আমার কাহিনি এক ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের জুবানি
(১৯৮৪)
ঘটনাবহুল সাল! অথবা রক্তক্ষয়ী একটা বছর। প্রতি পদক্ষেপে ভুল সিদ্ধান্ত ও একটা ভুল ঢাকতে আর একটা ভুল, সেই ভুল ঢাকতে আরও কিছু ভুল। আর অবশেষে সব কিছুর মাশুল …!
খুন! আবার খুন! খুন কা বদলা খুন! তার বদলে আবার খুন…! আর্মি, হত্যা, দাঙ্গা! এবং একের পর এক ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের ইতিহাস। সাহিত্যে মাত্র একটাই ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন ছিল। কিন্তু মানব সভ্যতার ইতিহাসে বারবার সে এসেছে নতুন রূপে, নতুন চেহারায়। রক্তবীজের মতোই বারবার জন্ম নিয়েছে সে। আর বারবার হত্যা হয়েছে মানবতার!
বছরটা শুরুই হয়েছিল ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের গল্প দিয়ে। উন্মাদ কিংবা অতিচালাক জর্নেল সিং ভিন্দ্ৰাওয়ালের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধী সরকারের পাঞ্জা কষা শুরু হয়েই গিয়েছিল আগেই। ভিন্দ্রানয়ালেকে কোনো মানুষ তৈরি করেনি। এই ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের জন্ম দিয়েছিল স্বয়ং রাজনীতি! অকালি দলের কাছে কংগ্রেসের হেরে যাওয়ার পর জ্ঞানী জৈল সিং ও সঞ্জয় গান্ধীর পালটা চাল ছিল জর্নেল সিং ভিন্দ্রানয়ালে। ফলও পাওয়া গিয়েছিল হাতে-নাতেই। পরবর্তী ইলেকশনে ভিন্দ্রানয়ালে কংগ্রেসের জয়ের পথ মসৃণ করে দিয়েছিল।
কিন্তু তখন কে জানত, এই বোড়েই একদিন ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন হবে! ছোটোখাটো গুণ্ডা ভিন্দ্রানয়ালে রাজনৈতিক মদতে ত্রাসের অপর নাম হয়ে উঠল। দমদমি টাকশালের চতুর্দশতম ‘জাঠেদার গোটা পাঞ্জাবের অধীশ্বর হতে চাইল। এবং বলাইবাহুল্য ক্ষমতার আগ্রাসী খিদেয় নিজের সৃষ্টিকর্তাকেই গিলে খেতে চাইল। স্বাধীন খালিস্তানের দাবিতে সে পাঞ্জাবে রীতিমতো হিন্দুনিধন যজ্ঞ শুরু করে দিয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধী তাকে আরও আগে থামাতে পারতেন, কিন্তু জ্ঞানী জৈল সিং-এর অতিরিক্ত মহানুভবতায় গোকুলে বাড়ার মতোই নিশ্চিন্তে বেড়েছিল ভিন্দ্রানয়ালে৷ এতটাই বাড় বেড়েছিল যে অকাল তখতের ওপর কবজা করতেও পিছ-পা হয়নি। অদম্য সাহসে বলেছিল—“আর্মি সামনে দিয়ে ঢুকবে, আমি পেছন দিয়ে বর্ডার পেরিয়ে পাকিস্তানে পৌঁছে যাব।”
এই অহংকার ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই তার কাল হল। দশ মাথাওয়ালা রাবণও অহংকারের এই ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা পাননি, জর্নেল সিং ব্রারের তো একখানাই মাথা ছিল। নিজের কফিনে সে শেষ পেরেক ঠুকেই দিয়েছিল ১৯৮৩ সালের ২৫ এপ্রিলে। স্বয়ং পাঞ্জাব পুলিশের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল অবতার সিং অটওয়াল এসেছিলেন স্বর্ণমন্দিরে প্রার্থনা করতে। স্বর্ণমন্দিরের পবিত্র সিঁড়ির ওপরই তাঁকে খুন করেছিল ভিন্দ্রানয়ালের লোকেরা। এমনই আতঙ্ক ছিল, যে পুলিশ টিম দূর থেকে হতভাগ্য ডি.আই.জি.-র লাশ পড়ে থাকতে দেখলেও ধারে কাছে যাওয়ার সাহসই পাচ্ছিল না। জানি না অকাল তখতে বসে ঈশ্বর ঠিক কীভাবে তাকিয়েছিলেন সেই হতভাগ্যের রক্তাক্ত মৃতদেহের দিকে। তাঁর চোখে নির্লিপ্তি ছিল? না মর্মান্তিক অসহায়তা। অথবা তিনি হয়তো বুঝেছিলেন যে প্রতিটা অশুভ শক্তিই যখন ‘নারী’ নামক শক্তির সঙ্গে পাঞ্জা কষতে যায়, তখন তার শেষ পরিণতি ঠিক কী হতে পারে। মহিষাসুরের সর্বনাশ করার জন্য দেবী দূর্গা ছিলেন, রক্তবীজকে ঠেকানোর জন্য মহাকালী, রাবণের সর্বনাশের কারণ ছিলেন সীতা আর কুরুরাজ্য ধ্বংস হওয়ার পেছনে এক ও অদ্বিতীয়া নারী – দ্রৌপদী! ভিন্দ্রানয়ালের সামনেও তখন এসে দাঁড়িয়েছিলেন এক নারী ইন্দিরা গান্ধী!
আমি কিন্তু তাকে সমর্থন করি না। অকাল তখতের ওপর কোনো মানুষের অধিকার থাকতেই পারে না। হিন্দুদের নিধনও ক্ষমার অযোগ্য। যেভাবে সে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড করে বেড়াচ্ছিল তাতে আর যা-ই হোক, তাকে মানুষ বলা চলে না। ভিন্দ্রানয়ালের কাজ নিঃসন্দেহে লজ্জাজনক ও অসমর্থনযোগ্য। মুশকিল হল, ভিন্দ্রানয়ালের মতো রাক্ষসকে দমন করার জন্য শেষ পর্যন্ত যে পদক্ষেপ নিলেন ইন্দিরা গান্ধী, তা আর এক ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের জন্ম দিল। অনেক নিরীহ মানুষকে খুন করেছিল সে, তাই ‘খুন কা বদলা খুন’তার কপালে লিখেছিলেন স্বয়ং ঈশ্বর। অপারেশন ব্লু স্টারের মাধ্যমে সেনাবাহিনী জর্নেল সিং ভিন্দ্রানয়ালেকে শেষ করল ঠিকই, কিন্তু সেই শ্যুট আউটে মারা গেল অনেক নিরীহ মানুষ। সবচেয়ে বেশি দুঃখ ও আতঙ্কের কথা—চরম ক্ষতিগ্রস্ত হল অকাল তখত৷ শয়তানকে শেষ করতে গিয়ে ধ্বংস হয়ে গেল ঈশ্বরের আসন!
আমি অপারেশন ব্লু স্টারকে সমর্থনও করি না, অসমর্থনও করি না। আর্মি কোনোদিন নিরীহ মানুষের রক্তকে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু শ্যুট আউটে তাদের মৃত্যুকে সমর্থন করা যায় না। সমর্থন করা যায় না অকাল তখতের অবমাননা। আবার ভিন্দ্রানয়ালের বিনাশও জরুরি ছিল। আর যা-ই হোক, বাঘের সামনে প্রেমের কীর্তন গেয়ে রক্ষা পাওয়া মুশকিল। আর জর্নেল সিং বাঘের থেকেও খারাপ এককথায় র্যাবিস সহ খ্যাপা কুকুর। তাই ভিন্দ্রানয়ালেকে সমূলে উৎখাত করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল কি? তবে সাধারণ মানুষের রক্তপাত ও অকাল তখতের সর্বনাশ কি এড়ানো যেত না? কে জানে, হয়তো ঠিক সেই মুহূর্তেই ঈশ্বর ফের লিখেছিলেন—’খুন কা বদলা খুন!
অপারেশন ব্লু স্টার এক ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের অন্ত করলেও আরও দু-জনের জন্ম দিয়েছিল! হ্যাঁ, সবাই তাদের নাম জানে। বেয়ন্ত সিং ও সতবন্ত সিং! তাদের পেছনে ছিল কেহর সিং। ছিল দমদমি টাকশাল। একত্রিশটা বুলেটে তারা ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীর পার্থিব শরীর। অথচ অপারেশন ব্লু স্টারের পর গোয়েন্দাবিভাগ বেয়ন্ত সিং সহ সমস্ত শিখকে ইন্দিরা গান্ধীর দেহরক্ষীর পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। তাদের কাছে শিখদের অসন্তোষ ও প্রধানমন্ত্রীর হত্যার ষড়যন্ত্রের খবর ছিল। ইন্দিরা স্বয়ং বেয়ন্ত সিংকে নিজের সুরক্ষাকর্মীর পদে পুনর্বহাল করেন। তিনি জানান, “আমার শিখ রক্ষীদের ওপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে। তারা বেইমান নয়।”
একে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন ছাড়া আর কী বলব। ইন্দিরার অতিবিশ্বস্ত বেয়ন্ত সিংই শেষে অকাল তখতের প্রতিশোধ নিল। একত্রিশটা গুলি… সর্বমোট একত্রিশটা গুলি মারতে পেরেছিল ওরা। তেইশটা গুলি তাঁকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়ে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। সাতটা দেহের মধ্যেই আটকে ছিল। একটা মাথার চামড়া চিরে দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। পোস্টমর্টেমের সময়ে ডাক্তাররা তাঁর যকৃতই খুঁজে পাননি। আততায়ীরা তাঁর পেট লক্ষ্য করে এত গুলি চালিয়েছিল যে লিভার প্রায় টুকরো টুকরোই হয়ে গিয়েছিল। বুকের হাড়ও আস্ত ছিল না। প্রায় ছ-ঘণ্টা ধরে যমের সঙ্গে প্রায় মরণপণ যুদ্ধ করে শেষমেষ দুটো বেজে কুড়ি মিনিটে ইন্দিরা গান্ধীকে মৃত ঘোষণা করেন ‘অল ইন্ডিয়া ইনস্টিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্স’ তথা ‘এইমস’-এর ডাক্তাররা। ততক্ষণে ‘এইমসে’-র সামনে হাজার হাজার জনতা ভিড় জমিয়েছে।
১৯৮৪ সালের ৩০ অক্টোবর, ভুবনেশ্বরে ইন্দিরা নিজের শেষ জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, “হয়তো কাল আমি বেঁচে থাকব না। তবু আমার দেহের প্রতিটা রক্তবিন্দু ভারতকে মজবুত করবে ও দেশের ঐক্য বজায় রাখবে!” কেউ জানে না, কী ভেবে তিনি শব্দগুলো বলেছিলেন। কিন্তু পরের দিন দিল্লির সফদরজঙ্গের রাস্তায় সত্যিই তাঁর রক্তবিন্দু ছড়িয়ে পড়ল। সঙ্গে একত্রিশটা বুলেটের খোল! তাঁর শেষ বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, এই রক্তবিন্দু ভারতকে আরও শক্তিশালী করবে ও সবাইকে ঐক্যের বন্ধনে বেঁধে রাখবে। অথচ সেই রক্তের প্রতিটা ফোঁটা গোটা দিল্লিকে ভেঙেচুরে দিয়েছিল সেদিন। রয়ে গেল শুধু ইন্দিরার সেই বিখ্যাত ‘ব্লাড অ্যান্ড ইউনিটি’ স্পিচের কয়েকটা শব্দ— “মেরা খুন কা এক এক কতরা…!”
আমি এ ঘটনাকেও সমর্থন করব না। বেয়ন্ত সিং, সতবন্ত সিং আমার কেউ হয় না! কিন্তু তা-ও তাদের আন্তরিক ঘৃণা করি। কারণ তাদের কীর্তি দেখে ফের ঈশ্বরের কলমের নিব ভেঙে গেল। ফের তিনি লিখলেন—’খুন কা বদলা খুন! যুগে যুগে খুনের প্রতিশোধ নিতে নামে একদল ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন! এবার সামনে এল স্বয়ং জনতার তৈরি করা রাক্ষস! খোদ সরকারই বদলা নিতে নামল! আর বলি হল নির্দোষ কিছু মানুষ। শুরু হল সেই অন্ধকার বাহাত্তর ঘণ্টা। আমার জীবনের সবচেয়ে কালো অধ্যায়। যা আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিল সব কিছু। মায়ের স্নেহ, বাবার আশ্রয়, দিদির প্রশ্রয়, জেঠুর চওড়া কাঁধে মাথা রাখার সুখ, দাদার আদর, এমনকি শৈশবও ওই অভিশপ্ত দিনে ছেড়ে গিয়েছিল আমায়। শুধু টের পেয়েছিলাম ফোঁটা ফোঁটা রক্তবিন্দু মাটিতে পড়ার ‘টপ টপ’শব্দ। হয়তো সেদিন বিধাতার নীরব অশ্রুও মিশে গিয়েছিল ওই রক্তের সঙ্গে। মেরা খুন কা এক এক কতরা…!
অ্যান্টি শিখ রায়ট। ১৯৮৪ শিখ ম্যাসাকার। ১৯৮৪ শিখ জেনোসাইড! অর্গানাইজড পোগ্রমস এগেইনস্ট শিখ! মাস মার্ডার। মাস রেপ! লুটিং, নেকলেসিং, অ্যাসিড থ্রোয়িং…। সাড়ে তিনহাজার, আট হাজার, সতেরো হাজার… ওঃ। এতকিছুর বদলে একটা শব্দ দিতে পারি। কালরাত্রি। ৭২ ঘণ্টা লম্বা এক অন্ধকার মৃত্যুশীতল রাত্রি। যে রাতের শেষ নেই। রক্তে এত পিচ্ছিল যে ঠিকমতো দাঁড়ানো যায় না, এত ভয়ংকর যে সহ্য করা যায় না। সে গল্প আমি শোনাব। অবশ্যই শোনাব সেই বাহাত্তর ঘণ্টার তাণ্ডব! এতগুলো দশক কেটে গেল, তারপরও ভুলতে পারি না সেই দৃশ্যগুলো। সেই রক্তহিম করে দেওয়া চিৎকার—“খুন কে বদলে খুন, সর্দার গদ্দার হ্যায়।” সেই তরোয়াল দিয়ে কতগুলো অসহায় মানুষকে টুকরো টুকরো করে দেওয়া। গর্ভবতীর পেট তরোয়াল দিয়ে চিরে, গর্ভস্থ শিশুকে বের করে এনে, সেই অসহায় সদ্যোজাতর নগ্ন, রক্তাক্ত লাশ তরোয়ালের তীক্ষ্ণ ফলায় গেঁথে নিয়ে ঘোরানো…! সেই গলায় জ্বলন্ত টায়ার পরে মৃত্যু যন্ত্রণায় আগুনে পাখির শেষ ছটফটানি…. ওঃ ঈশ্বর।
এত কিছু হওয়া সত্ত্বেও আর্মি নামল না। রাষ্ট্রপতি জ্ঞানী জৈল সিং-এর গাড়ির ওপরও আক্রমণ হল। তবু রাজীব গান্ধী হত্যা বন্ধ করতে সেনাবাহিনী নামালেন না! পুলিশ হত্যাকারীদের ঠেকানোর বদলে সাহায্য করতে শুরু করল। একটা আস্ত ট্রেন ভাড়া করে এসে পৌঁছোল আততায়ীর দল। সঙ্গে অস্ত্র, জ্বালানি তেল! পেট্রল পাম্প থেকে প্রচুর পরিমাণে ডিজেল, পেট্রল, গ্যাসোলিন ও কেরোসিন তেল জোগান দেওয়া হল। দলে দলে ছড়িয়ে পড়ল তারা। সুলতানপুরী, মঙ্গলপুরী, ত্রিলোকপুরী সমেত দিল্লির প্রায় সমস্ত শিখ পরিবারের বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হল। গুরুদ্বারাও জ্বলেপুড়ে ছারখার! গোটা দিল্লিতে যখন একটিও শিখ পুরুষ বেঁচে নেই, তখন মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষ করে রাজীব বললেন, “যখন কোনো সুবিশাল বটবৃক্ষ উপড়ে পড়ে, তখন আশেপাশের মাটি তো কেঁপে উঠবেই।”
মানে! রাজীব কি প্রকারান্তরে অ্যান্টি শিখ রায়টকে জাস্টিফাই করলেন? হয়তো তাই, হয়তো নয়—কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, হ্যাঁ, এটা জাস্টিফিকেশনই বটে! বড়ো দুর্বল জাস্টিফিকেশন! এর চেয়ে নীরবতাই ভালো ছিল না কি? কী প্রয়োজন ছিল এই বাক্যটার? না কি এর আড়ালে কয়েকটা রাক্ষসের মুখ লুকোতে চেয়েছিলেন তিনি? শ্যাম ত্যাগী, ভূপ ত্যাগী, মন্ত্রী এইচ কে এল ভগৎ, বলওয়ান খোখর, শঙ্কর লাল শর্মা, পি কে ত্রিপাঠী, ব্রহ্মানন্দ গুপ্তা এবং সজ্জন কুমারের মতো অপরাধীকে প্রশ্রয় দিচ্ছিলেন? না খোদ জগদীশ টাইটলারকে আড়াল করছিলেন, যিনি অসন্তুষ্ট হয়ে বলেছিলেন, “আমি আরও বেশি শিখকে মারতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সঙ্গীদের অপদার্থতায় মাত্র কয়েকজন শিখই মারা গিয়েছে।” মাত্র। আঠেরো হাজার মানুষের জন্য একটাই শব্দ, ‘মাত্র।’ শুধুমাত্র দিল্লিতেই তিন থেকে পাঁচহাজার শিখ মারা গিয়েছিল। এটা শুধু দিল্লির হিসাব। গোটা দেশের ‘আঁকড়া’ কেউ কখনও বলেনি। সরকার ধামাচাপা দিয়েছে। আসল অঙ্কটা লুকোনোর জন্য অনেক চেষ্টা চালিয়েছে।
প্রত্যেকবারই রাজনীতি সাধারণ মানুষকেই গিলোটিনে চড়ায় কেন? তখন আমি না ব্লু স্টার অপারেশন বুঝতাম, না বেয়ন্ত সিংকে চেনা ছিল। ইন্দিরা গান্ধীকে স্বচক্ষে দেখিনি। তাঁকে আমি বা আমার পরিবারের কেউ তো মারেনি। যে ধর্ম নিয়ে এত টানাটানি, সে ধর্মকে ঠিকভাবে বোঝার ক্ষমতাও আমার হয়নি। তবে কেন ঈশ্বর ফের কলম ভেঙে আমার কপালে লিখে দিলেন——খুন কা বদলা খুন।’
(২০২২)
আবার সেই কালরাত্রি ফিরে আসছে। কেউ জানে না, ১৯৮৪-এর অ্যান্টি শিখ রায়ট জন্ম দিয়েছিল নতুন এক ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের! যারা তাকে সৃষ্টি করেছিল, তাদের শেষ করতে আসছে সে। ইতিহাস সে মুখগুলোকে ভুলে যেতে পারে, কিন্তু ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন নিজের স্রষ্টাদের ভোলেনি। কখনোই ভোলে না।
সে আমি! এখন ওদের হাতেও স্রেফ বাহাত্তর ঘণ্টা। ওদের আয়ুও বাহাত্তর ঘণ্টা। পুলিশের হাতেও মাত্র তিনদিন। যে পুলিশ সেদিন স্রেফ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখেছিল, আমাদের বাঁচাতে আসেনি, তারাও ওদের বাঁচাতে পারবে না। আমি বাঁচাতে দেব না। যে-ই মাঝখানে আসবে, সে-ই মরবে। পুলিশ হোক, আইন হোক কিংবা গোটা কোর্ট! আবার জ্বলবে আগুন। আবার পুড়বে মানবদেহ! আবার বইবে রক্তের বন্যা….!
“তুমহারা খুন কা এক এক কতরা….!”
