গল্প
উপন্যাস

হাতের মুঠোয় পৃথিবী – ৫

পাঁচ

মরগ্যান এগিয়ে গিয়ে বসল যন্ত্রপাতি রাখার টেবিলে৷

‘তাহলে এই যদি আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়, তবে অসম্পূর্ণ কাজগুলো এবারে সেরে ফেলা যাক৷’ চারজনের মুখের ওপর একে একে চোখ বুলিয়ে নিল মরগ্যান৷

ওরা চারজন কারখানার এখানে সেখানে পড়ে থাকা কয়েকটা প্যাকিং বাক্সের ওপর বসে একমনে শুনতে লাগল মরগ্যানের কথা৷ উৎকণ্ঠাময় নিথর আবহাওয়া আরও জমাট বাঁধল!

‘জিনির ব্যবহারের জন্যে আমাদের আরও একটা গাড়ি দরকার৷’ বলে চলল মরগ্যান, ‘খোলামেলা, টু-সিটার স্পোর্টস-কার হলেই ভালো হয়৷’ এই গাড়িটা জোগাড় করার দায়িত্ব আমি কিটসন ও ব্লেকের ওপরেই ছেড়ে দিলাম৷’ ওদের দিকে ফিরল মরগ্যান, ‘গাড়িটা তোমারা কায়দা করামাত্রই সোজা নিয়ে আসবে এই কারখানায়৷ জিপো গাড়িটার রঙ নম্বর, সব পালটে দেবে—কেউ ধরতেই পারবে না৷ এই গাড়িটাকে আমরা বিপজ্জনক বাঁকের মুখে উলটে দেব৷ ওই বাঁকটার কাছাকাছি রাস্তার ধারে একটা বড়সড় গাড্ডা আছে৷ ফুট দশেক লম্বা দুটো শাবল দিয়ে আমরা গাড়িটাকে ওই গর্তে উলটে দেব৷ তোমার ওপরে শাবল দুটো জোগাড় করার ভার রইল জিপো৷’

‘ঠিক আছে৷… আর ফ্র্যাঙ্ক, ওই রোড-সাইন দুটো আমি তৈরি করে ফেলেছি৷’

‘দেখি, কোথায়?’

জিপো উঠে গিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই রোড-সাইন দুটো নিয়ে এল৷ মরগ্যান দেখে খুশিই হল—সম্মতিসূচক ভাবে মাথা নাড়ল, ‘ভালোই হয়েছে৷ এবার তাহলে পুরো প্ল্যানটা আর একবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক৷ তোমরা কেউ একজন কাগজ পেনসিল নিয়ে লিখতে শুরু করো৷ কারণ কাকে ঠিক কী কী করতে হবে, সে সম্বন্ধে পরে যেন কোনওরকম সংশয় সন্দেহের সৃষ্টি না হয়৷ জিনি, তুমিই লিখতে শুরু করো, কেমন?’

‘আমাকে একটা কাগজে আর পেনসিল দাও আমি লিখে নিচ্ছি৷’

জিপো ওর ঘরের দিকে পা চালাল কাগজ আর পেন্সিল আনতে।

জিপো কারখানার বাইরে যেতেই ব্লেক বলে উঠল, ‘জিপো মনে হয় ভয় পেয়েছে, ফ্র্যাঙ্ক৷ আমার তো ওকে নিয়ে রীতিমতো চিন্তা হচ্ছে৷’

মরগ্যানের মুখে নেমে এল কঠিনতার ছায়া৷

‘জিপোকে নিয়ে আমি চিন্তিত নই৷ ট্রাক দখলে আনার আগে পর্যন্ত ওর সঙ্গে আমরা নরম ব্যবহার করব, কিন্তু তারপরও যদি দেখি ও বেগড়বাঁই করছে, তাহলে ওকে চাপ দিয়ে কাজ আদায় করতে হবে, তাছাড়া উপায় নেই৷ সুতরাং জিপোকে নিয়ে ভয় পাওয়ার মানে হয় না৷’

‘তুমি ঠিকই বলেছ—এইভাবেই ওকে দিয়ে কাজ করাতে হবে৷’

মরগ্যান চোখ ফেরাল কিটসনের দিকে৷

‘এবার বলো, আলেক্স… কীরকম লাগছে তোমার? কীভাবে টাকাটা খরচ করবে সে নিয়ে কিছু ভেবেছ?’

‘এখনও টাকাটা আমার হাতে আসেনি৷’ ধীর স্বরে জবাব দিল কিটসন ‘ওটা হাতে পাওয়ার পর মতলব ভাঁজার ঢের সময় পাওয়া যাবে৷’

মরগ্যান কিছুক্ষণ চিন্তিতভাবে দেখল কিটসনকে, তারপর ফিরল জিনির দিকে, ‘কেমন লাগছে, জিনি?’

জিনির গভীর সবুজ চোখে ভাবলেশহীনতার পরশ, কেন, ‘খারাপ কী?’

এমন সময় একটা প্যাড ও পেনসিল নিয়ে জিপো ফিরে এল৷ ও দুটো সে তুলে দিল জিনির হাতে৷

‘প্ল্যানটার আগাপাস্তালা আমি আবার বলছি৷’ মরগ্যান শুরু করল, ‘কেউ যদি কোনও জায়গায় বুঝতে না পার, সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানাবে, কোনওরকম দ্বিধা করবে না৷ কারণ প্রত্যেকেরই নিখুঁতভাবে জানা দরকার কাকে কী করতে হবে৷ সুতরাং প্রশ্ন করতে ইতস্তত করবে না৷’ মরগ্যান থামল৷ একটা সিগারেট ধরিয়ে আবার বলতে শুরু করল, ‘শুক্রবার সকাল আটটায় আমরা এখানে এসে জমায়েত হচ্ছি৷ কিটসন ও জিনির থাকবে সেইরকম পোশাক, যে পোশাকে নতুন বর-বউ ছুটি কাটাতে যায়৷ বুইকটা চালাবে কিটসন; আর স্পোর্টস কারটা চালাবে জিনি৷ আমরা থাকব বুইকের লাগোয়া এই ক্যারাভ্যানটার ভেতরে—সম্পূর্ণ অদৃশ্য৷ জিনি গাড়ি নিয়ে সোজা যাবে ওয়েলিং এজেন্সির কাছে৷ সেখানে ও ট্রাকটার জন্যে অপেক্ষা করবে৷ এদিকে কিটসন বুইক নিয়ে আর ক্যারাভ্যান নিয়ে সোজা পড়বে সেই কাঁচা সড়কের মুখে৷ সেইখানে একটা রোডসাইন সমেত জিপোকে আমরা নামিয়ে দেব৷’ মরগ্যান হঠাৎ জিনির দিকে আঙুল দেখাল, ‘এইখানে লিখে রাখো, রোড-সাইন দুটো জায়গামতো লাগানোর জন্যে আমাদের দুটো ভারী হাতুড়ি দরকার৷’ মরগ্যান তারপর ফিরল জিপোর দিকে, কাঁচা সড়কের মুখে আমরা তোমাকে নামিয়ে দিচ্ছি৷ সেখানে লুকোবার জন্যে প্রচুর ঝোপঝাড় রয়েছে—সুতরাং তোমার কোনওরকম অসুবিধে হবে না৷ তোমার কাজ হচ্ছে ট্রাকটার জন্যে অপেক্ষা করা৷ যেই ওটা কাঁচা সড়কে ঢুকে পড়বে, অমনি তুমি রোড-সাইনটা রাস্তার মুখে লাগিয়ে দেবে—যাতে অন্য গাড়ি আর সেই রাস্তায় না ঢোকে৷ বুঝতেই পারছ, এইভাবে ট্রাকটাকে আমরা একলা পাচ্ছি৷… আচ্ছা—এবার কাজ হয়ে গেলে তুমি কাঁচা সড়ক ধরে হাঁটতে শুরু করবে; যাতে আসল কাজের সময় তোমাকে আমরা তুলে নিতে পারি—বুঝেছ?’

উত্তেজিতভাবে মাথা ঝাঁকাল জিপো, ‘হ্যাঁ—’

‘এরপর কিটসন গাড়ি থামাচ্ছে বিপজ্জনক বাঁকের কাছে৷ সেখানে এড আর আমি ক্যারাভ্যান থেকে নেমে পড়ব—তারপর আশপাশের ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে আমরা ট্রাকের আসার অপেক্ষায় থাকব৷ কিটসন কিন্তু গাড়ি চালিয়ে আবার পথ চলতে শুরু করবে৷’ কিটসনের দিকে ফিরে মরগ্যান বলে চলল, ‘ক্যারাভ্যানটা কোনও জঙ্গলের ভেতরে লুকিয়ে রেখে তুমি শুধু বুইকটাকে নিয়ে কাঁচা সড়কের অন্য মুখটায় পৌঁছবে৷ সেখানে দ্বিতীয় রোড-সাইনটা লাগিয়ে দিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে আসবে৷ ক্যারভ্যানটা আবার বুইকের পেছনে জুড়ে গাড়িটা ঘুরিয়ে যেদিক থেকে ট্রাকটা আসবার কথা, অর্থাৎ আমাদের দিকে মুখ করে রাখবে৷ তারপর সিগন্যালের জন্যে চুপচাপ অপেক্ষা করবে৷রাস্তা বেশ চওড়া আছে, ক্যারাভ্যানসুদ্ধু গাড়ি ঘোরাতে তোমার কনেও অসুবিধেই হবে না৷ তারপর সিগন্যাল পেলেই তুমি গাড়ি ছুটিয়ে আবার আমাদের কাছে এসে হাজির হবে৷ গাড়িটাকে আগের মতো গোল করে ঘুরিয়ে যেদিক থেকে ট্রাকটা আসবার কথা, অর্থাৎ আমাদের দিকে মুখ করে রাখবে। তারপর সিগন্যালের জন্য চুপচাপ অপেক্ষা করবে। রাস্তা বেশ চড়া আছে, ক্যারাভ্যানসুদ্ধু গাড়ি ঘোড়াতে তোমার কোনও আসুবিধেই হবে না। তারপর সিগনাল পেলেই তুমি গাড়ি ছুটিয়ে আবার আমাদের কাছে এসে হাজির হবে। গাড়িটাকে আগের মতো গোল করে ঘুরিয়ে ক্যারাভানের পেছনটা সামনের দিকে মুখ করে রাখবে। রাস্তার মাটি যথেষ্ট শক্ত, সুতরাং গাড়ি ঘোরানোর সময় ভয়ের কোনও কারণ নেই। তবে একটা কথা—সিগন্যাল শোনার পর তুমি আর ক্যারাভ্যানের পেছনটা সামনের দিকে মুখ করে রাখবে৷ রাস্তার মাটি যথেষ্ট শক্ত, সুতরাং গাড়ি ঘোরানোর সময় ভয়ের কোনও কারণ নেই৷ তবে একটা কথা—সিগন্যাল শোনার পর তুমি আর এক মুহূর্তও দেরি করবে না—বিদ্যুৎগতিতে গাড়ি ছোটাবে৷ এ ব্যাপারে যেন কোনওরকম ভুলচুক না হয়৷’

‘কিন্তু সিগন্যালটা কী, সেটা তো বললে না? কী করে বুঝব কখন গাড়ি ছোটাতে হবে?’ কিটসন প্রশ্ন করল৷

মরগ্যান সিগারেটটা ঠোঁট থেকে নামিয়ে একদৃষ্টে তার জ্বলন্ত প্রান্তটা লক্ষ করতে লাগল৷ চিন্তায় তার ভুরু ঈষৎ কুঞ্চিত হল, ‘হুঁ—আমার মনে হয় রাইফেল বা রিভলভারের শব্দ অতি সহজেই তুমি শুনতে পাবে৷ যদি সে ধরনের গুলি-গোলার ব্যাপার না ঘটে, তবে আমি বাঁশি বাজিয়ে তোমাকে সিগন্যাল পাঠাব৷ বাঁশির একটানা সিগন্যাল শোনামাত্রই তুমি তোমার কাজ শুরু করবে, কেমন?’

কিটসনের মুখ আচমকা গম্ভীর হল, ‘তোমার কী ধারণা যে রিভলভার বা রাইফেল ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে?’

মরগ্যান কাঁধ ঝাঁকাল, ‘কী জানি! আগে থাকতে কিছুই বলা সম্ভব নয়; তবে আমার ধারণা, সেরকম ঘটনা ঘটলেও ঘটতে পারে৷’

ব্লেকের দিকে একপলক দেখে আবার কিটসনকে লক্ষ করে বলল সে, ‘সে যাই হোক, মোট কথা—বাঁশির শব্দ শুনলেই তুমি চলে আসবে৷’ জিপোর দিকে ফিরে তাকল মরগ্যান, ‘তোমার কাজটা খুবই সহজ মনে হচ্ছে, তাই না? কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখবে, তোমার শেষের কাজটুকু হয়ে দাঁড়াবে সবচেয়ে কঠিন—কথাটা মনে রেখো৷’

জিপো অস্বস্তিভরে ঘাড় নাড়ল৷ তবে কোনওরকম মারপিটের মধ্যে তাকে জড়াতে হবে না দেখে সে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল৷ তাছাড়া এটা তো নিতান্তই স্বাভাবিক, সে যখন মরগ্যানের প্রধান কারিগর, তখন যন্ত্রপাতির কাজ ছেড়ে সে কেন যাবে সাধারণ হাতাহাতির মধ্যে! তার কাজ হচ্ছে ট্রাকের তালা খোলা, ব্যাস!

কিটসনকে লক্ষ্য করে প্রশ্ন করল মরগ্যান, ‘তোমাকে কী করতে হবে এখন বুঝতে পারছ?’

‘হ্যাঁ!’

নিজেকে খুনের দায়ে-জড়ানোর ভয় থেকে বাঁচাতে পেরে কিটসন আশ্বস্ত হল৷

‘এবার তাহলে জিনির কথায় আসা যাক৷’ মরগ্যান ঘুরে তাকাল জিনির দিকে৷ ও অভিব্যক্তিহীন মুখে একমনে তার কথা শুনছিল, ভুরু উঁচিয়ে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে ও তাকাল মরগ্যানের দিকে৷ ট্রাকটা বেরিয়ে আসা পর্যন্ত তুমি গাড়ি নিয়ে এজেন্সির দরজার কাছে অপেক্ষা করবে৷ ‘ট্রাকটা রাস্তায় নেমে চলতে শুরু করলেই তুমি ওটাকে সাবধানে ফলো করবে৷ ড্রাইভার যেন কোনওমতেই তোমাকে দেখতে না পায়, সেদিকে লক্ষ রাখবে৷ ট্রাকটা যখন মাঝারি রাস্তায় পড়বে, তখন তুমি হাজির হবে ওটার ঠিক পেছনে৷ ঘন-ঘন হর্ন বাজাতে শুরু করবে৷ তোমাকে যাবার রাস্তা দেবার জন্যে ট্রাকটা তখন একপাশে সরে যাবে৷ এরপর তোমাকে ড্রাইভারে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবেঃ অর্থাৎ ট্রাক ড্রাইভার যেন তোমাকে মনে রাখে৷ অতএব যখন ট্রাকের পাশ কাটাবে, তখন খুব জোরে হর্ন বাজাবে, চাই কী ড্রাইভারের দিকে মুখ ফিরিয়ে দু-চার বার হাতও নাড়বে; তারপর তীরবেগে গাড়ি ছুটিয়ে দেবে৷ আমি চাই, ওই ড্রাইভার যেন মনে করে তোমার ভীষণ তাড়া রয়েছে৷ তুমি যদি ঠিকমতো ট্রাকের পাশ কাটাতে পার, তবে সামনে তখনও মাইলখানেক সোজা রাস্তা পাবে৷ যে গাড়িটা তোমাকে এনে দেব, সেটা ঘণ্টায় কম করে একশো মাইল দৌড়বে—সুতরাং তুমি যত জোরে পার গাড়ি ছুটিয়ে যাবে৷ যাতে টমাস এবং ডার্কসন পরস্পরের মধ্যে বলাবলি করে, ‘‘মেয়েটা একটা দুর্ঘটনা না করে বসে!’’ আশা করি আমার মতলবটা তুমি ধরতে পেরেছ?’

জিনি সম্মতি জানাল৷

‘কাঁচা সড়কের কাছে বাঁক ঘুরতেই ওরা আর তোমাকে দেখতে পাবে না৷ কিন্তু তাই বলে তুমি গাড়ির গতি কমাবে না৷ দুর্ঘটনার কোনও ভয় নেই৷ কারণ মুখোমুখি আসা কোনও গাড়ির দেখা তুমি পাবে না৷ অর্থাৎ কিটসন ততক্ষণে কাঁচা সড়কের অন্য প্রান্তে ‘প্রবেশ নিষেধ’ রোড-সাইন লাগিয়ে দিয়েছে৷ কিন্তু তবুও তুমি সাবধান থাকবে, যাতে কোনও বিপদ না হয়৷ আমরা শাবল নিয়ে তোমার জন্যে বিপজ্জনক বাঁকের মুখেই অপেক্ষা করব৷ এড আর আমি গাড়িটাকে উলটে ফেলে দেব রাস্তার ধারের গর্তে৷ ট্রাকটা এসে পৌঁছবার আগে দৃশ্যসজ্জার জন্যে আমরা মোটামুটি মিনিট পনেরো সময় পাব৷ অবশ্য সেটা নির্ভর করছে, কত জোরে তুমি গাড়ি চালাতে পারবে তার ওপর৷ দুর্ঘটনার দৃশ্যটাকে বিশ্বাসযোগ্য এবং বাস্তব করে তোলার জন্যে তোমার গাড়িতে আমরা আগুন ধরিয়ে দেব৷ পেট্রল-ট্যাঙ্কে ডোবানোর জন্যে একটা লম্বা, ছেঁড়া কাপড় আমাদের দরকার পড়বে—আগুন ধরানোর জন্যে ওটাকেই পলতে হিসেবে ব্যবহার করা হবে৷ কাগজে কাপড়ের টুকরোটার কথা লিখে নাও—পরে ভুলে না যাই৷’ মরগ্যান চোখ ফেরাল কিটসনের দিকে, ‘তুমি যাবে ডুকাসের একটা মাংসের দোকানে৷ সেখান থেকে বোতল দুয়েক শুয়োরের রক্ত নিয়ে আসবে৷ রক্ত কেনার কারণ হিসেবে বলে দিও তোমার বাগানের কাজে লাগবে৷ জিনি, তুমি সঙ্গে করে একপ্রস্থ পোশাক নিয়ে যেও৷ কারণ তোমার পরনের পোশাক রক্তে একেবারে ভর্তি করে দেওয়া হবে৷ আমরা চাই ট্রাক থামিয়ে টমাল ও ডার্কসন মনে করুক তুমি অতিরিক্ত রক্তপাতের ফলে অজ্ঞান হয়ে পড়েছ৷ তোমাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলে ওরা ট্রাক ছেড়ে নামতে আর দেরি করবে না৷’ একটু হেসে প্রশ্ন করল মরগ্যান, ‘কোনও প্রশ্ন আছে৷’

জিনি মাথা নাড়ল, ‘না৷ এখনও পর্যন্ত সবই ঠিক আছে৷’

‘আচ্ছা, তাহলে রক্ত-সমুদ্রের মাঝে অচেতন হয়ে তুমি পড়ে রয়েছ—গাড়িটা রাস্তার ধারে দাউ দাউ করে জ্বলছে৷ এড আর আমি ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে—এডের হাতে অটোমেটিক রাইফেল৷ ট্রাকটা এসে এই দুর্ঘটনার দৃশ্য দেখে থামল৷’ মরগ্যান সিগারেটটা টেবিলে ঘষে নিভিয়ে ফেলল, ‘এইখানে আমাদের কিছুটা আন্দাজের ওপর চলতে হবে৷ আর এর পরের কাজগুলো অবস্থা বুঝে করতে হবে৷ কারণ জিনিকে পড়ে থাকতে দেখে টমাস ও ডার্কসন ঠিক কী করবে বলা মুশকিল৷ তবে একটা ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে জিনির ওপর দিয়ে ওরা ট্রাক চালিয়ে যাবে না; সুতরাং ওরা থামবে৷ তারপর হয়তো দুজনেই নেমে পড়বে ট্রাক থেকে—অবস্থাটা ভালো করে বুঝতে চাইবে৷ অবশ্য আমার তা মনে হয় না৷ আমার ধারণা প্রহরীটা এগিয়ে যাবে জিনির দিকে, আর ড্রাইভার ট্রাকেই বসে থাকবে৷তাহলে ডার্কসন যেই জিনির ফুট খানেকের মধ্যে পৌঁছে যাবে, অমনি ট্রাকের পেছন দিক থেকে আমি এগিয়ে আসব৷ এড তখন তার লুকোবার জায়গা থেকে ডার্কসনকে লক্ষ করে রাইফেল তাক করে রাখবে৷ ডার্কসন যেই জিনির ওপর ঝুঁকে পড়বে, আমি সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে হাজির হব ট্রাকের জানলার কাছে—ড্রাইভারের মুখে রিভলভার ঠেসে ধরব৷ এবং একই সঙ্গে ডার্কসনের পেটে বন্দুক চেপে ধরবে জিনি৷’

ওরা চারজন একাগ্র দৃষ্টিতে চেয়ে রইল মরগ্যানের দিকে৷

‘এরপর ঠিক কী ঘটবে, সে সম্বন্ধে আমার ধারণাও তোমাদেরই মতো৷’ মরগ্যান বলে চলল, ‘হয় টমাস ও ডার্কসন আত্মসমর্পণ করবে, নয় তো গোলমাল বাধাতে চাইবে৷ সুতরাং আমাদের সব রকম পরিস্থিতির জন্যেই তৈরি থাকতে হবে৷ ডার্কসনের কোনওরকম বেচাল দেখলেই এড ওকে গুলি করবে৷ টমাসের ক্ষেত্রে আমাকেও ওই একই পথ নিতে হবে৷ মানে, পুরো ব্যাপারটাই একটা চান্সের ওপর নির্ভর করছে৷ আমরা আগে থাকতে কোনওরকম ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি না৷ তবে যাই ঘটুক না কেন, টমাসকে আমি বোতাম টেপবার সময় দিচ্ছি না৷ তোমরা প্রত্যেকে যদি মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করতে পার তবে বিপদের কোনও কারণ নেই৷’ মরগ্যান তাকাল ব্লেকের দিকে, ‘যদি একান্তই তোমাকে রাইফেল ব্যবহার করতে হয়, তবে লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার কোনও আশঙ্কা নেই৷ কারণ ডার্কসন খুব বেশি হলে তোমার থেকে মাত্র বিশ ফুট দূরে থাকবে; আর তোমার হাতে থাকবে অটোমেটিক রাইফেল—তা দিয়ে একশো গজ দূরের একটা মানুষকেও মেরে ফেলা যায়৷ তবু মনে রাখবে, রাইফেল যেন একবারের বেশি ব্যবহার করতে না হয়: স্থির এবং নিশ্চিত লক্ষ্যে গুলি করবে৷’

‘সে বিষয়ে আমার কোনও ভুল হবে না৷’ মরগ্যানের দৃষ্টির মুখোমুখি তাকাতে পারল না ব্লেক৷

‘আচ্ছা, তাহলে টমাস, ডার্কসনকে কুপোকাত করে আমি বাঁশিতে ফুঁ দেব৷ তুমি আমাদের থেকে শ’পাঁচেক গজ দূরে থাকবে৷’ কিটসনের দিকে ফিরে বলল মরগ্যান, ‘বাঁশির শব্দের জন্যে একমনে কান পেতে অপেক্ষা করবে৷ সিগন্যাল শোনামাত্রই ঝড়ের গতিতে গাড়ি নিয়ে ছুটে আসবে৷’

কিটসন ঘাড় নাড়ল৷ ইতিমধ্যেই সে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে, তার ভাঙা নাকের জন্যে দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ পরিষ্কার কানে আসছে৷

‘এরপর আমাদের খুব তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে৷ কিটসন গাড়ি ঘুরিয়ে ক্যারাভ্যানটাকে ট্রাকের সামনের দিকে মুখ করে রাখবে৷ আমি ট্রাকটা চালিয়ে ঢালু পাটাতন বেয়ে ক্যারাভ্যান ঢুকিয়ে দেব৷ জিনি, তুমি ওই সময়ের মধ্যে তোমার পোশাক চটপট পালটে নেবে৷ এড শাবল দুটো এবং রাইফেলটা নিয়ে ক্যারাভ্যানে ঢুকিয়ে রাখবে, তারপর ট্রাকে আমার পাশে এসে বসবে৷ আর জিনি ও কিটসন বসবে বুইকে পাশাপাশি৷ কিটসন আবার গাড়ি ঘুরিয়ে যেদিক থেকে ট্রাকটা এসেছে সেদিকে ছুটবে৷ জিপো ততক্ষণে রাস্তার ধারে আমাদের দিকে হেঁটে আসছে৷ অতএব খুব সহজেই আমরা ওকে ক্যারাভ্যান খুলে ট্রাকের ভেতরে তুলে নেব৷ তাহলে কিটসন আর জিনি রইল বুইকে, আর আমরা তিনজন রইলাম ক্যারাভ্যানের ভেতরে দাঁড়ানো ট্রাকের মধ্যে সম্পূর্ণ আড়ালে৷ এবার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা বড় রাস্তার দিকে ছুটব৷ অবশ্য তার মানে এই নয় যে কিটসনকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হবে৷ ভাগ্য সহায় থাকলে আমরা মিনিট পনেরোর মধ্যে বড় রাস্তায় গিয়ে পড়ব৷ ওই সময়ের মধ্যে এজেন্সি জানতে পারবে তাদের ট্রাক মাঝ রাস্তায় গায়েব হয়ে গেছে৷ হয়তো প্রথমে ওরা ভাববে ট্রান্সমিটার কোনও অজানা কারণে খারাপ হয়ে গেছে; তাই হয়তো খোঁজ করবে রিসার্চ স্টেশনে৷ আমার ধারণা, এই ট্রাক উধাও হওয়ার ব্যাপার নিয়ে হট্টগোল বাধাতে সময় লাগবে মোটামুটি আধ ঘণ্টা৷ বড় রাস্তায় পড়ে কিটসন তিরিশ মাইলের বেশি জোরে গাড়ি ছোটাবে না৷ আর ওই সময়ে রাস্তায় গাড়ি-টাড়ির ভিড়ও থাকবে প্রচুর, সুতরাং এই ক্যারাভ্যানটার কথা কারও মনে আসবে না—বিশেষ করে যখন লোকে দেখবে নববিবাহিত স্বামী-স্ত্রী ছুটি কাটাতে চলেছে৷ এ পর্যন্ত কারও কোনও প্রশ্ন আছে?’

‘কিন্তু ড্রাইভার আর রক্ষীর কী হবে? ওদের কি আমরা ওই বাঁকের কাছেই রেখে আসব?’ হাতে হাত ঘষে প্রশ্ন করল কিটসন৷

বিব্রতভাবে মাথার চুলে হাত দিল মরগ্যান, ‘ও নিয়ে শুধু শুধু তোমাকে ব্যস্ত হতে হবে না৷ এড আর আমি ওদের উপযুক্ত ব্যবস্থা করব৷’

কিটসন ঘামতে শুরু করল৷ টমাস ও ডার্কসনকে নৃশংসভাবে খুন করা হবে, সে বিষয়ে তার মনে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ রইল না৷

‘কিন্তু ওরা তো ক্যারাভ্যানটাকে দেখবে৷ এমন কী আমাদের চেহারার বর্ণনাও দেবে পুলিশের কাছে—বলবে ট্রাকটা আমরা ক্যারাভ্যানে লুকিযে রেখেছি৷’ ভাঙা গলায় বলে উঠল কিটসন৷ কারণ টমাস ও ডার্কসনের ব্যবস্থার ব্যাপারটা সে খোলাখুলি মরগ্যানের মুখ থেকে শুনতে চায়৷

বিরক্ত হয়ে জবাব দিল মরগ্যান, ‘সেটা যাতে না হয় সেদিকে আমাদের নজর রাখতে হবে, তাই না? অতএব তুমি নিশ্চিন্তে থাকো৷ আমি আর এড ওদিকে খেয়াল রাখব, হয়েছে?’

কিটসন তাকাল জিনির দিকে৷ ওর নির্বিকার মুখভাব তার মনের আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে তুলল৷ তার মনে নিঃশব্দ চিৎকারে কে যেন বলে উঠল, ‘সাবধান আলেক্স, ভালো চাও তো এখনও এসব ছেড়ে চলে এসো! কিটসন বুঝল, এই ট্রাক লুটের চুড়ান্ত পরিণতি মৃত্যু৷ এর শেষ অধ্যায় রক্তিম অধ্যায়৷ একজন অন্ধও এটা স্পষ্ট বুঝতে পারবে৷ কারণ টমাস ও ডার্কসনকে জীবিত অবস্থায় ছেড়ে আসার সাহস তাদের নেই৷…হঠাৎ কিটসনের চমক ভাঙল মরগ্যানের কণ্ঠস্বরে৷’

মরগ্যান তখন বলছে, ‘তোমাদের যদি কোনও প্রশ্ন না থাকে, তাহলে আমি আবার শুরু করছি৷’

জিপো কাঁপা স্বরে বাধা দিল তাকে, ‘দাঁড়াও ফ্র্যাঙ্ক৷ ব্যাপারটা যেন আমার কাছে কেমন কেমন ঠেকছে৷ আমি তোমার কাছে সোজাসুজি জানতে চাই টমাস, ডার্কসনের কী ব্যবস্থা করবে তোমরা? কী করে তোমরা নিশ্চিত হবে যে ওরা পুলিশের কাছে মুখ খুলবে না?’

মরগ্যানের চোখে নেমে এল আকস্মিক বিবর্ণ ছায়া, চোয়ালের রেখা হল কঠিন৷

‘তোমাকে কি জিনিসটা ছবি এঁকে বুঝিয়ে দিকে হবে? দাঁতে দাঁত খিঁচিয়ে বলে উঠল সে, ‘কী করে লোকের মুখ বন্ধ করতে হয় তা তুমি জানো না, ন্যাকা—? শোনো জিপো, তুমি আর আলেক্স সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছেয় এ কাজের সপক্ষে ভোট দিয়েছ৷ তার আগে আমি তোমাদের বার বারই সাবধান করে দিয়েছিলাম—বলেছিলাম এ কাজে প্রচণ্ড ঝুঁকি আছে৷ চাই কি গরম চেয়ার পর্যন্তও ব্যাপার গড়াতে পারে৷ অনেক ভেবেচিন্তেই তোমরা এ কাজে সম্মত হয়ে আমার পক্ষে ভোট দিয়েছিলে৷ অতএব কী পন্থায় টমাস বা ডার্কসনের মুখ বন্ধ করর, সে নিয়ে এখন আর ন্যাকামি কোরো না! তুমিও যেমন জানো, তেমনি আমিও জানি কিভাবে মানুষের মুখ বন্ধ রাখতে হয়৷ কিন্তু তোমাকে আমি সে কাজের দায়িত্ব দিচ্ছি না? বরং আমি আর এড যেচে সে ঝুঁকি নিচ্ছি৷ সুতরাং তুমি যদি এখন দলছুট হবার মতলবে থাক, তো ভীষণ ভুল করবে! আমরা সবাই একসঙ্গে জলে নেমেছি, ডুবলে সবাই একসঙ্গে ডুবব৷ তোমার আর কিটসনের হঠাৎ ধম্মোভাব জেগেছে বলে কাজ ভেস্তে দেবে, অত বোকা আমি নই৷ বুঝেছো?’

জিপো বার কয়েক ঢোক গিলল৷ মরগ্যানের কালো চোখে ভেসে ওঠা নৃশংতার পরশ তার শিরদাঁড়া যেন বরফে ডুবিয়ে দিয়েছে৷ সেই মুহূর্তে হঠাৎই তার মনে হল, দ্বিতীয়বার কোনওরকম প্রতিবাদ করলে মরগ্যান তাকে কুকুরের মতো গুলি করে মেরে ফেলতে এতটুকু দ্বিধা করবে না৷

‘ঠিক আছে, তুমি যা বলবে তাই হবে, ফ্র্যাঙ্ক৷’ মৃদুস্বরে উত্তর দিল জিপো৷

‘আলবাত তাই হবে!’ মরগ্যান এক ঝটকায় ঘুরে তাকাল কিটসনের দিকে—স্থির চোখে চেয়ে রইল, ‘তুমি কী বলো?’

কিটসন মরগ্যানকে ততটা ভয় না করলেও জিনিকে আরও বেশি ভয় করে৷ কারণ সে জানে, এই চরম মুহূর্তে পরাজয় স্বীকার করলে সে জিনির কাছে হয়ে দাঁড়াবে উপহাস্যাস্পদ! তাছাড়া একটা মেয়ের কাছে সাহসের পরীক্ষায় কিছুতেই সে হার স্বীকার করতে পারবে না৷

‘আমি একটা প্রশ্ন করেছি তার জন্যেও কি আবার জবাবদিহি করতে হবে নাকি?’ মরগ্যানের চোখে চোখ রেখে উত্তর দিল কিটসন৷

‘আশা করি তোমার প্রশ্নের উত্তর তুমি পেয়ে গেছ?’ শান্ত স্বরে বলল সে, ‘যদি আর সময় নষ্ট করতে না চাও, তাহলে আমি বলতে শুরু করি?’

‘বলো৷’ কিটসনের মুখ উত্তেজনায় লাল হয়ে উঠেছে৷

‘বড় রাস্তায় পড়ে আমরা সোজা ছুটব ফন হ্রদের দিকে৷ কারণ, সেখানে একটা ক্যারাভ্যানের ঘাঁটি রয়েছে; আমরা সেখানেই রাখব আমাদের ক্যারাভ্যানটা৷ দুশো ক্যারাভ্যানের মধ্যে ওটাকে খুঁজে বার করা পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয়—সন্দেহ করা তো দূরের কথা! দুপুরের মধ্যেই আমরা ফন হ্রদে পৌঁছে যাব৷ সেখানে হ্রদের চারদিকে অসংখ্য ছোট ছোট ঘর রয়েছে—কিটসন সেরকম একটা ঘর ভাড়া করবে৷’ মরগ্যানের কর্কশ স্বরে চাপা ক্রোধের আভাস এখনও উপস্থিত৷ সে দেখল কিটসনকে, ‘ভাড়া নেওয়া ঘরটার কাছে তুমি ক্যারাভ্যানটা রাখবে৷ এবং তুমি আর জিনি নতুন বিয়ে করা বর-বউ-এর অভিনয় করবে৷ সাঁতার কাটাবে, মাছ ধরবে, ঘুরে বেড়াবে অর্থাৎ চুটিয়ে আনন্দ করবে৷ অন্যান্য লোকেরা যেন বুঝতে পারে তুমি হানিমুন কাটাতে এখানে এসেছ এবং তোমার নিজেদের মধ্যেই সারাক্ষণ থাকতে চাও৷ তুমি যখন এই ধরনের পরিবেশ তৈরি করছ, তখন আমি, জিপো আর এড ট্রাকটাকে নিয়ে পড়ব—’

‘আশ্চর্য ফ্র্যাঙ্ক৷’ উত্তেজিত স্বরে ব্লেক চেঁচিয়ে উঠল, ‘কিটসন শালা দেখছি দিব্যি আরামের কাজ নিয়েছে৷ খালি ফুঁর্তি আর ফুঁর্তি!’

কিটসন আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল৷ উত্তেজিত রক্তিম মুখে সে হাত মুঠো করে এগিয়ে এল—রাগে চোখজোড়ার যেন আগুন জ্বলছে৷

‘থামো৷’ রুক্ষস্বরে খেঁকিয়ে উঠল মরগ্যান৷ কিটসন থমকে দাঁড়াল মরগ্যানের রুষ্ট আদেশে৷’ ‘শোনো এড, তোমাকে আবারও বলছি, আমরা এই কাজটা দল বেঁধে করছি৷ কিটসনের কাজ গাড়ি চালানো আর একটু অভিনয় করা—এ দুটো সে আমাদের চেয়ে ভালোই পারে৷ অতএব তুমি কথায় কথায় ওকে নিয়ে ঠাট্টা, রসিকতা করা ছাড়ো! নয়তো শেষে আমরাও বিপদে পড়ব৷ তোমাদের নিজেদের মধ্যে এই খেয়োখেয়ি দেখতে দেখতে আমার ঘেন্না ধরে গেল৷ এক জিনিই যা চুপচাপ থাকে৷ যদি আমাদের সত্যিই এ কাজটা মতলব মাফিক হাসিল করতে হয়, তাহলে এই ছেলেমানুষিগুলো পকেটে পুরে রাখো৷ এ কথা আমি আর দ্বিতীয়বার উচ্চারণ করব না—সেটা বুঝে চুপচাপ থেকো!”

ব্লেক কাঁধ ঝাঁকাল, ‘আচ্ছা, আচ্ছা—ঠিক আছে৷ ওঃ, একটা সামান্য মন্তব্য করলেও দেখছি বিপদ!’

মরগ্যান একচোখে তাকিয়ে রইল ব্লেকের দিকে—ব্লেক চোখ সরিয়ে নিল একসময়৷ তখন সে আবার বলতে শুরু করল, ক্যারাভ্যান ফন হ্রদে গিয়ে থামামাত্রই জিপো ওর কাজ শুরু করবে৷ অবশ্য ক্যারাভ্যানের ভেতর ওই অল্প জায়গায় আর ভ্যাপসা গরমে ট্রাকের তালা খোলার কাজটা নেহাত সহজ হবে না, কিন্তু আমরা নিরুপায় জিপো, ওটুকু কষ্ট তোমাকে করতেই হবে৷ আমি আর এড থাকব ট্রাকের ভেতরে—তোমারই সুবিধের জন্যে৷ যদি কোনও সাহায্যের দরকার হয় তাহলে ডাকামাত্রই আমরা হাজির হব৷ আমাদের তিনজনকে একটু বেশিই কষ্ট সহ্য করতে হবে কারণ অন্ধকার নেমে আসার আগে আমরা ক্যারাভ্যান ছেড়ে বেরোতে পারছি না৷ রাত হলেই আমরা ক্যারাভ্যান ছেড়ে ঘরে গিয়ে ঢুকব, আবার সকাল হওয়ামাত্রই সকলের অলক্ষ্যে আবার ক্যারাভ্যানে ফিরে আসব৷ কেউ যাতে আমাদের দেখতে না পায়, সেদিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে৷ জিপো যদি মনে করে তালা খোলার কাজ খুব অল্প সময়ে হবে না, তাহলে আমাদের হয়তো ফন হ্রদ ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে হবে—সম্ভবত পাহাড়ি অঞ্চলের দিকে৷ কিন্তু সেটা এড়াতে পারলেই আমি খুশি হব৷ কারণ পাহাড়ি রাস্তায় বুইকের পক্ষে বোধ হয় ক্যারাভ্যানটাকে টেনে তোলা সম্ভব হবে না…তার ওপর গাড়ি যদি বিগড়ে যায়, তাহলেই তো চিত্তিরি!’ মরগ্যান তাকাল জিপোর দিকে, ‘কোনও প্রশ্ন আছে?’

‘তাহলে তুমি বলতে চাও ট্রাকের ভেতর বসেই ক্যারাভ্যানের ওপর কাজ চালাতে হবে?’ জিপো প্রশ্ন করল, ‘তাহলে তো অ্যাসিটিলিন টর্চ ব্যবহার করা মুশকিল হয়ে পড়বে৷ প্রথমত ক্যারাভ্যানের পরদার ভেতর দিয়ে কেউ সেই আগুন দেখে ফেলতে পারে৷ আর দ্বিতীয়ত, ক্যারাভ্যানে আগুন লেগে যাওয়ার চান্সও যথেষ্ট!’

‘হয়তো তোমাকে এই অ্যাসিটিলিন টর্চ ব্যবহার করতে নাও হতে পারে৷ সময় নির্ভর তালাটা যে ওই সময়ের মধ্যে খুলে যাবে না, তাই বা কে বলতে পারে? অথবা কম্বিনেশনের নম্বরটাও হয়তো অতি সহজেই তুমি বের করে ফেললে, তখন?’

জিপোর মুখমণ্ডল থেকে যেন অস্বস্তির কালো ছায়াটা মিলিয়ে গেল৷ মরগ্যানের কথার সমর্থনে সে ঘাড় নাড়ল৷

মরগ্যান টেবিল থেকে নেমে দাঁড়াল৷ হাত-পা ছড়িয়ে শিথিল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সজীব করতে চাইল, ‘তাহলে এই হল মোটামুটি আমাদের প্ল্যান৷ এতে কোনওরকম সম্ভাবনাকেই আমরা বাদ দিইনি, কিন্তু তবুও এটা নিখুঁত নয় : কোনওদিন কোনও প্ল্যান নিখুঁত হয় না৷ তবে একটা বিষয়ে আমি নিশ্চিত—ট্রাকটাকে লোকচক্ষুর আড়ালে আমরা অতি সহজেই দিনের পর দিন লুকিয়ে রাখতে পারব! ক্যারাভ্যানের সমুদ্রে কোনও একটা বিশেষ ক্যারাভ্যানের ভেতর ট্রাকটার থাকার কথা কেউ কোনওদিন ধরাণাতেও আনতে পারবে না৷ আমাদের প্ল্যানের এটাই হল সবচেয়ে মার-কাটারি অংশ!’ উৎফুল্ল মুখে মরগ্যান তাকাল জিনির দিকে, ‘জিনি, এর জন্যে আমি তোমার কাছে ঋণী৷ তোমার এই মতলবটা এককথায় অপূর্ব!’

‘যার যার কাজ সে সে ঠিকমতো করলেই আমাদের কাজ চোখ বুজে হাসিল হবে৷’ জিনির অকম্পিত কণ্ঠস্বরে নেই কোনও উচ্ছলতার আভাস৷

‘আমারও তাই মনে হয়৷’ মরগ্যান এবার ঘড়ি দেখল, বলল, ‘এড তুমি আর কিটসন জিপোর গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ো—গাড়ি রাখবার জায়গাগুলো একবার চক্কর দিয়ে এসো৷ একটা স্পোটর্স-কার আমার আজ রাতেই চাই৷ গাড়িটা পেলেই জিপো এখানে নিয়ে আসবে৷ জিপো ওটার রং পালটে নতুন রং-করে দেবে৷ যাও, বেরিয়ে পড়ো৷’

একটু বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল কিটসন৷ বলাবাহুল্য ব্লেকের সঙ্গই তার যত বিরক্তির কারণ৷ কিন্তু তবু সে রাজি হল৷ মাথা নিচু করে গম্ভীর মুখে এগিয়ে চলল দরজার দিকে৷

শিস দিতে দিতে ব্লেক ওকে অনুসরণ করল৷ জিনিকে পাশ কাটাবার সময় অর্থবহভাবে চোখ টিপল সে৷ জিনি শূন্যদৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে রইল; কিন্তু ব্লেক একটু হেসে দরজার কাছে এগিয়ে গেল৷ হঠাৎ ঘাড় ফিরিয়ে ওকে লক্ষ করে আরও একবার চোখ মারল—তারপর বেরিয়ে গেল কারখানা ছেড়ে৷

কয়েক মুহূর্ত পরে ওরা শুনতে পেল লিংকনে স্টার্ট দেওয়ার শব্দ৷ একটু পরেই সে ইঞ্জিনেরে শব্দ দূর থেকে আরও দূরে মিলিয়ে গেল৷

‘জিনি, তোমাকে যা করতে হবে তা হল খাবারের ব্যবস্থা৷’ জিনিকে লক্ষ করে মরগ্যান বলে উঠল, গোটা দুয়েক বাক্স কিনে তাতে টিনে ভরা খাবার কিনে নিও৷’ পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে ওর হাতে দিল সে, ‘যা যা দরকার মনে করে, বুঝে শুনে কিনে রেখো—আর হ্যাঁ, দু-বোতল স্কচ কিনতে ভুলো না যেন! যাও, তোমার আর কোনও কাজ নেই৷ শুক্রবার সকালে আবার আমাদের দেখা হবে—ঠিক আটটার সময় কেমন?’

‘ঠিক আটটার সময়৷’ প্যাড থেকে লেখা পৃষ্ঠা-দুটো ছিঁড়ে ও তুলে দিল মরগ্যানের হাতে! সে কাগজদুটোকে এক পলক দেখে পকেটে রাখল৷

‘বাইরে তো এখনও বৃষ্টি হচ্ছে! বলো তো তোমাকে আমার গাড়িতে পৌঁছে দিই?’ উত্তর কী হবে তা জেনেশুনেই প্রশ্নটা করল মরগ্যান৷

প্লাস্টিকের বর্ষাতিটা গায়ে চাপিয়ে নিল জিনি, মাথা নাড়ল, ‘না, তার কোনও প্রয়োজন নেই৷ আমি বাসেই যেতে পারব৷’ হঠাৎই ও চোখ রাখল মরগ্যানের চোখে, ‘তোমার ধারণা এ কাজে আমরা জিতবই, তাই না?’

‘হ্যাঁ, কিন্তু তোমারও তো ওই একই বিশ্বাস?’

‘হুঁ’—কিছুক্ষণ ইতস্তত করে ও মাথা নাড়ল, ‘আচ্ছা, তাহলে চলি’ জিপো ও মরগ্যানের দিকে পর্যায়ক্রমে ঘাড় হেলিয়ে বিদায় নিল জিনি৷ দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলল খোলা দরজার দিকে৷

জিপো কিন্তু ভীষণভাবে বিচলিত হয়ে পড়েছে৷ শুধু দু-লক্ষ ডলারের লোভ এবং মরগ্যানের নীরব শাসানি তার মুখ বন্ধ করে রেখেছে৷ এখন এই ট্রাক লুটের কাজটাকে সে রীতিমতো ভয় করতে শুরু করেছে৷ যদি তাদের কোথাও ভুল হয়ে যায়? যদি সে ধরা পড়ে পুলিশের হাতে? ওঃ ভগবান! তার মা শুনলে কী ভাববে?

মরগ্যান জিপোর কাঁধে আশ্বাসের ভঙ্গিতে হাত রাখল, ‘ভয় পাওয়ার কিছু নেই, জিপো৷ আর মাত্র এক সপ্তাহ—তার পরেই তোমার ভাগ্য ফিরে যাবে! দু-লক্ষ ডলারের জন্যে এর চেয়ে রিরাট ঝুঁকি নেওয়া যায়, তাই না? যাকগে, কাল সকালে আমি আবার আসব৷ ক্যারাভ্যানের ওপর তোমার কাজ দেখে আমি ভীষণ খুশি হয়েছি৷ যাও, একটু গলা ভিজিয়ে নাও—এত মুষড়ে পড়ার কী আছে?… আচ্ছা, তাহলে চলি।’ জিপোর পিঠে বারদুয়েক মৃদু চাপড় মেরে মরগ্যান চলে গেল৷ জিপো তখনও একই ভাবে বসে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় চিন্তামগ্ন৷

গমন্ট সিনেমার কাছাকাছি বিশাল গাড়ি রাখার জায়গা লক্ষ করে গাড়ি চালাতে চালাতে নিজের মনের ভেতর এক সুপ্ত দ্বন্দ্বের আভাস পেল কিটসন৷ এই বিপজ্জনক কাজে সাফল্যলাভের কোনও আশাই সে করছে না; বরং মাঝখান থেকে ও খুনের দায়ে জড়িয়ে পড়তে চলেছে৷ এ কাজ থেকে পিছিয়ে আসতে সে পারত, যদি না মরগ্যান আজ তার ভূমিকা সম্পর্কে খোলাখুলি আলোচনা করত৷ জিনি ও সে করবে স্বামী-স্ত্রীর অভিনয়৷ তাদের একসঙ্গে থাকতে হবে, ঘুরতে হবে… তারা সাঁতার কাটবে, মাছ ধরবে—আনন্দে কাটিয়ে দেবে কয়েকটা দিন৷ আর জিনি অভিনয়ের ব্যাপারে বাস্তবঘেঁষা, তাতে মনে হয় না কিটসনকে ওই কটা দিন ও এড়িয়ে চলবে৷ তাছাড়া জিনি নিখুঁত অভিনয় করতে ভালোবাসে৷

সুতরাং জিনির একান্ত সঙ্গলাভের এই সহজ সুযোগ তার মন থেকে বিপর্যয়ের আশংকাকে একেবারে মুছে দিল৷ নাঃ, জিনির কাছাকাছি আসার এই সুযোগ সে ছাড়তে পারবে না—মরে গেলেও না৷

লিংকনে কিটসনের পাশাপাশি বসে ব্লেক আড়চোখে তাকে লক্ষ করছিল, হঠাৎই বলে উঠল, শোনো আলেক্স, তোমাকে আগে থাকতেই জানিয়ে রাখা ভালো—জিনিকে নিয়ে যেন বেশি স্বপ্ন দেখো না! ওর সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গ বোঝাপড়া হয়ে গেছে৷ এই কাজের ঝামেলা মিটে গেলে আমরা দুজনে একসঙ্গে বেরিয়ে পড়ব—ঘুরে আসব প্যারিস, লন্ডন—নানান দেশ৷ ভাবলাম, তোমার যদি কোনও মতলব ছকা থাকে—তাই আগে থাকতেই বলে রাখলাম৷’

আরেকটু হলেই একটা ট্রাকের গায়ে ধাক্কা মারছিল কিটসন৷ চৌমাথায় লাল আলোর সিগন্যাল দেখে সে গাড়ি থামাল৷ তার মনে হল, কেউ যেন একটা বিরাশি সিক্কার ঘুষি তার পাঁজরে বসিয়ে দিয়েছে৷ সে আগুনঝরা চোখে ফিরে তাকাল ব্লেকের দিকে৷ চাপা স্বরে গর্জে উঠল, ‘তুমি মিথ্যে কথা বলছ! তোমার মতো একটা গাড়োলের সঙ্গে জিনি কখনও কোথাও যাবে না৷ অতএব, ফালতু তাপ্পি দিয়ে লাভ নেই!’

কিটসনের জান্তব ক্রোধে ব্লেক খুশিই হল৷ তার টোপ ফেলা সফল হয়েছে জেনে সে গলা ছেড়ে হেসে উঠল, ‘তাই নাকি? তাহলে ওইখানেই তুমি ভুলটা করেছ! জ্ঞান দানের অভ্যেসটা তোমার সাধারণ বুদ্ধিকে পর্যন্ত ভোঁতা করে দিয়েছে৷ জিনির আমার সঙ্গে না যাওয়ার কোনও কারণ নেই, আছে কি? আমি তবু কিছু লেখাপড়া জানি, তোমার তো ক অক্ষর গো-মাংস! আর…তাছাড়া ও পেটেন্ট নাক নিয়ে তুমি জিনির সঙ্গে প্যারিসে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখ—হুঁঃ!’

ব্লেকের তাচ্ছিল্যের হাসি কিটসনের কানে ঢেলে দিল সীসে৷ উত্তেজিত হয়ে সে চেঁচিয়ে উঠল, ‘থামো বলছি! নইলে এক—’

‘তোমার জায়গায় আমি হলে মোটেও সে চেষ্টা করতাম না৷’ ব্লেকের জিভে হঠাৎই জেগে উঠল ক্ষুরের ধার, ‘সেইদিন আচমকা ব্যাপারটা ঘটে যাওয়ায় আমি ঠিক প্রস্তুত হতে পারিনি৷ কিন্তু আলেক্স, সে চেষ্টা এখন কোরো না—একটি ঘুষিতে তোমার দাঁত কটা উপড়ে ফেলে দেব৷’

কিটসন বিদ্যুৎগতিতে পাশ ফিরল… কিন্তু সেই মুহূর্তেই পিছন থেকে ভেসে এল অধৈর্য হর্নের শব্দ৷ সামনে চেয়ে সে দেখল লাল আলো সবুজে পালটে গেছে৷ কিটসন যেন সম্বিত ফিরে পেল৷ গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে শোনা গেল তার চাপা গজরানির শব্দ—লিংকন আবার চলতে শুরু করল৷

‘হ্যাঁ—যা বলছিলাম’ কিটসনকে রাগাতে পেরে খুশি হল ব্লেক, ‘জিনির সঙ্গে এই সেদিন গল্প করছিলাম, তা কথায় কথায় প্যারিসের কথা উঠল৷ তুমি তো জানো, আমি বছর দুয়েক আগে প্যারিসে গিয়েছিলাম৷ সুতরাং ওখানকার সমস্ত কিছু আমার নখদর্পণে৷ জিনি হঠাৎ বলে উঠল, ওর প্যারিসে যাবার খুব শখ; তখন…’

‘দয়া করে একটু চুপ করবে!’ কিটসন বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, ‘নইলে গাড়ি থামিয়ে তোমাকে চুপ করাতে হবে দেখছি!’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে’—পৃষ্ঠপোষকতার সুরে বলে উঠল ব্লেক, ‘তোমাকে শুধু মনে করিয়ে দিতে চাইছি, যে জিনির ওপর প্রথম দাবিটা আমার৷ তুমি তো আবার ওর স্বামীর ভূমিকায় অভিনয় করছ, সুতরাং তখন যদি এ কথাটা ভুলে যাও তাহলে গণ্ডগোলের আশঙ্কা আছে৷’

ভেবেচিন্তে উপযুক্ত একটা জবাব দেওয়ার আগেই কিটসন এসে উপস্থিত হল এক বিরাট গাড়ি রাখবার জায়গার কাছে৷ হঠাৎই সে যেন মুষড়ে পড়ল৷ জিনির মতো মেয়ের পক্ষে ব্লেকের মতো বদমাইস লোকের ফাঁদে পা-দেওয়া সহজ৷ তার ওপর ব্লেক হয়তো প্যারিসের ব্যাপারটা বানিয়ে বলছে না৷ এই আকস্মিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হয়ে কিটসন যেন হোঁচট খেল৷

ব্লেকের সঙ্গে মুখোমুখি দ্বৈরথে নিজের জয় সম্পর্কেও তেমন স্থির নিশ্চিত নয় কিটসন৷ প্রথমত ব্লেক তার চেয়ে ওজনে চোদ্দো পাউন্ড বেশি এবং তার স্বাস্থ্য খারাপ নয়৷ একবার এক ঘরোয়া মারপিটের সময় ব্লেকের লড়াই দেখেছিল কিটসন৷ ওর লড়াইয়ের স্বচ্ছন্দ ভঙ্গি কিটসনকে অবাক করেছিল৷ প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারানোর জন্যে যে কোনও কুটিল উপায় অবলম্বন করতে সে দ্বিধা করে না৷ তাছাড়া তার নৃশংস, নিষ্ঠুর লড়াইয়ের পদ্ধতি তো আছেই!

গাড়ি রাখার জায়গার কাছে থেমে ওরা দেখল,গাড়ি পাহারা দেওয়ার কোনও লোকই সেখানে নেই৷ লম্বা-লম্বা দুটো সারিতে গাড়িগুলো পর পর দাঁড়িয়ে আছে৷

গাড়ি থেকে নেমে পড়ল ব্লেক, ‘তুমি ও পাশের সারিটা দেখতে থাকো; আমি এ-পাশেরটা দেখছি৷ যদি পছন্দমতো মালের সন্ধান পাও, শিস দিয়ে জানাবে৷’

ওরা দুজনে আলাদাভাবে এগিয়ে চলল গাড়িগুলোর পাশ দিয়ে৷ কিটসনের চোখ গাড়ির ওপর নিবদ্ধ হলেও মনে তখন বিক্ষুব্ধ ঝঞ্ঝা৷

ব্লেকের কথা আগাগোড়া মিথ্যে ভেবে মনকে সান্ত্বনা দিলেও কোথায় যেন একটা অস্বস্তির কাঁটা খচখচ করতে লাগল কিটসনের৷ সত্যিই কি জিনি তাহলে ব্লেকের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে? তবু ভালো, যে সে অন্তত দুটো কী তিনটে দিন ওর সঙ্গে একান্তে কাটাতে পারবে এবং তখন সে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখবে৷ জিনি যে বড় কঠিন ঠাঁই সে বিষয়ে তার মনে কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু তাই বলে হাল ছাড়তে সে রাজি নয়৷ মাঝে মাঝে জিনির নির্বিকার, অচঞ্চল অভিব্যক্তি তাকে সন্দেহগ্রস্ত করে তুলেছে৷ জিনির মন জয় করা অদৌ কোনও পুরুষের পক্ষে কি সম্ভব?

একটা এম জি স্পোটর্স-কারের সামনে এসে থমকাল কিটসন! একটা ক্যাডিলাক এবং একটা জাগুয়ারের ফাঁকে গাড়িটা দাঁড় করানো৷

প্রথম দেখাতেই কিটসন বুঝল এইরকম একটা গাড়িই তাদের প্রয়োজন৷ আড়চোখে এ-পাশ ও-পাশ তাকিয়ে সতর্কভাবে সে এগিয়ে গেল গাড়িটার কাছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সে দেখতে লাগল ওটাকে৷

কিটসনের সঙ্গে একটা ছোট টর্চ ছিল৷ সেটা জ্বালিয়ে সে ভালো করে পরীক্ষা করল গাড়িটা৷ একটু খোঁজাখুঁজি করতেই পাওয়া গেল গাড়ির চাবিটা৷ সুতরাং শিস দিয়ে সে ইশারা করে ব্লেককে ডাকল৷ ব্লেক অন্য সারির গাড়িগুলো জরিপ করে দেখছিল, কিটসনের ডাকে ফিরে এল তার কাছে৷

‘মনে হচ্ছে এই গাড়িটায় কাজ হবে৷’ বলল কিটসন, ‘এই যে গাড়ির চাবি৷’

ব্লেক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে গাড়িটাকে কয়েক মুহূর্ত দেখল, ঘাড় নাড়ল, ‘হুঁ চলবে৷ তা তুমি দেখছি দিনকে দিন সেয়ানা হয়ে উঠছ, ব্যাপারটা কী?’ বিদ্রুপের হাসি হেসে ঠাট্টা করল ব্লেক, ‘যাও—তাহলে গাড়িটা জিপোর কারখানায় পৌঁছে দাও৷ কারণ প্রথমত তুমি গাড়ি চালানোর দিগ্‌গজ, তার ওপর খুব একটা ভারী কাজের দায়িত্ব তোমার ওপর পড়েনি৷ সুতরাং এই যৎকিঞ্চিৎ ঝুঁকির কাজটুকু তোমায় করতেই হবে, তার পরে না হয় জিনির সঙ্গে ঢলাঢলি কোরো৷’

কথাটা কিটসনের সহ্যশক্তির সীমা ছাড়িয়ে গেল৷ কোনওরকম ভালোমন্দ না ভেবেই সে বিদুৎগতিতে ঘুষি চালাল ব্লেকের মুখ লক্ষ করে৷

ব্লেক বোধ হয় এই ধরনের কিছুই প্রত্যাশা করছিল, এবং সেই কারণেই সে আগে থেকেই এর জন্যে প্রস্তুত ছিল৷ পলকের মধ্যে সে মাথা হেলাল বাঁ-দিকে৷ কিটসনের ঘুষি লক্ষ্যহীন অবস্থায় তার কাঁধ ঘেঁষে বেরিয়ে গেল৷ ভারসাম্য হারিয়ে কিটসন ঝুঁকে পড়ল সামনের দিকে৷ সঙ্গে সঙ্গে ব্লেকের ডানহাতি জোরালো ঘুষি আছড়ে পড়ল আলেক্সের তলপেটে৷ ব্লেক ইচ্ছে করেই সমস্ত ক্ষমতা খরচ করল এই ঘুষির পিছনে—কিছুটা প্রতিহিংসাবশত, কিছুটা আত্মরক্ষার প্রয়োজনে৷ সংঘর্ষের আকস্মিকতার কিটসন মুহূর্তের জন্যে পঙ্গু হয়ে পড়ল৷ প্রচণ্ড ব্যথা লাগার সঙ্গে সঙ্গে সে মাটিতে বসে পড়ল৷

বহুদিন মুষ্টিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকায় কিটসন কিছুটা ধীরগতি হয়ে পড়েছে, শরীরের পেশি হয়ে পড়েছে শ্লথ৷ তাই ধাক্কাটা সামলে উঠতে তার সময় লাগল৷

ব্লেক নৃশংস হাসিতে মুখ ভরিয়ে কয়েক পা-পিছিয়ে দাঁড়াল, ‘এক মাঘে শীত যায় না, চাঁদু৷ তাই আজ সুদে-আসলে তোমার সেদিনকার বেইজ্জতি ওয়াপস করে দিলাম৷ এরপর আর বেশি পাঁয়তারা করার চেষ্টা কোরো না, তাহলে নিজেই বিপদে পড়বে৷ যাও, চটপট গাড়িটা নিয়ে কেটে পড়ো৷ কারখানায় জিপো তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে৷’

কথাটা শেষ করেই লিংকনের দিকে পা-চালাল ব্লেক৷ কিটসন তখনও একইভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে হাঁটু ভেঙে বসে তার যন্ত্রণাক্লিষ্ট ফুসফুসে হাওয়া টানার চেষ্টা করছে৷

ব্লেকের জোরালো ঘুষির আঘাত কিটসনকে আরও কয়েক মুহূর্ত আচ্ছন্ন করে রাখল৷ অবশেষে সে কোনওরকমে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল৷ শ্লথ, টলায়মান পদক্ষেপে সে এম জি স্পোর্টস-কারে গিয়ে উঠল৷ পরাজয়ের গ্লানি তার সারা শরীরে ছড়িয়ে দিয়েছে একটা বিজাতীয় রাগ৷ ইঞ্জিন চালু করে গাড়ি রাখার জায়গা ছেড়ে রাস্তায় এসে পড়ল কিটসন৷

আজ সে বলতে গেলে গাল বাড়িয়ে ব্লেকের হাতে চড় খেয়েছে নিজেকে বিরক্তিভরে ধিক্কার দিল কিটসন, তবে পরের বার আর ব্লেককে সে সুয়োগ দিচ্ছে না৷ লড়াই করার শখ একেবারে চিরকালের মতো ঘুচিয়ে দেবে৷

এ গলি, ও গলি করে জিপোর কারখানা অভিমুখে গাড়ি ছুটিয়ে চলল কিটসন৷

ব্লেক ও তার মধ্যে এক চরম যুদ্ধ যে আসন্ন, সেটা কিটসন বেশ বুঝতে পারল৷ দিনের পর দিন ব্লেক তাকে উপহাস করে এসেছে—কিন্তু কিটসন কোনও জবাব দেয়নি৷ আর এখন যদি যে মনে করে থাকে, জিনিকে কিটসনের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে, তবে ব্লেক একটা মারাত্মক ভুল করবে৷ কারণ আজকের মতো সেদিন কিটসন আর অপ্রস্তুত থাকবে না৷ অবশ্য ব্লেকের ডানহাতি ঘুষির জন্যে তাকে সতর্ক হতে হবে—এবং সেগুলো এড়িয়ে চলতে হবে৷ কারণ লড়াইয়ের ব্যাপারে ব্লেক নেহাত আনকোরা খিলাড়ি নয়৷ তারা দুজনেই পরস্পরকে আচমকা ঘুষিতে অবাক করেছে—একবার কিটসন, আর আজ ব্লেক৷ কিন্তু সে ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর ঘটবে না৷ কারণ আজ থেকে তারা পরস্পরের জন্যে সর্বদাই প্রস্তুত থাকবে৷

কিটসন যখন এলোমেলো ভাবনাকে সঙ্গী করে জিপোর কারখানার দিকে এগিয়ে আসছে, তখন দলপতি ফ্র্যাঙ্ক মরগ্যান তার বুইক নিয়ে ফিরে চলেছে নিজের ডেরায়৷

মরগ্যানের মনে ভেসে চলেছে চিন্তার কুয়াশা আসন্ন কাজের ভাবনায় সে মগ্ন৷ এই কাজটাকে সে অন্য তিনজনের চেয়েও গভীরভাবে নিয়েছে—যেন এর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তার জীবন-মরণের প্রশ্ন৷ অবশ্য কথাটা মিথ্যে নয়৷ তাই মরগ্যান তাদের পরিকল্পনাকে বার বার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে যাচাই করে দেখছে৷ বড় রাস্তায় গাড়ির সমুদ্রে গা-ভাসিয়ে সে ভাবল—এই আমার জীবনের শেষ কাজ৷

বৃষ্টি অনেকক্ষণ থেমে গেছে৷ কিন্তু রাস্তায় এখনও জলের আস্তরণ৷ তাতে প্রতিফলিত হচ্ছে আলোর ইশারা৷ বুইকের হেডলাইটের আলো ভিজে রাস্তাকে যেন আয়না করে তুলেছে৷ সর্তক হাতে গাড়ি ছুটিয়ে চলল মরগ্যান৷

ওই দশ লাখ ডলার হাতে পাওয়ামাত্রই তারা পাঁচজন যার যার ভাগের টাকা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরবে৷ নিজের ভবিষ্যতের ব্যবস্থা মরগ্যান আগেই করে রেখেছে৷ এই মুহূর্তেই তার পকেটে রয়েছে মেক্সিকো যাওয়ার টিকিট৷ এই টিকিটের বিশেষত্ব হল, যে কোনও দিন, যে কোনও সময়, যে কোনও প্লেনে মরগ্যান মেক্সিকো যেতে পারবে৷ সেজন্যে টাকা কিছু বেশি লেগেছে বইকি! মেক্সিকোয় এক আধা-গ্রাম, আধা-শহরে সে একটা ভল্ট ভাড়া করে রেখেছে৷ তাতেই সে রাখবে তার লুটের টাকা৷ তারপর শুরু হবে অনির্দিষ্ট প্রতীক্ষা৷ যখন মরগ্যান বুঝবে ট্রাক লুটের চাঞ্চল্য কমে এসেছে, তখন সে দু-লাখ ডলার দিয়ে ধীরে ধীরে বন্ড কিনতে শুরু করবে৷ সমস্ত টাকাটা যখন তমসুকে পরিণত হবে, তখন তাকে আর দেখে কে? এই পৃথিবীটাকে শুধু সে-যে হাতের মুঠোয় পাবে তা নয়, পৃথিবী তখন থাকবে তার পায়ের তলায়৷

অবশ্য মরগ্যানের মনে এমন কোনও ভুল ধারণা নেই যে এ কাজে সে নিশ্চিতভাবে সফল হবে৷ কারণ সে ভালোভাবেই জানে, এতে সাফল্য ও অসাফল্যের সম্ভাবনা সমান সমান—অর্থাৎ পঞ্চাশ, পঞ্চাশ৷ কারণ এ ক্ষেত্রে তার প্রতিপক্ষ নেহাত দুর্বল নয়৷ বরং তাদের চেয়ে অ-নে-ক বেশি শক্তিশালী৷ পুলিশ এবং সৈন্যবাহিনির লোকেরা পুরো শহরটা গোরু-খোঁজা করে ছাড়বে৷ ট্রাকটা পুনরুদ্ধারের জন্যে তারা যে কোনও পথকেই অবলম্বন করবে৷ প্রয়োজন হলে নৃশংস রাস্তা নিতেও ছাড়বে না৷ ব্লেক, জিপো বা কিটসনের ওপর তার বিন্দুমাত্রও বিশ্বাস নেই৷ যতক্ষণ সে তাদের পরিচালনা করছে ততক্ষণ ভয়ের কোনও কারণ নেই৷ কিন্তু যেই মরগ্যান তাদের মাঝ থেকে সরে পড়বে অমনি তারা দিশেহারা হয়ে নির্বোধের মতো ধরা পড়বে৷ শুধু এই কথা ভেবে মরগ্যানের দুঃখ হল, যে দশ লাখ ডলারের জন্যে এত বুদ্ধি খরচ করে সে কাজে নামতে চলছে, সেখানে সে পাচ্ছে মাত্র দু-লাখ ডলার৷ তার দৃঢ় বিশ্বাস, অন্তত ছ-লাখ ডলার পুলিশ উদ্ধার করবেই—যদি রক্ষা পায় তো জিনিই পাবে৷

জিনির কথায় তার চিন্তাধারা ভিন্ন পথে বাঁক নিল৷ মেয়েটা তার সঙ্গে এক হয়ে মাথা খাটাচ্ছে ঠিক, কিন্তু একই সঙ্গে ও মরগ্যানের ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে৷

ট্রাকটাকে ফাঁদে ফেলা থেকে শুরু করে লুট পর্যন্ত যে মতলব জিনি তার কাছে দাখিল করেছে, তা এককথায় অপূর্ব৷ কিন্তু জিনির মাথা থেকেই যে সে মতলব বেরিয়েছে, সেটা মরগ্যান কিছুতেই মানতে রাজি নয়৷ তাহলে কেউ কি আছে জিনির পিছনে? নাকি কাউকে বৈঠকি চাল দিচ্ছে মেয়েটা?

কিন্তু অবান্তর ভেবে সে চিন্তাকে মরগ্যান মন থেকে সরিয়ে রাখল৷ কারণ সাজানো গোছানো, পরিপাটি করা মতলবটা জিনিই তার হাতে তুলে দিয়েছে৷ এবং তাতে মরগ্যান যে লাভবান হয়নি তা নয়৷ তাছাড়া এই কাজের সবচেয়ে কঠিন অংশের দায়িত্ব নিয়েছে জিনি নিজে৷ সুতরাং ওকে সন্দেহ করে লাভ কী?

চিন্তিত মুখে কাঁধ ঝাঁকাল মরগ্যান৷ জিনিকে মন থেকে সরিয়ে সে আরও একবার পরিকল্পনার ছকে মন দিল…