নবম পরিচ্ছেদ
১
একই দিনে দ্বিতীয়বার পিক্সি কোভ অভিমুখে নৌকো বেয়ে চললো প্যাট্রিক রেডফার্ন৷ নৌকোর অন্যান্য যাত্রীদের একজন এরকুল পোয়ারো, পেটে হাত চেপে বিবর্ণ মুখে বসে রয়েছেন, এবং অন্যজন স্টিফেন লেন৷ কর্নেল ওয়েস্টন স্থলপথে রওনা হয়েছেন৷ কিন্তু পথে দেরি হওয়ার তিনি নৌকোর সঙ্গে প্রায় একই সময়ে এসে উপস্থিত হলেন পিক্সি কোভের বেলাভূমিতে৷ একজন পুলিশ কনস্টেবল ও একজন একজন সাদা পোশাকী সার্জেন্ট আগে থেকে সেখানে উপস্থিত ছিলো৷ ওঁরা তিনজন নৌকো থেকে নেমে যখন ওয়েস্টনের সঙ্গে যোগ দিলেন, তখন তিনি সার্জেন্টকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন৷
সার্জেন্ট ফিলিপস বললে, ‘বেলাভূমির প্রতিটি অংশ আমরা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেছি, স্যার৷’
‘খুব ভালো৷ কিছু পেলে?’
‘সমস্ত এক জায়গায় রাখা আছে, স্যার, যদি একবার এসে দেখেন—’
বিভিন্ন জিনিসের একটা ছোটখাটো সংগ্রহ সুন্দরভাবে সাজানো রয়েছে একখণ্ড পাথরের ওপর৷ একটা কাঁচি, গোল্ড ফ্লেক সিগারেটের একটা খালি প্যাকেট, একইরকম পাঁচটা বোতলের ডাকনা, বেশ কয়েকটা পোড়া দেশলাইয়ের কাঠি, তিন টুকরো সুতো, খবরের কাগজের দু-একটা টুকরো, একটা ভাঙা পাইপের ধ্বংসাবশেষ, চারটে বোতাম, একটা মোরগের পায়ের হাড় এবং একটা সূর্যস্নানের তেলের খালি শিশি৷
মূল্যায়নের দৃষ্টিতে জিনিসগুলোর দিকে চোখ নামিয়ে দেখলেন ওয়েস্টন৷
‘হুঁম’ তিনি বললেন, ‘আজকালকার সৈকতের যা অবস্থা তার চেয়ে ভালোই বলতে হবে! ইদানীং বেশিরভাগ লোকই সৈকতকে নিজেদের ডাস্টবিনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছে! শিশির লেবেলেন রঙটা যেভাবে জ্বলে গেছে, তাতে মনে হয় এটা বেশ কিছু সময় এখানে রয়েছে—অন্যান্য জিনিসগুলোর অবস্থাও একইরকম দেখছি৷ অবশ্য কাঁচিটা একেবারে নতুন : পরিষ্কার ঝকঝকে৷ গতকাল বৃষ্টির সময়ে এটা নিশ্চয়ই এখানে ছিলো না! এটা কোত্থেকে পেলে?’
‘মইয়ের ঠিক নিচেই, স্যার৷ এই ভাঙা পাইপটাও সেখানে ছিলো৷’
‘হুম, হয়তো ওঠানামা করার সময় কারো হাত থেকে পড়ে গিয়ে থাকবে জিনিসগুলো কার বলে মনে হয়?’
‘জানি না, স্যার৷ কাঁচিটা অতি সাধারণ নখ কাটার কাঁচি৷ আর পাইপটা ভালো জাতের গোলাপের কাঠের তৈরি—নিঃসন্দেহে দামী৷’
পোয়ারো চিন্তাচ্ছন্ন অস্পষ্ট স্বরে মন্তব্য করলেন, ‘ক্যাপ্টেন মার্শাল আমাদের বলেছিলেন, তাঁর পাইপটা কোথায় হারিয়ে গেছে—’
ওয়েস্টন বললেন, ‘উহুঁ—মার্শাল এর মধ্যে নেই৷ সে ছাড়াও তো আরও অনেকে পাইপ খায়৷
এরকুল পোয়ারো স্টিফেন লেনকে লক্ষ্য করছিলেন৷ তাঁর হাত একবার পকেটে ঢুকেই আবার বেরিয়ে এলো৷ সুতরাং নম্রস্বরে বললেন পোয়ারো, আপনি পাইপ ব্যবহার করেন, তাই না, মিঃ লেন?”
ধর্মযাজক চমকে উঠলেন, তাকালেন পোয়ারোর দিকে, বললেন, ‘হ্যাঁ—ইয়ে পাইপ আমার বহু পুরানো বন্ধু ও সঙ্গী৷’ পকেটে হাত দিয়ে একটা পাইপ বের করলেন তিনি তামাক ভরে তাতে অগ্নিসংযোগ করলেন৷
এরকুল পোয়ারে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন শূন্যদৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রেডফার্নের কাছে৷ নিচু স্বরে বললেন, ‘ভালোই হয়েছে—ওঁকে ওরা সরিয়ে নিয়ে গেছে—’
স্টিফেন লেন প্রশ্ন করলেন, ‘মৃতদেহটা ছিলো কোথায়?’
সার্জেন্ট ফিলিপস উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল, ‘ঠিক যেখানটায় আপনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন, স্যার৷’
লেন ক্ষিপ্রভাবে একপাশ সরে গেলেন৷ পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইলেন মুহূর্ত আগে দাঁড়িয়ে থাকা জায়গাটার দিকে৷
ফিলিপস বলে চললো, ‘ভেলাটা যেখানে থামানো হয়েছিলো, তা থেকে অনুমান করা যায় মিসেস মার্শাল পৌনে এগোরোটা নাগাদ এখানে এসে পৌঁছেছিলেন৷ জোয়ার-ভাটার নিয়ম থেকেই সময়টা অনুমান করছি৷ আর এখন সমুদ্রের জল দূরে সরে যাওয়ায় ভেলার মুখটা একপাশে ঘুরে গেছে৷’
‘ফটো-টটো যা তোলার তোলা হযে গেছে?’ ওয়েস্টন প্রশ্ন করলেন৷
‘হ্যাঁ, স্যার৷’
ওয়েস্টন ফিরলেন রেডফার্নের দিকে৷
‘আসুন মশাই, এবারে আপনার গুহার রাস্তাটা দেখান—’
প্যাট্রিক রেডফার্ন তখনও স্থির চোখে তাকিয়ে ছিলো ধর্মযাজকের প্রথম দাঁড়ানো জায়গাটার দিকে৷ যেন উপুড় হয়ে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে থাকা মৃতদেহটা এখনও তাঁর চোখের সামনে ভাসছে৷
ওয়েস্টনের কথায় তার সম্বিৎ ফিরলো৷ সে বললো, ‘ওই তো ওখানে—’
পাহাড়ের গায়ে সুপ্রাচীন ধ্বংসাশেষের সৌন্দর্য নিয়ে জড়ো করা ছিলো একরাশ ছোটবড় পাথর; সেদিকেই এগিয়ে চললো রেডফার্ন৷ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুটো বড় পাথরে মাঝামাঝি একটা সরু ফাটলের সামনে গিয়ে থামলো সে৷ বললো, ‘এটাই গুহায় ঢোকার পথ৷’
ওয়েস্টন বললেন, ‘এটা? দেখেশুনে তো মনে হচ্ছে না একটা মানুষ কোনরকমে ঢুকতে পারবে৷’
‘ওটা মনের ভুল একটু পরেই বুঝতে পারবেন—’
ওয়েস্টন ধীরেসুস্থে ফাটলে প্রবেশ করলেন৷ ফাটলটা দেখে যতটা সরু মনে হয়েছিলো ততটা নয়৷ ভেতরে জায়গাটা ক্রমশ চওড়া হয়ে বড়সড় গুহার আকার নিয়েছে৷ সোজা হয়ে দাঁড়াতে অথবা ঘুরেফিরে বেড়াতে কোনরকম অসুবিধে নেই৷
এরকুল পোয়ারো এবং স্টিফেন লেন পুলিশ-প্রধানকে অনুসরণ করলেন৷ অন্যান্যরা বাইরেই দাঁড়িয়ে রইলেন৷ ফাটল দিয়ে আলোর রেশ ভেতরে এলেও গুহাকে আলোকিত করা পক্ষে পর্যাপ্ত নয়৷ ওয়েস্টন একটা শক্তিশালী টর্চ জ্বালিয়ে ইতস্তত দেখতে লাগলেন৷
অবশেষে তিনি মন্তব্য করলেন, ‘বেশ জায়গা৷ বাইরে থেকে বোঝবারই উপায় নেই৷ তারপর মেঝের প্রতিটি অংশ টর্চের আলোয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন৷
এরকুল পোয়ারো শান্তভাবে বাতাসের গন্ধ নিচ্ছিলেন৷
সেটা লক্ষ্য করে ওয়েস্টন বললেন, ‘বাতাস মোটামুটি বিশুদ্ধ৷ শ্যাওলার গন্ধ বা আঁশটে গন্ধ নেই৷ অবশ্য জায়গাটা জোয়ারের জলের আওতার বাইরে৷’
কিন্তু পোয়ারো সূক্ষ্ম ঘ্রাণশক্তি ধরা পড়লো, বাতাস শুধু যে বিশুদ্ধ তা নয়,তার সঙ্গে মিশে আছে একটা হালকা মিষ্টি সুগন্ধ৷ অন্তত দুজনকে তিনি জানেন, যাঁরা এই ছলনাময়ী সুগন্ধী ব্যবহার করেন…
ওয়েস্টনের টর্চ ক্ষান্ত হয়ে থামলো৷ তিনি বললেন, ‘অস্বাভাবিক কিছুই পড়লো না৷’
মাথার ঠিক ওপরেই একটা সরু তাকের দিকে চোখে পড়লো পোয়ারোর৷ মৃদু স্বরে তিনি বললেন, ‘ওখানে যে কিছু নেই সেটা দেখে নিলে ভালো হয় না?’
ওয়েস্টন বললেন, ‘যদি কিছু থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সেটা কেউ ইচ্ছে করে লুকিয়ে রেখেছে৷… বলছেন যখন, দেখাই যাক৷’
পোয়ারো স্টিফেন লেনকে বললেন, ‘আমাদের মধ্যে আপনিই সবচেয়ে দীর্ঘকায় মঁসিয়ে লেন, তাই আপনাকে অনুরোধ করছি, যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে ওই তাকে যে কিছু নেই সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ হয়ে আমাদের দয়া করে আশ্বস্ত করুন৷’
লেন পা উঁচু করে হাত বাড়িয়েও তাকের ভেতর পর্যন্ত নাগাল পেলেন না৷ তখন পাথরের গায়ে একটা ফোকরে পা দিয়ে এক হাতে তাকের কিনারা ধরে বেয়ে উঠলেন৷
সঙ্গে সঙ্গে তাঁর উত্তেজিত কণ্ঠস্বর কানে এলো, ‘আরে একটা বাক্স রয়েছে দেখছি৷
মিনিটখানেকের মধ্যে ধর্মযাজকের আবিষ্কারকে পরখ করতে করতে তাঁরা বাইরে সূর্যালোকে পা রাখলেন।
ওয়েস্টন বললেন, ‘সাবধান! প্রয়োজনের বেশি হাত দেবেন না৷ কোন হাতের ছাপ-টাপ থাকলেও থাকতে পারে৷’
টিনের তৈরি বাক্সটার রঙ গাঢ় সবুজ৷ এবং তার গায়ে স্যান্ডউইচ শব্দটি লেখা রয়েছে৷
সার্জেন্ট ফিলিপস বলল, ‘হয়তো পিকনিক করতে এসে কেউ ফেলে গেছে৷’
রুমালে ধরে বাক্সের ঢাকনা খুললো সে৷
ভেতরে নুন, গোলমরিচ, রাই লেখা কয়েকটা ছোট ছোট টিনের কৌটো রয়েছে: আর রয়েছে দুটো বড় কৌটো—নিঃসন্দেহে স্যান্ডউইচ রাখবার জন্য৷ সার্জেন্ট ফিলিপস নুনের কৌটোর ঢাকনাটা খুলে ফেললো৷ ভেতরটা কানায় কানায় ভর্তি৷ পরে কৌটোটার ঢাকনা খুলে সে মন্তব্য করলো, হুঁ—গোলমরিচ লেখা কৌটোতেও নুন রয়েছে৷ দেখছি৷’
রাই-এর কৌটোর বেলাতেও তার ব্যতিক্রম হলো না৷
হঠাৎ সতর্ক হলো ফিলিপস-এর আচরণ৷ বড় কৌটো দুটোর একটা খুললো সে৷ তাতেও সেই একই সাদা স্ফটিকের গুঁড়ো৷
আরও সতর্ক তৎপর ভঙ্গীতে একটা আঙুল সাদা গুঁড়োয় ডুবিয়ে দিলো সার্জেন্ট ফিলিপস৷ আঙুলটা তুলে জিভে ঠেকালো৷
তার মুখভাবের আমূল পরিবর্তন ঘটলো৷ সে বলে উঠলো—তার কণ্ঠস্বরে চাপা উত্তেজনা৷ ‘এটা মোটে নুন নয়, স্যার৷ নুন হতেই পারে না! ভীষণ তেতো লাগছে৷ মনে হচ্ছে কোন মাদকদ্রব্য হবে৷’
২
‘তিন নম্বর দৃষ্টিকোণ৷’ প্রায় আর্তনাদের সুরে বললেন ওয়েস্টন৷
ওঁরা আবার হোটেলে ফিরে এলেন৷
পুলিশ-প্রধান বলতে লাগলেন, ‘যদি মাদকদ্রব্য চালানের কোন দল কোন কারণে এর সঙ্গে জড়িত থেকে থাকে, তাহলে নতুন কয়েকটা সম্ভাবনার কথা আমাদের ভেবে দেখতে হবে৷ প্রথমত, মৃত মহিলাটি হয়তো সেই দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন৷ আপনার কি মনে হয়?’
এরকুল পোয়ারো সতর্কভাবে উত্তর দিলেন, ‘অসম্ভব নয়৷’
‘হয়তো তাঁর মাদকদ্রব্যের নেশা ছিলো?’
অসমর্থনে মাথা নাড়লেন পোয়ারো৷ বললেন, ‘সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে৷ তাঁর শক্তি-সাহস ছিলো অবিচল, ছিলো উজ্জ্বল স্বাস্থ্য, তাছাড়া তাঁর হাতে কোন ইনজেকশানের ছুঁচের দাগ আমার নজরে পড়েনি৷ (অবশ্য এ থেকে স্থির নিশ্চিত হওয়া যায় না৷ কারণ অনেকে শুধুমাত্র আঘ্রাণ নিয়েই এ ধরনের নেশা করে থাকেন৷) না, আমার মনে হয় না তাঁর এ সব নেশা ছিলো৷’
‘সেক্ষেত্রে’, চিন্তান্বিত কণ্ঠে বললেন, ওয়েস্টন, তিনি হয়তো আকস্মিকভাবেই এই মাদকদ্রব্যের ব্যবসার ব্যাপারটা জানতে পেরেছিলেন, এবং পরিণতিস্বরূপ সেই দলের লোকেরা চিরতরে তাঁর মুখ বন্ধ করে দিয়েছে৷ ওই সাদা জিনিসটা যে কি সেটা এখুনি আমরা জানতে পারবো৷ ওটা পরীক্ষা করে দেখবার জন্যে নীসডনের কাছে পাঠিয়েছি৷ যদি সত্যিই কোন মাদকদ্রব্য চালানের দল এর পেছনে থেকে থাকে, তাহলে ছোটখাটো তুচ্ছ ঘটনার তারা থেমে থাকবে না।’
দরজা খুলে মিঃ হোরেস ব্ল্যাট ঘরে প্রবেশ করতেই মাঝপথে থমকে গেলেন ওয়েস্টন৷
মিঃ ব্ল্যাটের মুখমণ্ডল সূর্যতাপে রক্তাভ৷ তিনি কপালের ঘাম মুছছিলেন৷ তাঁর দরাজ কণ্ঠস্বরের তরঙ্গে ছোট্ট ঘরটা গমগম করতে লাগলো৷
‘এইমাত্র ফিরে এসেই খবরটা শুনলাম৷ আপনি পুলিশ-প্রধান? ওদের কাছেই শুনলাম আপনি এখানে আছেন৷ আমার নাম ব্ল্যাট—হোরেস ব্ল্যাট৷ কোনরকম সাহায্য করতে পারবো কিনা? মনে হয় না৷ সেই ভোরে নৌকো নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি, গোটা দিনটাই বাইরে কেটেছে৷ আর সেই জন্যেই এমন একটা চাঞ্চল্যকর ঘটনা থেকে পুরোপুরি ফাঁকি পড়লাম৷ এরকম একটা নির্জন জায়গা যখন একটা ঘটনার মতো ঘটনা ঘটলো তখন কিনা আমি থাকলাম না৷ সত্যি, জীবনটাই এইরকম, কি বলেন? আরে, মঁসিয়ে পোয়ারো যে! আপনাকে তো খেয়ালই করিনি৷ আপনিও তাহলে এর মধ্যে রয়েছেন? অবশ্য থাকবেন না-ই বা কেন! শার্লক হোমস বনাম স্থানীয় পুলিশ—ঠিক বলিনি? হা-হা! লেসট্রেড—ওই জাতীয় সমস্ত ব্যাপার৷ আঃ আপনার শখের গোয়েন্দা গিরি দেখতে আমার ভালোই লাগবে৷’
মিঃ ব্ল্যাট এগিয়ে এসে একটা চেয়ার অধিকার করলেন, সিগারেট কেস বের করে এগিয়ে ধরলেন ওয়েস্টনের দিকে৷ ওয়েস্টন সবিনয় প্রত্যাখ্যান জানালেন৷ ছোট্ট হাসি হেসে বললেন, ‘আমি মশাই এক নম্বরের পাইপ ভক্ত৷’
‘আমিও তাই৷ সিগারেটও অবশ্যই খাই—তবে পাইপের কাছে কিস্যু না৷’
কর্নেল ওয়েস্টন হঠাৎ অন্তরঙ্গ সুরে বলে উঠলেন, ‘তাহলে পাইপটা ধরান না মশাই৷’
হোরেস ব্ল্যাট মাথা নাড়লেন৷
‘এই মুহূর্তে পাইপটা সঙ্গে নেই৷ এবারে দয়া করে একটু ঝেড়ে কাশুন তো৷ এ পর্যন্ত যেটুকু আমি শুনেছি তা হলো, মিসেস মার্শালকে নাকি এ অঞ্চলের কোন বেলাভূমিতে নিহত অবস্থায় পাওয়া গেছে৷’
‘পিক্সি কোভে৷’ ব্ল্যাটের মুখে অপলক চোখ রেখে শান্ত কণ্ঠে বললেন, ওয়েস্টন৷
কিন্তু মিঃ ব্ল্যাট নিছকই উত্তেজিত স্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘শুনলাম তাঁকে গলা টিপে খুন করা হয়েছে?’
‘ঠিক শুনেছেন৷’
‘ওঃ, নৃশংস—বড় নৃশংস৷ তবে জানবেন, মেয়েটা নিজেই নিজের মৃত্যু ডেকে এনেছিলো৷ ওরকম গরম ঝাঁঝালো মশলা—কি বলেন, মঁসিয়ে পোয়ারো? কাজটা কে করলো কিছু আঁচ পেলেন৷ নাকি প্রশ্নটা করা ঠিক উচিত হচ্ছে না?’
হালকা হাসি হেসে কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না, মিঃ ব্ল্যাট, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশ্নগুলো আমাদেরই করবার কথা৷’
মিঃ ব্ল্যাট সিগারেটসমেত হাত নাড়লেন৷
‘দুঃখিত—অত্যন্ত দুঃখিত, আমারই ভুল হয়েছে৷ বলুন, কি জানতে চান৷’
‘আপনি আজ সকালে নৌকো বাইতে বেরিয়েছিলেন৷ ক’টার সময়?
‘পৌনে দশটা নাগাদ এখান থেকে বেরোই৷’
‘সঙ্গে কেউ ছিলো?’
‘কেউ না৷ আমিই ছিলাম একমাত্র নিঃসঙ্গ যাত্রী৷’ হাসলেন ব্ল্যাট৷
‘কদ্দুর গিয়েছিলেন?’
সমুদ্রের তীর ধরে প্লিমাউথের দিকে৷ সঙ্গে খাবার ছিলো৷ তেমন হাওয়া না থাকায় বেশি দূর যেতে পারিনি৷’
আরও দু-একটা প্রশ্নের পর ওয়েস্টন জিগ্যেস করলেন, ‘এবার মার্শালদের কথায় আসি; আমাদের সাহায্যে আসতে পারে এমন কিছু ওঁদের সম্পর্কে জানেন?’
‘আমার মতামত তো আপনাকে জানিয়েই দিয়েছি৷ এ অপরাধ প্রেম-প্রবঞ্চনার পরিণতি৷ তবে এটুকু হলফ করে বলতে পারি, এ কাজ আমার নয়৷ আমার জীবনে সুন্দরী আর্লেনার মুখ্য অথবা গৌণ কোন ভূমিকা ছিল না৷ মেয়েটা ওর নীল-নয়নে ছোকরাটাকে নিয়ে দিব্যি ছিলো৷ আর যদি জিগ্যেস করেন তাহলে বলবো, ব্যাপারটা ক্রমশ মার্শালের নজরে আসছিলো৷’
‘এ ধারণার সমর্থনে কোন প্রমাণ আছে?’
‘দু-একবার ওকে ঘৃণাভরে চোখে রেডফার্নের দিকে তাকাতে দেখেছি৷ … মার্শালকে চেনা বড় শক্ত৷ দেখে মনে হয় খুবই শান্ত এবং নম্র স্বভাবের—যেন সর্বক্ষণ তন্দ্রায় ডুবে আছে, কিন্তু লন্ডনে ওর খ্যাতি সম্পূর্ণ অন্য ধরনের৷ ওর সম্পর্কে দু-একটা কথা আমারও কানে এসেছে৷ একবার তো মারপিট করার জন্যে আদালতমুখো হতে হতে বেঁচে গেছেন৷ তবে এটা জানবেন, ওই ফরিয়াদী লোকটা মার্শালের সঙ্গে অত্যন্ত নোংরা ব্যবহার করছিলো৷ মার্শাল বিশ্বাস করেছিলো৷ লোকটাকে আর সে মার্শালের দুর্দিনে সেই বিশ্বাসের মুখে লাথি মেরে সরে পড়েছিলো৷ কাজটা যে অত্যন্ত অন্যায় হয়েছিলো, সেটা আমিও মানি৷ মার্শাল রাগে অন্ধ হয়ে লোকটাকে প্রায় মেরেই ফেলেছিলো৷ সেটা আমিও মানি৷ মার্শাল রাগে অন্ধ হয়ে লোকটাকে প্রায় মেরেই ফেলেছিলো৷ লোকটা অবশ্য আদালতে আর যায়নি—ভয় পেয়েছিলো, যদি কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসে৷ যতটুকু শুনেছি আপনাদের বললাম—সত্যি-মিথ্যে জানি না৷’
‘তাহলে আপনার ধারণা,’ বললেন, পোয়ারো, ক্যাপ্টেন মার্শালের পক্ষে তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করা অসম্ভব নয়?’
‘উহুঁ, মোটেই না৷ সে কথা আমি একবারও বলিনি৷ শুধু বলেছি, মার্শাল এমন ধরনের লোক যে সময়ে সময়ে হঠাৎই ক্ষেপে উঠতে পারে৷’
পোয়ারো বললেন, ‘মিঃ ব্ল্যাট, কতকগুলো কারণের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের বিশ্বাস, মিসেস মার্শাল আজ সকালে পিক্সি কোভে একজনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন৷ সেই ‘একজন’ টি কে হতে পারে বলে আপনার মনে হয়?’
মিঃ ব্ল্যাট চোখ টিপলেন৷
‘মনে হয়-টয় নয়! একেবারে সঠিক বলতে পারি৷ রেডফার্ন!’
‘না, মিঃ রেডফার্ন নন৷’
মিঃ ব্ল্যাট যেন থিতিয়ে গেলেন৷ দ্বিধাগ্রন্ত কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘রেডফার্ন নয়? তাহলে আমি ঠিক বলতে পারছি না… মানে, আর কাউকে সেরকম মনে হচ্ছে না…’
আংশিক আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে তিনি বলে চললেন, ‘আগেও বলেছি এখনও বলছি—সেই ‘একজন’ টি আই নই৷ সে সৌভাগ্য কখনও হয়নি৷ দাঁড়ান, ভেবে দেখি—নাঃ, গার্ডেনারে হবে না, কারণ ওর বউটা সর্বক্ষণ শ্যেনদৃষ্টিতে ওর ওপরে নজর রাখে৷ আর ওই বুড়ো বেতো ঘোড়া ব্যারীটা? রামোঃ! পাদ্রীসাহেবও হবেন বলে মনে হচ্ছে না৷ তবে মনে রাখবেন, আমাদের সম্মানিত পাদ্রীসাহেবকে প্রায়ই দেখেছি আর্লেনাকে লক্ষ্য করছেন : পুরোপুরি ধর্মীয় ঘৃণার দৃষ্টিতে, কিন্তু সেই সঙ্গে সেই ধর্মীয় চোখ মেয়েটার শরীরের চড়াই-উৎরাইগুলাকে রেহাই দেয়নি৷ কি বুঝলেন? শালা বেশিরভাগ পাদ্রীই এক নম্বরের ভণ্ড৷ গতমাসের মামলার খবরটা পড়ে ছিলেন? ধর্মযাজক আর র্গীজার দারোয়ানের মেয়ের কেলোর কীর্তি! এ সব কেচ্ছা দেখে লোকের তো চোখ খুলে যাওয়া উচিত৷’
চাপা হাসিতে মুখর হলেন হোরেস ব্ল্যাট৷
কর্নেল ওয়েস্টন শীতলকণ্ঠে বললেন, ‘আমাদের সাহায্যে আসতে পারে এমন কিছু আপনি তাহলে জানেন না?’
মিঃ ব্ল্যাট মাথা নাড়লেন ‘উঁহু,’ সেরকম কিছু মনে পড়ছে না৷’ একটু থেমে তিনি যোগ করলেন, ‘এ ধরনের একটা ব্যাপারটা নিয়ে যে বেশ তোলপাড় হবে, বুঝতে পারছি৷ কাগজের লোকেরা তো জায়গাটাকে একেবারে মাছির মতো ছেঁকে ধরবে৷ জলি রজারে যে বিশেষ একটা স্বাতন্ত্র্য ছিলো ভবিষ্যতে তার খুব বেশি আর অবশিষ্ট থাকবে বলে মনে হয় না৷ জলি রজারই বটে! এই না হলে আর আনন্দমুখর পরিবেশ!’
এরকুল পোয়ারো অস্ফুট কণ্ঠে বললেন, ‘এখানে ছুটির দিনগুলো আপনার ভালো লাগেনি?’
মিঃ ব্ল্যাটের রক্তাক্ত মুখমণ্ডল আরো রক্তিম হলো৷ তিনি বললেন, ‘সত্যি কথা বলতে গেলে, না, ভালো লাগেনি নৌকো বাওয়া, নিসর্গ দৃশ্য, খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা, অতিথিসেবা, এ সম্পর্কে কোন অভিয়োগ আমার নেই—কিন্তু এ জায়গাটার মিশুকে ভাবটুকুর বড় অভাব, বুঝতেই তো পারছেন কি বলতে চাইছি৷ আমার কথা হলো, কারো টাকার দামই কারোর চেয়ে কম নয়৷ আমরা সবাই এখানে এসেছি ছুটি উপভোগ করতে, আনন্দ করতে৷ তাহলে একসঙ্গে মিলে সেটাই করি না কেন? তা নয়, কেবল দলাদলি, যার যার একা একা বসে আছে, দায়সারা ঠাণ্ডা গলায় সুপ্রভাত, শুভরাত্রি জানাচ্ছে—দম দেওয়া পুতুলের মতো নিষ্প্রাণ সুরে বলছে, আজকের দিনটা ভারী চমৎকার, তাই না—ওঃ অসহ্য৷’
মিঃ ব্ল্যাট থামলেন—তাঁর মুখমণ্ডলে রক্তিম প্রলেপ এখন আরও স্পষ্ট, আরও উজ্জ্বল৷
কপালে হাত বুলিয়ে ঘাম মুছে অপরাধী সুরে তিনি বললেন, ‘যাকগে, আমার কথায় কান দেবেন না৷ তুচ্ছ জিনিসকে আমি বড় বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলি৷’
৩
এরকুল পোয়ারো মৃদু স্বরে বলে উঠলেন, ‘তাহলে মিঃ ব্ল্যাট সম্পর্কে আমাদের কি মতামত?’
কর্নেল ওয়েস্টন হাসলেন, বললেন, ‘আপনার কি মতামত তাই বলুন৷ আপনি তাঁকে বেশিদিন ধরে দেখেছেন—’
পোয়ারো কোমল সুরে বললেন, ‘আপনাদের ইংরেজি ভাষায় তাঁকে বর্ণনা করার মতো প্রচুর শব্দগুচ্ছ রয়েছে৷ অমসৃণ হীরে৷ স্বগঠিত মানুষ৷সমাজশীর্ষ আরোহী৷ তিনি হয়তো বা করুণামাত্রর পাত্র, উপহাস্যম্পদ, অথবা ফূর্তিপ্রিয় যে ভাবে আপনি দেখতে চাইবেন৷ এটা সম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গীর প্রশ্ন৷ কিন্তু আমার মনে হয়, এছাড়াও আরও একটা কিছুটা তাঁর চরিত্রে রয়েছে৷’
‘কি সেটা?’
এরকুল পোয়ারো ওপর দিকে নজর তুলে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করলেন, ‘আমার ধারণা, তিনি বর্তমানে অত্যন্ত বিচলিত!’
৪
ইন্সপেক্টর কলগেট বললেন, ‘ওই সময়গুলো আমার যাচাই করা হয়ে গেছে৷ হোটেল থেকে বেরিয়ে পিক্সি কোভে নামার মই পর্যন্ত পৌঁছতে তিন মিনিট৷ অবশ্য এখানে ধরে নেওয়া হচ্ছে, হোটেল থেকে চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত আপনি হাঁটছেন, এবং তারপর প্রচণ্ডবেগে দৌড়চ্ছেন৷’
ওয়েস্টন ভুরু উঁচিয়ে বললেন, ‘আমি যা ভেবেছিলাম তার চেয়েও কম সময় লাগছে দেখছি!’
‘মই বেয়ে নেমে সৈকতে পৌঁছতে এক মিনিট পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ড; আর ওঠবার সময় দু মিনিট৷ এ সবই কনস্টেবল ফ্রিণ্টের কাজ৷ অল্পস্বল্প খেলোয়ার বলে ওর নাম আছে৷ সাধারণভাবে হেঁটে গেলে, মই বেয়ে ওঠা নামা ইত্যাদি সেরে ফিরে আসতে সময় লাগবে মিনিট পনেরো মতো৷’
ওয়েস্টন সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন বললেন, ‘আরও একটা জিনিস আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে : পাইপের ব্যাপারটা৷’
কলগেট বললেন, ‘ব্ল্যাট পাইপের নেশা করেন, করেন মার্শাল এবং পাদ্রী ভদ্রলোক৷ রেডফার্ন পছন্দ করেন সিগারেট, মার্কিন ভদ্রলোক চুরুট৷ মেজর ব্যারী একেবারেই ধুমপান করেন না৷ মার্শালের ঘরে একটা পাপি রয়েছে, ব্ল্যাটের ঘরে দুটো; পাদ্রীর ঘরে একটা৷ পরিচারিকা বলছে, মার্শালের নাকি দুটো পাইপ আছে৷ অন্য পারিচারিকাটি তেমন চালাক চতুর নয়৷ বাকি দুজনের ক’টা করে পাইপ আছে সঠিক জানে না৷ অনুমানে বলছে, ‘ওঁদের ঘরে দু-তিনটি করে পাইপ সে পড়ে থাকতে দেখেছে৷’
ওয়েস্টন সম্মতিসূচক ভঙ্গীতে মাথা নাড়লেন৷
‘আর কিছু?’
‘হোটেল কর্মচারীদের সম্পর্কে খোঁজখবর করা হয়ে গেছে৷ ওদের মধ্যে কোন গলদ নেই৷ পানশালার পরিচারক হেনরী, তার সঙ্গে মার্শালের যে এগোরোটা বাজতে দশে দেখা হয়েছে সে কথার সমর্থন করছে৷ সৈকতে পরিচারক উইলিয়াম আজ সকালের বেশিরভাগ সময় হোটেল থেকে নিচের পাথরে নামার সিঁড়িটা মেরামতের কাজে ব্যস্ত ছিলো৷ মনে হয় না, ওর কথায় কোন ফাঁকি রয়েছে৷ জর্জ টেনিস কোটে দাগ কাটার কাজ সেরে খাবার ঘরে চারদিকে কতকগুলো গাছের চারা লাগায়৷ সেতু পার হয়ে কেউ দ্বীপে এসে থাকলে সেটা ওদের কারোরই নজরে পড়তো না৷’
‘জোয়ারের জল সেতুর নীচে নেমেছে কখন?’
‘সাড়ে ন’টা নাগাদ, স্যার৷’
‘হুম—’ ওয়েস্টন গোঁফে তা দিতে লাগলেন, ‘তাহলে সেতু পার হয়ে সত্যিই যদি কেউ দ্বীপে এসে থাকে, আমি মোটেই অবাক হবো না৷ কারণ আমরা একটা নতুন সূত্র পেয়েছি কলগেট৷’
তিনি গুহা থেকে স্যান্ডউইচের বাক্স আবিষ্কারে ঘটনাটা খুলে বললেন৷
৫
দরজায় টোকার শব্দ হতেই ওয়েস্টন বললেন, ‘ভেতরে আসুন৷’
আগন্তক ক্যাপ্টেন মার্শাল৷
তিনি বললেন, ‘কবে নাগাদ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যবস্থা করবো কিছু বলতে পারেন?’
‘আমার মনে হয়, করোনারের বিচার পরশুদিনই শেষ হয়ে যাবে, ক্যাপ্টেন মার্শাল৷’
‘ধন্যবাদ৷’
ইন্সপেক্টর কলগেট বললেন, ‘একমিনিট স্যার, এগুলো দয়া করে নিয়ে যাবেন৷’
চিঠি তিনটি ক্যাপ্টেন মার্শালের হাতে দিলেন কলগেট৷
হাসলেন কেনেথ মার্শাল—হাসিতে ব্যঙ্গের ছোঁয়া৷
তিনি বললেন, ‘আমার টাইপ করার গতিবেগ পুলিশ-বিভাগ পরীক্ষা করে দেখছিলো বুঝি? আশা করি আমাকে সন্দেহ থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে—’
কর্নেল ওয়েস্টন খুশিভরা কন্ঠে বললেন, ‘হ্যাঁ, ক্যাপ্টেন মার্শাল; আপনি আমাদের কাছ থেকে নির্দোষিতার প্রমাণপত্র পেতে পারেন৷ ওই কাগুজগুলো টাইপ করতে পুরোপুরি এক ঘণ্টাই লাগে৷ তাছাড়া, এগোরোটা বাজতে পাঁচ মিনিস পর্যন্ত হোটেলের পরিচারিকা আপনাকে টাইপ করতে শুনেছে, আর এগারোটা কুড়িতে আরও একজন সাক্ষী আপনাকে টাইপ করতে দেখেছে৷’
ক্যাপ্টেন মার্শাল অস্ফুটস্বরে বললেন, ‘তাই নাকি? সব কিছুই অতিরিক্ত সন্তোষজনক মনে হচ্ছে৷’
‘ঠিক তাই৷ মিস ডার্নলি এগারোটা কুড়িতে আপনার ঘরে এসেছিলেন৷ আপনি টাইপ করতে এত ব্যস্ত ছিলেন যে তাঁকে খেয়াল করেননি৷’
কেনেথ মার্শালের মুখমণ্ডল আবৃত হলো অভিব্যক্তিহীন অভিব্যক্তিতে৷ তিনি বললেন, ‘মিস ডার্নলি বুঝি তাই বলেছেন? তিনি একটু থামলেন, ‘সত্যি কথা বলতে কি তার একটু ভুল হয়েছে৷ আমিও তাঁকে দেখতে পেয়েছি, তবে তিনি সেটা জানেন বলে আমার মনে হয় না৷ সামনের আয়নায় আমি তাঁর প্রতিবিম্ব দেখেছিলাম.’
পোয়ারো অস্পষ্ট স্বরে বললেন, ‘কিন্তু আপনি টাইপ বন্ধ করেননি৷’
মার্শাল সংক্ষিপ্তভাবে জবাব দিলেন, ‘না, আমার শেষ করার তাড়া ছিলো৷’
মিনিটখানেক নীরব থাকার পর হঠাৎই তিনি বলে উঠলেন, ‘আর কিছু আপনাদের জানার আছে?’
‘না ধন্যবাদ, ক্যাপ্টেন মার্শাল৷’
কেনেথ মার্শাল ধন্যবাদ গ্রহণ করে নিষ্ক্রান্ত হলেন৷
‘ওয়েস্টন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ওই চলে যাচ্ছে আমাদের অতি প্রত্যাশিত হত্যাকারী—নিজেকে সম্পর্ণ নির্দোষ প্রতিপন্ন করে!… এই তো, নীসডন এসে পড়েছেন৷’
ডাক্তারের আচার-ব্যবহারে উত্তেজনার সামান্য ছোঁয়া৷ তিনি বললেন, ‘সাঙ্ঘাতিক যা হোক এক জিনিস পাঠিয়েছেন, মশাই৷’
‘কেন, কি ওটা?’
‘কি ওটা? ডায়ামরফিন হাইড্রোক্লোরাইড! যে জিনিসটাকে সচরাচর হেরোইন বলা হয়ে থাকে৷’
ইন্সপেক্টর কলগেট চাপা শিস দিয়ে উঠলেন বললেন, ‘এবারে পায়ের তলায় শক্ত মাটির পাওয়া যাচ্ছে৷ এই মাদকদ্রব্যের ব্যাপারটা যে সমস্ত ঘটনার মূলে তা আমি বাজি রেখে বলতে পারি৷’
