ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ
১
চিন্তার সুরে বললেন, পোয়ারো, ‘কোন এক সকালে সৈকতে আমরা বসেছিলাম, আলোচনা করছিলাম কসাইয়ের দোকানে সাজানো মাংসের মতো পড়ে থাকা সূর্যস্নাত শরীরগুলো নিয়ে, এবং তখনই আমার মনে হয়েছে, দুটো ভিন্ন শরীরের মধ্যে কি সামান্যই না পার্থক্য৷ যদি কেউ গভীর এবং নিরীক্ষার দৃষ্টিতে দেখেন, তাহলে, হ্যাঁ পার্থক্য আছে—কিন্তু অসর্তক অমনোযোগী দৃষ্টির কাছে? একজন মোটামুটি স্বাস্থ্যের তরুণীর সঙ্গে দ্বিতীয় কোন তরুণীর মিল প্রচুর৷ দুটো তামাটে পা, দুটো তামাটে বাহু, এবং দুয়ের মাঝে এক টকুরো সাঁতার-পোশাক। সূর্য—কিরণে শুয়ে থাকা শুধুই একটা দেহ৷ যখন কোন মহিলা চলাফেরা করেন, কথা বলেন, হাসেন, মাথা ঘুরিয়ে তাকান, হাতের ভঙ্গী করেন—তখন হ্যাঁ, তখন একটা ব্যক্তিত্ব চোখে পড়ে—চোখে পড়ে স্বাতন্ত্র্য৷ কিন্তু সূর্যসাধনের সময় না৷
‘সেই দিনই আমরা অশুভ শক্তির প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছিলাম—মিঃ লেনের কথা অনুয়ায়ী শক্তির প্রভাব রয়েছে পৃথিবীর সর্বত্র৷ মিঃ লেন অত্যন্ত সচেতন মানুষ—অশুভের প্রভাব তিনি অনুভব করেন—বুঝতে পারেন তাঁর উপস্থিতি—কিন্তু তাঁর মতো সূক্ষ্ম যন্ত্রও সঠিক জানতো না অশুভের অবস্থান ছিলো ঠিক কোন জায়গায়৷ তাঁর মতে, অশুভ শক্তি লুকিয়ে ছিলো আর্লেনা মার্শালের ব্যক্তিতে, এবং কার্যত প্রত্যেকেই তাঁকে সমর্থন জানিয়েছেন৷’
‘কিন্তু আমার মতে, অশুভ শক্তি উপস্থিতি থাকলেও সে আর্লেনা মার্শালের মধ্যে আদৌ কেন্দ্রীভূত ছিলো না৷ তাঁর সঙ্গে অশুভের যোগ ছিলো, মানছি—কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে৷ আমি তাঁকে প্রথমে, শেষে এবং সর্বসময়েই দেখেছি অশুভের চিরন্তন নিশ্চিত শিকার হিসেবে৷ যেহেতু উনি সুন্দরী ছিলেন, যেহেতু তাঁর চেহারায় চটক ছিলো, তাঁর মতো মহিলারাই ঘর ও জীবন নষ্ট করেন৷ কিন্তু আমি তাঁকে দেখেছি একেবারে অন্যভাবে৷ সর্বনাশা আকর্ষণে পুরুষদের উনি কখনও টানতেন না বরং পুরুষেরাই তাঁকে টানতো৷ উনি ছিলেন সেই ধরনের মহিলা, যাঁদের প্রতি পুরুষেরা যেমন সহজে আগ্রহ দেখায়, তেমন সহজেই আবার ক্লান্ত হয়ে পড়ে৷ এবং তাঁর সম্পর্কে যা কিছু আমি দেখেছি, শুনেছি, সব আমার ধারণাকে আরও জোরদার করেছে৷ তাঁর সম্পর্কে প্রথম যে কথাটি শোনা যায় তা হলো কিভাবে সেই লোকটি, যার বিবাহ-বিচ্ছেদের মামলায় উনি জড়িয়ে পড়েছিলেন, তাঁকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে, আর ঠিক তখন আমাদের ক্যাপ্টেন মার্শাল, যাঁর বিপাদাপন্ন-রমণী-সেবার ব্রত চিকিৎসার অযোগ্য, ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেন এবং তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব জানালেন৷ ক্যাপ্টেন মার্শালের মতো লাজুক নিঃসঙ্গ মানুষের কাছে যে কোনরকম প্রকাশ্য বিচার ছিলো এরকম যন্ত্রণা—সেই কারণেই আমরা দেখতে পাই প্রথম স্ত্রীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং করুণা, যাঁকে আদালতে অভিযুক্ত করা হয়েছিলো খুনের অপরাধে, যে খুন তিনি কখনও করেননি৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল তাঁকে বিয়ে করেছিলেন এবং বুঝতে পেরেছিলেন, স্ত্রী চরিত্র নির্ণয়ে তিনি কোন ভুল করেননি৷ তাঁর মৃত্যুর পর আর একজন সুন্দরী মহিলা, হয়তো একই ধরনের (কারণ লিন্ডার মাথার চুল লাল, যা সে ওর মায়ের কাছ থেকেই উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়ে থাকবে), অভিযুক্ত হলেন প্রকাশ্য কলঙ্কে৷ আবারও মার্শাল তাঁর ত্রাণকার্য সম্পন্ন করলেন৷ কিন্তু এইবার আকর্ষণ জীইয়ে রাখার মতো কিছুই তিনি স্ত্রীর কাছে পেলেন না৷ আর্লেনা নির্বোধ, তাঁর করুণা প্রতিরক্ষার অযোগ্য এবং হৃদয়হীনা৷ তা সত্ত্বেও আমার মনে হয়, স্ত্রীর মোটামুটি সত্যিকারের অযোগ্য এবং হৃদয়হীনা৷ তা সত্ত্বেও আমার মনে হয়, স্ত্রীর মোটামুটি সত্যিকারের ছবিটা তাঁর আজানা ছিলো না৷ স্ত্রীর সঙ্গে ভালোবাসা শেষ হয়ে তাঁর উপস্থিতিতে বিরক্ত হতে লাগলেন মার্শাল, কিন্তু তার অনেক পরেও আর্লেনার প্রতি একটা দুঃখবোধ তাঁর মনে বরাবরের জন্য থেকে গিয়েছিলো৷ তাঁর কাছে আর্লেনা ছিলেন একটা শিশুর মতো, যিনি জীবন-কেতাবের একটা বিশেষ পৃষ্ঠা কোনরকমেই অতিক্রম করতে পারছেন না৷
‘পুরুষে আসক্ত আর্লেনা মার্শালকে আমি দেখেছিলাম বিশেষ একধরনের বিবেকহীন পুরুষের অনিবার্য শিকার হিসেবে৷ আর সেই বিশেষ ধরনের পুরুষকে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম প্যাট্রিক রেডফার্নের মধ্যে, তাঁর সুন্দর চেহারা, সহজ আত্মবিশ্বাস ও মহিলাদের আকর্ষণ করার অকাট্য ক্ষমতার মধ্যে৷ এ ধরনের ফাটকাবাজ পুরুষেরা, এভাবে ওভাবে যেভাবেই হোক, মহিলাদের মূলধন করে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করে৷ সৈকতে বসে যেটুকু আমার নজরে পড়েছে, তাতে এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে আর্লেনাই ছিলো প্যাট্রিকের শিকার, তার উলটোটা নয়৷ এবং অশুভের কেন্দ্রবিন্দুতে আমি প্যাট্রিক রেডফার্নকেই দেখেছি, আর্লেনা মার্শালকে নয়৷
‘আর্লেনার জনৈক বয়স্ক প্রেমাস্পদ, যিনি আর্লেনার প্রতি ক্লান্ত হয়ে পড়ার সময় পাননি, সম্প্রতি অঙ্কের অর্থ তাঁর জন্য রেখে গেছেন৷ এ ধরনের মহিলারা সাধারণত অর্থসংক্রান্ত ব্যাপারে কোন না কোন পুরুষের হাতে অনিবার্যভাবে প্রতারিত হয়ে থাকেন৷ মিস ব্রুস্টার একজন যুবকের কথা আমাদের বলেছেন, যে আর্লেনার জন্য ‘নষ্ট’ হয়ে গিয়েছিলো, সে আলেনাকে হীরে জহরতে সাজানের ইচ্ছে প্রকাশ করে থাকলেও (যে ইচ্ছে প্রকাশে কোন খরচ নেই) প্রকৃতপক্ষে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া একটা চেকের প্রাপ্তিসংবাদ জানিয়েছে, যার সাহায্যে সে আদালত এড়াতে পারবে বলে আশা করে৷ কোন অপব্যয়ী তরুণীর হাতে আর্লেনার শোষিত হওয়ার এক স্পষ্ট উদাহরণ৷ সুতরাং তাঁর কাছ থেকে ‘‘ব্যবসায়িক লগ্নীর’’ নাম করে মাঝে মধ্যে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে নেওয়াটা যে রেডফার্নের কাছে সম্ভবত বিরাট সুযোগের লম্বা চওড়া গল্প ফেঁদে আর্লেনাকে মুগ্ধ করে ফেলেছিলেন—বলেছিলেন কিভাবে তিনি ওঁর এবং নিজের জন্য বিশাল সম্পত্তি গড়ে তুলবেন৷ অরক্ষিত, নিঃসঙ্গ স্ত্রীলোকেরাই এ ধরনের লোকের সহজ শিকার হয়—এবং সাধারণত সে নিশ্চিন্তে লুঠের মাল নিয়ে চম্পট দেয়৷ কিন্তু যদি একজন স্বামী, ভাই অথবা বাবা দৃ্শ্যপটে উপস্থিত থাকেন, তাহলে প্রতারকের পক্ষে ব্যাপার একটু খারাপের দিকে মোড় নিলেও নিতে পারে৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল যদি একবার জানতে পারতেন তাঁর স্ত্রীর বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে কি কাণ্ডটা হচ্ছে, তাহলে প্যাট্রিক রেডফার্নের ভাগ্যে অর্ধচন্দ্র প্রাপ্তির সম্ভাবনা ছিলো অত্যন্ত প্রবল৷
অবশ্য, সেজন্য রেডফার্ন বিন্দুমাত্রও চিন্তিত হননি, কারণ অত্যন্ত ঠান্ডা মেজাজে তিনি স্থির করেছিলেন৷ প্রয়োজন বুঝলেই আর্লেনাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবেন—অতীতের একটা খুনের সাফল্য তাঁকে আরও বেশি সাহসী করে তুলেছিলো—যে মেয়েটিকে তিনি খুন করেছিলেন তাকে তিনি করিগান নাম নিয়ে বিয়ে করেন এবং বিশাল অঙ্কের এক জীবনবীমা করাতে মেয়েটিকে রাজি করান৷
‘তাঁর পরিকল্পনা তাঁকে সর্বরকমে সাহায্য করেছে একটি স্ত্রীলোক, যিনি এখানে রেডফার্নের স্ত্রীর পরিচয়ে বাস করছেন এবং যাঁর সঙ্গে রেডফার্নের সত্যিকারের সম্পর্ক রয়েছে৷ যেসব মহিলারা রেডফার্নের শিকার, তাদের সঙ্গে এই অল্পবয়সী মহিলার স্বাভাবিকভাবেই কোন মিল নেই—শীতল, শান্ত, আবেগহীন, কিন্তু রেডফার্নের প্রতি আনুগাত্যে অবিচল, আর তাঁর অবিশ্বাস্য অভিনয়দক্ষতাকে কোনরকমেই অবহেলা করা যায় না৷ এই দ্বীপে উপস্থিত হওয়া থেকে ক্রিস্টিন রেডফার্ন একটা বিশেষ ভূমিকায় অভিনয় করে চলেছেন, ‘হতভাগিনী বেচারা’ স্ত্রীর ভূমিকায়—দুর্বল, অসহায় এবং স্বাস্থ্যবর্তী না হলেও বুদ্ধিমতী৷ উনি কিভাবে একের পর এক নিজের বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছেন একবার ভেবে দেখুন৷ সূর্যস্নানে তাঁর শরীরে ফোস্কা পড়ে, যে কারণে তাঁর গায়ের রঙ সাদা ফ্যাকাশে, উঁচু জায়গায় উঠলে তাঁর মাথা ঘোরে—যেমন মিলান, গীর্জায় উঠে মাঝপথে আটকে পড়ার গল্পটা৷ অর্থাৎ সব মিলিয়ে নিজের দুর্বল অসহায় ভাবটাকে ফুটিয়ে তোলা—প্রায় প্রত্যেকেই তাঁর সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘ছোটখাটো মহিলা’৷ অথচ উনি আর্লেনা মার্শালের সমান লম্বা, যদিও তাঁর হাত-পায়ের গড়ন অপেক্ষাকৃত খাটো৷ ক্রিস্টিন বলেছেন, তিনি স্কুলের দিদিমণি ছিলেন, এবং এর দ্বারা উনি জোর দিয়েছিলেন নিজের বই-পড়ে শেখাবিদ্যে ও শারীরিক অপটুতার ওপর৷ আসলে একথা সত্যি যে ক্রিস্টিন স্কুলে চাকরি করতেন, কিন্তু সেখানে তাঁর চাকরি ছিলো খেলার দিদিমণি হিসেবে, এবং উনি অত্যন্ত চটপটে তৎপর মহিলা যিনি বেড়ালের মতো বেয়ে উঠতে পারেন, দৌড়তে পারেন কোন দৌড়বাজের মতো৷
‘এই খুনের পরিকল্পনা ও সময়ের ছক ছিলো নিখুঁত৷ এ খুন ছিলো, আমি আগেও যেমন বলেছি অত্যন্ত পরিপাটি৷ এর সময়ের ছক সত্যিই কোন প্রতিভাধরে চিন্তার ফসল৷
‘প্রথমত, মুখবন্ধ হিসেবে কতকগুলো দৃশ্যের অবতারণা করা হয়…একটি দৃশ্য অভিনীত হয় পাথুরে কুঠুরীতে, যখন তাঁরা জানতেন পাশের কুঠুরীতে আমি বসে আছি—ঈর্ষান্বিত স্ত্রী ও স্বামীর মধ্যে নিছক গতানুগতিক কথোপকথন পরে ক্রিস্টিন আমার সঙ্গেও ওই একই অভিনয় করেন৷ সেই সময়ে আমার কেমন ঝাপসাভাবে মনে হয়েছিলো এ সব আমি কোন বইয়ে পড়েছি৷ ব্যাপারটা বাস্তব বলে আমার মনে হয়নি৷ কারণ অবশ্যই, সেটা মোটেও বাস্তব ছিলো না—ছিলো অভিনয়৷ তারপর এলো খুনের দিন৷ দিনটা ছিলো চমৎকার যা অত্যন্ত প্রয়োজন ছিলো৷ রেডফার্নের প্রথম কাজ হলো খুব ভোরে সকলের নজর এড়িয়ে বেরিয়ে পড়া—বারান্দার দরজা দিয়ে যে দরজা তিনি ভেতর থেকে চাবি দিয়ে খুলেছিলেন (যদি কেউ খোলা দরজাটা ঘটনাচক্রে আবিষ্কার করে ফেলেন, তাহলে তিনি ভাবেন কেউ ভোরে স্নান করতে বেরিয়েছেন)৷ তাঁর স্নান-পোশাকের আড়ালে তিনি লুকিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন একটা সবুজ চীনে টুপি, ঠিক যেরকম টুপি আর্লেনা প্রায়ই পরতেন৷ দ্বীপ পেরিয়ে, মই বেয়ে নেমে নির্ধারিত জায়গা মতো কয়েকটা পাথরের আড়ালে রেডফার্ন টুপিটা লুকিয়ে রেখে আসেন৷ প্রথম পর্ব৷
‘আগের দিন সন্ধ্যায় তিনি আর্লেনার সঙ্গে দেখা করে গোপন সাক্ষাৎকারের এক ব্যবস্থা করেন৷ আর্লেনা স্বামীকে একটু ভয় করতেন, তাই তাঁরা দেখাসাক্ষাতের ব্যাপারে যথেষ্ট সাবধান হতেন৷ পরদিন সকালে তিনি পিক্সি কোভে দেখা করতে রাজি হলেন৷ সকালে সেখানে কেউ যায় না৷ রেডফার্ন সুযোগ বুঝে সকলের চোখ এড়িয়ে তাঁর সঙ্গে সেখানে গিয়ে দেখা করবেন৷ যদি তিনি কারো মই বেয়ে নামার শব্দ শোনেন, বা কোন নৌকোকে পাড়ে আসতে দেখেন তাহলে যেন পিক্সির গুহায় লুকিয়ে পড়েন এবং পথ পরিষ্কার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন৷ তাঁকে পিক্সির গুহার কথা রেডফার্নই বলেছিলেন৷ সমাপ্ত হলো দ্বিতীয় পর্ব৷
‘ইতিমধ্যে ক্রিস্টিন লিন্ডার ঘরে গেছেন, এমন—সময়ে, যখন উনি জানতেন লিন্ডা রোজকার মতো ভোরে স্নান করতে বেরিয়ে থাকবে৷ তখন উনি লিন্ডার ঘড়ির সময়ে বদলে দেবেন, ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে দেবেন কুড়ি মিনিট, অবশ্য এ ভয় ছিলো যে ঘড়ি ভুল সময়টা হয়তো লিন্ডার নজরে পড়ে যাবে, কিন্তু তাতে বিশেষ কোন ক্ষতি হতো না৷ ক্রিস্টিনের আসল অ্যালিবাই ছিলো তাঁর ছোট ছোট হাতের গড়ন, যার ফলে, দৈহিক শক্তির দিক থেকে খুনটা করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে৷ তা সত্ত্বেও অতিরিক্ত একটা অ্যালিবাই থাকা ভালো৷ লিন্ডার ঘরে গিয়ে তাঁর নজরে পড়ে যাদুবিদ্যা ও ডাকিনীবিদ্যার বইটা একটা বিশেষ পৃষ্ঠায় খোলা রয়েছে৷ উনি সেই পাতাটা পড়েন, এবং যখন লিন্ডা ঘরে আসে ও হাত থেকে মোমবাতির প্যাকেটটা মেঝেতে ফেলে দেয় তখন বুঝতে পারেন লিন্ডার মনে কি রয়েছে৷ এর ফলে ক্রিস্টিনের মনে কয়েকটা নতুন মতলবের উদয় হয়৷ আমাদের অপরাধী যুগলের প্রথম মতলব ছিলো কেনেথ মার্শালের ওপর যথেষ্ট সন্দেহ আরোপ করা৷ সেই কারণেই দৃশ্যপটে আবির্ভাব ইঙ্গিতবহ পাইপের—যার কিছু ভাঙা টুকরো পাওয়া গেছে পিক্সি কোভে মইয়ের নিচে৷
লিন্ডা ফিরে এলে ক্রিস্টিন খুব সহজেই ওকে গাল কোভে যাবার পরিকল্পনায় রাজি করিয়ে ফেলেন৷ তারপর তিনি নিজের ঘরে ফিরে আসেন, তালাবন্ধ স্যুটকেস থেকে বের করেন এক শিশি নকল সূর্যস্নানের প্রলেপ, সেটা বিশেষ যত্নে শরীরে মেখে শিশিটা ছুড়ে ফেলে দেন জানলা দিয়ে, যেটা স্নানরত এমিলি ব্রুস্টারকে অল্পের জন্য আঘাত করেনি৷ অতএব তৃতীয় পর্ব সুষ্ঠুভাবে শেষ হলো৷
‘ক্রিস্টিন তারপর পরে নিলেন সাঁতারু-পোশাক, তার ওপরে ঢোলা হাতা জামা ও পাজামা, সুতরাং তাঁর নতুন রঙ করা বাদামী হাত-পা ঢাকা পড়লো পোশাকের নিচে৷
‘সওয়া দশটায় আর্লেনা বেরিয়ে পড়লেন তাঁর গোপন সাক্ষাৎকার সারতে, তাঁর মিনিট কয়েক পরেই প্যাট্রিক রেডফার্ন এসে উপস্থিত হলেন সমুদ্রসৈকতে, আমাদের দেখালেন বিস্ময়, বিরক্তি ইত্যাদি৷ ক্রিস্টিনের কাজ ছিলো খুবই সহজ৷ নিজের হাতঘড়ি লুকিয়ে রেখে এগারোটা পঁচিশে লিন্ডাকে জিগ্যেস করলেন ক’টা বাজে৷ লিন্ডা ঘড়ি দেখে জবাব দিলো, পৌনে বারোটা৷ তারপর ও সমুদ্রে নামে স্নান করতে, আর ক্রিস্টিন ছবি আঁকার সরঞ্জাম গোছগাছ করতে শুরু করেন৷ লিন্ডা তাঁর দিকে পেছন ফিরতেই ক্রিস্টিন লিন্ডার হাত ঘড়িটা তুলে নেন, কারণ স্বাভাবিকভাবেই স্নান করতে নামার আগে লিন্ডা ঘড়িটা খুলে রেখে গেছে, এবং কাঁটা ঘুরিয়ে ঘড়ির সময় আবার ঠিক করে দেন৷ তারপর পাহাড়ি পথ ধরে তিনি রওনা হয়ে পড়েন, সরুর জমিটুকু এক ছুটে পার হয়ে পৌঁছে যান মইটার কাছে, ঢোলা জামা-পাজামা ছেড়ে, সেগুলো এবং ছবি আঁকার সরঞ্জাম একটা পাথরের আড়ালে লুকিয়ে অভ্যাসলব্ধ দক্ষতায় তরতর করে মই বেয়ে নেমে যান ক্রিস্টিন৷
‘আর্লেনা তখন সৈকতে দাঁড়িয়ে ভাবছিলেন প্যাট্রিকের এত দেরি হচ্ছে কেন? হঠাৎ মইয়ের কাছে কাউকে উনি দেখতে পান বা তার শব্দ শুনতে পান৷ খুব সন্তর্পণে লক্ষ্য করেন তিনি৷ এবং অসীম বিরক্তির সঙ্গে আবিষ্কার করেন সেই অবাঞ্ছিত মেয়েটিকে—স্ত্রীরত্নটিকে! সুতরাং তাড়াতাড়ি সৈকত পার হয়ে তিনি ঢুকে পড়েন পিক্সির গুহায়৷
‘লুকোনো জায়গা থেকে টুপিটা বের করে নেন ক্রিস্টিন; টুপিটার পেছনে কানায় লাল রঙের পরচুলায় গুচ্ছ আলপিন দিয়ে আঁটা ছিলো৷ তারপর টুপি ও পরচুলায় ঘাড় ও মুখ ঢেকে হাত-পা ছড়িয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েন তিনি৷ সময়ের হিসেবে একেবারে নিখুঁত৷ কারণ মিনিট দুয়েক পরেই প্যাট্রিক ও এমিলি ব্রুস্টার নৌকো নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিতি হন৷ মনে রাখবেন, যে ব্যক্তি নিচু হয়ে মৃতদেহ পরীক্ষা করেছেন তিনি প্যাট্রিক, প্যাট্রিকই অবাক হয়েছেন—আঘাত পেয়েছেন ভেঙে পড়েছেন তাঁর প্রেমিকার মৃত্যুতে৷ তিনি সাক্ষী বেছে নিয়েছিলেন অনেক ভাবনাচিন্তা করে৷ মিস ব্লুস্টারের মাথাঘোরা রোগ আছে, তিনি কখনোও মইটা বেয়ে ওঠার চেষ্টা করবেন না৷ তিনি গেলে নৌকো নিয়েই যাবেন, এবং প্যাট্রিক থাকবেন মৃতদেহের কাছে—‘‘কারণ খুনী হয়তো আশেপাশে কোথাও লুকিয়ে আছে৷’’ নৌকো নিয়ে মিস ব্রুস্টার চলে গেলেন পুলিশ খবর দিতে৷ তিনি চলে যেতেই চটপট উঠে পড়লেন ক্রিস্টিন, প্যাট্রিকের লুকিয়ে আনা কাঁচিটা দিয়ে টুপিটাকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেললেন, টুকরোগুলো লুকিয়ে ফেললেন সাঁতার পোশাকের ভেতর এবং প্রথমবারের অর্ধেক সময়ে মই বেয়ে উঠে ঢোলা জামা-পাজামা পরে নিয়ে ছুটে চললেন হোটেলের দিকে৷ তখন কোনরকমে স্নান সেরে নকল সূর্যস্নানের প্রলেপ ধুয়ে, টেনিস খেলার পোশাক পরে বেরোবার মতো সময়টুকু হাতে রয়েছে৷ আরও একটা কাজ উনি করেছেন৷ পিচবোর্ডের টুপির সবুজ টুকরোগুলো এবং লাল পরচুলার গুচ্ছ উনি পুড়িয়ে ফেলেন লিন্ডার ঘরে তাপচুল্লীতে—সঙ্গে যোগ করেন একটা ক্যালেন্ডারের পাতা, যাতে পোড়া পিচবোর্ডের সঙ্গে ক্যালেন্ডারে একটা যোগসূত্র গড়ে ওঠে৷ অর্থাৎ যা পোড়ানো হয়েছে সেটা একটা ক্যালেন্ডার, টুপি নয়৷ তাঁর সন্দেহ অনুয়াযী লিন্ডা যাদুবিদ্য নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলো—মোমের পিণ্ড ও আলপিন তারই সাক্ষী৷
‘তাঁরপর তিনি উপস্থিত হলেন টেনিস কোটে, সবার শেষে, কিন্তু তাড়াহুড়ো অথবা অগোছালো ভাব—দুটোই তাঁর মধ্যে অনুপস্থিত৷
‘আর, ইতিমধ্যে, প্যাট্রিক ঢুকে পড়েছেন পিক্সির গুহায়৷ আর্লেনা কিছুই দেখেননি এবং শুনতেও পেয়েছেন খুব সামান্যই—একটা নৌকো—কিছু কথাবার্তা—উনি বুদ্ধি করে লুকিয়েই ছিলেন৷ কিন্তু এখন তাঁকে ডাকছেন প্যাট্রিক৷
‘আর ভয় নেই, সোনা’ এবং আর্লেনা বেরিয়ে এলেন বাইরে৷ তারপর প্যাট্রিকের হাত চেপে বসলো তাঁর গলায়—আর সেই হলো বেচারো নির্বোধ সুন্দরী আর্লেনা মার্শালের জীবনকাহিনির পরিসমাপ্তি…’
পোয়ারো কণ্ঠস্বর নিচু করে মিলিয়ে গেলো৷
এক মুহূর্তের নীরবতা তারপর রোজমণ্ড ডার্নলি সামান্য শিউরে উঠে বললো, ‘আপনি সব কিছু ছবির মতো দেখিয়ে দিচ্ছেন৷ কিন্তু এ তো অন্য তরফের কাহিনী৷ আপনি এখনও আমাদের বলেননি কি করে আপনি আসল সত্যিটা জানতে পারলেন?’
এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘আপনাদের আগেও একবার বলেছি, আমার মন অতি সরল৷ সব সময়, সেই প্রথম থেকেই, আমার মনে হয়েছে যে সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যক্তিই আর্লেনা মার্শালকে খুন করেছেনে৷ এবং সেই সম্ভাব্য ব্যক্তি নিঃসন্দেহে প্যাট্রিক রেডফার্ন৷ তাঁর চরিত্র এমন কোন মানুষের, যে আর্লেনার মতো মেয়েদের কাজে লাগায়। তাঁর চরিত্র এমন কোন মানুষের যে আর্লেনার মতো মেয়েদের কাজে লাগায়—তাঁর চরিত্র কোন খুনীর চরিত্র—তিনি সেই ধরনের লোক যাঁরা কোন মহিলার সঞ্চয় শুষে নিয়ে তাঁর গলা কাটতে পারেন৷ সেদিন সকালে আর্লেনা কার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন? তাঁর মুখ, তাঁর হাসি,তাঁর আচরণ, আমার সঙ্গে তাঁর কথোপকথন আমাকে জানিয়ে দিয়েছে সেই ব্যাক্তির নাম—প্যাট্রিক রেডফার্ন৷ সুতরাং স্বাভাবিক ঘটনাপরম্পরা অনুয়াযী, আর্লেনাকে যিনি খুন করেছেন, তিনি প্যাট্রিক৷
‘কিন্তু সেই মুহূর্তে, আপনারা জানেন, আমি মুখোমুখি হয়েছি এক অসম্ভব পরিস্থিতির৷ প্যাট্রিক রেডফার্নের পক্ষে আর্লেনাকে খুন করা সম্ভব ছিলো না, কারণ মৃতদেহ আবিষ্কার করা পর্যন্ত তিনি প্রথম সৈকতে ও পরে মিস ব্রুস্টারের সঙ্গে ছিলেন৷ সুতরাং অন্যান্য সম্ভাবনার দিকে আমাকে নজর ফেরাতে হলো—এবং তাদের সংখ্যাও ছিলো একাধিক৷ আর্লেনাকে তাঁর স্বামী খুন করে থাকতে পারেন—মিস ডার্নলির নীরব সমর্থন পেয়ে৷ (তাঁরা দুজনেও একটা বিষয়ে মিথ্যে কথা বলেছেন, যা অত্যন্ত সন্দেহজনক৷) আকস্মিকভাবে মাদকদ্রব্য চোরাচালানের খবর জানতে পারার ফলেও আর্লেনা মার্শালের মৃত্যু ঘটে থাকতে পারে৷ কোন ধর্মেন্মাদ ব্যক্তিও তাঁকে খুন করে থাকতে পারেন, এবং তাঁর সৎমেয়ের পক্ষেও তাঁকে খুন করা অসম্ভব ছিলো না৷ এর মধ্যে শেষেরটাই প্রকৃত সমাধান বলে আমার একবার মনে হয়েছিলো পুলিশের সঙ্গে লিন্ডার প্রথম সাক্ষাৎকার যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিলো৷ পরে ওর সঙ্গে এক আলোচনায় একটা বিষয়ে আমার বিশ্বাস স্থির হয়৷ লিন্ডা নিজেকে অপরাধী মনে করে৷’
‘আপনি বলতে চান ও ভেবেছিলো ও সত্যি সত্যিই আর্লেনাকে খুন করেছে?’
রোজমণ্ডের স্বরে অবিশ্বাসের সুর৷
এরকুল পোয়ারো মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন৷
হ্যাঁ৷—মনে রাখবেন—ও নেহাতই শিশু৷ ডাকিনীবিদ্যার বইটা পড়ে ও সেটা প্রায় বিশ্বাস করে বসে৷ ও আর্লেনাকে ঘৃণা করতো৷ সুতরাং উদ্দেশ্য নিয়ে ও্ তৈরি করলো মোমের পুতুল, পড়লো, মন্ত্র পুতুলের হৃদপিণ্ড বিদ্ধ করলো আলপিন দিয়ে, পুতুলটা গলিয়ে ফেললো—এবং ঠিক সেইদিন মারা গেলেন আর্লেনা৷ লিন্ডার চেয়ে বয়ষ্ক ও প্রাজ্ঞ মানুষেরাও অন্ধভাবে যাদুবিদ্যায় বিশ্বাস করেছেন৷ স্বাভাবিকভাবেই লিন্ডাও বিশ্বাস করে এ সব সত্যি—যে যাদুবিদ্যার ক্ষমতা ওর সৎমাকে ও খুন করেছে৷’
রোজমণ্ড ডুকরে উঠলো৷
‘ওঃ, বেচারা লিন্ডা৷ আর আমি ভেবেছি—আমি ভেবেছি—সম্পূর্ণ অন্য কথা—যে ও এমন কিছু জানতো যাতে—’
রোজামণ্ড থামলো৷ পোয়ারো বললেন, ‘আপনি কি ভেবেছিলেন আমি জানি৷ প্রকৃতপক্ষে আপনার ব্যবহার লিন্ডাকে আরও বেশি ভয় পাইয়ে দিয়েছিলো৷ ও বিশ্বাস করেছিলো, আর্লেনার মৃত্যুর জন্য সত্যিই ও নিজে দায়ী এবং সেকথা আপনি জানেন৷ ক্রিস্টিনও ওর কানে মন্ত্র জোগান, ওর মনে গেঁথে দেন ঘুমের বড়ির কথা, দেখিয়ে দেন ও অপরাধের দ্রুত যন্ত্রণাহীন প্রায়শ্চিত্তের পথ৷ বুঝতেই পারছেন, একবার যদি প্রমাণিত হয় ক্যাপ্টেন মার্শালের অ্যালিবাই রয়েছে, তাহলে নতুন কোন সন্দেহভাজন খুঁজে বের করাটা হয়ে পড়বে একান্ত জরুরী৷ ক্রিস্টিন অথবা তাঁর স্বামী মাদকদ্রব্য চোরাচালানের ব্যাপারটা জানতেন না৷ সুতরাং বলির পাঁঠা হিসেবে লিন্ডাকেই তাঁরা বেছে নিলেন৷’
রোজমণ্ড বললো, কি শয়তান৷’
পোয়ারো সম্মতি জানালেন নীরবে৷
‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন ঠান্ডা রক্তের এক নৃশংস মহিলা৷ আর আমি—আমি পড়লাম মহা মুশকিলে৷ লিন্ডা কি শুধুমাত্র যাদুবিদ্যা প্রয়োগের শিশুসুলভ অপরাধে অপরাধী, নাকি ওর ঘৃণা ওকে আরও গভীরে নিয়ে গেছে—লিপ্ত করেছে প্রকৃত অপরাধে? আমি চেষ্টা করেছি ওর কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করতে৷ কিন্তু সবই বিফলে গেছে৷ সেই মুহূর্তে আমি দুলতে লাগলাম দুরন্ত অনিশ্চয়তায়৷ পুলিশ-প্রধান রাজি ছিলেন মাদকদ্রব্যের ব্যাখ্যাটাকে গ্রহণ করতে৷ আমিও সেখানেই ক্ষান্ত দিলেন পারতাম৷ সমস্ত তখ্য আমি আবার সন্তপর্ণে খতিয়ে দেখতে লাগলাম৷ আমার হাতে তখন বুঝতেই পারছেন, টুকরো-ছবির ধাঁধার অনেকগুলো টুকরো, বিচ্ছিন্ন কতকগুলো ঘটনা, নিছক তথ্য৷ সেগুলোর নিশ্চয়ই একটা সুষম সম্পূর্ণ নকশায় খাপ খেয়ে যাবে৷ প্রথমে রয়েছে বেলাভূমিতে পাওয়া একটা কাঁচি—জানলা দিয়ে ছুড়ে ফেলা একটা শিশি—একটা স্নানের খবর যা কেউই করেছেন বলে স্বীকার করেননি—অর্থাৎ আপাতদৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নির্দোষ কতকগুলো ঘটনা, কিন্তু সেগুলোর প্রতি প্রত্যেকের অস্বীকার ঘটনাগুলোকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে৷ সুতরাং সেগুলোর তাৎপর্য নিশ্চয়ই একটা রয়েছে ক্যাপ্টেন মার্শাল, লিন্ডা অথবা চোরাচালানকারীদের দায়ী করলে ওই ঘটনাগুলোর কোন সুষ্ঠু ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না, কিন্তু তবুও সেগুলোর নিশ্চিত কোন অর্থ রয়েছে৷ সুতরাং আমি ফিরে গেলাম আমার প্রথম সমাধানে—যে প্যাট্রিক রেডফার্নই খুনটা করেছেন৷ এর সমর্থনে কি কোন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে? হ্যাঁ, আর্লেনার তহবিল থেকে যে একটা বিশাল অঙ্কের টাকা উধাও হয়েছে সে কথা আমরা জানি৷ কে নিলো সেই টাকা? অবশ্যই প্যাট্রিক রেডফার্ন৷ আর্লেনা ছিলেন সেই রকম মেয়ে যাঁদের সুন্দর চেহারার যুবকেরা সহজেই ঠকিয়ে নিতে পারে—কিন্তু ব্ল্যাকমেল হবার মতো মেয়ে কখনই উনি ছিলেন না৷ প্রয়োজনের চেয়েও বেশি খোলা ছিলো তাঁর মন, গোপন কথা উনি গোপন রাখতে পারতেন না৷ তাই ওই ব্ল্যাকমেলারের গল্প একবারও আমার মনে সত্যি বলে নাড়া দেয়নি৷ কিন্তু তবুও হঠাৎ শুনে ফেলা সেই কথাবার্তার সাক্ষ্যটুকু আমাদের সামনে থেকে যাচ্ছে—হুঁ, কিন্তু সেই কথাবার্তা শুনেছেন কে? না প্যাট্রিক রেডফার্নের স্ত্রী৷ এটা সম্পূর্ণ তাঁর গল্প—দ্বিতীয় কারো সাক্ষ্যর সমর্থন সেখানে নেই৷ তাহলে এ গল্প বানানো হলো কেন৷ বিদ্যুৎচমকের মতো এর উত্তর ঝলসে উঠলো আমার মনে৷ আর্লেনার উধাও হয়ে যাওয়া টাকার একটা যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা যোগাতে৷
‘প্যাট্রিক ও ক্রিস্টিন রেডফার্ন৷ ওঁরা দুজনেই এ ব্যাপারের সঙ্গে জড়িত৷ আর্লেনাকে গলা টিপে খুন করার মতো দৈহিক শক্তি অথবা মানসিক প্রস্তুতি, কোনটাই ক্রিস্টিনের ছিলো না৷ না, হত্যাপর্বের নায়ক প্যাট্রিক নিজে—কিন্তু সে তো অসম্ভব! কারণ আর্লেনার দেহ আবিষ্কার করার আগে পর্যন্ত প্রতিটি মিনিটের অ্যালিবাই তাঁর রয়েছে৷
‘দেহ—এই দেহ শব্দটা আমার মনে নাড়া দিলো—সৈকতে শুয়ে থাকা দেহ—সব একরকম৷ প্যাট্রিক রেডফার্ন ও এমিলি ব্রুস্টার পিক্সি কোভে গেছেন এবং একটা দেহ বেলাভূমিতে শুয়ে থাকতে দেখেছেন৷ একটা দেহ—যদি ধরে নেওয়া যায় সে দেহ আর্লেনার নয়, অন্য কারো? কারণ তাঁর মুখ ঢাকা ছিলো বিশাল চীনে টুপিতে৷
‘কিন্তু একটা মাত্র মৃতদেহই আমরা পেয়েছি—আর্লেনার৷ তাহলে সেই দেহ কি কোন জীবন্ত দেহ—এমন কেউ, যিনি মৃতের ভান করে শুয়ে রয়েছেন৷ আর্লেনা নিজে নন তো? প্যাট্রিকের প্ররোচনায় উনি হয়তো এরকম লোকঠকানো মজা করতে রাজি হয়েছেন৷ আমি মাথা নাড়লাম—উঁহু, তাতে ঝুঁকি অনেক৷ একটা জীবন্ত দেহ—কার? এমন কোন মেয়ে কি এখানে আছেন, যিনি রেডফার্নকে সাহায্য করতে পারেন? অবশ্যই আছেন—তাঁর স্ত্রী৷ কিন্তু তাঁর গায়ের রঙ ফ্যাকাশে সাদা৷ মানলাম, কিন্তু সূর্যস্নানের নকল প্রলেপ সহজেই শিশি থেকে লাগানো যেতে পারে—শিশি—একটা শিশি—খুঁজে পেলাম আমার টুকরো-ছবির ধাঁধার একটা টুকরো৷ হ্যাঁ, তারপর, অবশ্যই প্রয়োজন একটা স্নানের—টেনিস খেলতে যাবার আগে সর্বনাশা প্রলেপের দাগ ধুয়ে ফেলতে হবে তো৷ আর কাঁচিটা? কেন, কাঁচিটা নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো পিচবোর্ডের টুপিটাকে টুকরো টুকরো করে কাটবার জন্যে—ওরকম অসুবিধে জনক বিশাল বস্তুটাকে লোকচক্ষুর আড়ালে না সরালেই নয়, এর তাড়াহুড়োর কাঁচিটা থেকে যায় অকুস্থলে—এই একটামাত্র জিনিস যেটা আমাদের খুনী দম্পত্তি ভুল করে রেখে আসেন৷
‘কিন্তু এতক্ষণ আর্লেনা ছিলেন কোথায়? সে উত্তরও অত্যন্ত স্পষ্ট৷ হয় রোজমণ্ড ডার্নলি নয় আর্লেনা মার্শাল পিক্সির গুহায় গিয়েছিলেন, তাঁরা যে সুগন্ধী ব্যবহার করতেন তার গন্ধই আমাকে জানিয়ে দিয়েছে৷ কিন্তু রোজামণ্ড ডার্নলি ওখানে যাননি৷ সুতরাং আর্লেনাই গিয়েছিলেন পিক্সির গুহায়, লুকিয়ে ছিলেন যতক্ষণ পর্যন্ত না পথ পরিষ্কার হয়৷
‘যখন এমিলি ব্রুস্টার নৌকো নিয়ে চলে গেলেন, প্যাট্রিক তখন সৈকতে একা এবং খুন করার পুরোপুরি সুযোগ তাঁর ছিলো৷ আর্লেনা মার্শাল খুন হন পৌনে বারোটার কিছু পরে, কিন্তু ডাক্তারি সাক্ষ্য শুধু মাথা ঘামায় সবচেয়ে কত বেশি আগে খুনটা হয়ে থাকতে পারে, সেই সময়টা নিয়ে৷ পৌনে বারোটার সময় আর্লেনা যে মৃত ছিলেন সে কথা ডাক্তারকেই বলা হয়েছে, ডাক্তার মোটেও পুলিসকে বলেননি৷
আরও দুটো রহস্যের সমাধান তখনও বাকি৷ লিন্ডা মার্শালের সাক্ষ্য ক্রিস্টিন রেডফার্নকে একটা অ্যালিবা জুগিয়েছে৷ মানছি, কিন্তু সে সাক্ষ্য দাঁড়িয়ে আছে লিন্ডা মার্শালের হাতঘড়ির ওপরে৷ এখন শুধু যেটুকু দরকার, তা হলো, প্রমাণ করা যে ওই হাতঘড়ির সময় বদলের অন্তত দুটো সুযোগ ক্রিস্টিনি পেয়েছিলেন৷ খুব সহজেই সে প্রমাণ পেলেন৷ সেদিন সকালে তিনি লিন্ডার ঘরে একা ছিলেন—এছাড়াও একটা পরোক্ষ প্রমাণ আছে৷ লিন্ডাকে বগলতে শোনা গেল যে ‘‘ওর ভয় হচ্ছিলো ওর হয়তো দেরি হয়ে গেছে,’’ কিন্তু যখন ও নেমে আসে তখন বিশ্রামকক্ষের ঘড়িতে মাত্র দশটা পঁচিশ৷ দ্বিতীয় সুযোগটা ছিলো অনেক বেশি সহজ—যখন লিন্ডা পেছন ফিরে সমুদ্রে স্নান করতে নামে তখন ঘড়ির সময় আবার পিছিয়ে দেওয়াটা ক্রিস্টিনের পক্ষে কিছু অসম্ভব ছিলো না৷
‘এরপর আসছে মইয়ের প্রশ্ন৷ ক্রিস্টিন বরাবরই জোর গলায় বলেছেন যে উঁচু জায়গা তাঁর ধাতে সয় না৷ আরো একটা সযত্নে সাজানো মিথ্যে৷
‘আমার নকশা এবার সম্পূর্ণ—প্রতিটি টুকরো নিখুঁতভাবে খাপ খেয়ে গেছে নিজের নিজের জায়গায়৷ কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমার হাতের নির্দিষ্ট কোন প্রমাণ নেই৷ সমস্তটাই রয়েছে আমার মনের ফলকে গাঁথা৷
‘তখন একটা মতলব আমার মাথায় এলো৷ এই খুনের মধ্যে নিহিত রয়েছে একটা আত্মবিশ্বাসের ভাব—একটা পরিপাটি ছিমছাম পরিকল্পনা৷ প্যাট্রিক রেডফার্ন যে ভবিষ্যতেও তাঁর দুষ্কর্মের পুনরাবৃত্তি করবেন সে বিষয়ে আমার মনে কোন সন্দেহ ছিলো না৷ তাহলে তাঁর অতীত কি বলে? এটা সম্ভব হলেও হতে পারে যে এ তাঁর প্রথম খুন নয়৷ এবং এই খুনের পদ্ধতি, শ্বাসরোধ করে হত্যা, প্যাট্রিকের প্রকৃতির সঙ্গে একই সুরে বাঁধা—শুধু ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, নিছক আনন্দের জন্যও তিনি খুন করেন৷ যদি এটা তাঁর খুন না হয়, তাহলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস অতীতেও তিনি একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন৷ আমি ইন্সপেক্টর কলগেটের কাছে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়েছে এমন মেয়েদের একটা তালিকা চাইলাম৷ এর ফলাফল আমাকে ভীষণ খুশি করলো৷ নির্জন ঝোপের পাশে শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় পাওয়া নীতি পার্সন্সের খুন প্যাট্রিক রেডফার্নের কাজ হতেও পারে, নাও হতে পারে, হয়তো এ ঘটনা শুধুমাত্র স্থান নির্বাচনে তাঁকে সাহায্য করেছে, কিন্তু অ্যালিস করিগানের মৃত্যুতে আমি ঠিক যা খুঁজেছিলাম তাই পেয়ে গেলাম৷ সার কথায় বলতে গেলে হুবহু একই পদ্ধতি৷ সেই সময় নিয়ে কারচুপি, একটা খুন বা অনুমতি সময়ের আগে সংঘটিত হয়নি, সাধারণত যা হয়ে থাকে-বরং ঘটেছে এরই সময়ের পরে৷ সওয়া চারটের সময় ‘আবিষ্কৃত’ হয় ‘মৃতদেহ’৷ আর, একজন স্বামী, যার অ্যালিবাই রয়েছে চারটে পঁচিশ পর্যন্ত৷
‘তাহলে সত্যি সত্যি কি ঘটেছিলো? বলা হয়েছে যে এডওয়ার্ড করিগান পাইন রিজে গিয়ে উপস্থিত হয়, তার স্ত্রীকে সেখানে পায় না, এবং তখন বাইরে এসে পায়চারি করতে থাকে৷ অবশ্য কার্যত সে প্রাণপণে ছুটে যায় তাদের দেখা করার জায়গায় সীজার্স গ্রোভে৷ (আশা করি আপনাদের মনে আছে যে জায়গাটা ছিলো খুন কাছেই) স্ত্রীকে খুন করে এবং কাফেতে ফিরে আসে৷ পথচারী যে মেয়েটি খুনের খবর দেয়, সে ছিলো একজন সম্ভ্রান্ত যুবতী, সুপরিচিত একটি বালিকা বিদ্যালয়ের খেলার দিদিমণি৷ আপাতদৃষ্টিতে এডওয়ার্ড করিগানের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক ছিলো না৷ খুনের খবর জায়গা মতো জানাতে তাকে বেশ কিছুটা পথ হেঁটে যেতে হয়৷ পুলিশের ডাক্তার মৃতদেহ পরীক্ষা করেন সেই পৌনে ছ’টা নাগাদ৷ এবং এখনকার মতো তখনও খুনের সময়টা সকলেই বিনা দ্বিধায় মেনে নিয়েছেন৷
‘একটা চূড়ান্ত পরীক্ষা আমি করলাম৷ আমাকে সঠিকভাবে জানতেই হবে মিসেস রেডফার্ন মিথ্যাবাদী কিনা৷ সুতরাং ডার্টমুরে বেড়াতে যাওয়ার নির্দোষ বন্দোবস্ত করলাম৷ উচ্চতা ধাতে সয় না এমন কেউ কখনও সুস্থভাবে বয়ে যাওয়া জলের ওপরে দিয়ে সরু সাঁকো পার হতে পারে না৷ মিস ব্রুস্টার, যিনি প্রকৃত রোগী, নিজেকে সুস্থ রাখতে পারেননি৷ কিন্তু ক্রিস্টিন রেডফার্ন নিশ্চিন্তভাবে নির্বিকারে ছুটে পার হয়ে যান সাঁকোটা৷ ঘটনাটা ছোট হলেও একটা নিশ্চিন্ত পরীক্ষা৷ যদি তিনি বিনা প্রয়োজনে একটা মিথ্যে বললে থাকতে পারেন—নাহলে অন্যান্য মিথ্যেগুলোও অসম্ভব নয়৷ ইতিমধ্যে কলগেট সারে পুলিশ দিয়ে ছবিটা সনাক্ত করিয়াছেন৷ তখন আমি যেভাবে জেতা সম্ভব সেভাবেই হাতে তাস খেলেছি৷ প্যাট্রিক রেডফার্নকে নিরাপত্তার নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে ঠেলে দিয়ে আকস্মিকভাবে তাঁকে আক্রমণ করেছি, যাতে তিনি আত্মসংযম হারিয়ে ফেলেন তার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি৷ তাঁকে যে করিগান বলে সনাক্ত করা হয়েছে সেকথা শুনেই তাঁর মাথা খারাপ হয়ে যায়৷’
চিন্তারতভবে গলায় হাত বোলালেন এরকুল পোয়ারো৷
‘আমি যা করেছি,’ গুরুত্ব দিয়ে বললেন তিনি, ‘তা অত্যন্ত বিপজ্জনক ঝুঁকি নিয়ে করেছি—কিন্তু তার জন্য আমার দুঃখ নেই৷ আমি জিতেছি৷ বিনা কারণে আমি কষ্ট করিনি৷’
এক মুহূর্তের নীরবতা৷ তারপর মিসেস গার্ডেনার এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন৷
‘সত্যি, মঁসিয়ে পোয়ারো, তিনি বললেন, কি ভীষণ ভালো লাগলো শুনতে—কিভাবে আপনি ধাপে ধাপে সমাধানে পৌঁছলেন, আশ্চর্য৷ আপনার প্রত্যেকটি কথা মুগ্ধ করার মতো, যেন অপরাধ-বিজ্ঞানের ওপর কোন বক্তৃতা। আসলে সত্যিই তো এটা অপরাধ-বিজ্ঞানের ওপর কোন বক্তৃতা, তাই না? আর ভাবতে কিরকম লাগছে যে আমার বেগুনি উল আর ওই সূর্যস্নান-নিয়ে কথাবার্তা, দুটোরই একটা করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো৷ ওঃ, আনন্দে আমি কি বলবো ঠিক করতে পারছি না, আর আমার বিশ্বাস মিঃ গার্ডেনারের অবস্থাও একই রকম, তাই না, ওডেল?’
‘হ্যাঁ সোনা৷’ বললেন, মিঃ গার্ডেনার৷
এরকুল পোয়ারো বললেন, মিঃ গার্ডেনারও আমাকে সাহায্য করেছেন৷ আমি মিসেস মার্শাল সম্পর্কে একজন বিচক্ষণ ব্যক্তির অভিমত চেয়েছিলাম৷ আমি মিঃ গার্ডেনারকে প্রশ্ন করেছিলাম মিসেস মার্শালকে তাঁর কিরকম মহিলা বলে মনে হয়৷’
‘তাই নাকি?’ বললেন, মিসেস গার্ডেনার, ‘আর তুমি কি বলেছো, ওডেল?’
মিঃ গার্ডেনার কাশলেন৷
তিনি বললেন, ‘তুমি তো জানো, সোনা, ওঁকে, আমার কখনই সেরকম কিছু মনে হয়নি৷’
‘লোকে তাদের বউদের সব সময় এই কথাই বলে৷’ বললেন, মিসেস গার্ডেনার, ‘তাহলে আর যদি আমাকে জিগ্যেস করো তাদের বলবো, এমন কি এই মঁসিয়ে পোয়ারো পর্যন্ত মিসেস মার্শালকে একটু যাকে বলে প্রশ্রয় দিয়েছেন, বিশেষ করে ওঁকে ঘটনাচক্রের স্বাভাবিক শিকার ইত্যাদি বলে উল্লেখ করে৷ অবশ্য এ কথা সত্যি যেন শিক্ষা-দীক্ষার বালাই ভদ্রমহিলার মোটেও ছিলো না, আর ক্যাপ্টেন মার্শাল যখন এখানে নেই তখন বলতে বাধা নেই যে ওঁকে আমার সব সময়েই কেমন বোকা-সোকা বলে মনে হয়েছে৷ সে কথা আমি মিঃ গার্ডেনারকেও বলেছি, বলিনি, ওডেল?’
‘হ্যাঁ, সোনা’, বললেন মিঃ গার্ডেনার৷
২
গাল কোভে এরকুল পোয়ারোর সঙ্গে বসে ছিলো লিন্ডা মার্শাল৷
ও বললো, ‘ভাগ্যিস শেষ পর্যন্ত আমি মরে যাইনি৷ কিন্তু, মঁসিয়ে পোয়ারো, আমার অপরাধ তো সত্যি সত্যি ওকে খুন করারই সমান, তাই না? আমি তো সেটাই চেয়েছিলাম৷
এরকুল পোয়ারো উৎসাহের সঙ্গে বললেন, ‘না, দুটো এক জিনিস নয়৷ খুন করার ইচ্ছে আর খুন করা দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস৷ যদি তোমার শোবার ঘরে সেই ছোট্ট মোমের পুতুলের বদলে তুমি তোমার সৎমাকে বন্দী অসহায় অবস্থায় পেতে, আর তোমার হাতে আলপিনের বদলে একটি ছুরি থাকতো, তাহলে তুমি সে ছুরি তাঁর বুকে বিঁধিয়ে দিতে পারতে না! তোমার ভেতর থেকে কেউ একজন বলে উঠতো ‘না’৷ আমার নিজের বেলায়ও সেই একই ব্যাপার৷ কোন নির্বোধের ওপর রাগ করে আমি বলি, ‘ব্যাটাকে লাথি মারতে পারলে ভালো হতো৷’ কিন্তু পরিবর্তে আমি লাথি মারি টেবিলের গায়ে৷ বলি, ‘এই টেবিলটা, এটা একটা বোকা গর্দভ, তাই এটাকে লাখি মারছি৷’ আর তারপর, যদি পায়ের আঙুলে খুব একটা ব্যথা না পেয়ে থাকি, তাহলে আমার মেজাজ অনেক ভালো হয়, আর সাধারণত টেবিলেরও কোন ক্ষতি হয় না কিন্তু সেই নির্বোধ গর্দভ যদি সত্যি সত্যিই আমার সামনে থাকতো তাহলে আমি তাকে লাথি মারতে পারতাম না৷ মোমের পুতুল বানানো, তাতে আলপিন ফোটানো, এসব বোকার মতো ছেলেমানুষী কাজ, ঠিক কথা—কিন্তু এর উপকারী দিকটাও একটা আছে৷ তোমার মনে সমস্ত ঘৃণা এখন চলে গেছে সেই ছোট্ট পুতুলের ভেতর৷ আর আলপিন ও আগুন দিয়ে তুমি ধ্বংস করেছো—সৎমাকে নয়—বরং তাঁর প্রতি তোমার মনের ঘৃণাকে৷ পরে, তাঁর মৃত্যুসংবাদ শোনার আগেই, তুমি নিজেকে শুদ্ধ মনে করেছো, করোনি—তোমার মনের ভাব অনেক হালকা হয়ে গেছে—তুমি হয়েছো অনেক সুখী?’
লিন্ডা মাথা নেড়ে সম্মত্তি জানালো৷
ও বললো, ‘আপনি কি করে জানলেন? সত্যিই আমার সেরকম মনে হয়েছিলো৷’
পোয়ারো বললেন, ‘সুতরাং ভবিষ্যতে এরকম বোকামি আর করো না৷ এর পরে সৎমাকে যাতে ভালোবাসতে পারো তার জন্য এখন থেকে মনকে তৈরি করে নাও৷’
লিন্ডা চমকে উঠে বললো, ‘আপনার কি মনে হয় আমার ভাগ্যে আবার একটা সৎমা জুটছে? ও, বুঝেছি, আপনি রোজামণ্ডের কথা বলছেন৷ ওকে আমার ভালো লাগে৷’ এক মিনিট ইতস্তত করলো ও, ‘ওর যথেষ্ট বুদ্ধি-বিবেচনা আছে৷’
পোয়ারো নিজে হয়তো ঠিক এই বিশেষণটা রোজমণ্ড ডার্নলির জন্য বেছে নিতেন না, কিন্তু তিনি উপলব্ধি করলেন লিন্ডার কাছে এই বিশেষণ চূড়ান্ত প্রশংসার৷
৩
কেনেথ মার্শাল বললেন, রোজামণ্ড, তোমার মাথায় কি এই উদ্ভট চিন্তা ঢুকেছিলো যে আর্লেনাকে আমি খুন করেছি৷’
রোজামণ্ডের মুখ লাজুক হলো৷ ও বললো, ‘আমার মতো বোকা আর কেউ নেই৷’
‘সে আর বলতে৷’
‘মানলাম, কিন্তু কেন, তুমি নিজেকে ঝিনুকের মতো এমন গুটিয়ে রাখো যে আমি কখনও জানতেই পারলাম না আর্লেনার সম্পর্কে সত্যিসত্যি তোমার কি ধারণা৷ কখনও বুঝিনি, তুমি ওকে সব জেনেশুনে মেনে নিয়ে ওর সঙ্গে অস্বাভাবিক ভালো ব্যবহার করতে নাকি—নাকি, ওকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে৷ আর আমি ভেবেছি যদি শেষেরেটা হয়, আর তুমি যদি হঠাৎ জানতে পারো ও তোমাকে ঠকাচ্ছে, তাহলে তুমি হয়তো রাগে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়বে৷ তোমার নামে অনেক গল্প আমার কানে এসেছে৷ তুমি সব সময়ই ভীষণ শান্ত থাকো, কিন্তু সময়ে সময়ে তোমাকে দেখলে ভয় হয়৷’
‘আর তাই তুমি ভেবেছো আমি সোজা গিয়ে ওকে গলা টিপে খুন করেছি?’
‘হ্যাঁ, মানে—সত্যিই আমি তাই ভেবেছিলাম৷ আর তোমার অ্যালিবাইটাও কেমন যেন হালকা ঠেকছিলো৷ তখনই তো আমি ঠিক করলাম, তোমাকে সাহায্য করবো৷ তাই তোমাকে তোমার ঘরে টাইপ করতে দেখেছি বলে বোকার মতো একটা গল্প ফেঁদে বসলাম৷ আর পরে যখন শুনলাম তুমি বলেছো যে তুমি আমাকে দরজায় উঁকি মারতে দেখেছো—তখন, ইয়ে, মানে…আমি ধরেই নিলাম আমার সন্দেহ পুরোপুরি সত্যি৷ এছাড়া রয়েছে লিন্ডার অদ্ভুত ব্যবহার৷’
কেনেথ মার্শাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘বুঝতে পারছো না, সেকথা আমি তোমার গল্পকে সমর্থন করবার জন্যেই বলেছিলাম৷ আমি—আমি ভেবেছিলাম, তুমি চাও যে তোমার গল্পটাও আমি সমর্থন করি৷’
রোজামন্ড অপলকে তাঁর দিকে চেয়ে রইলো৷
‘তার মানে তুমি ভেবেছো তোমার বউকে আমি খুন করেছি?’
কেনেথ মার্শাল অস্বস্তিভরে নড়েচড়ে বসলেন৷ অস্পষ্ট স্বরে তিনি বললেন, ‘কেন, রোজামণ্ড, তোমার মনে নেই, একটা কুকুরের জন্যে কিভাবে তুমি সেই ছেলেটাকে প্রায় খুন করে বসেছিলো? কিভাবে তুমি ওর গলা টিপে ধরেছিলে, কিছুতেই ছাড়তে চাইছিলো না৷’
‘কিন্তু সে তো বহু বছর আগের কথা৷’
‘হ্যাঁ, জানি—’
রোজামণ্ড তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললো, ‘আর্লেনাকে খুন করার পেছনে আমার কোন মহৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে?’
কেনেথ মার্শাল চোখ সরিয়ে নিলেন, অস্পষ্ট স্বরে কি যেন বললেন৷
রোজমণ্ডের স্বর পর্দায় উঠলো, ‘কেন, সত্যি বুদ্ধির ঢেঁকি? তুমি ভেবেছো তোমার সুখের জন্যে আমি ওকে খুন করেছি, হ্যাঁ? নাকি—নাকি ভেবেছো আমি তোমাকে চাই বলে আমার পথের কাঁটা সরিয়ে দিয়েছি?’
‘না, মোটেও তা ভাবিনি৷’ ঘৃণা ও ক্রোধের সুরে বললেন, কেনেথ মার্শাল, ‘কিন্তু সেদিন তুমি কি বলেছিলে, আশা করি তোমার মনে আছে—লিন্ডার সম্পর্কে, আমাদের সম্পর্কে—আর—আর তখন তোমাকে আমার অবস্থার জন্য যথেষ্ট চিন্তিত মনে হয়েছিলো৷’
রোজামণ্ড বললো, ‘সে নিয়ে সব সময়েই আমি চিন্তা করেছি৷’
‘আমি তো তোমাকে অবিশ্বাস করিনি৷ জানো, রোজামণ্ড আমি সাধারণত এটা ওটা নিয়ে বেশি কথা বলতে পারি না, ভালো করে কথা বলা আমার আসে না৷ কিন্তু একটা কথা আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই৷ আর্লেনাকে আমি নিজের করে কখনও ভাবিনি—শুধু প্রথম দিকে ওকে একটু ভালোবেসেছিলাম—এছাড়া ওকে নিয়ে দিনের পর দিন কাটানো—সে যে কি দুঃসহ কষ্ট৷ সত্যি কথা বলতে কি, এ যেন সুদীর্ঘ এক নরকবাস৷ কিন্তু ওর জন্যে আমার ভীষণ দুঃখ হতো৷ ও এত সরল আর বোকা ছিলো—পুরুষ দেখলে পাগল হয়ে যেতো—নিজেকে সামলে রাখতে পারতো না, আর পুরুষেরা সব সময়েই ওকে ঠকাতে এবং ওর সঙ্গে বাজে ব্যবহার করতো৷ আমার শুধু মনে হতো, আর যাই করি, ওকে চরম পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়৷ আমি ওকে বিয়ে করেছি, সুতরাং যথাসম্ভব ভালোভাবে ওর দেখাশোনা করা আমার কর্তব্য: আমার ধারণা, ও সেটা জানাতো, আর সে জন্যে আমার কাছে সত্যিই কৃতজ্ঞ ছিলো৷ ওকে-ওকে দেখে আমার করুণার পাত্র বলে মনে হতো৷’
রোজামণ্ড শান্তস্বরে বললো, ‘জানি কেন৷ এখন আমি সব বুঝতে পারছি৷’
ওর দিকে না তাকিয়ে কেনেথ মার্শাল সযত্নে পাইপে তামাক ভরতে লাগলেন৷ অস্পষ্ট স্বরে বললেন, ‘তুমি—তুমি চট করে সব কিছু বুঝতে পারো, রোজামণ্ড৷’
একটা হালকা হাসির ঢেউ তুললো রোজামণ্ডের শ্লেষভরা ঠোঁটের রেখায়৷ ও বললো, ‘তুমি কি এখনই আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে, কেন, নাকি ছ’মাস অপেক্ষা করবে বলে ঠিক করেছো?’
কেনেথ মার্শাল পাইপ খসে পড়লো ঠোঁট থেকে, নিচের পাথরে পড়ে চুরমার হয়ে গেলো৷
তিনি বললেন, ‘যাঃ, এখানে এসে এ নিয়ে আমার দু-দুটো পাইপ গেলো৷ সঙ্গে আর পাইপও নেই৷ কিন্তু তুমি কি করে জানলে যে অপেক্ষা করার পক্ষে ছ’মাসই মোটামুটি ঠিক সময় বলে আমি ভেবে রেখেছি?’
‘কারণ সত্যিই সেটা ঠিক সময়৷ কিন্তু দয়া করে এখনই আমাকে স্পষ্ট কথা দাও৷ নয়তো আগামী ছ’মাসের মধ্যে তুমি হয়তো আবার কোন নির্যাতিত অসহায় মেয়ের দেখা পাবে আর সঙ্গে সঙ্গে তাকে উদ্ধার করতে বীরের মতো ছুটে যাবে৷’
তিনি সশব্দে হাসলেন৷
‘এবারে সেই নির্যাতিত অসহায় মেয়ে তুমি, রোজামণ্ড৷ তবে তোমার ওই হতচ্ছাড়া পোশাক তৈরির ব্যবসা তোমাকে ছাড়তে হবে, তারপর আমরা চলে যাবো গ্রামে, সেখানেই থাকবো৷’
‘তুমি কি জানো না, ওই সব ব্যবসা থেকে আমার অনেক আয় হয়? বুঝতে পারছো না, ওটা আমার নিজস্ব—ব্যবসা, আমিই ওটা সৃষ্টি করেছি, নিজের হাতে গড়ে তুলেছি, আর তার জন্যে আমার যথেষ্ট গর্ব আছে৷ আর তোমার এত সাহস, হঠাৎ এসে হুট করে বসলে, ‘ওসব ছেড়ে দাও, সোনা৷’
হ্যাঁ, আমার এতই সাহস৷’
‘আর তোমার বিশ্বাস তোমার জন্যে একথায় আমি রাজী হয়ে যাবো?’
‘যদি রাজী না হও’, বললেন, কেনেথ মার্শাল, ‘তাহলে তুমি আমার কোন উপকারেই আসবে না৷’
রোজামণ্ড অস্ফুট স্বরে বললো, ‘ওঃ কেন সোনা, তোমাকে নিয়ে আমি সারাটা জীবন আমি শুধু গ্রামে কাটাতে চেয়েছি৷ এখন আমার সে স্বপ্ন সত্যি হবে…৷’
সমাপ্ত
