গল্প
উপন্যাস

আলোছায়ার খেলা – ১

প্রথম পরিচ্ছেদ

১৭৮২ সালে ক্যাপ্টেন রজার অ্যাংমারিং যখন লেদারকোম্ব উপসাগরে এক দ্বীপে একটি বাড়ি তৈরি করলেন, তখন সেটাকে তাঁর খামখেয়ালিপনার চূড়ান্ত বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিলো৷ তাঁর মতো একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির পক্ষে, নদী-বয়ে-যাওয়া, সবুজ-ঘাসে-ছাওয়া কোন বিস্তীর্ণ প্রান্তরে একটা প্রাসাদোপম বাড়ি তৈরি করাটাই ছিলো বেশি স্বাভাবিক৷

কিন্তু ক্যাপ্টেন রজার অ্যাংমারিং-এর পরম ভালোবাসা ছিলো একটিমাত্র জিনিসের প্রতি—সমুদ্র৷ সুতরাং প্রয়োজন অনুয়ায়ী বেশ শক্ত কাঠামোয় তিনি বাড়িটা তৈরি করলেন, চঞ্চল বাতাস ও গাঙচিল অধ্যুষিত ছোট্ট পাথুরে অন্তরীপের ওপর—জোয়ারে সময় সেটা মুল ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তো৷

তিনি বিয়ে করেননি, সমুদ্রই ছিলো তাঁর প্রথম ও শেষ সঙ্গিনী, এবং তাঁর মৃত্যুর পর সেই বাড়ি এবং দ্বীপের মালিক হলেন তাঁর দূরসম্পর্কে এক ভাই৷ সেই ভাই এবং তাঁর বংশধরেরা এই সম্পত্তি নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামালেন না৷ তাঁদের নিজেদের জমি-জমা ক্রমশ কমে আসছিলো এবং তাঁদের উত্তরাধিকারীদের অবস্থা ক্রমে যেতে লাগলো খারাপের দিকে৷

অবশেষে ১৯২২ সালে ‘সমুদ্রতীরে-অবসর যাপনের’ সৌখিন রীতি যখন প্রচলিত হলো এবং গ্রীষ্মকালেও ডেভন ও কর্নওয়াল উপকূলের আর অসহ্য বলে মনে হলো না, আর্থার অ্যাংমারিং আবিষ্কার করলেন, তাঁর বিশাল অসুবিধাজনক জর্জীয় বাড়ি আর বিক্রি হবার নয়, কিন্তু সমুদ্রচারী ক্যাপ্টেন রজারের সংগ্রহ করা অন্যান্য সম্পত্তির বিনিময়ে তিনি ভালো দামই পেলেন৷

সুদৃঢ় বাড়িটাকে পরিবর্ধনের পর সাজিয়ে তোলা হলো৷ মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপ পর্যন্ত তৈরি হলো একটা কংক্রিটের সেতু৷ পরিকল্পনা-মাফিক দ্বীপের সর্বত্র তৈরি হলো ‘মনোরম পথ’ ও অবসর যাপনের নিভৃত স্থান৷’ তৈরি হলো দুটো টেনিস কোর্ট, ভেলা ও স্প্রীং-পাটাতনে সাজানো সৈকতের দিকে নেমে আসা খোলা চত্বর৷ জলি রজার হোটেল স্মাগলার্স দ্বীপ, লেদারকোম্ব উপসাগর একই সঙ্গে আত্মপ্রকাশ করলো বিজয়ীর ভঙ্গিতে৷ এবং জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (সেই সঙ্গে ইস্টারে ছোট্ট মরসুমেও) জলি রজার হোটেলে সাধারণ তিলধারণের জায়গা থাকতো না৷ ১৯৩৪-এ হোটেলের উন্নয়নকল্পে একটা পানশালা, একটা বড় খাবার-ঘর ও কয়েকটা অতিরিক্ত কলঘর তৈরি করা হলো৷ মাথাপিছু থাকার খরচও গেলো বেড়ে৷

লোকে বলতো, ‘লেদারকোম্ব উপসাগরে কখনও গেছেন? একটা দ্বীপের মতো জায়গায় ভীষণ ভালো একটা হোটেল আছে৷ খুব আরামের জায়গা, কোন উটকো লোক বা শ্যারাব্যাং-গাড়ির ঝামেলা নেই৷ রান্নাবান্না আর তদারকি চমৎকার৷ ওখানে আপনার যাওয়া উচিত৷’

এবং সত্যিই লোকে যেতো৷

বর্তমানে একজন বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তি (অন্তত তাঁর নিজের মতো) জলি রজারে বাস করছেন৷ একটি আধুনিক ডেক চেয়ারে গা এলিয়ে তিনি অলস দৃষ্টি মেলে দিয়েছেন সামনের সমুদ্রতীরের দিকে৷ পরনের তাঁর দুধ-সাদা ধবধবে স্যুট, মাথার পানামা টুপি চোখের ওপর নামানো; গোঁফজোড়া বাঁকানো রাজকীয় পদ্ধতি৷

হোটেলের দিক থেকে সিমেন্ট বাঁধানো একাধিক চত্বর ঢালু হয়ে নেমে এসেছে সমুদ্রতীরের দিকে৷ সামনের বেলাভূমিতে ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে রবার ও ক্যাম্বিশের নৌকো, পলিথিনের বল, খেলনা এবং কয়েকটা ভসিকা৷ তীর থেকে বিভিন্ন দূরত্বে চোখে পড়ছে তিনটি ভেলা ও একটা দীর্ঘ স্প্রীং-পাটাতন৷ সমুদ্র-স্নানার্থীদের কয়েকজন স্নান করছেন, কেউ বা সৈকতে শরীর মেলে সূর্যস্নানে ব্যস্ত, আর কেউ কেউ শরীরে বুলিয়ে চলেছেন তেলের প্রলেপ৷

স্নানবিমুখ অতিথিরা বসে রয়েছেন বেলাভূমিসংলগ্ন খোলা বারান্দায়, তাঁদের কথাবার্তা প্রধানত আবহাওয়া, সৈকতের দৃশ্য, প্রাত্যাহিক সংবাদপত্রের খবর এবং অন্য যে-কোন আলোচনাসাপেক্ষ বিষয়ে সীমাবদ্ধ ছিলো৷

পোয়ারের বাঁ দিক থেকে মিসেস গার্ডেনারের অবিশ্রান্ত একঘেয়ে কথাবার্তার স্রোত ভেসে আসছে৷ কিন্তু মিসেস গার্ডেনারের কর্মব্যস্ত হাত এক মুহূর্তের জন্যেও বিচলিত হচ্ছে না৷ তাঁর কথার স্রোত এবং উল বোনার কাঁটা অভিজ্ঞতালব্ধ দক্ষতায় একই সঙ্গে তাল রেখে এগিয়ে চলেছে৷ তাঁর ঠিক পেছনেই একটা দোলনা-চেয়ারে গা এলিয়ে শুয়ে আছেন তাঁর স্বামী, ওডেল. সি. গার্ডেনার; মাথার টুপিটা টেনে নামানো তাঁর নাকের ওপর, এবং কোনরকম অনুমতি অথবা উৎসাহ পেলেই তিনি সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে সরব হচ্ছেন৷

পোয়ারোর ডান পাশে বসে মিস ব্রুস্টার৷ তাঁর মাথার চুল ধূসর; মুখমণ্ডলের গড়নে প্রকৃত সহিষ্ণুতার ছাপ; শরীরের গঠন অনেকটা অ্যাথলিটদের মতো৷ থেকে থেকে তাঁর সংক্ষিপ্ত উত্তর শোনা যাচ্ছে, যেন কোন পমেরেনিয়ান কুকুরের যতিহীন তীক্ষ্ণ চিৎকারকে কোন শিকারি হাউন্ডকর্কশ ধমকের সাহায্যে বাধা দিতে চেষ্টা করছে৷

মিসেস গার্ডেনার তখন বলে চলেছেন, ‘আর সেই জন্যেই মিঃ গার্ডেনারকে আমি বললাম, প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করা খুব ভালো, আমি বললাম, এবং যে-কোন জায়গা আমি তন্ন তন্ন করে ঘুরে দেখতে চাই৷ এমনিতে, আমি বললাম, গোটা ইংল্যান্ডটা আমরা মোটামুটি ঘুরে দেখেছি আর এখন আমি যা চাই তা হলো সমুদ্রের কাছাকাছি কোন শান্ত পরিবেশে গিয়ে নিছক বিশ্রাম করতে৷ আমি তাই বলেছি, বলিনি, ওডেল? শুদ্ধ বিশ্রাম৷ বেশ বুঝতে পারি, আমার এখন বিশ্রামের প্রয়োজন, আমি ওকে বলেছি৷ তাই না ওডেল?’

মিঃ গার্ডেনার তাঁর টুপির নিচ থেকে অনুচ্চ কণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, সোনা৷’

মিসস গার্ডেনার বিনা বিলম্বে তাঁর কাহিনি পশ্চাদ্ধাবনে মনোনিবেশ করলেন৷

‘আর সেই কারণেই, যখন আমি ‘কুক’-এর মিঃ কেলসাকো একথা জানালাম, তিনি যেচে আমাদের বেড়ানোর সমস্ত ব্যবস্থা করে দিলেন৷ তিনি না থাকলে আমরা যে কি করে কি করতাম, তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন!—যাকগে, যা বলছিলাম মিঃ কেলসোকে এ জায়গাটার কথা বলামাত্রই তিনি বললেন, এর চেয়ে ভালো জায়গা আর নেই৷ নির্জন, মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ, সঙ্গে পরিচর্যার সুব্যবস্থা; সব দিক থেকেই জলি রজার অন্য সব হোটেলের চেয়ে আলাদা৷ অবশেষে মিঃ গার্ডেনারের তখন জল-কলের ব্যবস্থার কথা জানতে চেয়েছিলেন৷ কারণ বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, মঁসিয়ে পোয়ারো, মিঃ গার্ডেনারের এক বোন একবার এই জাতীয় একটি অতিথিশালায় দিন কয়েকের জন্য ছিলেন, কিন্তু শুনলে অবাক হবেন, সেখানকার কলঘরে অবস্থা ছিলো নিতান্তই গ্রামের মতো—মাটির তৈরি৷ সুতরাং স্বাভাবিকভাবে এ ধরনের ‘নির্জন, সুন্দর’ জায়গা সম্পর্কে মিঃ গার্ডেনার একটু সন্দেহপ্রবণ, তাই না, ওর্ডেল?’

‘নিশ্চয়ই, সোনা৷’ বললেন মিঃ গার্ডেনার৷

‘কিন্তু মিঃ কেলসো সঙ্গে-সঙ্গেই আমাদের আশ্বাস দিলেন৷ বললেন, জল-কলের ব্যবস্থা একেবারে আধুনিক এবং রান্না অত্যন্ত চমৎকার৷ এখন দেখছি, সে কথা সত্যি৷ আর আমি সবচেয়ে যেটা পছন্দ করি, তা হলো সময়ানুবর্তিতা—বুঝতেই তো পারছেন কি বলতে চাইছি৷ তাছাড়া এলাকাটা ছোট হওয়ার প্রত্যেকের সঙ্গেই প্রত্যেকের আলাপ পরিচয়ের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে৷ ইংরেজদের যদি কোন দোষ থেকে থাকে তা হলো আপনার সঙ্গে পরিচয় বছর দুয়েকের পুরোনো না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা একটু আলগা থাকতে চায়৷ অবশ্য তার পরে তাঁদের অন্তরঙ্গতার জুড়ি মেলা ভার৷ মিঃ কেলেসো আরও বললেন, নানা ধরনের বিচিত্র সব মানুষ এসে ভিড় করে এই স্মাগলার্স দ্বীপে, এবং সে কথা যে মিথ্যে নয়, এখন দেখতে পাচ্ছি৷ আপনি রয়েছেন, মঁসিয়ে পোয়ারো, আর রয়েছেন মিস ডানলি৷ ওহ্! আপনার আসল পরিচয় পেয়ে আমরা তো পালকের ঘায়ে মূর্ছা যাবার মতো অবস্থা—তাই না, ওডেল?’

‘হ্যাঁ, সোনা৷’

‘সত্যি!’ সামান্য সুযোগ পেয়েই সরব হলেন মিস ব্রুস্টার, ‘কি রোমাঞ্চকর ব্যাপার, তাই না মঁসিয়ে পোয়ারো?’

ক্ষীণ প্রতিবাদে হাত তুললেন এরকুল পোয়ারো৷ কিন্তু সে প্রতিবাদ নিছক ভদ্রতাবশেই৷ মিসেস গার্ডেনার সাবলীলভাবে এগিয়ে চললেন৷

‘জানেন, মঁসিয়ে পোয়ারো কর্নেলিয়া রবসনের কাছে আপনার সম্বন্ধে আমি অনেক কিছু শুনেছি, গত মে মাসে আমি এবং মিঃ গার্ডেনার ব্যাডেনহফে ছিলাম, সেই সময়েই কর্নেলিয়া মিশরের ব্যাপারটা আমাদের বলেছে—যখন লিনেট রিজওয়ে খুন হয়৷* ও বলেছে, আপনি যেভাবে ঘটনাটার সমাধান করেছেন, তা এক কথায় অপূর্ব আর সেই থেকেই আপনাকে দেখবার জন্যে আমি একেবারে পাগল, তাই না, ওডেল?’

‘হ্যাঁ সোনা৷’

‘তারপর ধরুন মিস ডার্নলির কথা৷ আমার বেশির ভাগ জামাকাপড়ই৷ ‘রোজ মন্ড’ থেকে কেনা—আর উনিই তো রোজ মন্ডের মালিক, তাই না? ওঁর দোকানের পোশাকগুলোর একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে৷ গত রাতে আমি যে পোশাকটা পরেছিলাম সেটাও তো ওঁরই দোকান থেকে কেনা৷ সব দিক দিয়েই মেয়েটিকে আমার ভীষণ ভালো লাগে৷’

মিস ব্রুস্টারে পেছন থেকে মেজর ব্যারী, যিনি তাঁর বিস্ফারিত চোখ স্নানার্থীদের ওপরে নিবদ্ধ রেখে বসেছিলেন, গম্ভীর স্বরে মন্তব্য করলেন, মেয়েটির চেহারায় বিশেষত্ব আছে!’

মিসেস গার্ডেনার উল বোনার কাঁটা সশব্দে সচল হলো৷

‘একটা কথা আমি স্বীকার না করে পারবো না, মঁসিয়ে পোয়ারো আপনাকে এখানে দেখে আমি ভীষণ অবাক হয়েছি৷ সেই সঙ্গে রোমাঞ্চিতও যে হইনি তা নয়৷ মিঃ গার্ডেনারও সে কথা জানেন৷ আমার যেন হঠাৎই মনে হলে, আপনি এখানে এসেছেন নিতান্তই আপনার—পোশার প্রয়োজনে, আশা করি বুঝতে পারছেন আমি কি বলতে চাইছি? এমনিতে আমার অনুভূতি অত্যন্ত প্রখর, মিঃ গার্ডেনারও আপনাকে সেই কথাই বলবেন, আর যে-কোন ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত হওয়াটাকে আমি একেবারেই বরদাস্ত করতে পারি না৷ দেখুন—’

মিঃ গার্ডেনার গলা-খাঁকারি দিয়ে উঠলেন, বললেন, ‘দেখতেই পাচ্ছেন, মঁসিয়ে পোয়ারো, মিসেস গার্ডেনারের চোখ সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি প্রখর৷’

এরকুল পোয়ারোর দু’হাত শূন্যে বিক্ষিপ্ত হলো৷

‘আমাকে অন্তত একবার আশ্বাস দেবার সুযোগ দিন, মাদাম—আমি এখানে আপনাদের মতোই ছুটি কাটাতে; আনন্দ করতে—এসেছি, কোন অপরাধের কথা আমি এখন চিন্তাও করছি না৷’

মিস ব্রুস্টার সংক্ষিপ্ত রুক্ষ স্বরে মন্তব্য করলেন, ‘স্মাগলার্স দ্বীপে কোন ‘দেহ’ নেই৷’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘কিন্তু সে কথা পুরোপুরি সত্যি নয়৷’ তিনি আঙুল তুলে নির্দেশ করলেন নিচের বেলাভূমির দিকে, ‘ওদিকে একবার তাকিয়ে দেখুন, সারি সারি শুয়ে থাকা শরীরগুলো৷ ওগুলো কি? মোটেই পুরুষ কিংবা মহিলা নয়৷ ওদের নিজস্ব কোন বৈশিষ্ট্য নেই৷ ওরা শুধুই দেহ!’

মেজর ব্যারী সপ্রশংস সুরে বললেন, ‘ওদের মধ্যে কয়েকটা মেয়ের চেহারা দেখবার মতো! যদিও একটু রোগার দিকে৷’

পোয়ারো জোরালো কণ্ঠে বললেন, ‘সুন্দর চেহারা মানছি, কিন্তু কি আবেদন আছে এর? কি রহস্য আছে? আমি, আমি বৃদ্ধ সেকেলে লোক৷ যখন আমি ছোট ছিলাম, তখন বড়জোর গোড়ালিটুকু দেখা যেতো৷ সফেন সেমিজের সামান্য আভাস লুব্ধ করার মতো৷ পায়ের গোছের মসৃণ স্ফীতি—হাঁটু—মোজা বাঁধার ফিতে—’

‘দুষ্টু, দুষ্টু৷’ কর্কশ স্বরে বলে উঠলেন মেজর ব্যারী৷

‘আজকাল আমরা যে সব পোশাক পরি, তা অনেক বেশি মনোজ্ঞ৷’ মিস ব্রুস্টার বললেন৷

‘নিশ্চয়ই মঁসিয়ে পোয়ারো’, বললেন মিসেস গার্ডেনার, ‘আমার তো মনে হয়, জানেন, যে আজকালকার ছেলেমেয়েরা অনেক বেশি স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করে৷ একসঙ্গে মিলে হৈ-হৈ করে বেড়ায়, আর ওরা—মানে, ওরা—’মুখের রক্তিম আভাসে মিসেস গার্ডেনারের মনের পরিচয় পাওয়া গেলো, ‘ওরা এই মেলামেশার ফলাফলের কথা একেবারেই চিন্তা করে না, বুঝতেই তো পারছেন?’

‘আপনি ঠিকই বলেছেন৷’ এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘রীতিমতো দুঃখের কথা৷’

‘দুঃখের কথা?’ মিসেস গার্ডেনার তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন৷

সমস্ত সুখকল্পনা, সমস্ত রহস্যের অপমৃত্যু—দুঃখেরী কথা নয়? আজকাল সব কিছুরই মানদণ্ড নির্দিষ্ট হয়ে গেছে৷’ তিনি হাত তুলে অর্ধশায়িত দেহগুলোর দিকে নির্দেশ করলেন, ‘ওই শরীর গুলো এই মুহূর্তে আমাকে প্যারিসের ‘লাশ-রাখা-ঘর’-এর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে৷’

‘মঁসিয়ে পোয়ারো৷’ মিসেস গার্ডেনার অস্বস্তি-অনুযোগের সুরে বলে উঠলেন৷

‘দেহ পাথরে ওপর সাজানো—অনেকটা মাংসের দোকানের মতো৷’

‘কিন্তু, মঁসিয়ে পোয়ারো, এ বড্ড কষ্টকল্পিত, তাই না?’

এরকূল পোয়ারো স্বীকার করলেন৷

‘হ্যাঁ—হয়তো৷’

‘তা হলেও,’ মিসেস গার্ডেনার দ্রুত হাতে বুনতে শুরু করলেন, ‘একটা বিষয়ে আমি আপনার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত যে সব মেয়েরা এভাবে খালি গায়ে রোদে শুয়ে থাকে, তাদের হাতে পায়ে অতিরিক্ত লোম জন্মাতে বাধ্য৷ আমি সেই কথাই বলেছি আমার মেয়ে আইরীনকে, মঁসিয়ে পোয়ারো৷ আইরীনকে বলেছি, তুমি যদি এভাবে খালি গায়ে রোদে শুয়ে থাকো, তাহলে তোমার সারা শরীরে লোমে ছেয়ে যাবে, হাতে লোক হবে, পায়ে লোম হবে, বুকে লোম হবে, আর তখন তোমাকে কিরকম দেখাবে বলো তো? আমি ওকে বলেছি৷ বলিনি ওডেল?’

‘হ্যাঁ, সোনা৷’ বললেন মিঃ গার্ডেনার৷

কিছুক্ষণ সকলেই চুপচাপ৷ সম্ভবত আইরীনের চূড়ান্ত বিপর্যস্ত চেহারাটা তাঁরা মনে মনে কল্পনা করার চেষ্টা করছিলেন৷

মিসেস গার্ডেনার এবার তাঁর সেলাই গুছিয়ে নিলেন, বললেন, ‘তাই ভাবছি—’

মিঃ গার্ডেনার বললেন, ‘কি হলো, সোনা?’

তিনি দোলনা চেয়ার ছেড়ে উঠে এলেন এবং হাত বাড়িয়ে মিসেস গার্ডেনারের কাছ থেকে সেলাই ও সেলাইয়ের বইটা নিলেন৷ তিনি জিগ্যেস করলেন, ‘মিস ব্রুস্টার, আসবেন নাকি, একসঙ্গে বসে একটু গলা ভেজানো যাক?’

‘না, এখন নয়, ধন্যবাদ৷’

গার্ডেনারা হোটেলের দিকে এগিয়ে চললেন।

মিস ব্রুস্টার বললেন, ‘মার্কিন স্বামীরা দারুণ চমৎকার৷’

মিসেস গার্ডেনারের শূন্যস্থান পূরণ করলেন ধর্মযাজক স্টিফেন লেন৷

তাঁর পঞ্চাশস্পর্শী দীর্ঘকায় শরীরে সতেজ আভাস সুষ্পষ্ট৷ মুখের রঙ তামাটে, পরনের গাঢ় ধূসর প্যান্টে অবসরসুলভ অগোছালো ছাপ৷

তিনি উৎসাহভরে বললেন, ‘চমৎকার জায়গা৷ লেদারকোম্ব উপসাগর থেকে হারফোর্ড পর্যন্ত গিয়েছিলাম, আর ফেরার সময় পাহাড়ি রাস্তা ধরে ফিরে এলাম৷’

‘আজকের দিনে হেঁটে বেড়ানো পরিশ্রমের কাজ৷’ বললেন মেজর ব্যারী৷ হাঁটাহাঁটি তিনি একদম পছন্দ করেন না৷

‘ভালো ব্যায়াম৷’ মিস ব্রুস্টার বললেন, ‘এখনও আমার নৌকো নিয়ে বেরোনো হলো না৷ পেটের পেশীর পক্ষে নৌকো চালানোর চেয়ে ভালো ব্যায়াম নেই৷’

পোয়ারোর বিষণ্ণ দৃষ্টি ধীরে ধীরে নেমে এলো নিজের স্ফীত মধ্যদেশের দিকে৷

মিস ব্রুস্টার সেটা লক্ষ্য করে সান্ত্বনার সুরে বললেন, ‘রোজ যদি নৌকো নিয়ে বেরোন, তাহলে আপনার ওই ভুঁড়ি দিন কয়েকের মধ্যেই মিলিয়ে যাবে, মঁসিয়ে পোয়ারো৷’

‘মাপ করবেন, মাদামোয়াজেল, নৌকো জিনিসটাকে আমি অত্যন্ত অপছন্দ করি৷’

‘ছোট নৌকো?’

‘উঁহু, বড়-ছোট সব রকমের নৌকো৷’ চোখ বুজে শিউরে উঠলেন তিনি, ‘সমুদ্রের দুলনি মোটেই সুখের নয়৷’

‘কি বললেন৷ সমুদ্র আজ পুকুরে মতো শান্ত৷’

পোয়ারো প্রত্যয়ের সুরে উত্তর দিলেন, ‘শান্ত সমুদ্র বলে সত্যি কিছু নেই, মাদমোয়াজেল৷ সর্বদা, সব সময়, সেখানে রয়েছে আলোড়ন৷’

‘যদি আমাকে জিগ্যেস করেন, তাহলে বলবো সমুদ্র-রোগের দশ ভাগের ন’ভাগই হচ্ছে স্নায়ুর ব্যাপার৷’ বললেন মেজর ব্যারী৷

‘এই তো,’ সামান্য হেসে ধর্মযাজক বললেন, ‘একজন অভিজ্ঞ নাবিকের কথা শুনুন—ঠিক বলেছি তো, মেজর?’

‘একবারই মাত্র অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম—ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার সময়৷ সমুদ্র-রোগ জিনিসটাকে মনে একেবারেই আমল দেবেন না, এই হলো আমার মত৷’

‘সমুদ্র-রোগ ভারী, অদ্ভুত৷’ আনমনা সুরে বললেন মিস ব্রুস্টার, ‘সবার না হয়ে এ রোগ কারো কারো হয় কেন? এ ভারি অন্যায়৷ নিজের স্বাস্থ্যের ওপর তো কারো হাত নেই৷ রীতিমতো রুগ্ন চেহারার লোকও দক্ষ নাবিক হয়৷ একজন আমাকে বলেছিলেন, এ রোগের সঙ্গে নাকি শিরদাঁড়ায় কি একটা যোগ আছে৷ আবার অনেকে দেখি—উঁচু জায়গা একেবারেই সহ্য করতে পারে না৷ আমি নিজেও ওই দলের, কিন্তু মিসেস রেডফার্নের অবস্থা আরও খারাপ৷ এই তো সেদিন হারফোর্ডের পাহাড়ি পথে হঠাৎ মাথা ঘুরে গিয়ে তিনি আমাকে জড়িয়েই ধরলেন৷ তাঁর মুখেই শুনেছি, একেবার মিলান গীর্জা থেকে নামার পথে মাঝ-সিঁড়িতে তিনি আটকে পড়েছিলেন৷ ওঠার সময় কোনরকম চিন্তা না করেই উঠে গেছেন, কিন্তু নামার সময়েই হয়েছে বিপদ৷’

‘তাহলে পিক্সি কোভে নামার মইটা তাঁর ব্যবহার না করাই উচিত৷’ মন্তব্য করলেন স্টিফেন লেন৷

মিস ব্রুস্টার একটা মুখভঙ্গী করলেন৷

‘ওটাকে আমিও ভয় করি৷ অবশ্য ছোটদের পক্ষে মইটা ঠিক আছে৷ কাওয়ান আর মাস্টারম্যানদের ছেলেরা তো ওটা বেয়ে দৌড়ে ওঠা-নামা করতে ভালোবাসে৷’

লেন বললেন, ‘ওই যে, মিসেস রেডফার্ন স্নান সেরে ফিরে আসছেন৷’

মিস ব্রস্টার মন্তব্য করলেন, ‘ওঁকে মঁসিয়ে পোয়ারোর পছন্দ হওয়া উচিত৷ উনি সূর্যস্নান করেন না৷’

তরুণী মিসস রেডফার্ন তখন মাথা থেকে রবারের টুপিটা খুলে চুল ঝাড়ছিলো৷ ওর মাথার চুল ছাই-রঙা এবং ত্বকের রঙ চুলের সঙ্গে মানানসই মৃত-পাণ্ডুর৷ হাত ও পায়ের রঙ অত্যন্ত সাদা৷

কর্কশ চাপা হাসিতে মুখ খুললেন মেজর ব্যারী, ‘অন্যান্যদের তুলনায় রোদে একটু কম ভাজা হয়েছেন, তাই না?’

একটা দীর্ঘ স্নান-পোশাকে নিজেকে আবৃত করে ক্রিস্টিন রেডফার্ন বেলাভূমি ধরে এগিয়ে এলো ওঁদের দিকে, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলো৷

ওর সুন্দর মুখে গম্ভীর ছায়া৷ সুন্দর, তবে বিরুদ্ধ অর্থে, এবং হাত-পায়ের গড়ন ছোট হলেও নিখুঁত৷

ওঁদের দিকে চেয়ে হাসলো ক্রিস্টিন, স্নান-পোশাকটাকে শরীরে ভালো করে জড়িয়ে ওঁদের পাশে এসে বসলো৷

মিস ব্রুস্টার বললেন, ‘আপনি মঁসিয়ে পোয়ারোর মূল্যবান প্রশংসা অর্জন করেছেন৷ যার সূর্যস্নান করে তাদের তিনি একদম পছন্দ করেন না৷ বলছেন, তাদের অনেকটা কসাইয়ের দোকানে সাজানো মাংসের মতো দেখায়—৷’

ক্রিস্টিন রেডফার্ন বিষণ্ণভাবে হাসলো, বললো, ‘যদি সত্যি সূর্যস্নান করতে পারতাম! কিন্তু তাতে আমার গায়ের রঙ বাদামি হয় না, শুধু ফোস্কা পড়ে, আর সারা হাতে বিশ্রী ফোঁটা ফোঁটা দাগ পড়ে যায়৷’

‘মিসেস গার্ডেনারের আইরীনের মতো সারা গায়ে চুল গজানোর চেয়ে তবু ভালো৷’ মিস ব্রুস্টার বললেন৷ ক্রিস্টিনের সপ্রশ্ন দৃষ্টির উত্তরে তিনি বলে চললেন, ‘মিসেস গার্ডেনার আজ সকালে দারুণ মেজাজে ছিলেন৷ একেবারে এক নাগাড়ে চালিয়ে গেছেন৷ ‘তাই না, ওডেল?’ ‘হ্যাঁ, সোনা৷’ একটু থেমে তিনি বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনি ওঁর সঙ্গে একটু চালাকি করলে পারতেন৷ কেন করলেন না? বললেন, না কেন, আপনি এখানে একটা নৃশংস খুনের সমাধান করতে এসেছেন, আর সেই উন্মাদ হত্যাকারীকে নিঃসন্দেহে হোটেলের অতিথিদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে?’

পোয়ারো দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, বললেন, ‘তিনি হয়তো সেটা বিশ্বাস করে বসতেন৷’

মেজর ব্যারী সশব্দ নিঃশ্বাসে হেসে উঠলেন৷ তিনি বললেন, ‘নির্ঘাত বিশ্বাস করতেন৷’

এমিলি ব্রুস্টার বললেন, ‘না, আমার মনে হয় না, মিসেস গার্ডেনারের মতো মানুষও এখানে ঘটেছে এমন কোন খুনের কথা বিশ্বাস করতেন৷ কারণ, এটা ঠিক সে ধরনের জায়গা নয় যেখানে আপনি মৃতদেহ পাবেন৷’

পোয়ারো চেয়ারে সামান্য নড়েচড়ে বসলেন৷ প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বললেন, ‘কিন্তু কেন নয়, মাদমোয়াজেল? এই স্মাগলার্স দ্বীপে আপনার ভাষায় ‘মৃতদেহ’ পাওয়ার কোন অসুবিধেটা আপনি দেখলেন?’

এমিলি ব্রুস্টার বললেন, ‘কি জানি, আমার মনে হয়, কতকগুলো জায়গা খুনের পক্ষে ঠিক উপযুক্ত নয়৷ এটা সেরকম জায়গা নয়, যেখানে—’ নিজের বক্তব্যকে পরিষ্কার করে বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে চুপ করে গেলেন তিনি৷

‘জায়গাটা স্বপ্নময়, মানছি৷’ সম্মতি জানালেন এরকুল পোয়ারো, ‘এখানে রয়েছে শান্তি৷ রয়েছে উজ্জ্বল কিরণ, গভীর নীল সমুদ্র৷ কিন্তু আপনি ভুলে যাচ্ছেন, মিস ব্রুস্টার পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে আছে অশুভ শক্তির ছায়া৷’

ধর্মযাজক লেন চেয়ারে নড়েচড়ে বসলেন৷ সামনে ঝুঁকে এলেন তিনি৷ তাঁর গভীর নীল চোখ চকচক করে উঠলো৷

মিস ব্রুস্টার কাঁধ ঝাঁকালেন৷

‘ও, হ্যাঁ, সে কথা মিথ্যে নয়, কিন্তু তবুও—’

‘কিন্তু তবুও আপনার মনে হচ্ছে, এ জায়গাটা কোন অপরাধ সংঘটিত হবার পক্ষে ঠিক উপযুক্ত নয়? আপনি একটা কথা ভুলে যাচ্ছেন, মাদমোয়াজেল৷’

‘মানব-চরিত্রের কথা বোধ হয়?’

‘হ্যাঁ, সেটাই প্রথম এবং শেষ কথা৷ কিন্তু সে কথা আমি বলতে চাইনি৷ আমি আপনাকে মনে করিয়ে দিতে যাচ্ছিলাম, যে এখানে প্রত্যেকেই ছুটিতে বেড়াতে এসেছেন৷’

এমিলি ব্রুস্টার বিহ্বল চোখে তাকালেন তাঁর দিকে৷

‘ঠিক বুঝলাম না৷’

এরকুল পোয়ারো করুণার হাসি হাসলেন৷ শূন্যে তর্জনী নাচিয়ে বোঝাতে চাইলেন তাঁর বক্তব্যের ইঙ্গিত৷

‘মনে করা যাক, আপনার কোন শত্রু আছে৷ এখন, আপনি যদি তাঁর বাড়িতে, অফিসে বা রাস্তায় তাঁকে খোঁজ করেন, তাহলে আপনাকে যথেষ্ট উপযুক্ত কারণ দেখাতে হবে৷ কৈফিয়ৎ দিতে হবে আপনাকে৷ কিন্তু এখানে, এই সমুদ্রতীরে উপস্থিতির জন্য কাউকেই কৈফিয়ৎ দিতে হবে না৷ আপনি লেদারকোম্ব উপসাগরে এসেছেন—কেন? উত্তর অতি সহজ৷ এখন আগস্ট মাসে—লোকে এই আগস্ট মাসেই ছুটি কাটাতে সমুদ্রতীরে বেড়াতে যায়৷ সুতরাং আপনার এখানে আসাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক, যেমন স্বাভাবিক মিঃ লেন ও মেজর ব্যারীর এখানে আসা, অথবা মিসস রেডফার্ন ও তাঁর স্বামীর এখানে বেড়াতে আসা৷ কারণ আগস্ট মাসে সমুদ্রতীরে ছুটি কাটাতে আসাটা ইংল্যান্ডের রীতি৷’

‘হ্যাঁ, আপনার কথা অস্বীকার করা যায় না৷’ স্বীকার করলেন মিস ব্রুস্টার, ‘কিন্তু গার্ডেনারদের সম্পর্কে আপনি কি বলবেন? ওরা তো মার্কিনিয়৷’

পোয়ারো মৃদু হাসলেন৷

‘মিসেস গার্ডেনারও বিশ্রামের প্রয়োজন অনুভব করেন, তিনি নিজেই আমাদের বলেছেন৷ যেহেতু তিনি গোটা ইংল্যান্ডটা ঘুরে দেখেছেন, সেহেতু এই সমুদ্রতীরে তাঁর সপ্তাদুয়েক কাটানো উচিত—অন্য কোন কারণে না হলেও অন্তত ভালো টুরিস্ট হিসেবে৷ তাছাড়া তিনি বিভিন্ন ধরনের মানুষ দেখতে ভালোবাসেন৷’

মিসেস রেডফার্ন অস্ফুট স্বরে বললো, ‘আপনিও তো মানুষ দেখতে ভালোবাসেন, তাই না?’

‘মাদাম, সে কথা আমি স্বীকার করি৷ আমি মানুষ দেখতে ভালোবাসি!’

ও চিন্তিত সুরে বললো, ‘আপনি—অনেক বেশি দেখতে পান৷’

কিছুক্ষণ নীরবতা৷ স্টিফেন লেন সশব্দে গলা-খাঁকারি দিয়ে অপ্রতিভ কণ্ঠে বললেন, ‘মঁসিয়ে পোয়ারো, এইমাত্র যে কথাগুলো আপনি বললেন, সে সম্পর্কে আমি একটু কৌতূহলী৷ আপনি বলেছেন, পৃথিবীর সর্বত্রই অপরাধ সংঘটিত হয়৷ আপনার এই কথাগুলোর সঙ্গে বাইবেলের ‘ইিক্লিসিয়াস্তেস’ অধ্যায়ের একটি উদ্ধৃতির বিশেষ মিল রয়েছে৷’ এক মুহূর্তে থামলেন তিনি৷ তারপর স্পষ্ট স্বরে ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন, ‘সত্য, মানুষের প্রতিটি পুত্রের হৃদয় অপরাধ-বাসনায় পরিপূর্ণ এবং জীবৎকালে অপ্রকৃতিস্থতা তাদের হৃদয়ের সহিত ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে৷’ তাঁর মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠলো ধর্মীয় দীপ্তিতে, ‘আপনার মুখে এ কথা শুনে আমি অত্যন্ত খুশি হয়েছি৷ আজকাল অশুভ শক্তিতে কেউই বিশ্বাস করে না৷ এটাকে বড়জোর শুভর বিপরীত হিসাবে বিচার করা হয় মাত্র৷ লোকে বলে, অসৎ কাজ তারাই করে যায়া অজ্ঞ—বুদ্ধিজ্ঞানে যারা অসম্পূর্ণ—যাদের দোষারোপ করার বদলে করুণা করা উচিত৷… কিন্তু মঁসিয়ে পোয়ারো, অশুভ শক্তির অস্তিত্ব আছে৷ এটা বাস্তব সত্য৷ আমি যেমন শুভতে বিশ্বাস করি তেমনি বিশ্বাস করি, তেমনি বিশ্বাস করি অশুভে৷ এর প্রভাব আছে, আছে নিজস্ব ক্ষমতা৷ পৃথিবী জুড়ে বিস্তৃত এর রাজত্ব!’

তিনি থামলেন৷ তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন হয়ে উঠেছে৷ রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছে তিনি হঠাৎ ক্ষমাপ্রার্থীর দৃষ্টিতে তাকালেন৷

‘দুঃখিত৷ একটু আত্মবিস্মৃত হয়ে পড়েছিলাম৷’

পোয়ারো শান্ত স্বরে বললেন, ‘আপনার বক্তব্যের অর্থ আমি বুঝতে পারছি৷ আপনার সঙ্গে আমি আংশিকভাবে একমত৷ অশুভের রাজত্ব সারা পৃথিবীতে রয়েছে এবং তার স্বরূপ আমাদের অজানা থাকে না৷’

মেজর ব্যারী গলা-খাঁকারি দিলেন৷

‘ভারতবর্ষের কয়েকজন ফকিরও এ ধরনের কথা বলেছিলেন।’

সুদীর্ঘ ভারতীয় কাহিনীর প্রতি তাঁর সর্বনাশা প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রত্যেকের সাবধান হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট দিনই জলি রজারে কাটিয়েছেন মেজর ব্যারী৷ সুতরাং, মিস ব্রুস্টার ও মিসেস রেডফার্ন দুজনেই বক্তব্যে ঝাঁপিয়ে পড়লেন৷

‘ওই যে আপনার স্বামী সাঁতরে ফিরে আসছেন, তাই না, মিসেস রেডফার্ন? ওঁর হাত টানার ভঙ্গী দেখবার মতো৷ ভীষণ ভালো সাঁতারু আপনার স্বামী৷’

প্রায় একই সঙ্গে বললো মিসেস রেডফার্ন! ওই দেখুন! লাল রঙের পাল দেওয়া কি সুন্দর ছোট্ট একটা নৌকো! ওটা তো মিঃ ব্ল্যাটের, তাই না?’

লাল পালের নৌকোটা তখন উপসাগরের সীমানা অতিক্রম করছে৷

মেজর ব্যারী ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে বললেন, ‘আজব পছন্দ, লাল-রঙা-পাল, কিন্তু ফকির-কাহিনী আতঙ্ক এরানো গেলো৷

এইমাত্র যে যুবকটি সাঁতরে পাড়ে এসে পৌঁছেছে এরকুল পোয়ারো সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকে দেখছিলেন৷ প্যাট্রিক রেডফার্ন মানুষের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত৷ দীর্ঘকায় তামাটে শরীর৷ প্রশস্ত কাঁধ, সুগঠিত সঙ্কীর্ণ ঊরু৷ তাকে ঘিরে রয়েছে একটা সংক্রামক হাসিখুশি আনন্দের ঢেউ—একটা সহজাত সারল্য, যা তাকে সমস্ত মহিলা ও অধিকাংশ পুরুষের কাছে করে তুলেছে প্রিয়৷

সৈকতে দাঁড়িয়ে শরীরে জল ঝাড়ছিলো সে; খুশিতে হাত নেড়ে ইশারা করলো স্ত্রীর দিকে৷

প্রতি ইশারা ফিরিয়ে দিলো, ক্রিস্টিন, ডেকে উঠলো, ‘এখানে এসো প্যাট৷’

‘আসছি৷’

বালিতে পড়ে থাকা তোয়ালেটা তুলে নিয়ে সৈকত ধরে আরও কিছুটা এগিয়ে গেলো প্যাট্রিক৷

ঠিক সেই মুহূর্তে একজন মহিলা হোটেলের দিক থেকে তাঁদের অতিক্রম করে নেমে গেলো বেলাভূমির দিকে৷

তার উপস্থিতিতে ছিলো নাটকীয় আবির্ভাবের সমস্ত বৈশিষ্ট্য৷

উপরন্তু, তার চলার ছন্দ জানিয়ে দিচ্ছে, এ তার অজানা নয়৷ আত্ম-সচেতনভাব আপাতদৃষ্টিতে সেখানে অদৃশ্য৷ এটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক, তার উপস্থিতির নাটকীয় প্রভাব তার কাছে নতুন কিছু নয়৷

সে তম্বী ও দীর্ঘকায়৷ পরনে সাধারণ পিঠখোলা সাদা সাঁতারে পোশাক, এবং তার শরীরে উন্মুক্ত প্রতিটি অংশে সূর্যস্নানের সুষম ব্রোঞ্চ-প্রলেপ৷ কোন ভাস্কর্যের মতোই নিখুঁত তার গড়ন৷ উজ্জ্বল আগুন রঙ চুল ঘাড়ের কাছে এসে নিয়েছে ঘনিষ্ঠ অন্তর্মুখী বাঁক৷ মুখমণ্ডলে সামান্য কাঠিন্য, তিরিশটা বছর এসে আবার বিদায় নিলে যা চোখে পড়ে, কিন্তু সব মিলিয়ে সেখানে টানা, এবং এক চৈনিক স্থৈর্য ছড়িয়ে রয়েছে সারা সুখে৷ মাথায় তার যমজ-সবুজ পিচবোর্ডের এক স্বপ্নময় চীনে টুপি৷

মহিলাটির মধ্যে এমন কিছু একটা ছিলো, যা সৈকতে উপস্থিত অন্যান্য মহিলাদের করে দিলো তুচ্ছ ও নিষ্প্রভ৷ এবং সমান অনিবার্যতায় উপস্থিত প্রতিটি পুরুষের চোখে আকর্ষিত হয়ে গেঁথে গেলো তার শরীরে৷

এরকুল পোয়ারোর চোখ পুরোপুরি খুলে গেলো, তাঁর গোঁফজোড়া নেচে উঠলো নীরব প্রশংসায়, মেজর ব্যারী সোজা হয়ে বসলেন, এবং তাঁর বিস্ফারিত চোখ আরও বিস্ফারিত হলো৷ পোয়ারোর বাঁ দিকে ধর্মযাজক স্টিফেন লেন সশব্দে গভীর শ্বাস নিলে এবং তাঁর শরীরের প্রতিটি পেশী হয়ে উঠলো কঠিন৷

মেজর ব্যারী কর্কশ ফিসফিস স্বরে বললেন, ‘আর্লেনা স্টুয়ার্ট (মার্শালকে বিয়ে করার আগে ওঁর নাম তাই ছিলো) অভিনয় ছেড়ে দেবার আগে ওঁর শেষ নাটক ‘কাম অ্যান্ড গো’ আমি দেখেছিলাম৷ দেখবার মতোই চেহারা বটে, কি বলেন?’

ক্রিস্টিন রেডফার্ন ধীরে স্বরে বললো৷ ওর কন্ঠে শীতলতার পরশ, ‘ও সুন্দরী—সত্যি৷ তবে ওকে দেখে—পশু বলে মনে হয়!’

এমিলি ব্রুস্টাব আচমকা বলে উঠলেন, ‘এইমাত্র আপনি অশুভ শক্তির কথা বলছিলেন, মঁসিয়ে পোয়ারো৷ আমরা ধারণা এই মেয়েটা সেই অশুভ শক্তির মানবী রূপ৷ ওর মধে এতটুকুও ‘ভালো’র ছোঁয়া নেই৷ ঘটনাচক্রে ওর সম্পর্ক অনেক কিছুই আমি জানি৷’

মেজর ব্যারী স্মৃতি রোমন্থনের সুরে বললেন, ‘সিমলার একটি মেয়ের কথা আমার মনে পড়ছে৷ ওর মাথার চুলও ছিলো লাল৷ জনৈক নিম্নপদস্থ সৈনিকের বউ ছিলো মেয়েটা৷ যদি জানতে চান ও সেখানে কোন অশান্তির সৃষ্টি করেছিলো কিনা, তাহলে বলবো, হ্যাঁ, করেছিলো৷ পুরুষেরা ওর জন্য পাগল হয়ে যেতো। স্বাভাবিক কারণেই, অন্যান্য মহিলারা সুযোগ পেলে ওর চোখ উপড়ে নিতে ছাড়তো না৷ মেয়েটা বহু সংসার ছারখার করে দিয়েছিলো৷’

তিনি স্মৃতিচারণের চাপা হাসি হাসলেন৷

‘স্বামীটা ছিল শান্তশিষ্ট চমৎকার মানুষ৷ বউকে প্রায় পুজোই করতো৷ ওর কোন অন্যায় সে দেখতে পেতো না—অথবা, দেখেও না দেখার ভান করতো৷’

তীব্র আবেগভরা চাপা স্বরে স্টিফেন লেন বললেন, ‘এই ধরনের মেয়েরা সমাজের পক্ষে ভীষণ—ভীষণ ক্ষতিকর—’

থামলেন তিনি৷

আর্লেনা স্টুয়ার্ট ইতিমধ্যে জলের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে: দুজন যুবক, সবেমাত্র কৈশোরের সীমারেখা পেরিয়েছে চট করে উঠে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে এগিয়ে এসেছে ওর দিকে৷ তাদের দিকে হাসি মুখে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো ও৷

ওর দৃষ্টি যুবক দুজনকে অতিক্রম করে পড়লো সৈকত ধরে এগিয়ে আসা প্যাট্রিক রেডফার্নের দিকে৷

এরকুল পোয়ারো ভাবলেন, ব্যাপারটা যেন অনেকটা কম্পাসের কাঁটা পর্যবেক্ষণ করার মতো৷ প্যাট্রিক রেডফার্নের গতিপথের বিচ্যুতি ঘটলো, তার পা-জোড়া দিক পরিবর্তন করলো৷ চুম্বক-বিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী কম্পাসের কাঁটা সর্বদা উত্তরমুখী হবেই৷ প্যাট্রিক রেডফার্নের পা তাকে নিয়ে এলো আর্লেনা স্টুয়ার্টের কাছে৷

প্যাট্রিকের দিকে তাকিয়ে ও তখন অল্প অল্প হাসছে৷ তারপর ঢেউয়ের পাশাপাশি পা ফেলে ধীরে ধীরে সৈকত ধরে ও এগিয়ে চললো৷ প্যাট্রিক রেডফোর্ন ওর সঙ্গ নিলো৷ একটা পাথরের পাশে শরীর এলিয়ে শুয়ে পড়লো ও৷ রেডফার্ন বসলো ও-পাশে৷

আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে হোটেলে ঢুকে পড়লো ক্রিস্টিন রেডফান!

ও চলে যাবার পর একটা অস্বস্তিকর নীরবতা ক্ষণেকের জন্য জমাট বেঁধে রইলো৷

তারপর এমিলি ব্রুস্টার বললেন, ‘সত্যি, খুব খারাপ লাগে৷ ও ভীষণ ভালো মেয়ে৷ মাত্র বছর কয়েক হলো ওদের বিয়ে হয়েছে৷’

‘যে মেয়েটার কথা আমি বলছিলাম,’ বললেন মেজর ব্যারী, ‘সিমলার মেয়েটা৷ ও বেশ কয়েকটা সত্যিকারের সুখের বিয়ে বিগড়ে দিয়েছিলো৷ দুঃখের কথা, কি বলেন?’

‘এক ধরনের মেয়ে আছে,’ বললেন, মিস ব্রুস্টার, ‘যারা পরে সংসার ভেঙে দিতে ভালোবাসে৷’ মিনিট কয়েক থেমে তিনি যোগ করলেন, ‘প্যাট্রিক রেডফার্ন এক নম্বরের বোকা৷’

এরকুল পোয়ারা নীরব রইলেন৷ তিনি একদৃষ্টে চেয়ে ছিলেন বেলাভূমির দিকে, কিন্তু প্যাট্রিক রেডফার্ন বা আর্লেনা স্টুয়ার্ট তাঁর লক্ষ্য ছিল না৷

মিস ব্রুস্টার বললেন, ‘আচ্ছা, আমি বরং যাই নৌকো নিয়ে বেরিয়ে পড়ি৷’ তিনি বিদায় নিলেন৷

মেজর ব্যারী ঘুরে তাকালেন পোয়ারোর দিকে৷ তাঁর বিস্ফারিত চোখে চাপা উত্তেজনা ও কৌতূহল৷

‘বলুন, মঁসিয়ে পোয়ারো, কি এত ভাবছেন? আপনি তো কই মুখ খুললেন না? এই অপ্সরাটি সম্পর্কে আপনার কি ধারণা? জব্বর চিজ?’

পোয়ারো বললেন, ‘হয়তো তাই৷’

‘ঝেড়ে কাশুন, মশাই৷ আপনাদের ফরাসীদের আমি হাড়ে হাড়ে চিনি!’

পোয়ারো শীতল স্বরে বললেন, ‘আমি ফরাসী নই!’

‘তা বলে এ কথা বলবেন না, সুন্দরী মেয়েরা আপনার নজর কাড়ে না! ওঁকে দেখে কি মনে হয় আপনার, হুঁ?’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘উনি মোটেই তরুণী নন৷’

‘তাতে কি আসে যায়? একজন মহিলার চোহারা দেখে যা মনে হয়, তাঁর বয়েস ঠিক তাই! ওঁর চেহারার কোন গলতি নেই৷’

এরকুল পোয়ারো সম্মতির মাথা নাড়লেন৷ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, উনি সুন্দরী৷ কিন্তু সৌন্দর্যই শেষ কথা নয়৷ সৈকতে উপস্থিত প্রত্যেকে একজন বাদে যে তাঁর দিকে তাকিয়েছে, তার কারণ সৌন্দর্য নয়৷’

‘ওটাই একমাত্র কারণ, মশাই,’ বললেন মেজর, ‘ওটাই একমাত্র কারণ৷’

তারপর হঠাৎ কৌতূহলী কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘কিন্তু সেই তখন থেকেই একদৃষ্টে আপনি কি দেখছেন বলুন তো?’

এরকুল পোয়ারো উত্তর দিলেন, ‘আমি তাকিয়ে আছি ব্যতিক্রমটির দিকে৷ সেই একমাত্র মানুষটির দিকে যিনি ভদ্রমহিলা যাওয়ার সময় চোখ তুলে তাকাননি৷’

পোয়ারোর দৃষ্টিতে অনুসরণ করে সেই ব্যতিক্রমটির দিকে তাকালেন মেজর ব্যারী৷ ভদ্রলোকের বয়েস প্রায় চল্লিশ, শান্ত সুন্দর মুখশ্রী, মাথায় হালকা রঙের চুল, গায়ের রঙ তামাটে৷ ঠোঁটে তাঁর ধূমায়িত পাইপ, চোখের নজর হাতের ‘দি টাইম্‌স্‌’এ নিবদ্ধ।

‘ওঃ, উনি!’ মেজর ব্যারী বললেন, ‘উনিই হলেন আমাদের স্বামীদেবতা মশাই৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল৷’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘হ্যাঁ, জানি৷’

মেজর চাপা হাসি হাসলেন৷ তিনি নিজে অবিবাহিত৷ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গীতে যে কোন ‘স্বামী’র ভূমিকা মাত্র তিন রকমের—‘প্রতিবন্ধক’, ‘অসুবিধে সৃষ্টিকারী’, অথবা ‘রক্ষাকর্তা’৷

তিনি বললেন, ‘দেখে মনে হয় চমৎকার লোক৷ শান্তশিষ্ট৷ আমার ‘টাইমস্’ ‘টা দিয়ে গেলো কিনা কে জানে?’

উঠে দাঁড়িয়ে তিনি পা বাড়ালেন হোটেলের দিকে৷

পোয়ারো ধীরে ধীরে তাঁর দৃষ্টি সরিয়ে স্টিফেন লেনের দিকে তাকালেন৷

স্টিফেন লেন আর্লেনা মার্শাল ও প্যাট্রিক রেডফার্নকে লক্ষ্য করছিলেন হঠাৎই তিনি ফিরে তাকালেন পোয়ারোর দিকে৷ তাঁর দু চোখে ঝিলিক মারলো বিতৃষ্ণার তীব্র আলো৷

তিনি বললেন, ‘এই মেয়েছেলেটার রন্ধ্রে রন্ধ্রে শয়তান বাসা বেঁধেছে৷ আপনার কি এতে কোন সন্দেহ আছে?’

পোয়ারো ধীরে স্বরে উত্তর দিলেন, ‘এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া শক্ত৷’

স্টিফেন লেন বললেন, ‘কিন্তু আশ্চর্য মঁসিয়ে পোয়ারো৷ আপনি কি বাতাসে এর উপস্থিতি টের পাচ্ছেন না? আপনার চারপাশে? অশুভের উপস্থিতি?’

ধীরে মাথা দুলিয়ে নীরব সম্মতি জানালেন এরকুল পোয়ারো৷