গল্প
উপন্যাস

আলোছায়ার খেলা – ৬

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

কর্নেল ওয়েস্টন হোটেলের অতিথি তালিকার খাতার ওপর ঝুঁকে ছিলেন তিনি সশব্দ উচ্চারণে পড়তে লাগলেন :

‘মেজর এবং মিসেস কাওয়ান,
মিস পামেলা কাওয়ান,
মাস্টার রবার্ট কাওয়ান,
মাস্টার ইভান কাওয়ান৷
রাইড্যালস মাউন্ট লেদারহেড৷

মিঃ এবং মিসেস মাস্টারম্যান,
মিঃ এডওয়ার্ড মাস্টারম্যান,
মিস জেনিফার মাস্টারম্যান,
মিঃ রয় মাস্টারম্যান,
মাস্টার ফ্রেডরিক মাস্টারম্যান,
৫. মার্লবোরো অ্যাভিনিউ, লন্ডন, এন ডব্লিউ৷

মিঃ এবং মিসেস গার্ডেনার,
ন্যু-ইয়র্ক,

মিঃ এবং মিসেস রেডফার্ন,
ক্রসগেটস সেলডন প্রিন্সেস, রিসবোরো৷

মেজর ব্যারী,
১৮, কারডন স্ত্রিট, সেন্ট জেমস, লন্ডন এস ডব্লিউ১৷

মিঃ হোরেস ব্ল্যাট,
৫, পিকাসর্জিল স্ট্রিট, লন্ডন, ই. সি, ২৷

মঁসিয়ে এরকুল পোয়ারো,
হোয়াটিহ্যাভেন, ম্যানসনস, লন্ডন ডব্লিউ, ১৷

মিস রোজামন্ড ডার্নলি
৮, কার্ডিগান কোর্ট, ডব্লিউ, ১৷

মিস এমিলি ব্রুস্টার,
সাউথ গেটস, সানবেরী-অন-টেমস৷
রেভারেন্ড স্টিফেন লেন,
লন্ডন

ক্যাপ্টেন এবং মিসেস মার্শাল
মিস লিন্ডা মার্শাল
৭৩, আপকট ম্যানসনস, লন্ডন এস, ডব্লিউ, ৭৷’

ওয়েস্টন থামলেন৷

ইন্সপেক্টর কলগেট বললেন, ‘আমার মনে হয় স্যর, প্রথম দুটো পরিবারকে আমরা স্বচ্ছন্দে বাদ দিতে পারি৷ কারণ মিসেস ক্যাসল, বলেছেন মাস্টারম্যান৷ এবং কাওয়ানরা নাকি প্রতি গ্রীষ্মেই ওঁদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে এখানে বেড়াতে আসেন৷ আজ সকালে ওঁরা দুপুরের খাবার সঙ্গে নিয়ে দিনভর নৌকোভ্রমণে বেড়িয়েছিলেন৷ সকাল ন’টার কিছু পরেই ওঁরা রওনা হন৷ অ্যানড্রু ব্যাস্টন নামে একজন লোক ওঁদের নৌকো করে নিয়ে যায়৷ তাকে জিগ্যেস করলেই আমরা মিসেস ক্যাসল-এর কথা যাচাই করে নিতে পারবো৷ কিন্তু আমার মনে হয়, সন্দেহের আওতা থেকে ওঁদের আমরা অনায়াসে বাদ দিতে পারি৷’

ওয়েস্টন মাথা নোয়ালেন৷

‘আমারও তাই ধারণা৷ যে ক’জনকে পারা যায় এভাবেই আমরা বাদ দেবো৷ অবশিষ্টদের কারও সম্পর্কে আপনি কোন ইঙ্গিত দিতে পারেন, মঁসিয়ে পোয়ারো?’

পোয়ারো বললেন, ‘ভাসা ভাসা ভাবে নিশ্চয়ই দেওয়া সম্ভব৷ গার্ডেনার মধ্যবয়ষ্ক বিবাহিত দম্পতি; আচরণে হাসিখুশি এবং ভ্রমণবিলাসী ৷ আলাপ-আলোচনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব শ্রীমতী গার্ডেনার একাই পালন করেন৷ তাঁর এই আধিপত্যকে মিঃ গার্ডেনার নীরবে মেনে নিয়েছেন৷ তিনি টেনিস গলফ খেলতে ভালোবাসেন, কখনও একান্ত সঙ্গী হিসেবে পেলে তাঁর অসামান্য রসবোধ আমার কাছে হয়ে ওঠে এক আকর্ষণ৷’

‘সুতরাং, নজরে পড়ার মতো অস্বাভাবিক কিছু নেই৷’

‘এরপর ধরুন রেডফার্নদের—৷ মিঃ রেডফার্ন বয়েসে তরুণ মহিলাদের কাছে প্রলোভনের বস্তু অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাঁতারু, ভালো টেনিস খেলোয়াড় ও প্রথম শ্রেণীর নাচিয়ে৷ তাঁর স্ত্রী সম্পর্কে আমি আগেই আপনাকে বলেছি৷ তিনি শান্ত প্রকৃতির মহিলা: তাঁর বহিরঙ্গের বিবর্ণতার মধ্যে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য প্রচ্ছন্ন রয়েছে৷ তিনি, আমার মনে হয়, তাঁর স্বামীর প্রতি যথেষ্ট অনুরক্ত৷ তাঁর মধ্যে এমন একটা জিনিস রয়েছে যা আর্লেনা মার্শালের ছিলো না৷’

‘যথা?’

‘বুদ্ধি—’

ইন্সপেক্টর কলগেট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন৷ বললেন, ‘মোহের প্রশ্ন যখন আসে, তখন বুদ্ধির কোন গুরুত্ব সেখানে থাকে বলে আমার মনে হয় না, স্যার৷’

‘হয়তো থাকে না৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার বিশ্বাস মিসেস মার্শাল সম্পর্কে মোহচ্ছন্ন হলেও মিঃ রেডফার্ন প্রকৃতপক্ষে তাঁর স্ত্রীকেই ভালোবাসেন৷’

‘সেটা হতে পারে, স্যার৷ কারণ মিঃ রেডফার্নের এ জাতীয় পদস্খলন হয়তো এই প্রথম নয়—’

পোয়ারো অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘এটাই তো সবচেয়ে দুঃখের কথা! স্ত্রীরা এই সরল সত্যি কথাটাই সহজে বিশ্বাস করতে পারেন না!’

একটু থেমে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন ‘মেজর ব্যারী৷ ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক৷ নারী-সৌন্দর্যের পূজারী দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর কাহিনীর কথক৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন৷

‘আর বলার প্রয়োজন নেই৷ এ ধরনের কিছু লোকের সঙ্গে দুর্ভাগ্যবশত আমারও পরিচয় হয়েছে, স্যর!’

মিঃ হোরেস ব্ল্যাট৷ আপাতদৃষ্টিতে তিনি একজন ধনী ব্যক্তি৷ কথা বলেন প্রচুর—তবে নিজের সম্পর্কেই৷ সকলের বন্ধুত্বই তাঁর কাম্য৷ এবং তার পরিণতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক৷ কারণ কেউই তাঁকে তেমন একটা পছন্দ করেন না৷ এছাড়া আর একটা ঘটনা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে৷ গত রাতে আমাকে তাঁর একরাশ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিলো৷ তখন আমার মনে হয়েছে, মিঃ ব্ল্যাট বেশ অস্বস্তি বোধ করছেন৷ তাঁর যে কোথাও কোন একটা গোলমাল রয়েছে সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত৷’

এক মুহূর্ত থামলেন তিনি৷ তারপর ভিন্ন স্বরে পুনরায় শুরু করলেন, ‘এরপর আসছেন মিস রোজামণ্ড ডার্নলি তাঁর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নাম রোজামন্ড লিমিটেড৷ তিনি একজন বিখ্যাত পোশাক-বিশেষজ্ঞ৷ তাঁর সম্পর্কে আর বিশেষ কি বলা যায়? মোটের ওপর মিস ডানর্লির বু্দ্ধি, সৌন্দর্য ও চটক—সবই আছে৷ এবং তাঁর সৌন্দর্যের আকর্ষণী ক্ষমতাকে অস্বীকার করা খুবই কঠিন৷’ একটু থেমে তিনি আবার যোগ করলেন, সবশেষে উল্লেখ করা প্রয়োজন, তিনি ক্যাপ্টেন মার্শালের একজন পুরনো বন্ধু৷’

ওয়েস্টন চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন৷

‘বলেন কি? তাই নাকি?’

‘হ্যাঁ৷ যদিও মাঝে বেশ কয়েক বছর তাঁদের দেখা সাক্ষাৎ হয়নি৷

ওয়েস্টন প্রশ্ন করলেন, ‘মিস ডানর্লি কি জানতেন যে ক্যাপ্টেন মার্শাল এখানে বেড়াতে আসছেন?’

‘তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জানতেন না৷’

পোয়ারো কিছুক্ষণ নীরব রইলেন৷ তারপর বলতে শুরু করলেন, এরপর কে আসছেন? মিস ব্রুস্টার৷ তাঁর সম্পর্কে আমি কিঞ্চিৎ আশঙ্কিত৷’ তিনি ধীরে মাথা নাড়লেন, ‘তাঁর কণ্ঠস্বর পুরুষ-সদৃশ৷ আচরণে রূঢ় হলেও আন্তরিকতার অভাব নেই৷ নৌকা বাইতে ভালোবাসেন এবং গলফ খেলায় পারদর্শিনী৷’ একটু থামলেন তিনি তারপর বললেন, অবশ্য আমার মনে হয়, সব মিলিয়ে তিনি একজন সহৃদয় মহিলা৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘সুতরাং এরপর বাকি রইলেন ধর্মযাজক স্টিফেন লেন৷ কে এই ধর্মযাজক স্টিফেন লেন?’

‘এ ক্ষেত্রে একটা কথাই আমি বলতে পারি; ধর্মযাজক লেন এক প্রচণ্ড স্নায়ুবিক চাপের মধ্যে রয়েছেন৷ এছাড়া, আমার মতে, তিনি একজন ধর্মান্ধ ব্যক্তি৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট সংক্ষিপ্ত করলেন, ‘ও—এই ধরনের লোক!’

ওয়েস্টন বললেন, ‘ব্যস, আমাদের লিস্ট শেষ!’ তিনি তাকালেন পোয়ারোর দিকে, ‘কিন্তু বন্ধুবর, আপনাকে যেন বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছে?’

পোয়ারো জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ৷ কারণ আজ সকালে মিসেস মার্শাল যখন ভেলা নিয়ে রওনা হন এবং আমাকে অনুরোধ করেন তাঁর উপস্থিতির কথা কাউকে না জানাতে, তখন সঙ্গে সঙ্গেই আমার মন এক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়৷ আমার মনে হয়েছিলো প্যাট্রিক রেডফার্নের সঙ্গে মিসেস মার্শালের অন্তরঙ্গতা তাঁর এবং তাঁর স্বামীর মধ্যে এক অশান্ত জটিলতার সৃষ্টি করেছে৷ ভেবেছিলাম, তিনি সম্ভবত প্যাট্রিক রেডফার্নের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন, এবং তিনি চান না তাঁর সেই গতিবিধি সম্পর্কে তাঁর স্বামী অবহিত হোক৷’

তিনি থামলেন৷ কিন্তু সে ক্ষণিকের জন্য৷

‘কিন্তু, এখন আশা করি আপনারা বুঝতে পেরেছেন, আমার ভুলটা হয়েছিলো সেইখানেই৷ কারণ, তিনি চলে যাওয়ার অব্যবহিত পরে ক্যাপ্টেন মার্শালের সমুদ্রতীরে এসে উপস্থিত হন ঠিকই, এবং আমাকে প্রশ্ন করেন তাঁর স্ত্রীকে আমি দেখেছি কিনা, কিন্তু প্রায় একই সঙ্গে প্যাট্রিক রেডফার্নও ঘটনাস্থলে হাজির হয়—এবং অত্যন্ত প্রকট ও নির্লজ্জভাবে মিসেস মার্শালের অনুসন্ধান করতে থাকে৷ সুতরাং, বন্ধুগণ, এই মুহূর্তে আমি নিজেকেই প্রশ্ন করছি, আজ সকালে আর্লেনা মার্শাল তাহলে কার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন?’

ইন্সপেক্টর কলগেট বললেন, ‘আপনার বক্তব্য আমার ধারণাকেই পুরোপুরি সমর্থন করছে, মঁসিয়ে পোয়ারো৷ লন্ডন অথবা অন্য কোন জায়াগা থেকে আসা জনৈক অজ্ঞাত-পরিচয় ব্যক্তির সঙ্গেই মিসেস মার্শাল—’

এরকুল পোয়ারো প্রতিবাদের ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন৷ বললেন, ‘কিন্তু, বন্ধু, আপনার অভিমত অনুযায়ী এই কাল্পনিক ব্যক্তির সঙ্গে আর্লেনা মার্শালের সম্পর্ক ইতিমধ্যেই ছিন্ন হয়েছে৷ সুতরাং এরপরেও তিনি এতোটা ঝুঁকি এবং শ্রম স্বীকার করে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাবেন, এটা ভাবতে কষ্ট হয়৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট মাথা নাড়লেন, বললেন, ‘তাহলে আপনি কাকে সন্দেহ করছেন?’

সেটাই তো আমি এখনও আন্দাজ করে উঠতে পারছি না৷ একটু আগেই আমরা হোটেলের অতিথি-তালিকা পড়ে শেষ করেছি৷ দেখেছি তাঁদের সকলেই প্রায় মধ্যবয়স্ক নীরস প্রকৃতির৷ তাঁদের কাউকে কি প্যাট্রিক রেডফার্নের চেয়ে বেশি গুরুত্ব মিসেস মার্শাল দেবে? উহুঁ—সম্পূর্ণ অসম্ভব৷ কিন্তু তবুও আমরা দেখতে পাচ্ছি, তিনি একজনের সঙ্গে একান্তে সাক্ষাতের আয়োজন করেছিলেন—এবং সেই একজন প্যাট্রিক রেডফার্ন নন৷’

ওয়েস্টন মৃদু স্বরে বলে উঠলেন, ‘আপনার কি মনে হয়, মিসেস মার্শাল আপন খেয়ালে একাই বেরিয়ে পড়েছিলেন?’

পোয়ারো প্রতিবাদ জানিয়ে আরও একবার মাথা নাড়লেন৷

‘বন্ধু’, বললেন পোয়ারো, ‘আপনার কথা স্পষ্টই প্রমাণিত হচ্ছে মৃত মহিলার সঙ্গে পরিচয়ের সে ভাগ্য আপনার হয়নি৷ সুন্দরীশ্রেষ্ঠা ব্রুমেল অথবা নিউটনের মতো মানুষ—এই দুজনের ক্ষেত্রে ‘আরোপিত নিঃসঙ্গ বন্দী জীবন’-এর তাৎপর্যের যে পার্থক্য, তা নিয়ে জনৈক ব্যক্তি একদা এক জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ লিখেছিলেন৷ নিঃসঙ্গতার জগতে আলেনা মার্শালের স্থান নেই, বন্ধু৷ পুরুষের প্রশংসা সর্বদা আলোকিত মঞ্চেই তাঁর চিরকালের অধিষ্ঠান৷ সুতরাং আজ সকালে তিনি কারো না কারো সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন৷ কিন্তু কে সেই ব্যক্তি?’

কর্নেল ওয়েস্টন দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়লেন৷ বললেন, ‘আপাতত এসব তত্ত্ব-আলোচনা থাক৷ এ নিয়ে আমরা পরেও ভাববার অনেক সময় পাবো৷ এখন যেটা প্রয়োজন, তা হলো জবানবন্দিগুলো সেরে নেওয়া৷ কারণ প্রত্যেকের গতিবিধির একটা লিখিত বিবৃতি পেলে আমাদের কাজের অনেক সুবিধে হবে৷ প্রথমে তাহলে মার্শালের মেয়েটিকেই ডাকা যাক৷ সে হয়তো আমাদের কোন জরুরি খবর দিলেও দিতে পারে৷’

দরজার টোকা মেরে নিজের উপস্থিতি জানালো লিন্ডা মার্শাল, অগোছালো ভঙ্গীতে ঘরে পা রাখলো৷ ওর শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত লয়ে বইছে, দু চোখের তারা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বিস্তৃত৷ লিন্ডাকে দেখে কোন হতকচিত অশ্বশাবকের কথাই প্রথমে মনে আসে৷ওর প্রতি অদ্ভুত স্নেহের আবেগ অনুভব করলেন কর্নেল ওয়েস্টন৷

তিনি ভাবলেন ঃ ‘বেচারি মেয়েটা—এই তো কচি বয়েস! নিশ্চয়ই এ ঘটনায় ভীষণ মানসিক আঘাত পেয়েছে৷’

তিনি একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে আশ্বাসের সুরে বললেন, ‘আপনাকে এ অবস্থায় বিরক্ত করার জন্যে দুঃখিত, মিস লিন্ডা, তাই তো?’

‘হ্যাঁ৷ লিন্ডা৷’

ওর কণ্ঠস্বরে শ্বাস টেনে শব্দ উচ্চারণের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা অধিকাংশ স্কুলের মেয়েদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়৷ ওয়েস্টনের সামনে, টেবিলের ওপর অসহায় ভঙ্গীতে রক্ষিত লিন্ডার হাড়সর্বস্ব, রক্তিম, দীর্ঘ আকৃতির করুণ হাত দুটো৷ তিনি ভাবলেন ঃ ‘এ ধরনের ঘটনায় কোন কিশোরীর কখনোই জড়িয়ে পড়া উচিত নয়৷’

তাঁর কণ্ঠে ফুটে উঠলো আশ্বাসের কোমল সুর, ‘এ সব দেখে আপনার ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই, মিস লিন্ডা৷ আমরা শুধু চাই, আপনি যদি এমন কিছু জেনে থাকেন যা আমাদের প্রয়োজন আসতে পারে, তাহলে সেটুকু আমাদের খুলে বলুন—ব্যস, এর বেশি কিছু নয়৷’

লিন্ডা বলল, ‘তার মানে—আর্লেনা সম্পর্কে৷’

‘হ্যাঁ৷ আজ সকালে আপনি কি তাঁকে একবারও দেখেছেন?’

অসহায় মেয়েটি মাথা নাড়লো৷

‘না৷ কারণ আর্লেনা বরাবরই একটু বেলায় নিচে নামে৷ তাছাড়া বিছানায় বসে প্রাতরাশ সারা ওর পুরনো অভ্যেস৷’

‘আর আপনি, মাদমোয়াজেল?’ এরকুল পোয়ারো বললেন৷

‘ও, আমি উঠে পড়ি৷ বদ্ধ ঘরে বিছানায় বসে প্রাতরাশ খেতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘আজ সকালে উঠে আপনি কি কি করেছেন, সেটা আমাদের খুলে বলবেন?’

‘হ্যাঁ, প্রথমে আমি স্নান সেরে নিই৷ তারপর প্রাতরাশ সেরে মিসেস রেডফার্নের সঙ্গে গাল কোভে যাই৷’

‘কটার সময় আপনারা রওনা হয়েছিলেন?’ ওয়েস্টন প্রশ্ন করলেন৷

‘মিসেস রেডফার্ন বলেছিলেন, তিনি আমার জন্যে নিচের হলঘরে সাড়ে দশটায় অপেক্ষা করবেন৷ আমার মনে হচ্ছিলো, হয়তো দেরি করে ফেলেছি—কিন্তু না, তা হয়নি৷ সাড়ে দশটার মিনিট তিনেক আগেই আমরা রওনা হই—’

পোয়ারো বললেন, ‘গাল কোভে গিয়ে আপনারা কি করলেন?’

‘আমি গিয়ে সোজা তেল মেখে সূর্যস্নানে মনোযোগ দিই, আর মিসেস রেডফার্ন আপন মনে ছবি আঁকতে থাকেন৷ তারপর, আরও পরে, আমি সমুদ্রে নামি স্নান করতে, আর ক্রিস্টিন হোটেলে ফিরে যান টেনিস খেলার জন্য পোশাক পালটে প্রস্তুত হতে৷’

ওয়েস্টন গলার স্বরকে যথাসম্ভব সহজ ও স্বাভাবিক রেখে প্রশ্ন করলেন, ‘সেই সময়টা আপনার মনে আছে৷’

‘কখন, যখন মিসেস রেডফার্ন হোটেলে ফিরে যান?—পৌনে বারোটা৷’

‘আপনার ঠিক মনে আছে—পৌনে বারোটা?’

লিন্ডা চোখ বড় করে বলে উঠলো, ‘হ্যাঁ, স্পষ্ট মনে আছে৷ আমি ঘড়ি দেখেছিলাম৷’

‘যে ঘড়িটা আপনি এখন পরে আছেন?’

লিন্ডা চোখ নামিয়ে তাকালো হাতের দিকে৷

‘হ্যাঁ—’

ওয়েস্টন বললেন, ‘ঘড়িটা একবার দেখতে পারি?’

লিন্ডা ওর মণিবন্ধ এগিয়ে ধরলো৷ তিনি নিজের হাতঘড়ি ও হোটেলের দেওয়াল ঘড়ির সঙ্গে ওর ঘড়িটা মিলিয়ে দেখলেন৷ তারপর হেসে বললেন, ‘সেকেন্ড পর্যন্ত নির্ভুল…আচ্ছা—মিসেস রেডফার্ন চলে যাওয়ার পর আপনি তাহলে স্নান করতে নামেন?’

‘হ্যাঁ৷’

‘তারপর হোটেলে ফিরলেন কখন?’

‘প্রায় একটা নাগাদ৷ আর—আর ফিরে এসে শুনলাম—আর্লেনা—আর্লেনা মারা গেছে…’

ওর স্বর শেষ দিকে কেমন বদলে গেলো৷

কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘আশা করি সৎমায়ের সঙ্গে মানিয়ে চলতে আপনার—ইয়ে—কোন অসুবিধা হতো না?’

কোন উত্তর না দিয়ে প্রায় মিনিটখানেক লিন্ডা কর্নেল ওয়েস্টনের দিকে তাকিয়ে রইলো৷ তারপর বললো, ‘না হতো না৷’

পোয়ারো প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কি তাঁকে পছন্দ করতেন মাদমোয়াজেল?’

‘হ্যাঁ করতাম৷’ বলল লিন্ডা৷ একটু থেমে আবার যোগ করলো, ‘আর্লেনা আমার সঙ্গে যথেষ্ট ভালো ব্যবহার করতো৷’

ওয়েস্টন অস্বস্তিপূর্ণ ঈষৎ সুরে বললেন, ‘তাহলে চিরাচরিত ‘নিষ্ঠুর সৎমা’ তিনি ছিলেন না, অ্যাঁ?’

লিন্ডা নির্বিকারভাবেই মাথা নাড়লো৷

‘ভালো কথা৷ খুব ভালো কথা৷’ বললেন, ওয়েস্টন, ‘কখনও কখনও, জানেন, ঈর্ষা ইত্যাদির কারণে সংসারে নানারকম অশান্তি দেখা দেয়৷ ধরুন, মেয়ে এবং বাপের মধ্যে হয়তো মধুর সম্পর্ক রয়েছে, সুতরাং বাবা নতুন বিয়ে-করা বউকে নিয়ে মেতে উঠলে মেয়ে একটু-আধটু বিরক্ত বা ক্ষুব্ধ হলেও হতে পারে? তা সেরকম কিছু নিশ্চয়ই আপনার ক্ষেত্রে হয়নি?’

লিন্ডা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তাঁর দিকে৷ তারপর স্পষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে জবাব দিলো, ‘না হয়নি৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘আমার ধারণা, আপনার বাবা ইদানীং তাঁর স্ত্রীকে নিয়েই একটু বেশি—ইয়ে—ব্যস্ত ছিলেন…’

লিন্ডা শুধু বললো, ‘আমি ঠিক জানি না,’

ওয়েস্টন বলে চললেন, ‘আপনাকে যেমন বললাম, সব রকমের অশান্তিই সংসারে আসতে পারে… মানে—ঝগড়া, কথা কাটাকাটি—এই ব্যাপার আর কি৷ স্বামী এবং স্ত্রীর সম্পর্কে যদি তিক্ততা আসে, তাহলে তাঁদের মেয়ের কাছে পরিস্থিতিটা ভীষণ অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে৷ সে ধরনের কিছু কি এ ক্ষেত্রে হয়েছিলো?’

লিন্ডা স্পষ্ট স্বরে বলল, ‘আপনি কি জানতে চাইছেন বাবা এবং আর্লেনা ঝগড়া করতো কি না?’

‘হ্যাঁ—মানে—’

ওয়েস্টন আপন মনেই ভাবলেন : কি বিশ্রী ব্যাপার—একটা বাচ্চা মেয়েকে তার বাবার সম্পর্কে এই ধরনের প্রশ্ন করা—! লোকে যে কেন পুলিশের চাকরি নেয়! কিন্তু ছাই এ প্রশ্ন না করেও তো উপায় নেই!’

লিন্ডা নিশ্চিত স্বরে জবাব দিলো, ‘না৷ বাবা কখনও কারো সঙ্গে ঝগড়া করে না৷ তার স্বভাবই ওরকম নয়৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘মিস লিন্ডা, এবার আপনাকে যে প্রশ্নটা করবো, খুব ভেবেচিন্তে উত্তর দিন৷ আপনার সৎমাকে কে খুন করতে পারে এ সম্পর্কে আপনার কি কোন ধারণা আছে? এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে এমন কিছু কি আপনি শুনেছেন অথবা জানেন?’

প্রায় এক মিনিট লিন্ডা নীরব রইলো৷ ওকে দেখে মনে হলো, খুব শান্তভাবে মনে মনে প্রশ্নটাকে ও বিবেচনা করে দেখেছে৷ অবশেষে ও মুখ খুললো, ‘না,আর্লেনাকে কে খুন করতে চেয়েছে, জানি না’—একটু থেমে আবার যোগ করলো, ‘অবশ্য মিসেস রেডফার্ন ছাড়া৷’

ওয়েস্টন বললেন, অর্থাৎ, আপনার ধারণা মিসেস রেডফার্ন আপনার সৎমাকে খুন করতে চাইতেন? কেন?’

লিন্ডা বলল, ‘কারণ তাঁর স্বামী আর্লেনার প্রেমে পড়েছিলেন৷ অবশ্য আমি বলছি না তিনি সত্যি সত্যি ওঁকে খুন করতে চাইতেন৷ মানে—তাঁর হয়তো মনে হতো আর্লেনা মরে গেলে খুব ভালো হয়—এই চিন্তা আর সত্যি সত্যি খুন করার নিশ্চয়ই এক জিনিস নয়, তাই কি?’

পোয়ারো নম্র স্বরে বললেন, ‘না—মোটেও এক জিনিস নয়৷’

লিন্ডা মাথা ঝুঁকিয়ে সমর্থন জানালো পোয়ারোর বক্তব্যকে৷ এক অদ্ভুত বিক্ষুব্ধ আবেগ ওর মুখমণ্ডলে ছায়া ফেলে গেলো৷ ও বললো, ‘আর তাছাড়া, মিসেস রেডফার্নের পক্ষে এ ধরনের কাজ করা—মানে, কাউকে খুন করা সম্ভব নয়৷ কারণ, তিনি তেমন—ইয়ে—উগ্র প্রকৃতির নন, মানে—আমি বোধহয় ঠিক আপনাদের বোঝাতে পারছি না৷’

ওয়েস্টন এবং পোয়ারো আশ্বাসের ভঙ্গীতে মাথা নাড়লেন৷ দ্বিতীয়জন বললেন, ‘আপনাদের কথা আমি স্পষ্টই বুঝতে পারছি, মাদমোয়াজেল লিন্ডা, এবং আমি আপনার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত৷ তিনি সে ধরনের মহিলা নন, যাঁরা—আপনাদের প্রবাদ অনুযায়ী—অল্পেতেই ‘রক্ত দর্শন’ করেন৷ তিনি কখনোই—’ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন পোয়ারো; অতি সন্তপর্ণে শব্দ চয়ন করে বলে চললেন, ‘—মানসিক আবেগসঞ্জাত কোন ঝঞ্ঝায় বিচলিত হবেন না—যদিও তিনি দেখেন, তাঁর চোখের সামনে জীবন ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসছে—সর্বদা ভেসে বেড়াচ্ছে একটা ঘৃণ্য মায়াবী মুখমণ্ডল, সুগঠিত শুভ্র গ্রীবা—অথবা হয়তো অনুভব করেছেন নিজের আক্রোশে মুষ্টিবদ্ধ হাত—এবং নরম শরীরে মরণ-স্পর্শে আকাঙ্ক্ষায় তাদের আকুল লিপ্সা৷ উহুঁ তা সত্ত্বেও তিনি বিচলিত হবেন না—’

পোয়ারো থামলেন৷

লিন্ডা এক ঝটকায় টেবিলের কাছ থেকে সরে যেতে চাইলো৷ কাঁপা স্বরে প্রশ্ন করলো, ‘আমি তাহলে এখন যাই? আপনাদের কি আর কিছু জিগ্যেস করার আছে?’

কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ—নিশ্চয়ই যাবেন৷ আপনার সহযোগিতার জন্যে ধন্যবাদ, মিস লিন্ডা৷

তিনি উঠে এসে লিন্ডার জন্য দরজা খুলে ধরলেন৷ তারপর ফিরে এলেন টেবিলের কাছে৷ একটা সিগারেট ধরালেন৷’

‘ওফ—’ হাঁফ ছাড়লেন কর্নেল ওয়েস্টন, ‘বড় বিশ্রী জিনিস, আমাদের এই পুলিশের চাকরি৷ বিশ্বাস করুণ মেয়েটাকে ওর বাবা এবং সৎমায়ের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করার সময় নিজেকে ভীষণ ছোটলোক মনে হচ্ছিল৷ বলতে গেলে ওকে যেন সরাসরি অনুরোধ করা হচ্ছে ওর বাবা গলায় ফাঁসির দড়িটা পরিয়ে দেবার জন্যে! অথচ এ কাজ না করেও তো উপায় নেই৷ খুন সব সময়েই খুন৷ আর এক্ষেত্রে লিন্ডাই একমাত্র ব্যক্তি যার পক্ষে সমস্ত ঘটনার প্রকৃত চরিত্র জানা সম্ভব৷ অবশ্য সে ব্যাপারে ও আমাদের তেমন কিছু বলতে না পারায় আমি একদিক দিয়ে খুশিই হয়েছি—’

পোয়ারো বললেন, ‘হ্যাঁ, আমিও সেইরকমই অনুমান করেছিলাম৷’

অস্বস্তিভরে কাশলেন ওয়েস্টন৷ বললেন, প্রসঙ্গত বলি, মঁসিয়ে পোয়ারো, শেষ দিকে আপনি ওর সঙ্গে একটু বাড়াবাড়িই করে ফেলেছেন—অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে৷ বিশেষ করে ওই আক্রোশে গলা টিপে ধরার লিপ্সার ব্যাপারটা৷ একটা অল্পবয়েসি মেয়েকে এ ধরনের কথা বলে প্রভাবিত করাটা বোধহয় ঠিক নয়৷’

এরকুল পোয়ারো চিন্তাকুল চোখে তাঁর দিকে তাকালেন৷ বললেন, ‘তাহলে আপনার ধারণা, আমার কথা ওকে প্রভাবিত করেছে?’

‘হ্যাঁ৷ কেন, আপনার কি তাই মনে হয় না? এবারে একটু ঝেড়ে কাশুন দেখি!’

পোয়ারো মাথা নাড়লেন৷

ওয়েস্টন বক্তব্য থেকে সরে গিয়ে প্রসঙ্গের পরিবর্তন করলেন৷ বললেন, ‘মোটের ওপর ওর কাছ থেকে খুব কম কথাই আমরা জানতে পেরেছি৷ শুধু রেডফার্ন মহিলাটির একটা পুরোপুরি অ্যালিবাই পাওয়া গেলো, এই যা৷ ওরা যদি সাড়ে দশটা থেকে পৌনে বারোটা পর্যন্ত একসঙ্গে থেকে থাকে, তাহলে ক্রিস্টিন রেডফার্নকে সন্দেহের আওতা থেকে সরাসরি বাদ দিতে হয়৷ অর্থাৎ সন্দেহভাজন, ঈর্ষাপরায়ণ স্ত্রীর সসম্মানে নিষ্ক্রমণ৷’

পোয়ারো বললেন, ‘মিসেস রেডফার্নকে সন্দেহভাজনের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আরও জোরালো কারণ আমাদের হাতে রয়েছে৷ আমার স্থির বিশ্বাস দৈহিক এবং মানসিক দিক থেকে কাউকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা তাঁর পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব৷ তিনি শান্ত প্রকৃতির মহিলা, সহজে ধৈর্য হারান না৷ তাঁর কাছ থেকে গভীর অনুরাগ এবং অবিচল দৃঢ়তা আশা করা যায়, কিন্তু উষ্ণ রক্তপ্রসূত যে আবেগ এবং ক্রোধ, তা সম্পূর্ণ তাঁর চরিত্রের বিপরীত৷ উপরন্তু, তাঁর হাতের গড়ন অস্বাভাবিকরকম হালকা এবং ছোট৷’

কলগেট বললেন, ‘মঁসিয়ে পোয়ারোর সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত৷ মিসেস রেডফার্নকে আমরা স্বচ্ছন্দে বাদ দিতে পারি৷ কারণ ডাঃ নীসডন বলেছেন, যে দুটো হাতের চাপে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মিসেস মার্শাল মারা গেছেন, তাদের গড়ন মোটেই হালকা এবং ছোট নয়৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘তাহলে রেডফার্নদের ডাকা যাক৷ আশা করি মিঃ রেডফার্ন এতক্ষণে অনেকটা সামলে উঠেছেন৷’

প্যাট্রিক রেডফার্ন ইতিমধ্যে পুরোপুরি সামলে উঠেছে৷ তার কোটরগত চোখ, পাণ্ডুর মুখমণ্ডলে তারুণ্যের ভাব সহসা প্রকট হয়ে উঠলেও ব্যবহারে সে এখন স্থৈর্য ফিরে পেয়েছে৷

‘আপনিই মিঃ প্যাট্রিক রেডফার্ন, ঠিকানা ক্রসগেটস, সেলডন প্রিন্সেস রিজবোরো?’

‘হ্যাঁ—’

‘মিসেস মার্শালের সঙ্গে আপনার পরিচয় কতদিনের?’

প্যাট্রিক রেডফার্ন প্রথমে একটু ইতস্তত করলো, তারপর জবাব দিলো, তিন মাসের—’

ওয়েস্টন বলে চললেন, ‘ক্যাপ্টেন মার্শাল আমাদের বলেছেন, একটা ককটেল পার্টিতেই নাকি মিসেস মার্শালের সঙ্গে আপনার প্রথম আলাপ হয়। কথাটা কি ঠিক?’

‘হ্যাঁ—প্রথম পরিচয় আমাদের ওইভাবেই।’

ওয়েস্টন বললেন, ‘ক্যাপ্টেন মার্শাল কথা প্রসঙ্গে এরকম ইঙ্গিতই দিয়েছেন যে এখানে আসার আগে আপনার দুজনের ঘনিষ্ঠতা তেমন গভীর হয়নি—আশা করি কথাটা সত্যি, মিঃ রেডফার্ণ?’

আবারও প্রায় মিনিট খানেক ইতস্তত করলো প্যাট্রিক রেডফার্ন। তারপর বললো, ‘হ্যাঁ—পুরোপুরি না হলেও আংশিক। কারণ, সত্যি কথা বলতে কি, আর্লেনার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ আমার প্রায়ই হতো।’

‘ক্যাপ্টেন মার্শালের অজান্তেই?’

রেডফার্নের মুখে রক্তিম আভাস পলকের জন্যে ঢেউ খেলে গেল। সে বললো, ‘তিনি জানতেন কি জানতেন না তা আমি বলতে পারছি না।’

এবার পোয়ারো কথা বললেন। তিনি মৃদু কন্ঠে জানতে চাইলেন, ‘আশা করি আপনার স্ত্রীও এ সম্পর্কে কিছু জানতেন না—?’

‘যদ্দূর মনে পড়ছে, আমি ওকে কথায় কথায় একদিন বলেছিলাম, বিখ্যাত আর্লেনা স্টুয়ার্টের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে।’

পোয়ারো সহজে সন্তুষ্ট হলেন না।

‘কিন্তু আপনাদের ঘন ঘন মেলামেশার কথা নিশ্চয়ই তিনি জানতেন না?’

‘কি জানি, হয়তো জানতো না।’

ওয়েস্টন বললেন, ‘আপনাদের এই দ্বীপে দেখা হওয়ার ব্যাপারটা কি আগে থাকতেই সাজানো ছিলো?’

রেডফার্ন মিনিটকয়েক নীরব রইলো। তারপর কাঁধ ঝাঁকালো।

‘দেখুন—’বললো সে, ‘আমার মনে হয়, আজ নয় কাল ব্যাপারটা জানাজানি হবেই। সুতরাং আপনাদের সঙ্গে ছলনা করে লাভ নেই। আর্লেনার জন্যে আমার বিচারবুদ্ধি, হিতাহিতজ্ঞান, সবই যেন লোপ পেয়েছিলো—আমাকে পাগল বলুন, মোহাচ্ছন্ন বলুন, আমার কোন আপত্তি নেই। ও চেয়েছিলো আমিও এই দ্বীপে বেড়াতে আসি, প্রথমে কিছুটা ইতস্তত করলেও শেষে আমি রাজি হই। আমি—আমি—ওর অনুরোধে যে কোন কাজ করতেই প্রস্তুত ছিলাম; পুরুষদের ওপর ওর প্রভাব ছিলো এতই মারাত্মক।’

এরকুল পোয়ারো অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘আপনি তাঁর চরিত্রের খুব স্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন, মঁসিয়ে রেডফার্ন। তিনি ছিলেন পুরুষের কাছে চিরন্তন আকর্ষণের বস্তু-রুপোলি জলকন্যার মতো। এসম্পর্কে আমার কোন দ্বিমত নেই।’

প্যাট্রিক রেডফার্ণ তিক্তস্বরে বললো, ‘পুরুষদের মধ্যে বিশেষ প্রবৃত্তি জাগিয়ে তুলতে ওর জুড়ি ছিলো না।’ তারপর অপেক্ষাকৃত সংযত স্বরে বলে চললো, ‘আপনাদের সঙ্গে আমি কিন্তু খোলাখুলি আলোচনা করছি—আর কোন কিছু আমি লুকোতেও চাই না। তাতে লাভই বা কি? হ্যাঁ, যা বলছিলাম, আর্লনা আমাকে যেন আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো। ও আমাকে সত্যি সত্যি ভালোবাসতো কি না—তা জানি না। তবে ভালোবাসার ভানটুকু অন্তত করতো। ও সেই ধরনের মেয়ে, যারা কোন পুরুষের দেহ-মন জয় করার পর তার সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়ে। ও জানতো, আমি ওর প্রভাবে সম্পূর্ণ অন্ধ। আজ সকালে, পিক্সি কোভের সৈকতে, আমি যখন ওর মৃতদেহ আবিষ্কার করি তখন মনে হয়েছিলো যেন—’ সে থামলো, ‘—যেন আমার মাথায় সারা আকাশ ভেঙে পড়েছে। আমি আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছি—হয়ে গেছি স্তম্ভিত।’

পোয়ারো সামনে ঝুঁকে এলেন, ‘আর এখন?’

প্যাট্রিক রেডফার্ণ স্থির চোখে তাঁর দিকে চেয়ে রইলো।—বললো, ‘যা সত্যি, সবই আপনাদের বললাম। এখন আমি জানতে জানতে চাই—এর কতটুকু আপনারা প্রকাশ্যে আনার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন? কারণ আর্লেনার মৃত্যুর সঙ্গে এ সবের তো আর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কোন যোগাযোগ নেই! আর এ ব্যাপারে যদি প্রকাশ্যে আলোচিত হয়, তাহলে আমার স্ত্রী ভীষন কষ্ট পাবে।

‘ওহ্ হ্যাঁ—আমি জানি,’ তাড়াতাড়ি বলে উঠলো প্যাট্রিক, ‘আপনারা ভাবছেন, এতদিন স্ত্রীর খেয়াল আমার কোথায় ছিলো! হয়তো এ অভিযোগ একেবারে মিথ্যে নয়। কিন্তু আসলে আমার স্ত্রীকে আমি খুব ভালোবাসি—যদিও এ কথা শুনে আপনারা আমাকে নিকৃষ্ট চরিত্রের ভন্ড বলেই ভাববেন, কিন্তু তবুও, বিশ্বাস করুন, ওকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। আর অন্য ব্যাপারটা—’ কাঁধ ঝাঁকালো রেডফার্ন, ‘ওটা নিছকই একটা পাগলামো-পুরুষেরা মাঝে মাঝে মোহাচ্ছন্ন অবস্থায় নির্বোধের মতো যে সব ভুল করে বসে, সেইরকম একটা ভুল! তার বেশি কিছু নয়। কিন্তু ক্রিস্টিন আমার কাছে সম্পূর্ণ আলাদা। ওই আমার কাছে একমাত্র সত্যি। ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলেও, মনে মনে আমি জানি, ওই একমাত্র মানুষ যার গুরুত্ব আমার কাছে সবচেয়ে বেশি। ‘রেডফার্ণ থামলো-দীর্ঘশ্বাস ফেলশো-এবং অপেক্ষাকৃত করুণ কন্ঠে বললো, ‘এ কথাগুলো যদি আপনাদের বিশ্বাস করাতে পারতাম!’

এরকুল পোয়ারো সামনে ঝুঁকে পড়লেন, বললেন, ‘কিন্তু আমি বিশ্বাস করি। সত্যিই বিশ্বাস করি!’

প্যাট্রিক রেডফার্ন কৃতজ্ঞদৃষ্টিতে পোয়ারোর দিকে তাকালো৷ বললো, ‘ধন্যবাদ৷’

কর্নেল ওয়েস্টন সশব্দে গলা খাঁকারি দিলেন৷ বললেন, ‘একটু আপনাকে কথা দিতে পারি, মিঃ রেডফার্ন যে অবান্তর প্রসঙ্গে আমরাও কখনও যাবো না৷ এই খুনের সঙ্গে মিসেস মার্শালের প্রতি আপনার ইয়ের ব্যাপারটার যদি কোন সম্পর্ক না থেকে থাকে, তাহলে সেটাকে প্রকাশ্যে টেনে আনার কোন প্রয়োজন আমি দেখি না৷ কিন্তু যে জিনিসটা আপনি ঠিক উপলব্ধি করতে পারছেন না, সেটা হলো ইয়ে মানে, আপনাদের এ অন্তরঙ্গতার সঙ্গে খুনের কোন গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষ যোগাযোগ থাকলেও থাকতে পারে৷ হয়তো এই দৃষ্টিকোণ থেকেই, বুঝতেই পারছেন, খুনের উদ্দেশ্যটাকে আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো৷’

প্যাট্রিক রেডফার্ন বললো, ‘খুনের উদ্দেশ্য?’

ওয়েস্টন বললেন, হ্যাঁ, মিঃ রেডফার্ন, খুনের উদ্দেশ্য! ক্যাপ্টেন মার্শাল সম্ভবত আপনাদের এ ব্যাপারটার কথা জানতেন না৷ এখন মনে করুন, হঠাৎই যদি তিনি জানতে পেরে থাকেন?’

রেডফার্ন বললো, ‘ওঃ ভগবান! আপনি বলতে চান, তিনি তখন সব দেখে শুনে তাঁর স্ত্রীকে—স্ত্রীকে খুন করেন?’

পুলিশ-প্রধান অপেক্ষাকৃত শুষ্ক স্বরে বললেন, ‘কেন, কথাটা আপনার কখনও মনে হয়নি?’

রেডফার্ন মাথা নাড়লো৷ বলল, ‘না—আশ্চর্য! কথাটা আমি কিন্তু একবারও ভাবিনি৷ আপনি তো জানেন মার্শাল কিরকম শান্ত স্বভাবের লোক! আমি—মানে—এটাকে ঠিক সম্ভব বলে ভাবতে পারছি না৷’

ওয়েস্টন প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা, তাঁর স্বামীর প্রতি মিসেস মার্শালের আচরণ কিরকম ছিলো? ব্যাপারটা তাঁর স্বামীর কানে যেতে পারে, এই ভেবে তিনি কি কখনও—মানে, অস্বস্তি—অনুভব করতেন? নাকি এ সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন?’

 রেডফার্ন ধীর স্বরে জবাব দিলো, ও একটু—একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলো৷ ও চাইতো না, ওর স্বামী এ নিয়ে কোনরকম সন্দেহ করুক৷’

‘আচ্ছা, তাঁকে দেখে কি কখনও মনে হয়েছে যে স্বামীকে ভয় করেন?’

‘ভয়? উহুঁ—আমার অন্তত তা মনে হয়নি৷’

পোয়ারো মৃদু অস্পষ্ট স্বরে বললেন, ‘মাপ করবেন, মঁসিয়ে রেডফার্ন, এ প্রসঙ্গে বিবাহ-বিচ্ছেদের কথা কখনও ওঠেনি?’

প্যাট্রিক রেডফার্ন দৃঢ় নিশ্চয়তায় মাথা নাড়লো৷

‘ওহ না, এ ধরনের কথা কখনও ওঠেনি৷ প্রথম ক্রিস্টিন তো ছিলই; আর তাছাড়া,আর্লেনা কখনও সে কথা ভাবেনি—আমি জানি৷ মার্শালকে বিয়ে করে ও পুরোপুরি সন্তষ্ট ছিল৷ মার্শাল বলতে গেলে—একজন রইল আদমী—হঠাৎই হাসলো রেডফার্ন, জমিদার, ওই সব ব্যাপার আর কি, তাছাড়া পয়সাকড়িও আছে৷ ও কখনও সম্ভাব্য স্বামী হিসেবে, আমার কথা ভাবেনি৷ ওর অনুগামী হতভাগ্য, অপদার্থ, মোহাবিষ্ট পুরুষদের তালিকায় আমি ছিলাম সর্বশেষ সংযোজন নিছকই সময় কাটানোর কোন জিনিস৷ আমি প্রথম থেকেই সব জানতাম, বুঝতাম কিন্তু আশ্চর্য, তাতেও ওর প্রতি আমার আকর্ষণ কখনও কমেনি…’

তার স্বর শেষ দিকে নিচু পর্দায় নেমে মিলিয়ে গেলো৷ বসে বসেই কি যেন ভাবতে লাগলো সে৷

ওয়েস্টন তাকে সচকিত করে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনলেন৷

‘আচ্ছা, মিঃ রেডফার্ন, আজ সকালে কি মিসেস মার্শালের সঙ্গে আপনার দেখা করবার কথা ছিলো?’

প্যাট্রিক রেডফার্নকে দেখে কিছুটা যেন বিহ্বল মনে হলো৷

সে বললো, ‘না, সেরকম কোন কথা ছিলো না৷ সাধারণত, সকাল বেলা আমাদের সৈকতেই দেখা হতো৷ ভেলায় চড়ে আমরা সমুদ্রে এদিক-ওদিকে ভেসে বেড়াতাম৷’

‘তাহলে, আজ সকালে তাঁকে বেলাভূমিতে না দেখে আপনি কি অবাক হয়েছিলেন?’

‘হ্যাঁ, হয়ে ছিলাম—ভীষণ অবাক হয়েছিলাম৷ ওর এই না আসার কোন কারণই ভেবে পাচ্ছিলাম না৷’

‘তখন আপনার কি মনে হলো?’

‘কি আর মনে হবে! সারাক্ষণই ভাবছিলাম, এই হয়তো ও এসে পড়বে!’

‘যদি তিনি অন্য কারো সঙ্গে কোথাও দেখা করবার ব্যবস্থা করে থাকেন, তাহলে সে একজন কে আপনি জানতেন না?’

প্যাট্রিক রেডফার্ন হতভম্ব দৃ্ষ্টিতে চেয়ে রইলো৷ আস্তে আস্তে মাথা নাড়লো৷

‘মিসেস মার্শালের সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ আপনি কোথায় করতেন?’

‘কখনও কখনও বিকেলের দিকে গাল কোভে ওর সঙ্গে দেখা হতো৷ আপনি তো জানেন, বিকেলবেলা গাল কোভে সূর্যের আলো থাকে না, সুতরাং বেড়াবার লোকের ভিড় ও তখনও কম হয়৷ ওখানে আমরা বার কয়েক দেখা করেছি৷’

‘অন্য কোভটায় কখনও যাননি? পিক্সি কোভে?’

‘না৷ কারণ পিক্সি কোভটা দ্বীপের পশ্চিমদিকে হওয়ার ফলে পড়ন্ত সূর্যের আলো সেখানে অনেকক্ষণ থাকে৷ নৌকো, ভেলা ইত্যাদি নিয়ে অনেকেই ওখানে বেড়াতে যান৷ সুতরাং নির্জনতা সেখানেই নেই৷ আর, সকালেই দেখা করার চেষ্টা আমরা কখনও করিনি৷ তাতে আমাদের অনুপস্থিতিটা সহজেই সকলের নজরে পড়তো৷ বিকেলে প্রত্যেকে নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে, হয় ঘুমোয়, নয় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ায়, অন্য কারও খবর কেউ রাখে না৷’

ওয়েস্টন নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন৷

প্যাট্রিক রেডফার্ন বলে চললো, ‘কোন কোন সুন্দর রাতে, নৈশভোজের পর, আমরা দুজনে দ্বীপের অনেক অজানা অংশে পায়চারি করে বেড়িয়েছি—’

এরকুল পোয়ারো মৃদু স্বরে বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ—জানি!’ এবং প্যাট্রিক রেডফার্ন চকিত অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকালো তাঁর দিকে৷

ওয়েস্টন বললেন, ‘তাহলে আজ সকালে মিসেস মার্শালের পিক্সি কোভে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে আপনি কোনরকম আলোকপাত করতে পারছেন না?’

রেডফার্ন মাথা নাড়লো৷ তার কণ্ঠে প্রকৃত বিহ্বল সুর ফুটে উঠলো, ‘বিশ্বাস করুন, এ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না৷ তবে এটুকু বলতে পারি, ব্যাপারটা আর্লেনার স্বভাবের সঙ্গে যেন ঠিক খাপ খাচ্ছে না৷’

ওয়েস্টন প্রশ্ন করলেন, ‘এ অ্ঞ্চলের কাছাকাছি তাঁর কোন বন্ধুবান্ধব ছিলো?’

‘আমি চিনি এমন কেউ নেই; উহুঁ—আমার বিশ্বাস, সেরকম কেউ বোধহয় ছিলো না৷’

‘মিঃ রেডফার্ন, এবারে খুব ভেবেচিন্তে এই প্রশ্নটার উত্তর দিন৷ মিসেস মার্শালকে আপনি লন্ডনে থাকতেই চিনতেন৷ সুতরাং তাঁর বন্ধু-বৃত্তের অনেকের সঙ্গেই হয়তো আপনার পরিচয় রয়েছে৷ তাঁদের মধ্যে এমন কাউকে কি জানেন, যাঁর মনে মিসেস মার্শালের প্রতি একটা বিদ্বেষ মনোভাব ছিলো? হয়তো এমন কেউ, যাঁকে স্থানচ্যুত করে আপনি মিসেস মার্শালের মনে জায়গা করে নিয়েছেন?’

প্যাট্রিক রেডফার্ন মিনিটকয়েক ভাবলো৷ তারপর মাথা নাড়লো৷

‘না’, সে বললো, সেরকম কাউকে মনে পড়ছে না৷’

কর্নেল ওয়েস্টন টেবিলে টোকা মেরে সৃষ্টি করলেন দ্রুত ছন্দের৷ অবশেষে চঞ্চল হাত থামিয়ে বলে উঠলেন, ‘সুতরাং, আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে মাত্র তিনটে সম্ভাবনাই আমাদের হাতে রয়েছে৷ প্রথমটা কোন অজ্ঞাতপরিচয় খুনীর—জনৈক বিকৃত মানসিকতার ব্যক্তি, যে ঘটনাচক্রে স্থানীয় অঞ্চলে উপস্থিত ছিলো, আর ‘‘স্থানীয় অঞ্চল’’ বলতে নেহাৎ ছোট জায়গা নয়।’

তাঁকে বাধা দিয়ে রেডফার্ন বলে উঠলো, ‘এবং আমার বিশ্বাস, এই সম্ভাবনাটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক৷’

ওয়েস্টন মাথা নাড়লেন, বললেন, ‘উহুঁ, এই খুনটা ঠিক ‘পড়ে পাওয়া শিকার’ ধরনের নয়৷ বিশেষ করে, পিক্সি কোভ জায়গাটা যখন রীতিমতো দুর্গম৷ হয়তো সেই লোকটিকে কংক্রিটের-সেতু পার হয়ে, হোটেলের পাশ দিয়ে এসে, গোটা দ্বীপটা অতিক্রম করে, মই বেয়ে পিক্সি কোভে নামতে হয়েছে—নয়তো সে এসেছে সমুদ্রের দিক দিয়ে—নৌকো বেয়ে৷ এবং এই দুটোর যে কোনটাই কোন আকস্মিক খুনের পক্ষে অস্বাভাবিক৷’

প্যাট্রিক রেডফার্ন বললে, ‘আপনি বলছিলেন, তিনটে সম্ভাবনা রয়েছে—’

‘উম্—হুঁ,’ পুলিশ-প্রধান বললেন, ‘কারণ, প্রথম সম্ভাবনা ছাড়া এই দ্বীপের মাত্র দুজন ব্যক্তি রয়েছেন, মিসেস মার্শালকে খুনের পেছনে যাঁদের জোরালো উদ্দেশ্য রয়েছে৷ প্রথমজন তাঁর স্বামী—এবং দ্বিতীয়জন আপনার স্ত্রী৷’

রেডফার্ন বিস্মিত অপলক চোখে তাঁর দিকে চেয়ে রইলো৷ দেখে মনে হলো, সে যেন এ কথায় সম্পূর্ণ হতবুদ্ধি হয়ে গেছে৷ সে বললো, ‘আমার স্ত্রী? ক্রিস্টিন?! আপনি বলতে চান এ খুনের পেছনে ক্রিস্টিনের হাত রয়েছে৷’

সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো৷ স’ব কথা একই সঙ্গে উচ্চারণের চেষ্টায় তার জিব জড়িয়ে এলো৷ উত্তেজিত অসংলগ্ন স্বরে সে বলে উঠলো৷ ‘আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে—তাই এ রকম ভুল বকছেন! শেষ পর্যন্ত ক্রিস্টিন? যা একেবারে অসম্ভব, অবিশ্বাস্য—এমন কি রীতিমতো হাস্যকর!’

ওয়েস্টন বললেন, ‘কিন্তু তবুও মিঃ রেডফার্ন, ঈর্ষা বড় সাংঘাতিক জিনিস৷ ঈর্ষার অন্ধ মহিলারা সময়ে সময়ে নিজেদের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন৷’

রেডফার্ন একান্ত-আন্তরিক সুরে বলে উঠলো, ‘কিন্তু ক্রিস্টিনের কথা আলাদা৷ ও—ও মোটেই সে ধরনের মেয়ে নয়৷ হয়তো ও অসুখী—মানছি৷ কিন্তু তাই বলে কাউকে—ওঃ ওর মধ্যে এতটুকু উগ্রভাব নেই৷’

এরকুল পোয়ারো চিন্তিতভাবে মাথা নাড়লেন৷ উগ্রপ্রকৃতি৷ ঠিক এই একই শব্দ ব্যবহার করেছেন লিন্ডা মার্শাল৷ এবং তখনকার মতো, এখনও তিনি এই ধারণাকে মনে মনে সমর্থন জানালেন৷

‘আর তাছাড়া’ আস্থার সুরে বলে চললো রেডফার্ন, ‘এ সন্দেহ নিতান্তই অযৌক্তিক৷ কারণ আর্লেনা ক্রিস্টিনের চেয়ে অন্তত দ্বিগুণ শক্তিশালী ছিলো৷ ক্রিস্টিন একটা বিড়ালছানাকে গলা টিপে মারতে পারবে কিনা সে বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে—আর্লেনার মতো শক্তসমর্থ একজনকে খুন করা তো দূরের কথা! তার ওপর পাহাড়ের গায়ের ঝোলানো ওই মইটা বেয়ে ওর পক্ষে সমুদ্রতীরে নামা কখনও সম্ভব ছিলো না৷ জানেন তো, ক্রিস্টিন উঁচু জায়গা একদম সইতে পরে না৷ তাছাড়া—ওঃ, আপনারা কেন বুঝতে পারছেন না৷ পুরো ব্যাপারটাই একটা অবাস্তব, উদ্ভট কল্পনা!’

কর্নেল ওয়েস্টন অপ্রয়োজনেই বারকয়েক কান চুলকোলেন৷ বললেন, ‘হ্যাঁ—মানে, সেভাবে দেখতে গেলে সম্ভাবনাটা অবাস্তব বলেই মনে হয় বটে—সে কথা আমি অস্বীকার করছি না৷ কিন্তু সর্বপ্রথম আমাদের বিচার করতে হবে খুনের উদ্দেশ্যে।’ একটু থেমে তিনি আরও যোগ করলেন, ‘উদ্দেশ্য এবং সুযোগ৷’

রেডফার্ন ঘর ছেড়ে নিষ্ক্রান্ত হতেই পুলিশ-প্রধান মৃদু-হাসি-সহকারে মন্তব্য করলেন, তাঁর স্ত্রীর যে একটা নিশ্ছিদ্র অ্যালিবাই রয়েছে, সেটা মিঃ রেডফার্নকে জানাবার প্রয়োজন মনে করলাম না৷ এ সম্পর্কে কি বলেন সেটাই আমার শোনবার ইচ্ছে ছিলো৷ দেখলাম, ব্যাপারটা তাঁকে বেশ জোরালো ঝাঁকুনি দিয়েছেন, তাই না?’

এরকুল পোয়ারো মৃদুস্বরে বললেন, মঁসিয়ে রেডফার্ন যে সব যুক্তিতর্ক আমাদের সামনে রেখেছেন, তাদের গুরুত্ব অ্যালিবাইয়ের চেয়ে কোন অংশে কম নয়৷’

‘হ্যাঁ, সে কথা মানছি—ক্রিস্টিন এ কাজ করেননি, তাঁর পক্ষে করা সম্ভবও ছিলো না! আর আপনার কথা অনুযায়ী, দৈহিক শক্তির দিক থেকে তো একেবারেই অসম্ভব! বরং মার্শালকে আমরা সন্দেহ করতে পারি—কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে তিনিও নির্দোষ৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট কাশলেন, বললেন, ‘একটা কথা, স্যর—ওই অ্যালিবাইটা নিয়ে আমি তখন থেকে ভাবছি৷ আমার মনে হয়, তিনি যদি স্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা আগেই করে থাকেন, তাহলে চিঠিগুলো আগে থাকতে টাইপ করে রাখাটা তাঁর পক্ষে কিছু অসম্ভব নয়৷’

ওয়েস্টন বললেন, কথা মন্দ বলোনি, কলগেট৷ ব্যাপারটা আমাদের খোঁজ করে—’

ক্রিস্টিন রেডফার্ন ঘরে ঢুকতেই মাঝপথে থমকে গেলেন তিনি৷

ক্রিস্টিনের আচরণ, বরাবরের মতোই, শান্ত এবং যথাযথ৷ ওর পরনে দুধ-সাদা টেনিস-ফ্রক এবং হালকা-নীল সোয়েটার৷ এই পোশাক ওর শুভ্র বিবর্ণ সৌন্দর্যকে যেন আরও গভীরভাবে প্রকাশ করেছে৷ তবুও আপন মনেই ভাবলেন এরকুল পোয়ারো, ক্রিস্টিনের মুখমণ্ডলে নিবুদ্ধিতা বা দুর্বলতার লেশমাত্র ছায়াও নেই৷ বরং সেখানে স্বপ্রাচুর্যে উপস্থিত বিশ্লেষণ-ক্ষমতা, সাহস এবং শুভ বাস্তববুদ্ধি৷ সপ্রশংসভাবে মাথা দোলালেন পোয়ারো৷

কর্নেল ওয়েস্টন ভাবলেন, ‘চমৎকার মহিলা৷ যদিও একটু কৃশ এবং দুর্বল প্রকৃতির৷ তবে ওর ছেনাল কচি গর্দভ স্বামীটির তুলনায় অনেক-অনেক ভালো৷ অবশ্য হ্যাঁ, ছেলেটার বয়স এখনও অল্প৷ আর মেয়েরার পুরুষদের সাধারণত একবারই বোকা বানায়৷’

তিতি বললেন, ‘বসুন, মিসেস রেডফার্ন৷ কিছু রুটিনমাফিক কাজ যে আমাদের সারতে হয়, তা তো জানেন৷ যেমন, প্রত্যেককে তাঁদের সকাল বেলার গতিবিধি সম্পর্কে বিশদভাবে প্রশ্ন করা হচ্ছে৷ অবশ্য সেটা নিছকই পুলিশি নথিভুক্ত করবার জন্যে৷’

ক্রিস্টিন রেডফার্ন মাথা নেড়ে সম্মত্তি জানালো৷

ও স্বভাবসিদ্ধ শান্ত সংযত স্বরে বলল, ‘হ্যাঁ, সে তো নিশ্চয়ই—৷ বলুন, কোত্থেকে আমাকে শুরু করতে হবে?’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘যত শুরু থেকে পারেন, মাদাম৷ প্রথম বলুন, আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে আপনি কি করেছেন৷’

ক্রিস্টিনের ফর্সা কপালে ভাঁজ পড়লো৷ ও বললো, ‘দাঁড়ান, একটু ভাবতে দিন৷ আজ সকালে প্রাতরাশ সারতে যাওয়ার পথে আমি লিন্ডা মার্শালের ঘরে গিয়েছিলাম৷ ওর সঙ্গে গাল কোভে যাওয়ার কথা ঠিক করতে৷ সাড়ে দশটায় নিচের হলঘরে আমরা দেখা করবো বলে কথা হয়৷’

পোয়ারো প্রশ্ন করলেন, ‘প্রাতরাশের আগে আপনি স্নান করেননি, মাদাম?’

‘না অত সকালে খুব কম সময়েই আমি স্নান করি৷’ হাসলো ও, ‘রোদের তাপে সমুদ্র বেশ গরম না হওয়া পর্যন্ত আমি জলে নামি না৷ মানে—আমি একটু শীতকাতুরে৷’

‘কিন্তু আপনার স্বামী তো প্রাতরাশের আগেই স্নান করেন—?’

‘ওহ—হ্যাঁ৷ বলতে গেলে রোজই৷’

‘আর মিসেস মার্শাল, তিনিও?’

ক্রিস্টিনের কণ্ঠস্বরে ঈষৎ পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলো৷ ওর স্বরে হয়ে উঠল শীতল ও ঝাঁঝালো৷ ও বললো, ‘না, মিসেস মার্শাল ছিলেন সেই ধরনের মানুষ যাঁরা মাঝবেলা না পেরোলে দর্শন দেন না৷’

ঈষৎ বিভ্রান্তির সুরে এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘প্রাসঙ্গিক আলোচনার বাধা দেওয়ার জন্য দুঃখিত, মাদাম৷ আপনি বলছিলেন, প্রথমে আপনি মিস লিন্ডা মার্শালের ঘরে যান৷ আচ্ছা, তখন ক’টা বাজে?’

‘দাঁড়ান, ভেবে দেখি…সাড়ে আটটা—না, তার চেয়ে কিছু বেশিই হবে।’

‘মিস মার্শাল কি তখন ঘুম থেকে উঠেছেন?’

‘হ্যাঁ। ও কোথায় যেন বেরিয়েছিলো।’

‘বেরিয়েছিলেন?’

‘হ্যাঁ; ফিরে এসে ও বললো, ও নাকি স্নান করতে গিয়েছিলো।’

ক্রিস্টিনের কণ্ঠস্বরে একটা ক্ষীণ অত্যন্ত ক্ষীণ—অস্বস্তির সুর ফুটে উঠলো এরকুল পোয়ারোর মুখে বিহ্বলভাব ফুটে উঠলো৷

ওয়েস্টন বললেন, ‘তারপর?’

‘আর প্রাতরাশের পর?’

‘প্রাতরাশের পর ছবি আঁকার সাজ-সরঞ্জাম আনতে ওপরে যাই, এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমরা হোটেল ছেড়ে বেড়িয়ে পড়ি৷’

‘মানে আপনি এবং মিস লিন্ডা?’

‘হ্যাঁ৷’

‘তখন ক’টা বাজে?’

‘আমার মনে হয়, তখন প্রায় সাড়ে দশটা হবে৷’

‘তারপর কি করলেন?’

‘আমরা গাল কোভে যাই৷ দ্বীপের পূর্বদিকে, সমুদ্রের কোল ঘেঁষে যে জায়গাটা আছে৷ সেখানে গিয়ে আয়েস করে বসি. আমি ছবি আঁকাতে থাকি, আর লিন্ডা সূর্যস্নানে ব্যস্ত হয়ে পড়ে৷’

গাল কোভ ছেড়ে আপনারা ফিরলেন কখন?’

‘পৌনে বারোটা নাগাদ৷ কারণ বারোটায় আমার টেনিস খেলার কথা ছিলো, এবং স্বাভাবিকভাবেই পোশাক পালটানোর ঝঞ্ঝাটও ছিলো৷’

‘আপনার সঙ্গে ঘড়ি ছিলো?’

‘না, সত্যি কথা বলতে কি ছিলো না৷ আমি লিন্ডাকেও সময় জিগ্যেস করেছিলাম৷’

‘ও—৷ তারপর?’

ছবি আাঁকার সাজ-সরঞ্জাম গুছিয়ে আমি হোটেলে ফিরে আসি৷’

পোয়ারো বললেন, ‘আর মাদামোয়াজেল লিন্ডা?’

‘লিন্ডা; ও লিন্ডা সমুদ্রে স্নান করতে নামে৷’

পোয়ারো আবার প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার কি সমুদ্র থেকে অনেকটা দূরে বসেছিলেন?’

‘হ্যাঁ—জোয়ার-রেখার অনেকটা ওপরে আমরা বসেছিলাম৷ আমি ছিলাম ঝুলন্ত পাহাড়ের ঠিক নিচে, ছায়াতে—আর লিন্ডা একটু দূরে, রোদে শুয়ে ছিলো৷’

পোয়ারো বললেন, ‘আপনি সৈকত ছেড়ে আসার আগেই কি লিন্ডা মার্শাল জলে নেমেছিলেন?’

স্মৃতির মণিকোঠা অনুসন্ধানে ক্রিস্টিনের ভুরু কুঞ্চিত হলো৷ ও বললো, ‘দাঁড়ান৷ একটু ভেবে দেখি৷ ও সমুদ্রতীর ধরে জলের কিনারায় ছুটে গেলো—আমি বাক্স বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালাম—হ্যাঁ, ফিরে আসার পথে আমি ওর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ার শব্দ শুনেছিলাম৷’

‘এ নিয়ে আপনার মনে কোন সন্দেহ নেই, তো মাদাম? যে সত্যিই মাদমোয়াজেল লিন্ডা জলে নেমেছিলেন?’

 ‘হ-হ্যাঁ৷’

ক্রিস্টিন বিস্ময়ে অপলকে তাঁর দিকে চেয়ে রইলো৷

কর্নেল ওয়েস্টনও বিহ্বল বিমূঢ় বিমূঢ় চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে৷ অবশেষে তিনি বললেন, ‘বলে যান, মিসেস রেডফার্ন—তারপর?’

‘আমি হোটেলে ফিরে খেলার পোশাক পরে টেনিস কোর্টে উপস্থিত হই৷ সেখানেই অন্যান্যদের সঙ্গে আমার দেখা হয়!’

‘অন্যান্যরা বলতে?’

‘ক্যাপ্টেন মার্শাল, মিঃ গাডেনার এবং মিস ডার্নলি৷ আমরা দু’সেট শেষ করে সবে তৃতীয সেট শুরু করেছি, এমন সময় খবরটা এলো—মানে, মিসেস মার্শালের মৃত্যু সংবাদটা৷’

এরকুল পোয়ারো সামনে ঝুঁকে পড়লেন, বললেন, ‘খবরটা শুনে আপনার কি মনে হলো মাদাম৷’

‘কি মনে হলো?’ ওর মুখমণ্ডলে প্রশ্নটার প্রতি একটা ক্ষীণ বিতৃষ্ণার ভাব ছায়া ফেললো৷’

‘হ্যাঁ—’

‘ক্রিস্টিন রেডফার্ন ধীর স্বরে জববা দিলো, ‘খবরটা শুনে—ঘটনাটা একটা জঘন্য বীভৎস ব্যাপারে বলে মনে হয়েছিলো৷’

‘আপনার রুচিশীল মন একটা মানসিক বিদ্রোহ করে উঠেছিলো, সেটা আমি বুঝতে পারছি৷ কিন্তু ঘটনাটা শুনে আপনার কি মনে হয়েছে—ব্যক্তিগতভাবে?’

ক্রিস্টিন চকিত নয়নে তাঁর দিকে তাকালো—ওর দৃষ্টিতে সনির্বন্ধ অনুরোধের ইশারা৷ পোয়ারো এই নীরব ইশারায় সাড়া দিলেন৷ সহজ সরল স্বরে তিনি বলে উঠলেন, ‘মাদাম, জনৈকা বুদ্ধিমতী, সুপ্রচুর শুভ বাস্তব বু্দ্ধি এবং বিচারশক্তি-সম্পন্না মহিলা হিসেবেই আপনাকে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি অনুরোধ করছি৷ মিসেস মার্শাল, অথবা তিনি কি ধরনের মহিলা সে সম্পর্কে আপনার নিজস্ব একটা ধারণা নিশ্চয়ই একদিনে গড়ে উঠেছে?’

ক্রিস্টিন সতর্ক সুরে বলল, ‘আমার মনে হয়, হোটেলে থাকাকালীন অন্যান্য অতিথিদের সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা প্রত্যেকের মনেই গড়ে ওঠে৷’

‘নিশ্চয়ই আর সেটাই চরম স্বাভাবিক৷ সুতরাং আমি জানতে চাই মাদাম, মিসেস মার্শালের এই আকস্মিক মৃত্যু-সংবাদে আপনি কি খুব অবাক হয়েছিলেন?’

ক্রিস্টিন ধীরে ধীরে বললো, ‘আপনি কি বলতে চান, সেটা সম্ভবত আমি বুঝতে পেরেছি৷ না, অবাক হয়তো হইনি৷ বরং একটা আকস্মিক আঘাত পেয়েছিলাম৷ কিন্তু উনি ছিলেন সেই ধরনের মহিলা—’

পোয়ারো ওর কথা শেষ করলেন, ‘মিসেস মার্শাল ছিলেন সেই ধরনের মহিলা যাঁদের জীবনে এই পরিণতিই স্বাভাবিক…হ্যাঁ, মাদাম, আজ সারা সকালে এ ঘরে উচ্চারিত সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ এবং চরম সত্য বক্তব্য এইটাই৷ সমস্ত—ইয়ে, ব্যক্তিগত এই শব্দটায় সযত্নে জোর দিলেন তিনি৷ আবেগপ্রবণতাকে এক পাশে সরিয়ে রেখে বলুন তো, মাদাম, মৃতা মিসেস মার্শাল সম্পর্কে আপনি সত্যি সত্যি কি ভাবেন?’

ক্রিস্টিন রেডফার্ন শান্ত কণ্ঠে বললো, ‘এ সব অবান্তর প্রসঙ্গে যাওয়ার সত্যিই কি কোন প্রযোজন আছে?’

‘আমার মনে হয়, হ্যাঁ, আছে৷’

‘কিন্তু আমি কি বা বলবো?’ ক্রিস্টিনের শুভ্র ত্বকে হঠাৎই ছড়িয়ে পড়লো রক্তিম আভা৷ ওর আচরণের সর্তক ভারসাম্য শিথিল হয়ে এলো৷ এবং ক্ষণিকের জন্য উঁকি দিলো ওর আভ্যন্তরীণ স্বাভাবিক চিরন্তন এক নারী৷ ‘উনি ছিলেন সেই ধরনের মহিলা যাঁরা আমার মতে একেবারে অপদার্থ! নিজের অস্তিত্বের সমর্থনে কোন কাজই উনি করতেন না৷ ওঁর মন বলেও কিছু ছিলো না…বুদ্ধি তো দূরের কথা! শুধু ভাবতেন পুরুষ, পোশাক এবং প্রেম…এই তিনটে জিনিসের কথা৷ উনি ছিলেন সমাজের এক স্বার্থপর পরগাছা মাত্র! পুরুষের কাছে ওর আকর্ষণ ছিলো, একথা অস্বীকার করি না…আর নিঃসন্দেহে সেটাই ছিলো ওঁর এক ও একমাত্র গুণ৷ এবং এ ধরনের জীবনই উনি পছন্দ করতেন৷ সুতরাং, বুঝতেই পারছেন, ওঁর এই আকস্মিক পরিণতিতে আমি ঠিক অবাক হইনি৷ ওঁর মতো চরিত্রের মেয়েরাই ব্ল্যাকমেল—ঈর্ষা-হিংসা—প্রভৃতি নোংরা আবেগসংক্রান্ত জঘন্য ব্যাপারে জড়িয়ে পড়ে৷ মানুষের নীচ প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে তুলতে ওঁর—জুড়ি ছিলো না…’

ক্রিস্টিন থামালো৷ ওর শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত লয়ে বইছে: ঘৃণাজনিত বিরক্তিতে ওষ্ঠ স্ফুরিত৷ কর্নেল ওয়েস্টনের মনে হলো, আর্লেনা স্টুয়ার্টের সঙ্গে চারিত্রিক বৈসাদৃশ্যের সম্পূর্ণতায় রেডফার্নের চেয়ে যোগ্যতর কাউকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব৷ তাঁর এও মনে হলো, ক্রিস্টিন রেডফার্নের সঙ্গে বিবাহিত পুরুষের কাছে পারিপাশ্বিক পরিবেশ হয়তো এতই স্বচ্ছ মনে হবে যে এই পৃথিবীর আর্লেনা স্টুয়ার্টদের আকর্ষণকে সে কখনই এড়াতে পারবে না৷

এবং হঠাৎই, এই চিন্তাস্রোতের মাঝে ক্রিস্টিনের উচ্চারিত একটা শব্দ তাঁকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করলো৷

তিনি সামনে ঝুঁকে পড়লেন, বললেন, ‘মিসেস রেডফার্ন, মিসেস মার্শালের কথা বলতে গিয়ে আপনি হটাৎই ‘ব্ল্যাকমেল’ শব্দটার উল্লেখ করলেন কেন?’