গল্প
উপন্যাস

আলোছায়ার খেলা – ১০

দশম পরিচ্ছেদ

জনতার ছোট্ট দলটা বেরিয়ে এলো ‘রেড বুল’-এর বাইরে, ইতস্তত ছড়িয়ে পড়লো৷ করোনান্দের সংক্ষিপ্ত বিচার আজকের মতো শেষ—মুলতুবী রাখা হয়েছে পক্ষকালের জন্য৷

রোজমণ্ড ডার্নলি ক্যাপ্টেন মার্শালের সঙ্গে নিলো৷ ও নিচু গলায় বললো, যতটা ভেবেছিলাম সেরকম খারাপ কিছু হয়নি, কি বলো, কেন?’

তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর দিলেন না ক্যাপ্টেন মার্শাল৷ হয়তো উপস্থিত গ্রামবাসীদের নির্লজ্জ অপলক দৃষ্টি সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন, সচেতন ছিলেন তাদের প্রায় উদ্যত তর্জনী সম্পর্কে৷

‘এর কথাই তোমাকে বলছিলাম গো৷’ দ্যাখো, ওই যে মরা মেয়েটার স্বামী৷’ ‘হ্যাঁ, ওই লোকটার বউটাকে কে যেন খুন করেছে৷’ দেখতে পাচ্ছো ওই যে যাচ্ছে…’

জ্ঞানের তীব্রতা তাঁর শ্রবণে আসার পক্ষে যথেষ্ট নয়; কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি অনুভব করতে পারছিলেন তাদের উপস্থিতি, তাদের লক্ষ্যস্থল৷ অতীতের শাস্তি স্তম্ভের এই বোধহয় আধুনিক রূপ৷ ইতিপূর্বে সাংবাদিকদের মুখোমুখি তাঁকে হতে হয়েছে—‘কিছুই বলার নেই’—জাতীয় যে নীরবতার প্রাচীর তিনি তাঁদের কাছে গড়ে তুলেছেন তা দক্ষ হাতে চুরমার করে দিয়েছে৷ সেই আত্মপ্রত্যয়ী অধ্যবসায়ী তরুণেরা এমন কি যে সব সংক্ষিপ্ত শব্দ করে কোন ত্রুটিপূর্ণ সিদ্ধান্তকে তিনি এড়াতে চেয়েছেন, সেই শব্দগুচ্ছই আজকের প্রভাতী সংবাদপ্রত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন তাৎপর্য নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে৷

‘তাঁর স্ত্রী মৃত্যুরহস্যকে একমাত্র এ ধরনের ভিত্তিতেই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যে, কোন স্বভাব-অপরাধী ঘটনাচক্রে এই দ্বীপে এসে উপস্থিত হয়েছিলো, এ বিষয়ে তিনি একমত কিনা প্রশ্ন করা হলে ক্যাপ্টেন মার্শাল বলেন—’ ইত্যাদি ইত্যাদি৷

ফ্লিক-ফ্লিক…ক্যামেরা ঝলসে উঠেছে ক্লান্তিহীনভাবে৷ আর এখন, এই মুহূর্তে সেই বহু পরিচিত ছোট্ শব্দ আবার তাঁর কানে এলো৷ ঘুরে তাকালেন তিনি—একটি যুবক, ঠোঁটে তার হাসি, নিজের কাজ সম্পূর্ণ করে খুশি-খুশিভাবে তাঁকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে৷

রোজমণ্ড অস্ফুট কণ্ঠে বললো, ক্যাপ্টেন মার্শাল ও তাঁর জনৈক বান্ধবী বিচারে শেষে রেড বুল থেকে বেরিয়ে আসছেন৷’

মার্শাল সঙ্কুচিত হলেন৷

রোজমন্ড বলল, ‘এড়াবার চেষ্টা করে লাভ নেই, কেন? বাস্তবের মুখোমুখি তোমাকে হতেই হবে! আমি শুধু আর্লেনার মৃত্যু কথা বলছি না—আনুষঙ্গিক সমস্ত নোংরা ব্যাপারগুলোর কথাও বলছি৷ দশজনের নির্লজ্জ চোখ, পরচর্চায় মুখর জিভ, কাগজের লোকেদের বোকা বোকা সাক্ষাৎকার—এসবের মুখোমুখি হওয়ার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো পুরো ব্যাপারটাকে কৌতুকের চোখে দেখা৷ পুরনো যত বস্তাপচা শব্দে এর জবাব দিয়ে ব্যঙ্গ ভরা কুটিল ঠোঁটে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকো৷’

তিনি বললেন, ‘তুমি বুঝি তাই করতে?’

‘হ্যাঁ৷’ একটু থামলো ও, ‘এবং তুমি তা করবে না আমি জানি৷ তোমার পথ হলো বর্ণচোরা বহুরূপীর পথ৷ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থেকে পটভূমিতে মিলিয়ে যাওয়া৷ কিন্তু এখানে তোমার সে কায়দা খাটবে না, কারণ মিলিয়ে যাওয়ার মতো কোন পটভূমি এখানে নেই৷ এখানে সকলের চোখে তুমি ভীষণভাবে স্পষ্ট—সাদা পটভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা হলদে-কালো ডোরা কাটা কোন বাঘের মতো৷ কারণ তুমি ‘‘নিহত-মহিলার-স্বামী”৷’

‘দোহাই তোমার, রোজমণ্ড!’

শান্তস্বরে বলল ও, ‘তোমার ভালোর জন্যই এসব বলছি, সোনা৷’

কিছুটা পথ ওঁরা নীরবে এগিয়ে গেলেন৷ তারপর ভিন্ন সুরে বললেন মার্শাল, জানি, রোজমণ্ড, জানি৷ আমাকে অতটা অকৃতজ্ঞ ভেবো না৷’

ক্রমে গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে এলেন ওঁরা৷ দূরাগত কৌতূহলী দৃষ্টি এখনও ওঁদের অনুসরণ করলেও কাছাকাছি কেউ নেই৷ রোজামণ্ড ডার্নলি ওর প্রথম মন্তব্যের পুনরাবৃত্তি করলো ভিন্নভাবে, ওর কণ্ঠস্বর স্বাভাবিকের চেয়ে নিচু হলো, ‘ওখানে সত্যি সত্যিই তেমন খারাপ কিছু হয়নি কি বলো?’

এক মুহূর্ত নীরব রইলেন তিনি, তারপর বললেন, ‘কি জানি, জানি না৷’

‘পুলিশ কি ভাবছে?’

‘ওরা স্পষ্ট করে কিছু বলছে না৷’

মিনিটখানেক নীরবতার পর রোজমণ্ড বলল, ‘আর আমাদের সেই ক্ষুদে মানুষটি—পোয়ারো—তিনি কি সত্যিই এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন?’

কেনেথ মার্শাল বললেন, সেদিন তো দেখে মনে হলো, পুলিশ-প্রধানের সঙ্গে আঠার মতো সর্বক্ষণ লেগে রয়েছেন৷’

‘সে জানি—কিন্তু তিনি কি সত্যিই কিছু করছেন?’

‘আমি কি করে জানবো, রোজামণ্ড?’

চিন্তিত স্বরে বলল, ভদ্রলোকর বয়েস হয়েছে৷ সম্ভবত অল্পসল্প ভীমরতিগ্রস্ত৷’

‘হতে পারে৷’

ওঁরা কংক্রীটের সেতুর কাছে এসে দাঁড়ালেন৷ সেতুর ও প্রান্তে সূর্যালোকে আলোকিত দ্বীপটা যেন একরাশ প্রশান্তি নিয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে৷

রাজামণ্ড হঠাৎই বললো, ‘কখনো কখনো—সবকিছু কেমন অবাস্তব বলে মনে হয়৷ এই মুহূর্তে আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না, ওরকম একটা নৃশংস ঘটনা এখানে ঘটতে পারে…’

মার্শাল ধীরে ধীরে বললেন, ‘জানি, তুমি কি বলতে চাইছো৷ কিন্তু প্রকৃতি বড় নিষ্ঠুর৷ বহু জনপ্রাণীর একটি না হয় ক্রমেই গেলো। প্রকৃতির কাছে এটা এরকমই তুচ্ছ, তার বেশি কিছু নয়৷’

রোজামণ্ড বলল, ‘সত্যি—হয়তো এইভাবেই ব্যাপারটা আমাদরে দেখা উচিত৷’

চকিত চোখে ওর দিকে তাকালেন তিনি৷ তারপর নিচু গলায় বললেন, ‘ভেবো না, রোজমণ্ড৷ সব ঠিক আছে৷ স-ব ঠিক আছে৷’

ওঁদের সঙ্গে দেখা করতে সেতুর ওপ্রান্তে এসে দাঁড়ালো লিন্ডা৷ ওর চলাফেরায় দ্বিধাগ্রস্ত অশ্বশাবকের আকস্মিক চঞ্চল ভঙ্গী৷ চোখের কোলে গভীর কালো ছায়া ও কচি মুখের সৌন্দর্যকে অনেকাংশে ম্লান করে দিয়েছে৷ ওষ্ঠাধারে শুষ্কতা ও রুক্ষতা প্রকটভাবে স্পষ্ট৷

রুদ্ধশ্বাসে ও বললো, ‘কি হলো—কি বললো ওরা?’

ওর বাবা সংক্ষিপ্তভাবে বললেন, ‘বিচার দু সপ্তাহের জন্য মুলতুবী রাখা হয়েছে৷’

‘তার মানে ওরা—ওরা এখনও সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি?’

‘হ্যাঁ৷ এখনও অনেক সাক্ষ্য প্রমাণের প্রয়োজন আছে৷’

‘কিন্তু—কিন্তু ওদের কি মনে হচ্ছে?’

অনিচ্ছাসত্ত্বেও সামান্য হাসলেন মার্শাল৷

‘বড় অবুঝ তুমি—কে বলতে পারে ওরা কি ভাবছে? তাছাড়া ‘ওরা’ বলতে তুমি কার কথা বলছো? করোনারের, জুরিদের, পুলিশের, কাগজের সাংবাদিকদের নাকি লেদারকোম্ব উপসাগরে জেলেদের কথা?’

লিন্ডা আস্তে আস্তে বলল, ‘মনে হয় আমি—পুলিশের কথাই বলতে চাইছি৷’

মার্শাল নীরস কণ্ঠে বললেন, ‘পুলিশ যাই ভাবুক না কেন, সেটা এখুনি ওরা কাউকে বলছে না৷’

কথার শেষে তাঁর ঠোঁটের রেখা সূক্ষ্ম হলো, কঠিন হলো৷ তিনি হোটেলে প্রবেশ করলেন৷

রোজামণ্ড ডার্নলিও যখন একই পদাঙ্ক অনুসরণে পা বাড়িয়েছে, লিন্ডা ডাকলো, ‘রোজামণ্ড!’

রোজামণ্ড ঘুরে দাঁড়ালো৷ মেয়েটার অসুখী মুখমণ্ডলে নীরব কাকুতি ওর হৃদয় স্পর্শ করলো৷ লিন্ডার হাতে হাত রাখলো ও৷ তারপর হোটেলকে পেছনে রেখে সরু পথ ধরে ওরা এগিয়ে চললো, ‘দ্বীপের দূরপ্রান্তের দিকে৷

রোজমণ্ড শান্ত স্বরে বলল, এত বেশি ভেবো না, লিন্ডা৷ আমি জানি ব্যাপারটা কত নিষ্ঠুর, এবং তোমার কাছে কত বড় একটা মানসিক আঘাত—সবই জানি, কিন্তু সে নিয়ে শুধু শুধু চিন্তা করে কোন লাভ নেই৷ আর যে জিনিসটা সর্বক্ষণ তোমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে তা হলো ঘটনার বীভৎসতা—তার বেশি কিছু নয়৷ কারণ তুমি নিজেও খুব ভালোভাবে জানো, আর্লেনাকে তুমি একটুও পছন্দ করতে না৷’

লিন্ডার শরীরে আকস্মিক কম্পন রোজমণ্ড অনুভব করতে পারলো, সেই সঙ্গে শুনতে পেলো মেয়েটার উত্তর৷

‘না, ওকে আমার মোটেও ভালো লাগত না…’

রোজামণ্ড বলে চললো, ‘কারও জন্যে দুঃখ পাওয়া সম্পূর্ণ অন্য জিনিস—তাকে কখনও লুকিয়ে রাখা যায় না৷ কিন্তু মানসিক আঘাত এবং আতঙ্কের হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সে বিষয়ে এতটুকু চিন্তা না করা৷’

লিন্ডা তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠলো, ‘তুমি কিচ্ছু বুঝতে পারছো না৷’

‘মনে তো হয় পারছি, সোনা৷’

লিন্ডা মাথা ঝাঁকালো৷

‘না, পারছো না৷ তুমি একটুও বুঝতে পারছো না—আর ক্রিস্টিনও কখনও বোঝে না৷ তোমরা আমাকে এত ভালোবাসো, কিন্তু বুঝতে পারো না আমার মনের অবস্থাটা৷ তোমরা শুধু ভাবো, আমি অযথা একই জিনিস নিয়ে চিন্তা করে করে অসুস্থ হয়ে পড়ছি৷’

ও একটু থামলো৷ তারপর বললো, ‘কিন্তু আসলে মোটেই তা না৷ আমি যা জানি, তা যদি তুমি জানতে—’

রোজামণ্ড থমকে দাঁড়ালো৷ নিথর নিষ্পন্দ ওর শরীর এতটুকু কাঁপলো না—বরং কঠিন হলো৷ মিনিট কয়েক দাঁড়িয়ে রইলো ও, তারপর লিন্ডার হাত থেকে ছাড়িয়ে নিলো নিজের হাত৷

ও বললো, ‘কি জানো তুমি, লিন্ডা?”

মেয়েটা স্থির চোখে চেয়ে রইলো৷ তারপর মাথা ঝাঁকালো আপন মনেই বল, ‘কিচ্ছু না৷’

রোজামণ্ড আচমকা চেপে ধরলো ওর বাহু৷ চাপের তীব্রতায় ব্যথা পেলো লিন্ডা৷ ওর মুখমণ্ডলে ঈষৎ যন্ত্রণায় ছাপ ক্ষণিকের তরে দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেলো৷

রোজামণ্ড বললো, ‘সাবধানে থেকো, লিন্ডা৷ খুব সাবধানে থেকো৷’

ও বললো, ‘আমি খুব সাবধানে থাকি—স-ব সময়৷’

রোজমণ্ড জরুরি স্বরে বলল, ‘শোনো, লিন্ডা, একটু আগেই তোমাকে যে কথা বললাম, এখনও আমি সেই কথাই বলবো—প্রয়োজন হলে আরও একশোবার বলবো৷ সমস্ত ব্যাপারটা তোমার মন থেকে মুছে ফেলো৷ কখনও ও নিয়ে ভেবো না৷ ভুলে যাও—সব ভুলে যাও… চেষ্টা করলেই তুমি পারবে৷ আর্লেনা মারা গেছে, কোন কিছুর বিনিময়েই ওকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না… সমস্ত ভুলে গিয়ে ভাবো তোমার ভবিষ্যতের কথা৷ আর সবচেয়ে যেটা প্রয়োজন : মুখে একেবারে কুলুপ এঁটে থাকবে৷’

লিন্ডা যেন কুঁকড়ে গেলো৷ ও বললো, ‘তুমি—তুমি তাহলে সবই জানো?’

রোজামণ্ড সতেজ কণ্ঠে বললো, ‘আমি কিছুই জানি না৷ আমার মতে, ভবঘুরে কোন পাগল হঠাৎই এই দ্বীপে এসে আর্লেনাকে খুন করেছে৷ এটাই একমাত্র সম্ভাব্য সাবধান৷ আমার দৃঢ় বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত পুলিশকেও এ কথা মানতে হবে৷ কারণ সত্যিই হয়তো তাই ঘটে থাকবে৷ হয়তো কেন, প্রকৃতপক্ষে তাই ঘটেছে!’

লিন্ডা বলল, ‘যদি বাবাকে—’

রোজমণ্ড বাধা দিলো৷

‘ও কথা যাক৷’

লিন্ডা বললো, ‘একটা কথা আমাকে বলতেই হবে৷ আমার মাকে—’

‘বলো, কি হয়েছে তোমার মায়ের?’

‘মাকে—মাকে খুনের অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিলো, তাই না?’

‘হ্যাঁ—’

লিন্ডা বিলম্বিত স্বরে বললে, ‘আর তারপর, বাবা তাকে বিয়ে করে৷ এ সব দেখে শেুনে মনে হয় না যে বাবা খুন করাটাকে সত্যি সত্যি তেমন অন্যায় বলে মনে করে না। অন্তত সব ক্ষেত্রে তো নয়ই৷’

রোজমণ্ড তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠলো, ‘আর কখনও এ ধরনের কথা উচ্চারণ করবে না—এমন কি আমার কাছেও! তোমার বাবার বিরুদ্ধে পুলিশের হাতে কোন প্রমাণ নেই৷ তাঁর অ্যালিবাই রয়েছে—এমন অ্যালিবাই যা ওরা শত চেষ্টাতেও ভাঙতে পারবে না৷ তোমার বাবা সম্পূর্ণ নিরাপদ৷’

লিন্ডা ফিসফিস করে বললো, ‘তাহলে কি ওরা প্রথমে ভেবেছিলো যে বাবা—?’

রোজমণ্ড চিৎকার করে উঠলো, ‘ওরা কি ভেবেছিলো আমি জানি না৷ কিন্তু এখন ওরা জানে, তাঁর পক্ষে এ কাজ করা সম্ভম ছিলো না৷ বুঝতে পারছো আমার কথা? তাঁর পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব ছিলো না৷’

ওর কথায় কর্তৃত্বের সুর, ওর চোখের শাসনে লিন্ডার মুখমণ্ডলে নেমে এলো নীরব বশ্যতা৷ মেয়েটার বুক ঠেলে বেরিয়ে এলো এক সুদীর্ঘ স্পন্দিত নিঃশ্বাস৷

রোজমণ্ড বলল, ‘শিগগিরই এ জায়গা ছেড়ে তুমি চলে যেতে পারবে৷ তখন সব ভুলে যাবে—স-ব!’

আকস্মিক অপ্রত্যাশিত বিদ্রোহী সুরে বলে উঠলো লিন্ডা, ‘আমি কোনদিন ভুলবো না৷’

কথা শেষ করেই ও ঘুরে দাঁড়িয়ে ছুটতে শুরু করলো হোটেল অভিমুখে৷

ওর অপসৃয়মান শরীরের দিকে অপলকে চেয়ে রইলো রোজামণ্ড৷

‘একটা কথা আপনার কাছে আমি জানতে চাই, মাদাম—’

ক্রিস্টিন রেডফার্ন ঈষৎ আনমনা ভঙ্গীতে চোখ তুলে তাকালো পোয়ারোর দিকে৷ ও বললো, ‘বলুন?”

এরকুল পোয়ারো ওর অন্যমনস্কতাকে তেমন গ্রাহ্য করলেন না৷ তিনি লক্ষ্য করেছেন, কিভাবে ওর চোখজোড়া পানশালার বাইরে উঠোনে পায়চারির স্বামীকে অনুসরণ করে চলেছে, কিন্তু এই মুহূর্তে বিশুদ্ধ দাম্পত্য সমস্যায় বিন্দুমাত্রও কৌতূহল তাঁর নেই৷ তিনি চান প্রয়োজনীয় তথ্য৷

তিন বললেন, ‘হ্যাঁ, মাদাম, বলছি৷ একটা সামান্য কথা—সেদিন দৈবক্রমে বলে ফেলা আপনার একটা সামান্য কথা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে৷’

ক্রিস্টিন প্যাট্রিকের ওপর চোখ রেখেই বললো, ‘হ্যাঁ? কি বলেছিলাম আমি?’

‘পুলিশ-প্রধানের প্রশ্নের উত্তরে সেই কথাটা আপনি বলেছিলেন৷ আপনি বলেছেন, ‘কিভাবে খুনের দিন সকালে আপনি মিস লিন্ডা মার্শালের ঘরে গিয়েছিলেন, ঘরে তাঁকে পাননি, তারপর কিভাবে তিনি ঘরে ফিরে আসেন, এবং এই সময়ে পুলিশ-প্রধান আপনাকে প্রশ্ন করেছেন মিস মার্শাল ঘর ছেড়ে কোথায় গিয়েছিলেন৷’

ক্রিস্টিন একটু অধৈর্যভাবেই বললে, ‘আর আমি বলেছিলাম ও স্নান করতে গিয়েছিলো? তাই তো?’

হ্যাঁ—কিন্তু আপনি ঠিক এই কথাগুলো বলেননি, মাদাম৷ আপনি বলেননি ‘ও স্নান করতে গিয়েছিলো৷’ আপনার কথাটা ছিলো, ‘ও বললো, ও নাকি স্নান করতে গিয়েছিলো৷’

ক্রিস্টিন বললো, ‘কিন্তু সে তো একই কথা৷’

‘না, মাদাম, এক নয়! আপনার উত্তরের ধরন আপনার তরফে এক বিশেষ মনোভাবের ইঙ্গিত দিচ্ছে৷ লিন্ডা মার্শাল ঘরে এলেন—পরনে তাঁর স্নানের পোশাক, কিন্ত তা সত্ত্বেও—যে কোন কারণেই হোক, আপনার তখন মনে হয়নি তিনি স্নান করতে গিয়েছিলেন৷ আপনার কথাতেই এ সন্দেহে স্পষ্ট, ‘‘ও বলল, ও নাকি স্নান করতে গিয়েছিলো৷’’ সুতরাং তাঁর হাবভাবে কি এমন বিশেষত্ব ছিলো—সে কি তাঁর ব্যবহার, অথবা তাঁর পরনের কোন পোশাক, অথবা এমন কোন কথা যা তিনি বলেছিলেন—যার ফলে, তিনি স্নান করতে গিয়েছিলেন শুনে আপনি যথেষ্ট অবাক হন?’

ক্রিস্টিনের মনোযোগ প্যাট্রিককে পরিত্যাগ করে সম্পূর্ণ কেন্দ্রীভূত হলো পোয়ারোর ওপর৷ ওর মুখমণ্ডলে চাপা কৌতূহল৷ ও বললো, ‘আপনার বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়৷ এখন মনে হচ্ছে কথাটা মিথ্যে নয়… লিন্ডা যখন বললো, ও স্নান করতে গিয়েছিলো, তখন সামান্য হলেও আমি অবাক হয়েছিলাম৷’

‘কিন্তু কেন, মাদাম, কেন?’

‘হ্যাঁ, কেন? সেটাই তো এখন মনে করবার চেষ্টা করছি৷ ওহ-হ্যাঁ, এখন মনে পড়ছে, ওর হাতে একটা প্যাকেট ছিলো৷’

‘তাঁর হাতে একটা প্যাকেট ছিলো?’

‘হ্যাঁ৷’

‘তার ভেতরে কি ছিলো আপনি জানেন না?’

‘ও হ্যাঁ, জানি৷ সুতোটা হঠাৎ ছিঁড়ে গিয়েছিলো৷ গ্রামের লোকেরা যেরকম করে বাঁধে, প্যাকেটটা সেরকম আলগা করে বাঁধা ছিলো৷ ভেতরে ছিলো কতকগুলো মোমবাতি। সেগুলা ছড়িয়ে পড়েছিলো মেঝেতে৷ আমি ওকে মোমবাতিগুলো তুলে রাখতে সাহায্য করেছিলাম৷’

‘হুঁ—’ বললেন পোয়ারো, ‘মোমবাতি…’

ক্রিস্টিন অবাক চোখে কয়েক মুহূর্ত তাঁর দিকে চেয়ে রইলো৷ তারপর বললো, ‘আপনাকে দেখে বেশ উত্তেজিত মনে হচ্ছে, মঁসিয়ে পোয়ারো৷’

পোয়ারো প্রশ্ন করলেন, ‘তাঁর মোমবাতি কেনার কারণ কি মিস লিন্ডা আপনাকে বলেছিলেন?’

ক্রিস্টিনের মসৃণ কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো৷

‘না, যতদূর মনে পড়ছে বলেনি৷ তবে আমার মনে হয়, রাতে পড়াশোনো করবার জন্যেই ও মোমবাতিগুলো কিনেছিলো—হয়তো ঘরে আলোটা কমজোরী ছিলো৷’

‘বরং এর বিপরীতটাই সত্যিই, মাদাম৷ মিস মার্শালের বিছানার পাশে একটা চমৎকার বৈদ্যুতিক আলো আমার নজরে পড়েছে৷’

ক্রিস্টিন বললো, ‘কি জানি, তাহলে বলতে পারছি না৷’

পোয়ারো বললেন, ‘সুতো ছিঁড়ে মোমবাতিগুলো যখন পড়ে যায়, তখন তাঁর মুখের অবস্থা কি রকম ছিলো?’

ক্রিস্টিন ধীরে ধীরে বললে, ‘ওকে কেমন—বিচলিত—হতবুদ্ধি বলে মনে হয়েছিলো?’

পোয়ারো সমর্থনে মাথা দোলালেন৷ তারপর প্রশ্ন করলেন, ‘তাঁর ঘরে কোন ক্যালেন্ডার আপনার নজরে পড়েছে?’

ক্যালেন্ডার? কিরকম ক্যালেন্ডার?’

পোয়ারো বললেন, ‘সম্ভবত একটা সবুজ ক্যালেন্ডার—যার পৃষ্ঠাগুলো ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে৷’

স্মৃতি রোমন্থনে সুতীক্ষ্ণ হয়ে এলো ক্রিস্টিনের আয়ত চোখ৷

‘একটা সবুজ ক্যালেন্ডার—সবুজ না বলে বরং গাঢ় সবুজ বলতে পারেন৷ হ্যাঁ, ওরকম একটা ক্যালেন্ডার আমি দেখেছি—তবে কোথায় ঠিক মনে করতে পারছি না৷ হতে পারে লিন্ডার ঘরে, কিন্তু জোর দিয়ে বলতে পারছি না৷’

কিন্তু ওরকম একটা জিনিস আপনি দেখেছেন, এটা সত্যি?’

‘হ্যাঁ৷’

সম্মতিসূচকভাবে আবার মাথা নাড়লেন পোয়ারো৷

ক্রিস্টিন একটু তীক্ষ্ণ স্বরেই বললো, ‘কিন্তু আপনি কি বলতে চাইছেন, মঁসিয়ে পোয়ারো? এ সবের অর্থ কি?’

উত্তরে পোয়ারো প্রকাশ করলেন বিবর্ণ-বাদামী চামড়ায় বাঁধানো ছোট বইটা। বললেন, ‘এটা আগে কখনও দেখেছেন?’

হ্যাঁ—মনে হয়—মানে, সেদিন গ্রামের লাইব্রেরীতে দাঁড়িয়ে লিন্ডা এই বইটা দেখছিলো, কিন্তু আমাকে আসতে দেখেই ও বইটা বন্ধ করে তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢুকিয়ে রাখে৷ ব্যাপারটা আমার কাছে একটু অবাক লেগেছিলো—কৌতূহলও যে হয়নি তা নয়৷’

ডাকিনীবিদ্যা, মায়াবিদ্যা ও লক্ষণহীন বিষের মিশ্রণপদ্ধতির বিস্তারিত ইতিহাস৷

ক্রিস্টিন বললো, ‘আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না, এ সবের মানে কি? পোয়ারো গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘এর অর্থ অনেক কিছু হতে পারে, মাদাম৷’

ওর সপ্রশ্ন দৃষ্টির কোন উত্তর দেবার পরিবর্তে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘আরও একটা প্রশ্ন, মাদাম—খুনের দিন সকালে টেনিস খেলতে যাবার আগে আপনি কি স্নান করেছিলেন?’

ক্রিস্টিন অপলক স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো৷

‘স্নান? উঁহু৷ এমনিতেই আমার হাতে সময় কম ছিলো, আর তাছাড়া, তখন স্নান করবার ইচ্ছেও আমার ছিলো না—টেনিস খেলার আগে তো নয়ই৷ পরে হয়তো করলেও করতে পারতাম৷’

‘হোটেলে ফিরে এসে স্নানঘরে একবারও গিয়েছিলেন?’

‘হ্যাঁ, শুধু হাত-মুখ ধোবার জন্যে ব্যস৷’

‘স্নানের জন্য আপনি তাহলে কল খুলে রাখেননি?’

‘না৷ আমার স্পষ্ট মনে আছে খুলিনি৷’

পোয়ারো সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন৷ বললেন, ‘এমনিই জিগ্যেস করলাম…’

মিসেস গার্ডেনার যেখানে বসে একটা ‘টুকরো ছবির-ধাঁধার সঙ্গে মানসিক যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন, সেই টেবিলের পাশে দাঁড়ালেন এরকুল পোয়ারো। ভদ্রমহিলা চোখ তুলেই চমকে উঠলেন৷

‘আরে, মঁসিয়ে পোয়ারো, চুপি চুপি কখন এসে দাঁড়ালেন৷ আমি তো টেরই পাইনি৷ এই মাত্র বিচার সেরে ফিরলেন বুঝি? জানেন, বিশেষ করে এ বিচারটার কথা শুনলেই আমাকে নিজেকে কিরকম দুর্বল বলে মনে হয়, কি করবো বুঝে উঠতে পারি না৷ সেইজন্যেই এই সমুদ্রতীরে আজ আর বসতে পারবো না৷ মিঃ গার্ডেনার জানেন, যখন আমার মন অস্থির থাকে, তখন তাকে শান্ত করতে এই ধাঁধার জুড়ি নেই! দেখুন তো, এই সাদা টুকরোটা কোথায় লাগবে? নির্ঘাত লোমের কম্বলটার অংশ হবে, কিন্তু দেখে তো মনে হচ্ছে না…’

অমায়িক ভঙ্গীতে পোয়ারোর হাত ভদ্রমহিলার হাত থেকে টুকরোটা তুলে নিয়ে নিলো৷ পোয়ারো বললেন, এটা এইখানে বসবে, মাদাম৷ এটা বেড়ালটার একটা অংশ৷’

‘হতে পারে না! ওটা তো কালো বেড়াল!’

‘কালো বেড়াল, ঠিক কথা, কিন্তু লক্ষ্য করুন, ঘটনাচক্রে বেড়ালটার লেজের প্রান্তভাগ সাদা৷’

‘আরে, তাই তো! সত্যি আপনার বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়! কিন্তু তবুও আমার ধারণা, যারা এই ধাঁধাগুলো তৈরি করে, তারা ভীষণ পাজী লোক৷ আমাদের ঠকানোর জন্যে কত ফন্দীই না আঁটে!’

আরও একটা টুকরো যথাস্থানে বসিয়ে তিনি বলে চললেন, ‘জানেন মঁসিয়ে পোয়ারো, গত দু-একদিন ধরে আমি আপনাকে লক্ষ্য করছি৷ কখন আপনি গোয়েন্দাগিরি করেন, সেইটাই আমি স্বচক্ষে দেখতে চেয়েছি—অবশ্য এভাবে বললে, কথাটা কেমন নিষ্ঠুর শোনায়, যেন পুরো ব্যাপারটাই একটা খেলা—অথচ বেচারা মেয়েটা খুন হলো৷ ওঃ, প্রত্যেকবার এ কথা ভাবলেই আমি শিউরে উঠি৷ আজ সকালে মিঃ গার্ডেনারকে বলছিলাম, যে করে হোক এ জায়গা ছেড়ে আমাকে যেতেই হবে, আর এখন বিচার শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি বললেন, তাঁর ধারণা আগামীকালই আমরা রওনা হতে পারবো, এবং এটা নিঃসন্দেহে ভগবানের আশীর্বাদ৷ কিন্তু গোয়েন্দাগিরি প্রসঙ্গে বলি, এটা আপনার কায়দা-কানুনগুলো আমার জানতে ভীষণ ইচ্ছে করে—যদি একটু বুঝিয়ে বলেন, তাহলে সত্যি নিজেকে ধন্য মনে করবো৷’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ব্যাপারটা অনেকটা আপনার এই ধাঁধার মতো, মাদাম৷ সমস্ত টুকরোগুলো প্রথমে এক জায়গায় জড়ো করতে হয়৷ জিনিসটা ঠিক রঙিন পাথরের কারুকার্যের মতো, বিভিন্ন রঙ, বিভিন্ন নকশা—এবং প্রতিটি অদ্ভুত আকারে ছোট্ট টুকরোকে তাদের মানানসই জায়গায় নির্ভুলভাবে বসিয়ে দিতে হয়৷”

‘বাঃ, বেশ মজার তো! আর আপনি বলছেনও একেবারে জলের মতো সহজ করে!’

পোয়ারো বলে চললেন, ‘এবং কখনও কখনও অবস্থা হয়ে পড়ে আপনার ধাঁধার ওই টুকরোটার মতো৷ নিয়মমাফিক টুকরোগুলোকে হয়তো ‘একটার পর একটা সাজানো হচ্ছে—রঙ অনুয়ায়ী তাদের ভাগ করে নেওয়া হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন অংশ—আর ঠিক তখন বিশেষ রঙের একটা টুকরো যেটা মানিয়ে যাওয়া উচিত—ধরুন, লোমের কম্বলের সঙ্গে মানিয়ে গেলো কালো বেড়ালের লেজে৷’

‘সত্যি মুগ্ধ হয়ে যাবার মতো! আপনার হাতে কি এইরকম অনেক টুকরো রয়েছে, মঁসিয়ে পোয়ারো?’

হ্যাঁ, মাদাম৷ এই হোটেলের প্রায় প্রত্যেকেই একটি করে টুকরো উপহার দিয়েছেন আমার ধাঁধার জন্য৷ তার মধ্যে আপনিও রয়েছেন৷’

‘আমি?’ মিসেস গাডের্নারে কণ্ঠস্বর উত্তেজিত, তীক্ষ্ণ!

‘হ্যাঁ, মাদাম, আপনার একটা মন্তব্য আমাকে ভীষণভাবে সাহায্য করেছে, বলা যেতে পারে রহস্যের একটা দিক আলোকিত করে দিয়েছে৷’

‘শুনে আমার দারুণ আনন্দ হচ্ছে! আর একটু খুলে বলুন না, মঁসিয়ে৷ পোযারো?’

‘মাপ করবেন, মাদাম, সমস্ত প্রশ্নের উত্তর আমি তুলে রেখেছি শেষ দৃশ্যের জন্য৷’

মিসেস গার্ডেনার আপনমনেই বললেন, ‘সব ভালো যার শেষ ভালো…’

ক্যাপ্টেন মার্শালের ঘরের দরজায় আলতো করে টোকা মারলেন এরকুল পোয়ারো৷ ভেতরে থেকে ভেসে আসছে টাইপরাইটারের শব্দ৷

সংক্ষিপ্ত ‘ভেতরে আসুন’ শোনামাত্রই ঘরে ঢুকলেন পোয়ারো৷

ক্যাপ্টেন মার্শাল তাঁর দিকে পেছন ফিরে বসে আছেন৷ দু-জানলার মধ্যে টেবিলে বসে টাইপ করছেন তিনি৷ ঘুরে তাকালেন না মার্শাল৷ মুখোমুখি দেওয়ালে টাঙানো আয়নায় প্রতিবিম্বিত পোয়ারোর চোখে চোখ রেখে বিরক্তির সুরে প্রশ্ন করলেন, ‘বলুন, মঁসিয়ে পোয়ারো, কি চান?’

পোয়ারো তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, ‘অনধিকার প্রবেশের জন্য একশোবার ক্ষমা চাইছি৷ আপনি ব্যস্ত আছেন?’

মার্শাল সংক্ষিপ্তভাবে বললেন, ‘তা একটু আছি৷’

পোয়ারো বললেন, ‘একটা ছোট্ট প্রশ্ন আপনাকে আমি করতে চাই৷’

মার্শাল বললেন,’ওঃ ভগবান, প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়ে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি৷ পুলিশের প্রশ্নের উত্তর আমার দেওয়া হয়ে গেছে৷ সুতরাং, আর কারও প্রশ্নের উত্তর দেবার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না৷’

পোয়ারো বললেন, ‘আমার প্রশ্নটা অত্যন্ত সহজ৷ শুধু এই আপনার স্ত্রীর মৃত্যুর দিন সকালে টাইপ সেরে টেনিস খেলতে যাবার আগে আপনি কি স্নান করেছিলেন?’

‘স্নান? স্নান করবো কেন? তাঁর ঘণ্টাখানেক আগেই তো আমার স্নান হয়ে গেছে৷’

এরকূল পোয়ারো বললেন, ‘ধন্যবাদ, আমার আর কোন প্রশ্ন নেই৷’

‘কিন্তু শুনুন৷ ইয়ে—’ দ্বিধাগ্রস্তভাবে থামলেন তিনি৷

পোয়ারো নিষ্ক্রান্ত হলেন৷ যাবার আগে নিঃশব্দে ভেজিয়ে দিলেন দরজাটা৷

কেনেথ মার্শাল বললেন, ‘লোকটা নির্ঘাত পাগল!’

পানশালার ঠিক বাইরেই মিঃ গার্ডেনারের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো পোয়ারোর৷

মিঃ গার্ডেনার দুটো ককটেল হাতে স্পস্টতই ‘টুকরো-ছবির-ধাঁধা’ নিয়ে আরামে বসে থাকা মিসেসের কাছে যাচ্ছিলেন, পোয়ারোকে দেখে অমায়িকভাবে হাসলেন৷

‘আসবেন নাকি, মঁসিয়ে পোয়ারো?’

পোয়ারো মাথা নাড়লেন, বললেন, ‘করোনারের বিচার সম্পর্কে আপনার কি মতামত, মিঃ গার্ডনার?’

মিঃ গার্ডেনার গলার স্বর নিচু করলেন, বললেন, ‘দেখেশুনে তো মনে হলো, ওরা ফলাফল সম্পর্কে অনিশ্চিত৷ তবে আমার যদ্দুর ধারণা, আপনাদের পুলিশ তাদের তুরুপের তাস আস্তিনে লুকিয়ে রেখেছে৷’

‘অসম্ভব নয়৷’ এরকুল পোয়ারো বললেন৷

মিঃ গার্ডেনারের কণ্ঠস্বর আরও নিচু হলো৷

‘মিসেস গার্ডেনারকে এখান থেকে নিয়ে যেতে পারলে আমি বাঁচি৷ খুব অল্পেতেই ও বিচলিত হয়ে পড়ে, আর এই ব্যাপারটা ওকে ভীষণ উত্তেজিত করে তুলেছে৷ ওর স্নায়ু সহ্যক্ষমতা একেবারে শেষ সীমায় এসে পৌঁছেছে৷’

এরকূল পোয়ারো বললেন, ‘যদি অনুমতি দেন, তাহলে একটা প্রশ্ন করি মিঃ গার্ডেনার৷’

নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই৷ আপনাকে কোনভাবে সাহায্য করতে পারলে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হবো, মঁসিয়ে পোয়ারো৷’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘আপনি অভিজ্ঞ লোক, আপনার বিচার বুদ্ধিতে আমার বিশ্বাস আছে৷ স্পষ্ট করে বলুন তো মিসেস মার্শাল সম্পর্কে আপনার ধারণা কি রকম ছিলো?’

বিস্ময়ে মিঃ গার্ডেনার ভ্রুযুগল ঊর্ধ্বমুখী হলো৷ চারপাশে সতর্ক দৃষ্টিতে চোখ বুলিয়ে তিনি গলার স্বর নামিয়ে নিলেন নিচু পর্দায়৷

‘কি জানেন, মঁসিয়ে পোয়ারো, বিশেষ করে মেয়েমহলে ভেসে বেড়ানো কতকগুলো কথা আমার কানে এসেছে সত্যি, পোয়ারো মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালেন, ‘কিন্তু যদি আমাকে প্রশ্ন করেন, তাহলে, স্পষ্টস্পষ্টি বলবো, ওই মেয়েটা ছিলো এক নম্বরের বোকা৷’

এরকুল পোয়ারোর চিন্তামগ্ন কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন, ‘আপনার কথাটা ভেবে দেখার মতো…’

রোজমণ্ড ডার্নলি বললো, ‘এবার তাহলে আমার পালা, কি বলুন?’

‘মানে?’

ও হাসলো৷

‘আগের দিন পুলিশ-প্রধান তাঁর তদন্ত নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন৷ আপনি ছিলেন নীরব দর্শক৷ আর আজ, আমার ধারণা, আপনি আপনার নিজস্ব বেসরকারী তদন্ত শুরু করেছেন৷ আপনাকে আমি লক্ষ্য করেছি৷ প্রথমে মিসেস রেডফার্ন, তারপর লাউঞ্জের জানলা দিয়ে এক পলক দেখলাম, মিসেস গার্ডনার যেখানে তাঁর ওই বিতিকিচ্ছিরি ‘টুকরো-ছবির-ধাঁধা’ নিয়ে বসে আছেন, সেখানে আপনি দাঁড়িয়ে৷ আর এখন, আমার পালা৷’

এরকুল পোয়ারো ওর পাশে বসলেন৷ জায়গাটা সানি লেজ৷ নিচের চঞ্চল সমুদ্রে গাঢ় সবুজ দ্যুতি যেন ফেটে পড়ছে৷ সেই সবুজ ক্রমে মিলিয়ে গেছে সমুদ্রে চোখ ধাঁধানো বিবর্ণ প্রশান্ত নীলে, তারপর দিগন্তে৷

পোয়ারো বললেন, ‘আপনি অত্যন্ত বুদ্ধিমতী, মোদমোয়াজেল৷ এখানে আসার পর থেকে এই কথাটাই আমার সব সময় মনে হয়েছে৷ বর্তমান দুর্ঘটনা নিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে আমার ভালোই লাগবে৷’

রোজামণ্ড ডার্নলি নরম সুরে বললো, পুরো ব্যাপারটা সম্পর্কে আপনি আমার মতামত জানতে চান?’

‘জানতে পারলে অত্যন্ত খুশি হবো৷’

রোজমণ্ড বললে, ‘আমার তো মনে হয় ব্যাপারটা খুবই সহজ-সরল৷ মেয়েটার অতীত জীবনেই এ ঘটনার মূল সূত্র লুকিয়ে আছে৷’

‘অতীতে? বতর্মানে নয়?’

‘উহুঁ, অতীত বলতে খুব বেশি অতীতের কথা নাও হতে পারে৷ ব্যাপারটা আমি এভাবে দেখছি : পুরুষের কাছে আর্লেনা মার্শালের আকর্ষণ ছিলো প্রচণ্ড৷ আর, আমার মনে হয়, হয়তো খুব তাড়াতাড়িই ও তাদের সম্পর্কে ক্লান্তি বোধ করতো৷ ওর—কি বলবো?—অনুগামীদের মধ্যে এমন একজন ছিলো, যে এই ব্যবহারে তেমন খুশি হয়নি৷ আমাকে ভুল বুঝবেন না, মঁসিয়ে পোয়ারে, আমি এমন কারো কথা বলছি না যাকে চট করে সবার নজরে পড়বে৷ সম্ভবত, সাধারণ ছোটখাটো কোন মানুষ, দাম্ভিক, অনুভূতিশীল, এমন ধরনের মানুষ, যে ব্যর্থতার চিন্তায় সর্বক্ষণ মগ্ন৷ আমার ধারণা, সে আর্লেনার পিছু নিয়ে এখানে আসে, উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষায় থাকে, এবং অবশেষে ওকে খুন করে৷’

‘আপনি বলতে চান সে বাইরের লোক, সে সেতু পার হয়ে দ্বীপে এসেছে?’

‘হ্যাঁ৷ সম্ভবত উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষায় সে ওই গুহাটায় লুকিয়ে ছিলো৷’

পোয়ারো অসম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন৷ বললেন, ‘আপনার কি মনে হয়, মিসেস মার্শাল এরকম কোন লোকের সঙ্গে দেখা করতে পিক্সি কোভে যেতেন? উহুঁ, কক্ষনো না৷ তিনি সে প্রস্তাব হেসে উড়িয়ে দিতেন৷’

রোজামণ্ড বলল, আর্লেনা হয়তো জানতো না ও সেই লোকটার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে৷’ লোকটা হয়তো অন্য কারো নামে ওকে ডেকে পাঠিয়ে থাকবে৷’

পোয়ারো অস্ফুট কণ্ঠে মন্তব্য করলেন, ‘সেটা সম্ভব৷’

তারপর তিনি বললেন, ‘কিন্তু একটা কথা আপনি ভুলে যাচ্ছেন, মাদমোয়াজেল৷ খুনের পরিকল্পনা নিয়ে কোন মানুষ প্রকাশ্য দিবালোকে সেতু পার হয়ে হোটেল অতিক্রম করার ঝুঁকি নেবে না৷ কেউ হয়তো তাকে দেখে ফেলতে পারে৷’

‘তা পারে—কিন্তু তার কোন নিশ্চয়তা নেই৷ আমার তো মনে হয় সকলের চোখ এড়িয়ে আসাটা মোটেও অসম্ভব নয়৷’

‘হয়তো সম্ভব, মানলাম৷ কিন্তু কথা হলো, ওই সম্ভাবনার ওপর কেউ ভরসা করতে পারে না৷’

রোজমণ্ড বললো, ‘কিন্তু একটা জিনিস কি আপনি ভুলে যাচ্ছেন না? আবহাওয়ার কথা৷’

‘আবহাওয়া?’

‘হ্যাঁ খুনের দিনটা ছিলো চমৎকার, কিন্তু তার আগের দিন, মনে করে দেখুন, বৃষ্টি এবং ঘন কুয়াশায় ঢাকা ছিলো এই দ্বীপে৷ তখন সকলের চোখ এড়িয়ে যে কেউ এখানে আসতে পারে৷ শুধু তাকে সমুদ্রতীরে গিয়ে রাতটা গুহায় কাটাতে হবে৷ ওই কুয়াশার ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, মঁসিয়ে পোয়ারো৷’

পোয়ারো চিন্তিতভাবে মিনিটকয়েক তাকিয়ে রইলেন ওর দিকে৷ তারপর বললেন, ‘এইমাত্র আপনি যা বললেন তার তাৎপর্য কম নয়, মাদমোয়াজেল৷’

রোজামণ্ডের মুখমণ্ডলে রক্তের উচ্ছ্বাস৷ ও বললো, ‘আমার মত এই, সম্ভব অসম্ভব বুঝি না৷ এবার আপনারটা বলুন৷’

‘হুঁ—’ বললেন, এরকুল পোয়ারো৷ স্থির চোখে রইলেন নিচে সমুদ্রের দিকে৷

‘জানেন মাদমোয়াজেল, আমি অত্যন্ত সরল মানুষ৷ সব সময় এই কথাটাই আমি বিশ্বাস করতে চেষ্টা করি যে সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যক্তিই কোন অপরাধের নেপথ্য নায়ক৷ একবারে শুরুতে আমার মনে হয়েছিলো, একজনের প্রতি এই ইঙ্গিত অত্যন্ত স্পষ্ট৷’

রোজামন্ডের স্বর কঠিন হলো৷ ও বললো, ‘বলুন—থামলেন কেন?’

এরকুল পোয়ারো বলে চললেন, ‘অথচ দেখুন, সে চিন্তার পথে আপনাদের ভাষায় একটা ‘‘ছোট প্রতিবন্ধক’’ রয়ে গেছে৷ আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, সেই একজনের পক্ষে এ খুন করা সম্পূর্ণ অসম্ভব ছিলো৷’

রোজামণ্ডের দ্রুত নিঃশ্বাসের শব্দ তাঁর কানে এলো৷ও রুদ্ধশ্বাসে বললো, ‘তাই?’

এরকুল পোয়ারো কাঁধ ঝাঁকালেন৷

‘তাহলে এখন আমরা কি করবো? সেটাই তো আমার সমস্যা৷’ তিনি এক মুহূর্ত থামলেন, তারপর বললেন, ‘আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?’

‘নিশ্চয়ই৷’

ও পোয়ারোর দিকে তাকিয়ে৷ সতর্ক এবং তৎপর৷ কিন্তু যে প্রশ্ন এলো তা একেবারে অপ্রত্যাশিত৷

‘সেদিন সকালে আপনি যখন টেনিস খেলার পোশাক পরতে আসেন, তখন কি স্নান করেছিলেন?’

রোজামণ্ড হতবুদ্ধি দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে রইলো৷

‘স্নান? কি বলতে চান আপনি?’

‘ঠিক ওই কথাই বলতে চাই৷ স্নান! চীনামাটির মসৃণ সুদৃশ্য আধার, কল খুলে ভর্তি করা হয় টলটলে জল, তারপর শরীর ডুবিয়ে দেওয়া হয় সেই জলে, শেষে বেড়িয়ে এসে হুশ—হুশ—হুশ, অস্বচ্ছ জল চলে যায় পাইপ বেয়ে নিচে!’

‘মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে?’

‘উহুঁ—বরং আমি সম্পূর্ণ সুস্থ৷’

‘কি জানি, অতসব বুঝি না, তবে আমি স্নান করিনি৷’

‘হুঁ!’ বললেন, পোয়ারো, ‘তাহলে কেউ স্নান করেনি৷ বড়ই আশ্চর্য ব্যাপার৷’

‘কিন্তু কেউ হঠাৎ স্নান করতে যাবে কেন?’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘সত্যিই তো, কেন?’

রোজামণ্ড একটু রাগতভাবেই বললো, ‘এটা সম্ভবত আপনার শার্লক হোমস-মার্কা প্যাঁচ!’

এরকুল পোয়ারো হাসলেন৷

তারপর শান্তভাবে বাতাসের আঘ্রাণ নিলেন৷

যদি সামান্য ধৃষ্টতা প্রকাশের অপরাধ ক্ষমা করেন, মাদমোয়াজেল—’

‘আপনার পক্ষে কখনই ধৃষ্টতা দেখানো সম্ভব নয়, মঁসিয়ে পোয়ারো, আমি জানি৷’

‘সে আপনার মহানুভবতা৷ তাহলে দুঃসাহসের সঙ্গে আমি বলবো, যে সুগন্ধী আপনি ব্যবহার করেন তা এক কথায় অপূর্ব—এর একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে—আছে চমৎকার ছলনাময়ী আকর্ষণ৷’ শূন্যে হাত নাড়লেন পোয়ারো, তারপর প্রয়োজনীয় সুরে যোগ করলেন, ‘গ্যাব্রিয়েল নম্বর ৮, তাই না?’

‘আপনার বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়৷ হ্যাঁ, সব সময় এটাই আমি ব্যবহার করি৷’

‘মৃতা মিসেস মার্শালও এই সুগন্ধী ব্যবহার করতেন৷ অত্যন্ত আধুনিক জিনিস, কি বলেন? এবং দামীও বটে?’

সামান্য হেসে কাঁধ ঝাঁকালো রোজামণ্ড৷

পোয়ারো বললেন, ‘খুনের দিন সকালে আপনি এখানে বসে ছিলেন, মাদমোয়াজেল, যেখানে আমরা এখন বসে আছি৷ মিস ব্রুস্টার এবং মিঃ রেডফার্ন সমুদ্রপথে যাওয়ার সময়ে আপনাকে, অথবা অন্তত আপনার রঙিন ছাতাটাকে এখানে দেখেছিলেন৷ হলফ করে বলতে পারেন, মাদমোয়াজেল, যে সারা সকালে আপনি একবারের জন্যেও পিক্সি কোভে যাননি, ঢোকেননি সেই গুহাতে—বিখ্যাত পিক্সি গুহাতে?’

রোজমণ্ড ফিরে তাকালো, পোয়ারোর দিকে৷ চেয়ে রইলো স্থির চোখে৷

শান্ত মসৃণ কণ্ঠে ও বললো, ‘জানতে চাইছেন, আর্লেনা মার্শালকে আমি খুন করেছি কি না?’

‘না, আমি শুধু জানতে চাইছি, পিক্সি গুহায় আপনি গিয়েছিলেন কি না?’

ওটা কোথায় তাই-ই আমি জানি না৷ তাছাড়া ওখানে যাবো কেন? কি কারণে?’

গ্যাব্রিয়েল নম্বর ৮ ব্যবহার করে এমন একজন খুনের দিন ওই গুহায় গিয়েছিলো, মাদমোয়াজেল৷’

রোজামন্ড কণ্ঠস্বর তীক্ষ্ণ হলো৷

‘একটু আগে আপনিই বললেন, মঁসিয়ে পোয়ারো, আর্লেনা মার্শাল গ্যাব্রিয়েল নম্বর ৮ ব্যবহার করতো৷ সেদিন ও পিক্সি কোভের বেলাভূমিতে গিয়েছিলো৷ গুহাতেও সম্ভবত ও-ই গিয়ে থাকবে৷’

‘কিন্ত গুহাতে তিনি কেন যাবেন? ওটা অন্ধকার, অপ্রশস্ত এবং অস্বস্তিকর জায়গা৷’

রোজামণ্ড অধৈর্য স্বরে বলল, ‘কারণ আমাকে জিগ্যেস করবেন না৷ যেহেতু ও সেখানে গিয়েছিলো, গুহায় যাওয়াটা ওর পক্ষেই বেশি স্বাভাবিক৷ আপনাকে তো আগেই বলেছি, সারা সকালে এ জায়গা ছেড়ে আমি কোথায়ও যাইনি৷’

‘শুধু একবার ছাড়া, যখন আপনি হোটেলে ক্যাপ্টেন মার্শালের ঘরে গিয়েছিলেন৷’ পোয়ারো ওকে মনে করিয়ে দিলেন৷

‘ও, হ্যাঁ৷ সে কথা মনে ছিলো না৷’

পোয়ারো বললেন, ‘আপনি ভেবেছিলেন ক্যাপ্টেন মার্শাল আপনাকে দেখতে পাননি, মাদমোয়াজেল, কিন্তু আপনার ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত৷’

অবিশ্বাসের সুরে বলে উঠলো রোজমণ্ড, ‘কেনেথ আমাকে দেখেছিলো? ও—ও কি তাই বলেছে?’

পোয়ারো সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন৷

‘টেবিলের মুখোমুখি ঝোলানো আয়নায় তিনি আপনাকে দেখেছিলেন মাদমোয়াজেল৷’

রোজামণ্ডের শ্বাসপ্রশ্বাস স্তব্ধ হলো মুহূর্তের জন্যে৷ ও বললো, ‘ও—বুঝেছি৷’

পোয়ারোর চোখ এখন আর সমুদ্রের দিকে নেই৷ তাঁর দৃষ্টি নিবন্ধ রোজমণ্ড ডার্নলির কোলে, ওর ভাঁজ করা হাতের দিকে৷ দীর্ঘ আঙুলের সমন্বয়ে সুন্দর গড়নের হাত৷

চকিত দৃষ্টিতে পোয়ারোর দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখকে অনুসরণ করলে রোজমণ্ড, তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললো, ‘আমার হাতের দিকে এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? আপনার কি ধারণা—আপনার কি ধারণা—?’

পোয়ারো বললেন, ‘আমার কি ধারণা, মাদমোয়াজেল ?’

রোজামণ্ড ডার্নলি বললো, ‘না, কিছু না৷’

প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে গাল কোভে যাবার রাস্তার শীর্ষদেশে এসে উপস্তিত হলেন এরকুল পোয়ারো৷ নির্জন সৈকতে কেউ একজন বসে রয়েছে৷ লাল জামা ও গাাঢ় নীল সংক্ষিপ্ত প্যান্ট পরিহিত একটি কৃশকায় শরীর৷

আঁটোসাঁটো ফ্যাশানদুরস্ত জুতো পায়ে সন্তর্পিত পদক্ষেপে বেলাভূমিতে নেমে এলেন পোয়ারো৷

লিন্ডা মার্শাল চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো৷ পোয়ারোর মনে হলো, যেন সামান্য কুঁকড়ে গেলো৷

নিঃশব্দ চরণে ওর পাশে রুক্ষ নুড়ির ওপর এসে বসলেন তিনি৷ ওর ধুসর সবুজ চোখ ফাঁদে পড়া পশুর মতো সতর্ক সন্দিহান দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে৷ তীব্র বেদনার সঙ্গে পোয়ারো অনুভব করলেন, কত অনভিজ্ঞ এবং আত্মরক্ষায় কত অক্ষম এই দিশেহারা মেয়েটি৷

ও বললো, ‘কি ব্যাপার? কি চান?’

এরকুল পোয়ারো মিনিটকয়েক নীরব রইলেন৷ তারপর বললেন, সেদিন পুলিশ-প্রধানকে আপনি বলেছেন, আপনার সৎমাকে আপনি ভালোবাসতেন, এবং তিনিও আপনার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন৷’

‘তাতে কি হয়েছে?’

‘কথাটা সত্যি নয়—সত্যি কি মাদমোয়াজেল?’

‘হ্যাঁ, সত্যি৷’

পোয়ারো বললেন, ‘আপনার প্রতি ব্যবহারে তিনি হয়তো নিষ্ঠুর ছিলেন না—সে কথা আমি মানছি৷ কিন্তু আপনি তাঁকে পছন্দ করতেন না—উহুঁ—বরং আপনি তাঁকে অত্যন্ত অপচ্ছন্দ করতেন৷ এটা দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট৷’

লিন্ডা বলল, ‘হয়তো আপনার কথাই সত্যি৷ কিন্তু মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে ও কথা বলা ঠিক নয়৷ ভালো দেখায় না৷’

পোয়ারো দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, বললেন, ‘এসব আপনাকে ইস্কুল থেকে শেখানো হয়েছে?’

‘একরকম তাই৷’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘কোন খুনের ঘটনায় লৌকিক ভদ্রতার চেয়ে সত্যভাষণের গুরুত্ব অনেক বেশি৷’

লিন্ডা বলল, ‘ও কথা আপনার মুখেই মানায়—’

‘হ্যাঁ, আমার মুখেই মানায় এবং সে কথাই আমি বলছি৷ কারণ, আর্লেনা মার্শালের হত্যাকারীকে খুঁজে বের করাই আমার প্রথম ও প্রধান কাজ৷’

লিন্ডা অস্ফুট স্বগত কণ্ঠে বললো, ‘আমি স-ব ভুলে যেতে চাই৷ উঃ, কি ভয়ঙ্কর৷’

পোয়ারো শান্ত স্বরে বললেন, ‘কিন্তু ভুলতে আপনি পারছেন না—পারছেন কি?’

লিন্ডা বললো, ‘আমার মনে হয়, কোন নৃশংস উন্মাদ ওকে খুন করেছে৷’

এরকুল পোয়ারো অস্ফুটে উচ্চারণ করলেন, ‘না, আমার তা মনে হয় না৷’

লিন্ডার শ্বাসপ্রশ্বাস যেন স্তব্ধ হলো পলকের জন্য৷ ও বললো, ‘আপনি এমনভাবে বলছেন যেন—যেন আপনি সব জানেন ?’

পোয়ারো বললেন, হয়তো জানি৷’ একটু থেমে তিনি বলে চললেন৷ ‘বিশ্বাস করবে লিন্ডা, যদি বলি, তোমার চূড়ান্ত অশান্তিতে আমি তোমাকে যথাসাধ্য সাহায্য করবো?’

লিন্ডা লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো৷ ‘আমার কোন অশান্তি নেই: সুতরাং আপনার সাহায্যেরও প্রয়োজন নেই৷’… জানি না, আপনি কি বলতে চাইছেন৷’

পোয়ারো বললেন, ওর চোখে চোখ রেখে, ‘আমি মোমবাতির কথা বলছি…’

আতঙ্কের শিখা দপ কর ঝলসে উঠলো লিন্ডার চোখে৷ ও চিৎকার করে বলল, ‘আমি আপনার কথা শুনবো না৷ কিছুতেই শুনবো না৷’

মৃগশিশুর তৎপরতায় সৈকত পার হয়ে ছুটে চললো ও৷ আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে নিমেষে মিলিয়ে গেলো ওর চঞ্চল শরীর৷

পোয়ারো ধীরে মাথা নাড়লো৷ তাঁর গম্ভীর মুখে দুশ্চিন্তার বিষণ্ণ ছায়া৷