দশ
ছটি রাস্তায় ভাগ করা চওড়া বড় সড়কটা এমনিতেই গাড়ির ভিড়ে জমজমাট, তার ওপর বেশ কয়েকটা গাড়ি তাদের পিছনে একটা করে ক্যারাভ্যান টেনে নিয়ে চলেছে৷
থেকে থেকেই উড়ন্ত হোভার প্লেন নেমে আসছে মাথার ওপর—উড়ে চলেছে প্রধান সড়ক ধরে—যেন চলমান যন্ত্রযানদের প্রত্যেকটিকে সে পরখ করে দেখছে৷ এবং পরখ করার প্রতিটি মুহূর্তেই কিটসনের বুক দুরুদুরু করে কেঁপে উঠছে৷
মাঝে মাঝে কয়েকটা বড়সড় ট্রাকের ওপর ঢাকনা খুলে অনুসন্ধান করে দেখছে পুলিশের দল৷ কিন্তু একটা ক্যারাভ্যানকেও তারা সন্দেহবশে থামাল না৷ হয়তো তাদের ধারণা, অত ভারী ট্রাকটাকে বয়ে নিয়ে যাওয়া ক্যারাভ্যানের মতো কোনও হালকা জিনিসের পক্ষে সম্ভব নয়৷
তবু ওই পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রেখে, ঠিক তিরিশ মাইল বেগে গাড়ি চালানো কঠিন বইকি! অসীম প্রচেষ্টায় দুঃসাহসী ইচ্ছাকে সংযত করে গাড়ি চালাতে লাগল কিটসন৷
দীর্ঘ ছ-ঘণ্টা ধরে ওরা গাড়ি ছুটিয়ে চলল৷
জিনি কিটসনের পাশে নির্বাকভাবে বসে; কিটসনও যেন কথা বলার কোনও আন্তরিক তাগিদ খুঁজে পাচ্ছে না৷
রাস্তায় যখনই কোনও পুলিশের গাড়ি অথবা মোটর বাইকে চোখে পড়েছে, তখনই ওরা আতঙ্কে সিঁটিয়ে উঠেছে৷ মোটের ওপর সহজ সাবলীলভাবে কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে এই সময়টুকু তাদের কাছে নিতান্তই অনুপযুক্ত মনে হয়েছে৷
পাহাড়ি রাস্তায় ওরা যখন পৌঁছল, তখন সন্ধে সাতটা৷
সূর্য অস্ত গেছে দূর পাহাড়ের আড়ালে, এবং একই সঙ্গে অন্ধকার নেমে এসেছে৷ কিটসন ততক্ষণে বিপরীতমুখী বাঁকের প্রথম সারি অনায়াসেই পার হয়ে গেছে৷
পথ যতই যেতে লাগল, গাড়ি চালানো ততোই দুরূহ হয়ে উঠতে লাগল৷ কিটসন জানে, বাঁকের দূরত্ব অনুমানে সামান্যতম ভুলচুক হলেই ক্যারাভ্যান সমেত গড়িয়ে পড়তে হবে অতল খাদে৷ বাঁচবার কোনও আশাই থাকবে না৷
সে বুঝল, ক্যারাভ্যান ও ট্রাকের পিছুটান বুইকের গতিকে ক্রমশই শ্লথ করে তুলেছে৷ অ্যাকসিলেটারের কাছ থেকে তেমন আশাব্যঞ্জক সাড়া পাচ্ছে না কিটসন। সে চিন্তিত হয়ে পড়ল৷ কারণ কিটসন জানে আরও কুড়ি মাইল পরেই দেখা মিলবে রুক্ষ, খাড়াই রাস্তার, সে রাস্তা আরও অ-নে-ক বিপজ্জনক৷
কিটসন চোখ ফেরাল থার্মোমিটারের দিকে—ডায়ালের পয়েন্টার ক্রমশ স্বাভাবিক থেকে উত্তপ্ত অংশের দিকে এগোচ্ছে৷
‘আর কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়িটা গরম হয়ে পড়বে৷’ জিনিকে জানাল সে, ‘ট্রাক ও ক্যারাভ্যানের ওজনের জন্যেই এই অবস্থা হচ্ছে৷ আমাদের সামনের কুড়ি মাইল রাস্তা মোটামুটি এইরকম—তারপরেই শুরু হবে আসল বিপদ৷’
‘কেন, এর চেয়েও খারাপ রাস্তা?’ জিনি প্রশ্ন করল৷
কিটসন সতর্কভাবে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে একটা বাঁকে মোড় নিল৷ গাড়িটাকে আবার আয়ত্তে এনে জিনির দিকে চোখ ফেরাল, ‘খারাপ? সেই রাস্তার তুলনায় এই রাস্তা তো শ্বেতপাথরে বাঁধানো৷ গত সপ্তাহে এক প্রচণ্ড ঝড়ে সেই রাস্তা একরকম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে৷ সারানো আর হয়ে ওঠে—নি। হবেও না৷ অবশ্য এই রাস্তাটা কেউ কখনও ব্যবহার করে না৷ সকলেই ডুকাসের সুড়ঙ্গ পথটা ধরে যাতায়াত করে৷’
আরও মাইল তিন-চারেক যাওয়ার পর থার্মোমিটার এসে থামল স্ফুটনাঙ্কের ঘরে৷ অগত্যা বাধ্য হয়েই গাড়ির গতি কমিয়ে আনল কিটসন, তারপর একসময় দাঁড়িয়ে পড়ল রাস্তার পাশে৷
‘গাড়িটা কিছুক্ষণ ঠান্ডা হোক, তারপর আবার চালানো যাবে৷’ গাড়ি ছেড়ে নেমে পড়ল কিটসন৷ গোটাকয়েক বড় বড় পাথরের টুকরো নিয়ে গাড়ির চাকায় আটকে দিল সে৷ জিনি হাতল ঘুরিয়ে খুলে দিল ক্যারাভ্যানের দরজা৷
কিটসন ঘুরে গিয়ে উঁকি মারল ক্যারাভ্যানের ভেতরে৷ ঘন অন্ধকারে ব্লেক বা সে, কারও পক্ষেই কাউকে দেখা সম্ভব ছিল না৷ কিন্তু ওরই মধ্যে ব্লেক অনুভব করল কিটসনের উপস্থিতি৷
‘কী হল, থামলে কেন?’ সে জানতে চাইল৷
‘ইঞ্জিন ভীষণ গরম হয়ে পড়েছে৷ একটু ঠান্ডা হওয়া দরকার, তাই থামালাম৷’
ব্লেক আড়ষ্ট দেহে নেমে দাঁড়াল ক্যারাভ্যান থেকে৷ এগিয়ে গেল রাস্তার ধারে৷ বুক ভরে শ্বাস নিল ঠান্ডা পাহাড়ি বাতাসে৷
‘হুঁ, আমরা তাহলে অনেকটা পথই এসে পড়েছি৷ ওপরে পৌঁছতে আর কতটা পথ বাকি?’
‘প্রায় ষোলো মাইল৷ খারাপ রাস্তার এখনও সবটাই বাকি৷’
‘কী মনে হয়, শেষটুকু নির্বিঘ্নে পার হওয়া যাবে তো?’
কিটসন মাথা নাড়ল, ‘কী জানি! এই ক্যারাভ্যান ও ট্রাকের ওজন তো নেহাত কম নয়! শুধু ক্যারাভ্যানটা টেনে তোলাই সমস্যা হয়ে উঠবে, ট্রাকের কথা তো ছেড়েই দিলাম৷’
জিনি এসে দাঁড়াল ওদের পাশে।
‘এক কাজ করা যাক। ট্রাকটা বের করে চালিয়ে নিয়ে চলো।’ ও প্রস্তাব দিল, ‘এখন যথেষ্ট রাত হয়েছে, সুতরাং বিপদের কোনও ভয় নেই।’
ব্লেক ইতস্তত করল।
‘ট্রাকটাকে ওপরে তোলার এটাই একমাত্র পথ।’ জিনির প্রস্তাবে সায় দিল কিটসন, ‘এবং এ কাজটা যে খুব একটা সহজ হবে তা আমি বলছি না।’
‘তাই করা যাক তাহলে, কিন্তু কেউ যদি আমাদের দেখে ফেলে তাহলে সর্বনাশের আর কিছু বাকি থাকবে না।’
জিপো এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল ক্যারাভ্যানের পাশে, চুপচাপ শুনছিল ওদের কথা এখন সে মুখ খুলল, ‘কিন্তু আমরা যাচ্ছি কোথায়? আর কতদূর?’
পাহাড়ের একেবারে ওপরে একটা হ্রদ আছে—আর আছে ঘন জঙ্গল। যদি আমরা সেখানে পৌঁছতে পারি,তাহলে সমস্ত সমস্যারই সমাধান হয়ে যাবে।’
কিটসন জবাব দিল।
‘কিন্তু ট্রাকটাকে চালিয়ে নিয়ে যেতে গেলে প্রথমে ব্যাটারির তার দুটোকে আবার লাগিয়ে নিতে হবে—জিপো, এদিকে এসো! ভূতের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে না থেকে একটু কাজের কাজ করো। ব্যাটারির তার দুটোকে লাগিয়ে দাও চটপট।’ ব্লেক খেঁকিয়ে উঠল জিপোকে লক্ষ করে।
একটা শাবলের সাহায্যে ট্রাকের বনেট ভেঙে যখন ওরা ব্যাটারির তার-লাগানোর কাজ শেষ করল, ততক্ষণে বুইকের ইঞ্জিন অনেকটা ঠান্ডা হয়ে গেছে।
‘বুইকের সঙ্গে ট্রাকটাকে আরও কিছুক্ষণ টেনে নিয়ে গেলে কেমন হয়?’ ব্লেক বলল। কারণ ট্রাকটাকে ক্যারাভ্যানের বাইরে আনার ব্যাপারে সে নিতান্তই অনিচ্ছুক।
‘সেটা না করলেই ভালো হয়।’ কিটসন জবাব দিল, ‘কারণ রাস্তার খাড়াই ক্রমশ বাড়ছে। কিছুদূর যাওয়ার পর বুইকের ইঞ্জিন আবার গরম হয়ে উঠবে, তখন আবার আমাদের রাস্তার ধারে অপেক্ষা করতে হবে।’
ব্লেক কাঁধ ঝাঁকাল। তারপর উঠে বসল ট্রাকের ভেতরে। ইঞ্জিন চালু করে ট্রাকটাকে পিছিয়ে আনতে লাগল ক্যারাভ্যানের পাটাতন বেয়ে।
‘তোমরা আগে আগে বুইক নিয়ে চলো।’ কিটসনকে লক্ষ করে সে বলল, ‘জিপো আর আমি ট্রাক নিয়ে তোমাদের পিছু পিছু আসছি। আমি ট্রাকের হেডলাইট জ্বালছি না। তোমাদের গাড়ির পেছনের লাল আলো দেখেই আমি পথ চিনতে পারব।’
কিটসন ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল। তারপর উঠল গিয়ে বুইকে, জিনির পাশে। সে গাড়ি চালু করতেই জিনি জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ট্রাকটাকে দেখতে চেষ্টা করল।
আবার শুরু হল ওদের পথ চলা। ট্রাকের ক্লান্তকর ওজনের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে বুইকটা সহজ গতিতে, সগৌরবে চড়াই রাস্তা বেয়ে উঠতে লাগল।
‘ওরা ঠিকমতো ফলো করছে তো?’ কিটসন প্রশ্ন করল।
‘হ্যাঁ। কিন্তু একটু আস্তে চালাও; বাঁক নেওয়ার সময় ওরা পিছিয়ে পড়ছে।’
এইভাবে মিনিট কুড়ি চলার পর ওরা এসে পৌঁছল রাস্তার সেই বিধ্বস্ত অংশের কাছে।
কিটসন হেডলাইট জ্বালিয়ে গাড়ি থামাল।
‘তুমি গাড়িতেই থাকো। আমি সামনে গিয়ে রাস্তার অবস্থাটা দেখছি।’
কিটসন গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গেল ট্রাকের কাছে। ব্লেককে জানাল, সে সামনের রাস্তাটা একবার পরীক্ষা করতে যাচ্ছে।
বুইকের হেডলাইটের আলোয় ওরা তাকাল রাস্তাটার দিকে। রাস্তাটা সোজা উঠে গেছে ওপরে—প্রায় লম্বভাবে। বড় বড় পাথর, নুড়ি সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে রাস্তার ওপর।
‘আরে সর্বনাশ!’ ব্লেক অবিশ্বাসের সুরে বলে উঠল, ‘আমাদের কি এই রাস্তা বেয়ে উঠতে হবে?’
‘হ্যাঁ।’ কিটসন মাথা নাড়ল, ‘কাজটা যে কঠিন তাতে সন্দেহ নেই—তবে অসম্ভব নয়। প্রথমে আমাদের ওই বড় বড় পাথরগুলোকে রাস্তার মাঝখান থেকে সরাতে হবে।’
সে এগিয়ে চলল রাস্তা ধরে৷ বড় পাথরগুলোকে ধাক্কা দিয়ে গড়িয়ে দিতে লাগল রাস্তার ধারে৷
সমস্ত বড় পাথরগুলো সরিয়ে, পথ পরিষ্কার করতে ওদের তিনজনের প্রায় আধঘণ্টা লেগে গেল৷ প্রায় পাঁচশো গজ ধরে রাস্তাটার ওই রুক্ষ অবস্থা, তারপর থেকেই সেটা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে৷
‘যাক, মনে হয় এতেই কাজ হবে৷’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল কিটসন, ‘এই পর্যন্ত আসতে পারলেই বাকিটা আমরা সহজে পার হতে পারব৷’
ওরার তিনজনে আবার ঢাল বেয়ে নেমে চলল দাঁড়িয়ে থাকা বুইকের কাছে৷
‘খুব আস্তে আস্তে গাড়ি চালাবে৷’ ব্লেককে বলল কিটসন, আর সবসময় গাড়িকে প্রথম গিয়ারে রাখবে৷ হেডলাইট জ্বালাতে ভুলো না যেন৷ তবে আর যাই করো গাড়ি এক মুহূর্তের জন্যেও থামবে না৷ যদি একবার থামো, তাহলে নতুন করে আর চাকার জোর পাবে না৷
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে—’ বিরক্ত হয়ে বলে উঠল ব্লেক, ‘কী করে গাড়ি চালাতে হয় সেটা আর তোমাকে শোখাতে হবে না, তুমি তোমারটার দিকে খেয়াল রেখো, আমি আমরাটা দেখব৷’
‘আমি একেবারে ওপরে না ওঠা পর্যন্ত তুমি কিন্তু ট্রাক নিয়ে উঠতে শুরু কোরো না৷ হয়তো প্রথমবারের চেষ্টায় আমি সফল নাও হতে পারি৷ আর যদি আমাকে গাড়ি পেছিয়ে নেমে আসতে হয়, তাহলে তোমার ট্রাক আমার রাস্তা বন্ধ করুক তা আমি চাই না৷’
‘ঠিক আছে, এখন বেশি বকবক না করে কাজ শুরু করো৷’ কিটসনকে খিঁচিয়ে উঠল ব্লেক৷
কিটসন কাঁধ ঝাঁকিয়ে এগিয়ে গেল বুইকের দিকে৷ উঠে বসল গাড়িতে৷
হেডলাইট জ্বালিয়ে সে গিয়ার নামিয়ে দিল প্রথম ঘরে৷ তারপর অ্যাকসিলারেটারে প্রয়োজনীয় চাপ দিয়ে সে গাড়িটাকে এগিয়ে নিয়ে চলল খাড়াই রাস্তা ধরে৷
প্রয়োজনের তুলনায় বুইকের শক্তির কমতি নেই৷ কিন্তু পিছনে বাঁধা ক্যারাভ্যানের—খালি হলেও—ওজন সে শক্তি হ্রাসের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াল৷ থেকে থেকেই গাড়ির পিছনের চাকা দুটো নিরালম্ব হয়ে বিদ্যুবেগে ঘুরতে লাগল৷ সেইসঙ্গে পাথরের টুকরো, শুকনো মাটি ছিটকে পড়তে লাগল চাকার দু-পাশে৷
জিনি সামনের দিকে ঝুঁকে বসেছিল—চোখের দৃষ্টি রইল রাস্তার দিকে৷ গাড়ির গতিপথে কোনও বড় পাথর পড়লেই জিনি কিটসনকে আগে থেকেই সাবধান করে দিচ্ছে৷
বুইকের গতি এখন আরও কমে গেছে৷ স্টিয়ারিং হুইল শক্ত হাতে চেপে আপন মনেই শাপশাপন্ত করছে কিটসন৷ তার পা নির্মমভাবে চেপে বসেছে অ্যাকসিলারেটারে৷ গাড়ির প্রচণ্ড কাঁপুনি অনুভব করছে সে৷
যে মুহূর্তে তারা থামবে, সেই মুহূর্তেই ঘটবে চরম সর্বনাশ৷ ভাবল কিটসন! সে আচমকা বাঁক নিল ডানদিকে, যাতে ক্যারাভ্যানের সরাসরি পিছুটানটা কিছুটা কমে যায়৷ এবং পরমুহূর্তেই আবার বাঁ-দিকে বাঁক নিল সে৷ ওইভাবে সেই সরু রাস্তায় একবার ডান দিক, একবার বাঁ-দিক করে সহজাত দক্ষতার সঙ্গে রাস্তার ধার বাঁচিয়ে সে বুইক নিয়ে এগিয়ে চলল৷
গাড়ির গতি ক্রমশ বেড়ে উঠল৷
রেডিয়েটারের জল ইতিমধ্যেই ফুটতে শুরু করেছে, সেইসঙ্গে গাড়ির ভেতরটাও হয়ে উঠেছে, অসহ্য গরম৷ হেডলাইটের আলোয় চোখে পড়ল সামনের স্বাভাবিক রাস্তা৷
‘ওঃ আর একটু৷’ উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠল জিনি, ‘আমরা প্রায় এসে গেছি৷’
সম্ভবত এই বিশেষ মুহূর্তের জন্যেই বুইকের কিছুটা শক্তি কিটসন সংরক্ষিত রেখেছিল৷ এবার সে অ্যাকসিলারেটার চেপে ধরল গাড়ির মেঝের ওপর৷ গাড়ির পিছনের চাকা প্রথমটা নিরালম্ব হয়ে ঘুরতে লাগল, তারপর গাড়ির পিছন দিকটা সামান্য ডান দিকে সরতেই চাকায় জোর পাওয়া গেল৷ একটা প্রকাণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়ি এবং ক্যারাভ্যান রাস্তার স্বাভাবিক অংশে উঠে পড়ল—এবং সঙ্গে-সঙ্গেই তার গতিবেগ বাড়তে শুরু করল৷
গাড়িটা রাস্তার পাশে দাঁড় করাল কিটসন৷
‘যাক, আমরা তাহলে শেষ পর্যন্ত পেরেছি৷’ কিটসন সাফল্যের হাসি হাসল, ‘ওফ্৷ আমি তো ভাবলাম বোধ হয় হয়ে গেল৷’
‘তোমার এলাম আছে, আলেক্স৷ এরকমভাবে গাড়ি চালানো নেহাত সোজা ব্যাপার নয়৷’
কিটসন ওর দিকে চেয়ে হাসল৷ ব্রেক আটকে নেমে পড়ল গাড়ি থেকে৷
ব্লেক ততক্ষণে ওপরে উঠতে শুরু করেছে। কিন্তু কিটসনের বুইকের মতো প্রয়োজনীয় শক্তি তার ট্রাকের ছিল না। অবশ্য বুইকের মতো একটা ভারী ক্যারাভ্যানকেও তাকে টেনে তুলতে হচ্ছে না।
‘ও বড্ড বেশি তাড়াতাড়ি উঠছে।’ কথাগুলো বলে কিটসন ঢাল বেয়ে দৌড়ে নামতে শুরু করল—সোজা ট্রাকের হেডলাইট লক্ষ করে।
ওপরে ওঠার জন্যে ব্লেকের তাড়াহুড়োর অন্ত ছিল না। সে অ্যাকসিলারেটার চেপে ধরেছে গাড়ির মেঝেতে—প্রয়োজনীয় মুহূর্তের জন্যে সামান্যতম শক্তিও সে অবশিষ্ট রাখছে না।
হেলতে দুলতে লাফাতে-লাফাতে ট্রাকটা বন্ধুর পথ ধরে ওপরে উঠতে লাগল। ব্লেকের পাশে বসা জিপো ট্রাকের ঝাঁকুনিতে বারবারই ছিটকে পড়তে লাগল দরজার গায়ে।
‘ওঃ—সাবধানে চালাও!’ জিপো আর্তনাদ করে উঠল, ‘তুমি বড্ড বেশি জোরে চালাচ্ছ!’
‘থামো!’ ব্লেক চিৎকার করে বলল, ‘আমার সে খেয়াল আছে।’
ট্রাকের হেডলাইটের উজ্জ্বল আলোয় জিপো দেখল ওদের সামনে রাস্তায় পড়ে এক বিশাল পাথর।
‘সাবধান!’ বিকট স্বরে চিৎকার করে উঠল জিপো।
কিন্তু ব্লেক সাবধান হওয়ার আগেই ট্রাকের সামনে ডান দিকের চাকাটা ধাক্কা মারল পাথরটার গায়ে। এই আকস্মিক সংঘর্ষে ট্রাকটা ছিটকে গেল বাঁ-দিকে। ব্লেক সামাল দেওয়ার আগেই গাড়িটা হেলে পড়ল খাদের দিকে; আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে গেল গাড়ির ইঞ্জিন।
ট্রাকটাকে একটা বিপজ্জনক কোণে হেলে পড়তে দেখে জিপো ভয়ার্ত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, ‘গাড়িটা উলটে পড়ছে।’ পাগলের মতো ট্রাকের ডানদিকে দরজা ধরে টানাটানি শুরু করে দিল সে। কিন্তু ট্রাকটা হেলে থাকার দরুন, এবং দরজার অস্বাভাবিক ওজনের জন্য জিপোর সমস্ত প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হল।
‘চুপ করে বসে থাকো, গাধা কোথাকার!’ খেঁকিয়ে উঠল ব্লেক, ‘তোমার নড়াচড়ার জন্যেই গাড়িটা এবার ওলটাবে!’
কিটসন ছুটে এল ওদের কাছে।
ট্রাকটার এই বিপজ্জনক অবস্থা তাকে শঙ্কিত করে তুলেছে। সে লাফ দিয়ে উঠল দরজায় লাগোয়া পাটাতনের ওপর। শরীরের সমস্ত ওজন দিয়ে ডান দিকের ঊর্ধ্বাভিমুখী চাকা দুটোকে স্থির রাখবার চেষ্টা করল।
‘ইঞ্জিন চালু রেখে গাড়ি আবার পেছতে শুরু করো।’ ব্লেককে বলল সে।
ব্লেকের মুখ উত্তেজনা, আতঙ্কে ঘর্মাক্ত, রক্তিম। কিটসনের কথায় চাপা স্বরে সে খিঁচিয়ে উঠল, ‘এতটুকু নড়বার চেষ্টা করলেই ট্রাকটা খাদে উল্টে পড়বে।’
‘এ ছাড়া আর কোনও উপায় নেই৷ খুব আস্তে-আস্তে ডান দিক চেপে গাড়ি চালু করো৷’
অস্থির হাতে ইঞ্জিন চালু করল ব্লেক৷ তারপর ব্যাক গিয়ার দিয়ে ক্লাচ ছাড়তে শুরু করল৷
‘খুব ধীরে-ধীরে ক্লাচ ছাড়বে৷ যেন ঝাঁকুনি না লাগে৷ তারপর গাড়িটা চলতে আরম্ভ করলেই স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে পেছতে শুরু করবে৷’
চাপা স্বরে খিস্তি করে ক্লাচ ছাড়ল ব্লেক, ট্রাকটা সচল হতেই সে বাঁ-দিকে স্টিয়ারিং ঘোরাতে শুরু করল৷
এক সংক্ষিপ্ত আতঙ্কিত মুহূর্তের জন্যে ব্লেক অনুভব করল ট্রাকের ডান দিকের চাকা দুটো মাটি ছেড়ে শূন্যে উঠে পড়ছে, কিন্তু কিটসনের ওজন চাকার ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করল এবং ধীরে-ধীরে ট্রাকটা পিছিয়ে এসে আবার খাড়াই রাস্তার সোজাসুজি দাঁড়াল৷
ব্লেক এবার ব্যাক গিয়ার থেকে ফাস্ট গিয়ারে গাড়ি আনবার চেষ্টা করতেই ট্রাকটা রাস্তার ঢালের জন্যেই পিছন দিকে গড়াতে শুরু করল৷ সঙ্গে সঙ্গে ব্রেক চেপে ধরল ব্লেক৷
এবং অনিবার্যভাবেই ট্রাকের সচল ইঞ্জিন স্তব্ধ হল৷
‘ঠিক আছে৷ তুমি বেরিয়ে এসো, আমি দেখছি৷’ কিটসনের স্বরে তিরষ্কার ও আদেশের আভাস৷
গজ গজ করতে করতে বাইরে নেমে এল ব্লেক৷ কিন্তু ট্রাক চালানোর দায়িত্ব থেকে রেহাই পেয়ে সে যেন স্বস্তি বোধ করল৷
কিটসন কিছুক্ষণ ধরে ট্রাকটার অবস্থাটা দেখল৷ তারপর মাথা নাড়ল ৷
‘কয়েকটা পাথর নিয়ে এসো৷ পেছনের চাকা দুটো ঠেকা দিতে হবে৷ নইলে ইঞ্জিন চালু করা যাবে না৷’ কথা শেষ করে রাস্তার ধারে এগিয়ে গেল সে৷ একটা বড় পাথরকে কোনওরকমে টানতে-টানতে নিয়ে এল ট্রাকের কাছে৷ তারপর পিছনের চাকার গায়ে নরম মাটিতে ঠেসে ধরল পাথরটা৷
আরেকটা পাথর নিয়ে টলতে টলতে এগিয়ে এল ব্লেক৷ অন্য চাকাটায় ঠেকা দিল৷
কিটসন এবার ট্রাকের ভেতর উঠে বসল, ইঞ্জিন চালু করল৷
জানলা দিয়ে বাইরে মুখ বাড়িয়ে সে বলল, ‘যদি হঠাৎই ইঞ্জিন থেমে যায় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তুমি আর জিপো পেছনের চাকায় ঠেকা দেবে৷ যাতে ট্রাকটা আবার গড়াতে না পারে৷ হয়তো এইভাবেই আমাকে ওপরে উঠতে হবে, কারণ এই মাটিতে ট্রাকের চাকা ভালোভাবে ধরবে না৷’
‘নাও এবার কাজ শুরু করো৷’ ব্লেক বিরক্তিভরে খেঁকিয়ে উঠল, ট্রাকের চাকা নরম মাটিতে বসিয়ে দেওয়ার জন্যে মনে মনে নিজেকেই দায়ী করল সে৷ তার বিরক্তিও অনেকটা সেই কারণেই৷
কিটসন কিছুক্ষণ ধরে ইঞ্জিন চালু রাখল৷ তারপর হ্যান্ড-ব্রেকটা খুলে দিল৷ ট্রাকটা পিছনের পাথরে ভার রেখে দাঁড়িয়ে রইল৷
‘এবার তাহলে সামনে এগোচ্ছি৷’ ব্লেক ও জিপোর উদ্দেশ্যে কথা কটা ছুড়ে দিয়ে আলতা করে ক্লাচ ছাড়তে শুরু করল কিটসন৷
ট্রাকটা ধীরে-ধীরে সামনে এগোতে লাগল৷ ওটার পিছনের চাকা দুটো তেমন জোরালো অবলম্বন না পেয়ে পিছলে গেল, বনবন করে ঘুরতে আরম্ভ করল৷ একই সঙ্গে মাটি, পাথরের টুকরো ছিটকে গিয়ে আঘাত করল পিছনের দাঁড়ানো জিপো ও ব্লেকের গায়ে৷
ওরা সঙ্গে সঙ্গে হাত দিয়ে মুখ আড়াল করে পিছন ফিরে দাঁড়াল আত্মরক্ষার প্রচেষ্টায়৷
কিটসন ট্রাকটাকে সোজা রাখবার চেষ্টা করল, অ্যাকসিলারেটারে পুরো চাপ দিয়ে চেষ্টা করল সামনে এগোতে; কিন্তু ট্রাকের ইঞ্জিনের পক্ষে এতখানি ওজন সামলে রাখা সম্ভব হল না৷ ইঞ্জিন স্তব্ধ হল৷ তড়িঘড়ি ব্রেকে চাপ দিল কিটসন৷ এতক্ষণে সে মাত্র গজ দুয়েক দূরে এগিয়েছে৷’
কিন্তু ব্রেক দেওয়া সত্তেও ট্রাকটা গড়িয়ে-গড়িয়ে পিছোতে শুরু করল৷ কিটসন চিৎকার করে ব্লেক ও জিপোকে ডাকল ট্রাক সামলানোর জন্য৷ ওরা এসে পিছনের চাকায় পাথর লাগাতে লাগাতে ট্রাকটা প্রায় গজখানেক পিছিয়ে এল৷
দ্বিতীয় প্রয়াসে কিটসন আরও চার গজ এগিয়ে গেলে, কিন্তু তারপরেই যথারীতি ইঞ্জিন বন্ধ হল৷ এবার ব্লেক, জিপো প্রস্তুত ছিল৷ ইঞ্জিন থামতেই ওরা দৌড়ে এসে পিছনের চাকায় পাথর দিয়ে ঠেকা দিল৷
এইভাবে আধঘণ্টা ধরে চলল ট্রাক চালানোর কাজ৷ কিটসন হ্যাঁচকা মেরে একটু একটু করে এগোয়ে আর ব্লেক ও জিপো এসে পাথরের ট্রাকের পতন রোধ করে৷
অবশেষে ওরা ট্রাক নিয়ে বুইকের পঞ্চাশ গজের মধ্যে পৌঁছে গেল৷ কিন্তু ততক্ষণে তিনজনেই ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে৷ তাই ব্লেক কিছুক্ষণ বিরতির প্রস্তাব করল৷
‘থাক, কিছুক্ষণ পরে আবার শুরু করা যাবে৷ শালার ইঞ্জিনটা একটু ঠান্ডা হোক৷’ ট্রাকের গায়ে হেলান দিয়ে হাঁপাতে লাগল ব্লেক৷
কিটসন ট্রাকের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল৷
‘যাক আর খুব বেশি রাস্তা বাকি নেই৷ এই রাস্তটুকু পার হলেই আর কোনও ভয় নেই৷ ট্রাক ঠিক চলবে৷’
এমন সময় ছুটতে-ছুটতে জিনি নেমে এল ওদের কাছে, কিটসনকে লক্ষ করে বলল, ‘সত্যি, তোমার গাড়ি চালানোর তুলনা নেই৷’
কিটসন খুশি ভরা মুখে ওর দিকে চেয়ে হাসল৷
‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ড্রাইভার কী বলো?’ ব্লেক ব্যঙ্গ করে উঠল, ‘নিঃসন্দেহে নবম আশ্চর্য!’
জিনি তাকাল ব্লেকের দিকে, ‘তোমার তো সে ক্ষমতাটুকুও নেই৷ তবে আর মিছিমিছি ঠাট্টা করে লাভ কী?’
ব্লেক জিনিকে ব্যঙ্গ করে বলে উঠল, ‘আর কারও না পাক, এ ব্যাপারে আলেক্স অন্তত তোমার সাপোর্ট পাবে৷ অতএব, মত পালটে ওকে নিরাশ কোরো না৷’
কথা শেষ করে ব্লেক এগিয় গেল রাস্তার পাশের দিকে৷ একটা পাথরের ওপর বসে সে একটা সিগারেট ধরাল৷
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কিটসনের যখন মনে হল ট্রাকটার ইঞ্জিন যথেষ্ট ঠান্ডা হয়েছে, তখন সে ব্লেককে ডাকল, উঠে বসল ট্রাকের ভেতরে৷
দশ মিনিট পরে ট্রাকটাকে দেখা গেল বুইকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে৷
‘এখন এটাকে ক্যারাভ্যানে ভরে ফেলা যেতে পারে৷’ কিটসন বলল, ‘বুইকের যখন টানতে অসুবিধে হবে না তখন ট্রাকটাকে আড়ালে রাখাই ভালো৷’
সে ট্রাকটাকে চালিয়ে ঢুকিয়ে দিল ক্যারাভ্যানের ভেতরে৷ ব্লেক আর জিপো একই সঙ্গে ক্যারাভ্যানে আশ্রয় নিল৷
ক্যারাভ্যানের দরজা বন্ধ করে কিটসন বুইকের কাছে এগিয়ে গেল৷ স্টিয়ারিং ধরে বসল চালকের আসনে—জিনির পাশে৷
‘তোমার দক্ষতায় আমি অবাক হয়ে গেছি আলেক্স৷ তুমি না থাকলে এ রাস্তা আমরা কোনওদিনই পার হতে পারতাম না৷’
জিনি ঝুঁকে এল সামনের দিকে৷ ওর উষ্ণ ঠোঁট আলতোভাবে কিটসনের গাল স্পর্শ করল৷
তাঁবুর পরদার ফাঁক দিয়ে ছিটকে আসা সূর্যের আলো চোখে পড়তেই ব্লেকের ঘুম ভাঙল৷ চোখ খুলে সে নির্বিকারভাবে তাকিয়ে রইল ওপরের চালু ক্যাম্বিসের ছাদের দিকে৷ সে কোথায় আছে, এই সামান্য কথাটা মনে করতেই তার কয়েকটা দ্বিধাভরা মুহূর্ত কেটে গেল৷
চোখ বন্ধ করল ব্লেক। অনুভব করল সারা শরীরে ক্লান্তির অবসাদ। সারারাত রুক্ষ মেঝেতে শোয়ার ফলে তার হাত-পা সব আড়ষ্ট হয়ে গেছে। ভুরু কুঁচকে পরিস্থিতি অনুমান করার চেষ্টা করল ব্লেক।
যাক, অন্তত লুকোবার জন্য একটা ভালো জায়গা ওরা পেয়েছে। যদি কপাল ভালো থাকে, তাহলে জিপো ট্রাক না খোলা পর্যন্ত বেশ নিরাপদেই এখানে লুকিয়ে থাকা যাবে।
কাছাকাছিই রয়েছে একটা ঝরনা—সুতরাং জলের অভাব নেই। তাছাড়া, তাদের আড়াল করে রেখেছে ঘন জঙ্গল। উড়ন্ত কোনও এয়ারক্র্যাফট যে তাদের দেখে ফেলবে, সে সম্ভবনাও কম। আর বড় রাস্তা থেকে তারা রয়েছেও প্রায় পাঁচশো গজ দূরে।
এই বিধ্বস্ত পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে যে ট্রাকটাকে ওপরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, সেটা কেউ বিশ্বাসই করতে পারবে না। সুতরাং কেউ যে এখানে এসে হারানো ট্রাকের খোঁজ করবে সে সম্ভবনাও কম।
এখন সবকিছু নির্ভর করছে জিপোর ওপর। যদি এমনিতে সে তালা খুলতে না পারে, তাহলে বাধ্য হয়েই তাদের অ্যাসিটিলিন টর্চ ব্যবহার করতে হবে।
চার চারদিন ধরে ট্রাকটাকে হাতের মুঠোতে পেয়েও দশ লাখ ডলার এখনও তাদের নাগালের বাইরে, এ কথা ভাবতেই ব্লেক রাগে জ্বলে উঠল।
চোখ খুলল ব্লেক। চোখ কুঁচকে ঘড়ি দেখার চেষ্টা করল। ছটা-পাঁচ। এবার মাথা তুলে ব্লেক তাকাল শুয়ে থাকা জিনির দিকে। একটা কোটকে ভাঁজ করে, তার ওপরে মাথা রেখে চাদর মুড়ি দিয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে ও।
কিটসন শুয়েছে জিনি ও ব্লেকের ঠিক মাঝখানে—এখনও গভীর ঘুমে অসাড়।
তাঁবুর ভেতর জায়গা খুব একটা বেশি নেই। কিন্তু তবুও ওরই মধ্যে জায়গা করে কোনওরকমে শুয়েছে ওরা। কারণ বাইরের অসহ্য ঠান্ডায় কারও পক্ষে রাত কাটানো সম্ভব নয়।
ব্লেক এবার চোখ ফেরাল জিপোর দিকে৷ এখনও বোধ হয় ব্যাটা নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে—ভাবল সে৷ কিন্তু চোখ ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গেই সে লাফ দিয়ে উঠে বসল৷ তার মুখের পেশি অনিশ্চয়তায় টান-টান৷
তাঁবুতে জিপো নেই৷
এক মুহূর্তের জন্য চিন্তিত হয়ে পড়ল ব্লেক৷ কিন্তু পরক্ষণে জিপোর এই অনুপস্থিতির একটা সম্ভাব্য সমাধান মনে পড়ায় কিছুটা নিশ্চিন্ত হল সে৷ হয়তো জিপো বাইরে গেছে—তাদের জন্যে প্রাতরাশ তৈরি করছে৷
কিন্তু তাকে নিশ্চিত হতে হবে৷ সুতরাং গায়ের চাদর ছুড়ে ফেলে ব্লেক কিটসনকে পা দিয়ে এক ধাক্কা মারল৷ কিটসনের ঘুম ভাঙতেই সে বলে উঠল ‘শিগগির ওঠো! জিপো এর মধ্যেই কাজকর্ম শুরু করে দিয়েছে৷ আমাদের হাতে আজ প্রচুর কাজ৷’
কিটসন মাথা তুলে চোখ পিটপিট করে ব্লেকের দিকে তাকাল৷ তারপর উঠে আড়ামোড়া ভাঙল৷ তাঁবুর দরজার সব থেকে কাছাকাছি থাকায় সেই-ই প্রথম হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল৷ সূর্যের প্রখর আলোয় চোখ পিটপট করতে লাগল কিটসন৷
ব্লেক কিটসনের ঠিক পরেই এল৷ ইতিমধ্যে জিনির ঘুম ভেঙেছে৷ চোখ কচলাতে কচলাতে ও উঠে বসল৷
বাইরের খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে চারপাশে চোখ বোলাল কিটসন, জানতে চাইল, ‘জিপো কোথায়?’
ব্লেক চকিতে তাকাল অদূরে গাছের ছায়ায় দাঁড়ানো ক্যারাভ্যানের দিকে৷ তারপর দেখল ঝরনার দিকে৷
কোথাও জিপোর চিহ্নমাত্র নেই৷
দু-হাতের চেষ্টায় মুখ আড়াল করে সর্বশক্তি দিয়ে তারস্বরে চিৎকার করে উঠল ব্লেক, ‘জিপো ও—ও—’
কোনও উত্তর নেই৷ কিটসন ও ব্লেক, তাকাল পরস্পরের দিকে৷
‘হতভাগাটা আমাদের ছেড়ে সরে পড়েছে৷’ জিঘাংসা-নিষ্ঠুর স্বরে বলে উঠল ব্লেক, ‘মনে হয় পালিয়েই গেছে৷ ওর ওপর আমাদের নজর রাখা উচিত ছিল৷’
জিনি তাঁবু থেকে বেরিয়ে এল৷
‘কী হয়েছে?’
‘জিপো পালিয়েছে৷’ কিটসন জবাব দিল৷
‘তাহলে ও খুব বেশিদূর যেতে পারেনি৷ কারণ মিনিট কুড়ি আগেও ওকে আমি ঘুমোতে দেখছি৷’
‘যে করেই হোক ওকে ফিরিয়ে আনতেই হবে৷’ ব্লেকের গলা ভয়ঙ্কর শোনাল, ‘জিপোকে ছাড়া আমরা অথৈ জলে পড়ব৷ নাঃ, ওর বোধহয় মাথার ঠিক নেই৷ নইলে কুড়ি মাইল পাহাড়ি রাস্তা পায়ে হেঁটে কেউ পালাবার মতলব করে৷ এখান থেকে বড় রাস্তায় পৌঁছতেই ওর ঘণ্টা দশেক লেগে যাবে৷’
কিটসন রাস্তা লক্ষ করে ছুটতে শুরু করল৷ দেখাদেখি ব্লেকও তার সঙ্গ যোগ দিল৷
ঘাসজমির শেষ প্রান্তে গিয়ে তারা থামল৷ তাকাল নীচের আঁকাবাঁকা সরু রাস্তার দিকে৷ পাহাড়ের গাঢ় রঙের পটভূমিকায় রাস্তাটাকে সাদা সুতোর মতো দেখাচ্ছে৷
কিটসন হঠাৎ খামচে ধরল ব্লেকের হাত, আঙুল তুলে দেখাল, ‘ওই যে, জিপো যাচ্ছে৷’
ব্লেক চোখের দৃষ্টিকে কেন্দ্রীভূত করল কিটসন নির্দেশিত দিকে৷ কিছুক্ষণ লক্ষ করার পর সে দেখতে পেল দেড় মাইল নীচে রাস্তা বেয়ে নেমে চলেছে, একটা ছোট সচল বস্তু—জিপো৷
‘ওকে এখনও ধরা যাবে?’ ব্লেকের স্বর উত্তেজিত, ‘একবার ধরতে পারলে ওকে পালানোর ঠেলাটা হাড়ে-হাড়ে বুঝিয়ে দেব৷ চলো, গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি৷’
‘না৷ রাস্তাটা অসম্ভব সরু৷ ওকে ধরতে পারলেও ওই রাস্তায় গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে আসা অসম্ভব৷ তার চেয়ে চলো পাহাড়ের দিক দিয়ে নামতে থাকি, তাহলে দু-মাইল রাস্তা আমরা এক মাইল হেঁটেই পৌঁছে যাব৷’
কথা শেষ করে কিটসন পাহাড়ের গা-বেয়ে নামতে শুরু করল৷ কখনও লাফিয়ে, কখনও বুকে হেঁটে সে খাড়াই বেয়ে ধীরে ধীরে নামতে লাগল৷
ব্লেক ইতস্তত করল৷ এই দুঃসাহসিক কাজটাকে তার ভীষণ বিপজ্জনক মনে হল৷ কিন্তু নিরুপায় হয়েই সে কিটসনকে অনুসরণ করল—তবে তার চেয়ে অনেক ধীর গতিতে সে নামতে লাগল৷
কিছুক্ষণ বাদেই কিটসন রাস্তায় পৌঁছল৷ কিন্তু রাস্তা পেরিয়ে আবার পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে লাগল৷ এখানে পাহাড়ের গা আরও খাড়া, আরও ভয়ঙ্কর৷ সুতরাং সতর্কভাবে, আস্তে-আস্তে নামছে কিটসন৷ একবার আরেকটু হলেই সামনে হোঁচট খেয়ে পড়ছিল, কিন্তু কোনওরকমে শরীরকে পিছন দিকে ছিটকে ফেলে ভারসাম্য রাখল সে এবং গড়িয়ে গড়িয়ে এসে পড়ল রাস্তায় পরবর্তী পাকে৷ একই সঙ্গে কতকগুলো ছোট-বড় পাথরের টুকরো ছিটকে পড়ল নীচে৷ সামান্য আহত হলেও চটপট সে আঘাত সামলে উঠল কিটসন৷ তাকাল নীচের দিকে৷
জিপোকে এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷
ঢালু রাস্তা ধরে বেশ দ্রুতগতিতে সে এগিয়ে চলেছে৷
ব্লেক এসে দাঁড়াল কিটসনের পাশে৷
‘ওই যে, ও যাচ্চে!’ কিটসন আঙুল তুলে জিপোকে দেখাল৷
দাঁত খিঁচিয়ে রিভলভার উঁচিয়ে ধরল ব্লেক৷
‘কী করছ কী?’ কিটসন ব্লেকের কবজি চোপ ধরল, ‘এখন জিপো আমাদের ট্রাক খোলার একমাত্র ভরসা, আর ওকে তুমি খুন করতে চাইছ?’
ব্লেকের মুখমণ্ডল ঘামে ভেসে যাচ্ছে৷ সামান্য শ্বাস নেওয়ার জন্যে তাকে ভীষণভাবে হাঁপাতে হচ্ছে৷ হিংস্রভাবে এক ঝাঁকুনি দিয়ে সে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রিভলভারটা আবার খাপে গুঁজে রাখল৷ তারপর আবার পরের খাড়াই বেয়ে নামতে শুরু করল৷
কিটসন ব্লেককে অনুসরণ করতে যাবে, হঠাৎই ওর চোখে পড়ল জিপোর ওপর৷ সে থমকে দাঁড়িয়েছে৷ চোখ তুলে পাহাড়ের দিকে তাকাল জিপো৷ একমুহূর্ত নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল৷ তারপর ছুটতে আরম্ভ করল৷
‘ও আমাদের দেখে ফেলেছে৷’ চিৎকার করে ব্লেককে জানাল কিটসন৷ তারপর গলা চড়িয়ে সে ডেকে উঠল, ‘জিপো! জিপো! থামো! ফিরে এসো!’
কিন্তু কে শোনে কার কথা! জিপো মরিয়া হয়ে ছুটে চলল৷ ওর পা দুটো যেন সীসের মতো ভারী ঠেসছে, অতিরিক্ত পরিশ্রমে ফুসফুস যেন ফেটে পড়তে চাইছে৷
তার পালানোর এই চেষ্টা যে মূর্খামির ফল, তা সে যেন এতক্ষণে উপলব্ধি করল৷
সকালে তাঁবুতে যখন জিপোর ঘুম ভেঙেছে, তখন ব্লেক, কিটসন ও জিনি তিনজনেই গভীর ঘুমে মগ্ন৷ ওদের ঘুমোতে দেখে এই পালাবার চিন্তা হঠাৎই ওর মাথায় চাড়া দিয়ে উঠেছে৷ হঠাৎ বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে৷
ওদের তিনজনের ঘুম না ভাঙিয়ে সে যে নিরাপদে তাঁবুর বাইরে বেরোতে পারবে, জিপো ভাবতে পারেনি৷ অবশ্য সেজন্য চেষ্টার কসুর করেনি জিপো৷ গায়ের চাদর সরিয়ে অতি সন্তর্পণে উঠে বসেছে৷ হামাগুড়ি দিয়ে ধীরে-ধীরে এগিয়ে গেছে তাঁবুর পরদার দিকে৷ কিটসনের ঘুমন্ত দেহকে অতিক্রম করে বাইরে বেরিয়ে এসেছে৷ সূর্যের পরশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে তার সহজ, সরল সাফল্যকে বিশ্বাস করতে পারেনি৷
কিছুক্ষণ ইতস্তত করেছে জিপো৷ সে জানে বড় রাস্তায় পৌঁছতে তাকে কুড়ি মাইল পাহাড়ি রাস্তা পার হতে হবে৷ তারপর সেখান থেকে কারও গাড়িতে চোপে সে পৌঁছে যাবে তার কারখানায়৷ কিন্তু কুড়ি মাইল পাহাড়ি রাস্তা!
তখন ঘড়িতে পৌনে ছটা৷ সুতরাং জিপো ভেবেছে, কম করে সাতটা আটটার আগে ওদের তিনজনের ঘুম ভাঙবে না৷ তার মানে সে পালাবার জন্যে অন্তত ঘণ্টা দেড় দুই সময় পাবে৷ সে যে ওদের ছেড়ে পালিয়েছে, সেটা বুঝতেও ব্লেক ও কিটসনের কিছু সময় লাগবে৷
সুতরাং সাফল্য সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েই রওনা দিয়েছে জিপো৷ দ্রুতপায়ে ঢালু রাস্তা ধরে চলতে শুরু করেছে৷
এই আধঘণ্টায় সে প্রায় দু-মাইল রাস্তা পার হয়েছে৷ তারপর হঠাৎই অনেক ওপর থেকে ভেসে এসেছে ছোট বড় পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দ৷
চমকে মুখ তুলে তাকাতেই তার চোখে পড়েছে কিটসন আর ব্লেককে৷
ওরা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে নেমে আসছে, কখনও বুকে হেঁটে, কখনও গড়িয়ে কখনও বা একটুর জন্যে পড়তে পড়তে বেঁচে যাচ্ছে৷
ওদের দেখেইে আতঙ্কে হাত-পা পেটে সেঁধিয়ে গেছে জিপোর৷
সে শুনতে পেল কিটসনের চিৎকার, ‘জিপো! থামো! ফিরে এসো৷’
অন্ধের মতো দৌড়তে শুরু করল জিপো৷
কয়েক শো গজ যাওয়ার পরই জিপো বুঝতে পেরেছে, এভাবে সে ওদের সঙ্গে যথেষ্ট দুরত্ব বজায় রাখতে পারবে না৷ তাই আবার সে পিছনে ফিরে দেখল৷
ব্লেক তখন পাহাড়ের গা-বেয়ে নামছে৷ তারপর জিপোর দৃষ্টি সামনেই রাস্তায় পৌঁছল সে৷ কিটসন তার পিছন-পিছন গোড়ালিতে ভয় দিয়ে সরসর করে নেমে আসছে৷ সেইসঙ্গে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে অজস্র পাথরের টুকরো, শুকনো ধুলোর মেঘ কিটসনকে যেন আড়াল করে দিতে চাইছে৷
ফাঁদে পড়া ভয়ার্ত শিকারের মতো রাস্তা ছেড়ে পাহাড়ের ঢালের দিকে ছুটে চলল জিপো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভারসাম্য হারিয়ে মুখ থুবড়ে আছড়ে পড়ল সে। হাত দিয়ে পতনজনিত আঘাত রোধ করল জিপো। কিন্তু ওর ভারী শরীরটা পাহাড়ের রুক্ষ, অসমতল গা-বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল। রাস্তার কাছাকাছি পৌঁছে জিপোর আহত দেহটা থামল। হাঁপাতে-হাঁপাতে কোনওরকমে উঠে দাঁড়াল সে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল ওপর দিকে।
না, এখান থেকে কিটসন বা ব্লেক কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। পাহাড়ের গা থেকে বেরিয়ে আসা বড় বড় ঝুলন্ত পাথরগুলোই জিপো ও তাদের মাঝে আড়াল করে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু দেখতে না পেলেও ওদের এগিয়ে আসা পায়ের শব্দ সে স্পষ্টই শুনতে পেল।সুতরাং মুহূর্তের জন্যে নিশ্চিন্ত বোধ করলেও আবার সচকিত হয়ে পড়ল জিপো। ওদের পায়ের শব্দ যেন অনেক বেশি কাছে মনে হচ্ছে।
জিপো উন্মত্তের মতো চারদিকে তাকাল। একটা আশ্রয় তার দরকার। নইলে মিনিট খানেকের মধ্যেই ওরা এসে পড়বে।
সামনেই ডানদিকে সুবিস্তৃত ঘন বুনো গাছের ঝোপ-ঠিক পাহাড়ের পাশ ঘেঁষে। শুধু একটা ভয়ার্ত চিন্তাই জিপোর মাথায় পাক খেতে লাগল; লুকোতে হবে। সুতরাং পরক্ষণেই ঝোপ লক্ষ করে তীরবেগে দৌড়ল সে। ঝোপের উচ্চতা বেশি নয়-জিপোর উরু পর্যন্ত। তারই মধ্যে দিয়ে টলতে-টলতে পড়িমড়ি করে ছুটে চলল সে। কাঁটাঝোপে লেগে তার প্যান্ট ছিঁড়ে গেল-পা কেটে গিয়ে রক্ত বেরোতে লাগল। ঝোপের মাঝামাঝি পৌঁছে উপুড় হয়ে হাঁপিয়ে পড়ল জিপো। মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চাইল। ঝোপের ডালপালা আবার ফিরে এল নিজেদের জায়গায়, নিষ্পাপভাবে জিপোকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে রইল, যেন নিরাপত্তার চাদরে ভয়ার্ত জিপোকে আগলে রাখতে চাইছে।
গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল সে। উৎকর্ণ হয়ে নিশ্চিলভাবে পড়ে রইল।
কিটসনই প্রথম রাস্তায় এসে পৌঁছল৷ কিন্তু সামনে পিছনে তাকিয়ে জিপোকে দেখতে না পেয়ে সে ভীষণ অবাক হয়ে গেল৷ আচমকাই থমকে দাঁড়াল কিটসন৷
হাঁপাতে-হাঁপাতে একটা অশ্রাব্য কটূক্তি ছুড়ে ব্লেক এসে দাঁড়াল তার পাশে৷
‘কোথায় গেল ও?’ শ্রান্ত স্বরে জানতে চাইল সে৷
‘মনে হয় কোথাও লুকিয়ে পড়েছে৷’ চিন্তিতভাবে জবাব দিল কিটসন৷
ওরা দুজনেই তাকাল সামনের ঝোপের দিকে৷ কারণ এই রুক্ষ ধু-ধু পাহাড়ি এলাকায় লুকোবার এক এবং একমাত্র জায়গা ওই কাঁটাঝোপ৷
‘শালা ওখানেই লুকিয়েছে৷’ আঙুল তুলে ঝোপের বিস্তৃতির দিকে নির্দেশ করল ব্লেক৷ তারপর গলার স্বর উঁচু পরদায় তুলে চেঁচিয়ে উঠল, ‘জিপো! বাইরে বেরিয়ে এসো৷ আমরা জানি তুমি ওখানে লুকিয়ে আছ!’
ব্লেকের স্বরে জিপো যেন আতঙ্কে কুঁকড়ে গেল৷ নরম বেলে মাটিতে সে নিজেকে আর মিশিয়ে দিল, শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করে অনড় হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল৷
ব্লেক ফিরল কিটসনের দিকে, ‘চলো, ওকে ধরে বাইরে টেনে আনি৷ তুমি ওপাশ দিয়ে ভেতরে ঢোকো, আমি সামনে দিয়ে ঢুকছি৷’
দু-হাতে কাঁটাগাছ সরিয়ে ভেতরে ঢুকতে শুরু করল ব্লেক৷ কিন্তু এইভাবে গজ দশেক যাওয়ার পর সে থমকে দাঁড়াল৷ ব্লেক বুঝল, এভাবে শত পরিশ্রম এবং সময় নষ্ট করেও তার পক্ষে জিপোকে খুঁজে বের করা অসম্ভব৷ কারণ গোটা এলাকাটাই ঘন ঝোপে ঠাসা৷ সুতরাং এর মধ্যে জিপোর অবস্থান নির্ণয় করা কোনও গণৎকারের পক্ষেও সম্ভব নয়, নেহাত ভাগ্য সহায় না হলে জিপোকে সে কোনওদিনই খুঁজে পাবে না৷
ওদিকে ক্রম অগ্রসরমান কিটসনও একই সময়ে অবস্থাটা উপলব্ধি করল৷ সুতরাং একরাশ বুনো ঝোপের মাঝে সে থমকে দাঁড়াল৷
সাগর-সবুজ বুনো ঝোপের বিস্তৃতিকে অতিক্রম করে ওরা দুজনে পরস্পরের দিকে তাকাল৷
‘জিপো৷’ ব্লেক চিৎকার করে উঠল৷ রাগে তার স্বর কাঁপছে, ‘এই শেষবার তোমাকে বলছি৷ যদি এক্ষুনি বেরিয়ে না আস তাহলে পিটিয়ে তোমাকে ময়দার বস্তা করে ছাড়ব—এমন মার মারব, কোনওদিন ভুলবে না! বেরিয়ে এসো বলছি!’
ব্লেকের স্বরে ক্রোধ ও হতাশার আভাস জিপোকে নিশ্চিন্ত করল, সে বুঝল যদি সে সাহস করে নিশ্চলভাবে পড়ে থাকতে পারে, তাহলে তার সাফল্য লাভের সম্ভাবনা যথেষ্ট৷ শুধু একটু সাহস…আর কিছু নয়৷
হতাশ হলেও সামনের দিকে আরও কয়েক পা-এগিয়ে গেল ব্লেক৷ জিপো শুনতে পেল ঝোপঝাড় ঠেলে তার এগিয়ে আসার শব্দ—কিন্তু সে চলেছে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত দিকে৷ কিটসনের অবস্থাও তথৈবচ সেও ব্লেকেরই মতো ভুল নিশানায় এগিয়ে চলল৷ জিপো দাঁতে-দাঁত চেপে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগল৷ তার হৃৎপিণ্ডের গতি ক্রমশ স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এল৷
বেশ কয়েক মিনিট পর যখন কিটসন ও ব্লেকের পায়ের শব্দ দূরে মিলিয়ে গেল, তখন জিপো লুকোনো জায়গা ছেড়ে এগোতে মনস্থ করল৷
কারণ ওরা যদি এইভাবে পুরো এলাকাটা তন্ন তন্ন করে চক্কর দেয়, তাহলে লুকোনো জায়গা ছেড়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে চলাই তার পক্ষে নিরাপদ৷
সুতরাং বেলে মাটির ওপর ঘষটে সে এগোতে লাগল৷ খুব সতর্কভাবে কাঁটাগাছগুলোকে বিসদৃশভাবে না নড়িয়ে সে তার স্থূল দেহ নিয়ে এগিয়ে চলল৷ কারণ কাঁটাঝোপের সামান্য আন্দোলনই কিটসন ও ব্লেককে জানিয়ে দেবে তার অবস্থিতির কথা৷
এইভাবে বুকে হেঁটে প্রায় তিরিশ চল্লিশ গজ যাওয়ার পর জিপো অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করল৷ কিন্তু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার আগেই সে দেখতে পেল সাপটাকে৷
সবে সে তার ডান হাতটা সামনে বাড়িয়েছে, নিজেকে সামনে এগোবার প্রয়াসে তার আঙুলগুলো আঁকড়ে বসেছে নরম মাটিতে, এমন সময় সামনে চোখ পড়তেই জিপো দেখতে পেল সাপটাকে তার হাতের আঙুল থেকে ইঞ্চি কয়েক দূরেই ওটা কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে রয়েছে৷ চ্যাপটা বাঁকানো ফণাটা শূন্যে স্থির৷
বোবা আতঙ্কে দ্রুত শ্বাস টানল জিপো৷ তার সারা শরীর যেন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ল, সমস্ত চেতনা হয়ে গেল আচ্ছন্ন৷ পাথরের মূর্তির মতো অনড় হয়ে পড়ে রইল সে রক্তের মধ্যে অনুভব করল বরফ শীতল আতঙ্কের সূক্ষ্ম স্রোত৷ হৃৎপিণ্ডের দুর্দম গতি বুঝি তার কণ্ঠনালী রোধ করে দিতে চাইছে৷
সাপটাও নিশ্চলভাবে ফণা তুলে প্রতীক্ষায় রইল৷
কয়েকটা যন্ত্রণাও উৎকণ্ঠাময় মুহূর্তের পর জিপো দাঁত দাঁত চেপে, মরিয়া হয়ে বিদ্যুগতিতে ফিরিয়ে আনল তার ডান হাত৷
এবং সেই মুহূর্তেই সাপটা তার হাতে ছোবল মারল৷
ডান হাতের চেটোয় অমানুষিক যন্ত্রণা অনুভবের সঙ্গে সঙ্গে জিপো লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল৷ উন্মাদের মতো কর্কশ গলায় এক অপার্থিব চিৎকার করে অন্ধের মতো ঝোপঝাড় ভেদ করে দৌড়তে শুরু করল৷
ব্লেক ও কিটসন তখন বুনো ঝোপের একাংশের অনুসন্ধান সমাধা করে খোলা জায়গায় পৌঁছেছে৷ ওরা ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার অনুসন্ধান শুরু করতে যাবে, এমন সময় শুনতে পেল জিপোর মৃত্যুযন্ত্রণা-কাতর আর্তনাদ৷
ওরা চমকে উঠল, থমকে দাঁড়াল৷
দেখল, জিপো রক্ত-জমানো আর্তনাদে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে হাওয়ায় হাত ছুড়তে ছুড়তে উন্মাদের মতো ছুটে চলেছে৷
‘শালা একেবারে পাগল হয়ে গেছে!’ বলেই ব্লেকও জিপোর পিছন-পিছন ছুটতে শুরু করল৷ ঝোপঝাড় ঠেলে কিটসনও তাকে অনুসরণ করল৷
জিপোর আতঙ্কিত মস্তিষ্ক তাকে ছুটিয়ে নিয়ে চলল ঝোপঝাড় ছাড়িয়ে, পাহাড়ের খাড়াই ঢালের দিকে৷ কিন্তু সেখানে পৌঁছনোমাত্রই ভারসাম্য হারিয়ে পিছলে পড়ল জিপো৷ পাহাড়ের গা-বেয়ে গড়াতে-গড়াতে অসহায়ভাবে নেমে চলল নীচের রাস্তার দিকে৷ পড়বার সময় ইতস্তত পরে থাকা পাথরের টুকরোগুলো তার শরীরের ধাক্কায় ছিটকে পড়ল নীচে, শুকনো ধুলোর মেঘ উড়িয়ে জিপোর স্থূলকায় শরীরটা গড়িয়ে চলল…
ব্লেককে পিছনে ফেলে কিটসনই আগে পৌঁছল জিপোর কাছে৷ নীচের রাস্তার কাছে একটা বড় পাথরের গায়ে পড়েছিল সে৷ কিটসন ঝুঁকে পড়ল জিপোর ওপর৷
‘জিপো!’ কিটসন হাঁপাতে লাগল, ‘কোনও ভয় নেই৷ ব্লেক তোমাকে কিছু করবে না৷ কিন্তু তোমার হয়েছেটা কী!’
জিপোর কালশিটে পড়া মুখ দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল কিটসন৷ ওর চোখ দুটো যেন সাদা ধূসর কাগজে দুটো বীভৎস ফুটো৷
‘একটা সাপ…’ কোনওরকমে দম নিয়ে উচ্চারণ করল জিপো৷
পড়িমড়ি করে এসে পৌঁছল ব্লেক৷ এতখানি পথ দৌড়ে আসার ফলে তার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত লয়ে বইছে৷ জিপোকে দেখেই সে রাগে ফেটে পড়ল, ‘শালা ভিতু কোথাকার! তোকে আমি খুন করে ফেলব!’
জিপোর স্থবির দেহ লক্ষ করে এক প্রচণ্ড লাথি চালাল ব্লেক৷ কিন্তু বাঁ-হাতে সে আঘাত রোধ করল কিটসন, ‘থাক, এসব পরে হবে৷ দেখতে পাচ্ছ না, জিপোর কী অবস্থা হয়েছে৷’
‘সাপ… একটা সাপ…’ জিপো ফুঁপিয়ে উঠল৷ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হাতটা তুলে ধরে কিটসনকে আঘাতটা দেখাতে চাইল সে৷
কিটসন সামনে ঝুঁকে এল৷ দেখল, জিপোর রক্তিম ডান হাত অস্বাভাবিক রকম ফুলে উঠেছে—সমস্ত রক্ত এসে যেন জমা হয়েছে তার হাতে৷ সে জিপোর স্ফীত হাতের ওপর আঙুল ছোঁয়াতে সে যন্ত্রণায় হৃদয়বিদারী এক আর্তনাদ করে উঠল৷ কিটসনের মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল একটা শীতল শঙ্কার স্রোত৷
জিপোর পাশে পা-ছড়িয়ে বসে পড়ল কিটসন, প্রশ্ন করল, ‘কী হয়েছে, জিপো?’
‘সাপ…একটা সাপ…’ জিপো শ্বাসকষ্টে হাঁপাতে লাগল, ‘…আমাকে ছোবল… মেরেছে…’
জিপোর হাতের স্ফীত পেশির ওপর পাশাপাশি দুটো তীক্ষ্ণ দাঁতের দাগ কিটসনের চোখে পড়ল৷ সুতরাং বুঝতে তার আর কিছু বাকি রইল না৷
‘ভয় নেই জিপো৷’ ওকে আশ্বাস দিল কিটসন, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে৷ আমি এক্ষুনি সব ব্যবস্থা করছি৷’
‘আমাকে…হাসপাতালে নিয়ে চলো৷’ জিপো ভাঙা স্বরে অনুনয় করল, ‘আমি আমার ভাইয়ের মতো সাপের কামড়ে মারা যেতে চাই না…আলেক্স…’
কিটসন পকেট থেকে রুমাল বের করল৷ সেটাকে একটা দড়ির মতো পাকিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিল জিপোর কবজিতে৷
‘তার মানে ওকে সাপে কামড়েছে?’ উত্তেজিত হয়ে কিটসনের কাঁধ চেপে ধরল ব্লেক ‘তাহলে তাহলে আমরা ট্রাকের তালা খুলব কী করে?’
কিটসন বিনা বাক্যব্যয়ে কাঁধ থেকে ব্লেকের হাত সরিয়ে দিল৷ পকেট থেকে একটা ছোট্ট ছুরি বের করে তার ফলা খুলে ধরল৷
‘জিপো, এতে তোমার একটু ব্যথা লাগবে’ বলতে বলতে জিপোর কবজি চেপে ধরল সে, ‘কিন্তু কিছুটা আরাম পাবে৷ এ ছাড়া, এখন আর দ্বিতীয় কোনও পথ নেই৷’
ছুরির ধারালো অগ্রভাগ জিপোর উত্তপ্ত, স্ফীত হাতে বসিয়ে দিল সে৷ লম্বা করে চিরে দিল খানিকটা৷
জিপো চিৎকার করে বাঁ হাতে কিটসনকে আঘাত করল৷ আপ্রাণ চেষ্টা করল হাত ছাড়িয়ে নিতে৷
ওর হাতের ক্ষতস্থান থেকে ধীরে ধীরে রক্ত বেরোতে শুরু করল৷ একইভাবে শক্ত হাতে জিপোর কবজি ধরে রইল কিটসন৷ হাতে চাপ দিয়ে ক্ষতমুখ দিয়ে বিষটা বের করার চেষ্টা করল সে৷ জিপোর বিবর্ণ, পাণ্ডুর মুখ দেখে সে চিন্তিত হয়ে পড়ল৷ মনে হল, জিপো যেন আসন্ন মৃত্যুর জন্যে নির্বিকারভাবে অপেক্ষা করছে৷
‘আলেক্স… তুমি আমার সত্যিকারের বন্ধু৷ তোমার সঙ্গে সেদিন যে দুর্ব্যবহার করেছি, সে সব ভুলে যেও৷ আমাকে… আমাকে হাসপাতালে নিয়ে চলো…৷’
‘ভয় পেয়ো না, জিপো৷ আমি সব ব্যবস্থা করছি৷’ রুমালটাকে জিপোর কবজিতে আরও শক্ত করে বেঁধে দিল কিটসন—উঠে দাঁড়াল, ‘দাঁড়াও, বুইকটা আগে নিয়ে আসি৷’
‘কী-কী বললে?’ কিটসনের কথা শেষ হতে না হতেই খেঁকিয়ে উঠল ব্লেক৷
‘গাড়িতে করেই জিপোকে আমি হাসপাতালে নিয়ে যাব৷ ওর অবস্থাটা একবার দেখো৷ বাঁচে কি না বাঁচে, ঠিক নেই৷’ ঘুরে দাঁড়িয়ে কিটসন পাহাড়ের গা-বেয়ে উঠতে শুরু করল৷
‘কিটসন!’ ব্লেকের স্বরের তীব্রতায় কিটসন থামল, ঘুরে দাঁড়াল৷
‘আবার কী হল?’
‘ফিরে এসো এখানে!’ ব্লেক চিৎকার করে বলল, ‘তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? দেখো ওপরে!’ আঙুল তুলে আকাশের দিকে দেখাল ব্লেক৷ একটা উড়োজাহাজ ধীর বেগে, চক্রাকারে পাহাড়ের ওপর দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ ‘তুমি গাড়িটা আড়াল থেকে বাইরে আনলে ওরা দেখতে পাবে৷ তারপর পুলিশ নিয়ে এসে এ জায়গাটা গোরু-খোঁজা করতে ওদের কি খুব বেশি সময় লাগবে ভেবেছ?’
‘তাতে কী হয়েছে?’ রাগত স্বরে জবাব দিল কিটসন, ‘একটা মানুষকে তো আর বসে বসে মরতে দেওয়া যায় না৷ জিপোকে এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে না গেলে ওর বাঁচার কোনও সম্ভাবনা নেই তুমি কি সেটা বুঝতে পারছ না?’
‘গাড়িটা তুমি লুকোনো জায়গা থেকে বাইরে আনতে পারবে না, ব্যাস৷’
‘এখন থেকে হাসপাতাল কম করেও তিরিশ মাইল দূরে৷ এতটা রাস্তা আমি কি জিপোকে কাঁধে করে নিয়ে যাব?’
‘তাতে আমার বয়েই গেলে!’ খেঁকিয়ে উঠল ব্লেক, ‘মোটমাট গাড়িটা তুমি দিনের আলোয় রাস্তায় বের করবে না৷ জিপোকে এখন ভাগ্যের ওপর নির্ভর করতে হবে৷ উপায় কী!’
‘নিকুচি করেছে তোমার উপদেশের?’ বলে কিটসন ঘুরে দাঁড়াল৷ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে রাস্তার দিকে উঠতে শুরু করল সে৷
‘কিটসন!’
ব্লেকের শাসানির সুরে থমকে দাঁড়াল কিটসন, ঘুরে তাকাল৷
ব্লেকের রিভলভার তার হাতে উঠে এসেছে—কিটসনের শরীর লক্ষ করে স্থির হয়ে আছে কালো নলটা৷
‘এখানে ফিরে এসো৷’ ব্লেক নিষ্প্রাণ স্বরে আদেশ করল৷
‘দেরি হলে জিপো মারা পড়বে, এড৷ তুমি সেটা চোখে দেখছ না?’
‘তুমি আগে এখানে ফিরে এসো৷’ ভয়ঙ্কর স্বরে শাসিয়ে উঠল সে, ‘গাড়ি বের করার কথা ভুলে যাও৷ জলদি এদিকে এসো৷ আমি আর দ্বিতীয়বার বলব না৷’
হৃৎপিণ্ডের অশান্ত স্পন্দনকে সঙ্গী করে ঢাল বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে এল কিটসন৷ এতদিন বাদে তাহলে সময় এসেছে! সে ভাবল৷ আজই তাহলে একটা ফয়সালা হয়ে যাক৷ তবে ওর ডান হাতের দিকে আমাকে নজর রাখতে হবে৷ এই আমাদের চূড়ান্ত বোঝাপড়া৷ জিপোকে সে কিছুতেই অসহায়ভাবে মরতে দেবে না৷
‘কিন্তু আমাদের কিছু একটা করা উচিত৷’ ব্লেকের দিকে সহজ, স্বাভাবিক পদক্ষেপে এগিয়ে এল কিটসন৷ ‘এভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে জিপোকে আমরা মরতে দিতে পারি না৷ ওকে এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার৷’
‘ওর দিকে তাকিয়ে দেখো, গদর্ভ কোথাকার৷ যতক্ষণে তুমি ওপরে যাবে, গাড়ি বের করবে, গাড়ি নীচে নিয়ে এসে ওকে গাড়িতে তুলবে, তারপর হাসপাতালে রওনা হবে, ততক্ষণে ও মারা যাবে৷’
‘কিন্তু তাই বলে চুপচাপ বসে থাকলে তো চলবে না৷’ ব্লেকের দিকে না তাকিয়েই তাকে অতিক্রম করে গেল কিটসন, শরীরের প্রতিটি পেশি টানটান৷ আড়চোখে সে দেখল, ব্লেক রিভলভারটা সামান্য নামিয়ে নিল।
কিটসন পলকে ঘুরে দাঁড়াল৷ তার হাত কাটারির মতো বিদ্যুৎবেগে নেমে এল ব্লেকের কবজির ওপর৷
ব্লেকের হাত থেকে রিভলভারটা ছিটকে গিয়ে পড়ল ঝোপের মতো৷ এক লাফে পিছিয়ে গিয়ে কিটসনের মুখোমুখি দাঁড়াল সে৷
কয়েকটা নীরব মুহূর্ত ওরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল৷ তারপর দাঁত বের করে নিঃশব্দে হেসে উঠল ব্লেক৷
‘তাহলে তাই হোক৷’ হালকা স্বরে কথাগুলো উচ্চারণ করল ব্লেক, ‘তুমিই যখন আগ বাড়িয়ে বিপদ ডেকে আনলে তখন আমি কী করতে পারি৷ তোমাকে টিট করার ইচ্ছেটা আমার বরাবরের৷ সুতরাং সুযোগ যখন পেয়েছি, আজ তোকে সমঝে দের লড়াই কাকে বলে! শালা—’
সঙ্কুচিত চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে, মুষ্টিবদ্ধ হাতে অপেক্ষা করতে লাগল কিটসন৷
চোয়াল নামিয়ে, দু-পাশে হাত রেখে ব্লেক সন্তর্পণে এগিয়ে আসতে লাগল৷
কিটসন একটা বাঁ-হাতি ঘুষি চালাল ব্লেকের মুখ লক্ষ করে৷ কিন্তু চকিতে মাথা সরিয়ে নিল ব্লেক৷ কিটসনের ঘুষিটা তার কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেল, সে চট করে বসে পড়ল৷ কিটসনের ডান হাতর আড়াল কাটিয়ে তার বজ্রমুঠি সশব্দে আছড়ে পড়ল প্রতিদ্বন্দ্বীর পাঁজরে৷ আকস্মিক আঘাতে কিটসনের দম যেন বন্ধ হয়ে এল৷ সে কয়েক-পা পিছিয়ে গেল৷
ব্লেক আরও এগিয়ে আসতেই কিটসনের বাঁ-হাতি ঘুষি তার মাথায় আঘাত করল৷ মুহূর্তের জন্য টলে উঠল ব্লেকের শরীর৷
ওরা দুজনে আবার সরে গেল পরস্পরের কাছে থেকে৷ তারপর একই সঙ্গে এগিয়ে আসতে লাগল৷ কাছাকাছি আসতেই ওরা অন্ধ লক্ষ্যে ঘুষি চালাতে শুরু করল৷ কয়েকটা গায়ে মুখে আঘাত করল, কিন্তু তেমন জোরালো নয়৷ পরমুহূর্তেই ওরা ছিটকে সরে গেল পরস্পরের নাগাল থেকে৷ এইভাবে সতর্ক সাবধানি ভঙ্গিমায় চলল ওদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা৷
হঠাৎই একটা সরাসরি সুযোগ পেয়ে ব্লেকের চোয়াল নিশানা করে একটা বাঁ-হাতি ঘুষি চালাল কিটসন৷ কিন্তু ব্লেকও এর জন্যে প্রস্তুত ছিল, পলকে সে মুখ সরিয়ে নিতেই ঘুষিটা তার কাঁধ ঘেঁষে বেরিয়ে গেল৷ হিংস্রভাবে দাঁত বের করে কিটসনের বুক লক্ষ করে ডান হাতে জবাব দিল সে৷ ঘুষিটা সমস্ত শক্তি নিয়ে আঘাত করল প্রতিদ্বন্দ্বীর পাঁজরে৷
জোরালো ঘুষির নিরেট আঘাত সইতে পারল না কিটসন৷ আস্তে আস্তে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে৷
হিংস্রভাবে হেসে এগিয়ে এল ব্লেক, আর একখানা ঘুষি বসিয়ে দিল কিটসনের ঘাড়ে৷ কিটসন মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ল, ওর মন ভরে গেল আকস্মিক শূন্যতায়৷
ব্লেক পিছিয়ে দাঁড়াল৷
হাতে এবং হাঁটুতে ভর দিয়ে কোনওরকমে উঠে বসল কিটসন৷ মাথা ঝাঁকিয়ে মস্তিষ্কের আচ্ছন্ন ভাবটা কাটাতে চাইল৷ দেখল, ব্লেক তার দিকে আবার এগিয়ে আসছে—সঙ্গে সঙ্গে ব্লেকের হাঁটু লক্ষ করে সে ঝাঁপ দিল৷ দু-হাতে ব্লেকের পা-দুটো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল সে৷
কিটসনকে নিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল ব্লেক৷ কয়েক মুহূর্ত ওরা দুজনেই শিথিল ভঙ্গিতে হাত-পা এলিয়ে পড়ে রইল৷ তারপর কিটসন আচ্ছন্নভাবে ব্লেকের গলা টিপে ধরতে চাইল৷ কিন্তু ব্লেকের ঘুষি রগের পাশে এসে পড়তেই কিটসনের হাত আলগা হয়ে গেল৷ গড়িয়ে তার আওতার বাইরে চলে গেল ব্লেক৷
একই সঙ্গে ব্লেক ও কিটসন উঠে দাঁড়াল৷ কিন্তু হাত উঁচিয়ে প্রস্তুত হতে কিটসনের বোধ হয় এক পলক দেরি হয়ে গিয়েছিল, কারণ ব্লেকের ডান হাতি ঘুষিটা তার চোয়ালে আঘাত করল৷ ঘুষির প্রচণ্ড শক্তিতে কেমন যেন দুর্বল বোধ করল কিটসন৷ সামনের দিকে অনিশ্চিতভাবে ঝুঁকে পড়ে ব্লেকের হাত চেপে ধরল সে৷ এক দীর্ঘ মুহূর্ত ধরে চলল ওদের ধস্তাধস্তি৷ ব্লেক প্রাণপণে কিটসনের বাঁধন ছাড়াতে চেষ্টা করল, কিটসনও মরিয়া হয়ে ধরে রইল ব্লেকের হাত—সেই স্বল্প সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করতে চাইল৷
অবশেষে নিজেকে মুক্ত করে নিল ব্লেক৷ সঙ্গে সঙ্গেই চালাল বাঁ-হাতি ক্ষিপ্র ঘুষি৷ কোনওরকমে ঘুষিটাকে এড়াল কিটসন, ডান হাতে ব্লেকের উন্মুক্ত পাঁজরে একখানা বসিয়ে দিল, যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করল ব্লেক৷
সাফল্যের আশায় উদ্দীপ্ত হয়ে আরও এগিয়ে গেল কিটসন৷ এলোপাথাড়ি ঘুষি চালাল ব্লেকের মাথা লক্ষ করে৷
কয়েকটা অস্ফুট শব্দ করে পিছিয়ে গেল ব্লেক৷
এবার কিটসনের বাঁ-হাতি ঘুষি তার মাথায় গিয়ে বসতেই চোখে অন্ধকার দেখল ব্লেক৷ দু-হাত শূন্যে তুলে স্খলিত হয়ে আরও কয়েক পা-পিছিয়ে গেল৷ বিন্দুমাত্র দেরি না করে কিটসনের মুষ্টিবদ্ধ ডান হাত আশ্রয় নিল ব্লেকের পেটে৷ হাঁপাতে-হাঁপাতে ছিটকে পড়ল ব্লেক৷ যন্ত্রণায় বেঁকে উঠল ওর সারা শরীর৷
শিকারকে বাগে পেয়ে একরোখাভাবে অধৈর্য হয়ে এগিয়ে এল কিটসন৷ তার হাতে আঘাত করতে উদ্যত হতেই সে বুঝতে পারল শূন্যে ভেসে আসছে প্রতিদ্বন্দ্বীর ডান হাতি ঘুষি! কিন্তু তখন দেরি করে ফেলেছে৷
সংঘর্ষটা কিটসন অনুভব করল তার চোয়ালে৷ তারপরই তার মস্তিষ্কে শ্বেত তপ্ত কিছুর বিস্ফোরণ ঘটল৷ সে বুঝল, নির্বোধের মতো ব্লেকের মার্কামারা ঘুষিকে আহ্বান জানিয়ে সে তার পরাজয়কে নিশ্চিত করে তুলেছে৷ অসহায়ভাবে মুখ থুবড়ে পড়ল কিটসন৷ পাথরের টুকরোর তীক্ষ্ণ আঘাতে তার মুখ জায়গায় জায়গায় কেটে গেল৷ যন্ত্রণায় চাপা আর্তনাদ করে গড়িয়ে চিৎ হল সে৷ তার ক্ষতবিক্ষত মুখমণ্ডলে ঝাঁপিয়ে পড়ল সূর্যের উত্তপ্ত সোনা রোদ৷
কয়েক মুহূর্তে অথর্ব হয়ে সে পড়ে রইল৷ তারপর আপ্রাণ চেষ্টায় মাথা তুলে দেখল ব্লেকের দিকে৷
সে জিপোর দেহের ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে রয়েছে—একদৃষ্টে চেয়ে আছে তার মুখের দিকে৷
কিটসন মাথা ঝাঁকাল, তারপর টলতে-টলতে উঠে দাঁড়াল৷ বিক্ষিপ্ত পদক্ষেপে সে ব্লেকের কাছে এগিয়ে এল৷ পায়ের শব্দে ব্লেক পিছনে মুখ ফেরাল—নির্লিপ্ত মুখের প্রতিটি পেশি টান টান৷
‘ও মারা গেছে৷’ ব্লেকের স্বর শীতল, নির্বিকার, ‘শেষ পর্যন্ত হতভাগাটা আমাদের এভাবে বোকা বানাল!’
কিটসন হাঁটু গেড়ে বসল জিপোর পাশে৷ ওর ঠান্ডা, ভিজে হাতটা তুলে নিল দু-হাতে৷
জিপোর মুখমণ্ডলে প্রশান্তির ছাপ৷ ঠোঁট দুটো ঈষৎ ফাঁক হয়ে আছে৷ ক্ষুদে ক্ষুদে কালো চোখজোড়া পরম নিশ্চিন্ততায় ওপরের অবতল নীলাকাশে নিবদ্ধ৷
শরীরের অসহনীয় যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে কিটসন ভাবলঃ জিপোর মৃত্যুর পর ট্রাকের তালা খোলার ক্ষীণতম আশাও কি আর অবশিষ্ট আছে! দশ লক্ষ ডলার এক ছলনাময়ী মরীচিকা! হাতের মুঠোয় পৃথিবী৷
হুঁ, তাই বটে! মরগ্যান যখনই এ কাজে হাত দিয়েছে তখনই সে করে বসেছে চরম গলদ, আজ যদি ফ্র্যাঙ্ক থাকত, তাহলে সে দেখত তার ভুলের নিষ্ঠুর পরিণতি৷
‘চলে এসো’৷ ব্লেক ডাকল কিটসনকে ‘ও মারা গেছে৷ ওর জন্যে আমাদের তার কিছু করার নেই৷’
কিটসন কোনও কথা বলল না৷ মৃত জিপোর মুখে তাকিয়ে চুপচাপ ধরে রইল তার হাত—যেন শেষ সান্ত্বনা দিতে চাইল৷
ঠোঁট উলটে কাঁধ ঝাঁকাল ব্লেক৷ তারপর দীর্ঘ পথ ধরে চলতে শুরু করল ট্রাকের উদ্দেশ্যে৷
