তিন
রাত আটটায় মরগ্যান একটা আলোচনা সভা ডেকেছিল লু স্ট্রাইগারের জুয়ার আড্ডায়৷ কিন্তু ব্লেক পৌঁছে গেল নির্দিষ্ট সময়ের কিছু আগেই—সাতটা পঁয়তাল্লিশ৷ কারণ অবশ্য তেমন কিছু নয়; নেহাত তার ঘড়িটা বেয়াড়া সময় দিচ্ছেল বলেই৷
বার-এর লোকজনের ভিড় ঠেলে ব্লেক এগিয়ে চলল। ঘরের বন্ধ আবহাওয়া ভারী হয়েছে সিগারেটের ধোঁয়ায়। অনেক পরিশ্রমের পর সে দেখতে পেল স্ট্রাইগারকে। লালমুখো, মোটা লোকটা জুয়ার বোর্ডের ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছে।
‘কেউ ভেতরে গেছে নাকি, লু?’ ব্লেক প্রশ্ন করল।
‘উঁহু। দরজা খোলাই আছে। স্বচ্ছন্দে যেতে পার!’
‘আচ্ছা, আমাকে একটা স্কচ খাওয়াও দেখি!’
স্ট্রাইগারের এগিয়ে দেওয়া গেলাসটাকে দু-চুমুকে শেষ করে নামিয়ে রাখল ব্লেক। আনমনাভাবেই এগিয়ে গেল কোনার একটা টেবিলের দিকে। টুপিটাকে পিছন দিক থেকে সামান্য ঠেলে বসে পড়ল সে। টাইয়ের নটটাকে সামান্য আলগা করে গা-এলিয়ে দিল চেয়ারে।
অস্বাচ্ছন্দ্য আর ভাবপ্রবণতা ব্লেকের মন থেকে একমুহূর্তের জন্যও নিষ্কৃতি পায়নি। বিশেষ করে ফ্র্যাঙ্কের ওই রেস্তোরাঁ লুটের ব্যাপারটা তাকে ভাবিয়ে তুলেছে—জিনির চিন্তা তো আছেই!
অন্য তিনজনের মতো ব্লেকের জীবন অতটা জটিল ছিল না; বরং সুখ সুবিধা ছিল প্রচুর। ব্লেকের বাবা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। তাঁর ইচ্ছে ছিল একমাত্র ছেলেকে ভালোভাবে মানুষ করবেন, লেখাপড়া শিখিয়ে ডাক্তার করবেন। কিন্তু এত সুখে থেকেও পড়াশোনার ব্যাপারটা ব্লেকের কাছে বড় একঘেয়ে মনে হল। তাই মেডিকেল কলেজে বছর-দুয়েক কাটানোর পরই সে পড়াশোনার অধ্যায়ে পূর্ণচ্ছেদ টেনে বাড়ি ছেড়ে নিরুদ্দেশ হল।পরে অনেক কষ্টে একটা চাকরি জোগাড় করল; কমিশনে গাড়ি কেনা-বেচার কাজ; এবং একইসঙ্গে সে আবিষ্কার করল নারী-সঙ্গ তার কাছে হয়ে উঠেছে অপরিহার্য। সুতরাং অনিবার্যভাবেই আয়ের চেয়ে বিভিন্ন পথে ব্যয়ের পরিমাণই হতে লাগল বেশি। অবশেষে একদিন সে বুঝতে পারল পর্বতপ্রমাণ ঋণের বোঝায় তার শিরদাঁড়া নুয়ে পড়েছে৷ তখনই ব্লেক হাত লাগল কোম্পানির সিন্দুকে৷ সিন্দুক থেকে চার হাজার ডলার সরিয়ে সে চম্পট দিল৷ তার মনে একটা ভ্রান্ত ধারণা জন্মাল যে পুলিশের চোখে সে সাফল্যের সঙ্গেই ধুলো দিতে পেরেছে৷ তাই গোয়েন্দা-পুলিশের জালে জড়িয়ে পড়ার মুহূর্তই পরিস্থিতির আকস্মিকতায় ব্লেক একেবারে বোকা বনে গেল৷ তখন পর্যন্ত চার হাজার থেকে সে খরচ করেছে মাত্র দুশো ডলার৷ এরপর যথারীতি সে দোষী সাব্যস্ত হল, এবং শাস্তি পেল ছ-মাসের কারাদণ্ড৷ তখন ব্লেকের বয়েস মাত্র বাইশ বছর৷ পরে আর যে ব্লেক জেল খাটেনি, তা নয়৷ আরও দুবার তাকে যথাক্রমে তিন এবং চার বছরের জন্যে জেলে যেতে হয়েছে৷ ক্রমে-ক্রমে ব্লেকের মনে জেল সম্বন্ধে এক অদ্ভুত ঘৃণা এবং আতঙ্ক গড়ে উঠেছে৷
শেষ বার, যখন সে চার বছরের শাস্তি ভোগ করেছে, তার দেখা হয় মরগ্যানের সঙ্গে—ওই জেলেই৷ মরগ্যান তখন তার পনেরো বছর সশ্রম কারাদণ্ডের শেষ বছরটা কোনওরকমে কাটাচ্ছে৷ কিন্তু পনেরো বছর জেলের কথা শুনেই ব্লেকের শিরদাঁড়া কেঁপে উঠেছে—বুকে বয়ে গেছে হিমেল স্রোত৷
ওরা জেল থেকে ছাড়া পেল একই সঙ্গে৷ ছাড়া পাওয়ার পর মিলেমিশে দল বাঁধার প্রস্তাবটা মরগ্যানই রাখল ব্লেকের কাছে৷ অরাজি হওয়ার কোনও যুক্তি খুঁজে না পেয়ে ব্লেক রাজি হল৷
ব্লেকের রাজি হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল গোলমেলে লাইনে মরগ্যানের খ্যাতি৷ জেলে থাকতে অনেকেরই মুখেই সে শুনেছে আজ হোক কাল হোক, মরগ্যান একটা মোটা দাঁও মারবেই৷ এবং তারপর সে একজন কেউকেটা হয়ে বসবে৷ সুতরাং ব্লেক মরগ্যানের প্রস্তাবে রাজি হতে দ্বিধা করেনি৷
পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে জীবনের দিকে পিছন ফিরে তাকিয়ে ব্লেকের চোখের সামনে ধরা পড়েছে শুধুই হতাশা এবং ব্যর্থতার ইতিহাস৷ ভবিষ্যতের বিবর্ণ রূপ ও তার অজানা ছিল না৷ তাই জীবনের প্রথম এবং শেষ জুয়ার সে বাজি ধরেছে৷ ভবিষ্যতের রং বদলের চরম চেষ্টা না করে সে হার মানতে রাজি নয়৷ তার মনে হয়েছিল মরগ্যানই তাকে নিয়ে যাবে ঐশ্বর্যের রাজপথে৷ যে পথে কানাগলির আকারহীন বীভৎস প্রবেশের অধিকার নেই৷
ঘরের কোণায় একা একা বসে বসে স্বপ্নের জাল বুনে চলল ব্লেক৷ ভাবতে লাগল তার অংশের দু-লাখ ডলারের কথা৷ দু-লক্ষ ডলার! অত টাকা নিয়ে কী করবে সে? দেশে দেশে ঘুরে বেড়াবে? ব্লেকের মন স্বপ্নের পাখায় ভর করে উড়ে চলল! ওর চোখের সামনের রঙিন পরদায় ভেসে উঠল দেশ-বিদেশের সুন্দরী তরুণীদের ছবি, যাদের সুখ-সঙ্গের জন্যে সে পাগল৷ বেশ কিছুদিন মৌজ করার পর সে যাবে মন্টি কার্লোয়৷ সেখানে ব্যাঙ্ক ডাকাতি করে আরও কিছু টাকা তাকে হাতাতে হবে৷ তারপর…
এমন সময় সমস্ত দিবাস্বপ্নের জাল ছিঁড়ে ব্লেকের সামনে উপস্থিত হল জিনি গর্ডন৷ ভেসে বেড়ানো ধোঁয়ার পুঞ্জ ভেদ করে ও এগিয়ে এল৷ উদ্ধত চিবুক, চোখের ভাষায় তাচ্ছিল্য৷ বার-এর অন্যান্য মধু-পিয়াসীর দল জিনিকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি, চোখ টেপাটেপি করতে লাগল৷ লুক স্ট্রাইগার তার জুয়ার আড্ডায় নারী সংক্রান্ত কোনওরকম আঠালো ব্যাপার পছন্দ করে না৷ নইলে বার-এ ঢোকার পর জিনির কী অবস্থা হতো বলা মুশকিল৷
ওফ্ একটা জিনিস বটে—ভাবল ব্লেক৷ তার চোখজোড়া অদূরে দাঁড়ানো জিনির শরীরে আটকানো৷ গোপন আলোচনার জন্যে লু স্ট্রাইগারের কয়েকটা বিশেষ ঘর আছে৷ সেগুলো সে মোটা টাকায় খদ্দেরদের ভাড়া দেয়৷ বার থেকে বেরিয়ে দু-তিন ধাপ সিঁড়ি নামলেই ঘরগুলো চোখে পড়ে৷ ব্লেক লক্ষ করল জিনি সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে একটু যেন দ্বিধাগ্রস্ত৷
জিনির পরনে আঁটোসাঁটো কালো নাইলনের কালো স্ল্যাক্স, আর শ্যাওলা সবুজ শার্ট—গলার কাছটা সামান্য খোলা৷
কিন্তু মেয়েটাকে বশ করা বড় কঠিন৷ আপন মনেই বলে উঠল ব্লেক৷ কোথায় থাকে, কী করে, কে জানে৷ তবে ওর সঙ্গ লাভে ব্লেকের বিন্দুমাত্রও অনীহা নেই৷ এখন একটু-আধটু মিষ্টি কথা বলে ওকে হাতে রাখা দরকার৷ পরে এই ট্রাক-ফাকের ঝামেলা মিটে গেলে জিনিকে নিয়ে একটু ফুর্তি করা যাবে৷ মেয়েটার মধ্যে প্রাণ আছে, আনন্দ আছে—আর চেহারা তো আছেই৷
চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল ব্লেক৷ লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গেল সিঁড়ির দিকে৷ ঘরগুলোর কাছাকাছি পৌঁছে জিনিকে ধরে ফেলল সে৷
‘এই যে, জিনি—আমরা দুজনেই তাহলে প্রথমে পৌঁছলাম, কী বলো?’ তারপর কয়েক মুহূর্ত ব্লেকের চোখ খেলে বেড়াল জিনির আঁটোসাঁটো স্ল্যাক্সের ওপর, ‘ওফ্, এটা পরে তোমাকে দারুণ দেখাচ্ছে!’
জিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে ব্লেকের আপাদমস্তক দেখল৷ সাগর-সবুজ-চোখ অভিব্যক্তিহীন নিস্পৃহ৷
‘তাই নাকি?’ নিরুত্তাপ স্বরে উত্তর দিল জিনি৷ তারপর দরজা খুলে ঘরে ঢুকল৷ সুইচ টিপে জ্বালিয়ে দিল ঘরের আলোটা৷
আলো জ্বেলে ও এগিয়ে গেল গোল টেবিলের কাছে৷ চেয়ারে বসে হাতব্যাগটা খুলল৷ চিরুনি আর আয়না বের করে অবাধ্য একমাথা তাম্রাভ চুলের বন্যাকে আয়ত্তে আনতে চাইল৷
একটা চেয়ার টেনে নিয়ে ব্লেকও বসল জিনির মুখোমুখি৷ প্রশংসাভরা চোখে অপলকে সে চেয়ে রইল জিনির তরঙ্গায়িত যৌবনের দিকে৷
‘শুনেছ তো, আজ রাতেই আমরা ছোট কাজটা সারছি৷’ হাসল ব্লেক, ‘ভয় পেলে নাকি?’
আয়না আর চিরুনি ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল জিনি৷ বের করল এক প্যাকেট সিগারেট৷
‘ভয়? এতে ভয় পাওয়ার কী আছে?’ নিস্পৃহ স্বরে ও পালটা প্রশ্ন করল৷
‘তা অবশ্য ঠিক—অন্তত তোমার বেলায়!’ জিনির দিকে চোখ রেখে ব্লেক বলল, ‘তুমি ভয় পেয়েছ বললেও আমি বিশ্বাস করতে পারব না৷’
ব্লেক ঝুঁকে পড়ল টেবিলের ওপর৷ লাইটার জ্বালিয়ে ধরল জিনির ঠোঁটের সামনে৷
কয়েকটি নিটোল মুহূর্ত কেটে গেল নীরবতায়৷ জিনি স্থিরচোখে চেয়ে রইল লাইটারের কম্পমান নীল শিখার দিকে৷ তারপর মাথা নামিয়ে সিগারেটের অগ্রভাগ স্পর্শ করাল লাইটারের আগুনে৷ ওর উষ্ণ, নরম রক্তিম ঠোঁট কুঞ্চিত হল রহস্যময় হাসিতে—কিন্তু সে পলকের জন্যে৷ এই দুর্জ্ঞেয় হাসির অর্থ ব্লেকের কাছেও রয়ে গেল অস্পষ্ট৷
‘হঠাৎ হাসবার কী হল?’ তীক্ষ্ণ স্বরে জানতে চাইল ব্লেক৷
জিনির চোখজোড়া আবার এসে থামল জ্বলন্ত লাইটারের ওপর৷ তাকাল ব্লেকও৷ এবং সবিস্ময়ে সে লক্ষ করল, তার হাত থরথর করে কাঁপছে৷ এক ঝটকার লাইটার নিভিয়ে দিল ব্লেক, চেয়ারে টান-টান হয়ে বসল, হাসল কষ্টকৃত হাসি৷
‘ঠিকই ধরেছ, জিনি, আমি ভয় পাচ্ছি৷ কিন্তু কেন জান?” টেবিলে আড়াআড়ি হাত রেখে, তার ওপর ভর দিয়ে সামান্য ঝুঁকে এল ব্লেক, ‘আমার ভয় হচ্ছে, আজ রাতের ছোট কাজটায় কোনওরকম গোলমাল বাঁধিয়ে আসল কাজটাকে আমরা না কেঁচিয়ে ফেলি! তার ওপর এই রেস্তোরাঁ লুটের মতলবটা আমার ঠিক পছন্দসই নয়৷ ফ্র্যাঙ্ককে বহুবার আমি বারণ করেছি৷ এর চেয়ে ডুকাসের ওই পেট্রোলপাম্পটা কায়দা করা আমাদের পক্ষে অনেক সোজা এবং নিরাপদ ছিল—কিন্তু কে শোনে কার কথা৷ তাছাড়া ভেবে দেখো, এই রেস্তোরাঁর ব্যাপারটায় কোনও খদ্দের হঠাৎ বেশি সাহসী হয়ে উঠতে পারে—তখন? বুঝতেই পারছ, সে ক্ষেত্রে আমাদের গুলি চালানো ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না৷ আর সেই গুলিতে যদি কেউ মারা যায়, তাহলে আসল কাজে হাত দেবার আগেই পুলিশ আমাদের পেছনে লাগবে৷’
ব্লেকের চোখে চোখ রেখে জিনি নাক দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল, ‘তাহলে কেউ যাতে সাহস দেখাতে না যায়, সেদিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে৷’
‘কাজে করার চেয়ে রেখে জিনি নাক দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল, ‘তাহলে কেউ যাতে সাহস দেখাতে না যায়, সেদিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে৷’
‘কাজে করার চেয়ে মুখে বলা অনেক সোজা৷’
ভুরু উচিয়ে অবাক চোখে তাকাল জিনি, ‘তাই নাকি? ঠ্যাঙানির কাছে ক্ষ্যাপা কুকুরও পোষ মানে; তেমনি রিভলভারের সামনে বীরত্ব দেখাতে গেলে তার ফল যে ভালো হয় না, সেটা বেশ ভালো করে প্রত্যেকের সমঝে দিতে হবে৷ তাহলেই আর গোলমালের কোনও ভয় থাকবে না৷’
ব্লেকের ভুরু কুঁচকে উঠল সংশয়ে, ‘তোমাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না, জিনি৷…আচ্ছা, এর আগে কি কখনও কোনও দলের হয়ে তুমি কাজ করেছ?’
জিনির সবুজ চোখে নেমে এল ঘন মেঘের ছায়া৷
‘তাহলে আমাকে বোঝবার চেষ্টা কোরো না৷’ সংক্ষিপ্তভাবে জবাব দিল ও৷
ব্লেক অসহায়ভাবে কাঁধ ঝাঁকাল, ‘ঠিক আছে৷ তুমি যদি নিজেকে পরদার আড়ালেই রাখতে চাও, রাখো—আমার কোনও আপত্তি নেই৷ তবে একটা কথা তোমাকে জানিয়ে রাখা ভালো, আজ রাতে সবচেয়ে কঠিন কাজটা পড়েছে তোমারই ওপর৷ অর্থাৎ রেস্তোরাঁর খদ্দেরদের কাছ থেকে তাদের মানিব্যাগগুলো তোমাকেই জোগাড় করতে হবে৷ সেই সময়ে কেউ হয়তো তোমাকে বাধা দিতে পারে৷ সুতরাং সাবধান থেকো৷
ব্লেক মনে মনে জিনিকেও তার অবস্থার অংশীদার করতে চাইল৷ কিন্তু সে অবাক হল জিনির জবাব শুনে৷
‘আমার রিভলভারের সামনে সে চেষ্টা কেউ করবে বলে তো মনে হয় না৷’ নির্বিকার অভিব্যক্তিহীন মুখে বলল ও৷
এমন সময় দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকুল জিপো ও কিটসন।
ব্লেকের সঙ্গে জিনিকে ঘরের মধ্যে আবিষ্কার করে ভীষণ অবাক হল কিটসন৷ তার মনের চাপা ক্রোধ প্রতিফলিত হল রক্তিম মুখমণ্ডলে৷
‘এই যে, জামাইবাবু এসে গেছেন দেখছি৷’ ঠাট্টার সুরে বলে উঠল ব্লেক৷ তারপর বেসুরো গলায় গেয়ে উঠল, ‘এ ব্যথা কী যে ব্যথা, বোঝে কী আন জনে…’
জিপো আর হাসি চাপতে পারল না৷ সশব্দে হেসে উঠল সে৷ তার কালো চোখের তারা নেচে উঠল উপচে পড়া খুশিতে৷ ব্লেকের রসালো টিপ্পনিতে সে দোষের কিছু দেখল না৷ কিন্তু কিটসনের মুখমণ্ডল হয়ে উঠল ফ্যাকাসে৷ উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘থামো৷’ তোমার এই ছাগল-মার্কা রসিকতা পকেটে পুরে রাখো৷’
ব্লেক গান বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল৷ মুখে ফুটে উঠল তাচ্ছিল্যের হাসি, ‘চটছ কেন, আলেক্স? ফ্র্যাঙ্কই তো বলল, তুমি আর ও… …’ আঙুল তুলে নির্বিকারভাবে বসে থাকা জিনির দিকে দেখাল ব্লেক, ‘নব-বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী সাজতে যাচ্ছ, ক্যারাভানে চড়ে যাচ্ছ হানিমুন কাটাতে৷’
‘আমি তোমাকে থামতে বলেছি, এড৷’ দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল কিটসন৷
‘আরে, এতে তোমার আপত্তিটা কিসের? হালকা সুরে জানতে চাইল ব্লেক, ‘কেন, তুমি কি জিনির সঙ্গে হানিমুন কাটাতে রাজি নও৷ এমনিতেই ট্রাক-লুটের ব্যাপারে তোমার ভূমিকাটা তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়৷ তার ওপর জিনির মতো একটা চামর যন্তরকে পাশে বসিয়ে গাড়ি চালানোর চেয়ে মজা আর কী হতে পারে? অবশ্য সে সময়টুকু তোমাকে কাজে লাগাতে হবে, মানে…’
গুটিকয়েক পা ফেলে চকিতে ব্লেকের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল কিটসন৷ বিদ্যুৎচমকের মতো ঝলসে উঠল তার ডান হাত৷ আধমনি হাতুড়ির মতো সপাটে আছড়ে পড়ল ব্লেকের চোয়ালে৷
গোটা ঘরটা যেন কেঁপে উঠল প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে৷ চেয়ারসুদ্ধ মেঝেতে উলটে পড়ল ব্লেক ডিগবাজি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল কয়েক মুহূর্ত৷ তারপর চোখ তুলে ঘোলাটে দৃষ্টিতে তাকাল তার প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে৷
‘ওঠ শালা ভেড়ুয়ার বাচ্চা৷ তোর সবকটা দাঁতই আমি উপড়ে নেব৷!’ কিটসনের বিশাল শরীর রাগে কাঁপছে৷ ‘এই আলেক্স—শোনো—’ জিপো ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল৷ কিটসনের হাতের এক ঝটকায় সে ছিটকে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল দেওয়ালে৷
ব্লেক বারকয়েক মাথা ঝাঁকিয়ে ঘৃণাভরা চোখে দেখল কিটসনকে, ‘বহুদিন ধরে শুধু এই রকম একটা সুযোগের অপেক্ষাই করছিলাম৷ শালা, এবার তোর বক্সিং করার শখ চিরকালের জন্যে ঘুচিয়ে দেব!’
ব্লেক সোজা হয়ে দাঁড়াতেই ঘরে এসে ঢুকল মরগ্যান।
তাকে দেখে রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল জিপো, ‘ওদের আটকাও, ফ্র্যাঙ্ক! ওরা এক্ষুনি একটা মারপিট বাঁধাবে!’
মরগ্যান দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে থামল দুজনের মাঝখানে৷ কিটসনের দিকে পিছন ফিরে ব্লেকের মুখোমুখি দাঁড়াল সে, তোমাদের কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?’ কৃত্রিম নম্রস্বরে তিরস্কার করল মরগ্যান৷ তার সরীসৃপ কালো চোখ ধক্ ধক্ করে জ্বলছে৷
ব্লেক ইতস্তত করল, তারপর কাঁধ ঝাঁকাল৷ কোটটাকে টেনেটুনে ঠিক করল, আঙুল চালাল অবিন্যস্ত চুলের ফাঁকে৷ একটা চেয়ার হ্যাঁচকা মেরে টেনে নিয়ে তাতে বসল৷ মাথা নিচু করে টেবিলের দিকে চোখ রেখে আহত চোয়ালে হাত বেলাতে লাগল সে৷
মরগ্যান এবার ফিরল কিটসনের দিকে, ‘দলের মধ্যে কোনওরকম গোলমাল করবার চেষ্টা কোরো না, আলেক্স, তাহলে তুমি নিজেই গোলমালে পড়বে৷ এই শেষ এই নিয়ে আর দ্বিতীয় দিন তোমাকে আমি সাবাধান করব না৷ নাও—বোসো!’
জিনি এবং ব্লেকের থেকে বেশ কিছুটা দূরে একটা চেয়ার দিয়ে বসে পড়ল কিটসন৷
জিপো তখনও অস্বস্তির ভাবটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি৷ টেবিলের কাছে এসে জিনির পাশে দাঁড়িয়ে সে কিছুক্ষণ আমতা আমতা করল, ‘তোমার পাশে বসলে কোনও আপত্তি আছে?’
জিনি মাথা নাড়ল, ‘উঁহু—স্বচ্ছন্দে বসতে পার৷’
বিব্রত হয়ে কপট হাসি হাসল জিপো৷ বসল জিনির পাশে৷
মরগ্যান ঘরের মধ্যে অস্থিরভাবে পায়চারি করতে লাগল৷ ঠোঁটের কোনায় অলস ভঙ্গিতে ঝুলছে একটা জ্বলন্ত সিগারেট; মাথার টুপি চোখের ওপর টেনে নামানো৷
‘শোনো তাহলে—’ বলতে শুরু করল মরগ্যান, ‘আজ রাত ঠিক বারোটা বেজে দশ মিনিটের সময় আমরা সেই রেস্তোরাঁটা লুট করছি; অর্থাৎ যখন কাফে থাকবে খদ্দেরদের ভিড়ে জমজমাট—এবং অন্য কেউ যে হঠাৎ এসে পড়ে আমাদের কাজ পণ্ড করে দেবে সে সম্ভাবনাও কম৷ স্বাভাবিকভাবে গাড়ির সম্পূর্ণ দায়িত্ত্ব থাকবে কিটসনের ওপর!’ মরগ্যান থামল, এক পলক দেখল কিটসনকে, ‘তুমি তো জানো রেস্তোরাঁটা কোথায়! সুতরাং পালাবার পথ খুঁজে নিতে তোমার কোনওরকম অসুবিধে হওয়ার কথা নয়৷ গাড়ির ইঞ্জিন চালু রেখে আমাদের জন্যে তুমি রাস্তার অপেক্ষা করবে৷ যদি শেষ পর্যন্ত কাজটা পণ্ড হয়ে যায় তাহলে তোমাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গাড়ি ছোটাতে হবে—আর কোনও গাড়ি যদি আমাদের পিছু নেয় তবে তাকে ঝেড়ে ফেলার ভার আমি তোমার ওপরেই ছেড়ে দিলাম—কী বলো?’
গুম হয়ে বসেছিল কিটসন৷ মরগ্যানেরে কথায় সে শুধু মাথা হেলাল৷
‘জিনি, তুমি, এড আর আমি—’ পায়চারি করতে করতেই বসে চলল মরগ্যান, ‘এই তিনজন রেস্তোরাঁয় ঢুকব৷ লু আমাকে একটা মেশিনগান ধার দেবে বলেছে৷ তাছাড়া তোমার আর এডের হাতে রিভলভার থাকবে৷ আমার পেছনে পেছনে তুমি ভেতরে ঢুকবে৷ আমরা ঢুকলেই এড দরজার পরদা ফেলে দেবে—খোলা রিভলভার হাতে দরজাটা পাহারা দেবে৷ ‘আমি সোজা গিয়ে দাঁড়াব বার-এর ওপর যাতে মেশিনগান দিয়ে গোটা ঘরটাকেই কবজা করতেই পারি৷ আশা করি মেশিনগান দেখে কেউ আর বিশেষ চেঁচামেচি করবে না৷ যাকগে, এইভাবে লোকগুলোর চুপ করানোর পর শুরু হবে তোমার কাজ৷ অর্থাৎ প্রত্যেকের মানিব্যাগগুলো তোমাকে সংগ্রহ করতে হবে৷ ক্যাশ টাকা ছাড়া আর কিছু আমরা চাই না৷ কিন্তু এড, সেই সময় যদি কেউ কাফেতে ঢোকবার চেষ্টা করে, তবে তাকে বাধা দেওয়ার দায়িত্ব তোমার৷ ঠিকমতো যদি আমরা সব কাজ করতে পারি, তাহলে মিনিট পাঁচেকের বেশি সময় লাগবে না৷ অবশ্য সেটা নির্ভর করছে তোমার ওপর৷’ জিনির দিকে আঙুল দেখাল মরগ্যান, ‘কাজ করার সময় তোমাকে ভীষণ সতর্ক থাকতে হবে—কারণ মানিব্যাগ তোলার সময় হয়তো কোনও মাতাল আচমকা তোমার রিভলভার কেড়ে নেবার চেষ্টা করতে পারে৷ আর নেহাত প্রয়োজন না পড়লে আমরা বন্দুক ব্যবহার করতে চাই না৷’
জিপোর কালো চোখ অস্বস্তিতে চঞ্চল হয়ে উঠল৷ এ কাজে তার কোনও ভূমিকা নেই ভেবে তার আশ্বস্ত লাগল৷
কিটসন একদৃষ্টে টেবিলের দিকে তাকিয়ে নখ খুঁটতে লাগল৷ গাড়ির দায়িত্ব দেওয়ার জন্যে ফ্র্যাঙ্ককে সে মনে মনে ধন্যবাদ দিল৷ ওঃ কাফেতে সটান ঢুকে চল্লিশ-পঞ্চাশজন লোককে সামাল দেওয়া নেহাত চাট্টিখানি কথা নয়! তার নিজের অতখানি সাহস আছে কি না সে বিষয়ে কিটসনের যথেষ্ট সন্দেহ আছে৷
ব্লেক ভেতরে ভেতরে তখনও কিটসনের ওপর রাগে জ্বলছে৷ কিন্তু মরগ্যানের কথায় তার মন থেকে কিটসনের চিন্তা একেবারে উবে গেল৷ একটা অদ্ভুত শীতল অনুভূতির সঙ্গে সঙ্গে তার পাকস্থলীটা যেন কুঁকড়ে যেতে চাইল৷
‘ঠিক আছে’, বলল ব্লেক, ‘তুমি যদি এ ভাবেই কাজটা করবে বলে ঠিক করে থাক তবে আমার আর কিছু বলার নেই৷ কিন্তু আমার যেন মনে হচ্ছে, এর চেয়ে একটা সহজ কাজ নিলেই আমরা ভালো করতাম—এ কাজটা আমার একেবারেই মনপসন্দ নয়৷’
মরগ্যান পায়চারি থামিয়ে থমকে দাঁড়াল, ‘আমি তা জানি এড৷ কিন্তু এ-কাজের আগে এটা মোটামুটিভাবে আমাদের একটা পরীক্ষা৷ এই কাজ থেকেই আমি বুঝতে পারব, আসল কাজের সময় তোমরা মাথা ঠান্ডা রেখে এগোতে পারবে কি না৷ সেই জন্যে এই কাঠে লুটের প্ল্যানটা আমার মাথায় এসেছে—’ মরগ্যান টেবিলের কাছে এগিয়ে এল, সরাসরি চোখ রাখল জিনির চোখে, ‘এটা তোমারও পরীক্ষা জিনি৷ প্রথম থেকেই তুমি বড় বেশি কথা বলেছ, এবং আমি তোমার কথায় বিশ্বাস করেছি৷ এখন আমি দেখতে চাই তোমার কথার মধ্যে সত্যের পরিমাণ কতটুকু৷ সেইজন্যেই এ কাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তোমার—সবচেয়ে কঠিন কাজটাই আমি তোমার জন্যে রেখেছি৷’
জিনির স্থির চোখকে মোকাবিলা করল মরগ্যানের দৃষ্টি৷
‘নিশ্চিন্ত থাকো, ফ্র্যাঙ্ক৷ কাজটাকে তুমি যতটা কঠিন ভাবছ ততটা কঠিন নয়৷ আমি ঠিক পারব৷’ থামল জিনি৷
মরগ্যান হাসল, ‘সময় এলেই সেটা বোঝা যাবে৷ ঠিক আছে, এবার বাকিটা তোমরা শুনে নাও৷ কিটসন, তুমি জিপোর গাড়িটা নিয়ে ঠিক বারোটা দশ মিনিটে কাফের সামনে হাজির থাকবে৷ তোমার ঘড়িটা ঠিক আছে তো? কটা বাজে দেখো তো?’
‘আটটা কুড়ি৷’ হাতঘড়ি দেখে জবাব দিল কিটসন৷
‘আর আমার ঘড়িতে আটটা বেজে তেইশ মিনিট৷’ নিজের ঘড়ি দেখে সময় বলল মরগ্যান,
‘লু-র কাছ থেকে তুমি মেশিনগানটা নেবে৷ সেটাকে রাখবে গাড়ির পেছনের সিটে৷ তারপর কাফেতে তুমি একাই যাবে৷ আমি আর এড হেঁটেই যাব৷ কাফেতে ঢোকার সময় আমি পেছনের সিট থেকে মেশিনগান তুলে নেব৷’ মরগ্যান ফিরল জিনির দিকে, ‘তুমি ম্যাডক্স স্ট্রিট ধরে আসবে৷ কাফের কাছে ঠিক বারোটা দশেই পৌঁছবে—যেন দেরি না হয়৷ সময়ের ব্যাপারে আমাদের ভুল করলে চলবে না৷ তোমার কাছে ঘড়ি আছে তো?’
জিনি সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল;
‘ঠিক আছে৷ তা হলে আলেক্স, যাবার সময় লু-র কাছ থেকে তুমি মেশিনগানটা নিয়ে যেও৷ জিপো, তুমিও ওর সঙ্গে যাও৷ দেখো তোমার সাধের পক্ষীরাজ আবার ইঞ্জিন বিগড়ে না বসে থাকে৷ বারোটা বেজে দশ মিনিটে আবার আমাদের দেখা হবে, কেমন?’
কিটসন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল! অস্বস্তিভরা চোখে তাকাল মরগ্যানের দিকে; তারপর দেখল জিনিকে৷ হঠাৎ চোখ ফিরিয়ে সে এগিয়ে চলল দরজার দিকে; জিপো তাকে অনুসরণ করল৷
ওরা চলে যেতেই মরগ্যান বলল, ‘তুমি ঠিক আছ তো?’ সে প্রশ্ন করল জিনিকে৷
ভুরু উঁচিয়ে তাকাল জিনি, ‘কেন, ঠিক না থাকার কোনও কারণ ঘটেছে নাকি?’
‘দেখো, আমার সামনে বেশি বড় বড় কথা বোলো না৷’ তীক্ষ্ণস্বরে বলে উঠল মরগ্যান, ‘এ ধরনের কাজ আমি বহু করেছি, কিন্তু তবুও আমি যে একেবারেই ভয় পাই না তা নয়৷ আমাকে ধোঁকা দেবার চেষ্টা কোরো না, জিনি৷ আমি জানতে চেয়েছি—তুমি ঠিক আছ কি না? এখনও ভেবে দেখো, এ কাজটা তুমি পারবে তো!’
জিনি হাত বাড়িয়ে ধরল মরগ্যানের দিকে৷ ওর আঙুলের ফাঁকে একটা জ্বলন্ত সিগারেট৷ একটা সূক্ষ্ম রেখায় স্থিরভাবে এঁকেবেকে উঠছে সিগারেটের ধোঁয়া৷ জিনির আঙুলের সিগারেট নিথর, নিষ্কম্প৷
‘আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে, ভয় পেয়েছি?’ শান্তস্বরে জানতে চাইল জিনি৷ তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করেই চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল৷
মরগ্যান ও ব্লেক চোখ তুলে তাকাল জিনির দিকে৷
‘বারোটা দশে আমাদের দেখা হবে৷’ মরগ্যানের চোখে চোখ রেখে বলল জিনি৷ তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে হেঁটে চলল দরজার দিকে৷ স্বাভাবিকভাবেই ওর নারীসুলভ বিশেষত্ব ব্লেকের চোখ এড়াল না৷ বাইরে বেরিয়ে নিঃশব্দে দরজাটা আবার বন্ধ করে দিল জিনি৷
‘মেয়েটার সাহসের প্রশংসা করতে হয়৷’ ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল ব্লেক৷
‘কে জানে৷’ মৃদুস্বরে উত্তর দিল মরগ্যান, ‘অনেক সাহসী লোককেই বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে আমি ভেঙে পড়তে দেখেছি৷ আসল কাজের সময়েই আমরা জিনির সত্যিকারের পরিচয় পাব৷’ মরগ্যান উঠে দাঁড়াল, ‘আচ্ছা—তাহলে এবার ওঠা যাক৷’
রাত ঠিক বারোটা বেজে পাঁচ মিনিটের সময় মরগ্যান এবং ব্লেক এসে উপস্থিত হল ম্যাডক্স স্ট্রিটের মোড়ে৷ রাস্তা পার হয়ে একটা অন্ধকার দোকানঘরের সামনে ওরা থমকে দাঁড়াল৷ চোখের শ্বাপদ দৃষ্টি প্যালেস অল-নাইট কাফের দিকে৷
পরদা-ঢাকা জানলার ফাঁক দিয়ে ভেসে আসছে উজ্জ্বল আলোর রেখা৷ কাচের দরজার ওপারে অবস্থিত বার-এর একাংশ ওদের নজরে পড়ল৷
আধ-খাওয়া সিগারেটের টুকরোটা টোকা মেরে রাস্তায় ছুঁয়ে দিল মরগ্যান, ‘ওই যে কাফে৷’
‘আমি বাজি রেখে বলতে পারি, এ কাজের হাত থেকে রেহাই পেয়ে জিপো মনে মনে ভগবানকে ধন্যবাদ দিচ্ছে৷’ বন্ধ হাতের মুঠোয় ঘামের তৈলাক্ত অনুভূতি এবং হৃৎপিণ্ডের অসংলগ্ন, ক্লান্ত পদক্ষেপ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ব্লেক বলে উঠল৷
‘এবং জিপোকে এ কাজ থেকে বাদ দিতে পেরে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি৷’ বলল মরগ্যান৷ কিন্তু বুকের ঢিপঢিপ শব্দ উৎকটভাবে তার কানে বাজল৷ ঠোঁট দুটোতে শুকনো জিভ বুলিয়ে সে সহজ হতে চাইল, ‘কিটসন গাড়ি নিয়ে হাজির হওয়ামাত্রই আমরা রাস্তা পার হয়ে কাফেতে ঢুকছি৷’
‘হু, কথা বলতে বলতেই প্যান্টের পিছনের পকেটে হাত ঢোকাল ব্লেক৷ অনুভব করল .৩৮ রিভলবারের শীতল স্পর্শ৷ এমন সময় সে লক্ষ করল, জিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে কাফের দিকে৷ ওর পরনের পোশাকের কোনও পরিবর্তন হয়নি—সেই কালো স্ল্যাক্স আর শ্যাওলা সবুজ শার্ট৷ কিন্তু ওর তামা-রঙ চুলের ঢল একটা সবুজ স্কার্ফের আবরণে ঢাকা৷ রাস্তার স্বল্প আলোয় ওর মুখের যতটুকু ব্লেকের নজরে পড়ল, তাতে তার মনে হল জিনির সৌন্দর্যকে অনেকাংশ ম্লান করে দিয়েছে ওর মাথার সবুজ স্কার্ফ; যার আড়ালে অদৃশ্য হয়েছে জিনির রেশমি চুল৷
‘ওই যে, জিনি এসে গেছে৷’ মরগ্যানকে লক্ষ করে বলে উঠল ব্লেক৷ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জিপোর ঝরঝরে লিংকন গাড়িটা এসে থামল কাফের দরজার সামনে৷
‘চলো, এবার যাওয়া যাক৷’ ব্লেকের আস্তিন ধরে টান মারল মরগ্যান৷ তারপর দ্রুত লম্বা পা ফেলে রাস্তা পার হতে লাগল৷
কাফের সামনের রাস্তাটা একেবারে নির্জন—নিঃশব্দ৷ ওদের কানে এল কাফের জ্যুক-বক্স থেকে ভেসে আসা ওয়ালস্ সংগীতের হালকা সুর৷
মরগ্যান গিয়ে থামল লিংকনের পাশে৷ চারপাশে একনজর দেখে হাত বাড়িয়ে পিছনের সিট থেকে তুলে নিল মেশিনগানটা৷
‘ঠিক সময়ের জন্যে প্রস্তুত থেকো আলেক্স৷’ গাড়ির চালকের আসনে বসে থাকা কিটসনের দিকে না তাকিয়েই কথাগুলো ছুড়ে মারল মরগ্যান, পালাবার সময় এক সেকেন্ড সময়ও আমি নষ্ট করতে চাই না৷’
কিটসন একটা অস্ফুট শব্দ করে সায় জানাল৷ ওর হাতে শক্তভাবে আঁকড়ে রইল স্টিয়ারিং হুইলটা৷
ব্লেক ইতিমধ্যে একটা রুমাল বের করে মুখের নিম্নাংশ ঢেকে ফেলেছে৷ রুমালের গিঁট বাঁধতে গিয়ে সে টের পেল উৎকণ্ঠা উত্তেজনায় তার হাত অস্থির হয়ে উঠেছে৷
জিনি তখন মুখ ঢাকার পালা সেরে কাফের দরজার কাছে চুপটি করে দাঁড়িয়ে৷ হাতে ধরা .৩৮ পুলিশ স্পেশালটা ওর শরীরের পাশে সমান্তরাল ভাবে ঝুলছে৷
মরগ্যান মুখোশ ব্যবহারের কোনও প্রয়োজন অনুভব করল না৷ এ লাইনে এতদিন থেকে তার যা যৎসামান্য অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাতে সে ভালোভাবেই জানে কাফের কোনও খদ্দেরই পুলিশের কাছে তাদের চেহারার সঠিক বর্ণনা দিয়ে উঠতে পারবে না৷ কারণ এই আতঙ্কের মুহূর্তে ওদের চিন্তাক্ষমতা সম্পূর্ণ লোপ পাবে৷
‘এসো ভেতরে ঢোকা যায়৷’ দ্রুত গভীর শ্বাস টেনে বলল মরগ্যান৷ তারপর এগিয়ে গেল জিনির কাছে, ‘তুমি দরজাটা খুলেই পাশে সরে দাঁড়াবে৷’
‘জানি৷’ জিনির শীতল, নির্বিকার উত্তর মরগ্যানকে অবাক করল৷ সে তাকাল জিনির দিকে৷ নিষ্পলক চোখে মেয়েটা তারই চোখে তাকিয়ে৷
‘হুঁ, মেয়েটার নার্ভের প্রশংসা করতে হয়৷ ভাবল মরগ্যান৷ কিন্তু আমি ভেবেছিলাম বুঝি… অবিশ্বাস্য! এইটুকু একটা কচি মেয়ের পক্ষে এতখানি ঠান্ডা মাথায় কাজ করা কখনই সম্ভব নয়? অথচ…
জিনি দরজার খুলে তার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল৷ মরগ্যান ওর পাশ কাটিয়ে ঢুকল ভেতরে৷ বার-এর কলগুঞ্জন এবং উত্তপ্ত আবহাওয়া যেন চোখেমুখে এসে ঝাপটা মারল৷
জিনি মরগ্যানকে অনুসরণ করতেই ব্লেক এগিয়ে গেল দরজার কাছে৷ মুখে বাঁধা রুমাল ঘামে ভিজে উঠেছে৷ ঘেমে উঠেছে হাতের রিভলভারও৷ ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল সে৷ পরদা টেনে দিল কাচের ওপর৷
বার কাউন্টারে দুজন বয়স্ক লোক দাঁড়িয়েছিল৷ বাইরের ঠান্ডা হাওয়া ঘরে ঢুকতেই তারা ঘাড় ফিরিয়ে দরজার দিকে দেখল৷ প্রথমে তাদরে নজর পড়ল মরগ্যানের মুখের দিকে—তারপর তার হাতের মেশিনগানটার দিকে৷ এই অবিশ্বাস্য দৃশ্যের আকস্মিকতায় তাদের চোখজোড়া গর্ত ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল; মুখের রং মিলিয়ে গিয়ে ভেসে উঠল একটা ফ্যাকাসে ভাব৷ তখনই ওরা দেখতে পেল রুমালে ঢাকা জিনিকে৷
মরগ্যান চিৎকার করে উঠল, ‘সাবধান, পথ ছেড়ে সরে দাঁড়ান আপনারা৷’ তার হাতের মেশিনগান আদেশের ভঙ্গিতে আন্দোলিত হল৷
ঘরের কলকুঞ্জন নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল৷ অখণ্ড নীরবতা ভঙ্গুর আসবারের মতো ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে৷ মরগ্যানের তীক্ষ্ণস্বর রেশমি কাপড়ে ছুরির ঝলকের মতো কেটে বসল সেই জমাট নিস্তব্ধতার ওপর৷
বুড়ো লোক দুটো পিছোতে গিয়ে একজন আরেকজনের ঘাড়ের ওপর উলটে পড়ল৷
বার কাউন্টারে এত হাতের ওপর ভয় দিয়ে মরগ্যান শূন্যে লাফিয়ে উঠল৷ পরমুহূর্তেই তাকে দেখা গেল পা-ফাঁক করে, দুহাতে মেশিনগান আঁকড়ে কাউন্টারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে৷
এলোপাথাড়ি লাথি চালিয়ে মরগ্যান কাউন্টারের ওপর সাজানো বোতলগুলো চারিদিকে ছিটকে ফেলল৷ কাচ ভাঙার ঝনঝন শব্দের সঙ্গে ভেসে এল কোনও তরুণীর ভয়ার্ত চিৎকার৷ কাফের চেয়ারে বসে থাকা প্রতিটি লোক চমকে উঠে দাঁড়াল৷ শুরু হল পরস্পরের মধ্যে চাপা গুঞ্জন৷
‘খবরদার!’ গর্জে উঠল মরগ্যান৷ সেই সঙ্গে নেচে উঠল তা হাতের মেশিনগান, কেউ নিজেদের জায়গা ছেড়ে নড়বেন না; চুপচাপ বসে পড়ুন৷ আপনারা চুপ থাকলে আমার মেশিনগানও চুপ থাকবে৷ কারও একটু বেচাল দেখলেই একেবারে সীসের বস্তা করে ছাড়ব!’
বুকের খাঁচায় আবদ্ধ হৎপিণ্ডের আকুল দাপাদাপি ব্লেকের কানে যেন দামামার মতো বাজতে লাগল৷ ঘামের বন্যায় তার দৃষ্টি হয়ে এল অবরুদ্ধ৷ নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টায় এক হ্যাঁচকায় রুমালটা খুলে ফেলল ব্লেক৷’ বুক ভরে শ্বাস নিল৷ জনাকীর্ণ কাফের চারপাশে চোখ বুলিয়ে রিভলভারটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল সে৷ কিন্তু অবাধ্য হাতের কাঁপুনি সে বাঁধনকে শিথিল করে দিতে চাইল৷ ব্লেক তখন মনে মনে প্রার্থনা করছে, যেন ওদের কোনও বিপদের মুখোমুখি না পড়তে হয়৷
একটা বুড়ি ভাঙা গলায় চিৎকার করে উঠল৷ দুজন লোক চেয়ার ছেড়ে ওঠবার চেষ্টা করতেই তাদের সঙ্গিনীরা হাত ধরে টেনে বসিয়ে দিল৷ ঘরের সকলেই যেন নিটোল পাথরের মূর্তিতে পরিণত হয়েছে৷
গলার স্বর উঁচু পরদায় তুলে বলে উঠল মরগ্যান, ‘ভালো করে কান দিয়ে শুনুন আমাদের শুধু ক্যাশ টাকা চাই! অতএব চটপট আপনাদের মানিব্যাগগুলো বের করে টেবিলে রাখুন৷ চটপট—তাড়াতাড়ি করুন!’
বেশির ভাগ লোকই তাদের ব্যাক পকেট হাতড়াতে লাগল৷ একই সঙ্গে জিনিও তৈরি হল ওর দায়িত্ব পালনের জন্যে৷ মরগ্যানের দেওয়া ক্যাম্বিসের থলেটা স্ল্যাক্সের পকেট থেকে বের করল ও৷ তারপর বাঁ হাতের থলেটা ঝুলিয়ে, ডানহাতের .৩৮ নাচিয়ে এগিয়ে চলল টেবিলের সারির মধ্যে দিয়ে৷ প্রত্যেক টেবিলের কাছে মুহূর্তের জন্যে দাঁড়িয়ে ও তুলে নিতে লাগল পড়ে থাকা মানিব্যাগগুলো, এবং পর্যায়ক্রমে সেগুলোকে ঢুকিয়ে রাখতে লাগল বাঁ হাতের থলেতে৷
দরজার কাছে নিশ্চলভাবে দাঁড়িয়ে ব্লেক ওকে লক্ষ করতে লাগল৷ ধীরে অথচ অত্যন্ত সাবধানে জিনি এগিয়ে চলল৷ যেন ভঙ্গুর বরফের চাদরে পা রেখে ও হেঁটে চলেছে৷ কিন্তু ওর চলার মধ্যে দ্বিধার ছায়া সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য৷ যান্ত্রিকভাবে কাজ করে চলল জিনি৷
মরগ্যান আবার হিংস্রভাবে চিৎকার করে উঠল, ‘চটপট করুন! মানিব্যাগ বের করতে ফালতু সময় নষ্ট করবেন না৷ বলা যায় না, আমার আঙুলের চাপে মেশিনগান থেকে হয়তো… কিন্তু তা আমি চাই না৷ সুতরাং মানিব্যাগগুলো চটপট মেয়েটার হাতে তুলে দিন!’
এতক্ষণে ব্লেক কিছুটা স্বস্তি বোধ করল৷
মরগ্যান আর জিনিই বলতে গেলে কাজটা হাসিল করল—ভাবল সে৷ ওঃ সাহস আছে বটে ওদের৷
মরগ্যানের স্বরের কাঠিন্য ও শীতলতা সারা ঘরে ছড়িয়ে দিল হিমেল আতঙ্ক৷ তার দাঁড়াবার দৃপ্তভঙ্গি, সেই সঙ্গে শক্ত মুঠোয় ধরা কালো চকচকে মেশিনগানটা যেন শিয়রে দাঁড়ানো মৃত্যুদূতের প্রতিমূর্তি৷’
ওর যান্ত্রিক পরিক্রমার মধ্যে হঠাৎই একটা টেবিলের সামনে থমকাল জিনি৷ টেবিলে বসেছিল একজন সুন্দরী তরুণী; পরনে দামি লোমের কোট৷ তার পাশে বসা স্থূলকায় চেহারার একটি লোক, চোয়ালের রেখা কঠিন, চোখের দৃষ্টি ক্রূর৷ টেবিলের ওপর কোনও মানিব্যাগের চিহ্নমাত্র নেই৷
জিনি তাকাল লোকটার দিকে৷ ওদের চোখাচোখি হল৷ লোকটার ধূসর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল৷
‘ব্যাগটা চটপট বের করে দিন, স্যার৷ শুধু শুধু সময় নষ্ট করবেন না৷ নরম স্বরে বলল জিনি৷
‘দুঃখিত৷ আমার কাছে কোনও ব্যাগ নেই৷ তাছাড়া তোমার মতো কোনও বাজারের মাগীকে দেবার জন্যে আমি টাকা সঙ্গে নিয়ে ঘুরি না৷’ নির্বিকারভাবে জবাব দিল লোকটা৷
ব্লেক ঘামতে শুরু করল৷ সে যেন বিপদের গন্ধ পেল৷ বিচলিত হয়ে সে তাকাল মরগ্যানের দিকে৷ সে একইভাবে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে৷ স্থির তার হাতের মেশিনগানও তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে মরগ্যান তখন লক্ষ করছে জিনিকে। ঠোঁট সরে গিয়ে তার দাঁতের সারি আংশিক উন্মুক্ত—সারা মুখে নেকড়ের হিংস্রতার ছাপ৷
‘ব্যাগটা বের করে দাও৷’ জিনির স্বর উঁচু পরদায় উঠল৷
‘শালা কুত্তির বাচ্চা! আমার কাছে কোনও ব্যাগ নেই!’ জিনির দিকে চোখ রেখে উত্তর দিল লোকটা৷
লোকটার সঙ্গিনীর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে উঠল৷ আতঙ্কে তার চোখজোড়া বুজে এল৷ ধীরে ধীরে সে ঢলে পড়ল লোকটার গায়ে৷ কিন্তু লোকটা অধৈর্যভাবে মেয়েটিকে ঠেলে সরিয়ে দিল৷
এবার রিভলভার উঁচিয়ে ধরল জিনি, ‘চটপট বের করে ফ্যাল মোটা, নইলে একেবারে ঝাঁঝরা করে দেব!’
জিনির কর্কশ ধমকানিতে এতটুকু চমকাল না লোকটা৷ তার মুখের পেশি কঠিন হল, দাঁতে দাঁত ঘষে সে বলল, আমার কাছে কোনও ব্যাগ নেই!! বেরো এখান থেকে!’
মরগ্যান মেশিনগানের নল ঘুরিয়ে লোকটার দিকে লক্ষ করল৷ কিন্তু সে জানত এ প্রচেষ্টা নিরর্থক৷ কারণ লোকটা এবং মরগ্যানের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে জিনি৷ মরগ্যান যে এ অবস্থায় গুলি চালাতে পারে না, সেটা লোকটাও বেশ বুঝতে পারল৷
সুতরাং এই অবস্থাকে সামলানোর দায়িত্ব পুরোপুরি জিনির৷ তাই মরগ্যান তীক্ষ্ণতে ওদের লক্ষ করতে লাগল৷ সে জানত এটাই জিনির চরম পরীক্ষা৷ এই স্নায়বিক চাপের মুহূর্তে ও কি ভেঙে পড়বে?
মরগ্যান তার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই৷
জিনি লোকটার দিকে চেয়ে হাসলঃ সে হাসির ঝলকানি রুমালের আড়ালে পলকের জন্যে আবির্ভূত হয়েই মিলিয়ে গেল৷ তার ক্ষণস্থায়ী রেশ ফুটে উঠল জিনির সবুজ চোখে৷ পরমুহূর্তে সাপের ছোবলের মতো ওর পিস্তলসুদ্ধ হাত আছড়ে পড়ল লোকটার মুখে৷ ব্যাপারটা এত তাড়াতাড়ি ঘটে গেল যে লোকটা বাধা দেওয়ার কোনও সুযোগই পেল না৷ .৩৮-এর নলটা আড়াআড়িভাবে আঘাত করল তার নাকে এবং গালে৷ গাল ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল৷ মুখে দু-হাত চাপা দিয়ে পিছন দিকে হেলে পড়ল লোকটা৷ তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল একটা অস্ফুট আর্তনাদ৷
টেবিলের ওপর ভর দিয়ে ঝুঁকে পড়ল জিনি; রিভলবার ঘুরিয়ে দ্বিতীয় বার আঘাত হানল৷ এবার .৩৮-এর নলটা সরাসরি গিয়ে বাধা পেল লোকটার ব্রহ্মতালুতে৷ লোকটা অবসন্নের মতো আচমকা হুমড়ি খেয়ে পড়ল সামনের দিকে৷
পাশের মেয়েটা বিকট স্বরে চিৎকার করে উঠল৷ এবং সঙ্গে সঙ্গেই জ্ঞান হারিয়ে গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে৷
‘সাবধান নিজের জায়গা ছেড়ে এতটুকু নড়ার চেষ্টা করলে কাউকেই আমি রেহাই দেব না৷’ মরগ্যানের চিৎকারে সকলে আবার ফিরে তাকাল তার দিকে৷ সারা ঘরে ভেসে বেড়াতে লাগল জমাট আতঙ্কের আবহাওয়া, এমন কী ব্লেক পর্যন্ত মুহূর্তের জন্যে শিউরে উঠল মরগ্যানের হাড়-কাঁপানো চিৎকার৷
জিনি হুমড়ি খেয়ে পড়ে-থাকা লোকটার কাছে এগিয়ে গেল৷ কলার ধরে টেনে তাকে সোজা করল৷ তারপর ভেতরের পকেট হাতড়ে বের করে আনল লোকটার মানিব্যাগটা৷ ব্যাগটা থলেতে ভরে তাকে সজোরে এক ধাক্কা মারল৷ লোকটা আবার আছড়ে পড়ল মেঝেতে৷
এতেই যথেষ্ট কাজ হল৷
কোনও যাদুমন্ত্রবলে একের পর এক মানিব্যাগ আবির্ভূত হতে লাগল টেবিলে৷ জিনি শুধু চটপট সেগুলোকে থলেতে ভরে ফেলতে লাগল৷
সাফল্যের উল্লাসে ব্লেক দরজার দিকে আর নজর রাখেনি৷ তাই দরজা খুলে একজন দোহারা চেহারার বলিষ্ঠ লোক যখন হঠাৎ তার সামনে এসে হাজির হল, তখন সে একেবারে বোবা হয়ে গেল৷
নির্বোধের মতো শূন্য দৃষ্টিতে সে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল৷ বিশাল চেহারার আগন্তুক প্রথমে তাকাল ব্লেকের মুখের দিকে৷ তার পরেই চোখে পড়ল ব্লেকের হাতের আলগা মুঠোয় ধরা রিভলভারের ওপর৷ বিদ্যুৎগতিতে আগন্তুকের বলিষ্ঠ হাতে কাটারির মতো নেমে এল ব্লেকের কবজির ওপর; রিভলভারটা সঙ্গে সঙ্গে ব্লেকের হাতছাড়া হয়ে ছিটকে পড়ল মেঝেতে, গড়াতে গড়াতে গিয়ে থামল বার-কাউন্টারের সামনে৷ আগন্তুকের ক্ষিপ্রতায় হতভম্ব ব্লেক তখনও একইভাবে দাঁড়িয়ে৷
লোকটা ব্লেককে লক্ষ করে ঘুঁষি তুলতেই মরগ্যান মেশিনগান তাক করল তার দিকে, চিৎকার করে উঠল, ‘খবরদার! মাথার ওপর হাত তুলে দাঁড়াও! নইলে…’
লোকটা ফিরে তাকাল মরগ্যানের দিকে৷ তার হাতের মেশিনগানটার ওপর চোখ পড়তেই লোকটার সাহস কর্পূরের মতো উবে গেল৷ ব্লেকের কাছ থেকে পিছিয়ে গিয়ে সে মাথার ওপর হাত তুলে দাঁড়াল৷
জিনি একটা টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে একজন বেঁটে-খাটো বলিষ্ঠ লোকের কাছ থেকে মানিব্যাগটা নিচ্ছিল৷ লোকটা মরগ্যানের মেশিনগানটা অন্য দিকে ফেরাতে দেখেই জিনির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ জিনি ব্যাগটা থলেতে ভরতে যাচ্ছিল, এমন সময় বেঁটে লোকটার দুটো হাত আঁকড়ে ধরল ওর হাতের রিভলভারটা—মরিয়া হয়ে রিভলভারটা কেড়ে নিতে চাইল৷ শুরু হল ধস্তাধস্তি৷
জিনিও শক্ত হাতে ধরে রইল .৩৮-এর বাঁট৷ এক পলক দেখল লোকটার ভয়ার্ত, চঞ্চল চোখের দিকে৷ তারপর ধস্তাধস্তির মধ্যেই ট্রিগার টিপল৷ একটা বিকট শব্দ করে গর্জে উঠল রিভলভারটা৷ কাফের সমস্ত জানলা ঝন্ঝন্ করে কেঁপে উঠল৷ লোকটা তড়িৎস্পৃষ্টের মতো এক ঝটকায় হাত সরিয়ে নিল৷ গুলিটা তার জামার আস্তিন ছিঁড়ে, হাত ঘেঁষে বেরিয়ে গেছে৷ চামড়া কেটে রক্ত বেরিয়ে আসছে ধীরে ধীরে৷ জিনি রিভলভার নাচিয়ে দু-পা পিছিয়ে এল৷ লোকটা তখন বাঁ-হাতে তার আহত ডান হাত চেপে ধরেছে৷
‘জলদি করো, জিনি৷ আমাদের হাতে আর সময় নেই!’ মরগ্যান কর্কশস্বরে চিৎকার করে বলল৷
শান্তভাবে নির্বিকার মুখে জিনি কাজ করে চলল! চলাফেরায় নেই কোনও ব্যস্ততার ছাপ৷ কাফের প্রতিটি লোক নিশ্চলভাবে যার-যার জায়গায় বসে৷ তাদের ফ্যাকাসে, বিবর্ণ মুখে আতঙ্কের মুখোশ যেন পেরেক ঠুকে বসানো৷ নিঃশব্দে ওরা লক্ষ করছে জিনির প্রতিটি কার্যকলাপ৷
বাইরের গাড়িতে অপেক্ষারত কিটসনের কানে এল গুলির কান-ফাটানো শব্দ৷ চমকে উঠল কিটসন৷ তবে কি…? অসাধারণ সংযম এবং প্রচেষ্টায় সে গিয়ারের কাছ থেকে তার শঙ্কাতুর হাতকে সরিয়ে আনল৷
স্থির হয়ে বসে রইল কিটসন৷ দুহাতের থাবা আঁকড়ে ধরেছে হুইলটাকে৷ তার সারা মুখ ঘামে চকচক করছে, উৎকণ্ঠার শিকার হয়ে কাঁপছে তার উত্তাল হৃৎপিণ্ড : ধক্…ধক্ ধক্…৷
হঠাৎই অবসান হল তার আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তার৷ কিটসনের কানে এল দৌড়ে আসা ভারী পায়ের শব্দ৷ একটু পরেই খুলে গেল লিংকনের পিছনের দরজা৷ দুদ্দাড় করে কারা যেন ঢুকে পড়ল গাড়িতে৷ লিংকনটা সামান্য দুলে উঠল৷ একটা উতপ্ত ঘামে ভেজা দেহ কিটসনের শরীরে এসে আঘাত করতেই সে পাশ ফিরে তাকাল৷ ব্লেক হুমড়ি খেয়ে পড়েছে সামনের সিটে—তার পাশে৷ যান্ত্রিকভাবে কিটসনের হাত এগিয়ে গেল গিয়ারের দিকে৷ এক প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে সচল হল গাড়িটা৷
‘শিগগির, আলেক্স!’ পিছনের সিট থেকে কিটসনের কানের কাছে মুখ এনে গলা ফাটিয়ে বলে উঠল মরগ্যান, ‘যত জোরে পার গাড়ি ছোটাও!’
দাঁত দাঁত চেপে কিটসন গাড়ি ছুটিয়ে দিল তীরবেগে? চাকার কাতর আর্তনাদের সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটা ঘোরাল কিটসন৷ সরু একটা গলি পার হয়েই বড় রাস্তায় পড়ল৷
সহজাত দক্ষতার সঙ্গে সে বড় রাস্তা নিমেষে পার হয়ে গাড়ি ঢুকিয়ে দিল আর একটা গলিতে৷ গাড়ির গতি এবার সামান্য কমিয়ে, হেডলাইটের সংকেত দিয়ে সে একের পর এক চৌরাস্তা পার হয়ে চলল৷
মরগ্যান ঘুরে বসে পিছনের জানলা দিয়ে দেখতে লাগল কেউ তাদের অনুসরণ করছ কি না৷ এমনিভাবে আধ মাইলটা যাওয়ার পর হঠাৎ সে বলে উঠল, ‘যাক, বাঁচা গেছে৷ কেউ আমাদের পিছু নেয়নি৷ তাহলে চলো, জিপোর ওখানেই যাওয়া যাক৷’
সবাই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল৷ দম আটকানো আবহাওয়া ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে এল৷
‘ওঃ একটা সময় গেল বটে!’ হাতের উলটো পিঠ দিয়ে মুখ মুছে বলে উঠল ব্লেক, ‘মেশিনগানটা না থাকলে আজ ভীষণ বিপদে পড়তে হত৷ আর যখন ওই হারামজাদাটা জিনির হাত থেকে রিভলভার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, তখন…’
‘কী হয়েছিল?’ কাঁপা গলায় জানতে চাইল কিটসন, ‘গুলি চালানোর শব্দ শুনতে পেলাম! কেউ কি আহত হয়েছে নাকি?
‘উঁহু! একটা লোক জিনির রিভলভার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল—এমন সময় ধস্তাধস্তির রিভলভার থেকে গুলি বেরিয়ে যায়৷ অবশ্য তাতে সেরকম একটা কেউ আহত হয়নি; তবে লোকটা ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল৷ আবার অন্য আর একটা লোক আচমকা এসে হাজির হয়ে আমার হাত থেকে বন্দুকটা ছিটকে ফেলে দিল৷ তারপর তাকে সামলাতে অনেক ঝক্কি পোয়াতে হয়েছে৷’
জিনি মরগ্যানের ঠিক পাশেই বসেছিল৷ মরগ্যান অনুভব করল, ওর শরীর কাঁপছে৷ চোখ ফিরিয়ে ওকে দেখল মরগ্যান৷ রাস্তার আলোয় তার চোখে পড়ল জিনির মুখ ফ্যাকাসে, রক্তশূন্য, যেন এক প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেয়েছে৷
ওর হাঁটুর ওপর হাত রাখল মরগ্যান, তোমার কাজে আমি খুশি হয়েছি জিনি৷ সত্যিই তোমার সাহস আছে৷ বিশেষ করে ওই মোটা লোকটাকে যেভাবে শায়েস্তা করলে৷ ওঃ, আমি তো ভাবতেই পারিনি…’
পা সরিয়ে নিল জিনি৷
‘দয়া করে চুপ করো ফ্র্যাঙ্ক৷’ মরগ্যানকে অবাক করে দিয়ে মুখ ফিরিয়ে কাঁদতে শুরু করল মেয়েটা৷
সামনের সিটে বসা কিটসন অথবা ব্লেক কিছুই টের পেল না৷ মরগ্যান জিনিকে একা থাকতে দিয়ে সরে বসল৷
জিপোর কারখানার কাছাকাছি এসে পড়াতে খুব সন্তর্পণে গাড়ি চালাতে লাগল কিটসন৷ মুখ না ফিরিয়ে সে প্রশ্ন করল, ‘মোট কত টাকা হাতালে?’
‘মন্দ নয়৷ কম করে গোটা পঞ্চাশেক মানিব্যাগ তো হবেই, তাছাড়া কাফের ক্যাশবক্সও প্রায় ঠাসা ছিল৷’ কথা শেষ করে মরগ্যান একটা সিগারেট ধরাল৷ নিজের অকম্পিত হাতের দিকে তাকিয়ে সে গর্ব অনুভব করল৷
মরগ্যান তখনও বেশ শুনতে পাচ্ছে ব্লেকের হাঁপানোর শব্দ৷ কাফেতে ঢোকার পর সে প্রায় সর্বক্ষণই ব্লেকের ওপর নজর রেখেছে৷ এবং তার মনে একটা ক্ষীণ সন্দেহ জন্মেছে যে ব্লেক সংশয়ের মুহূর্তে আচমকা ভেঙে পড়তে পারে৷ মরগ্যানের কাছে এ এক নতুন দুশ্চিন্তা৷ এতদিন ধরে ব্লেকের সাহস ও দৃঢ়তা সম্পর্কে তার গভীর আস্থা ছিল৷ কিন্তু আজ সেভাবে নির্জীবের মতো সে ওই জোয়ান লোকটার মোকাবিলা করল, তাতে সে ভরসা মরগ্যানের উবে গেছে৷ নাঃ, এখন থেকে ব্লেকের ওপরেও তাকে কড়া নজর রাখতে হবে৷
এমন কি কিটসনও আজ মুহূর্তের জন্যে তার বিচার-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছিল৷ কথা ছিল ওরা গাড়িতে উঠে বসলেই সে তীরবেগে গাড়ি ছুটিয়ে দেবে৷ কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা হয়নি৷ মরগ্যান যদি ওর কানের কাছে চিৎকার না করত, তা হলে হয়তো কিটসন অত জোরে গাড়ি ছোটাতে পারত না৷ অর্থাৎ কাফে থেকে কেউ না কেউ বেরিয়ে এসে পলায়নরত গাড়িটাকে দেখতে পেত, এবং পুলিশের কাছে গাড়িটার একটি বর্ণনাও দিয়ে ফেলত৷
নাঃ, বড় কাজের আগে প্রত্যেককে ঠিকমতো প্রস্তুত করতে হবে৷তবে জিনির জন্যে তার কোনও চিন্তা নেই৷ ওর আজকের কাজের ধরন মরগ্যানকে ভীষণ খুশি করেছে৷ বলতে গেলে দলের মধ্যে জিনির মূল্যই তার কাছে সবচেয়ে বেশি৷
মরগ্যান আবার দেখল জিনির দিকে৷ ও এখন কান্না থামিয়ে সোজা হয়ে বসেছে৷ ওর ঘষা কাচের চোখে রাস্তার আলোগুলো প্রতিফলিত হয়েই মিলিয়ে যাচ্ছে৷ কাঠখোদাই অভিব্যক্তিহীন মুখে ও বাইরের দিকে তাকিয়ে৷
মরগ্যান তার সিগারেটটা এগিয়ে দিল ওর দিকে৷
‘নাও, ধরো৷’ সংক্ষিপ্তভাবে সে বলল৷
জিনি নিঃশব্দে সিগারেটটা ধরাতেই গাড়িটা উঁচু-নিচু কাঁচা রাস্তায় পড়ল৷ কিটসন বুঝল জিপোর কারখানার আর খুব বেশি দেরি নেই৷
কারখানা বলতে একটা বড় টিনের একচালা; তার পাশে কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি একটা বড় টিনের চালা দেওয়া জায়গাটাই জিপোর কর্মস্থল৷ সাধারণত ছোটখাটো ওয়েলডিং, লোহার দরজা তৈরি বা তালা-চাবিসংক্রান্ত টুকটাক কাজ করেই জিপোর সময় কাটে৷ এবং এই কাজের অজুহাত দেখিয়েই সে গোটা কতক অ্যাসিটিলিন গ্যাসের সিলিন্ডার তার কারখানায় রাখবার অনুমতি পেয়েছে৷ কিন্তু সেই সঙ্গে দু-একটা হাইড্রোজেন সিলিন্ডার রাখতেও সে ভোলেনি৷ কারণ সিন্দুক খোলার কাজে হাইড্রোজেন গ্যাস নিতান্তই অপরিহার্য৷ কারখানা থেকে জিপোর যা লাভ হয়, তাতে তার পেট চলা তো দূরের কথা, ঘর-ভাড়াই মেটে না৷
লিংকনের হেড লাইটের আলো কারখানার দরজায় পড়তেই জিপো বেরিয়ে এল৷ সম্ভবত সে ওদের জন্যই অপেক্ষা করছিল৷ তাড়াহুড়ো করে দরজা খুলতে গিয়ে বার কয়েক হোঁচট খেল জিপো৷ অবশেষে পাল্লা দুটোকে হাট করে খুলে গাড়ি ঢোকার রাস্তা করল৷ তাকে দেখে মনে হল, সে ভীষণ ভয় পেয়েছে৷
দরজা বন্ধ করে দ্রুতপায়ে ওদের কাছে এসে দাঁড়াল জিপো, উদ্বিগ্নভাবে প্রশ্ন করল, ‘কী ব্যাপার? সব ঠিক আছে তো?’
‘হ্যাঁ, কিছু ভেব না৷’ উত্তর দিল মরগ্যান, ‘এখন বোতল আর গেলাস বের করো দেখি! আলেক্স, তুমি চটপট এই নাম্বার প্লেট দুটো পালটে ফেল৷’ লিংকনের দিকে নির্দেশ করল মরগ্যান৷ ‘আর রেডিয়েটরের জলটা পালটে ঠান্ডা জল ভরে দাও৷ বলা যায় না কখন পুলিশ এসে আবার এখানে হানা দেয়৷ কী হল জিপো, দাঁড়িয়ে রইলে কেন? ঝটপট গেলাস নিয়ে এসো৷’ ব্লেক অদূরে দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে সিগারেট ধরানোর চেষ্টা করছিল, তাকে ডাকল মরগ্যান, ‘এড তুমি কিটসনকে একটু সাহায্য করো?’
মরগ্যান এবার এগিয়ে গেল জিনির কাছে, হাসল, ‘কেমন আছ এখন?’
জিনির মুখভাব কঠিন হল৷ ওর গায়ের চামড়া হয়ে উঠেছে ঈষৎ নীলাভ, মুখমণ্ডল পাণ্ডুর৷ বিরক্তিভরা স্বরে জবাব দিল ও, ‘আমার জন্যে তোমাকে ভাবতে হবে না৷’
‘এ কাজটার মতো আসল কাজের বেলায় যদি ওতরাতে পার, তবেই বুঝব৷’
‘ওঃ, তখন থেকে খালি এক কথা৷ আমি কি কচি খুকি নাকি?’ অসহিষ্ণু স্বরে কথাগুলো বলে মুখ ফিরিয়ে নিল জিনি৷ এগিয়ে গিয়ে বসল যন্ত্রপাতি রাখার টেবিলের ওপর৷ উদ্দেশ্যহীনভাবে আঙুল দিয়ে যন্ত্রপাতিগুলো নাড়াচাড়া করে চলল৷
মরগ্যান ঠোঁট উলটে কাঁধ ঝাঁকাল৷ এমন সময় এক বোতল হুইস্কি এবং পাঁচটা গেলাস নিয়ে হাজির হল জিপো৷ গেলাসে হুইস্কি ঢেলে সে নিয়ে গেল জিনির কাছে৷ একটা গেলাস বাড়িয়ে ধরল, ‘নাও খেয়ে নাও৷ ধকল তো কিছু কম গেল না৷’
জিনি গেলাসে একটা ছোট্ট চুমুক দিয়েই মুখ কোঁচকাল৷ ওর মুখের বিবর্ণ ভাবটা কেটে গিয়ে ফিরে এল আগের সেই লাবণ্য৷
‘কাজটা যতটা সহজ ভেবেছিলাম, ততটা নয়৷ আরেকটু হলেই আমার হয়েছিল!’
জিনির কথায় পিঠে বলে উঠল মরগ্যান, ‘কিন্তু তা যখন হয়নি, তখন আর ও নিয়ে ভাবছ কেন?’ এক চুমুকে বাকি হুইস্কিটা গলায় ঢেলে বলে চলল সে, ‘তাছাড়া, সবার চেয়ে তোমার কাজই ভালো হয়েছে৷ যাকগে, এবার দেখা যাক কিরকম আমদানি হল৷’
মরগ্যান এগিয়ে গিয়ে থলেটা উপুড় করে দিল টেবিলের ওপর৷ জিনি তাকে সাহায্য করতে লাগল৷ জিপো, কিটসন এবং ব্লেক তখন একমনে গাড়িটাকে নিয়ে পড়েছে৷
‘এই ব্যাগটা সেই মোটা লোকটার৷’ একটা কালো রঙের ছক-কাটা মানিব্যাগ তুলে নিয়ে বলল জিনি, ‘যাকে রিভলভার দিয়ে মেরেছিলাম৷’
জিনি ব্যাগ হাতড়ে বের করে আনল দশ দশটা একশো ডলারের নোট৷ সেগুলো বিছিয়ে দিল টেবিলের ওপর৷
হুঁ—লোকটাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই৷ হাজার ডলারের মায়ায় যে কোনও লোকই তোমাকে বাধা দেবার চেষ্টা করত৷’
গাড়িটার উপযুক্ত ব্যবস্থা করে ওরা তিনজন এসে দাঁড়াল টেবিলের কাছে৷ চুপচাপ দেখতে লাগল মরগ্যান আর জিনির কার্যকলাপ৷ মিনিটখানেক পরে সমস্ত টাকা টেবিলে স্তূপীকৃত হওয়ার পর মরগ্যান আয়েস করে বসল একটা বাক্সের ওপর; গুনতে শুরু করল লুটের পরিমাণ৷
চারজনের চারজোড়া উৎকণ্ঠিত চোখ স্থিরভাবে লক্ষ করে চলল৷
শেষ টাকাটা গোনা হয়ে গেলে মরগ্যান মুখ তুলে তাকাল, ‘দু-হাজার ন-শো পঁচাত্তর ডলার৷ যাক, তাহলে আমাদের মূলধন জোগাড় হয়ে গেল৷ সুতরাং এবার আমরা স্বচ্ছন্দে এগোতে পারি৷’
‘ফ্র্যাঙ্ক, সত্যিই কি জিনি একটা লোককে মেরেছে?’ চোখ গোল গোল করে প্রশ্ন করল জিপো৷
‘হ্যাঁ, প্রয়োজন ছিল তাই মেরেছে৷’ ডলারের নোটগুলো গুছিয়ে রাখতে রাখতে বলল মরগ্যান, ‘লোকটাকে ও যেভাবে শায়েস্তা করেছে দেখার মতো৷’ তুমি আমি বোধ হয় ওর চেয়ে ভালোভাবে পারতাম না৷’
জিনি গম্ভীর মুখে ঘুড়ে দাঁড়িয়ে পা বাড়াল গাড়ির দিকে৷
ওরা চারজন মুখ চাওয়া চাওয়ি করল৷
‘ওকে দিয়ে কাজ হবে৷’ শান্তস্বরে বলল মরগ্যান, ‘আর তোমরাও যদি ওর মতো কাজ করে দেখাতে পার, তাহলে আর চিন্তা নেই৷ ধরে নাও দশ লাখ ডলার আমরা পেয়ে গেছি৷’
ওর কথা শেষ করে মরগ্যান সরাসরি তাকাল ব্লেকের দিকে৷ ব্লেক সে চাউনির মোকাবিলা করতে বার কয়েক ব্যর্থ চেষ্টা করল৷ তারপর পকেট থেকে সিগারেট বের দেশলাইয়ের খোঁজে এ পকেট সে পকেট অসহায়ের মতো হাতড়াতে লাগল৷ অনুভব করল মরগ্যানের ঝিলিক মারা চোখের অন্তর্ভেদী দৃষ্টি৷
‘আমার কথা শুনতে পেয়েছ, এড?’
ব্লেক কোনওরকমে আগুন ধরাল তার সিগারেটে, ‘নিশ্চয়ই৷’
পরিস্থিতির সন্দেহজনক ইঙ্গিত জিপোর চোখ এড়াল না৷ সে প্রশ্ন করল, ‘কী ব্যাপার, ফ্র্যাঙ্ক? কোনও গোলমাল হয়েছে নাকি?’
‘তেমন কিছু নয়… একটা লোক হঠাৎই এডের কাছ থেকে রিভলভার কেড়ে নিয়েছিল৷ অল্পের জন্যে আমরা সে যাত্রায় রেহাই পেয়েছি৷ নইলে কী হতো বলা যায় না!’
ব্লেক থমথমে মুখ কাঁধ ঝাঁকাল, ‘লোকটার জন্যে আমি ঠিক তৈরি ছিলাম না৷ আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে তারও ঠিক একই অবস্থা হতো৷’
মরগ্যান যে খুব একটা মিথ্যে বলছে না, সেটা কিটসন বেশ বুঝতে পারল৷ কাফের ভেতর থেকে ভেসে আসা বন্দুকের শব্দটাই তার সমস্ত কিছু ওলট-পালট করে দিয়েছিল৷ সে ভেবেছিল, কাফের কোনও লোককে ওরা বুঝি খুন করেছে৷ আর এই খুনের দায়ে জড়াবার আশঙ্কাটাই তাকে কয়েক মুহূর্তের জন্যে একেবারে স্থবির করে দিয়েছিল৷
‘জিনি…’
মরগ্যানের ডাকে ফিরে তাকাল জিনি৷ তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে এল ওদের কাছে৷
‘শোনো, এইবার আমরা বড় কাজের প্রস্তুতি শুরু করব’ বলতে শুরু করল মরগ্যান, ‘তুমি আর কিটসন কাল মার্লোয় যাবে ক্যারাভ্যানটা কিনে আনতে৷ কী মাপের কিনতে হবে সেটা জিপোই তোমাদের বলে দেবে৷’ মরগ্যান এবার বসল টেবিলে৷ তার সিগারেটের ধোঁয়া সাপের মতো এঁকে বেঁকে উড়ে চলেছে শূন্যের দিকে৷ ধোঁয়ার আড়ালে মরগ্যানের চোখ ঝাপসা দেখাচ্ছে৷
‘ক্যারাভানটা দামটা যত কম রাখতে পার ততই ভালো৷ কারণ এই তিন হাজার ডলারের প্রতিটি সেন্ট আমাদের কাছ এক-এক ফোঁটা রক্তের চেয়েও দামি৷ অবশ্য সেটা তোমাকে নতুন করে বলার দরকার নেই৷’ মরগ্যান চোখ ফেরাল কিটসনের দিকে, ‘ক্যারাভান কিনতে গিয়ে তোমাকে কী বলতে হবে মনে আছে তো? বলবে যে, তুমি আর জিনি সম্প্রতি বিয়ে করেছ; হানিমুন কাটানোর জন্যে একটা ক্যারাভান তোমাদের দরকার৷ এতে সন্দেহ করার কিছু থাকবে না; কারণ আজকালকার ছেলেমেয়েরা বিয়ের পর হরদম ক্যারাভান কিনছে৷ তবে একটা বিষয় লক্ষ রেখো যে লোকটা তোমাদের ক্যারাভান বেচবে, সে যেন তোমাদের আর শনাক্ত করতে না পারে!’
কিটসন সন্দেহের চোখে তাকাল ব্লেকের দিকে৷ কিন্তু ঠাট্টা করার মতো মেজাজে ব্লেক ছিল না, কারণ কাফে লুটের ব্যাপারটায় সে খুব একটা কৃতিত্ব দেখাতে পারেনি৷ তাই নিজের ওপর একরাশ বিরক্তি নিয়ে সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল৷
‘ওঃ—এই ভ্যাবাগঙ্গারাম মার্কা ভাবটা মুখ থেকে তাড়াও দেখি৷’ কিটসনকে ধমকে উঠল মরগ্যান, ‘তোমার চাল চলনে মনে হচ্ছে না জিনিকে নিয়ে তুমি হানিমুন কাটাতে যাচ্ছ৷ নাঃ ক্যারাভান কিনতে গেলে দোকানদার তোমাকে নির্ঘাত সন্দেহ করে বসবে৷’
জিপো মনে মনে হাসল, বলল, ‘এক কাজ করলে কেমন হয়, ফ্র্যাঙ্ক? ধরো—আলেক্সের জায়গায় আমিই না হয় গেলাম ক্যারাভান কিনতে? প্রথমত স্নেহ ভালোবাসার ব্যাপারটা আমার সহজাত, তাছাড়া জিনির সঙ্গে আমাকে মানাবে দারুণ!’
জিপোর কথায় জিনি পর্যন্ত হেসে ফেলল৷
‘জিনির সঙ্গে তোমার বয়েসের তফাতটা বড্ড বেশি, জিপো৷ তাছাড়া, তোমার এই প্রকাণ্ড ভুঁড়িটা দোকানদারের স্মৃতিশক্তিকে চাঙ্গা করে তুলতে পারে,’ হেসে জবাব দিল মরগ্যান, ‘সুতরাং কিটসন ছাড়া আমাদের গতি নেই৷’
টেবিলের ওপর থেকে টাকার গোছা তুলে নিয়ে তা থেকে দু-হাজার ডলার কিটসনকে গুনে দিল মরগ্যান৷
‘দরাদরি করে দামটা একটু কম সম করার চেষ্টা কোরো৷ কাল সকাল এগারোটায় আমি বুইক আর ক্যারাভান টানার শেকল তোমার ওখানে পৌঁছে দেব৷’ মরগ্যান তাকাল জিপোর দিকে, ‘তুমি লিংকটনকে নিয়ে আমাকে ফলো করবে৷ কারণ বুইকটা কিটসনের ওখানে ছেড়ে দিয়ে তোমার গাড়িতেই আমাকে ফিরতে হবে৷’
‘ঠিক আছে৷’
‘আচ্ছা, এবার তাহলে ওঠা যাক৷ লু-কে ওর মেশিনগানটা এখনই ফেরত দিতে হবে৷ এড, তুমি আমার সঙ্গে চলো৷’ মরগ্যান এবার দেখল জিনি ও কিটসনের দিকে, ‘তোমরা দুজনে বাসে করেই রওনা দাও৷ কারণ আমাদের চারজনকে একসঙ্গে যত কম দেখা যায় ততই ভালো৷’
বাকি টাকাটা মরগ্যান ব্যাক-পকেটে ঢুকিয়ে রাখল৷ তারপর জিনিকে লক্ষ করে বলল, ‘তোমরা কোথায় দেখা করবে সেটা নিজেরাই ঠিক করে নিও৷ তবে কাল বিকেলের মধ্যেই ক্যারাভ্যানসুদ্ধ তোমাদের এখানে ফিরে আসতে হবে৷’ ব্লেকের দিকে মাথা ঝাঁকাল মরগ্যান, ‘চলে এসো এড৷’
ওরা চলো গেলে জিনি মাথা থেকে সবুজ স্কার্ফটা খুলে ফেনল৷ আড়ষ্ট চুলের গোছাকে আঙুলের আলতো আঁচড়ে স্বচ্ছন্দ করে তুলল৷
বিব্রতভাবে ওকে দেখতে লাগল কিটসন; জিনির সৌন্দর্য সম্পর্কে সে আবার সচেতন হয়ে উঠল, টেবিলে হেলান দিয়ে অপ্রতিভভাবে নখ খুঁটতে লাগল৷
‘আর এক গেলাস হবে নাকি?’ জিগ্যেস করল জিপো৷
জিনি মাথা নাড়ল ‘উহুঁ—ধন্যবাদ৷’ তারপর ব্যাগ থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে ঠোঁট রাখল, তাকাল কিটসনের দিকে৷
কিটসন পকেট হাতড়ে দেশলাই বের করে জ্বালাল৷ জ্বলন্ত কাঠিটা কাঁপা হাতে এগিয়ে ধরল জিনির মুখের কাছে৷ আগুনের শিখাকে স্থির করতে জিনি দু-হাতে আঁকড়ে ধরল কিটসনের চঞ্চল হাত৷ মুখ নামিয়ে সিগারেটের অগ্রভাগ ডুবিয়ে দিল আগুনের আওতায়৷ কিটসনের শিরা-উপশিরায় উষ্ণ রক্তের ঢেউ আছড়ে পড়ল৷’
‘আচ্ছা, তাহলে চলি—’ জিপোর দিকে কথা কটা ছুড়ে দিয়ে দরজার দিকে এগোল জিনি৷
‘পরে আবার দেখা হবে৷’ কিটসনকে লক্ষ করে চোখ টিপল জিপো৷ কিটসন তাতে কোনওরকম ভ্রুক্ষেপ না করে জিনিকে অনুসরণ করল৷
বাইরে বেরেতেই রাতের উত্তপ্ত হাওয়ার ঝাপটা এসে লাগল ওদের শরীরে৷ পাশাপাশি পা-ফেলে ওরা এগিয়ে চলল বড় রাস্তার দিকে৷
বাস-স্টপে পৌঁছে জিনি হঠাৎ প্রশ্ন করল, ‘তুমি থাক কোথায়?’
‘লেনেক্স স্ট্রিট৷’ উত্তর দিল কিটসন৷
ঠিক আছে, কাল এগারোটার সময় আমি লেনেক্স স্ট্রিটের মোড়ে তোমার জন্যে অপেক্ষা করব৷’
‘যদি বলো, তাহলে গাড়ি নিয়ে আমিও যাব তোমার ওখানে—’
‘না, তার কোনও প্রয়োজন নেই৷’
কিটসন আড়চোখে দেখতে লাগল পাশে দাঁড়ানো জিনিকে৷ একসময় হঠাৎ বলে উঠল, ‘সেদিন রাতে—আমি কখনওই তোমার গায়ে হাত তুলতাম না৷ হঠাৎ কেন যে অমন রেগে উঠলাম, কে জানে!… আমি দুঃখিত৷’
জিনি হাসল, ‘আমি তো ভাবছিলাম, ‘তুমি বোধ হয় আমাকে মেরেই বসলে, খুব ভয় করছিল আমার৷’
কিটসন লজ্জা পেল, ‘না, না—শুধু শুধু তুমি ভয় পেয়েছিলে৷ এমনিতেই আমার চেয়ে ছোট কারোর গায়ে আমি হাত তুলি না৷ তার ওপর তুমি তো মেয়ে৷’
‘তা ঠিক, তবে পরে ভেবে দেখলাম, তোমার হাতের ওই চড়টা খেলে আমার উপযুক্ত শিক্ষা হতো৷ বলতে গেলে আমিই তো সাধ করে গাল বাড়িয়ে দিয়েছিলাম৷’ সিগারেটের ছোট টুকরোটা টোকা মেরে ফেলে দিল জিনি৷ দু-একটা ফুলকি ছড়িয়ে সেটা গিয়ে পড়ল রাস্তায়৷ ‘কিন্তু ব্লেকের গায়ে হাত তোলাটা তোমার কি উচিত হয়েছে?’
কিটসন গম্ভীরভাবে উত্তর দিল, ব্যাটা বড্ড বেশি বেড়ে উঠেছিল, তাই একটু দাওয়াই দিলাম৷ তাছাড়া, ও-ই তো গায়ে পড়ে ঝগড়া বাঁধাল৷ সেই প্রথম দিন থেকে… মাঝপথে থেমে গেল কিটসন৷
তা হোক, তবুও ওর গায়ে হাত তুলে তুমি ভালো করোনি৷ এখন থেকে ব্লেকের ওপর সব-সময় তোমাকে নজর রাখতে হবে৷ কারণ, সেই অপমানের প্রতিশোধ নিতে ও ভুলবে না৷’
কিটসন কাঁধ ঝাঁকাল, ব্লেককে অমি ভয় করি না৷’
‘আমারও তাই ধারণা৷ বছর খানেক আগে তোমার একটা লড়াই আমি দেখেছিলাম৷ ওই যে যে লড়াইয়ে জ্যাকি ল্যাজার্ডকে একেবারে ময়দার বস্তা করে ছাড়লে—মনে পড়ছে? ওঃ, দারুণ জমেছিল লড়াইটা!’
কিটসন তাকাল জিনির দিকে৷ ওর বলিষ্ঠ মুখে ফুটে উঠল উজ্জ্বল হাসি৷ সত্যিই দারুণ জমেছিল, সেই লড়াইটা৷ জ্যাকি ল্যাজার্ডকে সে যে হারাতে পেরেছিল, তা নেহাতই ভাগ্যের জোরে৷ ন-টা রক্তাক্ত, ক্লান্ত রাউন্ডের ল্যাজার্ডকে কিটসন কাত করেছিল৷ ভাগ্য সহায় থাকলে সে লড়াইয়ে ল্যাজার্ডও জিততে পারত৷
‘জ্যাকি খুব ভালো লড়িয়ে ছিল!’
‘তুমিও নেহাত খারাপ ছিলে না৷ তা হঠাৎ বক্সিং-টক্সিং ছেড়ে দিলে যে?’
এই প্রশ্নে কিটসন ভীষণ বিব্রত বোধ করল৷ কোনওরকমে একটা মনগড়া জবাব দিয়ে দিল, ‘শেষ লড়াইয়ের পর হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, আমার চোখের ক্ষমতা ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে—কাছের জিনিস খুব ভালো দেখতে পাচ্ছি না৷’ মাথার কোঁকড়ানো চুলে আঙুল চালাল কিটসন, ‘ব্যাপার-স্যাপার দেখে তো খুব ভয় পেয়ে গেলাম৷ তাড়াতাড়ি গেলাম ডাক্তারের কাছে৷ তিনি বললেন বক্সিং ছেড়ে দিতে৷ আমার কিন্তু সেরকম ইচ্ছে একেবারেই ছিল না৷ একেই চ্যাম্পিয়ন হবার খুব সাধ ছিল, তাছাড়া প্রচুর সম্ভাবনাও ছিল… …কিন্তু, ডাক্তারের মতামতকে তো আর অবহেলা করতে পারি না? তাই…’
কিটসনের ম্যানেজার উপস্থিত থাকলে তার বক্তব্য হয়তো একেবারেই অন্যরকম হতো৷
কিটসন উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকাল জিনির দিকে! বুঝতে চাইল, বক্সিং ছাড়ার গল্পটা সম্পর্কে ওর মনে কোনওরকম সন্দেহ আছে কি না৷ কিন্তু জিনির ভাবলেশহীন নির্বিকার মুখে কোনওরকম অভিব্যক্তির আভাস সে দেখতে পেল না৷
দীর্ঘস্থায়ী নীরবতার পর সে প্রশ্ন করল, ‘তুমি হঠাৎ ফ্রাঙ্কের দলে এসে ভিড়লে কেন?’
‘তাছাড়া কার কাছেই বা যেতাম—’ উত্তর দিল জিনি৷ তারপর রাস্তার দিকে তাকিয়েই বলে উঠল, ওই যে—বাস আসছে৷’
বাস থামল, ওরা উঠে পড়ল৷ পাশাপাশি একটা আসনে বসল দু’জনে৷ কিটসন দুটো টিকিট কাটল৷ তারপর নীরবে চেয়ে রইল কাচের জানলায় প্রতিফলিত জিনির মুখের দিকে৷ বাসের কোনও আসনই খালি নেই৷ কিছু কিছু কৌতূহলী লোক মাঝে মাঝে ঘাড় ফিরিয়ে দেখছে জিনিকে৷ কিটসন কেমন অস্বস্তি অনুভব করল৷
বাস চাপা গর্জন তুলে এগিয়ে চলল শহরের দিকে৷ রেল রোড স্টেশনের সামনে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল জিনি, ‘আমি এখানেই নামব৷’
কিটসন উঠে দাঁড়িয়ে ওকে যাওয়র রাস্তা করে দিল৷ জিনির শরীরের আলতো স্পর্শে মুহূর্তের জন্যে চঞ্চল হয়ে উঠল কিটসন৷ বাস থামতেই নেমে পড়ল জিনি৷
বাস আবার চলতে শুরু করতেই কিটসন জানলার ঠান্ডা কাচে মুখ চেপে ধরল তাকাল বাইরের অন্ধকারের দিকে৷ জিনিকে এক পলক দেখার আশায় তার উৎসুক চোখের দৃষ্টি বৃথাই মাথা খুড়ল অন্ধকারের নরম পরদায়৷’
