গল্প
উপন্যাস

হাতের মুঠোয় পৃথিবী – ৭

সাত

নিজেকে যথাসম্ভব সঙ্কুচিত করে ক্যারাভ্যানের দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে জিপো৷ ক্যারাভ্যানের অসম দোলানির সঙ্গে-সঙ্গে ওর বৃত্তাকার চোখে কেঁপে কেঁপে উঠছে উলঙ্গ আতঙ্কের ছায়া। ওর শরীর থেকে মাত্র ইঞ্চিকয়েক দূরেই একটি ছন্দে দুলছে ট্রাকের ইস্পাত আবরণ।

ব্লেক ট্রাক ছেড়ে এখন আশ্রয় নিয়েছে পিছনের দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে সে লক্ষ করছে, ট্রাকের একপাশে নির্লিপ্তভাবে অপেক্ষারত মরগ্যান ও জিপোকে।

বুইকের প্রচণ্ড গতিবেগের সঙ্গে তাল রেখে ছুটে চলা ক্যারাভ্যানের ভেতর ভারসাম্য বজায় রাখতে ওরা তিনজন আপ্রাণ চেষ্টায় কিছু একটা আঁকড়ে ধরতে চাইছে। ক্রমাগত ঝাঁকুনি আর দোলানির সঙ্গে সঙ্গে দুলছে ওদের শরীর তিনটে।

‘তাহলে একটা লোক এখনও এই ট্রাকের ভেতরে রয়েছে?’ আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করল জিপো।

‘হ্যাঁ, রয়েছে—কিন্তু ভয়ের কোনও কারণ নেই, লোকটা মারা গেছে। যাকগে, শোনো জিপো, তোমাকে এই ইস্পাতের চাদরটা যে করেই হোক খুলতে হবে কারণ টমাস যে বেতার সংকেত চালু করেনি, সে বিষয়ে আমাদের নিশ্চিত হওয়া দরকার।’

কাজের শুরু থেকে এই প্রথম একটা প্রস্তাবের মতো প্রস্তাব করল ব্লেক, ‘আচ্ছা, বেতার সংকেত পাঠানোর যন্ত্র তো ট্রাকের ব্যাটারিতেই চলে! তা-এক কাজ করলে হয় না? ট্রাকের তলায় ঢুকে ব্যাটারির তার দুটো যদি কেটে দিই?’

‘ঠিক বলেছ।’ মরগ্যান যেন হাতে চাঁদ পেল, ‘জিপো, তুমি তাহলে চটপট ট্রাকের নীচে ঢুকে পড়ো; ব্যাটারির তার দুটো কেটে দাও। তাড়াতাড়ি করো?’

জিপোর মুখ গম্ভীর হল, ‘ট্রাকের নীচে কাজ করা সম্ভব নয়, ফ্র্যাঙ্ক। যে কোনও মুহূর্তে ট্রাকটা দুলে উঠতে পারে—তাহলে আমাকে চাপা পড়তে হবে ভারী ট্রাকটার তলায়।’

‘আশা করি আমার কথা তোমার কানে গেছে।’ হায়েনার স্বরে গর্জে উঠল মরগ্যান, ‘জলদি কাজ শুরু করো!’

আপন মনেই গজগজ করতে করতে যন্ত্রপাতি রাখার বাক্সের ঢাকনা খুলল জিপো। একটা স্ক্রু ড্রাইভার এবং একটা তার কাটার কাঁচি বের করে নিল বাক্স থেকে।

মরগ্যান তার পাশের জানলার পরদা সরিয়ে সতর্কভাবে বাইরে উঁকি মারল। ওরা এখন মাঝারি রাস্তায় এসে পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই গাড়ির গতিবেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে কিটসন। ক্যারাভ্যানটা বিপজ্জনকভাবে এপাশ-ওপাশ দুলছে। রাস্তায় যদি কোনও মোটরবাইক পুলিশ উপস্থিত থাকত তাহলে সে নির্ঘাত মোটরবাইক নিয়ে ওদের তাড়া করত। কিন্তু কিটসনকে আস্তে চালানোর জন্যে অনুরোধ করারও কোনও উপায় নেই। থাকলে মরগ্যান তাকে সাবধান করে দিত। সুতরাং প্রধান সড়কে পৌঁছে বুইকের গতিবেগ যে কমাতে হবে, সে ব্যাপারেও কিটসনের বিচারবুদ্ধির ওপরেই তাদের নির্ভর করতে হবে।

জিপো তখন মেঝেতে উপুর হয়ে ট্রাকের নীচে ঢোকবার চেষ্টা করছে। প্রথমত স্বল্পপরিসরের জন্যে সে অসুবিধেয় পড়েছে—তার ওপর মস্তিষ্কে চেপে বসা ভয়টা তো আছেই। অবশেষে অনেক চেষ্টার পর সে ট্রাকের তলায় নিজের শরীরটাকে প্রবেশ করাল, তখন মরগ্যান একটা টর্চ এগিয়ে দিল ওর হাতে।

চিৎ হয়ে ট্রাকের ইঞ্জিনের তলায় পৌঁছতেই পাটতনের গায়ে একটা বিশ্রী লাল দাগ চোখে পড়ল। ওর মুখ থেকে ইঞ্চি কয়েক ওপরেই স্যাঁতসেঁতে ভিজে দাগটা যে রক্তের দাগ, সেটা ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই কয়েকটা আঠালো উত্তপ্ত রক্তের ফোঁটা এসে পড়ল জিপোর মুখের ওপর।

শিউরে উঠে মুখ সরিয়ে নিতে চেষ্টা করল সে। ট্রাকের মেঝের ওপিঠেই পড়ে থাকা টমাসের রক্তাক্ত দেহের সান্নিধ্য তাকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলল।

কাঁপা হাতে অন্ধের মতো মরিয়া হয়ে সে খুঁজতে লাগল ব্যাটারির তার দুটো। শত চেষ্টাতেও অসহ্য কাঁপুনিকে সে থামাতে পারল না—চুপচাপ ঘামতে লাগল জিপো। মরগ্যান এখন হাঁটু গেড়ে ট্রাকের নীচে মাথা এনে জিপোর কার্যকলাপ লক্ষ করছে। তা যদি না হতো, তাহলে সেই মুহূর্তেই জিপো বেরিয়ে আসত ট্রাকের তলা থেকে—সাফ বলে দিত ব্যাটারির তার সে কেটে দিয়েছে। কিন্তু মরগ্যানের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার উপায় নেই। তাই সে চেষ্টা আর করল না।

অবশেষে একটা তারের সন্ধান পেল জিপো, কিন্তু সেটা আবার নাগালের অনেক বাইরে। তাই হাঁপাতে হাঁপাতে সে বলে উঠল, ‘আমি হাত পাচ্ছি না, ফ্র্যাঙ্ক। আমাদের ওপর থেকে চেষ্টা করে দেখতে হবে।’

‘ওপর থেকে দেখবে কোন দিক দিয়ে? সব বন্ধ। ঠিক আছে, এক মিনিট অপেক্ষা করো।’ মরগ্যান এগিয়ে গেল যন্ত্রপাতি রাখার বাক্সের দিকে। ধাতু কাটার একটা লম্বা হাতলওলা কাঁচি বের করে আনল।

‘এই নাও,এটা দিয়ে কাটো!’ কাঁচিটা ট্রাকের তলায় ঠেলে দিয়ে সে বলল।

কাঁচিটাকে জুতমতো বাগিয়ে ধরতে জিপোকে টর্চটা নামিয়ে রাখতে হল! কিন্তু কিছুক্ষণ পরিশ্রমের পর যখন সে কাঁচিটাকে উঁচিয়ে ধরল, তখন তারের খুঁটটাকে সে আর দেখতে পেল না।

‘এখানে একটু আলো ফেলার ব্যবস্থা করো, ফ্র্যাঙ্ক!’ হাঁপাতে-হাঁপাতে বলে উঠল জিপো।

‘যাও, নীচে ঢুকে আলোটা ধরো।’ একপাশে সরে গিয়ে ব্লেককে বলল মরগ্যান। আঙুল তুলে ইশারা করল ট্রাকের নীচে ঢুকতে।

অতি সহজেই ট্রাকের নীচে ঢুকে পড়ল ব্লেক। টর্চটা উঁচিয়ে ধরতেই তার চোখে পড়ল ট্রাকের পাটাতনের রক্তে-ভেজা অংশটা—সেই সঙ্গে চোখে পড়ল জিপোর ভয়ার্ত মুখে কাঁচা রক্তের ফোঁটা।

জিপো ব্যাটারির তারটা কাটল।

‘হয়ে গেছে। এবার আমাকে বেরোতে দাও।’

ব্লেক হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসছিল, হঠাৎই একটা অস্ফুট শব্দে তার হাত-পা যেন বরফ হয়ে এল, ঘাড়ের ওপর শজারুর মতো দাঁড়িয়ে উঠল চুলগুলো।

ট্রাকের পাটাতনের ওপিঠ থেকে ভেসে এল একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস, সেই সঙ্গে এক অস্ফুট গোঙানি—যেন কোনও অশরীরীর হাত তাকে স্পর্শ করতে আসছে।

জিপো উন্মাদের মতো চিৎকার করে উঠল, ‘সরে যাও-যেতে দাও আমাকে! সরে যাও!’ পায়ের এলোপাথাড়ি ধাক্কায় ব্লেককে সরাতে চাইল সে। অন্ধ আতঙ্কে তার হৃৎপিণ্ড ধুকপুক করছে বুকের খাঁচায়।

খেঁকিয়ে উঠে ওর পাঁজরে একটা ঘুষি বসিয়ে দিল ব্লেক, ‘থাম, শালা!’ জিপোর দম বন্ধ হয়ে এল আচমকা আঘাতে। বুকে হেঁটে আস্তে আস্তে ট্রাকের তলা তলা থেকে বেরিয়ে এল ব্লেক। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কোট ঝাড়তে লাগল।

ব্লেকের ছাই-রঙা মুখের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইল মরগ্যান।’ কী হয়েছে?’ জানতে চাইল সে।

এমন সময় পাগলের মতো চেঁচাতে-চেঁচাতে ট্রাকের নীচ থেকে পড়িমড়ি করে বেরিয়ে এল জিপো। সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়েই ট্রাকের গায়ে লেগে ওর জামাটা আড়াআড়িভাবে অনেকটা ফেঁসে গেল। জিপোর মুখে রক্তশূন্যতার রাজত্ব, আঠালো রক্তের ফোঁটাগুলো হাতের ঘষা লেগে ওর গালে গলায় বিশ্রীভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

‘ও-ও বেঁচে আছে!’ কোনওরকমে উচ্চারণ করল সে। গলা দিয়ে যেন স্বরই বেরোতে চায় না, ‘আমি স্পষ্ট শুনেছি! ও নড়ছে ট্রাকের ভেতরে!’

মরগ্যানের মুখভাব কঠিন হল!

‘তাহলেও টমাস এখন আর ট্রান্সমিটার ব্যবহার করতে পারছে না, তালাও বিকল করতে পারছে না। কারণ আমার মনে হয়, ওই তালা বা ট্রান্সমিটার চালু করার বোতামগুলো ট্রাকের ব্যাটারিতেই চলে। আপাতত ব্যাটারিই যখন অকেজো, তখন আর ভয় কী? যাকগে, এসো জিপো, এই ইস্পাতের চাদরটা এবার ভাঙা যাক। তা না হলে টমাসকে শেষ করা যাবে না!’

‘না, না-আমি নয়!’ শিউরে উঠে পিছিয়ে গেল জিপো, ‘টমাসের কাছে রিভলভার আছে; আছে না? ইস্পাতের ঢাকনা ভাঙলেই ও আমাকে গুলি করবে!’

মরগ্যান দোনামনা হয়ে কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল। জানলা দিয়ে আবার বাইরে চোখ রাখল সে। প্রধান সড়ক ও মাঝারি রাস্তার চৌমাথায় এসে পৌঁছেছে ওদের গাড়ি। কিটসন বুইকের গতি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে লাগল …একসময় একেবারে থেমে গেল। মরগ্যান দেখল, তাদের সামনে প্রধান সড়কের ওপর দ্রুতগামী গাড়ির আধিক্য। রাস্তা আর আগের মতো নির্জন নয়।

যদি টমাস এখন রিভলভার চালিয়ে একটা হট্টগোলের সৃষ্টি করে, তাহলে রাস্তার লোকে নির্ঘাত সেই শব্দ শুনতে পাবে—এবং ওরা বিপদে পড়বে।

না, এ সমস্যার উত্তর মরগ্যানের জানা নেই।

ব্লেক বলল, ‘কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা যাক, ফ্র্যাঙ্ক। এই বড় রাস্তায় সব সময়েই পুলিশ টহল মারে। যদি গুলির শব্দ হয়, তাহলে ওরা শুনতে পাবে…’

‘হ্যাঁ—অপেক্ষা করতে হবে।’

জিপো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ক্যারাভ্যানের মেঝেতে উবু হয়ে বসল। ওর স্নায়ুর কাঁপুনি তখনও পুরোপুরি থামেনি। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখের রক্ত মুছল সে। ঘেন্নায় তার গা-গুলিয়ে উঠেছে।

মরগ্যান এগিয়ে গেল ট্রাকের সামনের দিকে। ইস্পাত আবরণীর ওপর কান চেপে ধরে শুনতে চাইল শব্দ। কিন্তু কিছুই কানে এল না। কয়েক মুহূর্ত একইভাবে একাগ্র ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল মরগ্যান, তারপর তাকাল ব্লেকের দিকে।

‘উঁহু—কিছুই তো শুনতে পাচ্ছি না?’ তোমরা কী ঠিক শুনেছ?

‘হ্যাঁ—টমাসের নড়াচড়ার শব্দও পরিষ্কার শুনেছি।’

‘জিপো!’ ঘুরে দাঁড়াল মরগ্যান, ‘শুধু শুধু বসে থেকো না। উঠে একটু ট্রাকের তালাটা নেড়েচেড়ে দেখো। যত তাড়াতাড়ি তুমি কাজ শুরু করবে, তত তাড়াতাড়িই টাকাটা আমাদের হাতে আসবে।’

জিপো উঠে দাঁড়াল; মরগ্যানের পাশ কাটিয়ে এগোল ট্রাকের পিছন দিক লক্ষ করে।

বুইক ততক্ষণে আবার চলতে শুরু করেছে। পরদা সরিয়ে মরগ্যান দেখল অন্যান্য দ্রুতগামী গাড়িগুলো একের পর এক তাদের বুইক ও ক্যারাভ্যানকে অতিক্রম করে এগিয়ে চলেছে। কিটসন গাড়ির গতি ঘণ্টায় তিরিশ মাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে দেখে মরগ্যান স্বস্তি অনুভব করল। সমতল পিচ ঢালা রাস্তা ধরে মসৃণ গতিতে বুইক ও ক্যারাভ্যান নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছে।

ট্রাকের পিছনটা পরীক্ষা করেই জিপো হতাশ হয়ে পড়ল। সে যা ভেবেছিল ঠিক তাই : ট্রাকের তালা খোলা যার তার কর্ম নয়। পিছনের দরজাটা এত নিখুঁতভাবে আঁটা যে কারও পক্ষে সেটাকে চাড় দিয়ে ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়। দরজার ঠিক কেন্দ্রস্থলে একটা গোলাকার চাকতি—সাধারণ সিন্দুকে যে ধরনের চাকতি থাকে অনেকটা সেইরকম। চাকতির পাশেই একটা ছোট্ট জানলা—গুলি প্রতিরোধকারী কাচে ঢাকা। সেখানে চোখ রাখতেই একটা সংখ্যা জিপোর নজরে পড়ল। সে জানে—বাইরে চাকতি ঘোরালেই ওই সংখ্যার পরিবর্তন ঘটবে—আসবে নতুন সংখ্যা। দরজা খুলতে গেলে কম্বিনেশন সংখ্যাটা তার জানা দরকার;—অর্থাৎ সেটা জানতে গেলে অনিবার্যভাবে প্রয়োজন হবে সুদক্ষ,নিশ্চিত, অচঞ্চল হাতের কাজ—এবং সেই সঙ্গে একাগ্র, ঘনীভূত শ্রবণ ক্ষমতার।

‘কী রকম মনে হচ্ছে?’ ট্রাকের পিছন দিকে এগিয়ে এল মরগ্যান। জিপোর পাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল।

‘তালাটা যে মজবুত তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ঠিক ঠিক কম্বিনেশন বের করতে গেলে প্রচুর সময় দরকার।’

‘দরজা ভাঙার কোনও পথ আছে?’

‘উঁহু—তা সম্ভব নয়। দেখেছ, কী জিনিস দিয়ে তৈরি? অত সহজে এ জিনিস ভাঙার নয়। হয়তো প্রচুর সময় পেলে দরজা কেটে খোলা সম্ভব।’

‘তুমি বরং কম্বিনেশন নম্বরটা চেষ্টা করে দেখো—যদি বের করতে পার। ক্যারাভ্যানের ছাউনিতে পৌঁছতে এখনও কম করে চল্লিশ মিনিট লাগবে; শুধু শুধু এ সময়টা বসে বসে নষ্ট করবে কেন? এখন থেকেই কাজ শুরু করে দাও।’

জিপো অবাক চোখে মরগ্যানের দিকে চেয়ে রইল—যেন মরগ্যানের মস্তিষ্কের সুস্থতা সম্পর্কে সে সন্দিহান।

‘এখন? এখন কী করে হবে? এই গোলমাল, গাড়ির দোলানির মধ্যে কাজ করা সম্ভব নয়।’ জিপোর স্বরে আকুতি ঝরে পড়ল! মরগ্যানকে ব্যাপারটা বোঝাতে চাইল সে, ‘তুমি বুঝতে পারছ না, ফ্র্যাঙ্ক চাকতি ঘোরানোর সময় আমাকে একমনে কান খাড়া করে শুনতে হবে। কিন্তু এই গাড়ি ঘোড়ার গোলমালের মধ্যে তা কি সম্ভব—তুমিই বলো?’

মরগ্যান হাতের একটা অধৈর্য ভঙ্গি করে কী একটা বলতে যাচ্ছিল—নিজেকে সামলে নিল। তার বুকের যন্ত্রণাটা ক্রমশই বাড়ছে, সেই সঙ্গে আরও বেশি চিন্তিত হয়ে পড়ছে মরগ্যান। সে জানে, এখন জিপোকে চাপ দিলে সর্বনাশের আর কিছু বাকি থাকবে না। তাই জিপোর ভাবনাকে মন থেকে সরিয়ে দিয়ে সে ভাবতে লাগল আহত টমাসের কথা—সত্যিই কি লোকটা বেঁচে আছে? নাঃ… একের পর এক দুর্ঘটনা পরিস্থিতিকে ক্রমশ জটিল করে তুলছে। আস্তে আস্তে বসে পড়ল মরগ্যান। বলা যায় না, কাজটাকে সে প্রথমে যতটা কঠিন মনে করেছিল, হয়তো কার্যক্ষেত্রে দেখা যাবে কাজটা তার চেয়েও বেশি জটিল।

আচমকা উন্মাদের মতো ইস্পাতের প্রাচীরে ঘুষি মেরে চলল মরগ্যান, চেঁচিয়ে উঠল অসহায়ভাবে, ‘এর মধ্যে রয়েছে দশ লক্ষ ডলার! ভেবে দেখো একবার! ঠিক এই দেওয়ালের ও পিঠেই আছে কুবেরের সম্পদ! দশ লাখ ডলার! যে করে হোক টাকাটা আমরা নেবই! তার জন্যে জাহান্নমে যেতেও আমি প্রস্তুত!’

ওদিকে কিটসন তখন বুইককে নির্দেশিত আঁকাবাঁকা পথ ধরে ছুটিয়ে নিয়ে চলেছে, অন্যান্য গাড়ির গতিপথ বাঁচিয়ে অত্যন্ত সতর্কভাবে সে গাড়ি চালাচ্ছে—জিনির দিকে নজর দেওয়ার সময় তার ছিল না : কিন্তু প্রধান সড়কে পৌঁছেই সে দেখল, তার সামনে নির্জন রাস্তা। স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়ির গতিপথ ঠিক করে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

জিনি সিটের গায়ে গা-এলিয়ে বসে ছিল। ওর চোখের দৃষ্টি বাইরে রাস্তার দিকে। ওদের অতিক্রম করে ছুটে চলা দ্রুতগামী গাড়িগুলোকে ও আনমনা হয়েই লক্ষ করছিল। মুখের বিবর্ণতা এখনও পুরোপুরি কাটেনি; শরীরের কাঁপুনিকে গোপন করলেও হাত দুটোকে আড়াল করেছে হাঁটুর ফাঁকে।

কিটসন ভাবছিল ট্রাকের ভেতরে পড়ে থাকা লোকটার কথা। ট্রাকের প্রতিরোধ ভেঙে ওই লোকটার দেহকে টেনে হিঁচড়ে বার করবার কথা মনে পড়তেই সে শিউরে উঠল। একটা মিশ্র অনুভূতির ঢেউ খেলে গেল তার শরীরে। কিন্তু লোকটা কি বেতারে সাহায্য চেয়ে সংকেত পাঠিয়েছে?… হয়তো ওরা এখন সরাসরি এগিয়ে চলেছে পুলিশের পাতা-ফাঁদে ধরা দিতে!

‘টমাস যদি ইতিমধ্যে বেতারে খবর পাঠিয়ে থাকে, তাহলে’—মনের দুশ্চিন্তাকে মুখে প্রকাশ করতে পেরে অনেকটা হালকা বোধ করল কিটসন,—‘তাহলে হয়তো আমরা পুলিশের জালে ধরা দিতেই চলেছি।’

জিনি কাঁধ ঝাঁকাল। ঠোঁট উলটে জবাব দিল, ‘কিন্তু আমাদের কী করবার আছে বলো?’

‘কিছুই নেই।’ সহজভাবে কথাটা বললেও একটা অস্বস্তির কাঁটা কিটসনের মনে খচখচ করতে লাগল, ‘যাকগে, ক্যারাভ্যানে চড়তে হয়নি দেখে আমি খুব খুশি হয়েছি। নইলে গাড়ি চড়ার মজাটা টের পেতাম! ওর ভেতরে ওদের নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হচ্ছে।’

‘শুনতে পাচ্ছ?’ আচমকা তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠল জিনি।

কিটসনের হৃৎপিণ্ড আচমকা এক ডিগবাজি খেয়ে আছড়ে পড়ল—-কাঁপতে লাগল থরথর করে! না, শব্দটা ও স্পষ্টই শুনতে পেয়েছে—দ্রুতবেগে ধেয়ে আসা পুলিশের সাইরেনের কান-ফাটানো আর্তনাদ ওদের দিকেই আসছে।

সমস্ত গাড়িই তাদের গতিপথ পরিবর্তন করে ধীরগামী যানবাহনের জন্যে নির্দিষ্ট পথের দিকে এগিয়ে চলল। রাস্তা পরিষ্কার হয়ে গেল পলক ফেলতেই ।

সাইরেনের একটানা আর্তনাদ এবার আরও জোরে শোনা গেল। তারপরেই কিটসনের চোখে পড়ল দ্রুতবেগে এগিয়ে আসা পুলিশের গাড়িটার ওপর। তার পিছন পিছন সার বেঁধে ছুটে আসছে চার-চারটে মোটর বাইক চড়া দ্রুতগামী পুলিশ, এবং তাদের পিছনে আরও দুটো পুলিশের গাড়ি। ঘণ্টায় আশি মাইলেরও বেশি বেগে গাড়িগুলো তাদের অতিক্রম করে ছুটে গেল মাঝারি সড়কের দিকে।

জিনি ও কিটসন, পরস্পরের দৃষ্টি বিনিময় করল।

ভাঙা গলায় বলল কিটসন, ‘একটুর জন্যে আমরা ওই রাস্তাটা পার হয়ে এসেছি। আর সামান্য দেরি করলেই পুলিশের ঝামেলায় পড়তে হতো।’

জিনি ঘাড় নেড়ে তার বক্তব্যকে সমর্থন করল।

ওরা এগিয়ে চলল। আরও মাইলখানেক যাওয়ার পর ওরা হঠাৎই লক্ষ করল, ওদের সামনের গাড়িগুলো ক্রমশ গতিবেগ কমিয়ে আনছে। আরও দূরে নজর চালাতেই ওরা দেখল গাড়ির এক লম্বা সারি ধীরে ধীরে নিজেদের গতি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে।

‘সামনের রাস্তা বন্ধ। নিশ্চয়ই পুলিশ রাস্তা আটকেছে।’ কিটসন অনুভব করল হৃৎপিণ্ডের অশান্ত, উত্তেজিত স্পন্দন, ‘তাহলে সর্বনাশের আর কিছু বাকি নেই দেখছি!’

‘চুপচাপ বসো; এখন সাহস হারালে চলবে না।’ জিনি ভরসা দিল তাকে। ওদের বুইকের সামনে গাড়িগুলো আস্তে আস্তে একেবারে থেমে গেল।

বহু সময় অপেক্ষা করার পর গাড়িগুলো আবার চলতে শুরু করল। ঘর্মাক্ত হাতে স্টিয়ারিং চেপে ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল কিটসন। দূরে রাস্তার অবরোধটা সে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে।

রাস্তার ওপর আড়াআড়িভাবে দু-দুটো পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের ফাঁক দিয়ে ঠিক একটি একটি করে গাড়ি শম্বুকগতিতে এগিয়ে চলেছে। গাড়ি দুটোর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে রয়েছে ছজন পুলিশ অফিসার। প্রতিটি গাড়ি থামতেই ওদের মধ্যে একজন অফিসার ঝুঁকে পড়ছে গাড়ির ভেতর, চালকের সঙ্গে দু-একটা কথা বলেই তাকে এগোতে নির্দেশ করছে।

‘সবকিছু আমার ওপর ছেড়ে দাও আমিই ওদের সঙ্গে কথা বলব।’ জিনি বলল।

ওর সাহস দেখে অবাক হয়ে কিটসন ফিরে তাকাল জিনির দিকে। ক্যারাভ্যানের ভেতর ওরা তিনজন কী ভাবছে, সেটা আন্দাজ করতে চেষ্টা করল সে। কারণ ওরা এই রাস্তা অবরোধের ব্যাপারটা দেখতেই পাবে না। সুতরাং বুইকের এই শম্বুকগতির কারণ অনুমান করতে গিয়ে ওরা বার বার ব্যর্থ হবে, সেই সঙ্গে হয়ে পড়বে সংশয়াচ্ছন্ন। ক্যারাভ্যানের ভেতরে তাকে যেতে হয়নি দেখে আরও একবার স্বস্তি পেল কিটসন। মনে মনে প্রার্থনা করল, ক্যারাভ্যানের ভেতরে ওরা যেন কোনওরকম গোলমাল বাঁধিয়ে না বসে।

দশ মিনিট ব্যাপী স্নায়ু ছেঁড়া উৎকণ্ঠার পর ওরা এসে পৌঁছল অবরোধের সামনে। নির্বিকার মুখে, নিছক উদ্দেশ্যমূলকভাবে স্কার্টটাকে হাঁটুর ওপরে তুলে ধরল জিনি। পায়ের ওপর পা-তুলে বসে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল।

কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারটি এগিয়ে এল জিনির দিকে। প্রথমে ওর মুখে … তারপর ওর নগ্ন হাঁটুর দিকে চোখ রাখল সে। তার রোদে-পোড়া তামাটে মুখে ফুটে উঠল প্রশংসার হাসি। কিটসনের দিকে সে তাকাবারই প্রয়োজন মনে করল না।

‘কোত্থেকে আসছেন আপনারা জানতে পারি?’ বুইকের গায়ে হেলান দিয়ে, সশ্রদ্ধ দৃষ্টিতে জিনির দিকে চেয়ে প্রশ্ন করল সে।

‘ডুকাস থেকে।’ বলল জিনি, ‘আমরা হানিমুন কাটাতে বেরিয়েছি। তা ব্যাপার কী, অফিসার? এত হই চই কিসের জন্যে?’

‘আপনারা কি ওয়েলিং কোম্পানির একটা ট্রাককে রাস্তায় দেখেছেন?’প্রশ্ন করল অফিসার, ‘ট্রাকটাকে দেখলে ভোলার কথা নয়; কারণ ওটার গায়ে বড় বড় হরফে ওয়েলিং কোম্পানির নাম লেখা আছে।’

‘কই, না তো! কোনও ট্রাকই আমাদের চোখে পড়েনি, তাই না আলেক্স?’ কিটসনের দিকে ফিরে সমর্থন খুঁজল জিনি।

কিটসন মাথা নাড়ল। তার হৃৎপিণ্ডের আছাড়ি-পিছাড়ি এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছল যে সে শব্দ অফিসারের কানে যাওয়ার আশঙ্কায় কিটসন নির্বাক হয়ে পড়ল।

‘কেন, আপনারা ট্রাকটা হারিয়ে ফেলেছেন বুঝি?’ হাস্য-তরল কণ্ঠে জানতে চাইল জিনি। বিনা কারণেই খুশি খুশি হয়ে হেসে উঠল।

জিনির হাঁটু থেকে চোখ না সরিয়েই অফিসারটি হাসল।

‘যাকগে, ছেড়ে দিন ওসব কথা। এবার আপনারা যেতে পারেন। আপনাদের হানিমুন শুভ হোক।’ কিটসনের দিকে চেয়ে চোখ টিপল অফিসার, ‘শুভ হওয়া সম্পর্কে আমার অন্তত কোনও সন্দেহই নেই, মশায়—জানি না আপনার আছে কি না! আচ্ছা, এবার তাহলে এগোন।’

গাড়ি নিয়ে সামনে এগোল কিটসন। একটু পরেই ওরা পুলিশের অবরোধ পার হয়ে ফাঁকা রাস্তায় এসে পড়ল।

‘ওফ্,খুব জোর বেঁচে গেছি!’ হাঁফ ছাড়ল কিটসন। শক্ত মুঠোয় সে আঁকড়ে ধরল বুইকের স্টিয়ারিং, লোকটাকে তুমি দারুণ ঘোল খাইয়েছ, জিনি।’

স্কার্ট ঠিক করে হাঁটু ঢাকল জিনি, অধৈর্যভাবে কাঁধ ঝাঁকাল।’ এসব লোককে বোকা বানানো খুব সহজ। দেখবার মতো কিছু একটা পেলেই হল; কাজ-টাজ ভুলে শুধু সেদিকে চেয়ে থাকবে।’ কথা বলতে বলতে হাতব্যাগ খুলে এক প্যাকেট সিগারেট বের করল ও। কিটসনের দিকে ফিরে প্রশ্ন করল, ‘চলবে নাকি?’

‘দাও একটা।’

‘ঠোঁট চেপে সিগারেট ধরাল জিনি। তারপর সেটা তুলে দিল কিটসনের ঠোঁটে। সিগারেটের শেষ প্রান্তে জিনির লিপস্টিকের হালকা আস্তরণ কিটসনের চোখে পড়ল। এ সিগারেটে জিনির নরম ঠোঁটের ছোঁয়া আছে জেনে সে এক অদ্ভুত সুখ অনুভব করল। আমেজ ভরে এক গভীর টান দিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছাড়ল।

নিজের জন্যে আর একটা সিগারেট ধরাল জিনি।

পরবর্তী দশ মাইল ওরা দুজনেই চুপচাপ। একসময় জিনিই নীরবতা ভাঙল, ‘সামনের চৌ-মাথায় ডানদিকে ঘুরবে। সেই রাস্তাটাই ফন হ্রদের রাস্তা।’

কিটসন মাথা হেলাল। সামনের রাস্তায় নজর রাখতেই আকাশের দিকে তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হল। সে দেখল, একটা হোভার প্লেন তাদের লক্ষ করে উড়ে আসছে। রাস্তা থেকে বড়জোর শ-তিনেক ফুট ওপর দিয়ে উড়ে আসছে প্লেনটা।

‘ওই দেখো!’

হাওয়ায় চড়া শিসের ঝাঁপটা তুলে হোভার প্লেনটা বুইক ও ক্যারাভ্যানের ঠিক ওপর দিয়েই বেরিয়ে গেল।

‘হুঁ, তাহলে দেখছি কাজ শুরু করতে খুব একটা দেরি করেনি!’ বলল জিনি। তারপর চোখ রাখল হাতঘড়ির দিকে। বারোটা বেজে দশ মিনিট। অথচ সেই পঁয়তাল্লিশ মিনিট জিনির কাছে ঠেকল পঁয়তাল্লিশ বছর?

ক্যারাভ্যানের ভেতরে মরগ্যান, জিপো ও ব্লেক—তিনজনেই শুনল হোভার প্লেনের বাতাস কেটে, শিস তুলে বেরিয়ে যাওয়ার শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে ভয়ার্ত জিপো হুমড়ি খেয়ে উপুড় হয়ে পড়ল মেঝেতে, ওর শরীর কুঁকড়ে গেল আতঙ্কে । শব্দ শোনামাত্রই সে বুঝেছে প্লেনটা তাদেরই খোঁজ করছে।

পুলিশি অবরোধের কাছে পৌঁছনোমাত্রই ওরা তিনজন উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েছিল মেঝেতে। মরগ্যান দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় বের করে এনেছিল ওর .৪৫। যদি কেউ ক্যারাভ্যানে ঢোকবার সামান্য চেষ্টাও করে, তবে তাকেই প্রথম মরতে হবে মরগ্যানের গুলিতে। বিনা যুদ্ধে ধরা দিতে সে রাজি নয়।

বুইক আবার যখন তার গতি ফিরে পেল, তখন ওরা তিনজনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। উৎকণ্ঠার পাষাণ ভার নেমে গেল ওদের বুক থেকে।

মরগ্যান কোট খুলে ক্ষতস্থানটা একবার দেখল। জিনির বেঁধে দেওয়া ব্যান্ডেজটা রক্তে-ভিজে লাল হয়ে উঠেছে; সেইসঙ্গে ক্ষতস্থান থেকে আবার রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে গেছে।

মরগ্যানের সুনজরে আসার দুশ্চিন্তায় ব্লেক প্রথম থেকেই উদ্বিগ্ন ছিল। এখন সুযোগ পেয়েই সে উঠে দাঁড়াল। জিপোকে ডিঙিয়ে এগিয়ে গেল ক্যারাভ্যানের তাকে রাখা ফার্স্ট এইড বক্সটার দিকে। বাক্সটা সর্বদা হাতের কাছে রাখার জন্যে শুরু থেকেই পীড়াপীড়ি করেছে মরগ্যান।

‘দাঁড়াও ফ্র্যাঙ্ক, আমি এখুনি ব্যান্ডেজটা ঠিক করে দিচ্ছি।’ বাক্সটা খুলতে খুলতে ব্যস্ত-স্বরে ব্লেক বলল।

মরগ্যানের মাথা তখন ঝিমঝিম করছে। একটা নিকষ-কালো পরদা যেন ঘিরে ফেলতে চাইছে তার চেতনাকে। রক্তপাতের পরিমাণ দেখে মনে মনে শঙ্কিত হয়ে পড়েছে মরগ্যান। ব্লেকের কথায় কোনওরকমে মাথা হেলাল। তারপর ক্যারাভ্যানের দেওয়ালে হেলান দিয়ে আরও আয়েশ করে বসতে চেষ্টা করল।

জিপো অস্বস্তি ও আশঙ্কা ভরা চোখে দেখতে লাগল মরগ্যানকে। ভাবল : ফ্র্যাঙ্ক যদি এই অবস্থায় মারা যায়, তাহলে আমরা কী করব? যে কোনও জটিল পরিস্থিতিতেই মাথা ঠান্ডা রেখে সমাধান খুঁজে বের করার ব্যাপারে ওর জুড়ি নেই। সুতরাং ফ্র্যাঙ্ক মারা গেলে আমরা গিয়ে পড়ব অথৈ জলে।

মরগ্যানের সামনে ঝুঁকে বসে চিকিৎসার কাজ শুরু করল ব্লেক। মিনিট কয়েক পরে নতুন একটা ব্যান্ডেজ বেঁধে রক্ত বন্ধ করতে সক্ষম হল সে।

‘এবার সব ঠিক হয়ে যাবে।’ হাতের উলটো পিঠ দিয়ে মুখ মুছল ব্লেক, ‘এক গেলাস চলবে নাকি?’

‘চলুক, ক্ষতি কী?’ তিক্তস্বরে বলে উঠল মরগ্যান, ‘এখন তো মজা লোটবার সময়। অতএব খোলো বোতল…!’

তিনটে গেলাসে বেশ খানিকটা করে নির্জলা হুইস্কি ঢেলে জিপো ও মরগ্যানের দুটো এগিয়ে দিল ব্লেক।

যার-যার গেলাসে সবেমাত্র চুমুক দিয়েছে, এমন সময় হঠাৎই ওরা অনুভব করল ওদের বুইক বড় রাস্তা ছেড়ে আচমকা বাঁক নিল। পরমুহূর্তেই অসমতল রাস্তার প্রতিক্রিয়ায় ক্যারাভ্যানটা প্রচণ্ডভাবে ঝাঁকুনি খেয়ে লাফাতে লাফাতে এগিয়ে চলল।

ওরা তিনজন চটপট নিজেদের গেলাস শেষ করে ফেলল। মরগ্যান দাঁতে দাঁত চেপে ক্যারাভ্যানের অনিশ্চিত দোলনি ও বুকের জমাট, তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা সহ্য করে চলল। ক্যারাভ্যানের সঙ্গে সঙ্গে একই ছন্দে দুলতে লাগল তার অসহায় দেহটা!

মিনিটখানেক পরে বুইকের গতি ক্রমশ কমে এল। একসময় একেবারে থেমে গেল গাড়িটা।

কিছুক্ষণ পর খুলে গেল ক্যারাভ্যানের পিছনের দরজা। খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে জিনি ও কিটসন।

‘কোনও রকম অসুবিধে হয়নি তো?’ চিন্তিত মুখে প্রশ্ন করল কিটসন। মরগ্যানের মুখের বিবর্ণ পাণ্ডুর প্রলেপ তার মনে জাগিয়ে তুলল দুশ্চিন্তার কালো মেঘ।

মরগ্যান কিটসনকে অতিক্রম করে চোখ রাখল বাইরের পরিবেশে। ওরা এখন রাস্তা ছেড়ে ঢুকে পড়েছে এক ফার বনের শীতল ছায়াঘন রাজত্বে। তিরিশ ফুট দূরে মৃত অজগরের আঁকাবাঁকা শরীর নিয়ে শুয়ে আছে নির্জন রাস্তাটা। পাহাড়কে পাকে-পাকে জড়িয়ে রাস্তাটা সোজা চলে গেছে ফন হ্রদের দিকে। এখান থেকে ফন হ্রদের দূরত্ব খুব বেশি হলে ছ-মাইল।

মাথার ওপর শোনা যাচ্ছে কোনও উড়োজাহাজের বিরক্তিকর গর্জন। এখানে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করলে যে বিপদের সম্ভাবনা আছে, সেটা ওই শব্দ শুনেই বুঝতে পারল মরগ্যান।

‘টমাস এখনও বেঁচে আছে!’ ট্রাকের দিকে লক্ষ্য করে আঙুল ঝাঁকাল মরগ্যান, ‘ওকে যে করে হোক একেবারে শেষ করতে হবে।’ কিটসন মনে মনে টমাসের অবস্থাটা কল্পনা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হল, ‘এই জায়গাটা বেশ নির্জন-সুতরাং টমাসকে খতম করার পক্ষে উপযুক্ত পরিবেশ।’ হিংস্র ব্যঙ্গে বিকৃত হল মরগ্যানের মুখ, ‘ক্যারাভ্যান বন্ধ করে তোমরা সরে পড়ো। তুমি বরং বুইকের একটা চাকা খুলে এমন ভান করো, যেন লোকে মনে করে তোমাদের গাড়ির চাকা ফেঁসে গেছে। যদি কোনও গাড়ি-টাড়ি আসতে দেখো, ক্যারাভ্যানের গায়ে টোকা মেরে আমাদের সাবধান করে দেবে। জিনি,তুমি রাস্তার ধারে গিয়ে বোসো। সঙ্গে খাবারের বাক্সটা নিয়ে যাও। ওখানে গিয়ে এমন ভাব করবে, যেন তুমি পিকনিকে এসেছ, সময় হওয়াতে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করছ তোমাদের দুজনের জন্যে। যাও, চটপট কাজে লেগে পড়ো।’

নির্বিকার মুখে খাবারের বাক্সটা জিনির হাতে তুলে দিল ব্লেক।

কিটসন এতক্ষণে যেন প্রতিবাদ করার শক্তি ফিরে পেল, ‘টমাসকে নিয়ে কী করবে তোমরা? খুন করবে ওকে?’

মরগ্যানের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল নিষ্ঠুর বাঁকা হাসি।

‘নয়তো কি জামাই আদর করব? ক্যারাভ্যান বন্ধ করে যা বলছি তাই করো।’

‘থামো!’ তীক্ষ্ণ কর্কশ স্বরে চিৎকার করে উঠল জিপো, ‘আমি এখান থেকে চলে যাচ্ছি। টমাসকে খুন করার মধ্যে আমি নেই। আমার কাজ ট্রাকের তালা খোলা—তাই খুলব, ব্যস! অন্য কিছুর মধ্যে আমি নাক গলাতে রাজি নই…’

‘চুপ করো!’ খিঁচিয়ে উঠল মরগ্যান। .৪৫ পলকে উঠে এল তার হাতে, শাসাতে লাগল ভয়ার্ত জিপোকে, ‘ইস্পাতের চাদরটা তোমাকেই খুলতে হবে, জিপো! ভালো চাও তো-যা বলছি তাই করো! নইলে তোমার ওই ভুঁড়িকে সীসে দিয়ে ঝাঁঝরা করে দেব।’

মরগ্যানের মুখের নৃশংস কুটিল অভিব্যক্তি জিপোর ফুসফুসে যেন বরফ ছড়িয়ে দিল। দু-হাত সামনে ছড়িয়ে ককিয়ে উঠল জিপো, ‘আমাকে ছেড়ে দাও, ফ্র্যাঙ্ক। আমাকে এখান থেকে বেরোতে দাও।’

মরগ্যান ফিরে তাকাল কিটসনের দিকে, ‘আমার কথা তোমার কানে যায়নি? ক্যারাভ্যান বন্ধ করে বুইকের চাকা খুলতে শুরু করো!’

কিটসন ক্যারাভ্যানের দরজা বন্ধ করে ফিরে চলল। মানসিক উত্তেজনা ওর স্নায়ুমণ্ডলীকে অস্থির করে তুলছে, মুখের রং-কাগজের মতো সাদা। বুইকের পিছনের ঢাকনা তুলে ও একটা স্ক্রু-জ্যাক বের করে আনল। আসন্ন নৃশংস অধ্যায়ের কথা ভেবে শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল। কিটসন জ্যাক নিয়ে এগিয়ে গেল বুইকের সামনের চাকার দিকে। জ্যাক ঘুরিয়ে গাড়িটাকে মাটি থেকে তুলতে লাগল সে…

মরগ্যান নির্লিপ্ত শীতল স্বরে তখন জিপোকে সাবধান করে দিচ্ছে, ‘শোনো জিপো, এখন থেকে তুমি তোমার টাকার অংশ উপার্জন করার চেষ্টা করো! এ পর্যন্ত তো শুধু হাওয়ায় গা-লাগিয়ে ঘুরেছ। কিন্তু এখন আর ওটি হচ্ছে না। সুতরাং এবার কঠিন কাজের জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করে নাও। ইস্পাতের এই হতচ্ছাড়া ঢাকনাটা তোমাকে খুলতেই হবে!’

সশব্দে নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে জিপো এগিয়ে এল ইস্পাত আবরণীর কাছে। একদৃষ্টে চেয়ে রইল ওটার দিকে।

ব্লেক চুপচাপ দাঁড়িয়ে জিপোকে লক্ষ করতে লাগল। একবার সে দেখছে জিপোর দিকে, আবার মরগ্যানের দিকে…আবার জিপোর দিকে। চোখের ভাষায় অস্বস্তির ইঙ্গিত।

জিপো দেখল, ইস্পাতের চাদরটা তেমন মজবুত নয়; ট্রাকের দরজার মতো এটার পিছনে তেমন যত্ন নেয়নি ওয়েলিং এজেন্সি।

দু-পলক দেখে মরগ্যানও সেটা বুঝতে পারল।

‘যাও, ছোট শাবল আর হাতুড়িটা নিয়ে এসো! এটাকে ভেঙে ফেলতে বেশি সময় লাগবে না।’

জিপোর সারা শরীর কুঁকড়ে গেল। ইস্পাতের ঢাকনা ভাঙার পরের মুহূর্তটার কথা মনে পড়ল ওর। কর্কশ স্বরে সে বলে উঠল, ‘টমাস ভেতরে বসে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবে। আমাকে দেখামাত্রই ও সরাসরি গুলি করবে, এক সেকেন্ডও দেরি করবে না।’

মরগ্যান খেঁকিয়ে উঠে জবাব দিল, ‘যা বলছি, চটপট করো!’

যন্ত্রপাতি রাখার বাক্স খুলে হাতুড়ি নিল জিপো। তারপর থেকে একটা ছোট শাবল নিয়ে এগিয়ে এল। ওর হাত এত বিশ্রীভাবে কাঁপছে, মনে হচ্ছে এখুনি বোধ হয় শাবল আর হাতুড়িটা ওর হাত থেকে খসে পড়বে।

‘শিগগির করো! জলদি!’ অধৈর্য স্বরে চেঁচিয়ে উঠল মরগ্যান, ‘এত ভয় পাওয়ার কী আছে তা-তো বুঝতে পারছি না!’

‘টমাস যদি আমাকে গুলি করে তাহলে ট্রাক খুলবে কে?’ উত্তেজনায় হাঁপাতে লাগল জিপো; অস্ত্র হিসেবে মরগ্যানের নাকের ডগায় ছুড়ে মারল ওর তুরুপের তাস। কাজ হল।

ক্রোধে, বিরক্তিতে গভীর নিঃশ্বাস নিল মরগ্যান, ‘দাও, ও দুটো আমার হাতেই দাও!…শালা, ভিতুর ডিম ‘হিংস্রভাবে দাঁত বের করল সে, ‘দাঁড়াও, তোমাকে আর তোমার ওই নদের চাঁদ ইয়ারকে আমি শায়েস্তা করছি। তোমরা দুজন যদি মনে করে থাক,পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকলেই দু-লাখ ডলার করে পাওয়া যাবে, তবে ভীষণ ভুল করবে!’

সেই মুহূর্তে যদি জিপোকে এই ভয়াবহ পরিবেশ থেকে মুক্তি দিয়ে পৌঁছে দেওয়া হত ওর শান্ত নির্জন কারখানায়, তাহলে খুশি মনেই ও নিজের টাকার অংশ ছেড়ে দিয়ে ফিরে যেত ওর অভাব-অনটনের সংসারে—সুখের সংসারে।

হাতুড়ি আর শাবলটা জিপোর হাত থেকে হ্যাঁচকা মেরে কেড়ে নিল মরগ্যান। শাবলটাকে ইস্পাতের ঢাকনা ও জানলার জোড়ের মুখে ঠেকিয়ে হাতুড়ি দিয়ে সজোরে আঘাত করল। শাবলটা ইস্পাতের চাদরকে সামান্য ঠেলে ঢুকে গেল ভেতরে। ক্রমাগত হাতুড়ির ঘা-মেরে শাবলটা যখন ভেতরে ইঞ্চি ছয়েক ঢুকে গেল, তখন থামল মরগ্যান। হাতুড়ি ফেলে ব্লেকের দিকে ঘুরে তাকাল।

‘জিপোর মতো তুমিও কি ভয়ে কেলিয়ে পড়লে?’

কাঁধের খাপ থেকে .৩৮ রিভলভারটা হাতে নিয়ে মরগ্যানের কাছে সরে এল ব্লেক, ‘তুমি রেডি হলেই আমি রেডি।’ নির্বিকার কঠিন মুখে জবাব দিল সে। চোখজোড়ায় দৃঢ় সিদ্ধান্তের সুনিশ্চিত আভাস।

মরগ্যান দাঁত বের করে বাঁকাভাবে হাসল, ‘কী ব্যাপার, তুমি কি এখন নিজের দু-লাখ ডলারকে বাঁচাতে চাইছ?’

‘বাজে কথা ছাড়ো, ফ্র্যাঙ্ক; কাজ শুরু করো। টমাসের মোকাবিলা করার জন্যে আমি রেডি।’

মরগ্যান শাবলের প্রান্তে সবলে চাপ দিতে যাবে, ভেসে এল পরপর তিন বার ক্যারাভ্যানের গায়ে টোকা দেওয়ায় শব্দ। মুহূর্তে মরগ্যান যেন জমে পাথর হয়ে গেল।

‘সাবধান! কেউ আসছে!’ চাপা স্বরে বলে উঠল সে।

জানলার কাছে সরে গিয়ে পরদা সরিয়ে উঁকি মারল ব্লেক।

জিনি ঠিক রাস্তার ধারেই গুছিয়ে বসেছিল; ওর কাছ থেকে গজ কয়েক দূরেই এসে দাঁড়িয়েছে একটা গাড়ি, তার পিছনে একটা ক্যারাভ্যান। সম্ভবত, তাদের মতোই আরও কেউ ক্যারাভ্যান নিয়ে চলেছে ফন হ্রদের দিকে।

একজন রোদে-পোড়া লালমুখো মধ্যবয়স্ক লোক খুশি খুশি মুখে নেমে এল গাড়ি থেকে। তার সঙ্গিনী একজন সুশ্রী মহিলা ও একটি বছর দশ-বারোর বাচ্চা ছেলে। ওরা গাড়িতে বসেই বুইক ও ক্যারাভ্যানকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে লক্ষ করতে লাগল। ব্লেকের কানে এল মধ্যবয়স্ক লোকটার হেঁড়ে গলা, ‘কী ব্যাপার? চাকা বিগড়েছে মনে হচ্ছে?’ জিনিকে লক্ষ করে বলল সে, ‘বলেন তো সাহায্য করি—’

জিনি তার দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসল, ‘না, না—তার কোনও দরকার। আমার স্বামী একাই পারবেন। ধন্যবাদ;’

‘আপনারা কী ফন হ্রদের দিকেই যাচ্ছেন?’ জানতে চাইল লোকটা!

‘হ্যাঁ।’

‘আমরাও সেখানেই যাচ্ছি; গত গ্রীষ্মের ছুটিতেও গিয়েছিলাম। আপনারা আর কোনওদিন ওখানে গেছেন নাকি?’

‘উহুঁ।’ মাথা নাড়ল জিনি।

‘দেখবেন, খুব ভালো লাগবে জায়গাটা। এক কথায় চমৎকার! তার ওপর সুব্যবস্থা তো আছেই! ওহ্ হো,আমার নামটাই আপনাকে বলা হয়নি—’ লজ্জায় জিভ কাটল লোকটা! যেন ভীষণ একটা অপরাধ করে ফেলেছে, ‘আমার নাম ফ্রেড ব্র্যাডফোর্ড। ওই যে গাড়িতে বসে আছে—আমার স্ত্রী—মিলি, আর ওঁর পাশেই আমার ছেলে। আপনাদের ছেলেমেয়েদের দেখছি না?’

ব্র্যাডফোর্ডের কথায় জিনি খোলা হাসিতে ফেটে পড়ল। ওর হাসির স্বাভাবিকতা ব্লেককেও অবাক করল। সত্যি, মেয়েটা অভিনয় জানে বটে!

জিনির হাসিতে ব্র্যাডফোর্ড অপ্রস্তুতে পড়তেই ও তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘না, এখনও পর্যন্ত নেই। আমরা হানিমুন কাটাতে ফন হ্রদে যাচ্ছি।’

এবার ব্র্যাডফোর্ডের হাসবার পালা। সে নিজের ঊরুতে এক প্রচণ্ড চাপড় কষিয়ে হো-হো করে হেসে উঠল। হাসির দমকে তার চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল।

‘ও—দারুণ দিয়েছেন! আরে শুনছ, মিলি! ওরা কোথায় হানিমুন কাটাতে যাচ্ছ, আর আমি বোকার মতো জিজ্ঞেস করছি ওদের ছেলেমেয়ে আছে কি না! হোঃ-হোঃ-হোঃ…।’

‘তোমার সব সময়েই ওই রকম।’ গাড়ি থেকে বলে উঠলেন মহিলাটি। স্বামীর নির্বুদ্ধিতায় তিনি যে যথেষ্ট বিরক্ত হয়েছেন, সেটা তার কোঁচকানো ভুরু দেখলেই বোঝা যায়, ‘চলে এসো, ফ্রেড—তুমি শুধু শুধু ওকে বিরক্ত করছ।’

ব্র্যাডফোর্ড সরলভাবে একগাল হাসল, ‘হ্যাঁ—ঠিক বলছ। আমার ও তাই মনে হয়…আচ্ছা, তাহলে চলি মিসেস…এই দেখুন কাণ্ড, আপনার নামটা তো একেবারেই জানা হয়নি!’

‘হ্যারিসন। আমার স্বামীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতে পারলাম না বলে দুঃখিত।’

তাতে কী হয়েছে। হয়তো ফন হ্রদে গিয়েই আমাদের আবার দেখা হবে, তখনই এই বকেয়া আলাপের পালাটা সেরে নেওয়া যাবে। আর নিতান্তই যদি দেখা না হয়, তাহলে আপনাদের শুভ মধুচন্দ্রিমা কামনা করি।’

‘ধন্যবাদ!’

ব্র্যাডফোর্ড পায়ে পায়ে গাড়িতে গিয়ে উঠে বসল। হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে দিল পাহাড়ি রাস্তা ধরে।

মরগ্যান ও ব্লেক অস্বস্তিভরা চোখে তাকাল পরস্পরের দিকে।

‘এখন যদি টমাস রিভলবার চালাতে শুরু করে তাহলে ওরা গুলির শব্দ শুনতে পাবে।’ ব্লেক চিন্তিতভাবে বলে উঠল।

‘পেলে পাক।’ মরিয়া হয়ে বলল মরগ্যান, ‘এই বনে কেউ শিকার করে না? ওরা ভাববে কোনও শিকারী শিকারের পিছনে ছুটছে।’ শাবলটা শক্ত হাতে চেপে ধরল সে, ‘এসো, কাজ শুরু করা যাক।’

এমন সময় জানলা দিয়ে ডেকে উঠল কিটসন, ‘কী ব্যাপার, কী ব্যাপার, কী হচ্ছে ভেতরে?’

মরগ্যান চাড় দিতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল, তুমি যেখানে আছ, সেখানেই থাকো। কাউকে এদিকে আসতে দেখলেই আমাদের সাবধান করে দেবে। আমরা আর দেরি করতে পারছি না!’

কিটসন শিউরে উঠে কয়েক পা-পিছিয়ে গেল। ওর সারা শরীর যেন হঠাৎ গুলিয়ে উঠল।

মরগ্যান ক্যারাভ্যানের জানলাগুলো বন্ধ করে দিল, ব্লেকের দিকে ফিরে ঘাড় নাড়ল, ‘এসো এড—তাহলে শুরু করা যাক।’

‘চলো।’

মরগ্যান শাবলটা ধরে নীচের দিকে এক হ্যাঁচকা মারতেই জিপো ভয়ে মুখ ঢাকল দু-হাতে।

ওয়েলিং এজেন্সির ট্রাক চালক ডেভ টমাস পড়ে ছিল ট্রাকের মেঝেতে। চৌচির, রক্তাক্ত চোয়ালের যন্ত্রণা এখন সমস্ত অনুভূতিকে অসাড় করে দিয়েছে। শুধু অপরাজিতের একরোখা সাহসকে সম্বল করে সে কোনওরকমে বেঁচে আছে।

মরগ্যানের রিভলভারের গুলি তার মুখের নিম্নাংশকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। যাওয়ার পথে টমাসের চোয়ালের হাড় চুরমার করে, জিভকে দু-ফালি করে সরাসরি বেরিয়ে গেছে গুলিটা।

এই আকস্মিক আঘাত ও যন্ত্রণার প্রতিক্রিয়া টমাসের মস্তিস্কের দীর্ঘ সময়ের জন্যে আচ্ছন্ন রেখেছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ আগেই তার জ্ঞান ফিরেছে। সঙ্গে সঙ্গেই টমাস অনুভব করেছে, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে সে ভীষণ দুর্বল পড়েছে।

চেতন ও অচেতন জগতের সীমারেখায় দাঁড়িয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ভাবতে চেষ্টা করল টমাস। চালকহীন ট্রাকটা কী করে ছুটে চলেছে, ভেবে সে অবাক হল।

আয়ু যে ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে, সেটা বুঝতে দেরি হল না তার। কারণ এইভাবে এক নাগাড়ে রক্তপাত হওয়ার পরে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা যে অত্যন্ত ক্ষীণ তা টমাস জানে। তবে মরতে সে ভয় পায় না। এখন যদি কোনও বিচিত্র মন্ত্রবলে সে বেঁচেও ওঠে, তবুও খুব একটা লাভ হবে বলে মনে হয় না৷ কারণ একটা ফাটা চৌচির চোয়াল নিয়ে ও আধখানা জিভ নিয়ে লোকসমাজে কী করে মুখ দেখাবে সে? তাছাড়া বোবা হয়ে বাকি জীবনটা কাটানোর যন্ত্রণা সে কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না৷

এবার টমাসের মনোযোগ আকৃষ্ট হল ট্রাকের এপাশ-ওপাশ টলমল দোলানির দিকে৷ কিছুক্ষণ চিন্তার পর সে সিদ্ধান্ত নিল, ট্রাকটাকে কোনও গাড়িতে চড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে৷ নাঃ, মতলবটা মন্দ নয়, কিন্তু এরা কি পারবে শেষ রক্ষা করতে? আপাতত তার কর্তব্য হল পুলিশকে সিগন্যাল পাঠানো, পুলিশকে জানানো ট্রাকের অবস্থিতির কথা৷ যেখানেই ওটা লুকোনো থাকুক না কেন, পুলিশ ঠিক খুঁজে বের করবেই৷

টমাসের মনে হল, বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে এখুনি তার কাজটা করা উচিত। কিন্তু বেতার যন্ত্রটা ঠিক তার পিছনে-ওপর দিকে। অর্থাৎ ওটার নাগাল পেতে হলে তাকে একপাশে হাত বাড়াতে হবে ওপরে।

এতক্ষণ চুপচাপ পড়ে থাকার ফলে যন্ত্রণার অনুভূতিটা ক্রমশ ফিকে হয়ে এসেছিল, কিন্তু পাশ ফেরামাত্রই আবার নতুন করে শুরু হবে অসহ্য যন্ত্রণা।

সুতরাং চোখ বুজে একইভাবে নিশ্চল হয়ে পড়ে রইল টমাস। ভাবতে লাগল নেকড়ের হিংস্রতায় ভরা মুখটার কথা, সাপ কালো, শীতল চোখ জোড়ার কথা—সেই লোকটার কথা, যে তাকে গুলি করেছে। লোকটার পরিচয় ভেবে অবাক হল টমাস। আর ওই মেয়েটা, যে স্পোর্টস কারটা চালাচ্ছিল সেও নিশ্চয়ই এর মধ্যে আছে। ওদের পুরো মতলবটা প্রশংসার দাবি রাখে। বিশেষ করে ওই দুর্ঘটনার দৃশ্যটা। কিন্তু তবুও ডার্কসন কোনওরকম ঝুঁকি নিতে চায়নি। ও সরাসরি বেতারে খবর দিয়েছিল এজেন্সিতে, জানতে চেয়েছিল তাদের কর্তব্য। তা না হলে এজেন্সি তাদের কর্মদক্ষতা ও বিচারবুদ্ধির ওপর সন্দিহান হয়ে পড়ত। মোটের ওপর, এজেন্সির নির্দেশ পেয়েই তারা ওই দুর্ঘটনার তদন্ত করতে এগিয়ে গিয়েছিল। অবশ্য তাতে পরিণতির খুব একটা অদল-বদল কিছু হয়নি।

কিন্তু ওই ফুলের মতো কচি মেয়েটা কী করে এই নৃশংস ভয়ঙ্কর কাজে জড়িয়ে পড়ল! তন্দ্রাচ্ছন্ন মস্তিষ্কে ভাবল টমাস।

মেয়েটার কথায় টমাসের মনে পড়ল ক্যারির কথা—তার তেরো বছরের ছোট্ট মেয়েটার কথা।

ক্যারির মাথার চুল অনেকটা ওই মেয়েটার মতোই, তামাটে। কিন্তু ওর মতো ক্যারি অতটা সুন্দরী নয়। অবশ্য ক্যারির বয়েস এখনও অনেক কম—বড় হলেও যে আরও সুন্দরী হবে না সেকথা জোর দিয়ে বলা যায় না। সেটা নেহাতই ভাগ্যের ব্যাপার।

ক্যারি তাকে খুব শ্রদ্ধা করে, বলে, ওর বাবার মতো সাহসী লোক আর নেই। নইলে দশ লক্ষ ডলার ভর্তি একটা ট্রাক চালিয়ে নিয়ে যাওয়া কি চাট্টিখানি কথা!

টমাস ভাবল : ক্যারি যদি আমাকে এই অবস্থায় এখানে পড়ে থাকতে দেখত; তাহলে আমাকে ঘিরে ওর কাচের আবরণে ঢাকা সমস্ত স্বপ্নই ভেঙে চুরমার হয়ে যেত। সামান্য একটু ব্যথার ভয়ে, আমি পাশ ফিরে বেতারে খবর পাঠাতে পারছি না দেখলে লজ্জায় ওর চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসত।

ট্রাকের টাকা রক্ষা করার জন্যে টমাস যদি জীবনও দিয়ে দেয়, তবুও ক্যারি এতটুকু দুঃখ পাবে না৷ বরং বন্ধুদের বলবে তার বাবা কিভাবে বীরের মতো প্রাণ দিয়েছে৷ না, ওর কাছে ছোট হতে টমাস পারবে না৷

এখন ট্রাক বাঁচাতে তার করণীয় কাজ দুটো: প্রথমত, বেতারে বিপদ সংকেত ছড়িয়ে দেওয়া৷ দ্বিতীয়ত, বোতাম টিপে সময়-নির্ভর তালাকে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্যে অকেজো করে দেওয়া৷

তালাকে অকেজো করার বোতামটা রয়েছে স্টিয়ারিং হুইলের ঠিক পাশে৷ ওটার নাগাল পেতে হলে টমাসকে উঠে বসে সামনে ঝুঁকে পড়তে হবে৷ কিন্তু সেই সামান্য নড়াচড়ায় তার ভাঙা চোয়ালের যে কী হাল হবে, সেকথা ভেবে সে ঘামতে লাগল৷

ক্যারি ট্রাক রক্ষা করার ব্যাপারে টমাসকে সমর্থন করলেও, হ্যারিয়েট—তার স্ত্রী যে করবে না, সেটা টমাস ভালোই জানে৷ হ্যারিয়েট বুঝবে টমাসের বর্তমান অবস্থাটা, কিন্তু ক্যারি যে ছোট, ক্যারি যে অবুঝ! এজেন্সিও চাইবে টমাস আগে ট্রাক রক্ষা করুক, পরে তার শরীর নিয়ে ভাববে, কিন্তু তার অবস্থাটা ওরা কেউ বুঝতে চাইবে না৷ তবে সে যদি মরিয়া হয়ে ট্রাক বাঁচানোর চেষ্টা করে, তবে এজেন্সি হয়তো তার কাজে খুশি হয়ে হ্যারিয়েট ও ক্যারির ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেবে৷ অবশ্য সে বিষয়ে টমাস পুরোপুরি নিশ্চিত নয়৷ কিন্তু তার অকর্মণ্যতার ফলে যদি এই লুটেরার দল ট্রাকের তালা ভেঙে সমস্ত টাকা হাতিয়ে নেয়, তবে এজেন্সি মনে করবে ট্রাক রক্ষা করার যথাযথ চেষ্টা টমাস করেনি, এবং তার ফলে হ্যারিয়েটকে বাকি জীবনটা কষ্ট করেই কাটাতে হবে৷ হয়তো পেনসনের কোনও টাকাই ওরা তার স্ত্রীকে দেবে না!

সে ভাবল: অতএব, নাও এবার একটু সাহসী হও৷ বেতার সংকেত পাঠানোই যখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ, তখন সেটাই প্রথমে চালু করার চেষ্টা করো৷ শুধু তো পাশ ফিরে হাত উঁচু করে চাবিটা টিপে দেওয়া, ব্যস! বোতামটা ঠিক তোমার মাথার ওপরেই৷ সুতরাং অসুবিধের কিছু নেই: ওটা চালু করে দাও, তার দেখতে দেখতে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পুলিশের গাড়িতে ছেয়ে যাবে গোটা এলাকাটা৷ তখন লোকের চোখে তুমি হয়ে থাকবে সাহসিকতার এক জ্বলন্ত নিদর্শন৷ একবার চেষ্টা করেই দেখো না, সামান্য একটু কষ্ট—এই তো?

কিন্তু সাহস করে প্রস্তত হতে হতেই টমাসের লেগে গেল মিনিট পাঁচেক৷ অবশেষে সে যখন পাশ ফিরতে চেষ্টা করল, সঙ্গে-সঙ্গেই যন্ত্রণার তীব্র ছুরি কেটে বসল তার হৃৎপিণ্ডে৷ সে মুহূর্তে আবার জ্ঞান হারাল টমাস৷ স্থির হয়ে পড়ে রইল তার অসাড় দেহটা৷ হাতুড়ি পেটার অপ্রত্যাশিত বিকট শব্দে টমাসের ঘুম ভাঙল৷ জ্ঞান ফিরে পেয়ে চোখ খুলল সে৷ তার চোখের সামনেই ড্রাইভারের জানলার ওপর ইস্পাতের ধাতব আবরণ৷ তার চোখে পড়ল, জানলা ও ইস্পাতের পাতের ফাঁক দিয়ে এসে পড়া এক চিলতে মধ্যাহ্নের আলো৷ দৃষ্টি ক্রমশ স্বচ্ছ হয়ে আসতেই সে দেখল, একটা শাবল আংশিক ঢুকে রয়েছে ইস্পাত আবরণী ও জানলার ফাঁকে৷

তাহলে ওরা আমাকে শেষ করতে আসছে৷ ভাবল টমাস৷ যাক, তাতে আমার কোনও আপত্তি নেই৷ কিন্তু যদি একটা সুযোগও আমি পাই, তাহলে আমার সঙ্গে ওদের একজনকেও স্বর্গের সিঁড়িতে পা-রাখতে হবে৷ আমার পক্ষে এ অবস্থায় এর চেয়ে বেশি কিছু করা সম্ভব নয়৷ তাছাড়া মাইকের মৃত্যুর প্রতিশোধ যদি আমি না নিই, তাহলে সে আমার সম্বন্ধে ভাববে কী! ওদের জনা দুয়েককে শেষ করতে পারলে খুশিই হতাম, কিন্তু যে অবস্থায় আমি পড়ে আছি, তাতে একজনকে খতম করতে পারলেই নিজেকে ভাগ্যবান মনে করব৷

দুর্বল হাতে সে নিজের রিভলভার বের করার চেষ্টা করল৷ মরগ্যান গুলি করার সময় রিভলভার ব্যবহারের সুযোগ টমাস পায়নি৷ তাই এবারে সে আগে থেকেই প্রস্তুত হতে চায়৷

টমাসের রিভলভার .৪৫ অটোমটিক কোল্ট৷ সুতরাং স্বভাবতই একটু ভারী৷ কিন্তু খাপ থেকে রিভলভারটা হাতে নিতেই তার মনে হল যেন অসহ্য-ভারে হাত ভেঙে পড়তে চাইছে৷ আরেকটু হলেই পড়েও যাচ্ছিল বন্দুকটা৷ অতিকষ্টে হাত নামিয়ে সে ওটাকে নামিয়ে আনল তার ডান পাশে৷ বন্দুকের নলটা তাক করে রইল ট্রাকের জানলার দিকে৷ যে জানলায় দেখা যাচ্ছে শাবলের আংশিক অগ্রভাগ৷

ঠিক আছে শালা, এসো এবার! ভাবল টামাস, আমার একদিন কি তোমার একদিন! এমন চমকে দেব, জীবনভর ইয়াদ রাখবে! আর বেশিক্ষণ আমি অপেক্ষা করতে পারছি না৷ তাড়াতাড়ি করো! মরবার আগে জীবনের শেষ যুদ্ধে আমি জিততে চাই৷

এমন সময় তার কানে এল কারও চাপা তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর, ‘সাবধান! কেউ আসছে!’

এরপর দীর্ঘ নীরবতা৷ টমাস অনুভব করল, আচ্ছন্ন অনুভূতি ক্রমশ তার মস্তিষ্ককে স্থবির করে দিতে চাইছে৷ একমাত্র মনের জোরকে সম্বল করে লড়ে চলল সে৷ কোনওরকমে জাগিয়ে রাখল তার মনের চেতনা৷

আপন মনেই উচ্চারণ করল টমাস, ‘তাড়াতাড়ি করো! তাড়াতাড়ি! এ অবস্থা আমি আর সইতে পারছি না!’

হঠাৎই টমাস শুনতে পেল কারও উত্তেজিত স্বর, ‘এখন যদি টমাস রিভলভার চালাতে শুরু করে তাহলে ওরা গুলির শব্দ শুনতে পাবে৷’

আরেকজন বলে উঠল, ‘পেলে পাক৷ এই জঙ্গলে কেউ কি শিকার করে না? ওরা ভাববে কোনও শিকারী শিকারের পেছনে ছুটছে৷ এসো, কাজ শুরু করা যাক৷’

টমাসের হাতে কোল্ট রিভলভার ক্রমশ ভারী ঠেকছে৷ সে বুঝল, আর বেশিক্ষণ জানলা লক্ষ করে তাকিয়ে থাকা সম্ভব হবে না৷ ওরা ট্রাকের সাইড-ডোর না খোলা পর্যন্ত তাকে এইভাবে অপেক্ষা করতে হবে৷ তারপর দরজা খুললেই টমাস সরাসরি গুলি চালাবে৷ তখন আর সে লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে না৷

তার কানে এল শাবলে চাড় দেওয়ার ধাতব শব্দ৷ টমাস প্রতীক্ষায় রইল৷ যন্ত্রণায় তার শ্বাস-প্রশ্বাস বুঝি রুদ্ধ হয়ে আসবে৷ কিন্তু কোণঠাসা হিংস্র, চিতার মতো সে একাগ্রভাবে অপেক্ষা করে চলল৷

‘আরেকটা শাবল নিয়ে এসো৷’ কারও স্বর শোনা গেল, আমাকে সাহায্য করো৷’

আর একটা শাবলের অগ্রভাগ জানলার ফাঁকে অবির্ভূত হল৷ বেশ কিছুক্ষণ ঠুকঠাক শব্দের পর সড়াৎ করে ওপরে উঠে গেল ইস্পাতের চাদর৷ না, দুটো শাবলে কাজ হয়েছে৷ ভাবল টমাস৷ চার চোখের দৃষ্টি আবদ্ধ হল ট্রাকের খোলা জানলায়৷

মরগ্যান আর ব্লেক দুজনেই সরে দাঁড়াল জানলার কাছ থেকে। দরজার দুপাশে ওরা কান খাড়া করে অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু কোনওরকম শব্দই ওদের কানে এল না। ওরা তাকাল পরস্পরের দিকে—মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।

‘শালা চালাকি করছে না তো?’ হাঁপাতে হাঁপাতে প্রশ্ন করল ব্লেক।

‘হতে পারে।’

দরজার কাছ থেকে নিজের দেহকে যথাসম্ভব সরিয়ে রেখে জানলা দিয়ে ভেতরে হাত গলিয়ে দিল মরগ্যান। হাতড়ে-হাতড়ে খুঁজে চলল দরজার খোলার হাতলটা।

টমাস তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ করতে লাগল মরগ্যানের কার্যকলাপ। তার চোখ আধবোজা; তর্জনী চেপে বসেছে রিভলভারের ট্রিগারে; সাফল্যের অনিশ্চয়তায় তার মন সামান্য শঙ্কিত।

অবশেষে দরজাটা খুলে ফেলল মরগ্যান। দরজার পাল্লাটা ঘুরে গিয়ে থামল ব্লেকের সামনে। সুতরাং ইচ্ছে করলেও ব্লেকের পক্ষে ট্রাকের ভেতরে নজর চালানো সম্ভব হল না। একদিকে ক্যারাভ্যানের দেওয়াল,অন্যদিকে ট্রাক, এবং সামনে ট্রাকের খোলা দরজার পাল্লা-একরকম বন্দিই হয়ে পড়ল ব্লেক।

মরগ্যান ট্রাকের ভেতর চোখ রাখল৷ বিদ্যু্গতিতে ভেতরে উঁকি মেরেই বাইরে বের করে আনল শরীরটাকে৷

সেই কয়েক মুহূর্তে সে দেখল, একটা লোক বিশ্রস্তভাবে ট্রাকের মেঝেতে পড়ে রয়েছে, চোখ তার বোজা, মুখের রং ছাইয়ের মতো ফ্যাকাসে৷

মরগ্যানের শ্বাস-প্রশ্বাস দাঁতের ফাঁক দিয়ে শোনা গেল৷ ব্লেকের দিকে ফিরে চাপা স্বরে সে বলল, ‘কোনও ভয় নেই; ও মারা গেছে৷’

টমাস মনে মনে ভাবল: পুরোপুরি নয়, বন্ধু৷ একটু পরেই তুমি সেটা জানতে পারবে৷ যমের দুয়ারে এক পা-বাড়িয়ে আছি ঠিকই, কিন্তু ভেতরে এখনও ঢুকিনি৷

প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তির জোরে রিভলভার ধরা হাতটা ঈষৎ উঁচিয়ে ধরল টমাস৷ বন্দুকের হিমালয়প্রমাণ ভারে সে যেন নুয়ে পড়বে৷ ঠিক সেই মুহূর্তে আস্তে আস্তে, সতর্ক ভঙ্গিতে ট্রাকের খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল মরগ্যান৷

মরগ্যানের বন্দুকটা টমাসের দিকে নিশানা করা; কিন্তু সেটা নিছকই অতিরিক্ত সাবধানতাবশে৷ কারণ তার দৃঢ় বিশ্বাস টমাস মৃত৷ ওই রকম একটা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন মুখ নিয়ে, আর মৃতের মতো রক্তহীন, পাণ্ডুর শরীর নিয়ে কারও পক্ষেই বেঁচে থাকা সম্ভব নয়৷

‘ওকে এখান থেকে বের করে বাইরে কবর দেওয়া যাক, কী বলো?’ ব্লেকের দিকে ফিরে তাকাল মরগ্যান৷ ব্লেক তখন কৌতূহলভরে জানলা নিয়ে ভেতরে ঝুঁকে পড়ে টমাসকে দেখছে৷ কিন্তু খোলা দরজার পাল্লাটা তার সামনে অবরোধের সৃষ্টি করায় ট্রাকের ভেতরে সে ঢুকতে পারছে না৷

এমন সময় টমাস চোখ খুলে তাকাল৷

‘সাবধান!’ প্রচণ্ড চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে রিভলভার বের করতে চেষ্টা করল ব্লেক৷ কিন্তু দরজাটা তার শরীরে চেপে বসায় সে অসুবিধেয় পড়ল৷

মরগ্যান ওকে গুলি করার সঙ্গে সঙ্গেই টমাস ট্রিগার টিপল৷

দুটো বন্দুকের শব্দ ঠিক এক মুহূর্তে বিস্ফোরিত হল—যেন একটা গুলিরই শব্দ৷ মরগ্যানের রিভলভার নিক্ষিপ্ত গুলিটা বিঁধল গিয়ে টমাসের গলায়—সঙ্গে সঙ্গেই মারা গেল সে৷

কিন্তু টমাসও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি৷ তার গুলি সোজা গিয়ে আঘাত করেছে মরগ্যানের পেটে৷ হাঁটু ভেঙে ট্রাকের ভেতর হুমড়ি খেয়ে পড়ল মরগ্যান৷ তার দেহ গিয়ে পড়ল টমাসের কোলে৷

ভাঙা কর্কশ গলায় এক তীব্র আর্তনাদ করে উঠল জিপো৷

এক দীর্ঘ মুহূর্ত ধরে স্থির হয়ে রইল ব্লেক৷ তারপর চটকা ভাঙতেই ট্রাকের দরজাটা ঠেসে ধরল মরগ্যানের বেরিয়া থাকা পায়ে৷ কোনওরকমে একপাশ হয়ে ক্যারাভ্যানের দেওয়াল ও ট্রাকের দরজার ফাঁক দিয়ে এদিকে এসে দাঁড়াল সে৷

ঘষা কাচের মতো স্বচ্ছ, ঘোলাটে দৃষ্টি মেলে তার দিকে তাকাল মরগ্যান, ‘শেষ পর্যন্ত আমি হেরে গেলাম এড৷’ বিড়বিড় করে বলতে চেষ্টা করল সে৷ তার স্বর এতই অস্পষ্ট যে ব্লেকের বুঝতে বেশ কষ্ট হল, ‘তবে টাকাটা তোমাদের কাজে আসবে৷ তোমাদের প্রত্যেকেরই কাজে লাগবে এই দশ লাখ ডলার…গুড লাক…৷’

ব্লেক সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল৷ হঠাৎই তার খেয়াল হল, সে এক অদ্ভুত চিন্তা করে চলেছে, যদি শেষ পর্যন্ত ট্রাকের তালা ভাঙতে পারে, তাহলে দু-লাখ ডলারের জায়গায় তারা প্রত্যেকে আড়াই লাখ করে পাবে৷ কারণ পাঁচের জায়গায় তাদের অংশীদারের সংখ্যা এই মুহূর্ত থেকে চারজন!