গল্প
উপন্যাস

আলোছায়ার খেলা – ৫

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

ইন্সপেক্টর কলগেট পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আর্লেনার মৃতদেহ নিয়ে পুলিশ-সার্জনের পরীক্ষা শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছিলেন৷ প্যাট্রিক রেডফার্ন ও এমিলি ব্রুস্টার একপাশে নীরবে দাঁড়িয়ে৷

ডাঃ নীসডন হাঁটু ভেঙে বসেছিলেন, অভ্যস্ত ক্ষিপ্ত ভঙ্গীতে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, বললেন, ‘শ্বাস রোধ করে খুন করে হয়েছে—এবং নিঃসন্দেহে একজোড়া শক্ত সবল হাতের কাজ৷ ওঁকে দেখে মনে হচ্ছে না, বাধা দেবার খুব একটা চেষ্টা করেছিলেন৷’

এমিলি ব্রুস্টার মৃতদেহের মুখের দিকে একপলক তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিলেন৷ নীলাভ রক্তিম যন্ত্রণাবিকৃত মুখমণ্ডলের বীভৎসতা কল্পনা করা যায় না৷

ইন্সপেক্টর কলগেট প্রশ্ন করলেন, ‘ক’টার সময় মারা গেছেন বলে মনে হয়, ডাক্তার?’

নীসডন অস্বস্তিভরে জবাব দিলেন, ‘ওর সম্পর্কে আরও কিছু না জেনে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা সম্ভব নয়৷ কারণ অনেকগুলো ব্যাপারে আমাদের বিবেচনা করে দেখতে হবে৷… আচ্ছা, এখন বাজে পৌনে একটা; আপনারা ক’টার সময় মৃতদেহ আবিষ্কার করেন?’

প্যাট্রিক রেডফার্ন, শেষ প্রশ্নটা যাকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে, অস্পষ্টভাবে বললো, ‘বোধহয় বারোটার কিছু আগে৷ ঠিক বলতে পারছি না৷’

এমিলি ব্রুস্টার বললেন, ‘যখন আমরা বুঝলাম মিসেস মার্শাল মারা গেছেন, তখন ঠিক পৌনে বারোটা বাজে৷’

‘ও—৷ আচ্ছা, আপনারা তো এখানে নৌকো করে এসেছিলেন; যখন আপনারা দূর থেকে ওঁকে এখানে পড়ে থাকতে দেবেন তখন ক’টা বাজে?’

এমিলি ব্রুস্টার কিছুক্ষণ ভাবলেন৷

‘ধরুন তার প্রায় মিনিট পাঁচ-ছয় আগে আমরা পাথরের বাঁকটা ঘুরেছি৷’ তিনি ফিরলেন রেডফার্নের দিকে, ‘আপনার কি মনে হয়?’

প্যাট্রিক রেডফার্ন অনিশ্চিত সুরে বলল, ‘হ্যাঁ—হ্যাঁ—ওই রকমই হবে; আমরাও তাই মনে হয়৷’

নীসডন নিচু গলায় পাশে দাঁড়ানো ইন্সপেক্টরকে প্রশ্ন করলেন, ‘ইনিই কি মৃত মহিলার স্বামী?… ও, তাহলে আমারও ভুল হয়েছে৷ ভদ্রলোক দেখছি রীতিমতো ভেঙে পড়েছেন৷ সেই জন্যই ভাবছিলাম হয়তো স্বামী হলেও হতে পারেন৷’

তিনি এবার অপেক্ষাকৃত উঁচু স্বরে বললেন, ‘তাহলে ধরা যাক, মোটামুটি বারোটা বাজতে কুড়ি মিনিটের সময় আপনারা ওঁকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন৷ আমার মনে হয় না, তার খুব একটা আগে ইনি মারা গেছেন ঃ হয়তো ওই সময় থেকে এগারোটা—কিংবা খুব বেশি পৌনে এগারোটার মধ্যে৷’

সশব্দে নোটবই বন্ধ করে মুখ তুলে তাকালেন ইন্সপেক্টর৷

‘ধন্যবাদ৷’ তিনি বললেন, ‘এতে আমাদের অনেক সাহায্য হবে৷ বিশেষ করে খুনের সময়টাকে যখন খুব অল্প পরিসরে বাঁধা গেছে—বলতে গেলে এক ঘণ্টার কম৷’

এবার তিনি ফিরলেন মিস ব্রুস্টারের দিকে৷

‘যাক এ পর্যন্ত সবকিছু তাহলে পরিষ্কার৷ আপনি হলেন মিস এমিলি ব্রুস্টার এবং ইনি মিঃ প্যাট্রিক রেডফার্ন আপনারা দুজনেই বর্তমানে জলি রজার হোটেলে রয়েছেন৷ এই মৃত মহিলাকে আপনারা দুজনেই বর্তমানে জলি রজার হোটেলে রয়েছেন৷ এই মৃত মহিলাকে আপনারা সেই হোটেলেরই অতিথি—এবং জনৈক ক্যাপ্টেন মার্শালের স্ত্রী বলে সনাক্ত করছেন৷’

এমিলি ব্রুস্টার নিঃশব্দে মাথা কেড়ে সম্মতি জানালেন৷

‘তাহলে, আমার মনে হয়,’ বললেন ইন্সপেক্টর কলগেট, ‘এখন আমাদের হোটেলে ফিরে যাওয়াই ভালো৷’

তিনি ইশারায় একজন কনেস্টবলকে ডাকলেন৷

‘হক্স, তুমি এখানে থাকো—আর কাউকে এখানে আসতে দেবে না৷ আমি একটু পরেই ফিলিপসকে পাঠিয়ে দিচ্ছি৷’

‘সত্যি বলছি৷’ বললেন কর্নেল ওয়েস্টন, ‘আপনাকে এখানে দেখবো আশাই করিনি!’

পুলিশ-প্রধানের অভিবাদের উত্তরে যথাযোগ্য ভঙ্গীতে প্রত্যাভিবাদন জানালেন এরকুল পোয়ারো৷ মৃদুস্বরে বললেন, ‘হুঁ—সেন্ট লু-র সেই ঘটনার পর বহু বছর কেটে গেছে৷’

‘তা হলেও ঘটনা আমার এখনও মনে আছে৷’ বললেন ওয়েস্টন, ‘আমার জীবনের সে এক বিরাট বিস্ময়৷ যে জিনিসটা আমি আজও ভুলতে পারিনি, তা হলো সেই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যাপারটায় আপনি যেভাবে আমাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন৷ পুরোপুরি বেনিয়মী অদ্ভুত আপনার পদ্ধতি! এক কথায় অবিশ্বাস্য!’

‘কিন্তু তা হলে তার ফল কি ভালো হয়নি কর্নেল?’ পোয়ারো বললেন৷

‘হ্যাঁ, হয়তো হয়েছে৷ তবে আমার ধারণা নিয়মমাফিক পথেই আমরা সেখানে পৌঁছতে পারতাম৷’

‘হয়তো পারতেন৷’ পোয়ারো অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদের মতো সমর্থন জানালেন৷

‘আর এখানে এসে আর একটা খুনের জটিল পরিবেশে আপনাকে আবিষ্কার করলাম৷’ পুলিশ-প্রধান বললেন, ‘এটা নিয়ে তেমন কিছু ভেবেছেন?’

পোয়ারো ধীরে ধীরে জবাব দিলেন, ‘ঠিকমতো কিছু ভাবিনি—কিন্তু ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে কৌতূহল জাগিয়ে তোলে৷’

‘তা আমাদের একটু-আধটু সাহায্য করছেন তো?’

‘আপনি সে অনুমতি দিচ্ছেন?’

মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনাকে আমাদের সঙ্গে পেলে ভীষণ খুশি হবো৷ এ ব্যাপারে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের হাতে তুলে দেবো কিনা, সে সিদ্ধান্ত নেবার মতো যথেষ্ট খবর এখনও আমরা পাইনি৷ এমনিতে দেখে মনে হচ্ছে, একটা সীমিত এলাকার মধ্যেই আমাদের খুনীকে খুঁজে পাওয়া যাবে৷ কিন্তু আবার এদিকে দেখুন—হোটেলে যাঁরা উপস্থিত রয়েছেন, তাঁদের কেউ স্থানীয় বাসিন্দা নন৷ সুতরাং তাঁদের সম্বন্ধে খোঁজখবর করতে গেলে এবং খুন করার পেছনে তাঁদের উদ্দেশ্যের সন্ধান করতে গেলে লন্ডনে আপনাকে যেতেই হবে৷’

পোয়ারো বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন৷’

‘সর্বপ্রথম আমাদের জানতে হবে মৃত মহিলাটিকে শেষ কে দেখেছেন?’ বললেন ওয়েস্টন, পরিচারিকা সকাল ন’টায় মিসেস মার্শালকে তাঁর প্রাতরাশ পৌঁছে দেয়৷ তারপর, প্রায় দশটা নাগাদ, একতলার দপ্তরে বসে থাকা মেয়েটি তাঁকে হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে যেতে দেখে৷’

‘বন্ধু, ওয়েস্টান,’ পোয়ারো বললেন, ‘সম্ভবত আমি আপনার প্রার্থিত ব্যক্তি৷’

‘আপনি তাঁকে আজ সকালে দেখেছেন? ক’টার সময়?’

‘দশটা বেজে পাঁচ মিনিটে৷ আমি তখন সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে তাঁকে ভেলা ভাসাতে সাহায্য করছিলাম৷’

‘এবং তিনি ভেলায় চড়ে চলে গেলেন?’

‘হ্যাঁ৷’

‘একা?’

‘একা৷’

‘কোনদিকে গেলেন সেটা কি আপনি খেয়াল করেছেন?’

‘ডানদিকে মোড় ঘুরে তিনি পাহাড়ের আড়ালে চলে যান৷’

‘তা মানে পিক্সি কোভের দিকে, তাই না?’

‘হ্যাঁ৷’

‘তখন সময় কত ছিলো?’

‘আমি বলবো, তিনি সমুদ্রতীর ছেড়ে রওনা হন ঠিক সওয়া দশটায়৷’

ওয়েস্টান কিছুক্ষণ ভাবলেন৷

‘হুঁ—মোটামুটি সব মিলে যাচ্ছে৷ ভেলায় চড়ে পিক্সি কোভে পৌঁছতে তাঁর কতক্ষণ লাগতে পারে বলে আপনার মনে হয়?’

‘আমি? আমি এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ৷ নৌকো বা ভেলায় চড়ায় আমি ঘোর বিরোধী৷ তবুও মনে হয়, আধ ঘণ্টার বেশি লাগা উচিত নয়৷’

‘আমারও তাই ধরাণা৷’ কর্নেল বললেন, ‘অবশ্য যদি তিনি স্বাভাবিকভাবে তাড়াহুড়ো না করে ভেলা চালিয়ে থাকেন৷ আর তাই যদি হয়, তাহলে পৌনে এগারোটা নাগাদ তিনি পিক্সি কোভে পৌঁছেছেন—হুঁ, সবই মোটামুটি খাপ খেয়ে যাচ্ছে৷’

‘ক’টার সময় তিনি মারা গেছেন বলে আপনাদের ডাক্তার মনে করেন?’

‘ওহ, নীডসন কখনও নিজের ঘাড়ে দায়িত্ব বা ঝুঁকি নেয় না৷ সে বড় সাবধানী লোক৷ তার মতো খুনটা খুব বেশি হলে পৌনে এগারোটার আগে হয়নি৷’

পোয়ারো নীরবে মাথা নাড়লেন৷ তারপর বললেন, ‘আরও একটা ছোট্ট ঘটনা আমার উল্লেখ করা উচিত৷ চলে যাওয়ার সময় মিসেস মার্শাল আমাকে অনুরোধ করেন, আমি যে তাঁকে দেখেছি, সে কথা যেন কাউকে না বলি৷’

ওয়েস্টন একদৃষ্টে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন৷

তারপর বললেন, ‘হুম—ব্যাপারটা ভাবার মতো, তাই না?’

পোয়ারো অস্পষ্ট স্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হয়েছিলো৷’

ওয়েস্টান বার কয়েক গোঁফে মোচড় দিলেন৷ বললেন, ‘আচ্ছা, মঁসিয়ে পোয়ারো, একটা কথা৷ আপনার অভিজ্ঞতা সাধারণের চেয়ে নিঃসন্দেহে অনেক বেশি৷ বলতে পারেন মিসেস মার্শাল ঠিক কি ধরনের মহিলা ছিলেন?’

একটা হালকা হাসির ছোঁয়া পোয়ারোর ঠোঁটে দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেলো৷ তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কি এখনও কিছু শোনেননি?’

পুলিস-প্রধান নীরস কণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘শুনেছি৷ তবে তার সবটাই অন্যান্য মহিলাদের বক্তব্য৷ সুতরাং বুঝতেই পারছেন—৷ তাই আমি জানতে চাই সে সব বক্তব্যের কতটুকু সত্যি? রেডফার্নের সঙ্গে মিসেস মার্শালের সত্যিই কি কোন ‘ইয়ে’ চলছিলো?’

‘এব্যাপারে আমি অন্তত নিঃসন্দেহ৷’

‘রেডফার্ন তাহলে মিসেস মার্শালকে অনুসরণ করেই এই দ্বীপে এসে হাজির হয়েছে বলতে চান?’

‘সে রকম ভাবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে৷’

‘আর ভদ্রমহিলার স্বামী? তিনি কি এ ঘটনার কথা জানতেন? কি ভাবতেন তিনি এ বিষয়ে?’

পোয়ারো ধীর স্বরে বললেন, ‘ক্যাপ্টেন মাশার্ল কি ভাবেন বা উপলব্ধি করেন তা অনুমান করা নেহাত সহজ নয়৷ তিনি সেই ধরনের মানুষ, যাঁরা নিজেদের মনের ভাবকে কখনও বাইরে প্রকাশ করেন না৷’

ওয়েস্টান তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘কিন্তু তা হলেও মন বলে তো তার একটা পদার্থ আছে!’

পোয়ারো মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন, বললেন, ‘হাঁ, তা হয়তো আছে৷’

পুলিশ-প্রধান ওয়েস্টান তাঁর স্বভাবসিদ্ধ কুশলী পদ্ধতিতে মিসেস ক্যাসল-এর সঙ্গে কথা বলছিলেন৷

মিসেস ক্যাসল জলি রজার হোটেলের এক এবং একমাত্র স্বত্বাধিকারিণী৷ তাঁর চল্লিশোর্ধ্ব শরীরে বক্ষদেশে অস্বাভাবিক স্ফীত, মাথায় একরাশ ঘোর লাল চুল রীতিমতো দৃষ্টি বিকর্ষক এবং তাঁর কথা বলার ভঙ্গী অপ্রত্যাশিতরকম পরিমার্জিত৷

তিনি বলছিলেন, ‘এইরকম একটা ঘটনা আমার হোটেলে ঘটতে পারে, আশ্চর্য! এটা বরাবরই পৃথিবীর সব চেয়ে শান্ত জায়গা, এ আমি হলফ করে বলতে পারি! যে সব লোকেরা এখানে আসে তারা এ-তো ভদ্র, এ-তো চমৎকার, যে তার কোন তুলনা হয় না৷ কোনরকম কেলেঙ্কারি লেশমাত্রও এখানে নেই—বুঝতেই তো পারছেন, কি বলতে চাইছি৷ সেন্ট লু-র ওই বড় বড় হোটেলগুলোর মতো কোন জঘন্য ব্যাপার এখানে হয় না৷’

‘আপনি ঠিকই বলেছেন, মিসেস ক্যাসল,’ কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘কিন্তু অত্যন্ত সুনিয়ন্ত্রিত—ইয়ে, গৃহস্থ বাড়িতেও তো দুর্ঘটনা ঘটে—’

‘আশা করি ইন্সপেক্টর কলগেটও আমার কথায় মত দেবেন—’ পেশাদারী নির্লিপ্ত অভিব্যক্তি নিয়ে অদূরে উপবিষ্ট ইন্সপেক্টরের দিকে সনির্বন্ধ দৃষ্টিতে এক পলক তাকালেন মিসস ক্যাসল, ‘ব্যবসার অনুমতিপত্রের ব্যাপারে আমি খুব সাবধান এবং মনোযোগী৷ আজ পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোন বেআইনি কাজ আমি করিনি৷’

‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই—’ বললেন ওয়েস্টন, ‘আমরা আপনাকে কোনরকম দোষ দিচ্ছি না, মিসেস ক্যাসল৷’

‘কিন্তু তবুও একটা নামকরা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ নিঃসন্দেহে নিন্দের ব্যাপার৷’ উত্তেজিত শ্বাসপ্রশ্বাসে মিসেস ক্যাসেলের সুবিশাল বক্ষদেশ আন্দোলিত হলো, ‘ওঃ, যখনই আমি ভাবি হাঁ করে তাকিয়ে থাকা এই এলাকার লোকগুলোর কথা! অবশ্য, একমাত্র হোটেলের অতিথিরা ছাড়া বাইরে কোন লোককে দ্বীপে ঢুকতে দেওয়া হয় না—কিন্তু তা সত্ত্বেও ওরা নির্ঘাত ওপারে এসে ভীড় করবে, আর আমার—আমার হোটেলের দিকে আঙুল উঁচিয়ে নিজেদের মধ্যে সব নোংরা আলোচনা করবে—এ আমি কোনদিন কল্পনাও করিনি৷’

তিনি সে দৃশ্যের কথা ভেবে শিউরে উঠলেন৷

ইন্সপেক্টর কলগেট অপেক্ষাকৃত প্রয়োজনীয় প্রসঙ্গে আলোচনার মোড় ঘোরাবার সুযোগ পেয়ে বলে উঠলেন, ‘এইমাত্র আপনি যে কথাটা তুললেন, অর্থাৎ দ্বীপটাকে সম্পূর্ণ নিজেদের আয়ত্তে রাখার ব্যাপারটা, সে সম্পর্কে আমার একটা প্রশ্ন আছে৷ আপনি বাইরের লোকদের দ্বীপে ঢুকতে বাধা দেন কি করে?’

ও ব্যাপারে আমি খুউব সাবধান থাকি৷’

‘হ্যাঁ, তা বুঝলাম—কিন্তু কি ভাবে তাদের আটকান? মানে, কি দিয়ে তাদের ঠেকিয়ে রাখেন? কারণ গ্রীষ্মকালে ভ্রমণকারীরা এখানকার প্রায় প্রতিটি জায়গাই মাছির মতো ছেয়ে ফেলে৷’

মিসেস ক্যাসল আরও একবার শিউরে উঠলেন, বললেন, ‘এ সব দোষই হলো বেড়াবার জন্যে তৈরি ওই আ-ঢাকা শ্যারাবাং গাড়িগুলোর৷ আমি দেখেছি, এক সঙ্গে ওইরকম আ-ঠেরোটা গাড়ি লেদারকোম্ব উপসাগরের নৌকোঘাটার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ একবার ভাবুন আঠারোটা৷ হুঁঃ খেয়েদেয়ে আর কাজ নেই, একটা শ্যারাবাং গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেই হলো৷’

‘সে না হয় মানলাম, কিন্তু এই দ্বীপে আসতে তাদের আপনি বাধা দেন কি করে?’ কলগেট মনে হলো তাঁর ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছেছেন৷

‘সে জন্যে অনেকগুলো নোটিস লাগানো আছে৷ আর তাছাড়া জোয়ারের সময় আমরা তো এমনিতেই একেবারে আলাদা হয়ে পড়ি৷’

‘হ্যাঁ, কিন্তু ভাটার সময়?’

অতঃপর মিসেস ক্যাসল সবিস্তারে ব্যাখ্যা করলেন৷ সেতুটা দ্বীপের প্রান্তে যেখানে এসে মিশেছে, সেখানে একটা বড় দরজা আছে৷ তাতে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা আছে৷ ‘জলি রজার হোটেল; নিজস্ব এলাকা৷ হোটেল ব্যতীত অন্য কোথাও বহিরাগতের প্রবেশ নিষেধ৷’ এবং এই দরজার দুপাশে পাহাড়ের পাথর খাড়া নেমে গেছে সমুদ্রে সুতরাং কারও পক্ষে সে প্রাচীর বেয়ে ওঠা সম্ভব নয়৷

‘কিন্তু যে কেউ তো নৌকো বেয়ে দ্বীপের পাশ দিয়ে পিক্সি অথবা গাল কোভে সহজেই পৌঁছতে পারে? আপনি তো তাদের আর আটকাতে পারছেন না৷ তাছাড়া, সমুদ্রতীরে জোয়ার এবং ভাটার সময় জলে দুই প্রান্তের মাঝখানে বেলাভূমির যে অংশ, সেখানে বাইরের লোকদের প্রবেশের অধিকার আছে৷ সে অধিকারেও আপনি হস্তক্ষেপ করতে পারেন না৷’

কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে সম্ভব হলেও জানা গেলো, কার্যক্ষেত্রে এ ঘটনা প্রায় ঘটে না বললেই চলে৷ লেদারকোম্ব উপসাগরের নৌকোঘাটায় নৌকো ভাড়া পাওয়া যায় ঠিকই কিন্তু সেখান থেকে এই দ্বীপের দূরত্ব অনেক৷ তাছাড়া লেদারকোম্ব উপসাগরের পোতাশ্রয় ছাড়িয়ে সমুদ্রের একটু ভেতরে এলেই অস্বাভাবিক জোরালো স্রোতের মুখোমুখি হতে হয়৷

গাল কোভ এবং পিক্সি কোভে নামার লোহার মইয়ের পাশেও যথারীতি বিজ্ঞপ্তি লাগানো আছে৷ মিসেস ক্যাসল আরও জানালেন জর্জ অথবা উইলিয়াম মূল ভুখণ্ডের নিকটতম বেলাভূমির যে অংশ, সেখানে প্রায় সর্বক্ষণই নজর রাখে৷

‘এই জর্জ এবং উইলিয়াম কারা?’

জর্জ সারাদিন বেলাভূমির তদারকিতে থাকে, ও নজর রাখে স্নানের পোশাক এবং রঙিন ভেলাগুলোর দিকে৷ আর উইলিয়াম এখানকার মালি৷ রাস্তাঘাটের দেখাশোনা, টেনিস কোর্টের ঘর কাটা—এ সবই ওর কাজ৷’

কর্নেল ওয়েস্টন অধৈর্য হয়ে বলে উঠলেন, ‘যাক, একটা ব্যাপার তাহলে এখন মোটামুটি পরিষ্কার৷ বাইরে থেকে কারও পক্ষে দ্বীপে আসা একেবারে অসম্ভব না হলেও এটুকু অন্তত বলা যায় যেই আসুক না কেন, তাকে একটা ঝুঁকি নিতে হবে—অন্য কারও নজরে তার উপস্থিতি ধরা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি৷ আমরা জর্জ এবং উইলিয়ামের সঙ্গে এ বিষয়ে এখুনি একবার কথা বলতে চাই৷

মিসেস ক্যাসল বললেন, ‘এখানে বেড়াতে আসা উটকো লোকদের আমি মোটেও পাত্তা দিই না—সব সময় খালি হৈ-হৈ করব, আর কমলালেবু খোসা থেকে শুরু করে সিগারেটের খালি বাক্স পর্যন্ত স-ব রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে ফেলে রেখে যাবে, কিন্তু তবুও এ কথা কখনও ভাবিনি, ওদের কেউ কখনও খুন করতে পারে৷ সত্যি! ব্যাপারটা এত বিশ্রী যে ভাষায় বলা যায় না৷ মিসেস মার্শালের মতো একজন ভদ্রমহিলা শেষে কিনা খুন হলেন? আর সবচেয়ে যেটা খারাপ লেগেছে, তা হলো যেভাবে তাঁকে খুন করা হয়েছে—ইয়ে, মানে,—গলা টিপে…’

শেষ দুটো শব্দে মিসেস ক্যাসল তীব্র অনিচ্ছাসত্ত্বেও উচ্চারণ করলেন৷

ইন্সপেক্টর কলগেট তাঁকে প্রবোধ দিলেন , হ্যাঁ, ব্যাপারটা যে বিশ্রী তাতে সন্দেহ নেই৷’

‘আর খবরের কাগজগুলো আর এক উৎপাত৷ ভেবে দেখুন, আমার হোটেলের সুনাম নিয়ে ওরা কাগজে-কাগজে কিরকম ছিনিমিনি খেলবে!’

মৃদু হেসে কলগেট বললেন, ‘তবে এক দিন দিয়ে সেটা আপনার হোটেলের বিজ্ঞাপনের কাজ করবে৷’

মিসেস ক্যাসল আচমকা গম্ভীর হলেন, স্ফীত বক্ষদেশ আন্দোলন সহকারে উঠে দাঁড়ালেন৷ বরফ-শীতল স্বরে জবাব দিলেন তিনি, এ ধরনের বিজ্ঞাপনের আমি পরোয়া করি না, মিঃ কলগেট৷’

কর্নেল ওয়েস্টন এবার কথা বললেন, আচ্ছা, মিসেস ক্যাসল, ‘আপনাকে যে বলেছিলাম হোটেলের বর্তমান অতিথিদের নামের একটা তালিকা তৈরি করতে, করেছেন?’

‘হ্যাঁ, স্যার—করেছি৷’

কর্নেল ওয়েস্টন হোটেলের অতিথি-তালিকার খাতার ওপর ঝুঁকে পড়লেন৷ তারপর পলকের জন্য চোখ তুলে তাকালেন মিসেস ক্যাসলের অফিস-ঘরে উপস্থিত চতুর্থ ব্যক্তি, এরকুল পোয়ারোর দিকে৷

‘দেখুন, এখানে হয়তো আপনি আমাদের সাহায্য করতে পারবেন৷’ মিসেস ক্যাসেলকে লক্ষ্য করে বললেন ওয়েস্টন৷ তিনি নীরবে নামের তালিকার ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন৷

‘হোটেলে চাকরবাকর ক’জন আছে?’

মিসেস ক্যাসল একটা দ্বিতীয় তালিকা বের করলেন৷

‘চারজন পরিচারিকা, একজন প্রধান পরিচারক—অ্যালবার্ট এবং তার অধীনের তিনজন পরিচারক৷ এছাড়া ‘বার’ এ থাকে হেনরি; উইলিয়াম অতিথিদের জুতো-চটির পরিচর্যার দিকে নজর রাখে, আর সবশেষে রাঁধুনি, ও তার সাহায্যের জন্য দুজন কর্মচারী—ব্যস্ এই সব৷’

‘পরিচারকরা কিরকম লোক?’

‘ওদের মধ্যে অ্যালবার্ট প্লিমাউথের ভিনসেন্ট হোটেল ছেড়ে আমার এখানে এসে কাজ নেয়৷ সেখানে ও বছর কয়েক ছিলো৷ আর ওর তদারকিতে যে তিনজন কাজ করে, তারা তিন বছর ধরে আমার এখানে চাকরি করছে—ওদের মধ্যে একজন আবার চার বছর পুরনো৷ ওরা অত্যন্ত ভদ্র এবং চমৎকার ছেলে৷ আর হেনরি তো হোটেলের শুরু থেকেই এখানে রয়েছে৷—বলতে গেলে ও নিজেই এখন একটা প্রতিষ্ঠান৷’

ওয়েস্টন মাথা নাড়লেন৷ কলগেটকে বললেন, ‘সন্দেহজনক কিছু নেই বলেই মনে হচ্ছে৷ অবশ্য তুমি তোমার নিয়মমাফিক ওদের সম্পর্কে খোঁজখবরের কাজ চালিয়ে যাবে৷ আচ্ছা, ধন্যবাদ, মিসেস ক্যাসল৷’

‘তাহলে আপনাদের আর কোন প্রশ্ন নেই?’

‘না, আপাতত নেই৷’

মিসেস ক্যাসল তাঁর বিশাল শরীর নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন৷

ওয়েস্টন বললেন, ‘আমাদের প্রথম কাজ হবে ক্যাপ্টেন মার্শালের সঙ্গে কথা বলা৷

কেনেথ মার্শাল শান্ত ভঙ্গীতে বসে তাঁর প্রতি জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন৷ মাঝে মাঝে ঈষৎ কাঠিন্যের আভাস ছাড়া তাঁর মুখভাব বরাবরের মতোই নির্লিপ্ত৷ এখন, এই মুহূর্তে জানালা দিয়ে ঠিকরে আসা সোনা রোদের আলোয় তাঁকে দেখে বোঝা যায় তিনি সুদর্শন৷ মুখের প্রতিটি তীক্ষ্ণ রেখা, অবিচলিত নীল চোখ, দৃঢ়সংবদ্ধ ঠোঁট বুঝি তারই ইঙ্গিত বহন করছে৷ তাঁর কণ্ঠস্বর চাপা অথচ আন্তরিক৷

কর্নেল ওয়েস্টন বলছিলেন, ‘এ ঘটনা যে আপনাকে কতখানি আঘাত করেছে তা আমি বুঝি, ক্যাপ্টেন মার্শাল৷ কিন্তু আপনি আমার অবস্থাটাও একবার ভেবে দেখুন—যত তাড়াতাড়ি এই খুন সম্পর্কে সমস্ত তথ্য আমরা সংগ্রহ করতে পারবো আমাদের ততই সুবিধে হবে৷’

মার্শাল মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন৷ বললেন, ‘হ্যাঁ, কর্তব্য তো আপনাদের করতেই হবে৷ বলুন, কি জানতে চান৷’

মিসেস মার্শাল দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী ছিলেন?’

‘হ্যাঁ৷’

‘আপনাদের বিয়ে হয়েছিলো কতদিন?’

‘চার বছরের সামান্য কিছু বেশি৷’

‘বিয়ের আগে আপনার স্ত্রীর নাম কি ছিলো?’

‘হেলেন স্টার্ট৷ তবে ওর অভিনয়-জগতের নাম ছিলো আর্লেনা স্টুয়ার্ট৷

‘তিনি অভিনেত্রী ছিলেন?’

‘হ্যাঁ৷ রিভ্যুতে বেশ কয়েকটা নাটকেও অভিনয় করেছে৷’

‘বিয়ের পর তিনি কি অভিনয় ছেড়ে দেন?’

‘উহুঁ৷ বিয়ের পরেও ও অভিনয় করতে থাকে৷ বলতে গেলে মাত্র বছর দেড়েক হলো ও অভিনয়-জগৎ থেকে পুরোপুরি অবসর নিয়েছিলো৷’

‘এই অবসর গ্রহণের কি বিশেষ কোন কারণ ছিলো?’

কেনেথ মার্শালকে দেখে মনে হলো, তিনি প্রশ্নটা একটু ভাবছেন৷

তারপর বললেন, ‘না৷ ও শুধু বলেছিলো, অভিনয় করতে করতে ও হাঁপিয়ে উঠেছে—তাই একটু বিশ্রাম চায়৷’

‘ও—তাহলে আপনার কোন বিশেষ—ইচ্ছের প্রতি অনুগত্য দেখিয়ে তিনি এ কাজ করেননি?’

মার্শাল ভুরু তুলে তাকালেন৷

‘না, না—’

‘বিয়ের পরে তাঁর অভিনয় করাটাকে আপনি তাহলে মেনেই নিয়েছিলেন?’

মার্শালের ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠলো৷

‘ও অভিনয় ছেড়ে দিলে আমি হয়তো খুশিই হতাম—সে কথা অস্বীকার করি না৷ কিন্তু তা নিয়ে আমি কখনও উচ্চবাচ্য করিনি৷’

‘এ জন্যে আপনাদের মধ্যে কখনও কোনরকম মতবিরোধ হয়নি?’

‘একেবারেই না৷ তার কারণ আমার স্ত্রী-স্বাধীনতায় আমি কখনও হস্তক্ষেপ করিনি৷’

এবং এই বিয়েতে আপনারা সুখী ছিলেন?’

শীতল স্বরে জবাব দিলেন কেনেথ মার্শাল, ‘নিশ্চয়ই ছিলাম৷’

কর্নেল ওয়েস্টন মিনিটখানেক নীরব রইলেন৷ তারপর বললেন, ‘ক্যাপ্টেন মার্শাল, আপনার স্ত্রীকে কার পক্ষে খুন করা সম্ভব সে বিষয়ে কি আপনার কোন ধারণা আছে?’

বিন্দুমাত্রও দ্বিধা না করে তিনি উত্তর দিলেন, ‘না।’

‘তাঁর কি কোন শত্রু ছিলো?’

‘হয়তো ছিলো।’

‘হ্যাঁ?’

মার্শাল তাড়াতাড়ি বলে চললেন, ‘আমাকে ভুল বুঝবেন না, স্যার৷ আমার স্ত্রী একজন অভিনেত্রী ছিলো, এবং অত্যন্ত সুন্দরীও ছিলো সে৷ এই কারণেই অনেকের হিংসা ঈর্ষার শিকার হতে হয়েছিলো ওকে৷ এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিভিন্ন রকম সমালোচনা হতো—অন্যান্য মহিলারা ওর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতো—মোটের ওপর ওকে ঘিরে একটা ঘৃণা, ঈর্ষা ও বিদ্বেষপূর্ণ আবহাওয়া সব সময় থমথম করতো৷ কিন্তু তার মানেই এই নয় যে তাদের মধ্যে কারও পক্ষে ওকে এরকম নৃশংসভাবে খুন করা সম্ভব৷’

এরকুল পোয়ারো এই প্রথম মুখ খুললেন, বললেন, ‘আপনি তাহলে বলতে চান, মঁসিয়ে, যে আপনার স্ত্রীর শত্রুরা প্রধানত, অথবা সকলেই মহিলা ছিলেন?’

কেনেথ মার্শাল পোয়ারের দিকে তাকালেন, বললেন, ‘হ্যাঁ—তাই৷’

পুলিশ-প্রধান বললেন, ‘আপনি এমন কোন পুরুষের কথা জানেন না, যার সঙ্গে আপনার স্ত্রীর শত্রুতা ছিলো?’

‘না৷’

‘এ হোটেলের কারো সঙ্গে কি তাঁর পুরানো আলাপ ছিলো?’

‘যদ্দুর জানি, মিঃ রেডফার্নের সঙ্গে কোন এক ককটেল পার্টিতে ওর আলাপ হয়েছিলো৷ এছাড়া আর কারো সঙ্গে পুরনো আলাপ-পরিচয় ছিলো কিনা বলতে পারি না৷’

ওয়েস্টন কিছুক্ষণ নীরব রইলেন৷ বিষয়টা নিয়ে আলোচনার আরও গভীরে যাওয়া যুক্তিসঙ্গত হবে কিনা ভাবতে লাগলেন, অবশেষে তিনি বিপরীত সিদ্ধান্তই নিলেন৷ বললেন, ‘এবার আজ সকালের কথায় আসা যাক৷ আপনার স্ত্রীকে আপনি শেষ কখন দেখেন?’

মার্শাল মিনিটখানেট চিন্তা করে বললেন, ‘নিচে প্রাতরাশ সারতে যাওয়ার সময় আমি একবার ওর ঘরে গিয়েছিলাম—’

‘মাপ করবেন, আপনারা কি আলাদা ঘরে থাকতেন?’

‘হ্যাঁ৷’

‘তখন ক’টা বাজে?’

‘ন’টার কাছাকাছি তো হবেই৷’

‘তখন তিনি কি করছিলেন?’

‘ওর চিঠিপত্র খুলে দেখছিলো৷’

‘তার সঙ্গে আপনার কোন কথা হয়েছিলো?’

‘বিশেষ কোন কথা হয়নি৷ শুধু পারস্পরিক সুপ্রভাত জানানো—এবং আজকের দিনটা চমৎকার এই সব সাধারণ ব্যাপার নিয়ে আলোচনা হয়েছিলো৷’

তাঁর চালচলন আপনার কিরকম মনে হয়েছিলো? কোনরকম অস্বাভাবিক কিছু লক্ষ্য করেননি?’

‘উহুঁ—বরং সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছে৷’

‘তাঁকে দেখে উত্তেজিত, অথবা মনমরা, অথবা মানসিক দিক দিয়ে কোনরকম বিচলিত মনে হয়েছিলো?’

‘না, আমার অন্তত তা নজরে পড়েনি৷’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘তিনি কি চিঠিপত্রের বিষয়বস্তুর কথা একবারও উল্লেখ করেছিলেন?’

মার্শালের ঠোঁটে আবারও ফুটে উঠলো হালকা হাসির রেখা৷ তিনি বললেন, “যতদূর আমার মনে পড়ছে, ও বলেছিলো সবক’টা চিঠিই নাকি রসিদ-সংক্রান্ত৷’

‘আপনার স্ত্রী আজ বিছানায় বসেই প্রাতরাশ সারেন?’

‘হ্যাঁ৷’

‘তিনি কি রোজই তাই করতেন?’

‘হ্যাঁ, এটা ওর বরাবরের অভ্যেস৷’

পোয়ারো আবার প্রশ্ন করলেন, ‘সাধারণত তিনি কখন নিচে নামতেন?’

‘এই—দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে—তবে বেশিরভাগ দিনই এগারোটা নাগাদ৷

পোয়ারো বলে চললেন, ‘সেক্ষেত্রে, তিনি যদি কখনও ঠিক দশটায় নিচে নামেন, তাহলে সেটাকে কি আপনি অস্বাভাবিক ভেবে আশ্চর্য় হবেন?’

‘হ্যাঁ, হবো৷ কারণ অত সকালে আর্লেনা কখনও নিচে নামে না৷’

‘কিন্তু আজ তিনি নেমেছিলেন৷ হঠাৎ তাঁর এই নিয়মভঙ্গের পেছনে কি কারণ থাকতে পারে বলে আপনার মনে হয়, ক্যাপ্টেন মার্শাল?’

মার্শাল নির্লিপ্ত স্বরে জবাব দিলেন, ‘সে সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণাও আমার নেই৷ হয়তো আজকের সুন্দর আবহাওয়াই ওর অনিয়মের কারণ—’

আপনি তাঁকে ঘরে না পেয়ে অবাক হয়েছিলেন?’

কেনেথ মার্শাল চেয়ারে নড়েচড়ে বসলেন, বললেন, ‘প্রাতরাশের পর আমি ওর ঘরে গিয়েছিলাম৷ দেখলাম, ঘর খালি৷ তাই একটু অবাক হয়েছিলাম৷’

‘আর তারপরই আপনি সমুদ্রতীরে আসেন এবং আমাকে প্রশ্ন করেন, আপনার স্ত্রীকে আমি দেখেছি কি না?’

‘ওহ—হ্যাঁ!’ কণ্ঠস্বরে সামান্য জোর দিয়ে তিনি আরও বললেন, ‘এবং আপনি বলেন যে ওকে আপনি দেখেননি…’

 পোয়ারোর নিষ্পাপ চোখে অস্বস্তির কোনরকম ছায়া পড়লো না৷ তিনি অলস ভঙ্গীতে তাঁর উজ্জ্বল, দর্শনীয় গোঁফে সস্নেহে আঙুল বোলাতে লাগলেন৷

ওয়েস্টন প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার স্ত্রীর খোঁজ করার পেছনে আপনার কি কোন বিশেষ কারণ ছিলো?’

মার্শাল তাঁর সৌহার্দ্যপূর্ণ দৃষ্টি মেলে ধরলেন পুলিশ-প্রধানের দিকে৷ বললেন, ‘না, শুধু এই কথা ভেবেই অবাক হয়েছিলাম যে এত সকালে ও কোথায় যেতে পারে—তার বেশি কিছু নয়৷’

ওয়েস্টন কয়েক মুহূর্তে নীরব রইলেন৷ চেয়ারটাকে সামান্য টেনে বসলেন৷ তাঁর কণ্ঠস্বর সামান্য নিচু গ্রামে নেমে এলো৷ তিনি বললেন, ‘ক্যাপ্টেন মার্শাল, আপনি একটু আগেই বলেছেন যে আপনার স্ত্রীর সঙ্গে মিঃ প্যাট্রিক রেডফার্নের পূর্বপরিচয় ছিলো৷ এখন প্রশ্ন হলো, আপনার স্ত্রী মিঃ রেডফার্নকে কতখানি জানতেন?’

কেনেথ মার্শাল বললেন, ‘সামান্য ধূমপান করলে আশা করি আপনার আপত্তি হবে না৷’ তিনি পকেট হাতড়াতে লাগলেন, এই যাঃ! নিশ্চয়ই পাইপটা অন্য কোথাও ফেলে এসেছি!’

পোয়ারো তাঁর দিকে একটা সিগারেট এগিয়ে দিলেন৷ মার্শাল সেটা গ্রহণ করে তাতে অগ্নিসংযোগ করলেন৷ একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘আপনি রেডফার্নের কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন৷ আমার স্ত্রী আমাকে বলেছিলো, কোন এক ককটেল পার্টিতে নাকি ওর সঙ্গে রেডফার্নের প্রথম আলাপ হয়৷’

‘ও—মিঃ রেডফার্ন তাহলে আকস্মিকভাবেই আপনার স্ত্রীর সঙ্গে পরিচিত হন?’

‘আমার অন্তত তাই বিশ্বাস৷’

‘কিন্তু তারপর—’ একটু থামলেন পুলিশ-প্রধান, ‘আমার ধারণা, সেই পরিচয় ক্রমশ এক অন্তরঙ্গতায় পরিণত হয়.’

মার্শাল সঙ্গে সঙ্গে তীক্ষ্ণস্বরে জবাব দিলেন, ‘আপনি বুঝি তাই ভাবেন? কে আপনাকে বলেছে একথা?’

‘এটাই তো হোটেলের এক এবং একমাত্র গুজব৷’

পলকের জন্য মার্শালের চোখ ফিরলো এরকুল পোয়ারোর দিকে৷ ক্রোধের এক শীতল দীপ্তি নিয়ে চোখজোড়া জরিপ করলো পোয়ারোকে৷ তারপর তিনি বললেন, ‘হোটেলের গুজব সাধারণত একরাশ মিথ্যে রটনা ছাড়া আর কিছু নয়!’

‘হয়তো তাই৷ কিন্তু আমি যা শুনেছি, তাতে মনে হয় মিঃ রেডফার্ন এবং আপনার স্ত্রী এই গুজব রটনার স্বপক্ষে বেশ কিছু সূত্র জুগিয়েছিলেন।’

‘যথা?’

‘তাঁরা বেশিরভাগ সময়ই একসঙ্গে থাকতেন৷’

‘এটাই একমাত্র কারণ?’

‘আপনি নিশ্চয়ই একথা অস্বীকার করেন না?’

‘সত্যিই হলেও হতে পারে৷ তবে তেমনভাবে আমার নজরে কখনও পড়েনি৷’

‘আপনি মিঃ রেডফার্নের সঙ্গে আপনার স্ত্রীর—ইয়ে বন্ধুত্বে কখনও—কিছু মনে করবেন না, ক্যাপ্টেন মার্শাল—বাধা দেননি?’

‘নিজেকে স্ত্রীর আচার-আচরণে সমালোচনা করা আমার স্বভাব নয়৷’

‘আপনি তাহলে এ নিয়ে কোনরকম প্রতিবাদ বা আপত্তি করেননি?’

‘নিশ্চয়ই না৷’

‘ব্যাপারটা একটা কেলেঙ্কারি পর্যায়ে যাচ্ছে দেখেও আপনি চুপচাপ ছিলেন?’

কেনেথ মার্শাল শীতল কণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘আমি পরের চরকায় তেল দেওয়া পছন্দ করি না, এবং অন্যান্যদের কাছ থেকে এই একই মনোভাব আশা করি৷ আর, গুজব অথবা পরচর্চামূলক মুখরোচক খবরে আমার তেমন আগ্রহ নেই৷’

‘আশা করি একথা আপন অস্বীকার করবেন না যে মিঃ রেডফার্ন আপনার স্ত্রীর প্রতি বিশেষভাবে অনুরক্ত ছিলেন?’

‘হয়তো ছিলো, ঠিক জানি না৷ আমার স্ত্রী অত্যন্ত সুন্দরী ছিলো৷ সুতরাং বেশির ভাগ পুরুষই ওর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়তো৷’

কিন্তু আপনাকে বোঝানো হয়েছিলো যে ব্যাপারটা গুরুত্ব দেবার মতো তেমন কিছু নয়?’

‘বিশ্বাস করুন, এ নিয়ে আমি কখনো ভাবিনি৷’

‘কিন্তু মনে করুন, এমন কোন সাক্ষী যদি আমাদের হাতে থাকে, যে শপথ করে বলবে, তাঁদের সম্পর্কে বন্ধুত্বের সীমানা ছাড়িয়ে চরম অন্তরঙ্গ পর্যায়ে এগিয়েছিলো?’

মার্শালের নীল চোখ আবার স্থির হলো পোয়ারোর চোখে৷ তাঁর সদা অভিব্যক্তিহীন মুখমণ্ডলে ক্ষণেকের জন্য ভেসে উঠলো অপছন্দের ছায়া৷

মার্শাল বললেন, ‘আপনি যদি সে সব গাল-গপ্পো বিশ্বাস করতে চান, করুন৷ আমার স্ত্রী মৃতা; ওর পক্ষে নিজেকে নির্দোষ প্রতিপন্ন করা এখন আর সম্ভব নয়৷

‘আপনি বলতে চান, ব্যক্তিগতভাবে এ সবে আপনি বিশ্বাস করেন না?’

মার্শালের ভুরুতে এই সর্বপ্রথম লক্ষিত হলো স্বেদবিন্দুর ছোঁয়া৷ তিনি বললেন, ‘এ ধরনের গাল-গপ্পে বিশ্বাস করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও আমার নেই৷’

তিনি বলে চললেন, ‘আপনারা কি ক্রমশ প্রয়োজনীয় প্রসঙ্গ থেকে সরে যাচ্ছেন না? আমার মনে হয়, এই খুনের সঙ্গে আমার নিজস্ব বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সম্পর্ক নিছকই অবান্তর৷’

অন্য দুজন কোন উত্তর দেবারই আগেই এরকুল পোয়ারো বলে উঠলেন, ‘আপনি ব্যাপারটা ঠিক উপলব্ধি করতে পারছেন না, ক্যাপ্টেন মার্শাল৷ খুনের চেয়ে চরম বাস্তব পৃথিবীতে আর কিছু নেই৷ দশটার মধ্যে অন্তত নটা ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নিহত ব্যক্তির চরিত্র এবং তাঁর পারিপার্শ্বিকের মধ্যেই খুনের প্রথম এবং প্রধান কারণ নিহিত রয়েছে৷ যেহেতু নিহত ব্যক্তির স্বভাব চরিত্রে তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিলো, শুধু সেই কারণেই তাঁকে হত্যাকারীর শিকার হতে হলো৷ সুতরাং যতক্ষণ না আমরা সম্পূর্ণভাবে জানতে পারছি আর্লেনা মার্শাল ঠিক কি ধরনের মহিলা ছিলেন, ততক্ষণ আমরা স্পষ্টভাবে বুঝতেই পারবো না ঠিক কোন ধরনের ব্ক্তয়র পক্ষে তাঁকে খুন করা সম্ভব৷ এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে আমাদের প্রশ্নের গুরুত্ব আপনার কাছে স্পষ্ট হবে৷’

মার্শাল ফিরলেন পুলিশ-প্রধানের দিকে৷ বললেন, ‘আপনারও কি একই মত?’

ওয়েস্টন একটু ইতস্তত করলেন৷ তারপর বললেন, ‘হ্যাঁ—একরকম তাই—’

মার্শাল ছোট্ট করে হাসলেন৷

‘ভেবেছিলাম আপনি হয়তো একমত হবেন না৷ কারণ এই চরিত্র-সংক্রান্ত ব্যাপারগুলোকে আমি মঁসিয়ে পোয়ারোর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বলেই জানতাম৷’

পোয়ারো সহাস্যে জবাব দিলেন, ‘তাহলে আপনি নিজেকে অন্তত এই কথা ভেবে অভিনন্দন জানাতে পারেন, ক্যাপ্টেন মার্শাল, যে আমাকে সাহায্য করার মতো কিছুই আপনি এখনও বলেননি৷’

‘তার মানে?’

‘আপনার স্ত্রীর সম্পর্কে আপনি আমাদের কতটুকু বলেছেন? কিছুই না! যেটুকু বলেছেন, তা সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন যে কোন মানুষের এমনিতেই নজরে পড়ে৷ অর্থাৎ আপনার স্ত্রী সুন্দরী এবং আকর্ষণীয়া মহিলা ছিলেন৷ এর চেয়ে বেশি কিছু আপনি আমাদের বলেছেন কি?’

কেনেথ মার্শাল কাঁধ ঝাঁকালেন৷ শুধু বললেন, ‘আপনার অভিযোগ সম্পূর্ণ অর্থহীন৷’

তিনি পুলিশ-প্রধানের দিকে তাকালেন, একটু জোর দিয়েই বললেন, ‘আপনি আমার কাছে আর কিছু জানতে চান?’

‘হ্যাঁ ক্যাপ্টেন মার্শাল—আজ সকালে আপনার গতিবিধির কথা৷’

কেনেথ মার্শাল সম্মতিসূচকভাবে মাথা নাড়লেন৷ তিনি নিঃসন্দেহে এ প্রশ্নটাই আশা করছিলেন৷

তিনি বলতে শুরু করলেন, রোজকার মতো সকাল নটায় আমি প্রাতরাশ সারতে নিচে যাই এবং খবরের কাগজ পড়ি৷ পরে আমার স্ত্রী-ঘরে গিয়ে দেখি ও ঘরে নেই—সে কথা তো আপনাদের আগেই বলেছি৷ সমুদ্রতীরে এসে মঁসিয়ে পোয়ারোর সঙ্গে আমার দেখা হয়; আমি তাঁকে আমার স্ত্রী কথা জিগ্যেস করি৷ তারপর সংক্ষেপে স্নান সেরে আবার হোটেলে ফিরে আসি৷ তখন ক’টা হবে?… এই—এগারোটা বাজতে কুড়ির মতো—৷ হ্যাঁ, সময়টা আমার সঠিক মনে আছে, কারণ ফিরে এসেই হোটেলের দেওয়াল ঘড়িটা আমার প্রথম নজরে পড়ে: তখন এগারোটা বাজতে ঠিক কুড়ি মিনিট বাকি ছিলো৷ ওপরের ঘরে দেখি পরিচারিকা ঘর তদারকির কাজ তখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি৷ তাকে তাড়াতাড়ি কাজ সারতে বলে আমি আবার নিচে নেমে আসি, বার-এ হেনরীর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে এগারোটা বাজতে দশ মিনিটের সময় আবার ঘরে ফিরে যাই৷ আমার কতকগুলো জরুরি চিঠি টাইপ করার ছিলো৷ সেগুলোকে সকালের ডাকেই পোস্ট করবো বলে আর সময় নষ্ট না করে টাইপরাইটার নিয়ে বসে পড়ি৷ বারোটা বাজতে দশে কাজ শেষ করে আমি টেনিস খেলার পোশাক পরে নিই, কারণ বারোটায় আমাদের টেনিস খেলার কথা ছিলো৷ আমরা আগের দিনই টেনিস কোট বুক করে রেখেছিলাম—’

‘আমরা মানে কারা৷?’

মিসেস রেডফার্ন, মিস ডার্নলি, মিঃ গার্ডেনার এবং আমি৷ বেলা বারোটার সময় আমি টেনিস কোর্টে হাজির হই৷ মিস ডার্নলি ও মিঃ গার্ডেনার আমার আগেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন৷ শুধু মিসেস রেডফার্ন আসতে কয়েক মিনিট দেরি করেন৷ প্রায় ঘণ্টা খানেক আমরা খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকি৷ তারপর হোটেলে ফিরে আসতেই আমি—আমি—খবরটা পাই৷’

ধন্যবাদ, ক্যাপ্টেন মার্শাল৷ এবারে নিছক রুটিনমাফিক একটা প্রশ্ন করবো—আপনি যে এগারোটা বাজতে দশ থেকে বারোটা বাজতে দশ পর্যন্ত আপনার ঘরে বসে টাইপ করছিলেন, এ বক্তব্যকে সমর্থন করতে পারে এমন কি কেউ আছে?’

কেনেথ মার্শালের ঠোঁটে ফুটে উঠলো হাসির রেখা৷ তিনি বললেন, ‘আপনি কি সন্দেহ করছেন যে আমি আমার স্ত্রীকে খুন করেছি?… দাঁড়ান, একটু ভাবতে দিন৷ পরিচারিকাটি তখন অন্যান্য ঘর ঝাঁড়পোঁছ নিয়ে ব্যস্ত ছিলো৷ সুতরাং সে নিশ্চয়ই টাইপরাইটারের শব্দ শুনে থাকবে৷ তাছাড়া চিঠিগুলো তো আমার কাছে রয়েছেই আর ডাকে দেওয়া হয়ে ওঠেনি৷ আমার মনে হয়, আমার বক্তব্যের সমর্থনে ও চিঠিগুলোই পর্যাপ্ত প্রমাণ৷’

পকেট থেকে তিনি চিঠি তিনটি বের করলেন৷ চিঠিগুলোতে ঠিকানা লেখা থাকলেও ডাকটিকিট লাগানো হয়নি৷ তিনি বললেন, ‘প্রসঙ্গত বলি, এই চিঠিগুলোর বিষয়বস্তু একান্ত গোপনীয়৷ কিন্তু খুনের মামলায় পুলিশের বিবেচনার ওপর ভরসা রেখে এগুলো আপনাদের হাতে তুলে দিতে আমি বাধ্য৷ এ চিঠিগুলোর আমার বিভিন্ন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিবৃতি ও তাদের সঠিক অঙ্ক লেখা রয়েছ৷ আমার মনে হয়, যদি আপনারা এ চিঠিগুলো আপনাদের কোন লোককে দিয়ে টাইপ করান, তাহলে তার পক্ষেও এক ঘণ্টার খুব একটা কম সময়ে এগুলো শেষ করে ওঠা সম্ভব হবে না৷’

তিনি একটু থামলেন৷

‘আশা করি এবারে সন্তুষ্টু হয়েছেন?’

ওয়েস্টন মসৃণ স্বরে জবাব দিলেন, ‘এটা কোন সন্দেহের প্রশ্ন নয়, ক্যাপ্টের মার্শাল৷ এ দ্বীপে উপস্থিত প্রত্যেককেই আজ সকাল পৌনে এগারোটা থেকে এগারোটা চল্লিশ পর্যন্ত তাঁদের গতিবিধির জন্যে পুলিশের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।’

“হু-তা তো নিশ্চয়ই—’

‘আর একটা কথা, ক্যাপ্টেন মার্শাল—’ ওয়েস্টন বললেন, ‘আপনার স্ত্রীর নিজস্ব কোন বিষয় সম্পত্তি থেকে থাকলে সেগুলো তাঁর কিভাবে ভাগ করে যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো সে সম্পর্কে আপনি কিছু জানেন?’

‘আপনি কি কোন উইলের কথা বলছেন? আমার মনে হয় না ও কোন উইল-টুইল করে গেছে৷’

‘কিন্তু সেটা তো শুধুই আপনার অনুমান—’

‘ওর সলিসিটর ছিলো ‘বাকেট, মার্কেট অ্যান্ড অ্যাপলগুড’, বেডফোর্ড স্কোয়ার৷ ওর সমস্ত অভিনয়-সংক্রান্ত চুক্তিগুলো তারাই দেখাশোনা করতো৷ কিন্তু আমি যদ্দুর জানি ও কখনও কোন উইল করেনি৷ একবার ও আমাকে বলেছিলো, এইসব উইল-টুইল করার কথা শুনলে ওর জ্বর আসে৷’

‘সে ক্ষেত্রে স্বামী হিসেবে তাঁর সমস্ত সম্পত্তির মালিকানা স্বত্ব তাহলে আপনার ওপরেই বর্তাচ্ছে?’

হ্যাঁ, সেরকমই তো মনে হচ্ছে৷’

‘তাঁর কাছাকাছি কোন আত্মীয়-স্বজর ছিলো?’

‘সম্ভভত না৷ আর থাকলেও তাদের কথা ও আমাকে কখনও জানায়নি৷ শুনেছি, ছোটবেলাতেই ওর মা বাবা দুজনেই মারা যায়—ওর আর কোন ভাই বা বোন নেই৷’

‘সে যাই হোক, রেখে যাওয়ার মতো তেমন বিষয়-সম্পত্তি তাহলে আপনার স্ত্রীর ছিলো না?’

কেনেথ মার্শাল শীতল স্বরে জবাব দিলেন, বরং ঠিক তার উলটো৷ মাত্র বছর দুয়েক আগে, ওর এক পুরনো বন্ধু স্যার রবার্ট আরস্কিন মারা যান, এবং তাঁর সমস্ত বিষয়-সম্পত্তি তিনি আর্লেনাকেই উইল করে দিয়ে যান৷ সে সম্পত্তির আর্থিক মুল্য, আমার অনুমান, প্রায় পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট চোখ তুলে তাকালেন৷ তাঁর দৃষ্টিতে ফুটে উঠলো এক তৎপর প্রতিক্রিয়া৷ এ পর্যন্ত তিনি একেবারেই নীরব ছিলেন, এবার প্রশ্ন করলেন, ‘তাহলে প্রকৃতপক্ষে আপনার স্ত্রী একজন ধনী মহিলা ছিলেন, ক্যাপ্টের মার্শাল?’

কেনেথ মার্শাল কাঁধ ঝাঁকালেন, ‘হ্যাঁ, তা হয়তো ছিলো৷’

আর তা সত্ত্বেও আপনি বলতে চান তিনি কোন উইল করে যাননি?’

‘আপনারা ওর সলিসিটরদের প্রশ্ন করতে পারেন৷ কিন্তু আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি ও কোন উইল করেনি৷ এটাকে ও অমঙ্গলসূচক কাজ বলে মনে করতো৷’

কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর মার্শাল যোগ করলেন, ‘আপনার আর কিছু জিজ্ঞাসা আছে?’

ওয়েস্টন মাথা নাড়লেন, মনে হয় না—কি, কলগেট? না, আপাতত প্রশ্নের পালা শেষ৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল, আপনার এই আকস্মিক ক্ষতিতে আমি আরও একবার আপনাকে সমবেদনা জানাচ্ছি৷’

মার্শালের চোখের পাতা কেঁপে উঠলো৷ আচমকা সুরে তিনি জবাব দিলেন, ‘ওহ—ধন্যবাদ৷’

তারপর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন৷

উপস্থিত তিনজন পরস্পরে দিকে তাকালেন৷

ওয়েস্টন বললেন, ‘ঠান্ডা মাথার মক্কেল৷ সহজে ধরা দেবার পাত্র নয়, তাই না? তোমার কি মনে হয় কলগেট?’

ইন্সপেক্টর অনিশ্চিত ভঙ্গীতে মাথা নাড়লেন৷

‘বলা শক্ত৷ তিনি সে ধরনের লোক নন যাঁরা নিজেদের মনের ভাব অভিব্যক্তিতে প্রকাশ করেন৷ এবং এ ধরনের লোকেরা সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে জুরীদের সহানুভূতিকে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে পারেন না৷ সত্যি কথা বলতে কি, এই কারণে একাধিকবার তাঁদের ওপরই কিঞ্চিৎ অবিচারও করা হয়েছে৷ অনেক সময় তাঁদের মনের ভেতরে চিন্তা ও সমস্যার তুমুল আলোড়ন উঠলেও তাঁরা মুখের পর্দার সে মানসিকতার প্রতিবিম্ব ফুটিয়ে তুলতে পারেন না—সোজা কোথায়, অভিব্যক্তি প্রকাশে তাঁরা সম্পূর্ণ অক্ষম৷ ঠিক এই ধরনের স্বভাবের জন্যেই ওয়ালেসের বিরুদ্ধে জুরীরা ‘অপরাধী’ রায় দিতে বাধ্য হয়৷ তাঁদের এই রায় সাক্ষ্য-নির্ভর ছিলো না৷ তাঁরা বিশ্বাসই করতে পারেননি, কোন স্বামী তাঁর স্ত্রীকে হারিয়ে এত সহজ ও শান্তভাবে ব্যাপারটাকে মেনে নিতে পারেন৷’

ওয়েস্টন ফিরলেন পোয়ারোর দিকে৷

‘আপনি কি বলেন, মঁসিয়ে পোয়ারো?’

এরকুল পোয়ারো হাত তুলে একটা ভঙ্গী করলেন৷ বললেন, ‘কি-ই বা বলা সম্ভব৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল হলেন অবরুদ্ধ সিন্দুক—আবদ্ধ শুক্তি৷ তিনি নিজের ভূমিকা ইতিমধ্যেই বেছে নিয়েছেন৷ তিনি কিছুই শোনেননি, কিছুই দেখেননি, এবং কিছুই জানেন না!’

‘তবে খুনের উদ্দেশ্য হিসেবে অনেকগুলো কারণ আমাদের সামনে রয়েছে৷’ বললেন কলগেট, ‘প্রথমত রয়েছে ঈর্ষা, আর রয়েছে মিসেস মার্শালের রেখে যাওয়া প্রচুর অর্থ—এ দুটোয় যে কোনটাই খুনের জোরালো কারণ হতে পারে৷ অবশ্য এমনিতেই স্ত্রীর মৃত্যুর ক্ষেত্রে স্বামীই প্রথম এবং প্রধান সন্দেহভাজন ব্যক্তি, তাকে সন্দেহ করার কথাটাই সর্বাগ্রে আমাদের মনে আসে সুতরাং যদি আমরা জানতে পারি যে ক্যাপ্টেন মার্শাল নিজের স্ত্রীর ব্যভিচারের কথা সবই জানতেন, তাহলে ;’

পোয়ারো বাধা দিলেন, বললেন, ‘আমার মনে হয় তিনি তা জানতেন৷’

‘আপনার এ ধারণার কারণ?’

‘কারণ, গতরাত্রে আমি সানি লেজ-এ মিসেস রেডফার্নের সঙ্গে কথা বলছিলাম৷ সেখান থেকে হোটেলে ফিরে আসার পথে আমি ওদের দুজনকে—মানে মিসেস মার্শাল ও প্যাট্রিক রেডফার্নকে দেখতে পাই৷ এবং তার কয়েক সেকেন্ড পরেই ক্যাপ্টেন মার্শালের সঙ্গে আমার আচমকা সাক্ষাৎ হয়৷ তাঁর মুখমণ্ডল যথারীতি অভিব্যক্তিশূন্য, অচঞ্চল ও কঠিন৷ কিন্তু তাঁর ওই চেষ্টাকৃত অভিব্যক্তিশূন্যতা আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি৷ তিনিও ওদের দেখতে পেয়েছেন, সে সম্পর্কে আমার মনে সন্দেহের আর লেশমাত্র ছিলো না!’

কলগেট সন্দেহসূচকভাবে একটা গম্ভীর শব্দ করলেন৷

তিনি বললেন, ‘ও—তাহলে আপনার যদি সেইরকম মনে হয় থাকে—’

‘মনে হওয়া’ নয়, আমি নিঃসন্দেহ! কিন্তু তার থেকে কতটুকুই বা আমরা জানতে পারছি? কেনেথ মার্শাল নিজের স্ত্রী সম্পর্কে প্রকৃতপক্ষে কি ভাবতেন তা আমরা এখনও জানি না৷’

কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘স্ত্রীর মৃত্যুকে তিনি বড় সহজভাবে নিয়েছেন৷’

পোয়ারো অতৃপ্তভাবে মাথা নাড়লেন৷

ইন্সপেক্টর কলগেট বললেন, ‘কখনও কখনও এই সব আপাত-শান্ত লোকেরা ভেতরে ভেতরে ভীষণ উগ্র হয়৷ তাঁদের সমস্ত আবেগ, অনুভূতি দিনের পর দিন মনে আবদ্ধ থাকে বলেই চূড়ান্ত বিস্ফোরণটা হয় ভয়ঙ্কর৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল হয়তো তাঁর স্ত্রীকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন—আর সেই জন্যেই ছিলেন অস্বাভাবিক রকম ঈর্ষাপরায়ণ৷ কিন্তু সে অনুভূতি বাইরে প্রকাশ করার মতো লোক তিনি নন৷’

পোয়ারো ধীর স্বরে বললেন, ‘হয়তো সম্ভব৷ কারণ আমাদের এ ক্যাপ্টেন মার্শাল বড় অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ৷ তাঁর প্রতি আমার যথেষ্ট কৌতূহল রয়েছে৷ যেমন রয়েছে তাঁর অ্যালিবাই সম্পর্কে৷’

‘টাইপরাইটার-অ্যালিবাই!’ শব্দ করে হাসলেন ওয়েস্টন, ‘এ ব্যাপারে তোমার মতামত কি কলগেট?’

ইন্সপেক্টর কলগেটের উজ্জ্বল চোখজোড়া ঈষৎ সঙ্কুচিত হলো৷ তিনি বললেন, ‘সত্যি কথা বলতে কি, স্যার অ্যালিবাইটা আমাকে মোটামুটি সন্তুষ্টই করেছে৷ কারণ ওটা বেশি রকম নিখুঁত তো নয়ই, বরং বলতে পারেন—স্বাভাবিক৷ যদি আমরা জানতে পারি যে সেই পরিচারিকাটি তখন কাছাকাছিই ছিলো এবং টাইপরাইটার চলার শব্দ শুনতে পেয়েছিলো, তাহলে আমার মনে হয় এই অ্যালিবাই নিয়েই আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হবে, এবং নিরুপায় হয়েই নজর দিতে হবে অন্যদিকে৷’

‘হুম!’ বললেন, কর্নেল ওয়েস্টন, ‘কিন্তু নজরটা তুমি দেবে কোন দিকে?’

প্রায় মিনিটখানেক ধরে ওঁরা তিনজন প্রশ্নটার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে চেষ্টা করলেন৷

অবশেষে ইন্সপেক্টর কলগেটই স্তব্ধতা ভঙ্গ করলেন৷ তিনি বললেন, ‘গোটা সমস্যাটা এখন নেমে এসেছে একটা প্রশ্নে—কাজটা কি কোন বাইরের লোকের, না হোটেলের কোন অতিথির? মনে রাখবেন, আমি চাকর-বাকরদেরও সন্দেহের আওতা থেকে পুরোপুরি বাদ দিচ্ছি না, তবে আমার মনে হয়, এ ব্যাপারে ওদের কোন ভূমিকা নেই৷ উহুঁ—এ কাজ হয় হোটেলের কোন অতিথির, নয় বাইরে কোন লোকের; এ সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্রও দ্বিধা নেই৷ ব্যাপারটা এইভাবে দেখা ছাড়া আমাদের উপায় নেই৷ তাছাড়া, সবচেয়ে প্রথম আসে—খুনের উদ্দেশ্য৷ এখানে সেটা স্ববৈশিষ্ট্যে বতর্মান : আর্থিক লাভ৷ মিসেস মার্শালের এই আকস্মিক মৃত্যুতে একমাত্র লাভবান হচ্ছেন তাঁর স্বামী, আপাতদৃষ্টিতে অন্তত তাই মনে হচ্ছে৷ এ ছাড়া আর কি উদ্দেশ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি? প্রথম এবং প্রধান—ঈর্ষা৷ ঘটনার দিকে সরাসরি চোখ রেখে আমার মনে হয়, যদি কখনও নিছক প্রেমঘটিত ঈর্ষার কারণে কোনও খুন হয়ে থাকে, তাহলে এটাই সেই একমাত্র উদাহরণ (পোয়ারোর দিকে ফিরে মাথা ঝুঁকিয়ে ইশারা করলেন কলগেট)৷’

পোয়ারো চোখ তুলে তাকালেন ঘরে আভ্যন্তরীণ ছাদের দিকে৷ মৃদু স্বরে বললেন, ‘মানুষের মনের অসংখ্য আবেগের প্রকৃত চরিত্র কজন জানে—’

ইন্সপেক্টর কলগেট বলে চললেন, ভদ্রমহিলার স্বামী তো কিছুতেই স্বীকার করলেন না যা তাঁর স্ত্রীর কোন শত্রু ছিলো—সত্যিকারের শত্রু৷ কিন্তু সেকথা আমি বিশ্বাস করি না৷ আমি বলবো, মিসেস মার্শালের মতো মহিলার প্রচুর শত্রু থাকাটাই স্বাভাবিক—চরম শত্রু৷ আপনি কি বলেন, স্যর?’

পোয়ারো বিনা দ্বিধায় জবাব দিলেন, ‘আপনার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত৷ আর্লেনা মার্শালের শত্রু থাকাটা খুবই স্বাভাবিক৷ কিন্তু আমার মনে হয়, আপনার এই শত্রুতত্ত্বকে ভিত্তি করে বেশিদূরে আমরা এগোতে পারবো না৷ কারণ, আপনি তো জানেন ইন্সপেক্টর, আর্লেনা মার্শালের শত্রুরা সর্বদাই মহিলারা৷’

কর্নেল ওয়েস্টন সম্মতিসূচক একটা গম্ভীর শব্দ করে বললেন, ‘আপনার কথাটায় যুক্তি আছে৷ এই দ্বীপের মিসেস মার্শালের একমাত্র শত্রু ছিলো মহিলারা—’

পোয়ারো বলে চললেন, ‘এবং আমার মনে হয়, এই খুনটা কোন মহিলারা পক্ষে করা সম্ভব৷ আপনাদের ডাক্তারি সাক্ষ্য কি বলছে?’

ওয়েস্টন সেই বিচিত্র শব্দ সহকারে জবাব দিলেন, ‘মিসেস মার্শাল যে কোন পুরুষের হাতে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছেন যে বিষয়ে নীসডনের মনে কোন সন্দেহ নেই, বিশাল, শক্তিশালী একজোড়া হাতের কঠিন নিষ্পেষণ৷ অবশ্য, এও হয়তো সম্ভব যে অমানুষিক শক্তিসম্পন্ন কোন ক্রীড়াবিদ মহিলাই এ মৃত্যুর জন্যে দায়ী—কিন্তু আমার মতে, সেটা একটু কষ্টকল্পনা এবং অস্বাভাবিক৷’

পোয়ারো মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানালেন৷

‘ঠিক তাই৷ চায়ের কাপে আর্সেনিক—বিষাক্ত চকোলেটের বাক্স কিংবা ছুরি—এমন কি পিস্তল পর্যন্ত আমি এগোতে রাজি আছি—কিন্তু শ্বাসরোধ করে হত্যা? অসম্ভব৷ আমাদের প্রার্থিত ব্যক্তি নিঃসন্দেহে কোন পুরুষ৷’

‘কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের সমস্যা হয়ে পড়ছে আরও জটিল৷’ তিনি বলে চললেন, ‘আর্লেনা মার্শালকে অপসারিত করে নিজেদের পথ নিষ্কণ্টক করতে চেয়েছেন এমন ব্যক্তি মাত্র দুজন উপস্থিত আছেন এই হোটেলে—কিন্তু তাঁরা দুজনেই মহিলা৷’

কর্নেল ওয়েস্টন প্রশ্ন করলেন, ‘তার মধ্যে একজন নিশ্চয়ই মিসেস রেডফার্ন?’

‘হ্যাঁ৷ মিসেস রেডফার্ন হয়তো আর্লেনা স্টুয়ার্টকে হত্যা করতে মনস্থির করেছিলেন৷ ধরে নেওয়া যাক, তার যথেষ্ট কারণও ছিলো৷ আমার মনে হয়, মিসেস রেডর্ফানের মতো মহিলার পক্ষে খুন করাটা অসম্ভব কিছু নয়৷ কিন্তু এই বিশেষ ধরনের হত্যাকাণ্ড সম্পূর্ণ তাঁর চরিত্র-বিরোধী৷ তাঁর সমস্ত মানসিক অশান্তি ও ঈর্ষার কথা মনে রেখেও আমি বলবো তিনি আবেগ তাড়িত মহিলা নন৷ ভালোবাসার ক্ষেত্রে তিনি অনুরক্ত এবং একান্ত-নিষ্ঠ উদ্দাম আসক্তিতে বিশ্বাসী নন৷ একটু আগেই আমি যে কথা বললাম—চায়ের কাপে আর্সেনিক, হয়তো সম্ভব—কিন্তু শ্বাসরোধ করে হত্যা, সম্পূর্ণ অসম্ভব! তাছাড়া দৈহিক গঠনের দিক থেকেও এ খুন মিসেস রেডফার্নের পক্ষে করা সম্ভব নয়—এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত৷ আপনারাও হয়তো লক্ষ্য করে থাকবেন, তাঁর হাত এবং পায়ের গড়ন সাধারণের তুলনায় বেশ ছোট৷’

ওয়েস্টন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন৷ বললেন, ‘না, এ কোন মহিলার কর্ম নয়৷ আমাদের প্রার্থিত আসামী নিঃসন্দেহে পুরুষ৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট শব্দ করে কাশলেন৷

‘আমি একটা সম্ভাব্য সমাধান আপনাদের সামনে রাখতে চাই, স্যর ধরে নেওয়া যাক, এই মিঃ রেডফার্নের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগে জনৈক পুরুষের সঙ্গে মিসেস মার্শালের একটু ইয়ে টিয়ে ছিলো, ধরা যাক, তার নাম ‘এক্স’৷ মিঃ রেডফার্ন রঙ্গ মঞ্চে প্রবেশ করা মাত্রই মিসেস মার্শাল এই ‘এক্স’ কে সবিনয় বিদায় দিলেন৷ সুতরাং ‘এক্স’ ঈর্ষা এবং অপমানের জ্বালায় উন্মাদ হয়ে উঠলো৷ সে তার প্রাক্তন প্রেমিকাকে অনুসরণ করে এলো এই অঞ্চলে৷ স্থানীয় কোন বাড়িতে বসে সুযোগের অপেক্ষায় রইলো৷ অবশেষে সে এলো এই দ্বীপে, এবং তার অপমানের প্রতিশোধ নিলো৷ এমনটা ঘটলেও ঘটতে পারে৷’

‘তা পারে৷’ জবাব দিলেন ওয়েস্টন, এবং ‘তোমার অনুমান যদি সত্যি হয়, তাহলে ব্যাপারটা প্রমাণ করতে কোন অসুবিধা হবে না৷ এই মিঃ ‘এক্স’ কি পায়ে হেঁটে দ্বীপে এসেছেন, না নৌকোয়, এটাই সবচেয়ে প্রথমে আমাদের জানতে হবে৷ আমার কাছে দ্বিতীয় পন্থাটাই বেশি সম্ভাব্য বলে মনে হচ্ছে৷ আর তাই যদি হয়, তাহলে সে নিশ্চয়ই কাছাকাছি কোন জায়গা থেকে নৌকো ভাড়া করেছে৷ এ ব্যাপারে তুমি একটু খোঁজ খবর নাও৷’

ওয়েস্টন ফিরে তাকালেন পোয়ারোর দিকে, ‘কলগেটের এই ধারণা সম্পর্কে আপনার কি মত?’

পোয়ারো ধীর স্বরে বললেন, ‘এতে হত্যাকারীকে সুযোগ এবং সম্ভাবনার ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে৷ আর তাছাড়া—ইন্সপেক্টরের কাল্পনিক কাহিনিতে অন্তত এক জায়গায় একটা ভুল থেকে যাচ্ছে৷ কারণ এই ঈর্ষা এবং অপমানের জ্বালায় উন্মত্ত লোকটিকে আমি ঠিক কল্পনায় আনতে পারছি না…’

কলগেট বললেন, ‘কিন্তু স্যর, মিসেস মার্শালের জন্যে পাগল হওয়ার মতো লোকের অভাব এখানে নেই৷ এই রেডফার্নকে দেখুন না—’

‘হ্যাঁ, মানছি… কিন্তু তবুও—’

কলগেট সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে পোয়ারোর দিকে তাকালেন৷

 পোয়ারো মাথা নাড়লেন৷

তাঁর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো৷

তিনি বললেন, ‘কোথাও এমন কিছু একটা রয়েছে, যেটা আমাদের নজর এড়িয়ে গেছে…’