গল্প
উপন্যাস

হাতের মুঠোয় পৃথিবী – ১১

এগারো

হ্রদের কাছেই বসে ছিল ফ্রেড ব্র্যাডফোর্ড, একমনে খবরের কাগজ পড়ছিল৷ এমন সময় দুজন লোককে সামনের সরু রাস্তা ধরে এগিয়ে আসতে দেখা গেল৷

ব্র্যাডফোর্ড সবেমাত্র প্রাতরাশ সেরে একটু বিশ্রাম করছিল৷ একটু আগেই তার স্ত্রী ও ছেলে হ্রদের দিকে বেড়াতে গেছে৷ সেও যাবে—তবে একটু পরে, এমন সময় তার চোখে পড়ল আগন্তুক দুজনের ওপর৷ অবাক হল ব্র্যাডফোর্ড, এরা কারা!

আগন্তুকদ্বয়ের একজনের পরনে সৈন্যবাহিনীর মেজরের পোশাক, দ্বিতীয় জনের পরনে সস্তা ছাই রঙের স্যুট, মাথায় সযত্নে বসানো টুপি৷

মেজরের চেহারা বেঁটেখাঁটো৷ তামাটে লম্বা ধরনের মুখ৷ ঠোঁটের ওপর টানা মিলিটারি মার্কা গোঁফ৷ নীল চোখে অন্তর্ভেদী কঠিন দৃষ্টি!

মেজরের সঙ্গী যথেষ্ট লম্বা, চেহারা ভারীর দিকে৷ রক্তিম মুখমণ্ডল যেন পাথর খোদাই করে বসানো৷ চোখে-মুখে তীক্ষ্ণতার ছাপ সুষ্পষ্ট; ব্র্যাডফোর্ড অনুমান করল, এই দ্বিতীয় ব্যক্তি সাদা পোশাকে পুলিশের কোনও অফিসার৷

‘মিঃ ব্র্যাডফোর্ড?’ বসে থাকা ব্র্যাডফোর্ডের সামনে পৌঁছে প্রশ্ন করলেন মেজর৷

‘হ্যাঁ, কিন্তু’…উঠে দাঁড়াল ব্র্যাডফোর্ড, ‘কী ব্যাপার বলুন তো?’

‘ফ্রেড ব্র্যাডফোর্ড, জুনিয়র?’ মেজর জানতে চাইল।

 ব্র্যাডফোর্ড হাঁ-করে মেজরের মুখের দিকে চেয়ে রইল৷

‘না, সে আমার ছেলে—’ বিব্রতভাবে খবরের কাগজটা ভাঁজ করে চেয়ারে রাখল ব্র্যাডফোর্ড, ‘কিন্তু ওর সঙ্গে আপনাদের কী দরকার?’

‘আমি মেজর ডিলেনি, ফিল্ড সিকিওরিটি৷’ এবার সঙ্গীর দিকে আঙুল দেখাল মেজর, ‘আর ইনি হলেন লেফটেন্যান্ট কুপার, সিটি পুলিশ৷’

ব্র্যাডফোর্ড অস্বস্তিভরা চোখে তাকাল দুজনের দিকে৷

‘আপনাদের সঙ্গে আলাপ হয়ে খুশি হলাম৷ কিন্তু আপনারা কি আমার ছেলের সঙ্গেই দেখা করতে চান?’

‘হ্যাঁ, কোথায় সে?’ কুপার প্রশ্ন করল৷

‘ও তার মার সঙ্গে হ্রদের ধারে বেড়াতে গেছে৷ কিন্তু কী হয়েছে বলুন তো?’ ব্র্যাডফোর্ডের স্বরে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট৷

‘চিন্তা করার কিছু নেই, মিঃ ব্র্যাডফোর্ড৷’ ডিলোনি তাকে আশ্বাস দিল, ‘আমরা শুধু ওর সঙ্গে কয়েকটা কথা বলতে চাই৷’

এমন সময় সামনের রাস্তা ধরে বিক্ষিপ্ত পদক্ষেপে তীক্ষ্ণস্বরে শিস দিতে দিতে এসে হাজির হল ব্র্যাডফোর্ড জুনিয়র৷ কিন্তু বাবার সামনে দাঁড়ানো লোক দুজনকে দেখেই সে শিস দেওয়া বন্ধ করল তার গতি কিছুটা শ্লথ হয়ে এল, মুখমণ্ডলে হঠাৎই ফুটে উঠল একটা সতর্ক ভাব৷

‘ওই যে, ও এসে গেছে৷’ ব্র্যাডফোর্ড ফিরল তার ছেলের দিকে, ‘এই—জুনিয়র, এদিকে এসো৷ তোমার মা কোথায়? তাকে দেখছি না!’

‘মা হ্রদের ধারে বসে আড্ডা মারছে৷’ বিরক্ত স্বরে জবাব দিল ছেলেটা৷

‘তুমিই কি ফ্রেড ব্র্যাডফোর্ড জুনিয়র?’ ডিলোনিই প্রথম প্রশ্ন করল৷

‘ঠিকই ধরেছেন৷’ ওদের দুজনের দিকে চোখ তুলে তাকাল সে৷

‘এটা কি তোমার লেখা?’ পকেট থেকে একটা খাম বের করল ডিলোনি৷ খামের ভেতর থেকে একটা চিঠি বার করে দেখাল ছেলেটাকে, ‘এই চিঠিটা?’

ব্র্যাডফোর্ড সহজেই তার ছেলের আঁকাবাঁকা হাতের লেখা চিনতে পারল৷ কিন্তু কী লিখছে সেটা বুঝতে পারল না৷

‘হ্যাঁ—আমারই লেখা৷’ গম্ভীরভাবে জুনিয়র জবাব দিল৷

এবার মাটিতে উবু হয়ে বসল সে, মাথা থেকে শতছিন্ন শোলার টুপিটা খুলে তার মধ্যে ঘাস ভরতে লাগল৷

ব্র্যাডফোর্ড বিস্ময়ে হতবাক৷ কোনওরকমে সে প্রশ্ন করল, ‘আমার ছেলে আপনাদের চিঠি লিখেছে?’

‘হ্যাঁ, সে পুলিশ সদরে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, লুকোনো ট্রাকটার হদিশ সে জানে৷’ ডিলোনি জবাব দিল৷

ব্র্যাডফোর্ড হাঁ-করে তার ছেলের দিকে চেয়ে রইল৷ তার দু-চোখে চরম অবিশ্বাসের দৃষ্টি৷

‘জুনিয়র! এ কী করেছ তুমি! তুমি ভালোভাবেই জানো, লুকোনো ট্রাকের হদিশ তুমি জানো না৷ তবে কেন…?”

অবজ্ঞাভরে বাবার দিকে চোখ তুলে তাকাল ছেলেটা, তারপর আবার টুপিতে ঘাস ভরার কাজে মন দিল৷ টুপি ভর্তি হয়ে গেলে সে ঝুঁকে পড়ল সামনের দিকে, মাথাটা ঢুকিয়ে দিল টুপির ভেতর৷ মাথা সোজা করে ঘাসভর্তি টুপিটা ভালো করে চেপে বসাল৷ তারপর গম্ভীরভাবে উঠে দাঁড়াল৷

‘এইভাবে টুপি পরা ছাড়া উপায় নেই৷’ নির্দিষ্ট কাউকে সম্বোধন না করেই সে বলে চলল, ‘নইলে সব খসে পড়ে যেত৷ এতে আমার মাথা ঠান্ডা থাকে৷ এটা সম্পূর্ণ আমার আবিষ্কার৷’

ডিলেনি ও কুপার পরস্পরের দিকে তাকাল৷ তারপর ডিলেনিই আদর-মাখানো সুরে প্রশ্ন করল, ‘ট্রাকটা কোথায় আছে, খোকা?’

ছেলেটা আবার বসে পড়ল, পায়ের ওপর পা-রাখল। টুপিটা টেনেটুনে আরও শক্ত করে বসাল মাথায়।

‘ট্রাকটা কোথায় লুকোনো আছে আমি জানি।’ গম্ভীর সুরে ঘোষণা করল সে।

‘সে তো ভালো কথা।’ অসীম প্রচেষ্টায় নিজেকে সংযত রেখে উৎসাহভরে বলল ডিলেনি, ‘কোথায় আছে ওটা?’

‘কিন্তু পুরস্কারের কী হবে?’ চকিতে মুখ তুলে তাকাল ব্র্যাডফোর্ড জুনিয়র। স্থির, সপ্রতিভ চোখে চেয়ে রইমেল জরের দিকে।

‘শোনো জুনিয়র,’ অস্বস্তিতে ঘামতে শুরু করেছে ব্র্যাডফোর্ড, ‘তুমি বেশ ভালো করেই জানো, ট্রাকের কোনও খবরই তুমি জানো না। তাহলে শুধু-শুধু কেন এঁদের সময় নষ্ট করছ? এতে তুমি নিজেই বিপদে পড়বে-।’

‘ট্রাকটা কোথায় আছে সেটা আমি ভালো করেই জানি,’ ব্র্যাডফোর্ডকে ব্যঙ্গ করে শান্ত স্বরে ছেলেটা জবাব দিল, ‘কিন্তু পুরস্কারের টাকা হাতে না আসা পর্যন্ত একটা কথাও আমি বলছি না।’

‘শোনো খোকা,’ বিরক্তিতে ডিলেনির স্বর তীক্ষ্ণ হল, ‘যদি সত্যি সত্যিই ট্রাকের কোনও খবর তোমার কাছে জানা থাকে তো চটপট বলে ফেলো। তোমার বাবা ঠিকই বলেছেন; শুধু শুধু আমাদের সময় নষ্ট করার মতলব থাকলে তুমি ভীষণ বিপদে পড়বে।’

ছেলেটা ডিলেনির স্বরের তীক্ষ্ণতাকে সরাসরি অগ্রাহ্য করে জবাব দিল, ‘ট্রাকটা একটা ক্যারাভ্যানে লুকোনো আছে।’

‘ওঃ, আবার সেই একই কথা।’ ব্র্যাডফোর্ড অধৈর্য হয়ে পড়ল, ‘ও ব্যাপারটা নিয়ে কম করেও হাজারবার তোমার সঙ্গে আমি আলোচনা করেছি। যেমন আমিও জানি, তেমন তুমিও জানো যে…।’

‘এক মিনিট, মিঃ ব্র্যাডফোর্ড,’ ডিলেনি বাধা দিল, ‘যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে কথা বলার সুযোগটা আমাকেই দিন।’ সে ফিরল ছেলেটার দিকে, ‘খোকা, তুমি বুঝলে কী করে যে ট্রাকটা একটা ক্যারাভ্যানের ভেতর লুকোনো আছে।’

‘আমি নিজের চোখে দেখেছি।’ জুনিয়র উত্তর দিল, ‘ক্যারাভ্যানটা যাতে ট্রাকের ওজন বইতে পারে, সেজন্যে ওরা ক্যারাভ্যানের তলায় দুটো ইস্পাতের চওড়া পাত লাগিয়ে নিয়েছে।’

‘ওরা’? তার মানে—কারা?’

‘যারা ট্রাকটাকে চুরি করেছে, আমি তাদের কথাই বলছি।’

ডিলেনি ও কুপার পরস্পরের চোখে-চোখ রাখল। ডিলেনির চোখে মুখে উত্তেজনার মৃদু আভাস।

‘তার মানে তুমি ট্রাকটাকে নিজের চোখে দেখেছ?’

মাথা নাড়ল ছেলেটা। তারপর চিন্তিত মুখে মাথা থেকে টুপি খুলে নিল।

‘প্রথম প্রথম এটা বেশ ঠান্ডা থাকে,’ আন্তরিক সুরে বলল সে, ‘কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই ঘাসগুলো গরম হয়ে যায়!’ টুপির ভেতর থেকে ঘাসগুলো সে ঝেড়ে-ঝেড়ে বাইরে ফেলতে লাগল, ‘নাঃ আবার নতুন করে ঘাস ভরতে হবে দেখছি—’

সুতরাং আবার সে স্ব-আবিষ্কৃত পদ্ধতিতে মনোযোগ দিল।

‘ট্রাকটাকে তুমি কোথায় দেখেছ?’ উত্তেজনায় তীব্র হল ডিলেনির কণ্ঠস্বর!

ছেলেটা মেজরের প্রশ্নের কোনও ভ্রূক্ষেপ করল না। মুঠো-মুঠো ঘাস ছিঁড়ে টুপিতে ভরতে লাগল।

‘আমার কথা তোমার কানে গেছে?’ খেঁকিয়ে উঠল ডিলেনি।’

কী বললেন?’ থমকে গিয়ে চোখ তুলে তাকাল জুনিয়র।

‘আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করছি ট্রাকটা কোথায় রয়েছে?’

ছেলেটা ঘাস ভরতে -ভরতেই জবাব দিল, ‘আমার বাবা বলছিল, পুলিশ নাকি আমাকে পুরস্কারের টাকাটা দেবে না; নিজেরাই ওরা মেরে দেবে।’

কুপার কটমট করে তাকাল ব্র্যাডফোর্ডের দিকে। ব্র্যাডফোর্ড অস্বস্তিভরে নড়েচড়ে দাঁড়াল। তীব্রস্বরে ছেলেকে তিরস্কার করল, ‘মোটেই আমি এই কথা তোমাকে বলিনি। এভাবে কথা বলার জন্যে তোমার লজ্জা হওয়া উচিত।’

ছেলেটা বাবার মুখের দিকে তাকাল। তারপর শিস দেওয়ার মতো একটানা এক বিচিত্র শব্দ করল।

‘কী মিথ্যেবাদী?’ শিস থামিয়ে বলে উঠল সে, ‘তুমিই তো বললে, ট্রাকটা একটা ক্যারাভ্যানে লুকোনো আছে একথা পুলিশকে জানালে ওরা ভাববে আমরাই সেটা চুরি করেছি। তারপর বললে না, সব পুলিশই এক-এক নম্বরের চোর —’

ডিলেনি বহুক্ষণ একদৃষ্টে ব্র্যাডফোর্ডের দিকে চেয়ে রইল। তারপর মুখ দিয়ে একটা অস্পষ্ট শব্দ করল, ‘হুম–’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে’ কুপার গর্জন করে উঠল, ‘তোমার বাবা কী বলেছে না বলেছে সেটা বাদ দাও৷ ট্রাকটাকে কোথায় দেখেছে সে কথাই আগে বলো!’

অত্যন্ত ধীরে, অত্যন্ত সতর্কভাবে ছেলেটা ঝুঁকে পড়ল টুপির ওপর, মাথাটা গুঁজে দিল ভেতরে৷ তারপর সোজা হয়ে টুপিটা শক্ত করে এঁটে দিল মাথায়৷

‘পুরস্কারের টাকা না পাওয়া পর্যন্ত আমি আর কিছুই বলব না৷’ ছেলেটা উঠে দাঁড়াল, সরাসরি তাকাল লেফটেন্যান্টের চোখে৷

‘তাই নাকি৷ আচ্ছা, দেখা যাবে৷’ কুপারের মুখভাব কঠিন হল, ‘তোমরা দুজন আগে থানায় তো চলো, তারপর দেখব৷ যদি দেখি যে এতক্ষণ ধরে তুমি শুধু আমাদের সময় নষ্ট করেছ, তাহলে…৷’

‘দেখি সরো, আমাকে কথা বলতে দাও৷’ কুপারকে হাত দিয়ে সরিয়ে দিল ডিলেনি৷ শান্ত স্বরে বলল, ‘শোনো খোকা, ট্রাকটা খুঁজে বার করার ব্যাপারে যে পুলিশকে সাহায্য করবে, সেই-ই পুরস্কারের টাকাটা পাবে৷ এর মধ্যে একচোখোমির কোনও প্রশ্নই নেই৷ তোমার দেওয়া খবর যদি আমাদের ট্রাকটাকে খুঁজে বের করতে সাহায্য করে তবে তুমিই পুরস্কারের টাকাটা পাবে৷ এতে অবিশ্বাসের কী আছে?’

কয়েক সেকেন্ড ধরে মেজরকে জরিপ করল ব্র্যাডফোর্ড জুনিয়ার৷

‘সত্যি বলছেন?’

মেজর ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল, ‘সত্যি বলছি৷’

‘পুরস্কারের টাকাটা আমার বাবাকে দেবেন না তো? আমার হাতেই দেবেন?’

‘হ্যাঁ, তোমাকেই দেব৷’

‘পাঁচ হাজার ডলার?’

‘হ্যাঁ—’

ছেলেটা গুম হয়ে বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করতে লাগল৷ তারা তিনজন একদৃষ্টে ওকে লক্ষ করতে লাগল৷

‘ঠিক বলছেন তো? ট্রাকের খবর দিলে টাকাটা আপনি আমাকেই দেবেন?’ মেজরের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে ছেলেটা আবার প্রশ্ন করল৷

মেজর ঘাড় নাড়ল, মুখে আকর্ণবিস্তৃত হাসি৷

‘আমি ঠাট্টা করছি না খোকা৷ মিলিটারির লোকেরা কখনও মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেয় না৷ তাদের কথার দাম আছে৷

আবার কিছুক্ষণের জন্যে চিন্তায় পড়ল ব্র্যাডফোর্ড জুনিয়র৷ অবশেষে মনস্থির করে বলল, ‘আচ্ছা তাহলে বলছি৷ ওরা মোট চারজন আছে, তিনজন পুরুষ একজন মেয়ে৷ তিনজনের মধ্যে দুজন সারাদিন ধরে ক্যারাভ্যানে থাকত৷ শুধু রাত্রি হলেই বাইরে বেরোত৷ একদিন রাতে আমি ওদের দুজনকে ক্যারাভ্যান ছেড়ে বেরোতে দেখেছি৷ ওদের গাড়ির নম্বরও রয়েছে আমার কাছে৷ ওরা বলছিল, এরপর স্ট্যাগ হ্রদে দিয়ে বেড়াতে যাবে, কিন্তু সব মিথ্যে কথা৷ ওরা রওনা হবার সময় আমি দেখেছি, স্ট্যাগ হ্রদের যাবার রাস্তায় না গিয়ে বড় রাস্তার দিকে গেছে৷ ক্যারাভ্যানের রং সাদা, কিন্তু ছাদটা নীল রঙের৷’ পকেট থেকে একটা ময়লা নোট বই বার করে তার একটা পাতা ছিঁড়ল ছেলেটা৷ ডিলেনির দিকে এগিয়ে দিল কাগজটা, ‘ওদের গাড়ির নম্বরটা এই কাগজেই লেখা আছে৷’

‘কিন্তু ট্রাকটা যে ক্যারাভ্যানে আছে, সেটা তুমি জানলে কী করে?’ নোট বইয়ের ছেঁড়া পাতাটা সযত্নে পকেটে রাখতে-রাখতে ডিলেনি প্রশ্ন করল?

‘ওদের দুজন যখন ভোরবেলা ক্যারাভ্যানে ঢুকছিল তখন আমি দেখেছি৷ ট্রাকটা দেখবার জন্যেই তো অত ভোরে ঘুম থেকে উঠেছিলাম—৷’

‘কিন্তু ওটা যে হারানো ট্রাক সেটা তুমি বুঝলে কী করে?’

ছেলেটা ধৈর্যসহকারে মেজরকে পর্যবেক্ষণ করল৷ তারপর জবাব দিল, ‘হারানো ট্রাক কেমন দেখতে তা আমি খবরের কাগজে পড়েছি৷ ওই ট্রাকটাই সেই হারানো ট্রাক; আমি স্পষ্ট দেখেছি৷৷’

‘এ জায়গা ছেড়ে কখন রওনা হয়েছে ওরা৷?’

‘কাল দুপুরে৷ ওরা যখন যায় তখন আমি ঝোপের আড়াল থেকে লুকিয়ে, লুকিয়ে দেখছিলাম৷ স্ট্যাগ হ্রদের রাস্তার দিকে ওরা যায়নি৷ গেছে পাহাড়ি এলাকার দিকে৷’

‘ওঃ তাহলে অনেক সময় আমরা নষ্ট করে ফেলেছি৷’ ডিলেনি কঠিন চোখে তাকাল, ‘তুমি তোমার বাবাকে বলে আমাদের সদরে একটা ফোন করতে পারতে—!’

‘বাবাকে বলেছিলাম৷ কিন্তু বাবা নিজেও ফোন করবে না, আমাকেও করতে দেবে না৷ তাই শেষ পর্যন্ত চিঠি দিতে হল৷ বাবা খালি বলছিল, সব পুলিশের লোকই এক এক নম্বরের চোর৷’

ডিলেনি ও কুপার একই সঙ্গে ফিরে তাকাল ব্র্যাডফোর্ডের দিকে৷ কটমট করে কয়েক মুহূর্তে চেয়ে রইল৷

ঢোঁক গিলল ব্র্যাডফোর্ড৷ রক্তিম মুখে নিচু স্বরে জবাব দিল, ‘আমি এমনি ঠাট্টা করছিলাম৷ ওর ধারণাকে অপরিণত মস্তিষ্কের কল্পনা ভেবে…৷’

‘থাক হয়েছে৷’ রূঢ় স্বরে ব্র্যাডফোর্ডকে থামিয়ে দিল ডিলেনি৷ ফিরল জুনিয়রের দিকে, ‘ওই লোকগুলোর চেহারার বর্ণনা তুমি দিতে পারবে, খোকা?’

‘নিশ্চয়ই—’ বলল সে, এবং কিটসন, জিনি, জিপো ও ব্লেকের নিখুঁত শারীরিক বর্ণনা গড়গড় করে বলে গেল৷

একটা ছোট নোট বইয়ে ওদের চেহারার বর্ণনা টুকে নিল কুপার৷

‘এই তো লক্ষ্মী ছেলে৷’ ডিলেনি উৎসাহ ভরা সুরে বলে উঠল, ‘তুমি একটা কাজের মতো কাজ করেছ৷ যদি ট্রাকটা আমরা খুঁজে পাই, তাহলে তুমি যাতে পুরস্কারের টাকাটা পাও সেজন্য আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব৷’

নিশ্চিন্ত থাকুন—ট্রাক আপনারা খুঁজে পাবেনই৷’ মাথা থেকে টুপিটা খুলে ঝেড়ে ঝেড়ে ঘাসগুলো ফেলে দিল ছেলেটা, ‘উহু, এই কায়দাটাই তেমন জুতসই নয়৷ বড্ড তাড়াতাড়ি গরম হয়ে যাচ্ছে৷’

কুপার দাঁত বের করে হাসল, ‘এক কাজ করো, ঘাসের বদলে বরফ দিয়ে দেখো কাজ হবে৷’

জুনিয়রের মুখে হতাশা নেমে এল৷

‘একেবারে আজব প্রস্তাব৷’ গম্ভীর স্বরে বলল সে, ‘বরফ গলে যাবে না?’

ডিলেনি ওর কাঁধ চাপড়ে দিল, ‘আমি একটা পথ বাতলাতে পারি৷ তোমার টুপির ওপরটা কেটে ফেলো৷ তাহলে স্বাধীনভাবে হাওয়া চলাচল করতে পারবে, মাথাও ঠান্ডা থাকবে। তাছাড়া, কে বলতে পারে কালকে এটাই একটা ফ্যাশান হয়ে দাঁড়াবে না!’

ছেলেটা কিছুক্ষণ প্রস্তাবটা ভেবে দেখল, তারপর মাথা নাড়ল, ‘এটার মধ্যে বেশ নতুনত্ব আছে৷ দেখি, এই কায়দাটাই চেষ্টা করে দেখতে হবে৷ হয়তো এর থেকে বেশ কিছু টাকাও কামিয়ে ফেলতে পারি—৷’

গাড়ির দিকে ফিরে যেতে যেতে ডিলেনি বলল, ‘পাহাড়ের ওপরে…একমাত্র ওই জায়গাটাই আমরা এখনও খুঁজতে বাকি রেখেছি৷ ওখানে ওরা থাকলেও থাকতে পারে৷’

‘অসম্ভব৷’ কুপার দৃঢ় স্বরে বলে উঠল, ‘আমার যদি একবারও মনে হতো যে ওরা ওখানে লুকিয়ে, তাহলে এতদিনে ও জায়গাটা তুলোধোনা করে ছাড়তাম৷ কারণ ওই রাস্তা বেয়ে কারও পক্ষেই ওপরে ওঠা সম্ভব ন্য—ভারী ট্রাক নিয়ে তো দূরের কথা! কয়েক সপ্তাহ আগে প্রচণ্ড ঝড়ে ওই রাস্তার কিছুটা অংশ একেবারে ধুয়ে গেছে৷

‘কিন্ত একমাত্র ওই পাহাড়ি এলাকা ছাড়া আর কোনও জায়গাই তো আমরা খুঁজতে বাকি রাখি নি৷…হোক অসম্ভব, তবু আমি একবার খুঁজে দেখতে চাই৷ হয়তো ভাগ্যের জোরে ওরা ট্রাকটা নিয়েই ও রাস্তাটা উতরে গেছে৷’

গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন চালু করল৷

‘তুমি পুরস্কারের জন্যে সত্যি-সত্যিই ওই বাচ্চাটার নাম সুপারিশ করবে নাকি?’ সে প্রশ্ন করল৷

ডিলেনি কুপারের পাশে আয়েশ করে বসল৷ তার চোখে দূরাভিসারী শূন্যদৃষ্টি, ‘একটা দশ বছরের বাচ্চা ছেলে পাঁচ হাজার ডলার নিয়ে কী করবে বলতে পারো? মাঝখান থেকে ওর গেছো বাপটা ওই টাকাগুলো পকেটস্থ করবে৷’ কুপারের দিকে ফিরে তাকাল ডিলেনি, মুখে দুর্জ্ঞেয় হাসি, পুরস্কারের টাকাটা কে পাবে সেটা আমরা ভালোভাবেই জানি, তাই না? পুরষ্কারের শর্তে স্পষ্টই লেখা আছে, যে বা যারা ট্রাকটা খুঁজে বের করবে টাকাটা তারাই পাবে৷ আমরা ধারণা তুমি আর আমিই সেটা খুঁজে বের করতে চলেছি, অতএব…’

কুপার সশব্দে হাঁপ ছাড়ল, ‘ওঃ তুমি যেভাবে ওই বাচ্চাটাকে বোঝাচ্ছিলে, আমি তো ভাবলুম বুঝি সত্যি সত্যিই…’

ডিলেনি মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানাল, ‘বাচ্চাদের পেট থেকে কিভাবে কথা আদায় করতে হয় সেটা আমি মোটামুটি জানি৷ ওদের সঙ্গে কথা বলার সময় তোমাকে একাগ্র এবং আন্তরিক হতে হবে; নইলে ওরা তোমার কোনও কথাই বিশ্বাস করবে না৷ তাছাড়া, তুমি তো জানো, আমি বরাবরই একাগ্র এবং বিশ্বস্তভাবে কাজ করতে ভালোবাসি৷’ উঁচু গলায় হেসে উঠল সে৷

কিটসন যখন তাঁবুতে ফিলর তখন ন’টা বেজে গেছে৷ জিপোর বেলচাটা কাঁধে ফেলে শ্লথ ভঙ্গিতে সে এগিয়ে এল৷ গায়ের জামা ঘামে ভেজা৷

গাছের ছায়ায় একটা পাথরের ওপর বসেছিল জিনি৷ মুখ অস্বাভাবিক ফ্যাকাসে, সবুজ চোখে জল চিকচিক করছে৷

ব্লেক এরই মধ্যে ট্রাকটাকে ক্যারাভ্যানের বাইরে বের করে ফেলেছে৷ ট্রাকের দরজায় কান পেতে সে ডান হাতে কম্বিনেশন চাকতিটা ঘুরিয়ে চলেছে৷ অত্যন্ত সতর্ক ভঙ্গিতে, ধীরে ধীরে সে চাকতিটা ঘোরাচ্ছে—সম্ভবত জিপোর পদ্ধতিকে অনুসরণ করতে চাইছে৷

কিটসন বেলচাটা নামিয়ে রেখে জিনির দিকে এগিয়ে গেল৷ ওর পায়ের কাছে মাটিতে বসল, কাঁপা হাতে সিগারেট ধরাল একটা৷

জিনি আলতোভাবে হাত রাখল কিটসনের কাঁধে৷

‘ওঃ কী ভাবেই না বেচারা মারা গেল’, জিনির হাতের ওপর হাত রাখল কিটসন, ‘কিন্তু ওর জন্যে আমাদের করার কিছুই ছিল না৷ জিপো যখন মারা যায় তখন আমি আর ওই ছুঁচোটা মারামারিতে মত্ত৷ অবশ্য এমনিতেই ওকে সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না, তার আগেই ও মারা যেত৷’

‘ওসব নিয়ে আর ভেব না, আলেক্স৷’

‘তারপর শেয়াল কুকুরের মতো ওর দেহটা কবর দেওয়া—জিপো বড় ভালো লোক ছিল, জিনি৷ ওর কথা আমার শোনা উচিত ছিল৷ এ কাজে জিপো হাত দিতে চায়নি৷ আমাকেও নিরস্ত করার জন্যে কম চেষ্টা করেনি৷ এখন ভাবছিঃ ওর কথা শুনলে বোধ হয় ভালো হতো৷’

‘হ্যাঁ৷’

‘ও বলেছিল, এ কাজের ফল কোনওদিনই ভালো হবে না: সেটা যে কত বড় সত্যি কথা, তা আজ এ মুহূর্তে আমি বুঝতে পারছি৷ চলো, জিনি—আমরা এখান থেকে চলে যাই; তুমি আর আমি৷ অন্ধকার হলেই আমরা রওনা হব৷’

‘তাই চলো৷ এ সবই আমার দোষ, আলেক্স৷ এর জন্যে আমি নিজেকে কোনওদিনই ক্ষমা করতে পারব না৷ এতসব গণ্ডগোলের মূলে একমাত্র আমি৷ তুমি যখন জিপোকে কবর দিতে নীচে গেলে, তখন থেকে আমি বসে-বসে খালি ভাবছি৷ এখন বুঝতে পারছি কত বড় ভুল আমি করেছি, কত অন্যায় করেছি৷ এখন যদি ট্রাক খোলাও হয়, তবু আমি এর একটা টাকাও ছোঁব না৷ মনে হচ্ছে, আমি যেন এতদিন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম৷’

‘তাহলে তুমি আমার সঙ্গে আসতে রাজি?’ জিনির দিকে মাথা না তুলেই বলল কিটসন, ‘আবার নতুন করে জীবন শুরু করব, জিনি৷ তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?’

‘তুমি চাইলে আমার আপত্তি নেই৷’ অস্ফুট স্বরে জবাব দিল ও, ‘কিন্তু পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে সত্যিই কি আমরা পালাতে পারব? আজ হোক-কাল হোক ওরা আমাদের ধরে ফেলবেই৷’

সিগারেটটা নিভিয়ে দিল কিটসন, টোকা মেরে ফেলে দিল৷

‘কে জানে, হয়তো পারতেও পারি৷ একবার চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী৷ আমরা বুইকটা নিয়ে সোজা মেক্সিকো সীমান্তের দিকে রওনা দেব৷ পুলিশ তো আর আমাদের চেহারার বিবরণ জানে না৷ যদি একবার আমরা মেক্সিকোয় পৌঁছতে পারি…৷’

‘এই কিটসন! এদিকে এসো!’ চিৎকার করে ডেকে উঠল ব্লেক, ‘কী হচ্চে ওখানে বসে? এখানে এসে কাজে হাত লাগাও, আমাকে সাহায্য করো৷’

কিটসন ও জিনি দৃষ্টি বিনিময় করল৷ তারপর কিটসন উঠে দাঁড়াল৷ এগিয়ে চলল ট্রাকের দিকে৷

‘তুমি অ্যাসিটিলিন টর্চ ব্যবহার করেতে জানো?’ ব্লেক প্রশ্ন করল৷ তার মুখমণ্ডল কঠিন, যেন পাথরে খোদাই করা চোখে উদ্‌ভ্রান্ত দৃষ্টি৷

‘না জানি না৷’

‘তাহলে এখন থেকেই শিখতে শুরু করো৷ এই হতচ্ছাড়া বাক্সটা আমাদের তালা গলিয়ে খুলতে হবে৷ এসো, সিলিন্ডারগুলো একটু ঠিক করে ধরো৷’

‘ও আমার দ্বারা হবে না৷’ শান্ত স্বরে জবাব দিল কিটসন৷

ব্লেক অগ্নিক্ষরা চোখে তাকাল তার দিকে, ‘তার মানে? এই ট্রাকটা আমাদের যে করেই হোক খুলতে হবে, তাই না?’

‘ওতে আমার কোনও উৎসাহ নেই৷ আমার যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে, আর নয়৷ প্রথম থেকেই আমার এ কাজে হাত দেওয়া ঠিক হয়নি৷ তোমার দরকার থাকে তুমি খোলো৷ যদি খুলতে পারো তো সমস্ত টাকাই তোমার৷ কেউই ওতে ভাগ বসাতে যাবে না৷ আমি এই ঝামেলায় আর থাকতে চাই না৷’

ব্লেক গভীরভাবে শ্বাস নিল, ‘শালা ভিতুর ডিম! বুঝতে পারছ না, এটা আমার একার পক্ষে সামলানো সম্ভব নয়৷ ফালতু না বকে এসে হাত লাগাও, আমাকে সাহায্য করো!’

‘অন্ধকার হওয়ামাত্রই আমি আর জিনি এখান থেকে চলে যাচ্ছি৷ তুমি তোমার খুশিমতো পথ বেছে নাও, কিন্তু আমরা যে চলে যাচ্ছি এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত থেকো৷’

‘ও—তাই বুঝি!’ খেঁকিয়ে উঠল ব্লেক, ‘তোমরা দুজন…ও শেষ পর্যন্ত তাহলে জিনিকে কবজা করেছ?’ কিন্তু তাই বলে দশ লক্ষ ডলারকে পায়ে ঠেলে চলে যাবে এ কেমন কথা! তোমার নিশ্চয়ই মাথার ঠিক নেই৷’

‘আমরা এখান থেকে চলে যাচ্ছি!’ কিটসন শান্ত স্বরে পুনরাবৃত্তি করল৷

‘তাহলে এক দীর্ঘ পদযাত্রার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করো৷’ ব্যঙ্গের সুরে বলে উঠল ব্লেক৷

‘আমরা বুইকটা নিয়ে যাচ্ছি৷’

‘সে তো তুমি ভাবছ! কিন্তু বুইকটা আমার কাজে লাগবে, আর এই মুহূর্তে আমি যাবার জন্যে প্রস্তুত নই৷’ ট্রাকের গায়ে বারকয়েক চাপড় মারল ব্লেক, আর কিছু করি না করি, এই ট্রাকের তালা আমি খুলবই৷ ভেব না, তোমার মতো কোনও ডরপোক ভেড়ুয়া বা তার পেয়ারের তওয়ায়েফ আমাকে রুখতে পারবে৷ যদি কেটে পড়তে চাও তো সোজা কেটে পড়ো৷ আমি বাধা দেব না৷ তবে বুইক নয়, শ্রীচরণ ভরসা করেই বিদেয় হও৷ গাড়ি আমি অত সহজে ছাড়ছি না৷’

চোখের কোণ থেকে ব্লেকের নজর পড়ল জিনির দিকে৷ ও হঠাৎ উঠে দাঁড়াল, এগিয়ে আসতে লাগল তার দিকে৷

ব্লেক বুঝল, সে একা—এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী একাধিক৷ তাছাড়া, জিনির কাছে হয়তো রিভলভারও আছে৷

কিটসন তখন শান্ত স্বরে বলে চলেছে, ‘আজ রাতেই আমরা চলে যাচ্ছি, এবং গাড়ি নিয়েই যাচ্ছি৷ তুমি যদি চাও তো আমাদের সঙ্গে বড় রাস্তা পর্যন্ত আসতে পার, কিন্তু তারপরে তোমাকে নিজের ব্যবস্থা নিজেই করতে হবে৷ এবার যেটা পছন্দ বেছে নাও৷’

ব্লেক ইতস্তত করল তারপর তাকাল জিনির দিকে৷ ও এখন নিশ্চলভাবে দাঁড়িয়ে, ডান হাত শরীরের পাশে নামানো সকলের চোখের আড়ালে৷

এখন যে যদি ঠিকমতো প্যাঁচ না কষতে পারে তাহলে ওরা দুজন তাকে খুন করবে—ভাবল ব্লেক৷

অতএব সে কাঁধ ঝাঁকাল, কিটসনকে লক্ষ করে বলল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে, তুমি যা বলছ তাই হবে৷ তাহলে সন্ধে পর্যন্ত আমরা ট্রাকটা খোলার চেষ্টা করতে পারি৷ বলা যায় না, এ বারো ঘণ্টার চেষ্টায় ট্রাকের তালা হয়তো খুলে যেতেও পারে৷ আশা করি এই সময়টা তুমি বসে-বসে কাটাবে না? এসো সিলিন্ডারগুলো ধরো—কাজের সাহায্য হবে৷’

ব্লেকের এই আকস্মিক আত্মসমর্পণে কিটসন অবাক হল; কিছুক্ষণ ইতস্তত করল সে৷

‘ঠিক আছে৷ কিন্তু তাতে কিছু লাভ হবে বলে মনে হয় না৷ বারো ঘণ্টা কেন, বারো বছর ধরে চেষ্টা করলেও এই ট্রাকের তালা গলানো সম্ভব হবে না৷’

‘দেখাই যাক না৷’ ব্লেক একপলক দেখল জিনির দিকে৷ ওর নজর এখনও ব্লেকেরই ওপর, কিন্তু মুখের অভিব্যক্তি অনেকটা সহজ হয়ে এসেছে৷ ‘তোমার বড় বেশি উপদেশ দেওয়ার স্বভাব, আলেক্স৷ এসো, কাজে হাত লাগাও৷’

কিটসন ব্লেককে পাশ কাটিয়ে ক্যারাভ্যানের দিকে পা-বাড়াতেই ব্লেক তার রিভলভার বের করে কিটসনের দিকে চেপে ধরল৷

‘রিভলভার ফেলে দাও!’ জিনিকে উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে উঠল ব্লেক, ‘নইলে তোমার ভাতারের পেট ফুটো করে ছাড়ব!’

জিনির ডান হাতের মুঠো আলগা হল, রিভলভারটাও খসে পড়ল ঘাসের ওপর৷

ওদের দুজনকে রিভলভার আওতায় রেখে পায়ে-পায়ে পিছিয়ে গেল ব্লেক৷ জিনিকে লক্ষ করে খিঁচিয়ে উঠল, ‘সরে যাও রিভলভারের কাছ থেকে!’

জিনি কিটসনের পাশে গিয়ে দাঁড়াল৷

ব্লেক বৃত্তাকার পথে ওদের অতিক্রম করে তুলে নিল জিনির রিভলভারটা৷ ছুড়ে ফেলে দিলে হ্রদের জলে৷

‘এবার শোনো৷ এই ট্রাকটা আমরা খুলবই৷ মনে কোরো না, তোমাদের দুজনকে আমি সামলাতে পারব না, ট্রাক না খোলা পর্যন্ত এ জায়গা ছেড়ে আমরা নড়ছি না৷ তোমরা এ টাকা না চাইতে পারো, কিন্তু আমি চাই৷ এবং শেষ পর্যন্ত টাকা আমি নেবই৷’ কিটসনকে লক্ষ করে রিভলভার নাচাল সে, ‘যাও৷ ভেতরে গিয়ে সিলিন্ডারগুলো বের করো৷’

কাঁধ ঝাঁকিয়ে কিটসন পা-বাড়াল ক্যারাভ্যানের দিকে৷ ব্লেক তাকে অনুসরণ করল৷

‘এ কাজ আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়৷’ কিটসন বলল, ‘গাড়িতে এগুলো তোলবার সময় জিপো আমাকে সাহায্য করেছিল৷ কারণ সিলিন্ডারগুলোর ওজন খুব একটা কম নয়৷ তুমি অন্য দিকটা না ধরলে হবে না৷’

ব্লেক দাঁত বের করে হাসল৷ রিভলভারটা খাপে ঢুকিয়ে রাখল৷

‘কোনওরকম চালাকি করার চেষ্টা কোরো না আলেক্স৷ তার ফল খারাপই হবে!’

হাত বাড়িয়ে সিলিন্ডারের এক প্রান্ত চেপে ধরল কিটসন৷ টেনে কিছুটা বের করে আনল তাক থেকে৷ ব্লেক সিলিন্ডারের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজের কাঁধ পাতল৷ তারপর দুজনে অতি সাবধানে এক-পা করে ক্যারাভ্যানের বাইরে এল৷

ক্যারাভ্যানের বাইরে এসেই কিটসন সিলিন্ডারের এক প্রান্ত আচমকা ফেলে দিল কাঁধ থেকে৷ সিলিন্ডারের প্রান্তটা সশব্দে মাটিতে আছড়ে পড়ল৷ এই অতর্কিত আঘাতে ভারসাম্য হারিয়ে ছিটকে পড়ল ব্লেক৷

কিটসন সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ ওর ডান হাতি ঘুষি ব্লেকের ঘাড়ে সজোরে আঘাত করল—চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল সে৷

একটা মুখখিস্তি করে রিভলভার বের করার চেষ্টা করল ব্লেক৷ কিন্তু কিটসনের শরীরের তেরো স্টোন ওজন তার ওপর চেপে বসল৷

কয়েক মুহূর্ত ধরে ওরা বন্য জন্তুর মতো যুঝে চলল৷ তারপর একসময় ব্লেক হাঁটু ভাঁজ করে আঘাত করল কিটসনের বুকে—ছিটকে ফেলে দিল ওকে৷ তারপরে সে রিভলভার বের করতেই কিটসন ঝাঁপিয়ে পড়ল তার হাত লক্ষ করে৷

কিটসন ডান হাতে ব্লেকের রিভলভার ধৃত হাত আঁকড়ে ধরল, এবং একই সঙ্গে তার বাঁ-হাত সপাটে আঘাত করল ব্লেকের মুখে৷

একটা অস্ফুট আর্তনাদের সঙ্গে সঙ্গে রিভলভারটা খসে পড়ল ব্লেকের হাত থেকে৷

সে ঘুষির আঘাত সামলে ওঠার আগেই কিটসন কুড়িয়ে নিয়েছে ব্লেকের রিভলভার। উঠে দাঁড়িয়ে উঁচিয়ে ধরেছে ব্লেকের দিকে৷

ব্লেক কোনওরকমে উঠে বসল৷ ওর চোখের নীচে কাটা জায়গাটা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে৷ ঠোঁট সরে গিয়ে তার আংশিক দাঁতের সারি এক বীভৎস জিঘাংসায় প্রকট হয়ে পড়েছে৷

‘এর বদলা আমি নেবই৷’ নৃশংস স্বরে হিসহিস করে উঠল ব্লেক৷

 ‘তোমরা বদলা নেবার দিন চলে গেছে এড৷’ হাঁপাতে-হাঁপাতে জবাব দিল কিটসন৷

হঠাৎ, কোনওরকম পূর্বাভাস না দিয়েই ভেসে এল প্লেনের ইঞ্জিনের শব্দ৷ সৈন্যবাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের একটা ছোট এয়ারক্র্যাফট হাওয়ার ঝাপটায় ঘাসের শিষগুলোকে কাঁপিয়ে দিয়ে উড়ে গেল উপত্যকার দিকে৷

ব্লেক টলতে টলতে সোজা হয়ে দাঁড়াল, হাঁ-করে চেয়ে রইল ক্রম অপসৃয়মান প্লেনের দিকে৷

‘ওরা আমাদের দেখতে পেয়েছে!’ চাপা স্বরে বলে উঠল সে, ‘ওরা নির্ঘাত আমাদের দেখে ফেলেছে! এখুনি ওরা উঠে আসবে এই পাহাড়ে, আমাদের পেছু নেবে৷’

ওরা তিনজন নিশ্চলভাবে দাঁড়িয়ে রইল৷ দেখল বহুদূরে একটা ছোট বৃত্তাকার পথে বাঁক নিয়ে প্লেনটা আবার ফিরে আসছে তাদেরই দিকে৷

‘শিগগিরি লুকিয়ে পড়ো৷’ ব্লেক চিৎকার করে উঠল, অন্ধের মতো দৌড়ে গেল সামনের জঙ্গলের দিকে৷

কিটসন আর জিনি ছুটল জঙ্গলের দিকে, তবে একসঙ্গে নয়, ভিন্ন পথে৷ কিন্তু ইতিমধ্যেই প্লেনটা ওদের মাথার ওপর এসে পড়েছে৷

বিকট গর্জন করে, হাওয়ার ঝাপটা তুলে মাত্র একশো ফুট ওপর দিয়ে উড়ে গেল প্লেনটা! ওরা স্পষ্ট দেখতে পেল, খোলা ককপিট দিয়ে দুজন লোক বাইরের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। সোজাসুজি তাকিয়ে আছে ওদেরই দিকে৷ একটু পরেই দূরত্ব বৃদ্ধির ফলে স্তিমিত হয়ে এল প্লেনের গর্জন৷

কিটসন ও জিনি তাকাল পরস্পরের দিকে, ওদের চোখে উলঙ্গ আতঙ্কের ছাপ৷

ব্লেক গলা ফাটিয়ে ডেকে উঠল, ‘লুকিয়ে পড়ো গর্দভ কোথাকার৷ বোকার মতো হাঁ করে দাঁড়িয়ে থেকো না!’

ব্লেকের কথায় কর্ণপাত করল না কিটসন, বলে উঠল, ‘ওরা আমাদের দেখে ফেলেছে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা এসে পড়বে, জিনি৷’

‘হ্যাঁ, আমি তো আগেই বলেছিলাম, ওরা আমাদের ধরে ফেলবেই৷’

কিটসন চকিতে পা বাড়াল রাস্তার দিকে৷ শরীরকে যথাসম্ভব মাটির সঙ্গে মিশিয়ে রাস্তা পার হল সে৷ চোখ রাখল ঘাসবন ছাড়িয়ে দূরের আঁকাবাঁকা সরু পথের দিকে৷ উপত্যকার কোল ঘেঁষে বেয়ে ওঠা রাস্তার ক্ষীণ সাদা পটভূমিতে তার নজরে পড়ল বিপদের যান্ত্রিক রূপ৷

প্রায় মাইল দশেক নীচে তিনটে গাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে ধুলোর মেঘ উড়িয়ে ছুটে আসছে৷

কিটসন তার হৃৎপিণ্ডে অনুভব করল আচমকা আতঙ্কের ধাক্কা৷ সে ছুটে এল জিনির কাছে৷

‘ওরা আসছে৷’

বিকৃত মুখে বনের আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এল ব্লেক, ‘ওদের দেখা যাচ্ছে?’ প্রশ্ন করল সে৷

‘হ্যাঁ৷ যেভাবে ওরা গাড়ি ছুটিয়ে আসছে তাতে এখানে পৌঁছতে ওদের মিনিট দশেকের বেশি লাগবে না৷’

‘আমাদের এখনও পালাবার সুযোগ আছে৷’ কাঁপা স্বরে চেঁচিয়ে উঠল ব্লেক, ‘শিগগিরি বুইকটা নিয়ে এসো৷ আমরা যদি একবার পাহাড়ের মাথায় চড়তে পারি,তাহলে এখনও বাঁচবার উপায় আছে৷’

কিটসন মাথা নাড়ল, এখান থেকে মাইলখানেক ওপরে রাস্তা একেবারে সরে গেছে৷ আমাদের হয়তো পাহাড় বেয়েই উঠতে হবে…৷’

ব্লেক দৌড়ে গেল ক্যারাভ্যানের দিকে৷ অটোমেটিক রাইফেলটা নিয়ে ফিরে এল, ‘আমি প্রাণ থাকতে ওদের হাত ধরা দিচ্ছি না৷’ ব্লেকের চোখ হিংস্রতায় চকচক করে উঠল, ‘কারণ ইলেকট্রিক চেয়ার আমার একবারেই না-পসন্দ৷’

কিটসন বুইকের দরজা খুলে ধরল৷ জিনি উঠে বসল তার পাশে৷ সে অনুভব করল জিনির শরীর কাঁপছে৷ ওর হাঁটুতে হাত রেখে সে আশ্বাস দিল, ‘ভয় পাওয়ার কিছু নেই৷ আমরা একবার শেষ চেষ্টা করে দেখব৷’

ব্লেক জিনির পাশে বসতেই কিটসন গাড়ি চালু করল৷ রুক্ষ ঘাসজমি পেরিয়ে রাস্তায় নিয়ে এল গাড়িটাকে৷

ওরা তিনজন একবার ফিরে তাকাল দূরে গায়ের ছায়ায় দাঁড়ানো ট্রাকটার দিকে৷

‘ওই শালারা বলেছিল ওটা পৃথিবীর নিরাপদতম ট্রাক৷’ ট্রাকটার দিকে আঙুল দেখিয়ে নৃশংস স্বরে বলে উঠল ব্লেক, ‘এখন দেখছি কথাটা কেবলমাত্র প্রচারের জন্যে নয়৷’

কিটসনের সুদক্ষ হাতে বুইক অসমান রাস্তা ধরে ছুটে চলল!

ট্রাকটাকে শেষবারের মতো দেখার জন্যে বুইকের জানলা দিয়ে বাইরে ঝুঁকে পড়ল ব্লেক৷ ট্রাকের ভেতরে আবদ্ধ টাকার পরিমাণ দশ-লক্ষেরও অনেক বেশি—ভাবল সে৷ ওই ট্রাকের ভেতরে একই সঙ্গে বন্দি হয়ে রয়েছে আমার ভবিষ্যৎ, আমার জীবন৷

ঝড়ের গতিতে গাড়ি ছুটিয়ে চলল কিটসন৷ তার মুখের প্রতিটি পেশি টান-টান৷ চোখের দৃষ্টি সামনের রাস্তার দিকে নিবদ্ধ৷ প্রচণ্ড গতিবেগের জন্যে রাস্তার বাঁকে গাড়ির চাকা পিছলে যেতে লাগল৷

প্রথম বিপরীতমুখী বাঁকের কাছে পৌঁছে গাড়ির গতি কমিয়ে আনল কিটসন৷ কিন্তু তার অনুমান সঠিক না হওয়ায় সে গাড়ি থামাতে বাধ্য হল৷ ব্লেক অধৈর্য হয়ে তাকে শাপশাপান্ত করতে লাগল৷ গাড়িটা কিছুটা পিছিয়ে আবার সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলল কিটসন৷

কিন্তু পাহাড়ি রাস্তায় আবার উঠতে শুরু করামাত্রই সামরিক বাহিনীর উড়োজাহাজটা চঞ্চল হাউন্ডের মতো তার মাথার ওপরে, আকাশে বৃত্তাকার পথে ঘুরতে লাগল৷

‘ওই ব্যাটাকে যদি একবার নাগালের মধ্যে পাই—৷’ উড়ন্ত প্লেনের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে খিঁচিয়ে উঠল ব্লেক৷ শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরল অটোমেটিক রাইফেলটা৷

ওরা শুনতে পেল দূর থেকে ভেসে আসা পুলিশ সাইরেনের একটানা কাতর আর্তনাদ৷

জিনি ভয়ে কেঁপে উঠল৷ ওর হাত মুষ্টিবদ্ধ হল উত্তেজনায়৷

গাড়িকে রাস্তার ওপর সচল রাখতে কিটসনকে বেশ কষ্ট করতে হচ্ছিল৷ কারণ রাস্তাটা কয়েকশো গর্ত এবং আলগা পাথরে কণ্টকিত৷ হয়তো অতীতের সেই প্রচণ্ড ঝড়ের সাক্ষ্য বহন করছে৷

ওদের বাঁ দিকে খাড়া পাহাড়, যেন একটা গ্রানাইট পাথরের দেওয়াল সোজা ওপরে উঠে গেছে৷ আর ডান পাশে অতল খাদ—নীচের উপত্যকা এখান থেকে দেখাচ্ছে একটা ছোট বোতামের মতো৷

‘এভাবে আমরা আর বেশি দূর যেতে পারব না৷’ গাড়ির গতি কিছুটা কমিয়ে আনল কিটসন, আর একটু পরেই আমরা সেই বিধ্বংসী অংশের মুখোমুখি হব৷’

পরের বিপরীতমুখী বাঁকে মোড় নিতেই, আচমকা ব্রেক কষল কিটসন৷ থমকে দাঁড়াল বুইক৷

অসংখ্য ছোট বড় পাথর, বুনো ঝোপ রাস্তার ঠিক মাঝখানেই চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে৷ সে বাধা অতিক্রম করে বুইককে নিয়ে যাওয়ার কোনও উপায় নেই৷

অটোমেটিক রাইফেলটা হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল ব্লেক৷ অন্য দুজনের দিকে সে ফিরেও তাকাল না৷ ছুটে গেল পাথরের ঝোপে ঢাকা রাস্তার মাঝখানে ঢিবিটার দিকে৷ ওটা বেয়ে উঠতে লাগল৷

কিটসন চোখ তুলে ওপরে তাকাল৷

ওপরে, অনেক ওপরে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের শুভ্র তুষারবৃত চূড়া৷ একমুহূর্ত ইতস্তত করল সে৷ তারপর জিনির হাত আঁকড়ে ধরে ওপর দিকে আঙুল তুলে দেখাল, ‘জিনি, আমরা ওই পথ বেয়ে ওপরে উঠব৷ ওখানে হয়তো লুকোবার যথেষ্ট জায়গা থাকতে পারে৷ তাছাড়াও আমরা যদি ব্লেকের সঙ্গে যাই, তাহলে ধরা আমরা পড়বই—বাঁচবার কোনও আশাই থাকবে না৷’

পাহাড়ের বিস্তৃত আকারের দিকে তাকিয়ে ভয়ে কুঁকড়ে গেল জিনি৷

‘ও আমি পারব না, আলেক্স৷ তুমি একাই যাও৷’

কিটসন জিনিকে টেনে নামাল গাড়ি থেকে৷ ওকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে চলল৷

‘গেলে আমরা দুজনেই একসঙ্গেই যাব৷’ বলে সে পাহাড়ের খাঁজ বেয়ে উঠতে লাগল৷ প্রথম একশো গজ সহজেই ওঠা গেল ঃ জিনিরও তেমন অসুবিধে হল না৷ থেকে থেকেই কিটসন পিছন ফিরে জিনিকে উঠতে সাহায্য করছে৷ হাত বাড়িয়ে ওকে টেনে তুলল ওপরে৷

সাইরেনের শব্দ এখন আগের চেয়ে অনেক তীব্র, অনেক কাছে৷ ওদের আরোহণের গতি ক্রমশ কমে আসতে লাগল, কারণ ক্রমশই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে পাহাড়ে ঢাল৷

পাহাড়ের বন্ধুর তলের পটভূমিতে ওরা নিজেদের বড় বেশি অরক্ষিত এবং অসহায় বোধ করল৷ কিন্তু আরও পঞ্চাশ ফুট ওপরে দেখা যাচ্ছে গোটাকয়েক বিশাল পাথর, যার আড়ালে ওরা সহজেই আত্মগোপদ করতে পারে৷ তাই কিটসন তাড়াতাড়ি ওঠার জন্যে জিনিকে বারেবারেই তাড়া দিতে লাগল৷

হঠাৎ একসময় আতঙ্কে পিছলে গেল জিনির ডান হাত৷ কিন্তু বিদ্যুৎগতিতে কিটসন ওকে আঁকড়ে ধরল৷ আবার টেনে নিল নিরাপদ আশ্রয়ে৷ সেখানে থেকে ওরা আবার শুরু করল ওদের পবর্তারোহণ৷

অবশেষে ওরা পৌঁছল পাথরগুলোর আড়ালে৷ আর প্রায় একই সঙ্গে ওরা শুনতে পেল কতকগুলো গাড়ি এসে থামল রাস্তায় ওদের ঠিক নীচেই৷

পাশাপাশি উপুড় হয়ে শুয়ে ওরা নীচের দিকে উঁকি মারল৷ অত্যধিক পরিশ্রমে ওদের শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রমশ গভীর হয়ে উঠেছে৷

নীচের রাস্তার একটা অংশকে কিটসনের দৃষ্টিপথ থেকে আড়াল করে রেখেছে সামনের একটা বিশাল ঝুলন্ত পাথর৷ কিন্তু ডানদিকে চোখ রাখতেই কিটসন দেখল, ব্লেক পাগলের মতো হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে ছুটে চলেছে: আর মাঝে মাঝেই পিছন ফিরে তাকাচ্ছে৷ সামনের বাঁকে মোড় ঘুরতেই কিটসন তাকে আর দেখতে পেল না৷

কিটসন চোখ তুলে তাকাল৷ সম্ভবত বাঁচবার কোনও নতুন আশায়৷

তাদের কাছ থেকে আরও অনেকটা ওপরে ছোট ঝোপঝাড়ের পরদায় ঢাকা একটা চওড়া পাথরের আড়াল তার নজরে পড়ল৷ সে ভেবে দেখল, যদি তারা একবার ওই পাথরের আড়ালে পৌঁছতে পারে তাহলে পুলিশের অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত অতি সহজেই সে ও জিনি পরম নিশ্চিন্তে ওখানে আত্মগোপন করতে পারবে৷

সে হাত বাড়িয়ে জিনির বাহু স্পর্শ করল, ‘এখন ওপরে উঠতে পারবে?

জিনি ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানাল, ‘হ্যাঁ চলো৷’

কিটসন জিনির ঘর্মাক্ত মুখের দিকে চেয়ে হাসল৷ ওদের চোখজোড়া পরস্পরের খুব কাছাকাছি৷ সামান্য কাছে সরে এল জিনি, উষ্ণ ঠোঁট জোড়ার মাধ্যমে নিজের শরীরের মিশ্র অনুভূতি সঞ্চালিত করল কিটসনের দেহে৷

‘আমি দুঃখিত আলেক্স, এ সমস্তই শুধুমাত্র আমার দোষে৷’

‘উহুঁ, আমি নিজের ইচ্ছেতেই ফ্র্যাঙ্কের কথায় রাজি হয়েছিলাম৷ তবে দুঃখ এই, আমরা শেষ পর্যন্ত জিততে পারলাম না৷’

নীচ থেকে লোকজনের উত্তেজিত ভাসাভাসা কথোপকথন ওদের কানে এল৷

‘ওরা নিশ্চয়ই বুইকটা খুঁজে পেয়েছে৷’ কিটসন ফিসফিস স্বরে বলল, ‘চলো এগোনো যাক৷’

ওরা আবার পাহাড় বেয়ে উঠতে শুরু করল৷

জিনির কাছে পুরো ব্যাপারটাই যেন একটা বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্ন বলে মনে হল৷ কিটসন যদি প্রতি পদে ওকে সাহায্য না করত, তাহলে হয়তো ওর পক্ষে ওই খাড়াই বেয়ে ওপরে ওঠা কোনওমতেই সম্ভব হতো না৷

পাহাড়ের আড়ালটার কাছাকাছি এসে হঠাৎ থমকাল জিনি৷ ওপরের একটা ছোট ছুঁচলো পাথরকে দু-হাতে আঁকড়ে, একটা গাছের শেকড়ে পা-রেখে ও হাঁপাতে লাগল৷ দু-চোখ বোজা৷

‘আমি আর পারছি না, আলেক্স৷ আর এক পা ওঠারও সামর্থ্য আমার নেই৷ তুমি একাই ওপরে উঠে যাও, আমার জন্যে সময় নষ্ট কোরো না৷’

কিটসন চোখ তুলে তাকাল৷ আর মাত্র ফুটখানেক ওপরে রয়েছে পাথরের আড়ালটা৷

তারপর আবার জিনির দিকে চোখ নামাতেই, সে দেখল, দূরে—বহুদূরে বিস্তীর্ণ উপত্যকায় অতল গভীরতার হাতছানি৷ একটা আচ্ছন্নতার বিক্ষুব্ধ ঢেউ এসে ঝাপটা মারল কিটসনের মস্তিষ্কে৷

একটা ছোট কাঁটাঝোপের শেকড়কে অবলম্বন করে ঝুলতে লাগল কিটসন৷ ভয়ে চোখ বুজল সে৷ অনুভব করল তার মসৃণ মুখমণ্ডলে স্বেদবিন্দুর উপস্থিতি৷

ওপরে তাকাতেই কিটসনের অবস্থা দেখে চমকে উঠল জিনি৷ ওর মনে হল, কিটসন বুঝি এখনই হাত ফসকে নীচে পড়ে যাবে৷

‘আলেক্স!!’

‘কোনও ভয় নেই৷’ রুদ্ধশ্বাসে জবাব দিল কিটসন, ‘হঠাৎই কিরকম মাথাটা ঘুরে উঠেছিল৷ তুমি আর নীচের দিকে তাকিও না, জিনি৷ এক মিনিট অপেক্ষা করো—আমাকে একটু সামলে নেবার সময় দাও৷’

মসৃণ দেওয়ালের গায়ে লেপটে থাকা দুটো নিঃসঙ্গ মাছির মতো ওরা স্থির হয়ে রইল৷ তবে সে কয়েক মুহূর্তের জন্যে৷ তারপরেই পরিপূর্ণ সাবধানতা নিয়ে আবার উঠতে শুরু করল কিটসন৷ পা-রাখবার একটা জুতসই প্রশস্ত জায়গা খুঁজে পেতে তার দেরি হল না। নিজে প্রস্তুত হয়ে সে হাত বাড়াল জিনির দিকে৷

‘দেখি হাত ধরো৷… এবার আস্তে আস্তে ওঠার চেষ্টা করো৷ ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই, আমি তো ধরে আছি৷’

‘না, আলেক্স! এত করে তুমি আমাকে শেষ পর্যন্ত টেনে তুলতে পারবে না, আমি তার আগেই হয়তো নীচে…৷’

‘যা বলছি, করো৷ হাতটা বাড়িয়ে দাও৷’ কিটসনের স্বরে অধৈর্য আদেশের সুর৷

‘ও আলেক্স, আমার ভীষণ ভয় করছে৷ আমি আর এভাবে ঝুলে থাকতে পারছি না৷ যে কোনও মুহূর্তেই আমার হাতের বাঁধন হয়তো খুলে যাবে—৷’

পাথরের গা-থেকে ওর হাতের বাঁধন আলগা হতেই কিটসন ঝট করে জিনির কবজি চেপে ধরল৷ জিনির আর্ত চিৎকার হাওয়ার মাতাল ঝাপটায় মুহূর্তে মিলিয়ে গেল৷ ওর দু-বাহুর শেষ প্রান্তে অসহায়ভাবে ঝুলতে লাগল জিনি৷ ওর স্কার্ট হাওয়ায় উড়তে লাগল; লম্বা, সুগঠিত পা-দুটো অবলম্বন পাওয়ার আশায় শূন্যে এলোপাথাড়ি মাথা খুঁড়ছে৷

জিনির শরীরের সমস্ত ওজন নিজের হাতে নিয়ে ঝুলে রইল কিটসন৷

‘জিনি! সাবধান!’ হাঁপাতে হাঁপাতে চিৎকার করে উঠল কিটসন, ‘আমি পাহাড়ের গা ঘেঁষে তোমাকে ধরে থাকছি, তুমি কোনও পাথরের খাঁজে-টাজে পা-রাখবার চেষ্টা করো৷ তারপর তোমাকে সহজেই আমি টেনে তুলতে পারব৷ কোনও ভয় নেই, শুধু আমাকে একটু সাহয্য করো, তাহলেই হবে৷’

কিটসন জিনির শরীরটা সামান্য পাশে ঘোরাতেই ওর পায়ের আঙুল পাহাড়ের গায়ে এক অমানুষিক উন্মত্ততায় আশ্রয় খুঁজতে চাইল৷ একটু পরেই কিটসন অনুভব করল তার হাতের ওপর জিনির শরীরের ওজন আর নেই—অর্থাৎ ও কোনও অবলম্বন খুঁজে পেয়েছে৷

একইভাবে ওর হাত ধরে রেখে কিটসন তাকাল জিনির দিকে৷

ওরা সেইভাবেই দাঁড়িয়ে রইল৷ ধীরে ধীরে কেটে গেল এক দীর্ঘ মিনিট৷ তারপর শোনা গেল কিটসনের স্বর, ‘আচ্ছা, এবার এসো৷’ বলে সে ওকে টেনে তুলতে শুরু করল৷

চওড়া পাথরটার ওপরে পৌঁছেই শ্লথ, অবসন্নভাবে কিটসনের পাশে বসে পড়ল জিনি৷

সেই মুহূর্তেই ওরা শুনতে পেল গুলির শব্দ৷ শব্দের তীব্রতা অবিশ্বাস্য রকম বেশি, এবং তার প্রতিধ্বনি সে তীব্রতাকে আরও কয়েক গুণ বাড়িতে তুলল৷

জিনি ভয়ে যেন কুঁকড়ে গেল৷ ওর হাত আঁকড়ে ধরল কিটসনের কবজি৷

গুলির শব্দটা এসেছে নীচ থেকেই, এবং ওদের ডান পাশ থেকে৷

অত্যন্ত সাবধানে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল কিটসন, উঁকি মেরে ব্যাপারটা দেখতে চেষ্টা করল৷ নীচের রাস্তাটা এখান থেকে সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে৷ বুইকটা এবং তার কাছাকাছি দাঁড়ানো পুলিশের গাড়ি তিনটেও তার নজরে পড়ল৷

রাস্তার অবরোধের ঠিক পিছনেই অতি সন্তর্পণে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে চলেছে দশজন সৈনিক ও তিনজন পুলিশ অফিসার৷

সেখান থেকে প্রায় পঞ্চাশ গজ দুরে একটা বাঁকের আড়ালেই রয়েছে ব্লেক৷ দুটো ছোট ছোট গোলাকার পাথরকে সে আত্মরক্ষার অস্ত্র হিসেবে সামনে রেখেছে৷ তার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আছে তার অটোমেটিক রাইফেলের নল৷

ব্লেকের কাছ থেকে আরও পঞ্চাশ গজ দুরে দাঁড়িয়ে একটা জিপ, তার পাশেই দাঁড়িয়ে তিনজন সৈনিক—ব্লেকের দৃষ্টির সম্পূর্ণ আড়ালে৷

কিটসন বুঝতে পারল, জিপটা নিশ্চয়ই পাহাড়ের অন্য দিক দিয়ে উঠে এসেছে এবং ব্লেককে ফাঁদে ফেলেছে৷ সে যে ব্লেককে অনুসরণ না করে পাহাড় বেয়ে উঠে এসেছে, সেজন্য মনে মনে অনেকটা স্বস্তি বোধ করল কিটসন৷

ব্লেকের সোজাসুজি, রাস্তার বাঁকের কাছে মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে একজন সৈনিক৷ তার মাথার একটা ক্ষত থেকে রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছে৷ আশপাশের মাটি রক্তের সংস্পর্শে ভিজে, কালচে হয়ে উঠেছে৷

রাস্তা ধরে এগিয়ে আসা সৈনিকের দল বাঁকটার কাছে এসে থামল, ব্লেকের দৃষ্টিপথের আড়ালে৷ ব্লেকের কাছ থেকে ওদের দূরত্ব এখন মাত্র কুড়ি ফুট৷

একজন বেঁটেখাটো তৎপর মেজর তার সোনালি চুলে ঢাকা মাথা অতি সাবধানে সামনে ঝুঁকিয়ে উঁকি মারল৷ কিন্তু মৃত সৈনিকটিকে দেখামাত্রই ব্যস্তসমস্তভাবে সে মাথাটা ভেতরে টেনে নিল৷

গলার স্বর উঁচু পরদায় তুলে সে চিৎকার করে উঠল, ‘আমি জানি, তুমি ওখানেই লুকিয়ে রয়েছ! অতএব মাথার ওপর হাত তুলে বাইরে বেরিয়ে এসো! তোমার বাঁচার আর কোনও আশাই নেই! চুপচাপ বেরিয়ে এসে ধরা দাও!’

কিটসনের নজর পড়ল, ব্লেক যেন নিজেকে মাটির সঙ্গে আরও মিশিয়ে ফেলতে চাইছে৷

জিনি আস্তে আস্তে সরে এল কিটসনের পাশ থেকে, নীচে তাকাল৷

রাস্তায় দাঁড়ানো সৈনিকদের চেয়ে প্রায় দুশো ফুট ওপরে থাকলেও, ওদের মনে হল লোকগুলো যেন ওদের বড় বেশি কাছে রয়েছে৷

‘তুমি নিজেই বেরিয়ে আসবে, না আমরা গিয়ে তোমাকে টেনে বার করব?’ মেজর চিৎকার করে জানতে চাইল৷

‘আয় শালা আমাকে ধরবি আয়৷’ ব্লেক চিৎকার করে জবাব দিল৷ ওর স্বরে একটা নৃশংস, আতঙ্কিত সুর৷ ‘আয় ধরবি আয়—তারপর দেখ, কেমন দাওয়াই তোদের দিই!’

মেজর একজন পুলিশ অফিসারকে ডেকে কী যেন বলল৷ উত্তরে অফিসারটি ঘাড় হেলাল৷

তারপর মেজর এগিয়ে এল একজন সৈনিকের কাছে৷ তার সঙ্গে কিছুক্ষণ ধরে আলোচনা করার পর সৈনিকটা তার হাতের রাইফেলটা তুলে দিল আর একজন সহকর্মীর হাতে৷ তারপর পোশাকের পকেট থেকে ক্ষুদ্রাকৃতি কী একটা জিনিস হাত নিয়ে অতি সন্তর্পণে সে এগতে শুরু করল৷

কিটসন রুদ্ধশ্বাসে সব লক্ষ করে চলল৷ তার হৃৎপিণ্ডের গতি হয়ে উঠেছে টলমল, উত্তাল৷

রাস্তার বাঁকের কাছে পৌঁছেই সৈনিকটা থামল৷

‘এই তোমার শেষ সুযোগ!’ মেজর চিৎকার করে বলল, ‘এখনও বাইরে বেরিয়ে এসো৷’

উত্তরে ব্লেক একটা অশ্রাব্য খিস্তি করে উঠল৷

মেজর একই স্বরে চিৎকার করে উঠল, ‘ঠিক আছে, তাহলে তাই হোক!’

সৈনিকটি সেই ছোট জিনিসটাকে সহজ ভঙ্গিতে বাতাসে ছুড়ে দিল৷ অলসভাবে পাক খেতে-খেতে ওটা নীচে পড়তে শুরু করল৷

কিটসনের কাঁধে মুখ ঢাকল জিনি৷

কিটসন চিৎকার করে ব্লেককে সাবধান করে দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল৷ কারণ সামান্য শব্দ করামাত্রই সে নীচে দাঁড়ানো পুলিশ দলের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে! তখন এই লুকোনো জায়গার আর কোনও গুরত্বই থাকবে না৷

যে পাথর দুটোর আড়ালে ব্লেক আত্মগোপন করেছিল গ্রেনেডটা গিয়ে পড়ল ঠিক তার সামনে৷

কিটসন দু’হাতে চোখ ঢাকল৷

 গ্রেনেড বিস্ফোরণের শব্দটা অস্বাভাবিক তীব্র শোনাল৷ বিস্ফোরক টুকরোগুলোর হাওয়ায় শিস কেটে উড়ে যাওয়ার শব্দ কিটসনের কানে এল৷ কানে এল ছোট ছোট আলগা পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দ৷

এক হাতে জিনির শারীরকে আঁকড়ে ধরে সে আস্তে আস্তে ভেতরে পিছিয়ে এল; চোখ তখনও তার বোজা৷

জিনি কিটসনকে দুহাতে জাপটে ধরে কাঁপছে থরথর করে৷ ওরার নিজেদের ভয়ার্ত শরীরকে পরস্পরের সংস্পর্শে এনে হয়তো চাইছে ঝুটো আশ্বাস৷

হঠাৎ একটা লোক চিৎকার করে উঠল, ‘এখানে তো মাত্র একজন৷ আর দুজন তাহলে গেল কোথায়? মেয়েটাও তো দেখছি এখানে নেই৷’

‘ভয় পেয়ো না, ওরা আমাদের খুঁজে পাবে না!’ কিটসনের চঞ্চল আঙুল তখন জিনির তাম্রাভ চুলে বিলি কাটছে, ‘এই পাথরের আড়ালে আমাদের খোঁজ করার কথা ওদের মাথাতেও আসবে না৷’

ঠিক তখনই সে শুনতে পেল কোনও এয়ারক্র্যাফট উড়ে আসার শব্দ৷ কিটসন জানত, ওপর থেকে নজর ফেললে তাদের খুঁজে পেতে কারোর পক্ষেই খুব একটা সময় লাগবে না৷ কারণ মসৃণ পর্বতের গায়ে তাদের শরীর দুটো খোলা মাঠে দাঁড়ানো মিনারের মতোই প্রকট৷

ওরা তাকাল পরস্পরের দিকে৷ জিনি প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল নিজের শরীরটা কিটসনের শরীরে মিশিয়ে ফেলতে৷ যেন কোনও আতঙ্কিত পশু দিশাহারা হয়ে তার গর্তে ঢোকবার চেষ্টা করছে৷

আতঙ্কের শীতল নাগপাশ কিটসনের হৃৎপিণ্ডকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে৷ সম্মোহিতের মতো সে চেয়ে রইল দূরাগত এয়ারক্র্যাফটের দিকে৷

সূর্যের রশ্মিকে অতিক্রম করে, তাদের ভয়ার্ত শরীরে ছায়া ফেলে, ওদের ঠিক ওপর দিয়েই উড়ে গেল প্লেনটা৷ ওপরে চোখ রাখতে কিটসন দেখল, প্লেন চালক জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে তাদের দিকেই দেখছে৷

এয়ারক্র্যাফটের ডানা দুটো এদিক-ওদিক হেলিয়ে ওরা চলে গেল৷ কিটসন বুঝল, প্লেনচালক যে তাদের দেখতে পেয়েছে সেটাই সে যাওয়ার আগে ডানা নেড়ে তাকে জানিয়ে দিয়ে গেল৷ কিটসন মানসচক্ষে যেন দেখতে পেল, প্লেনচালক তার বেতার যন্ত্রে তারস্বরে খবর পাঠাচ্ছে৷ নীচের রাস্তায় দাঁড়ানো লোকগুলোকে জানিয়ে দিচ্ছে পলাতকদের সন্ধান সে পেয়ে গেছে৷

‘জিনি! আমার কথা শোনো!’ জিনির মুখটা আলতো করে তুলে ধরল সে৷ তাকাল ওর ভয়ার্ত চোখজোড়ার দিকে, ‘ব্লেক ঠিকই বলেছিল৷ কারণ এখন দেখছি মরণ কারাগারে যাওয়ার ইচ্ছে আমারও নেই৷ কিন্তু তোমার এখনও বাঁচার সুযোগ আছে৷ নেহাতই তোমার ভাগ্য যদি মন্দ হয়, তাহলেও ওরা তোমাকে দশ বছরের বেশি জেলে রাখতে পারবে না৷ তোমার বয়েস অনেক কম৷ জুরিরা তোমার জন্যে সহানুভূতি দেখাবে৷ দশ বছর সময় কিছুই নয়; দেখতে-দেখতে কেটে যাবে৷ তারপর জেল থেকে বেরিয়ে তুমি আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে পারবে৷ তুমি বরং এখানেই থাকো, পুলিশের লোক এসে তোমাকে নামিয়ে নিয়ে যাবে৷’

‘আর তুমি?’ জিনি কিটসনের বাহু আঁকড়ে ধরল৷

কিটসন কষ্টকৃত হাসি হাসল, ‘আমি এখান থেকে হাওয়ায় গা–ভাসিয়ে দেব৷ এই অবস্থায় সবচেয়ে তাড়াতাড়ি এ পৃথিবী ছেড়ে পালানোর পথ৷ আমি কিছুতেই মরণ কামরায় পা-রাখতে পারব না৷’

জিনি গভীরভাবে শ্বাস নিল, ‘আমরা একইসঙ্গে যাব, আলেক্স৷ এতে আমি ভয় করি না৷ কিন্তু দশ বছর জেল আমার কাছে অসহ্য৷ দশ বছরের নিঃসঙ্গ জীবনকে আমি ভয় পাই৷ আমরা একসঙ্গেই যাব৷’

হঠাৎই কোনও লাউডস্পিকারে ভেসে এল এক কর্কশ আদেশ, ‘এই তোমাদের বলছি৷ নীচে নেমে এসো৷ আমরা জানি তোমরা পাথরের ওপরেই লুকিয়ে রয়েছে৷ আমরা কোনও রক্তপাত চাই না বলেই বলছি, চুপচাপ নেমে এসো৷’

‘তুমি থাকো, জিনি—’

‘না৷ তা হয় না৷’

কিটসন সামনে ঝুঁকে এল৷ জিনিকে সর্বশক্তি দিয়ে জাপটে ধরে আবেগভরে চুমু খেল, ‘জিনি মনে আছে ফ্র্যাঙ্ক কী বলেছিল? হাতের মুঠোয় পৃথিবী৷ কে জানে, আমাদের সেই ইচ্ছার বাস্তব রূপ বোধ হয় এই পরণতি, হয়তো সে ইচ্ছাপূরণ এই পৃথিবীতে সম্ভব নয়, তার জন্যে রয়েছে অন্য কোনও পৃথিবী—যে পৃথিবীর সন্ধানে আমরা চলেছি৷’

হাত ধরাধরি করে ওরা দুজন উঠে দাঁড়াল৷

ওরা সোজাসুজি তাকাল নীচের রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়ানো পুলিশ ও সৈন্যদের দিকে৷ তাদের রাইফেলের নল ঊর্ধ্বমুখী, তাক করা ওদের দুজনের দিকেই৷ যে কোনও মুহূর্তেই নিরাপদ আড়াল লক্ষ করে দৌড়নোর জন্যে তাদের শরীরের প্রতিটি পেশি টান-টান৷

‘ঠিক আছে’ কিটসন চিৎকার করে উঠল৷ তার স্বর নীচে দাঁড়ানো সশস্ত্র সৈনিকদের কাছে দুর্বল, ক্ষীণ শোনাল, ‘আমরা আসছি৷’

সে চোখ ফেরাল, জিনির দিকে, ‘তুমি তৈরি?’

জিনি আরও শক্ত করে কিটসনকে আঁকড়ে ধরল, ‘আমাকে শক্ত করে ধরে রাখো, আলেক্স৷ আমি তৈরি৷’

নীচে দাঁড়ানো লোকগুলো ওদের লক্ষ করেছিল৷ তারা দেখল, ওরা হঠাৎই মসৃণ পাথরের আশ্রয় ছেড়ে হাওয়ায় গা-ভাসিয়ে দিল, পাহাড়ের পাথরের দেওয়ালে ধাক্কা খেতে-খেতে এলোপাথাড়িভাবে সত্যি-সত্যিই ওরা নেমে আসতে লাগল দুশো ফুট নীচের রুক্ষ রাস্তায়৷

সমাপ্ত

দ্য ওয়ার্ল্ড ইন মাই পকেট