অষ্টম পরিচ্ছেদ
১
আর্লেনা মার্শালের শোবার ঘরে ওঁরা দাঁড়িয়ে ছিলেন৷
দুটো বিশাল জানলা সামনের অলিন্দের সীমারেখা ছাড়িয়ে চোখ মেলে দিয়েছে সুনীল সাগরে এবং সংলগ্ন বেলাভূমির দিকে৷ আর্লেনা প্রসাধন টেবিলে রক্ষিত একরাশ শিশি-বোতলের বিভ্রান্তিকর জটিলতায় ঠিকরে পড়েছে সোনালী রোদ৷
প্রসাধন প্রতিষ্ঠানের পরিচিত সর্বপ্রকার প্রসাধান দ্রব্য এবং অনুলেপন এখানে উপস্থিত৷ স্ত্রীলোক-সংক্রান্ত আসবাবে পরিপূর্ণ ঘরে তিনজন পুরুষ বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে লাগলেন৷ ইন্সপেক্টর কলগেট ড্রয়ারগুলো যথাক্রমে খুলতে এবং বন্ধ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন৷
অনতিবিলম্বে তাঁর মুখ দিয়ে একটা গম্ভীর অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এলো৷ কারণ তিনি আবিষ্কার করেছেন একগোছা ভাঁজ করা চিঠি৷ তিনি এবং ওয়েস্টন চিঠিগুলো পড়ে দেখতে লাগলেন৷
এরকুল পোয়ারো ইতিমধ্যে এগিয়ে গেছেন পোশাকের আলমারির দিকে৷ দরজার একটা পাল্লা খুলতেই চোখে পড়লো রাশি রাশি বিভিন্ন আধুনিক পোশাক৷ পোয়ারো এবার অবশিষ্ট পাল্লাটা খুললেন৷ সফেন অন্তর্বাসের সমারোহ এক স্তুপের সৃষ্টি করেছে৷ একটা চওড়া তাকে রয়েছে অসংখ্য টুপি: গাঢ় লাল ও ফিকে হলুদ রঙের আরও দুটো কার্ডবোর্ডের সৈকত-টুপি—একটা বড় হাওয়াই ঘাসের টুপি—আরও একটা ঘন নীল কাপড়ে তৈরি, এছাড়া রয়েছে, তিন-চারটে অদ্ভুত আকারের টুপি, যেগুলোর পেছনে নিঃসন্দেহে কয়েক গিনি করে খরচ করা হয়েছে—একটা গাঢ় নীল রঙের সৈনিকের টুপি—কালো মখমলের একটা গুচ্ছ—এবং বিবর্ণ ধূসর একটা পাগড়ি৷
এরকুল পোয়ারো নিশ্চল দাঁড়িয়ে পোশাকগুলো পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন৷ এক টুকরো প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠলো তাঁর ঠোঁটে৷ মৃদু স্বরে মন্তব্য করলেন তিনি, ‘স্ত্রীয়াশ্চরিত্রম৷’
কর্নেল ওয়েস্টন চিঠিগুলো ভাঁজ করে রাখছিলেন৷
‘তিনটে লিখেছে রেডফার্ন ছেলেটা,’ তিনি বললেন, কবে যে ওর বুদ্ধিশুদ্ধি হবে৷ মেয়েদের যে কখনও চিঠি লিখতে নেই, সেটা আশা করি বছর কয়েকের মধ্যেই ও ঠেকে শিখবে৷ মেয়েরা চিরকালই চিঠিপত্র যত্ন করে জমিয়ে রাখে, আর মুখে দিব্যি গেলে বলে সেগুলো তারা পুড়িয়ে ফেলেচে৷ এছাড়া আরও একটা চিঠি এখানে রয়েছে৷ ওই একই পদের৷’
চিঠিটা তিনি পোয়ারোর দিকে এগিয়ে দিলেন৷
‘প্রিয়তমা আর্লেনা—যদি বুঝতে আমার দুঃখ৷ আমি চলে যাচ্ছি সুদূর চীনদেশে—হয়তো তোমাকে আর দেখতে পাবে—না৷ কখনও ভাবিনি, কোন পুরুষ কোন মেয়েকে এত গভীরভাবে ভালোবাসতে পারে, যেমন তোমাকে বেসেছি আমি৷ চেকটার জন্যে ধন্যবাদ৷ ওরা আমাকে সাজা থেকে এবার মুক্তি দেবে৷ খুব অল্পের জন্য বেঁচে গেছি৷ এত সবের কারণ আমি চেয়েছিলাম বড়লোক হতে—তাও তোমারই জন্যে৷ আমাকে ক্ষমা করবে তো? আমি চেয়েছিলাম তোমার কানে—তোমার সুন্দর নরম কানে, হীরের বন্যা বইয়ে দিতে—চেয়েছিলাম তোমার কানে—তোমার সুন্দর নরম কানে, হীরের বন্যা বইয়ে দিতে—চেয়েছিলাম দুধ-সাদা মুক্তোর মালা তোমার গলায় পরিয়ে দিতে, কিন্তু লোকে বলে মুক্তোর নাকি এখন কদর নেই৷ তাহলে একটা বিশাল সবুজ পাল্লা, কি বলো? হ্যাঁ, তাই দেবো৷ একটা বিশ্বাস পান্না, শীতল এবং সবুজ প্রচ্ছন্ন আগুনে টইটম্বুর৷ আমাকে ভুলে যেও না যেন—জানি, ভুলবে না৷ তুমি আমার—চিরকালের জন্যে আমার৷
বিদায়—বিদায়—বিদায়
‘জে. এন’
ইন্সপেক্টর কলগেট বললেন, ‘এই জে. এন৷ সত্যিই চীনে গিয়েছিলো কিনা খোঁজ করে দেখলে কাজ হবে৷ আর তা যদি না হয়, তাহলে—বুঝতেই পারছেন, সম্ভবত সে-ই আমাদের প্রার্থিত ব্যক্তি৷ অন্ধের মতো মহিলাটিকে ভালোবাসতো, হয়তো পুজোই করতে তারপর হঠাৎ একদিন জানতে পারলো, তাকে ঠকানো হয়েছে৷ দেখে শুনে মনে হচ্ছে, মিস ব্রুস্টার সম্ভবত এই ছেলেটির কথাই বলেছিলেন৷ হ্যাঁ, মনে হয়, এতে হয়তো কাজ হবে৷’
এরকুল পোয়ারো মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানালেন৷ বললেন, ‘হ্যাঁ, এই চিঠিটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ৷ আমার মতে, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷’
পোয়ারো ঘুরে দাঁড়ালেন, অপলকে চেয়ে রইলেন ঘরস্থ আসবারের দিকে—প্রসাধন টেবিলে রাখা অসংখ্য শিশিবোতলের দিকে—খোলা পোশাকের আলমারির দিকে, এবং সবশেষে তাঁর নজর পড়লো, উদ্ধত অলস ভঙ্গীতে বিছানায় শুয়ে থাকা বড়সড় জোকার পুতুলের দিকে৷
এবার ওঁরা কেনেথ মার্শালের ঘরে প্রবেশ করলেন৷
ঘরটা তাঁর স্ত্রীর ঘরে লাগোয়া, কিন্তু দু-ঘরে মাঝে যোগাযোগকারী কোন দরজা নেই, এবং বারান্দাও নেই৷ ঘরটার মুখ একই দিকে এবং দুটো জানলা আছে, তবে অনেক ছোট৷ দু-জানলার মাঝে দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে সোনালী ফ্রেমে বাঁধানো একটা আয়না৷ ডান দিকের জানলা ছাড়িয়ে ঘরের এক কোণে রয়েছে প্রসাধন-টেবিল৷ টেবিলে রয়েছে দুটো গজদন্তের বুরুশ, একটা পোশাক পরিষ্কারের বুরুশ এবং এক শিশি কেশ প্রসাধনের আরক৷ বাঁ দিকের জানলার পাশে, ঘরে অন্য প্রান্তে, রয়েছে লেখার টেবিল৷ একটা খোলা টাইপরাইটার টেবিলে বসানো, এবং তার পাশে স্তুপাকারে সাজানো রয়েছে একরাশ কাগজ৷
কলগেট ক্ষিপ্ত অভ্যস্ত ভঙ্গীতে তাঁর অনুসন্ধানের কাজ শুরু করলেন৷
তিনি বললেন, ‘আপাতদৃষ্টিতে সবকিছুই বেশ সহজ সরল মনে হচ্ছে৷ ও, এই তো সেই চিঠিটা, যেটার কথা উনি আজ সকালে বলেছিলেন৷ তারিখ দেওয়া আছে ২৪শে—অর্থাৎ গতকালের৷ আর এই যে সেই খামটা—লেদারকোম্ব বে ডাকঘরের আজ সকালের ছাপ রয়েছে৷ সুতরাং কারচুপির কোন প্রশ্ন নেই৷ এবার আমাদের জানতে হবে, এই চিঠির উত্তর তাঁর পক্ষে আগে থাকতেই তৈরি করে রাখা সম্ভব ছিলো কিনা৷’
তিনি চেয়ারে বসলেন৷
কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘তোমাকে কিছুক্ষণের জন্যে এ কাজে ছেড়ে যাচ্ছি। আমরা বাকি ঘরগুলোয় একবার চোখ বুলিয়ে নিই। সকাল থেকেই সবাইকে ঘরছাড়া করে নিচে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে, তাঁরা ক্রমশ অধৈর্য হয়ে পড়েছেন।’
ওঁরা দুজন ঢুকলেন লিন্ডা মার্শালের ঘরে। পূর্ব দিকের পাথুরে পাহাড়ী এলাকা ছাড়িয়ে নীল সমুদ্রের দিকে চোখ মেলে দিয়েছে ঘরটা।
ওয়েস্টন ঘরের চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিলেন। মৃদু স্বরে বললেন, ‘মনে হয় না এ ঘরে দেখার মতো কিছু আছে। তবে এও সম্ভব, মার্শাল হয়তো তাঁর মেয়ের ঘরে এমন কিছু লুকিয়ে রেখেছে, যা আমাদের নজরে পড়ুক সে চায় না; অবশ্য তার সম্ভাবনা কম। কারণ খুনের কোন হাতিয়ার বা অন্য কিছু সরিয়ে ফেলার ব্যাপার তো এখানে নেই। ‘
তিনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
এরকুল পোয়ারো ঘরেই রয়ে গেলেন। অগ্নি-আধারে আবিষ্কৃত কয়েকটা জিনিস তাঁকে কৌতূহলী করে তুলেছেন। খুব সদ্য কোন কিছু সেখানে পোড়ানো হয়েছে। তিনি হাঁটু গেড়ে বসলেন, ধৈর্য ধরে কাজ শুরু করলেন। তাঁর আবিষ্কার একটা সাদা কাগজে গুছিয়ে রাখলেন তিনি। অসম আকৃতির বিশাল এক টুকরো গলা মোম—কিছু সবুজ কাগজ অথবা পিচবোর্ডের ছিন্ন অংশ—সম্ভবত কোন ক্যালেন্ডারের, কারণ তার সামান্য অক্ষত অংশে বড় অক্ষরে ‘৫’ লেখা, এবং চোখে পড়ছে একটু ছাপা অংশ: ‘…মহৎ কর্ম…।’ এছাড়াও রয়েছে একটা সাধারণ পিন এবং সম্ভবত কোন পশুর দগ্ধ লোম।
পোয়ারো নিখুঁত সারিতে জিনিসগুলো সাজিয়ে সেদিকে অপলকে চেয়ে রইলেন। তিনি মৃদু স্বরে উচ্চারণ করলেন, ‘ “জীবন মহৎ কর্ম চিন্তায় ফল নাই, সম্পাদনে ফল আছে। “হয়তো এ কথাই লেখা ছিলো। কিন্তু এদের উদ্ভট জিনিসের অর্থ কি? আশ্চর্য!’
আর সেই মুহূর্তে ছোট্ট পিনটা হাতে নিতেই তাঁর চোখ তীক্ষ্ণ ও সবুজ হয়ে উঠলো।
অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করলেন, তিনি, ‘হুঁ…কিন্তু এও কি সম্ভব?’
অগ্নি-আধারের কাছ থেকে উঠে দাঁড়ালেন এরকুল পোয়ারো।
সম্পূর্ণ নতুন চোখে ধীরে ঘরের চারদিকে আর একবার তিনি নজর বুলিয়ে নিলেন। মুখে থমথমে নিরুত্তাপ অভিব্যক্তি।
অগ্নি-আধারে ওপরেই শ্বেতপাথরের লম্বা তাক। তাকের বাঁ দিকে শেলফে সাজানো কয়েকটা বই। এরকুল পোয়ারো চিন্তান্বিত মুখে বইয়ের নামগুলোয় চোখ বুলিয়ে নিলেন।
একটা বাইবেল, শেক্সপীয়রীয় নাটকের জরাজীর্ণ একটি সংকলন। মিসেস হামফ্রি ওয়ার্ড রচিত ‘দ্য ম্যারেজ অফ উইলিয়াম অ্যাশ’। শার্লট ইয়ং-এর লেখা, ‘দ্য ইয়াং স্টেপমাদার৷’ ‘দ্য শ্রপশায়ার ল্যান্ড৷’ ইলিয়ডের ‘মার্ডার ইন দ্য ক্যাথিড্রাল।’ বার্নাড শয়ের ‘সেন্ট জোয়ান’। মার্গারেট মিচেল-এর ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’। আর সব শেষে ডিক্সন কার এর ‘দ্য বার্নিং কোর্ট’।
দুটো বই বের করে নিলেন পোয়ারো, দ্য ইয়াং স্টেপমাদার’ এবং ‘উইলিয়ম অ্যাশ’, বই দুটোর নামপত্রে বসানো অস্পস্ট রবার ছাপগুলো চোখ বুলিয়ে দেখলেন৷ বই দুটো তাকে ফিরিয়ে রাখতে গিয়েই আর একটা বই তাঁর নজরে পড়লো৷ অন্যান্য বইগুলোর পেছনে লুকিয়ে রাখা এই বইটি আকারে খাটো অথচ মোটা৷ বাদামী চামড়া দিয়ে বাঁধানো৷
বইটা হাতে নিয়ে খুললেন তিনি৷ তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন৷
অস্ফুটস্বরে বললেন, তিনি, ‘সুতরাং, আমার ধারণাই দেখছি ঠিক… না, কোন ভুল আমার হয়নি৷ কিন্তু অন্য ব্যাপারটা—সেটাও কি সম্ভব?’ উহুঁ, তা সম্ভব নয়, যদি না…’
নিথর দাঁড়িয়ে রইলেন, তিনি অন্যমনস্কভাবে গোঁফে হাত বোলাতে লাগলেন, তাঁর মন তখন এই সমস্যাকে ঘিরে আলোড়ন তুলে চলেছে৷
অস্পষ্ট কণ্ঠে দ্বিতীয়বার উচ্চারণ করলেন তিনি, ‘যদি না…?’
২
কর্নেল ওয়েস্টন দরজায় উঁকি মারলেন৷
‘কি হলো, মঁসিয়ে পোয়ারো, এখনও হয়নি?’
‘আসছি, আসছি৷’ সরবে বলে উঠলেন পোয়ারো৷
তিনি ঘর ছেড়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলেন বারান্দায়৷
লিন্ডার ঠিক পাশের ঘরটাই রেডফার্নদের৷
ঘরটা ভালো করে দেখলেন পোয়ারো৷ অনিবার্যভাবেই দুটো ভিন্ন স্বাতন্ত্র্যের ছাপ তাঁর নজরে পড়লো—প্রথমটা, পরিষ্কার এবং পরিচ্ছন্নতা, যেটা তিনি ক্রিস্টিনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করলেন, এবং দ্বিতীয়টা স্পষ্ট বিশলঙ্খলা—বা প্যাট্রিকের চরিত্রানুগ৷ এই দুটো ভিন্ন ব্যক্তিত্বের ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ছাড়া অন্য কিছু তেমন ভাবে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করলো না৷
এর পরে ঘরটা রোজমণ্ড ডার্নলির; এবং ঘরে মালিকের ব্যক্তিত্বের কারণে এ ঘরে নিছক আনন্দেই কিছু সময় কাটিয়ে দিলেন তিনি৷
বিছানার পাশে টেবিলে রাখা কয়েকটা বই ও প্রসাধন-টেবিলে সাজানো প্রসাধন সামগ্রীর ব্যয়বহুল সরলতা তিনি প্রশংসা সহকারে লক্ষ্য করলেন৷ এবং রোজামণ্ড ডার্নলি যে বহুমূল্য সুগন্ধী ব্যবহার করেন তার ছলনাময়ী সৌরভ তাঁর নাসারন্ধ্রে এসে প্রবেশ করলো৷
রোজামণ্ড ডার্নলির ঘরে ঠিক পরেই, উত্তর প্রান্তে, একটা খোলা দরজা এবং দরজাসংলগ্ন বারান্দা৷ বারান্দা থেকে সিঁড়ি নেমে গেছে নিচের পাথুরে জমিতে৷
ওয়েস্টন বললেন, প্রাতরাশের আগে স্নান করার থাকলে সবাই এই সিঁড়িটাই ব্যবহার করে—’
এরকুল পোয়ারো চোখে কৌতূহল ঝিলিক মারলো৷ তিনি বাইরে এসে নিচের দিকে তাকালেন৷
একটা সরু পথ গিয়ে মিশেছে পাথর কেটে তৈরি আঁকাবাঁকা কয়েক ধাপ সিঁড়িতে। সিঁড়ি শেষ হয়েছে সমুদ্রে৷ এছাড়া আরও একটা পথ হোটেলকে ঘিরে বাঁ দিক দিয়ে চলে গেছে৷
তিনি বললেন, ‘এই সিঁড়ি নেমে, বাঁ দিকের পথ ধরে যে কেউ কংক্রিটের সেতুর কাছে প্রধান রাস্তায় পৌঁছতে পারে৷’
ওয়েস্টন সম্মতি জানিয়ে মাথা দোলালেন৷ পোয়ারোর মন্তব্যকে বিস্তারিত করলেন তিনি৷
‘সুতরাং হোটেলের মধ্যে দিয়ে না গিয়েও কারও পক্ষে দ্বীপের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত যাওয়া সম্ভব৷’ তিনি আরও যোগ করলেন, ‘কিন্তু সে ক্ষেত্রে কোন জানলা থেকে কারো নজরে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে৷’
‘কোন জানলা?’
‘সবার ব্যবহারের স্নান-ঘরগুলোর দুটোর জানলা ওই দিকে—উত্তর দিকে—এ ছাড়াও আছে কর্মচারীদের স্নান-ঘর, একতলার মালপত্র রাখার ঘর৷ আর সবশেষে রয়েছে বিলিয়ার্ড-ঘর৷
পোয়ারো সম্মতি জানালেন, বললেন, ‘কিন্তু প্রথম জানলাগুলোর লাগানো আছে ঘষা কাঁচ, আর সুন্দর সকালে কেউ কখনও বিলিয়ার্ড খেলে না৷’
‘ঠিক তাই৷’
একটু থামলেন ওয়েস্টন, তারপর বললেন, ‘সুতরাং এ যদি তাঁর কাজ হয়ে থাকে, তাহলে আজ সকালে এই পথ ধরেই তিনি গিয়ছিলেন৷’
‘মানে ক্যাপ্টেন মার্শাল?’
‘হ্যাঁ৷ ব্ল্যাকমেল-এর ব্যাপারটা সত্যি হোক আর নাই হোক, আমার এখনও মনে হচ্ছে, সব কিছু যেন তাঁরই দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে৷ আর তাঁর ব্যবহার—তাঁর ব্যবহার রীতিমতো দুভাগ্যজনক৷’
এরকুল পোয়ারো নীরস কণ্ঠে বললেন, ‘হয়তো কিন্তু শুধুমাত্র ব্যবহারে অজুহাতে কাউকে খুনী সাব্যস্ত করা যায়৷!’
ওয়েস্টন বললেন, ‘তাহলে আপনার ধারণা তিনি নির্দোষ?
পোয়ারো মাথা নাড়লেন, ‘না, সে কথা আমি বলবো না৷’
ওয়েস্টন বললেন, ‘দেখা যাক, ওই টাইপরাইটার-অ্যালিবাই থেকে কলগেট কদ্দূর কি করতে পারে৷ এদিকে হোটেলের যে পরিচারিকা এই অংশের দেখাশোনায় ছিলো সে জবানবন্দি দেবার জন্যে অপেক্ষা করছে৷ তার সাক্ষ্যের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করতে পারে৷’
পরিচারিকাটির বয়েস আনুমানিক তিরিশ৷ চটপটে, কর্মঠ, এবং বুদ্ধিমতী৷ প্রশ্নের জবাবে তার উত্তর পাওয়া গেলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই৷
ক্যাপ্টেন মার্শাল তাঁর ঘরে উঠে পড়েন সাড়ে দশটার সামান্য পরেই৷ সে তখন ঘর ঝাড়পোঁছ করছিলো৷ তিনি তাকে তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করতে বলে চলে যান৷ না, সে তাঁকে ফিরে আসতে দেখেনি বটে কিন্তু একটু পরে তাঁর টাইপরাইটারের শব্দ শুনেছে৷ তখন এগারোটা বাজতে পাঁচ মিনিট মতো৷ সেই সময়ে সে মিঃ এবং মিসেস রেডফার্নের ঘরে কাজ করছিলো৷ ওই ঘরের কাজ শেষ করে সে হাত দেয় মিল ডার্নলির ঘরের বারান্দার একেবারে শেষ দিকের ঘরটা৷ সেখান থেকে টাইপরাইটারের শব্দ তার কানে আসেনি৷ মিস ডার্নলির ঘরে সে ঢোকে, যদ্দুর তার মনে পড়েছে, এগারোটার ঠিক পরেই৷ কারণ ঘরে ঢোকার সময় লেদারকোম্ব গীর্জার এগারোটার ঘণ্টা সে শুনতে পায়ে৷ সওয়া এগারোটা নাগাদ সে নিচে যায় প্রাত্যহিক চা ‘জলখাবার’ খেতে৷ তার পরে হোটেলের অন্য অংশের ঘরগুলো ঝাঁড়পোঁছ করতে বেরিয়ে পড়ে৷ পুলিশ প্রধানের প্রশ্নের সে উত্তরে বললো, এই অংশের ঘরগুলো সে নিম্নোক্ত ক্রমানুসারে পরিষ্কার করেছে :
মিস লিন্ডা মর্শালের ঘর, দুটো সর্বসাধারণের স্নান-ঘর, মিসেস মার্শালের ঘর এবং তাঁর নিজস্ব স্নান-ঘর, মিস ডার্নলির ঘর ও স্নান-ঘর৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল ও মিস মার্শালের ঘরে কোন লাগোয়া স্নান-ঘর ছিলো না৷
যখন সে মিস ডার্নলির ঘর ও স্নান ঘর নিয়ে ব্যস্ত ছিলো তখন দরজার পাশ দিয়ে কারও হেঁটে যাওয়ার অথবা বারান্দায় সিঁড়ি বেয়ে কারও নামার শব্দ সে শোনেনি, অবশ্য চুপিসাড়ে কেউ হেঁটে গেলে সে পায়ের শব্দ তার পক্ষে না শোনাটাই স্বাভাবিক৷
ওয়েস্টন প্রশ্ন এবার প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে মিসেস মার্শালের দিকে মোড় নিলো৷
না, খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা মিসেস মার্শালের অভ্যাস ছিলো না৷
তাই দশটা নাগাদ দরজা খোলা পেয়ে এবং মিসেস মার্শালকে ঘরে না দেখে সে, গ্ল্যাডিস-ন্যারাকট, একটু অবাকই হয়েছিলো৷ ব্যাপারটা রীতিমতো অস্বাভাবিক৷
‘মিসেস মার্শাল কি তাঁর প্রাতরাশ রোজ বিছানাতেই সারতেন?’
‘ওহ্-হ্যাঁ, স্যার, রোজই৷ অবশ্য প্রাতরাশ বলতে সামান্য এক কাপ চা, একটু কমলালেবুর রস, ও এক টুকরো সেঁকা পাউরুটি৷ বেশির ভাগ মেয়েদের মতো রোগা থাকতে চাইতেন কিনা!’
না, মিসেস মার্শালের ব্যবহারে অস্বাভাবিক কিছু তার নজরে পড়েনি৷ বরং রোজকার মতোই স্বাভাবিক ছিলো৷
এরকুল পোয়ারো মৃদু স্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘মিসেস মার্শাল সম্পর্কে তোমার ধারণা কি, মাদমোয়াজেল?’
গ্ল্যাডিস ন্যারাকট নির্বাকভাবে তাঁর দিকে চেয়ে রইলো৷ অবশেষে বললো, ‘তার মতো বড়লোকের কথা কি আমার ছোট মুখে মানায়, আপনিই বলুন স্যার?’
‘হ্যাঁ, মানায়, তুমি নইলে বলবে কে! তোমার নিজস্ব মতামত শুনতে আমরা আগ্রহী—অত্যন্ত আগ্রহী৷’
গ্ল্যাডিস ঈষৎ অস্বস্তিভরা চোখে, তাকালো পুলিশ-প্রধানের দিকে৷ তিনি মুখ সম্মতি ও সহানুভূতি ফুটিয়ে তোলার প্রবল চেষ্টা করলেও মনে মনে তাঁর পরদেশী বন্ধুর বিচিত্র তদন্ত-পদ্ধতিতে অস্বস্তি বোধ করলেন৷ মুখে বললেন, ‘অ্যাঁ—হ্যাঁ, নিশ্চয়ই৷ ভয় কি—বলো৷’
এই প্রথম দ্রুত কর্মদক্ষতা গ্ল্যাডিসের চরিত্রে অনুপস্থিত বলে মনে হলো ছাপা পোশাকের প্রান্ত নিয়ে নাড়াচাড়া করে চললো ওর হাতের আঙুলগুলো৷ ও বললো, ‘মিসেস মার্শাল—ভদ্রমহিলা বলতে যা বোঝায় ঠিক তা ছিলেন না৷ মানে, ওঁকে দেখে কেমন যেন অভিনেত্রী-অভিনেত্রী মনে হতো৷’
কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘তিনি অভিনেত্রী ছিলেন৷’
‘হ্যাঁ, স্যার, আমিও সেই কথাই বলতে চাইছি৷ তিনি মনের ভাব কখনও ব্যবহারে গোপন করার চেষ্টা করতেন না৷ যেমন ভেতরে ভেতরে শান্ত না হয়ে থাকলে তিনি কখনও শান্তভাব দেখবার জন্যে ইয়ে কষ্ট করতেন না৷ এই হয়তো খুশি আছেন, হাসছেন, আবার পরমুহূর্ত হয়তো কিছু খুঁজে না পেলে, বা তাঁর ডাকে সাড়া দিতে দেরি করলে, অথবা কাচা পোশাক-আশাক সময়মতো ফেরত না পেলে, অত্যন্ত খারাপ এবং নোংরা ব্যবহার করতেন৷ আমাদের কেউই তাঁকে ঠিক পছন্দ করতো না৷ কিন্তু তাঁর পোশাকগুলো ছিলো দারুণ চমৎকার, দেখতেও ছিলেন সুন্দরী—সুতরাং সকলেই যে তাঁকে শ্রদ্ধা এবং প্রশংসা করবে এ আর আশ্চর্য কি!’
কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘এবার তোমাকে যে প্রশ্ন করবার জন্যে আমি আন্তরিক দুঃখিত, গ্ল্যাডিস, কিন্তু প্রশ্নটা ভীষণ জরুরী৷ আচ্ছা, মিসেস মার্শাল এবং তাঁর স্বামীর মধ্যে সম্পর্ক কিরকম ছিলো বলতে পারো?’
গ্ল্যাডিস ন্যারাকট মিনিটখানেক ইতস্তত করলো৷
তারপর বলল, ‘আপনারা নিশ্চয়ই—মানে আপনারা কি—আপনারা নিশ্চয়ই তাঁর স্বামীকে সন্দেহ করছেন না?’
এরকুল পোয়ারো প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘তোমার কি মনে হয়?’
‘ওঃ, আমার? আমার তা মনে হয় না৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল এত চমৎকার ভদ্রলোক। এ কাজ তিনি কখনোই করতে পারেন না—কোনমতেই না৷’
কিন্তু তুমি পুরোপুরি নিশ্চিত নও—তোমার কথাতেই বুঝতে পারছি৷’
অনিচ্ছা সত্ত্বেও গ্ল্যাডিস ন্যারাকট বলল, ‘এ রকম ঘটনা কাগজে প্রায়ই বেরোয়৷ সাধারণত যখন ঈর্ষার প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে৷ এ ক্ষেত্রেও সেরকম একটা কানাঘুষো—সকলেই তো প্রায় ওই কথা নিয়ে আলোচনা করছে—মানে, মিসেস মার্শাল আর মিঃ রেডফার্নের ব্যাপারটা নিয়ে। আর মিসেস রেডফার্ন এত শান্ত মহিলা! সত্যিই লজ্জার কথা! অবশ্য মিঃ রেডফার্নও যথেষ্ট ভদ্রলোক, কিন্তু মনে হয়, মিসেস মার্শালের মতো মহিলার কাছে কোন পুরুষই নিজেকে ধরে রাখতে পারে না—বিশেষ করে উনি যখন আবার নিজের খেয়াল-খুশিমতো চলেন৷ এখানে প্রত্যেকে স্ত্রীকেই অনেক না-পসন্দ ব্যাপার সহ্য করতে হতো৷’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একমুহূর্ত থামলো ও, ‘কিন্তু ক্যাপ্টেন মার্শালের কানে যদি ব্যাপারটা উঠে থাকে—’
কর্নেল ওয়েস্টন তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন, ‘তাহলে?’
গ্ল্যাডিস ন্যারাকট ধীর স্বরে বললো, ‘কখনও কখনও আমার মনে হয়েছে মিসেস মার্শাল এসব ঘটনা তাঁর স্বামীর কানে যাবে এই কথা ভেবে ভয় পেতেন৷’
‘তোমার এ ধারণার কারণ?’
‘তেমন কোন জোরালো কারণ নেই, স্যার৷ এমনিই মনে হয়েছিলো যে—কখনও কখনও তিনি যেন তাঁর স্বামীকে—ভয় করতেন৷ তিনি খুব শান্ত মানুষ, কিন্তু—যাকে বলে ঠিক সহজ লোক নন৷’
ওয়েস্টন বললেন, ‘তাহলে এ ধারণার পেছনে স্পষ্ট কোন প্রমাণ তোমার কাছে নেই? ওঁদের কথাবার্তা থেকে সেরকম কোন আঁচ পাওনি?’
গ্ল্যাডিস ন্যারাকট আস্তে আস্তে মাথা নাড়লো৷
ওয়েস্টন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে চললেন, ‘এবার তাহলে মিসেস মার্শালের আজ সকালে পাওয়া চিঠিপত্রের কথায় আসা যাক৷ এ ব্যাপারে তুমি কোন সাহায্য করতে পারো?’
‘প্রায় ছটা কী সাতটা চিঠি ছিলো, স্যার৷ ঠিক মনে নেই৷’
‘তুমি সেগুলো তাঁর কাছে নিয়ে গিয়েছিলে?’
‘হ্যাঁ, স্যার৷ অফিস থেকে চিঠিগুলো নিয়ে রোজকার মতো তাঁর প্রাতরাশের ট্রেতে রেখে দিই৷’
‘চিঠিগুলোর চেহারা একটু-আধটু তোমার মনে আছে?’
মেয়েটি মাথা নাড়লো৷
‘চিঠিগুলো দেখতে ছিলো সাধারণ চিঠিরই মতো৷ মনে হয়, তার মধ্যে কয়েকটা বিল ও ইস্তাহার ছিলো, কারণ পরে সেগুলো ছেঁড়া অবস্থায় ট্রেতে পড়ে থাকতে দেখি৷’
‘কি হলো সেগুলো?’
‘সেগুলো ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছে স্যার৷ পুলিশ অফিসারদের একজনকে দেখে এলাম, ডাস্টবিন ঘেঁটে দেখেছেন৷’
ওয়েস্টন সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন৷
‘বাজে কাগজ-ফেলার ঝুড়ির কাগজগুলো, সেগুলো কোথায় গেলো?’
‘সেগুলো ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছে৷’
ওয়েস্টন বললেন, ‘হুম—আচ্ছা—আপাতত আর কিছু জিগ্যেস করবার নেই৷’ তিনি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে পোয়ারোর দিকে তাকালেন৷
পোয়ারো সামনে ঝুঁকে এলেন৷
‘আজ সকালে মিস লিন্ডা মার্শালের ঘর পরিষ্কার করার সময় তুমি কি ফায়ারপ্লেসে কোন আগুন জ্বালানো হয়নি৷’
‘ফায়ার-প্লেসে কোন কিছু তোমার নজরে পড়েনি?’
‘না, স্যার, ওটা পরিষ্কারই ছিলো৷’
‘কটার সময় তুমি ওঘর পরিষ্কার করেছো?’
‘এই সওয়া ন’টা নাগাদ, স্যার, তখন মিস লিন্ডা প্রাতরাশ সারতে গেছেন!’
‘তিনি কি প্রাতরাশ সেরে ওপরে ফিরে এসেছিলেন, তুমি জানো?’
‘হ্যাঁ, স্যার, এসেছিলেন—প্রায় পৌনে দশটা নাগাদ৷’
‘তারপর কি ঘরেই ছিলেন?’
‘মনে হয় ছিলেন, স্যার৷ কারণ সাড়ে দশটার ঠিক আগে তাঁকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে আসতে দেখি৷’
‘তুমি তাঁর ঘরে আর যাওনি?’
‘না, স্যার৷ প্রথমবারেই কাজ সারা হয়ে গিয়েছিলো৷’
পোয়ারো সম্মতিসূচকভাবে মাথা নাড়লেন৷ বললেন, ‘আরও একটা কথা আমি জানতে চাই৷ আজ সকালে প্রাতরাশের আগে কারা কারা স্নান করেছিলেন?’
‘আমি শুধু এ’তলার অতিথিদের খবর আপনাকে দিতে পারি৷’
হ্যাঁ, শুধু সেইটুকুই আমি জানতে চাইছি৷’
‘তাহলে, স্যার, আমার মনে হয়, কেবল ক্যাপ্টেন মার্শাল এবং মিঃ রেডফার্নই স্নান করেছিলেন৷ এটা ওঁদের রোজকার অভ্যেস৷’
‘তুমি তাঁদের স্নান করতে দেখেছো?’
‘না স্যার, তবে তাঁদের ভিজে স্নানের পোশাক রোজকার মতোই বারান্দার রেলিং-এ ঝুলছিলো৷’
‘মিস লিন্ডা মার্শাল তাহলে আজ সকালে স্নান করেননি?’
‘না স্যার৷ তাঁর সমস্ত স্নানের পোশাকই একেবারে খটখটে শুকনো ছিলো৷’
‘ও—’ বললেন, পোয়ারো, ‘এইটাই আমি জানতে চাইছিলাম৷’
গ্ল্যাডিস ন্যারকট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যোগ করলো, ‘কিন্তু বেশির ভাগ দিনই উনি সকালে স্নান করেন স্যার৷’
‘আর বাকি তিনজন, মিস ডার্নলি মিসেস রেডফার্ন আর মিসেস মার্শাল?’
‘মিসেস মার্শাল কখনও করতেন না স্যার৷ মিস ডার্নলি দু-একবার করেছেন মনে হয়৷ মিসেস রেডফার্ন ও সচরাচর প্রাতরাশের আগে স্নান করেন না। তবে খুব গরম পড়লে করেন, কিন্তু আজ সকালে করেননি৷’
আবারও সমর্থনে মাথা নাড়লেন পোয়ারো৷ তারপর প্রশ্ন করলেন, ‘এ দিকের যেসব ঘর তুমি দেখাশোনা করো, তার কোনটা থেকে কোন শিশি খোয়া গেছে বলে তোমার নজরে পড়েছে?’
‘শিশি, স্যার? কিসের শিশি?
‘দুর্ভাগ্যবশত সেটা আমার জানা নেই৷ কিন্তু তোমার কি নজরে পড়তো—মানে, সাধারণভাবে ব্যাপারটা কি তোমার চোখে পড়তো—যদি কোন শিশি এভাবে হঠাৎ হারিয়ে যেতো?’
গ্ল্যাডিস স্পষ্ট স্বরে জবাব দিলো, ‘মিসেস মার্শালের ঘর থেকে হারালে আমার পক্ষে একেবারেই বলা সম্ভব নয়, স্যার৷ তাঁর ঘরে এত শিশি বোতল থাকে!’
‘আর অন্যান্য ঘর থেকে?’
মিস ডার্নলির ঘরের বেলায়ও ভরসা করে বলতে পারবো না৷ তাঁর ঘরেও একগাদা ক্রীম আর লোশনের শিশি আছে৷ কিন্তু অন্য কোন ঘর থেকে কোন শিশি খোয়া গিয়ে থাকলে তা নিশ্চয়ই আমার নজরে পড়তো, স্যার৷ মানে, যদি সেরকমভাবে খুঁটিয়ে দেখতাম৷ বলতে পারেন, যদি আমাকে তেমনভাবে নজর করে দেখত বলা হতো৷’
‘কিন্তু ব্যাপারটা তোমার চোখে পড়েনি?’
‘না, কারণ, আপনাকে যা বললাম, আমি সেরকমভাবে নজর করে দেখিনি৷’
‘তাহলে এখন বরং যাও, ঘরগুলো একবার ভালো করে দেখে এসো৷’
‘নিশ্চয়ই, স্যার৷’
ছাপা পোশাকের খসখস শব্দ তুলে ও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো৷ ওয়েস্টন তাকালেন পোয়ারোর দিকে৷ বললেন, ‘এসব কি ব্যাপার?’
পোয়ারো মৃদু কণ্ঠে বললেন, ‘আমার সুবিন্যস্ত মন তুচ্ছ কারণেই বড় বিচলিত হয়৷ আজ সকালে প্রাতরাশের আগে, মিস ব্রুস্টার পাথরে ঘাটের কাছাকাছি সমুদ্রে স্নান করেছিলেন; তিনি বলেছেন, ওপর থেকে একটি শিশি নাকি সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলা হয়, এবং খুব অল্পের জন্য সেই শিশির আঘাত থেকে তিনি রক্ষা পান৷ সুতরাং। এবং আমার জানতে ভীষণ ইচ্ছে করছে, কে সেই শিশিটা ছুড়ে ফেলেছিলো, এবং কেন?’
‘কিন্তু মশাই, যে কেউই তো শিশিটা ছুড়ে থাকতে পারে—’
‘না, পারে না৷ প্রথমত, হোটেলের পূর্বদিকের কোন জানলা থেকেই কেবল শিশিটা ওভাবে ছুড়ে ফেলা সম্ভব—অর্থাৎ যে ঘরগুলো আমরা একটু আগেই পরীক্ষা করে দেখলাম, তাদেরই কোন জানলা থেকে৷ এইবার আমি আপনাকে প্রশ্ন করছি, যদি কোন খালি অপ্রয়োজনীয় শিশি আপনার প্রসাধন-টেবিল অথবা স্নান-ঘরে থাকে, তাহলে সেটা নিয়ে আপনি কি করবেন? উত্তরটা আমিই বলছি—সেটাকে আপনি বাজে—কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দেবেন৷ অযথা পরিশ্রম করে বারান্দায় গিয়ে সেটাকে সমুদ্রে ছুড়ে ফেলার মতো কষ্ট স্বীকার নিশ্চয়ই করবেন না৷ কারণ প্রথমত, আপনার ছুড়ে ফেলা শিশিটা আকস্মিকভাবে কাউকে আঘাত করতে পারে, আর দ্বিতীয়ত, সামান্য কারণে শ্রমস্বীকারের পরিণামটা নেহাৎই অসামান্য হয়ে পড়বে৷ সুতরাং, এই অসামান্য শ্রমস্বীকার আপনি তখনই করবেন যখন আপনি চাইবেন, সেই বিশেষ শিশিটা আর কারো নজরে না পড়ুক৷’
ওয়েস্টন স্তব্ধ বিস্ময়ে তাঁর দিকে চেয়ে রইলেন, বললেন, ‘চিফ ইন্সপেক্টর জ্যাপের সঙ্গে কাজের ব্যাপারে কিছুদিন আগে আমার আলাপ হয়েছে৷ শুনেছি, তিনি নাকি প্রায়ই বলে থাকেন আপনার মনের আসধারণ কুটিলতার কোন তুলনা নেই৷ এই মুহূর্তে আপনি নিশ্চয়ই বলে বসবেন না, আর্লেনা মার্শালেকে মোটেই গলা টিপে খুন করা হয়নি, বরং কোন রহস্যময় শিশি থেকে কোন রহস্যময় বিষয় প্রয়োগ তাঁকে খুন করা হয়েছে?’
‘না, না, ওই শিশিতে বিষ ছিলো বলে আমার মনে হয় না৷’
‘তাহলে কি ছিলো?’
‘তা জানি না৷ জানি না বলেই এত কৌতূহলী হয়ে পড়ছি৷’
গ্ল্যাডিস ন্যারাকট ফিরে এলো৷ ঈষৎ রুদ্ধশ্বাসে বললে, ‘আমি দুঃখিত স্যার, কোন কিছু হারিয়েছে বলে খুঁজে পেলাম না৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল, মিস লিন্ডা মার্শাল, মিঃ এবং মিসেস রেডফার্নের ঘর থেকে কোন জিনিস যে খোয়া যায়নি সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই৷ আর মিস ডার্নলির ঘর থেকেও কিছু হারায়নি৷ শুধু মিসেস মার্শালের ঘরটা আমাকে ধাঁধায় ফেলেছে৷ আগেই তো বলেছি, তাঁর ঘরে শিশি-বোতল একগাদা৷’
পোয়ারো কাঁধ ঝাঁকালেন, বললেন, ‘ঠিক আছে৷ এ নিয়ে তোমাকে আর ভাবতে হবে না৷’
গ্ল্যাডিস ন্যারাকট বললো, ‘আমাকে আর কিছু জিগ্যেস করার আছে, স্যার?’
সে উপস্থিত দুজনের দিকে যথাক্রমে তাকালো৷
ওয়েস্টন বললেন, ‘উহুঁ, নেই৷ ধন্যবাদ৷’
পোয়ারো বললেন, ‘ধন্যবাদ আমার তরফ থেকেও, তবে একটা কথা৷ আশাকরি, আমাদের বলা প্রয়োজন এমন কোন কথা—কোন কথা—তুমি বলতে ভুলে যাওনি?’
‘মিসেস মার্শালের সম্বন্ধে, স্যার?’
‘না, যে কোন ব্যাপার সম্পর্কে৷ এমন কোন ঘটনা, যা তোমার কাছে অস্বাভাবিক, অসাধারণ, রহস্যময়, অথবা একটু অদ্ভুত, কিংবা আশ্চর্য বলে মনে হয়েছে—অর্থাৎ, এমন কোন ব্যাপার, যা দেখে তুমি আপনমনেই, অথবা কোন সহকর্মীর কাছে, বলতে বাধ্য হয়েছে, ‘‘ভারী অদ্ভুত তো!’’?’
ব্যঙ্গময় বিচ্ছিন্নতায় শব্দ তিনটি উচ্চারণ করলেন পোয়ারো৷
গ্ল্যাডিস বলল, ‘ব্যাপারটা খুব সামান্য৷ নর্দমা দিয়ে স্নানের জল বয়ে যাওয়ার একটা শব্দ মাত্র৷ আর সত্যিই নিচতলায় এলসিকে আমি তখন বলেছিলাম যে বেলা বারোটায় কারও স্নান করার ব্যাপারটা আমার কাছে অদ্ভুত ঠেকছে৷’
‘কার স্নান-ঘর থেকে জলটা আসছিলো, কে স্নান করছিলো তখন?’
‘সেটা আমি বলতে পারছি না, স্যার৷ নিচের নর্দমা দিয়ে জলটা যাওয়ার শব্দ আমরা শুনতে পেয়েছিলাম, ব্যস, আর তখনই এলসিকে আমি কথাগুলো বলেছিলাম৷’
‘ঠিক জানো, সেটা স্নানের জল? বেসিনে হাত ধোয়া জল নয়?’
‘হ্যাঁ, স্যার, ঠিক জানি৷ স্নানের জল বয়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে কারও ভুল হয় না৷’
পোয়ারো গ্ল্যাডিসের উপস্থিতির অতিরিক্ত কোন ইচ্ছে প্রকাশ না করায় তাকে প্রস্থান করার অনুমতি দেওয়া হলো৷
ওয়েস্টন বললেন, ‘এই স্নানের ব্যাপারটাকে আপনি নিশ্চয়ই তেমন কোন গুরুত্ব দিচ্ছেন না, মঁসিয়ে পোয়ারো? আমার ধারণা, এর সঙ্গে মূল ঘটনার কোন সংযোগ নেই৷ কারণ এ ক্ষেত্রে রক্তের দাগ-টাগ ধুয়ে ফেলার কোন ব্যাপার নেই৷ সেটাই হলো—’ তিনি ইতস্তত করতে লাগলেন৷
পোয়ারো অসমাপ্ত বক্তব্যকে শেষ করলেন, ‘আপনি বলবেন, সেটাই হলে গলা টিপে খুন করার সুবিধে। কোন রক্তপাত নেই, কোন অস্ত্র নেই—কোন কিছু সরিয়ে ফেলা বা লুকোবার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধুমাত্র দৈহিক শক্তির—আর একটা খুনী মন!’
তাঁর কন্ঠস্বরে প্রচণ্ডতায়, জীবন্ত অনুভূতির সংবেদনায়, একটু চমকে উঠলেন ওয়েস্টন।
এরকুল পোয়ারো ঈষৎ অপরাধী মুখে তার দিকে চেয়ে হাসলেন।
‘না,না,’ তিনি বললেন, ‘স্নানের ব্যাপারটার সত্যিই হয়তো কোন গুরুত্ব নেই। স্নান তো যে কেউই করে থাকতে পারেন। টেনিস খেলতে যাওয়ার আগে মিসেস রেডফার্ন, বা ক্যাপ্টেন মার্শাল, অথবা মিস ডার্নলি যে কেউ এতে তেমন কোন সূত্র নেই৷
দরজায় টোকা মেরে জনৈক পুলিশ কনস্টেবল ঘরে উঁকি দিলো৷
‘মিস ডার্নলি, স্যার৷ তিনি আপনাদের সঙ্গে মিনিটখানেকের জন্যে আবার দেখা করতে চান৷ বলছেন কি একটা জরুরি কথা আপনাদের বলতে ভুলে গেছেন৷’
ওয়েস্টন বললেন, ‘আমরা নিচে যাচ্ছি—এখুনি৷’
৩
প্রথম তাঁদের দেখা হলো কলগেটের সঙ্গে৷ তাঁর মুখমণ্ডলে বিষন্নতার ছোঁয়া৷
‘এক মিনিট, স্যার৷’
‘সুতরাং তাঁকে অনুসরণ করে ওয়েস্টন এবং পোয়ারো উপস্থিত হলেন মিসেস ক্যাসল-এর অফিসে৷
কলগেট বললেন, ‘হেল্ড-এর সঙ্গে এতক্ষণ ওই টাইপরাইটারে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করছিলাম৷ কোন সন্দেহ নেই৷ এক ঘণ্টার কমে ওটা টাইপ করা সম্ভব নয়৷ বরং বেশিই লাগবে, যদি চিঠির এখানে-ওখানে থেমে ভাবতে হয়৷ মনে হয়, ব্যাপারটার এখানেই নিষ্পত্তি হয়ে গেলো৷ আর এই চিঠিটা দেখুন৷’
একটা চিঠি এগিয়ে ধরলেন তিনি৷
‘প্রিয় মার্শাল—ছুটির মাঝে বিরক্ত করছি বলে দুঃখিত, কিন্তু বার্লি অ্যান্ড টেন্ডারে চুক্তি নিয়ে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে…’
‘ইতাদি ইত্যাদি’, বললেন, কলগেট, ‘তারিখ ২৪শে—অর্থাৎ গতকালের খামে পোস্ট অফিসের ছাপ গতকাল সন্ধ্যের, ‘ই. সি. ১’-এর এবং আজ সকালের ‘লেদারকোম্ব বে’-র৷ চিঠিতে এবং খামে একই টাইপরাইটার ব্যবহার করা হয়েছে৷ আর চিঠির সারমর্ম দেখে মনে হয় আগে থেকে এর উত্তর তৈরি করে রাখা মার্শালের পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব ছিলো৷ কারণ এ চিঠির কয়েকটা সংখ্যা থেকে মার্শালের চিঠির সংখ্যাগুলো তৈরি—পুরো ব্যাপারটা ভীষণ জটিল৷’
‘হুম—’ ওয়েস্টন ম্রিয়মান স্বরে বললেন, ‘মার্শালকে তাহলে সন্দেহের অওতা থেকে রেহাই দিতে হচ্ছে৷ এগবারে আমাদের অন্য দিকে নজর দিতে হবে৷’ একটু থেমে যোগ করলেন, তিনি, ‘মিস ডার্নলির সঙ্গে একবার দেখা করতে হবে৷ তিনি বাইরে অপেক্ষা করছেন৷’
রোজামণ্ড সাবলীল স্বচ্ছন্দ ভঙ্গীতে ঘরে প্রবেশ করলো৷ ওর ঠোঁটের হাসিতে অপরাধী-চেতনার ঈষৎ ছোঁয়া৷
ও বলল, অত্যন্ত দুঃখিত৷ হয়তো ব্যাপারটা তেমন গুরুত্ব দেবার মতো নয়৷কিন্তু জানেনই তো, মাঝে মাঝে মানুষ কিরকম ভুলোমনা হয়ে পড়ে৷’
‘হ্যাঁ, বলুন, মিস ডানলি?’
একটা চেয়ার দেখিয়ে পুলিশ-প্রধানকে ওকে বসতে ইশারা করলেন৷
রোজমণ্ড ওর সুষম কালো মাথা নাড়লো৷
‘ওহ, ব্যাপারটা খুব সামান্য, বসে বলার মতো নয়৷ কথাটা হলো, আমি আপনাদের বলেছিলাম যে আজ সারাটা সকাল আমি সানি লেজ-এ কাটিয়েছি৷ সেটা পুরোপুরি ঠিক নয়৷ আমি যে একবারের জন্যে হোটেলে গিয়ে আবার ফিরে এসেছিলাম, সেটা বলতে একেবারেই ভুলে গেছি৷’
‘কটার সময়, মিস ডার্নলি?’
‘সওয়া এগারোটা তো হবেই৷’
‘আপনি তাহলে হোটেলে ফিরে গিয়েছিলেন বলছেন?’
‘হ্যাঁ, রোদ-চশমাটা আনতে ভুলে গিয়েছিলাম৷ প্রথমে ভেবেছিলাম না হলেও চলবে, কিন্তু ক্রমশ চোখ ব্যথা করতে লাগলো৷ তাই হোটেলে গিয়ে ওটা নিয়ে আসাই ঠিক করলাম৷’
‘আপনি সোজা নিজের ঘরে গিয়ে ফিরে এসেছিলেন?’
‘হ্যাঁ৷ অবশ্য, সত্যি বলতে কি, যাবার সময় কেনের—ক্যাপ্টেন মার্শালের ঘরে একবার উঁকি মেরেছিলাম৷ ওর টাইপ করার শব্দ শুনতে পেয়ে ভাবলাম, আজকের মতো একটা সুন্দর দিনে ওর ঘরে বসে টাইপ করে বোকার মতো সময়টা নষ্ট করছে ঠিক করলাম, ওকে বেরোতে বলবো৷’
‘তা ক্যাপ্টেন মার্শাল কি বললেন?’
রোজামণ্ড লজ্জা-লজ্জা মুখে হাসলো৷
‘দরজা খুলে দেখলাম, কেন এত গভীর মনোযোগে, ভুরু কুঁচকে দ্রুতহাতে টাইপ করে চলেছে যে ওকে আর বিরক্ত করলাম না, নিঃশব্দে চলে এলাম৷ আমার মনে হয়, ও আমাকে দেখতেও পায়নি৷’
‘আর এটা ঠিক—ক’টার সময় হয়েছে, মিস ডার্নলি?’
‘এগারোটা বেজে প্রায় কুড়ি মিনিট নাগাদ৷ বেরোবার সময় হলঘরে ঘড়িটা আমার নজরে পড়েছিলো৷’
৪
‘অতএব ওই প্রসঙ্গে এবার পূর্ণচ্ছেদ পড়লো৷’ বললেন, ইন্সপেক্টর কলগেট, ‘পরিচারিকা তাঁকে এগারোটা বাজতে পাঁচ মিনিট পর্যন্ত টাইপ করতে শুনেছে৷ মিস ডার্নলি তাঁকে দেখেছেন এগারোটা কুড়িতে, আর মিসেস মার্শাল নিহত হন পৌঁনে বারোটা নাগাদ৷ তিনি বলেছেন, পুরো একটি ঘণ্টা ঘরে বসে টাইপ করে কাটিয়েছেন, আর এখন স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, তিনি সত্যিই ওই সময়টা ঘরে বসে টাইপ করছিলেন৷ সুতরাং ক্যাপ্টেন মার্শাল এখন সব সন্দেহের বাইরে৷’
থামলেন তিনি, কৌতূহলী চোখে তাকালেন পোয়ারো দিকে, প্রশ্ন করলেন, ‘মঁসিকে পোয়ারোকে যেন কোন কারণে চিন্তিত মনে হচ্ছে—’
পোয়ারো চিন্তাচ্ছন্ন জবাব দিলেন, ‘মিস ডার্নলি কেন হঠাৎ এই অতিরিক্ত সাক্ষ্যটুকু যেচে আমাদের উপহার দিলেন, সেটা ভেবেই অবাক হচ্ছি৷’
ইন্সপেক্টর কলগেট তৎপর ভঙ্গীতে ঘাড় কাত করলেন৷
‘ব্যাপারটা কি একটু গোলমেলে ঠেকছে? মানে, নিছক, ‘‘ভুলে যাওয়া’’র ঘটনা এটা নয় বলছেন?’
মিনিট কয়েক কি ভাবলেন তিনি৷ তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘আচ্ছা স্যার, ব্যাপারটাকে তাহলে একটু অন্যভাবে দেখা যাক৷ ধরে নেওয়া যাক, মিস ডার্নলি, তাঁর কথামতো, আজ সকালে সানি লেজ-এ ছিলেন না ; তাঁর গল্পটা সবৈব মিথ্যে৷ এবারে মনে করুন, তাঁর গল্পটা আমাদের শোনাবার পর হঠাৎই তিনি আবিষ্কার করলেন কেউ একজন তাঁকে অন্য কোথাও দেখে ফেলেছে, অথবা কোন একজন তাঁর খোঁজে সানি লেজ-এ গিয়ে সেখানে তাঁকে পায়নি৷ সুতরাং তিনি চট করে একটা নতুন গল্প বানিয়ে ফেললেন এবং সেটা আমাদের কাছে সবিস্তারে বিবৃত করে তাঁর অনুপস্থিতির কৈফিয়ত তৈরি করে রাখলেন আপনি হয়তো খেয়াল করে থাকবেন, তিনি বেশ সতর্কভাবেই বলেছেন, তিনি যখন ক্যাপ্টেন মার্শালের ঘরে উঁকি মারেন, তখন তিনি ওঁকে দেখতে পাননি৷’
পোয়ারো অস্পষ্ট স্বরে বললেন, ‘হুঁ, খেয়াল করেছি৷’
প্রচণ্ড অবিশ্বাসের সুরে বলে উঠলেন ওয়েস্টন, ‘আপনি কি বলতে চান মিস ডার্নলি এর মধ্যে জড়িয়ে আছেন৷ যত্তো সব উদ্ভট চিন্তা৷ এতে তিনি জড়াবেন কোন্ দুঃখে?’
ইন্সপেক্টর কলগেট কাশলেন, বললেন, ‘ওই মার্কিন ভদ্রমহিলা, মিসেস গার্ডেনারের কথাগুলো নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে৷ তিনি মোটামুটি স্পষ্টই ইঙ্গিত করেছিলেন৷ ক্যাপ্টেন মার্শালের ওপর মিস ডার্নলির যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে৷ সেখানেই তো খুনের উদ্দেশ্য পাওয়া যাচ্ছে স্যার৷’
ওয়েস্টন অধৈর্য কণ্ঠে বললেন, ‘আর্লেনা মার্শাল কোন মহিলার হাতে খুন হননি৷ আমাদের খোঁজ করতে হবে কোন পুরুষের৷ সুতরাং এ মামলার পুরুষদের পেছনে আমাদের আঠার মতো লেগে থাকতে হবে৷’
ইন্সপেক্টর কলগেট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনার কথাই ঠিক, স্যার৷ এই একই জায়গায় আমরা বার বার ফিরে আসছি, তাই না?’
পুলিশ-প্রধান বলে চললেন, ‘বরং একজন কনস্টেবলকে দু-একটা বিষয়ের সময় খতিয়ে দেখবার কাজে লাগিয়ে দাও৷ হোটেল থেকে দ্বীপের অপর প্রান্তের মইটা পর্যন্ত তাকে একবার হেঁটে, একবার দৌড়ে যেতে বলো৷ মই দিয়ে ওঠানামার ব্যাপারটাও ওই একইরকমভাবে যাচাই করে দেখবে৷ আর বেলাভূমি থেকে ভেলায় চড়ে পিক্সি কোভে পৌঁছতে কতটা সময় লাগে সেটাও কাউকে দিয়ে খতিয়ে নাও৷’
ইন্সপেক্টর কলগেট সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন৷
‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, স্যার৷’ আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠলো তাঁর কণ্ঠস্বরে৷
পুলিশ-প্রধান বললেন, ‘মনে হয় এবার পিক্সি কোভে আমার একবার যাওয়া দরকার৷ দেখি, ফিলিপস সেখানে কিছু পেলো কিনা৷ তাছাড়া পিক্সি গুহাটাও রয়েছে—যেটার কথা আমরা সকাল থেকে শুনে আসছি৷ দেখা দরকার, কোন পুরুষের অপেক্ষা করার কোন চিহ্ন সেখানে পাওয়া যায় কিনা৷ হুঁ পোয়ারো? আপনি কি বলেন?’
‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই৷ এর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে৷’
ওয়েস্টন বললেন, ‘যদি বাইরে থেকে কেউ এ দ্বীপে এসে থাকে, তাহলে পিক্সি গুহাই হচ্ছে তার লুকোবার পক্ষে চমৎকার জায়গা—অবশ্য গুহার খবরটা যদি তার জানা থাকে৷ আমার তো ধারণা, স্থানীয় লোকেরা হয়তো গুহার খবরটা জানে৷’
কলগেট বললেন, ‘আজকালকার ছেলেমেয়েরা জানে না বলেই আমার মনে হয়৷ কারণ, যেদিন থেকে এই হোটেল খোলা হয় সেদিন থেকেই এই দ্বীপ এবং দ্বীপসংসলগ্ন কোভগুলো ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ জেলেরা অথবা কোন পিকনিক দল কেউই সেখানে যায় না৷ আর হোটেলের লোকদের আপনি স্থানীয় অধিবাসী বলতে পারেন না৷ মিসেস ক্যাসল লন্ডনের লোক৷’
ওয়েস্টন বললেন, ‘রেডফার্নকে আমাদের সঙ্গে নেওয়া যেতে পারে৷ উনিই আমাদের গুহার খবরটা প্রথম দিয়েছিলেন৷ আর, মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনি?’
এরকুল পোয়ারো ইতস্তত করলেন৷ তাঁর উচ্চারণে পরদেশী প্রভাব সুস্পষ্ট হলো, ‘আমি? আমার অবস্থাও মিস ব্রস্টার এবং মিসেস রেডফার্নের মতো—খাড়া মই বেয়ে ওঠানামা আমার সয় না৷’
ওয়েস্টন বললেন, ‘আপনি তাহলে নৌকো করে যেতে পারেন৷’
আবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন এরকুল পোয়ারো, ‘আমার পাকস্থলী সমুদ্রে ঠিক সুস্থ বোধ করে না৷’
‘কি বাজে কথা বলছেন, মশাই৷ সমুদ্র আজ পুকুরের মতো শান্ত৷ এই শেষ সময়ে আমাদের এভাবে ডোবাবেন না৷’
এই ইংরেজি সনির্বন্ধ অনুরোধেও এরকুল পোয়ারোকে বিশেষ বিচলিত বলে মনে হলো না৷ ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় আড়াল থেকে উঁকি মারলো মিসেস ক্যাসল-এর বিশদ কেশবিন্যাস-সমৃদ্ধ সম্ভ্রান্ত মুখমণ্ডল৷
‘আশা করি আপনাদের কথার মাঝখানে নাক গলিয়ে বিরক্ত করছি না,’ তিনি বললেন, ‘কারণ মিঃ লেন, সেই ধর্মযাজক ভদ্রলোক, এইমাত্র ফিরে এসেছেন৷ ভাবলাম, খবরটা হয়েতো আপনারা জানতে চাইবেন৷’
‘ওহ—হ্যাঁ, ধন্যবাদ, মিসেস ক্যাসল৷ আমরা এখুনি তাঁর সঙ্গে দেখা করছি৷’
মিসেস ক্যাসল ঘরের ভেতরে কয়েক পা এগিয়ে এলেন, বললেন, ‘জানি না, এটা বলার কোন দরকার আছে কি না, কিন্তু আমি শুনেছি, যে কোন ছোটখাটো জিনিসকেও এসব ব্যাপারে তুচ্ছ করা ঠিক নয়, তাই—’
হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলুন?’ ওয়েস্টন অধৈর্য কণ্ঠে বললেন৷
‘ব্যাপারটা হচ্ছে, বেলা একটা নাগাদ একজন ভদ্রলোক ও একজন ভদ্রমহিলা এখানে এসেছিলেন৷ এসেছিলেন দ্বীপের ওপার থেকে৷ মধ্যাহ্নভোজ সারতে৷ তাঁদের বলা হয়েছিলো যে এখানে একটা দুঘটনা ঘটেছে, এবং এ অবস্থায় মধ্যাহ্নভোজের কোনরকম ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়৷’
‘তাঁদের পরিচয় কিছু জনেন?’
কি করে বলবো! কোন নাম তাঁরা দেননি৷ দুর্ঘটনার বিবরণ শুনে কিছুটা কৌতূহল প্রকাশ করে, হতাশ হয়ে চলে গেছেন৷ আমি অবশ্য কোন কথাই তাঁদের বলিনি৷ তবে আমার মনে হয়, তাঁরা উঁচুদরের টুরিস্ট—গ্রীষ্মের ছুটিতে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন৷’
ওয়েস্টন ঈষৎ রূঢ় স্বরে বললেন, ‘এই সাহায্যের জন্যে ধন্যবাদ৷ খবরটা তেমন দরকারী না হলেও, সব ঘটনাই—ইয়ে—মানে রাখা ভালো৷’
‘নিশ্চয়ই’, মিসেস ক্যাসল বললেন, ‘আমার কর্তব্য আমাকে পালন করতেই হবে!’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে৷ এবারে মিঃ লেনকে এ ঘরে আসতে বলুন৷’
৫
স্বভাবসিদ্ধ সতেজ পদক্ষেপে ঘরে প্রবেশ করলেন ধর্মযাজক স্টিফেন লেন৷
ওয়েস্টন বললেন, ‘আমি এ অঞ্চলের পুলিশ-প্রধান, মিঃ লেন৷ আশা করি এখানকার দুর্ঘটনার কথা আপনাকে জানানো হয়েছে?’
‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, ফিরে আসতেই ব্যাপারটা কানে এসেছে৷ কি ভয়ানক কি ভয়ানক—’ তাঁর শরীরে হালকা কাঠামো কেঁপে উঠলো৷ নিচু স্বরে তিনি বললেন, ‘সেই প্রথম থেকেই—যেদিন থেকে এখানে এসেছি—অশুভ শক্তির অন্তরঙ্গ উপস্থিতি আমি টের পেয়েছি—স্পষ্ট টের পেয়েছি৷’
তাঁর চোখ, জ্বলন্ত একাগ্র চোখ, ফিরলো এরকুল পোয়ারোর দিকে৷
তিনি বললেন, ‘আপনার মনে আছে, মঁসিয়ে পোয়ারো? আমাদের দিন কয়েক আগেকার আলোচনার কথা? অশুভ শক্তির অস্তিত্ব নিয়ে?’
বিহ্বল দৃষ্টি নিয়ে দীর্ঘকায় কৃশ মানুষটিকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন ওয়েস্টন৷ মানুষটিকে বুঝে ওঠা তাঁর কাছে বেশ কষ্টকর মনে হলো৷ ধর্মযাজক লেনের চোখ ফিরে এলো তাঁর দিকে৷ ঈষৎ হেসে তিনি বললেন, ‘জানি, কথাগুলো হয়তো আপনার কাছে অদ্ভুত ঠেকেছে৷ কারণ বর্তমান যুগে অশুভ শক্তিতে বিশ্বাস আমরা করি না৷ নরকাগ্নিকে আমরা মন থেকে নির্বাসন দিয়েছি? শয়তানে আমরা বিশ্বাস করি না৷ কিন্তু জানবেন, শয়তান এবং তাঁর অনুচরেরা অতীতে যেমন শক্তিমান ছিলো, আজ, এই মুহূর্তে ,তার চেয়ে কিছু কম নেই৷’
ওয়েস্টন বললেন, ‘হ্যাঁ—ইয়ে—হয়তো তাই। সেটা পুরোপুরি আপনার এলাকা, মিঃ লেন। আর আমার এলাকা অনেক নিরস, বাস্তববাদী—একটা খুনের কিনারা করা।’
স্টিফেন লেন বললেন, ‘বড় নিষ্ঠুর শব্দ। খুন! পৃথিবীর প্রাচীনতম পাপ—নির্মমভাবে কোন নিষ্পাপ ভাইয়ের রক্তে হাত রাঙানো …’কয়েক মুহূর্ত নীরব রইলেন তিনি, চোখ অর্ধনিমীলিত। তারপর অপেক্ষাকৃত স্বাভাবিক স্বরে বললেন, ‘বলুন, কিভাবে আপনাদের সাহায্য করতে পারি?’
‘মিঃ লেন, যদি আপত্তি না থাকে, তাহলে প্রথমে বলুন, আজ সারা সকালটা আপনি কিভাবে কাটিয়েছেন। ‘
‘বিন্দুমাত্রও আপত্তি নেই। বরাবরের মতো আজও আমি সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ি পদব্রজে ভ্রমণে। হাঁটতে আমি ভীষণ ভালোবাসি। এখানকার গ্রামাঞ্চলের অনেকটাই আমার পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখা হয়ে গেছে। আজ গিয়েছিলাম “সেন্ট পেট্রক-ইন-দ্য কোম্ব”-এ—এখন থেকে প্রায় মাইল সাতেক দূরে। আঁকাবাঁকা গলি ঘুরে ডেভনের পাহাড় উপত্যকার কোল ঘেঁষে চমৎকার হাঁটা পথ। সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের জন্যে কিছু খাবার নিয়ে গিয়েছিলাম, তাই খেয়েছি। ওখানকার গীর্জটাও দেখে এলাম। সেখানে প্রাচীন কাঁচশিল্পের টুকরো টুকরো কিছু নিদর্শন অবশিষ্ট রয়েছে ; আমাদের দুর্ভাগ্য, যে সম্পূর্ণটা নেই এছাড়া একটা সুন্দর রঙ-করা পর্দাও চোখে পড়লো।’
‘ধন্যবাদ, মিঃ লেন। পথে আপনার সঙ্গে কি কারও দেখা হয়েছে?’
‘দেখা হলেও কথা হয়নি। একটা গরুর গাড়ি চোখে পড়েছে, কতকগুলো ছেলেকে সাইকেল চালিয়ে যেতে দেখেছি, আর দেখেছি কয়েকটা গরু অবশ্য,’ তিনি হাসলেন, আমার বক্তব্যের স্বপক্ষে প্রমাণ যদি চান, তাহলে বলতে পারি, গির্জার খাতায় আমি আমার নামটা লিখে এসেছি। খোঁজ করলে দেখতে পাবেন।’
‘গীর্জায় কারও সঙ্গে আপনি দেখা করেননি—ধর্মযাজক অথবা কোন কর্মচারীর সঙ্গে?’
স্টিফেন লেন মাথা নাড়লেন৷ বললেন, ‘না, সেখানে কেউ ছিলো না; আমিই ছিলাম এক এবং অদ্বিতীয় দর্শক৷ সেন্ট পেট্রক বড় নির্জন জায়গা৷ গ্রামটা গীর্জা ছাড়িয়ে আরও অন্ত আধ মাইল ভেতরে৷’
কর্নেল ওসেস্টন হাসিমুখে বললেন, ‘ভাববেন না যেন আমরা আপনার কথায় ইয়ে মানে সন্দেহ করছি৷ শুধু প্রত্যেকের বক্তব্য যাচা করে দেখা হচ্ছে৷ নেহাতই নিয়মমাফিক কাজ, জানেন তো৷ এ ধরনের ব্যাপারে পুলিশি নিয়মের এতটুকু এদিক ওদিক হবার জো নেই৷’
স্টিফেন লেন শান্তস্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ, জানি৷’
ওয়েস্টন বলে চললেন, ‘এবারে পরের কথায় আসি; আপনি কি এমন কিছু জানেন না যা আমাদের তদন্তের কাজে আসবে? মৃত মহিলা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কোন তথ্য? এমন কোন সূত্র, যা খুনীকে খুঁজে পেতে সাহায্য করবে? এমন কিছু, যা আপনি দেখেছেন অথবা শুনেছেন?’
স্টিফেন লেন বললেন, ‘কোন কিছুই আমার কানে আসেনি৷ আমি আপনাদের মোটের ওপর যেটুকু বলতে পারি তা হলো এই : আর্লেনা মার্শালকে দেখামাত্রই ষষ্ঠেন্দ্রিয়ের সহজাত ক্ষমতায় আমি অনুভব করতে পারি তিনি অশুভশক্তির একটি উৎসবিন্দু৷ তিনি ছিলেন অশুভশক্তির মানবীয় রূপ৷ পুরুষের জীবনে নারীই সবচেয়ে বড় সহায়, বড় প্রেরণা—আবার সেই নারীই তাকে নিয়ে যেতে পারে অবনতির অন্ধকারে গহনে, নিয়ে যেতে পারে পশুর পর্যায়ে৷ আমাদের মৃত মহিলাটি ছিলেন ঠিক সেই প্রকৃতির৷ পুরুষের চরিত্রের সব ক’টি হীন নিচ প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে তুলতে তিনি ছিলেন তুলনাহীন৷ এ ক্ষেত্রে জেজবেল এবং অ্যাহেলিবার কথাই আমার মনে পড়ছে৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিচারের দণ্ড আকস্মিকভাবে নেমে এসেছে তাঁর পাপাচারে সমাপ্তি ঘটাতে তাঁকে স্তব্ধ করতে!’
এরকুল পোয়ারো চঞ্চল হলেন, বললেন, ‘বিচারের দণ্ড তাঁকে স্তব্ধ করেনি—স্তব্ধ করেছে কোন মানুষের হাত! একজোড়া মানুষের হাত তাঁকে শ্বাসরোধ করে খুন করেছে৷’
ধর্মযাজকের হাত কাঁপাতে লাগলো৷ তীব্র অনুভূতিতে বাতাস আঁকড়ে ধরার অগোছালো প্রয়াস পেতে লাগলো তাঁর হাতের দশ আঙুল৷ চাপা অবরুদ্ধ কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন, ‘কি ভয়ঙ্কর—কি ভয়ঙ্কর—আপনার বর্ণনাও বড় নৃশংস—’
এরকুল পোয়ারো শান্ত স্বরে বললেন, ‘কিন্তু এটাই সরল সত্য৷ আপনি বলতে পারেন, মিঃ লেন, সেই অদৃশ্য হাত দুটির মালিক কে?”
ধর্মযাজক মাথা নাড়লেন, বললেন, ‘জানি না—আমি কিছুই জানি না…’
ওয়েস্টন উঠে দাঁড়ালেন, কলগেটের দিকে এক পলক তাকাতেই সংক্ষিপ্ত অনির্ণেয় ভঙ্গীতে মাথা হেলালেন কলগেট, তারপর বললেন, ‘এবারে আমাদের পিক্সি কোভে একবার যাওয়ার দরকার৷’
লেন বললেন, ‘ওখানেই কি ব্যাপারটা ঘটেছে?’
ওয়েস্টন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন৷
লেন বললেন, ‘আ-আমি আপনাদের সঙ্গে গেলে আপত্তি আছে?’
সংক্ষিপ্ত উত্তর লেনকে নিরাশ করতে যাচ্ছিলেন, ওয়েস্টন, পোয়ারোর কথায় বাধা পেলেন৷
‘নিশ্চয়ই যাবেন৷’ উৎসাহের সঙ্গে বললেন, পোয়ারো, ‘আপনি আমার সঙ্গে নৌকোয় চলুন, মিঃ লেন৷ এখুনি আমরা রওনা হবো৷’
