গল্প
উপন্যাস

শুধু যাওয়া আসা – ১০

দশ

আমি আর রয়—দুজনে পরস্পরকে দেখামাত্রই চিনতে পারলাম৷ নিমেষে ও থমকে দাঁড়াল৷ এই হঠাৎ দেখার বিস্ময়কে ওর চোখে যেন মেনে নিতে পারছে না৷ ওর মুখ রক্তহীন, বিবর্ণ৷

কতক্ষণ যে ওইভাবে পরস্পরের দিকে চেয়ে আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না, একসময় রয়ই প্রথমে সংবিৎ ফিরে পেল৷ ওর মুখের বিবর্ণ ভাবটা কেটে গিয়ে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত ঔজ্জ্বল্য—ঠোঁটের কোনায় ফিরে এল সেই অতি-পরিচিত হাসি৷ ও দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার বুকে৷ সর্বশক্তি দিয়ে আমাকে জাপটে ধরল৷

আমাদের তখন আর কথা বলার শক্তি নেই৷ এক প্রচণ্ড আনন্দ-উল্লাসের অনুভূতি যেন আমাদের কণ্ঠরোধ করল৷

একসময় আমাকে ছেড়ে দিয়ে রয় সোজা হয়ে দাঁড়াল, ‘শেট! তুই—তুই এখানে! আমি কি ভুল দেখছি?’

ঠিক সেই মুহূর্তেই উপলব্ধি করলাম, রয়কে আমি কতটা ভালোবাসি৷ এতদিন ওর অনুপস্থিতিতে আমার বুকটা যেন খালি ছিল৷ এই অবাধ্য মনটাকে কত কষ্ট করেই না রয়ের কথা ভুলিয়ে রেখেছিলাম৷ এখন বুঝতে পারছি, রয় আমার জীবনের কতখানি অংশ জুড়ে রয়েছে৷ ওকে কাছে পেয়ে সাময়িকভাবে লোলার কথাও ভুলে গেলাম৷ ওর কাঁধে এক চাপড় মেরে ওকে জড়িয়ে ধরলাম৷ কপট তিরস্কারের সুরে বললাম, ‘শালা, সিন্দুকের বাচ্চা! কোথায় ছিলি অ্যাদ্দিন?’

আমার হাতের বাঁধন ছাড়িয়ে ও আমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল৷ শেষে অস্ফুটে বলল, ‘কিন্তু শেট, তুই এখানে কি করছিস? আমি তো ভেবেছিলাম তুই কোন শহরে কেটে পড়েছিস!’

‘পুলিশও তাই ভাবছে৷’ কথা বলতে বলতে আনন্দে আমার চোখ সজল হয়ে উঠল৷ ওকে হাত ধরে রেস্তোরাঁয় টেনে নিয়ে চললাম, ‘আগে চল, একটু গলা ভেজানো যাক৷—কিন্তু তুই এখানে কোত্থেকে এলি?’

‘লিটল ক্রীক—শালা একেবারে জঘন্য জায়গা! সে যাকগে—বললি না তো, তুই এখানে কি করছিস?

খাবারঘরে ঢুকে কাউন্টারের কাছে দুটো টুল নিয়ে আমরা বসলাম৷ রয় ঘরটার চারপাশে চোখ বোলাতে লাগল৷

দুটো গেলাসে হুইস্কি আর সোডা মিশিয়ে রয়ের দিকে একটা এগিয়ে দিলাম৷ অন্যটায় নিজে চুমুক দিয়ে বললাম, ‘তুই জানতে চাইছিস এখানে আমি কী করছি?’

মাঝপথে কথা থামিয়ে একটু ভাবলাম—রয়কে সব বলাটা কি ঠিক হবে? উহুঁ, আপাতত কিছু না জানানোই ভালো৷ অতএব সত্যি-মিথ্যে মিলিয়ে একটা জবাব দিলাম, ‘আমি এখানে চাকরি করছি৷ তা ছাড়া, গা ঢাকা দেবার পক্ষে জায়গাটা বেশ নিরাপদ৷’

‘নিরাপদ যে সে-বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই কিন্তু তুই মেক্সিকো বা ক্যানাডায় গেলে, সেটা কি আরও ভালো হত না?’

‘ভাই বলা যত সহজ, করা তত সহজ নয়৷ টাকা কোথায়, যে যাব? এখানে যে টিঁকে আছি তাই আমার সাতপুরুষের ভাগ্যি!’

‘এ জায়গাটা তাহলে সত্যিই নিরাপদ বলছিস?’

‘হ্যাঁ৷ কারণ, যে-ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছি, তাতে এর চেয়ে ভালো জায়গা আর হতে পারে না৷’

রয় আমার কাঁধে আলতো করে হাত রাখল, ‘ফানওয়ার্থ থেকে তোর পালানোর কথা আমি কাগজে পড়েছি৷ তোর সাহস আছে বলতে হবে! এ ক-মাস সবসময় খালি তোর কথাই ভেবেছি৷ কোনদিন ভাবতেই পারিনি, তোর সঙ্গে এভাবে দেখা হবে!’

ওর দিকে চেয়ে হাসলাম, ‘সেটা আমিও ভাবিনি৷’

রয় হঠাৎ ঝুঁকে পড়ে আমার হাত চেপে ধরল, ‘শেট, তোকে কি বলে যে ধন্যবাদ দেব জানি না৷ তুই আমার জন্যে যা করেছিস, তার কোন তুলনা হয় না৷ তুই যদি ওভাবে—’

‘ওসব কথা বাদ দে৷ ওরকম হলে তুইও আমার জন্যে তাই করতিস৷’

রয় হাঁফ ছাড়ল, ‘ওফ! তোকে যখন ওরা ধরল, আমি তো ভাবলাম তুই বোধ হয় আমার কথা বলেই দিবি৷ কিন্তু—না, শেট, তুই-ই আমার বন্ধুর মতো বন্ধু৷’

‘সে তোর আর দোষ কি! নিজের বোকামির জন্যেই তো আমি ধরা পড়লাম৷ তোর কথা শুনলে কি আর এ অবস্থা হত? তা ছাড়া দেখলাম, আমি যেখানে একাই ধরা পড়েছি, সেখানে তোকে টেনে এনে আর লাভ কী! আসল কথা, তখন ভয়ে আমার মাথার ঠিক ছিল না৷’

রয় এক চুমুক পুরো হুইস্কিটা গলায় ঢেলে দিল, ‘শালা—ভয় কি আমিই কম পেয়েছিলাম? ওঃ কোনরকমে পালিয়ে বেঁচেছি!—সত্যি, কেন যে ওই হতচ্ছাড়া মতলবটা মাথায় এসেছিল৷ দিনের দিন খালি আফসোস করেছি—কেন কুপারের ফ্ল্যাটে গেলাম! সে যাকগে—এখন কি করছিস বল্? আর এখানেই বা কেমন করে এলি?’

রয় ওর খালি গেলাসটা আমার দিকে এগিয়ে দিল৷ গেলাসটা ভর্তি করে ওর হাতে তুলে দিলাম৷ ও দু-চার ঢোঁকে হুইস্কিটা শেষ করে হাত দিয়ে মুখ মুছল, ‘এখন আমাকে সেলসম্যান হয়ে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে, শেট৷ অর্থাৎ লরেন্স কোম্পানি এখন কোনরকমে আমাকে তাড়াতে পারলে বাঁচে! ফ্রাঙ্কলিন থেকে আরম্ভ করে সব বড়কর্তারাই সন্দেহ করছে—কুপারের ব্যাপারটায় তোর সঙ্গে আমিও জড়িয়ে ছিলাম৷ আর তার ওপর এক শালা আবার বলে বসেছে, পাঁচশো ডলারের দেনায় আমি নাকি পালিয়ে বেড়াচ্ছি৷ ব্যস, ফ্রাঙ্কলিন আমায় ডেকে বলল, আমার আর সিন্দুক-টিন্দুক সারানোর দরকার নেই৷ তার চেয়ে, যেসব খদ্দেরের পুরনো লরেন্স সিন্দুক আছে, তাদের ধরে ধরে নতুন সিন্দুক গছানোর কাজটা আমি নাকি ভালোই পারব৷ এবং তাতে নাকি আমার অভিজ্ঞতাও বাড়বে৷ তারপরেই আমার হাতে খদ্দেরদের নামের ইয়া বড় একটা লিস্ট ধরিয়ে দিল, আর দিল কিছু লম্বা-চওড়া উপদেশ৷ শা—লা!—অ্যাদ্দিন ধরে ঘুরে ঘুরে জুতোয় শুকতলা খইয়ে ফেললাম, তবু কোন ব্যাটা একটা নতুন সিন্দুক নিল না৷ আশ্চর্য মাইরি!’

রয় পকেট থেকে একটা লম্বা কাগজের টুকরো বের করল, ‘এই তো—‘‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’’—মালিক—কার্ল জেনসন৷ তাই তো?’

‘হ্যাঁ৷’

‘এখন আমার কাজ হল মি. জেনসনকে পটিয়ে-পাটিয়ে একটা নতুন সিন্দুক গছানো—আচ্ছা, এই জেনসন লোকটাকে, তোর মনিব নাকি?’

বাইরে থেকে একটা ক্যাডিলাকের হর্ন কানে আসায় উঠে পড়লাম, ‘তুই একটু বোস, আমি এখুনি আসছি৷’

রয়ের কাছ থেকে কিছুক্ষণের জন্য রেহাই পেয়ে মনে মনে খুশিই হলাম৷ ওকে কতটা কি বলব না-বলব, সেটা ভাববার কিছুটা সময় পাওয়া যাবে৷

ক্যাডিলাক গাড়িটায় তেল ভরতে ভরতে চিন্তায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম৷

অনেক ভেবেচিন্তে স্থির করলাম, রয়কে সবকিছু খোলাখুলি বলাটা ঠিক হবে না—বিশেষ করে জেনসনের খুনের কথা৷ সেটা লোলার ব্যাপার, লোলাই বুঝবে৷ তার চেয়ে বরং সবাইকে যে গল্পটা বলেছি, ওকে তাই বলব৷ সেটাই নিরাপদ হবে৷

কাজ শেষ করে আবার রেস্তোরাঁয় ফিরে গেলাম৷

রয় সিগারেট ধরিয়ে খাবারঘরে পায়চারি করছিল, আমাকে ঢুকতে দেখেই থমকে দাঁড়াল, ‘তোকে দেখে আমার হিংসে হচ্ছে, শেট৷ এরকম একটা চমৎকার জায়গায় তুই চাকরি পেলি কেমন করে? নাঃ, তুই ভাগ্যবান বলতে হবে!’

‘যতটা চমৎকার ভাবছিস, ততটা না হলেও, জায়গাটা খারাপ নয়৷—হ্যাঁ, ভালো কথা, তুই জেনসনের কথা জানতে চাইছিলি? সে এখানে নেই—ব্যবসার কাজে অ্যারিজোনা গেছে৷ কবে ফিরবে কিছু বলে যায়নি৷’

‘যাঃ শালা!’ হতাশায় ধপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়ল রয়, ‘তাহলে অ্যাদ্দুর এসে কোন লাভই হল না? তা তুই একবার মিসেস জেনসনেকে বলে দেখ না, তিনি হয়ত নতুন সিন্দুকের অর্ডার দিতে পারেন!’

‘উহুঁ—কোন আশাই নেই৷ এখানে মি. জেনসনের কথা ছাড়া কেউ এক পা চলে না৷ তোর কপাল ফুটো—কী আর করবি!’

রয় হাত বাড়িয়ে কাউন্টারের উপর রাখা ছাইদানে সিগারেটের টুকরোটা গুঁজে দিল, ‘তাহলে তোকে একটা কথা বলা দরকার, শেট৷ একটু আগেই তোকে বলেছি গত দুমাসে একটা সিন্দুকও আমি বেচতে পারিনি৷ এতএব, যখনই আমি কোম্পানিতে ফিরে যাব, সঙ্গে সঙ্গে ওরা আমাকে রাস্তা দেখাবে৷ কারণ, শুধু মুখ দেখবার জন্যে ওরা আমাকে রাখেনি৷ অর্থাৎ চাকরি খতম!’ রয় বিরক্তিতে ভুরু কোঁচকাল৷

‘এতে তোর ভাবনার কী আছে? অন্য-কোন সিন্দুক কোম্পানি তোর মতো কারিগর পেলে একেবারে লুফে নেবে৷ তুই ‘‘হেওয়ার্ডসে’’ চলে যা না৷ ওদের কোম্পানির সিন্দুক লরেন্স কোম্পানির থেকে অনেক বেশি বিক্রি হয়৷

রয় মাথা নাড়ল, ‘উহুঁ, হেডয়ার্ডস কেন, কোন সিন্দুক কোম্পানিই আমাকে কলকে দেবে না৷ ওরা জানতে চাইবে, কেন আমি চাকরি ছাড়লাম৷ তখন শালা ফ্রাঙ্কলিন ওদের স-ব বলে দেবে৷ বলবে, আমি ঠিক বিশ্বস্ত কর্মচারী নই—ব্যস, হয়ে গেল! চাকরি না পাওয়ার পক্ষে এই কথা ক-টাই যথেষ্ট!’

একটু অবাক হয়ে রয়ের দিকে তাকালাম, ‘তার মানে? ফ্রাঙ্কলিন তো আর প্রমাণ করতে পারছে না কুপারের ব্যাপারটায় তুই জড়িয়ে ছিলি!’

‘প্রমাণ করার কোন প্রয়োজন নেই৷ ফ্রাঙ্কলিনের কথাকেই ওরা বেদবাক্য বলে মনে করবে৷ আর সঙ্গে সঙ্গে হেডয়ার্ডস থেকে অর্ধচন্দ্র৷’

‘তাহলে কি করবি ভাবছিস?’

রয় ঠোঁট উলটে কাঁধ নাচাল, ‘কি জানি, কিছু তো বুঝে উঠতে পারছি না৷ সিন্দুকের কাজ ছাড়া আর-কোন কাজই আমি জানি না৷ তা ছাড়া, বয়েসও তো পঁয়ত্রিশ হল এই বয়েসে নতুন চাকরিই বা কে দেবে?’ কথা বলতে বলতে হঠাৎ ঘড়ি দেখল রয়, ‘আরে, একটা বাজে! অ্যাই, কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা কর মাইরি—ভীষণ খিদে পেয়েছে৷’

আজ কি কি রান্না করেছি, ওকে জানালাম৷ এই সময় দুজন ট্রাক ড্রাইভার এসে খাবারের অর্ডার দিল৷ রান্নাঘরের গিয়ে তাদের খাবার তৈরি করছি, রয়ের গলা কানে, ‘শেট, ফ্রায়েড চিকেন থাকলে আমাকে তাই দে৷’

‘ঠিক আছে, বোস—একটু পরেই নিয়ে আসছি৷ আগে খেয়ে তারপর বলিস, কি জানিস! আমি বাজি ফেলতে পারি, আগে কখনও এরকম রান্না তুই খাসনি৷’

‘সবই বুঝলাম বাবা—কিন্তু আর দেরি করিস না তাহলে ক্ষিদের চোটে টেবিল চেয়ার কামড়াতে শুরু করব!’ নিজের রসিকতায় ও নিজেই হেসে উঠল, ‘শালা, সেই কখন থেকে না খেয়ে আছি৷’

কাজ করতে করতে মাঝে মাঝেই জানলা দিয়ে বাইরে দেখছি—লোলা এল কিনা৷ এতক্ষণে তো ওর ফিরে আসার কথা৷ কেন এত দেরি হচ্ছে বুঝতে পারছি না৷

যখন রয়ের জন্য প্লেটে ফ্রয়েড চিকেন সাজিয়ে নিয়ে আসছি, দেখলাম দূরের বালিয়াড়ির পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে ছুটে আসছে লোলার মার্কারি৷

খাবারের প্লেটটা এনে রয়ের সামনে রাখলাম, ‘মিসেস জেনসন আসছেন৷’ তারপর গলার স্বরকে অপেক্ষাকৃত নিচু করলাম, ‘এখানে আমার নাম শেট কারসন নয়—শেট প্যাটমোর৷ ভুলিস না যেন!’

রয় ছোটবেলা থেকেই আমাকে শেট নামে ডেকে অভ্যস্ত৷ তাই জ্যাক প্যাটমোর বললেও, ও হয়তো ভুল করে শেট নামেই আমাকে ডেকে বসবে৷ তার তা শুনে লোলা যদি অবাক না হয়, তাহলে ও ভাববে, লোলা আমার আসল পরিচয় জেনেও আমাকে এখানে থাকতে দিয়েছে৷ এবং এতে রয় নির্ঘাত সন্দেহ করে বসবে৷ হয়তো বুঝতে পারবে জেনসনের উধাও হওয়ার পিছনে আমাদের হাত আছে৷ এইসব ভেবেই এই নামটা বললাম৷

রয় ঘাড় নেড়ে চোখ টিপল, ‘নিশ্চিন্ত থাকুন, মি. শেট প্যাটমোর৷ আমার কোন ভুল হবে না৷’

রেস্তোরাঁর পিছন দিকে এসে লোলা গাড়ি থামাল৷ একটু পরেই, রান্নাঘরের পিছন দিকে যে খিড়কি দরজা আছে, সেটা খোলার শব্দ পেলাম৷ রয়কে ইশারায় অপেক্ষা করতে বলে গেলাম রান্নাঘরে৷

‘আমার ফিরতে একটু দেরি হয়ে গেল, এদিকে সবকিছু ঠিক আছে তো?’ রুমাল দিয়ে মুখের ঘাম মুছল লোলা৷ রোদে একটানা গাড়ি চালানোর ফলে ওর মুখ হয়ে উঠেছে রক্তাভ৷

‘হ্যাঁ, সব ঠিক আছে—কোন অসুবিধে হয়নি৷’ ওকে কাছে টেনে নিয়ে ওর গালে ছোট্ট করে চুমু খেলাম, ‘তবে একটা ব্যাপার হয়েছে, লোলা৷ আমার এক ছোটবেলাকার বন্ধু আজ হঠাৎ এখানে এসে হাজির হয়েছে৷ কার্লের সঙ্গে ওর কিছু ব্যবসার কথাবার্তা ছিল৷ ওকে বলেছি, কার্ল অ্যারিজোনা থেকে মাস দুয়েকের আগে ফিরছে না৷’

লোলা যেন চমকে উঠল, ‘তোমার বন্ধু? কিন্তু ও যদি পুলিশে তোমার কথা—’

‘না, না৷ সে-সবের কোন ভয় নেই৷ বলছি না, আমার ছোটবেলাকার বন্ধু৷ আমাকে ভীষণ ভালোবাসে৷’

একসময় খাবার ঘর থেকে, কাউন্টারের উপর অধৈর্যভাবে টোকা মারার শব্দ কানে এল৷

‘দাঁড়াও—দেখে আসি, কে ডাকছে৷ পরে বরং গাড়ি থেকে সব মালপত্র নামানো যাবে৷’ লোলার লোভনীয় সঙ্গ ত্যাগ করে খাবার ঘরে ফিরে এলাম৷

দেখি, কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে একজন মোটাসেটা বয়স্ক লোক৷ পরনে ফিকে বাদামী রঙের স্যুট৷ টুপিহীন মাথায় চুলের স্বল্পতা চোখে পড়ছে৷ সারা মুখে একটা পরিশ্রান্ত ভাব৷

‘জনা বিশেক লোকের খাওয়ার ব্যবস্থা হবে?’ আমাকে ঢুকতে দেখে লোকটি প্রশ্ণ করল৷

‘নিশ্চয়ই হবে তাঁদের ভেতরে নিয়ে আসুন৷’

জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই চোখে পড়ল পাম্পের কাছে দাঁড়ানো একটা যাত্রীবাহী বাস৷ মোটা লোকটির নির্দেশে বাস থেকে যাত্রীরা একে একে নেমে আসতে লাগল৷

চট করে রান্নাঘরের দরজা দিয়ে উঁকি মারলাম৷ লোলাকে আসন্ন ভিড়ের কথা জানিয়ে, তাড়াতাড়ি হাত চালাতে নির্দেশ দিলাম৷ ও হেসে ঘাড় নাড়ল৷

কাউন্টারের কাছে ফিরে আসতে-না-আসতেই খাবার ঘর খদ্দেরে ভরে গেল৷ শুরু হল কাজ আর কাজ৷ একে দম নেবার সময় পাওয়া যাচ্ছে না, তার উপর কয়েক ট্রাক তেল নেবার জন্য অনবরত হর্ন দিতে লাগল৷

রয়ের তখন খাওয়া-দাওয়া শেষ৷ ও বসে বসে দেখছিল, আমি খদ্দেরদের চাপে পড়ে কিরকম হিমসিম খাচ্ছি৷ হঠাৎই টুল ছেড়ে ও আমার কাছে এগিয়ে এল, ‘আমি সাহায্য করলে তোর আপত্তি আছে? বল্ তো বাইরে গিয়ে ট্রাকগুলোকে পেট্রল দিই৷’

‘তাহলে তো আমার অনেক সুবিধে হয়৷’ খুচরো পয়সা-ভরা থলেটা ওর দিকে এগিয়ে দিলাম, ‘পাম্পের মিটারেই দাম লেখা আছে দেখতে পাবি—কোন অসুবিধে হবে না৷’

থলেটা নিয়ে রয় পাম্পের দিকে চলে গেল৷

দেড়টি ঘণ্টা টানা ব্যস্ত থাকার পর কাজের চাপ হালকা হল৷ যাত্রীদের নিয়ে বাস চলে গেল৷ এতক্ষণ কাজের ভিড়ে রয়ের কথা আমার মনেই ছিল না৷ এখন হঠাৎ খেয়াল হওয়াতে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম৷

পাম্পের কাছে এখনও তিনটে গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ রয় একমনে তাদের উইন্ডস্ক্রীন পরিষ্কার করছে৷

রান্নাঘর ছেড়ে লোলা যে কখন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, লক্ষ্যই করিনি৷ ও রয়কে একদৃষ্টে দেখতে লাগল৷ একসময় আমার দিকে ফিরে প্রশ্ন করল, ‘শেট, এ লোকটা কে? তোমার সেই বন্ধু নাকি?’

‘হ্যাঁ, আমার বন্ধু রয় ট্রেসি৷’ জানালা দিয়ে আমি তখনও রয়কে দেখছি, ‘কাজের চাপ দেখে নিজে থেকেই সাহায্য করতে চাইল, তাই—বেশ ভালোই কাজ করছে কী বলো?’ বন্ধু-গর্বে গর্বিত হয়ে লোলার দিকে চেয়ে হাসলাম৷

‘হুঁ—’ লোলার স্বরে এমন একটা কিছু ছিল, যার শুনে চোখ ফেরাতে গিয়েও থমকে গেলাম৷ খুঁটিয়ে লোলাকে দেখতে লাগলাম৷ ও কিন্তু তখনও একইভাবে জানালা দিয়ে চেয়ে আছে—রয়কে দেখছে৷

হঠাৎ ওর সবুজ চোখ কোন-এক কুটিল চিন্তায় কুঁচকে উঠল, ‘তোমার বন্ধু কি এখানে কাজ করবে বলেছে, শেট? তাহলে ওকে রাখলে কেমন হয়? তুমিই তো বলছিলে, আমাদের একজন বিশ্বস্ত কর্মচারী দরকার৷’

ওকে জড়িয়ে ধরে আস্তে চাপ দিলাম, ‘আমিও তোমাকে ঠিক এই কথাই বলতে যাচ্ছিলাম, লোলা৷ রয় আমার ভাইয়ের মতো, আর খুবই বিশ্বাসী৷ ওকে তো আগেই বলেছি জেনসন এখানে নেই৷ এখন জানিয়ে দিলেই হবে, কার্ল অন্য একটা মেয়েকে নিয়ে ভোগে পড়েছে৷ ও কোন সন্দেহই করবে না৷—কিন্তু রয় কি এই নির্জন জায়গায় থাকতে চাইবে?’

‘সেটা ওকে বলেই দেখ!’ লোলা রয়ের দিক থেকে চোখ না সরিয়েই জবাব দিল৷

লোলার কাঁধে হাত রেখে হাসলাম, ‘তবে একটা কথা বলতে পারি, লোলা—তোমার দিকে রয় কখনোই হাত বাড়াবে না৷ উনিশ বছর বয়সে ওর বউ পালানোর পর থেকে, ও কোন মেয়েকেই সহ্য করতে পারে না৷’

‘এই, রয় আসছে৷ এলে ওকে জিগ্যেস করো থাকবে কিনা৷’ রয়কে আসতে দেখে চাপা স্বরে লোলা বলল৷

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রয় খাবার ঘরে এসে ঢুকল৷ লোলাকে দেখেই ও থমকে দাঁড়াল—অবাক হয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল৷ অন্য কেউ লোলার দিকে এভাবে চেয়ে থাকলে হয়ত অস্বস্তি বোধ করতাম৷ কিন্তু রয়কে আমি চিনি—তাই হেসে ওর সঙ্গে লোলার পরিচয় করিয়ে দিলাম, ‘রয়, ইনিই মিসেস জেনসন৷ লোলা, এ আমার বন্ধু—রয় ট্রেসি৷’

‘যে কাজের চাপ পড়েছিল! তুমি সাহায্য না করলে হয়তো ভীষণ অসুবিধেয় পড়তাম৷’ লোলা রয়ের দিকে চেয়ে হাসল, ‘সাহায্যের জন্যে ধন্যবাদ৷’

‘ও কিছু নয়৷’ রয় হেসে লোলার হাসি ফিরিয়ে দিল, ‘সত্যি, মিসেস জেনসন, এই জায়গাটা ভারি চমৎকার!’

‘জায়গাটা সত্যিই আপনার ভালো লেগেছে?’

‘নিশ্চয়ই! না হলে আর বলছি?’

‘তাহলে এখানে থেকেই যা না৷’ সুযোগ বুঝে রয়কে বললাম, ‘রাস্তার ওপারে একটা ঘর আছে, ওখানে থাকতে পারিস৷ আর সপ্তাহে চল্লিশ ডলার করে মাইনে পাবি৷ কি রে, রাজি?’

রয় আমার দিক থেকে চোখ সরিয়ে লোলার দিকে তাকাল৷ মূর্খের ধূর্ত হাসিটাকে আরও ধূর্ত করল, ‘আপনি যদি রাজি থাকেন তাহলে আর আপত্তি করি কেন, মিসেস জেনসন?’

‘রাজি না হওয়ার কি আছে?’ এই তো সেদিন শেটকে বলছিলাম, আমাদের একজন লোকের দরকার৷’

‘তাহলে থাকব৷’ কাঁধ ঝাঁকিয়ে রয় হাসল৷

এমন সময় একটা ফোর্ড স্টেশন-ওয়াগন একরাশ ধুলো উড়িয়ে পাম্পের কাছে এসে থামল৷ সেটাকে একনজর দেখে নিয়ে রয় আমার দিকে চেয়ে দাঁত বের করে হাসল, ‘কী স্যর, বলেন তো এই গাড়িটাকে দিয়েই আমার চাকরি শুরু করি?’

ওর কপট ঠাট্টার সুরে হাসলাম, ‘এত তাড়াতাড়ির কিছু নেই৷ লোলার সঙ্গে আলাপ-সাপাল কর, জায়গাটা ঘুরে-ফিরে দেখ্, তারপর কাজ শুরু করবি৷—এ গাড়িটা আমিই দেখছি৷’

খাবার ঘর ছেড়ে বেরোবার আগে লোলাকে বললাম, ‘ভালো করে ওর যত্ন-আত্তি করো—সেই সুকল থেকে ও আমার বন্ধু শুধু বন্ধু কেন, একেবারে ভাইয়ের মতো৷’

রয় হেসে আমার পাঁজরে এক খোঁচা মারল, ‘ঠিক বলেছিস৷’ ও ফিরে তাকাল লোলার দিকে—ওর চোখে চোখ রাখল, ‘একেবারে ভাইয়ের মতো!’

রাত দশটায় গাড়ি-ট্রাকের ভিড় কমলে আমরা খেতে বসলাম৷ ডিনার টেবিলের একদিকে আমি আর লোলা৷ আমাদের মুখোমুখি, টেবিলের অপরদিকে বসেছে রয়৷ রয়ের উপস্থিতি আমার কাছে কিছুটা অস্বস্তির কারণ হলেও লোলাকে বেশ উৎফুল্ল মনে হল৷ নতুন চাকরির আনন্দে রয় উদ্বেলিত খেতে খেতে অনর্গল বকবক করছে৷

‘জায়গাটা আমার ভীষণ ভালো লেগেছে শেট! কে ভেবেছিল বল্, এভাবে হুট করে তোর সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে, আর সঙ্গে-সঙ্গে একটা লোভনীয় চাকরি পেয়ে যাব৷ ঘুরে ঘুরে সিন্দুক বেচার চেয়ে এখানে চাকরি করা অনেক ভালো৷’

লোলা খেতে-খেতে থমকে রয়ের দিকে তাকাল, ‘তুমি বুঝি সিন্দুক কোম্পানিতে কাজ করতে?’

‘আপনার কাছে কিছুই গোপন করব না, মিসেস জেনসন,’ রয় দাঁত বের করে হাসল, ‘সিন্দুকের লাইনে আমার আর শেটের চেয়ে ভালো কারিগর বেশি নেই৷’

কথা শেষ করে আমার দিকে ফিরল সমর্থনের আশায়, ‘কি রে, মিথ্যে বলছি?’

‘না, মানে—মোটামুটি আর কি! এই সিন্দুক-লাইনে আমাদের চেয়েও বাজে কারিগর অনেক দেখেছি৷’

‘জানেন মিসেস জেনসন, আমি আর শেট একই দিনে, একই কোম্পানিতে চাকরি নিয়েছিলাম৷ অবশ্য ও আমার চেয়ে অনেক ভালো কারিগর, তবে সিন্দুকের তালার ব্যাপারে ওর চেয়ে আমার অভিজ্ঞতা বেশি৷ কিন্তু ওকে নিয়ে মুশকিল হল, ও বড্ড বেশি সাধুপুুরুষ৷ ওর সঙ্গে আমার পরিচয় হওয়ার দিন থেকে আজ পর্যন্ত ও শুধু আমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেই গেছে৷ সবসময়ে আমিই ওকে ঝামেলায় জড়িয়েছি, আর শেষ পর্যন্ত ও-ই আমাকে বাঁচিয়েছে৷’

‘এখানে কোন ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার ভয় নেই, রয়৷’ শীতল স্বরে ওকে বললাম, ‘দৈনন্দিন কাজ-কর্ম ছাড়া আর বিশেষ কিছু করার আছে বলে তো মনে হয় না৷’

‘আমার তাতে বিন্দুমাত্রও আপত্তি নেই,’ রয়ের মুখের ভাব হঠাৎই গম্ভীর মনে হল, ‘কিন্তু মি. জেনসন ফিরে এসে আমাকে দেখলে কি বলবেন?’ ও লোলার দিকে তাকাল, ‘মিসেস জেনসন, চাকরিটা স্থায়ী হলেই ভালো হয়৷’

‘কার্ল ফিরবে বলে আমার মনে হয় না৷’ লোলার বিষণ্ণ ঘরের পরিবেশ মুহূর্তে ভারী হয়ে উঠল, ‘আর যদিও বা ফিরে আসে, তোমাকে দেখলে খুশিই হবে৷’

রয় চমকে মুখ তুলে তাকাল লোলার দিকে, ‘মি. জেনসন ফিরবেন না? কি বলছেন আপনি!’ ও একপলক আমাকে দেখল, তারপর আমার চোখ ফেরাল লোলার দিকে, ‘কিছু গণ্ডগোল হয়েছে নাকি, মিসেস জেনসন?’

‘হ্যাঁ, সাধারণত যা হয়, তাই৷’ কথার পিঠে কথা বলার ভঙ্গিতে লোলা জবাব দিল, ‘আমি কাউকে এখনও বলিনি৷ চিঠিতে কার্ল পরিষ্কার করে না লিখলেও, আমার মনে হয়, ও আর ফিরবে না৷ অ্যারিজোনায় গিয়ে কার্ল এমন আর-একটা মেয়ের সন্ধান পেয়েছে, যাকে ওর আমার চেয়ে অনেক বেশি ভালো লেগেছে৷’ কথা শেষ করে লোলা মাথা নিচু করল, কাঁটা-চামচটা আঙুল দিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগল৷

রয় হঠাৎ যেন অস্বস্তিবোধ করল, ‘আমি দুঃখিত, মিসেস জেনসন—’

লোলা মুখ তুলে হাসল, ‘এতে দুঃখিত হওয়ার কী আছে—’ ও হাত রাখল আমার হাতে, ‘এখন আমি আর শেট—’ লোলা মাঝপথেই থামল, আমার হাতে আস্তে চাপ দিল, ‘কার্ল যে শেটকে এখানে রেখে গেছে, তাতেই আমি খুশি৷ আর-কিছু আমার চাই না৷’

রয় আমার দিকে চেয়ে মুচকি হেসে মাথা নাড়ল, ‘শেট, তোর ভাগ্য সত্যিই অসাধারণ!’

‘তাই তো দেখছি৷’ ঠাট্টার সুরে জবাব দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম, ‘চল্, তোকে তোর ঘর দেখিয়ে দিই৷’

রয় খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়াল, ‘এত চমৎকার রান্নার জন্যে ধন্যবাদ, মিসেস জেনসন৷’

লোলা রয়ের দিকে চেয়ে হাসল, ‘আমাকে লোলা বলেই ডাকবে৷ এখানে আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেককে নাম ধরেই ডাকি তার ওপর তুমি আবার শেটের বন্ধু৷’

‘তাই সই৷ বল তো প্লেট ধোবার ব্যাপারে সাহায্য করি—হুঁ?’

‘নাঃ, তার কোন দরকার নেই৷ ও আমি একাই পারব৷ তুমি বরং শেটের সঙ্গেই যাও৷’

চাঁদের আলোয় ভেজা বালির রাস্তা ধরে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম৷

‘খুকিখানা পেয়েছিস জববর! তোর জন্যে আমার সত্যিই আনন্দ হচ্ছে, শেট৷ এখনও ভেবে দেখ, আমি থাকাতে তোর কোন অসুবিধে হবে না তো৷’

‘একটুও না, তাছাড়া, সারাটা দিন ধরে একটা মেয়ের সঙ্গে কাটাতে ভালো লাগে? গল্প ইয়ার্কি করবার জন্যে কারও সঙ্গ চাই তো৷’

রাস্তার ওপারে পৌঁছে ঘরের দরজা খুলে আমরা ভেতরে ঢুকলাম৷

‘এ যে সাংঘাতিক কাণ্ড দেখছি! শালা, টেলিভিসন পর্যন্ত রয়েছে!’ রয় ঘরের চারদিকে চোখ বুলিয়ে একেবারে অবাক হয়ে গেল৷ তারপর ঘরের জানলা দিয়ে রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা জেনসনের বাংলোর দিকে তাকাল, ‘তুই কি এখন ওখানে থাকিস?’

‘হ্যাঁ৷ তা ছাড়া কোথায় থাকব?’ হেসে জবাব দিলাম৷

‘হুঁ, মেয়েদের ব্যাপারে তুই মাইরি গুরুদেব! আমার বাবা ওসব আসে না—’ রয় ওর মালপত্রের ব্যাগটা একটা চেয়ারে নামিয়ে রেখে সিগারেট ধরাল, ‘এই জেনসন লোকটা দেখছি নিতান্তই বোকার চূড়ান্ত৷ নয়তো এরকম একটা জায়গা ছেড়ে চলে যায়! আর তাও কিনা সামান্য একটা মেয়ের জন্যে! নাঃ, আমার মাথায় শালা কিছুই ঢুকছে না৷ ওই মেয়েটার কাছে জেনসন এমন কি পেল বল্ তো, যা লোলার নেই?’

‘আমার মনে হয়, কার্ল কোন মোটাসোটা সমবয়সী বুড়ির প্রেমে পড়েছে৷ লোলা ওর চেয়ে বিশ বছরের ছোট হওয়ায় ওদের একদম বনিবনা হত না৷’

রয় সিগারেটে একটা লম্বা টান দিল৷ তারপর ফুরফুর করে একটানা ধোঁয়া ছাড়ল, ‘তাহলে তো একটা সহজ উপায়ই ছিল৷ লোলাকে ভাগিয়ে দিয়ে জেনসন নিজেই এখানে থাকতে পারত! আমি হলে অন্তত তাই করতাম৷’

রয়কে আমি ছোটবেলা থেকেই চিনি৷ ও আর যাই হোক, বোকা নয়৷ ব্যাপার-স্যাপার দেখে ওর সন্দেহ হয়েছে, তা বুঝতে পেরে সতর্ক হলাম৷ যেভাবে হোক ওকে বিশ্বাস করাতেই হবে৷ না হলে ও হয়ত আসল ব্যাপারটাই ধরে ফেলবে—জেনসন আর বেঁচে নেই!

‘ভাগিয়ে দেব বললেই হল? অত সোজা নয় রে, রয়! আর লোলাই বা নিজের পাওনা ছাড়বে কেন?’

ওর সন্দেহাতুর চোখ আমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল, ‘জেনসন গেছে কদ্দিন হল?’

‘মাসখানেক হবে৷’

‘এর মধ্যে লোলা ওর কাছ থেকে কোন চিঠিপত্তর পেয়েছে?’

‘উহুঁ৷’

‘তাহলে জেনসন যে ওখানে গিয়ে অন্য মেয়ের প্রেমে পড়েছে, সে-সম্বন্ধে লোল নিশ্চিত হল কেমন করে?’

‘ও কার্লকে অনেকদিন ধরে জানে—সে যে ওখানে গিয়ে অন্য কোন মেয়ের প্রেমে পড়েছে, সে-বিষয়ে লোলা নিঃসন্দেহ৷’

রয় মাথা নাড়ল, ‘কিন্তু জেনসন যদি হঠাৎ ফিরে আসে? তোকে আর লোলাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে?’

‘জেনসন আর ফিরবে না, রয়৷’ আমার গলায় সিদ্ধান্তের সুর৷

রয় চমকে মুখ তুলে আমাকে দেখল৷ তারপর আবার চোখ ফেরাল অন্যদিকে, ‘তুই যে ঝামেলায় জড়িয়ে আছিস, সে-কথা লোলাকে বলেছিস?’

উত্তর দিতে কয়েক মুহূর্ত দ্বিধা করলাম৷ কি উত্তর দেব এ প্রশ্নের? লোলা আমার সম্বন্ধে সবই জানে, তা কি বলব? কিছুক্ষণ চিন্তার পর ঠিক করলাম, রয়কে একথা জানানোর কোন বিপদ নেই৷ হাজার হলেও ও আমার ছোটবেলাকার বন্ধু৷ তাই সম্মতি জানিয়ে জবাব দিলাম, ‘হ্যাঁ, বলেছি৷’

আমার উত্তরে রয় একটুও অবাক হল না৷ হয়তো এই উত্তরই ও আশা করেছিল৷

রয় একমনে ওর ব্যাগ খালি করে জিনিসপত্রগুলো বিছানার উপর ছড়িয়ে রাখতে লাগল, ‘এ জায়গাটাকে ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারলে, তুই রাজা হয়ে যাবি৷ সপ্তাহে কি রকম আমদানি হয়, শেট?’

জেনসন মারা যাবার পর থেকে সাপ্তাহিক আয় একেবারে কমে গেছে৷ কারণ, ওর পুরোনো লোহালক্কড়ের ব্যবসা থেকেই একটা মোটা টাকা আসত৷ আর এই লোহালক্কড়ের ব্যাপারে আমি আর লোলা সমান দিগগজ৷ তাই কার্ল মারা যাবার পরই লোহালক্কড়ের ব্যবসা একেবারে মুখ থুমড়ে পড়েছে৷ বর্তমানে আমাদের ভরসা রেস্তোরাঁ, পেট্রল এবং গাড়ি মেরামত৷ কিন্তু হলে কি হবে, যা আশা করেছিলাম, আয়-পত্তর তার ঢের কম হয়৷ টেনেটুনে সপ্তাহে মাত্র শ-দুয়েক ডলার লাভ হয়৷ সে-টাকাটা আমি আর লোলা ভাগাভাগি করে নিই৷ অর্ধেক আমার, আর বাকী অর্ধেক ওর৷

জেনসন মারা যাবার পর, ওর সিন্দুকে আমার জমানো টাকা ঠিক যেমন ছিল তেমনই আছে৷ ওতে আর হাত দিইনি, কারণ টাকাটা খরচ করবই বা কিসে? তাই এখনও প্রতি সপ্তাহে, আমার ভাগের একশো ডলার ওই সিন্দুকেই জমিয়ে রাখি৷ লোলা ওর ভাগের টাকাটা দিয়ে কি করে জানিও না, জিগ্যেসও করি না৷

‘কীরে শেঠ, বললি না তো আমদানি কেমন হয়?’

রয়ের কথায় আমার চমক ভাঙল৷ ভাবনা-চিন্তা ছেড়ে সাত-তাড়াতাড়ি জবাব দিলাম, ‘তুই যত ভাবছিস, তত নয়৷ এই—শ-দুয়েক আসে আর কি?’

রয় হতাশায় মুখ ব্যাজার করল, ‘কী বলছিস তুই! এত কম!—আমি তো ভেবেছিলাম দু-শ ডলারের বেশি৷’ ও পায়ে পায়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল৷ বাইরেটায় একবার চোখ বুলিয়ে বলল, ‘ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারালে, এরকম একটা জায়গাকে কাজে লাগিয়ে মোটা টাকা আমদানি করা যায়৷’

‘উহুঁ—সেরকম কোন আশা নেই৷ এই বিশাল মরুভূমির মাঝে, এই হতচ্ছাড়া জায়গা কি কাজেই বা লাগবে?’

‘আরে, মরুভূমির মাঝে বলেই তো বলছি!’ রয় উৎসাহভরে আমার দিকে তাকাল, ‘কোন ব্যবসার ব্যাপারে এর চেয়ে ভালো জায়গা আর যে হতে পারে না, এটুকু তুই বুঝতে পারছিস না?’

‘তার মানে, কী ব্যবসা?’

‘তুই কি এই নির্জন শ্মশানেই চিরজীবন পড়ে থাকতে চাস, শেট? ছোটবেলা থেকেই আমরা সবসময় ভেবে এসেছি কি করে বড়লোক হব, দুটো পয়সার মুখ দেখব!—তাই তো বললাম, এ-জায়গাটা কাজে লাগাতে পারলে তুই রাজা হয়ে যাবি৷’ রয় ফিরে এসে আমার মুখোমুখি বসল৷

বিছানায় বসে ভুরু কুঁচকে রয়ের দিকে তাকালাম, ‘কী কাজে? খুলে বল্৷’

‘এই—ধর্—মেক্সিকো চেড়ে যারা পালাতে চায়, তাদের হেলিকপ্টারে করে এখানে নিয়ে আসা যায়৷ এ জায়গাটা তাদের ভালোই লাগবে৷ আর আমরাও মাথাপিছু দু-শ ডলার করে মোটা টাকা খিঁচতে পারব!’

‘রয়, তুই যদি মাস দুয়েক ফার্নওয়ার্থে থাকতিস, তবে আর এ-ধরনের কথা বলতিস না৷’ শান্ত স্বরে ওকে বললাম৷

রয় মাথার চুলে হাত চালিয়ে নির্লজ্জের মতো হাসল৷ কিছুটা অস্বস্তিভরেই বলল, ‘সে-কথা ঠিক, শেট৷ তোর মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি৷ কিন্তু কুপারের এই কাজটা আমরা ঠিকভাবে করতে পারিনি৷ বোকার মতো, মাত্র দুদিনের অনুসন্ধানেই কাজে নেমে পড়েছি৷ আমাদের উচিত ছিল, অন্তত এক সপ্তাহ কুপারের গতিবিধি লক্ষ্য করা৷ ওর সমস্ত ভাব-গতিক জেনে, তারপর আসল কাজে হাত দেওয়া—কিন্তু কোথায় কি? নিজেদের দোষেই আমরা বিপদে পড়লাম৷’

‘ওসব দুদিন-ফুদিন নয়৷ কাজটা আমাদের করাই উচিত হয়নি৷ নিজেরাই বিপদ ডেকে এনে নিজেদের পায়ে কুড়ুল মেরেছি—তুই না হলেও অন্তপক্ষে আমি তোকে সোজাসুজি জানিয়ে দেওয়াই ভালো, রয়—আর-কোন ঝামেলায় আমি নিজেকে জড়াতে চাই না৷’

‘সে আমি বুঝতে পারছি, শেট, কিন্তু বড়লোক হওয়ার আশা ছাড়তে আমি রাজি নই৷ আজ হোক, কাল হোক, বেশ কিছু টাকা আমার চাই-ই চাই৷’

‘সেই ‘‘বেশ কিছু টাকা’’ যে এখান থেকে পাবি না, সে-বিষয়ে তুই নিশ্চিন্ত থাকিস৷’

রয়ের সেই বিশেষ হাসিটি তখনও ওর ঠোঁটে লেগে রয়েছে, ‘আচ্ছা বাবা, ঠিক আছে৷ কোন ঝামেলার তোকে আর জড়াচ্ছি না৷’

রয় উঠে টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল৷ একটা ড্রয়ার খুলে কতকগুলো শার্ট, প্যান্ট তাতে রাখল৷ তারপর মুখ ফিরিয়ে তাকাল, ‘শেট, সত্যিই কি তোর আর বড়লোক হওয়ার সাধ নেই?’

‘না, রয়—ফার্নওয়ার্থের দাওয়াই খেয়ে সে-সাধ আমার মিটে গেছে৷ তুই খেলে তোরও যেত!’

‘শুনেছি, ওরা নাকি কয়েদীদের কাছে খুব নৃশংস ব্যবহার করে—’ গোটাকয়েক রুমাল বিছানা থেকে তুলে দ্বিতীয় ড্রয়ারটা খুলল৷ কিন্তু সেগুলো রাখতে গিয়েই তীক্ষ্ণস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো, রয়, ‘আরে! এটা কী?’

ওর কথার সুরে চমকে উঠলাম৷ অশান্ত হৃৎপিণ্ড যেন ধাক্কা খেল এক অদৃশ্য কাচের দেওয়ালে, ‘কীসের কথার বলছিস?’ দুরু দুরু বুকে প্রশ্ন করলাম৷ তাহলে কি রয়—?

আমার আশঙ্কা যে মিথ্যে নয়, পরমুহূর্তেই তার প্রমাণ পেলাম৷ রয় .৪৫ কোন্ট রিভলভারটা ততক্ষণে ড্রয়ার থেকে বের করে ফেলেছে যে রিভলভারের গুলিতে মারা গেছে কার্ল জেনসন৷

চোখের সামনে গোটা পৃথিবীটা যেন দুলে উঠল৷ ভীষণভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়ল মস্তিষ্কের প্রতিটি চিন্তা-কোষ—কী জবাব দেব ওকে?

সেই ঘটনার পর রিভলভারটা লোলার কাছ থেকে নিয়ে, পরে কখন যে ওই ড্রয়ারটায় রেখে দিয়েছিলাম, মনেও নেই৷ এতদিন ওটার কথা একেবারেই ভুলে ছিলাম৷ কিন্তু এখন? কি বলব রয়কে! একটা সরীসৃপ যেন আস্তে আস্তে শিরদাঁড়া বেয়ে উঠতে লাগল৷

হঠাৎ ইচ্ছে হল, একলাফে রয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রিভলভারটা কেড়ে নিই, কিন্তু অনেক কষ্টে দমন করে কোনরকমে জবাব দিলাম, ‘ওঃ, ওটা জেনসনের রিভলভার৷ ও চলে যাবার পর, একদিন রিভলভারটা পেয়ে এই ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখেছিলাম৷’ যতটা সম্ভব সহজ হবার চেষ্টা করলাম৷

রয় নিষ্পলক চোখে রিভলভারটার দিকে তাকিয়ে ছিল৷ গুলি ভরার সিলিন্ডারটা ও আঙুল দিয়ে ঘোরাল৷ রিভলভারের নলটা নাকের কাছে এনে শুকল, ‘খুব সম্প্রতি এটা থেকে গুলি ছোঁড়া হয়েছে দেখছি৷’ ও ম্যাগাজিন খুলে খালি কার্তুজের খোলটা বের করে বিছানায় উপর ফেলল, ‘দেখেছিস?—তুই জানতিস না এটা থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে?’—হুঁ—গুলিটা ছোড়া হয়েছে খুব বেশি দিন হয়নি দেখছি৷’ আত্মগতভাবে শেষ কথাগুলো বলে, রয় ওর অন্তর্ভেদী তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে ধরল আমার চোখে, ‘এই গুলিতে কে মারা গেছে, শেট?’

বহু কষ্টে ওর চোখে চোখ রাখলাম৷ অপরাধবোধের ছায়াকে মুখের আয়না থেকে সরিয়ে রাখবার আপ্রাণ চেষ্টা করলাম, ‘কেউ মারা যায়নি রয়৷ জেনসন এটা দিয়ে চিল শিকার করত৷ হয়তো গুলি করার পর রিভলভারটা পরিষ্কার করতে ভুলে গেছে৷’

‘.৪৫ রিভলভার দিয়ে কেউ যে পাখি শিকার করে, তা তো জানতাম না!’ রয় রিভলভারটা টেবিলের উপর নামিয়ে রাখল, ‘তাহলে জেনসনের টিপ বলতে হবে৷’

‘গুলি করত, এই পর্যন্ত৷ কোনদিন কোন চিলের গায়ে লাগাতে তো দেখিনি৷’ এগিয়ে গিয়ে টেবিল থেকে রিভলভারটা তুলে নিয়ে পকেটে রাখলাম, ‘যাকগে, অনেক দেরি হয়ে গেল—আমি চলি৷ তোর সব-কিছু ঠিক আছে তো?’

‘হ্যাঁ, সব ঠিক আছে৷’ রয়ের গলায় কেমন যেন একটা নিষ্প্রাণ সুর৷ কিছুটা অস্বস্তিবোধ করলাম৷

‘আজ রাতে কে জাগছে, শেঠ?’ রয় হঠাৎ প্রশ্ন করল৷

‘আমি৷ কিন্তু কাল রাতে তোর ডিউটি৷ আমরা দুজনেই পালা করে চালাব, কী বলিস?’

‘হুঁ৷ —শেট, আমার সৌভাগ্যকে আমি কিন্তু এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না৷ কি অদ্ভুতভাবেই না তোর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, তাই না?’

ওর কাঁধে হাত রাখলাম, ‘সৌভাগ্য তো আমারও৷ আমিও কি জানতাম, তোর সঙ্গে এতদিন পরে আবার এভাবে দেখা হবে? নে, শুয়ে পড়্—’ পা বাড়ালাম দরজার দিকে৷

‘শেট!’

থমকে দাঁড়ালাম৷

ঘাড় ফেরাতেই চোখে পড়ল রয়ের স্থির চোখজোড়ায়৷ ও একমনে চোয়ালে হাত বোলাচ্ছে৷

‘কি বলছিস বল্৷’

‘.৪৫টা পরিষ্কার করে রাখিস৷ যে-বন্দুকে বারুদের গন্ধ লেগে থাকে, সে বন্দুককে কখনও বিশ্বাস নেই!’

ওর চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিলাম, ‘ঠিকই বলেছিস৷ আচ্ছা—চলি৷

‘ভালোভাবে থেকো, দোস্ত!’ রয়ের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি৷

ঘর ছেড়ে বাইরে বেরোতেরই লক্ষ্য করলাম—রেস্তোরাঁয় কোন আলো নেই, কিন্তু বাংলোয় লোলার ঘরে আলো জ্বলছে৷ সুতরাং বাংলোর দিকে এগোলাম৷

লোলা বিছানায় বসে পা থেকে মোজা খুলছিল৷ পরনে সানদো অন্তর্বাস ও নাইলনের প্যান্টিস৷ আমি ঘরে ঢুকতেই ও ঘাড় ফিরিয়ে আমাকে একবার দেখল, তারপর আবার মোজা খোলায় মন দিল৷

‘ওঃ, ভীষণ ঘুম পাচ্ছে৷’ লোলা হাই তুলল৷ তারপর মাথার চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বলল, ‘শেট, তোমার বন্ধুকে আমার ভালো লেগেছে৷’

‘তা লাগবারই কথা৷ কারণ, রয় আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু৷’ পকেট থেকে রিভলভারটা বের করে টেবিলের একদম উপরের ড্রয়ারটায় রাখলাম৷ লোলা আমার দিকে পিছন ফিরে থাকায় কিছু দেখতে পেল না৷ ঠিক করলাম, কালই রিভলভারটা পরিষ্কার করে রাখব৷

ড্রয়ার বন্ধ করে লোলাকে বললাম, ‘আমরা তিনজন একসঙ্গে থাকলে দিনগুলো বেশ ভালোই কাটবে৷ তবে একটা কথা কি জান, রয় মেয়েদের ব্যাপারে বিন্দুমাত্রও কৌতূহলী নয়৷ মাঝে-মাঝে ভারি অবাক লাগে৷ সেই যে একবার উনিশ বছর বয়েসে ওর বউ পালাল—ব্যস, ওই শেষ! তারপর থেকে রয়কে কোন মেয়ের দিকে তাকাতে পর্যন্ত দেখিনি৷’

লোলা বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল৷ অবশিষ্ট জামাকাপড় ছেড়ে রাত্রিবাস পরতে লাগল, ‘শেট, পৃথিবীতে এমন কোন পুরুষ নেই, যে মেয়েদের প্রতি আকৃষ্ট হয় না—সেটা শুধু নির্ভর করে, কি রকম মেয়ে, তার ওপর৷’ লোলার কথায় যে একটা ঔদ্ধত্যের সুর লুকিয়ে আছে, সেটা আমার কান এড়াল না৷

‘লোলা, রয়কে আমি তিরিশ বছর ধরে জানি৷ আজ পর্যন্ত মাত্র একটি মেয়ের প্রতিই ও আকৃষ্ট হয়েছিল৷ সে ওর বউ৷ কিন্তু বছর দুয়েকের মধ্যেই সেসব আকর্ষণ-টাকর্ষণ ধুয়ে-মুছে মিলিয়ে গেছে৷’

লোলা বিছানায় শুয়ে পড়ল, ‘তাহলে ওর বউ নিশ্চয়ই তেমন সুন্দরী ছিল না—’ অ্যামেজে হাত ছাড়িয়ে ও হাই তুলল, ‘উ—ম্—ম্! তুমি একটা বাজলেই চলে এসো, কেমন?’

‘হ্যাঁ৷’ ঝুকে পড়ে ওকে চুমু খেলাম, ‘চুপচাপ ঘুমোও৷ আমি ফিরে এসে তোমাকে আর জাগাব না—৷’

‘সেই ভালো৷ আমার ভীষণ ক্লান্তি লাগছে৷’ লোলা চাদর টেনে নিল বুক পর্যন্ত, তারপর আমার দিকে চেয়ে হাসল, ‘ওহো, আমার তো মনেই নেই৷ সকালে কোন অসুবিধে হয়নি তো?’

কেউ যেন পাঁজরে এক লাথি বসিয়ে দিল৷ রিক্স! রিক্সের কথা তো একেবারে ভুলেই গেছি! রয়কে নিয়ে আনন্দে এত মেরে ছিলাম, ঐ বুড়ো শকুনটার কথা আমার মনেই পড়েনি৷

লোলা আমার মুখের ভাবে চমকে উঠে বসল, ‘কী হয়েছে, শেট?’

‘রিক্স আজ সকালে এসেছিল৷ ওর গায়ে হাত তুলতে ও আমাকে বাধ্য করেছে৷’

‘তুমি—তুমি ওকে মেরেছ?’ লোলার স্বর তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল৷

‘তা ছাড়া আর-কোন উপায় ছিল না৷’

লোলা উত্তেজনায় আমার হাত চেপে ধরল, ‘আমাকে সব খুলে বল৷ রিক্স কি করেছিল?’

ওকে সব খুলে বললাম৷

এক হাতে চাদরটা বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে, লোলা একমনে শুনতে লাগল৷ ওর সবুজ চোখজোড়া ভয়ে উত্তেজনায় বিস্ফারিত৷ সারা শরীর চাবুকের মতো টান-টান৷

‘ওকে দশ ডলার দিয়েছিলাম, কিন্তু সেটা ও আমার মুখের ওপর ছুড়ে মেরেছে৷ বলেছে, ও এবার পুলিশেই যাবে৷’

লোলা আশ্বস্ত হয়ে ধপাস করে আবার শুয়ে পড়ল, ‘কোন ভয় নেই, শেট—রিক্স পুলিশে যাবে না৷ আর গেলেও পুলিশ ওর কথা বিশ্বাস করবে না৷ ওরা রিক্সকে ভালোভাবেই চেনে৷’

‘সেটা হলেই ভালো৷’

‘কিন্তু তুমি ওকে মারতে গেলে কেন?’

‘বুঝতে পারছি, ওকে মারাটা ঠিক হয়নি, কিন্তু কি করব—!’

‘যাকগে, ও নিয়ে আর চিন্তা করো না৷ পুলিশের কাছে গেলে, ওরা রিক্সকে সোজা তাড়িয়ে দেবে৷’

লোলাকে কপালে চুমু খেলাম, ‘শুয়ে পড়ো, সোনা—আমি কাজ সেরে একটার মধ্যেই ফিরে আসব৷’

‘কাল রাতে কিন্তু আমরা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ব৷ রয়কে বলো রাতে কাজ করতে৷’

হেসে ওর রেশম-নরম চুলে হাত চালালাম, ‘যথা আজ্ঞা, মহারানী!’