এগার
পরদিন সকাল প্রাতরাশ খাবার সময় রয়কে রিক্সের কথা জানালাম৷
‘ওর কাছ থেকে সাবধানে থাকিস৷ শালা এক নম্বরের বিচ্ছু—যখন-তখন হুট্হাট্ করে এখানে ঢুকে পড়ে৷ এই তো কালই এসেছিল—একেবারে, অসহ্য৷ কাল তো রাগের মাথায় ব্যাটাকে মারধোর দিয়ে ফেলেছি৷ তারপর ও বলেছে, পুলিশে খবর দেবে—দিক্গে!’
রয় চমকে মুখ তুলে তাকাল, ‘পুলিশ? তার মানে!’
‘রিক্স একদিন আমাকে আর লোলাকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখে ফেলে৷ জেনসন যে অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে সটকে পড়েছে, সে খবর ও জানে না৷ তাই এখন ও কার্লকে খুঁজে বের করতে চায়—ওর পেনসনের কাগজে কি সব সই-টইয়ের ঝামেলা আছে—তাছাড়া রিক্স আমাকে খুব একটা ভালো চোখে দেখে না৷’
কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে সিগারেট ধরাল রয়৷ খাবার ঘরে শুধু আমরা দুজন—লোলা এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি৷ রয় অ্যাশট্রেতে ছাই ঝেড়ে আমার দিকে ফিরল, ‘তাহলে লোলা ওকে বলছে না কেন, জেনসন আর ফিরবে না?’
‘প্রথমত, সেটা রিক্সকে বলার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না৷ আর দ্বিতীয়ত, বললেও রিক্স সে-কথা বিশ্বাস করবে না৷’
‘হুঁ—’ রয় চিন্তিতভাবে মাথা নাড়ল, ‘কিন্তু শেট, এটা কিছুতেই আমার মগজে ঢুকছে না যে একটা লোক কি করে এমন সুন্দরী বউ, আর এরকম একটা জায়গা ছেড়ে চলে যেতে পারে! নাঃ, জেনসন ব্যাটা বোকার হদ্দ!’
‘হ্যাঁ,—শোন্—যা বলছিলাম—আমরা যখন থাকব না, তখন যদি রিক্স এখানে আসে, সোজা তাড়িয়ে দিবি৷ এখান থেকে কোন জিনিস নিয়ে যেতে দিবি না—বুঝলি?’
‘হ্যাঁ, বুঝলাম৷ কিন্তু রিক্স পুলিশে যাবে বলেছে? অদ্ভুত তো!’
রয় কি আমাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছে?
‘না না—পুলিশে ও যাবে বলে মনে হয় না৷ আর যদিও বা যায়, পুলিশ ওর কোন কথাতেই কান দেবে না৷’ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম, ‘যাকগে—আয়, ঘরটা পরিষ্কার করে ফেলা যাক৷ প্রত্যেকদিন সকালে এটা লোলাই পরিষ্কার করে, কিন্তু, এখন তুই এসেছিস—’ রয়ের দিকে চেয়ে হাসলাম, ‘তাই লোলা এখনও ঘুমোচ্ছে—’
খাবার ঘর ঝাঁড়-পোঁচ করতে করতে রয় বলল, ‘শেট, ফার্নওয়ার্থ থেকে তুই কেমন করে পালালি বল্ তো? কাগজে লিখেছিস, তুই-ই হলি একমাত্র কয়েদী যে ফার্নওয়ার্থ থেকে পালিয়ে বাঁচতে পেরেছে৷—বল্ না, পালালি কেমন করে?’
রয় উৎসুক চোখে আমার দিকে তাকাল৷
ওকে ধীরে ধীরে জানালাম আমার পালানোর ইতিহাস৷
ঝাঁট দেওয়া বন্ধ করে রয় একমনে শুনতে লাগল৷ ওর মুখ দেখে মনে হল, এই অবিশ্বাস্য কাহিনীকে ও কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না৷ মাঝে-মাঝে অস্ফুট স্বরে বিস্ময়ও প্রকাশ করল৷
আমার কথা শেষ হতেই ও আমাকে জাপটে ধরল, ‘শালা! তোর সাহস আছে বলতে হবে! আমি হলে এই সর্বনেশে কুকুরগুলোর ধারেকাছেও ঘেঁষতাম না৷ আশ্চর্য, কী করে যে পালালি! একবার ভয়ও করল না?’
‘ফার্নওয়ার্থ থেকে পালাবার জন্যে কুকুর কেন, বাঘের মুখোমুখি হতেও কোন কয়েদী পেছপা হবে না৷ মোদ্দা কথা, ফার্নওয়ার্থে আমি আর ফিরছি না৷ তার চেয়ে আমার মৃত্যুও ভালো৷’
কথা বলতে বলতে হয়তো একটু উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম৷ সেটা লক্ষ্য করে রয় বলল, ‘এখন আর তোর ভয়ের কোন কারণ নেই৷ এখানে তোর খোঁজ করার কথা পুলিশের মনেও আসবে না৷’
‘আমারও তাই মনে হয়৷’
হঠাৎ জানালা দিয়ে বাংলোর দরজায় চোখ পড়তেই, দেখলাম লোলাকে৷ ও রেস্তোরাঁর দিকেই এগিয়ে আসছে৷ পরনে সেই চোলি, আর একটা খাটো প্যান্ট৷ মাথার একরাশ তাম্রাভ চুল একটা সবুজ ফিতে দিয়ে অগোছালোভাবে বাঁধা৷
ওকে দেখামাত্রই কেমন একটা অস্বস্তি অনুভব করলাম৷ কারণ, সেদিন বারণ করার পর থেকে লোলা এই পোশাকে আর বাইরে বেরোয় না৷ তাহলে আজ কেন?—ও বুঝেছি, ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’-এ যেই একজন অপরিচিত পুরুষের আগমন ঘটেছে, অমনি লোলা ওর ভরা যৌবনের পসরা সাজিয়ে বেরিয়ে পড়েছে৷ আড়চোখে রয়কে দেখলাম৷ ও কিন্তু লোলাকে দেখেনি, তখনও একমনে কাউন্টার পরিষ্কার করছে৷
লোলা চটুল হাসিতে চোখ নাচিয়ে খাবার ঘরে এসে ঢুকল৷ এক কথায় যাকে বলে নাটকীয় আবির্ভাব৷
‘কী ব্যাপার? সকাল হতে-না-হতেই আমার কর্মচারীরা কাজে লেগে গেছে৷’
আমি একদৃষ্টে রয়কে লক্ষ্য করছিলাম৷ ও কাজ করতে করতে থমকাল, চোখ তুলে তাকাল লোলার দিকে৷ ও তখন দরজার গায়ে হেলান দিয়ে স্থির চোখে রয়ের দিকে চেয়ে আছে৷
লোলা আজ যেন আরও বেশি উচ্ছল হয়ে উঠেছে৷ রয়ের চোখের সামনে নিজেকে করে তুলেছে অনেক বেশি লোভনীয়৷
কিন্তু রয়ের মুখের ভাবে বিন্দুমাত্রও পরিবর্তন হল না৷ ও শূন্যদৃষ্টিতে বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে রইল৷ তারপরই মাথা ঝুঁকিয়ে আবার কাজে মন দিল৷ নিস্পৃহ স্বরে জবাব দিল, ‘তাই নাকি! আমরা খিদমতগার, আর তুমি কি?’
রয়ের অপ্রত্যাশিত রুক্ষ জবাবে লোলার মুখ থমথমে হয়ে উঠল—যেন আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস৷ কারণ ও রয়ের থেকে এ ধরনের জবাব কখনোই আশা করেনি৷ হয়ত ভেবেছিল, ওর এই উচ্ছল বালিকা-সুলভ ব্যবহার রয়ের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করবে৷ কিন্তু যখন দেখল, ওর যৌবনের আকর্ষণ রয়ের উপর এতটুকু প্রভাব বিস্তার করেনি, তখন স্বভাবতই রুদ্ধ আক্রোশে মাথা খুঁড়েছে লোলার অপমানিত, আহত নারীত্ব৷
আমার মন থেকে অস্বস্তির ভাবটা কেটে গেল৷ লোলার অবস্থা দেখে মুখ ফিরিয়ে হাসলাম৷ নাঃ, রয় সেই একই আছে—এতটুকু বদলায়নি৷ ওর জীবনে নারীর ভূমিকা এখনও সবার শেষে৷
লোলা চুপচাপ রান্নাঘরের দিকে এগোল৷ কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছে একবার ঘাড় ফিরিয়ে রয়কে দেখল৷ রয় তখনও সেই একই ভাবে কাজ করে চলেছে, আর আপনমনেই হালকা সুরে শিস দিচ্ছে৷ রয় লোলার দিকে পিছন ফিরে থাকায় ওর মুখের ভাব দেখতে পেল না৷ কিন্তু লোলা রান্নাঘরে ঢুকে দড়াম করে দরজা বন্ধ করতেই ওর মুখ ফিরিয়ে একবার রান্নাঘরের দিকে তাকাল৷ তারপর আমার দিকে চেয়ে চোখ টিপল, ‘শালা, রমণীর মন দেবা না জানন্তি, কুতো মনুষ্যাঃ! কোনদিন কোন মেয়েকে সন্তুষ্ট হতে দেখলাম না, মাইরি!’
‘আমারই দোষ৷’ হেসে রয়কে বললাম, ‘আমিই তোর কথা ওকে বলেছি৷ বলেছি যে মেয়েদের সম্বন্ধে তুই এতটুকু কৌতূহলী নোস৷ ব্যস, লোলা তো কিছুতেই বিশ্বাস করবে না৷ বলে, এ নাকি হতেই পারে না৷’
‘এবার বোধ হয় বিশ্বাস করবে৷’ রয় হেসে জবাব দিল৷
এমন সময় বাইরে থেকে একটা ট্রাকের শব্দ কানে এল৷ ড্রাইভারের হর্ন দেবার ধরন শুনে বুঝলাম, তার প্রয়োজনটা জরুরী৷ রয় কাউন্টার পরিষ্কার করার কাপড়টা রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল, ‘তুই থাক, আমিই যাচ্ছি৷’
ও বেরিয়ে যেতেই রান্নাঘরে গেলাম৷
লোলা মুখ গোমড়া করে টেবিলের কাছে দাঁড়িয়েছিল৷ এর মধ্যেই ও কাজ করার গাউনটা পরে নিয়েছে৷ আমাকে ঢুকতে দেখেই বলল, ‘শেট, আজ রাতে আমরা সিনেমায় যাব৷ রয় এখানে দেখাশোনা করবে, কোন অসুবিধে হবে না৷ বারটার শো দেখে, রাত তিনটের মধ্যেই আমরা আসতে পারব, কী বলো?’
একটু ইতস্তত করলাম৷ আমাদের দুজনের একসঙ্গে ওয়েন্টওয়ার্থে যাওয়াটা কি ঠিক হবে?
‘লোলা, আমার মনে হয়, আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করা প্রয়োজন—’
‘তার মানে?’ চট করে ঘুরে তাকাল লোলা—মুখের ভাব কঠিন৷
‘না, বলছিলাম—জেনসন যে অ্যারিজোনায় গিয়ে অন্য মেয়ের সঙ্গে ভিড়ে গেছে, সে-গল্পটা এখনও তো কেউ জানে না—তাই ভাবছিলাম, লোকে আগে গল্পটা শুনুক, তারপর আমরা একসঙ্গে যেখানে-সেখানে ঘুরব—কারুর কিছু বলার থাকবে না৷ কিন্তু তার আগে আমাদের দুজনের—’
আমার কথা শেষ হতে-না হতেই লোলা মুখঝামটা দিয়ে উঠল, ‘তোমার ওই এক কথা শুনতে আমার কান ঝালাপালা হয়ে গেল৷ ওসব বাজে কথা আমি শুনতে চাই না৷ আজ রাতে আমি সিনেমায় যাব, এবং তুমিও আমার সঙ্গে যাচ্ছ—ব্যস!’
‘ঠিক আছে, এত করে যখন বলছ, যাব, বারোটার শো তো, কেউ যে আমাদের দেখে ফেলবে সে-সম্ভবনা কম৷’
‘দেখে ফেললেই বা—আমাদের তাতে বয়েই গেল!’ লোলার কণ্ঠস্বরে অধৈর্য৷
‘কিন্তু তুমি একটা কথা ভুলে যাচ্ছ লোলা, কার্লকে আমরা এখানেই করব দিয়েছি৷ যদি সন্দেহের বশে পুলিশ এখানে আসে, তাহলে—’
‘যদি পুলিশ এখানে আসে! যদি কার্লের দেহ খুঁজে পায়! যদি আমাদের সন্দেহ করে—’ লোলার তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ব্যঙ্গের সুর, ‘তার মানে বাকি জীবনটা আমাকে পুলিশের ভয়ে ভয়েই কাটাতে হবে এই তো তোমার বক্তব্য?
‘তোমার যা খুশি বলো৷ তোমাকে তো আর ফার্নওয়ার্থে যেতে হয়নি!’
এমন সময় রয় এসে ঢুকল রান্নাঘরে৷
রয়কে দেখেই লোলা বলল, ‘রয়, আমি আর শেট রাতে সিনেমায় যাচ্ছি৷ তুমি একা সব সামলাতে পারবে তো?’
রয় একবার আমার দিকে তাকাল, হয়তো একটু অবাকও হল, কিন্তু মুখে সে-কথা প্রকাশ করল না, ‘না না,—আমার কোন অসুবিধে হবে না৷’
লোলা ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার কাজে মন দিল৷
রয় এবার আমাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘শেট, এক মিনিট বাইরে আয় তো—আমার গাড়িটা একটু দেখবি৷ শালা গাড়িটার সব ক-টা প্লাগই খারাপ হয়ে গেছে৷ তুই তো জানিস, গাড়ির ইঞ্জিনের ব্যাপার-ট্যাপার আমার মাথায় একদম ঢোকে না!’
‘এবার একটু গাড়ির কাজ শেখ্৷ মনে কর, আমি আর লোলা বেড়াতে গেলাম, আর একটা গাড়ি ব্রেকডাউনের কাজ এসে পড়ল—তখন কী করবি?’
রয় হাসল, ‘সে আগে আসুক তো, তখন দেখা যাবে৷ চল্, গাড়িটা দেখবি চল—’
রয় রান্নাঘরের দরজার দিকে এগোল৷ ওর পিছন পিছন আমিও চললাম৷ কিন্তু রান্নাঘরের দরজা খুলেই ও হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল৷ ব্যাপারটা আচমকা ঘটে যাওয়ায় নিজেকে সামলাবার আর সময় পেলাম না৷ সোজা ওর গায়ে গিয়ে ধাক্কা খেলাম৷
‘দ্যাখ, কে আসছে!’ চাপা উত্তেজিত স্বরে রয় বলে উঠল৷
রয়ের কাঁধের উপর দিয়ে তাকালাম৷ রান্নাঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ছে খাবার ঘরের জানলা৷ আর সেই জানলা দিয়ে বেশ দেখতে পেলাম বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটাকে৷
গাড়ির আরোহী দুজনের পরনেই কালো স্যুট এবং স্টেটসন হ্যাট৷ দুজনের মধ্যে অপেক্ষাকৃত মোটাসোটা লোকটা গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল—থলথলে, পেটমোটা জলহস্তীর মতো চেহারা৷ তার কোটের উপর বুকের কাছে লাগানো রয়েছে একটা রুপোর। তারা প্রখর সূর্যের আলো সেই তারার গায়ে পড়ে ঠিকরে পড়ছে৷
গাড়ি থেকে নামার সময়, লোকটার কোটটা একটু ফাঁক হতেই চোখে পড়ল তার কোমরের বেল্টে আঁটা .৪৫ রিভলভারটা৷
‘পুলিশ!’ রয় চাপাস্বরে ফিসফিস করল৷
ততক্ষণে আমিও সেটা বেশ বুঝতে পেরেছি৷ মেরুদণ্ড দিয়ে একটা বরফ শীতল স্রোত বয়ে গেল৷ পুলিশ কেন? তাহলে কী—
পাগলের মতো ঘুরে তাকালাম লোলার দিকে৷ অদ্ভুত মনে হলেও, সেই মুহূর্তে একটা আশ্চর্য ভয়ার্ত অনুভূতি আমার মনকে ছেয়ে ফেলল৷ মনে হল, এই আসন্ন বিপদ থেকে একমাত্র লোলাই আমাকে উদ্ধার করতে পারবে—আর কেউ নয়৷ ক্ষিপ্র পায়ে লোলার কাছে এগিয়ে গেলাম, ‘লোলা, শেরিফ এখানে আসছে!’
লোলা এক টুকরো কাপড় নিয়ে হাত মুছতে লাগল, ‘কোনভয় নেই, শেট৷ শেরিফের সঙ্গে আমিই কথা বলেছি৷’
লোলার ব্যবহারে অবাক হয়ে গেলাম৷ ও এত শান্ত, সহজ, নির্বিকার ভাবে কথাগুলো বলল, যে বিশ্বাসই হতে চায় না৷
অবশ্য শেরিফের আগমনে লোলার ভীত হওয়ার কোন কারণ নেই৷ ভয়টা আমার—কারণ ফার্নওয়ার্থ থেকে আমিই পালিয়ে এসেছি, লোলা নয়৷ আর ধরা পড়লে আমাকেই ফার্নওয়াথে ফিরে যেতে হবে৷ অশরীরী এক আতঙ্ক আমার হৃৎপিণ্ডকে সজোরে আঁকড়ে ধরল৷
আমাকে এবং রয়কে পাশ কাটিয়ে লোলা ঘরে গেল৷ ও চলে যেতেই রান্নাঘরে দরজাটা আস্তে বন্ধ করে দিলাম৷ সঙ্গে সঙ্গেই কানে এল লোলার অকম্পিত কণ্ঠস্বর, ‘কী ব্যাপার, শেরিফ? হঠাৎ এই অবেলায় কী মনে করে?’
রান্নাঘরের দেওয়ালে হেলান দিয়ে রুদ্ধশ্বাসে শুনে চললাম৷ ভয়ে আমার হাত-পা তখন ঘেমে উঠেছে৷ রয়ও দেওয়ালে কান পেতে ওদের কথাবার্তা শুনছে, আর মাঝে মাঝে আড়চোখে আমাকে দেখছে৷
এবার কানে এল শেরিফের স্পষ্ট ভরাট কণ্ঠস্বর, ‘কেমন আছেন মিসেস? বহু দিন পর আপনার সঙ্গে দেখা হল—’
উত্তরে লোলার অস্পষ্ট স্বর শুনতে পেলাম, ‘আছি একরম—’
‘মি. জেনসনকে একটু ডেকে দিন তো—কয়েকটা কথা আছে৷’
‘কার্ল তো এখানে নেই, বাইরে গেছে৷’ লোলার স্বর অত্যন্ত সহজ এবং স্বাভাবিক৷ কল্পনার চোখে যেন দেখতে পেলাম, শেরিফের মুখোমুখি লোলা দাঁড়িয়ে আছে—সবুজ চোখে শূন্য নিষ্পাপ দৃষ্টি৷ অভিব্যক্তিহীনমার্কা শেরিফের পক্ষে তো নয়ই৷ কিন্তু কেন জানি না, শেরিফের দেখার পর থেকে কিছুতেই সহজ হতে পারছি না৷
‘মি. জেনসন এখানে নেই?’ লোলার কথায় শেরিফ অবাক হয়েছেন মনে হল, ‘আশ্চর্য ব্যাপার! মি. জেনসন কোনদিন এ জায়গা ছেড়ে গেছেন বলে তো আমার মনে পড়ে না!—আচ্ছা, কোথায় গেছেন বলুন তো?’
‘কী জানি কোথায় গেছে!’ লোলার কণ্ঠস্বরে ফুটে উঠল নিস্পৃহ অবহেলার সুর, ‘বলে তো গিয়েছিল, কয়েক জায়গায় ঘোরাঘুরি করবে৷ হয়তো অ্যারিজোনা কিংবা কোলোরাডোয় আছে—ঠিক জানি না৷ ও তো গিয়ে পর্যন্ত একটা চিঠিও দেয়নি৷’
‘কবে ফিরবে, সে-সম্বন্ধে কিছু বলে গেছে?’
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা৷ তারপর কানে এল লোহার শীতল স্পষ্ট উত্তর, ‘আমার তো মনে হয় কার্ল আর ফিরবে না!’
শেরিফের মুখ দিয়ে একটা বিস্ময়সূচক শব্দ বেরিয়ে এল৷ অবাক হয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘ফিরবে না? কী বলছেন আপনি?’
‘হ্যাঁ, ঠিক বলছি৷ কার্ল আমাকে ছেড়ে চলে গেছে৷’
অনেকক্ষণ কারুর মুখে কোন কথা নেই৷ বুঝলাম, শেরিফ তাঁর অনুসন্ধানী দৃষ্টি মেলে লোলার মুখের দিকে চেয়ে আছেন—ওর কথার সত্যতা যাচাই করছেন৷ আর লোলাও মুখে পরে রয়েছে শূন্য করুণ দৃষ্টির মুখোশ যা ভেদ করে ওর মনোভাব বোঝা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়৷
এবার রয়ের দিকে তাকালাম৷ রয়ও আমার মতোই উদ্গ্রীব হয়ে ওদের কথাবার্তা শুনছিল৷ আমার চোখে চোখ পড়তেই ও ভ্রুকুটি করে মাথা নাড়ল৷
এবার শুনলাম, শেরিফ একটু দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে বলছেন, ‘ও, তাই নাকি?—কিন্তু মিসেস জেনসন, আপনি কি করে বুঝলেন, মি: জেনসন আপনাকে—’
শেরিফকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে লোলা বলে উঠল, ‘কোন স্বামী তার স্ত্রীকে ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে অন্য মেয়েকে বিয়ে করেছে, এ-ঘটনা তো আজ নতুন নয়!’ লোলার কণ্ঠস্বর এবার ধারালো হয়ে উঠল, ‘কিন্তু এসবে আপনার কি দরকার বলুন তো, শেরিফ? কার্ল কি করল না করল, সে আমি বুঝব—আপনি এতে নাক গলাচ্ছেন কেন?’
শেরিফ বোধ হয় একটু থতিয়ে গেলেন৷ কারণ কানে এল তাঁর অস্বস্তিভরা কণ্ঠস্বর, ‘আমি দুঃখিত, মিসেস জেনসন৷ মি. জেনসন যে আপনার সঙ্গে এরকম ব্যবহার করতে পারেন, তা আমার মনেও আসেনি তাই আপনাকে জিগ্যেস করছিলাম—’
‘না, এতে কার্লের খুব একটা দোষ নেই—দোষ আমারই৷ কারণ, ওর মতো বয়স্ক লোককে বিয়ে করে আমি খুব ভুল করেছি৷ বিয়ের পর থেকেই ওর সঙ্গে আমার বনিবনা হত না৷ এতদিন যে আমরা কি করে একসঙ্গে কাটালাম, ভাবতেই অবাক লাগছে—তবে কার্ল আমাকে এ জায়গাটা দিয়ে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছে৷ না হলে, আমাকে হয়তো না খেয়েই মরতে হত!—কিন্তু কার্লের সঙ্গে আপনার কী দরকার তা তো বললেন না, শেরিফ? অবশ্য আমাকে বলতে যদি আপনার অসুবিধে না থাকে—’
শেরিফ সশব্দে গলা ঝাড়লেন, ‘আপনার এখানে জ্যাক প্যাটমোর নামে একটা লোক কাজ করে শুনলাম—?’
ভয়ে আমার বুক কেঁপে উঠল৷ তাড়াতাড়ি একটা হাতিয়ারের সন্ধানে রান্নাঘরের চারদিকে একবার চোখ বোলালাম৷ মাংস কাটার ছুরিটা টেবিলের উপরেই পড়েছিল৷ চটকরে হাত বাড়িয়ে ওটা তুলে নিলাম৷ যা ঘটে ঘটুক—ফার্নওয়ার্থে আমি কিছুতেই যাব না! ওই জলহস্তী শেরিফ ব্যাটা যদি ভেবে থাকে, আমাকে জ্যান্ত গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাবে, তবে ভীষণ ভুল করবে!
রয় আমাকে ছুরিটা তুলতে দেখেই ইশারায় বারণ করল৷ দেখলাম, বিপদের আশঙ্কায় ওর মুখ সাদা হয়ে গেছে৷ আমার মুখের ভাবে ও বোধ হয় বুঝতে পারল, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আমি কিছুতেই ধরা দেব না৷ কিন্তু শেরিফের রিভলভারের কথা চিন্তা করেই ও আমাকে নিরস্ত করতে চাইল৷ কিন্তু একবার বুঝল না আমার মনের অবস্থা বুঝল না, ফার্নওয়ার্থের চেয়ে যে-কোন মৃত্যু আমার কাছে শ্রেয়৷
এবার শুনতে পেলাম লোলার উত্তর, ‘প্যাটমোর? হ্যাঁ, ও এখানে কাজ করে৷ কার্ল যাবার আগে ওকে এখানে চাকরিতে ঢুকিয়ে ছিল—আর আমার কাজের সাহায্যের জন্যে একজন লোক তো এমনিতেই দরকার, তাই ওকে আর ছাড়াইনি—৷’
‘ও—৷ আচ্ছা, ওকে একবার ডাকুন তো৷ ওর সঙ্গে আমি কয়েকটা কথা বলতে চাই৷’
‘তা বেশ তো—দেখুন, ও বোধহয় গুমটিঘরে রয়েছে—’ লোলার স্বর অত্যন্ত স্পষ্ট ও স্বাভাবিক৷ সম্ভবত আমাদের শোনবার জন্যই৷
রয় নিঃশব্দে আমার কাছে এগিয়ে এল, ফিসফিস করে বলল, ‘তুই এখানে থাক, আমি দেখছি৷’
‘মনে রাখিস, জ্যাক প্যাটমোর—শেট নয়৷’
ও আমাকে আশ্বাস দিয়ে পিঠে আস্তে করে চাপড় মারল, ‘কোন ভয় নেই৷’
কথা শেষ করে রয় রান্নাঘরের খিড়কি-দরজার দিকে এগোল৷ দরজা খুলে বাইরের গরম বালির উপর দিয়ে রয় গুমটিঘরের দিকে হেঁটে চলল৷
লোলা তখন শেরিফকে বলছে, ‘যান, জ্যাকের সঙ্গে কথা বলে দেখুন৷ আমি আপনাকে বাধা দেবার কে!’
‘হ্যাঁ, দেখছি৷’ শেরিফের পায়ের শব্দ দরজার দিকে এগিয়ে চলল৷
এমন সময় লোলা বলে উঠল, ‘রিক্স কি প্যাটমোরের নামে আপনাকে কিছু বলেছে, শেরিফ?’
‘হ্যাঁ—কেন বলুন তো?’ শেরিফ থমকে দাঁড়ালেন৷
‘কী বলেছে? প্যাটমোর ওকে মেরেছে?’
কিছুক্ষণ নীরবতার পর শেরিফের জবাব কানে এল, ‘হ্যাঁ৷’
লোলার স্বর এবার রুক্ষ হল, ‘প্যাটমোর কেন ওকে মেরেছে, সে-কথা জর্জ আপনাকে বলেছে?’
‘না৷ রিক্স বলছিল, এই প্যাটমোর লোকটা নাকি অকারণেই ওকে মেরেছে৷ তা ছাড়া প্যাটমোরের স্বভাব-চরিত্রও খুব—’
‘তাহলে আসল কারণটা রিক্স আপনাকে বলেনি৷ প্যাটমোর কেন ওকে মেরেছে জানেন? রিক্স আমাকে বেশ্যা বলেছে বলে৷’ লোলার কণ্ঠে অভিযোগের রূঢ় সুর, ‘প্যাটমোরের জায়গায় যদি আপনি হতেন, তবে আপনিও রিক্সকে মারতেন, তাই না?’
শেরিফ কাশলেন, একটু আমতা-আমতা করে বললেন, ‘হ্যাঁ—তবে আসল কথা কী জানেন, রিক্সের কথা আমি যে পুরোপুরি বিশ্বাস করেছি, তা নয়—’
এমন সময় খাবার ঘরের দরজা খোলার শব্দ পেলাম৷ পরক্ষণেই কানে এল রয়ের গলা, ‘সুপ্রভাত, শেরিফ৷’
‘তোমার নামই জ্যাক প্যাটমোর?’
‘হ্যাঁ—কী হয়েছে?’
দরজার গায়ে কান পেতে একাগ্রচিত্তে শুনতে লাগলাম ওদের কথোপথন৷ এর পর শেরিফ রয়কে কি প্রশ্ন করবেন কে জানে!
কিন্তু শেরিফের পক্ষে কেবল রিক্সের বর্ণনা শুনে রয়কে চিনে ফেলা অত্যন্ত কঠিন হবে৷ কারণ বর্তমানে গোঁফ রাখার ফলে, আমার এবং রয়ের চেহারা দাঁড়িয়েছে প্রায়ই এক রকম৷ সুতরাং রয়কে প্যাটমোর বলে ভুল করা শেরিফের পক্ষে অত্যন্ত স্বাভাবিক৷
শেরিফ তাঁর জলদ-গম্ভীর স্বরে রয়কে প্রশ্ন করলেন, ‘রিক্স বলছিল, তুমি নাকি ওকে মেরেছ—সত্যি নাকি?’
লোলা অত্যন্ত চতুরভাবে রয়কে ঘটনার সূত্র ধরিয়ে দিল৷ শেরিফের কথা শেষ হতে-না-হতেই ও বলে উঠল, ‘এইমাত্র শেরিফকে বলছিলাম, রিক্স আমাকে বেশ্যা বলে গালাগাল দিয়েছে বলেই তুমি ওকে মেরেছ৷’
‘হ্যাঁ, মেরেছি৷’ রয় হালকা স্বরে জবাব দিল, ‘এবং আর একটা কথা আপনাকে বলে রাখি, শেরিফ—রিক্স যদি আবার এখানে কোনদিন আসে, তাহলে শুধু যে ওকে মারবই তা নয়, ঠ্যাঙদুটো পর্যন্ত ভেঙে দেব৷’
শেরিফ হঠাৎ এক অদ্ভুত প্রশ্ন করে বললেন, ‘এখানে চাকরিতে ঢোকার আগে তুমি কোথায় থাকতে প্যাটমোর?’
মাংসকাটা ছুরির বাঁটে আমার পাঁচ আঙুল সজোরে চেপে বসল৷ দাঁতে দাঁত চেপে রুদ্ধশ্বাসে চরম মুহূর্তের অপেক্ষা করতে লাগলাম৷
কিন্তু রয় বেশ ব্যঙ্গের সুরেই জবাব দিল, ‘ওকভিল, ক্যালিফোর্নিয়া৷ শুনুন শেরিফ, আমাদের গ্রামে কোন ভদ্রঘরের মেয়েকে রিক্সের মতো কোন ছুঁচো যদি গালাগাল দেয়, তবে আমরা তা সহ্য করি না৷ যদি প্রয়োজন মনে করেন, আপনি আমার হাতের ছাপ নিতে পারেন—’
‘হয়েছে, হয়েছে—তোমাকে আর বেশি চালাক সাজতে হবে না৷’ বিরক্তস্বরে শেরিফ রয়কে বাধা দিলেন, ‘এ অঞ্চলে কোন নতুন লোক এলে, তার সম্বন্ধে আমার খবর রাখা দরকার বলেই জিগ্যেস করছি৷’
লোলা সঙ্গে সঙ্গে অযাচিতভাবে বলে উঠল, ‘লোহালক্কড়ের ব্যবসার মাধ্যমে কার্লের সঙ্গে প্যাটমোরের পরিচয় হয়৷ তারপর কার্লই ওকে এখানে নিয়ে আসে৷’
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর শেরিফ উত্তর দিলেন, ‘সবই মানলাম, কিন্তু প্যাটমোর, তুমি একটু সাবধানে থেক৷ একটু ঘুষি খরচা করার আগে দশবার ভেব, বুঝলে?’
‘আপনি তাহলে রিক্সকেও বলে দেবেন—একটা কথা বলার আগে যেন একশবার ভাবে!’ একটু রুক্ষ স্বরেই রয় জবাব দিলেন৷
‘ঠিক আছে, রিক্সকে আমি সাবধান করে দেব৷’
‘ওকে আরও বলবেন, এদিকে যেন আর না আসে৷ জর্জ সবসময়েই খালি টাকার জন্যে আমাকে জ্বালাতন করে৷’ লোলা বিরক্তস্বরে বলল৷
‘হ্যাঁ, আমি জানি৷ মি. জেনসনও আমাকে অনেকবার এই কথা বলেছিলেন—রিক্স নাকি টাকার জন্যে দিনরাত তাঁকে জ্বালাতন করে—’
অনেকক্ষণ সব চুপচাপ৷ তারপর শেরিফের সহানুভূতিপূর্ণ কণ্ঠস্বর কানে এল, ‘মি. জেনসন আপনাকে ছেড়ে চলে গেছেন শুনে আমি আন্তরিক দুঃখিত, মিসেস জেনসন—’ একটু কাশলেন শেরিফ, ‘আশা করি অল্পদিনের মধ্যেই মি. জেনসন তাঁর ভুল বুঝতে পারবেন—’
কিন্তু লোলার নিস্পৃহ স্বর শেরিফকে নিরাশ করল, ‘সে নিয়ে আপনারা আর ভেবে কি করবেন৷ কার্ল যদি আমাকে ছেড়ে সুখে থাকতে পারে, তো আমিও পারব৷’
‘সে তো খুব ভালো কথা৷’ কিন্তু শেরিফের কথার সুরে তা মনে হল না, ‘তবে মি. জেনসন যে এ জায়গা ছেড়ে চলে যাবেন, ভাবতেই পারিনি—শুনেছি এখানেই নাকি তাঁর জন্ম হয়েছিল—’
এতক্ষণ ধরে শেরিফের কথা শুনে শুনে লোলা বোধ হয় বিরক্ত হয়ে উঠেছিল, কারণ শেরিফের কপট সহানুভূতির উত্তরে ও ধারালো স্বরে জবাব দিল, ‘এতে অবাক হওয়ার কী আছে, শেরিফ? কিছু কিছু মেয়ে আছে, যারা পুরুষদের সহজেই, বোকা বানাতে পারে৷ তার ওপর কার্ল যেরকম নির্বোধ—ভাবছি, এখানে আর বেশি দিন থাকব না৷ কিছু টাকাপয়সা জমলেই এ জায়গা ছেড়ে চলে যাব৷ এর মধ্যে কার্ল যদি খবর-টবর দেয়, তো ভালো৷ ওকে জানাব এ জায়গা ছেড়ে চলে যাচ্ছি৷ তাতেও যদি ও না ফেরে, তবে এই ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’ বিক্রি করে আমি চলে যাব৷ মোটের ওপর, এখানে আমি আর বেশিদিন থাকছি না৷’
‘হ্যাঁ,—সত্যিই তো৷ আপনার স্বামী যদি আর না ফেরেন, তবে একা-একা দিন কাটাতে আপনার খারাপ তো লাগবারই কথা৷ তার ওপর এ জায়গাটা অত্যন্ত নির্জন৷
‘ঠিকই বলেছেন৷’ লোলা শেরিফের কথায় সায় দিল৷ তারপর শেরিফের কাছ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বলল, ‘অনেকদিন পরে আপনার সঙ্গে দেখা হল, শেরিফ৷ সময় সুবিধে পেলেই এদিকে চলে আসবেন—’
শেরিফ লোলার ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে বললেন, ‘হ্যাঁ—সময় তেমন পাই না৷ তবে আপনার কোন দরকার পড়লেই আমাকে খবর দেবেন, মিসেস জেনসন—কোন দ্বিধা করবেন না৷’
‘ধন্যবাদ৷’
শেরিফের ভারী পায়ের শব্দ দরজার দিকে এগোল, ‘চলি প্যাটমোর—’
‘আবার দেখা হবে, শেরিফ৷’ রয় উত্তর দিল৷
তারপর কানে এল গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ৷ ক্রমশ সে-শব্দ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে মিলিয়ে গেল৷
মাংস-কাটা ছুরিটা টেবিলে নামিয়ে রেখে রুমাল দিয়ে মুখ মুছলাম৷ ভয় ও উত্তেজনা কেটে গিয়ে অনেকটা স্বস্তি ফিরে পেলাম৷
একটু পরেই লোলা আর রয় রান্নাঘরে এসে ঢুকল৷
‘তুই আমাকে বাঁচিয়েছিস৷’ আনন্দে রয়ের হাত চেপে ধরলাম, ‘তুই না থাকলে আজ কি যে হত—’
‘তুমি মিছিমিছি ভয় করছিলে,’ লোলা অধৈর্যভাবে বলে উঠল, ‘তোমাকে তো বলেছিলাম, শেরিফকে আমিই সামলাব—’
রয় আমার পক্ষে নিয়ে উত্তর দিল, ‘তা হোক৷ আমি যদি শেট হতাম, তবে আমিও ভয় পেতাম৷ তা ছাড়া শেটের ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণও ছিল৷’
‘ওঃ, তোমরা পুরুষেরা দেখছি সব সমান!’ লোলা এগিয়ে গিয়ে মুরগিগুলোর দিকে আবার মনোযোগ দিল৷
রয় মুচকি হেসে দরজার দিকে পা বাড়াল৷
‘সত্যি রয়, তোর জন্যই আজ এই বিপদের হাত থেকে—’
রয় থমকে ঘুরে তাকাল, ‘তুই এমনভাবে বলছিস, যেন তুই আমার জন্য কোনদিন কিছু করিসনি৷—আরে শালা, কৃতজ্ঞতাবোধ বলেওতো কিছু একটা আছে!’
ও চলে যেতেই লোলার কাছে গেলাম৷ কিছুক্ষণ চুপচাপ ওকে লক্ষ্য করলাম তারপর বললাম, ‘আজ রাতে আমার আর সিনেমায় যাওয়া হবে না, লোলা৷’
লোলা ভুরু কুঁচকে আমার দিকে ফিরে তাকাল, ‘তার মানে?’
‘আমি আজ আর ওয়েন্টওয়ার্থে যাব না৷’
‘কেন?’
‘বুঝতেই তো পারছ! শেরিফ যদি হঠাৎ আমাদের দেখে ফেলেন, তবে?’ ওর নির্বুদ্ধিতার আমার ভীষণ রাগ হল, ‘শেরিফ এখন জানেন রয়ই প্যাটমোর৷ তাহলে, তার সঙ্গে দেখা হলে আমার পরিচয় কি দেব?’
‘তার সঙ্গে দেখা যে হবেই, একথা তুমি ভাবছ কেন?’
‘কোন অনিশ্চয়তার মধ্যে গিয়ে আমি নিজের বিপদ ডেকে আনতে চাই না—এবং তুমি সেটা ভালোভাবেই জান৷’
‘তাতে কী হয়েছে? ওই পেটমোটা শেরিফটার সঙ্গে দেখা হওয়ার ভয়ে তুমি ওয়েন্টওয়ার্থে যাবে না? এর কোন মানে হয়?’
‘তুমি বুঝতে পারছ না—শেরিফের মাথায় যদি একবার ঢোকে, এখানে কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে, তাহলে বিপর্যয়ের কিছু বাকি থাকবে না৷’ গলার স্বর নীচু করে লোলাকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম, ‘মনে কর, যদি ও জেনসনের দেহ খুঁজে পায়? তখন তুমি কি করবে? পারবে এমন নিশ্চিন্ত থাকতে?—আমি জানি তুমি পারবে না—কারণ জেনসনকে তুমি গুলি করেছ৷’
‘তাই বুঝি? তোমার ওই শেরিফ সেটা প্রমাণ করতে পারবে?’
অবাক চোখে লোলার দিকে চেয়ে রইলাম৷ মনে মনে কেমন যেন অস্বস্তি অনুভব করলাম৷ লোলা বলে কী!
‘যাকগে, এসব কথা এখন বাদ দাও৷ আমরা দুজনেই যখন ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছি, তখন দুজনেই সাবধান থাকতে হবে৷ তুমি চাইলেও কোন ঝুঁকি আমি নিতে পারব না৷’
লোলা নিস্পৃহভাবে ঠোঁট উলটে কাঁধ ঝাঁকাল৷ তারপর ফিরে দাঁড়িয়ে আবার কাজে মন দিল, ‘ঠিক আছে—আমি তাহলে একাই যাব৷’
ওর কথার একটা চাপা অভিমান লক্ষ্য করলাম৷ তাই এগিয়ে গিয়ে ওকে কাছে টেনে নিলাম, ‘রাগ করো না, লক্ষ্মীটি—কেন বুঝতে পারছ না—’
লোলা আমার হাত ছাড়িয়ে নিল, ‘কাজের সময় বিরক্ত করো না৷ তোমার কোন কাজ না থাকতে পারে, কিন্তু আমার আছে৷’
‘ঠিক আছে, তোমার যা খুশি তাই কর৷’
লোলা মুখ ফিরিয়ে আমার দিকে তাকাল—ওর সবুজ চোখদুটো যেন পাথরে খোদাই করা—বরফের মতো শীতল, নিষ্প্রাণ৷ ‘শেট, আজ রাতে বাংলোয় আমি একা থাকতে চাই৷ তুমি রয়ের ঘরে গিয়ে থেকো৷’
‘শোন, লোলা—’
‘আমি কি বলছি, তা আশা করি বুঝতে পারছ? তুমি হয়তো ভুলে গেছ, আমিই এ জায়গাটার মালিক—তুমি নও৷ রয়ের সঙ্গে তোমার যখন এতই বন্ধুত্ব, তো যাও—ওর কাছে গিয়েই রাত কাটাও৷’
লোলার চোখের তারায় অতলান্ত ঘৃণার ছায়া৷ মনে মনে শঙ্কিত হয়ে পড়লাম৷ বিশ্বাসই হতে চাইল না, লোলা আমাকে এই কথাগুলো বলছে৷
‘ঠিক আছে, আমাকে যদি তোমার এত অসহ্যই মনে হয়, তবে—’
‘আর বিরক্ত করো না—যাও৷ কোন পুরুষত্বহীন কাপুরুষের সঙ্গে আমি রাত কাটাতে চাই না৷ যাও, রয়ের সঙ্গে গল্প কর গিয়ে৷’
রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম৷ সশব্দে বন্ধ করে দিলাম ঘরের দরজা৷
লোলার সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গতার শেষ হল সেই দিনই৷ কিন্তু আশ্চর্য, রয়ের সদাহাস্যময় উপস্থিতি আমাকে ভুলিয়ে দিল এই বিচ্ছেদের কথা৷ লোলার সঙ্গ আমার কাছে আর আগের মতো অপরিহার্য ঠেকল না৷ গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতি রাতে যখনই বাংলোয় গেছি, অনুভব করেছি জেনসনের অশরীরী অপস্থিতি৷ লোলার মোহময় সান্নিধ্য আর তত ভালো লাগেনি৷ জেনসনের বিছানায় শোওয়ামাত্রই মনে হয়েছে, যেন অনধিকার প্রবেশ করেছি৷ কিন্তু পরক্ষণেই লোলার উষ্ণ আলিঙ্গনে পারিপার্শ্বিক পৃথিবী লুপ্ত হয়েছে মনের আকাশ থেকে৷ তবু রোজ রাতে বাংলোয় ঢুকবার সময় কখনও কখনও মনে হয়েছে, ফিরে যাই৷
সুতরাং, লোলার সিদ্ধান্ত একরকম আমাকে খুশিই করল৷ জিনিসপত্র সব বাংলো থেকে সরিয়ে রয়ের ঘরে নিয়ে তুললাম৷ ও আমার অবস্থা দেখে ঠাট্টা করতে ছাড়ল না, ‘কিরে, আবার তাহলে পুনর্মূষিক ভব?—সত্যি, মেয়েদের মন বুঝে ওঠা ভীষণ কষ্টকর৷ এখন বুঝতে পারছি, জেনসন কেন লোলাকে ছেড়ে কেটে পড়েছে৷ মাইরি, এরকম খাণ্ডারণী বউকে নিয়ে ঘর করা মুশকিল৷—শালা, আমি একা আছি—বেশ আছি৷’
সারাটা দিন লোলা মুখ গোমড়া করে রইল৷ আমার সঙ্গে একটা কথাও বলল না৷ বেলা দশটার সময় ও গাড়ি নিয়ে ওয়েন্টওয়ার্থে চলে গেল৷ লোলা চলে যাওয়ার পর বাংলো থেকে আমার অবশিষ্ট জিনিসপত্রগুলো নিয়ে এলাম৷ কাজ করতে করতে মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছি৷ ভেবেছি, দু-এক দিনেই লোলা ওর ভুল বুঝতে পারবে—আমার কাছে আবার ফিরে আসবে৷
রয় বাইরে একটা গাড়ি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বাংলোয় আমি একাই ছিলাম৷ হঠাৎ .৪৫ রিভলভারটার কথা মনে পড়ায় ড্রয়ারের কাছে গেলাম৷ একদম উপরের ড্রয়ারটা খুলতেই চমকে উঠলাম৷ চোখের সামনে যেন একটা কালো পর্দা নেমে এল৷ কোন এক অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নিলাম৷
.৪৫ রিভলভারটা ড্রয়ারে নেই৷
একমাত্র লোলা ছাড়া ওটা কেই বা নেবে! সুতরাং সারা ঘর আঁতিপাঁতি করে খুঁজলাম৷ যেন রিভলভারটার উপরেই নির্ভর করছে আমার জীবনমরণ৷
সারা বাংলো তন্নতন্ন করে খুঁজেও ওটার সন্ধান পেলাম না৷ রিভলভারটা যেন সম্পূর্ণ হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে৷ কিন্তু রিভলভারটায় লোলার কি প্রয়োজন! নিতান্ত উদ্দেশ্যহীনভাবেই কি ও .৪৫টা সরিয়েছে!
বাকিদিনটুকু ও রিভলভারের চিন্তাতেই কেটে গেল৷ কাজ করতে করতে খালি ভেবেছি .৪৫টার কথা৷ খুঁজেছি ওটাকে সরানোর কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ—কিন্তু সবই নিষ্ফল হয়েছে৷ চোখের সামনে ভেসে উঠেছে লোলার ঘৃণাভরা কুটিল চোখ৷ মনে হয়েছে, আমাদের অন্তরঙ্গতার দিনগুলো মিথ্যে স্বপ্ন৷ লোলা ওর চতুর অভিনয়ে আমাকে বোকা বানিয়েছে৷
রাত একটা পর্যন্ত রয়ের সঙ্গে বাইরে কাটালাম৷ কিন্তু লোলার ফিরবার কোন লক্ষণই দেখা গেল না৷ অবশেষে কিছুটা হতাশ হয়েই রয়কে নিয়ে ঘরে ফিরে চললাম৷
আমার বিছানা ঠিক জানালার পাশে৷ রাত প্রায় তিনটের সময় একটা গাড়ির শব্দ কানে আসায় জানালা দিয়ে উঁকি মারলাম৷ দেখি লোলার মার্কারি বাইরে বালির উপর দাঁড়িয়ে আছে৷ আর লোলা শ্লথ পায়ে ফিরে চলেছে বাংলোয়৷ একবার ইচ্ছে হল, বাংলোয় গিয়ে রিভলভারের কথাটা ওকে জিগ্যেস করি—কিন্তু কি ভেবে সে ইচ্ছে ত্যাগ করলাম, কাল সকালেই ওকে রিভলভার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করব৷ আবার শুয়ে পড়লাম, কিন্তু রাতে ঘুম এল না৷
পরদিন সকালে লোলা যখন খাবার ঘরে এল, তখন এগারোটা বাজে৷ রয় আলুর খোসা ছাড়ানোয় ব্যস্ত ছিল, আর আমি গত রাতে এঁটো প্লেটগুলো ধুয়ে রাখছিলাম৷ লোলা গম্ভীরমুখে ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়াল৷ রয়ের দিকে চেয়ে একবার হাসল৷ আমাকে যেন দেখেও দেখল না৷
রয় আমাকে লক্ষ্য করে মুচকি হেসে চোখ টিপল৷ তারপর হাতের কাজ ফেলে রেখে উঠে দাঁড়াল—চোখের একটা ইশারা করে এগিয়ে চলল দরজার দিকে৷ রয় চলে যেতেই লোলাকে প্রশ্ণ করলাম, ‘রিভলভারটা কোথায়?’
লোলা স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে জবাব দিল,‘ওটা আমি লুকিয়ে ফেলেছি৷’
‘কোথায়?’
‘ওয়েন্টওয়ার্থে সাবার পথে রাস্তার পুঁতে ফেলেছি৷—কেন, তোমার কি সন্দেহ হচ্ছে?’
লোলা মিথ্যে বলছে কি সত্যি বলছে কে জানে!
‘কেন— পুঁতে ফেলেছ কেন?
‘তোমার তো কারণটা বোঝা উচিত, শেট৷ পুলিশ যদি রিভলভারটা খুঁজে পেত, তাহলে কি আমাকে ছেড়ে দিত মনে করছ? ওরা সহজেই বুঝতে পারত, ঐ রিভলভারের গুলিতেই কার্ল মারা গেছে, তাই না?’
লোলার কথাগুলো পুরোপুরি যুক্তিসঙ্গত৷ কিন্তু তবু কোথায় যেন একটা খটকা লাগছে৷ বার বার মনে হচ্ছে, ও হয়তো মিথ্যে বলছে৷
‘আর—শেট, আমি আর একটা কথা ভাবছিলাম—’
‘কী কথা?’
‘এখন তোমার বন্ধু রয় তো এখানে রয়েছে, সুতরাং এ জায়গা দেখাশোনা করতে তোমার আর অসুবিধে হওয়ার কথা নয়৷ তাই ঠিক করেছি, আমি এ জায়গা ছেড়ে চলে যাব৷’
‘সেটা কী ঠিক হবে?’
‘কেন, ঠিক না হওয়ার কী আছে? তোমাকে তো আমি প্রথম থেকেই বলেছি, এখানে থাকতে আমার ভালো লাগছে না৷ এতদিন কোন লোক না পাওয়ায় তোমাকে একা রেখে যেতে পারিনি৷ কিন্তু এখন রয় এসেছে৷ সুতরাং, তোমার আর অসুবিধে হওয়ার কথা নয়—’
‘শেরিফ যখন শুনবে, তুমি এ জায়গা ছেড়ে চলে গেছ, তখন কি সন্দেহ করবে ভেবে দেখেছ?’
‘কিছুই সন্দেহ করবে না৷ তুমি ওকে বলবে, আমি কার্লের কাছে গেছি৷ আর এখানকার দেখাশোনার ভার তোমার আর রয়ের ওপরেই রয়েছে৷’
‘তুমি একটা কথা ভুলে যাচ্ছ, লোলা৷ এখানকার প্রতিটি পুলিশ-ফাঁড়িতে আমার চেহারার বিবরণ—এমন কি ফটো পর্যন্ত রয়েছে৷ তুমি চলে গেলে আমার পক্ষে নিরাপদে থাকা অসম্ভব৷ অতএব, এ জায়গা ছেড়ে যাওয়া তোমার হবে না৷’
লোলার চোখজোড়া হায়েনার মতো জ্বলজ্বল করে উঠল, ‘কার্লের সিন্দুক তোমাকে খুলতেই হবে, শেট—কারণ আমার টাকা আমি চাই৷ টাকা পেলেই, আমি এ সপ্তাহের শেষে ‘‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’’ ছেড়ে চলে যাব৷ দেখি কে আমাকে আটকায়!’
‘ওসবে কোন লাভ হবে না, লোলা৷ তিনটে কারণে এ জায়গা ছেড়ে তোমার যাওয়া চলবে না৷ প্রথমত, এখানে সবসময় আমাকে আত্মগোপন করে থাকতে হবে৷ তুমি চলে গেলে সবাই মনে করবে রয় একাই এ জায়গা দেখাশোনা করছে৷ আর তাতে শেরিফ যদি সন্দেহ করে বসে, তবে অবাক হবার কিছুই নেই৷ তারপর শেরিফ এসে আমাকে দেখলেই ষোলকলা পূর্ণ হবে৷ দ্বিতীয়ত জেনসনের মৃতদেহ আশেপাশেই কবর দেওয়া হয়েছে৷ পুলিশ যদি খোঁড়াখুঁড়ি করে সে মৃতদেহ খুঁজে পায়, তবে তোমার ভবিষ্যৎ অন্ধকার৷ তোমাকে জেলে নিয়ে ঘানি ঘোরাতে হবে৷ কারণ কার্লকে গুলি যখন তুমিই করেছ, তার ফলও তোমাকেই ভোগ করতে হবে৷ আর তৃতীয়ত, সিন্দুক আমি খুলছি না—এবং টাকাও তুমি পাবে না৷ কারণ, টাকা পেয়ে গেলেই তুমি আমার বিপদ ডেকে আনবে৷ হয়তো পুলিশকে বলবে, জেনসনকে আমিই খুন করেছি৷ কিন্তু এ-কথাটা তুমি যাতে পুলিশকে না বলতে পার, সেদিকে আমি বিশেষ যত্ন নেব, বুঝেছ৷’
আমার উত্তরের প্রতিটি শব্দ মিছরির ছুরির মতো লোলার গায়ে কেটে বসল৷ ভেবেছিলাম, রাগে হতাশায় অন্ধ হয়ে ও হয়তো ভীষণ কিছু একটা করে বসবে৷ কিন্তু লোলা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল গায়ের রং ফ্যাকাশে, চোখে অন্ধকারের ছায়া, মুখে কষ্টকৃত প্রশান্তির ভাব৷
‘এ ব্যাপারে এই কি তোমার শেষ কথা, শেট?’ শান্ত স্বরে লোলা প্রশ্ন করল৷ ওর চোখের দৃষ্টি আমার চোখে স্থির৷
‘হ্যাঁ৷’
‘তাহলে তোমাকে একটা কথা জানিয়ে রাখা ভালো৷ তিন-তিনটে বছর এই হতচ্ছাড়া জায়গায় আমি পড়ে থেকেছি—ধৈর্য ধরে সুযোগের অপেক্ষা করেছি৷ আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে আমি পারব৷ অধৈর্য হওয়ার মতো ছেলেমানুষ আমি নই৷ এ জায়গা ছেড়ে চলে আমি যাবই—আর যখন যাব, তখন তোমার হয়তো দুঃখ হবে পরিণতির কথা ভেবে৷ হয়তো মনে হবে, আমাকে এখন যেতে দিলেই ভালো করতে—’
‘তুমি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ, লোলা? তবে শোন, রয় যে কার্লের সিন্দুক খুলতে পারবে না, তা নয়৷ কিন্তু ভুলক্রমেও ওকে দিয়ে সিন্দুক খোলানোর কথা চিন্তা করো না৷ কারণ, রয় যদি সিন্দুক খুলে দেখে ওতে কি আছে, তবে সব টাকা ও-ই নিয়ে নেবে৷ এ বিষয়ে তুমি নিশ্চিন্তে থেক৷ ভেব না, ও তোমার যৌবনের মায়াজালে ধরা দেবে৷ তা যদি হত, তবে আমি রয়কে এখানে চাকরি দিতাম না৷ ওকে আমি ছোটবেলা থেকেই চিনি৷ মেয়েদের উপস্থিতিই রয়ের কাছে অসহ্য এবং বিরক্তিকর৷ তুমিও তো বারকয়েক চেষ্টা করে দেখেছ, কোন লাভ হয়েছে কি? রয়ের জীবনে সবচেয়ে প্রথমে যার স্থান, তা হল টাকা৷ সিন্দুক খুলে টাকাগুলো দেখলেই ও তোমাকে খুন করবে৷ তারপর সমস্ত টাকা নিয়ে চলে যাবে৷ ও টাকা তুমি আর কোনদিন পাবে না৷ অতএব, তোমার যদি এতই টাকার প্রয়োজন থাকে, তবে যাও—রয়কে সিন্দুক খুলতে বলো৷’
কথা শেষ করে বাইরে পা বাড়ালাম৷ লোলা তখনও একদৃষ্টে আমার দিকে চেয়ে আছে৷
রয় বাইরে পাম্পের কাছটা ঝাঁট দিচ্ছিল, আমাকে আসতে দেখেই মুখ তুলে দেঁতো হাসি হাসল, ‘কীরে, মানভঞ্জন-পালা শেষ হল?’
‘উহুঁ৷ লোলা বড় কঠিন ঠাঁই৷’ আমি নতুনভাবে, রয়কে দেখতে লাগলাম৷ মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করলাম—সত্যিই কি রয়কে বিশ্বাস করা চলে! ও যদি এতদিনকার সংযম ভুলে লোলার যৌবনের ফাঁদে পা দেয়! কিন্তু ওর নির্বিকার, কঠোর ভাব আমাকে আশ্বস্ত করল৷ মনে হল রয়কে আমি বিশ্বাস করতে পারি৷
‘মেয়েদের সঙ্গে কখন নরম ব্যবহার করবি না, শেট৷ তাহলেই ওরা পেয়ে বসবে৷ শুধু শুধু একটা মেয়ের জন্য তুই নিজে কষ্ট পাবি৷ ছেড়ে দে, ও নিয়ে আর ভাবিস না৷ লোলার সঙ্গে তোর যদি বনিবনা না হয়, তো অন্য মেয়ে দেখ৷ বাজারে মেয়ের অভাব নেই৷’
‘তুই ঠিকই বলেছিস, রয়—তবে আমার কি মনে হয় জানিস? এবার লোলা হয়তো তোর সঙ্গে ভাব জামাবার চেষ্টা করবে৷ তোমাকে আগে থেকেই জানিয়ে রাখলাম৷ দেখিস, সাবধানে থাকিস৷’
রয় হেসে উঠল, ‘ভীষণ মজার ব্যাপার তো! ঠিক আছে, আসুক লোলা৷ এ থেকে ওর বিশেষ সুবিধে হবে না৷ তুই তো আমাকে জানিস—কিন্তু ওর উদ্দেশ্যটা কি বল্ তো? আমার সঙ্গে ভাব জমিয়ে, তোকে উল্লু বানাবার চেষ্টা? না অন্য কিছু?’
একবার মনে হল, রয়কে সিন্দুকের কথা বলে দিই৷ কিন্তু পরমুহূর্তেই সে ইচ্ছে ত্যাগ করলাম৷ কারণ, রয় যদি একবার জানতে পারে সিন্দুকে কি আছে, তবে ওর পক্ষে স্থির থাকা মুশকিল হবে৷ হয়তো সিন্দুক খোলার জন্য আমাকেই চাপ দেবে৷ আর যাই করি, সিন্দুক আমি খুলছি না!
‘সম্ভবত আমাকে একটু ঈর্ষাকাতর করে তুলতে চায়—অন্য কিছু নয়৷’
রয় আপনমনেই মাথা নাড়ল, ‘ওঃ, মেয়েদের পক্ষে সব সম্ভব!’
পর পর তিনটে দিন লোলা একাই কাটাল৷ আমার সঙ্গে কথাবার্তা একেবারেই বন্ধ করে দিল৷ কিন্তু আমার তাতে একটুও অসুবিধে হল না৷ কারণ, এখন রয়ই হল আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী৷
রোজ রাতে বাইরের উঠোনে আমরা তাস খেলে সময় কাটাতাম৷ মাঝে-মাঝে দরকার পড়লে খেলা ছেড়ে উঠে গিয়ে গাড়িতে তেল-মোবিল দিয়ে আসতাম৷ তারপর ফিরে এসে আবার শুরু করতাম৷ খেলাটা নিরামিষ না হলেও, টাকা-পয়সার লেনদেন ঠিক তখনই হত না৷ একটুকরো সাদা কাগজে আমরা পরস্পরের দেখাপাওনার হিসেব টুকে রাখতাম৷
একেই রয় আমার চেয়ে ভালো খেলে, তার উপরে ভালো তাস পড়ায় ও রোজই জেতে৷ চারদিনের দিন রাতে খেলার সময় ও হঠাৎ ঠাট্টার সুরে বলল, ‘শেট, এর মধ্যেই তোর পাঁচশো ডলার দেনা হয়ে গেছে৷ এখন থেকে সাবধান না হলে কিন্তু বিপদে পড়বি৷’
‘ভয় নেই, টাকা ঠিক পেয়ে যাবি৷’ ওর দিকে চেয়ে হাসলাম, ‘আপাতত খেলায় মন দে৷ নয়তো বেশিক্ষণ আর জিততে পারবি না৷’
‘জানিস, আমি এই পাঁচশো ডলার পেলে কী করব? তাস ভাঁজতে ভাঁজতে রয় বলল, ‘সামনের সপ্তাহেই রেস শুরু হচ্ছে৷ একটা দারুণ ঘোড়া ওই রেসে দৌড়চ্ছে৷ ওটার পেছনে যদি এই পাঁচশো ডলার লাগাতে পারি, তবে আমার পাঁচ হাজার ডলার আমদানি ঠেকায় কে!’ উত্তেজনায় রয় শিস দিয়ে উঠল, ‘চিরকাল আমি একটা বড়সড় দাঁও মারার আশঙ্কায় অপেক্ষা করেছি৷ এতদিনে বোধ হয় আর আমার সে আশা পূর্ণ হবে৷’
আমার মনে পড়ল সিন্দুকের পড়ে-থাকা এক লাখ ডলারের কথা৷ রয় যদি ওই টাকার কথা জানত, তবে কি ভাবত কে জানে৷
‘মনে কর তুই এত টাকা পেলি৷ তারপর ওই টাকা দিয়ে কী করবি?’
রয় চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল, ‘সেসব আমি অনেক আগেই ভেবে রেখেছি, শেট৷ পাঁচ হাজার ডলার পেলে আমি একটা নামী ক্যামেরা-কোম্পানির অংশীদার হয়ে যেতে পারব৷ সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকের সঙ্গে আমার পরিচয়ও আছে৷ তার বর্তমানে আর কিছু মূলধনের প্রয়োজন৷—আর আমি যদি হাজার পনেরো ডলার দিতে পারি, তো একাই মালিক হয়ে বসতে পারব৷ ওফ শেফ, যদি হাজার পনেরো ডলার পেতাম৷
‘তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে৷ ও-সব ক্যামেরার ব্যবসা-ট্যাবসা করে কখনও কেউ বড়লোক হতে পারেনি—পারবেও না৷ বিশেষ করে ওই সামান্য পুঁজি নিয়ে৷’
‘আমি ঠাট্টা করছি না, শেট৷ সত্যি বলছি, পাঁচ হাজার ডলারে বিশেষ সুবিধে হবে না—কিন্তু পঞ্চাশ হাজার পেলে আমাকে কেউ ঠেকাতে পারবে না৷’
রয়ের কথায় চেয়ারে নড়েচড়ে বসলাম৷ অস্বস্তিভরে জবাব দিলাম, ‘পঞ্চাশ হাজার ডলার! অত টাকা কোত্থেকে পাবি, শুনি?—ও-সব আজগুবি চিন্তা ভুলে যা৷’
‘ইচ্ছে করলে ছ-মাসেই আমরা টাকাটা যোগাড় করতে পারি, শেট৷’ রয় সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে আমার চোখে চোখ রাখল, ‘তোকে যে-ব্যবসার কথা বলেছিলাম, মনে আছে?—আমরা হেলিকপ্টারে করে সেইসব লোকদের এখানে নিয়ে আসব৷ তারপর এখান থেকে তাদের ট্রপিকা স্প্রিংস আর ওয়েন্টওয়ার্থে পাঠাবার ব্যবস্থা করব৷ তাহলে আর দেখতে হচ্ছে না৷ দু-দিনের আমরা লাল হয়ে যাব৷’
‘রয়, মনে আমার আছে৷ কিন্তু আমার উত্তরটা বোধহয় তোর মনে নেই৷’ দৃঢ়স্বরে রয়কে জানালাম, ‘কোন ঝামেলায় আমি নিজেকে আর জড়াতে চাই না৷ তোর যদি এখানে ভালো না লাগে, তো খোলাখুলি বল্৷ তুই থাকাতে আমার কোন আপত্তি নেই, কিন্তু তুই যা চাইছিস, তা আমি এখানে হতে দেব না৷ তোকে অন্য জায়গা দেখতে হবে৷’
রয় তাস বাঁটতে শুরু করল৷ ও মুখ নীচু করে তাস দিতে থাকায় ওর মুখের ভাব দেখতে পেলাম না কিন্তু কানে এল ওর শান্ত গম্ভীর কণ্ঠস্বর, ‘সেটা তোর খুশি৷ তবে আমাকে বেশ কিছু টাকা জোগাড় করতেই হবে৷ এ ছাড়া বড়লোক হওয়ার আর তো উপায় দেখছি না৷ হয়তো আরও কিছুদিন এখানে থাকতে পারি, কিন্তু তার বেশি নয়—অনন্তকাল ধরে আমি এখানে পড়ে থাকতে পারব না৷ কিছু টাকা রোজগারের উপায় আমাকে যে করে হোক বের করতেই হবে৷’
‘বোকার মতো কাজ করিস না!’ তীক্ষ্ণস্বরে বলে উঠলাম, ‘তুই প্রথমবারের মতো আবার বিপদে পড়বি৷ এখানে তোর অসুবিধেটা কী? নিজের খুশিমতো কাজ করছিস, থাকছিস, খাচ্ছিস—কেউ কোন কথা বলতে আসছে না৷ কথায় বলে না, সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়! তোর টাকার লোভ বড় বেশি৷ যদি একবার ফার্নওয়ার্থ থেকে ঘুরে আসতিস—’
‘সে-কথা আমি জানি শেট৷’ আমাকে হাত তুলে বাধা দিল রয়, ‘কিন্তু ফার্নওয়ার্থে তোকে যেতে হত না৷ তুই সেদিন বোকার মতো রাস্তার দিকে ছুটেছিলি বলেই—’
‘বাদ দে ওসব কথা৷ যদি খেলার ইচ্ছে থাকে তো খেল৷’
আমরা আরও কয়েক দান খেললাম৷ খেলার প্রতি রয়ের মনোযোগ না থাকায় শেষ দান ক-টা আমিই জিতলাম৷ বেশ বুঝলাম রয় তখনও সেই ব্যবসার কথাই ভাবছে৷ একসময় হঠাৎ ও হাতের তাস টেবিলের উপর ফেলে দিল, ‘ছেড়ে দে, আজ আর খেলব না৷ ভীষণ ক্লান্ত লাগছে, যাই শুয়ে পড়ি গিয়ে৷’
আজ রাতে কাজ করার দায়িত্ব আমার৷ কিন্তু অন্যান্য দিন রয় সবসময় আমার কাছেই থাকে৷ গাড়ির ভিড় কমলে আমরা একসঙ্গেই শুতে যাই৷ কিন্তু আজ এই প্রথম একা শুতে যাচ্ছে৷
ওকে মনের কথা না জানিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই বললাম, ‘ঠিক আছে—যা৷’
রয় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল৷ আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলল, ‘সকালে আবার দেখা হবে, শেট৷ আমি চললাম৷’
রয় হেঁটে চলল ওর ঘরের দিকে৷ চুপচাপ বসে ওকে লক্ষ্য করতে লাগলাম৷ একটু পরেই ওর ঘরের আলো জ্বলে উঠল৷ চোখ ফিরিয়ে দেখি, বাংলোয় লোলার ঘরে তখনও আলো জ্বলছে৷
দুটো আলোকিত জানালা আমার কাছে বয়ে নিয়ে এল এক অনুচ্চারিত ইঙ্গিত৷ মনে হল, রয় হঠাৎ আমার বিপক্ষে গিয়ে দাঁড়িয়েছে৷ ও যেন আমাকে একা ফেলে রেখে হাত মিলিয়েছে লোলার সঙ্গে৷ মনে হল এই ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’-এ আমি বড় একা—বড় নিঃসঙ্গ৷
