চতুর্থ পরিচ্ছেদ
১
২৫শে আগস্টের সকাল বয়ে নিয়ে এলো উজ্জ্বল নির্মেঘ দিনের আশ্বাস৷ এমন সুন্দর সকাল কোন চূড়ান্ত অলসকেও বিছানা ছাড়তে লোভ দেখায়৷
জলি রজারের অনেকেই আজ সকাল সকাল উঠেছেন৷
সাজের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বাদামী রঙের মোটা বাঁধানো বইটা খোলা অবস্থাতেই উপুড় করে রাখলো লিন্ডা৷ তারপর তাকালো আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে৷ সকাল এখন আটটা৷
ওর ঠোঁট জোড়ায় এক অদ্ভুত দৃঢ়তা, চোখের তারা স্বাভাবিকের চেয়ে ঈষৎ সঙ্কুচিত৷
ও রুদ্ধশ্বাসে উচ্চারণ করলো, ‘আমাকে পারতেই হবে…’
পাজামা ছেড়ে সাঁতারের পোশাক পরে নিলো লিন্ডা৷ তার ওপরে পরলো স্নানের ঢোলা পোশাক৷ ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দা ধরে চলতে শুরু করলো ও৷ বারান্দার শেষে একটা দরজা খুলতেই দেখা গেলো একটা ঘোরানো লোহার সিঁড়ি সোজা নেমে গেছে নিচের পাথুরে জমিতে৷ সেখান থেকে একটা ঝোলানো লোহার মই নেমে গেছে সমুদ্রের জলে৷ প্রাত্যহিক প্রাতরাশ সেরে নেবার আগে হোটেলের যে সব অতিথিরা একটু শরীর ভিজিয়ে নিতে চান, তাঁরাই সময় সংক্ষেপ করার জন্য প্রধান সৈকতে না গিয়ে এ মইটা ব্যবহার করেন৷
লিন্ডা যখন বারান্দা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামছে, তখন ও মুখোমুখি হলো ওর বাবা সঙ্গে, তিনি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছিলেন৷ ওকে দেখে বললেন, ‘আজ সকাল সকাল উঠেছ দেখছি৷ স্নান করতে যাচ্ছো বুঝি?’
লিন্ডা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো৷
ওরা পরস্পরকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো৷
কিন্তু ঝোলানো মইয়ের দিকে না এগিয়ে হোটেলকে ঘিরে বাঁ পাশ দিয়ে যে পথটা কংক্রিটের সেতুর দিকে চলে গেছে, সে পথ ধরলো লিন্ডা৷ জোয়ারের কারণে সেতু এখন জলের নিচে, কিন্তু অতিথিদের পারাপারে নেকোটা কাছেই পাড়ে বাঁধা রয়েছে৷ ওটার দায়িত্ব যাঁর ওপর, তাঁকে কাছাকাছি কোথাও দেখা গেলো না৷ লিন্ডা নৌকোয় উঠে বাঁধন খুলে নৌকো ছেড়ে দিলো৷
ওপারে পৌঁছে, পাড়ে নৌকো বেঁধে ও ঢালু পথ বেয়ে এগিয়ে চললো… হোটেলের গ্যারেজ ছাড়িয়ে থামলো এসে ছোট দোকানটার কাছে৷
দোকানের মহিলাটি তখন সবেমাত্র দোকান খুলে ঘর ঝাঁট দিতে শুরু করেছে৷ লিন্ডাকে দেখে সে রীতিমতো অবাক হলো৷
‘আপনি আজ খুব সকাল সকাল উঠেছেন, মিস৷’
লিন্ডা স্নান-পোশাকের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনলো কিছু টাকা৷ তারপর কেনাকাটার মন দিলো৷
২
লিন্ডা যখন ফিরে এলো তখন ক্রিস্টিন রেডফার্ন ওর ঘরে দাঁড়িয়ে৷
‘ও, এই তো!’ বিস্মিত সুরে বললো ক্রিস্টিন, ‘আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো এখনও ঘুম থেকে ওঠোনি৷’
‘না, স্নান করতে গিয়েছিলাম৷’ লিন্ডা বললো৷
ওর হাতের প্যাকেটটা লক্ষ্য করলো ক্রিস্টিন, একটু অবাক হয়ে বললো, ‘পিয়ন আজ বেশ তাড়াতাড়িই ডাক বিলি করে গেছে দেখছি৷’
লিন্ডা চমকে উঠলো৷ ওর স্বভাবসিদ্ধ অগোছালো প্রকৃতির জন্য কাগজের প্যাকেটটা ওর হাত ফস্কে পড়ে গেলো মেঝেতে৷ পলকা সুতোটা ছিঁড়ে গিয়ে ভেতরে কয়েকটা জিনিস গড়িয়ে পড়লো বাইরে৷
ক্রিস্টিনের চোখে ফুটে উঠলো বিস্ময়৷
‘তুমি মোমবাতি কিনেছো কিসের জন্যে?’
কিন্তু লিন্ডার সৌভাগ্যবশত ক্রিস্টিন ওর উত্তরের অপেক্ষা করলো না৷ ওকে সাহায্য করতে মেঝে থেকে জিনিসগুলো তুলতে তুলতে বলে চললো, ‘জানতে এসেছিলাম, তুমি আমার সঙ্গে গাল কোভে যাবে কি না? আমি আজ সেখানে ছবি আঁকতে যাবো৷’
লিন্ডা বিনাদ্বিধায় সম্মতি জানালো৷
গত কয়েকদিনে ও একাধিকবারই ক্রিস্টিনকে ওর চিত্রাঙ্কন-অভিযানে সঙ্গ দিয়েছে৷শিল্পী হিসেবে ক্রিস্টিন খুব উঁচুদরের না হলেও লিন্ডার ধারণা, সম্ভবত এই ছবি আঁকার কপট অজুহাতই ওর অহঙ্কারকে এখনও অক্ষুণ্ণ রেখেছে৷ কারণ ওর স্বামী দিনের বেশিরভাগ সময়ই আর্লেনা মার্শালের সান্নিধ্যে কাটিয়ে দেয়৷
লিন্ডা দিনের পর দিন ক্রমশ খিটখিটে এবং বদ-মেজাজী হয়ে পড়ছে৷ ক্রিস্টিনের সঙ্গে সময় কাটাতে ওর ভালো লাগে, কারণ ক্রিস্টিন ছবি আঁকার সময় গভীর মনোযোগে ডুবে থাকে, এবং অত্যন্ত কম কথা বলে৷ তাতে লিন্ডা একরকম নিঃসঙ্গ তার স্বাদ অনুভব করে, অথচ ওর মনের মধ্যে থাকে কারও সঙ্গ লাভের এক অদ্ভুত আকুলতা৷ ওদের পরস্পরের প্রতি কেমন যেন একটা সূক্ষ্ম সহানুভূতির যোগ রয়েছে, সম্ভবত বিশেষ একজনকে সমানভাবে অপছন্দ করার মধ্যেই এর কারণ লুকিয়ে আছে৷
ক্রিস্টিন বললো, ‘বারোটায় আমি টেনিস খেলতে যাবো, তাই একটু তাড়াতাড়ি বেরোলেই ভালো হয়৷ ধরো, সাড়ে দশটা?’
‘ঠিক আছে, আমি তৈরি হয়ে থাকবো৷ হলঘরেই তাহলে আপনার সঙ্গে দেখা হবে৷’
৩
অত্যন্ত দেরিতে প্রাতরাশ সেরে রোজামন্ড ডার্নলি খাবার ঘর ছেড়ে শ্লথ পায়ে বেরোতেই সিঁড়ি বেয়ে ত্বরিত নেমে আসা লিন্ডার সঙ্গে ওর ধাক্কা লাগলো৷
‘ওহ—দুঃখিত, মিস ডার্নলি৷’
রোজামন্ড বলল, ‘চমৎকার সকাল, তাই না? গতকালের পর এরকম একটা দিন বিশ্বাসই করা যায় না৷’
‘ঠিক বলেছেন৷ আমি মিসেস রেডফার্নের সঙ্গে গাল কোভে যাচ্ছি৷ সাড়ে দশটায় তাঁর সঙ্গে দেখা করবার কথা৷ ভাবছিলাম, হয়তো দেরিই হয়ে গেলো৷’
‘না, না—এখন সবে দশটা পঁচিশ৷’
‘যাক—তাহলে নিশ্চিন্ত৷’
লিন্ডাকে একটু হাঁপাতে দেখে রোজামণ্ড উৎসুক হয়ে তাকালো ওর দিকে।
‘তোমার জ্বর হয়নি তো, লিন্ডা?’
লিন্ডার চোখ অস্বাভাবিক উজ্জ্বল এবং ওর দু গালে লালচে আভা বেশ স্পষ্ট৷
‘কই—না তো৷ আমার কখনও জ্বর হয় না৷’
রোজমন্ড হেসে বললো, ‘আজকের দিনটা এত সুন্দর যে আমি বিছানায় বসে প্রাতরাশ খাওয়ার পুরনো অভ্যেস ছেড়ে সটান নিয়ে চলে এসেছি৷ এবং বীরপুরুষের মতোই খাওয়ার টেবিলে ডিম ও বেকনের মুখোমুখি হয়েছি৷’
‘হ্যাঁ—গতকালের পর আজকের দিনটা সত্যি অপূর্ব৷ আর সকালের দিকে গাল কোভে খুব ভালো লাগে৷ আমি গিয়ে একরাশ তেল মেখে খোলা রোদে শুয়ে থাকবো—’
রোজামন্ড বললো, ‘হ্যাঁ, গাল কোভে সকালের দিকে ভালো লাগে৷ তাছাড়া জায়গাটা এখানকার সৈকতের তুলনায় অনেক শান্ত নির্জন৷’
লিন্ডা লাজুক স্বরে বলল, ‘আপনিও চলুন না৷’
রোজামণ্ড মাথা নাড়লো৷ বললো, ‘না, আজ কতকগুলো অন্য কাজ আছে৷’
ক্রিস্টিন রেডফার্ন সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো নিচে৷
ওর পরনে আবহাওয়া উপযোগী লম্বা হাতার ঢোলা পোশাক: সবুজ কাপড়ের ওপর হলদে কাজ করা৷ ওর গায়ের ফ্যাকাশে পাণ্ডুর রঙের সঙ্গে সবুজ এবং হলদে রঙটাই যে সবচেয়ে বেশি বেমানান, সে কথা বলার জন্য রোজামণ্ডের জিভ নিসপিস করিতে লাগলো৷ পোশাক সম্পর্কে কোন বোধশক্তি নেই, এমন কাউকে দেখলে রোজামন্ডের ভীষণ অস্বস্তি হয়৷
ও ভাবলো, ‘যদি এই মেয়েটাকে আমি মনের মতো করে সাজাতে পারতাম, তাহলে কয়েক দিনের মধ্যেই ওর স্বামী সচেতন হয়ে ঠিক ওর দিকে নজর দিতো৷ আর্লেনা বোকা হতে পারে, কিন্তু ও জানে নিজেকে কিভাবে সাজাতে হয়৷’
তারপর লিন্ডাকে ও বলল, ‘আশা করি সময়টা তোমার ভালই কাটবে৷ আমি একটা বই নিয়ে সানি লেজ-এর দিকে, যাচ্ছি৷’
৪
এরকুল পোয়ারো যথারীতি তাঁর ঘরে বসেই কফি ও রোল সহকারে প্রাতরাশ সারলেন৷
সকালের সৌন্দর্য তাঁকে অভ্যাস-নির্দিষ্ট সময়ের আগেই হোটেল ছাড়তে বাধ্য করলো৷ তিনি যখন সমুদ্রতীরে নেমে এলেন, তখন সবে দশটা—এখানে তাঁর দৈনন্দিন উপস্থিতির সময় হতে তখনও অন্তত আধ ঘণ্টা দেরি৷ শুধু একজন ছাড়া বেলাভূমিতে আর কাউকে তাঁর নজরে পড়লো না৷
সেই একজন আর্লেনা মার্শাল৷
আর্লেনার পরনে ওর প্রিয় সাদা সাঁতারের পোশাক, মাথায় সবুজ টুপি৷ ও একটা সাদা কাঠের ভেলাকে জলে ভাসানোর চেষ্টা করছিলো৷ পোয়ারো নির্দ্বিধায় ওকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে গেলেন এবং পরোপকারিতার পুরস্কারস্বরূপ নিজের ধবধবে সাদা জুতো জোড়াকে সমুদ্রের জলে স্নান করালেন৷
আর্লেনা ওর নিজস্ব তির্যক দৃষ্টিতে পোয়ারোকে ধন্যবাদ জানালো৷
ভেলায় চড়ে এগিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে আর্লেনা তাঁকে ডাকলো, ‘মঁসিয়ে পোয়ারো?’
পোয়ারো তৎপর ভঙ্গিতে নিমেষে জলের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ালেন৷
‘মাদাম!’
আর্লেনা বললো, ‘আমার জন্যে একটা কাজ করবেন?’
‘নিশ্চয়ই।’
ও পোয়ারোর দিকে চেয়ে হাসলো৷ তারপর মৃদু স্বরে বললো, ‘কাউকে বলবেন না আমি কোথায় আছি৷’ ওর চোখে অন্তর-স্পর্শ করা দৃ্ষ্টি, ‘নইলে প্রত্যেকেই আমার পেছু নেবে৷ আমি আজ একটু একা থাকতে চাই৷’
নিপুণ হাতে বৈঠা বেয়ে এগিয়ে চললো আর্লেনা৷
পোয়ারো সমুদ্রতীর ছেড়ে উঠে এলেন৷ আপনমনেই বিড়বিড় করতে লাগলেন, ‘উহুঁ, একেবারেই অসম্ভব! আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না৷’
আর্লেনা স্টুয়ার্ট, যদি মঞ্চের নামেই ওকে সম্বোধন করা যায়, জীবনে কখনও একা থাকতে চেয়েছে কিনা সে বিষয়ে তাঁর যথেষ্ট সন্দেহ আছে৷
অভিজ্ঞ এরকুল পোয়ারো সহজেই এর আসল কারণ অনুমান করলেন৷ আর্লেনা মার্শাল নিঃসন্দেহে কারও সঙ্গে দেখা করতে চলেছে, এবং কার সঙ্গে সে বিষয়েও পোয়ারোর মনে একটা সুস্পষ্ট ধারণা রয়েছে৷
কিন্তু মনে মনে ভাবলেও নিজের অনুমানকে ভ্রান্ত প্রমাণিত হতে দেখলেন পোয়ারো৷
কারণ সাদা ভেলাটা যেই পাহাড়ের বাঁকে অদৃশ্য হলো, তখনই তাঁর নজরে পড়লো, প্যাট্রিক রেডফার্ন লম্বা পা ফেলে হোটেলের দিক থেকে সমুদ্রতীরের দিকে নেমে আসছে—এবং তার ঠিক পেছনেই আসছেন কেনেথ মার্শাল৷
মার্শাল পোয়ারোকে দেখে ঈষৎ মাথা নোয়ালেন, ‘সুপ্রভাত, মঁসিয়ে পোয়ারো৷ আমার স্ত্রীকে দেখেছেন?’
পোয়ারো অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদের মতো জবাব দিলেন, ‘মাদাম তাহলে আজ সকালে উঠেছেন?’
মার্শাল বললেন, ‘ওকে ওর ঘরে দেখলাম না৷’ তিনি আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকালেন, ‘চমৎকার দিন৷ এখনই স্নানটা সেরে ফেলি৷ ফিরে গিয়ে আবার একগাদা কাগজ টাইপ করতে হবে৷’
প্যাট্রিক রেডফার্ন অপেক্ষাকৃত চাপা দৃষ্টিতে সমুদ্রতীরের দু-পাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো৷ তারপর পোয়ারোর পাশে বসে তার প্রেমিকার প্রতীক্ষা করতে লাগলো৷
পোয়ারো বললেন, ‘আর মাদাম রেডফার্ন? তিনিও কি ভোরে উঠেছেন?’
প্যাট্রির জবাব দিলো, ক্রিস্টিন? ও ছবি আঁকতে বেরোবে৷ ইদানীং দেখছি ওর ছবি আঁকার ঝোঁক বেড়ে গেছে৷’
প্যাট্রিক রেডফার্নের সুর অধের্য, এবং স্পষ্টই বোঝা গেলো তার মন পড়ে রয়েছে অন্য কোথাও৷ সময় যতই যেতে লাগলো, আর্লেনার জন্য তার অসহিষ্ণু ভাব ততই প্রকট হতে লাগলো৷ কোন পায়ের শব্দ শোনামাত্রই সে উৎসুক হয়ে ঘুরে তাকিয়ে দেখছে, হোটেলের দিক থেকে কে আসছে৷
কিন্তু শুধু হতাশার পর হতাশা৷
প্রথমে এলেন মিঃ এবং মিসেস গার্ডেনার—সেলাই ও সেলাইয়ের বইয়ে সুসজ্জিত হয়ে৷ তারপর এলেন মিস ব্রুস্টার৷
মিসেস গার্ডেনার তাঁর চেয়ারে গুছিয়ে বসলেন৷ তারপর যথারীতি অসীম উৎসাহে বুনতে শুরু করলেন—সেই সঙ্গে শুরু হলো তাঁর কথার স্রোত৷
‘আচ্ছা, মঁসিয়ে পোয়ারো, ব্যাপারটা কি? সমুদ্রতীর আজ এত ফাঁকা লাগছে? সব গেলো কোথায়?’
পোয়ারো বললেন, ‘মাস্টারম্যান ও কাওয়ানরা বাচ্চাকাচ্ছা সমেত দুটি পরিবারই সারাদিনব্যাপী নৌকো-বিহারে বেরিয়েছে৷’
‘ও, সেই জন্যেই আজ এত চুপচাপ লাগছে, হাসিহাসি চেঁচামেচি করার জন্য ওরা তো আর নেই৷ আর মাত্র একজনই দেখছি স্নান করছেন, ক্যাপ্টেন মার্শাল৷’
মার্শাল তাঁর সাঁতার শেষ করে পাড়ে এলেন, তোয়ালে দুলিয়ে সৈকত ছেড়ে উঠে এলেন ওপরে৷
আজ সমুদ্রের জল চমৎকার৷’ তিনি বললেন, ‘কিন্তু এমনই দুর্ভাগ্য, ওদিকে একগাদা কাজ পড়ে রয়েছে৷ না গিয়ে উপায় নেই৷’
‘আজকের মতো চমৎকার দিনেও আপনার কাজ রয়েছে, ক্যাপ্টেন মার্শাল? তাহলে তো সত্যিই দুর্ভাগ্য বলতে হয়৷ উঃ, গতকাল কি বিশ্রীই না একটা দিন গেছে! আমি মিঃ গার্ডেনারকে বলেছিলাম যে রোজই যদি এইরকম বৃষ্টি-বাদলা চলতে থাকে তাহলে আমাদের এ জায়গা ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া দ্বিতীয় পথ নেই৷ কারণ এইরকম কুয়াশা ঢাকা পরিবেশে আমার কেমন যেন মনমরা লাগে, আর একটা অদ্ভুত ভাব মনকে ঘিরে থাকে৷ আপনি হয়তো জানেন না, ছোটবেলা থেকেই আবহাওয়া আর পরিবেশের প্রতি আমি যথেষ্ট সংবেদনশীল৷ মাঝে মাঝে আমার মনে হতো, আমি শুধু চিৎকার করে যাই এবং বুঝতেই পারছেন, মা-বাবার কাছে এটা একটা সমস্যাই হয়ে উঠতো৷ কিন্তু আমার মা খুব ভালো ছিলো৷ মা বাবাকে বলতো, ‘সিনক্লেয়ার, বাচ্চাটার যদি সত্যিই চিৎকার করতে ইচ্ছে হয়, তাহলে আমাদের বাধা দেওয়া উচিত নয়৷ এই চিৎকার করেই ও ও মনের ভাব প্রকাশ করতে চাইছে৷’ এবং স্বাভাবিকভাবেই আমার বাবা এ নিয়ে আর দ্বিমত করতো না৷ এমনিতে বাবা মায়ের অত্যন্ত অনুগত ছিলো৷ মা যা বলতো বিনাদ্বিধায় তাই করতো৷ তারা সত্যিই সুখী দম্পতি ছিলো, এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস মিঃ গার্ডেনারও আমার সঙ্গে একমত হবেন৷ তারা-এক কথায় ছিলো অসাধারণ স্বামী-স্ত্রী, ছিলো না, ওডেল?’
‘হ্যাঁ, সোনা৷’ বললেন, মিঃ গার্ডেনার৷
‘আপনার মেয়ে কোথায়, ক্যাপ্টেন মার্শাল?’
‘লিন্ডা? কি জানি, জানি না৷ হয়তো দ্বীপের এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷’
‘জানেন, ক্যাপ্টেন মার্শাল, মেয়েটাকে আমার দুর্বল আর রোগা বলে মনে হয়৷ ওকে ভালো মতো খাওয়া-দাওয়া করানো দরকার৷ আর খুব দরদ দিয়ে যত্ন আত্তি করা দরকার৷’
কেনেথ মার্শাল সংক্ষিপ্তভাবে জবাব দিলেন, ‘লিন্ডা ঠিক আছে৷’
কথা শেষ করে তিনি পা বাড়ালেন হোটেলের দিকে৷
প্যাট্রিক রেডফার্ন জলে নামলো না৷ সে অলসভাবে হোটেলের দিকে চেয়ে বসে রইলো৷ তার মুখমণ্ডলে নেমে এসেছে হতাশা ও অভিমানের কালো ছায়া৷
মিস ব্রুস্টার যখন এসেছেন, তাঁকে দেখে বেশ প্রাণবন্ত এবং হাসিখুশি বলেই মনে হয়েছে৷
আজকের কথাবার্তা অনেকটা সেদিন সকালেই মতোই চলতে লাগলো৷ মিসেস গার্ডেনারের শান্ত একঘেয়ে শব্দস্রোতকে কাটা কাটা তীক্ষ্ম মন্তব্যে যতিচিহ্নিত করতে চাইছেন মিস ব্রুস্টার৷
শেষে একসময় মিস ব্রুস্টার মন্তব্য করলেন, সমুদ্রতীর আজ একটু নির্জন মনে হচ্ছে৷ সবাই কি বেড়াতে-টেড়াতে গেছে নাকি?’
মিসেস গার্ডেনার বললেন, ‘এই তো আজ সকালেই আমি মিঃ গার্ডেনারকে বলছিলাম, আমাদের ‘‘ডাটমুরে’’ অবশ্যই একবার বেড়াতে যাওয়া দরকার৷ এমনিতেই জায়গাটা বেশ কাছে, তার ওপর ওখানকার পরিবেশ অত্যন্ত চমৎকার৷ আমার তো অপরাধীদের সেই কয়েদখানাটা দেখবার খুব ইচ্ছে—কি নাম যেন—‘প্রিন্সটাউন’, তাই না? আমার মনে হয়, আজই সব ব্যবস্থাপত্র সেরে কাল ডার্টমুরে রওনা দিলে ভালো হয়, কি বলো ওডেল?’
মিঃ গার্ডেনার বললেন, ‘হ্যাঁ, সোনা৷’
এরকুল পোয়ারো মিস ব্রস্টারকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘আপনি কি এখন স্নান করতে নামবেন, মাদামোয়াজেল?’
‘নাঃ, আমি স্নানের পালা প্রাতরাশের আগেই সেরে নিয়েছি৷ সেই সময় একজন পরোপকারী ব্যক্তি একটা শিশি আর একটু হলেই আমার মাথায় বসিয়ে দিয়েছিলো৷ বোধহয় হোটেলের কোন জানলা দিয়ে বাইরে সমুদ্রে ছুড়ে দিয়ে থাকবে৷’
‘উহুঁ, এ ধরনের ছুড়ে ফেলার অভ্যেস রীতিমতো বিপজ্জনক৷’ বললেন, মিসেস গার্ডেনার, ‘একবার আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু টুথপেস্টের টিন মাথায় পড়ে রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলো—একটা বাড়ির পঁয়ত্রিশ তলার জানলা দিয়ে কেউ ওটাকে ছুড়ে ফেলেছিলো৷ ভাবুন, কিরকম সাংঘাতিক! এর জন্য আমার বন্ধুর অনেক ক্ষতি হয়৷’ তিনি এবার তাঁর উলের ভাণ্ডার হাতড়াতে লাগলেন, ‘ওডেল মনে হচ্ছে উলের বলটা আমি ফেলে এসেছি৷ ওটা শোবার ঘরে টেবিলের দ্বিতীয় কি তৃতীয় টানাতে আছে—একবার দ্যাকখো তো—’
‘হ্যাঁ, সোনা—দেখছি৷’
মিঃ গার্ডেনার অনুগতভাবে উঠে দাঁড়ালেন এবং তাঁর অনুসন্ধানের কাজে রওনা হলেন৷
পোয়ারো বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তাঁর সাদা জুতো জোড়া পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন৷ এমিলি ব্রুস্টার বললেন, ‘আপনি কি জুতো পরেই জলে নেমেছিলেন নাকি, মঁসিয়ে পোয়ারো?’
পোয়ারো মৃদু স্বরে বললেন, ‘অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে কাজ করার ফল—’
এমিলি ব্রুস্টার গলার স্বরকে খাদে নামিয়ে বললেন, ‘আমাদের ‘‘শ্রীমতী’’ কোথায়? তাকে এখনও দেখছি না?’
মিসেস গার্ডেনার তাঁর সেলাই থেকে চোখ তুলে প্যাট্রিক রেডফার্নের দিকে তাকালেন৷ তাকে লক্ষ্য করতে করতে চাপা স্বরে বললেন, ‘ওকে দেখে ঠিক থমথমে মেঘ বলে মনে হচ্ছে৷—ওঃ, এই পুরো ব্যাপার আমার এত বিশ্রী লাগছে—! ক্যাপ্টেন মার্শাল এ বিষয়ে কি ভাবেন কে জানে৷ ভদ্রলোক এত চমৎকার শান্ত মানুষ—একজন সত্যিকারে ইংরেজ এবং বিনয়ী৷ কোন বিষয়ে তিনি কি ভাবেন, তা আপনি টেরও পাবেন না৷’
প্যাট্রিক রেডফার্ন উঠে দাঁড়িয়ে সমুদ্রতীরে পায়চারি করতে লাগলো৷
মিসেস গার্ডেনার বিড়বিড় করলেন, ‘ঠিক যেন একটা বাঘ৷’
তিনজোড়া চোখ রেডফার্নকে লক্ষ্য করতে লাগলো৷ তাঁদের পর্যবেক্ষণ তাকে যেন অস্বস্তিতে ফেললো৷ তার মুখভাব এখন শুধু গম্ভীর নয়, তাতে এসে মিশেছে চাপা ক্রোধের কালো ছায়া৷ যেন এখুনি একটা বিস্ফোরণ ঘটবে৷
এই থমথমে আবহাওয়ায় তাঁদের কানে এলো মূল ভূখণ্ড থেকে ভেসে আসা ঘণ্টার হালকা শব্দ৷
এমিলি ব্রুস্টার মৃদু স্বরে বললেন, ‘পূব দিক থেকে তাহলে আবার হাওয়া বইছে৷ এখানে গির্জার ঘণ্টা শুনতে পাওয়াটা একটা সুলক্ষণ৷’
মিঃ গার্ডেনার বেগুনি উলের বল দিয়ে ফেরা পর্যন্ত কেউ আর কোন কথা বললেন না৷
‘কি ব্যাপার ওডেল, এত দেরি হলো?’
‘দুঃখিত, সোনা, কিন্তু এটা টেবিলের কোন টানাতেই ছিলো না৷ অনেক খোঁজাখুঁজির পর শেষে আলমারির তাকে পেলাম৷’
‘ও—৷ কিন্তু আশ্চর্য, আমার ধারণা ছিলো এটা আমি টেবিলের টানাতেই রেখেছি৷ সত্যি, আমার সেভাগ্যই বলতে হবে যে কখনও কোন আদালতে সাক্ষী দিতে আমার ডাক পড়েনি৷ সেখানে কোন কথা ঠিকমতো মনে করতে না পারলে অস্বস্তি আর চিন্তায় আমি হয়তো মরেই যেতাম৷’
মিঃ গার্ডেনার বললেন, ‘মিসেস গার্ডেনার অত্যন্ত নীতিবোধসম্পন্ন মহিলা৷’
৫
আরও প্রায় মিনিট পাঁচেক পরে প্যাট্রিক রেডফার্ন মুখ খুললো, ‘মিস ব্রুস্টার, নৌকো নিয়ে আজ বেরোবেন না? আমি সঙ্গে গেলে আপনার আপত্তি আছে?’
‘আপত্তি? বরং অত্যন্ত খুশি হবো৷’ আন্তরিক সুরে বললেন, মিস ব্রুস্টার৷
‘তাহলে চলুন, আজ গোটা দ্বীপটাকে একটা চক্কর দিয়ে আসা যাক৷’ রেডফার্ন প্রস্তাব করলো৷
‘হাতে অত সময় পাওয়া যাবে কি?’ মিস ব্রুস্টার ঘড়ি দেখলেন, ‘ও—হ্যাঁ, এখনও সাড়ে এগারোটাই বাজে নি৷ চলুন, আর দেরি না করে বেরিয়ে পড়া যাক৷’
ওরা নেমে চললো সমুদ্রের কিনারার দিকে৷
প্যাট্রিক রেডফার্নই প্রথম বৈঠার কাছে বসলো৷ সে সবল হাতে বৈঠা বাইতে লাগলো৷ নৌকো গতিবেগ নিয়ে চলতে শুরু করলো৷
এমিলি ব্রুস্টার প্রশংসার সুরে বললেন, ‘দেখা যাবে শেষ পর্যন্ত এভাবে বাইতে পারেন কিনা৷’
রেডফার্ন মিস ব্রুস্টারের চোখে তাকিয়ে হাসলো৷ তার মানসিক অবস্থা আগের চেয়ে অনেক হালকা হয়ে গেছে৷
‘যখন আমরা নৌকো নিয়ে ফিরবো, ততক্ষণে দেখবেন আমার গায়ে এক গাদা ফোস্কা গজিয়ে গেছে৷’ মাথা ঝাঁকিয়ে কপালে নেমে আসা কালো চুল স্বস্থানে ফেরত পাঠালো রেডফার্ন, ‘ওঃ, আজকের দিনটার তুলনা হয় না! ইংল্যান্ডে যদি কখনও একটা চমৎকার গ্রীষ্মের দিন পান, তাহলে তার চেয়ে ভালো আর কিছু হয় না৷’
এমিলি ব্রুস্টার একটু রুক্ষ স্বরেই জবাব দিলেন, ‘ইংল্যান্ডের সবকিছুই ভালো৷ পৃথিবীতে থাকবার মতো জায়গা ওই একটাই আছে৷’
‘ঠিক বলেছেন৷’
ওরা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে পশ্চিমে মোড় নিয়ে এগিয়ে চললো৷ বাইতে বাইতেই হঠাৎই চোখ তুলে তাকালো রেডফার্ন৷
‘সানি লেজ-এ আর কেউ গেছে নাকি? হুঁ, একটা ছাতা দেখতে পাচ্ছি৷ কে হতে পারে, তাই ভাবছি৷’
এমিলি ব্রুস্টার বললেন, ‘মনে হয়, মিস ডার্নলি৷ ওরকম জাপানি ছাতা ওঁর একটা আছে৷’
ওরা উপকূল ধরে নৌকো বেয়ে চললো৷ ওদের বাঁ দিকে উন্মুক্ত সমুদ্র৷
এমিলি ব্রুস্টার বললেন, ‘আমাদের উলটো দিক ধরে যাওয়া উচিত ছিলো৷ এদিকে স্রোতের বিরুদ্ধে বাইতে হচ্ছে৷’
‘না, এদিকে স্রোত তেমন বেশি নেই৷ আমি তো এখানে সাঁতারও কেটেছি, স্রোতের টান কখনও টের পাইনি৷ তাছাড়া ওদিক দিয়ে আমরা যেতে পারতাম না, কারণ সেতুটা এ সময় জলের ওপরেই থাকবে৷’
‘সেটা অবশ্য ঢেউয়ের ওপর নির্ভর করছে৷ কিন্তু সকলে বলে পিক্সি কোভে স্নান করতে নামলে বেশি দূরে সাঁতরে যাওয়া বিপজ্জনক৷’
প্যাট্রিক এখনও সমান উদ্যমে বৈঠা বাইছে৷ এবং একই সঙ্গে বেশ মনোযোগ সহকারে সে পাহাড়ের কোলে প্রতিটি অংশে অনুসন্ধানী চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে৷
হঠাৎ এমিলি ব্রুস্টার ভাবলেন, ‘ও নিশ্চয়ই মিসেস মার্শালের খোঁজ করছে৷ সেই জন্যেই ও আমার সঙ্গে নৌকো করে আসতে চেয়েছে৷ আজ সারা সকালে আর্লেনার দেখা পাওয়া যায়নি এবং ওর অনু্পস্থিতির কারণ ভেবে ভেবে প্যাট্রিক এখন রীতিমতো দুশ্চিন্তায় পড়েছে৷ সম্ভবত সব জেনে শুনেই আর্লেনা এই ছল করছে; ওর প্রতি প্যাট্রিকের আকর্ষণ বাড়িয়ে তোলার নিঃসন্দেহে এ এক নতুন চাল৷’
পিক্সি কোভের দক্ষিণ দিকে সমুদ্রে বেরিয়ে আসা পাথুরে অংশটার কাছে ওরা বাঁক নিলো৷ পিক্সি কোভ জায়গাটা বেশি বড় নয়৷ এখানকার বেলাভূমিতে ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র পাথরের টুকরো৷ পাহাড়ের কিছু অংশ গাড়ি বারান্দার মতো ঝুলে রয়েছে বেলাভূমির ওপর৷ উত্তর-পশ্চিমে মুখ করে অবস্তিত এই ছোট জায়গাটা পিকনিকের প্রয়োজনে অনেকের কাছেই অত্যন্ত প্রিয়৷ মাথার ওপরে পাথরের আড়াল থাকার জন্য সকালের দিকে সূর্যের কিরণ এখানে এসে পৌঁছয় না, এবং সেই কারণেই এ সময়ে কেউ এদিক প্রায় আসে না বললেই চলে৷
কিন্তু আজ, এই মুহূর্তে বেলাভূমিতে একজনকে দেখা গেলো৷
প্যাট্রিক রেডফার্নের কর্মরত হাত ক্ষণিকের জন্য নিশ্চল হলো, তারপর আবার বাইতে শুরু করলো৷
সে স্বাভাবিক এবং সহজ সুরে বললো, ‘আরে, কে ওখানে?’
মিস ব্রুস্টার নির্লিপ্ত স্বরে জবাব দিলেন, ‘দেখে তো মিসেস মার্শাল বলেই মনে হচ্ছে৷’
প্যাট্রিক রেডফার্ন যেন হঠাৎই খেয়াল হয়েছে এমন সুরে অবাক হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ—সত্যিই তো৷’
সুতরাং তার নৌকো চালানোর গতি পরিবর্তিত হলো৷ তীর অভিমুখে নৌকো এগিয়ে চললো৷
এমিলি ব্রুস্টার ক্ষীণ প্রতিবাদ করতে চাইলেন, ‘আমরা কি এখানে পাড়ে নামবো?’
প্যাট্রিক রেডফার্ন চটপট জবাব দিলো, ‘ক্ষতি কি৷ হাতে এখনও প্রচুর সময় আছে৷’
সে মিস ব্রুস্টারের চোখে নিষ্পলকে তাকালো৷ তার দৃষ্টিতে যেন সরল আকুতি ঝরে পড়লো, অনেকটা প্রভুভক্ত কোন কুকুরের নীরব মিনতির মতো৷ মিস ব্রুস্টার মুখ ফুটে আর কিছু বলতে পারলেন না৷ তিনি মনে মনে ভাবলেন, ‘হায় বেচারা, প্রেমে ও একেবারে অন্ধ হয়ে গেছে৷ কিন্তু উপায় কি৷ সময় হলেই ও এটা কাটিয়ে উঠবে৷’
নৌকো তরতর করে নিঃশব্দে এগিয়ে চললো পাড়ের দিকে৷
আার্লেনা মার্শাল নুড়ি-ছাওয়া বেলাভূমিতে উপুড় হয়ে শুয়ে রয়েছে৷ ওর হাত দুটো দু-পাশে বিস্তৃত৷ সাদা ভেলাটাও অদূরেই চোখে পড়লো৷
কিছু একটা এমিলি ব্রুস্টারকে অস্বস্তিতে ফেললো৷ যেন তার অত্যন্ত পরিচিত স্বাভাবিক কোন দৃশ্যের দিকে তিনি চেয়ে আছেন, অথচ তার কোথায় যেন একটা অসঙ্গতি রয়েছে৷
আরও প্রায় মিনিট কয়েক পরে অসঙ্গতিটা তাঁর নজরে পড়লো৷
আর্লেনা মার্শালের শুয়ে থাকার ভঙ্গী কোন সূর্যস্নানার্থীর শুয়ে থাকার ভঙ্গীর মতোই নিখুঁত৷ হোটেলের সামনের সৈকতে ওকে প্রায়ই এই একই ভঙ্গীতে শুয়ে থাকতে দেখা গেছে: ব্রোঞ্জ রঙের শরীর সূর্যপিপাসায় টানটান, আর সবুজ পিচবোর্ডের টুপিটা ওর মাথা ও ঘাড় প্রখর সূর্যকিরণ থেকে রক্ষা করছে৷
কিন্তু পিক্সি কোভের বেলাভূমিতে সূর্যকিরণের এতটুকু আভাসমাত্র নেই, এবং আগামী কয়েক ঘণ্টাতেই থাকবে না৷ ওপরে ঝুলন্ত পাথরের আড়াল সকালের সূর্যকে বেলাভূমি থেকে সম্পূর্ণ অপসারিত করেছে৷ আশঙ্কার এক অদ্ভুত ইশারা এমিলি ব্রুস্টারের মনকে ধীরে ধীরে গ্রাস করলো৷
ওদের নৌকো এসে থামলো বেলাভূমির পাথুরে কিনারায়৷ প্যাট্রিক রেডফার্ন চেঁচিয়ে ডাকলো, ‘এই আর্লেনা—’
এবং তখন এমিলি ব্রুস্টারের ভিত্তিহীন আশঙ্কা একটা নির্দিষ্ট রূপ নিলো৷ কারণ রেডফার্নের আহ্বানে শায়িত কোনও চাঞ্চল্য দেখা গেলো না, এলো না কোন উত্তর৷
প্যাট্রিক রেডফার্নের মুখের আকস্মিক পরিবর্তনটা এমিলির চোখে পড়লো৷ সে এক লাফে নৌকো থেকে নামলো, এমিলি ব্রুস্টারও তাকে অনুসরণ করলেন৷ নৌকোটাকে টেনে পাড়ে তুললো দুজনে, তারপর বেলাভূমি ধরে এগিয়ে চললো পাহাড়ের কোলে নিশ্চল হয়ে পড়ে থাকা নিরুত্তর শুভ্র দেহটার দিকে৷
প্যাট্রিক রেডফার্নই প্রথমে এসে পৌঁছলো, এবং তার ঠিক পেছনেই মিস ব্রুস্টার৷
তিনি দেখলেন, যেন স্বপ্নে দেখার মতো, একটা ব্রোঞ্জ রঙের শরীরে সাদা পিঠ-খোলা সাঁতার পোশাক—সবুজ টুপির সীমানা ছাড়িয়ে বেড়িয়ে আসা লাল চুলের গুচ্ছ—দেখলেন আরও একটা জিনিস—বিস্তৃত দু’বাহুর অদ্ভুত, অস্বাভাবিক অবস্থান৷ সেই মুহূর্তে তিনি অনুভব করলেন, দেহটা ঠিক স্বইচ্ছায় শায়িত নয়, বরং কেউ যেন অবহেলাভরে ওটাকে ছুঁড়ে দিয়েছে উন্মুক্ত বেলাভূমিতে…
তিনি শুনতে পেলেন প্যাট্রিকের কণ্ঠস্বর—নিছকই এক আতঙ্কবিকৃত ফিসফিসে স্বর৷ সে হাঁটু ভেঙে বসলো নিথর দেহটার পাশে—স্পর্শ করলো একটা হাত—বাহু…
চাপা ফিসফিসে শব্দে তার স্বর কেঁপে উঠলো, ‘হায় ভগবান! ও মারা গেছে…’
এবং তারপর, সে সবুজ টুপিটা সামান্য তুলে ঘাড়ের কাছে উঁকি মারলো, ‘…কেউ ওকে গলা টিপে খুন করেছে… ওঃ ভগবান!’
৬
সেটা এমনই এক মুহূর্ত, যে মুহূর্তে সময় নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে৷
এক অদ্ভুত অপ্রাকৃত অনুভূতির সঙ্গে এমিলি ব্রুস্টার শুনতে পেলেন নিজের কণ্ঠস্বর, ‘আমাদের কোন কিছুতেই হাত দেওয়া ঠিক হবে না… অন্তত যতক্ষণ না পুলিশ আসছে৷’
যান্ত্রিকভাবে ভেসে এলো রেডফার্নের উত্তর, ‘না—না, আপনি ঠিকই বলেছেন৷’ তারপর গভীর যন্ত্রণাক্লিষ্ট ফিসফিস স্বরে সে বললো, ‘কিন্তু কে? কে? কে আর্লেনার এ অবস্থা করলো? ওকে কেউ—ওকে কেউ খুন করতে পারে না? এ মিথ্যে—সব মিথ্যে!’
এমিলি ব্রুস্টার উত্তর খুঁজে না পেয়ে নীরবে মাথা নাড়লেন৷
তাঁর কানে এলো রেডফার্নের আচমকা গভীর শ্বাস টানার শব্দ—শুনতে পেলেন তার ক্রোধে উত্তেজিত সংযত স্বর, ‘ওঃ, ভগবান, যে এ কাজ করেছে, সেই শয়তানটাকে যদি একবার হাতের মুঠোয় পেতাম!’
এমিলি ব্রুস্টার শিউরে উঠলেন৷ তাঁর কল্পনায় ভেসে উঠলো কোন পাথরে আড়ালে লুকিয়ে ওঁৎ পেতে বসে থাকা কোন হত্যাকারীর ছবি৷ তিনি শুনতে পেলেন অনিশ্চয়তায় ভরা নিজের কণ্ঠস্বর, ‘যেই এ কাজ করে থাকুক, সে কি আর এখানে বসে আছে? আমাদের পুলিশে খবর দেওয়া উচিত৷ অবশ্য’ তিনি সামান্য ইতস্তত করলেন, ‘আমাদের একজনের মৃতদেহের কাছে থাকা দরকার—’
প্যাট্রিক রেডফার্ন বলল, ‘আমি থাকছি৷’
এমিলি ব্রুস্টার স্বস্তির ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললেন৷ তিনি সেই ধরনের মহিলা নন, যাঁরা নিজেদের ভয় পাওয়ার কথা কখনও স্বীকার করেন, কিন্তু বেলাভূমিতে আশেপাশে কোন উন্মাদ হত্যাকারীর উপস্থিতির ক্ষীণ সম্ভাবনা নিয়ে, তাঁকে একা থাকতে হবে না দেখে তিনি মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন৷
তিনি বললেন, ‘সেই ভালো৷ আমি যত তাড়াতাড়ি পারি ফিরে আসবো৷ আমি নৌকো নিয়েই যাচ্ছি, ওর মই বেয়ে ওপরে ওঠা আমার কর্ম নয়৷ লেদারকোম্ব উপসাগরের কাছাকাছি একজন কনস্টেবল আছে, তাকেই খবর দিচ্ছি৷’
প্যাট্রিক রেডফার্ন যান্ত্রিক স্বরে বিড়বিড় করলো, ‘হ্যাঁ—হ্যাঁ—আপনি যা ভালো বোঝেন৷’
সুপটু হাতে নৌকো বেয়ে এগিয়ে চললেন এমিলি ব্রুস্টার৷ যেতে যেতেই দেখলেন, প্যাট্রিক ঝুঁকে পড়লো মৃতদেহের পাশে, দু’হাতে মুখ ঢাকলো৷ তার ভঙ্গীতে এমন একটা সর্বহারা হতাশার ভাব ছিলো যে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি প্যাট্রিকের জন্য দুঃখ অনুভব করলেন৷ তাকে দেখে মনে হলো, যেন কোন অনুগত কুকুর তার প্রিয় প্রভুর মৃতদেহের পাশে অপলকে বসে আছে৷ কিন্তু তবুও মিস ব্রুস্টারের সরল স্বাভাবিক বুদ্ধি তাঁকে নীরবে বললো, ‘ওর এবং ওর স্ত্রী ভালোর জন্য—মার্শাল ও তাঁর মেয়ের জন্যে—এর চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারতো না৷ কিন্তু আমার মনে হয় না, ও কখনও সেদিক থেকে ব্যাপারটাকে চিন্তা করে দেখবে,… বেচারা!’
এমিলি ব্রুস্টার সেই ধরনের মহিলা, যাঁরা প্রয়োজনে সর্বদা তৎপর হতে পারেন৷
