সপ্তম পরিচ্ছেদ
১
ক্রিস্টিন অভিব্যক্তিহীন চোখে অপলকে চেয়ে রইলো কর্নেল ওয়েস্টনের দিকে৷ মনে হলো তাঁর কথার নিহিত তাৎপর্য ও উপলব্ধি করতে পারেনি৷ ও যান্ত্রিক সুরে জবাব দিলো, ‘না—মানে, কেউ সম্ভবত ওঁকে ব্ল্যাকমেল করছিলো৷ ওঁর মতো মেয়ের জবাব দিলো, ‘না মানে, কেউ সম্ভবত ওঁকে ব্ল্যাকমেলে করছিলো৷ ওঁর মতো মেযের পক্ষেই তো ব্ল্যাকমেল হওয়াটা স্বাভাবিক৷’
ব্যগ্র সুরে প্রশ্ন করলেন কর্নেল ওয়েস্টন, ‘কিন্তু…আপনি কি জানেন, কেউ তাঁকে ব্ল্যাকমেল করছিলো?’
ওর গালে ছড়িয়ে পড়লো রক্তিম আভা৷ অপ্রতিভ স্বরে ও বলে উঠলো, ‘সত্যি কথা বলতে কি, ঘটনাচক্রে ব্যাপারটা আমি জানতে পারি৷ একদিন হঠাৎই কিছু কথা আমার কানে আসে—’
‘আর একটু বিশদভাবে বললে ভালো হয়, মিসেস রেডফার্ন—’
আরও এক ঝলক রক্তিম আভা ছড়িয়ে গেলো ক্রিস্টিন রেডফার্নের মুখে৷ ও বললে, ‘আমি—আমি কথাগুলো মোটেই শুনতে চাইনি৷ মানে—ব্যাপারটা বলতে গেলে নিছকই একটা দুর্ঘটনা৷ ঘটনাটা ঘটে দুদিন—না তিনদিন আগে, রাতে৷ আমরা তখন ব্রীজ খেলছিলাম৷’ ও ফিরলো পোয়ারোর দিকে, ‘আপনার মনে আছে? আমি এবং আমার স্বামী, আর আপনি এবং মিস ডার্নলি—এই চারজনে মিলে তাস খেলছিলাম? আমি সেই দানটায় ডামি ছিলাম৷ ঘরে বদ্ধ আবহাওয়ায় আমার শ্বাস যেন বন্ধ হয়েও আসছিলো৷ তাই একটু খোলামেলা ঠান্ডা হাওয়ার লোভে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ি৷ সমুদ্রতীরে উদ্দেশ্যে নেমে চলেছি, কানে এলো কারও কণ্ঠস্বর৷ একটি স্বর—আর্লেনা মার্শালের, শুনেই চিনতে পেরেছি. তখন বলে চলেছে, ‘আমাকে শুধু শুধু চাপ দিয়ে কোন লাভ নেই৷ আর টাকার যোগাড় করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়৷ আমার স্বামী সন্দেহ করে বসবে৷’ আর তারপর কোন পুরুষের কণ্ঠস্বর বলে উঠলো, ‘ওসব ছেঁদো কথায় আমি ভুলছি না৷ যেমন করে হোক টাকা আমার চাই৷’ তখন আর্লেনা মার্শাল বললেন, ‘নীচ, ইতর, জানোয়ার কোথাকার!’ আর লোকটা বললো, ‘জানোয়ার হই আর নাই হই, দেবী, টাকা তোমাকে দিতেই হবে!’
ক্রিস্টিন একটু থামলো৷
‘আমি তখন হোটেলের দিকে ফিরলাম৷ মিনিটখানে পরেই আর্লেনা মার্শাল ঝড়ের বেগে আমাকে পাশ কাটিয়ে গেলেন৷ ওঁকে দেখে ভীষণ বিচলিত বলে মনে হলো৷’
ওয়েস্টন বললেন, ‘আর লোকটা? আপনি কি তাকে চিনতে পেরেছেন?’
ক্রিস্টিন রেডফার্ন মাথা নাড়লো, বললো, ‘না৷ সে খুব নিচু স্বরে কথা বলছিলো৷ তার কথাগুলো আমি কোনরকমে, অস্পষ্টভাবে শুধু শুনতে পেয়েছি মাত্র৷’
‘সেটা আপনার চেনা কোন লোকের গলা বলে মনে হয়নি?’
ক্রিস্টিন কিছুক্ষণ ভাবলো, তারপর আবার মাথা নাড়লো৷
ও বললো, ‘উহুঁ—ঠিক বলতে পারছি না৷ কারণ সে গলার স্বর খুব অস্পষ্ট এবং কর্কশ ছিলো৷ সে স্বর—মানে, কি বলবো?—যে কোন লোকের হতে পারে৷’
কর্নেল ওয়েস্ট বললেন, ধন্যবাদ, মিসেস রেডফার্ন৷’
২
ক্রিস্টিন রেডফার্ন নিষ্ক্রান্ত হওয়ার পর দরজা বন্ধ হতেই ইন্সপেক্টর কলগেট বললেন, ‘যাক, এতক্ষণে একটু আলোর ইশারা পাওয়া গেলো৷’
ওয়েস্টন বললেন, ‘তোমার কি তাই মনে হচ্ছে, হুঁ?’
‘হ্যাঁ, মানে, ব্যাপারটা বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ, স্যার—এ কথা আপনি অস্বীকার করতে পারেন না৷ এই হোটেলেরই কোন বাসিন্দা মৃতা মহিলাটিকে সযত্নে ব্ল্যাকমেলা করছিলো৷’
পোয়ারো মৃদু কণ্ঠে বললেন, ‘কিন্তু সেই দুর্বৃত্ত ব্ল্যাকমেলার মোটেই নিহত হয়নি৷ মারা গেছে তার শিকার৷’
‘হুঁ, এটা একটু অস্বাভাবিক মানছি৷’ বললেন ইন্সপেক্টর, ‘কারণ ব্ল্যাকমেলারা কখনও তাদের শিকারকে খুন করে বেড়ায় না৷ কিন্তু এই ঘটনা থেকে আজ সকালে মিসেস মার্শালের অদ্ভুত আচরণের একটা সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ভেসে ওঠে৷ তিনি আজ সেই অজ্ঞাত ব্ল্যাকমেলারের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন, এবং সঙ্গত কারণেই তিনি চাননি, এ ঘটনা তাঁর স্বামী অথবা রেডফার্ন জানতে পারুক৷’
হ্যাঁ, এ থেকে ওই ব্যাপারটা অন্তত স্পষ্ট হচ্ছে৷’ সমর্থন জানালেন পোয়ারো।
ইন্সপেক্টর কলগেট বলে চললেন, ‘আর একবার ভাবুন তো গোপন সাক্ষাৎকারে জায়গাটার কথা! উপযুক্ত কাজের উপযুক্ত স্থানই বটে৷ মিসেস মার্শাল তাঁর ভেলায় চড়ে ভেসে পড়লেন৷ এবং তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই৷ এ তাঁর নিত্যনৈমিত্তিক অভ্যাস৷ তিনি ডাইনে বাঁক নিয়ে পিক্সি কোভের উদ্দেশে রওনা হন, যেখানে সকালের দিকে কেউ কখনও যায় না এবং তাঁর গোপন সাক্ষাৎকারের পক্ষে এক শান্ত, সুন্দর জায়গা৷’
পোয়ারো বললেন, ‘হ্যাঁ, এ কথাটা আমারও মনে হয়েছিলো৷ জায়গাটা, আপনি যা বললেন, গোপন সাক্ষাৎকারের পক্ষে এক আদর্শ মিলনস্থল৷ জায়গাটা নির্জন, এবং দ্বীপের দিক থেকে ওখানে পৌঁছবার একমাত্র পথ পাহাড়ের গা থেকে ঝোলানো ইস্পাতের মইটা ব্যবহার করা, যা সকলের কর্ম নয়৷—তার ওপর ঝুলন্ত পাহাড়ের ঠিক নিচে অবস্থিত হওয়ার, ওপর থেকে বেলাভূমির অধিকাংশই থেকে যায় পাহাড়ের আড়ালে অদৃশ্য৷ এছাড়া, আরও একটা সুবিধে পিক্সি কোভের আছে, যেটার কথা মিঃ রেডফার্ন একদিন আমাকে বলেছিলেন৷ ওখানে নাকি একটা গুপ্ত গুহা আছে, যার প্রবেশ পথ খুঁজে পাওয়া নেহাৎ সহজ নয়, কিন্তু সেখানে লোকচক্ষুর আড়ালে যে কেউ অতি স্বচ্ছেন্দে কারও অপেক্ষা করতে পারে৷’
ওয়েস্টন বললেন, ‘হ্যাঁ, পিক্সি গুহা—ওটা সম্পর্কে বেশ কিছু কথা শুনেছি বলে মনে পড়ছে৷’
ইন্সপেক্টর কলগেট বললেন, ‘অবশ্য বহু বছর ধরে এই গুহা প্রসঙ্গ একেবারে চাপা পড়েছিলো৷ জায়গাটা আমাদের একবার সরেজমিনে তদন্ত করে দেখা উচিত৷ বলা যায় না, তেমন কোন সূত্র-টুত্র পেয়ে গেলেও পেয়ে যেতে পারি৷’
ওয়েস্টন বললেন, ‘হ্যাঁ, তোমার কথাই ঠিক, কলগেট, এ সমস্যার প্রথম অংশের সমাধান আমরা করতে পেরেছি৷ মিসেস মার্শাল পিক্সি কোভে কেন গিয়েছিলেন? অবশ্য, এখন দ্বিতীয় অংশের উত্তরটা আমাদের প্রয়োজন৷ সেখানে তিনি কার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন? অনুমান করা যায়, সেই ব্যক্তি হোটেলের অতিথিদেরই একজন৷ তাঁদের কাউকেই প্রেমিকের ভূমিকায় ঠিক মানায় না—কিন্তু ব্ল্যাকমেলারের প্রশ্ন উঠলে অন্য কথা৷’
হোটেলের অতিথি-তালিকার খাতাটা তিনি কাছে টেনে নিলেন৷
‘হোটেলের পরিচারক, চাকর ইত্যাদি, যাদের আমি সন্দেহভাজন বলে মনে করি না, তাদের বাদ দিলে বাকি থাকেন এঁরা : মার্কিন ভদ্রলোক গার্ডেনার, মেজর ব্যারী, মিঃ হোরেস ব্ল্যাট এবং ধর্মযাজক স্টিফেন লেন৷’
ইন্সপেক্টর কলগেট বললেন, ‘আমরা এই সন্দেহের পরিধিকে আরও সংক্ষিপ্ত করে আনতে পারি, স্যর৷ কারণ, আজ সারা সকালটা মিঃ গার্ডেনার সমুদ্রতীরেই উপস্থিত ছিলেন৷ তাই তো মঁসিয়ে পোয়ারো?’
পোয়ারো উত্তর দিলে, ‘শুধু মাঝে অল্প সময়ের জন্য উঠে গিয়েছিলেন, স্ত্রীর জন্য একটা উলের গোছা নিয়ে আসতে৷’
কলগেট বললেন, ‘ওহ, সেটা ধর্তব্যের মধ্যে নয়৷’
মেজর ব্যারী আজ সকাল দশটায় বেরোন, এবং ফিরে আসেন দেড়টা নাগাদ৷ মিঃ লেন বেরোন আরও সকালে৷আটটার সময় তিনি প্রাতরাশ সারেন৷ বলেন, একটু ‘পদব্রজে’ ভ্রমণে যাচ্ছেন৷ মিঃ ব্ল্যাট প্রায় রোজকার মতোই সাড়ে ন’টা নাগাদ তাঁর নৌকো নিয়ে বেরোন৷ এখনও পর্যন্ত তাঁরা কেউই ফেরেননি৷’
‘নৌকো নিয়ে বেরিয়েছেন, হুঁ?’ কর্নেল ওয়েস্টনের স্বরে গভীর চিন্তায় ছোঁয়া৷
ইন্সপেক্টর কলগেট সেই ইঙ্গিতে সাড়া দিয়ে বলে উঠলেন৷ ‘আমাদের সন্দেহের কাঠামোয় এই ভদ্রলোক চমৎকার মানিয়ে যাচ্ছেন, স্যার৷’
ওয়েস্টন বললেন, ‘আচ্ছা, এই ব্ল্যাট ভদ্রলোকের সঙ্গে আমরা একবার কথা বলে দেখবো—দেখি, আর কে কে বাকি রইলো? রোজামণ্ড ডার্নলি৷ আর ওই ব্রুস্টার মহিলা, যিনি রেডফার্নের সঙ্গে মিসেস মার্শালের মৃতদেহ আবিষ্কার করেন৷ আচ্ছা, এই মহিলাটি কিরকম, কলগেট?’
বেশ বুদ্ধিমতী মহিলা, স্যার৷ পরিচ্ছন্ন পরিপাটি৷’
‘এই মৃত্যু সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য কি?’
ইন্সপেক্টর মাথা নাড়লেন৷
‘যতদূর জানি, এ সম্পর্কে আমাদের বলার মতো আর কোন খবর তাঁর কাছে নেই, কিন্তু তবুও আমাদের নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন৷ এছাড়া রয়েছেন ওই মার্কিন ভদ্রলোক ও তাঁর স্ত্রী৷
কর্নেল ওয়েস্টন মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানালেন৷ বললেন, ‘ওঁদের সবাইকেই এখানে আসতে বলো, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এসব ঝামেলা মিটিয়ে ফেলা যাক৷ বলা যায় না, তেমন কোন খবর পেলেও পেয়ে যেতে পারি৷ আর কিছু না হোক অন্তত ওই ব্ল্যাকমেল সম্পর্কে হয়তো কিছু জানা যাবে৷
৩
পরস্পরকে সঙ্গী করে মিঃ এবং মিসেস গার্ডেনার আরক্ষী-প্রধানের সম্মুখে উপস্থিত হলেন৷
সঙ্গে সঙ্গেই বিশদ ব্যাখ্যায় ব্যস্ত হলেন মিসেস গার্ডেনার৷
‘আশা করি আমাদের অবস্থাটা আপনি বুঝতে পারছেন, কর্নেল ওয়েস্টন (ওয়েস্টন তো আপনার নাম, তাই না?)’ শেষোক্ত বিষয়ে সম্মতি ও আশ্বাস পেয়ে তিনি বলে চললেন, ‘ঘটনার আকস্মিকতার আমি ভীষণ একটা মানসিক আঘাত পেয়েছি, আর মিঃ গার্ডেনার আমার স্বাস্থ্য সম্পর্কে বরাবরই ভীষণ সতর্ক—’
মিঃ গার্ডেনার মাঝপথে কথা বললেন, ‘মিসেস গার্ডেনার অত্যন্ত অনুভূতিশীল৷’
‘—তখন তিনি আমাকে বললেন, ‘ক্যারি, তুমি কক্ষনো একা যাবে না; আমিও তোমার সঙ্গে যাবো৷’ অবশ্য তার মনে এই নয় যে ব্রিটিশ পুলিশের তদন্ত পদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের বিন্দুমাত্রও শ্রদ্ধা নেই, বরং ঠিক তার উলটো৷ শুনেছি, তদন্তের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ পুলিশের পদ্ধতি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও উন্নত মানের, এবং আমি মনে প্রাণে তা বিশ্বাস করি, আরও বিশেষ করে যখন স্যাভয় হোটেলে আমার একটা ব্রেসলেট হারিয়ে গেলো, তখন যে ছেলেটি তদন্তের প্রয়োজনে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলো, তার মতো সহানুভূতিপূর্ণ ভদ্র ব্যবহার আমি খুব কম লোকেরই দেখেছি, আর ব্রেসলেটটাও সত্যি সত্যি হারায়নি, আমি ভুল করে কোথায় রেখেছিলাম, সব সময় তাড়াহুড়ো করার এই অসুবিধে, কোথায় কখন কি রাখি কিছুই মনে থাকে না—’ মিসেস গার্ডেনার থামলেন, ধীর শ্বাস নিলেন, এবং পুনরায় সরব হলেন, ‘আর আমি যা বলতে চাই, এবং আমি জানি মিঃ গার্ডেনারও আমার সঙ্গে একমত হবেন, তা হলো ব্রিটিশ পুলিশকে তদন্তে যে কোনভাবে সাহায্য করার জন্যে আমরা সর্বদাই উদগ্রীব৷ সুতরাং বিন্দুমাত্রও দ্বিধা না করে আপনারা আমার কাছে যা জানতে চান জিগ্যেস করুন—’
কর্নেল ওয়েস্টন এই আমন্ত্রণে সারা দিয়ে মুখ খুলছিলেন, কিন্তু মিসেস গার্ডেনার কথা বলতে থাকায় সে চেষ্টায় বিরত হলেন৷
‘সেই কথাই আমি বলেছিলাম, তাই না, ওডেল? আর বলছিও ঠিক তাই না?’
‘হ্যাঁ, সোনা, বললেন, মিঃ গার্ডেনার৷
কর্নেল ওয়েস্টন ঝটিতি বলে উঠলেন, ‘মিসেস গার্ডেনার, শুনলাম আপনি এবং আপনার স্বামী আজ সারা সকালটা সমুদ্রতীরেই কাটিয়েছেন?’
সম্ভবত এই প্রথম মিঃ গার্ডেনার স্ত্রীকে পরাস্ত করে প্রথমে কথা বলতে পারলেন৷
‘হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন৷’ তিনি বললেন৷
‘নিশ্চয়ই, সেখানেই তো ছিলাম আমরা,’ মিসেস গার্ডেনার বললেন, ‘কি সুন্দর, শান্ত ছিলো আজকের সকালটা, ঠিক অন্য দিনগুলোর মতোই, হয়তো তার চেয়েও স্বাভাবিক; আশা করি বুঝতে পারছেন, কি বলতে চাইছি; আর আমরা ঘুণাক্ষরেও টের পারিনি, বাঁক পেরিয়ে ওই নির্জন সৈকতে কি কাণ্ডটাই না ঘটে চলেছে৷’
‘মিসেস মার্শালকে আজ সারা দিনে আপনারা কখনও দেখেছেন?’
‘না—দেখিনি৷ আর সেইজন্যেই তো ওডেলকে বলছিলাম, মিসেস মার্শাল আজ সকালে কোথায় যেতে পারেন৷ আর প্রথমে খোঁজ করতে এলেন তাঁর স্বামী, তাঁরপর এলো ওই সুদর্শন ছেলেটি, মিঃ রেডফার্ন, আর সে যা অধৈর্য হয়ে পড়েছিলো কি বলবো! সৈকতে বসে প্রত্যেকের দিকে তাকিয়ে খালি বিরক্তভাব করছে৷ তখন আমি মনে মনে বললাম, নিজের অমন সুন্দরী, চমৎকার স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তার কি ওই সাংঘাতিক মেয়ে ছেলেটার পেছনে না দৌড়লে চলছিলো না? কারণ মেয়েটাকে আমার সাংঘাতিক বলেই মনে হতো৷ ওর সম্পর্কে আমার ধারণা বরাবরই ওই রকম তাই না, ওডেল?’
‘হ্যাঁ, সোনা৷’
‘ক্যাপ্টেন মার্শালের মতো এমন চমৎকার একজন ভদ্রলোক যে কি করে এ ধরনের একটা মেয়েছেলেকে বিয়ে করে বসলেন, তা কিছুতেই আমার মাথায় আসছে না—তাছাড়া তাঁর মেয়ে এখন বড় হচ্ছে, আর মেয়েদের বাড়ন্ত বয়েসের মুখে প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ৷ মিসেস মার্শাল ঠিক সেরকম মানুষ ছিলেন না—কোন শিক্ষা-দীক্ষা নেই—আর আমি বলবো, আচরণে ঠিক পশুর মতো৷ ক্যাপ্টেন মার্শালের যদি সামান্যতম বাস্তব বুদ্ধি থাকতো, তাহলে তিনি মিস ডানলির মতো সুন্দরী এবং সম্মানিতা মহিলাকেই বিয়ে করতেন৷ একথা মানতেই হবে, যেভাবে তিনি জীবনে এগিয়ে গেছেন এবং প্রথম শ্রেণীর একটা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছেন, তা রীতিমতো প্রশংসার যোগ্য৷ এ কাজে বুদ্ধির প্রয়োজন—আর রোজামণ্ড ডার্নলির দিকে এক পলক তাকালেই আপনি বুঝতে পারবেন, তাঁর বুদ্ধির অভাব নেই! যে কোন কাজ পরিকল্পনামাফিক সুষ্ঠুভাবে শেষ করার ক্ষমতা তাঁর আছে৷ আমি যে তাঁকে কতখানি শ্রদ্ধা করি তা বলে বোঝাতে পারছি না৷ আর, এই তো সেদিন আমি মিঃ গার্ডেনারকে বলছিলাম, মিস ডার্নলি যে ক্যাপ্টেন মার্শালের প্রেমে অন্ধ, তা যে কোন লোকেরই চোখে পড়বে—বলেছিলাম, ক্যাপ্টেন মার্শালকে মেয়েটা ভীষণ ভালোবাসে, বলিনি, ওডেল?’
‘হ্যাঁ, সোনা৷’
‘শুনেছি, ওঁরা নাকি ছোটবেলা থেকেই পরস্পরকে চিনতেন, আর এখন, কে বলতে পারে, ওই নোংরা মেয়েছেলেটার চিরতরে সরে যাওয়ায় ওঁদের আন্তরিক ইচ্ছে পূর্ণ হবে না! আমাকে মোটেই সংকীর্ণমনা ভাববেন না, কর্নেল ওয়েস্টন, আর এও নয় যে অভিনয় আমি অপছন্দ করি—কেন, আমার অন্তরঙ্গ বন্ধুদের অনেকেই তো অভিনয় নিয়ে আছেন—কিন্তু মিঃ গার্ডেনারকে আমি বরাবরই বলেছি, ওই মেয়েটার মধ্যে কোথায় যে একটা অশুভ ছায়া লুকিয়ে আছে৷ আর এখন দেখতেই পাচ্ছেন, যে আমার কথাই ঠিক হলো৷’
বিজয়ীর উল্লসিত অভিব্যক্তি নিয়ে থামলেন মিসেস গার্ডেনার৷
এরকুল পোয়ারোর ঠোঁটে ফুটে উঠলো ছোট্ট হাসির রেখা৷ তাঁর চোখ কিছুক্ষণের জন্য অপলকে চেয়ে রইলো মিঃ গার্ডেনারের বিচক্ষণ ধূসর চোখের তারায়৷
কর্নেল ওয়েস্টন মরিয়া হয়েই বলে উঠলেন, ‘আচ্ছা, ধন্যবাদ, মিসেস গার্ডেনার৷ তাহলে আপনারা কেউই এমন কিছু দেখেননি৷ যার সঙ্গে এই খুনের কোন সম্পর্ক আছে?’
‘উহুঁ—সেরকম কিছু আমাদের নজরে পড়েছে বলে মনে হয় না৷’ মিঃ গার্ডেনার থেমে থেমে জবাব দিলেন, ‘মিসেস মার্শাল বেশির ভাগ সময়েই রেডফার্ন ছেলেটার সঙ্গে ঘুরে বেড়াতেন—কিন্তু সে কথা তো যে কেউ আপনাদের বলবে৷’
‘কিন্তু তাঁর স্বামী? আপনার কি মনে হয়, তিনি এতে অসন্তুষ্টু হতেন?’
মিঃ গার্ডেনার সতর্ক সুরে বললেন, ‘ক্যাপ্টেন মার্শাল খুব চাপা স্বভাবের মানুষ৷ বাইরে থেকে দেখে তাঁর মনের কথা বোঝা যায় না৷’
মিসেস গার্ডনার এ বক্তব্যের সমর্থনে মন্তব্য করলেন, ‘হ্যাঁ, তিনি যাকে বলে একেবারে খাস ইংরেজ৷’
৪
মেজর ব্যারীর ঈষৎ-বিবশ মুখমণ্ডলে বিভিন্ন অভিব্যক্তির প্রতিযোগিতা পরিলক্ষিত হলো৷ তিনি যে সত্যি অত্যন্ত বিস্মিত এবং আতঙ্কিত, সেটা বোঝাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, মেজর ব্যারী, কিন্তু তা সত্ত্বেও লজ্জানম্র তৃপ্তির ছোঁয়াটুকু তাঁর অভিব্যক্তিতে গোপন থাকেনি৷
তিনি তাঁর কর্কশ, সশব্দ-শ্বাসপ্রশ্বাস সম্বলিত স্বরে তখন বলছিলেন, ‘যে-কোনভাবে আপনাদের সাহায্য করতে পারলে খুশি হবো৷ অবশ্য ঘটনা সম্পর্কে আমি বলতে গেলে তেমন কিছু জানি না—কিছুই জানি না৷ পাত্র-পাত্রী কারো সঙ্গেই আমার সাক্ষাৎ পরিচয় নেই৷ তবে জীবনের বেশ কিছু সময় আমি একটু-আধটু ঘুরে বেড়িয়েছি৷ প্রাচ্য অঞ্চলে অনেকদিন ছিলাম৷ আর এ কথা আপনাকে জোর দিয়ে বলতে পারি, ভারতীয় কোন শৈলবাসে কিছুদিন কাটানোর পর মানব-চরিত্রের যেটুকু আপনার কাছে অজানা থাকে, জানবেন, সেটুকু জানার তেমন কোন প্রয়োজন নেই৷’
তিনি থামলেন, শ্বাস নিলেন, এবং পুনরায় শুরু করলেন, ‘বস্তুত এই ব্যাপারটা আমাকে সিমলার একটা ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়৷ লোকটির নাম ছিলো রবিনসন, নাকি ফ্যালকনার? সে যাই হোক, সে ছিলো ‘‘ইস্ট উইল্টস’’ অথবা ‘‘নর্থ সারেস’’-এর লোক৷ ঠিক মনে পড়ছে না, অবশ্য দরকারও নেই৷ শান্তশিষ্ট মানুষ, বুঝলেন, বইয়ের পোকা—দেখলে বলতেন, একেবারে ভিজে বেড়ালটি৷ একদিন সন্ধ্যায় নিজের বাংলোয় স্ত্রীকে হঠাৎ আক্রমণ করে৷ গলা টিপে ধরে দুহাতে৷ বউটা নাকি অন্য কোন একটা লোকের সঙ্গে ‘‘ইয়ে’’ চালিয়ে যাচ্ছিলো, হঠৎ সেটা সে জানতে পারে৷ ওঃ, আরেকটু হলেই বউটাকে একেবারে শেষ করে দিয়েছিলো৷ অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যায় মেয়েটা৷ আমরা তো চমকে গিয়েছিলাম৷ কখনো ভাবিনি, লোকটার ভেতরে এত তেজ আছে!’
এরকুল পোয়ারো মৃদুকণ্ঠে বললেন, ‘আর এই ঘটনার সঙ্গে মিসেস মার্শালের মৃত্যুর একটা সাদৃশ্য আপনি দেখতে পাচ্ছেন, তাই তো?’
‘হ্যাঁ—মানে, আমি বলতে চাইছি ওই শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টার ব্যাপারটা৷ অনেকটা একই রকম৷ হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে ভয়ঙ্কর কিছু একটা করে বসা!’
পোয়ারো বললেন, ‘আপনার ধারণা, ক্যাপ্টেন মার্শাল তাই করেছেন?’
‘না, সে কথা আমি একবারও বলিনি৷’ মেজর ব্যারীর রক্তিম মুখমণ্ডল আরও রক্তিম হলো, ‘মার্শাল, সম্পর্কে কোন কথাই আমি বলিনি৷ সে অত্যন্ত ভালোমানুষ৷ তার সম্পর্কে কোন কুকথা মরে গেলেও মুখে আনতে পারবো না৷’
পোয়ারো বললেন, ‘কিন্তু, মাপ করবেন, একটু আগেই একজন প্রতারিত স্বামীর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার প্রতি আপনিই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন৷’
মেজর ব্যারী বললেন, ‘হ্যাঁ, মানে, আমি বলতে চাইছিলাম, মিসেস মার্শাল ছিলেন, আমার মতে, রীতিমতো গরম চীজ৷ কি বলেন? রেডফার্ন ছেলেটাকে একেবারে সুতোয় করে নাচাচ্ছিলেন৷ হয়তো এর আগে এরকম অনেকে তাঁর জীবনে গেছে এসেছে৷ কিন্তু মজার ব্যাপারটা কি জানেন, নিজের স্ত্রীর ব্যাপারে স্বামীদেবতারা বিশ্বাসে একেবারে অন্ধ! আশ্চর্য! এই জিনিসটা বরাবরই আমাকে অবাক করেছে৷ তাঁরা এটুকু বোঝেন, যে একটা লোক তাঁদের স্ত্রীর প্রতি আসক্ত কিন্তু এটা দেখেও দেখেন না যে তাঁদের স্ত্রীরত্নটিও লোকটির প্রতি সমানভাবে অনুরক্ত! পুনায় এরকম একটা ঘটনার কথা আমার মনে পড়ছে৷ খুব সুন্দরী মেয়েটি৷ ওঃ, নিজের স্বামীকে কম ঝঞ্ঝাটে ফেলেনি সে—’
কিঞ্চিৎ অনিচ্ছা নিয়েই নড়েচড়ে বসলেন কর্নেল ওয়েস্টন, বললেন, ‘ঠিক আছে, মেজর ব্যারী৷ এখন আমাদের প্রথম কাজ বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে দেখা৷ আপনি তাহলে ব্যক্তিগতভবে এমন কিছু জানেন না অর্থাৎ এমন কিছু দেখেননি বা শোনেননি, যা আমাদের তদন্তে কোনরকম সাহায্য করতে পারে?’
উহুঁ, কর্নেল, সেরকম কোন তথ্য দিতে পারছি না৷ একদিন বিকেলে মিসেস মার্শাল এবং রেডফার্নকে গাল কোভে দেখেছিলাম—’ এই পর্যন্ত বলে মেজর ব্যারী চোখ টিপলেন, সবজান্তার ভঙ্গীতে৷ হেসে উঠলেন চাপা কর্কশ স্বরে—‘সে বড় সুন্দর দৃশ্য৷ কিন্তু সেরকম সাক্ষ্য প্রমাণ তো আর আপনি চাইছেন না? হাঃ-হাঃ-হাঃ-হাঃ!’
‘আজ সকালে আপনি মিসেস মার্শালকে একবারও দেখেনেনি?’
‘সকালে কারও সঙ্গে আমার দেখা হয়নি৷ সেন্ট লু-তে গিয়েছিলাম৷ দুর্ভাগ্য বলতে হবে৷ এ এমন জায়গা যেখানে মাসের পর মাস নির্বিঘ্নে কেটে যায়, আর যেদিন বিঘ্ন ঘটে সেইদিনই আমরা থাকি অনুপস্থিত৷’
মেজরের কণ্ঠে একটা পৈশাচিক আক্ষেপের সুর ফুটে উঠলো৷
কর্নেল ওয়েস্টন তাঁকে বক্তব্যের খেই ধরিয়ে দিলেন, ‘আপনি তাহলে সেন্ট লু তে গিয়েছিলেন বলছেন?’
‘হ্যাঁ, একটু টেলিফোন করার দরকার ছিলো। এখানে তো টেলিফোনের কোন ব্যবস্থা নেই, আর লেদারকোম্ব ডাকঘরে ফোনে একটু একা কথা বলার উপায় নেই!’
‘আপনার ফোনের বক্তব্য কি একান্ত গোপনীয় ছিলো?’
সহাস্যে আবার চোখ টিপলেন মেজর, ‘হ্যাঁ, গোপনীয় বলতে পারেন, আবার নাও বলতে পারেন৷ চেয়েছিলাম, আমার এক বন্ধুকে ডেকে তার মারফত একটা বিশেষ ঘোড়ার ওপর কিছু বাজী ধরতে, দুর্ভাগ্য লাইনই পেলাম না৷’
‘আপনি কোথা থেকে ফোন করেছিলেন?’
সেন্ট লু-র প্রধান ডাকঘর থেক৷ তারপর ফেরার সময় রাস্তা হারিয়ে ফেলি—যতসব জট পাকানো অলিগলি—গোটা এলাকাটা জুড়ে এঁকেবেঁকে যেন গোলধাঁধার সৃষ্টি করেছে৷ রাস্তা খুঁজে বার করতেই কম করে ঘণ্টাখানেক সময় নষ্ট হয়েছে৷ এটাই সম্ভবত পৃথিবীর জটিলতম হতচ্ছাড়া জায়গা! এই তো সবে আধঘণ্টা হলো ফিরেছি৷’
কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘সেন্ট লু-তে কারও সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছিলো কিংবা কারও সঙ্গে কথা বলেছেন?’
মেজর ব্যারী স্বভাবসিদ্ধ চাপা হাসিতে উজ্জ্বল হলেন, বললেন, ‘অ্যালিবাই প্রমাণ করতে বলছেন? সেরকম কিছু মনে করতে পারছি না৷ সেন্ট লু-তে প্রায় হাজার পঞ্চাশেক লোককে আমি দেখেছি—কিন্তু তার মানে এই নয়, তারা আমাকে মনে রাখবে৷’
পুলিশ-প্রধান বললেন, ‘এ ধরনের নিয়মমাফিক প্রশ্ন আমাদের করতে হয়, তা তো জানেন৷’
‘সে কথা ঠিক৷ দরকার পড়লেই খবর দেবেন৷ সাহা্য্য করতে পারলে খুশি হবো৷ মৃতা মহিলার চটক ছিলো৷ আমিও চাই, যে এ কাজ করেছে, ধরা পড়ুক৷ নির্জন সমুদ্র-সৈকতে হত্যাকাণ্ড—কাগজে এই শিরোনামাই যে দেখতে পাবো, তা বাজী রেখে বলতে পারি৷ এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে—’
ইন্সপেক্টর কলগেটই মেজর ব্যারীর এই সাম্প্রতিক স্মৃতিচারণপর্বকে নিষ্ঠুরভাবে অঙ্কুকে বিনাশ করে তাঁকে সুকৌশলে এগিয়ে দিলেন দরজা পর্যন্ত৷
ফিরে এসো তিনি বললেন, ‘সেন্ট লু-তে কোন খোঁজ-খবর নেওয়া একটু কষ্টকর হবে৷ কারণ এখন সেখানে রীতিমতো ছুটির মরসুম চলছে৷’
পুলিশ-প্রধান বললেন, ‘হ্যাঁ, মেজর ব্যারীকে আমরা সন্দেহভাজনের তালিকা থেকে বাদ দিতে পারি না৷ অবশ্য আমার ধারণা, তিনি এ ব্যাপারে তেমনভাবে জড়িয়ে নেই৷ এইরকম ক্লান্তিকর বাচাল বৃদ্ধ বহু দেখা যায়৷ সৈন্যবাহিনিতে থাকাকালীন কয়েকজনের সাক্ষাৎ আমিও পেয়েছিলাম৷ কিন্তু তবুও—মেজরের দিকে নজর রাখতেও হবে৷ কলগেট, তোমার ওপরেই সেটা ছেড়ে দিলাম৷ খোঁজ নিয়ে দ্যাখো, ক’টার সময় তিনি গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছেন, ট্যাঙ্কে তেল কতটা ছিলো—কোনকিছু বাদে দেবে না৷ হয়তো এও সম্ভব, কেন নির্জন জায়গায় গাড়ি রেখে তিনি দ্বীপে ফিরে আসেন এবং পিক্সি কোভে গিয়ে উপস্থিত হন৷ অবশ্য কাজটা তেমন যুক্তিগ্রাহ্য নয়৷ সেক্ষেত্রে মেজরকে কারও না কারও নজরে পড়ে যাওয়ার প্রচণ্ড ঝুঁকি নিতে হবে৷’
কলগেট মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন৷ বললেন, ‘হ্যাঁ, বিশেষ করে আজই প্রচুর শ্যারাব্যাং গাড়ি এখানে উপস্থিত রয়েছে৷ আজ চমৎকার দিন৷ মোটামুটিভাবে সাড়ে এগারোটা নাগাদ ওরা আসতে শুরু করে৷ অবশ্য জোয়ার ছিলো সাতটায়৷ আর ভাটা শুরু হবে বেলা একটায়৷ সুতরাং লোকেরা কংক্রিট সেতু এবং বেলাভূমিতে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো৷’
ওয়েস্টন বললেন, ‘হ্যাঁ৷ কিন্তু তাঁকে সেতু পার হয়ে হোটেলের পাশ দিয়েই তো আসতে হবে!’
ঠিক পাশ দিয়ে না এসে তিনি হয়তো অন্য রাস্তাটা দিয়ে দ্বীপের ওপ্রান্তে গেছেন—’
ওয়েস্টন দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে বললেন, ‘আমি একবারও বলছি না, লোকজনের চোখ এড়িয়ে তাঁর পক্ষে এ কাজ করা অসম্ভব। আজ হোটেলের সমস্ত অতিথিই সমুদ্রতীরে উপস্থিত ছিলেন, শুধু মিসেস রেডফানী এবং লিন্ডা মার্শাল ছাড়া যেহেতু ওরা গাল কোভে গিয়েছিলেন, আর যে রাস্তার কথা তুমি বলছো , তার প্রথম অংশটুকু হোটেলের কয়েকটা মাত্র ঘর থেকেই শুধু দেখা যায়, এবং কেউ যে সেই “বিশেষ “ সময়ে জানলা দিয়ে ওই রাস্তার দিকে চেয়ে থাকবে, সে সম্ভবনা অত্যন্ত কম। সত্যি কথা বলতে কি, স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি, কোন লোকের পক্ষে সকলের চোখ এড়িয়ে হোটেলে এসে লাউঞ্জ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়াটা নেহাৎ অসম্ভব নয়। কিন্তু আমার মনে হয়, কেউ তাঁকে দেখতে পাবে না, এই বিশ্বাসের ওপর ভরসা করে তিনি এতটা ঝুঁকি নিতে পারেন না।’
কলগেট বললেন, ‘তিনি হয়তো নৌকো বেয়ে ঘুর পথে পিক্সি কোভে গিয়ে থাকবেন।’
ওয়েস্টন মাথা নাড়লেন, সম্মতি জানিয়ে বললেন, ‘এটা তবু অনেকটা যুক্তিগ্রাহ্য। যদি সমুদ্রের কিনারায় কাছাকাছি কোন নির্জন অঞ্চলে তিনি আগে থাকতেই নৌকোটা রেখে গিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর পক্ষে গাড়ি ছেড়ে নৌকো বেয়ে পিক্সি কোভে যাওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়; তাঁরপর মিসেস মার্শালকে খুন করে তিনি নৌকো নিয়ে ফিরে আসেন, এবং গাড়ি নিয়ে আমাদের কাছে উপস্থিত হন ওই সেন্টুলু-তে গিয়ে রাস্তা হারিয়ে ফেলার গল্প নিয়ে—এমন গল্প যা তিনি ভালোভাবেই জানেন, আমাদের পক্ষে যাচাই করা বেশ কষ্টকর হবে।’
‘ঠিক বলেছেন, স্যার।’
পুলিশ-প্রধান বললেন, ‘সুতরাং, ব্যাপারটা আমি তোমার ওপরে ছেড়ে দিচ্ছি, কলগেট। স্থানীয় এলাকায় তন্নতন্ন করে চিরুনি চালাও। তুমি তো জানো কি করতে হবে। এখন তাহলে মিস ব্রুস্টারের সঙ্গে কথা বলা যাক।’
৫
তাঁদের সংগৃহীত তথ্যের সঞ্চয়ে নতুন কোন প্রয়োজনীয় তথ্য উপহার দিতে সক্ষম হলেন না এমিলি ব্রুস্টার৷
তাঁর মৃতদেহ আবিষ্কারের কাহিনি দ্বিতীয়বার শোনার পর ওয়েস্ট বললেন, ‘এছাড়া এমন কিছু আপনি জানেন না, যা আমাদের তদন্তে সাহায্য করতে পারে?’
এমিলি ব্রুস্টার সংক্ষিপ্তভাবে জবাব দিলেন, ‘উহুঁ৷ এরকম একটা বীভৎস বিশ্রী ব্যাপার…৷ আশা করি খুব শিগগিরই আপনারা এর একটা সমাধান করতে পারবেন৷’
ওয়েস্টন বললেন, ‘হ্যাঁ, সেই রকমই আশা করছি৷’
নিস্পৃহ, শুষ্ক স্বরে এমিলি বললেন, ‘অবশ্য এর সমাধান তেমন কঠিন হওয়ার কথা নয়…’
‘তার মানে? কি বলতে চান আপনি, মিস ব্রুস্টার?’
‘দুঃখিত৷ আপনাকে গায়ে পড়ে উপদেশ দিতে চাইনি৷ শুধু বলতে চাইছিলাম, এ ধরনের মেয়েছেলে-সংক্রান্ত ব্যাপারে সমাধান যথেষ্ট সহজ হওয়াই উচিত৷’
এরকুল পোয়ারো মৃদুস্বরে বললেন, ‘আপনার তাই মনে হয়?’
তীব্র স্বরে জবাব দিলেন এমিলি ব্রুস্টার, ‘নিশ্চয়ই মনে হয়৷ মৃতব্যক্তি সম্পর্কে নোংরা কথা বলা উচিত নয় ইত্যাদি নীতিবাক্য মানলেও বাস্ববকে তো আপনি অস্বীকার করতে পারেন না৷ ওই মেয়েছেলেটা ছিলো পুরোপুরি নষ্ট চরিত্রের৷ আপনাদের তদন্তের মধ্যে যা করতে হবে, তা হলো ওর নোংরা অতীতটাকে একটু খোঁজ-খবর করে ঘেঁটে দেখা৷’
এরকুল পোয়ারো নম্র স্বরে বললেন, ‘আপনি তাঁকে পছন্দ করতেন না?’
‘না, কারণ ওর সম্পর্কে সাধারণের চেয়ে একটু বেশিই আমি জানি৷’ সকলের নীরব সপ্রশ্ন দৃষ্টির উত্তরে তিনি বলে চললেন, ‘আমার খুড়তুতো ভাই আরস্কিনদের একজনকে বিয়ে করে৷ আপনারা হয়তো শুনে থাকবেন, আর্লেনা বৃদ্ধ স্যার রবার্টের ওপর এমন প্রভাব বিস্তার করেন যে তিনি ওর প্রতি অনুরাগে অন্ধ হয়ে নিজের আত্মীয়স্বজনকে বঞ্চিত করে সমস্ত সম্পত্তি ওই মেয়েটাকেই দিয়ে যান৷’
কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘আর তাতে, তাঁর আত্মীয়স্বজনেরা—ইয়ে—মানে অসন্তুষ্ট হন?’
‘স্বাভাবিকভাবেই৷ প্রথমত আর্লেনার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক একটা চরম কেলেঙ্কারির সৃষ্টি করে, আর তার ওপর ওকে পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড উইল করে দিয়ে যাওয়ার স্পষ্টই বোঝা যায় সে কি চরিত্রের মেয়ে ছিলো৷ কথাগুলো হয়তো আপনাদের কাছে রূঢ় ঠেকেছে, কিন্তু আমার মতে আর্লেনা স্টুয়ার্টের মতো মেয়েদের কোন সহানুভূতি দেখানো উচিত নয়৷ আরও একটা ঘটনার কথা আমি বলতে পারি—একজন হতভাগ্য যুবকের কথা, আর্লেনার জন্যে শেষ পর্যন্ত যে পাগল হয়ে গিয়েছিলে—সে বরাবরই একটু ছিটগ্রস্ত ছিলো, আর স্বাভাবিকভাবেই ওর সঙ্গ ছেলেটাকে সুস্থতার বাইরে ঠেলে দিয়েছে৷ সে কিছু শেয়ার নিয়ে তছরুপ না কি যেন করেছিলো, শুধু ওর পেছনে খরচ করার টাকা যোগাড়ের জন্যে, আর কোনরকমে আদালতের সাজা থেকেই সে রেহাই পায়৷ ওই মেয়েছেলেটা যার সঙ্গে মিশেছে তাকেই নষ্ট করে ছেড়েছে৷ দেখুন না, কেমন করে রেডফার্ন ছেলেটার মাথাটা দিনের পর দিন চিবিয়ে খাচ্ছিলো৷ না, ওর মৃত্যুতে ঠিক দুঃখ প্রকাশ করতে পারছি না বলে দুঃখিত—অবশ্য, এর বদলে ও যদি জলে ঝাঁপ দিয়ে বা পাহাড় থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করতো তাহলে ভালো হত৷ কারণ গলা টিপে খুন হওয়াটা ভীষণ বিশ্রী৷’
‘তাহলে আপনার ধারণা, খুনী মিসেস মার্শালের অতীত জীবনের কোন শত্রু?’
‘হ্যাঁ, তাই৷’
‘এমন কেউ, যে সকলের চোখকে ফাঁকি দিয়ে মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপে এসেছে?’
‘তাকে দেখবার লোক কোথায়? আমরা সকলেই তো সমুদ্রতীরে ছিলাম৷ যদ্দূর জানি মার্শাল মেয়েটা আর ক্রিস্টিন রেডফার্ন তখন গাল কোভে ছিলো৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল হোটেলে, নিজের ঘরে৷ তাহলে খুনীকে দেখবার জন্যে কোন কাক পক্ষীটা ছিলো বলতে পারেন? অবশ্য মিস ডার্নলি ছাড়া…’
‘কেন, মিস ডার্নলি কোথায় ছিলেন?’
‘হোটেলের পশ্চিম দিকের পাহাড়ের কিনারায়৷ জায়গাটার নাম সানি লেজ৷ আমি ও মিঃ রেডফার্ন তাঁকে সেখানে বসে থাকতে দেখেছি—যখন আমরা দ্বীপের গা ঘেঁষে নৌকো বেয়ে যাচ্ছিলাম৷’
কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘হয়তো আপনার কথাই ঠিক, মিস ব্রুস্টার৷’
‘এমিলি ব্রুস্টার আত্মপ্রত্যয়ের সুরে বললেন, ‘হয়তো নয়, আমি জানি আমার কথাই ঠিক৷ যখন কোন মেয়ে এরকম নৃশংস পৈশাচিকভাবে খুন হয়, তখন জানবেন, সবচেয়ে মূল্যবান সূত্রের সন্ধান সে-ই আপনাদের হাতে তুলে দেবে৷ মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনি কি আমার সঙ্গে একমত্ নন?’
এরকুল পোয়ারো চোখ তুলে তাকালেন৷ তাঁর চোখ পড়লো এমিলি ব্রুস্টারের আত্মবিশ্বাসের ভরা ধূসর চোখে৷ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই—আপনি এইমাত্র যা বললেন, তার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত৷ নিজের মৃত্যু রহস্যের শ্রেষ্ঠ ও একমাত্র সূত্র আর্লেনা মার্শাল নিজেই৷’
মিস ব্রুস্টার তীক্ষ্ণ বললেন, ‘দেখলেন তো, তাহলে?’
তিনি ঋজু বলিষ্ঠ ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে রইলেন৷ তাঁর শীতল আত্মপ্রত্যয়ে পরিপূর্ণ দৃষ্টি চঞ্চলভাবে ছুঁয়ে যেতে লাগলো সবার মুখ৷
নীরবতা ভঙ্গ করলেন কর্নেল ওয়েস্টন, ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, মিস ব্রুস্টার, মিসেস মার্শালের অতীত জীবনে নির্হিত কোন সূত্রই আমাদের নজর এড়িয়ে যাবে না৷’
এমিলি ব্রুস্টার নিষ্ক্রান্ত হলেন৷
৬
ইন্সপেক্টর কলগেট টেবিলের কাছে নড়েচড়ে বসলেন, চিন্তান্বিত কণ্ঠে বললেন, ‘ভদ্রমহিলা একটু একরোখা প্রকৃতির; আর মৃতা মহিলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যে ঠিক মধুর ছিলো না, সেটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে৷’
এক মিনিট নীরব থেকে তিনি আত্মগতভাবে বললেন, ‘এটা একদিন দিয়ে আমাদের দুর্ভাগ্য, যে আজকের গোটা সকালের জন্যে মিস ব্রুস্টারের এক নিখুঁত অ্যালিবাই রয়েছে৷ আপনি কি তাঁর হাত দুটো লক্ষ্য করেছিলেন, স্যার? যে কোন পুরুষের মতো বড়সড়৷ তাছাড়া তাঁর শরীরের গঠনও বেশ ঋজু—আমি বলবো, অনেক পুরুষের চেয়ে তাঁর শক্তি বেশি…’
ইন্সপেক্টর থামলেন৷ পোয়ারোর প্রতি তাঁর দৃষ্টিতে যেন একরাশ মিনতি ঝরে পড়লো৷
‘আর আপনি বলছেন, মঁসিয়ে পোয়ারো, তিনি আজ সকালে একবারের জন্যেও বেলাভূমি ছেড়ে যাননি?’
পোয়ারো ধীর মাথা নাড়লেন, বললেন, ‘প্রিয় ইন্সপেক্টর, মিস ব্রুস্টার যখন সমুদ্রতীরে আসেন, তখন মিসেস মার্শাল সম্ভবত পিক্সি কোভেই পৌঁছননি, এবং মিঃ রেডফার্নের সঙ্গে নৌকো নিয়ে বেরোবার সময় পর্যন্ত তিনি সর্বক্ষণ আমার চোখের সামনেই ছিলেন৷’
কলগেট হতাশা ভরা কণ্ঠে বললেন, ‘তাহলে তো তাঁকেও বাদ দিতে হয়৷’
এবং এই অনুসিদ্ধান্ত যথেষ্ট বিচলিত বলে মনে হলো৷
৭
রোজমণ্ড ডার্নলির আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে বরাবরের মতো খুশির একটা উদ্বেল অনুভূতি এরকুল পোয়ারোকে দোলা দিয়ে গেলো৷
এমন কি এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তদন্ত সংক্রামিত নীরস পরিবেশেও রোজমণ্ড ওর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে উপস্থিত হলো৷
কর্নেল ওয়েস্টনের মুখোমুখি বসে বুদ্ধিদীপ্ত মুখমণ্ডলে গম্ভীর অভিব্যক্তি ফুটিয়ে ও প্রশ্ন করলো, ‘আপনারা বোধহয় আমার নাম ঠিকানা জানতে চান; রোজমণ্ড অ্যান ডার্নলি৷ ‘রোজামণ্ড লিমিটেড’ নামে ৬২২, ব্রুক স্ট্রীটে আমার একটা পোশাক তৈরি প্রতিষ্ঠান আছে৷’
‘ধন্যবাদ, মিস ডানলি৷ এবার বলুন, এমন কিছু আপনি জানেন, যা আমাদের তদন্তে সাহায্য করতে পারে?’
‘উহুঁ, সেরকম কিছু জানি বলে মনে হয় না৷’
‘আজ সকালে আপনার গতিবিধি—’
‘প্রায় সাড়ে ন’টা নাগাদ আমি প্রাতরাশ শেষ করি৷ তারপর ওপরে ঘরে গিয়ে কয়েকটা বই এবং সূর্য-আচ্ছাদন নিয়ে চলে যাই সানি লেজ-এ৷ তখন অন্তত দশটা পঁচিশ হবে৷ বারোটা বাজতে দশ নাগাদ আমি হোটেলে ফিরে আসি, ঘর থেকে টেনিস রাকেট নিয়ে টেনিস কোর্টে যাই, খেলেছি প্রায় মধ্যাহ্নভোজ পর্যন্ত৷’
‘আপনি তাহলে সাড়ে দশটা থেকে প্রায় বারোটা দশ পর্যন্ত ওই পাহাড়ের কিনারায় ছিলেন, অর্থাৎ হোটেল থেকে যে জায়গাটাকে সানি লেজ বলা হয়?’
‘হ্যাঁ৷’
‘আজ সকালে মিসেস মার্শালকে একবারও দেখেছিলেন?’
‘না৷’
‘তিনি যখন ভেলা ভাসিয়ে পিক্সি কোভের দিকে যান, তখন কি সানি লেজ থেকে আপনি তাঁকে দেখেছিলেন?’
‘না৷ হয়তো আমি সেখানে পৌঁছবার আগেই উনি ভেলায় চড়ে জায়গাটা পার হয়ে যান৷’
‘সানি লেজ-এ থাকাকালীন কোন নৌকো বা ভেলা আপনার নজরে পড়েনি?’
‘না, তাছাড়া আগেই তো বলেছি, আমি বই পড়ছিলাম৷ অবশ্য মাঝে মাঝে দু’একবার চোখ তুলে তাকিয়েছি ঠিকই, কিন্তু তখন সমুদ্রে কোন ভেলা বা নৌকো দেখিনি৷’
‘তাহলে মিঃ রেডফার্ন এবং মিস ব্রস্টারকেও নিশ্চয়ই আপনি যেতে দেখেননি?’
‘না, দেখিনি৷’
‘মিঃ মার্শালের সঙ্গে তো আপনার আগে থাকতেই পরিচয় ছিলো, তাই না?’
ক্যাপ্টেন মার্শাল আমাদের পরিবারে একজন পুরনো বন্ধু৷ আমরা এক সময় পাশাপাশি বাড়িতে থাকতাম৷ মাঝে অবশ্য বেশ কয়েক বছর তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি—অন্তত বারো বছর তো হবেই—’
‘আর মিসেস মার্শাল?’
‘তাঁকে আমি এই দ্বীপে এসেই প্রথম দেখি৷’
ক্যাপ্টেন ও মিসেস মার্শালের মধ্যে সম্পর্ক তো ভালোই ছিলো, কি বলেন?’
‘খুবই ভালো ছিলো—অন্তত আমি যদ্দুর জানি৷’
‘ক্যাপ্টেন মার্শাল কি স্ত্রীর প্রতি খুব অনুরক্ত ছিলেন?’
রোজমণ্ড বলল, ‘হয়তো ছিলেন—আমার পক্ষে সেটা সঠিক বলা সম্ভব নয়৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল ব্যবহারে একটু সেকেলে প্রকৃতির—সাংসারিক দুঃখ-দুর্দশার কথা পাঁচজনকে বলে বেড়াবার মতো ‘আধুনিক’ তিনি নন৷’
‘মিসেস মার্শালকে আপনি পছন্দ করতেন, মিস ডার্নলি?’
‘না৷’
ছোট এক অক্ষরের শব্দটা শান্ত এবং মসৃণ কণ্ঠে উচ্চারিত হলো৷ উচ্চারণের ভঙ্গীতে বক্তব্যের চরিত্র রইলো না—যেন একটা সহজ সত্যের নিষ্পাপ বিবৃতি৷
‘কারণটা জানতে পারি—?’
রোজামণ্ডের ঠোঁটে অর্ধস্ফুট হাসির ছোঁয়া রেখাপাত করলো৷ ও বললো, ‘ইতিমধ্যে আপনারা নিশ্চয়ই এটুকু আবিষ্কার করেছেন, মহিলা মহলে আর্লেনা মার্শাল তেমন জনপ্রিয় ছিলেন না৷ মেয়েদের আসরে উনি একঘেয়েমিতে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন এবং মুখেও সেই বিরক্তি প্রকাশ করতেন৷ এত সত্ত্বেও আমি কিন্তু আর্লেনার পোশাকের প্রশংসা না করে পারছি না৷ পোশাক নির্বাচন এবং পরিধানের ব্যাপারে ওঁর কতকগুলো সহজ গুণ ছিলো৷ ওঁকে আমরা দোকানের খদ্দের হিসেবে পেলে আমি সত্যিই খুশি হতাম৷’
‘পোশাক-আশাকের পেছনে তিনি নিশ্চয়ই খুব খরচ করতেন?’
‘নিশ্চয়ই করতেন, কারণ ওঁর নিজের তো পয়সার অভাব ছিল না, তা ছাড়া ক্যাপ্টেন মার্শালও বেশ অবস্থাপন্ন লোক—’
‘একথা কি কখনও শুনেছেন, বা আপনার মনে হয়েছে মিস ডানলি, যে মিসেস মার্শালকে কেউ ব্ল্যাকমেল করছিলো?’
রোজামণ্ড ডার্নলির অভিব্যক্তিপূর্ণ মুখমণ্ডলে ফুটে উঠলো তীব্র বিস্ময়৷ ও বললো, ব্ল্যাকমেল করছিলো? আর্লেনাকে?’
‘মনে হচ্ছে, আপনি যেন বেশ অবাক হচ্ছেন?’
‘হ্যাঁ, বলতে পারেন, একরকম তাই৷ কারণ ব্যাপারটা এত বেমানান লাগছে—’
‘কিন্তু অসম্ভব তো নয়!’
‘না, অসম্ভব নয়৷ এ পৃথিবীতে সবকিছুই যে সম্ভব, সেটা ঠেকে শিখতে আমাদের বেশি সময় লাগে না, তাই না? কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি এই কথা ভেবে, আর্লেনাকে কোন অজুহাতে ব্ল্যাকমেল করা হচ্ছিলো৷’
‘হয়তো এমন কতকগুলো বিষয় ছিলো, আমার মনে হয় যেগুলো মিসেস মার্শাল চাননি যে তাঁর স্বামীর কানে যাক৷’
‘ওহ-হ্যাঁ, হতে পারে—’
কণ্ঠস্বরে ফুটে ওঠে দ্বিধার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মৃদু হাসলো রোজামণ্ড, বললে, ‘আমাকে অবাক করার কারণ আশা করি বুঝতে পারছেন। মানে আর্লেনা বরাবরই ওর আচার-আচরণে একটু বেপরোয়া ছিলো৷ কখনই ও নিজেকে সতী সাবিত্রী বলে জাহির করার চেষ্টা করতো না৷’
‘তাহলে আপনার ধারণা অন্যান্য পুরুষদের সঙ্গে মিসেস মার্শালের ইয়ে, অন্তরতার কথা তাঁর স্বামী জানতেন?’
কিছুক্ষণ নীরবতা৷ রোজামণ্ডের কপালে চিন্তার সূক্ষ্ম রেখা৷ অবশেষে অনিচ্ছাভরা মৃদু স্বরে ও নৈঃশব্দ ভঙ্গ করলো, ‘ব্যাপারটা কি জানেন, কি যে ধারণা করবো সেটা আমি নিজেই ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না৷ বরাবরই আমার মনে হয়েছে, কেনেথ মার্শাল আর্লেনাকে আর্লেনা হিসেবেই সরাসরি মেনে নিয়েছেন৷ ওঁর সম্পর্কে তাঁর মনে কোন ভ্রান্ত ধারণা ছিলো না৷ কিন্তু কি জানি, আমার অনুমান ঠিক নাও হতে পারে৷’
‘হয়তো তিনি স্ত্রীকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতেন?’
রোজমণ্ড ঈষৎ উত্ত্যক্ত কণ্ঠে বললো, ‘পুরুষেরা ভীষণ বোকা৷ আর কেনেথ মার্শাল তাঁর কৃত্রিম মার্জিত আচরণের আড়ালে প্রকৃতপক্ষে একজন অসাংসারিক পুরুষ৷ সুতরাং তাঁর পক্ষে স্ত্রীকে অন্ধ বিশ্বাস করাটা কিছু অসম্ভব নয়৷ হয়তো তিনি ভেবেছেন, অন্যান্য পুরুষেরা তাঁর স্ত্রীর রূপমুগ্ধ ভক্ত মাত্র—তার বেশি কিছু নয়৷
‘তাহলে আপনি এমন কাউকে জানেন না—মানে, এমন কারো কথা শোনেননি, যাঁর পক্ষে মিসেস মার্শালের সঙ্গে শত্রুতা বা কোন আক্রোশ থাকা সম্ভব?’
রোজামণ্ড ডার্নলি হাসলো, বললো, ‘হ্যাঁ জানি, শুধু মাত্র ক্ষুব্ধ স্ত্রীদেরই আর্লেনার ওপর আক্রোশ ছিলো৷ কিন্তু যেহেতু ও শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছে, সেহেতু আমি ধরেই নিচ্ছি ওকে খুন করেছে কোন পুরুষ৷’
‘ঠিকই বলেছেন—’
রোজামণ্ড চিন্তান্বিত কণ্ঠে বললো, ‘না, তেমন কোন পুরুষের কথা আমি বিশেষ করে বলতে পারছি না৷ অবশ্য আমার পক্ষে সঠিক জানার সম্ভাবনাও কম৷ আপনারা বরং আর্লেনার অন্তরঙ্গ সঙ্গীদের কাউকে জিগ্যেস করে দেখতে পারেন৷’
‘ধন্যবাদ, মিস ডার্নলি৷’
রোজামণ্ড চেয়ারে সামান্য ঘুরে বসলো, বললো, ‘মঁসিয়ে পোয়ারো, কি, জিগ্যেস করার মতো কোন প্রশ্ন নেই?’
‘ওর মুখমণ্ডলে ফুটে ওঠা হাসিতে শ্লেষের ছোঁয়া পোয়ারোর দিকে ঝিলিক মারলো৷
এরকুল পোয়োরো হাসলেন এবং মাথা নাড়লেন৷
তিনি বললেন, ‘না—এই মুহূর্তে কোন প্রশ্নের কথা মনে করতে পারছি না৷’
রোজামণ্ড ডার্নলি উঠে দাঁড়ালো, নিষ্ক্রান্ত হলো ঘর থেকে৷
