গল্প
উপন্যাস

শুধু যাওয়া আসা – ১২

বার

রয় সম্বন্ধে আমার রাতের আশঙ্কা যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, পরদিন সকালেই সেটা বুঝতে পারলাম৷ কারণ দেখলাম, ওর ব্যবহার আবার সেই আগের মতোই হাসি খুশি ও উচ্ছল হয়ে উঠেছে৷

গতকাল ওর সেই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ও আমার উপর অসন্তুষ্ট হয়েছিল৷ কাল সারারাত শুয়ে শুয়ে রয় হয়তো এই ব্যবসার কথাই ভেবেছে শেষে হয়তো বুঝেছে আমার কথাই ঠিক—ওসব ঝামেলার জড়িয়ে আখেরে কোন লাভ হবে না৷

রোজকার মতো আজও সন্ধেবেলা আমরা তাস নিয়ে বসলাম৷ নিজেদের মধ্যে হার-জিত নিয়ে ঠাট্টা-ইয়ার্কিও করলাম৷ গতদিনের আলোচনা বাদ দিয়ে অন্য সবরকম আলোচনাই হল৷ রয়ও দেখলাম সে-কথা একেবারেই ভুলে গেছে৷

রয় আবার ওর পুরনো হাসি-খুশি মেজাজ ফিরে পাওয়ার অনেকটা স্বস্তিবোধ করলাম৷ তাছাড়া নিশ্চিন্ত হওয়ার আরও একটা কারণ ছিল৷ তা হল, আমার প্রতি লোলার ব্যবহার আবার ধীরে ধীরে সহজ হয়ে উঠেছে৷ সারাদিনে বার দুয়েক ও আমার সঙ্গে কথা বলেছে—যদিও পুরোপুরি ব্যবসা-সংক্রান্ত কথা—তবু কথা যে বলেছে, এতেই আমি খুশি৷

রাত প্রায় দশটার সময় লোলা বাইরের বারান্দায় এল৷ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল আমাদের তাস খেলা৷

ওকে দেখেই আহ্বান জানালাম, ‘চলে এসো, লোলা৷ একটা চেয়ার নিয়ে বসে যাও৷’

‘না, শুধু শুধু তাস খেলে আর সময় নষ্ট করব না৷ আমি শুতে চললাম৷ কাল আবার সকাল সকাল উঠতে হবে৷ ওয়েন্টওয়ার্থে গিয়ে অনেক কেনাকাটা করার আছে৷ তোমাদের মধ্যে একজন যদি আমাদের সঙ্গে যাও তো ভালো হয়৷’

একটু অবাক হলাম৷ কারণ, এ পর্যন্ত কেনাকাটার ব্যাপারগুলো লোলা একাই সেরেছে৷ তাই আজ ওর এই অনুরোধে মনে সন্দেহের দোলা লাগল৷ এর পিছনে লোলার কী কোন উদ্দেশ্য আছে?—কে জানে!

আমার ইতস্তত করার সুযোগে রয় বলে উঠল, ‘তোর যদি অসুবিধে থাকে, তো বল্—আমিই না হয় যাব৷ এখানে এসে থেকে আজ পর্যন্ত কোনদিনও তো কোথাও গেলাম না৷ ওয়েন্টওয়ার্থে গেলে আমার সুবিধেই হবে৷ কিছু জিনিসপত্র কেনার আছে—কিনে আনতে পারব৷ কী বলিস?’

আমি চমকে রয়ের দিকে তাকালাম৷ ও একটা সিগারেট ধরাচ্ছিল৷ লাইটারের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল ওর মুখ৷ কিন্তু সে-মুখের ভাব নিস্পৃহ, নিরাসক্ত, অভিব্যক্তিহীন৷ তাহলে কি এই অস্বস্তি নিতান্তই আমার দুর্বল মনের কল্পনা?

‘ঠিক আছে, যাবি তো যা না৷ তবে দুপুরের আগেই ফিরে আসিস৷ নয়তো আমি একা সামলাতে পারব না৷’

‘আমি কিন্তু সকাল আটটায় বেরোয়৷ শুভ রাত্রি৷’ বিদায় জানিয়ে লোলা বাংলোয় ফিরে চলল৷’

‘গোটাকয়েক জামা, আর একজোড়া জুতো আমাকে কিনতে হবে,’ হাতের তাসে চোখ বোলাতে বোলাতে রয় বলল৷

সঙ্গে সঙ্গে আমার মন থেকে মিলিয়ে গেল সন্দেহের ছায়া৷ সত্যিই তো, আজ পর্যন্ত রয় একদিনের জন্যও কোথাও যায়নি৷ তা ছাড়া জামা-জুতোর প্রয়োজন তো প্রত্যেকেরই হতে পারে৷ কিন্তু তবু মনে হল, লোলার সঙ্গে ও না গেলেই পারত৷

লোলার সঙ্গে রয়ের যাওয়াটাকে আমি কিছুতেই সহজভাবে মেনে নিতে পারছি না৷ কারণ আমি নিশ্চিত, সুযোগ পেলেই লোলা ওর সঙ্গে অন্তরঙ্গ হবার চেষ্টা করবে তার উপর এখান থেকে ওয়েন্টওয়ার্থে যাবার কুড়ি মাইল রাস্তা লোলা চুপচাপ বসে কাটাবে বলে তো মনে হয় না!

‘আরে, ঘাবড়াস না৷’ রয় হাত বাড়িয়ে আমার হাঁটুর এক চাপড় মারল, ‘আমি জানি, তুই কি ভাবছিস৷ কিন্তু নিশ্চিন্ত থাক, লোলা আমার সঙ্গে বিশেষ সুবিধে করতে পারবে না৷’

কাষ্ঠহাসি হেসে জবাব দিলাম, ‘না না—এতে ভাববার কী আছে৷’

মুখে একথা বললেও, পরদিন সকালে যখন দেখলাম রয় আর লোলা মার্কারি নিয়ে রওনা হচ্ছে, তখন আর একবার নিঃসঙ্গতাবোধ আমাকে আঁকড়ে ধরল৷ মনের কোনায় ঘুরতে লাগল একই সন্দেহ, একই আশঙ্কা৷

এসব চিন্তার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য স্টেশন-ওয়াগানের ইঞ্জিন নিয়ে কাজে লেগে গেলাম৷ কিন্তু তবু কি স্থির হয় আমার অশান্ত মন! লোলা ও রয়ের চিন্তা ছাড়া আর-কোন কথা আমার মনেও আসছে না৷ শেষে আমার অবস্থাও কী হবে সেই একচক্ষু হরিণের মতো!

এই সময় একটা বড় ট্রাক তেল নেবার পাম্পগুলোর কাছে এসে দাঁড়াল৷ ট্রাকে সার বেঁধে সাজানো বড় বড় কাঠের প্যাকিং বাক্স৷ ট্রাক-চালক একজন মোটাসোটা বয়স্ক লোক৷ মাথায় সোনালী চুলের কোথাও কোথাও শুভ্রতার আভাস৷ ভারী মুখমণ্ডল রোদের তাপে রক্তবর্ণ৷ মাথায় একটা স্টেটসন হ্যাট৷

ট্যাঙ্কে তেল দিচ্ছি, ড্রাইভারটা হঠাৎ ট্রাক থেকে নেমে এল৷ একটা ময়লা রুমাল দিয়ে মুখের ঘাম মুছে লোকটা কৌতূহলভরে আমার দিকে তাকাল, ‘তুমি বোধহয় এখানে নতুন এসেছ, তাই না?—জেনসন গেল কোথায়?’

লক্ষ্য করলাম, জেনসনের মতো এ লোকটাও সুইডেনের অধিবাসী৷ সুতরাং, এ যদি জেনসনের বন্ধুও হয়, তবে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই৷ তাই, খুব সতর্কভাবে ওকে জেনসনের অ্যারিজোনা যাওয়ার গল্পটা শোনালাম৷

কী কারণে জানি না, লোকটা এই গল্পটা ঠিক সহজভাবে গ্রহণ করল না৷ ওর মুখের রেখা কঠিন হয়ে উঠল, চোখদুটো হয়ে উঠল সংকীর্ণ৷

‘জেনসন কোনদিন এ জায়গা ছেড়ে গেছে বলে তো মনে পড়ে না৷ জান, গত বিশ বছর ধরে আমি এ রাস্তায় নিয়মিত যাতায়াত করি৷ যতবারই গেছি, কার্লের সঙ্গে প্রতিবারই আমার দেখা হয়েছে৷—অ্যাজিজোনায় নতুন পেট্রল-পাম্প খুলে ওর যে কি সুবিধে হবে কে জানে!—তাহলে কি ও আর এখানে ফিরবে না?’

‘হ্যাঁ, ফিরবেন৷ এখানকার সব-কিছুগোছগাছ করার জন্য তাকে একবার আসতে হবে৷’

‘ওর বউ কি ওর সঙ্গে গেছে?’

‘না, এখন উনিই এসব দেখাশোনা করছেন৷ আর আমি তাকে সাহায্য করি৷’

পেট্রল-ট্যাঙ্কের ঢাকনা লাগাচ্ছি, লোকটা হঠাৎ এক অদ্ভুত প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি কার্লের বউয়ের পরিচিত কেউ?’

‘না, আমি এখানে চাকরি করি৷ কিন্তু কেন বলুন তো?’

‘না—বলছিলাম—জেনসনের বউয়ের স্বভাব-চরিত্র খুব একটা ভালো নয়৷ যখন প্রথম মেয়েটাকে দেখলাম যে জেনসনকে বিয়ে করে এখানে বসে আছে—তোমাকে কি বলব ভাই, ভীষণ অবাক হয়ে গেলাম৷ কারণ মেয়েটাকে আমি আগে থেকেই চিনি৷’ লোকটা ট্রাকের গায়ে হেলান দিয়ে একটা সিগারেট তৈরি করতে লাগল৷ আমি হাঁ করে ওর মুখের দিকে চেয়ে রইলাম, যাতে ওর একটা কথাও আমার কান না এড়ায়৷ লোকটা ধীরেসুস্থে সিগারেট ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছাড়ল, ‘বছর পাঁচেক আগেকার কথা৷ তখন মেয়েটা কারসন সিটিতে থাকত৷ ফ্রাঙ্ক ফিনি নামে একটা লোককে ও বিয়ে করেছিল৷ ফিনি একটা গাড়ির কারখানা দেখাশোনা করত, আর সেই সঙ্গে একটা স্ন্যাক-বারের ম্যানেজারও ছিল৷ জান, শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল?’

রুদ্ধশ্বাসে লোকটার কথা শুনতে লাগলাম৷ কারণ লোলার অতীত ইতিহাস বর্তমানে আমার কাছে অমূল্য৷

‘একদিন ফিনিকে স্ন্যাক-বারে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেল৷ ওর ডান হাতে ধরা ছিল একটা রিভলভার৷ আর মাথাটা ফেটে চুরমার হয়ে সারা মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে৷ লোলার বক্তব্য—ও নাকি ওপরের ঘরে কাজে ব্যস্ত ছিল, এমন সময় নিচের তলা থেকে রিভলভারের নিকট শব্দ ওর কানে আসে৷ তারপর ও নীচে এসে দেখে, ফিনি মরে পড়ে রয়েছে৷ কাউন্টারের ওপর যে ক্যাশবাক্স ছিল, দেখা গেল তা থেকে প্রায় দু হাজার ডলার অদৃশ্য হয়েছে৷ সকলের মোটামুটি ধারণা হল ফিনি প্রায় ক্যাশবাক্স থেকে দোকানের টাকা সরাত৷ তাই জানাজানি হয়ে যাবার ভয়ে আত্মহত্যা করেছে৷ যা হোক, সেই হারিয়ে-যাওয়া টাকাগুলো আর খুঁজে পাওয়া গেল না৷ কিন্তু পুলিশের ধারণা, সে-টাকাটা নাকি লোলাই নিয়েছিল৷ অথচ তার সপক্ষে কোন প্রমাণই ওরা দাখিল করতে পারল না৷ একজন অফিসার সন্দেহ করল, লোলাই হয়ত ফিনিকে গুলি করেছে৷ কারণ, ওরা নাকি প্রায়ই এটা-সেটা নিয়ে তুমুল ঝগড়া করত৷ কিন্তু সেটাও প্রমাণ করতে পারল না৷ এ ঘটনার কিছু দিন পরে লোলা কারসন সিটি ছেড়ে কোথায় যেন চলে গেল৷—তাহলেই বুঝে দেখ, যখন দেখলাম ও এখানে এসে জেনসনের মতো একজন লোককে বিয়ে করে বসেছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ অবাক হলাম!’

‘আশ্চর্য আমি তো কিছুই জানতাম না!’ চোখেমুখে বিস্ময় ফুটিয়ে ওকে বললাম৷

‘না জানবারই কথা৷ লোলা তো আর এ গল্প ঢাক পিটিয়ে বেড়াবে না৷ আশা করি জেনসন ভালোই আছে৷—আচ্ছা ভাই, ও সত্যি সত্যি অ্যারিজোনাতে আছে তো?’

হঠাৎ কেমন শীত-শীত করে উঠল৷ লোকটা বলে কী! এ যে দেখছি রিক্সের থেকেও বিপজ্জনক!

‘হ্যাঁ, উনি অ্যারিজোনাতে ভালোই আছেন৷’ অসীম চেষ্টায় ওর অন্তর্ভেদী দৃষ্টির মোকাবিলা করলাম, ‘এই তো সেদিনই মি. জেনসনের একটা চিঠি এসেছে৷ লিখেছেন নতুন পেট্রল-পাম্প নিয়ে উনি বেশ ভালোই আছেন৷ হয়তো সামনের বারই আপনার সঙ্গে মি. জেনসনের দেখা হবে৷’

লোকটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, ‘জেনসন ভালো আছে শুনে খুশি হলাম, ভাই৷ নয়তো, তুমি প্রথমেই যখন বললে জেনসন এখানেই নেই, আমি তো ভাবলাম—মানে—ও হয়তো মারাই গেছে৷ যাক, ও ভালো আছে শুনে নিশ্চিন্ত হলাম৷’

আমি তখন ঘামতে শুরু করেছি৷ কোনরকমে ওকে প্রশ্ণ করলাম, ‘আচ্ছা, ফিনিকে যে ওর স্ত্রী—মানে মিসেস জেনসন—গুলি করেছিলেন তার কোন প্রমাণ নেই না?’

লোকটা হঠাৎ কেমন অস্বস্তি বোধ করল, ‘না, তা নেই—কিন্তু এ নিয়ে অনেক কথা উঠেছিল৷’

‘কিন্তু আমি যতদূর জানি, মি. জেনসন মিসেস জেনসনকে নিয়ে বেশ সুখেই আছেন৷ আপনার এই কথাগুলো মি. জেনসনের কানে গেলে তিনি খুব অসন্তুষ্ট হবেন৷ অতএব, এ নিয়ে আর বেশি আলোচনা না করাই ভালো৷’

‘জেনসন তাহলে ওর বউকে নিয়ে সুখে আছে বলছ?’ লোকটা যেন আমার কথা বিশ্বাসই করতে পারল না৷

‘কেন, আপনার কি অবিশ্বাস হচ্ছে?’

‘না—মানে—যাকগে, আমার কথার কথায় কিছু মনে করবেন না৷ মিসেস জেনসনকে চিনি বলেই এত কথা বললাম৷ জেনসনের কাছে এসব কথা আবার বলো না যেন!’

কথা শেষ করে লোকটা তেলের দাম বাবদ কয়েকটা নোট আমার দিকে এগিয়ে ধরল৷ টাকাগুলো পকেটে রেখে বললাম, ‘পাগল নাকি৷ এসব কথা মি. জেনসনের কানে গেলে বিপদ আছে?’

লোকটা ট্রাকে উঠে সশব্দে দরজা বন্ধ করল৷ তারপর পূর্ণ-গতিতে ট্রাক ছুটিয়ে দিল৷ যাবার সময় ওর মুখের ভাবে বুঝলাম, আমাকে লোলা-সম্বন্ধীয় কথাগুলো বলার জন্য ও এখন আফসোস করছে৷

কিন্তু লোকটার বলে-যাওয়া কথাগুলো আমাকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলল৷

ছুটন্ত ট্রাকটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম৷ মনের মধ্যে বয়ে চলল চিন্তার ঝড়৷ তাহলে লোলা আগেওএকবার বিয়ে করেছে! ওর স্বামী মারা গেছে রিভলভারের গুলিতে! আর সেই সঙ্গে অদৃশ্য হয়েছে দু-হাজার ডলার! এ কথা ভাবতেই হৃৎপিণ্ডটা কে যেন খামচে ধরল৷ জেনসনও তো মারা গেছে রিভলভারের গুলিতে! আর আমি যদি সিন্দুকের দরজা বন্ধ করে না দিতাম, তাহলে হয়তো অদৃশ্য হত ওই এক লাখ ডলার৷

এই ঘটনাদুটোর মধ্যে কি কোন যোগসূত্র আছে? রেস্তোরাঁর বারান্দায় গিয়ে বসলাম৷ একটা সিগারেট ধরাতে গিয়ে টের পেলাম, আমার হাত ভীষণভাবে থরথর করে কাঁপছে৷

সন্দেহ-আতঙ্কের সুতোয় মনটা দুলতে লাগল পেণ্ডুলামের মতো৷

ঐ ট্রাক-ড্রাইভারের কথা যদি সত্যি হয়, তবে কারসন সিটির পুলিশ লোলাকে শুধু টাকা চুরির জন্যই সন্দেহ করেনি—ফিনিকে খুন করার জন্যও সন্দেহ করেছে৷ তার মানে—

ছ-টা শব্দ বাঁধভাঙা ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ল মনের পর্দায়৷

তাহলে কি জেনসনকে লোলা খুন করেছে?

মনকে ফিরিয়ে নিয়ে গেলাম ভয়াবহ রাতের দৃশ্যে৷ সব-কিছু আবার যেন আমার চোখের সামনে নিখুঁতভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠল পরিষ্কার দেখতে পেলাম, লোলা রিভলভার উঁচিয়ে বসবার ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে৷ উত্তেজনায় ওর বুক উঠছে নামছে৷ তারপরই শুনতে পেলাম লোলার সেই অবিশ্বাস্য কর্কশ শাসানি৷ মনে পড়ল, জেনসনের উঠে দাঁড়ানোর কথা৷ রাগে চোখমুখ লাল করে ও লোলার দিকে এগোতে গেল৷ সঙ্গে সঙ্গেই আবার যেন শুনতে পেলাম সিন্দুকের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ—লোলার সেই হিংস্র দৃষ্টি—রিভলভারের বিকট আওয়াজ৷—

এতদিন ধরে ভেবে এসেছি ঃ সিন্দুকের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে লোলা চমকে ওঠায়, ট্রিগারে আচমকা চাপ পড়ে গুলি বেরিয়ে গেছে৷ আর তাতেই জেনসন মারা গেছে—এক আকস্মিক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে৷

এখন ওই লোকটার কথা শোনার পর সব আবার নতুনভাবে ভাবতে শুরু করলাম৷

ট্রিগারে আচমকা চাপ পড়ে? সত্যিই কি তাই?

সিগারেটের বাকিটুকু ফেলে দিলাম৷ হাতের উলটোপিঠ দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে যেতেই পরিষ্কার বুঝলাম, আমি ভয় পেয়েছি!

এখন এই ‘আচমকা’ শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে জেনসনের মৃত্যুরহস্যের চাবিকাঠি৷

প্রথম স্বামীকে খুনের ব্যাপারে পুলিশ লোলাকে সন্দেহ করেছিল—তাহলে কি জেনসনকে লোলা নৃশংসভাবে খুন করেছে!

কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে ব্যাপারটাকে আকস্মিক দুর্ঘটনা ছাড়া আর-কিছু মনে হয় না৷ ব্যাপারটা যদি সত্যি সত্যি খুনই হয়, তাহলে তো অনায়াসেই খুনের দায়টা আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পারত! তারপর—হঠাৎ একটা বিচিত্র সম্ভাবনা আমার সমস্ত চিন্তাশক্তি ওলটপালট করে দিল৷ হৃৎপিণ্ডের গতি স্তব্ধ হল মুহূর্তের জন্য!

সেদিন লোলা যখন রিভলভার হাতে ঘরে এসে ঢোকে, তখন সিন্দুকের দরজা খোলাই ছিল৷ তাহলে কি লোলার উদ্দেশ্য ছিল জেনসনের পর আমাকে গুলি করে সিন্দুকের টাকা গুছিয়ে নেওয়া? হয়তো আগে থেকেই ও সব-কিছু পরিকল্পনা করে রেখেছিল৷

লোলার গুলিতে আমি আর জেনসন মারা গেলে পর, ও হয়তো টাকাগুলো লুকিয়ে ফেলে পুলিশে খবর দিত৷ তারপর পুলিশ এলে পরে, ফ্রাঙ্ক ফিনির সময় যেরকম গল্প শুনিয়েছিল, এবারও সে-রকম কিছু একটা শোনাত৷ বলত, আমি লুকিয়ে লুকিয়ে সিন্দুক খুলছিলাম, এমন সময় ও আর জেনসন এসে আমাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে৷ আমি তখন কোন পথ না পেয়ে জেনসনকে খুন করেছি৷ তারপর লোলা অসমসাহসিকতায় পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে আমার কাছ থেকে রিভলভার কেড়ে নিয়ে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে আমাকে গুলি করেছে৷

ওয়েন্টওয়ার্থের এই পেটমোটা শেরিফটা লোলার এই কাহিনী অক্ষরে অক্ষরে বিশ্বাস করত৷ কারণ, আমার আসল পরিচয় জানার পর তায় মনে আর কোনরকম সন্দেহ থাকত না৷

কিন্তু লোলার এই নিখুঁত পরিকল্পনা বানচাল হয়ে যাওয়ার একটাই যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে৷ তা হল, জেনসনকে গুলি করামাত্রই আমি সিন্দুকের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম৷ সেই মুহূর্তেই লোলা বুঝতে পেরেছিল, ও যদি আমাকে গুলি করে, তবে সিন্দুক চিরকাল বন্ধই থেকে যাবে৷ কারণ আমি ছাড়া সিন্দুক খোলার লোক এই পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন-এ আর নেই৷ তাই সঙ্গে সঙ্গেই ও এমন অভিনয় করেছে, যেন আচমকা গুলি বেরিয়ে জেনসন মারা গেছে৷ তারপরই লোলা যখন বুঝতে পারল, ব্ল্যাকমেল করে আমাকে দিয়ে সিন্দুক খোলানো যাবে না, তখন ও অন্য রাস্তা ধরল৷ এমন ভাব দেখাল, যেন ও আমাকে ভালোবেসে ফেলেছে৷ কিন্তু আমি ওর ফাঁদে পা দিইনি৷

আর যখনই ও টের পেয়েছে, এই ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন-এ সিন্দুক খোলার লোক আর আমি একা নই, তখনই আমার প্রতি ওর ব্যবহার হয়ে উঠে রূঢ় এবং নির্বিকার৷ কারণ, এখন আর আমার প্রয়োজন নেই যেহেতু রয়ও সিন্দুক খুলতে জানে৷ তাই লোলা এখন রয়ের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হবার চেষ্টা করছে৷

এত চিন্তার পর আমি নিশ্চিন্ত হলাম, লোলার রিভলভার লুকিয়ে ফেলার গল্পটা সর্বৈব মিথ্যে৷ জেনসনের .৪৫ বর্তমানে লোলার কাছে, একথা ভাবতেই আমার গলা শুকিয়ে এল৷

তার মানে আমার এবং রয়ের—দুজনের জীবনই বিপন্ন৷ লোলা হয়তো রয়কে যা-হোক করে রাজী করিয়ে সিন্দুক খোলাবে৷ তারপর নির্বিকারচিত্তে ওকে খুন করবে৷ হয়তো আমাকেও আর জীবিত রাখবে না৷ পুলিশকে ও সেই একই গল্প শোনাবে—শুধু জেনসনের বদলে রয়ের নামটা বসিয়ে দেবে৷ আবার সব-কিছু ওর পরিকল্পনামাফিক ঘটতে থাকবে৷

নাঃ, এর একটা বিহিত করা দরকার৷ স্বীকার করছি, পুরো ব্যাপারটা আমার আন্দাজ ছাড়া আর-কিছু নয়৷ সেই ড্রাইভারটার কথা শোনার পরই এসব উদ্ভট চিন্তা এসে আমার মনে বাধা বেঁধেছে৷ হয়তো খোঁজ নিলে দেখা যাবে, ফিনি সত্যি সত্যিই আত্মহত্যা করেছে, এবং জেনসনের মৃত্যুটাও দুর্ঘটনা ছাড়া আর কিছু নয়৷ কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কোন অনিশ্চয়তার মধ্যে আমি যেতে চাইছি না৷ কারণ লোলার সেই রক্তলোলুপ হিংস্র দৃষ্টি—সেটা তো আর মিথ্যে নয়!

লোলাকে জব্দ করার একটামাত্র উপায় আছে৷ তা হল, সিন্দুক থেকে সমস্ত টাকা অন্য কোথাও সরিয়ে সিন্দুক খোলা রেখে দেওয়া৷ তাহলে সেই খোলা সিন্দুক দেখলেই লোলা বুঝতে পারবে, রয়কে কব্জা করে বা আমাকে খুন করে ওর কোন লাভ হবে না৷

কিন্তু ওই টাকাগুলো লুকোবার জন্য আমাকে প্রথমেই ভালো দেখে একটা জায়গা খুঁজতে হবে৷ হাতঘড়িতে চোখ রাখলাম দশটা বেজে দশ মিনিট৷ অর্থাৎ ওয়েন্টওয়ার্থ থেকে ওদের ফিরতে এখনও ঘণ্টা আড়াই বাকি, সুতরাং, টাকাগুলো লুকোবার যথেষ্ট সময় পাওয়া যাবে৷ অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করলাম, টাকাগুলো সিন্দুক থেকে নিয়ে জনসনের সঙ্গেই কবর দেব৷ তাতে লোলা যদিও বা লুকনো টাকার সন্ধান পায়, তাহলেও শান্তিতে সে-টাকা ভোগ করতে পারবে না৷ টাকার সঙ্গে সঙ্গে ওকে খুঁড়ে তুলতে হবে জেনসনের গলিত বিকৃত মৃতদেহ৷

কিন্তু এই পরিকল্পনাকে কার্যকর রূপ দেবার আগেই এক ঝামেলায় জড়িয়ে পড়লাম৷ বারান্দা ছেড়ে বাংলোর দিকে এগোচ্ছি, চোখে পড়ল একটা ট্রাক ওয়েন্টওয়ার্থের রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে৷ তার পিছনে দড়ি দিয়ে বাঁধা একটা পুরনো প্যাকার্ড গাড়ি৷ বুঝলাম, এবার এই বিকল প্যাকার্ডের পিছনেই আমার সময়ের শ্রাদ্ধ হবে৷ এবং ঠিক তাই হল৷

প্যাকার্ডের ড্রাইভার অত্যন্ত খিটখিটে স্বরে জানাল, তার গাড়ি এখুনি ঠিক করে দিতে হবে৷ নয়তো, ট্রপিকা স্প্রিংসে পৌঁছতে তার দেরি হয়ে যাবে৷

নাছোড়বান্দা ড্রাইভারটার পাল্লায় পড়ে ওই ঝরঝরে প্যাকার্ডের পিছনে লাগতে হল৷

দুপুরবেলা রয় আর লোলা যখন ওয়েন্টওয়ার্থ থেকে ফিরে এল, তখনও আমি ওই হাতচ্ছাড়া প্যাকার্ডের সঙ্গে রেঞ্চ নিয়ে ধস্তাধস্তি করছি৷

এভাবে কেটে গেল তিন দিন তিন রাত৷ কিন্তু এর মধ্যে একবারও সিন্দুকের কাছে যাওয়ার সুযোগ পেলাম না৷

লোলা সর্বদাই আমার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে লাগল৷ রাতে আমি আর রয় যখনই তাস খেলতে বসি, ও বাংলোয় চলে যায়৷ আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ে৷ সুতরাং, সিন্দুক যেমন ছিল, তেমনই রয়ে গেল৷

লোলা আজকাল আমার সঙ্গে কথা বলে ঠিকই, কিন্তু ওর নিস্পৃহ ব্যবহার সব সময় আমাকে দূরে সরিয়ে রেখেছে৷ এমনভাবে ও নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে, যাতে আমার বুঝতে একটুও অসুবিধে হয়নি, আমাদের আগের সম্পর্ক আর কোনদিনই আমরা ফিরে পাব না৷ অতীতের অন্তরঙ্গতার সূত্র ছিঁড়ে গিয়ে আমাদের মাঝখানে গড়ে উঠেছে এক সুদৃঢ় দ্বন্দ্বের পাঁচিল৷

প্রথম প্রথম অসুবিধে হলেও অস্বস্তিকর পরিবেশকে আমি মেনে নিলাম৷ এবং কয়েক দিনের মধ্যেই অনুভব করলাম, লোলাকে স্পর্শ করতেও আমার প্রচণ্ড অনীহা৷ সত্যকে অস্বীকার যদি না করি, তাহলে বলতে বাধা নেই, লোলাকে আমি ঘৃণা করি৷

সবসময় ওকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করতে লাগলাম৷ যদি একবারও আমার অনুমানের সপক্ষে কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাই৷ কিন্তু বৃথাই৷ লোলার চলনে বলনে মুহূর্তের জন্যও কখনও প্রকাশ পেল না, ও আমাকে নৃশংসভাবে খুন করতে চায়৷ সুতরাং, অনিশ্চয়তার দোলায় দুলতে লাগলাম৷

রয়কেও আমি বহুভাবে লক্ষ্য করেছি৷ ওয়েন্টওয়ার্থ থেকে ফেরার পর লোলার সঙ্গে ওর সম্পর্কের কোন পরিবর্তন হয়েছে কিনা বুঝতে চেয়েছি৷ কিন্তু এক্ষেত্রেও আমাকে হতাশ হতে হয়েছে৷

এক-একসময়ে হঠাৎ মনে হয়েছে, রয়কে সব কথা খুলে বলি৷ কিন্তু পরক্ষণেই আবার কি মনে করে চুপ করে গেছি৷ কেন জানি না মনে হয়েছে, সিন্দুকে এক লাখ ডলার আছে শুনলেই রয়ের বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে৷ তারপর ওকে ঠেকিয়ে রাখা মুশকিল হবে৷ সুতরাং মুখ বুজে দিন কাটাতে লাগলাম৷ এখন এই কঠিন সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায় রয় ও লোলার অনুপস্থিতি৷ তাই বসে বসে দিন গুনতে লাগলাম, কবে লোলা রয়ের সঙ্গে ওয়েন্টওয়ার্থে যাবে—আমাকে এই ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন-এ রেখে যাবে সম্পূর্ণ একা!

প্রায় এক সপ্তাহ পরে এল সেই প্রতীক্ষিত সুযোগ৷

একদিন সন্ধ্যায় খাবার ঘরে আমি আর রয় কাজে ব্যস্ত, এমন সময় লোলা ঘরে এসে ঢুকল, ‘ওয়েন্টওয়ার্থে ব্রিজিত বার্দোর একটা ভালো ছবি এসেছে৷ আমি আজ রাতে দেখতে যাব৷ তোমরা কেউ যাবে?’

রয় ঘাড় নাড়ল, ‘উহুঁ—আমি আবার মারপিটের ছবি ছাড়া দেখি না৷’

ভেবে দেখলাম, এই সুযোগ৷ এখন যদি কোনরকমে রয়কে লোলার সঙ্গে যেতে রাজি করাতে পারি, তাহলেই আমার উদ্দেশ্য সফল হবে৷ কারণ ওয়েন্টওয়ার্থে সিনেমা দেখে ফিরতে ফিরতে ওদের রাত তিনটে হয়ে যাবে৷ আর ওই সময়ের মধ্যেই আমি সিন্দুক থেকে টাকাগুলো সরিয়ে গুমটিঘরে পুঁতে ফেলব৷ রাত বারোটার পর এমনিতেই গাড়ি আর ট্রাকের ভিড় কমে আসে৷ সুতরাং, ওই সামান্য কাজটুকু সেরে ফেলতে আমার কোন অসুবিধে হবে না৷ তাই রয়কে বললাম, ‘তুই লোলার সঙ্গে যা না৷ এমনিতেই আজ রাতে আমার কাজ করার কথা তাছাড়া আরও কয়েকটা মেরামতের কাজও সেরে ফেলতে পারব৷ ছবিতে মারপিট না হয় নাই থাকল, ব্রিজিত বার্দোকে তো দেখতে পাবি?’

রয় অবাক চোখে আমার দিকে তাকাল৷ ও হয়তো ভেবেছিল, আমিই লোলার সঙ্গে যাব৷

‘না—ভাবছিলাম আজ একটু তাস-টাস খেলব৷’ ইতস্তত করে রয় জবাব দিল৷

‘কিন্তু এই কুড়ি মাইল গাড়ি চালিয়ে লোলা একেবারে একা ওয়েন্টওয়ার্থে যাবে—তাই বলছিলাম—’

লক্ষ্য করলাম, লোলা একদৃষ্টে আমাকে দেখছে৷ ভয় হল, ও বোধহয় আমার উদ্দেশ্য ধরে ফেলেছে৷ কিন্তু আমি মরিয়া৷ যে করে হোক, এই সুযোগের সদ্ব্যবহার আমাকে করতেই হবে৷ কারণ, এরকম সুবর্ণসুযোগ মানুষের জীবনে বার বার আসে না৷

লোলা আমাকে লক্ষ্য করে হঠাৎ বলে উঠল, ‘ঠিক আছে, তোমাদের যখন যাবার ইচ্ছে নেই, তখন আর কষ্ট করে যেতে হবে না৷ আমি একাই চললাম৷’

রয় লোলার দিকে আড়চোখে চেয়ে হাসল, ‘আচ্ছা—তোমার কথাই থাক৷ চল, কি ছবি দেখাতে নিয়ে যাবে—বান্দা হাজির৷’ রয় আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে মাথা নোয়াল৷ লোলা প্রত্যুত্তরে হেসে পা বাড়াল বাংলোর দিকে৷

সাড়ে ন’টা বাজতে-না-বাজতেই লোলা সেজেগুজে বাংলো থেকে বেরিয়ে এল৷ ওর পরনে একটা দুধ-সাদা পোশাক৷ আগে কোনদিন ওকে এ পোশাক পরতে দেখিনি৷

লোলা যেন আজ প্রাণভরে সেজেছে৷ ওর রূপযৌবনের সমস্ত ছলাকলা প্রকট করে ও এগিয়ে চলল মার্কারির দিকে৷ ওর ভাবসাব দেখে বুকের মধ্যে বেজে উঠল বিপদের সংকেত—মনে নেমে এল অস্বস্তির ছায়া৷

লোলা ওর স্বভাবসিদ্ধ ছন্দে এগিয়ে গিয়ে রয়ের পাশে উঠে বসল৷ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রয় আমার দিকে চেয়ে মুচকি হাসল, ‘শেট, আমি কিন্তু যেতে চাইনি৷ নেহাত তুই বললি বলে—’ লোলাকে আড়াল করে চোখ টিপল রয়৷

রয়ের মন্তব্য আমার কানে বাজাল৷ কারণ ওর চরিত্রের সঙ্গে এ ধরনের কথা ঠিক খাপ খায় না—কিন্তু ওর কথা আমি গায়েই মাখলাম না৷ মিষ্টি করে জবাব দিলাম, ‘আশা করি সময়টা তোর ভালোই কাটবে৷’

আমি ভালোভাবেই জানি না, যদি একবার সিন্দুকের টাকাটা পরিল্পনামতো লুকিয়ে ফেলতে পারি, তবে লোলা আর রয়—দু-জনেই থাকবে আমার বুড়ো আঙুলের তলায়—সম্পূর্ণ আমার আজ্ঞাধীন৷

লোলা গাড়িতে বসে আমাকে লক্ষ্য করছিল, ব্যঙ্গের সুরে জবাব দিল, ‘সে-বিষয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না৷ তুমি শুধু ঠিকমতো চারদিকে খেয়াল রেখ৷’

রয় গীয়ার দিয়ে ক্লাচ ছাড়তেই ছুটে চলল লোলার মার্কারি৷ অনেক দূর পর্যন্ত দেখা গেল গাড়ির পিছনে লাল আলো৷ শেষে তাও মিলিয়ে গেল মরুভূমির অন্ধকারে৷

কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম৷ তারপর রওনা দিলাম বাংলোর দিকে৷ মনে মনে একটু যে ভয় না পেলাম, তা নয়৷ কারণ, কাজটাকে যতটা সহজ ভাবছি, হয়ত তত সহজ নয়—কে জানে!

বাংলোর কাছে পৌঁছেই লক্ষ্য করলাম সদর দরজা বন্ধ৷ ঠেলাঠেলি করেও যখন খুলল না, বুঝলাম দরজায় লোলা তালা দিয়ে গেছে৷ সুতরাং গুমটিঘরের দিকে চললাম একটুকরো তারের সন্ধানে৷

তারের মাথাটা সামান্য বাঁকিয়ে চাবির ফুটো দিয়ে ঢুকিয়ে দিলাম৷ সেকেন্ড দুয়েকের চেষ্টাতেই খুলে গেল বাংলোর দরজা৷ বসবার ঘরে পৌঁছে সিন্দুকের কাছে হাঁটু গেড়ে বসলাম৷ গত কয়েক সপ্তাহের অভ্যাসে বর্তমানে সিন্দুক খুলতে আমার বড়জোর মিনিট তিনেক লাগে৷ কিন্তু আজ সময় কিছু বেশি লাগল—সম্ভবত আমার মানসিক উৎকণ্ঠাই তার জন্য দায়ী৷

সিন্দুকের দরজা খোলামাত্রই নির্মম রসভঙ্গের মতো কানে এল কোন গাড়ির হর্নের শব্দ৷ উঠে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে উঁকি মারতেই দেখি, পাম্পের কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা হলদে ক্যাডিলাক৷

অতএব কম্বিনেশন ডায়াল ঘুরিয়ে, সিন্দুক বন্ধ করে বাইরে এলাম৷ কিছুটা হতাশ হয়েই গাড়িটার দিকে এগিয়ে গেলাম৷

এই যে গাড়ি আসতে শুরু করল, ব্যস—সিন্দুক সিন্দুকের জায়গাতেই পড়ে রইল, আর আমি অক্লান্তভাবে খেটে চললাম৷

আমি কিন্তু এতে অবাক হয়নি৷ এই সময়টা রোজই গাড়ি ও ট্রাকের ভিড় থাকে৷ কিন্তু সে শুধু রাত বারোটা পর্যন্ত৷ তার পরই গাড়ির ভিড় কমে আসে৷ অর্থাৎ, তখনও আমার হাতে তিন ঘণ্টা সময় থাকবে৷ এই সময়ের মধ্যে বেশ নির্বিঘ্নেই কাজ সারতে পারব৷

প্রায় বারোটা নাগাদ গাড়ি-চালাচল একেবারে কমে এল৷ বারান্দায় বসে পরবর্তী গাড়ির অপেক্ষায় রইলাম৷ চাঁদের আলোয় ধোয়া আঁকাবাঁকা রাস্তা যতদূর চোখ যায় সম্পূর্ণ নির্জন—কোন গাড়ির হেডলাইটও চোখে পড়ছে না৷ অতএব নিশ্চিন্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালাম৷ বাংলোর দিকে এগোতে যাব, চোখে পড়ল দূরাগত কোন গাড়ির হেডলাইটের উজ্জ্বল আলো৷ এতক্ষণ প্রতীক্ষার পর এই গাড়িটার আলো চোখে পড়তেই অধৈর্য হয়ে উঠলাম৷ কিছুটা বিরক্ত হয়ে পাম্পের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম৷ জানতাম, এই হতচ্ছাড়া গাড়িটা যে-কোন কারণেই হোক এখানে থামবেই৷ এবং আমার ধারণাকে নির্ভুল প্রমাণিত করে গাড়িটা পাম্পের সামনে এসে দাঁড়াল৷

গাড়িটা একটা পুরোনো মডেলের বুইক৷ মরুভূমির মধ্যে দিয়ে এতটা রাস্তা আসার ফলে বুইকের সারা গায়ে ধুলোর আস্তরণ৷ গাড়ির আরোহী দুজনের একজন জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে আমার দিকে তাকাল৷

লোকটার বয়স প্রায় আমার মতোই৷ মাথায় কালো টুপি, পরনে কালো জামা, আর একটা সাদা টাই৷ হনু বের করা লম্বাটে ভাবলেশহীন মুখ৷ ক্ষুদে ক্ষুদে কাল চোখজোড়া যেন নিষ্প্রাণ দু-টুকরো কাচ৷

তার স্থূলকায় সঙ্গীকে দেখে মেক্সিকোর অধিবাসী বলেই মনে হল৷ তার গায়ের রঙ রোদে পোড়া—তামাটে৷ ঠোঁটের উপর লম্বা টানা গোঁফ৷ পরনে তেলচিটে ময়লা স্যুট৷ মাথায় মেক্সিকান হ্যাট—চামড়ার ফিতেদুটো চিবুকের নীচে গিঁট দেওয়া৷

কেন জানি না, লোকদুটোকে দেখেই ভীষণ অস্বস্তি বোধ করলাম৷ ষষ্ঠেন্দ্রিয় যেন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘সাবধান—সাবধান!’

এতদিন পরে হঠাৎই আবিষ্কার করলাম, ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’ সত্যিই বড় নির্জন—এবং এখানে আমি সম্পূর্ণ একা৷

মোটা লোকটা আমাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করছিল৷ কিন্তু তার সঙ্গী গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে চোখ বোলাতে লাগল৷ হয়তো দেখল, এখানে আমি ছাড়া আর-কেউ আছে কিনা৷

পাম্পের গা থেকে তেল দেবার পাইপটা খুলে নিলাম, ‘ক লিটার দেব?’

‘দশ৷’ মোটা লোকটা নির্বিকার সুরে জবাব দিল৷ কিন্তু উত্তর দেবার সময় ওর সতর্ক দৃষ্টি সাদা টাই-পরা লোকটাকে লক্ষ্য করতে লাগল৷

ট্যাঙ্কে তেল ঢালতে ঢালতে সাদা টাই-পরা লোকটার দিকে আড়চোখে তাকালাম৷ সে তখন গাড়ি ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে এদিক-ওদিক চাইছে, যেন কারুর খোঁজ করছে৷ লোকটা মাথা থেকে টুপি খুলে নিজেকে হাওয়া করতে লাগল৷ ওর মাথার বাদামী চুল ঘামে ভিজে টাকের সঙ্গে লেপটে আছে৷

নিছক কথা বলার জন্যই বললাম, ‘ওঃ, আজ ভীষণ গরম পড়েছে—একেবারে অসহ্য!’

লোকদুটো জবাব দিল না৷ আমার উপস্থিতি ওদের কাছে নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হল৷

হঠাৎ আমার সন্দেহ হল, এ লোকদুটো হয়তো রেস্তোরাঁর ক্যাশ লুট করতে এসেছে৷ কিন্তু পরমুহূর্তেই অন্য একটা চিন্তা দশমনী হাতুড়ির মতো আমার মস্তিষ্কে আঘাত করল৷ যদি ওরা বাংলোয় গিয়ে সিন্দুকটা খুঁজে পায়! যদি লুঠ করে সিন্দুকের সমস্ত টাকা!

সাদা টাই-পরা লোকটা কোট থেকে একটা পিন খুলে দিয়ে দাঁত খোঁচাতে লাগল৷ অনুভব করলাম, ওর ক্ষুদে ক্ষুদে অভিব্যক্তিহীন চোখজোড়া আমার ওপরেই নিবদ্ধ—কিন্তু আমার মুখে নেয়, নির্নিমেষে তাকিয়ে আছে আমার উন্মুক্ত গলার দিকে৷ ভয়ে শিউরে উঠলাম৷

‘কী হে, তুমিই এখানকার মালিক নাকি?’ হালকা সুরে আচমকা প্রশ্ন করল সাদা-টাই, ‘একা থাক, না বউ-ছেলেমেয়ে আছে?’

প্রশ্নটা অত্যন্ত নির্দোষ এবং সাধারণ৷ যে-কোন খদ্দেরই এ ধরনের প্রশ্ণ করতে পারে৷ কিন্ত লোকটার টেনে টেনে কথা বলার সুরে কেন যেন ভয় পেলাম৷

‘না, আমি এখানে চাকরি করি৷’ পাম্পের মিটারের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে জবাব দিলাম, ‘মালিক এবং তাঁর আর একজন কর্মচারী একটু বাইরে গেছেন৷ এখুনি এসে পড়বেন৷ ওঁদের আসার সময় অনেকক্ষণ পার হয়ে গেছে—’

লোকটা এবার পিন দিয়ে মাড়ি খোঁচাতে লাগল৷ তারপর পিনটা চুষে পরিষ্কার করে আবার কোটের গায়ে আটকে রাখল৷

আমি তেল দেওয়া শেষ করে বালতি থেকে ভিজে স্পঞ্জটা তুলে নিলাম৷ এগিয়ে গিয়ে গাড়ির উইণ্ডস্ক্রীন মুছতে লাগলাম৷

কাজ করতে থাকলেও আমার দৃষ্টি কিন্তু সর্বদাই লোকদুটোর দিকে৷

বন্ধ বাথরুমে স্নানরত অবস্থায় বুকে হেঁটে এগিয়ে-আসা কোন সাপকে লোকে যেভাবে লক্ষ্য করে, ঠিক সেভাবে ওদের চালচলন লক্ষ্য করতে লাগলাম৷

‘সল, চলো কিছু খাওয়া যাক৷’ সাদা-টাই তার মোটা সঙ্গীকে উদ্দেশ করে বলল৷ তারপর আমার দিকে ফিরল, ‘খাওয়ার মতো কি কি আছে বল দেখি?’

‘এত রাতে শুধু স্যান্ডউইচ ছাড়া আর-কিছুই নেই৷’

‘দুর দুর, শুধু স্যান্ডউইচে কী হবে? ভারী কিছু চাই—আমাদের ভীষণ খিদে পেয়েছে৷’

আড়চোখে হাতঘড়ির দিকে তাকালাম—বারোটা বেজে কুড়ি মিনিট৷ অর্থাৎ লোলাকে ফিরতে এখনও ঘণ্টা আড়াই বাকি৷ সুতরাং, এ লোকদুটোর হাত থেকে আর নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে না৷

নিরুপায় হয়ে খাবার ঘরের দিকে পা বাড়ালাম৷ সল এবং সাদা-টাই সতর্ক পা ফেলে আমাকে অনুসরণ করল৷

খাবার ঘরে ঢুকেই ওরা থমকে দাঁড়াল, ঘরের চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল৷

‘তুমি কি এখানে একা নাকি?’ সাদা-টাই জানতে চাইল৷

বুঝলাম মিথ্যে বলে লাভ নেই৷ কারণ, ওরা একটু ঘুরেফিরে দেখলেই জানতে পারবে, আমি এখানে একা কী দোকা৷ সুতরাং সত্যি কথাই বললাম, ‘হ্যাঁ৷’

‘এবারে খাওয়া-দাওয়া করা যাক৷—কী আছে?’

‘যদি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন, তবে ফ্রায়েড চিকেনের ব্যবস্থা করতে পারি৷’

সল আমাকে অতিক্রম করে কাউন্টার পার হয়ে রান্নাঘরের দিকে এগোল৷ রান্নাঘরের দরজা খুলে ভিতরে উঁকি মারল৷ কিন্তু একটু পরেই ও ফিরে এল৷ সাদা-টাইকে উদ্দেশ করে মাথা নেড়ে জানাল, রান্নাঘরে কেউ নেই৷

ঠিক সেই মুহূর্তে বুঝলাম, আমি বিপদে পড়েছি৷

সাদা-টাই পায়ে পায়ে দেওয়ালে-গাঁথা টেলিফোনের দিকে এগিয়ে গেল৷ টেলিফোন ডায়ালের ওপর আঙুলের টোকা মরল, ‘তোমার এখানে টেলিফোন কি একটাই?’

‘হ্যাঁ৷’ হাতদুটো ভাঁজ করে বুকের কাছে রেখে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম৷ কারণ, সামান্যতম নড়াচাড়াও বিপদ ডেকে আনতে পারে, তা আমার অজানা ছিল না৷

লোকটা টেলিফোনের রিসিভারটা শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে এক হ্যাঁকচা টান মারল৷ সিরিভারটা তার ছিঁড়ে দেওয়াল থেকে আলগা হয়ে বেরিয়ে এল৷ সাদা-টাই সরীসৃপের মতো স্থির দৃষ্টিতে আমার মুখের ভাব লক্ষ্য করতে লাগল, ‘যাও, ফ্রায়েড চিকেনের ব্যবস্থা করো গিয়ে৷ সল, তুমিও ওর সঙ্গে যাও—ওর দিকে নজর রেখো৷’

রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালাম৷ কানে অনুসরণরত সলের গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ৷ ফ্রাইং প্যানে মুরগি চাপিয়ে সলকে প্রশ্ন করলাম, ‘কী ব্যাপার—তোমরা কী চাও?’

‘ভয় পেও না, দোস্ত৷’ সল এগিয়ে গিয়ে টেবিলের উপর রাখল৷ ওর পাঁচ আঙুল রিভলভারের বাঁটের গায়ে খেলে বেড়াতে লাগল ‘চুপচাপ কাজ করে যাও৷’

বেশ কিছুক্ষণ নীরবতার পর সল আবার মুখ খলল, ‘তোমার এ জায়গাটা ভালো লাগে? একা একা থাকতে খারাপ লাগে না?’

‘অভ্যেস হয়ে গেছে৷’ ঠোঁট শুকিয়ে আসার অস্পষ্টভাবে জবাব দিলাম৷ বুকের কাঁপুনি হঠাৎ যেন আরও বেড়ে গেল৷

‘বিয়ে করেছ?’

‘উহুঁ৷’

‘তাহলে একা রাত কাটাও কেমন করে—যাঁ৷’

‘এই—চলে যায়৷’

এমন সময় সাদা-টাই এসে রান্নাঘরে ঢুকল৷ ওর হাতে এক প্লেট স্যান্ডউইচ৷ সম্ভবত খাবার ঘরের আলমারি থেকে তুলে নিয়েছে৷

‘এই নাও, সল৷ খেয়ে দেখ, খুব মিষ্টি খাবার৷ সাদা-টাইয়ের মুখ স্যান্ডউইচে ঠাসা৷ তাই ওর কথাগুলো কেমন যেন অস্পষ্ট শোনাল, ‘খোকার দিকে লক্ষ্য রেখো৷ দেখ যেন উল্টো-পাল্টা কিছু করে না বসে৷ আমি একবার চারপাশটা ঘুরে দেখে আসি৷’ কথা শেষ করে সাদা-টাই রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল৷

সল প্লেট থেকে একজোড়া স্যান্ডউইচ তুলে নিয়ে মুখে পুরে বলল, ‘এডি এমনিতে খুব ভালো লোক৷ তবে রিভলভারের ট্রিগার দেখলেই ওর ভীষণ টিপতে ইচ্ছে করে৷ সুতরাং, ওর সঙ্গে সমঝে ব্যবহার করো! নয়তো—’

সলের কথার কোন জবাব দিলাম না৷ তাছাড়া জবাব দেবই বা কি! কিন্তু আমার কোণঠাসা মন ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ল৷

সলকে কায়দা করতে আমাকে খুব একটা বেগ পেতে হবে না৷ ওর ওই থলথলে চেহারা নিয়ে ও আমার সঙ্গে যুঝে উঠতে পারব বলে মনে হয় না৷ সুতরাং, একবার যদি ওকে কাবু করতে ফেলতে পারি, তবে এডির সঙ্গে আমার লড়াই হবে সমানে সমানে৷

ভেবে দেখলাম, যদি সাহস করে সল আর এডির মোকাবিলা করতে পারি, তবে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী রয় ও লোলা ফিরে আসার আগেই সিন্দুকের টাকাটা সরিয়ে ফেলতে পারব৷

‘ক্যাশে টাকা-পয়সা কীরকম আছে?’ সল হঠাৎ প্রশ্ন করল৷

‘বেশি নেই৷ আজ বিকেলেই ব্যাঙ্কে টাকা জমা দেওয়া হয়ে গেছে৷’

তাই নাকি? তাহলে তো ভারি চিন্তার কথা!’

একমুহূর্তে চুপ করে থেকে বলল, ‘টাকাপয়সা তো নানা জায়গা থেকে আমদানিই হয়৷ তাহলে আমাকে কি ধাপ্পা দিচ্ছ নাকি?— চটপট বলে ফেল দেখি, রূপচাঁদগুলো কোথায় ছুপে রেখেছ?’

‘ক্যাশবাক্সে একশো-ডলার আছে—ওটাই সব৷’

উহুঁ, অত কম টাকায় তো চলবে না৷ আরও কিছু ব্যবস্থা করতে পার তো বল, নইলে তোমার প্রাণ-পাখি ডানা মেলবে৷’

দুটো খালি প্লেট নিয়ে টেবিলে রাখলাম৷ উত্তেজনায় শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুততম হয়ে উঠল৷ এই মোটাটাকে ঢিট করতে হলে এটাই উপযুক্ত সময়৷

গরম ফ্রায়েড চিকেনসুদ্ধ ফ্রাইং প্যানটা তুলে নিয়ে টেবিলের কাছে এগিয়ে গেলাম, ‘ক্যাশের টাকা ছাড়া পেট্রল বিক্রির পঞ্চাশ ডলার আছে৷ সত্যি বলছি, এ ছাড়া আর-কোন টাকা-পয়সা নেই৷’

সল ধীরেসুস্থে টেবিল থেকে নেমে দাঁড়াল৷ শিকারীর চোখে আমাকে লক্ষ্য করতে লাগল৷ আমি ফ্রাইং প্যান থেকে ভাজা মুরগিগুলো প্লেটে রাখার জন্য প্রস্তুত হলাম৷

‘ওই দেড়শো ডলারে কিছু হবে না দোস্ত, আরও জোগাড় করার ব্যবস্থা করো৷ এডির সঙ্গে প্যাঁচ খেলার চেষ্টা করলে তার ফল ভালো হবে না৷’

সলের কথা শেষ হতে না হতেই ফ্রাইং প্যানের গরম মুরগিগুলো সজোরে ছুড়ে দিলাম ওর মুখে৷ এক বিকট চিৎকার করে সল টলতে টলতে কয়েক পা পিছিয়ে গেল৷ গরম তেল ছড়িয়ে পড়ল ওর চোখেমুখে, ভাজা মুরগির কিছু অংশ ওর টুপির উপর, আর বাকিটা ওর কোটের গায়ে লেগে মেঝেতে ছিটকে পড়ল৷

সল এক হাতে মুখ চাপা দিয়ে অন্য হাতে কোমর থেকে রিভলভারটা বের করার চেষ্টা করতে লাগল৷ আর দেরি না করে ফ্রাইং প্যানটা ঘুরিয়ে সপাটে বসিয়ে দিলাম ওর মুখে৷ সে আঘাতে সল আরও কয়েক পা পিছিয়ে কোনরকমে সোজা হয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করল৷ ওর এক হাত তখনও খুঁজে বেড়াচ্ছে .৪৫ রিভলভারের বাঁট৷

ফ্রাইং প্যানের আর এক আঘাতেই সল মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল৷ ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল একটা চাপা গোঙানি৷

সলের ওপর ঝুঁকে পড়ে ওর রিভলভারটা বের করে নিলাম৷ কিন্তু এর পরেও ও উঠে বসবার চেষ্টা করতে লাগল৷ সুতরাং বিনা দ্বিধায় .৪৫-এর বাঁট দিয়ে সজোরে ওর মাথায় আঘাত করলাম৷ এবারে ও চোখ উল্টে , হাত-পা ছাড়িয়ে আবার মেঝেতে আছড়ে পড়ল৷

ওর রিভলভারটা শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম৷

ঠিক সেই মুহূর্তে কানে এল খাবার ঘরের দরজা খোলার মৃদু শব্দ৷ আর দেরি না করে বিদ্যুৎ বেগে ছুটলাম আলোর সুইচ লক্ষ্য করে৷ সুইচ অফ করতেই একরাশ অন্ধকারে ভরে গেল ছোট্ট রান্নাঘরটা৷

বুঝলাম, এডিকে কাবু করা এতটা সহজ হবে না৷ কারণ এডি পেশাদার খুনে৷ তবু আশার কথা, আমিও নিরস্ত্র নই৷

সুতরাং রিভলভার বাগিয়ে ধরে অন্ধকার রান্নাঘরে ঘাপটি মেরে পড়ে রইলাম৷

‘সল—?’

অন্ধকারে ভেসে এল এডির সতর্ক ফিসফিসে কণ্ঠস্বর৷

খুব সাবধানে হালকা পায়ে এগিয়ে গেলাম রান্নাঘরের খিড়কি-দরজার কাছে৷ জীবনে কোনদিন পিস্তল ব্যবহার করিনি৷ তাই .৪৫ রিভলভারটা আমার হাতে বেখাপ্পা ঠেকতে লাগল৷ কিন্তু তা হলেও মনে যেটুকু সাহস, আশা-ভরসা তা কেবল ওই পিস্তলটার জন্যই৷

এমন সময় খাবার ঘরে আলোটা হঠাৎ নিভে গেল৷ কানে এল কাঠের পাটাতনে পা ফেলার খসখস শব্দ৷

‘সল, তুমি কোথায়?’

খিড়কি-দরজায় হাত রেখে আস্তে চাপ দিলাম৷ কয়েকদিন সেই কব্জাগুলোতে তেল দেওয়ায়, দরজা খোলার সময় কোন শব্দ হল না৷

দরজা খুলতেই কানে এল সলের চাপা গোঙানি, এবং সেই সঙ্গে ওর নড়াচড়ার শব্দ৷ নাঃ, সলের মাথাটা দেখছি লোহার তৈরি! ভেবেছিলাম, অন্তত ঘণ্টাখানেক ও অজ্ঞান হয়ে থাকবে আর সেই সময়ে এডির সঙ্গে আমার বোঝাপড়া শেষ হবে৷ কিন্তু এখন দেখছি সমূহ বিপদ৷ এড়ির ব্যবস্থা যদি চটপট না করতে পারি, তাহলে সল জেগে উঠবে৷ আর, তারপর ওরা দুজনে মিলে ধীরেসুস্থে আমাকে শেষ করবে৷

খিড়কি-দরজা পুরোটা খুলতেই অনুভব করলাম মরুভূমির উত্তপ্ত বাতাসের ঝাপটা৷ ভেবে দেখলাম, বাইরে বেরোতে পারলে এডির সঙ্গে মোকাবিলা করতে আমার অনেক সুবিধে হবে৷ তাই .৪৫টা রান্নাঘরের দরজার দিকে কোনরকমে তাক করে পায়ে পায়ে পিছোতে লাগলাম৷

হঠাৎ চোখে পড়ল বিদ্যুৎ-ঝলকের মতো নীল আগুনের রেখা আর তার পরমুহূর্তেই রিভলভারের কান ফাটানো বীভৎস শব্দ৷ একটা গরম সীসের টুকরো ‘সুইস’ শব্দ তুলে আমার রগ ঘেষেঁ বেরিয়ে গেল৷ ভয়ে আমার সারা শরীর ঘেমে উঠল৷ হৃৎপিণ্ডের গতি হয়ে উঠল দুর্বার—ঢিপ—ঢিপ—ঢিপ—ঢিপ

এক লাফে তিনটে সিঁড়ি পার হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম বালির উপর৷ মুহূর্তের মধ্যে আত্মগোপন করলাম অন্ধকারের আশ্রয়ে৷

এডির লক্ষ্য যে এতটা নির্ভুল, তা আশা করিনি৷

হৎপিণ্ডের অশান্ত স্পন্দনকে একমাত্র সঙ্গী করে অন্ধকারে অপেক্ষায় রইলাম৷ কিন্তু চারদিকের বরফ-শীতল নিস্তব্ধতা পরিবেশকে আরও ভয়াবহ করে তুলল৷

আস্তে আস্তে মাথা তুলে ওয়েন্টওয়ার্থের রাস্তার দিকে তাকালাম৷ কিন্তু সে ক্ষীণ আশাতেও ছাই পড়ল—চাঁদের আলোয় আলোকিত রাস্তা শুভ্র বিতানের মতোই নিষ্কলঙ্ক৷ সে-নির্জনতাকে চুরমার করে এগিয়ে আসছে না কোন গাড়ির হেডলাইট৷ পরিস্থিতি যেন আমাকে বারবার জানিয়ে দিচ্ছে, আমি একা৷ এই বিপদের মুহূর্তে কেউ এগিয়ে আসবে না আমাকে সাহায্য করতে৷ সম্পূর্ণ নিজের উপরেই আমাকে নির্ভর করতে হবে৷

সামনের পাম্পগুলো চাঁদের আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে৷ কিন্তু গুমটিঘর, রেস্তোরাঁ আর বাংলোর চারদিকে অন্ধকারে জমাট আস্তরণ৷ যেভাবে হোক আমাকে বাংলোয় পৌঁছতেই হবে৷ অর্থাৎ পার হতে হবে সামনের আলোকিত উঠোনটুকু৷

রেস্তোরাঁর দেওয়াল ঘেঁষে পায়ে পায়ে পিছোতে লাগলাম৷ অন্ধকারে আড়াল থেকে বাংলোর যতটা কাছে যাওয়ার সম্ভব এগিয়ে গেলাম৷

এমন সময় নরম স্বরে কেউ বলে উঠল, ‘ওহে খোকা, পিস্তল ফেলে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এস৷ শুধু শুধু কেন নিজের বিপদ ডেকে আনছ৷

অন্ধকারে কণ্ঠস্বরের উৎসস্থল ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না৷ কিন্তু এডির সাদা টাইয়ের ঝিলিক মুহূর্তের জন্য চোখে পড়তেই গুলি করার একটা দুর্দম ইচ্ছে আমাকে পেয়ে বসল৷ কিন্তু পরক্ষণেই সে-নির্বুদ্ধিতার পরিণতির কথা চিন্তা করে নিরস্ত হলাম৷ কারণ এডি অত্যন্ত চতুর৷ ও জানে, আমি বোকার মতো ওকে লক্ষ্য করে গুলি করব, আর আমার পিস্তলের কৃশানু সংকেত ওকে জানিয়ে দেবে আমি কোথায় লুকিয়ে আছি৷ আমি যদিও বা ফসকাই, এডি যে লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে না, সেবিষয়ে আমি নিশ্চিত৷ সুতরাং ওর ফাদে পা না দিয়ে চুপচাপ বসে রইলাম৷ অন্ধকারের মধ্যেই দেখতে চেষ্টা করলাম এডির সাদা টাই, কিন্তু কিছুই চোখে পড়ল না৷

ভীষণ ভয় পেলেও স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি আমি তখনও হারায়নি৷ তাই যখন আরও একবার কানে এল এডির নেশা-ধরানোর হালকা স্বর, আমি যেমন বসে ছিলাম তেমনি রইলাম৷ কিন্তু মনে হল, এডির কণ্ঠস্বর যেন আরও অনেকটা কাছে এগিয়ে এসেছে৷ রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগলাম৷ এডি যদি কোনরকমে একবার বুঝতে পারে আমি কোথায় লুকিয়ে আছি, তাহলে আমাকে খুন করতে ও এতটুকু দ্বিধা করবে না৷

খুব সাবধানে বালিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লাম৷ বুকে হেঁটে এগোতে যেতেই হাতে ঠেকল একটা পাথরের টুকরো৷ অতি সপ্তর্পণে ওটা তুলে নিয়ে বিপরীত দিকে লক্ষ্য করে ছুড়ে দিলাম৷ পাথরটা রেস্তোরাঁর দেওয়ালে গিয়ে সশব্দে আঘাত করল৷ সঙ্গে সঙ্গে চোখ-ধাঁধানো নীল আলো, আর পিস্তলের বিকট গর্জন—মাথার ইঞ্চিখানেক উপর দিয়ে বাতাস কেটে শিস তুলে বেরিয়ে গেল একটা গুলি৷ যদি বালির উপর শুয়ে না থাকতাম, তাহলে সলের কথামতো হয়তো ওই গুলিতেই আমার প্রাণ-পাখি ডানা মেলত৷

এবারে বুঝলাম, এডিকে আমি কত ভুল বুঝেছি৷ কারণ, ও পাথরের শব্দ শুনে সেদিকে গুলি না করে, তার বিপরীত দিকে—অর্থাৎ আমাকে লক্ষ্য করেই গুলি করেছে৷ এডির দীর্ঘদিনের পেশাদারী অভিজ্ঞতাকে অবহেলা করে যে কী ভীষণ ভুল করেছি, তা এখন হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করলাম৷

পিস্তলের আলোটা ঝলসে উঠেছে ঠিক খিড়কি-দরজার কাছ থেকে৷ কিন্তু আমি রিভলভার তুলতে গিয়েই থমকে গেলাম৷ কারণ এডি আমাকে গুলি করার পরমুহূর্তেই সিঁড়ির পিছনে বালির উপর লাফ দিল৷ দেখতে না পেলেও, ধপ করে শব্দ হওয়ার ব্যাপারটা অনুমান করতে অসুবিধে হল না৷ বুঝলাম, এডি গুঁড়ি মেরে আক্রমণোদ্যত জাগুয়ারের মতো সিঁড়ির ধাপের আড়ালে আমার জন্য অপেক্ষা করছে৷

খুব সাবধানে নিঃশব্দে পিছোতে শুরু করলাম৷ প্রতিমুহূর্তেই আশা করতে লাগলাম, এখুনি হয়তো শুনতে পাব পিস্তলের গর্জন অনুভব করব বুলেটের নিঃশ্বাস৷

এই সংকটময় মুহূর্তে হঠাৎই এডিকে দেখতে পেলাম৷

আমার কাছ থেকে গজ পনেরো দূরে চোখে পড়ল অন্ধকারে ওর সাদা টাইয়ের ঝিলিক৷ কোন পেশাদার বন্দুকবাজের পক্ষে সাদা টাই পরা নেহাতই অবিবেচনার কাজ৷ এরকম একটা স্থূল লক্ষ্য আমার মতো একজন আনাড়ীও যে অনায়াসে ভেদ করবে সে-বিষয়ে এডির তো সন্দেহ থাকার কথা নয়৷ তাহলে কি প্রতিপক্ষকে অবহেলা করার দরুণই এডির এই চরম অসাবধানতা৷

সপ্তর্পণে একটু একটু করে রিভলভার শক্ত করে ধরে এডির ঝাপসা সাদা টাইয়ের উপর তাক করলাম৷ অস্থির ভয়ার্ত আঙুল ট্রিগারের উপর ক্রমশ চেপে বসতে লাগল৷

কিন্তু হঠাৎ একটা সম্ভাবনার কথা মনে আসতেই ট্রিগারের উপর হালকা হয়ে এল আঙুলের চাপ৷

যদি এডি আমার গুলিতে মারা যায়? কী হবে তাহলে?

ভাবতে অবাক লাগল, এই নিদারুণ সংকটময় মুহূর্তেও কী অদ্ভুতভাবেই না বিভিন্ন সম্ভাবনার বিশদ বিবরণ ভেসে উঠল মনের পর্দায়!

যদি এডিকে আমি খুন করি, তাহলে লাশটা লুকোব কোথায়? তাছাড়া, রান্নাঘরের মেঝেতে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে রয়েছে সল৷ ওরও তো একটা ব্যবস্থা করতে হবে৷ হয়তো শেষ পর্যন্ত সলকেও একেবারে শেষ করতে হবে৷ তারপর!

এডি আর সলের কথা জানিয়ে পুলিশে খবর দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়৷ কারণ, এবারে আর রয় আমার পরিচয় নিয়ে ওদের সামনে দাঁড়াতে পারবে না৷ পোস্টমর্টেম রিপোর্টেই ধরা পড়ে যাবে, এডি আর সলের মৃত্যুর সময় রয় এবং লোলা দুজনেই ওয়েস্টওয়ার্থে ছিল৷ তখন পুলিশ জানতে চাইবে এডি এবং সলের মৃত্যুর জন্য দায়ী কে? সুতরাং, আমাকেই অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে ওরা সোজা ফার্নওয়ার্থে চালান দেবে৷ কোন কথাই শুনতে চাইবে না৷

কিছুক্ষণ ইতস্তত করে রিভলভার নামিয়ে নিলাম৷ এবং সেটাই হল আমার চরম নির্বুদ্ধিতা৷

কারণ, রিভলভার নামানোর এই সামান্য নড়াচাড়া এডির শিকারী দৃষ্টিকে ফাঁকি দিতে পারল না৷

আগুনের ঝলক আর রিভলভারের গুলির শব্দের সঙ্গে সঙ্গে বুকে অনুভব করলাম এক প্রচণ্ড ধাক্কা৷ সারা শরীর বাঁশ পাতার মতো থরথর করে কেঁপে উঠল৷ কিন্তু কোন যন্ত্রণাই অনুভব করলাম না৷ শুধু মনে হল, আমার মস্তিষ্কের ভিতর কেউ যেন একটা সুইচ অফ করে দিয়েছে, আর তারই ফলস্বরূপ নির্বাপিত হয়েছে কোন শক্তির উৎস শরীরের নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা হয়েছে অকেজো৷

বালির উপর মুখ থুবড়ে পড়তেই অনুভব করলাম উষ্ণ উত্তাপ৷ দু-হাতে ধরা রিভলভারটা যেন অকস্মাৎ ময়দানবের প্রাসাদের মতোই ভারী ঠেকল৷ শত চেষ্টায়ও আর ধরে রাখতে পারলাম না৷

রিভলভারটা হাত থেকে স্খলিত হয়ে বালিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটা ছুঁচলো জুতোর কঠিন অগ্রভাগ সপাটে এসে আছড়ে পড়ল আমার পাঁজরে৷

মনে হল, একটা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের কাছে আমি দাঁড়িয়ে আছি৷ তার উত্তাপে আমার ভিতরটা পর্যন্ত পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে৷ সেই সঙ্গে রক্তসমুদ্রের বিশাল ঢেউ যেন আমাকে ভয় দেখাচ্ছে৷ আমি আস্তে আস্তে তার মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছি৷ শরীরের অসহ্য যন্ত্রণা ক্রমশ ফিকে হয়ে আসতে লাগল৷ চিৎকার করতে গিয়ে টের পলাম, সে-ক্ষমতাও আমি হারিয়েছি৷

ঘড়ির কাঁটা হঠাৎ উদ্দাম গতিতে ছুটে চলল বিপরীত দিকে—অন্ধকার চোখের সামনে ফিরে এল অতীতের সেই দৃশ্য—

কুপারের বাড়ির সিঁড়ি ভেঙে আমি উন্মাদের মতো দৌড়চ্ছি৷ নিচে আসতেই আবার সেই দ্বাররক্ষীর সঙ্গে ধস্তাধস্তি৷ তারপরই দেখলাম, আমি বৃষ্টি-ভেজা রাস্তা ধরে ছুটে চলেছি৷ পিছনে ধুপধাপ করে দৌড়ে আসছে সেই কালান্তক পুলিশটা—হঠাৎ কানে এল গুলির শব্দ—পরমুহূর্তেই এক প্রচণ্ড ধাক্কা—মুখ থুবড়ে রাস্তার পড়তেই টের পেলাম বৃষ্টির ফোঁটা ঝিরঝির করে ঝরে পড়ছে আমার চোখে-মুখে—আঃ—

পরে রয়ের কাছেই সমস্ত ঘটনা শুনেছিলাম৷ ওয়েন্টওয়ার্থ থেকে ফিরে এসে ওরা লক্ষ্য করে ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’ সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঢাকা৷ তাই দেখে রয়ের মনে কেমন যেন সন্দেহ হয়৷ ও আমার নাম ধরে ডাকাডাকি করতে থাকে৷ কিন্তু কোন উত্তর না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করতেই বাইরে বালির উপর রয় আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় আবিষ্কার করে৷ প্রথমে ও ভেবেছিল, আমি হয়তো আর বেঁচে নেই৷ কিন্তু পরে আমার অবস্থা বুঝতে পেরে, ও আর লোলা মিলে আমাকে ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে আসে—রয়ের বিছানায় শুইয়ে দেয়৷ তার কিছু পরেই নাকি আমার জ্ঞান ফিরে আসে৷

জ্ঞান যখন ফিরল, দেখি রয় আমার দেহের উপর ঝুঁকে রয়েছে৷ ওর মুখ ভয়ে সাদা হাত-পা থরথর করে কাঁপছে৷ রয়ের ঠিক পিছনেই স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে লোলা৷ উত্তেজনায় ওর মুখের রেখা কঠিন—চোখের তারায় কৌতূহল৷

আস্তে পাশ ফেরার চেষ্টা করতেই বুঝলাম, সে শক্তিও আমার নেই৷

আমাকে চোখ মেলাতে দেখেই লোলা রয়ের পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে এল৷ ঝুঁকে পড়ল আমার মুখের উপর—কাঁপা স্বরে প্রশ্ন করল, ‘কী হয়েছিল, শেট? কে তোমার এ অবস্থা করেছে?’

শত চেষ্টাতেও আমার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বেরোল না৷

রয় আমার অবস্থা দেখে লোলাকে নিরস্ত করল, ‘থাক, লোলা৷ ও এখন বিশ্রাম করুক৷ তুমি যাও আমি ওর পাশে বসছি৷’

আমি আবার ভেসে চললাম অন্ধকারের রাজ্যে৷ একরাশ কালো অন্ধকার যেন উন্মক্ত আক্রোশে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার উপর৷ মনে হল, এই বোধহয় শেষ অন্ধকার—জীবনের ওপিঠ—মৃত্যু! কিন্তু আশ্চর্য, এই মৃত্যুভয় আমার মনে আশঙ্কার পরিবর্তে এনে দিল এক বিচিত্র প্রশান্তি৷ চেতনার সীমারেখা পার হতেই যন্ত্রণার রেশ ক্রমশ ফিকে হয়ে মিলিয়ে গেল৷ জমাট অন্ধকারের বিশাল টুকরো এসে আশ্রয় নিল দুচোখের পাতায়—

দ্বিতীয় বার চোখ মেলতেই জানালা দিয়ে ঠিকরে-আসা সোনালী রোদে কেমন অস্বস্তি বোধ করলাম৷ কিছুক্ষণ চোখ বুজে থাকার পর তাকিয়ে দেখি রয় তখনও আমার পাশেই বসে আছে৷ চোখের চিন্তাকুল দৃষ্টি আমার মুখমণ্ডলে নিবদ্ধ৷ কিন্তু লোলাকে কোথাও দেখলাম না৷ সম্ভবত ও বাংলোয় ফিরে গেছে৷

‘এখন কেমন আছিস?’ সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে রয় প্রশ্ন করল৷

‘ভালোই৷’

মনে হল, এই একটা শব্দ উচ্চারণ করতে শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষিত হয়েছে৷ নিজেকে এত দুর্বল লাগল, যেন দু-পাখার ভর করে অসীম শূন্যের দিকে ভেসে চলেছি৷ খাট, ঘর—সব যেন আস্তে আস্তে দুলছে—দুলছে—

‘শোন্ শেট,’ রয় খুব ধীরে অথচ স্পষ্ট করে প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করল, ‘তোর শরীরের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়৷ তাই আমি ডাক্তার ডাকতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু লোলা বারণ করল৷ ও বলল, তোর নাকি ডাক্তারের দরকার হবে না?’

‘লোলা ঠিক বলেছে, রয়৷’ আপ্রাণ চেষ্টায় ক্ষীণস্বরে জবাব দিলাম৷

‘কিন্তু আমার মনে হয়, ডাক্তার না ডাকলে যে-কোন সময় তোর কিছু একটা হয়ে যেতে পারে৷’ রয়ের কণ্ঠস্বর উদ্বিগ্ন মনে হল, ‘আমার যথাসাধ্য আমি করেছি, শেট, কিন্তু আমি তো আর ডাক্তার নই!’

শরীর দুর্বল হলেও আমার চিন্তাশক্তি কিন্তু আচ্ছন্ন হয়নি৷ ডাক্তার ডাকার পরিণতি আমার অজানা নেই৷ ডাক্তার এসে যখনই দেখবে, আমি রিভলভারের গুলিতে আহত হয়েছি, তখনই সে পুলিশে খবর দেবে অর্থাৎ সেই ফার্নওয়ার্থ!

এমন সময় জানালা দিয়ে ভেসে এল হর্নের তীক্ষ্ণ শব্দ৷

আপনমনেই গজগজ করতে করতে রয় উঠে দাঁড়াল, ‘শালা, এই ট্রাক-ড্রাইভারগুলো দেখছি আমাকে পাগল করে ছাড়বে! তুই শুয়ে থাক শেট, আমি এখুনি আসছি৷’

চোখ বুঝে শুয়ে রইলাম৷ কখন যে ঘুমিয়ে পড়ছিলাম জানি না, হঠাৎ এক মৃদু শব্দে চমকে চোখ মেললাম৷ সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে৷ পারিপার্শ্বিক আবহাওয়ায় এক অদ্ভুত নৈঃশব্দ৷ দেখি, আমার মুখের ঝুঁকে রয়েছে লোলা৷

‘শেট, কারা তোমাকে গুলি করেছে?’

‘দুজন লোক ওদের কাছে রিভলভার ছিল,’ অস্পষ্টস্বরে জবাব দিলাম৷

লোলা মাথা আরও নামিয়ে আমার ঠোঁটের কাছে ঝুঁকে এল, ‘তুমি চেন ওদের?’

‘না—আগে কোনদিন দেখিনি৷’

‘ওরা সিন্দুক খোলেনি তো, শেট?’

অতিকষ্টে চোখ ফিরিয়ে লোলার দিকে তাকালাম৷ ওকে আর আগের লোলা বলে চেনাই যায় না৷ গাল ভেঙে গেছে চোখের কোলে কালি এই ক-দিনে লোলার বয়স যেন দশ বছর বেড়ে গেছে৷ ওর ঠোঁটের উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম সূর্যের পড়ন্ত আলোয় চকচক করছে৷ মুখ কাগজের মতো ফ্যাকাশে সাদা৷

‘জানি না খুলেছে কিনা৷’

বিছানায় শুয়ে সেই বিচিত্র শূন্যতার অনুভূতি সিন্দুকের চিন্তা আমার মন থেকে একেবারে মুছে দিল৷

‘ওরা কি সিন্দুকের কথা জিগ্যেস করেছিল?’ লোলার স্বর উৎকণ্ঠায় কাঁপছে৷

‘উহুঁ—’

‘শেট, সিন্দুকটা বাইরে থেকে বন্ধই আছে দেখে মনে হচ্ছে না ওটা কেউ খুলেছিল৷ কিন্তু তবু আমার নিশ্চিতভাবে জানা দরকার৷ যদি ওরা টাকাগুলো নিয়ে সিন্দুক বন্ধ করে দিয়ে থাকে, তাহলে?—শেট—শেট, আর একবার ভালো করে ভেবে দেখ!’ উত্তেজনায় লোলার সুডৌল স্তন সাদা গাউনের নিচে একবার উঠছে—একবার নামছে৷ সিন্দুকের চিন্তায় ও একেবারে উন্মাদ হয়ে গেছে৷

আমার মনে পড়ল এডির কথা৷ এডির মতো পেশাদার লোক যদি সিন্দুকটা খুঁজে পেয়ে থাকে, তবে সেটা খুলতে ওর বেশি সময় লাগবার কথা নয়৷ কারণ সিন্দুক সম্বন্ধে সামান্যতম অভিজ্ঞতা যার আছে, সে-ই এক তুড়িতে ওই সিন্দুক খুলে ফেলবে৷

‘জানি না৷ সিন্দুকটা দেখে থাকলে হয়তো নিতে পারে—৷’

কথা বলার পরিশ্রমে মন আচ্ছন্ন হয়ে পড়তে লাগল৷ আবার যেন ভেসে চললাম সেই শূন্যতার মধ্যে দিয়ে৷

‘আমার জানা দরকার, শেট৷ সিন্দুকটা কী করে খুলতে হয় আমাকে বলে দাও৷’

লোলার ফ্যাকাশে মুখে লোভ, উৎকণ্ঠার ছায়া—ওর ঘর্মাক্ত মুখ ঝুঁকে রয়েছে আমার মুখের উপর৷ নাকে আসছে ওর ঘামের গন্ধ৷ ওর কথাগুলো যেন শব্দতরঙ্গের প্রতিধ্বনির মতো ছড়িয়ে পড়ে সারা ঘর ভরে ফেলল—আমাকে বলে দাও, আমাকে বলে দাও, আমাকে বলে দাও—

চোখের সামনে এসে দাঁড়াল সেই অন্ধকার, আমাকে ঘিরে ধরল চারদিক থেকে৷ ভেসে এল লোলার কণ্ঠস্বর, ‘বলো শেট—চুপ করে থেকো না৷ সিন্দুকটা কি করে খুলতে হয়, আমাকে বলে দাও৷ শেট—শেট—!’

লোলার স্বর, রয়ের ঘর—আর অস্তায়মান সূর্যের ম্লান আলোয় আলোকিত জানালা—সব-কিছুর সামনে কে যেন হঠাৎ টেনে দিল এক নিকষ কালো পর্দা৷

জীবন-মৃত্যুর অনিশ্চয়তার দোলায় কেটে গেল তিনটে দিন৷ নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে শুধু শুধু আর পঙ্গু হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করিনি৷ সব-কিছু ছেড়ে দিয়েছি ভবিতব্যের হাতে৷

রয় যদি জীবনপণ করে এভাবে আমার সেবা না করত, তাহলে হয়তো এই তিনটে সূর্যোদয় দেখার সৌভাগ্যও আমার হত না৷ রাত নেই, দিন নেই—সব সময় রয় বসে থেকেছে আমার পাশে৷ জ্বরের সময় সারারাত ও আইস-ব্যাগ নিয়ে বসেছিল আমার মাথার কাছে৷ এক সেকেণ্ডের জন্যও দু-চোখের পাতা এক করিনি৷

জ্বরে যখন গা পুড়ে যাচ্ছে, যন্ত্রণায় চোখে অন্ধকার দেখছি, এমন সময় দেখলাম, আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে কার্ল জেনসন৷ বিস্ময়বিস্ফারিত দৃষ্টি মেলে সে আমাকে দেখছে৷ যেমন দেখেছিল খোলা সিন্দুকের সামনে আমাকে আবিষ্কার করার পর৷ আমি জেনসনকে কি যেন বলতে গেলাম, কিন্তু ঠোঁট কেঁপে উঠলেও, হল না কোন শব্দের সৃষ্টি৷ আমার কথা বলার নীরব প্রয়াসকে অবহেলা করে জেনসন মিলিয়ে গেল অন্ধকারে৷

পরে রয়ের কাছে শুনেছিলাম, সেই সময়েই নাকি আমার অবস্থা চরমে উঠেছিল৷ এমনকি রয়ও আমার জীবনের আশা ছেড়ে দিয়েছিল৷ কিন্তু তারপরই কোন-এক অলৌকিক শক্তিবলে আমার অবস্থা আবার ভালোর দিকে মোড় নিল৷ ধীরে ধীরে সেরে উঠতে লাগলাম৷

সাত দিনের দিন ফিরে পেলাম কথা বলার শক্তি৷ তখন রয়ের সঙ্গে এডি এবং সলের ব্যাপারটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলাম৷

কথা শেষ হলে রয় বলল, ‘ওরা ক্যাশ-বাক্স আর পেট্রল বিক্রির টাকা, সমস্ত ঝেড়ে পুঁছে নিয়ে গেছে৷ এমন কি খাবারগুলো পর্যন্ত বাদ দেয়নি৷’

আবার মনে পড়ল সিন্দুকের কথা৷ এডি কি সিন্দুকটাকে রেহাই দিয়ে গেছে? কে জানে—

কিন্তু রয়কে এ বিষয়ে কোন প্রশ্ন করলাম না৷

‘তোর আর-কোন ভয় নেই, শেট—এবারে তুই ধীরে ধীরে ভালো হয়ে উঠবি৷ নেহাত কপালজোরে এ যাত্রা বেঁচে গেছিস৷ রয়ের শীর্ণ মুখে বিবর্ণ হাসির আভাস৷ এ ক-দিনের অনিদ্রায় ওর চোখ লাল—চোখের কোলে কালি৷

‘এবারেও সেই তোর জন্যই বেঁচে উঠলাম, রয়৷ আমাকে দু-দুবার বাঁচিয়ে তুই আগের সমস্ত ঋণ শোধ করে দিলি৷ তোকে কি বলে যে ধন্যবাদ দেব জানি না—’

‘থাম্ শালা, থাম্—ঢের হয়েছে!’ কপট তিরস্কারের সুরে আমাকে বাধা দিল রয়, ‘কী আমার ভারি ইয়ে, তার আবার—৷ এ ক-টা দিন ভীষণ পরিশ্রম গেছে মাইরি৷ একবার তোকে দেখছি, আর একবার বাইরে গিয়ে গাড়িগুলোকে তেলমোবিল গেলাচ্ছি৷ ওফ—একটু ঘুমোতে পর্যন্ত পারিনি! দেখি, আজ একটা লম্বা ঘুম লাগাতে হবে৷’

আট দিন আট রাত আমি অসহায়ভাবে বিছানায় পড়ে ছিলাম৷ কিন্তু লোলা একবারের জন্যেও আমার কাছে আসেনি৷ জানি না, এ ক-দিনে রয়ের সঙ্গে ওর ঘনিষ্ঠতা কোন্ পর্যায়ে পৌঁছেছে৷

‘লোলার সঙ্গে তোর চলছে কেমন?’ ঠাট্টাচ্ছলে রয়কে প্রশ্ন করলাম৷

ও নিস্পৃহভাবে কাঁধ ঝাঁকাল, ‘ওর সঙ্গে তো বলতে গেলে দেখাই হয় না৷—কি করে হবে বল্ না, দিন-রাত তো তোর কাছেই পড়ে আছি!’

রয়ের জবাব দেবার ধরন দেখে বুঝলাম, ও মিথ্যে বলছে৷ এমনকি আমার দিকে তাকাতে পর্যন্ত ওর বিবেকে বাধছে৷

‘আমি তোকে বারবার সাবধান করেছি, রয়৷ লোলা সাপিনীর মতো খল—ওকে তুই এখনও চিনিসনি৷’

‘নিশ্চিন্ত থাক্৷ লোলা যাই করুক না কেন, আমার কাছে বিশেষ সুবিধে করতে পারবে না৷’

কিছুক্ষণ আমরা পরস্পরের চোখে চোখ রাখলাম৷ হয়তো বোঝবার চেষ্টা করলাম একে অপরের অন্তরের কথা৷ একসময় রয়ই হঠাৎ প্রশ্ন করল, ‘শেট, সত্যি করে বল্ তো, জেনসনের আসলে কী হয়েছে?’

যদি না বুঝতাম, লোলাও ওর রূপযৌবনের প্রভাবে রয়কে আচ্ছন্ন করেছে, তাহলে হয়তো রয়ের কাছে জেনসন-নিরুদ্দেশ-রহস্য ফাঁস করতাম না৷ কিন্তু এখন যে করে হোক রয়কে নিরস্ত করার জন্য আমি মরিয়া৷ লোলার কাছ থেকে ওকে সরিয়ে আমি আনবই—তা সে যেভাবেই হোক৷ তাই ওকে সত্যিই কথাই বললাম, ‘লোলা কার্লকে খুন করেছে—আর আমি বোকার মতো লোলার কথায় রাজি হয়ে সেই মৃতদেহটা করব দিয়েছি৷’

একথা বলামাত্রই রয়ের চোখে ফিরে এল নির্বিকার শূন্য দৃষ্টি৷ পরিষ্কার বুঝলাম, আমার বক্তব্য ওর একেবারেই মনঃপূত হয়নি৷ অর্থাৎ, লোলা-বিরোধী কোন কথা শুনতে ও বিন্দুমাত্র রাজি নয়৷

‘ জেনসনের আগে লোলা আরও একটা বিয়ে করেছিল,’ রয়ের উপেক্ষাকে অগ্রাহ্য করেই বলে চললাম, ‘এবং সেই স্বামীকেও লোলা নৃশংশভাবে খুন করেছিল৷ তুই সাবধান থাকিস, রয়, লোলার রক্তে মিশে আছে খুন করার নেশা৷ প্রয়োজন হলে তোকে খুন করতেও ওর হাত এতটুকু কাঁপবে না৷’

‘কী উল্টোপাল্টা বকছিস?’ রয় আমার মুখের কাছে ঝুঁকে এল৷ বিস্ময়ে ওর চোখ বিস্ফারিত৷ চোয়ালে রেখা কঠিন৷

‘যা বলছি, ঠিকই বলছি৷ তোকে আমি সব খুলে বলতে চাই, যাতে তুই সময় মতো সাবধান হতে পারিস৷’

রয় উঠে দাঁড়াল, ‘এসব বাজে কথা শোনার সময় আমার নেই—আমি চললাম৷’

‘আমি তোকে তোর ভালোর জন্য বলছি, রয়৷ লোলাকে আমি যতখানি চিনি, তুই তা চিনিস না৷’

রয় দরজার দিকে পা বাড়াল, ‘যাই, ওদিকে আবার হাতের কাজ ফেলে এসেছি— বেশি দেরি করা ঠিক হবে না৷ তুই চুপচাপ শুয়ে পড়, এসব নিয়ে আর ভাবিস না, কথা শেষ করে রয় আর দেরি করল না৷ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল৷

যাক, ওকে যে আগে থাকতে সাবধান করে দিতে পেরেছি, তাতেই আমার সান্ত্বনা৷ আমাকে আর জেনসনকে লোলা যত সহজে বোকা বানিয়েছে, রয়ের বেলায় ব্যাপারটা ততটা সহজ হবে না৷ কারণ, এখন থেকে রয়ও যথেষ্ট সাবধান হবে—লোলার প্রতি সবসময় লক্ষ্য রাখবে৷

কিন্তু তখনও বুঝিনি, আমার অনেক দেরি হয়ে গেছে, রয়কে সাবধান করার আর প্রয়োজন নেই৷ কারণ, পরদিন রাতেই আমি আমার ভুল বুঝতে পারলাম৷

আমার অসুখের পর থেকে রয় শোবার ঘরটা আমাকে ছেড়ে দিয়ে বসবার ঘরে গিয়ে রাত কাটাত৷ সম্ভবত আমার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে লক্ষ্য রেখেই৷ কিন্তু জেনসনের মৃত্যুর কথা রয়কে খুলে বলার পরই আমাদের মাঝে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য পাঁচিল৷ জানতাম, আমাদের মনের এই দূরত্ব পরস্পরকে চিরকাল দূরেই সরিয়ে রাখবে৷ আমাদের বোঝাপড়ার নিটোল ছন্দ সেই মুহূর্ত থেকেই বেসুর হয়ে গেছে৷ রয়ের নির্বিকার, অভিব্যক্তিহীন মুখভাবে সেটা আরও বেশি করে বুঝতে পারি৷ কিন্তু তার চেয়েও অস্বস্তিকর ঠেকে এই ঘরের পরিবেশ৷

লোলার কথা নিয়ে আমরা কখনও আলোচনা করি না৷ কিন্তু মাঝেমাঝেই জানালা দিয়ে দেখি, রেস্তোরাঁ থেকে বাংলোর দিকে হেঁটে যায়৷ অথচ ভুলেও কোনদিন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেনি৷

সেদিন রাত প্রায় এগারোটা বাজতেই দেখি, লোলা বাংলোয় ফিরে চলেছে৷ তার একটু পরেই নিভে গেল বাংলোর আলো৷ কিন্তু রেস্তোরাঁর আলো তখনও জ্বলছে—অর্থাৎ রয় এখনও কাজে ব্যস্ত৷

রাত প্রায় বারোটার সময় রয় আলো নিভিয়ে রেস্তোরাঁ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল৷ তারপর রেস্তোরাঁ বন্ধ করে ঘরে এল৷ বাইরে বসবার ঘরে ওর চলাফেরার শব্দ পেলাম৷ একটু পরেই ও হঠাৎ আমার ঘরের দরজা খুলে উঁকি মারল৷ কিন্তু আমাকে জেগে থাকতে দেখে কেমন থতিয়ে গেল, ‘শেট—মানে তোর কোন দরকার হলে আমাকে ডাকিস৷ আমি পাশের ঘরেই আছি—একটু ঘুমোবার চেষ্টা করি৷’

বুঝলাম, এ ক-দিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর রয়ের আজ ঘুমোনো একান্ত প্রয়োজন৷ তাই ওকে বললাম, তেমন দরকার আমার হবে না৷ ও যেন নিশ্চিন্তমনেই ঘুমোয়৷

রয় চলে যেতেই আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম৷

জানি না রাত তখন কত হবে, হঠাৎ কানে এল শোবার ঘরের দরজা খোলার শব্দ৷ অন্ধকারে উৎকর্ণ হয়ে রইলাম৷ কানে এল রায়ের চাপা কণ্ঠস্বর, ‘শেট, তুই কি ঘুমিয়ে পড়েছিস?’

কোন উত্তর না দিয়ে চুপচাপ শুয়ে রইলাম৷ অন্ধকারে চোখে পড়ল দরজায় দাঁড়ানো রয়ের ছায়ামূর্তি৷

ওর কথা বলার হাল্কা ফিসফিসে কণ্ঠস্বর আমাকে ভাবিয়ে তুলল৷ তাহলে কি?—

নিশ্চল হয়ে পড়ে রইলাম৷ একটু পরেই শুনলাম দরজা বন্ধ করার মৃদু শব্দ৷ বুঝলাম, রয় ঘর থেকে চলে গেছে৷

সব-কিছু জেনেশুনেও মনেপ্রাণে চাইলাম, আমার অনুমান যেন মিথ্যে হয়৷ রয় সম্বন্ধে আমার ধারণা যে এই অসুস্থ চিন্তার কলঙ্কিত না হয়৷ কিন্তু জানি, নিজেকে স্তোক দিয়ে লাভ নেই৷ কারণ, বাস্তবকে অস্বীকার করার ক্ষমতা আমার কেন, এ পৃথিবীতে কারুরই নেই!

একে একে গড়িয়ে চলল এক-একটি উৎকণ্ঠাময় মুহূর্ত৷ জানালা দিয়ে একদৃষ্টে চেয়ে রইলাম উঠোনের দিকে৷ একটু পরেই রয় অন্ধকার ছায়ার আশ্রয় ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এল৷ নিঃশব্দে অথচ ক্ষিপ্রপায়ে এগিয়ে চলল বাংলোর দিকে৷ যেতে যেতে একবার ও ঘুরে তাকাল, দেখল আমার ঘরের দিকে—কিন্তু পরমুহূর্তেই বাংলোর দরজা খুলে সন্তর্পণে ভিতরে ঢুকে পড়ল৷

আমার বোঝা উচিত ছিল, একটানা এই আট রাত লোলা শুধু শুধু নষ্ট করেনি৷ আমার অনুপস্থিতির সুযোগে রয়কে বোকা বানিয়েছে৷ আর, সঙ্গকামনায় চঞ্চল রয়, সে-প্রলোভনকে উপেক্ষা করতে পারেনি৷ সুতরাং ওকে দোষ দিয়ে লাভ কি!

অন্ধকারে শুয়ে নিজেকে বড় অসহায় মনে হল৷ ঈর্ষার বদলে অনুভব করলাম আতঙ্কের অস্তিত্ব৷ লোলা একবার যখন রয়কে কব্জা করেছে, তখন ওকে দিয়ে সিন্দুক লোলা খোলাবেই৷ তারপর ও রয়কে খুন করবে৷—না, এ বিষয়ে এতটুকু সংশয়-সন্দেহ আমার মনে নেই৷

রয়ের পর আমাকেও লোলার শিকার হতে হবে৷ তারপর টাকাগুলো জায়গা মতো লুকিয়ে ফেলে ও খবর দেব সেই শেরিফকে৷ পায়জামা পরে বিছানায় শোওয়া অবস্থায় আমার মৃত্যুর ব্যাখ্যা ও কি দেবে, ভেবে পেলাম না৷ তার উপর পুলিশ এসে দেখবে, আমি আগে থেকেই এডির গুলিতে আহত হয়ে অসুস্থ ছিলাম৷

কিন্তু লোলা এতে থমকাবে বলে ভাবলে ভীষণ ভুল হবে৷ এই আট দিনেও হয়তো জুতসই একটা গল্পও তৈরি করে ফেলেছে—আমার এবং রয়ের মৃত্যুর ব্যাখ্যা হিসেবে৷ এডি এবং সলের চেহারার বর্ণনা আমি রয়কে দিয়েছি৷

ইতিমধ্যে লোলা হয়তো সেই বিবরণ রয়ের থেকে জেনে নিয়েছে৷ পরে পুলিশ এলে ও বলবে, এই এডি এবং সলই আমাকে আর রয়কে খুন করেছে৷ আর সেই সময়ে লোলা নিজে ওয়েন্টওয়ার্থে ছিল৷ সুতরাং সব সমস্যারই সমাধান হয়ে যাবে৷

লোলার স্বরূপ আমি জানি—ওর অসাধ্য কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না৷

বুকের যন্ত্রণা উপলব্ধির সঙ্গে সঙ্গে নানান চিন্তায় ভেসে চললাম৷ কিন্তু চোখজোড়া বাংলোর দরজায় নিবদ্ধ৷ রাত প্রায় দুটো নাগাদ রয় বাংলোর দরজা খুলে বেরিয়ে এল৷ দরজা বন্ধ করে ঘরের দিকে আসতে লাগল৷

নিঃশব্দে বসবার ঘরে এসে ঢুকল রয়৷ একই সঙ্গে আমিও হাত বাড়ালাম আলোর সুইচের দিকে৷ রয় আমার ঘরের দরজা খুলতেই আলো জ্বেলে দিলাম৷

আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে ও স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল দরজার কাছে৷ ওর পরনে গেঞ্জি, পায়জামা৷ পায়ে জুতো বা চটি পর্যন্ত নেই৷

‘আমি তোকে জাগাতে চাইনি, শেট৷ দেখলাম, তুই ঠিকমতো ঘুমোচ্ছিস কিনা৷’

‘আয়, ভেতরে আয়৷ তোর সঙ্গে কথা আছে৷’

রয়ের চোখে অস্বস্তির ছায়া কেঁপে উঠল, ‘না রে, এখন নয়৷ রাত প্রায় শেষ হতে চলল—একটা ঘুম দিয়ে নিই৷’

‘তোর সঙ্গে জরুরি কথা আছে, রয়৷’ আমার কথার সুরে রয় চমকে উঠল, এগিয়ে এসে আমার পাশে বসে ও একটি সিগারেট ধরাল, ‘বল্, কী বলবি৷’

‘লোলা তোকে তাহলে শেষ পর্যন্ত ফাঁদে ফেলেছে, হুঁ?’

রয় কোন জবাব দিল না৷ হাতের সিগারেটে একটা গভীর টান দিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছাড়ল৷ ধোঁয়ার পর্দার ওপিঠ থেকে ভেসে এল ওর কর্কশ কণ্ঠস্বর, ‘শেট, তোর শরীর ভালো নেই৷ এসব আজেবাজে ভাবনা ছেড়ে শুয়ে পড়৷ কাল সকালে কথা হবে—আমার এখন ঘুম পাচ্ছে৷’

‘আমি অসুস্থ ঠিক কথা৷ কিন্তু তা বলে ভাবিস না আমি জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছি৷ আমার কথায় তুই যদি এখন থেকেই সাবধান না হোস, তবে তোর নিজের কবর তুই নিজেই খুঁড়বি৷ কিন্তু তুই আমার কথার জবাব দিল না তো?’

রয়ের অভিব্যক্তিহীন মুখে ফুটে উঠল একটা হিংস্র ভাব৷ নিজের বুকে আঙুলের টোকা মেরে ও বলল, ‘কোন মেয়ের ফাঁদে এই রয় ট্রেসি কোনদিন পা দেয়নি—দেবেও না৷’

‘তুই কি নিজেকে স্তোক দিয়ে ভোলাতে চাইছিস৷ নাকি আমাকে নেহাত বোকা ঠাউরেছিস?’

আমার কাটা-কাটা কথা রয়ের মোটেই ভালো লাগল না৷ অধৈর্য হয়ে ও বলে উঠল, ‘ঠিক আছে, তুই যখন না শুনেই ছাড়বি না—লোলার ফাঁদে আমি যে পা দিয়েছি, তা নয়—ওর দান আমি গ্রহণ করেছি বলতে পারিস্৷ এ বান্দাকে ফাঁদে ফেলা এত সহজ নয়৷’

‘লোলা কি তোকে কোন সিন্দুক খুলতে বলেছে?’

রয়ের ভুরু কুঁচকে উঠল সংশয়ভরা চোখে ও আমার দিকে তাকাল, ‘সিন্দুক! কীসের সিন্দুক!’

‘জেনসনের সিন্দুক৷’ ধীর স্বরে জবাব দিলাম৷ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর মুখভাব লক্ষ্য করতে লাগলাম৷

রয় হতভম্ব চোখে চেয়ে রইল৷ চিন্তান্বিতভাবে মাথার চুলে আঙুল চালিয়ে বলল, ‘এমন কি আছে জেনসনের সিন্দুকে যে—?’

‘তোকে খুলতে বলেছে কিনা বল্!’

রয়ের মুখ দেখে বুঝলাম, লোলা এখনও ওকে সে-কথা বলেনি৷ আমার উত্তেজনা প্রশমিত হয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস আর স্বাভাবিক হল৷ যাক, অন্তত এবারে লোলা আমাকে হারাতে পারবে না৷ আগেই রয়কে আমি সাবধান করে দেব৷

‘না, লোলা সে-রকম কথা তো কিছু বলেনি৷’ অবাক হয়ে জবাব দিল রয়৷

‘এখনও বলেনি—তবে বলবে৷ সে-বিষয়ে তুই নিশ্চিত থাকতে পারিস৷’

রয় অধৈর্য হয়ে হাতের একটা ভঙ্গি করল, ‘কী এত ধানাই-পানাই করছিস?’ আসল কথাটা খুলে বল্ দেখি!

‘শোন্ তাহলে জেনসনের সিন্দুকে একটা এমন একটা জিনিস আছে, যেটা না হলে লোলার চলবে না৷ আর সেটা পাওয়ার জন্য হেন কাজ নেই যে লোলা করতে রাজি নয়—এমন কি খুন করতেও ওর বিবেকে বাধবে না৷

‘ওই জিনিসটার জন্যই ও জেনসনকে খুন করেছে ভয় দেখিয়ে আমাকে দিয়েও সিন্দুক খোলাতে চেয়েছে, কিন্তু পারেনি৷ আর এখন যেই তোকে হাতের কাছে পেয়েছে, ওমনি ওর কাজ শুরু হয়ে গেছে৷ লোলা জানে তুই সিন্দুক খুলতে জানিস তাই তোর সঙ্গে অন্তরঙ্গ হবার চেষ্টা করছে৷ তোকে দিয়ে যে করে হোক সিন্দুক খুলিয়ে, ও তোকে খুন করবে৷

‘জানি, ব্যাপারটা তোর কাছে অত্যন্ত অবিশ্বাস্য ঠেকছে, কিন্তু এর প্রতিটি বর্ণ সত্যি৷ যে-মেয়ে ইতিমধ্যেই দু-দুটো খুন করেছে, তার কাছে আর একটা খুন করা কিছুই নয়! জেনসনকে খুন করার দিন আমাকেও খুন করত৷ শুধু অল্পের জন্য বেঁচে গেছি! আমার কথা বিশ্বাস কর—ওই সিন্দুকটা তুই কিছুতেই খুলিস না!’

কথা বলার পরিশ্রমে আমার সারা শরীর ঘেমে উঠল৷ বুকের যন্ত্রণায় নিশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসবে৷ আশা আর নিরাশার মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে রয়কে লক্ষ্য করতে লাগলাম৷ কিন্তু ওর অভিব্যক্তিহীন মুখে নিস্পৃহতার মুখোশ৷ শুধু চোখের তারায় ঈষৎ কালো ছায়া৷ অধৈর্য হয়ে ও প্রশ্ন করল, ‘তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে? সিন্দুকে কি এমন আছে যে লোলার সেটা না হলে চলবে না?’

সিন্দুকে যে এক লাখ ডলার আছে, সে-কথা ওকে বলার মতো বুদ্ধিভ্রংশ তখনও আমার হয়নি৷ তাই একটা বিশ্বাসযোগ্য কাল্পনিক গল্প ওকে শুনিয়ে দিলাম, ‘তোকে তো আগেই বলেছি, ওর প্রথম স্বামীকে খুন করার ব্যাপারে পুলিশ লোলাকে সন্দেহ করেছিল৷ এবং সে-সন্দেহ একেবারে মিথ্যে নয়৷ তাই লোলাকে বিয়ে করার আগে জেনসন ওকে দিয়ে ফিনির খুনের একটা স্বীকারোক্তি লিখিয়ে নেয়৷ তারপর নিজের নিরাপত্তার খাতিরে জেনসন সেটা সিন্দুকে বন্ধ করে রাখে৷ স্বীকারোক্তি লেখা সেই কাগজটা আমি দেখেছি—বিশ্বাস কর লোলা জানে, যতক্ষণ না পর্যন্ত ও সে কাগজটা হাতে পাচ্ছে, ততক্ষণ ওর জীবন বিপন্ন৷ যে-কোন সময় পুলিশ ওকে গ্রেপ্তার করতে পারে৷ পারে খুনের দায়ে চালান দিতে৷’

রয় ঘাড়ে হাত বুলিয়ে ভুরু কুঁচকে তাকাল, ‘শেট, তুই কি এগুলো সব বানিয়ে বলছিস, না সত্যি?’

‘এর এক বর্ণও মিথ্যে নয়, রয়৷ সেদিন জেনসনকে গুলি করার পর লোলা আমাকেও খুন করত৷ কিন্তু ও দ্বিতীর বার ট্রিগার টেপার আগেই আমি সিন্দুকের দরজাটা বন্ধ করে দিরই৷ ও জানত, আমার সাহায্য ছাড়া ওর পক্ষে সিন্দুক খোলা অসম্ভব তাই এতদিন আমাকে জিইয়ে রেখেছে৷ কিন্তু এখন অবস্থা হয়ে উঠেছে আরও জটিল’—তুই যে সিন্দুক খুলতে জানিস সেটা জানার পর থেকেই লোলা আরও তৎপর হয়ে উঠেছে৷ ও জানে এখন আর আমার প্রয়োজন নেই৷—সিন্দুকটা তুই কিছুতেই খুলিস না, রয়—আমার কথা শোন!’

‘তোর কথামতো লোলা যদি তোকে খুনই করতে চাইবে, তাহলে এতদিন ওর সঙ্গে রাত কাটালি কেমন করে?’

রয় যে এ প্রশ্ন তুলবে তা জানতাম৷ কারণ কোন সুস্থমস্তিষ্ক সাধারণ মানুষের পক্ষেই এ প্রশ্ন করা অত্যন্ত স্বাভাবিক৷

‘এর উত্তর খুব সোজা৷’ সহজ স্বরে রয়কে বললাম, ‘লোলা জানত, যতদিন সিন্দুক বন্ধ আছে, ততদিন ওর পক্ষে আমার কোন ক্ষতি করা সম্ভব নয়৷ তাই আমাকে ওর দলে টানতে চেয়েছে৷ জেনসন মারা যাবার পর পাঁচটা সপ্তাহ আমরা চুপচাপ, একা একা কাটিয়েছি৷ তারপর একদিন রাতে লোলা আমার ঘরে এসে উপস্থিত হল—তারপর যা হবার তাই হল ঠিক তোর বেলা যেমনটা হয়েছে৷ কিন্তু বিশ্বাস কর, তার আগে সে-রকম কোন চেষ্টাই আমি করিনি৷’

হাঁপাতে হাঁপাতে কোনরকমে কথা শেষ করলাম৷ অনুভব করলাম মেরুদণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়া ঘামের শীতল স্রোত৷

রয় বোধহয় আমার অবস্থা বুঝতে পারল৷ তাই তাড়াতাড়ি এগিয়ে এল আমার কাছে, ‘কীরে, কী হল তোর?—নে, চুপচাপ শুয়ে পড়্৷ একে তোর শরীর ভালো নয়, তার ওপর শুধু শুধু উত্তেজিত হয়ে পড়ছিস৷’

আমি রয়ের হাত চেয়ে ধরলাম, ‘যদি তুই সিন্দুকটা খুলিস, তাহলে আমরা কেউই লোলার হাত থেকে রেহাই পাব না! আমি তোকে বারবার বলে রাখছি, রয়—সিন্দুক খোলা মানে নিজেদের মৃত্যুকে ডেনে আনা৷’

‘আচ্ছা, আচ্ছা—ঠিক আছে৷ কিছু তুই মিছিমিছি ভয় পাচ্ছিস, শেট৷ লোলা সিন্দুক খোলার বিষয়ে এখনও আমাকে কিছুই বলেনি৷’

ক্লান্ত দেহে বিছানার গা এলিয়ে দিলাম৷ অবসাদে চোখ বুঝে এল৷ আমার কর্তব্য আমি করেছি৷ রয়কে খোলাখুলি সব জানিয়ে সাবধান করে দিয়েছি৷ এখন বাকিটা ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই৷ তবে মনে হয়, এবারের যুদ্ধে লোলা পরাজিত হবে৷ কিন্তু সে শুধু আশা ছাড়া আর-কিছু নয়; যে-আশা অন্ধ, যে আশা কুহকিনী৷

সে-রাতে ঘুম না আসা পর্যন্ত রয় আমার পাশেই বসে রইল৷

পরদিন সকলে যখন ঘুম ভাঙল, তখন টেবিল-ঘড়িতে দশটা বাজতে কুড়ি মিনিট৷ একটানা লম্বা বিশ্রামের পর নিজেকে অনেক সবল মনে হল৷ মাথাটাও যেন আগের চেয়ে হালকা ঠেকল৷ কিন্তু বুঝলাম, উঠে দাঁড়াবার ক্ষমতা এখনও আমার হয়নি৷ পরে বেলার দিকে রয় এসে আমার দাড়ি-গোঁফ কামিয়ে দিল৷ ও চুপচাপ থাকায় আমিও কোন প্রসঙ্গের উত্থাপন করলাম না৷ কিন্তু জানতাম, সিন্দুকের ব্যাপারটা আমাদের দু-জনের মনকেই ভারাক্রান্ত করে রেখেছে৷ আমরা যেন হাঁপিয়ে উঠেছি৷

ধীরে ধীরে গড়িয়ে চলল আরও একটা দিন৷ জানালার ধারে শুয়ে শুয়ে দেখতে লাগলাম বাইরের কর্মচাঞ্চল্য৷ লোলা আর রয় পরিশ্রম করে চলেছে অক্লান্তভাবে৷ রেস্তোরাঁ খদ্দেরের ভিড়ে জমজমাট৷

রাত প্রায় দশটায় সময় হাতের কাজ হালকা হতেই রয় আমার ঘরে এল—হাতে এক বাটি স্যুপ৷ ‘শালা, দিন গেল বটে একটা!’ বাটিটা আমার হাতে দিয়ে ও পরিশ্রান্তভাবে দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল, ‘তুই তাড়াতাড়ি সেরে ওঠ কোট৷’

‘হ্যাঁ, আর ক-টা দিন সবুর কর৷’ ম্লান-হাসিতে মুখ ভরিয়ে জবাব দিলাম৷

হঠাৎ রয়ের চোখে কেমন অস্বস্তিকর ভাব লক্ষ্য করলাম৷ নাকে একবার হাত বুলিয়ে ও বলে উঠল, ‘একটু আগে খাবার সময় লোলা সিন্দুকের কথা বলেছে৷ জিগ্যেস করেছে একটা লরেন্স সিন্দুক আমি খুলতে পারব কিনা৷’

আমার হাত কেঁপে গিয়ে খানিকটা স্যুপ বিছানায় চলকে পড়ল, ‘লোলা তাহলে সিন্দুকের কথা তোকে বলেছে?’

‘হ্যাঁ৷ তারপর আমি বললাম যে সিন্দুকটা না দেখা পর্যন্ত আমার পক্ষে কিছু বলা সম্ভব নয়৷’

আমার বুকের ভিতর তখন শুরু হয়ে গেছে তুমুল আলোড়ন৷ শ্বাসরুদ্ধ কণ্ঠে প্রশ্ন করলাম, ‘তারপর?’

‘তারপর একটা ট্রাক-ড্রাইভার এসে পড়ায় আর কথা বলার সুযোগ হয়নি৷’

‘তোকে আবারও বলছি রয়, সিন্দুকটা যতক্ষণ বন্ধ আছে, ততক্ষণ আমরা নিরাপদ৷ কিন্তু—’

‘জানি তুই কি বলবি৷’ আমাকে হাত তুলে বাধা দিল রয়, ‘এতই যদি তোর ভয়, তাহলে জেনসনের সেই রিভলভারটা আমাকে দে না কেন?’

‘রিভলভারটার আমার কাছে আর নেই৷ ওটা লোলা হাতিয়েছে৷’

রয় ভীষণভাবে চমকে উঠল৷ কী একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল৷

‘ লোলা আমাকে বলেছে, রিভলভারটা ও ওয়েন্টওয়ার্থের রাস্তায় পুঁতে ফেলেছে—কিন্তু আমার ধারণা অন্যরকম৷’

‘হুঁ—’ চিন্তিতভাবে রয় জবাব দিল৷ তারপর গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল, ‘যাক, এখনও পর্যন্ত যখন সিন্দুকটা আমাকে খুলতে বলেনি, তখন এসব ভেবে লাভ কি?’

‘আমি জানি লোলা বলবে৷ তখন আরও একবার আমার কথাগুলো ভেবে দেখিস৷’ এরপর ও-বিষয়ে আমাদের আর কথা হল না৷

পরবর্তী চারটে দিন সাধারণভাবেই কেটে গেল৷ রয় আমাকে বলেছে, লোলা এখনও ওকে সিন্দুক খোলার কথা বলেনি৷ জানি না, সত্যি কি না মিথ্যে!

ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেও, বিছানা ছেড়ে নামার শক্তি এখনও আমার হয়নি৷ তবে সান্ত্বনার কথা, রয় আজকাল আর বাংলোয় শুতে যায় না৷ কেন জানি না, এতে আমি অনেকটা স্বস্তি বোধ করি৷ রয়ের এই হঠাৎ-উদাসীনতার কারণ সম্ভবত লোলার প্রতি ওর প্রচ্ছন্ন আতঙ্ক৷ অর্থাৎ আমার কথা ওর মনে ধরেছে ঃ লোলা যে দু-দুটো খুন করেছে, সে-বিষয়ে রয়ের মনে আর সংশয় নেই৷

কিন্তু পাঁচ দিনের দিন রাত তিনটের সময় আচমকা ঘুম ভেঙে যেতেই দেখি, বাংলোর বসবার ঘরের আলো জ্বলছে৷ বুকের ভিতরটা ধক্ করে উঠল৷ বার কয়েক ঢোক গিলে রয়ের নাম ধরে আস্তে আস্তে ডাকলাম৷ কিন্তু কোন উত্তর নেই৷ অর্থাৎ রয় এখন বাংলোর বসবার ঘরে—সেখানে ওর সঙ্গে রয়েছে লোলা, আর সেই অভিশপ্ত সিন্দুক!

মনে হলে বিছানা ছেড়ে এখনই ছুটে যাই বাংলোয় কিন্তু জানি, আমার এই অসুস্থ দেহ নিয়ে তা সম্ভব নয়৷ সুতরাং নির্নিমেষে বসবার ঘরের আলোকিত জানালার দিকে চেয়ে গুনতে লাগলাম হৃৎপিণ্ডের উন্মত্ত স্পন্দন৷

রাত প্রায় চারটের সময় বাংলো আলো নিভে গেল৷ এবং তার একটু পরেই রয় বাংলো থেকে বেরিয়ে এল৷ সোজা হেঁটে আসতে লাগল ঘরের দিকে৷

সদর-দরজা খোলার শব্দ হতেই চাপাস্বরে রয়কে ডাকলাম৷ একটু পরেই আমার ঘরের দরজা খুলে গেল৷’ ভেসে এল রয়ের গলা, ‘আলো জ্বালাস না৷ আলো দেখতে পাবে৷’

অন্ধকারের আস্তরণ ভেদ করে রয়কে দেখতে চেষ্টা করলাম৷ কিন্তু কিছুই নজরে এল না৷ ‘এতক্ষণ কি করছিল বাংলোয়?’

‘লোলা আমাকে সিন্দুকটা দেখিয়ে খুলতে বলছিল৷ আমি বললাম, এটা খুব পুরোনো মডেলের—আমার পক্ষে খোলা সম্ভব নয়৷’

আমার বুক ভেদ বেরিয়ে এল স্বস্তির নিশ্বাস৷ ‘তারপর কী হল?’

‘লোলা বলল, কম্বিনেশন নম্বর ছাড়া অন্য কোনভাবে হয়তো ওটা খোলা সম্ভব৷ সিন্দুকের দরজাটা ডিনামাটই দিয়ে উড়িয়ে দিলে কেমন হয়৷ তখন আমি বললাম, সেটা বিপজ্জনক হবে৷ তাছাড়া ডিনামাইট ব্যবহারে আমি ঠিক অভ্যস্ত নই৷’

‘ও তোর কথা বিশ্বাস করল?’

‘কেন করবে না? আমি এমনভাবে বলেছি—’

‘সিন্দুকে কি আছে, কেন ও সিন্দুক খুলতে চায়, সে-বিষয়ে তোকে কিছু বলেছে?’ আমার উদগ্র কৌতূহল আর বাধ মানতে চাইছে না৷ অশান্ত তরঙ্গের মতোই আছড়ে পড়ছে মনের ভিতর৷

‘হ্যাঁ, বলেছে৷’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রয় বলল, সিন্দুকে নাকি প্রচুর টাকা আছে, সিন্দুক খুললে লোলা আমাকেও সে-টাকার ভাগ দেবে বলেছে৷’ আরও কিছুক্ষণ নীরবতার পর রয় মৃদুস্বরে প্রশ্ন করল, ‘শেট, সত্যিই কি সিন্দুকে টাকা আছে?’

এক্ষেত্রে ওকে সত্যি কথা বলা মানে সর্বনাশ ডেকে আনা৷ সুতরাং বাধ্য হয়েই মিথ্যে বললাম, ‘আছে, তবে মাত্র তিনশো ডলার৷ জেনসন দুঃসময়ের সঞ্চয় হিসেবে এই টাকাটা সিন্দুকে জমিয়ে রেখেছিল৷ কিন্তু লোলা ওই তিনশো ডলারের জন্য নয়, ও চায় সেই স্বীকারোক্তি লেখা কাগজটা৷’

‘কিন্তু ও যে বলল সিন্দুকে প্রায় এক লাখ ডলার আছে?’ রয়ের মুখে বিস্ময়ের ছায়া৷

‘লোলা মিথ্যে কথা বলছে৷ তোকে দিয়ে সিন্দুকটা খোলানোর জন্য ও এই টাকার টোন ফেলেছে৷’

‘হুঁ—’ চিন্তান্বিতভাবে রয় জবাব দিল, ‘তাই যদি হয়, তাহলে লোলাকে হতাশ হতে হবে৷’ শেষদিকে ওর গলায় স্বর কঠিন মনে হল৷

পরদিন সকালে শুয়ে শুয়ে জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে ছিলাম৷ দেখছিলাম পাম্পের কাছে কর্ম-ব্যস্ত রয়কে৷ এমনসময় কানে এল দরজা খোলার শব্দ৷ চমকে মুখ ফিরিয়ে তাকাতেই দেখি, লোলা দরজার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে৷ উত্তেজনায় ওর শ্বাস-প্রশ্বাস গভীর৷ সবুজ চোখজোড়া স্থিরভাবে আমারই দিকে চেয়ে আছে৷

আজকের লোলাকে চিনতে আমার কষ্ট হল৷

কোথায় ওর সেই সুললিত কোমল যৌবন? তার বদলে আমার সামনে দাঁড়িয়ে শীর্ণ চেহারার একটি অপরিচিতা মেয়ে৷ মুখের রেখা কঠিন৷ গাল ভেঙে চোয়ালের হাড় হয়ে উঠেছে প্রকট৷ কোটরাগত চোখের কোলে কালি৷ এ ক-দিনে ওর শরীরের উপর যেন বয়ে গেছে এক প্রচণ্ড মানসিক ঝড়৷

লোলা ওর অস্বাভাবিক উজ্জ্বল চোখ মেলে আমার দিকে চেয়ে রইল৷ না, আর সব-কিছু অচেনা লাগলেও লোলার এই সাপিনী-সবুজ চোখ আমার অনেকদিনের চেনা৷

‘কী করে সিন্দুক খুলতে হয় আমাকে বলে দাও৷’ কর্কশ-কাঁপা গলায় লোলা বলে উঠল, যদি না বল তাহলে আমি এখুনি পুলিশে ফোন করব৷ তোমাকে আবার ফিরে যেতে হবে সেই ফার্নওয়ার্থে৷’

কিন্তু লোলা জানে না ব্ল্যাকমেলের ভয় আমি আর এখন করি না৷ ভাগ্যচক্রে রঙের তাস এখন আমার হাতে৷

‘তবে আর দেরি করছ কেন? যাও, পুলিশে খবর দাও৷ ওই এক লাখ ডলারের আশা তুমি আর করো না৷ তাছাড়া, পুলিশকে আমিও বলে দেব জেনসনের মৃতদেহ কোথায় লুকোনো আছে৷ ভেব না, পুলিশ আমার কথা অবিশ্বাস করবে, আর তোমার কথায় সায় দেবে৷ কারণ তুমিও তো আর ধোয়া তুলসীপাতাটি নও! ওদের যদি জানিয়ে দিই ফ্র্যাঙ্ক ফিনির কথা, তাহলে তোমাকে আর রক্ষা পেতে হবে না!’

আমার শেষ কথাটা লোলাকে ভীষণভাবে আঘাত করল৷ ওর শরীরটা পলকে যেন পাথর হয়ে গেল৷ হঠাৎ পিছিয়ে যাবার চেষ্টা করল লোলা৷ কিন্তু দরজার গায়ে ধাক্কা লাগতেই ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল একটা চাপা আর্তচিৎকার৷ অন্ধ-আতঙ্কের নিবিড় ছাড়া কেঁপে উঠল ওর সবুজ চোখে৷

‘ফ্র্যাঙ্ক সম্বন্ধে তুমি কি জান!’ আগুনঝরা চোখে জানতে চাইল লোলা৷

‘আর-কিছু না জানলেও, তুমি যে ওকে খুন করেছ, তা জানি৷ মিথ্যে রাগ দেখিয়ে লাভ নেই, লোলা৷ দুজনেই এখন ফাদে জড়িয়ে পড়েছি৷ ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক, বাকি দিন ক-টা আমাদের এভাবেই একসঙ্গে কাটাতে হবে৷ এছাড়া আর কোন পথ আমাদের নেই৷ সেই সঙ্গে আর একটা কথা মনে রেখ৷ জেনসনের সিন্দুকটা যেমন আছে, তেমনই থাকবে৷ কেউই ওটা খুলতে যাচ্ছে না৷ রয়কে আমি তোমার সম্বন্ধে সব কথা জানিয়ে সাবধান করে দিয়ে দিয়েছি৷ তাছাড়া, সিন্দুক কি করে খুলতে হয়, তাও জানে না ও৷ সুতরাং, শুধু শুধুই তুমি রয়ের পেছনে সময় আর বুদ্ধি খরচা করছ৷’

বহুক্ষণ একদৃষ্টে আমার দিকে চেয়ে রইল লোলা৷ জ্বলন্ত সবুজ চোখে শুধুই ঘৃণা৷ তারপর একসময় ও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল! যাবার সময় খুলে রেখে গেল ঘরের দরজা৷

এই পরাজয়কে সাময়িকভাবে মেনে নিলেও লোলা আমাকে সহজে ছাড়বে বলে মনে হয় না৷ আহত নাগিনীর মতোই ও হয়ে উঠেছে ক্রূর, প্রতিহিংসাপরায়ণ৷ সতর্ক না থাকলে যে-কোন মুহূর্তেই লোলা চরম আঘাত হানবে৷

মানসিক অস্বস্তি ও উত্তেজনার মধ্যে দিয়ে এর পরের দুটো দিন নির্বিঘ্নেই কেটে গেল৷ কিন্তু তৃতীয় দিনের দিন রয় হঠাৎ আমাকে এসে বলল, লোলা ওয়েন্টওয়ার্থে সিনেমা দেখতে যাচ্ছে৷

সঙ্গে সঙ্গে মনের মধ্যে দপ্ করে জ্বলে উঠল বিপদের রক্তর-সংকেত৷ ‘তার মানে ও তোকে এখানে রেখে যাচ্ছে?’ রয়ের দিকে সন্দেহভরা চোখে তাকালাম৷ রয় অস্বস্তিভরে কাঁধ ঝাঁকাল, ‘তুই তো জানিস, লোলা সিনেমা দেখতে ভীষণ ভালোবাসে৷ ও আমাকেও যেতে বলেছিল, কিন্তু তোকে এই অবস্থায় একা ফেলে রেখে আমি কী করে যাই বল? তাছাড়া, জায়গাটা দেখাশোনা করার জন্যও তো একজনের থাকা দরকার—৷’

‘নিজেকে ছলনা করার চেষ্টা করিস না, রয়৷ তুই ভালোভাবেই জানিস, লোলা সিনেমায় যাচ্ছে না৷ তোর সামনে টোপ ফেলে তোকে সেটা গেলবার একটা সুযোগ দিয়ে যাচ্ছে৷’

রয় অধৈর্যভাবে হাত নাড়ল, ‘কী আবোল-তাবোল বকছিস? তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? একটু থেমে ও আবার বলল, ‘শেট, তুই সত্যি সত্যি কি ভাবছিস বল্ তো?’

‘লোলা তোকে বলেছে, সিন্দুকে অনেক টাকা আছে, কেমন? এতদিনে ও বুঝে গেছে, এই দুনিয়ায় টাকাই তোর কাছে সব৷ সুতরাং তোর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ও তোকে ফাঁদে ফেলতে চাইছে৷ লোলা জানে, ও সিনেমায় যাওয়ামাত্রই তুই সিন্দুক খুলতে চেষ্টা করবি৷ তাই ও সিনেমায় যাওয়ার ছল করে কাছাকাছি কোথাও লুকিয়ে থাকবে৷ তারপর হঠাৎ ফিরে এসে লোলা খোলা-সিন্দুকসুদ্ধ তোকে হাতেনাতে ধরে ফেলবে৷ বুঝতেই পারছিস, তোকে বোকা বানিয়ে কার্যোদ্ধার করার এই একটাই মাত্র পথ আছে! তাই লোলা মরিয়া হয়ে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখতে চায়৷ এত সহজে ও হার মানতে রাজি নয়৷’

‘তোকে তো বলেছি শেট, সিন্দুক আমি খুলছি না৷’

‘ভালো কথা৷ তবে লোলা সিনেমায় যাওয়ার পরও যেন কথাটা মনে থাকে৷’

রাত দশটার কিছু পরেই দেখি লোলা মার্কারির দিকে এগিয়ে চলেছে, আর রেস্তোরাঁর কাছ থেকে ওকে লক্ষ্য করছে রয়৷ লোলা গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার পরও রয় কোমরে হাত দিয়ে একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল৷ চাঁদের আলোয় স্পষ্ট লক্ষ্য করলাম, ওর মুখ উত্তেজনায় কঠিন৷ স্থির দুই চোখে ও তাকিয়ে আছে মার্কারির মিলিয়ে-আসা লাল আলোর দিকে৷ শেষে বালিয়াড়ির আড়ালে সে আলো মিলিয়ে গেলেও রেস্তোরাঁয় ফিরে চলল৷

রয় রেস্তোরাঁয় ঢুকতেই বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম৷ জানালা দিয়ে চেয়ে রইলাম আকাশের দিকে৷ আসন্ন কোন দুর্ঘটনার প্রতীক্ষায় সময় গুনে চললাম৷ একটা আবছা শীতল অনুভূতি আমাকে ঘিরে ধরল৷ যেন কানে কানে বলল, এই আমার জীবনের শেষ রাত৷ ধীরে ধীরে উপলব্ধি করলাম জীবন-পথের শেষ মাইলস্টোনের পাশে পরিশ্রান্ত দেহে, অবসন্ন মনে আমি দাঁড়িয়ে আছি৷ ওপারের চিরশান্তির জগৎ আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে৷

মানসচক্ষে পরিষ্কার দেখতে পেলাম, রান্নাঘরে পায়চারিরত চঞ্চল রয়কে৷ ওর বিচক্ষণ, লোভাতুর মন অত্যন্ত সতর্কভাবে আমার আর লোলার কথাগুলো বুদ্ধির কষ্টিপাথরে যাচাই করে দেখছে৷ সত্যিই কি এক লাখ ডলার আছে জেনসনের সিন্দুকে? নাকি রয়েছে শুধু লোলার স্বীকারোক্তি লেখা কাগজটা? ওকে দিয়ে সিন্দুক খোলানোর জন্যই কি আজ রাতে লোলা ফাঁদ পেতে গেছে?

এইসব জটিল সমস্যা সমাধানের দুরূহ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে রয়ের সুযোগসন্ধানী মন৷ এইভাবে এক ঘণ্টা কেটে গেল, কিন্তু কিছুই ঘটল না৷ সময় আর কাটতেই চায় না৷ ঘড়ির কাঁটা যেন এগিয়ে চলেছে শম্বুক গতিতে৷

একসময় হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, হেডলাইট জ্বালিয়ে একটা ট্রাক এদিকে এগিয়ে আসছে৷ ট্রাকটা ধীরে ধীরে পাম্পের কাছে এসে থামল৷

গাড়ির শব্দে রয় রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে এল৷ ট্রাকের ট্যাঙ্কে তেল ঢালতে ঢালতে দু-একটা কথাও বলল ড্রাইভারটার সঙ্গে৷ তারপর তেলের দাম মিটিয়ে লোকটা ট্রাক ছেড়ে দিল৷

বুঝলাম, এই সেই সংকটময় মুহূর্ত৷ রয়ের দ্বিধাগ্রস্ত মন এই মুহূর্তেই নেমে এক চরম সিদ্ধান্ত৷ হঠাৎ বুকের মধ্যে যেন দুন্দুভি বেজে উঠল৷ গলাটা কেমন যেন শুকনো ঠেকল৷ রয় পাম্পের কাছে দাঁড়িয়ে ওয়েন্টওয়ার্থের পাহাড়ী রাস্তার দিকে চেয়ে রইল৷ মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করেও যখন কোন গাড়ির হেডলাইট ওর নজরে পড়ল না, তখন ও দ্রুতপায়ে হেঁটে চলল বাংলোর দিকে৷

ওর অসীম অর্থলিপ্সা লোলার প্রলোভনকে এড়াতে পারল না৷ বুঝলাম, রয় টোপ গিলেছে৷ ও এখন যাচ্ছে সেই অভিশপ্ত সিন্দুক খুলতে৷

বাংলোর দরজার কাছে পৌঁছে রয় একটু থামল৷ ও নিশ্চয়ই আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে ছিল৷ কারণ মিনিটখানেক কি-সব খুটখাট করেই বাংলোর দরজা খুলে ফেলল৷ তারপর পিছনে এক পলক নজর বুলিয়ে বাংলোয় ঢুকে পড়ল৷

কিন্তু একটু পরেই ও আবার বেরিয়ে এল৷ বাংলোর দরজায় দাঁড়িয়ে ওয়েনন্টওয়ার্থের আঁকাবাঁকা রাস্তার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল৷ সম্ভবত দেখছে, লোলা ফিরে আসছে কিনা! তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে আবার ঢুকে পড়ল বাংলোয়৷

রয়ের এই অতিরিক্ত সাবধানতায় আমার হাসি পেল৷ লোলাকে ও এখনও ঠিক চিনতে পারেনি৷ ফিরে লোলা আসবেই, এবং সম্পূর্ণ রয়ের অজ্ঞাতে৷

একটু পরেই বাংলোর বসবার ঘরে আলো জ্বলে উঠল৷

সিন্দুক খুলতে রয়ের হয়তো মিনিট চারেক লাগবে৷ তারপরই ও বুঝতে পারবে লোলার কথাই সত্যি৷ দেখবে, সিন্দুকে সাজানো রয়েছে এক লাখ ডলার৷ না, এখন আর ওকে বাধা দেওয়া সম্ভব নয়৷ আমার যথাসাধ্য আমি করেছি৷ কিন্তু এই তাসের জুয়ায় শেষ পর্যন্ত আমি লোলার কাছে হেরে গেছি৷

এমন সময় লোলাকে দেখতে পেলাম৷ রয় রেস্তোরাঁয় ঢুকবার পরেই ও হয়তো গাড়ি থামিয়েছে পাহাড়ি রাস্তায়৷ তারপর হেডলাইট নিভিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে অতি সপ্তর্পণে ফিরে এসেছে ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’-এ৷ নাঃ, লোলার দক্ষতার প্রশংসা করতেই হবে! কারণ আমি সারাক্ষণই জানালা দিয়ে চেয়েছিলাম বাইরের রাস্তায়৷ কিন্তু ওকে ফিরে আসতে বা গাড়ি থামাতে আমিও দেখিনি৷

কিন্তু ওই তো লোলা বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে এগিয়ে চলেছে বাংলোর দিকে৷ চন্দ্রালোকে আলোকিত বালির উঠোনটুকু পার হওয়ার সময় দেখলাম ওর সবুজ পোশাক৷ জেনসনকে খুন করার সময়ও ওর পরনে এই একই পোশাক ছিল৷ হয়তো এই সবুজের আড়ালেই লুকিয়ে আছে রয়ের মৃত্যুসঙ্কেত!

শেষ পর্যন্ত লোলার ফাঁদে রয় ধরাই পড়ল৷

যেন দেখতে পেলাম সিন্দুকের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে-থাকা রয়কে৷ ও হতভম্ব হয়ে চেয়ে রয়েছে থাকে থাকে সাজানো এক লাখ ডলারের দিকে৷ ওই অবস্থায় বসবার ঘরের দরজা খোলার শব্দ ওর কানেও ঢুকবে না৷ তারপরই লোলা ওকে খুন করবে৷ না, এ-বিষয়ে আমার মনে এতটুকু সন্দেহ নেই৷ রয় এখন জানে না মৃত্যু গুড়ি মেরে ধীরে ধীরে ওর দিকে এগিয়ে চলেছে৷ বসবার ঘর এখন লোলার কাছ থেকে আর মাত্র কয়েক গজ দূরে৷

আর সহ্য করতে পারলাম না৷ এক ঝটকায় গায়ের চাদর ছুড়ে ফেলে বিছানায় উঠে বসলাম৷ টলতে টলতে এগিয়ে গেলাম দরজার দিকে৷ মাথাটা অসম্ভব ভারী ঠেকল৷ দরজার হাতলে ভর দিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়ালাম৷ বুকের ভিতর যেন আগুন জ্বলছে৷ কিন্তু আমার তখন ওসব ভাববার সময় নেই৷ মনের মধ্যে শুধু একটাই চিন্তা—বাংলোয় গিয়ে যে করে হোক রয়কে বাঁচাতে হবে৷

কোনরকমে দরজা খুলে বসবার ঘরে এলাম৷ সদর-দরজা খুলে বাইরে বালিতে পা রাখতেই বুকের কাছটা কেমন উষ্ণ, ভিজে ঠেকল৷ বুঝলাম, পুরোনো ক্ষত থেকে আবার রক্তস্রাব শুরু হয়েছে৷ কিন্তু সেসব গ্রহ্য না করে পা বাড়ালাম৷ কিন্তু লোলাকে বাইরে কোথাও দেখলাম না৷ তাইলে কি?

হাঁপাতে হাঁপাতে, টলতে টলতে এগিয়ে চললাম বাংলোর দিকে৷ আমার বুক, পেট ঊরু তখন রক্তে ভেসে যাচ্ছে৷ সর্পিল রেখায় গা বেয়ে এগিয়ে চলেছে রক্তের উষ্ণ ধারা৷ কিন্তু আমি না থেমে এগিয়ে চললাম৷

বাংলোর দরজার কাছে পৌঁছতেই কানে এল রিভলভারের চাপা গম্ভীর শব্দ৷ হৃৎপিণ্ড ডিগবাজি খেয়ে আছড়ে পড়ল বুকের ভিতর৷ ভিজে চড়ুইয়ের মতো কাঁপতে লাগলো থরথর করে৷ সেই সঙ্গে গুরুভার কিছু পতনের শব্দে মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ালাম৷ নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে এক ধাক্কায় খুলে ফললাম বাংলোর ভেজানো দরজা৷ টলতে টলতে বসবার ঘরে ঢুকলাম৷

দেখি, রয় দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে—ওর হাতের মুঠোয় জেনসনের .৪৫ রিভলবারটা৷ সিন্দুকের দরজা হাট করে খোলা৷ পরিষ্কার নজরে পড়ছে থরে থরে সাজানো নোটের বান্ডিলগুলো৷ রয়ের পায়ের কাছে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে লোলা৷ ওর কপালের বিশ্রী কালো ফুটোটা জানিয়ে দিচ্ছে রয়ের নির্ভুল লক্ষ্যভেদের কথা৷

লোলা যে বেঁচে নেই, এ-কথাটা বুঝতে আমার দেরি হল না৷ কারণ, কপাল ওইরকম বীভৎস ফুটো নিয়ে কেউ কখনও বেঁচে থাকতে পারে না৷

আমি আর রয় পরস্পরের দিকে চয়ে রইলাম৷ ওর মুখ রক্তহীন, পাণ্ডুর, নাকের উপর জমে-ওঠা ঘামের ফোঁটা ঘরের উজ্জ্বল আলোয় চকচক করছে৷

‘তুই ঠিক বলেছিলি, শেট৷’ ভাঙা ফিসফিসে স্বরে রয় বলে উঠল, ‘তুই যদি আগে থাকতে আমাকে সাবধান করে না দিতিস, তাহলে এখানে লোলার জায়গায় আমিই পড়ে থাকতাম৷

হঠাৎ অনুভব করলাম, আমার হাত-পা সব শক্তির অভাবে শিথিল হয়ে আসছে৷ কোনরকমে গিয়ে একটা চেয়ার গা এগিয়ে দিলাম৷ আমার গেঞ্জি, পায়জামা, সব রক্তে ভিজে লাল হয়ে গেছে৷ বুকের ব্যান্ডেজের কাছটায় কেমন একটা কালচে ভাব৷ রয় নির্বাক হয়ে লোলার মৃতদেহের দিকে চেয়ে রইল৷ আমিও যে ঘরে উপস্থিত রয়েছি সে-কথা ও যেন ভুলেই গেল৷

‘রয়, আমাদের পালাতে হবে!’ বুকের রক্তে-ভেজা ব্যান্ডেজ দু-হাতে চেপে ধরলাম, ‘শিগগির গাড়িটাকে বাংলোর কাছে নিয়ে যায়! পুলিশ এসে গেলে আমরা বিপদে পড়ে যাব! নে, টাকাগুলো চটপট গুছিয়ে নে! এখনও সময় আছে!’

রয় ঘড় ফিরিয়ে একবার খোলা সিন্দুকের দিকে তাকাল, তারপর আচ্ছন্ন স্বরে বলে চলল, ‘লোলা, ঘরে ঢুকতেই আমি ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর কাছ থেকে রিভলভারটা কেড়ে নিয়েছি৷ কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি ওখে খুন করতে চাইনি৷’

‘যা গাড়িটা নিয়ে আয়! শিগগির! আমাদের যে করে হোক পালাতে হবে!’ কথাগুলো আমার নিজের কানেই কেমন অস্পষ্ট ঠেকল৷ যেন বহুদূর থেকে কেউ ফিসফিস করে কথা বলছে৷ রক্তপাতের পরিণতি হিসেবে চোখজোড়া শ্রান্তিতে বুঝে আসতে চাইল৷

‘হুঁ, যাচ্ছি৷’ বলে রয় সিন্দুকের কাছে এগিয়ে গেল৷ এক হাতে টেবিলক্লথটা টেনে নিয়ে নোটের বান্ডিলগুলো তার উপর রাখতে লাগল৷

‘রয়, আমার ব্যান্ডেজটা একটু ঠিক করে দে আর কোটটা নিয়ে এসে আমার গায়ে জড়িয়ে দে৷ নয়তো এভাবে রক্ত পরেই হয়তো মারা যব৷’

রয় ফিরে তাকাল আমার দিকে৷ ওর মুখে এমন একটা অদ্ভুত ভাব, যা আমি আগে কোনদিন দেখিনি৷ রয়কে আমার সম্পূর্ণ অপরিচিত মনে হল৷

টাকাগুলো টেবিলক্লথ দিয়ে বেঁধে ও উঠে দাঁড়াল৷ কর্কশ লোভাতুর স্বরে বলে উঠল, ‘তুই আর কদ্দিন বাঁচবি বলে তোর ধারণা, শেট? এখন আর তোর কোন দাম নেই৷ তুই চিরকালের মতো শেষ হয়ে গেছিস৷ আর এই টাকা নিয়ে আমি নতুনভাবে জীবন শুরু করতে পারব—যেভাবে চিরকাল আমি বাঁচতে চেয়েছি৷ গাড়িতে তোকে জায়গা দিতে পারলাম না বলে আমি দুঃখিত, শেট৷ না—না ওমনি করে আমার দিকে তাকাস না৷ তুই কি ভাবছিস তোর দাম এক লাখ ডলারের চেয়েও বেশি? উহুঁ এই পৃথিবীতে কোন মানুষের দামই এক লাখ ডলারের চেয়ে বেশি নয়৷’ রয় টাকার পুঁটলিটা আমার চোখের সামনে বারকয়েক ঝাঁকাল, ‘তুই-ই তো সেদিন বলেছিলি, তোকে দু-বার বাঁচিয়ে তোর সব ঋণ আমি শোধ করে দিয়েছি, তাই তো? অতএব এবারে আমি চললাম৷ পরে আবার বলিস না যেন, রয় নিষ্ঠুর, রয় অকৃতজ্ঞ!’

হঠাৎ আমার উত্তেজিত মন ভীষণ শান্ত হয়ে পড়ল৷ রয়কে একটুও বাধা দেবার চেষ্টা করলাম না৷ জানালা দিয়ে দেখলাম, মার্কারির হেডলাইট জ্বলে উঠল৷ তারপর গাড়িটা মোড় দিয়ে ছুটে চলল পাহাড়ের দিকে! যে-পাহাড়ের ওপারেই রয়েছে আমার কল্পনায় আশ্রয়স্থল—ট্রপিকা স্প্রিংস৷

চোখ নামিয়ে লোলার দিকে তাকালাম৷ অসহায়ভাবে ও মেঝেতে শুয়ে—সারা মুখ রক্তাক্ত৷ চোখ-মুখ আতঙ্কে বিকৃত৷ ভাবতে অবাক লাগল, এই কুৎসিত, ভয়ঙ্কর মেয়েটার শরীরে আমি আমার প্রেমকে জলাঞ্জলি দিয়েছি৷

চেয়ারের হাতল দুটো সজোরে আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামলে নিলাম৷ শরীরের সব শক্তি মিলিয়ে গিয়ে চোখে নেমে আসছে নিঃসীম অন্ধকার৷ জানি, আজ নয় কাল, কেউ-না-কেউ আসবে এই ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন-এ৷ দেখতে পাবে এই ঘরের আলো৷ তারপর জানালায় উঁকি দিয়ে আবিষ্কার করবে আমাকে আর লোলাকে৷

যদি ততক্ষণ বেঁচে না থাকি তো চিন্তার কিছু নেই৷ কিন্তু যদি ওরা আমাকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে বাঁচিয়ে তোলে, তাহলে আবার ফার্নওয়ার্থ!

ওরা বিশ্বাস করবে না, লোলাকে আমি খুন করিনি! আমাকেই জেনসনের মৃত্যুর জন্য দায়ী করবে! ভুলেও ভাববে না রয়ের কথা, লোলার কথা৷

সুতরাং বুকভরা আশা নিয়ে মৃত্যুর অপেক্ষায় রইলাম৷ আসুক সেই চির অন্ধকার, আমার কপালে এঁকে দিক মৃত্যুর স্নেহ-চুম্বন৷ সেই হবে আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার৷

আশ্চর্যভাবেই হঠাৎ এল হারিয়ে-যাওয়া অতীতের স্মৃতি৷ জীবনের এই প্রথম মনে পড়ল মায়ের কথা, মনে পড়ল আমাদের ছোট্ট বাড়িটার কথা—কিন্তু রয়ের কথা মনে পড়তেই ধীরে ধীরে চোখ বুজে এল৷ আমাদের ছোটবেলার সেই খুশির দিনগুলো আরও একবার ভেসে উঠল আর হঠাৎই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল নিদারুণ বাস্তবের কঠিন আঘাতে৷ ছেলেবেলার রয় আর আজকের রয়, এই দুয়ের মধ্যে কি বিশাল ব্যবধান! বুকের যন্ত্রণা যেন আরও বেড়ে উঠল৷ শুনতে পাচ্ছি মৃত্যুর হালকা পায়ের ছন্দ—সে যেন এগিয়ে আসছে নিঃশব্দ চরণে—আসছে—সে আসছে—সে আসছে৷

সমাপ্ত

কাম ইজি—গো ইজি