একাদশ পরিচ্ছেদ
১
ইন্সপেক্টর কলগেট পুলিশ-প্রধানের কাছে তাঁর তদন্তের বিবরণ দিচ্ছিলেন৷
‘একটা ঘটনা আমার নজরে এসেছে, স্যার—রীতিমতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা৷ ব্যাপারটা মিসেস মার্শালের টাকা সম্পর্কে৷ তাঁর আইনজ্ঞদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি৷ আমি তো বলবো, সব দেখে শুনে তাঁরা বেশ অবাক হয়ে গেছেন৷ ব্ল্যাকমেলের গল্পটার সমর্থনে প্রমাণ আমার হাতে এসেছে৷ আপনার মনে আছে, স্যার আরস্কিন পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড মিসেস মার্শালকে দিয়ে গিয়েছিলেন? তা এখন সেই পঞ্চাশ হাজারের মাত্র হাজার পনেরো অবশিষ্ট আছে৷’
পুলিশ-প্রধান শিস দিয়ে উঠলেন৷
‘তাই নাকি! তাহলে বাকি টাকাগুলো গেলো কোথায়?’
‘সেটাই তো আশ্চর্যের কথা, স্যার৷ মাঝে মাঝে কিছু কিছু সম্পত্তি মিসেস মার্শাল হাত বদল করেছেন, এবং প্রতি ক্ষেত্রেই লেনদেন হয়েছে ক্যাশ টাকা, অথবা ক্যাশ টাকার সামিল—ঋণপত্রের বিনিময়ে—অর্থাৎ সে টাকা তিনি এমন কারও হাতে তুলে দিয়েছেন, যার পরিচয় প্রকাশ পাক তিনি চাননি৷ নিঃসন্দেহে ব্ল্যাকমেল৷’
পুলিশ-প্রধান সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন৷
‘তাই তো মনে হচ্ছে৷ এবং সেই ব্ল্যাকমেলার রয়েছে এই হোটেলেই৷ অর্থাৎ সে নিঃসন্দেহে ওই তিনজনের একজন, ওঁদের সম্পর্কে নতুন কিছু পেলে?’
‘তেমন জোরালো কিছু পেয়েছি বলে মনে হয় না, স্যার৷ মেজর ব্যারী, তাঁর নিজের কথা অনুয়ায়ী, একজন অবসরপ্রাপ্ত ফৌজী অফিসার৷ থাকেন একটা ছোট ফ্ল্যাটে; আয় বলতে পেনশনের টাকা এবং কিছু কোম্পানির শেয়ারের লভ্যাংশ৷ কিন্তু গত বছরে কয়েক দফায় বেশ মোটা টাকা তিনি ব্যাঙ্কে জমা দিয়েছেন৷’
‘চিন্তার কথা৷ তার কারণ হিসেবে কি বলেছেন?’
‘বলেছেন, ওগুলো বাজী-জেতা টাকা৷ একথা সত্যি যে ছোট-বড় সবরকম রেসের মাঠে তাঁর যাতায়াত আছে৷ সময়ে সময়ে বাজীও ধরেন, কিন্তু তার কোন হিসেবে রাখেন না৷’
পুলিশ-প্রধান সম্মতির ইঙ্গিতে মাথা নাড়লেন৷
‘এ কথা ভুল প্রমাণ করা শক্ত৷’ তিনি বললেন, ‘তবে এটাকে একেবারে অবহেলা করলে চলবে না৷’
কলগেট বলে চললেন, ‘এরপর, ধর্মযাজক স্টিফেন লেন৷ তাঁর পরিচয়ের কোন বুজরুকি নেই—হোয়াইটরিজ, সারে-র সেন্ট হেলেনে জীবিকা একটা ছিলো—কিন্তু ভগ্নস্বাস্থ্যের জন্যে বছরখানেক হলো সে জীবিকা ত্যাগ করেছেন৷ একই কারণে শেষ পর্যন্ত মানসিক রুগীদের এক নার্সিংহোমে তাকে যেতে হয়—সেখানে ছিলেন প্রায় এক বছর৷’
‘আচ্ছা৷’ ওয়েস্টনের কণ্ঠে কৌতূহলের ছোঁওয়া৷
‘হ্যাঁ স্যার৷ ভারপ্রাপ্ত ডাক্তারে কাছ থেকে আমি যতটা সম্ভব জানতে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু এই ডাক্তারগুলো কি চিজ আপনি তো জানেন—ওদের কাছ থেকে কাজের কথা আদায় করা খুব কঠিন৷ কিন্তু আমার যদ্দুর ধারণা আমাদের মাননীয় ধর্ময়াজকের প্রধান রোগ ছিলো শয়তান সম্পর্কে এক অদ্ভুত আচ্ছন্নতা—বিশেষ করে স্ত্রীলোকের বেশে উপস্থিত যে শয়তান—রক্তবর্ণ স্ত্রীলোক—ব্যবিলনের বেশ্যা৷’
‘হুম’, বললেন, ওয়েস্টন, অতীতে এ জাতীয় খুনের কারণের যথেষ্ট নজির রয়েছে৷’
‘হ্যাঁ, স্যার৷ আমার মনে হয়, স্টিফেন লেনকে অন্তত সন্দেহ করা যেতে পারে৷ তাঁর চোখে নিহত মিসেস মার্শাল ছিলেন রক্তবর্ণ স্ত্রীলোকের জ্বলন্ত উদাহরণ—লাল চুল পরনের পোশাক এবং ব্যবহার সবদিক থেকেই৷ সুতরাং এ ধারণা নেহাত অসম্ভব নয় যে এই অশুভ মেয়েটিকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়া তিনি তাঁর একান্ত কর্তব্য বলে মনে করেছিলেন৷ যদি অবশ্য সত্যি সত্যিই তাঁর মাথা গোলমাল থেকে থাকে৷’
‘ব্ল্যাকমেলের ব্যাপারে খাপ খাওয়ার মতো কিছু পাওনি?’
‘না, স্যার৷ ও ব্যাপারে তাঁকে আমরা সরাসরি বাদ দিতে পারি৷ খুব বেশি না হলেও তাঁর নিজস্ব কিছু আয়ের রাস্তা আছে, এবং সম্প্রতি তাঁর আয়ের অঙ্ক হঠাৎ করে বেড়ে যায়নি৷’
‘খুনের দিন সকালে নিজের গতিবিধি সম্পর্কে যে গল্পটা তিনি বলেছিলেন, তাঁর কি হলো?’
‘ওটার সমর্থনে কোন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না৷ রাস্তায় কোন পাদ্রীকে দেখেছে বলে কেউই মনে করতে পারছে না৷ আর গীর্জার খাতার কথা যদি বলেন, ওটাতে শেষ নামটা লেখা হয়েছে তিনদিন আগে এবং দিন পনেরো খাতাটা কেউ খুলেও দেখেনি৷ সুতরাং, মিঃ লেন খুব সহজেই খুনের আগের দিন, অথবা, ধরুন, তার দিনদুয়েক আগে গীর্জায় গিয়ে থাকতে পারেন, এবং তখন হয়তো নিজের নামটা ২৫ শে সই করে আসেন৷’
ওয়েস্টন মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালেন৷ বললেন, ‘আর আমাদের তৃতীয় জন?’
‘হোরেস ব্ল্যাট? আমার ধারণা, স্যার, ওখানে নির্ঘাত কোন গোলমাল রয়েছে৷ ভদ্রলোক যে আয়ের ওপর আয়কর দেন, তা তাঁর লোহার ব্যবসার আয়ের তুলনায় অনেক বেশি৷ মনে রাখবেন, এ মক্কেল একেবারে পাঁকালমাছ৷ তিনি হয়তো চটপট একটা যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা খাড়া করে দেবেন। তিনি একটু-আধটু শেয়ার বাজারে যাতায়াত করেন, এবং কোন কোন দুনম্বরি ব্যবসায় তাঁর সামান্য অংশও আছে৷ জানি না, তাঁর কথা সত্যিও হতে পারে; তবে এ কথা স্বীকার করা যায় না যে গত কয়েক বছর ধরে অজ্ঞাত কোন উপায়ে—তিনি মাঝখানেই বেশ মোটা টাকা রোজগার করেছেন৷’
‘তাহলে তুমি বলতে চাইছো’, বললেন ওয়েস্টন, মিঃ হোরেস ব্ল্যাট একজন পেশাদার ব্ল্যাকমেলার?’
‘হয় তাই, না হলে হেরোইনের মামলায় তিনি জড়িয়ে আছেন, স্যার৷ চীফ ইন্সপেক্টর রিজওয়ে, যিনি এই মাদকদ্রব্য চালানের তদন্তে রয়েছেন, তাঁর সঙ্গে আমি দেখা করেছিলাম, এবং এ ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত আগ্রহী৷ মনে হচ্ছে, সম্প্রতি চোরাপথের বেশ কিছু হেরোইন এ দেশে আসছে৷ এ পর্যন্ত কয়েকটা চুনোপুঁটি দোকানদারের খোঁজ ওরা পেয়েছে, এবং মোটামুটি জানে, এ ব্যবসার অন্য মাথায় কে বা কারা রয়েছে৷ কিন্তু জিনিসটা কিভাবে শহরে আসছে সেটা এখনও ওদের মাথায় ঢুকছে না৷’
ওয়েস্টন বললেন, ‘জেনেই হোক বা না জেনেই হোক, হেরোইন চোরাচালানের দলে জড়িয়ে পড়ার কারণেই যদি মার্শাল মহিলার মৃত্যু হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের উচিত হবে পুরো ব্যাপারটা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের হাতে তুলে দেওয়া৷ এ পাখি ওদের শিকার৷ হুঁ? তুমি কি বলো?’
ইন্সপেক্টর কলগেট একটু দুঃখিতভাবেই বললেন, ‘হ্যাঁ, স্যার ঠিকই বলেছেন৷ যদি মাদকদ্রব্যের ব্যাপারী হয় তাহলে এ মামলা নিঃসন্দেহে ইয়ার্ডের৷’
কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে ওয়েস্টন বললেন, ‘এটাই সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা বলে মনে হচ্ছে৷’
কলগেট বিষণ্ণ মুখে সম্মতি জানালেন৷
‘হ্যাঁ, আমারও তাই ধারণা৷ মার্শাল এর মধ্যে নেই—যদি এমন কতকগুলো খবর আমার হাতে এসেছিলো যেগুলো মার্শাল অ্যালিবাই অত নিখুঁত না হলে অনেক কাজে লাগতো৷ তাঁর ব্যবসা বর্তমানে প্রায় পাড়ে এসে ঠেকেছে৷ এতে মার্শালের অথবা তাঁর শরিকের দোষ নেই: গত বছরে আর্থিক সঙ্কট এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের দুরবস্থাই এর জন্যে দায়ী৷ এবং তিনি যদ্দুর জানতেন, তাঁর স্ত্রী মারা গেলে তিনি পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড পাবেন৷ এবং এই পঞ্চাশ হাজার তাঁর ব্যবসার বর্তমান অবস্থায় অনেক কাজে আসতো৷’
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন৷
‘বড় দুঃখের কথা৷ লোকটার দু-দুটো জোরালো খুনের উদ্দেশ্য থাকা সত্তে্ও সে নিজেকে দিব্যি নির্দোষ প্রমাণ করে বসে রইলো৷’
ওয়েস্টন হাসলেন৷
‘দুঃখ কোরো না, কলগেট৷ আমাদের কৃতিত্ব দেখাবার সুযোগ এখনও রয়েছে৷ ব্ল্যাকমেল সূত্র এবং উন্মাদ ধর্মযাজক—সমাধানের এ দুটো পথ এখনও আমাদের হাতে আছে, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারণা, মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত সমাধানটা অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত৷’ তিনি আরও বললেন, ‘আর যদি ভদ্রমহিলাকে হেরোইন-চোরাচালান দলের কেউ খুন করে থাকে, তাহলে এই চোরাচালান রহস্যের সমাধান স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড পরোক্ষভাবে আমাদের সাহায্য পাবে৷ সুতরাং যেভাবেই হোক না কেন, আমরা যথেষ্ট কাজ দেখিয়েছি৷’
অনিচ্ছাকৃত হাসির ছায়া পড়লো কলগেটের মুখে৷
তিনি বললেন, ‘তাহলে এ-ই সব, স্যার৷ ও, ভালো কথা, মিসেস মার্শালের ঘরে পাওয়া চিঠিটার সম্পর্কে একটু-আধটু খোঁজখবর করেছি৷ যে চিঠিটায় জে. এন, সই ছিলো৷ ফল কিছু হলো না৷ ভদ্রলোক চীনদেশে নিরাপদেই রয়েছেন৷ মিস ব্রুস্টার আমাদের এই মক্কেলের কথা বলছিলেন৷ বলতে পারেন, একেবারে অকর্মার ঢেঁকি৷ মিসেস মার্শালের অন্যান্য বন্ধু-বান্ধব সম্পর্কেও খোঁজ নিয়েছি৷ এ ক্ষেত্রেও ফলাফল শূন্য৷ যা কিছু তলিয়ে দেখার কথা সবই আমাদের দেখা হয়ে গেছে, স্যার৷’
ওয়েস্টন বললেন, ‘তাহলে এখন সবই আমাদের ওপর নির্ভর করছে৷’ একটু থেমে তিনি বললেন, ‘আমাদের বেলজিয়ান বন্ধুর খবর কি? আমাকে যা যা বললে সব তাঁকে বলেছো?’
কলগেট একমুখ হাসলেন, বললেন, ‘ভদ্রলোক একটু অদ্ভুত ধরনের মানুষ, তাই না? জানেন, পরশুদিন তিনি আমাকে কি জিগ্যেস করছিলেন? গত তিন বছর শ্বাসরোধে ঘটা প্রতিটি খুনের মামলার খুঁটিনাটি তথ্য তাঁর চাই৷’
ওয়েস্টন সোজা হয়ে বসলেন৷
‘তাই নাকি৷ ও—তাহলে…’ তিনি মিনিট খানেক নীরব রইলেন৷ তারপর বললেন, ‘আমাদের পাদ্রীসাহেব কবে নাগাদ ওই নাসিংহোমে ভর্তি হয়েছিলেন বললেন?’
‘গত ইস্টারে এক বছর আগে, স্যার৷’
কর্নেল ওয়েস্টন তখন গভীর চিন্তায় মগ্ন৷ তিনি বললেন, ‘একটা ঘটনা আমার মনে আছে—‘ব্যাগশট’ এর কাছাকাছি কোন অঞ্চলে একটি যুবতীর মৃতদেহ পাওয়া যায়৷ মেয়েটা ওর স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে কোথায় যেন গিয়েছিলো, তারপর আর ফিরে আসেনি৷ এ ছাড়াও আরও একটা ঘটনা ঘটেছিলো, যেটাকে খবরে কাগজওলা নাম দিয়েছিলো, ‘নির্জন জঙ্গলের রহস্য’৷ যদি আমার ভুল না হয়ে থাকে, তাহলে দুটো ঘটনাই সারের৷’
তাঁর চোখ মিলিত হলো ইন্সপেক্টরে চোখে৷ কলগেট বললেন, ‘সারে? তাহলে তো, স্যার, পুরোপুরি খাপ খেয়ে যাচ্ছে! যদি তাই হয়…’
২
দ্বীপের সব্বোর্চ শিখরে ঘাসে ছাওয়া জমিতে বসেছিলেন এরকুল পোয়ারো৷
তাঁর সামান্য বাঁয়ে ইস্পাতের মইটা নেমে গেছে পিক্সি কোভে৷ তিনি লক্ষ্য করলেন মইয়ের শীর্ষ প্রান্তের কাছাকাছি কতকগুলো বিশাল রুক্ষ পাথর পড়ে রয়েছে; যেগুলো নিচের সৈকতে নামতে ইচ্ছুক কোন ব্যক্তিকে সহজেই লোকচক্ষের আড়াল করতে পারবে৷ পাহাড়ের ঝুলন্ত অংশের জন্য ওপর থেকে নিচের সৈকতের খুব সামান্য অংশই দেখা যায়৷
এরকুল পোয়ারো গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন।
তাঁর ‘টুকরো-ছবির ধাঁধা’র টুকরোগুলো ক্রমশ উপযুক্ত শূন্যস্থানে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে।
মনে মনে ধাঁধার প্রতিটি টুকরোকে তিনি খতিয়ে দেখলেন, পরীক্ষা করলেন স্বতন্ত্র মনোযোগে।
আর্লেনা মার্শালের মৃত্যুর দিনকয়েক আগে স্নান-সৈকতে কাটানো একটি সকাল।
ব্রীজ খেলার একটি সান্ধ্য৷ টেবিলে ছিলেন তিনি, প্যাট্রিক রেডফার্ন এবং রোজামণ্ড ডার্নলি৷ ক্রিস্টিন ডামি থাকায় বাইরে পায়চারি করতে বেরিয়েছিলেন এবং শুনতে পান কিছু কথোপকথন৷ সেই সময় আরামকক্ষে আর কে ছিলেন? কে ছিলেন সাময়িকভাবে অনুপস্থিতি?
খুনের আগের দিন সন্ধ্যা সমুদ্রের সামনে পাহাড়ের কিনারায় ক্রিস্টিনের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা এবং হোটেলে ফিরে আসার পথে তাঁর দেখা একটি দৃশ্য৷
গ্যাব্রিয়েল নম্বর ৮৷
একটি কাঁচি৷
একটি ভাঙা পাইপ৷
জানলা দিয়ে ছুড়ে ফেলা একটি শিশি৷
একটি সবুজ ক্যালেন্ডার।
এক প্যাকেট মোমবাতি৷
একটি আয়না এবং একটি টাইপরাইটার৷
বেগুনী উলের একটি বল৷
একটি মেয়ের হাতঘড়ি৷
পাইপ বেয়ে স্নানের জল গড়িয়ে পড়ার শব্দ৷
এই সম্পর্কহীন তথাগুলোর প্রতিটি নিজের নিজের জায়গায় খাপ খেয়ে যেতে বাধ্য৷ কোনরকম শিথিলতা তার মধ্যে থাকবে না৷
আর তারপর, নির্দিষ্ট জায়গায় প্রতিষ্ঠিত তথ্যগুলো হাতে নিয়ে, তিনি ফেলবেন৷ পরবর্তী পদক্ষেপ, এই দ্বীপে অশুভ শক্তির উপস্থিত সম্পর্ক তাঁর নিজস্ব বিশ্বাস৷
অশুভ শক্তি…
হাতের টাইপ করা কাগজটার দিকে চোখ রাখলেন পোয়ারো৷
নীলি পার্সন্স—‘শবহ্যামে’ এর কাছাকাছি এক নির্জন জঙ্গলে তাকে শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়৷ সেই খুনী সম্পর্কে কোন সূত্রই আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি৷
নীলি পার্সন্স?
অ্যালিস করিগান…
অ্যালিস করিগানের মৃত্যুর প্রতিটি খুঁটিনাটি তিনি গভীর মনোযোগ পড়তে লাগলেন৷
৩
সমুদ্রকে সামনে রেখে শৈলশিরায় বসে থাকা এরকুল পোয়ারের দিকে এগিযে এলেন ইন্সপেক্টর কলগেট৷
ইন্সপেক্টর কলগেটেকে পোয়ারো পছন্দ করেন৷ তাঁর দৃঢ়সংবদ্ধ মুখের রেখা, বিচক্ষণ চোখ, এবং ধীর স্থির আচরণ পোয়ারোর ভালো লাগে৷
ইন্সপেক্টর কলগেট বসলেন৷ পোয়ারোর হাতের টাইপকরা কাগজগুলোর দিকে এক পলক দেখে তিনি বললেন, ‘ওই মামলাগুলো নিয়ে কিছু করলেন, স্যার?’
‘হ্যাঁ, ওগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছি৷’
কলগেট উঠে দাঁড়ালেন, এগিয়ে গিয়ে উঁকি মারলেন পাশের কৃত্রিম গুহাটায়৷ তারপর ফিরে আসতে বললেন, ‘সাবধানের মার নেই৷ আমি চাই না, আমাদের কথাবার্তায় কেউ কান পাতুক৷’
পোয়ারো বললেন, ‘আপনি বিচক্ষণ৷’
কলগেট বললেন, ‘আপনাকে বলতে বাধা নেই, মঁসিয়ে পোয়ারো, ওই মামলাগুলো সম্পর্কে আমি নিজেও একটু কৌতূহলী হয়ে পড়েছি—অবশ্য আপনি ওগুলোর কথা জিগ্যেস না করলে আমি হয়তো নতুন করে আর মাথা ঘামাতাম না৷’ তিনি এক মুহূর্ত থামলেন, তারপর বললেন, ‘বিশেষ করে একটা মামলা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে৷’
‘অ্যালিস করিগান?’
‘অ্যালিস করিগান৷’ কিছুক্ষণ নীরবতা৷ এ ব্যাপারে আমি সারে পুলিশের সঙ্গে দেখা করেছি—কেসটার আগাপাশতলা জানতে চেয়ে৷’
‘বলুন, বন্ধু৷ আমার জানতে ইচ্ছে করছে—ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে৷’
‘অত্যন্ত স্বাভাবিক৷ অ্যালিস করিগানকে ‘‘ব্ল্যাকরিজ হীর্থ’’ -এর ‘‘সীজার্স গ্রোভ’’-এ শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়-‘‘মালে কপ্স’’, যেখানে নীলি পার্সন্সকে পাওয়া গিয়েছিলো, সেখান থেকে মাত্র মাইল দশেক দূরে—এবং এই দুটোর জায়গাই হোয়াইটরিজের বারো মাইলের মধ্যে, মিঃ লেন যেখানে ধর্মযাজক ছিলেন৷’
পোয়ারো বললেন, ‘অ্যালিস করিগানের মৃত্যু সম্পর্কে আরও বলুন৷’
কলগেট বললেন, ‘ওর মৃত্যুর সঙ্গে নীলি পার্সেন্সের মৃত্যুর কোন সম্পর্ক আছে বলে সারে পুলিশ প্রথমে মনে করেনি৷ এর কারণ, ওরা খুনি হিসেবে অ্যালিসের স্বামীকেই সঙ্গে সঙ্গে সন্দেহ করে৷ ঠিক জানি না কেন, তবে খবরের কাগজে ভাষায় ভদ্রলোক একটু ‘রহস্যময় মানুষ’ ছিলেন—তাঁর সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায়নি—যেমন, তিনি আগে কোথায় ছিলেন, তাঁর পরিচয় কি, ইত্যাদি৷ মেয়েটা ওর বাড়ির লোকের অমতে তাঁকে বিয়ে করেছিলো, ওর নিজের জমানো কিছু টাকাপয়সা ছিলো—এবং স্বামীর নামেই ও জীবনবীমা করা ছিলো—অতএব, সন্দেহ জাগিয়ে তোলার পক্ষে এগুলো যথেষ্ট, এবং আমার ধারণা, আপনি আমার সঙ্গে একমত হবেন, স্যার?’
পোয়ারো সম্মতি জানালেন৷
‘কিন্তু গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ উঠতেই আমাদের স্বামীদেবতাটি সন্দেহের দৃশ্যপট থেকে একেবারে মুছে গেলেন৷ অ্যালিসের মৃতদেহটি আবিষ্কার করেছিলো পল্লী অঞ্চলে ভ্রাম্যমাণ একজন শক্তসমর্থ খাটো প্যান্ট পরিহিতা যুবতী৷ মেয়েটি সাক্ষী হিসেবে ছিলো নিঃসন্দেহে উপযুক্ত এবং নির্ভরযোগ্য—ল্যাংকাশায়ারের এক স্কুলের খেলার দিদিমণি৷ যখন সে মৃতদেহ আবিষ্কার করে, তখন সময় দেখেছিলো সে—ঠিক সোয়া চারটে—এবং তার নিজস্ব মত হিসেবে সে জানায়, মেয়েটি খুব বেশিক্ষণ মারা যায়নি—দশ মিনিটের আগে তো নয়ই৷ পুলিশ সার্জন পৌনে ছ’টা নাগাদ মৃতদেহ পরীক্ষা করেন, তিনি মেয়েটির মতই সমর্থন জানান৷ মেয়েটি কোন কিছুতে হাত না দিয়ে সোজা পায়ে হেঁটে রওনা হয় ব্যাগশট থানার দিকে এবং সেখানেই খুনের খবরটা জানায়৷ এখন, তিনটে থেকে চারটে দশ পর্যন্ত এডওয়ার্ড করিগান লন্ডন থেকে আগত একটি ট্রেনে ছিলেন৷ লন্ডনে তিনি সেইদিনই ব্যবসার কাজে গিয়েছিলেন৷ ট্রেনের কামরায় তাঁর সঙ্গে আরো চারজন যাত্রী ছিলো৷ স্টেশনে নেমে তিনি স্থানীয় বাসে চড়েন, এবং ট্রেনে চার যাত্রীর দুজন ওই বাসে তাঁর সঙ্গী হয়৷ ‘‘পাইন রিজ’’ কাফেতে তিনি বাস থেকে নামেন৷ সেখানে চায়ের আসরে তাঁর সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর যোগ দেবার কথা ছিলো৷ সময় তখন চারটে পঁচিশ৷ তিনি দুজনের জন্যে চায়ের ফরমাশ দেন, কিন্তু বলেন তাঁর স্ত্রী না আসা পর্যন্ত সেগুলো যেন টেবিলে না দেওয়া হয়৷ তারপর তিনি বাইরে এসে স্ত্রীর প্রতীক্ষায় পায়চারি করতে থাকেন৷ অবশেষে পাঁচটায় সময়েও যখন সে এলো না তখন ভদ্রলোক চিন্তিত হয়ে পড়লেন—ভাবলেন, সে হয়তো পায়ে চোট লাগিয়ে কোথাও বসে আছে৷ কারণ কথা ছিলো গ্রামে তাঁরা যেখান ছিলেন, সেখানে থেকে মেয়েটি পায়ে হেঁটে বিস্তীর্ণ প্রান্তর অতিক্রম করে পাইন রিজ কাফেতে আসবে, আর সেখান থেকে বাসে করে তাঁর ঘরে ফিরে যাবেন৷ কাফে থেকে সীজার্স গ্রোভের দূরত্ব বেশি নয়, এবং সকলের অনুমান, হাতে সময় থাকার দরুন মেয়েটি সীজার্স গ্রোফের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মুগ্ধ হয়ে ওখানে কিছুসময় কাটাতে মনস্থ করে৷ এই সময় কোন ভবঘুরে অথবা উন্মাদ ঘটনাচক্রে তার সাক্ষাৎ পায় এবং সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারে তাকে আক্রমণ করে৷ মেয়েটির স্বামী সন্দেহের ছায়া থেকে মুক্তি পাওয়া মাত্রই সারে পুলিশ সিদ্ধান্ত নেয়, ওই মৃত্যুর সঙ্গে নীলি পার্সন্সের মৃত্যুর কোন সম্পর্ক আছে—নীলি পার্সন্স মানে সেই অস্থিরমনা পরিচারিকা, যাকে শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় মার্লে কন্সে পাওয়া যায়৷ ওদের বিশ্বাস, একই লোক ওই দুটো খুনের জন্যে দায়ী, কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই লোককে ওরা ধরতে পারেনি—আর ধরা তো দূরে কথা, তার টিকিটি পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারেনি! ওদের হাজারো তদন্তের ফলাফল একট বিরাট শূন্য৷’
একটু থেমে তিনি ধীরে ধীরে বললেন, ‘আর এখন—শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তৃতীয় একজন মহিলা মারা গেলেন—এবং জনৈক ভদ্রলোক, যাঁর নাম করতে চাই না, একই মহিলা সন্দেহের দৃশ্যপটে উপস্থিত৷’
তিনি থামলেন৷
তাঁর অন্তর্ভেদী বিচক্ষণ চোখ স্থির হলো পোয়ারোর চোখে৷ উত্তরের প্রত্যাশায় তিনি নীরবে অপেক্ষা করতে লাগলেন৷
পোয়ারো ঠোঁট নড়ে উঠলো৷ ইন্সপেক্টর কলগেট সামনে ঝুঁকে এলেন৷
পোয়ারো তখন অস্ফুট কণ্ঠে বলছেন, ‘—কোন, টুকরোটা লোমের কম্বলের আর কোন টুকরোটা বেড়ালের লেজের বুঝে ওঠা ভারী শক্ত৷’
‘কি বলছেন, স্যার?’ চমকে উঠে বললেন ইন্সপেক্টর কলগেট৷
পোয়ারো তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, ‘আমাকে ক্ষমা করবেন৷ আমি নিজস্ব চিন্তায় একটু অনমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম৷’
‘লোমের কম্বল, বেড়ালের লেজ—এ সব কি?’
‘কিছু না—কিছু না৷’ তিনি একটু থামলেন৷ বলুন, ইন্সপেক্টর কলগেট যদি আপনার সন্দেহ হয় যে কেউ একজন মিথ্যে কথা বলছে—অজস্র, অজস্র মিথ্যে কথা, কিন্তু আপনার হাতে কোন প্রমাণ নেই, তাহলে আপনি কি করবেন?’
ইন্সপেক্টর কলগেট কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন৷
‘বলা শক্ত৷ তবে আমার মনে হয়, কেউ যদি অনর্গল মিথ্যে কথা বলে যায়, তাহলে শেষের দিকে মিথ্যে তোলগোল পাকিয়ে সে ধরা পড়ে যেতে বাধ্য৷’
পোয়ারো সম্মতি জানালেন৷
‘হ্যাঁ, আপনার কথা খাঁটি সত্যি৷ কারণ দেখুন, আমি শুধু মনে মনে জানি যে কিছু কিছু বিবৃতি পুরোপুরি মিথ্যে৷ আমার বিশ্বাস সেগুলো মিথ্যে, কিন্তু আমি নিশ্চয় করে বলতে পারি না অবশ্য একটা পরীক্ষা করে দেখতে বাধা নেই—এটা ছোট্ট তুচ্ছ মিথ্যের কষ্টিপাথর পরীক্ষা৷ এবং সত্যিই যদি সেটা মিথ্যে বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে বিনা দ্বিধায় বলা যেতে পারে অবশিষ্ট বক্তব্যগুলো নির্ভেজাল মিথ্যে৷’
ইন্সপেক্টর কলগেট কৌতূহলী চোখে পোয়ারো দিকে তাকালেন৷
‘আপনার মন বড় অদ্ভুতভাবে কাজ করে, তাই না, স্যার? কিন্তু আমার অনুমান, শেষ পর্যন্ত আপনিই জিতবেন৷ যদি কিছু মনে না করেন তাহলে একটা প্রশ্ন করছি : শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনাগুলোর দিকে আপনার নজর গেলো কি কারণে?’
পোয়ারো ধীর স্বরে বললেন, ‘আপনার ভাষায় একটা শব্দ আছে—পরিপাটি৷ এই অপরাধটা আমার কাছে অত্যন্ত পরিপাটি অপরাধ বলে মনে হয়েছে৷ কখনও কখনও অবাক হয়ে ভেবেছি, হয়তো এটাই খুনীর প্রথম অপরাধ নয়৷’
ইন্সপেক্টর কলগেট বললেন, ‘ও—বুঝেছি৷’
পোয়ারো বলে চললেন, ‘আমি নিজের মনেই বললাম, এ ধরনের অতীত খুনের ঘটনা একবার পরীক্ষা করে দেখা যাক, এবং যদি দেখা যায়, অতীতের কোন খুনের সঙ্গে এই খুনের যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে, তাহলে—বলাই বাহুল্য একটা বহুমূল্য সূত্র আমাদের হাতে আসবে৷’
‘একই রকম খুনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে বলে, স্যার?’
‘না না, আমি তার চেয়েও বেশি কিছু বলতে চাইছি৷ যেমন নীলি পার্সন্সের মৃত্যু আমাকে কোন সূত্রই দেয়নি৷ কিন্তু অ্যালিস করিগানের মৃত্যু—বলুন, ইন্সপেক্টর কলগেট, বর্তমান খুনের সঙ্গে ওই মৃত্যুর একটা অদ্ভুত সাদৃশ্য কি আপনার নজরে পড়ছে না?’
ইন্সপেক্টর কলগেট মনে মনে প্রশ্নটা উলটে-পালটে খতিয়ে দেখলেন৷ অবশেষে তিনি বললেন, ‘না, স্যার, ঠিক যে নজরে পড়ছে তা বলতে পারছি না। অবশ্য যদি এটা না হয় যে দুটো ক্ষেত্রেই শ্রীযুক্ত পতিদেবতার হিমালয় প্রমাণ অ্যালিবাই রয়েছে৷’
পোয়ারো হালকা স্বরে বললেন, ‘ও—তাহলে আপনার নজরে পড়েছে?’
৪
‘এই যে, পোয়ারো! আপনাকে দেখে খুশি হলাম৷ আসুন, ভেতরে আসুন৷ ঠিক এই মুহূর্তে যে মানুষটিকে চাইছিলাম৷’
এরকূল পোয়ারো সে আমন্ত্রণে সাড়া দিলেন৷
পুলিশ-প্রধান এক বাক্স সিগেরেট এগিয়ে দিলেন, নিজে একটা নিয়ে ধরালেন৷ ধোঁয়ার মুখ ঝাপসা করে তিনি বললেন, ‘একটা নির্দিষ্ট কর্মপন্থা আমি একরকম ঠিক করে ফেলেছি৷ কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবার আগে সে বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই৷’
এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘বলুন, বন্ধু।’
ওয়েস্টন বললেন, ‘ঠিক করেছি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ডেকে পাঠিয়ে মামলাটা ওদের হাতে তুলে দেবো৷ আমার মতে, যদিও দু-একজনকে সন্দেহ করবার জোরালো যুক্তি রয়েছে, পুরো ব্যাপারটা কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে ওই মাদকদ্রব্য চোরাচালানের ওপর৷
পোয়ারো সম্মতি জানালেন৷
‘আমি একমত৷’
‘শুনে সুখী হলাম৷ এবং আমাদের এই চোরাচালানকারী ব্যক্তিটি যে কে, তা আমি হলফ করে বলতে পারি৷ হোরেস ব্ল্যাট৷’
আবারও সম্মতি জানালেন পোয়ারো৷ তিনি বললেন, ‘সে ইঙ্গিতও মোটামুটি স্পষ্ট৷’
‘আমাদের চিন্তাধারা একই পথ ধরে এগিয়ে চলেছে দেখতে পাচ্ছি৷ ব্ল্যাট তাঁর নৌকো নিয়ে হরদম সমুদ্রে বেরিয়ে পড়তেন৷ কখনও কখনও সঙ্গী হিসেবে কাউকে সঙ্গে নিলেও বেশির ভাগ সময় তিনি একাই যেতেন৷ তাঁর নৌকোয় গোটাকয়েক লোক দেখানো লাল-রঙা পাল আছে, কিন্তু আমরা আবিষ্কার করেছি, এছাড়াও কয়েকটি সাদা পাল লুকোনো ছিলো৷ আমার ধারণা, একটা ভালো দিন দেখে তিনি নৌকো বেয়ে উপস্থিত হন নির্দিষ্ট কোন জায়গায়, এবং সেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা করে দ্বিতীয় কোন নৌকো সাধারণ পাল-তোলা নৌকো অথবা মোটরবোট জাতীয় কিছু তার তখনই আসল জিনিসের হাতবদল হয়৷ তারপর ব্ল্যাট পিক্সি কোভে ফিরে আসেন উপযুক্ত সময় দেখে।’
এরকুল পোয়ারো সামান্য হাসলেন৷
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ধরুন দেড়টা নাগাদ, যখন ইংরেজদের মধ্যাহ্নভোজের সময়;তখন প্রত্যেকেই যে খাবার ঘরে থাকবেন তাতে কোন সন্দেহ নেই৷ দ্বীপটা ব্যক্তিগত সম্পত্তি৷ এখানে বাইরের লোকেরা কখনও পিকনিক করতে আসেন না৷ কখনও কখনও বিকেলে, পিক্সি কোভে যখন পড়ন্ত সূর্যের আলো থাকে, অতিথিরা হোটেল থেকে চা নিয়ে সেখানে যান, আর যদি তাঁরা পিকনিক করতে চান, তাহলে তাঁরা যাবেন অনেক অনেক মাইল দূরে কোন প্রান্তরে—পিক্সি কোভে নয়৷’
পুলিশ-প্রধান সমর্থনে মাথা নাড়লেন৷
‘ঠিক বলেছেন৷’ তিনি বললেন, ‘সুতরাং, ব্ল্যাট পিক্সি কোভে নেমে সেই গুহার তাকে জিনিসটা লুকিয়ে রাখেন৷ জিনিসটা সেখান থেকে যথাসময়ে সরিয়ে নেবার দায়িত্ব ছিলো দ্বিতীয় কোন ব্যক্তির ওপর৷’
পোয়ারো মৃদু কণ্ঠে বললেন, ‘আপনার মনে আছে, খুনের দিন একটা দম্পতি মধ্যাহ্নভোজ সারতে এ দ্বীপে এসেছিলো?’ এটা সম্ভবত জিনিসটা পিক্সি গুহা থেকে সরিয়ে নেবার একটা পথ৷ মুর অতএব সেন্ট লু-র হোটেলে থেকে গ্রীষ্মের অতিথিরা কখনও কখনও স্মাগলার্স দ্বীপে আসেন৷ তাঁরা হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে মধ্যাহ্নভোজ সেরে নেবার ইচ্ছে প্রকাশ করেন৷ কিন্তু প্রথমে তাঁরা গোটা দ্বীপটা ঘুরে দেখতে বেরোন৷ তারপর সমুদ্র সৈকতে নেমে, স্যান্ডউইচের বাক্সটা নিয়ে মাদামের হাতে ঝোলানো স্নান-ব্যাগে ভরে নেওয়াটা একটু কঠিন কাজ নয়—এবং, যখন বাকি সবাই খাওয়ার ঘরে উপস্থিত, তখন নিজেদের আনন্দ-ভ্রমণ শেষ করে তাঁরা মধ্যাহ্নভোজ সারতে ফিরে আসেন হোটেলে। হয়তো একটু দেরিতে, ধরুন দুটো বাজতে দশে৷’
ওয়েস্টন বললেন, ‘হ্যাঁ, কাজটা অসম্ভব নয়৷ আর এ জাতীয় চোরাচালান দলের লোকেরা ভীষণ নৃশংস হয়৷ যদি কেউ আকস্মিকভাবেই তাদের কার্যকলাপ জানতে পেরে থাকে, তাহলে তাকে চিরতরে নিস্তব্ধ করে দিতে তাদের হাত এতটুকু কাঁপবে না৷ আমার মনে হয়, আর্লেনা মার্শালের মৃত্যুও ঠিক এইভাবে ঘটেছে৷ হতে পারে, সেদিন সকালে ব্ল্যাট হয়তো পিক্সি কোভে ওগুলো লুকিয়ে রাখছিলেন৷ সেইদিনই তাঁর সঙ্গীদের সেখানে আসবার কথা ছিলো জিনিসটা সরিয়ে নেবার জন্যে৷ এমন সময় আর্লেনা উপস্থিত হলেন তাঁর ভেলা নিয়ে এবং বাক্স হাতে ব্ল্যাটকে দেখলেন গুহায় ঢুকতে৷ সে বিষয়ে তিনি ব্ল্যাটকে প্রশ্ন করায় ব্ল্যাট তাঁকে খুন করেন, এবং নৌকো নিয়ে তাড়াতাড়ি সরে পড়েন৷’
পোয়ারো বললেন, ‘তাহলে আপনার স্থির বিশ্বাস ব্ল্যাটই খুনী?’
‘সেটাই সবচেয়ে বেশি সম্ভব বলে মনে হচ্ছে৷ অবশ্য এও হতে পারে যে আর্লেনা আসল ব্যাপারটা আগেই জানতে পেরেছিলেন, সে সম্পর্কে ব্ল্যাটকে হয়তো কিছু বলেও ছিলেন, এবং দলের অন্য একজন লোক মিথ্যে সাক্ষাৎকারে নাম করে আর্লেনাকে ডেকে পাঠায় ও তাঁকে খুন করে৷ সুতরাং, যা বললাম, আমার মতে সবচেয়ে ভালো পথ হলো গোটা ব্যাপারটা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের হাতে তুলে দেওয়া। চোরাচালান দলের সঙ্গে ব্ল্যাটের সম্পর্ক প্রমাণ করবার সুযোগ আমাদের চেয়ে ওদের হাতে অনেক বেশি আছে৷’
এরকুল পোয়ারো চিন্তান্বিতভাবে মাথা নাড়লেন৷
ওয়েস্টন বললেন, ‘আপনার কি মনে হয়? কাজটা ঠিক হবে, হুঁ?’
পোয়ারো তখনও চিন্তাকুল৷ অবশেষে তিনি বললেন, ‘হয়তো ঠিক হবে৷’
‘ওসব হেঁয়ালি ছাড়ুন, মশাই৷ সত্যি করে বলুন তো, আস্তিনে কোন তুরুপের তাসটি লুকিয়ে রেখেছেন৷’
পোয়ারো বিষণ্ণ স্বরে বললেন, ‘লুকিয়ে রাখলেও জানি না, শেষ পর্যন্ত তা প্রমাণ করতে পারবো কি না৷’
ওয়েস্টন বললেন, ‘অবশ্য জানি, আপনার এবং কলগেটের ধারণা অন্যরকম৷ আমার কাছে সেটা একটু অবিশ্বাস্য ঠেকলেও একথা স্বীকার করতে আমি বাধ্য যে তার ভেতরে সত্যি কিছু থাকলেও থাকতে পারে৷ কিন্তু আপনার ধারণা যদি ঠিকও হয়, তাহলেও আমার বিশ্বাস এটা ইয়ার্ডের মামলা৷ আমরা ওদের সমস্ত তথ্য জানিয়ে দেবো, তাহলে ওরা সারে পুলিশের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে পারবে৷ আমার কেবলই মনে হচ্ছে, এ মামলা আমাদের জন্যে না৷ কারণ এর সীমানা অনেক বিস্তৃত৷’
তিনি একটু থামলেন৷
‘আপনার কি মনে হয়, পোয়ারো৷ এ বিষয়ে কি করা উচিত হবে বলে আপনি মনে করেন?’
পোয়ারোকে দেখে চিন্তামগ্ন বলে মনে হলো৷ অবশেষে তিনি বললেন, ‘শুধু এটুকু জানি, এখন আমার কি করতে ইচ্ছে করছে৷’
‘কি?’
পোয়ারো শান্ত অস্ফুট কণ্ঠে বললেন, ‘একটা পিকনিকে গেলে মন্দ হয় না৷’
কর্নেল ওয়েস্টন স্তব্ধ বিস্ময়ে চেয়ে রইলেন পোয়ারোর গম্ভীর মুখের দিকে৷
