দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
১
যখন রোজামন্ড ডানলি এসে পোয়ারের পাশে বসলো, তখন মনের খুশিকে তিনি গোপন করার চেষ্টা করলেন না৷
অন্যান্য মহিলাদের মতো রোজামন্ড ডানলিনকেও তিনি যে আন্তরিক শ্রদ্ধা করেন সে কথা পোয়ারো কখনও অস্বীকার করেননি৷ ওর স্বাতন্ত্র্য, শরীরে কমনীয় সেষ্ঠব চলার গর্বিত সতর্ক ভঙ্গী তাঁর ভালো লাগে৷ তাঁর ভালো লাগে ওর মেঘ-কালো চুলের সাবলীল ঝর্না এবং ঠোঁটের হাসিতে ছোট্ট শ্লেষের আভাস৷
ওর পরনে গাঢ় নীল পোশাক, তার মাঝে ইতস্তত শুভ্রতার ছোঁয়া৷ প্রথম দৃষ্টিতে পোশাকটা সাধারণ মনে হলেও তাঁর বৈচিত্র পোয়ারোর নজর এড়ালো না৷ রোজামন্ড ডার্নলির তক্ত্বাবধানে পরিচালিত ‘রোজমান্ড লিমিটেড’ লন্ডনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পোশাক তৈরি প্রতিষ্ঠান৷
রোজামন্ড বললো, ‘এখানে আমার একদম ভালো লাগছে না৷ ভাবছি, এত জায়গা থাকতে এখানেই বা কেন বেড়াতে এলাম৷
‘হ্যাঁ, বছর দুয়েক আগে, ঈস্টারের ছুটিতে৷ তখন এখানে এত লোকজন ছিলো না৷’
এরকুল পোয়ারো চোখ ফেরালেন ওর দিকে৷ শান্ত স্বরে বললেন, ‘আপনাকে ভাবিয়ে তোলার মতো কিছু একটা হয়েছে, তাই না?’
ও নীরবে সম্মতি জানালো, পা দোলাতে লাগলো ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে তাকালো চঞ্চল পায়ের দিকে, তারপর বললে, ‘আমি একটা প্রেতাত্মার মুখোমুখি হয়েছি৷ সেটাই আমার চিন্তার কারণ৷’
‘প্রেতাত্মা, মাদমোয়াজেল?’
‘হ্যাঁ৷’
‘কিসের প্রেতাত্মা? কার প্রেতাত্মা?’
‘ওহ, আমার নিজেরই৷’
পোয়ারো শান্ত স্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘সে প্রেতাত্মা কি আপনাকে দুঃখ দিয়েছে?’
ভীষণ দুঃখ৷ সে আমাকে নিয়ে গেছে আমার অতীতে, জানেন…’
ও আনমনাভাবে থামলো, তারপর বললে, ‘একবার ভাবুন তো আমার ছোটবেলার কথা৷ নাঃ, আপনি পারবেন না৷ আপনি তো আর ইংরেজ নন৷’
পোয়ারো প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার শৈশব বুঝি পুরোপুরি ইংরেজ পরিবেশে কেটেছে?’
‘হ্যাঁ, সম্পূর্ণ ইংরেজ পরিবেশে৷ সেই সবুজ গ্রাম—বিশাল জীর্ণ বাড়ি—ঘোড়া, কুকুর—বৃষ্টিতে পথ হাঁটা—শুকনো ডালপালায় আগুন জ্বালানো—বাগানের আপেল গাছ—বরাবরে অর্থাভাব—পুরনো, ছেঁড়া পোশাক—সান্ধ্য পোশাক, বা বছরের পর বছর ধরে চলতো—একটা অবহেলিত বাগান—যেখানে শরৎকালে মাইকেলম্যাস ডেইজিরা চোখ-ধাঁধানো নিশানের মতো হাজির হতো…’
পোয়ারো মৃদু স্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘আর আপনি সেই অতীতে ফিরে যেতে চান?’
রোজামন্ড মাথা নাড়লো, বললো, ‘কেউ ফিরে যেতে পারে না, পারে? সেটা—কখনও হয় না৷ কিন্তু ফিরে যেতে পারলে আমি খুশি হতাম—অন্য কোন ভাবে৷’
পোয়ারো বললেন, ‘তাতে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে৷’
রোজামন্ড সশব্দে হাসলো৷
‘সে তো আমারও আছে!’
পোয়ারো বললেন, ‘আমরা যখন ছোট ছিলাম (এবং সে মাদমোয়াজেল, সত্যিই বহুদিন আগের কথা) তখন একটা খেলা ছিলো৷ তার নাম, ‘তুমি যদি “তুমি” না হতে চাও, তবে কি হতে চাও?’ এর উত্তর ছোট মেয়েলি অ্যালবামে লিখে রাখা হতো৷ অ্যামবামগুলো ছিলো নীল চামড়ায় বাঁধানো, ধারগুলো সোনালী পাতে মোড়া৷ এর উত্তরটা কিন্তু সহজ নয়, মাদমোয়াজেল৷’
রোজামন্ড বললো, হ্যাঁ, আমারও তাই ধারণা৷ কারণ সেটা একটা বিরাট ঝুঁকি৷ কেউই বোধহয় মুসোলিনী বা রানী এলিজাবেথ হতে চাইবে না৷ আর নিজস্ব বন্ধুবান্ধবের কথা যদি বলেন, তাহলে বলবো, তাদের সম্পর্কে আমরা বড্ড বেশি জানি৷ মনে আছে, একবার এক চমৎকার দম্পতির সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিলো৷ ওঁদের পরস্পরের প্রতি ব্যবহার এত উচ্ছল, এত সুন্দর, আর বিয়ের বহু বছর পরেও নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক এত ভালো ছিলো যে আমি মহিলাটিকে রীতিমতো ঈর্ষা করতাম৷ ওঁর সঙ্গে স্বইচ্ছায় জায়গা বদল করতে আমি রাজি ছিলাম৷ পরে আমাকে কে যেন বললো, জনান্তিকে ওঁরা নাকি এগারো বছর ধরে কেউ কারো সঙ্গে কথা বলেন না৷’
ও সশব্দে হাসলো৷
‘এতেই বোঝা যায় যে কারো সম্পর্কে সঠিক কেউ বলতে পারে না, তাই না?’
মুহূর্ত কয়েক-নীরবতার পর পোয়ারো বললেন, ‘অনেকেই কিন্তু আপনাকে ঈর্ষা করবে মাদমোয়াজেল৷’
রোজমন্ড ডার্নলি শীতল স্বরে জবাব দিলো, ‘ওহ, হ্যাঁ৷ স্বাভাবিকভাবেই৷’
চিন্তায় ওর কপালে ভাঁজ পড়লো, ঠোঁটের বক্রতায় ফুটে উঠলো শ্লেষের হাসি৷
‘হ্যাঁ, আমি সত্যিই সার্থক কোন মহিলার এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি৷ আমি সফল সৃজনশীল কোন শিল্পীর মতো তৃপ্তির আনন্দ পাই৷ জামা-কাপড়ের নকশা করতে আমি সত্যি খুব ভালোবাসি৷ এবং সেই সঙ্গে সফল কোন ব্যবসায়ীর আর্থিক পরিতৃপ্তি৷ আমার অবস্থা ভালো, স্বাস্থ্য ভালো, মুখশ্রী মোটামুটি, আর জিভের ধার তেমন বেশি নয়৷’
ও একটু থামলো৷ বিস্তৃত হলো ওর হাসি৷
‘অবশ্য আমার কোন স্বামী নেই! ওই একটা জায়গাতেই আমি হেরে গেছি, তাই না মঁসিয়ে পোয়ারো?’
পোয়ারো মন-রাখা সুরে জবাব দিলেন, ‘মাদমোয়াজেল, আপনি যদি অবিবাহিত হয়ে থাকেন, তার কারণ আমাদের পুরুষদের কেউই আপনাকে তেমনভাবে আকর্ষণ করেনি৷ আপনি নিঃসঙ্গ জীবন বেছে নিয়েছেন নিজস্ব পছন্দ থেকেই, প্রয়োজনের জন্য নয়৷’
‘রোজামন্ড ডার্নলি বললো, ‘কিন্তু তবুও অন্য সব পুরুষদের মতো আপনিও হয়তো মনে মনে বিশ্বাস করেন, স্বামী-পুত্র ছাড়া কোন স্ত্রীলোকই পূর্ণতা পায় না৷’
পোয়ারো কাঁধ ঝাঁকালেন৷
বিয়ে করা এবং সন্তানের মা হওয়া, সেটা সাধারণ স্ত্রীলোকের জন্য৷ আপনার মতো খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন এমন মহিলা শ’য়ে একটা—আরও বেশি, হাজারে একটা দেখা যায়৷’
রোজামন্ড বিস্তৃত হাসলো৷
‘কিন্তু তবুও, আমি একটা বিচ্ছিরি আইবুড়ি ছাড়া কিছু নয়! কেন জানি না, আজকাল সব সময় এই কথাটাই আমার মনে হয়৷ একটা ছাপোষা শান্ত জোয়ান স্বামী আর একপাল আঁচলধরা বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে আমি হয়তো বেশি সুখী হতাম৷ কথাটা সত্যি, তাই না?’
পোয়ারো কাঁধা ঝাঁকালেন৷
‘আপনি যখন বলছেন, মাদমোয়াজেল তখন সত্যি!’
রোজামণ্ড সরবে হেসে উঠলো, ওর ভারসাম্য যেন আবার ফিরে এলো৷ একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে রাখলো ও৷
‘মহিলাদের সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হয়, তা আপনি ভালোই জানেন, মঁসিয়ে পোয়ারো৷ এখন ইচ্ছে করছে, বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে মহিলাদের প্রতিষ্ঠার পক্ষে আপনার সঙ্গে আবার তর্ক জুড়ে দিই৷ অবশ্য এখন আমি যেভাবে আছি, বেশ সুখেই আছি—তা আমি ভালোভাবেই জানি৷’
‘সুতরাং, বাগানের—নাকি বলবো এই সৈকতের?—সমস্ত ফুলই সুন্দর, মাদমোয়াজেল৷’
‘ঠিক বলেছেন৷’
পোয়ারো এবার তাঁর সিগারেট কেস বের করলেন৷ অতি সন্তর্পণে তুলে নিলেন একটা ছোট্ট সিগারেট—নিতান্তই ধূমপানের প্রতি করুণাবশে৷
সর্পিল ধোঁয়ার সূক্ষ্ম পর্দার দিকে রহস্যময় চোখ মেলে মৃদু স্বরে উচ্চারণ করলেন পোয়ারো, ‘তাহলে মিঃ—উহুঁ, ক্যাপ্টেন মার্শাল আপনার একজন পুরনো বন্ধু, মাদমোয়াজেল?’
রোজমন্ড সোজা হয়ে বসলো৷ বললো, ‘কিন্তু আপনি সে কথা জানলেন কি করে? ওহ্ কেন্ বোধহয় বলে থাকবে৷’
পোয়ারো মাথা নাড়ালেন৷
‘কেউ আমাকে কোন কথা বলেননি৷ শত হলেও মাদমোয়াজেল, আমি একজন গোয়েন্দা৷ এক্ষেত্রে এটাই ছিলো যুক্তিসঙ্গত একমাত্র স্পষ্ট সিদ্ধান্ত৷
রোজমণ্ড ডার্নলি বললো, ‘কই, আমি তো বুঝতে পারছি না?’
‘কিন্তু ভেবে দেখুন৷’ ক্ষুদে মানুষটি হাত নেড়ে ব্যাপারটা বোঝাতে চাইলেন, ‘আপনি এখানে এসেছেন এক সপ্তাহ৷ আপনি প্রাণবন্ত, হাসিখুশি উচ্ছল৷ আজ, হঠাৎ আপনি বলছেন প্রেতাত্মার কথা, বলছেন, পুরনো দিনের কথা৷ কি এমন ঘটলো? গত কয়েকদিনে নতুন কেউ এখানে আসেননি, শুধু কাল রাত্রে এসেছেন ক্যাপ্টেন মার্শাল, তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে৷ আর আজ এই পরিবর্তন! সুতরাং এটা অত্যন্ত স্পষ্ট৷’
রোজমন্ড ডার্নলি বললো, ‘হ্যাঁ, কথাটা সত্যি! কেনেথ মার্শাল আমার ছোটবেলাকার বন্ধু৷ মার্শালরা আমাদের পাশের বাড়িতে থাকতো৷ কেন্ আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতো আমার চেয়ে চার বছরে বড় হলেও সমবয়েসীর মতো মিশতো৷ বহুদিন ওর সঙ্গে আমার দেখা নেই৷ তা কম করে—বছর পনেরো তো হবেই৷’
পোয়ারোর কণ্ঠে ভেসে উঠলো গভীর চিন্তার সুর৷
‘পনেরো বছর বড় সুদীর্ঘ সময়৷’
রোজমন্ড মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো৷
কিছুক্ষণ নীরবতার পর এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘ক্যাপ্টেন মার্শাল দরদী মানুষ কি বলেন?’
রোজামন্ড উষ্ণ স্বরে বললো, ‘কেন খুব ভালো৷ সবচেয়ে ভালো লোকদের একজন৷ ভীষণ শান্ত আর চাপা স্বভাবের মানুষ ও৷ আমার মতে, ওর একমাত্র দোষ হলো আজেবাজে বিয়ে করার ঝোঁক৷’
গভীর সমব্যথীর সুরে বললেন পোয়ারো, ‘হুঁ—’
রোজামন্ড ডার্নলি বলে চললো, মেয়েদের ব্যাপারে কেনেথটা একেবারে বোকা—এক নম্বরের বোকা! মাটিংডেল মামলাটা আপনার মনে আছে?’
পোয়ারোর ভুরুজোড়া কুঁচকে উঠলো৷
মার্টিংডেল? মার্টিংডেল? আর্সেনিক, তাই না?’
‘হ্যাঁ৷ সতেরো-আঠারো বছর আগের ঘটনা৷ স্বামীকে খুন করার অপরাধে ভদ্রমহিলাকে অভিযুক্ত করা হয়েছিলো৷’
‘এবং ভদ্রলোক নিয়মিত আর্সেনিক খেতেন এ কথা প্রমাণিত হওয়ার পর তাঁর স্ত্রীকে মুক্তি দেওয়া হয়?’
‘ঠিক তাই৷ আর ছাড়া পাওয়ার পর কেন মেয়েটাকে বিয়ে করে বসলো৷ সাধারণত এই ধরনের বোকার মতো কাজই ও করে থাকে৷’
এরকুল পোয়ারো মৃদু স্বরে বললেন, ‘কিন্তু মেয়েটি যদি নির্দোষ হয়ে থাকে?’
রোজামন্ড অধৈর্য সুরে বললো, ‘হ্যাঁ আমার ধারণা, সে নির্দোষ ছিলো৷ সঠিক কেউ জানে না৷ কিন্তু বিয়ে করার মতো প্রচুর মেয়ে পৃথিবীতে রয়েছে, আপনাকে যে কষ্ট করে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো মেয়েকেই বিয়ে করতে হবে, তার কোন মানে নেই৷’
পোয়ারো নীরব রইলেন৷ হয়তো তিনি জানতেন, নীরব থাকলে রোজমন্ড ডার্নলি ওর কথা বলে যাবে৷ ও তাই করলো৷
‘অবশ্য, তখন কেনের বয়েস খুব কম ছিলো—সবে একুশ৷ বউকে ও প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতো৷ লিন্ডার জন্মের সময় ওর বউ মারা গেলো—ওদের বিয়ের ঠিক এক বছর পর৷ স্ত্রীর মৃত্যুতে কেন ভীষণ ভাবে ভেঙে পড়েছিলো৷ এরপর ও হৈ-চৈ করে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে দেয়—হয়তো সেই দুঃখ ভুলবার জন্যে৷’
ও একটু থামলো৷
‘আর তারপরেই ঘটলো এই আর্লেনা স্টুয়ার্টের ব্যাপার৷ তখন আর্লেনা রিভ্যুতে ছিলো৷ সেখানে কডরিংটন বিবাহ-বিচ্ছেদের মামলা চলছিলো৷ আর্লেনা স্টুয়াটের জন্যেই লেডি কডরিংটন তাঁর স্বামীকে ডিভোর্স করেন৷ লোকে বলে, লর্ড কডরিংটন ওর জন্যে একেবারে মজে গিয়েছিলেন৷ সবাই ভেবেছিলো, আদালতের চূড়ান্ত রায় বেরোলেই ওরা বিয়ে করবে৷ কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা হলো না৷ লর্ড কডরিংটন সরাসরি ওকে পাশ কাটালেন৷ যদ্দুর মনে পড়ে, আর্লেনা প্রতিশ্রুতিভঙ্গের অপরাধে তাঁর নামে মামলা ঠুকেছিলো৷ যাই হোক, তখন এই ব্যাপারটা নিয়ে প্রচুর হৈ-চৈ হয়েছিলো৷ বোকা—এক নম্বরের বোকা৷’
এরকুল পোয়ারো মৃদু স্বরে বললেন, ‘কোন পুরুষকে এ ধরনের বোকামির জন্য ক্ষমা করা যায়—মিস স্টুয়ার্ট অসামান্য সুন্দরী, মাদমোয়াজেল৷’
‘হ্যাঁ, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই৷ বছর তিনেক আগে ওকে নিয়ে হলো আর এক কেলেঙ্কারি৷ স্যার রজার আরস্কিন মারা যাওয়ার সময় তাঁর সমস্ত সম্পত্তি আর্লেনাকে দিয়ে গেলেন৷ আমার ধারণা ছিলো, আর কিছু না হোক, এই ব্যাপারটাই কেনের চোখ খুলে দেবে৷’
‘তাই কি হয়নি?’
রোজামন্ড ডার্নলি কাঁধ ঝাঁকালেন৷
‘বললাম তো, ওর সঙ্গে আমার বহু বছর দেখা নেই৷ অবশ্য, লোকে বলে, ব্যাপারটাকে ও ভীষণ ঠাণ্ডা মেজাজে নিয়েছিলো৷ কিন্তু কেন, সেটাই আমার জানতে ইচ্ছে করে৷ ও কি ওর স্ত্রীকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করে?’
‘হয়তো অন্য কোন কারণ থাকতে পারে৷’
হ্যাঁ৷ অহঙ্কার! সব ব্যাপারেই নির্বিকার থাকা! জানি না, নিজের স্ত্রীর সম্পর্কে সত্যি সত্যি ওর কি ধারণা৷ আমি কেন, কেউ জানে না৷’
‘আর মিসেস মার্শাল? নিজের স্বামী সম্পর্কে তাঁর কি ধারণা?’
রোজামণ্ড স্থির চোখে চেয়ে রইলো পোয়ারোর দিকে৷
ও বললো, আর্লেনা? ও পৃথিবীর সেরা স্বর্ণসন্ধানী৷ আর সেই সঙ্গে একটি নরখাদক বাঘিনী? যদি পুরুষের পোশাকে যে কোন বস্তু ওর একশো গজের মধ্যে আসে, তাহলে তখনই শুরু হয় ওর নতুন খেলা৷ ও ওই ধরনের মেয়ে৷’
পোয়ারো পূর্ণ সম্মতি জানিয়ে ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন৷
‘হ্যাঁ,’ তিনি বললেন, ‘আপনার কথা মিথ্যে নয়…মিসেস মার্শালের চোখ শুধু একটা জিনিসই খুঁজে বেড়ায়—পুরুষ৷’
রোজামন্ড বললো, ‘আপাতত ওর নজর পড়েছে প্যাট্রিক রেডফার্নের ওপর৷ তিনি অত্যন্ত সুপুরুষ—আর, একটু সোজা ধরনের—; নিজের স্ত্রীকে তিনি ভালোবাসেন এবং তথাকথিত কলির কেষ্ট নন৷ ঠিক এই ধরনের পুরুষরাই আর্লেনার প্রিয় খাদ্য৷ মিসেস বেডফার্নকে আমার ভালো লাগে—তাঁর বিবর্ণ চেহারায় একটা নিজস্ব সৌন্দন্দর্য আছে—কিন্তু আমার মনে হয় না, নরখাদক বাঘিনী আর্লেনার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তিনি পেরে উঠবেন৷’
পোয়ারো বললেন, ‘না, আপনি ঠিকই বলেছেন৷’
তাঁর মুখমণ্ডলে যন্ত্রণার ছায়া৷
রোজমন্ড বলল, ‘যতদূর জানি, ক্রিস্টিন রেডফার্ন ইস্কুলের দিদিমণি ছিলেন৷ তিনি সেই ধরনের মহিলা, যাঁরা বিশ্বাস করেন, মনের ওপর ঘটনার প্রভাব থাকে৷ খুব শীগগিরই তিনি এক কঠিন আঘাত পাবেন৷’
পোয়ারো বিহ্বলভাবে মাথা নাড়লেন৷
উঠে দাঁড়ালো রোজামণ্ড, বললো, ‘কি বিশ্রী পরিস্থিতি বলুন তো!’ তারপর ও অনিশ্চিত সুরে যোগ করলো, ‘এ ব্যাপারে কারো অন্তত কিছু করা উচিত৷’
২
শোবার ঘরে আয়নায় নিজের মুখমণ্ডল শান্তভাবে জরীপ করছিলে না লিন্ডা মার্শাল৷ নিজের মুখ ভীষণ অপছন্দ হলো ওর৷ এই মুহূর্তে সে মুখের অধিকাংশে হাড ও বিন্দু বিন্দু দাগের উপস্থিত প্রকট বলে মনে হলো ওর কাছে৷ ও বিরক্তভাবে লক্ষ্য করলো ওর একরাশ নরম বাদামী চুল (ইঁদুর, মনে মনে বলল ও), সবুজ ধূসর চোখ, গালের উঁচু হাড় ও চিবুকের দীর্ঘ উদ্ধত রেখা৷ ওর মুখ দাঁত হয়তো ততটা খারাপ নয়—কিন্তু দাঁতের সৌন্দর্য কি আসে যায়? আর নাকের পাশে ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে ওটা কি কোন দাগ?
নিশ্চিন্ত হয়ে ও সিদ্ধান্ত নিলো, ওটা কোন দাগ নয়৷ ও আপন মনেই ভাবলো, ষোলো বছরে পা দেওয়া খুব বিচ্ছিরি—ভীষণ বিচ্ছিরি৷’
এ সময়ে নিজের সত্যিকারে অবস্থাটা কেউ বুঝতে পারে না৷ লিন্ডা এখন কোন ছোট্ট অশ্বশাবকের মতো হতবুদ্ধি ও শজারুর মতোই স্পর্শবিরূপ৷ নিজের অগোছালো অবস্থা সম্পর্কে ও প্রতিটি মুহূর্তে সচেতন; ও জানে, প্রতিটি মুহূর্তে দ্বিধাগ্রস্ত ওর মন৷ স্কুলের দিনগুলো এত খারাপ ছিলো না৷ কিন্তু এখন ও স্কুল ছেড়ে এসেছে৷ এর পর ও কি করবে তা সঠিক কেউ জানে বলে মনে হয় না৷ ওর বাবা ভাসা ভাসা ভাবে বলছিলেন সামনের শীতে ওকে প্যারিসে পাঠিয়ে দেবার কথা৷ লিন্ডা প্যারিস যেতে চায় না—কিন্তু বাড়িতে থাকতেও ওর ভালো লাগে না৷ এর আগে কোনদিন ও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেনি, আর্লেনাকে ও কি ভীষণ অপছন্দ করে৷
লিন্ডার কচি মুখ টান টান হলো উত্তেজনায়, সবুজ চোখজোড়া হয়ে উঠলো কঠিন৷
আর্লেনা…৷
ও আপনার মনেই ভাবলো, ‘ও একটা পশু—একটা পশু…৷’
সৎমা৷ সৎমা থাকাটাই ভীষণ বিচ্ছিরি, সবাই তাই বলে৷ এবং কথাটা সত্যি৷ আলেনা যে ওর সঙ্গে নিষ্ঠুর ব্যবহার করে তা নয়৷ বেশির ভাগ সময় লিন্ডাকে ও খেয়ালই করে না৷ যখন করে তখন ওর চোখে, কথায়, থাকে, এক অবজ্ঞাভরা কৌতুক৷ আর্লেনার নিখুঁত চালচলন লিন্ডার কিশোরীসুলভ বিশৃঙ্খল অবস্থাকে করে তোলে আরও বেশি প্রকট৷ আর্লেনা আশেপাশে থাকলে, যে কেউই নিজেকে ভীষণ অপরিণত অমার্জিত ভেবে লজ্জা পায়৷
কিন্তু শুধু তাই নয়৷ না, শুধুমাত্র তাই নয়৷
মনের আনাচে-কানাচে খাপছাড়াভাবে হাতড়ে চললো লিন্ডা৷ মনের বিভিন্ন ভাবকে আলাদা করে বেছে নিয়ে তাদের নামকরণে তেমন অভ্যস্ত নয় ও৷ কি যেন একটা করে আর্লেনা—মানুষগুলোকে—বাড়িটাকে—
‘ও খারাপ,’ সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবলো, লিন্ডা, ‘ও ভীষণ, ভীষণ খারাপ৷’
কিন্তু এখানেই থামলে চলবে না৷—নিছক নৈতিক উন্নাসিকতায় নাক সিঁটকে ওকে মন থেকে সরিয়ে দেওয়া যায় না৷
মানুষগুলোকে ও কি যেন করে৷ বাবা—বাবা এখন সম্পূর্ণ অন্যরকম…
ব্যাপারটা অবাক হয়ে ভাবলো ও৷ বাবা ওকে স্কুল থেকে ফিরিয়ে নিতে আসছেন৷ বাবা ওকে নিয়ে যাচ্ছেন জাহাজে করে বেড়াতে৷ এবং সেই বাবা, বাড়িতে আর্লেনার সঙ্গে যেন—যেন নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেন৷ এবং তাঁর মন সেখানে থাকে না৷
লিন্ডা ভাবলো, ‘আর এইভাবেই চলবে৷ দিনের পর দিন—মাসের পর মাস৷ এ আমার কাছে অসহ্য৷’
জীবনের ওর সামনে দীর্ঘায়িত হলো—অন্তবিহীন—আর্লেনার উপস্থিতিতে অন্ধকার ও বিষাক্ত একরাশ দিনের মিছিলে৷ ওর শিশুসুলভ মনে সময় সম্পর্কে এখনও কোন স্পষ্ট ধারণা গড়ে ওঠেনি৷ লিন্ডার কাছে এক-একটা বছর যেন মনে হয় অনন্তকাল৷
আর্লেনার প্রতি ঘৃণা এক বিশাল কালো জ্বলন্ত ঢেউ উথলে উঠলো ওর মনে৷ ও ভাবলো, ‘ওকে আমার খুন করতে ইচ্ছে করে৷ ইস! যদি ও মরে যেতো…!’
আয়নার ওপরে চোখ তুলে ও তাকালো দূরে সমুদ্রের দিকে৷
এ জায়গাটা সত্যিই চমৎকার৷ অথবা চমৎকার হতে পারতো৷ মনোরম সমুদ্রতীর, নির্জন উপকূল৷ আর পায়ে চলার বিচিত্র আঁকাবাঁকা পথ৷ অজানা জায়গা আবিষ্কারের আনন্দ৷ এবং একা একা গিয়ে খুশিমতো হুল্লোড় করার কত জায়গা৷ এছাড়া গুহা আছে, কাওয়ানদের ছেলেরা ওকে তাই বলছিলো৷
লিন্ডা ভাবলো, ‘শুধু যদি আর্লেনা এখান থেকে চলে যেতো, তাহলে আমি আনন্দ করতে পারতাম৷’
ওর মনে ফিরে গেলো সেই বিকেলে, যেদিন ওরা এখানে এসে উপস্থিত হয়েছিলো৷ মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপে আসাটা হয়েছিলো বেশ মজার৷ কংক্রীটের সেতুটা তখন জোয়ারে জলে ডুবে ছিলো ওরা এসেছিলো নৌকো করে৷ হোটেলটাকে দেখে কেমন রোমাঞ্চকর এবং অদ্ভুত মনে হয়েছিলো লিন্ডার৷ আর তারপর, সামনের খোলা চত্বরে বসে থাকা একজন লম্বা তামাটে চেহারার মহিলা ওদের দেখে লাফিয়ে উঠেছেন বলেছেন, ‘আরে, কেনেথ!’
এবং ওর বাবা, ভীষণ অবাক চোখে তাকিয়ে বিস্মিতভাবে বলে উঠেছেন, ‘রোজামন্ড!’
ও সিদ্ধান্ত নিলো, রোজামন্ডকে ও মেনে নিতে পেরেছে৷ রোজমন্ড, ও ভাবলো, বেশ বুদ্ধিমতী৷ আর ওর চুল কত সুন্দর—যেন ওর চেহারার সঙ্গে মানিয়েই তৈরি—বেশির ভাগ লোকের চুলই তাদের চেহারার বেমানান হয়৷ এছাড়া ওর পোশাকও চমৎকার৷ আর ও মুখে সর্বদাই কেমন এক অদ্ভুত খুশি—যেন সেই খুশির লক্ষ্য রোজামণ্ড নিজে, অন্য কেউ নয়৷ রোজমন্ড, ওর সঙ্গে, লিন্ডার সঙ্গে, সুন্দর ব্যবহার করেছে৷ কখনও আজেবাজে কথা বলেনি৷ (‘আজেবাজে’ শব্দের মধ্যে নিহিত রয়েছে লিন্ডার একরাশ বিভিন্ন অপছন্দ) আর রোজামন্ড কখনো এমন ভাব করেনি যাতে মনে হয় লিন্ডাকে ও বোকা ভাবছে৷ সত্যি কথা বলতে কি, লিন্ডাকে, সত্যিকারে মানুষ মনে করেই ওর সঙ্গে কথা বলেছে রোজামন্ড৷ এত কম সময়ে লিন্ডার নিজেকে সত্যিকারে মানুষ বলে মনে হয় যে কেউ ওকে সে মর্যাদা দিলে ও তার প্রতি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ হয়ে পড়ে৷
বাবাকে দেখে মনে হয়েছে, মিস ডার্নলিকে দেখে তিনি খুশি হয়েছেন৷
আশ্চর্য তাঁকে দেখে মনে হয়েছে সম্পূণ অন্য মানুষ, যেন মুহূর্তে বদলে গেছেন৷ তাঁকে দেখে মনে হয়েছে লিন্ডা অনেক ভেবে ঠিক করলো—হ্যাঁ, যেন তাঁর বয়েস অনেক কমে গেছে! তিনি সরবে হেসে উঠেছেন—এক অদ্ভুত বালকসুলভ হাসি৷ এখন লিন্ডার হঠাৎ মনে পড়লো বাবাকে সে খুব কম সময়েই হাসতে দেখেছে৷
ও কেমন বিহ্বল হয়ে পড়লো৷ যেন ও এক ঝলক দেখতে পেয়েছে সম্পূর্ণ অন্য একজন মানুষকে৷ ও ভাবলো, ‘আমার বয়েসে বাবা কি রকম ছিলো কে জানে…৷’
কিন্তু সে ভাবনা অনেক শক্ত৷ ও হাল ছেড়ে দিলো৷
একটা নতুন চিন্তা ঝলসে উঠলো ওর মনে৷
যদি ওরা এখানে এসে মিস ডার্নলির দেখা পেতো—শুধু ও আর বাবা—তাহলে কি মজাটাই না হতো৷
কিছুক্ষণের জন্য খুলে গেলো কল্পনার দরজা, ফুটে উঠলো এক কল্পদৃশ্য৷ বাবা, ছোট ছেলের মতো হাসছেন, মিস ডার্নলি, আর ও নিজে—সঙ্গে এই দ্বীপের সমস্ত মজা, আনন্দ সমুদ্রস্নান—গুহা৷
আবার ঝাঁপিয়ে পড়লো অন্ধকারে ঢেউ৷
আর্লেনা৷ আর্লেনা সঙ্গে থাকলে কারও পক্ষেই আনন্দ করা সম্ভব নয়৷ কেন সম্ভব নয়? কে জানে, তবে অন্তত ওর পক্ষে, লিন্ডার পক্ষে, সম্ভব নয়৷ কে সুখী হতে পারে, যদি এমন কেউ কাছাকাছি থাকে যাকে সে—ঘৃণা করে? হ্যাঁ, ঘৃণা৷ আর্লেনাকে ও ঘৃণা করে৷
অত্যন্ত ধীরে ঘৃণার সেই কালো জ্বলন্ত ঢেউ আবার উত্থলে উঠলো৷
লিন্ডার মুখ হয়ে গেলো ফ্যাকাশে৷ ওর ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক হলো৷ ওর চোখের তারা তীক্ষ্ণ হয়ে এলো৷ এবং ওর আঙুলগুলো ক্রমশ কঠিন হয়ে আঁকড়ে ধরলো বাতাস…৷
৩
স্ত্রীর ঘরে দরজায় টোকা মারলেন কেনেথ মার্শাল৷ ওর সাড়া পেতেই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন তিনি৷
আর্লেনা তখন শেষবারের মতো নিজের সাজগোজ দেখে নিচ্ছিলো৷ ওর পরনে চোখ-ধাঁধানো সবুজ পোশাক—অনেকটা মৎস্যকন্যার মতো৷ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখের পাতায় ও ম্যাস্কারা লাগাচ্ছিল, বললো, ‘ও—তুমি!’
‘হ্যাঁ৷ দেখতে এলাম তোমার হলো কিনা৷’
‘আর এক মিনিট৷’
কেনেথ মার্শাল ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন জানলার কাছে৷ তাকালেন সমুদ্রের দিকে৷ তাঁর মুখমণ্ডল, বরাবরের মতোই, অভিব্যক্তিহীন৷ সেই সঙ্গে শান্ত এবং স্বাভাবিক৷
ঘুরে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, ‘আর্লেনা?’
‘উঁ—?’
‘রেডফার্নকে তুমি আগে থেকে চিনতে, তাই না?’
আর্লেনা সহজভাবেই জবাব দিলো, ‘হ্যাঁ, সোনা৷ কোন একটা ককটেল পার্টিতে যেন দেখা হয়েছিলো৷ ওকে আমাকে বেশ ভালো লেগেছিলো৷’
‘আমারও সেইরকম ধারণা৷ তুমি কি জানতে যে সে এবং তার স্ত্রী এখানে বেড়াতে আসছে?’
আর্লেনা মেলে ধরলো ওর গভীর আয়ত চোখ৷
‘ওঃ, না, সোনা৷ সেইজন্যেই তো ভীষণ অবাক হয়ে গেছি৷’
কেনেথ মার্শাল শান্ত স্বরে বললেন, ‘আমি ভাবছিলাম, হয়তো সেটা জানতে বলেই এ জায়গাটার কথা তোমার মাথায় এসেছে৷ আমরা যাতে এখানেই আসি, সেজন্যে তুমি বরাবরই একটু বেশি আগ্রহ দেখিয়েছো৷’
আর্লেনা ম্যাস্কারা নামিয়ে রাখলো, ঘুরে তাকালো স্বামীর দিকে। হাসলো নেশাধরানো নরম হাসি৷ বলল, ‘এ জায়গাটার কথা কে যেন আমাকে বলেছিলো৷ সম্ববত রোজান্ডরা৷ ওরা বলেছিলো, জায়গাটা ভীষণ চমৎকার—আর সুন্দর৷ কেন, তোমার ভালো লাগছে না?’
কেনেথ মার্শাল বললেন, ‘কি জানি, জানি না৷’
‘ওঃ কেন তুমি তো সমুদ্রে স্নান করতে আর ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতে৷ এখানে তোমার নিশ্চয়ই ভালো লাগবে৷’
‘বেশ বুঝতে পারছি, জায়গাটা তোমার অন্তত ভালোই লাগবে৷’
আর্লেনার আয়ত চোখ আরও বিস্তৃত হলো৷ অনিশ্চিত দৃষ্টিতে ও তাকালো কেনেথ মার্শালের দিকে৷
কেনেথ মার্শাল বললেন, ‘আমার মনে হয়, আসলে ব্যাপারটা হলো, তুমি রেডফার্নকে আগেই জানিয়েছো যে তুমি এখানে আসছো৷’
আর্লেনা বললো, কেনেথ সোনা, তুমি এরকম করে কথা বলছো কেন?’
কেনেথ মার্শাল বললেন, ‘শোনো আর্লেনা৷ তুমি কি ধরনের মেয়ে আমি জানি৷ তাই বলছি, রেডফার্নরা মোটামুটি সুখী স্বামী-স্ত্রী৷ ছেলেটা সত্যিই ওর বউকে ভালোবাসে৷ তুমি কি চাও ওদের এই সুখের সম্পর্কে চিড় ধরুক?’
আর্লেনা বলল, ‘আমাকে দোষ দেওয়াটা তোমার ঠিক হচ্ছে না, কেন৷ আমি তো কিছু করিনি—কিছুই করিনি৷ আমি কি করতে পারি, যদি—’
আর্লেনার কথার খেই ধরে প্রশ্ন করলেন কেনেথ মার্শাল, ‘যদি কি?’
আর্লেনার চোখের পাতায় কাঁপন ধরলো৷
‘অবশ্য, আমি জানি, পুরুষরা আমাকে দেখলে পাগল হয়ে যায়৷ কিন্তু সেটা তো আমার দোষ নয়৷ ওদের অমনি হয়৷’
‘তাহলে তুমি স্বীকার করছো, রেডফার্ন তোমার জন্য পাগল?’
আর্লেনা অস্পষ্ট স্বরে জবাব দিলো, ‘সেটা নিছকই ওর বোকামি৷’
ও এক পা এগিয়ে গেলো স্বামীর দিকে৷
‘কিন্তু তুমি তো জানো, কেন, তুমি ছাড়া আর কারো কথা আমি ভাবি না?’
কৃষ্ণাভ চোখের পাতার ফাঁকে কেনেথ মার্শালের চোখে তাকালো আর্লেনা৷
সে দৃষ্টি এক কথায় বিস্ময়কর—যা খুব কম পুরুষই প্রতিরোধ করতে পারে৷
কেনেথ মার্শাল গম্ভীরভাবে চোখ নামালেন আর্লেনার চোখে৷ তাঁর মুখ অভিব্যক্তিহীন৷ কণ্ঠস্বর শান্ত৷ তিনি বললেন, ‘আমার ধারণা, তোমাকে আমি বেশ ভালোভাবেই চিনি, আলেনা…’
৪
হোটেলের দক্ষিণ দিকে বেরোলেই আপনার চোখে পড়বে সামনে বিস্তৃত বাঁধানো উঠোন, আর তার নিচেই সমুদ্রতীর৷ দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের ছোট পাহাড়টার কোল ঘেঁষে আরও একটা পথ দ্বীপকে ঘিরে এগিয়ে গেছে৷ সেই পথ ধরে কিছুটা গেলে কয়েক ধাপ সিঁড়ি আপনাকে নামিয়ে নিয়ে যাবে পাহাড়ের পাথর কেটে তৈরি কতকগুলো কৃত্রিম কুঠুরীর দিকে৷ হোটেল থেকে প্রচারিত দ্বীপের মানচিত্রে এই জায়গাটাকে ‘সানি লেজ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে৷ কৃত্রিম গুহাগুলোর ভেতরে পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে কতকগুলো বেদী—বসার জন্য৷
নৈশভোজের ঠিক পরেই প্যাট্রিক রেডফার্ন ও তার স্ত্রী এসে বসলো—এই রকমই একটা গুহায়৷ রাতের স্পষ্ট আকাশে চোখে পড়েছে উজ্জ্বল চাঁদ৷
কিছুক্ষণ ওরা চুপচাপ রইলো৷
অবশেষে প্যাট্রিক রেডফার্ন মুখ খুললো, ‘আজকের রাতটা খুব সুন্দর তাই না ক্রিস্টিন?’
‘হুঁ —’
ওর কণ্ঠস্বরে একটা অদ্ভুত আভাস পেয়ে প্যাট্রিক অস্বস্তি বোধ করলো৷ ওর দিকে না তাকিয়েই সে চুপচাপ বসে রইলো৷
ক্রিস্টিন ওর স্বভাবসিদ্ধ শান্ত স্বরে প্রশ্ন করলো, ‘তুমি কি জানতে যে ওই মেয়েটা এখানে আসছে?’
প্যাট্রিক চমকে ঘুরে তাকালো, বললো, ‘তার মানে?’
‘আমার তো মনে হয়, মানেটা বেশ ভালো বুঝতে পারছো!’
‘শোনো, ক্রিস্টিন—জানি না, হঠাৎ তোমার কি হয়েছে—’
বাধা দিলো ক্রিস্টিন৷ ও স্বরে আবেগের স্পর্শ, ও শরীর কাঁপচে৷
‘আমার কি হয়েছে? আমার কিছু হয়নি, হয়েছে তোমার৷’
‘আমার কিছু হয়নি—’
‘ও—প্যাট্রিক! কিছু একটা হয়েছে! তুমি এখানে আসার জন্যে প্রথম থেকে জোর করেছিলে৷ আমার কোন কথা কানে তোলনি৷ আমি টিন্টাজেলে আবার যেতে চেয়েছিলাম—সেখানে আমাদরে হানিমুন কেটেছিলো৷ কিন্তু তুমি এখানে আসার জন্যে একেবারে গোঁ ধরে ছিলে৷’
হ্যাঁ, তাতে কি হয়েছে? এ জায়গাটা অত্যন্ত চমৎকার৷’
‘হয়তো৷ কিন্তু তুমি এখানে আসতে চেয়েছিলে যেহেতু ও এখানে আসছে৷’
‘ও? ও মানে?’
‘মিসেস মার্শাল৷ তুমি—তুমি ওর মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছো৷’
‘ভগবানের দোহাই, ক্রিস্টিন, বোকার মতো কথা বলো না৷ কাউকে ঈর্ষা করা তো তোমার স্বভাব নয়!’
প্যাট্রিকের স্বরে উন্মক্ত ক্রোধের অনিশ্চিত সুর, এবং তার তীব্রতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি৷
ক্রিস্টিন বললো, ‘আমরা কত সুখী ছিলাম৷’
‘সুখী? নিশ্চয়ই আমরা সুখী ছিলাম! আর এখনও আছি৷ কিন্তু আমাকে কোন মেয়ের সঙ্গে দুটো কথা বলতে দেখলেই তুমি যদি এমনি খুঁচিয়ে ঝগড়া করো, তাহলে আর বেশি দিন সুখে থাকা বোধহয় সম্ভব হবে না৷’
‘না, তা নয়৷’
‘হ্যাঁ, তাই৷ বিয়ের পর কোন পুরুষের অন্য লোকেদের সঙ্গে—ইয়ে—বন্ধুত্ব হওয়াটা নেহাৎই স্বাভাবিক৷ সে ক্ষেত্রে এ ধরনের সন্দেহজনক মনোভাবে মোটেই ঠিক নয়৷ আমি কোন সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে কথা বললেই তুমি ধরে নিচ্ছো আমি তার প্রেমে পড়েছি—’
সে থামলো, তারপর কাঁধ ঝাঁকালো৷
ক্রিস্টিন রেডফার্ন বললো, ‘তুমি সত্যিই ওর প্রেমে পড়েছো…’
‘ওঃ, বোকামো কোরো না, ক্রিস্টিন! আমি—আমি ওর সঙ্গে ভালো করে কথাই পর্যন্ত বলিনি৷’
‘মিথ্যে কথা৷’
‘ভগবানের দোহাই পথে দেখা হওয়া প্রতিটি সুন্দরী মেয়েকে ঘিরে আমাকে সন্দেহ করার এ স্বভাব তুমি ছাড়ো৷’
ক্রিস্টিন রেডফার্ন বলল, ‘ও নিছকই একটা সুন্দরী মেয়ে নয়! ও—ও অন্য রকম৷ ও একটা নষ্ট মেয়েছেলে!৷ ও তোমার ক্ষতি করবে, প্যাট্রিক৷ আমার কথা শোনো,এসব ছেড়ে দাও৷ চলো, আমরা এখান থেকে চলে যাই৷’
প্যাট্রিক রেডফার্নের উদ্ধত চিবুকে ফুটে উঠলো বিদ্রোহী ভাব৷ বয়েসের তুলনায় অনেক বেশি তরুণ দেখালো তাকে৷ প্রতিবাদের সুরে সে বলে উঠলো, ‘একটু ভেবেচিন্তে কথা বলো, ক্রিস্টিন৷ আর—আর এ নিয়ে ঝগড়া কোরো না’
‘আমি তো ঝগড়া করছি না৷’
‘তাহলে একটু সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের মতো আচরণ করো৷ এসো, হোটেলে ফিরে যাওয়া যাক৷’
প্যাট্রিক উঠে দাঁড়ালো৷ কিছুক্ষণ নীরব থেকে ক্রিস্টিন রেডফার্ন উঠে দাঁড়ালো৷
ও বললো, ‘আচ্ছা চলো…’
পাশের কুঠুরীতে বসে গভীর দুঃখে মাথা নাড়লেন এরকুল পোয়ারো৷
অন্য কেউ হয়তো সাধারণ ভদ্রতাবোধেই এই ব্যক্তিগত কথাবার্তার শ্রবণ-সীমার বাইরে নিজেকে সরিয়ে নিতেন, কিন্তু এরকুল পোয়ারো নয়৷ এ ধরনের ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণ বিবেকহীন৷
‘তাছাড়া—’ পরে কোন একদিন তিনি তাঁর বন্ধু হেস্টিংসের কাছে এর ব্যাখ্যা করেছিলেন, ‘ওই ঘটনার সঙ্গে একটা খুনের প্রশ্ন জড়িয়ে ছিলো৷’
হেস্টিংস অবাক চোখে চেয়ে থেকে বলেছেন, ‘কিন্তু তখনও তো খুনটা হয়নি৷’
এরকুল পোয়ারো দীর্ঘশ্বাস ফেললেন৷ বললেন, ‘না হয়নি৷ কিন্তু বন্ধু সেই মুহূর্তে আমি তার স্পষ্ট ইঙ্গিত পেয়েছিলাম৷’
‘তাহলে তুমি সেটা রুখলে না কেন?’
তখন এরকুল পোয়ারো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, যে কথা তিনি আগে মিশরেও একবার বলেছেন, যে যদি কোন মানুষ খুন করার জন্য বদ্ধপরিকর হয়, তবে তাকে বাধা দেওয়া নেহাৎ সহজ কাজ নয়৷ পরবর্তী ঘটনার জন্য তিনি নিজেকে কখনও দোষারোপ করেননি৷ কারণ তাঁর মতে খুনটা ছিলো অনিবার্য৷
