গল্প
উপন্যাস

শুধু যাওয়া আসা – ৯

নয়

সকালের সোনা-রোদ সরাসরি চোখে এসে পড়তেই ঘুম ভাঙল৷ শরীরে এক বিচিত্র অবসাদ৷ আড়মোড়া ভেঙে, মাথা তুলে বিছানার পাশে-রাখা ঘড়ির দিকে তাকালাম—ছ-টা বেজে কুড়ি মিনিট৷ লোলা কখন চলে গেছে জানি না, কিন্তু ওর সেন্টের নেশা-ধরানো মিষ্টি গন্ধ এখনও বিছানায় মিশে রয়েছে৷

আমাদের যখন একসঙ্গেই থাকতে হবে, তখন আর শত্রুতা করে লাভ কী?

লোলার কথাগুলো মনে পড়ায় হাসি পেল৷ না মিসেস লোলা জেনসন, শেট কারসনকে আপনি এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি৷ আপনার বড়লোক হওয়ার সুখ-স্বপ্ন ওই সিন্দুকের ভিতর যেমন বন্ধ আছে—তেমনি থাকবে৷ শেট আর যাই হোক, বোকা নয়৷

বিচানা ছেড়ে বাথরুমে গেলাম৷ দাড়ি কামিয়ে, স্নান সেরে জামা-কাপড় পরে নিলাম৷ আজ সকালে লোলার মনোভাব কিরকম আছে, জানা দরকার৷ সুতরাং আর দেরি না করে পা বাড়ালাম রেস্তোরাঁর দিকে৷

কাউন্টার পার হয়ে রান্নাঘরের দরজায় হাত রেখে আস্তে চাপ দিলাম৷ না, অন্যান্য দিনের মতো দরজা আজ বন্ধ নয়৷ ভিতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল কর্মরত লোলাকে৷ ও কাজ করার সাদা গাউনটা পরে ডিমের ওমলেট করতে ব্যস্ত৷ পায়ের শব্দে ও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল, ‘ও, হুজুরের ঘুম তাহলে ভেঙেছে! আমি তো ভাবছিলাম, আজ সারাটা দিনই বুঝি পড়ে পড়ে ঘুমোবে!’

আস্তে আস্তে ওর পিছনে এসে ওকে জড়িয়ে ধরলাম, কাছে টেনে নিলাম, মুখ ডুবিয়ে দিলাম ওর আগুন-রঙা চুলের বন্যায়৷

‘এই, এই—এ কি হচ্ছে! তোমার ওমলেট নষ্ট হয়ে যাবে যে!’ কিন্তু মুখ সরিয়ে নেবার জন্য ও একটুও ব্যস্ত হল না৷ বরং নিজেকে এলিয়ে দিল আমার গায়ে, ‘কাল রাতের জন্যে তুমি নিশ্চয়ই আমার ওপর রাগ করেছ?’

ওকে কাঁধ ধরে ঘুরিয়ে আমার মুখোমুখি দাঁড় করালাম, হাসলাম, ‘তাহলে আরও একবার আমাকে রাগ করতে দাও৷’ এক ঝটকায় ওকে টেনে নিলাম আমার বুকে, ঠোঁট নামিয়ে আনলাম ওর ঠোঁটের উপর৷ অনুভব করলাম ওর হৃদস্পন্দন, ওর যৌবনের উষ্ণস্পর্শ৷ লোলার আঙুল খেলা করে বেড়াতে লাগল আমার চুলে৷

একসময়ে আমার বাঁধন ছাড়িয়ে ও প্রাতরাশের আয়োজন করতে লাগল৷ একটা চেয়ারে বসে লক্ষ্য করছিলাম লোলাকে৷ কিরকম সুপটু হাতে ও একটার পর একটা কাজ করে চলেছে৷

প্রাতরাশ তৈরি শেষ করে লোলা খাবারের প্লেটটা আমার দিকে এগিয়ে দিল, ‘কফিটা নিজে কাপে ঢেলে নাও৷ তারপর ও আমার মুখোমুখি বসে একটা সিগারেট ধরাল৷ ওর চোখের দৃষ্টি আজ আমার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত—সম্পূর্ণ নতুন৷

‘শেট, প্রথম থেকেই তোমার সঙ্গে আমি খুব খারাপ ব্যবহার করেছি৷ কিন্তু কাল রাতেই আমার মত পালটেছে৷ ভেবে দেখলাম, কার্ল মারা যাবার পর আমরা যেভাবে এতদিন কাটিয়েছি, তার কোন মানে হয় না৷ বিশেষত—তুমি যখন একজন সুপুরুষ আর—’ একটু থামল লোলা, ‘কোন মেয়ের জীবনে তোমার মতো পুরুষের সঙ্গলাভ-নিঃসন্দেহে একটা অভিজ্ঞতা৷ তুমি বরং তোমার জিনিসপত্র নিয়ে বাংলোয় চলে এসো—এখন আলাদা থেকে লাভ কী?’

মুহূর্তের জন্য ইতস্তত করলাম৷ মৃত জেনসনের ধোঁয়াটে মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠল৷ কিন্তু সেটা মন থেকে সরিয়ে ফেলে লোলার দিকে তাকালাম, ‘ঠিকই বলেছ—তুমি তো জান, প্রথমদিন থেকেই তুমি আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছ৷ তা ছাড়া, গত রাতের পর আলাদা থাকা কি আমার সাধ্যে কুলোবে?’

লোলা মিষ্টি করে হাসল, মুখ নামাল লজ্জায়৷

বাইরে থেকে ভেসে এল কোন ট্রাকের শব্দ—পর পর দুবার তার হর্ন বেজে উঠল৷

‘আমি দেখছি৷’ লোলা উঠে দাঁড়াল, ‘তুমি খেয়ে নাও৷’ ও রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল৷

খাওয়া শেষ হতেই আমার মন সক্রিয় হয়ে উঠল৷ বৎস কারসন, সাবধান! লোলার অভিনয়ের ফাঁদে খবরদার পা দিওনা—ক্রূর সাপিনীর এ এক নতুন অভিসন্ধি!

কিন্তু অবচেতন মনে একটা ক্ষীণ আশা উঁকি মারছিল—হয়তো ও সত্যিই আমাকে ভালোবাসে৷

এমন সময় লোলা রান্নাঘরে ফিরে এল৷ চোখেমুখে সামান্য পরিশ্রান্ত ভাব, কিন্তু ঠোঁটে মোহিনী হাসি৷ ও আমার কাছে এসে দাঁড়াল৷ আলতো করে ওকে জড়িয়ে ধরলাম, ‘রিক্সের কথা কিচু ভেবেছ? ও তো রাত্তিরে আবার আসবে—’

‘ওর জন্যে আমি একটুও ভাবছি না৷ কিছু টাকা দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে—আর আসবে না৷’

‘তাই কি?— রিক্স যেরকম চরিত্রের লোক, তাতে মনে হয়, একবার টাকার গন্ধ পেলেই ও রোজ আসবে৷’

লোলা ঘাড় নাড়ল, ‘কিছু ভেবো না, রিক্সকে সামলানোর ভার আমার৷’

‘কিন্তু সাবধান থেকো, ব্যাটা গণ্ডগোল করতে পারে৷’

‘তুমি নিশ্চিন্ত থাকো৷’

গত ক-দিনের অসহ্য আবহাওয়া বর্তমানে অনেকটা সহনীয় হয়ে উঠেছে৷ মরুভূমির হাওয়ার আগের মতোই অনুভূত হচ্ছে শীতল আমেজ৷ গাড়ি-ট্রাকের যাতায়াত অনেক বেড়ে গেছে৷ ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’ আবার হয়ে উঠেছে কর্মচঞ্চল৷

সারাদিনের কর্মব্যস্ততার মধ্যেও, দু-এক মুহূর্তের অবসরে রান্নাঘরে গিয়ে লোলার উষ্ণ সান্নিধ্য অনুভব করেছি৷ প্রতিবারই ওকে আগের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয়া বলে মনে হয়েছে৷ কাজের মাঝে ওকে বিরক্ত করার জন্য শুনতে হয়েছে কপট অনুযোগ, কিন্তু কোনবারই আমাকে ও নিরাশ করেনি৷—তবুও কেন জানি না, ও যে অভিনয় করছে, এ ধারণাটা আমার মনে আরও বদ্ধমূল হয়েছে৷

সন্ধে সাতটার সময় যানবাহন চলাচল একেবারে কমে এল৷ অতএব মুহূর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে গেলাম রান্নাঘরে৷

লোলা ভীল কাটলেটগুলো সাজিয়ে রাখছিল—আমি ঢুকতেই ঘুরে দাঁড়াল, আবার এখানে এসেছ! কী চাই?’

কোন জবাব না দিয়ে ওকে সোজা বুকে টেনে নিলাম৷

‘এই, ভালো হবে না বলছি৷ কী করছ, ছাড়—’ ও আমার বাঁধন ছাড়িয়ে মুক্ত হবার চেষ্টা করল—যেন একটা তুলতুলে নরম পালকে ঢাকা পাখি তার ছোট্ট ডানা ঝটপট করছে৷

আমিও ওকে জাপটে ধরে রইলাম, ‘ছাড়ব না৷ দেখি তুমি কেমন করে ছাড়াও—’ আমাদের এই একান্ত ব্যস্ততার মুহূর্তে একটা হাল্কা শব্দ কানে এল—রান্নাঘরের দরজা খোলার শব্দ! চমকে উঠে এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়ালাম৷ কিন্তু এতক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে—আমরা দুজনেই দাঁড়িয়ে রিক্স৷ ও হাসছে—ধূর্ত-বিষাক্ত হাসি কুৎসিত মুখের চেহারা হয়ে উঠেছে ভয়াল-কুটিল! বুঝতে আর বাকি রইল না, ও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখেছে৷ ইস! রিক্স এই সময়ে আসবে জেনেও কি বোকার মতো কাজই না করেছি! লোলার দিকে তাকালাম৷ কিন্তু ও এতটুকু বিচলিত হয়নি৷ মুখ ভাবলেশহীন, চোখের ভাষায় এক নীরব প্রশ্ন৷

মনের অপরাধবোধ সম্ভবত প্রতিফলিত হয়েছিল আমার মুখের দর্পণে৷ কারণ রিক্স কৌতূহলভরে আমাকে একবার দেখল, তারপর ফিরে তাকাল লোলার দিকে, ‘তোমাদের বিরক্ত করার কোন উদ্দেশ্য আমার ছিল না৷ বলেছিলাম এ-সময়ে আসব, তাই এসেছি৷’

আমার ঠোঁটদুটো কেউ যেন সেলাই করে আটকে দিয়েছে৷ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ঘামছি—দেখছি রিক্সকে৷

‘কী ব্যাপার, জর্জ?’ লোলার স্বর একেবারে স্বাভাবিক, ‘এ সময়ে কী দরকার?’

রিক্সের ক্ষুদে চোখজোড়া আমাদের মুখের উপর খেলে বেড়াতে লাগল, ‘আমি যে এ সময়ে আসব, তা বলেনি?’ আঙুল দিয়ে আমাকে দেখাল সে৷

লোলা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল৷

‘কার্লের কোন খবর পেয়েছ? আমার পেনসনের কাগজে ওর সই দরকার৷’

‘না, এখনও পাইনি৷ হয়তো ওখানে গিয়ে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে৷ তুমি তো এক কাজ করতে পার—কোন উকিল বা ব্যাঙ্ক-ম্যানেজারকে দিয়ে তোমার কাগজে সই করাতে পার৷’

রিক্স আড়চোখে আমার দিকে চেয়ে ভ্রূকুটি করল, ‘উহুঁ, তাতে হবে না৷ কার্লের সই না হলে, ওরা টাকা আটকে দেবে৷ আমার তাহলে চলবে কী করে?’

লোলা কাঁধ ঝাঁকাল, ‘কি আর করা যাবে, কার্ল তো নির্দিষ্ট কোন ঠিকানা দিয়ে যায়নি৷ ও না ফেরা পর্যন্ত তোমাকে অপেক্ষাই করতে হবে৷’

লোলার স্থির নির্বিকার দৃষ্টির কাছে রিক্স যেন অস্বস্তি বোধ করল৷ যে-কথাগুলো বলবে, সেগুলো হয়তো মনে মনে আর-একবার ভেবে নিল৷

‘তাহলে অ্যারিজোনা পুলিশকে লিখে জাননোই ভালো৷ কারণ পেনসনের কাগজে কার্লের সই না হলে আমার চলবে না৷’

কথাগুলো বলার সময় ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লোলাকে লক্ষ্য করছিল৷ কিন্তু লোলার মুখে আশানুরূপ প্রতিক্রিয়া না দেখে একটু হতাশ হল৷

‘ইচ্ছে হলে তাই কর, তাতে আমার কিছু যাবে-আসবে না৷ তবে কার্ল অ্যারিজোনায় হয়তো না-ও থাকতে পারে৷ একবার কোলোরাডো যাবে বলছিল—কে জানে!’ লোলা টেবিলে হেলান দিয়ে মাথার চুলে হাত চালাতে লাগল, ‘তা এ নিয়ে এত ঝামেলা করার কি আছে, জর্জ? আমার মনে হয়, কোন ব্যাঙ্ক-ম্যানেজারকে দিলেই সে সই করে দেবে৷—অবশ্য যদি তোমার টাকার খুব প্রয়োজন থাকে, তো বল, দু-পাঁচ ডলার না হয় ধারই দেওয়া যাবে৷’

লোলা এত সহজ আর স্বাভাবিকভাবে ধারের প্রসঙ্গ তোলায়, রিক্স সন্দেহ করার কোন সুযোগ পেল না৷ আমিও হয়তো এত সুন্দরভাবে রিক্সকে বোকা বানাতে পারতাম না৷

‘কত?’ দ্বিধাগ্রস্ত মনে রিক্স জানতে চাইল৷ কিন্তু ওর অতি-আগ্রহের সুরটা লোলার কান এড়াল না৷

‘অত বেশি ব্যস্ত হয়ো না, জর্জ৷’ ঘৃণাভরে ও উত্তর দিল, ‘বড়জোর ডলার দশেক দিতে পারি৷’

‘রিক্স যেন আশাহত হল, ‘ওতে কি হবে! আমারও তো খরচ-খরচা আছে৷ অন্তত বিশ ডলার পেলে ভালো হত৷’

‘তোমার টাকার খাঁই কোনদিন কমবে না, জর্জ৷ সুযোগ পেলেই খালি নিংড়ে নেবার চেষ্টা কর৷’ ও রিক্সকে কাটিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল৷

একটু পরে ও ফিরে এল—হাতে তিনটে ডলারের নোট৷ নোট তিনটে লোলা রিক্সের হাতে গুঁজে দিল, ‘নাও, ধর—৷ এই শেষ, এর চেয়ে বেশি আমার কাছ থেকে আর পাবে না অতএব, শুধু শুধু আর এস না৷ তোমাকে টাকা দিয়েছি শুনলে কার্ল হয়তো অসন্তুষ্ট হবে৷’

রিক্স টাকাগুলো চটপট পকেটে ভরে ফেলল, ‘লোলা, তুমি বড় নির্দয়৷’ ও দাঁত বের করে হাসল, ‘আমি যে তোমার স্বামীদেবতা নই, সেজন্য নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি৷ আশা করি কয়েকদিনের মধ্যেই কার্ল ওর ভুল বুঝতে পারবে৷ তারপর চোখের জলে বুক ভাসাবে, অ্যাঁ!’ রিক্স শেয়ালের মতো খিকখিক করে হেসে উঠল৷

‘বাজে কথা না বলে কেটে পড়৷ কার্লের ভাবনা তোমাকে ভাবতে হবে না৷ লোলার স্বরে কাঠিন্য, ‘ভবিষ্যতে আর এদিকে মাড়িয়ো না৷’

‘হুঁ, দুয়ে গুঞ্জন তিনে হাট! না, তোমাদের প্রেমগুঞ্জনে আর বাধা দেব না৷ তবে একটু সাবধানে থেকো, লোলা৷ কার্ল হয়তো একটা বাড়াবাড়ি পছন্দ করবে না৷’ রিক্স ওর চোখজোড়া আমার মুখের উপর একবার বুলিয়ে নিল৷

লোলা ঘুরে তাকাল আমার দিকে, ‘একে লাথি মেরে বের করে দাও, জ্যাক—অনেকক্ষণ ওর বকবকানি সহ্য করছি৷’

আমি রিক্সের দিকে এগোতেই ও ঘুরে দৌড় লাগাল৷

ওর গাড়ির শব্দ মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত আমরা চুপচাপ অপেক্ষা করলাম৷ তারপর লোলা টেবিলের কাছে গিয়ে আবার কাজে মন দিল৷

‘রিক্স নিশ্চয়ই আমাদের দেখেছে৷’ ওকে বললাম৷

‘তো হয়েছে কী? বলেছি না, আমিই ওকে সামলাব—তোমাকে কিছু ভাবতে হবে না৷’

‘টাকার জন্যে ও আবার আসবে, দেখো৷’

কাটলেটগুলো লোলা প্লেটে সাজিয়ে রাখতে লাগল, ‘ওহ্ হো! বলছি না, ও নিয়ে ভেব না৷ আসুক না জর্জ, আমি তো আছি৷’

একদিন দুদিন করে দু-সপ্তাহ কেটে গেল, রিক্স আর এল না৷ কিন্তু ও না এলে কি হবে, এ দু-সপ্তাহে কম করে একশ লোকের কাছে জেনসনের অনুপস্থিতির জন্য জবাবদিহি করতে হয়েছে৷ দু-একজন সামান্য সন্দেহ প্রকাশ করলেও, অ্যারিজোনায় যাওয়ার গল্পটা মোটামুটি সকলেই বিশ্বাস করেছে৷ কয়েকজন একটু অবাক হয়ে আমার দিকে চেয়ে থেকেছে৷ তাদের চোখে একই নীরব প্রশ্ন ঃ ‘কি বাবা, জেনসনের বউকে নিয়ে ফষ্টিনস্টি শুরু করনি তো?’ মনে মনে অস্বস্তি হলেও, প্রকাশ্যে সহজ হবার চেষ্টা করেছি সবিনয়ে জানিয়েছি আমি এখানকার কর্মচারী মাত্র৷ অবশ্য তাতে কোন ফল হয়েছে কিনা বলতে পারি না৷

রোজ রাত একটায় রেস্তোরাঁ বন্ধ করে আমি লোলা শুতে যাই বাংলোয়৷ মাঝেমাঝে জেনসনের কথা ভেবে অস্বস্তি হয়৷ ওরই বিছানায় ওরই বউয়ের সঙ্গে শুয়ে আছি দেখলে সে কি ভাবত কে জানে! কিন্তু লোলার দুর্নিবার আকর্ষণের কাছে এসব চিন্তা ধুয়ে-মুছে বিলীন হয়ে যায়৷ ওকে সোহাগে আদরে জড়িয়ে চুমোয় চুমোয় অস্থির করে তুলি৷ সমস্ত পৃথিবী কেন্দ্রীভূত হয় আমাদের—একান্ত আমাদের অস্তিত্বে৷

একসময় পূর্ণ পরিতৃপ্তির অবসাদ নিয়ে ক্লান্ত দেহে দুজনে পাশাপাশি শুয়ে থাকি৷ জানালা দিয়ে আসা চাঁদের আলোয় মায়াময় পরিবেশে আরও একবার মনে পড়ে কবরে শুয়ে-থাকা জেনসনের কথা৷ তখন নিজেকে ভীষণ অপরাধী বলে মনে হয়৷ কিন্তু লোলা? কই, মুহূর্তের জন্যও তো ওকে অপরাধবোধের শিকার হতে দেখিনি! বরং ওর ভাবসাব দেখে মনে হয়, কার্ল জেনসন নামে ব্যক্তিপূর্ণ পুরুষটি ওর স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেছে—তার একদা-অস্তিত্ব আজ ওর কাছে নেহাতই অবাস্তব৷

তবে এই দু-সপ্তাহে একটা জিনিস উপলব্ধি করেছি৷ সেটা হল—লোলাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি৷ যেভাবে আমরা দিনের পর দিন কাটিয়েছি, তাতে হয়তো এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক৷ যদিও লোলাকে দেখার প্রথম দিন থেকেই অনুভব করেছিলাম ওর প্রতি অনিবার্য দুর্দম আকর্ষণ৷ কিন্তু এও মনে হয়েছিল—সেটা নিতান্তই নারীর যৌবনের প্রতি পুরুষের যে চিরন্তন লিপ্সা, তারই তাৎক্ষণিক বহিঃপ্রকাশ৷ কিন্তু এখন দেখছি তা নয়৷ কামনা-বাসনার শেষ পর্যায়ে ঘিরে সুখী-সংসরের সুখ-স্বপ্ন দেখি৷ তা ছাড়া ওকে ভালোবাসার সঙ্গে সঙ্গে ওর প্রতি আমার সন্দেহ-সতর্ক ভাবটা অনিবার্যভাবে ক্রমশই ফিরে হয়ে এসেছে৷ কখনো কখনো আচ্ছন্ন মনকে বিবেকের কশাঘাতে সচেতন করেছি—সাবধান! মনে রেখ কারসন, তুমি সাপ নিয়ে খেলছ! কিন্তু বৃথাই৷ পরমুহূর্তেই ওর যৌবনের সাজানো ডালিতে নিজের সত্তাকে নিঃশেষে অর্পণ করেছি৷

লোলা কিন্তু একবারের জন্যও সিন্দুকের কথা তোলেনি৷ টাকার কথাও যেন একেবারে ভুলে গেছে৷ মনে মনে আশ্বস্ত হয়েছি, বিশ্বাসও অনেকটা বেড়েছে৷ শেষ পর্যন্ত মনে হয়েছে, লোলাও আমাকে সমান ভালোবাসে৷

অতীতের সব কথা ভুলে গিয়ে চিরটা জীবন কি আমরা এভাবে কাটিয়ে দিতে পারি না?

এমনি এক মিষ্টি সকাল৷ বিছানায় আমরা পাশাপাশি শুয়ে আছি৷ জানালা দিয়ে চোখে পড়ছে পাহাড়ের সারি, ভোরের সিঁদুর-রাঙা সূর্য—হঠাৎ লোলা প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা, শেট, কাজকর্ম দেখাশোনার জন্যে একজন লোক রাখলে কেমন হয়? আমরা বেশ মাঝেমাঝে ছুটি নিয়ে ওয়েন্টওয়ার্থে বেড়াতে যেতে পারি—’

প্রস্তাবটা নিঃসন্দেহে লোভনীয়, কিন্ত একই সঙ্গে বিপজ্জনক৷ আালস্যে আড়মোড়া ভেঙে ওর দিকে তাকালাম, ‘তা হয় না, লোলা৷ ওয়েন্টওয়ার্থে আমরা একসঙ্গে বেড়াতে গেলে, লোকে নানান কথা বলবে৷—না, এখনও আমাদের মাস দুয়েক অপেক্ষা করতে হবে৷ জেনসন যে আর ফিরছে না, সে-গল্পটা রটিয়ে দেওয়ার পর লোক রাখার কথা ভাবা যাবে৷’

‘এখানে এভাবে থাকতে আমার ভালো লাগছে না৷’

‘আর কিছুদিন কষ্ট কর—সব ঠিক হয়ে যাবে৷’

লোলা বিছানা থেকে নেমে, এগিয়ে গিয়ে সিল্কের চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিল৷ পাশ ফিরে শুয়ে ওকে লক্ষ্য করছিলাম৷ চোখাচোখি হতেই ও হাসল, ‘ঠিক আছে তোমার কথাই থাক আর কিছুদিন না হয় অপেক্ষাই করা যাবে৷’ হঠাৎ কি মনে পড়ায় আমায় বলল, ‘শেট, তুমি আজ ওয়েন্টওয়ার্থে যেতে পারবে? অনেক জিনিসপত্র কেনার আছে৷ আমিই যেতাম, কিন্তু ফ্রুট-পাই তৈরি নিয়ে ব্যস্ত থাকব বলে যেতে পারছি না৷ তুমিই না হয় ঘুরে এস৷—আমি পাম্পগুলোর দিকেও খেয়াল রাখব— কোন অসুবিধে হবে না৷’

আরেকটু হলেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যেতাম আর কি! আচমকা এক সন্দেহের ঝাপটায় সচেতন হয়ে উঠলাম৷ আমাকে সরানোর জন্য এটা কি লোলার কোন নতুন মতলব? হয়তো আমাকে ওয়েন্টওয়ার্থে পাঠিয়ে, ট্রপিক স্প্রিংসে ফোন করে কোন সিন্দুক সারানোর লোক ডেকে আনবে—তাকে দিয়ে সিন্দুক খোলাবে৷ তারপর আমি ওয়েন্টওয়ার্থ থেকে ফিরতে ফিরতে টাকা নিয়ে হাওয়া হয়ে যাবে৷

ওর দিকে তাকালাম৷ নির্বিকারভাবে ও চুল আঁচড়াচ্ছে, আনমনে গুনগুন করছে কোন গানের কলি৷ কিন্তু তার মানে এই নয়, ও উদ্দেশ্যহীনভাবে কথাগুলো বলেছে৷ কারণ রিক্সের সঙ্গে কথা বলার সময় ওর মুখে লক্ষ্য করেছি এই একই নির্বিকার ভাব৷

গলার স্বরকে অত্যন্ত স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে জবাব দিলাম, ‘আমার ওয়েন্টওয়ার্থে যাওয়াটা বোধহয় ঠিক হবে না, লোলা৷ ওখানে গেলে বিপদের সম্ভাবনা আছে—কেউ আমাকে চিনে ফেলতে পারে৷—তার চেয়ে বরং তুমিই যাও, আমি এদিকটা দেখাশোনা করব৷ সেটাই মনে হয় নিরাপদ হবে৷’

লোলার মুখের ভাবে একটা পরিবর্তন আশা করেছিলাম, কিন্তু আমার সন্দেহের সমর্থনে কোন প্রতিক্রিয়াই ওর মুখে লক্ষ্য করলাম না৷ ও আমার কথায় কাঁধ ঝাঁকাল, চিরুনিটা নামিয়ে রাখল, ‘ঠিক আছে, তুমি যা ভালো বোঝ তাই কর৷’ ও পায়ে পায়ে বিছানার কাছে এসে দাঁড়াল, সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে, ‘শেট, সত্যিই কি ওয়েন্টওয়ার্থে যাওয়া তোমার পক্ষে বিপজ্জনক?’

‘তা জানি না, তবে আমি কোন ঝুঁকি নিতে চাইছি না৷’

‘তাহলে না যাওয়াই ভালো৷ তোমার ভালোমন্দ কিছু একটা হোক, তা আমি চাইব না৷’

‘শুনে সুখী হলাম৷’

‘ঠাট্টা নয় শেট, সত্যি বলছি৷’ লোলা সলজ্জ হাসি হাসল, ‘তোমাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি৷’

আনন্দে বিছানা থেকে নেমে ওকে জড়িয়ে ধরলাম, ‘সত্যি? এতদিন তোমার মুখ থেকে শুধু এই কথাটাই শুনতে চেয়েছি, লোলা৷’

ও আঙুল দিয়ে আমার বুকের দাগ কাটছিল, হেসে ঘাড় নাড়ল, ‘হ্যাঁ, সত্যি৷ জীবনে কোন পুরুষকে নিয়ে সুখী হব, তা ভাবিনি৷ কিন্তু তুমি সবকিছু ওলট-পালট করে দিয়েছ৷—এ জায়গায় থাকতে আমার ভালো লাগছে না, শেট—আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে৷ সারাটা দিন শুধু কাজ আর কাজ! কোথাও যে বেড়াতে-টেড়াতে যাব, তারও একটু উপায় নেই৷’

‘আর কয়েকটা দিন ধৈর্য ধর, লোলা—তারপর আমরা অন্য কোথাও চলে যাব৷ এখানে থাকতে ভালো কি আমারও লাগছে? কিন্তু এখুনি এ জায়গা ছাড়লে বিপদের সম্ভাবনা আছে যে! তা ছাড়া, জায়গাটা যে বিক্রি করে দেব, তারও তো উপায় নেই!’

লোলা আমার বাহুর বাঁধন খুলে হঠাৎ সরে দাঁড়াল, ‘যাই, ফ্রুট-পাইগুলো এখনই শুরু না করলে, পরে আবার দেরি হয়ে যাবে৷’ ও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল৷

জামা কাপড় পরতে পরতে ভাবতে লাগলাম—লোলা আমাকে ভালোবাসে৷ ও নিজের মুখে বলেছে৷ আজ আমার আনন্দের দিন—লোলা আমাকে ভালোবাসে৷

ঠিক এই মুহূর্ত থেকেই ওকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে শুরু করলাম৷

রান্নাঘরে গিয়ে কফি তৈরি করে চুমুক দিলাম৷ লোলা ফ্রুট-পাই নিয়ে ব্যস্ত ছিল, হঠাৎ ডাকল, ‘শেট—’ ও ঘাড় ফিরিয়ে আমার দিকে তাকাল, ‘এরপর কী করবে কিছু ঠিক করেছ?’

‘হ্যাঁ৷ এসব ঝামেলা মিটে গেলে প্রথমেই তোমাকে আমি বিয়ে করছি—‘না’ বললেও শুনছি না৷’

ও হাসল, ‘না’ বলতে আমার বয়ে গেছে৷—কিন্তু কার্ল যে মৃত, সেটা তো আগে প্রমাণ করতে হবে!’

‘সেটা প্রমাণ করতে গেলে বিপদ আছে৷—নাঃ, যে-কোন উপায়ে আমাদের এখান থেকে পালাতে হবে৷ কিন্তু কীভাবে, তা এখনও ভেবে পাচ্ছি না৷ যদি একবার এখান থেকে পালাতে পারি, তবে আর চিন্তা নেই৷—আচ্ছা, ফ্লোরিডায় আমাদের একটা পেট্রল-পাম্প খুললে কেমন হয়?’

‘ভালোই হবে৷—তার মানে সিন্দুকের টাকাগুলো কাজে লাগানো যাবে, কি বলো?’

এতদিন পর এই প্রথম ও টাকার কথা উচ্চারণ করল৷ খুব সহজভাবে কথাটা বললেও, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালাম৷ কিন্তু কোনরকম অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ল না৷ বরং ওর দৃষ্টি নিষ্পাপ বলেই মনে হল৷

‘হ্যাঁ, তাই তো করব৷ তা ছাড়া উপায় কি?’ ওর কথা সমর্থন করলাম৷

‘খুব ভালো হবে, তাই না শেট?’ লোলার সবুজ চোখ আনন্দে জ্বলজ্বল করে উঠল, ‘কেউ থাকবে না, শুধু তুমি আর আমি৷ আমি কিন্তু বেশিদিন অপেক্ষা করব না বলে রাখছি৷’ আদরমাখানো স্বরে ও বলে উঠল৷

‘হুঁ, প্রথমে আমাদের এ জায়গাটা বেচতে হবে—৷ কিন্তু কীভাবে!’ আত্মগতভাবে বললাম৷

‘যেভাবে হোক!’

এমন সময় একটা ট্রাকের শব্দ পেয়ে বাইরে গেলাম৷ আর কাজে এমনই ব্যস্ত হয়ে পড়লাম যে লোলার সঙ্গে কথা বলার কোন সুযোগই পেলাম না৷

একসময় দেখি, লোলা অপরূপ সাজে সেজে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, ‘আমি চললাম, দুপুরের দিকে ফিরব৷ ফ্রুটপাইগুলো ঠিক করে রাখতে ভুলো না যেন৷’ ও গাড়ি চালিয়ে চলে গেল৷

কিছুক্ষণের মধ্যে হাতের কাজ সেরে রেস্তোরাঁয় গেলাম৷

লোলা টাকার উল্লেখ করার বেশ খুশিই হয়েছি৷ ওর সম্বন্ধে যেটুকু অস্বস্তি-অবিশ্বাস ছিল, তাও মন থেকে মিলিয়ে গেছে৷ ও যে আমার সঙ্গে অভিনয় করছে না, সেটা ভেবে ভালো লাগল৷ কিন্তু এই ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’-এর হাত থেকে মুক্তি পাই কেমন করে? লোকের মনে সন্দেহ না জাগিয়ে, কীভাবে এর হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়, তাই ভাবতে লাগলাম৷

কিন্তু যত ভাবছি, সমস্যাটা ততই যেন জটিল হয়ে উঠছে৷ ভাবতে ভাবতে একসময় নিষ্ঠুর সত্যের মতো উপলব্ধি করলাম, আমাদের অবস্থা মাকড়সার জালে আটকানো মাছির মতো৷ মুক্তির কোন পথই আমাদের সামনে খোলা নেই৷ নিশ্চিন্তে, নিরাপদে থাকতে গেলে, সারাটা জীবন আমাদের এখানেই কাটাতে হবে৷ ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’কে ছেড়ে যাবার ক্ষমতা আমাদের নেই৷

এসব ভাবনায়, কখন একসময় উত্তেজিত হয়ে খাবার-ঘরে পায়চারি শুরু করে দিয়েছি, হঠাৎ একটা গাড়ির শব্দে চমক ভাঙল৷ জানালা দিয়ে তাকাতেই চোখে পড়ল রিক্সের ঝরঝরে গাড়িটা৷ রিক্স গাড়ি থেকে নেমে গুমটিঘরের দিকে এগোল৷ পিছন পিছন গুটিগুটি পায়ে চলল ওর কুকুরটা৷

এতদিন বাদে রিক্সকে দেখে চমকে উঠলাম৷ ও কি উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে কে জানে! হঠাৎ মনে পড়ল, গুমটিঘরেই পোঁতা রয়েছে জেনসনের দেহ! মুহূর্তমাত্র দেরি না করে ছুটলাম গুমটিঘরের দিকে৷ বুকের ভিতর যেন দামামা বাজতে শুরু করেছে৷ রিক্স অথবা ওর কুকুর যদি খুঁজে পায় কার্লের দেহ!

গিয়ে দেখি, রিক্স গুমটিঘরে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে, মাঝে মাঝে যন্ত্রপাতিগুলো নেড়েচেড়ে দেখছে৷ কুকুরটাও যেন ওর পায়ে লেগে রয়েছে৷ আমাকে দেখেই কুকুরটা কুঁকড়ে গেল৷ সুড়সুড় করে রিক্সের পায়ের ফাঁকে ঢুকে পড়ল৷

‘কী চাই?’ গলার স্বরকে যতটা সম্ভব রুক্ষ এবং কঠোর করলাম৷

রিক্স থমকে দাঁড়াল৷ কুকুরটাকে এক লাথিতে সরিয়ে দিয়ে আড়চোখে তাকাল, ‘কার্ল কোন খবর-টবর দিয়েছে?’

‘না৷’

‘লোলা কোথায়?’

‘তিনি ওয়েন্টওয়ার্থে গেছেন৷ কী চাই তোমার?’

‘রিক্সের কুকুরটা হঠাৎ উৎসুক হয়ে, ঘাড় ফিরিয়ে কাজ করার টেবিলটার দিকে তাকাল৷ তারপর ছোট ছোট পা ফেলে এগিয়ে চলল জেনসনের কবরের দিকে৷ সীমাহীন আগ্রহে ওখানকার মাটি শুঁকতে লাগল৷ মাঝে মাঝে পা দিয়ে আঁচড়াতে চেষ্টা করল৷

বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল, হৃৎপিণ্ড যেন আচমকা হোঁচট খেল!

রিক্স কুকুরটাকে লক্ষ্য না করেই বলল, ‘আমার কিছু টাকার দরকার৷ পেনসনের টাকা এখনও পায়নি৷’

‘আমাকে ওসব কথা বলে কোন লাভ নেই৷’ আমার কিন্তু পড়ে আছে হতচ্ছাড়া কুকুরটার দিকে৷

কুকুরটা তখন মাটি আঁচড়াতে শুরু করেছে৷ মাটি স্বাভাবিকভাবেই আলগা হওয়ায়, আঁচড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসতে লাগল৷ কুকুরটাও উৎসাহের সঙ্গে থাবা দিয়ে আরও পূর্ণোদ্যমে আঁচড়াতে শুরু করল৷

রিক্স হঠাৎ ঘাড় ফিরিয়ে কুকুরটাকে দেখল৷ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে রইল, ‘আরে, ব্যাপার কী! আগে কোনদিন সীজারকে এরকম অদ্ভুত কাজ করতে তো দেখিনি৷’ ও এগিয়ে গিয়ে সীজারের পেটে ক্যাঁৎ করে এক লাথি কষিয়ে দিল৷ সীজার কেঁউ কেঁউ করতে করতে, ছিটকে গিয়ে পড়ল গুমটিঘরের দরজার কাছে৷

রিক্স আবার আমার কাছে ফিরে এল, ‘আমার এখনে কপর্দকহীন অবস্থা৷ কিছু টাকা ধার দিতে পারবে? পেনসনের টাকা পেলেই শোধ করে দেব৷’

রিক্সের কথা বলার সুযোগে সীজার সন্তর্পণে আবার এগিয়ে এল৷ আড়চোখে রিক্সের দিকে লক্ষ্য রেখে আবার আঁচড়াতে শুরু করল৷

‘আচ্ছা, কুকুর তো!’ একটা বড় কাঠের টুকরো তুলে নিয়ে সীজারকে লক্ষ্য করে সজোরে ছুড়ে মারলাম৷ কুকুরটা ঘ্যাঁক করে একটা চাপা চিৎকার করে দরজার দিকে পালাল৷

রিক্সের চোখে যেন আগুন জ্বলে উঠল, ‘একটা বোবা জানোয়ারকে ওভাবে মারতে তোমার লজ্জা করে না!’

‘বেরোও এখান থেকে! তোমার এই হতচ্ছাড়া কুত্তাকে নিয়ে এখুনি কেটে পড়ো!’ দাঁত খিঁচিয়ে খেঁকিয়ে উঠলাম৷

রিক্স কিন্তু আমার কথা কানেই তোলেনি৷ ও তখন সীজারের খোঁড়া গর্তের দিকে চেয়ে আছে—সারা মুখে একটা হতবুদ্ধি ভাব৷

‘তুমি কি এখানে কিছু পুঁতেছ!’

কেমন যেন শীত-শীত করতে লাগল—সারা মুখে ফুটে উঠল বিন্দু বিন্দু ঘাম—কোনরকমে মুখে হাত বোলালাম, ‘কিচ্ছু পুঁতিনি৷—যাও, যাও, এখন কেটে পড়ো!’

আমার কথা কানে তোলা তো দূরের কথা, রিক্স আস্তে আস্তে গর্তটার কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল৷ ওর শকুন-চোখজোড়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে৷’

‘দেখে মনে হচ্ছে, এ জায়গাটা আগে কেউ খুঁড়েছে!’ রিক্স ওর নোংরা লিকলিকে আঙুলগুলো আলগা মাটিতে ডুবিয়ে দিলে৷ কুকুরটা যেন সমর্থন পেয়ে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে এগিয়ে এল, আবার আঁচড়াতে শুরু করল৷

অধৈর্য হাতের এক ধাক্কায় রিক্স কুকুরটাকে সরিয়ে দিল, আপনমনেই বলে উঠল, ‘কার্ল হয়তো ওর জমানো টাকা এখানেই লুকিয়ে রেখেছে৷ নাঃ, ব্যাটা সত্যিকারের বোকার চূড়ান্ত! এভাবে কেউ টাকা লুকোয়!—যাকগে, তবু একবার দেখা যাক৷’ রিক্স আমার দিকে ফিরল, ‘বেলচা আছে?’

আমার হাত-পা যেন ভয়ে পেটের ভিতর সেঁধিয়ে যেতে চাইল৷ রিক্সের দিকে এক পা এক করে এগিয়ে গেলাম৷ আমার মুখের ভাবে রিক্স ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়াল৷ পায়ে পায়ে পিছোতে লাগল, ‘আরে আরে, এতে রাগ করার কি আছে?’ পিছতে পিছতে আমাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল রিক্স৷ কুকুরটাও ওর সঙ্গে তাল মিলিয়ে পিছোতে লাগল৷

‘হঠাৎ মনে হল, তাই বললাম৷ এর জন্যে কিছু মনে করো না৷’

‘বেরোও! আর কোনদিন এখানে আসবার চেষ্টা করলে ঠ্যাঙ ভেঙে দেব!’ চেঁচিয়ে ওকে সাবধান করলাম, ‘যাও—বেরোও!’

‘পাঁচটা ডলার ধার দিতে পারবে?’ রিক্স ততক্ষণে বাইরে বেরিয়ে পড়েছে৷ রোদের তেজ এর মধ্যেই বেড়ে উঠেছে৷ মরুভূমির বালি-মেশানো গরম হাওয়া চোখে মুখে এসে ঝাপটা মারছে৷

‘একটা পয়সাও তুমি পাবে না৷’ ওকে তাড়িয়ে নিয়ে চললাম, ‘গাড়িতে উঠে সোজা কেটে পড়৷’

পিছোতে পিছোতে রিক্স ওর গাড়ির কাছে পৌঁছল৷ গাড়ির দরজায় হাত রেখে ও হঠাৎ থমকে দাঁড়াল, আড়চোখে ঘৃণাভরা চাউনি নিয়ে তাকাল আমার দিকে, ‘আচ্ছা, তুমি তাহলে সোজা করার মানুষ নয়!’ ওর গলায় যেন বিষ ঝরে পড়ল, ‘শেষ পর্যন্ত পুলিশেই খবর দিতে হবে দেখছি৷ ওদের বলব কার্লের খোঁজ করতে৷ নয়তো, তুমি আর ওই বেশ্যাটা যেভাবে লেপটালেপটি, ঘা-ঘষাঘষি শুরু করেছ—’

অন্ধক্রোধে রিক্সের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম৷ আমার ডান হাতের ঘুষি সপাটে গিয়ে আছড়ে পড়ল ওর চোয়ালে৷ রিক্স ছিটকে গিয়ে পড়ল বালির উপর৷ আমি তখন রাগে উন্মাদ৷ পাম্পের কাছে যখন যে একটা ট্রাক এসে দাঁড়িয়েছে, দেখতেই পাইনি৷ রিক্সকে মারতে দেখে ড্রাইভারটা চেঁচিয়ে উঠল, ‘অ্যাই, কী হচ্ছে?’

সংবিৎ ফিরে পেয়ে নিজেকে সংযত করলাম৷ ড্রাইভারটা না এলে এই বুড়ো শকুনটাকে আজ রামঠ্যাঙানি দিতাম৷

রিক্সের দুরবস্থা দেখে কুকুরটা একলাফে গাড়িতে উঠে বসল৷ জুলজুল করে আমাদের কাণ্ডকারখানা দেখতে লাগল৷

‘কী দোস্ত৷ বুড়ো পেয়ে খুব প্যাঁদাচ্ছ?’ ড্রাইভারটা ট্রাক থেকে নেমে এল, ‘একটা সমবয়েসী জোয়ানের সঙ্গে লড়তে, তো বুঝতাম!’

ইচ্ছে হল, দিই ব্যাটার নাকে একখানা বসিয়ে! কিন্তু তাতে ব্যবসার ক্ষতি হবে ভেবে নিজেকে সামলে নিলাম৷ দু’পা পিছিয়ে দাঁড়াতেই, রিক্স ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে কোনরকমে উঠে দাঁড়ালাম৷ টলতে টলতে গাড়িতে গিয়ে উঠল৷ বাঁ হাতে আহত চোয়ালে হাত বুলোতে বুলোতে গাড়িতে স্টার্ট দিল৷ আপনমনেই কীসব বিড়বিড় করতে লাগল৷

পকেটের মানি-ব্যাগ থেকে একটা দশ ডলার নোট বের করে ওর দিকে এগিয়ে দিলাম, ‘ঠিক আছে৷ নাও, ধর—এদিকে আর এসো না৷’

রিক্স কাঁপা হাতে ওটা নিল৷ তারপর ওটাকে হাতের মুঠোয় দলা পাকিয়ে ছুড়ে মারল আমার মুখের উপর৷ ঘৃণাভরে থুতু ছেটাল মাটিতে, ‘আজকের কথা আমি ভুলব না৷’ রাগে, ঘৃণায় ওর মুখ বীভৎস হয়ে উঠল, ‘আমি সোজা পুলিশে যাচ্ছি৷ ওরাই তোমার খবর নেবে৷’

অ্যাকসিলারেটরে জোরে চাপ দিয়ে ক্লাচ ছাড়তেই গাড়িটা এক ঝটকায় ছুটে বেরিয়ে গেল৷ যাবার সময় আরও একবার আগুনঝরা চোখে ও আমাকে দেখল৷

সেই মুহূর্তে বুঝলাম, একটা ভীষণ ভুল করে ফেলেছি৷ রিক্সকে মারা আমার উচিত হয়নি৷ ভেবেছিলাম দশ ডলার দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে৷ কিন্তু ওর মতো মেরুদণ্ডহীন লোক যে ওভাবে টাকাটা মুখের উপর ছুড়ে মারবে, ভাবতেই পারিনি৷

নিচু হয়ে নোটটা তুলে, আবার ব্যাগে ভরলাম৷ রিক্স-আতঙ্ক মনের মধ্যে আরও চেপে বসল৷

দাঁড়িয়ে-থাকা ট্রাকটায় তেল দিলাম৷ ড্রাইভারটা দাম দেবার সময় অবাক হয়ে আমাকে দেখতে লাগল৷ কিন্তু কোন প্রশ্ন করল না৷

ট্রাকটা চলে যাওয়ার পর গুমটিঘরে গিয়ে টেবিলটা সরালাম৷ মাটি দিয়ে গর্তটা ভরাট করে, একগাদা পুরনো লোহালক্কড় এনে এর উপরে জমা করলাম৷ কারণ কুকুরটা আবার এসে জায়গাটা আঁচড়াক, তা আমি চাই না৷ আধঘণ্টা বাদে কাজ শেষ করে খাবারঘরে গেলাম৷

রিক্স যে এবার পুলিশেই যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই৷ তাহলে কি পুলিশ এসে তদন্ত শুরু করার আগেই কেটে পড়ব? কিন্তু কীভাবে?

ভেবে ভেবে কোন পথ পেলাম না৷ হঠাৎ জানালা দিয়ে চেয়ে দেখি, একটা জরাজীর্ণ লিংকন গাড়ি পাম্পের কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ নিজের সমস্যায় এত ব্যস্ত ছিলাম, কখন যে ওটা এসে দাঁড়িয়েছে খেয়ালও করিনি৷ খাবারঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম৷

গাড়ির স্টিয়ারিং-এ বসে থাকা লোকটিকে যেন চেনা-চেনা ঠেকল৷ সে গাড়ি থেকে নেমে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল৷ তার পরনে একটা পুরনো ময়লা স্যুট৷ মাথায় জীর্ণ টুপি৷ লোকটি মুখের উপর টুপির ছায়া পড়ায়, তাকে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না৷

কিন্তু সে আরও কয়েক পা এগিয়ে আসতেই, তাকে চিনতে পারলাম৷ মুহূর্তে স্তব্ধ হল হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন—কিন্তু পরক্ষণেই ছুটে চলল পাগলা ঘোড়ার মতো উদ্দাম গতিতে—ধকধকধক—

আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, আমার বন্ধু রয় ট্রেসি!