ছয়
শুক্রবার ভোর ছটায় ঘুম ভাঙল জিপোর৷ গত রাতে সে ভালোমতো ঘুমোতে পারেনি৷ সম্ভবত অসহ্য মানসিক উৎকণ্ঠাই এই অনিদ্রার কারণ৷ বিছানা ছেড়ে খোলা জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল সে৷ দূরে ধূসর পাহাড়ের অন্তরাল থেকে ক্রমশ আত্মপ্রকাশ করছে ভোরের সূর্য৷
আর ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যেই সেই কাজ শুরু হবে—যা নিয়ে এ কদিন তারা সর্বক্ষণ মাথা ঘামিয়েছে, আলোচনা করেছে—যতক্ষণ না চিন্তার ভারে মস্তিষ্ক হয়ে পড়েছে আচ্ছন্ন৷ আজ থেকে শুরু হবে পৃথিবীর চতুরতম এবং কঠিনতম তালার সঙ্গে জিপোর বুদ্ধি ও দক্ষতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা৷ জিপো কিছুটা অস্বস্তি বোধ করল৷ যদি সে পরাজিত হয়, তাহলে? মরগ্যানের ক্রোধোম্মত্ত রূপের কথা মনে পড়ায় সে শিউরে উঠল৷
উত্তেজিত স্নায়ুমণ্ডলীকে শান্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করে সে এগিয়ে গেল একটা টিনের গামলার দিকে৷ গামলা থেকে ঠান্ডা জল নিয়ে, আঁজলা ভরে চোখে মুখে ছিটিয়ে নিল৷ তারপর দাড়ি কামাতে গিয়েই সে বুঝল তার হাত বাঁশ পাতার মতো থরথর করে কাঁপছে৷ গালে দু-এক জায়গায় রক্তও বেরিয়ে পড়ল৷ তাড়াতাড়ি তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছল জিপো৷ ট্রাকের সময়-নির্ভর তালা খোলার সময় তাকে ভীষণ সতর্ক হতে হবে৷ কম্বিনেশন চক্রটাকে ঘোরাতে হবে এক চুল, এক চুল করে৷ কারণ কখন যে নম্বর মিলবে কেউ বলতে পারে না৷ সেই সময় যদি এভাবে তার হাত কাঁপতে থাকে, তাহলে তো বিপদের কিছু বাকি থাকবে না!
নিজের কাঁপা হাতের দিকে চেয়ে গভীর শ্বাস টানল জিপো৷ নাঃ, এই উৎকণ্ঠা, উত্তেজনাকে যে করে হোক রুখতেই হবে! বারবার সে তার অচঞ্চল, স্থির দক্ষ হাতের জন্যে গর্ব অনুভব করেছে৷ কিন্তু আজ তার শিল্পীসুলভ আঙুল, আস্থা এবং আশ্বাসময় হাত—সব কি ম্যালেরিয়ার শিকার হয়েছে? আসল কাজের এত আগে থেকেই সে যদি সাহস হারিয়ে ফেলে তবে তার পরাজয় সুনিশ্চিত!
চোখ ফিরিয়ে জিপো তাকাল দেওয়ালে ঝোলানো কাঠের ক্রুশটার দিকে৷ এই সুন্দর কাজ করা জিনিসটা তাকে তার মা দিয়েছিল দেশ ছাড়ার সময়ে৷ হঠাৎই তার প্রার্থনা করার ইচ্ছে জাগল৷ তার মনে হল, এই মুহূর্তে তার প্রর্থানা করা একান্ত প্রয়োজন৷
কিন্তু হাঁটু গেড়ে ক্রুশের নীচে বসে, বুকে ক্রশচিহ্ন এঁকে যখন যে প্রার্থনার জন্যে প্রস্তুত হল, তখন সবিস্ময়ে সে আবিষ্কার করল, প্রার্থনার একটি শব্দও তার মনে নেই৷ জিপো উপলব্ধি করল, এ কাজে ঈশ্বরের সাহায্য চাইবার ক্ষমতা তার নেই৷ অসংলগ্ন, অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে একই কথা বলে চলল জিপো, ‘ক্ষমা করো…আমাকে ক্ষমা করো…’
শহরতলি এলাকার একটি ছোট ঘরে কফি গরম করছিল কিটসন৷ এইমাত্র সে বিছানা ছেড়ে উঠেছে৷ একটা শীতল আতঙ্কের নাগপাশ যেন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে৷
গত রাতে উসখুশ করেই তার সময় কেটেছে৷ চিন্তায় চিন্তায় ক্লান্ত মস্তিষ্ক একটি মুহূর্তের জন্যেও রেহাই পায়নি৷ এখন সে স্পষ্ট বুঝেছে, পিছিয়ে আসার সময় আর নেই৷ ঠিক আটটার সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী একের পর এক কাজ শুরু হবে নিয়তির লিখন স্পষ্ট অক্ষরে আঁকা হয়ে গেছে তার চিন্তাকুল ললাটে৷ সম্মোহিত শিকারের মতোই সে এগিয়ে চলেছে ক্ষুর্ধাত অজগরের অন্ধকার মুখ-গহ্বরে৷ শুধু যদি জিনি না থাকত, তাহলে কিটসন কিছুতেই এ কাজে সায় দিত না৷ এতক্ষণে মালপত্তর কাঁধে করে সে চলে যেত দূরে, বহুদূরে—যেখানে মরগ্যানরা তার খোঁজ পাবে না৷ কিন্তু…
সে হাড়ে হাড়ে বুঝতে পেরেছে, এ কাজে তারা বিফল হবেই হবে৷ কিন্তু জিনির আকর্ষণ, এবং ওর প্রতি তার একাগ্র, অবুঝ ভালোবাসার নেশা কিটসনকে এ কাজে রাজি হতে বাধ্য করেছে৷
কফি তৈরি করে কাপে ঢালল কিটসন৷ কিন্তু চুমুক দিতে গিয়েই কফির গন্ধে তার গা গুলিয়ে উঠল৷ কাপটাকে ঝাটিতি সে উপুড় করে ধরল বেসিনের ওপর৷
অন্য এক রাস্তায় অন্য এক ঘরে জানলার কাছে বসেছিল মরগ্যান৷ তার ঠোঁটের কোণ থেকে অলস ভঙ্গিতে ঝুলছে একটা সিগারেট৷ চোখের দৃষ্টি বাইরের রক্তিম আকাশে নিবদ্ধ৷ গত রাতের চরম প্রস্তুতিগুলোর কথাই তার মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে চলেছে৷
যে কোনও যুদ্ধেই সেনাপতির ভূমিকায় অভিনয় করে চলেছে ফ্র্যাঙ্ক মরগ্যান৷ তাই আক্রমণ পরিকল্পনার প্রতিটি অংশ সে কষ্টিপাথরে ঘষে-ঘষে যাচাই করে দেখেছে, কোথাও কোনও গলদ আছে কি না৷ এখন নিয়তিকে মেনে নিতে মরগ্যান প্রস্তত—তাতে যদি পরাজয় আসে, তবুও তার দুঃখ নেই৷ কারণ সে জানে, তার তরফ থেকে কোনওরকম ভুলের সুযোগ সে রাখেনি৷ তার পরিকল্পনাকে এর চেয়ে নিখুঁত করা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়৷
এখন সাফল্য অসাফল্য পুরোপুরি নির্ভর করছে প্রত্যেকের নিজের নিজের দক্ষতার ওপর৷ জিনি যদি হঠাৎ ভয় পেয়ে যায়, যদি ব্লেক ঠিকমতো গুলি চালাতে না পারে, কিটসন যদি বিপদে পড়ে তার গাড়ি ও ক্যারাভ্যান নিয়ে, অথবা যদি জিপো তালা খুলতে সক্ষম না হয়…একগাদা ‘যদি’র মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তার কিছু করার নেই৷ মরগ্যান কিন্তু একবারও ভাবল না নিজের পারদর্শিতার কথা৷ কারণ নিজের ক্ষমতা সম্বন্ধে সে স্থিরনিশ্চিত৷ মাথা নিচু করে, স্থির অনড় হাতের দিকে চেয়ে চোখ রাখল মরগ্যান৷ নিজের স্নায়ু নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতায় সে সন্তুষ্ট হল৷ না, কোনওরকম ভুলকে সে নিজে অন্তত প্রশ্রয় দেবে না৷
শহরের অন্য প্রান্তে, নিজের ফ্ল্যাটে ব্লেক তখনও বিছানায় শুয়ে৷ চিৎ হয়ে শুয়ে সে একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে দেওয়াল বেয়ে এগিয়ে চলা একটুকরো রোদের দিকে৷ সে জানে, যখন ওই আলোর টুকরোটা ঘরের ছাদ স্পর্শ করবে তখনই হবে তার বিছানা ছাড়ার সময়৷
কাল রাতে তার ভীষণ ইচ্ছে করছিল গ্লোরিকে ডেকে পাঠাতে; কিন্তু তাতে বিপদের সম্ভাবনা আছে জেনে সে ইচ্ছে ব্লেক ত্যাগ করেছে৷ তার দরকারি জিনিসপত্র সব গোছানো হয়ে গেছে৷ অন্যান্য মালপত্র সে ভাঁড়ার ঘরে ঢুকিয়ে তালা এঁটে দিয়েছে৷ গ্লোরি এসেই বুঝতে পারত, তার পেয়ারের এডি শহর ছেড়ে লম্বা দেওয়ার মতলবে আছে৷ এবং সে নিয়ে ও নানান রকম প্রশ্ন করত৷ শেষে হয়তো একটা কাণ্ডই বাঁধিয়ে বসত৷ তাই গত-রাতে ব্লেককে একাই ঘুমোতে হয়েছে৷ এবং অনভ্যাসের ফলে যথারীতি তার ঘুম আসেনি; রাতটাকেও অস্বাভাবিক দীর্ঘ মনে হয়েছে৷
একফালি রোদের শম্বুকগতিকে লক্ষ করতে করতে সে ভাবল, আচ্ছা ডার্কসনকে খুন করার পর তার কেমন লাগবে? কারণ অপরাধজীবনে সেটাই হবে তার চরম পদক্ষেপ৷ এর আগে কোনওদিন সে কাউকে খুন করেনি৷ বরাবরই লুটপাটের মতলবগুলো এমন কায়দায় ফেঁদেছে, যাতে কেউ হতাহত না হয়৷ কিন্তু আজকের ব্যাপার সম্পূর্ণ আলাদা৷
না, ডার্কসনের খুন হওয়াটাকে ব্লেক তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না৷ কারণ যা বাস্তব, তাকে স্বীকার করতেই হবে৷ কাজে সাফল্যের প্রয়োজনে ডার্কসনের মৃত্যুর প্রয়োজন আছে৷ তাকে না মারলে গোটা পরিকল্পনাটাই ভেস্তে যাবে৷ কিন্তু তবুও ব্লেকের চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দৃশ্যঃ সে আস্তে আস্তে ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে তাকিয়ে রইল নিহত—ডার্কসনের দিকে—তার কপালের লাল ফুটোটার দিকে৷ যদিও সে জানে, কাউকে খুন করতে তার হাত কাঁপবে না, তবুও ব্লেক যেন শিউরে উঠল৷ জেলে থাকতে অনেক রকম খুনির সঙ্গেই তার আলাপ হয়েছে৷ তারা বেশ গর্বের সঙ্গে নিজেদের পাপের কাহিনি বললেও ব্লেক লক্ষ করেছে একটা অস্বস্তি-আতঙ্কের ছায়া তাদের চোখের তারায় ক্রমাগত ঢেউ তুলেছে৷ ব্লেক স্পষ্ট বুঝেছে, ওরা নিজেদের আর সাধারণ মানুষের মধ্যে ভাবতে পারে না৷ কোথায় যেন ওদের ঘিরে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য কাচের দেওয়াল৷ তাদের চোখের যে অভিব্যক্তি, তা একেবারেই আলাদা৷ অন্য কোনও লোকের চোখে ব্লেক সে দৃষ্টি দেখেনি৷ এই কি তাহলে খুনির চোখ? ডার্কসনকে খুন করার পর তার চোখেও কি ফুটে উঠবে এই একই দৃষ্টি? তাকেও তাহলে বন্দি হতে হবে কাচের খাঁচায়? আমৃত্যু তাকে আতঙ্কের শিকার হয়েই কাটাতে হবে?
না, এ ঘটনার পর ব্লেক আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারবে না৷ দরজায় কড়া নাড়ার আকস্মিক শব্দে তাকে চমকে উঠতে হবে, কোনও পুলিশি পোশাক তার মনে তুলবে শঙ্কার তুমুল আলোড়ন, রাতের ঘুম হয়ে পড়বে দুঃস্বপ্ন কণ্টকিত৷ ভবিষ্যতের হাতের পুতুল হয়েই তাকে বাকি জীবনটা কাটাতে হবে৷
রোদের টুকরোটা ঘরের ছাদ স্পর্শ করতেই গায়ের চাদরটা ছুড়ে ফেলে বিছানায় উঠে বসল ব্লেক৷
খাট থেকে নেমে সে এগিয়ে গেল অদূরে রাখা একটা স্কচের বোতলের দিকে—বোতলে তখনও কিছুটা তরল অবশিষ্ট আছে৷ বোতল উপুড় করে গলায় ঢালল ব্লেক৷ একটা তীব্র জ্বালার অনুভূতি নেমে এল তার কণ্ঠনালী দিয়ে৷
কয়েক মুহূর্ত নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ব্লেক৷ অবশেষে যখন স্কচের হালকা আমেজটা সে টের পেল, তখন এগিয়ে গেল কলঘরের দিকে৷ ঝাঁঝরিটা খুলে দিয়ে তার ঝরনার নীচে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল এড ব্লেক৷
শহরের আরেক প্রান্তে, ওপর তলার একটা অপরিষ্কার ছোট ঘরে কাজে ব্যস্ত জিনি গর্ডন৷ নিজের সমস্ত জিনিসপত্র গোছগোছ করে ও তখন স্যুটকেসের ঢাকনা বন্ধ করছে৷ একবার হাতঘড়ির দিকে চোখ রাখল ও সাতটা বাজতে কুড়ি৷
জিপোর কারখানার রওনা হওয়ার জন্যে ওর হাতে এখনও আধঘণ্টার ওপর সময় আছে—ভাবল জিনি; তারপর এগিয়ে এসে বসল জানলার কাছে৷ দেখতে লাগল বাইরের নোংরা, অপরিসর রাস্তা—তার দু-ধারের জঞ্জাল৷ এ সবই ওর বাসস্থানের পারিপার্শ্বিক, সুতরাং নোংরা হলেও কেমন একটা মায়া পড়ে গেছে৷
ভাগ্য যদি ওদের সহায় থাকে, তবে আর কয়েকদিনের মধ্যেই এই দুঃখ কষ্টের জীবনকে সে অতীতের পরিসীমায় সীমাবদ্ধ রাখতে পারবে৷ পারবে নতুন করে জীবনের পথে পা বাড়াতে৷ তখন ওর কাছে থাকবে অজস্র টাকা, ও যেতে পারবে ওর স্বপ্ন-নগরী ন্যু-ইয়র্কে, কিনবে দামি দামি সব পোশাক, প্রকাণ্ড বাড়ি ভাড়া নিয়ে রানির হালে থাকবে ওর এতদিনকার দেখা স্বপ্ন, বাস্তবে রূপ নেবে৷
যদি ভাগ্য ওদের সহায় থাকে…
কিন্তু মরগ্যানের ওপর যথেষ্ট বিশ্বাস আছে জিনির৷ এবং মরগ্যানের ধারণাও অনেকটা তারই মতো৷ মরগ্যানের একটা কথা ওর ভীষণ ভালো লেগেছেঃ হাতের মুঠোয় পৃথিবী৷ এই তিনটে শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে জিনির স্বপ্নের আসল রূপ৷ ওর ইচ্ছেকে এর চেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা বোধহয় কারও পক্ষেই সম্ভব নয়৷ আর সে ইচ্ছেকে বাস্তবে রূপ দিতে গেলে চাই প্রচুর টাকা৷
নাঃ, ট্রাক লুট করা যদি কারও পক্ষে সম্ভব হয়, তবে নিঃসন্দেহে সে লোক মরগ্যান৷ কিন্তু ওই তিনজন…
জিনির মুখে নেমে এল সংশয়ের ছায়া৷
কাজের মূল চাবিকাঠিই নির্ভর করছে জিপোর ওপর৷ আর সে যেভাবেই অল্পেতেই উত্তেজিত হয়ে ওঠে, তাতে মাঝে মাঝে জিনির ভয় হয়৷ জিপো পারবে তো ওই ট্রাকের তালাটা খুলতে? কিন্তু এখন জিপোর জন্যে মরগ্যানের ওপর ভরসা করা ছাড়া উপায় নেই৷
ব্লেককে নিয়েও জিনির ভাবনা কম নয়৷ তার চোখের দৃষ্টি ওর মোটেই ভালো লাগেনি৷ আর যেভাবে সর্বক্ষণ ছোঁক ছোঁক করে! নাঃ, ফন হ্রদে গিয়ে জিনিকে সতর্ক থাকতে হবে—কোনওমতেই যেন ওই লোকটার সঙ্গে তাকে একা থাকতে না হয়৷
কিটসনের কথা মনে পড়তেই জিনির মসৃণ কপালে ভাঁজ পড়ল৷ ছেলেটা তার প্রেমে একেবারে হাবুডুবু খাচ্ছে৷ জিনির যুক্তিনির্ভর, আঙ্কিক মনের শীতলতা বুঝি কমে এল কিটসনের চিন্তার উষ্ণতায়? মালো যাওয়ার পথে তাকে খুশি করার জন্যে ছেলেটার আপ্রাণ প্রয়াসের কথা মনে পড়ে ওর মুখে ফুটে উঠল এক টুকরো মিষ্টি হাসি৷
জিনির হাতে টাকা আসামাত্রই নেকড়ের দল ঝাঁপিয়ে পড়বে ওদের ওপর৷ চাইবে টাকাগুলো ছিনিয়ে নিতে৷ নাঃ, এ বিষয়ে জিনি একেবারে নিশ্চিত৷ তাই ও ভাবছে, কাজের শেষে কিটসনের সঙ্গে যোগ দিলে কেমন হয়৷ ওদের দুজনের মিলিয়ে মোট টাকা হবে চার লাখ ডলার৷ তাছাড়া কিটসনের স্বভাব ভালোই, এবং অনায়াসেই জিনি ওর ওপর নির্ভর করতে পারে৷ তাহলে সবদিক দিয়েই ও নিশ্চিন্ত হতে পারবে৷ নইলে লোকে সন্দেহ করবে, একটা বিশ বছরের ছুঁড়ি এত টাকা পেল কোত্থেকে! সাধারণত কোনও সঙ্গীহীন মেয়েকে সব মানুষই সন্দেহের চোখে দেখে৷”
নাঃ, ব্যাপারটা নিয়ে জিনিকে আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে৷
মরগ্যানই এসে পৌঁছল সবার আগে৷
জিপোর কারখানার সামনে সে যখন বুইক থামাল তখন গাড়ির ড্যাশবোর্ডের ঘড়িতে আটটা বাজতে দশ মিনিট৷
গত রাতে সে, ব্লেক ও জিপো—তিনজন মিলে বুইক গাড়িটার ওপর প্রচুর খেটেছে! বার বার পরখ করে দেখেছে কতটা ধকল গাড়িটা সইতে পারে৷ কাজের শেষে মরগ্যান গাড়িটাকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে গেছে তার ফ্ল্যাটে—চালিয়ে দেখেছে গাড়িটার অবস্থা৷
কারখানায় ঢুকেই মরগ্যানের চোখে পড়ল, জিপো ক্যারাভ্যানের কাবার্ডে রাখা যন্ত্রপাতিগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করছে৷
প্রায় একই সঙ্গে সে লক্ষ করল, জিপোর মুখমণ্ডল বিবর্ণ, শ্বাস-প্রশ্বাস হাঁপানি রুগির মতো যন্ত্রণাক্লিষ্ট৷ ওর যন্ত্রপাতি ধরা হাত দুটো অনিশ্চয়তার শিকার হয়ে কাঁপছে৷
প্রথম প্রথম তো, পরে সব ঠিক হয়ে যাবে—ভাবল মরগ্যান৷ তা যদি না হয়, তাহলে বিপদের সম্ভাবনা প্রচুর৷
জিপো তো জিপো, এই মুহূর্তে মরগ্যান নিজেও কি সুস্থির থাকতে পারছে! পরিকল্পনার প্রথম পর্বে পৌঁছে সে নিজে খুব টেনশানে পড়েছে জিভ শুকনো, বিস্বাদ৷ সুতরাং জিপো যে একটু বিচলিত হয়ে পড়বে, তাতে আর আশ্চর্যের কী আছে!
কিন্তু এই অনিশ্চিত ভাবটা জিপোর কাটিয়ে ওঠা একান্ত প্রয়োজন; নইলে এই সামান্য দুর্বলতা থেকেই রূপ নেবে বিরাট ফাটল—সেটা কিছুতেই হতে দেবে না৷ মরগ্যান৷
‘এই যে, জিপো—ঠিক আছ তো?’ এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করল সে৷
হ্যাঁ—হ্যাঁ, ঠিক আছি৷’ মরগ্যানের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে জবাব দিল জিপো, ‘মনে হচ্ছে, আজ আর বৃষ্টি হবে না৷ হুঁঃ, প্যাচপেচে বর্ষার চেয়ে রোদ্দুর অনেক ভালো৷’
এমন সময় একটা স্যুটকেস ও একটা পিকনিক বাস্কেট নিয়ে জিনি এসে ঢুকল কারখানায়৷ ওকে দেখে মরগ্যানের মনে হল, গত রাতে ওর ভালো ঘুম হয়নি৷ ওর চোখের কোলে কালি, রঙ মাখা মুখমণ্ডলের আনাচে-কানাচে বিবর্ণতার আভাস৷
‘কী খবর? ভয় করছে নাকি?’ জিনির কাছে গিয়ে থমকাল মরগ্যান৷ হালকা সুরে জানতে চাইল৷
ও তাকাল মরগ্যানের চোখে—সাগর-সবুজ চোখ শীতল, অভিব্যক্তিহীন৷
‘তোমার মতোই—তার বেশি নয়৷’
হাসল মরগ্যান, ‘তাহলে তো ভয় করছে বলতে হয়৷ কারণ আমিও যে একেবারে নিশ্চিত তা নয়৷’
এবার কারখানায় উপস্থিত হল কিটসন—তার পিছনেই ব্লেক৷
ব্লেককে দেখেই মরগ্যানের হঠাৎ সন্দেহ হল ও নেশা করেছে৷ ব্লেকের মুখে লালচে আভা, চলাফেরার মধ্যে কেমন আলস্য, অবসাদ৷ অস্বস্তির বিদ্যুৎ এই প্রথম ঝলসে উঠল মরগ্যানের মনে৷
কিটসনকে কিছুটা নার্ভাস মনে হলেও জিপো বা ব্লেকের তুলনায় আজ সে নিজের ওপর অনেক বেশি আস্থাশীল৷ এই ব্যাপারটাই মরগ্যানকে অবাক করল৷
আটটা বাজতে ঠিক দু-মিনিট বাকি৷ সুতরাং, শুধু শুধু আর সময় নষ্ট করতে চাইল না মরগ্যান৷ কারণ এতে অযথাই তাদের স্নায়ুর ওপর চাপ পড়বে৷
‘ঠিক আছে, তাহলে এবার বেরোনোর জন্যে রেডি হও৷’ সংক্ষিপ্তভাবে বলল সে, ‘তোমরা তিনজন ক্যারাভ্যানটা বের করো বাইরে৷ আর জিনি, তুমি এম জিটা নিয়ে সোজা চলে যাও এজেন্সিতে৷’
জিনিকে অনুসরণ করে ছোট এম জি গাড়িটার দিকে এগোল মরগ্যান৷ জিনি উঠে বসল চালকের আসনে৷ মরগ্যান ঝুঁকে দাঁড়াল ওর ওপর৷ জিনির অচঞ্চল, নির্বিকার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ওর প্রশংসাই করল সে৷
‘তুমি তো জানোই কী করতে হবে৷ দেখো, যেন কোনও ভুল না হয়৷ গুড লাক!’
কিটসন চটপট পা-চালিয়ে এগিয়ে এল জিনির কাছে, ‘গাড়ি চালাবার সময় সাবধানে থেকো, এম জিটা দারুণ জোরে ছোটে৷ গুড় লাক৷’
কিটসনের চোখে চোখ রেখে মাথা নাড়ল জিনি, ‘ধন্যবাদ৷ তুমিও সাবধানে থেকো৷’ ক্লাচ টিপে, গিয়ার দিয়ে এম জিটা কারখানায় বাইরে নিয়ে চলল ও৷
মিনিট পাঁচেক পরে ক্যারাভ্যানটাকে সঙ্গী করে বুইকটা আস্তে আস্তে জিপোর কারখানা ছেড়ে বেরোল৷
মরগ্যান ও ব্লেক ক্যারাভ্যানের মেঝেতে বসে—আর গাড়ির চালক কিটসন৷ বাইরে এসে জিপো কারখানার দরজা বন্ধ করে দিল৷ তারপর তালার ওপরে ঝুলিয়ে দিল একটা কাঠের ফলক৷ তাতে লেখা; গরমের ছুটিতে কারখানা বন্ধ থাকবে৷
জিপোর কেন জানি না মনে হল, তার এই সাধের জীর্ণ কারখানাকে সে আর কোনওদিনই দেখতে পাবে না৷ এই কারখানার থেকে তার লাভ খুব একটা হয় না ঠিকই, কিন্তু পনেরো বছর এটাকে সুখ-দুঃখের সঙ্গী করার ফলে আজ কেমন একটা মায়া পড়ে গেছে৷ ক্যারাভ্যানে ওঠার সময় জিপোর দৃঢ়তার প্রতিরোধ ভেঙে তার চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল৷ একজন ভাবপ্রবণ ইটালিয়ানের মতোই সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল৷
‘কী হল আবার তোমার, ন্যাকামো?’ ব্লেক নিষ্ঠুর স্বরে খেঁকিয়ে উঠল৷ তার স্নায়ুতন্ত্র যেন পাক খেয়ে উঠল, ‘হঠাৎ ছিঁচকাঁদুনির কী হল?’
‘থামো এড৷’ দাঁত খিঁচিয়ে গর্জে উঠল মরগ্যান৷ সরে গিয়ে জিপোর জন্যে জায়গা করে দিল৷ তার বিপজ্জনক সাপ চোখের শীতল দৃষ্টি ব্লেকের মুখে যেন জ্বালা ধরিয়ে দিল—সে মুখ ফিরিয়ে নিল অন্যদিকে৷ মরগ্যান জিপোর পাঁজরে হালকাভাবে খোঁচা মারল, ‘জিপো, তুমি কারখানার জন্যে কাঁদছ? ভুলে যাচ্ছ কেন, এর থেকে অনেক ভালো ভালো জিনিস তোমার হাতে আসবে ঃ নিজের বাংলো, জমিজমা, গাড়ি—কত কী? ভেবে দেখো তো, সব মেয়েরা তোমার চারদিকে কেমন ভিড় করবে! তোমার পকেট থাকবে দু-লাখ ডলারে ঠাসা৷’
জিপো ঘাড় নাড়ল, বিষণ্ণমুখে ফুটিয়ে তুলল কষ্টকৃত হাসির রেখা৷
‘তাই যেন হয়৷ কিন্তু সত্যি সত্যি আমরা পারব তো, ফ্র্যাঙ্ক?’
‘নিশ্চয়ই৷ সে সব ভার তুমি আমার ওপর ছেড়ে দাও৷ প্রত্যেকটা কাজের বেলাতেই তোমরা আমার নির্দেশ মেনে চলেছ—তাতে কোনও বিপদ হয়েছে কি?’
ওরা তিনজন যখন কাঁচা সড়কের মুখে পৌঁছল, তখন প্রত্যেকেই একেবারে ঘেমে নেয়ে উঠেছে, মেজাজ হয়ে উঠেছে তিরিক্ষি৷
কিটসন মোটামুটি জোরেই গাড়ি চালাচ্ছিল, এবং ক্যারাভ্যানের ভেতর ওরা তিনজনই একই সঙ্গে এপাশ ওপাশ ভীষণভাবে ঝাঁকানি খেতে লাগল৷ ক্যারাভ্যানের চাকায় কোনওরকম স্প্রিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় এবড়ো-খেবড়ো রাস্তায় দোলানির পরিমাণও হয়ে উঠল সাংঘাতিক৷
রাস্তার মুখেই একটা রোড-সাইন ও একটা হাতুড়ি দিয়ে জিপোকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ একা একা নামতে জিপোর ইচ্ছে করছিল না ঠিকই, কিন্তু পরর্বতী বিপজ্জনক বাঁক-সংক্রান্ত ব্যাপারে তাকে কোনওরকম দায়িত্ব নিতে হবে না ভেবে সে স্বস্তি পেল৷
‘শালা, একেবারে অপদার্থ!’ ক্যারাভ্যানটাকে নিয়ে বুইকটা রাস্তায় ঢুকে পড়তেই চাপা স্বরে খিঁচিয়ে উঠল ব্লেক, ‘যদি ওই ট্রাকের তালা হারামজাদাটা না ভাঙতে পারে, তবে আমিও ওকে ভেঙে তক্তা করব৷’
মরগ্যান উঠে দাঁড়িয়ে ক্যারাভ্যানের ছাদ থেকে অটোমেটিক রাইফেলটা হ্যাঁচকা মেরে নামিয়ে নিল৷ ওটাকে ঠেসে দিল ব্লেকের হাতে৷
‘জিপোর চিন্তা ছেড়ে এবার এদিকে মন দাও৷’ মরগ্যানের স্বর যেন বরফে ডোবানো, ‘তোমার কাজটুকু ঠিকমতো করবার চেষ্টা করো৷ রাইফেলের নিশানা যেন ঠিক থাকে!’
ব্লেক রাইফেলটা কাঁপা হাতে আঁকড়ে ধরল, ‘আমার একটু গলা ভেজাতে ইচ্ছে করছে, ফ্র্যাঙ্ক৷ দেখো, জিনির বাস্কেটে বোধ হয় স্কচের বোতল আছে!’
‘ওসব পরে হবে, এড৷ প্রথমে তোমার কাজটুকু তুমি ঠিকমতো করো, তারপর বোতলের কথা ভাবা যাবে৷’
আস্তে আস্তে গাড়ির গতি শ্লথ হয়ে এল…একসময় থামল ক্যারাভ্যানটা৷ কিটসনই খুলল পিছনের দরজাটা৷
ওরা এসে দাঁড়িয়েছে বিপজ্জনক বাঁকের কাছে৷
ব্লেক ও মরগ্যান রাস্তায় নেমে দাঁড়াল৷ ব্লেকের হাতে রাইফেল, মরগ্যানের হাতে .৪৫৷ কয়েক সেকেন্ড ওরা থমকে রইল, নিঃশ্বাস নিল বুক ভরে৷ ভোরের ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের তাপ অনুভব করল ওরা৷
মরগ্যান কিটসনকে লক্ষ করে বলল, ‘তোমার কাজ তুমি জানো, অতএব বাঁশির সিগন্যালের জন্যে রেডি থেকো, আসতে যেন একমুহূর্তও দেরি না হয়৷’
কিসটন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল৷ প্রথমে তাকাল ব্লেকের দিকে, তারপর মরগ্যানের দিকে, ‘গুড লাক৷’
‘শালা এমনভাবে বলছে যেন ভাগ্য টাগ্যের ব্যাপারটা ওর দরকার নেই৷’ মরগ্যানের দিকে ফিরে বিদ্রূপ-মাখানো স্বরে বলে উঠল ব্লেক, ‘তোমারও বেশ খানিকটা ভাগ্যের দরকার, আলেক্স! শুধু শুধুই আমাদের জন্যে তুমি দুঃখ করছ৷’
কিটসন কাঁধ ঝাঁকাল, গিয়ার দিয়ে গাড়ি এগিয়ে নিয়ে চলল৷ হঠাৎই মরগ্যানের মনে পড়ল, ক্যারাভ্যান থেকে শাবল দুটো নামাতে ওরা ভুলে গেছে৷
‘এই! এই আলেক্স—থামো!’ হেঁড়ে গলায় চিৎকার করে উঠল মরগ্যান৷
কিটসন গাড়ি থামিয়ে জানলা দিয়ে মুখ বাড়াল, ‘কী হল?’
‘প্রত্যেকটা জিনিসই কি আমাকে মনে করিয়ে দিতে হবে, এড? গাধার মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছ কী? যাও শাবল দুটো নামিয়ে নাও গাড়ি থেকে৷৷’
কিসটন গাড়ি থেকে নেমে ক্যারাভ্যানের দরজাটা খুলল, শাবল দুটো তুলে দিল ব্লেকের হাতে৷ মরগ্যানের চোখজোড়া রাগে জ্বলছে৷ সে হাত নেড়ে বিদায় জানাল কিটসনকে৷ বুইক ও ক্যারাভ্যানটা চলতে শুরু করতেই মরগ্যান রাস্তার ধার বেয়ে ওপরে উঠলে লাগল৷ ব্লেক তাকে অনুসরণ করল৷
এই জায়গাটা মরগ্যান এতবার, এতভাবে ঘুরে দেখেছে যে এর প্রতিটি ঝোপঝাড়ের অবস্থান তার নখদর্পণে৷ ব্লেকের হাত থেকে একটা শাবল নিয়ে ওকে লুকেবার জায়গাটা দেখিয়ে দিল মরগ্যান৷ ব্লেকের থেকে গজ ছয়েক দূরে সে তার লুকোবার জায়গা বেছে নিল৷
ওরা দুজনেই উপুড় হয়ে রাস্তার দিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখে প্রতীক্ষায় রইল৷
নাঃ, লুকোবার জায়গাটা ভালোই হয়েছে—ভাবল ব্লেক৷ রাইফেলটা কাঁধে ঠেকিয়ে রাস্তার দিকে তাক করল সে৷ না, রাইফেল-নিশানার পথে কোনওরকম বাধাই পড়ছে না; তাছাড়া রাস্তা থেকেও কারও পক্ষে তাকে দেখে ফেলা সম্ভব নয়৷ ব্লেকের অস্বস্তি কমে এল অনেকটা… কিন্তু এক চুমুক স্কচের অভাবে তার শুকনো ফুসফুসটা আনচান করতে লাগল৷ ফ্ল্যাট ছাড়ার আগে যে তিন গেলাস স্কচ সে গিলছে, তার আমেজটা এখন যাই যাই করছে৷ বেলা খুব বেশি না হলেও সুর্যের তাপ প্রচণ্ড৷ শরীরের সর্বত্র ঘামের উপস্থিতি অনুভব করে শুকনো জিভটা একবার ঠোঁটের ওপর বুলিয়ে নিল সে৷
‘কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো?’ মরগ্যান ঝোপের আড়াল থেকেই প্রশ্ন করল৷
‘নাঃ, দারুণ আছি৷’ রাইফেলের মাছিটা ঠিক করতে করতে বলে উঠল ব্লেক৷ তারপর রাইফেলটা নামিয়ে রাখল পাশে৷ রুমাল বের করে ঘর্মাক্ত হাত দুটো মুছল৷
মরগ্যান টাই খুলে জামার বোতাম খুলল৷ তাকাল হাতঘড়ির দিকে৷ এগারোটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি৷ টমাস যদি রোজকার মতোই জোরে ট্রাক চালায়, তবে সাড়ে এগারোটা নাগাদ এই বাঁকের কাছে ওদের পৌঁছে যাওয়া উচিত৷ তাহলে জিনি বোধ হয় মিনিট পনেরোর মধ্যেই এসে পড়বে—মরগ্যান ভাবল৷
হাতে এখনও সময় আছে দেখে মরগ্যান একটা সিগারেট ধরাল৷
ব্লেকও এই সুযোগ হাতছাড়া করল না—সেও সিগারেট ধরাল৷ একবার সে চোখ রাখল রাইফেলের ওপর রাখা তার বাঁ-হাতের ওপর—তার হাত কাঁপছে৷ শত চেষ্টাতেও ব্লেক ওটাকে স্থির রাখতে পারছে না৷ নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে মুখভঙ্গি করল সে৷ বুকের ভেতর শোনা যাচ্ছে উত্তাল হৃৎপিণ্ডের উন্মত্ততা৷ এই দুঃসহ প্রতীক্ষা ব্লেকের স্নায়ুর ওপর যেন জেঁকে বসল৷
পাঁচ মিনিট অখণ্ড নীরবতার পর আচমকা মরগ্যান মাথা তুলল, যেন কিছু শোনবার চেষ্টা করল৷
‘মনে হচ্ছে একটা গাড়ি আসছে৷’
তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াতে গেল ব্লেক৷ সঙ্গে সঙ্গেই চাপা স্বরে ধমকে উঠল মরগ্যান, ‘বসে পড়ো, বোকা কোথাকার! এটা জিনির গাড়ি নয়—লুকিয়ে পড়ো শিগগির!’
তাড়াহুড়ো করে ব্লেক আমার বসে পড়ল—ঝোপের আড়াল থেকে দেখার চেষ্টা করল৷
আধ মাইলটাক দূরে ওদের নজরে পড়ল সাদা ধুলোর মেঘ উড়িয়ে একটা গাড়ি ছুটে আসছে৷ আরও কাছে আসতেই ওরা দেখল গাড়িটা একটা সৈন্যবাহিনীর ট্রাক৷ ড্রাইভারের পাশে বসে তিনজন সৈনিক৷ ট্রাকটা একটুও না থেমে ওদের সামনে দিয়ে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল৷
‘ও আজকের ডাক গেল৷’ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল মরগ্যান, ‘আজ ওদের অন্য দিনের চেয়ে কিছুটা দেরি হয়ে গেছে৷’
ঘড়ির কাঁটা ক্রমশ এগিয়ে চলল৷ এগারোটা কুড়ির সময় মরগ্যান এই প্রথম দুশ্চিন্তায় চঞ্চল হয়ে উঠল৷ তাহলে কি জিনি কোনও দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে? নাকি ভয় পেয়ে তাদের দল ছেড়েই পালাল মেয়েটা?
ব্লেক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠল, ‘ওফ, আর পারছি না৷ এতক্ষণ ধরে করছে কী মেয়েটা?’
‘বোধহয় গাড়ি-টাড়ির ভিড়ে রাস্তায় আটকে পড়েছে৷’ চিন্তাকুটিল মুখে জবাব দিল মরগ্যান৷
‘টমাস যদি জিনিকে আগে যেতে না দেয়, তাহলে?’ উৎকণ্ঠায় উঠে বসলে ব্লেক, ‘ওই শালারা যদি ট্রাক নিয়ে মেয়েটার আগে চলে আসে, তখন আমরা কী করব?’
‘কিছুই করব না৷ কাল আবার নতুন করে চেষ্টা করব৷’
‘কিন্তু জিনিকে যদি ওরা কাল একই সময় আবার দেখতে পায়, তাহলে নির্ঘাত সন্দেহ করে বসবে৷ তখন পুরো প্ল্যানটা ভেস্তে যাবে৷’
‘থামো, যত সব আজগুবি চিন্তা’ ব্লেককে ধমকে উঠল মরগ্যান, ‘সে সব ভাববার জন্যে যথেষ্ট সময়…’
দূরাগত কোনও গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দে মাঝপথেই থমকে গেল মরগ্যান৷
‘এইবার ও আসছে!’
কয়েক সেকেন্ড পরেই ওরা দেখতে পেল বিদ্যুৎগতিতে ধেয়ে-আসা এম জি গাড়িটাকে৷ তখনও তার দূরত্ব বাঁকের কাছ থেকে প্রায় এক মাইল৷
‘ও দেখি পাগলের মতো গাড়ি ছোটাচ্ছে!’ অস্ফুটস্বরে বলে উঠল ব্লেক৷ তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়াল ঝোপের আড়াল থেকে, ‘দেখো, কী সাংঘাতিক জোরে ছুটে আসছে৷’
মরগ্যানও তখন উত্তেজিতভাবে উঠে দাঁড়িয়েছে৷ আগ্রহভরে দেখছে রাস্তার দিকে৷
‘হয়তো ট্রাকটা ওর গাড়ির থেকে খুব বেশি দূরে নেই৷ শিগগির এসো৷ শাবল দুটো চটপট তুলে নাও!’
পকেট থেকে এক ফালি বড় ন্যাকড়া বের করে রাস্তার ওপর গিয়ে দাঁড়াল মরগ্যান৷ ন্যাকড়াটা পাকিয়ে দড়ির মতো করে, বাঁ-পকেট থেকে বের করল একটা বেনজিনের শিশি৷
বিপজ্জনক বাঁকের কাছাকাছি আসতেই গাড়ির গতিবেগ কমে এল—পর মুহূর্তেই বাঁক ঘুরেই গাড়িটা হাজির হল মরগ্যানের দৃষ্টির আওতায়৷ হাত নেড়ে সে জিনিকে উপযুক্ত জায়গায় গাড়িটা থামাতে নির্দেশ দিল৷ গাড়িটাকে এক ঝটকায় রাস্তার ধারে নিয়ে গিয়ে থামাল জিনি৷
ওর মুখ আতঙ্কে বির্বণ, চোখের দৃষ্টিতে ক্রোধ ও উত্তেজনায় ছোঁয়া। লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নামল জিনি।
‘ওঃ, ওরা কিছুতেই আমাকেই আগে যেতে দিচ্ছিল না! শেষে অতিকষ্টে পাশ কাটিয়ে এসেছি। আরেকটু হলেই রাস্তা থেকে ছিটকে যাচ্ছিলাম নালার মধ্যে! শিগগির করো!’ জিনির মুখমণ্ডল রক্তশূন্য, কাগজের মতো ফ্যাকাসে। স্বর উটকণ্ঠায় অস্থির; ওরা ঠিক আমার পিছন পেছনেই আসছে!’
গাড়ির যন্ত্রপাতি রাখার বাক্স থেকে ছোঁ-মেরে একটা রিভলভার বের করে আনল জিনি৷ তারপর গাড়ির মেঝে থেকে শুয়োরের রক্ত-ভরা বোতলটা তুলে নিল৷
‘কোন জায়গায় আমাকে শুতে হবে?’
মরগ্যান আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়ে দিল জায়গাটা।
বোতলের ঢাকনা খুলে জিনি যখন রাস্তায় রক্ত ঢালছে, মরগ্যান ও ব্লেক তখন তড়িঘড়ি জিনির গাড়িটাকে শাবলের চাড় দিয়ে ওলটাতে ব্যস্ত!
ওদের দুজনের একত্রিত শক্তির প্রচেষ্টায় মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ির একপাশ শূন্যে উঠল৷ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিকট শব্দ করে নালার মধ্যে আছড়ে পড়ল গাড়িটা৷
‘যাও, শাবল দুটোকে নিয়ে লুকিয়ে পড়ো!’ ব্লেককে লক্ষ করে কথা কটা ছুড়ে দিয়েই মরগ্যান পেট্রোল ট্যাঙ্কের ঢাকনা খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল৷
শাবল দুটোকে নিয়ে ব্লেক একছুটে ফিরে গেল নিজের জায়গায়—লুকিয়ে পড়ল৷ ওদিকে জিনি রক্ত ঢেলে চলেছে ওর হাতে, গায়ে, জামায়—ঘেন্নায় মুখ বিকৃত৷
মরগ্যান ন্যাকড়ায় দড়িটার ওপর বেনজিন ঢেলে দিল৷ শিশিটা ঝোপের আড়ালে ছুঁড়ে দিয়ে ভেজা দড়ির একমাথা ঢুকিয়ে দিল পেট্রোল ট্যাঙ্কের ভেতরে৷ অন্য মাথাটা পড়ে রইল রাস্তার ওপর৷
‘ওই যে, ওরা আসছে! ওদের স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এখান থেকে৷’ ব্লেক চেঁচিয়ে উঠল, ‘জলদি ফ্র্যাঙ্ক!’
মরগ্যান এক ঝটকায় ফিরে দেখল জিনির দিকে৷
এক গ্যালন রক্তের সমুদ্রে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে জিনি৷ ও মুখ তুলে তাকাল ফ্র্যাঙ্কের দিকে… বর্ণহীন মুখে উৎকণ্ঠায় ভরা বিস্ফারিত সবুজ চোখজোড়া বেমানান লাগছে!
‘রিভলভার নিয়েছ তো?’ মরগ্যান জানতে চাইল৷
‘হ্যাঁ৷’
‘ভয়ের কোনও কারণ নেই৷ আমরা তো আছি৷’
ক্ষিপ্রহাতে দেশলাই জ্বালাতেই আচমকা দ্বিধায় পড়ল মরগ্যান৷ ওলটানো গাড়িটা জিনির বড় বেশি কাছে রয়েছে না? যদি সে এখুনি গাড়িটায় আগুন লাগিয়ে দেয় তাহলে জিনির গায়ে আঁচ লাগবে না তো! কিন্তু সে সব চিন্তা করার সময় আর তখন ছিল না৷
‘জলদি করো, ফ্র্যাঙ্ক!’ আতঙ্ক ঝিমঝিম স্বরে চেঁচিয়ে উঠল ব্লেক৷
জ্বলন্ত দেশলাইয়ের কাঠিটা ন্যাকড়ার একপ্রান্তে স্পর্শ করাল মরগ্যান৷ পরমুহূর্তেই তীরবেগে জিনিকে অতিক্রম করে ঝোপের আড়াল লক্ষ করে ছুটল৷
আগুনের শিখা বেনজিন ভেজা ন্যাকড়া বেয়ে পলকের মধ্যে প্রবেশ করল গাড়ির পেট্রোল ট্যাঙ্কে৷ এক কান-ফাটানো বিস্ফোরণ! গরম হাওয়ার হলকা এসে ঝাপটা মারল মরগ্যানের মুখে যেন তার শ্বাসরোধ করে দিতে চাইল৷
ঘন কালো ধোঁয়া ও আগুনের লেলিহান রক্তিম শিখা আবহাওয়াকে আচ্ছন্ন করে তুলল৷ বাঁকের সামনের রাস্তাটা প্রায় ঢাকা পড়ে গেল ধোঁয়ায়-ধোঁয়ায়৷
‘জিনি নির্ঘাত পুড়ে মরবে৷’ হাত দিয়ে মুখ আড়াল করে চেঁচিয়ে বলল ব্লেক৷ কারণ এত দূর থেকেও আগুনের অসহ্য উত্তাপ সে অনুভব করতে পারছে৷
মরগ্যান জানে, এখন আর কিছু করার সময় নেই৷ জিনির কথা না ভেবে সে সামনের রাস্তার দিকে চোখ রাখল৷ দেখল, ওয়েলিং এজেন্সির ট্রাকটা সামনের বাঁকে মোড় নিয়ে এগিয়ে আসছে অকুস্থলে৷
‘ওরা এসে পড়েছে!’
এক ঝটকায় রাইফেল তুলে নিয়ে বাঁটটাকে কাঁধে চেপে ধরল ব্লেক৷ আপ্রাণ চেষ্টা করল নিশানা স্থির রাখতে, কিন্তু সামনের পটভূমি ওর চোখের সামনে স্তরে-স্তরে কাঁপতে লাগল৷
আগুনের উত্তাল শিখা এখন অনেকটা কমে এসেছে—ধোঁয়াও কেটে গেছে অনেকটা৷ গাড়িটা তখনও ভীষণভাবে জ্বলছে—আবহাওয়ার উত্তাপে যেন চামড়া ঝলসে যাচ্ছে৷ রাস্তার মাঝখানে স্থির পাথরের মতো পড়ে রয়েছে জিনি৷
ব্লেকের মনে হল, এর চেয়ে ভয়ংকর দুর্ঘটনার বাস্তব চিন্তা কারও পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয়৷
নিশ্চলভাবে পড়ে থাকা মেয়েটা, ওর জামা-কাপড়ের রক্ত, জ্বলন্ত গাড়িটা—সব মিলিয়ে যেন চূড়ান্ত দুর্ঘটনার এক বিশ্বাসযোগ্য নিখুঁত ছবি রূপ নিয়েছে৷ জিনিকে দেখে বোঝা শক্ত, ও বেঁচে আছে কি মরে গেছে৷
ইস, গাড়িটাকে আর একটু দূরে রাখলেই ভালো হতো৷ আপসোসের ধিক্কারে মনে মনে ফেটে পড়ল মরগ্যান৷
সে যেখানে লুকিয়ে আছে, সেখানেই তাপের প্রচণ্ডতা অসহ্য৷ তার ওপর জিনি রয়েছে মরগ্যানের চেয়ে জ্বলন্ত গাড়িটার অন্তত কুড়ি ফুট কাছে৷ ওর জীবন্ত দগ্ধ হওয়ার সম্ভাবনাকে হেসে উড়িয়ে দিতে পারল না মরগ্যান৷ সত্যিই যদি…? কিন্তু জিনির নিথর হয়ে পড়ে থাকার ভঙ্গি দেখে ওর যন্ত্রণার কোনওরকম আভাসই বাইরে থেকে পাওয়া যাচ্ছে না৷
ট্রাকটা এসে ঢুকল বিপজ্জনক বাঁকের মুখে৷
মরগ্যানের সর্পিল আঙুল চেপে বসল .৪৫-এর বাঁটের ওপর৷ সে এখানে থেকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ড্রাইভার ও রক্ষীকে৷ রাস্তার ধারে পড়ে থাকা জ্বলন্ত গাড়িটাকে ও রক্তাক্ত জিনিকে দেখেই ওদের মুখে ভাবান্তর ঘটল৷ ব্রেক কষে গাড়ি থামাল ট্রাক-ড্রাইভার টমাস৷ জিনির থেকে প্রায় ফুট পনেরো দূরে থমকে দাঁড়াল কালান্তক ট্রাকটা৷
এরপর ওরা কী করবে? মরগ্যানের মনে প্রশ্নের ঝড় বইল৷ ওরা কি গাড়ি ছেড়ে নামবে? নাকি…? এখন সমস্ত কিছুই নির্ভর করছে এই মুহূর্তটার ওপর: মরগ্যানের মতলব, আশা-ভরসা, সবকিছুই তুলাদণ্ডে দুলছে এই একটা মুহূর্তকে আশ্রয় করে৷
ডার্কসন তখন সামনে ঝুঁকে পড়ে ব্যাপারটা ভালোভাবে দেখতে চেষ্টা করছে৷ আর টমাস ট্রাকের গিয়ারকে ঠেলে দিল নিউট্রালে৷
মরগ্যান দেখল, ট্রাকের দু-ধারের জানলাই খোলা৷ যাক, এখনও পর্যন্ত সবকিছুই তার মতলব মাফিকই ঘটছে৷
ট্রাক ড্রাইভার ও রক্ষী উইণ্ডশিল্ডের ভেতর দিয়ে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে চাইল৷ এই মুহূর্ত কয়েকের বিরতিকে মরগ্যানের মনে হল কয়েক মিনিট৷ সে যখন অধৈর্য হয়ে পড়েছে, তখন ডার্কসন টমাসকে কী যেন বলল৷ জবাবে টমাল ঘাড় নাড়ল৷
ভীষণ অস্বস্তি অনুভব করল মরগ্যান৷ সামনের এই নৃশংস দুর্ঘটনার দৃশ্য দেখেও ওরা বরফের মতো ঠান্ডা মাথায় বসে বসে ভাবছে ওদের কর্তব্য৷ ওদের এই অবিচলিত মনোভাবে প্রমাদ গুনল মরগ্যান৷
সে দেখল, টমাস হাত বাড়িয়ে একটা ছোট রিসিভার তুলে দিল৷
সর্বনাশ! ভাবল মরগ্যান৷ ও কি নির্দেশ চেয়ে এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইছে?
হঠাৎই আড়াল থেকে রিভলভার দিয়ে ওদের দুজনের দিকে ছুটে যাওয়ার ইচ্ছে হল মরগ্যানের টমাসকে বাধা দিতে হলে এখুনি একটা কিছু করা দরকার৷ সে যদি আগে থেকে এটা ঘুণাক্ষরেও আন্দাজ করত, তাহলে ব্লেককে সে কখনই রাস্তার এ-পাশে রাখত না৷ কারণ ব্লেক আর সে রাস্তার দু-পাশে থাকলে এই মুহূর্তেই তারা টমাস ও ডার্কসনকে আক্রমণ করতে পারত৷ কিন্তু ওদের দুজনের সামনে একা-একা ঝুঁকি নেওয়া নেহাতই অপরিণামদর্শিতা৷
জিনির ভাবনাকে কল্পনা দিয়েই স্পর্শ করার চেষ্টা করল মরগ্যান৷ধীরে ধীরে আগুনের আঁচে পুড়ছে মেয়েটা৷ ও কি বুঝতে পারছে না, ওর কাছ থেকে কয়েক গজ দূরে এসে দাঁড়িয়েছে ট্রাকটা৷ শুয়ে শুয়ে ও নিশ্চয়ই ডার্কসনের আগমনের প্রতীক্ষা করছে৷
এই সংকটময় মুহূর্তেও মরগ্যান জিনির সাহসের প্রশংসা না করে পারল না৷ ওই অবস্থায় একরাশ উৎকন্ঠিত অনুভূতি নিয়ে অন্ধ হয়ে পড়ে থাকা সাধারণ মানুষের কর্ম নয়৷ মরগ্যান দেখল, টমাসের হাত থেকে যন্ত্রটা নিয়ে ডার্কসন তাতে কথা বলছে৷ তার গলার স্বর আংশিক মরগ্যানের কানে এলেও তার পক্ষে বক্তব্য অনুমান করা সম্ভব হল না৷
তাহলে দেখা যাচ্ছে, তাদের পালাবার সময় ধীরে ধীরে কমে আসছে—ভাবল মরগ্যান৷ যেই ট্রাকটা রাস্তা থেকে হাপিস হবে, সঙ্গে সঙ্গেই এজেন্সি সর্তকবাণী ছড়িয়ে দেবে বেতার তরঙ্গে৷
কথা শেষ করে যন্ত্রটা নামিয়ে রাখল ডার্কসন৷ টমাসকে কী যেন বলে দরজা খুলে ট্রাকের বাইরে নামল সে৷
টমাস একইভাবে ট্রাকের ভেতর বসে উইন্ডশিন্ডের মধ্যে দিয়ে ব্যাপারটা লক্ষ করতে লাগল৷
মরগ্যান যেখানে লুকিয়ে সেখান থেকে আর ব্লেককে দেখা যাচ্ছে না৷ ব্লেক কী করছে ভেবে সে অবাক হল৷
জিনির দিকে এগিয়ে যাওয়া ডার্কসনকে নিশানা করে রাইফেল তুলে ধরল ব্লেক৷ কিন্তু তার হাত অস্বাভাবিকভাবে থরথর করে কাঁপতে লাগল৷ চাপা স্বরে একটা খিস্তি দিয়ে সে হাত স্থির করার চেষ্টা করল, কিন্তু কোনও ফল হল না৷ আতঙ্কের হিমেল হাওয়া ঝাপটা মারল ব্লেকের ফুসফুসে৷
রক্ষীটি ততক্ষণে জিনির দশ ফুটের মধ্যে পৌঁছে গেছে৷ ব্লেক জানে, এবার যে কোনও মুহূর্তে মরগ্যান রিভলবার নিয়ে তার ঝোপের আড়াল ছাড়বে৷
ব্লেকের রাইফেলের নিশানা অনিশ্চিতভাবে কাঁপতে লাগল: একবার ডার্কসনের ওপর, পর মূহূর্তেই তার বাইরে৷
ঝোপঝাড়ের খসখস শব্দে চোখ ফেরাতেই সে দেখল মরগ্যান রাস্তায় নেমে দাঁড়িয়েছে৷ এবং সেইখানেই চরম ভুল করল ব্লেক৷ ডার্কসনের দিক থেকে নজর সরিয়ে সে তাকাল মরগ্যানের দিকে৷
মরগ্যান তখন .৪৫ বাগিয়ে ধরে বেড়ালের মতো নিঃশব্দ, ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে চলেছে ট্রাকের জানলার দিকে৷
ওদিকে ডার্কসন জিনির শরীরের ওপর ঝুঁকে পড়েছে কিন্তু তখনও ওকে স্পর্শ করেনি৷ হয়তো তার মনের কোণায় ক্ষীণ সন্দেহ ছিল যে এই দুর্ঘটনার ব্যাপারটায় কোথাও একটা গোঁজামিল আছে৷ হয়তো তার সামান্য সন্দেহ হল যে কেউ তার গতিবিধির ওপর নজর রাখছে৷ হঠাৎই মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকাল ডার্কসন৷
মরগ্যান ইতিমধ্যে ট্রাকের জানলায় উঠে পড়েছে৷ ওর হাতের রিভলভার বিচলিত, হতবুদ্ধি টমাসের মাথা লক্ষ করে স্থির৷
আচমকা উঠে বসল জিনি৷
ডার্কসন বিদ্যুৎ ঝলকের মতো ঘুরে দাঁড়াল৷ ওর ডান হাত কাটারির মতো আছড়ে পড়ল জিনির রিভলবার-ধৃত হাতে! ব্যাপার-স্যাপার বুঝে ওঠার আগেই জিনির হাত থেকে রিভলভার ছিটকে পড়েছে রাস্তায়৷ প্রায় একই সঙ্গে ডার্কসনের বাঁ হাতের প্রচণ্ড আঘাতে মুখ থুবড়ে উলটে পড়ল ও৷ ডান হাতের এক আপাত অদৃ্শ্য আন্দোলনে কোমরের খাপ থেকে রিভলভার বের করে আনল ডার্কসন৷ অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্র গতিতে চোখের পলক ফেলার আগেই ঘটে গেল ব্যাপারটা৷
উত্তেজিত শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ অনুভবের সঙ্গে সঙ্গে রাইফেলের ট্রিগার টিপল ব্লেক! মরগ্যানের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ট্রিগারে চাপ দেওয়ার বদলে হ্যাঁচকা টান মারল সে৷ ঝাঁকুনির ফলে রাইফেলের নল হয়ে পড়ল ঈষৎ ঊর্ধ্বমুখী এবং একই মুহূর্তে হল তার বিস্ফোরণ৷ সুতরাং কোনওরকম ক্ষতি না করেই ডার্কসনের মাথার অনেক ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেল গুলিটা৷
ব্লেকের গুলি চালানোর সঙ্গে সঙ্গে ট্রাকের মধ্যে হতবুদ্ধি হয়ে বসে থাকা টমাস পাশে ঝাঁপ দিল৷ ওর হাত ছোবল মারল ড্যাশবোর্ডের বোতাম তিনটের দিকে৷
মরগ্যান সরাসরি ওর মুখ টিপ করে গুলি করল!
একই সঙ্গে ডার্কসন মরগ্যানের দিকে তাক করে গুলি চালাল৷ সেই মুহূর্তে জিনি আঘাত করল ডার্কসন রিভলভার ধরা হাতে৷ ডার্কসনের লক্ষ সামান্য বিচলিত হলেও বিফলে গেল না৷ কারণ তার হাতের আঘাতে আচ্ছন্ন জিনির শক্তি তখন নিঃশেষিত৷
মরগ্যান তার পাঁজরে অনুভব করল এক বিরাট ধাক্কা, পরমুহূর্তেই বুক খাক করে দেওয়া এক জ্বলন্ত যন্ত্রণা৷ গুলির আচমকা সংঘর্ষে সে পড়ে গেল রাস্তায়, কিন্তু খুব সহজেই নিজেকে সামলে নিয়ে স্থির লক্ষ্যে গুলি করল ডার্কসনকে৷ জিনি তখন কোনও রকম ডার্কসনের রিভলভার ধরা হাত আঁকড়ে ঝুলছে৷
অনিবার্যভাবে মরগ্যানের গুলি সরলরেখায় গিয়ে আঘাত করল প্রহরীর কপালে, এবং মুহূর্তে মৃত ডার্কসনের নিষ্প্রাণ দেহটা জিনিকে নিয়ে আছড়ে পড়ল রাস্তায়৷
যন্ত্রণায় দাঁতে দাঁত চেপে ট্রাকের গা-ধরে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ল মরগ্যান৷ উঠেই দেখল, আহত, অবসন্ন টমাসের ডান হাত অতিকষ্টে ড্যাশবোর্ড আঁকড়ে এগিয়ে চলেছে একটা বোতামের দিকে৷ মরগ্যান কিছু একটা করে ওঠার আগেই টমাসের অনুসন্ধানী আঙুল খুঁজে পেল বোতামটা, এবং বোতামে চাপ দিল৷
মুহূর্তে ইষ্পাতের চাদরে ঢাকা পড়ে গেল গোটা ট্রাকটা৷ কেউ ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ট্রাকটা পরিণত হল একটা নিশ্ছিদ্র ইষ্পাতের বাক্সে৷
একটা মুখখিস্তি করে টলতে টলতে সোজা হয়ে দাঁড়াল মরগ্যান৷ আক্রোশ হতাশায় .৪৫-এর বাঁট দিয়ে সজোরে আঘাত করল ইস্পাতের পরদায়৷ সংঘর্ষের ধাতব শব্দ মরগ্যানকে ব্যঙ্গ করে যেন হেসে উঠল৷ হাঁপাতে হাঁপাতে চারপাশে তাকাল সে৷ এমন সময় ট্রাকের ভেতরে শোনা গেল গুরুভার কিছু পতনের শব্দ—সেই সঙ্গে একটা চাপা-অস্ফুট আর্তনাদ৷ সম্ভবত নিজের আসন থেকে ট্রাকের মেঝেতে গড়িয়ে পড়েছে টমাস৷
ঝোপের আড়াল ছেড়ে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে এল ব্লেক৷ দু-হাতে অটোমেটিক রাইফেলটা সে খামচে ধরে আছে—মুখে একরাশ অন্ধকার এসে ভিড় করেছে৷
মরগ্যান পায়ের শব্দে ঘুরে তাকাল তার দিকে৷ মরগ্যানের চোখে চোখ পড়তেই অজানা আতঙ্কে থমকে দাঁড়াল ব্লেক—যেন জমাট পাথরের মূর্তি৷
‘শালা কুত্তির বাচ্চা!’ হিংস্র স্বরে খেঁকিয়ে উঠল মরগ্যান, ‘তোকে আমি খুন করে ফেলব৷’
রাইফেল ফেলে দিয়ে দু-হাত শূন্যে রেখে অনুনয়ের ভঙ্গিতে বোঝাতে চাইল ব্লেক৷ প্রাণভয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘ফ্র্যাঙ্ক, বিশ্বাস করো, আমি ওকে মারতে চেয়েছি, কিন্তু মাছিটা গোলমাল থাকায় ফসকে গেছে, তারপর তো ট্রিগারটাই বিগড়ে গেল!’
হঠাৎ মরগ্যান অনুভব করল অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সে দুর্বল হয়ে পড়েছে৷ কোটের বোতাম খুলে ফেলতেই চোখে পড়ল রক্তাক্ত জামাটা৷ ক্ষতস্থান ঘিরে এক বিশাল চক্রাকার দাগ তৈরি হয়েছে জামার ওপর৷
বেতালা পা-ফেলে দৌড়ে এল জিনি৷ জ্বলন্ত গাড়ির আঁচে ওর মুখ টকটক করছে৷ বাদামি চুলের কয়েক গুচ্ছ পুড়ে গিয়ে জড়িয়ে গেছে৷
‘খুব বেশি লেগেছে?’ চিন্তিতভাবে প্রশ্ন করল জিনি৷
‘ও কিছু নয়!’ তাচ্ছিল্যভরে উত্তর দিলেও মরগ্যানের মাথা ঝিমিঝিম করতে লাগল, একটা শীতার্ত অনুভূতি তাকে আঁকড়ে ধরল৷ পকেট থেকে বাঁশিটা বের করে জিনির প্রসারিত হাতে গুঁজে দিল সে, ‘শিগগির ডাকো কিটসনকে!’
জিনি বাঁশিতে ফুঁ দিল : লম্বা একটানা কর্কশ সুরে বাজাল বাঁশিটা৷ কয়েক মুহূর্ত থেমে একই সুরের পুনরাবৃত্তি করল ও৷
‘টমাস? টমাসের কী হল?’ মরগ্যান ট্রাকের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াতেই প্রশ্ন করল জিনি৷ ও পরিষ্কার শুনতে পেল মরগ্যানের হালকা, কষ্টকৃত শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ৷
‘টমাসকে আমি শেষ করে দিয়েছি৷ একটা বোতাম ও টিপেছে বটে, কিন্তু অন্য দুটোর নাগাল পায়নি—তার আগেই ওর গড়িয়ে পড়ার শব্দ আমার কানে এসেছে৷’
ব্লেক ইতিমধ্যে মরগ্যানের কাছে এগিয়ে এসেছে, কিন্তু হতবুদ্ধি হয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল৷ হঠাৎই যেন সম্বিত ফিরে পেয়ে সে বলে উঠল, ‘ফ্র্যাঙ্ক! তোমার বুক থেকে রক্ত পড়ছে!’
‘সরে যা আমার সামনে থেকে—শালা, ভেড়ুয়া কোথাকার৷’ দাঁত খিঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল মরগ্যান, তোর জন্যেই আমাদের সমস্ত মতলব ফেঁসে গেল৷ এখন আমরা ডুবতে বসেছি৷’
‘না৷’ তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠল জিনি, ‘এখনও একটা উপায় আছে৷ এদিকে এসো, ফ্র্যাঙ্ক, বসো৷ আগে তোমার রক্তটা বন্ধ করি!’
মরগ্যান বসতেই জিনি টান মেরে খুলে ফেলল তার কোট ও শার্ট৷
ব্লেক একইভাবে দাঁড়িয়ে শূন্য চোখে চেয়ে রইল—যেন ঘটনাগুলোর আকস্মিকতায় তার বুদ্ধিভ্রংশ হয়েছে৷
মরগ্যান বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, হাঁ করে দাঁড়িয়ে কী দেখছ? যাও, যা হোক কিছু একটা করো৷’
জিনি প্রথমে মরগ্যানের ক্ষতটা পরীক্ষা করে দেখল—প্রায় ইঞ্চি তিনেক লম্বা একটা চেরা দাগ৷ অল্পের জন্যে গুলি পাঁজর ভেদ করে যায়নি৷ চটপট স্কার্ট তুলে পেটিকোটের সেলাই বরাবর লম্বা এক ফালি কাপড় ছিঁড়ে নিল জিনি৷ তারপর মরগ্যানের শার্টটা নিয়ে রক্ত-ভেজা অংশটা ছিড়ে বাদ দিল৷ বাকি কাপড়টা ভাঁজ করে একটা নরম প্যাডের মতো করে মরগ্যানের ক্ষতস্থানে চাপা দিল, সেটাকে কাপড়ের ফালিটা দিয়ে শক্ত করে বাঁধল৷
‘যাক, এতেই মোটামুটি কাজ হবে৷ তবে ফন হ্রদে পৌঁছনো মাত্রই এটার উপযুক্ত চিকিৎসা করাতে হবে৷ কেমন লাগছে এখন?’
মরগ্যান আস্তে আস্তে সোজা হয়ে দাঁড়াল৷ কোটটা গায়ে দিতে গিয়ে যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করল, ‘আমি ঠিক আছি৷ কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করা বন্ধ করো৷’ চোখ তুলে ট্রাকের দিকে তাকাল মরগ্যান, ‘আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেল৷ এখন আর ট্রাকটাকে ক্যারাভ্যানে ঢোকানো সম্ভব নয়—এদিকে সময়ও চলে যাচ্ছে৷ চলো পালাতে হলে আর দেরি করা ঠিক হবে না—শিগগির!’
ঠিক সেই মুহূর্তে ক্যারাভ্যান ও বুইক নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হল কিটসন৷ ঝড়ের গতিতে গাড়ি চালিয়ে ওদের কাছাকাছি এসে থমকাল সে৷ বিবর্ণ, উৎকণ্ঠা ভরা মুখে বুইক থেকে নামল কিটসন৷ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে একবার তাকাল ট্রাকের দিকে, তারপর মরগ্যানের দিকে৷
একটা ঝোপের পিছনে ডার্কসনের মৃতদেহটা লুকিয়ে ফেলে ব্লেক ফিরে এল৷
‘কী হয়েছে?’ উত্তেজিতভাবে প্রশ্ন করল কিটসন, ‘যেন গুলির শব্দ শুনলাম৷’
‘সর্বনাশ হয়ে গেছে!’ মরগ্যান জবাব দিল, ‘এক্ষুনি আমাদের পালাতে হবে৷’
‘দাঁড়াও৷’ ওদের বাধা দিয়ে বলে উঠল জিনি, ‘এখনও একটা উপায় আছে৷ বুইকটা চেষ্টা করলে ট্রাকটাকে ঠেলে ক্যারাভ্যানে তুলতে পারে৷ আমার মনে হয় তা অসম্ভব নয়৷ আমরা একবার শেষ চেষ্টা করে দেখব৷ দশ লাখ ডলারের ট্রাকটাকে বিনা চেষ্টায় হাতছাড়া করতে আমি রাজি নই৷’
মরগ্যান চোখ কুঁচকে তাকাল জিনির দিকে, ‘হুঁ তাইতো… শালা, আমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? নিশ্চয়ই পারা যাবে৷’ কিটসনের দিকে ফিরে তাকাল সে, ‘আলেক্স, চটপট ক্যারাভ্যানটাকে বুইকের ল্যাজ থেকে ছাড়িয়ে নাও৷’
ঘটনাবলির সম্পর্কে অন্ধকারে থাকলেও মরগ্যানের স্বরের তীক্ষ্ণতা কিটসনের কান এড়াল না৷ হতভম্ব হয়ে সে ছুটে গেল ক্যারাভ্যানের দিকে৷ বুইক থেকে ওটাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল শেকল খুলে৷
ব্লেককে লক্ষ করে গর্জে উঠল মরগ্যান, ‘যাও, ওকে সাহায্য করো! জিনি বুইকটাকে চালিয়ে নিয়ে গেল ট্রাক ছাড়িয়ে তারপর ব্যাক গিয়ার দিয়ে গাড়িটাকে আস্তে আস্তে পিছিয়ে এনে স্পর্শ করল ট্রাকের গায়ে৷ অর্থাৎ বুইকের পিছনের বাম্পার ও ট্রাকের পিছনের বাম্পার পরস্পরকে স্পর্শ করে রইল৷
কিটসন ও ব্লেক ক্যারাভ্যানটাকে টানতে টানতে নিয়ে এল ট্রাকের সামনের দিকে৷
‘এক কাজ করো এড, ক্যারাভ্যানের চাকার সামনে কয়েকটা আধলা ইঁট বসিয়ে দাও, যাতে ওটা নড়তে না পারে৷’ মরগ্যান নির্দেশ দিল, ‘আর শাবল দুটো বের করে আনো৷ ও দুটো দিয়ে ক্যারাভ্যানের সামনেটা ঠেকা দাও—যাতে ট্রাকটা ফেলে তোলার সময় ওটা উলটে না যায়!’
ঝড়ের বেগে কাজ করে চলল কিটসন৷ মুহূর্তের মধ্যে কতকগুলো বড়-বড় পাথরের টুকরো তুলে ক্যারাভ্যানের চাকা ও রাস্তার ফাঁকে গুঁজে দিল সে৷ ওদিকে শাবল দুটো দিয়ে ব্লেক ক্যারাভ্যানের সামনেটায় জোরালো ঠেকা দিয়েছে—যাতে ওটা উল্টে না যায়৷
‘ঠিক আছে৷’ জিনির দিকে হাতের ইশারা করল মরগ্যান৷
কিটসন ট্রাকের সামনের দিকে এসে দাঁড়াতেই মরগ্যান ক্যারাভ্যানের পিছনের দরজা খুলে দিল৷
‘সাবধান! ধীরে ধীরে জোর বাড়বে৷’ জিনিকে উদ্দেশ্য করে বলল সে৷ বুইকের ইঞ্জিন চালু করে ট্রাকটাকে ঠেলতে শুরু করল জিনি৷ ট্রাকের হ্যান্ড ব্রেক দেওয়া থাকলেও বুইকের ক্রমবর্ধমান চাপে নড়তে শুরু করল ট্রাকটা৷
কিটসন ও ব্লেক ট্রাকটাকে ক্যারাভ্যানের পাটাতন বেয়ে ঠিকমতো তোলার জন্যে ওটার সামনের চাকা জোড়ায় মুহুর্মুহু লাথি মেরে ট্রাকের গতিপথ ঠিক রাখল৷ ধীরে ধীরে ট্রাকটা ঢুকে পড়ল ক্যারাভ্যানে৷ ওটাকে শেষ বারের মতো ধাক্কা দেওয়ার জন্যে বুইকটা ঠেলতে ঠেলতে উঠে গেল ক্যারাভ্যানের পাটাতনে৷
‘থামো’ মরগ্যান ডেকে বলল জিনিকে, ‘কাজ হয়ে গেছে৷ এড, শিগগির শাবল দুটো আর রাইফেলটা গুছিয়ে নাও৷ কিটসন, চটপট বুইকের সঙ্গে ক্যারাভ্যানটাকে জুড়ে দাও৷ জলদি৷ আমাদের হাতে নষ্ট করার মতো একমুহূর্তে সময় নেই৷’
জিনি বুইকটা ঘুরিয়ে চালিয়ে নিয়ে এল ক্যারাভ্যানের সামনের দিকে, তারপর গাড়িটা পিছিয়ে ক্যারাভ্যানের কাছ ঘেঁষে থামতেই কিটসন দুটোকে আবার শেকল দিয়ে আগের মতো জুড়ে দিল৷
জিনি চালকের আসন থেকে সরে বসতেই কিটসন বুইকে উঠে বসল, স্টিয়ারিং ধরল৷ গাড়ি ও ক্যারাভ্যানকে বৃত্তাকারে ঘুরিয়ে যেদিক থেকে জিপোর আসার কথা সেদিকে মুখ করে দাঁড়াল৷
মরগ্যান ও ব্লেক লাফিয়ে ঢুকল ক্যারাভ্যানের ভেতরে৷
কিন্তু ট্রাকটা যে এতটা জায়গা নিয়ে নেবে সেটা ওরা ভাবতেই পারেনি৷ কারণ ট্রাক ও ক্যারাভ্যানের মাঝে পাশের দিকে দেড় ফুট এবং পিছনে মাত্র ফুট দুয়েক জায়গা রয়েছে৷ বিস্ময় ও সংশয় ওদের মস্তিষ্ক আচ্ছন্ন করে তুলতে চাইল৷
আগে থেকেই ঠিক ছিল মরগ্যান ও ব্লেক ট্রাকের সামনে ড্রাইভারের কেবিনে বসবে৷ কিন্তু ঘটনাচক্র বাধ্য করেছে পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে৷ সুতরাং বাধ্য হয়েই ওদের চলতে হবে ক্যারাভ্যানের দেওয়াল ও ট্রাকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে৷ নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক এবং অনিশ্চয়তায় ভরা প্রচণ্ড ঝুঁকি৷ কিন্তু ওরা নিরুপায়৷ কিটসন যদি দ্রুতবেগে কোনও বাঁক নেয় তাহলে ট্রাকটা ছিটকে সরে আসতে পারে ক্যারাভ্যানের দেওয়ালের দিকে, হয়তো, থেঁতলে দেবে ওদের দেহকে৷
ক্যারাভ্যানে উঠেই মরগ্যান বলল, ‘সাবধান৷ যে কোনও মুহূর্তেই ট্রাকটা সরে আসতে পারে৷ তাহলে…’
কিটসন গাড়ি ছেড়ে উঠে এসেছে ক্যারাভ্যানের দরজা বন্ধ করতে৷ ও মরগ্যানের কথায় ঘাড় নাড়ল, ‘ঠিক আছে, আমি সেদিকে লক্ষ রাখব—’
‘এক কাজ করলে হতো না?’ ইতস্তত করে বলেই ফেলল ব্লেক, ‘ট্রাকের চাকাগুলোকে পাথরের টুকরো দিয়ে আটকে দিলে কেমন হয়?’
‘না, না—ওসবের কোনও সময় নেই৷’ খেঁকিয়ে উঠল মরগ্যান, ‘দোহাই তোমার, ভেতরে ঢুকে এসো৷ কিটসন, গাড়ি ছেড়ে দাও জলদি৷’
হাতলে চাপ দিয়ে ক্যারাভ্যানের দরজা বন্ধ করে কিটসন ছুটে গিয়ে বসল বুইকের চালকের আসনে৷
জিনি ততক্ষণ ওর রক্তমাথা স্কার্ট, ব্লাউজ খুলে ফেলে নতুন একটা ধুসর পোশাক পরে নিয়েছে৷
কিটসন আড়চোখে ওকে দেখল, জিনির মুখমণ্ডলে মৃতের ছায়া৷ গিয়ার দিয়ে গাড়ি ছোটাল কিটসন৷ অনুভব করল, ট্রাকসুদ্ধ ক্যারাভ্যানটা টানতে গিয়ে বুইকের ক্ষমতা কমে আসতে চাইছে৷
ব্লাউজ পরে স্কার্টের চেন টেনে বন্ধ করতেই জিনিকে শুধোল কিটসন, ‘কী হয়েছিল?’
শঙ্কিতস্বরে পুরো ব্যাপারটা সংক্ষেপে কিটসনকে জানাল ও৷
‘তার মানে ট্রাকের ভেতরে একটা লোক মরে পড়ে রয়েছে?’ ভীষণ ভয় পেল কিটসন৷
‘যদি সে মরে না থাকে, তাহলে এতক্ষণে বেতারে সংকেত পাঠিয়ে আমাদের বিপদে ফেলত৷ মরগ্যান তো বলেছে যে ও টমাসকে একেবারেই শেষ করে দিয়েছে! কী জানি৷’
‘তাহলে একটা মড়াকে সঙ্গে বয়ে আমরা ক্যারাভ্যানের ঘাঁটিতে যাচ্ছি?’
‘ওঃ, তুমি থামবে?’ ভাঙা উত্তেজিত স্বরে ওকে বাধা দিল জিনি৷ তারপর পাশ ফিরে মুখ ঢুকল দু-হাতে৷
ওদিকে ক্যারাভ্যানের ভেতরে শান্তভাবে তার দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে ফ্র্যাঙ্ক মরগ্যান৷ নিরাপত্তার প্রয়োজনে পা-দুটো ঠেসে ধরেছে ট্রাকের পিছনের চাকায় তার মনের ভেতরে বয়ে চলেছে অশান্ত ঢেউ…
যাক, শেষ পর্যন্ত তাহলে কাজটা হল৷ এখন বাকি কাজটা ঠিকমতো সারতে পারলেই হয়৷ এর জন্যে দু-দুজন লোককে আমি খুন করেছি৷ অবশ্য সেটা তাদের নিয়তি৷ নাঃ, টমাস, ডার্কসনের সাহস আছে৷ বিশেষ করে ড্রাইভারটার৷ কারণ সে জানত যে আমার রিভলভারের সামনে সামান্যতম বেচাল মানেই মৃত্যু৷ কিন্তু তবুও সে বোতাম টেপার চেষ্টা করেছে৷ নাঃ, আমি হলে অন্তত সে চেষ্টা করতাম না৷ অথচ টমাস তাই করেছে—এবং আংশিকভাবে সফলও হয়েছে৷ এই ইস্পাতের চাদর নিয়ে এখন আমাদের প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাটে পড়তে হবে৷ তাছাড়া টমাসের দেহটাও পড়ে আছে ট্রাকের ভেতর৷ বাইরের পাটাতন ভেঙে ওর দেহটা আমাদের বের করতে হবে৷ মনে হয় টমাস মারাই গেছে৷ কিন্তু তা যদি না হয়, তাহলে? হয়তো জ্ঞান ফিরে এলে ও বেতারে সংকেত পাঠাতে চেষ্টা করবে এবং সেই সঙ্গে আমাদের বাড়া ভাতে ছাই দেবে!
মজবুত ইস্পাতের ট্রাকটার দিকে চোখ রাখল মরগ্যান৷ ভাবল, সামান্য ইস্পাত-প্রাচীরের ওপিঠেই রয়েছে তার এতদিনের স্বপ্ন—দশ লক্ষ ডলার৷ তার হাতের এত কাছে স্বর্ণমৃগের মাদকতাময়, নেশা-ধরানো, উপস্থিতি মরগ্যানকে ভুলিয়ে দিল তার বুকের ক্রমবর্ধমান, অসহ্য যন্ত্রণার কথা৷ সে যেন একটা ঘোরের মধ্যে আকণ্ঠ ডুবে আছে৷
মরগ্যানের চোখের আড়ালে, ট্রাকের অন্য দিকে নিচু হয়ে বসে আছে ব্লেক৷ ওর চোখ দুটো ট্রাকের গায়ে আঠার মতো আটকে আছে—লক্ষ করছে ট্রাকের প্রতিটি সূক্ষ্ম আন্দোলন৷ অধীর সংশয়ে তার চোখ-মুখে দুঃস্বপ্নের ছায়া—এই বুঝি ছিটকে এল তার দিকে৷
এখন ব্লেক তার সাহস ফিরে পেয়েছে—কিন্তু দু-দুবারের ব্যর্থতার গ্লানি সে যেন কিছুতেই ভুলতে পারছে না৷
ট্রাকটাকে ওরা হাতিয়েছে অথচ পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্লেককে কোনও খুন করতে হয়নি৷ ব্লেক স্বস্তির শ্বাস নিল৷ ওঃ, একটুর জন্যে সে তার অপরাধ জীবনের চরম অপরাধ থেকে রক্ষা পেয়েছে৷ প্রথম থেকে এই খুন করার ভাবনাটা তার সমস্ত সাহস শুষে নিয়েছে৷ কিন্তু এখন যে কোনও পরিস্থিতির জন্যেই সে সম্পূর্ণ প্রস্তুত৷ এমনিতে ভীরু বা কাপুরুষ সে নয়; অথচ ব্লেক জানে এ ঘটনার পর মরগ্যান তাকে আর একটি মুহূর্তের জন্যেও বিশ্বাস করবে না৷ সুতরাং ব্লেককে ফ্র্যাঙ্কের ওপর নজর রাখতে হবে৷ ব্লেক নিজের দু-লাখ টাকা অত সস্তায় ছাড়তে রাজি নয়৷
মাইল ছয়েক গাড়ি ছোটাবার পর কিটসন দেখল জিপো দ্রুতপায়ে রাস্তা ধরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে৷
কিটসন গাড়ি থামাতেই সে ছুটে এল বুইকের কাছে৷
‘কী হল? সব ঠিক আছে তো?’ গোল গোল চোখ করে প্রশ্ন করল জিপো, ‘কোনও গোলমাল হয়নি?’
‘না, সব ঠিক আছে৷ যাও, ক্যারাভ্যানের ভেতর ঢুকে পড়ো৷’
হাতল ঘুরিয়ে বুইক থেকে নেমে ক্যারাভ্যানের দরজার দিকে এগিয়ে গেল কিটসন৷ জিপোকে ডাকল ‘এসো এদিকে৷’
জিপো ক্যারাভ্যানের ভেতর উঁকি মারতেই তার চোখ পড়ল মরগ্যানের ওপর৷
‘সব ঠিক আছে তো, ফ্র্যাঙ্ক?’ মরগ্যান যন্ত্রণায় ঠোঁট টিপে বসে—মুখে ধূসর পাণ্ডুর প্রলেপ৷ জিপোর কথায় কোনওরকমে অস্ফুট স্বরে সে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ…এখন চলো! এসো, চটপট ভেতরে ঢুকে পড়ো জিপো৷’
হঠাৎই থমকে দাঁড়াল জিপো৷ স্থির অবাক চোখে সে বলে উঠল, ‘তুমি এখানে কী করছ, ফ্র্যাঙ্ক? তোমার তো ট্রাকের ভেতর বসার কথা?’
‘ভেতরে এসো৷’ গর্জে উঠল মরগ্যান ‘নষ্ট করার মতো সময় আমাদের নেই৷’
‘না! আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল জিপো৷ বিস্ফারিত চোখে চাইল কয়েক পা পিছিয়ে যেতে যেতে, ‘ওভাবে আমি ক্যারাভ্যানে চড়তে পারব না৷ ট্রাকটা যদি সামান্য নড়ে তাহলেই তোমরা মাছির মতো থেঁতলে মারা যাবে!’
মরগ্যান তার কাঁধে ঝোলানো খাপ থেকে বের করে আনল .৪৫টা৷ রিভলভার বের করার সময় তার কোট খানিকটা সরে গেল৷ জিপোর চোখে পড়ল, মরগ্যানের বুকে আড়াতাড়িভাবে বাঁধা রক্তে-ভেজা পট্টিটা৷
‘এসো ভেতরে!’ রিভলবার উঁচিয়ে খেঁকিয়ে উঠল মরগ্যান৷
কিটসন জিপোকে ধরে এক ধাক্কা মারল৷ জিপো ছিটকে গিয়ে পড়ল ক্যারাভ্যানের ভেতরে৷ সঙ্গে সঙ্গে কিটসন দৌড়ে গেল সামনের দিকে৷ হাতলে চাপ দিতেই বন্ধ হয়ে গেল ক্যারাভ্যানের দরজা৷
তারপর চালকের আসনে বসে গাড়ি চালু করল সে৷
গাড়ি এবং ক্যারাভ্যান হাওয়ার বেগে ছুটে চলল প্রধান সড়কের দিকে৷
