আপনারা ঠকবেন না৷ এটার নতুন দাম হচ্ছে তিন হাজার আটশো ডলার৷ তবে এটা তো আর নতুন নয়, তাই দামটা না হয় কিছু কমানো যাবে৷ কিন্তু দেখতেই তো পাচ্ছেন, এর গায়ে একটা আঁচড় পর্যন্ত নেই, মানে, যারা এটা নতুন কিনেছিল তারা পুরো ছ’মাসও জিনিসটা ব্যবহার করেনি৷ আর আপনাদের জিনিসটা যখন পছন্দ হয়েছে, মানে হানিমুনের ব্যাপার—তখন আর বেশি দাম বলি কী করে, বলুন? নিন, মাত্র আড়াই হাজারেই ক্যারাভ্যানটা আপনাদের দিয়ে দিচ্ছি৷ একেবারে জলের দর মশাই, এক্কেবারে জলের দর!’

‘উঁহু, অত দাম তো আমরা দিতে পারব না৷’ কিটসন কিছু বলার আগেই জিনি বলে বসল৷ ‘তাহলে মনে হচ্ছে এটা আর আমরা নিতে পারলাম না, মিঃ কার্টার৷ চলো আলেক্স, অন্য কোথাও যাওয়া যাক৷’

কার্টার বিজ্ঞের হাসি হাসল, ‘আমি এমন কিছু বেশি দাম বলিনি, মিসেস হ্যারিসন৷ এ এলাকায় আর কোথাও আপনি ক্যারাভ্যান পাবেন না৷ সেই এক পাবেন সেন্ট লরেন্সে গেলে—তবে সেখানে জিগ্যেস করলে বুঝতে পারবেন আমাদের চেয়ে সেখানে দাম কত বেশি! যদি আপনাদের এটার দাম বেশি মনে হয়, তাহলে আসুন, একটু কম দামের মধ্যে অন্য ক্যারাভ্যান আপনাদের দেখাই৷ ওই তো ওটা দেখছেন—ওটার দাম মাত্র পনেরোশো ডলার—ওটা অবশ্য তেমন মজবুত নয়, কিন্তু শৌখিনভাবে সাজানো৷’

‘আঠারোশো ডলার পর্যন্ত আমি উঠতে পারি, মিঃ কার্টার৷’ কিটসন নির্বিকারভাবে বলল, ‘তার বেশি দেওয়া আমাদের ক্ষমতার বাইরে৷’

অনুকম্পার হাসি কার্টারের সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল, ‘আপনার শর্তে রাজি হতে পারলে খুশি হতাম, মিঃ হ্যারিসন, কিন্তু আমি নিরুপায়৷ বিশ্বাস করুন আঠারোশো ডলার একদম পোষায় না৷ জিনিসটা আপনার পছন্দ হয়েছে বলেই আপনাকে ফিরিয়ে দিতে খারাপ লাগছে—ঠিক আছে, নিন, পুরোপুরি তেইশশো ডলারই দেবেন৷ এর চেয়ে কম করতে বলবেন না৷’

কিটসনের মেজাজ ক্রমশ তিরিক্ষে হয়ে উঠতে লাগল৷ কার্টারকে কলার ধরে দুটো ঝাপ্পড় দেবার ইচ্ছেকে সে অতিকষ্টে দমিয়ে রাখল৷

কার্টারের মোলায়েম, ভদ্র কথাবার্তা, তার সুন্দর ব্যবহার, বুদ্ধিদীপ্ত চোখ কিটসনকে ঈর্ষান্বিত করে তুলল৷ কারণ জীবনে যে সফলতার স্বপ্ন সে দেখেছিল তার চেহারা অনেকটা কার্টারের মতো৷ ব্যর্থতা ও হতাশা মিশে কিটসন অনুভব করল এক অদ্ভুত জ্বালা৷

‘কিন্তু অত টাকা দিয়ে ক্যারাভ্যান কেনার ক্ষমতা আমাদের নেই, মিঃ কার্টার৷’ জিনি বলে উঠল৷ ওর সবুজ চোখে এক বিশেষ মাদকতার দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে রইল কার্টারের চোখে৷ কিটসনের চোখজোড়ায় খেলে গেল ক্রোধের বিদ্যুৎ৷ জিনির এই মোহিনী ভঙ্গিমায় যেন ঝরে পড়ছে যেন আবেদন, আর কার্টার সেটা ক্ষুধার্ত হায়েনার মতো চোখ দিয়ে চাটছে৷ এমন করে ও তো কোনওদিন কিটসনকে দেখিনি! ‘ওটাকে দু-হাজারই করুন না৷ বিশ্বাস করুন ওর চেয়ে বেশি টাকা আমাদের সঙ্গে নেই!’

কার্টার চিন্তিতভাবে গোঁফে হাত বোলাল৷ অসীম কৌতূহলভরে জিনির দেহের প্রতিটি বাঁক জরিপ করল৷ কিছুক্ষণ ইতস্তত করে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে সে কাঁধ ঝাঁকাল, ‘আপনার অনুরোধকে আগ্রাহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই, মিসেস হ্যারিসন৷ অন্য কেউ হলে এ প্রস্তাবে আমি কখনই রাজি হতাম না৷ সত্যি কথা বলতে কী, দু-হাজারে ক্যারাভ্যানটা বেচলে আমার অন্ততপক্ষে একশো ডলার লোকসান যাবে—কিন্তু টাকাটাই তো বড় কথা নয়৷ ঠিক আছে, এটাকে আপনাদের বিয়ের উপহার বলেই ধরে নিন; আপনাদের জন্যে ওটার দাম আমি দু-হাজারেই নামিয়ে দিলাম৷

বুঝলেন মিসেস হ্যারিসন, সম্পর্কটাই আসল, টাকা-পয়সার কোনও দামই সেখানে নেই৷’

কিটসনের ফরসা মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল৷ উত্তেজনায় তার হাত মুষ্টিবদ্ধ হল৷

‘শুনুন, মশায়…’ কিটসনের উত্তেজিত স্বরকে বাধা দিল জিনি, ‘ধন্যবাদ, মিঃ কার্টার, আপনার সহযোগিতার জন্যে আমরা কৃতজ্ঞ৷ দু-হাজারে আমরা রাজি৷’ জিনির মনকেড়ে নেওয়া, ইঙ্গিতময় হাসি নিছক ব্যর্থ হল না৷

কান এঁটো করা হাসি হেসে কার্টারের দৃষ্টি জিনির দিকে তীক্ষ্ণ হল, ‘এতে আর ধন্যবাদের কী আছে মিসেস হ্যারিসন৷ নেহাত আপনি বললেন, ‘তাই খাতির করলাম৷ আমার লোকেদের বলে দিচ্ছি ক্যারাভ্যানটা আপনার গাড়ির সঙ্গে জুড়ে দেবে৷ আসুন, অফিসে বসে লেনদেনটা সেরে ফেলা যাক৷’ এবার কিটসনের দিকে ফিরল কার্টার—মুখে অনুগ্রহের হাসি, ‘আমার অভিনন্দন গ্রহণ করুন মিঃ হ্যারিসন৷ দরাদরির ব্যাপারে আপনার স্ত্রীর জুড়ি নেই—আমার মতো ব্যবসাদারকে পর্যন্ত তিনি রাজি করিয়ে ফেললেন! সত্যি এমন স্ত্রী পাওয়া ভাগ্যের কথা৷’

অফিসে এসে ওদের লেনদের সম্পূর্ণ হল৷ কার্টার যেন ছল-ছুতোয় দেরি করতে চাইল৷ বিলটা দু-আঙুলে ধরে সে সশ্রদ্ধ দৃষ্টিতে জিনির দিকে তাকাল, ‘হানিমুন কাটাতে কোথায় যাচ্ছেন, মিসেস হ্যারিসন? প্যারিসে?’

‘উহুঁ! আমার স্বামী মাছ ধরতে খুব ভালোবাসেন৷ তাই ভাবছি কোনও পাহাড়ি এলাকাতেই যাব৷ তারপর কী হয় পরে দেখা যাবে৷’

কিটসন হাত বাড়িয়ে কার্টারের হাত থেকে বিলটা ছিনিয়ে নিল৷ কার্টারের লোলুপ দৃষ্টি সে একেবারেই সহ্য করতে পারছে না; অথচ জিনি সম্পূর্ণ নির্বিকার৷

‘চলো, এবার ওঠা যাক৷ ওদিকে আবার একগাদা কাজ পড়ে রয়েছে৷’ জিনিকে লক্ষ করে কিটসন বলে উঠল৷

কার্টার কৃপার হাসি হাসল, উঠে দাঁড়াল, ‘আপনাদের শুভ মধুচন্দ্রিমা কামনা করি৷ পরে যদি কোনওদিন এই ক্যারাভ্যানটা পালটে নতুন কিছু কেনার ইচ্ছে হয়, লজ্জা করবেন না—সোজা আমার কাছে চলে আসবেন৷’ কথা শেষ করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় নিয়ে জিনির সঙ্গে হাত ঝাঁকাল কার্টার৷

কিটসন বিরক্ত হয়ে পকেটে হাত ভরে রাখল৷ কার্টারের সঙ্গে হাত ঝাঁকাতে তার গা রি-রি করছিল৷ নিজেকে সংযত করে সে এগিয়ে চলল—দরজার দিকে৷

ক্যারাভানটা ততক্ষণে বুইকের পিছনে লাগানো হয়ে গেছে৷ কার্টার জিনির সঙ্গে কথা বলতে-বলতে গাড়ির দিকে এগিয়ে চলল, পিছনে কিটসন৷

জিনিকে গাড়িতে তুলে দেওয়ার ভঙ্গি দেখে কার্টারের ওপর কিটসনের রাগ যেন দপ করে জ্বলে উঠল৷ কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে সে নিজেকে সামলে নিল৷ কার্টার তার পিঠে এক সশব্দ চড় মেরে আসন্ন মধুচন্দ্রিমা সম্পর্কে শুভেচ্ছা জানাল৷

ক্যারাভ্যান মার্ট ছেড়ে ওদের গাড়ি ছুটে চলতেই জিনি বলল, ‘যাক জিনিসটা বেশ সস্তায় পাওয়া গেছে—মরগ্যান খুশিই হবে৷’

কিটসন চাপা স্বরে ফেটে পড়ল, ‘ওই হতভাগাকে কষে ধোলাই দেওয়া উচিত ছিল৷ ব্যাটা যেভাবে তোমার দিকে তাকাচ্ছিল…’

জিনি চট করে মুখ ফিরিয়ে তাকাল কিটসনের দিকে; ওর সবুজ চোখে বিরক্তি এবং ঘৃণা৷

‘তার মানে?’

‘না, ওই কার্টারের কথা বলছি৷ ব্যাটা যে রকম জুলজুল করে তোমাকে দেখছিল, ইচ্ছে করছিল ওর নাকে একখানা বসিয়ে দিই!’

‘কে আমার দিকে কিভাবে তাকাল, তাতে তোমার কী?’ জিনির স্বর বরফ শীতল, ‘আমি তোমার বিয়ে করা বউ নই; তবে মিছিমিছি উত্তেজিত হচ্ছ কেন?’

কিটসনের মুখে কেউ যেন সজোরে চড় মারল৷ অপমানে তার মুখ হয়ে উঠল রক্তিম৷ শক্ত মুঠোয় স্টিয়ারিং চেপে ধরে একমনে গাড়ি ছুটিয়ে চলল৷

জিপোর কাখানায় পৌঁছনো পর্যন্ত সে একেবারের জন্যেও মুখ খুলল না৷

সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই আসল কাজের জন্যে ক্যারাভ্যানটাকে তৈরি করে ফেলল জিপো, ব্লেক ও কিটসন৷

ওই এগারো দিন ধরে জিপোর কাছ ছেড়ে নড়েনি ব্লেক৷ এমনকী জিপোর নোংরা আস্তানাতেই সে রাত কাটিয়েছে৷ ব্লেকের এতটা কর্মঅন্ত-প্রাণ হওয়ার একটা বিশেষ কারণ আছে৷ সে জানে, মরগ্যান তার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে৷ তাই প্রাণপণ পরিশ্রম করে সে মরগ্যানকে দেখাতে চাইছে, এ কাজ সম্পর্কে তার উৎসাহ কম নয়; এবং তার ওই ব্যর্থতা সাময়িক, সেটাও মরগ্যানকে বুঝিয়ে দিতে সে বদ্ধপরিকর৷

জিপোর কাছে শুয়ে রাত-কাটানো যে কী দুঃসহ ব্যাপার সেটা একদিনে ব্লেক বেশ বুঝতে পেরেছে৷ আসল কথা হল, জিপোর মতো নোংরামি ও কষ্টসহ্য করার ক্ষমতা তার একেবারেই নেই৷ ইটালিতে চাষ-বাসের কাজ করত বলে জিপো সবরকম অবস্থাতেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে৷ তাই বিভিন্ন অস্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি ওর নির্লিপ্ততায় ব্লেক অবাক হয়েছে—সেইসঙ্গে হয়েছে বিরক্তও৷

কিটসন প্রতিদিন সকালে ঘড়ি ধরে আটটার সময় কারখানায় আসে, আর রাত বারোটায় ফিরে যায় ঘরে৷ ওরা তিনজন সারাদিন ধরে ক্যারাভ্যানটার পিছনে লেগে থাকে৷ ওটা যাতে ট্রাকটাকে বইতে পারে, সেজন্য আপ্রাণ পরিশ্রম করে চলে৷

এই ক্যারাভ্যানটা নিয়ে কাজ করার সময়েই ব্লেক এবং কিটসন উপলব্ধি করল জিপোর কর্মদক্ষতা৷ ওর বু্দ্ধি এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতার সাহায্য না পেলে কাজ যে এতটুকু এগোত না, সেটা ওরা দুজনে বেশ বুঝতে পারল৷

ব্লেক এমনিতে জিপোকে বিশেষ পাত্তা দিত না৷ কিন্তু এই কাজের সময় সে আবিষ্কার করল যন্ত্র-সংক্রান্ত ব্যাপারে জিপোর তুলনায় তারা নিতান্তই এক-একটি গর্দভ৷ জিপোর সাহায্য ছাড়া যে এই ট্রাক-লুট করার কথা ভাবা যায় না, সেটা ব্লেকের মগজে ঢুকল৷ সেইসঙ্গে ঈর্ষা এবং বিরক্তি তাতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল৷

কিন্তু কিটসন এই সরল সাদাসিধে ইটালিয়ানের কাজ দেখে ভীষণ খুশি হল৷ মনে-মনে জিপোকে শ্রদ্ধা করতে আরম্ভ করল সে৷ তার মনে হল, জীবনে এই প্রথম সে একটা কাজ শিখছে৷ তাছাড়া জিপোর একাগ্রতা ও ধৈর্য তাকে মুগ্ধ করল৷

মঙ্গলবার রাতে ক্যারাভ্যানের কাজ শেষ হল, এবং সেই রাতেই জিপোর কারখানায় মরগ্যান এক আলোচনা সভার আহ্বান জানাল৷

গত এগারো দিন ধরে জিনি একেবারে বেপাত্তা৷ ও মরগ্যানের কাছে একটা টেলিফোন নাম্বার দিয়ে বলেছিল, যদি পরিকল্পনার কোনও পরিবর্তন হয় তবে ওকে যেন ফোন করে জানিয়ে দেওয়া হয়৷ কিন্তু ও কোথায় থাকে—কী করে, সে সম্পর্কে কারোরই কোনও ধারণা নেই—এমন কী মরগ্যানও এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অন্ধকারে৷

জিপোর সঙ্গে কিটসন কাজে ব্যস্ত থাকলেও কিটসন সর্বদাই জিনির কথা ভেবেছে৷ সে যে নিজের অজান্তেই জিনিকে ভালোবেসে ফেলেছে, সেটা কিটসন আর অস্বীকার করতে চাইল না৷ অবশ্য এ ভালোবাসা যে নিতান্তই হাস্যকর ও অর্থহীন, সে বিষয়ে কিটসনের মনে কোনওরকম ভুল ধারণা নেই৷ যেমন সে জানে, ওয়েলিং কোম্পানির ট্রাক-লুটের পরিকল্পনা তাদের টেনে নিয়ে যাবে অসাফল্য ও একরাশ বিপর্যয়ের মধ্যে৷

কিন্তু জিনির প্রতি তার আকর্ষণ এতই উদ্দাম যে তাকে রোধ করা কিটসনের অসাধ্য৷ অসংখ্য বীজানুর মতো সেই অনুভূতি ছড়িয়ে পড়েছে তার প্রতিটি শিরা উপশিরায়—মিশে গেছে রক্তের সঙ্গে৷

এ কদিন মরগ্যান ক্যারাভ্যান নিয়ে মোটেই মাথা ঘামায়নি৷ সে কেবল এজেন্সি থেকে রকেট রিসার্চ স্টেশন পর্যন্ত যাতায়াতের রাস্তাটাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বারবার ব্যবচ্ছেদ করে দেখেছে৷ ম্যাপের পর ম্যাপ এঁকে শুধু চিন্তা করেছে মরগ্যান৷ কোন পথ দিয়ে ঠিক কখন পালালে সুবিধে হবে, সেই মতলব ভেঁজেছে বসে-বসে৷ আর পরিকল্পনাটার আগাপাস্তলা যাচাই করেছে প্রতিটি মুহূর্তে৷

মরগ্যানের চিন্তাধারা কখনওই খাপছাড়া ভাবে এগোয়ে না৷ সে জানে, ট্রাকটাকে দখলে আনবার পর পালাবার ব্যাপারটাই হয়ে উঠবে প্রধান৷ অর্থাৎ পুলিশ কোনওরকম খবর পাওয়ার আগে অকুস্থল থেকে ক্যারাভ্যানের দুরত্ব যতই বাড়ানো যায় ততই নিশ্চিন্ত৷ সুতরাং অনিবার্যভাবেই সারা শহরতলির ভৌগোলিক বিবরণ নিয়ে তাকে প্রাণপণ মাথা ঘামাতে হচ্ছে৷

রাত প্রায় আটটার সময় জিপোর কারখানায় এসে পৌঁছল মরগ্যান৷ এ কাজের সফলতা সম্পর্কে সে বর্তমানে মোটামুটি নিশ্চিন্ত৷ শুধু দু-একটা ছোটখাটো ব্যাপারের জন্যে তাকে একটু চিন্তায় পড়তে হচ্ছে—অবশ্য সেগুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়৷ আর যদি দুর্ঘটনা ঘটেই যায়, তবে তাকে রোধ করার ক্ষমতা মরগ্যান কেন, পৃথিবীর কারোরই নেই৷

মাসের মধ্যে এই প্রথম বর্ষার সাক্ষাৎ পাওয়া গেল৷ বৃষ্টির ফোঁটা একঘেয়েভাবে ঝরে চলেছে৷ সেইসঙ্গে নাকে ভেসে আসছে ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ৷

বাঁধানো রাস্তা থেকে যেন অনুভূত হচ্ছে উত্তপ্ত নিঃশ্বাস—বহুদিন প্রতীক্ষার পর সে যেন আজ প্রাণভরে তেষ্টা মেটাচ্ছে বর্ষার শীতল জলে৷ মরগ্যানের এই আবহাওয়া ভালো লাগল৷

অদূরে জিপোর কারখানা অন্ধকারে ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করছে৷ সমস্ত জানলা দরজা সযত্নে বন্ধ থাকায় ভেতরের আলোর আভাস বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে না৷ পুরো এলাকাটা যেন জনশূন্য এক পরিত্যক্ত স্থান৷

বুইকের দরজা খুলে বাইরে পা রাখল মরগ্যান৷ হেডলাইট নেভাতে যাবে, শুনতে পেল কারও পায়ের শব্দ৷ কেউ যেন দৌড়ে আসছে তারই দিকে৷ অন্ধকারের দিকে অনুসন্ধানী চোখ মেলে ধরল মরগ্যান৷ নিষ্কম্প হাত যান্ত্রিকভাবে আঁকড়ে ধরল .৩৮-এর কঠিন বাঁট৷

অন্ধকারের এলাকা থেকে আলোর বৃত্তে আবির্ভূত হল জিনি গর্ডন৷ ওর পরনে একটা নীল বর্ষাতি৷ জলে ভেজা থাকায় চকচক করছে৷ ওর মাথায় একটা নীল টুপি৷ তার আড়ালে আশ্রয় নিয়েছে তামা রঙ চুলের গুচ্ছ৷

‘বহুদিন পর বৃষ্টির মুখ দেখা গেল’, বলল মরগ্যান, ‘তোমার ঠিকানা জানা থাকলে আসার পথে তোমাকে তুলে নিতাম—’

‘তাতে কী হয়েছে৷’ সংক্ষিপ্ত স্বরে জবাব দিল জিনি৷

মরগ্যান এগিয়ে গেল ওর কাছে, মুখোমুখি দাঁড়াল৷ বৃষ্টির ছাঁটতে আড়াল করে আচমকা প্রশ্ন করল, ‘তুমি থাক কোথায়, জিনি?’

জিনি থমকে দাঁড়াল৷ বৃষ্টির বেগকে উপেক্ষা করে চোখ রাখল মরগ্যানের চোখে, ‘সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার৷’

মরগ্যান তার থাবা দিয়ে আঁকড়ে ধরল মেয়েটার হাত৷ সামনের দিকে সামান্য টেনে আনল ওকে, ‘আমার সঙ্গে কথা বলার সময় সমঝে কথা বলবে খুকি৷ তোমার ব্যবহার, চালচলন প্রথম থেকেই আমার কাছে একটু ধোঁয়া-ধোঁয়া ঠেকছে৷ আমি এখনও জানি না, তুমি কে, তোমার আসল পরিচয় কী, কোথায় থাক, কী করে এই ট্রাক-লুট করার দুর্বুদ্ধি তোমার মাথায় এল—মানে, বলতে গেলে তুমি আমাদের কাছে এক রহস্যময়ী৷ তবে তোমার ইচ্ছে আমার অজানা নয়৷ তুমি ভাবছ, যদি ওই ট্রাক-লুটের ব্যাপারটা আমরা কেঁচিয়ে ফেলি তাহলে তুমি ভোল-চাল পালটে টুপ করে হাপিস হয়ে যাবে৷ জিনি গর্ডন নামে যে কেউ ছিল, সেটা পুলিশ ধরতেই পারবেন না, প্রমাণ করা তো দূরের কথা৷’

এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিল জিনি, ‘সেটা করা কি খুব অন্যায় হবে?’ মরগ্যানের পাশ কাটিয়ে ও এগিয়ে গেল কারখানার দরজার কাছে৷ অধৈর্যভাবে টোকা মারল বারকয়েক৷

কয়েক মুহূর্তে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল মরগ্যান; তার অভিব্যক্তিহীন কালো চোখে সংশয় ফুটল৷ কিটসন কারখানার দরজার খুলে দিতেই সে জিনির পাশে গিয়ে দাঁড়াল, ওরা একই সঙ্গে কারখানায় ঢুকল৷

‘এই যে আলেক্স, এদিকের খরব কী?’ বর্ষাতির জল ঝাড়তে ঝাড়তে বলল মরগ্যান৷

‘এদিকের কাজ সব শেষ৷’ মরগ্যানের প্রশ্নের উত্তর দিলেও কিটসনের চোখ কিন্তু জিনির দিকে৷ জিনি ওর ভিজে বর্ষাতিটা ছুড়ে রাখল টেবিলের ওপর৷ ওর পরনে একটা ধুসর কোট, স্কার্ট আর সবুজ ব্লাউজ৷ এই পোশাকে ওকে সামনে দেখে কিটসনের বুকে যেন ধাক্কা লাগল৷ সে আরও একবার আবিষ্কার করল জিনির আগুন ঝরানো রূপের অনিবার্য প্রভাব৷ আশান্বিত উৎসুক চোখে সে জিনির দিকে চেয়ে রইল৷

কিটসনের দিকে এক পলক ফিরে দেখল জিনি, কিন্তু তাকে তেমন আমল দিল না৷ বর্ষাতির পকেট হাতড়ে ও একটা বাদামি কাগজে মোড়া প্যাকেট বের করল৷ সেটা হাতে দিয়ে ক্যারাভ্যানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জিপোর কাছে গিয়ে হাজির হল ও বলল, ‘এই যে পরদাগুলো নিয়ে এসেছি৷’

মরগ্যান জিপোর দিকে এগিয়ে এল, ‘কী খরব?’ মরগ্যানের দৃষ্টির প্রত্যুত্তরে স্বভাবসিদ্ধ একগাল হাসি হেসে জিপো তাকে অভ্যর্থনা জানাল৷ তার গোলাকার ভারী মুখমণ্ডলে আত্মপ্রসাদের ছাপ স্পষ্ট৷

‘কাজ সব শেষ—আর কাজ দেখলে তুমি খুশি হবে ফ্র্যাঙ্ক৷’ পরদার প্যাকেটটা খুলতে লাগল জিপো, ‘দাঁড়াও, পরদাগুলো আগে লাগিয়ে দিই, তারপর দেখো শালার ক্যারাভ্যানের চেহারা—একেবারে যন্তর৷’

একটা ন্যাকড়ায় হাত মুছতে মুছতে ছায়ার আওতা থেকে বেরিয়ে এল এড ব্লেক৷ জিনিকে দেখে তার দৃষ্টি ওর শরীরে বাঁধা পড়ল—কিটসনের অবস্থাও তথৈবচ৷

ব্লেক এই এগারো দিন বলতে গেলে কোনও মেয়ের মুখ দেখেনি৷ তাই আজ জিনিকে সামনে পেয়ে ওর মনের সেই পুরোনো ইচ্ছেটা অদম্য হয়ে উঠল৷ কিটসনকে জিনির দিকে মোহগ্রস্তভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ব্লেক ভীষণ মজা পেল৷ থ্যাবড়ামুখো ছোঁড়াটা ভাবছে কী? ও কি সত্যিই-সত্যিই মনে করে যে জিনিকে ও কবজা করতে পারবে? হুঁ’, বামন হয়ে চাঁদ ধরার শখ৷

‘কী ব্যাপার, কোথায় ছিলে অ্যাদ্দিন?’ জিনির সামনে এগিয়ে গেল ব্লেক, ‘একেবারে এগারো দিন নিপাত্তা৷ তা, এই লুকোচুরির কারণটা জানতে পারি?’

জিনি হাসল—ব্যাপারটা কিটসনের কাছে নিঃসন্দেহ অপ্রত্যাশিত৷ ব্লেকও ভেবেছিল জিনির সামান্য এক চিলতে হাসির জন্যে তাকে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হবে৷ কিন্তু তার হাসির উত্তরে জিনির সহজ মিষ্টি হাসি ব্লেককে খুশি করল৷

জিনি হালকা স্বরে জবাব দিল, ‘ছিলাম কাছাকাছিই, তবে লুকোচুরি মোটেই খেলছিলাম না!’

‘তাহলে মাঝে মাঝে এখানে এলেই পারতে?’ ব্লেক তার সিগারেট কেস এগিয়ে দিল ওর দিকে, ‘আমরা কাজে বেশ একটু নতুন করে উৎসাহ পেতাম৷’

জিনি সিগারেট ঠোঁটে রাখল৷ ব্লেক লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে দিল ওর সিগারেটটা৷

‘আসতে আমার আপত্তি ছিল না, তবে ওই যে উৎসাহ টুৎসাহ কী সব বললে, ওতে আমার একটু আপত্তি আছে৷’

ওদের কথোপকথন চুপ করে দাঁড়িয়ে শুনছিল কিটসন৷ আর সেইসঙ্গে বুকের মধ্যে কেমন যেন অস্বস্তি অনুভব করছিল৷ ওদের সহজ, ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা কিটসনের মনে বিরক্তি জাগিয়ে তুলল৷ সে জানত, জিনির সঙ্গে কোনওদিন এ ধরনের কথাবার্তা বলা তার পক্ষে সম্ভব নয়৷ এবং ব্লেকের কথাবার্তায় ওকে খুশি হতে দেখে সে আরও দুঃখ পেল৷

‘তাহলে অন্তত একটিবার এসে দেখা করে যেতে পারতে৷ আমি এখানে চুপচাপ একা একা দিনের পর দিন কাজ করে চলেছি…ওঃ৷ ভেবে দেখো, দশ-দশটা রাত আমাকে জিপোর মতো জলহস্তীর সঙ্গে কাটাতে হয়েছে…বাপরে বাপ!’

জিনি সশব্দে হেসে উঠল৷ ‘ভালোই হয়েছে৷ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্যে মাঝে মধ্যে একট আধটু পরিবর্তন দরকার৷’ কথা শেষ করে জিনি ক্যারাভ্যানের দিকে পা-বাড়াল৷ মরগ্যান তখন ক্যারাভ্যানের চারিদিকে ঘুরে ফিরে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ওটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে৷

পরদাগুলো ক্যারাভ্যানের জানলায় লাগিয়ে জিপো গলদঘর্ম অবস্থায় বেরিয়ে এল, ‘এসো ফ্র্যাঙ্ক—ভেতরটা দেখবে এসো৷’

মরগ্যান একইভাবে ক্যারাভ্যানের দিকে চেয়ে রইল, ‘দরজাটার কী করছ, জিপো?’

জিপো হাসল—আকর্ণবিস্তৃত গর্বের হাসি৷ তারপর কিটসনকে চেঁচিয়ে ডাকল, ‘আলেক্স, এদিকে এসো একবার—ফ্র্যাঙ্ককে কলকবজা নেড়ে দরজার ব্যাপারটা বুঝিয়ে দাও দেখি!’

কিটসন জিপোর নির্দেশমতো ক্যারাভ্যানের সামনের দিকে গিয়ে দাঁড়াল৷ মরগ্যান ও জিপো পিছন দিকে দাঁড়িয়ে তাকে দেখতে লাগল৷

দরজাটা বার দুয়েক নেড়েচেড়ে দেখল মরগ্যান৷ তার কাছে ওটা বেশ মজবুত বলেই মনে হল৷

‘কী হে, কী রকম বুঝছ?’ সাফল্যের উত্তেজনায় জিপোর স্বর আগ্রহে ফেটে পড়ছে৷

‘দেখে তো মন্দ লাগছে না৷’

‘আসল কাজটা এখুনি দেখতে পাবে৷ আলেক্স, যন্তর চালু করো।’ কিটসনকে লক্ষ করে হাঁক দিল জিপো৷

কিটসন একটা হাতলে চাপ দিতেই ক্যারাভ্যানের পিছনটা একটা বাক্সের ঢাকনা মতো ওপরে উঠে গেল৷ এবং একই সঙ্গে ক্যারাভ্যানের মেঝের কিছুটা অংশ বাইরে বেরিয়ে এল; অনেকটা পাটাতনের মতো৷ সেটা মাটিতে ঠেকতেই, ক্যারাভ্যান থেকে কারখানার মেঝে পর্যন্ত তৈরি হল একটা ঢালু মজবুত রাস্তা৷

‘দেখেছ এবার আসল কায়দাটা? তুমি যেমনটি বলেছিলে ঠিক তেমনটি হয়েছে!’ হাতে হাত ঘষতে ঘষতে মরগ্যানকে লক্ষ করে বলল, জিপো, ‘পেছনের ঢাকনা আর ক্যারভ্যানের মেঝে দুটোকে একসঙ্গে কাজ করাতে গিয়ে কি কম অসুবিধে ভোগ করতে হয়েছে? শেষে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জিনিসটাকে দাঁড় করিয়েছি৷ ওই ঢালু পাটাতনটা যাতে ট্রাকের ওজন বইতে পারে তার জন্যে ইস্পাতের পাত দিয়ে এটাকে পুরোটা মুড়তে হয়েছে—বুঝলে ফ্র্যাঙ্ক, পরিশ্রম নেহাত কম করিনি৷’

ব্লেক ও জিনি ক্যারাভ্যানের কাছে এগিয়ে আসতেই মরগ্যান জিপোর কথায় ঘাড় নেড়ে সমর্থন জানাল, ‘নাঃ তোমার ক্ষমতা আছে—সত্যিই একটা যন্তর তৈরি করছে! তবে এই কলকবজার ব্যাপারটা আরও বার কয়েক চালাও দেখি?’

মরগ্যানকে সন্তুষ্ট করতে কিটসনকে কম করে বার দশেক হাতল টিপতে হল৷ অবশেষে ক্ষান্ত দিল মরগ্যান, ‘হুঁ, ভালোই হয়েছে কায়দাটা৷’ বলতে বলতে ঢালু পাটাতন বেয়ে ক্যারাভ্যানের ভেতর ঢুকল সে৷

জিপো চটপট মরগ্যানকে অনুসরণ করল৷ পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়ে ক্যারাভ্যানের ভেতরে যেসব পরিবর্তন সে করেছে সেগুলো ফ্র্যাঙ্ককে দেখাতে লাগল, যেন পাড়া-প্রতিবেশীকে ডেকে এনে নিজের বাড়ি দেখাচ্ছে!

‘হাইড্রোজেন আর অ্যাসিটিলিনের সিলিন্ডারগুলোকে রাখবার জন্যে ওপর দিকে এই কাঠের র‌্যাক গুলোকে লাগিয়েছি৷ যন্ত্রপাতি রাখবার জন্যে তৈরি করেছি ওই কাবার্ডটা৷ আর দুধারে যে কাঠের টাকা তাক রয়েছে, সেগুলো আমরা মালপত্র রাখবার জন্যে ব্যবহার করব৷ মেঝেটাকে তো যথাসম্ভব মজবুত করেছি, অতএব চট করে ভেঙে পড়ার কোনও ভয় নেই৷’

মরগ্যান ধীরেসুস্থে ক্যারাভ্যানের প্রতিটি অংশ যাচাই করে দেখতে লাগল৷ বিশেষ করে সে নজর দিল ক্যারাভ্যানের মেঝের দিকে৷ তারপর ক্যারাভ্যান থেকে নেমে চিৎ হয়ে শুয়ে ওটার তলায় ঢুকল মরগ্যান৷ টর্চ লাইট জ্বেলে জিপোর কথার সত্যতা পরীক্ষা করতে লাগল৷ ক্যারাভ্যানের মেঝের তলায় আড়াআড়িভাবে বল্টু দিয়ে আটকানো ইস্পাতের চওড়া পাতগুলো তার চোখে এড়াল না৷

জিপো উৎকণ্ঠিতভাবে মরগ্যানকে লক্ষ করতে লাগল৷

অবশেষে একসময় মরগ্যান বেরিয়ে এল ক্যারাভ্যানের নীচ থেকে৷ হাত দুটোকে ঝেড়ে পকেটে রাখল সে৷ উত্তেজনায় ভরা চক্‌চকে চোখজোড়া জিপোর দিকে রেখে সন্তুষ্ট স্বরে বলল মরগ্যান, ‘সাবাস জিপো! আমার কথার এতটুকু নড়চড় হয়নি দেখছি! কিন্তু ট্রাকটাকে ক্যারাভ্যানে ঢোকানোর পর বুইকটা কি ঠিকমতো টানতে পারবে?’

‘কেন পারবে না? আমি বলছি না যে ওর ওজন খুব কম হবে, তবে যদি আমাদের পাহাড়ি রাস্তায় না উঠতে হয়, তাহলে ওই ট্রাকসমেত ক্যারাভ্যানটা তোমার বুইক অতি সহজেই টেনে নিয়ে যাবে৷’

‘হুঁ—পাহাড়ের দিকে না এগোলে আর চিন্তার কোনও কারণ নেই৷ তবে…’ মরগ্যান মাঝপথে থমকাল, চোয়ালে হাত বোলাল কিছুক্ষণ, ‘সমস্ত কিছুই তোমার ওপর নির্ভর করছে, জিপো—কত তাড়াতাড়ি তুমি ট্রাকের তালা খুলতে পার তার ওপর৷ যদি তোমার সময় খুব বেশি লাগে, তাহলে হয়তো বাধ্য হয়ে আমাদের ছুটতে হবে পাহাড়ি এলাকায়—নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে৷ কিন্তু তা আমি চাই না৷ কারণ পাহাড়ি এলাকার রাস্তাগুলো একেই বিপজ্জনক, তার ওপর অসম্ভব খাড়া৷ আমার মনে হয় বুইকটা অত ওজন পেছনে নিয়ে ওই খাড়া পাহাড়ি রাস্তায় উঠতে পারবে না৷’

মুহূর্তে জিপোর মুখে নেমে এল অস্বস্তির ছায়া৷

‘কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক, তুমি বলেছিলে ট্রাকের তালা খোলার জন্যে আমি অফুরন্ত সময় পাব?’ ঘেমে-ওঠা হাতদুটো প্যান্টে ঘষে নিয়ে বলল সে, ‘নাকি ট্রাকের তালা ফুসমন্তরে পাঁচ মিনিট খুলে যাবে বলে মনে করছ?’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে—এত উত্তেজিত হচ্ছ কেন?’ মরগ্যান জিপোকে আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করল৷ জিনি, কিটসন, ব্লেক চমকে ফিরে তাকাল জিপোর দিকে৷ ‘তোমাকে আমি বলছি না যে ট্রাকটা পাঁচ মিনিটেই তোমাকে খুলতে হবে৷ হয়তো দু-তিন সপ্তাহ সময় পাবে তুমি—তবে তার পরে আমাদের পাহাড়ে গিয়ে লুকোতে হতে পারে৷’

জিপো নড়েচড়ে দাঁড়াল, ওর ছোট-ছোট চোখ আতঙ্কে বিস্ফারিত৷

‘কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক, তুমি বলেছিলে আমাকে এক মাস সময় দেওয়া হবে তালা খোলার জন্যে; আর এখন তুমি দু-তিন হপ্তার গীত গাইছ? ওয়েলিং কোম্পানির ট্রাকটা আমি দেখেছি, ওর তালা খোলা নেহাত ছেলেখেলার ব্যাপার নয়৷ তাড়াহুড়ো করে ওই তালা খোলা অসম্ভব৷’

ট্রাক উধাও হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে ক-শো লোক যে তাদের খোঁজে বেরিয়ে পড়বে, তা ভেবে মরগ্যান অবাক হল৷ তার ওপর রয়েছে মিলিটারি হেলিকপ্টার—প্রতিটি রাস্তা ওরা তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখবে৷ দ্রুতগামী পুলিশের দল মোটর বাইকে চড়ে প্রত্যেকটা গাড়ি পরীক্ষা করে দেখবে৷ যদি সত্যিই তাদের দু-লক্ষ ডলার করে পেতে হয়, তবে জিপোকে একটু তাড়াহুড়ো করতেই হবে—তাছাড়া উপায় নেই৷

মরগ্যান জানে আগে থাকতে এসব কথা জিপোকে জানালে সে ভয় পেয়ে যাবে—হয়তো একেবারে বেঁকে বসবে৷ তার চেয়ে বরং ট্রাকটা আগে ক্যারাভ্যানে চড়ুক, তখন জিপোকে তাড়াহুড়ো করার জন্যে চাপ দেওয়া যাবে৷ তখন আর ও রাজি না হয়ে পারবে না৷

‘আমারও তাই মনে হয়—তাড়াহুড়ো করে ওই তালা খোলা যাবে না৷’ মরগ্যান জিপোর কথায় সমর্থন জানাল, ‘দেখা যাক, যদি ভাগ্যের জোর থাকে, তবে হয়তো এক মাস সময় পেলেও পেতে পারি৷ কে বলতে পারে, হয়তো প্রথম চেষ্টাতেই তুমি ট্রাকের তালা খুলে ফেলবে৷’

মরগ্যানের হালকা সুর জিপোর কোনও ভাবান্তর ঘটল না৷ গম্ভীরভাবে সে-বলল, ‘ওদের ট্রাকটা খুব মজবুত, ওটা খুলতে গেলে কম সময় হবে না৷’

মরগ্যান একটা সিগারেট ধরাল, ‘তাহলে আসল কাজের জন্যে আমরা প্রস্তুত?’

তার মুখোমুখি দাঁড়ানো তিনজনের চোয়াল কঠিন হল—মুখে ফুটে উঠল একটা বিচলিত ভাব৷

জিনি ক্যারাভ্যানের গায়ে হেলান দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল—ওর চোখজোড়া হঠাৎই সতর্ক হয়ে উঠল৷

‘আজ মঙ্গলবার৷ সুতরাং ফাইনাল রেডি হওয়ার জন্যে আমরা পুরো তিনটি দিন হাতে পাচ্ছি;…মানে আসল কাজের জন্যে শুক্রবারটাকেই আমি বেছে নিয়েছি৷ কারও কোনও আপত্তি আছে?’

শ্বাসনালীটি কুঁকড়ে গিয়ে কিটসনের যেন দমবন্ধ হয়ে এল৷ গত এগারো দিন ধরে ক্যারাভ্যানের কাজে সে এতই ব্যস্ত ছিল যে আসল কাজের কথা তার মনেও ছিল না৷ দিব্যি মনের আনন্দে প্রাণ ঢেলে পরিশ্রম করছে—একমুহূর্তের জন্যেও তার মনে হয়নি, এ সবই আসল কাজের প্রস্তুতি৷

মরগ্যানের কথার সঙ্গে-সঙ্গে কিটসন যেন আকাশ থেকে আছড়ে পড়ল পার্থিব জগতে৷ আতঙ্কে তার হাত-পা পলকের জন্যে স্থবির হয়ে পড়ল৷

ব্লেক অনুভব করলে তার শিরদাঁড়ায় কোনও সরীসৃপের শীতল পিচ্ছিল উপস্থিতি৷ কিন্তু এই অদ্ভুত অনুভূতির মধ্যে ভয়ের লেশমাত্র ছিল না৷ কারণ সে জানে, কপালের জোর থাকলে কিছুদিনের মধ্যেই সে মস্ত বড়লোক হয়ে উঠবে৷ দু-লক্ষ ডলার থাকবে তার হাতের-মুঠোয়৷ উত্তেজনায় ব্লেকের হৃৎস্পন্দন দ্রুত হল৷

জিপোর অস্বস্তির সম্পূর্ণ অন্য কারণ৷ ট্রাক খোলার সময়-সম্পর্কিত ওই ভাসা ভাসা ধারণাটাই তার মনের জোরকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে৷ ট্রাক লুট করার ব্যাপারে সে জড়িত থাকছে না—অতএব সেদিক থেকে সে বিন্দুমাত্রও চিন্তিত নয়৷ কিন্তু মরগ্যান তার হাতযশ সম্পর্কে এক বিরাট ভ্রান্ত ধারণা করে বসে থাকবে, তা সে চায় না। বলা যায় না, হয়তো ওই ট্রাকের তালা জিপোর পক্ষে খোলাই সম্ভব হবে না! সুতরাং আগে থাকতে ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে ফ্র্যাঙ্ক তখন বিপদে পড়বে৷

‘ঠিক আছে, শুক্রবারই ঝঞ্ঝাট মিটে যাক৷’ জোরালো স্বরে জবাব দিল ব্লেক! সে চাইল, তার একাগ্রতা দেখে মরগ্যান খুশি হোক৷

‘আমি রাজি৷’ জিনি বলল৷

মরগ্যান তাকাল কিটসন ও জিপোর দিকে৷

ওরা দুজনেই কিছুক্ষণ ইতস্তত করল৷ কিন্তু কিটসন যেই বুঝল জিনি একদৃষ্টে তাকে লক্ষ করছে, অমনি ভাঙা গলায় জবাব দিল, ‘শুক্রবারই হোক, ক্ষতি কী?’

জিপো তার বিশাল কাঁধ নাচিয়ে বলে উঠল, ‘আমার কোনও আপত্তি নেই৷’