কালরাত্রি – ২২

(২২)

ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের ডায়েরি

শুনেছি, আলেকজান্ডার বলেছিলেন, “আমি সেই হাজার সিংহের দলকে ভয় পাই না, যাদের সেনাপতি একজন ভেড়া। কিন্তু আমি সেই হাজার ভেড়ার ফৌজকে ভয় পাই যার নেতৃত্ব একজন সিংহ দিচ্ছে!”

আমিও এখন ভয় পাচ্ছি। কারণ আমার সামনে একটা দল প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে আছে যার সেনাপতি একজন সিংহ। এরকম লোহার মতো কঠিন নার্ভ, মনের জোর, লড়াইয়ে টিকে থাকার সাহস ও অসম্ভব বুদ্ধির সংমিশ্রণ জীবনে খুব কমই দেখেছি। আমার কোনো চাল, মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবই ওর ওপর কাজ করছে না! যতই নিজেকে গোপন করার চেষ্টা করি, ঠিক চিনে নিচ্ছে। এমনকি আমার আসল নামটাও বের করে ফেলেছে। কমলার ছদ্মবেশে আমায় চেনা একরকম অসম্ভবই ছিল। কিন্তু কে জানত, ও আমার মুখ থেকে বেফাঁস কথাটা বের করে নেবে! এখন খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছি, বেয়ন্ত সিং ও জর্নেল সিং ভিন্দ্রানয়ালের সঙ্গে তুলনাটাও ও একদম ইচ্ছে করে দিয়েছিল। যাতে আমার খুন গরম হয়ে ওঠে আর আমি বেওকুফের মতো চেঁচিয়ে নিজের লোকেশনটা জানিয়ে দিই। কী অসম্ভব ধূর্ত লোক! কীভাবে আমার এই ডেরার কথা জানল, কখন জানল, কী করে এসে উপস্থিত হল রবজিই জানেন। এত চমকাবার পরেও খবরি নেটওয়ার্ক কাজ করে চলেছে, এত আতঙ্ক সৃষ্টির পরও ফরেনসিকে কেউ মজুত আছে—এ আমার কল্পনার বাইরে। নিজেকেই এখন অপদার্থ বলে মনে হচ্ছে। আমার অবিশ্বাসের জাল এত ঠুনকো ছিল যে সবটাই ছিঁড়ে ও বেরিয়ে আসতে পারল? আমার রহস্যময় প্ল্যানের ‘কোহরা’ ভেদ করে পি সি চৌধুরীর পরিবারকে বাঁচিয়ে নিল। এ কী করে সম্ভব? আমি কি এতটাই ‘নিকম্মা!

এখন রীতিমতো নিজের মাথাই দেওয়ালে ঠুকতে ইচ্ছে করছে। কোন কুক্ষণে আমি পুলিশকে চিঠি লিখেছিলাম! তখন কে জানত যে বেছে বেছে এই অধিরাজ ব্যানার্জির ‘বাস দুশমনি’-ই আমার কপালে নাচছে। জানা তো দূর, আমি বুঝতেও পারিনি যে ওরা এভাবে একদম নিশ্চুপে আমার ঘাঁটিতে এসে হাজির হবে। নেহাত কিচেনের জানলা দিয়ে বেরিয়ে কয়েক মিনিটের জন্য একটু শ্মশানের রাস্তায় ‘টহল’ মারতে গিয়েছিলাম। সেই ফাঁকেই ওরা ঢুকে পড়েছিল, তাই আমার সাড়াশব্দ পায়নি। ওদের খবরি বোধহয় সামনের দরজায় চোখ রেখেছিল, তাই পেছনের জানলা দিয়ে আমাকে বেরোতে দেখেনি। আমি ফিরে এসে দেখি, দুই অফিসার আমার গুপ্ত ঘাঁটিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম বলে কী করব প্রথমে বুঝে উঠতে পারিনি। চুপি চুপি জানলা দিয়ে গলে পালিয়ে গেলেই বোধহয় ভালো হত। কিন্তু আমি ‘গধেড়া’র মতো অতিরিক্ত ‘হিরোপন্তি’ দেখাতে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়েছি, পালটা ভয়ও দেখিয়েছি। কিন্তু তাতেও কিছু হল না। মাঝেমধ্যে অল্পবিস্তর রান্না কিংবা জল গরম করার জন্য গ্যাসের সিলিন্ডার দুটো রেখেছিলাম বলে কপালগুণে বেঁচেছি! নয়তো অতখানি ক্লোরোফর্ম ঢালার পরও সে ‘বান্দা’ এইসান চেজ করেছিল যে বার্নিং শিখের গল্প প্রায় আর একটু হলে শেষই হয়ে যাচ্ছিল।

কিন্তু গল্প এখনও শেষ হয়নি। এখনও একটা আস্ত দিন আর রাত পড়ে রয়েছে। আজ রাত তিনটে অবধি আমার দেওয়া বাহাত্তর ঘণ্টার মেয়াদ অবশিষ্ট আছে। তার মধ্যে আমি বারবার ফিরে আসব। বারবার আক্রমণ করব! অবিকল যেমন ওরা করেছিল…।

এই গল্প শুরু হয়েছিল ৩১ অক্টোবরের বিকেল থেকে। তারপর চব্বিশ ঘণ্টা কেটে গিয়ে এক তারিখের বিকেল হল, রাতও হল। তবু পরিস্থিতি পালটাল না। আমাদের জীবনে আর সূর্যোদয় হল না। বাহাত্তর ঘণ্টার এক লম্বা রাত! অন্তহীন… রক্তাক্ত। সেদিন ছাতে দাঁড়িয়ে আমি যেটুকু দেখেছিলাম, তারপর আর ওখানে দাঁড়াবার সাহস হয়নি। কীভাবে যে কাঁপতে কাঁপতে নীচে নেমে এসেছিলাম সে শুধু আমিই জানি। পা দুটো এমন কাঁপছিল যে মনে হচ্ছিল, এখনই বুঝি পড়ে যাব। শেষপর্যন্ত দু-পায়ে নামতে পারিনি। মনে হচ্ছিল, পা দুটোই বুঝি নেই। চার হাতে-পায়ে ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে কোনোমতে একতলায় এলাম। গোটা বাড়ি তখন অন্ধকার। দরজা জানলা সব বন্ধ। বাইরের আলো-বাতাস ঢোকা তো দূর, ঘরেও একবিন্দু আলো নেই। বেবে সব আলো নিভিয়ে দিয়ে বসে আছে। সেই অদ্ভুত অচেনা অন্ধকারে আমি কাউকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ভয় করছিল… ভীষণ ভয় করছিল….! মনে হচ্ছিল এটা আমার আজন্মপরিচিত সুখের ঘর নয়। একটা নির্জন দুনিয়ায়, আলোহীন কোনো বিশ্বে আমায় একা কেউ দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমার সবাই আছে, তবু কেউ নেই। এখানে ব্যথা লাগলে যদি কেঁদেও উঠি, তবু ‘বেবে’ ছুটে আসবে না। বাপু সস্নেহে ক্ষতে মলমের প্রলেপ লাগিয়ে দেবে না। ছোটো ছোটো দুই প্রা’জির কোলাহল কোথাও নেই। দিদির বিয়ের সানাই কোনোদিন বাজবে না-রোশনাই হবে না। এখানে শুধু অন্ধকার। শুধুই শীতল অন্ধকার!

আমার খুব ইচ্ছে করছিল চিৎকার করে কেঁদে বেবেকে ডাকি। কিন্তু ওই ‘অন্ধেরা’ ঘরে বেবে যেন হারিয়েই গিয়েছে। শুধু শুনতে পাচ্ছিলাম খুব মৃদুস্বরে একটা মেয়েলি কান্না। আমার বেবেকে চিরকালই খুব সাহসী বলে জানতাম। বাপু গল্প করেছিলেন, বেবে নাকি বিয়ের আগে একবার কোনো গুন্ডাকে লাঠি দিয়ে ‘পিটাই’ করেছিল। ওরকম একটা গুন্ডাকে স্রেফ লাঠি দিয়ে পেটাতে গেলে ‘জিগ্রা’ লাগে। আমার ইচ্ছে ছিল, বেবের মতো সাহসী হব। অথচ আমার সেই হিম্মতওয়ালি বেবেই কাঁদছিল, আর বলছিল, ‘কিসিকো নেহি ছোড়নেওয়ালে উয়ো লোগ… উয়ো ফির আয়েঙ্গে… সব কো মারেঙ্গে।’

একটা আট বছরের শিশুর হৃদয়ে যে সাহসের শেষ উৎস ছিল, সেটাও বুঝি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। একটা মানুষের জীবনে যে এত আতঙ্কও থাকতে পারে, তা জানা ছিল না। কানে আসছিল দিদির রিনিরিনে স্বর, “শুভ শুভ বোল বেবে…. কিচ্ছু হবে না। বাইরে সরতাজরা আছে তো!”

বাইরে তখন সরতাজরা ছাড়াও আরও অনেক কিছু ছিল। যতই দরজা জানলা বন্ধ থাকুক, কলোনির অন্যান্য ব্লকের মানুষদের পরিত্রাহি চিৎকার সব ছাপিয়ে তখনও কানে আসছে। অর্থাৎ চক্রাকারে চলছে আক্রমণ। এই ব্লকে সুবিধা করতে পারেনি। কিন্তু পুরো মঙ্গলপুরীকে ওরা ঘিরে ধরে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। এই একটি এলাকা শুধু বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো এখনও সুরক্ষিত পড়ে আছে। তবে ঐ আট বছরের শিশুও বুঝতে পেরেছিল, বেশিক্ষণ থাকবে না। আমাদেরও ওই একই পরিণতি হবে যা বাকিদের হতে দেখেছি। যতবার দৃশ্যগুলো মনে পড়ছিল, ততবার কেঁপে কেঁপে উঠছিলাম। ছোটোবেলায় ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখলে মা বুকে জড়িয়ে ধরত, আশ্রয় দিত৷ আজ কেউ জড়িয়ে ধরার জন্য ছিল না। সম্পূর্ণ নিরাশ্রয় হয়ে গিয়েছিলাম আমি! “গুরু। পুত্তর!”

বেবের কান্নামাখা গলার ডাক শুনে আমারও বুকের ভেতরে একটা অবুঝ কান্না দাপিয়ে মরল। মায়ের ছায়াশরীরটা ততক্ষণে চোখে পড়েছে। আমি সোজা দৌড়ে গিয়ে তাকে দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। ভয়ে, অদম্য আতঙ্কে তার বুকের সঙ্গে মিশে গিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললাম, “বেবে!… বেবে!”

বেবের নরম হাতটা আমার মাথার ওপরে পড়ল। কিন্তু এ সেই বরাভয় দেওয়ার হাত নয়। স্পষ্ট বুঝলাম, মায়ের হাতও আজ কাঁপছে। সেই স্পর্শে উষ্ণতা ছিল না, বরং ভয়মাখা শীতলতা ছিল। তার হৃৎস্পন্দনে একটুও অভয় ছিল না, বরং আতঙ্কের দ্রুতগামী লয় ছিল। মায়ের বাহুপাশেও এক সন্তান সেদিন আশ্রয় খুঁজে পায়নি। দুঃস্বপ্নে, আতঙ্কে যে স্নেহময়ী চিরকাল রক্ষা করেছে, আজ সে-ও বিপন্ন। ওই অন্ধকারেই আমরা কয়েকজন চুপ করে বসে রইলাম। বেবে, আমি, আমনপ্রীত, সরবজিত আর যস্যিদিদি। না, চুপ করেছিলাম বললে ভুল হয়। নিজেদের আপ্রাণ চুপ করাবার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু চাপা কান্না আমাদের পেছন ছাড়ছিল না। সবাই সবাইকে চিনতে পারছিলাম, নিঃশ্বাসের শব্দও শুনতে পাচ্ছিলাম, অথচ ঠিকমতো অনুভব করতে পারছিলাম না। ওদের কাউকে জীবিত মানুষ বলে মনেই হচ্ছিল না। কতগুলো আত্মা যেন হাহাকার করে বেড়াচ্ছে, “কেউ বাঁচবে না… কেউ না…!”

একটু পরেই ফের বাইরে অনেক উত্তেজিত কণ্ঠ শোনা গেল। প্রথমে আমরা সকলেই আঁতকে উঠেছিলাম। ভাবলাম, ওরা আবার ফিরে এল বুঝি! আমার আর উঁকি মেরে দেখার সাহস ছিল না। বেবের বুকে মুখ লুকিয়ে ভাবছিলাম, যদি এই আশ্রয়টুকুই আমায় বাঁচায়। যদি মা নিজের বুকের মধ্যেই চিরদিনের জন্য আমায় লুকিয়ে রাখে…. “আরে, তোমরা ফিরে এলে? কাজ হয়েছে?”

বাইরে থেকে সরতাজের কণ্ঠ ভেসে এল, “গৌরীদিদি। তুমি কাঁদছ কেন? কী হল?”

গৌরী দিদির মুখে সব ঘটনা শোনা গেল। ওরা আহত মানুষগুলোকে নিয়ে, নভজ্যোতের দিদি আর পদ্মীভাবিকে বাঁচানোর জন্য অনেক আশায় হাসপাতালে গিয়েছিল। গুরু নানক হসপিটালেরই শরণাপন্ন হয়েছিল ওরা। গৌরী বিশ্বাসের মনে ভরসা ছিল, অন্তত যে হসপিটাল স্বয়ং গুরু নানকের নামে, সেখান থেকে হয়তো শিখদের শূন্য হাতে ফিরতে হবে না। তাছাড়া তিনি নিজেও ওই হসপিটালেরই কর্মচারী। তাই আস্থা ছিল। হসপিটাল কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে আশ্বাসও দিয়েছিল যে তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই এসে জানাল সব বেড ভরতি, তাই পেশেন্টদের ভেতরে নিতে পারবে না। দু-জন দগ্ধ নারীকে যেন আপাতত বাইরেই মাটিতে শুইয়ে দেওয়া হয়। ভেতরে বেডের ব্যবস্থা হলে দু-জনকেই শিফট করা হবে।

এইটুকু আশ্বাস দিয়েই ডাক্তাররা চলে গেলেন। তারপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটল, কারোর দেখা নেই! কেউ ওদের শুশ্রুষা করতে এল না। পদ্মী কৌর ‘জল জল’ বলে গোঙাচ্ছিল। গৌরী তাড়াতাড়ি ভেতরে গেলেন একটু জলের ব্যবস্থা করতে। কিন্তু কেউ যেন তাঁকে দেখলই না। সবাই নিজেদের কাজ নিয়েই ব্যস্ত! ডাক্তারদের খোঁজ নিতে গিয়ে জানলেন যে তাঁরা নাকি জরুরি মিটিং করছেন। এমনকি জুনিয়র ডাক্তাররাও নাকি নেই। এখন কেউ আসতে পারবেন না। জলের প্রসঙ্গ তুলতেই তাঁর সহকর্মীরা জানাল যে আপাতত হসপিটালের ট্যাঙ্ক ও জলের বোতল সব শূন্য।কিছুক্ষণ পরেই জল দেওয়া হবে।

কিন্তু সেই জল আর এল না। ফিরে এলেন না ডাক্তাররাও। তারা সবাই নাকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত আছেন। গৌরী যতবার ভেতরের মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছেন, প্রত্যেকবার একই উত্তর পেয়েছেন, “ডাক্তাররা খুব ব্যস্ত। যখন বেডের ব্যবস্থা হবে তখন পেশেন্টদের নিয়ে আসা হবে। অপেক্ষা করুন।”

তিনি নিরুপায় হয়ে বলেন, “থার্ড ডিগ্রি বার্ন কেস। এভাবে মাটিতে শুইয়ে রাখলে ওরা তো এমনিই মরে যাবে!”

যিনি বিষয়টা দেখছিলেন, তিনি আরও গম্ভীর হয়ে বললেন, “বেড না থাকলে কী করব সিস্টার? আমি তো নিজেই বেড বানিয়ে অ্যালট করতে পারি না। আর বাইরের মেঝেতে পেশেন্টদের শুতে আপত্তি থাকলে হসপিটালের মেঝেতে শুইয়ে দিন। একই ব্যাপার।”

কথাটা শুনে আঁতকে ওঠেন গৌরীদিদি। পুড়ে যাওয়া পেশেন্ট মেঝেতে শোবে। ইনফেকশনেই তো শেষ হয়ে যাবে। এমনিতেই বাইরে মানুষগুলো যে পরিস্থিতিতে আছে, তাতে আর বেশিক্ষণ থাকলে এমনিই বাঁচবে না। বার্ন কেসের রোগীর পাশে একটু আগেও দুটো নোংরা কুকুর শুয়েছিল! সবাই মিলে কোনোমতে চেঁচিয়ে তাদের তাড়ানোর চেষ্টা করছিল। ওদের চেঁচামেচি শুনে ইউনিফর্ম পরা এক ওয়ার্ডবয় গম্ভীর মুখে বেরিয়ে এল, “কী হল? চেঁচাচ্ছেন কেন আপনারা! এটা হসপিটাল। এখানে শোর-শরাবা করলে লোক ডেকে স্রেফ বাইরে বের করে দেব।”

“ও জি।” গুরশরণ তাওজি বোঝানোর চেষ্টা করেন, “এই দেখুন …কুত্তা শুয়ে আছে পেশেন্টের পাশে!”

“তো?” লোকটি নিস্পৃহমুখে বলে, “কুকুরই তো শুয়ে আছে। বাঘ তো নয় যে পেশেন্টকে খেয়ে ফেলবে!”

জবাব শুনে সকলেই স্তম্ভিত। কে কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। গোমড়ামুখো ওয়ার্ডবয় রীতিমতো ‘চেতাবনি’ দিয়ে গেল, ফের হল্লা করলে পেশেন্টদের তুলে নিয়ে বাইরে ফেলে দেবে। ওয়ার্ডবয়টি গৌরীদিদির পরিচিত। তিনি এগিয়ে গিয়ে বললেন,

“গুড্ডুভাই, দেখো না একবার ডাক্তাররা কোথায়! অনেকক্ষণ তো হয়ে গেল!”

গুড্ডু নামক ব্যক্তিটি গৌরীদিদির দিকে এবার একটু নরম দৃষ্টিতে তাকায়। তারপর বলল, “আচ্ছা দিদি। খুঁজে দেখছি।”

সেই খোঁজ আর শেষ হল না। দু-জন দগ্ধ, অর্ধমৃত নারী হসপিটালের বাইরেই প্রায় তিনঘণ্টা মাটিতে শুয়ে কাতরাতে কাতরাতে অবশেষে একসময় নীরব হয়ে গেল।

সেটাই হওয়ার ছিল। শেষমুহূর্তে একফোঁটা জলও ওদের কপালে জোটেনি। ডাক্তাররা আর ফিরে আসেননি, তবে কুকুরগুলো বারবার ফিরে আসছিল। বাপু, তাওজিরা চেঁচাতেও পারছিলেন না। হাত-পা চালিয়ে যতবার ওদের তাড়িয়েছেন, ঠিক কিছুক্ষণ পরই প্রাণীগুলো ফের এসে হাজির। হয়তো এটাই ওদের আরাম করার স্থায়ী জায়গা। আজ সেখানে কতগুলো মানুষ শুয়ে আছে দেখে ওদেরও বুঝি কৌতূহলের অন্ত ছিল না। পুড়ে যাওয়া মানুষগুলোকে শুঁকে শুঁকে দেখে কী বোঝার চেষ্টা করছিল কে জানে। ডাক্তাররা তো ছুঁয়েও দেখল না। তবু কেউ তো দেখল, হলই বা মনুষ্যেতর প্রাণী।

যন্ত্রণাকাতর মুমূর্ষুদের কষ্ট কমাতে ডাক্তার না এলেও শেষপর্যন্ত যমরাজই এলেন। ওদের ছটফটানি, গোঙানি আর জ্বালা দেখে বোধহয় তাঁরও দয়া হল। মানুষদুটো শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতেই অদ্ভুতভাবে কুকুরগুলোও স্থানত্যাগ করল। পবনজ্যোত আর নভজ্যোতের কান্না থামছিল না। পবনজ্যোত পদ্মীর মৃতদেহ আঁকড়ে ধরে পাগলের মতো বিলাপ করছিল। গৌরীদিদি বুঝতে পারছিলেন না কী করবেন। তিনি হয়তো আবার হাসপাতালের মধ্যে যেতেন, তার আগেই এবার তাড়াতাড়ি ওয়ার্ডবয়রা বেরিয়ে এল। কোনো কথা না বলে মৃতদেহ দুটোকে তুলে নিয়ে চলে গেল। ওরা বুঝি জানত যে মেয়ে দুটো কিছুতেই বাঁচবে না। ওদের মরার অপেক্ষাতেই ছিল। বেড খালি না থাকলেও মর্গে নিশ্চয়ই জায়গা আছে! সেখানে ফেলে রাখতে সমস্যা নেই। সমস্যা শুধু চিকিৎসার ক্ষেত্রে।

বাইরের সমস্ত সংলাপই আমার কানে এসে ঢুকছিল। ওই বয়েসে অত কিছু আমার আদৌ বোঝার কথা নয়। অথচ আশ্চর্য। সব বুঝতে পারছিলাম। পবনজ্যোতের কলজে-ছেঁড়া কান্না আর বাপুর তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা— সবই শুনছিলাম। আর মনে মনে ভাবছিলাম, এখন বাপু পবনকে ‘দিলাসা’ দিচ্ছেন। কিন্তু এরপর কে কাকে সান্ত্বনা দেবে? মঙ্গলপুরীর চতুর্দিকে শিখ বসতি আর বিশেষ বাকি নেই। আমাদের মতো দু-চারটে এলাকা ছাড়া গোটাটাই প্রায় একটু একটু করে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। দুষ্কৃতীরা একবার উদয় হচ্ছে, মারছে, চলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর আবার দ্বিগুণ হিংস্র মূর্তিতে ফিরে আসছে, আবার মারছে কাটছে। আজ সারাদিন ধরে এই-ই চলেছে। চতুর্দিকে লাশের স্তূপ। কে কাকে সামলায়, কে কার দুঃখ ভাগ করে নেয়? সবাই শেষ! মৃতদেহ বহন করার জন্য, মুখাগ্নি করার জন্যও কেউ বেঁচে নেই।

আমরা জানতাম, এখানেও তাই হবে। ‘ভেড়িয়ার’ দল একবার ব্যর্থ হয়ে চলে গেলেও আবার আসবে। বাইরের কথাবার্তাতেও সেই আশঙ্কাই বারবার উঠে আসছিল। চাপা গুঞ্জনের মধ্যে ফুটে উঠছিল একটাই আতঙ্ক, “উয়ো লোগ ফির আয়েঙ্গে। এবার হয়তো আরও বেশি শক্তি সংগ্রহ করে।”

কথাটা বেবের কানেও গিয়েছিল। ফুঁপিয়ে উঠে আমায় আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ওর অন্য বাহুতে মুখ লুকিয়ে বসে আছে আমনপ্রীত ও সরবজিত। ওরা আওয়াজ করে কাঁদছিল না। কিন্তু দু-জনেরই কাঁপুনি আমি এখান থেকেই টের পাচ্ছিলাম। পাছে কান্নার আওয়াজ কেউ শুনে ফেলে, সেই ভয়ে ওরা আওয়াজ করে কাঁদতেও পারছিল না। কিন্তু পৈশাচিক আতঙ্ক কাঁপুনির মাধ্যমে সবাইকে ঝাঁকিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল।

ততক্ষণে বাইরে সন্ধ্যার অন্ধকার নামছে। দেখতে দেখতে আরও একটা রাত এসে পড়ল। কিন্তু আমাদের তাতে কিছুই আসে যায় না। কখন আলো ফুটছে, কখন রাত নামছে কিছুই বুঝতে পারছি না। বদ্ধ ঘরের ভেতরে বসে দরদর করে ঘামছি। একটা সামান্য আওয়াজ পেলেও চমকে উঠে ভাবছি, ওই এল…। ওই বুঝি এল ওরা! শ্বাস নিতেও ভয় করছে। যদি কোনো শত্রু শুনে ফেলে। যেটুকু বাতাস বুকে না ভরলেই নয় ঠিক ততটাই মেপে মেপে নিচ্ছি। যদি জেনে ফেলে এখানে শিখ পরিবাররা এখনও জিন্দা আছে। নিজেদের লুকিয়ে রাখার প্রবল ইচ্ছে মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু কোথায় লুকোব? যে বাড়িটাকে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় ভাবতাম, সেটাই কখন আগুনে জ্বলে উঠবে সেই ভয়েই মরছি। এই ঘর, পরিবার ছাড়া আর কোনো আশ্রয় তো আমার নেই। বাপুর মুখে শুনেছিলাম, এই দেশ আমার, এই মাটি আমার, এই দেশের সব মানুষ আমার আত্মীয়। অথচ এক মুহূর্তে সব কেমন যেন উলটোপালটা হয়ে গেল। হঠাৎ করেই বুঝলাম, এই দেশ, মাটি— কোনোটাই আর আমার নেই। আচমকা কোথা থেকে যেন একদল লোক এসে বুঝিয়ে দিয়ে গেল, তোমরা এই দেশের কেউ নও! এখানে তোমাদের অস্তিত্বই থাকতে দেব না আমরা। একদিন আগেও আমি জানতাম, ওরাই আমার আপন! আর আজ প্রত্যেকটা পরিচিত মুখই যেন ভয়াবহ এক রাক্ষসের মুখোশে ঢাকা!

“আয়েঙ্গে তো দেখ লেঙ্গে।” সরতাজের তেজি কণ্ঠ ভেসে এল, “আমরা এখনও মরিনি। যতক্ষণ না মরছি, লড়ে যাব। তারপর যা হবে দেখা যাবে।”

আস্তে আস্তে অনেক রাত হল। বাপু কিংবা তাওজি, কেউই একবারের জন্যও ঘরে এলেন না। বুঝলাম, ওরা সরতাজের সঙ্গে বাইরে কলোনি পাহারা দিচ্ছেন। একা ওরাই নন, বাকিরাও সবাই কেউ লাঠি, কেউ তরোয়াল হাতে নিয়ে অতন্দ্র প্রহরায় কায়েম আছে। ওদের অস্থির পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। বিশেষ করে সরতাজের ভারি বুট জুতো এ মাথা থেকে ও মাথা হেঁটে বেড়াচ্ছে। তার খট্ খট্ আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যায়।

সেই রাতে কারোর বাড়িতে ‘চুলা-চৌকা’ হয়নি। কোনো ঘরের উনুন জ্বলেনি। শান্তিময় রাতের বরাদ্দ রুটি-জলটুকুর কথাও ভুলে গিয়েছিল সবাই। আমারও সেসব কিছু মনে ছিল না। যে দৃশ্য দেখেছি, তারপর ক্ষুধা-তৃষ্ণাবোধ না থাকারই কথা। ‘জিন্দা লাশ’ হয়ে আমরা সবাই বসেছিলাম। টিক টিক করে ঘড়ির কাঁটা একটু একটু সরছিল, আর ভাবছিলাম, কখন আবার মৃত্যু এসে হানা দেবে। সবার মাথাতেই এক চিন্তা। কী হবে! তার চেয়েও কঠিন প্রশ্ন—কখন হবে!

ঠিক তখনই একটা চাপা কান্নার শব্দ পেয়ে চমকে উঠি। এতক্ষণ তো চারদিকে শুধু নীরবতাই ছিল। কারোর চোখে ঘুম নেই, যে ঘুমের ঘোরে দুঃস্বপ্ন দেখে কেঁদে উঠবে। তবে হঠাৎ এমন নীচুস্বরে কাঁদে কে! আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুনতে পেলাম যসমিত দিদির ফিশফিশে গলা, “সরবজিত! কাঁদছিস কেন?”

সরবজিত কোনো উত্তর না দিয়ে উচ্ছ্বসিত কান্নাকে গলাধঃকরণ করার চেষ্টা করে। কিন্তু তারপরও তার ‘সিকিয়াঁ’ শোনা যাচ্ছিল। ততক্ষণে রাত বেশ গভীর হয়েছে। চতুর্দিকে নৈঃশব্দ। নিজের কলোনিটাকে নিজেই চিনতে পারছি না। এখানে অনেক রাত অবধি গাল-গল্প, হাসি-ঠাট্টা, শোর শরাবা চলতেই থাকে। এমনিতেই সর্দারদের বদনাম আছে, তারা নাকি সবসময়ই চেঁচিয়ে-মেচিয়ে একসা করে। তার ওপর অল্পবয়েসী ছেলে মেয়েদের কলরব, শিশুদের কান্নার আওয়াজ, সব মিলিয়ে জমজমাট থাকে। অথচ আজ বড়োদের আওয়াজ তো দূর, একটা ছোট্ট বাচ্চার হাসি বা কান্না, কিছুই শোনা যাচ্ছে না। ছোট্ট শিশুরা একদিনেই কি বড়ো হয়ে গেল? না তাদের মায়েরা বাচ্চাগুলোর মুখে কাপড় গুঁজে রেখেছে, যাতে কান্না না শোনা যায়৷ কোথাও কেউ কোনো আওয়াজ করলেই সবাই ফিশফিশ করে বলে উঠছে, “চুপ। চুপ।” প্রত্যেকের শ্রবণেন্দ্রিয় উৎকর্ণ হয়ে আছে, ওই বুঝি শোনা যায় আততায়ীদের চিৎকার। ওই বুঝি ধুপধাপ করে একদল মানুষ ছুটে আসছে। ওই বুঝি…!

সরবজিতের কান্না আরও একটু উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। বেবে আর যসমিত দিদি দু-জনেই তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে জিজ্ঞাসা করার পর সে কান্নাভেজা গলায় কাতর স্বরে বলল, “ভুখ লেগেছে।”

বেবে আর দিদি নীরবে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। সরবজিত পা’জির দোষ নেই। ছোটোবেলা থেকেই সে খিদে সহ্য করতে পারে না। সর্দারের বাচ্চার খাওয়ার পরিমাণ একটু বেশিই হবে এতে আর আশ্চর্য কী। আর সে বড়ো ছেলে বলে মায়ের একটু বেশিই আদরের। আমনপ্রীত বা আমার খাওয়া নিয়ে বিশেষ কোনো মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু সরবজিতের খাওয়ার পরিমাণ চিরকালই একটু বেশি। চারটে রুটি ছাড়া তার কোনোদিন পেট ভরত না। ঘণ্টায় ঘণ্টায় তার খিদে পায়। কখনও বাদাম খায়, কখনও ভুট্টা। যখনই দেখো, সবসময়ই তার মুখ চলছে। কিছু না কিছু খেয়েই চলেছে। অথচ বাড়ির কারোর মনেই পড়েনি যে আজ অনেকক্ষণ ধরে ভোজনরসিক ছেলেটা অভুক্ত! এই অবস্থায় সে খাবার চাইতেও পারছে না, ওদিকে খিদের জ্বালাও সহ্য করতে পারছে না। শেষপর্যন্ত আর থাকতে না পেরে খুনখুন করে কেঁদেই ফেলল।

আমার কপালের ওপর টপ্ করে একবিন্দু গরম জল পড়ল। বেবের চোখের জল। সন্তানের ক্ষুধা দেখে অসহায় মায়ের চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। হয়তো ওর মনে পড়ে গিয়েছিল, শুধু সরবজিত নয়, তার অন্য সন্তানেরাও খিদের আগুনে জ্বলছে। অথচ তাদের মুখের সামনে দুটো রুটি ধরার অবস্থাও নেই। এখন আতঙ্কে ঘরে কেউ আলোই জ্বালাচ্ছে না, ‘চুলা’ তো দূর। আলো দেখলে শিকারীরা টের পাবে। উনুনের ধোঁয়া তো আবার দূর থেকেও দেখা যায়। স্টোভের নিজস্ব একটা গন্ধ আছে। ওরা এখন সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে। গোটা মঙ্গলপুরীকে থেকে থেকেই ঘিরে ধরছে। যদি বুঝতে পারে, এত কিছু হয়ে যাওয়ার পরেও সর্দাররা এখন ‘খানা পাকাচ্ছে’ তাহলে ছেড়ে কথা বলবে না! নির্ঘাৎ বলবে, “ইন্দিরা গান্ধীকে মেরে তোরা এখন ডাল-রুটি পাকাচ্ছিস! মার সালে কো….!” মারপিট করার শুধু অজুহাতই তো চাই ওদের। সেটা আলোকসজ্জা, মিঠাই থেকে শুরু করে রুটি পর্যন্ত সব হতে পারে। যসমিত দিদি কিছুক্ষণ বসে থেকে তারপর শেষে উঠে রসোইয়ের দিকে গেল। আমরা শুধু তার লঘু পায়ের আওয়াজের শব্দ পেলাম। আর কোনো আওয়াজ নেই। এমনকি বাসনপত্রের টুংটাং, ঠংঠংও নয়। কিছুক্ষণ পরই দিদি ফিরে এল। আমাদের প্রত্যেকের হাতে ক্ষীরা আর গাজর ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এখন এটাই খেয়ে নে। সকালে যদি সব ঠিকঠাক থাকে তবে কিছু বানিয়ে দেব।”

এতক্ষণ ভয়ে, আশঙ্কায়, বিবিধ চিন্তায় টের পাইনি যে আমাদেরও পেটের মধ্যে মোচড় দিচ্ছে। রাত কত প্রহর কে জানে! তবে নিস্তব্ধতা আর অন্ধকারের মধ্যে থেকে মনে হচ্ছিল, হয়তো মধ্যরাত হয়ে গিয়েছে। সরবজিত আর কোনো কথা না বাড়িয়ে গোগ্রাসে খাওয়া শুরু করল। শসা বা গাজর কামড়ে খেতে গেলে একটা আওয়াজ হবেই। আজ পর্যন্ত এই দুটো জিনিস কেউ নিঃশব্দে খেতে পেরেছে বলে জানা নেই। কিন্তু খাওয়ার শব্দটুকুও করা যাবে না। বেবে চোখ মুছে বলল, “পুত্তর! আস্তে খা। আওয়াজ করিস না…।”

মা শুধু এইটুকুই বলতে পেরেছিল। আচমকাই গভীর রাতের সব ‘সন্নাটা’ চিরে দিয়ে একটা হিংস্র চিৎকার ভেসে এল। শুনলাম, অনেকগুলো মানুষ চেঁচিয়ে বলছে, “ব্যাটারা এখানে লুকিয়ে বসে আছে…! সালারা দল বানাচ্ছে। মারো… মারো…!” সঙ্গে তাদের পায়ের সেই ধপাধপ ভয়াবহ আওয়াজ। মনে হচ্ছিল, গোটা কলোনিই বুঝি সেই শব্দে কাঁপছে। সরবজিত সবে এক কামড় শসা মুখে দিয়েছিল। ওর হাত থেকে শসাটা ধপ্ করে নীচে খসে পড়ে গেল। আমরা সবাই যেন ফের বরফের পুতুল হয়ে গিয়েছি। কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। শুধু শুনলাম ফের সেই রণ-হুঙ্কার। এদিক থেকে শিখরা চেঁচিয়ে উঠল, “বোলে সো নিহাল… সৎ শ্রী অকাল…।”

তারপর কী ঘটল তা উকি মেরে দেখার সাহস বা ইচ্ছে কোনোটাই ছিল না। বেবে ওখানে বসে কাঁদছে আর আমাদের বুকে জড়িয়ে ধরে চাপা স্বরে ‘ওয়াহেগুরুর’ নাম নিচ্ছে। দিদি একদম চুপ। বাইরে তখন লাঠির ঠাঁইঠাঁই শব্দ। তরোয়ালের ঝনৎকার। মৃত্যুর তাণ্ডব চলছে। মাঝেমধ্যেই নানারকমের ধাতব অস্ত্রের সংঘর্ষের জোরালো শাণিত শব্দ কানে ও মাথায় জ্বালা ধরাচ্ছে। তার সঙ্গে কারোর না কারোর আর্তনাদ ভেসেই আসছে। কে আহত হল, বাঁচল না মরল, শত্রু না মিত্র, কিছুই জানার উপায় নেই। শুধু একরাশ মানুষের চিৎকার, গোঙানি অথবা অস্ত্রের আওয়াজ। তার সঙ্গে টুকরো টুকরো ক্রুদ্ধ গালিগালাজও ভেসে আসছে।

আমনপ্রীত দু-হাতে কান চেপে শুয়ে পড়েছে। সে আর নিতে পারছে না। সরবজিতকে দেখে মনে হচ্ছে ও আর বেঁচে নেই। বেবে বিড়বিড় করে কী সব যেন বলে চলেছে। আর দিদিও মূর্তির মতো চুপ করে বসে আছে। আমার নিজের বাহ্যিক অবস্থা কী হয়েছিল তা সঠিক বলতে পারব না। কিন্তু আমিও অনড় হয়ে প্রতিটা মুহূর্ত গুণছিলাম। যারা বাইরে এখনও লড়ছে, শত্রুদের বাধা দিচ্ছে, তারা যদি হেরে যায় তবে যে কোনো মুহূর্তে এই বদ্ধ ঘরটা অগ্নিকুণ্ড হয়ে উঠতে পারে। অথবা নিতান্তই পলকা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে আসতে পারে আততায়ীরা। তারপর…!

এর থেকে বোধহয় নরকের যন্ত্রণাও অনেক ভালো ছিল। অন্তত সেখানে মানুষ জানতে পারে তার সঙ্গে ঠিক কী হতে চলেছে। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল স্বচক্ষে দেখা দৃশ্যগুলো! সেই জ্বলন্ত টায়ার, তরোয়ালের কোপে টুকরো টুকরো করে ফেলা, গায়ে সাদা পাউডার ঢেলে দেওয়া, কেরোসিন-পেট্রোল-ডিজেল ঢেলে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেওয়া, এককোপে ধড় থেকে মাথা আলাদা করে দেওয়া…! আমি ভাবছিলাম, এর মধ্যে ঠিক কোটা আমার সঙ্গে হবে। কোটা এদের মধ্যে একটু কম যন্ত্রণাদায়ক? যত ভাবছিলাম, ততই নিজের দেহে একের পর এক সেইসব মৃত্যুগুলোর যন্ত্রণা অনুভব করছিলাম। কখনও মনে হচ্ছিল, একটা জ্বলন্ত টায়ার আমার বুকের ওপর চেপে বসেছে… হাত নাড়তে পারছি না… টায়ারের সঙ্গে সঙ্গে আমার গোটা দেহ জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে…। কখনও অনুভব করছিলাম কেউ বুঝি তীক্ষ্ণ কোনো অস্ত্র দিয়ে আমায় কুপিয়েই চলেছে। কর্তার সিং-এর মতো আপাদমস্তক ওই কালান্তক সফেদ পাউডারে পুড়ে যাচ্ছি, চোখ দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে, কিন্তু কিচ্ছু করতে পারছি না। যারা মরেছে, তারা যে-কোনো একটা মৃত্যু মরেছে। আমি যে একসঙ্গে সবক-টা ‘মওত’-ই মরছিলাম। এখন মনে হয়, মৃত্যু বুঝি পোষাকের মতো আমার ওপর একের পর এক ট্রায়াল দিয়েই চলেছিল।

জানি না, বাকিদের মনের মধ্যে কী চলছিল। তবে আমার মনে হচ্ছিল, অসহ্য এই নিরাপত্তাহীনতার চেয়ে বোধহয় তাড়াতাড়ি মরে যাওয়াই ভালো। জানি না, বাইরে বাপু এখনও বেঁচে আছেন কিনা! তাওজি লড়ছেন, না তাঁর সব লড়াই শেষ হয়েছে তাও জানা নেই। সরতাজের রাইফেলের গর্জন শুনতে পাচ্ছি না। নভজ্যোত, পবনজ্যোতেরও আওয়াজ নেই। অনিশ্চয়তার প্রতিটা মুহূর্তের চেয়ে তখন মরণের মুহূর্তটা অনেক বেশি অভিপ্রেত হয়ে উঠেছিল আমার কাছে। সত্যি বলছি, ওই মুহূর্তে ভাবছিলাম, আমি এখনই হৃৎপিণ্ডটা ফেটে গিয়ে মরে যাই না কেন! অন্তত সেটা তো নিশ্চিত!

কতক্ষণ চলেছিল এই যুদ্ধ জানি না। অন্ধকারে সময়ের আন্দাজ করা মুশকিল। তবে আমার মনে হয়, বোধহয় কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের চেয়েও লম্বা ছিল এই লড়াই। দিন, মাস, বছর নয়, বহু শতাব্দী চলে যাচ্ছিল। যখন হৃৎপিণ্ডটা প্রায় গলায় এসে ঠেকেছে তখনই শুনতে পেলাম সরতাজের বিশ্বস্ত রাইফেলের আওয়াজ। পরমুহূর্তেই দুড়দাড় করে পদধ্বনি। না, আওয়াজটা এখন বিপরীতদিকে। অজস্র মানুষ এখন কলোনির এই গলি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দৌড়চ্ছে। শত্রু পিছু হটছে! ওরা পালাচ্ছে! পালিয়ে যাচ্ছে। ওঃ রবজি। ওয়াহে গুরুজি দা খালসা, ওয়াহেগু রুজি দি ফতেহ!

কিছুক্ষণের মধ্যেই সমস্ত আওয়াজ থেমে গেল। দাঙ্গাইরা আবার ব্যর্থ হয়েছে। তবে কিছুক্ষণ পরেই বাইরে একাধিক নারীকণ্ঠের কান্না শুনে বুঝলাম, এবারের মতো পালিয়ে গেলেও এ পক্ষের কয়েকটা লাশ ফেলে দিতে পেরেছে তারা। আমার মনের ভেতরটা অসাড় হয়ে আসছিল। আর কতক্ষণ চলবে এসব? ওরা ফিরবে, কয়েকজনকে মারবে, চলে যাবে। আবার ফিরবে… আবার মারবে…! এভাবে কতক্ষণ বেঁচে থাকা সম্ভব? আর যতবার ওই ভিড় ফিরে আসবে, ততোবার বেশি সংখ্যক লোক, বেশি অস্ত্র নিয়ে আসবে। আমাদের ঘরে তো হাতে গোণা কিছু অস্ত্রই ভরসা। আর এক এক করে মানুষও মরছে। কতক্ষণ লড়বে? বাপু, তাওজি ঠিক আছেন তো? এখনও তো ওঁদের কোনো সাড়া নেই। শুধু একের পর এক নারীকণ্ঠের হাহাকার, চুড়ি ভাঙার শব্দ, শোকার্ত কান্নার আওয়াজই ভেসে আসছে। সেই শোকবিলাপের প্রাবল্য বলে দিল এবার আমাদের অনেক পরিচিত মানুষেরই মৃত্যু হয়েছে। কে জানে, তাদের মধ্যে কারা কারা আছে। বাপু, তাওজি, সরতাজ, নভজ্যোত, ওরা কোথায়? কারোর সাড়া নেই কেন?

আমি মনে মনে এসব কথা ভাবছিলামই, এমন সময়ে দরজায় টোকা পড়ল। শুনতে পেলাম সরতাজের গলা, “পরজাইজি। দরজা খোলো একবার!”

সরতাজের কণ্ঠস্বর প্রাণে কিছুটা আরাম এনে দিল। যাক, অন্তত ও ঠিক আছে! আবার পরক্ষণেই আঁতকেও উঠলাম। দরজা খুলতে বলছে কেন? তবে কি বাইরে কোনো দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছে! কে গেল! বাপু? তাওজি?…

বেবের মনেও বোধহয় তেমনই কোনো আশঙ্কা কাজ করেছিল। কোনোমতে কাঁপতে কাঁপতে দরজার দিকে ছুটল। ওর পা এমন কাঁপছিল যে দেখে মনে হচ্ছিল, এখনই বুঝি পড়ে যাবে। তবু অনেক কষ্টে শেষপর্যন্ত দরজা খুলে সামনে তাকাল। আমরাও গেলাম পেছন পেছন। মনের ভেতর ভয় তো ছিলই, কিন্তু তাও গিয়ে হাজির হলাম। সামনের দৃশ্যটা দেখে কলিজায় একটু ‘ঠন্ডক্’এল ঠিকই। সামনেই বাপু দাঁড়িয়ে আছেন, তার পাশে তাওজি। ওঁরা সবাই ‘সলামত’ আছেন। তবে সবাই অমন বিষণ্ণ চোখে আমাদের দিকে দেখছেন কেন? সরতাজের চোখেও অব্যক্ত বেদনা। সে একটু ভারি গলায় বলল, “পরজাইজি, ছুটকিকে একবার ডাকো…!”

দিদিকে সে চিরকালই ‘ছুটকি’বলে ডাকে। যসমিত দিদি সরতাজের আওয়াজ শুনে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল। দুরম্ভ আবেগে সে কাঁপছে। চতুর্দিকের ভিড় দেখে ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “কী হৈয়া….!”

সরতাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে সরে দাঁড়ায়। গোটা ভিড়টাও আস্তে আস্তে সরে গিয়ে সামনের দৃশ্যটা প্রকট করে দিল। তখন সবে সূর্যোদয় হচ্ছে। একটা রক্তিম অথচ বিষণ্ণ আলো এসে পড়ছিল চতুর্দিকে। তার মধ্যেই দেখা গেল, আরও বেশ কিছু মৃতদেহের সঙ্গে নভজ্যোতও টানটান হয়ে পড়ে আছে মাটির ওপরে। তার গলার শিরা কেটে গিয়ে রক্তের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে চতুর্দিক। পেট পুরো ফালাফালা। চোখ খোলা কিন্তু তাতে কোনো প্রাণের স্পন্দন নেই। ওর বাবার, দাদা পবনজ্যোতের উথালিপাথালি কান্না প্রাণে এসে ধাক্কা মারছে। কিছুক্ষণ আগেই বাড়ির তিনজন মেয়েকে হারিয়েছে ওরা। এবার কনিষ্ঠ পুত্র, ছোটো ভাইও চলে গেল! চলে গেল যস্যিদিদির হবু ঘরওয়ালা! বিয়ের আগেই বিধবা হয়ে গেল দিদি…!

অথচ আশ্চর্য। দিদির মুখ অদ্ভুত নিরুত্তাপ। সে যেন স্থির মূর্তিতে পর্যবসিত হয়েছে। একদৃষ্টে কিছুক্ষণ নভজ্যোতের দেহটা দেখল। তারপর ক্লান্তভঙ্গিতে সরতাজের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, “উয়ো জিন্দা হ্যায়? ইয়া মর গয়া?”

দিদির এই অদ্ভুত প্রতিক্রিয়ায় উপস্থিত সবার সঙ্গে যেন সরতাজও ঘাবড়ে গেল। তার কাজলকালো সুন্দর দুই চোখে অসম্ভব বেদনা। সে উত্তরে শুধু মাথা নীচু করল। এ প্রশ্নের কোনো জবাব হয় না। দিদি তার নীরবতার ভাষা কতদূর বুঝল কে জানে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আস্তে আস্তে নভজ্যোতের লাশটার কাছে গেল। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল তার মাথার কাছে। উপস্থিত সকলেই একটা প্রবল শোকের ধাক্কা, বেসামাল কান্নার অপেক্ষা করছে। আমরাও কেঁদে ফেলেছিলাম। জিজু যতই গুরুগম্ভীর হোক কিংবা অঙ্ক ধরুক, তার কোমল স্বভাব, দিদির প্রতি মুগ্ধতা, বেবে-বাপুর সঙ্গে স্নেহের সম্পর্ক, দুষ্টু-মিষ্টি খুনসুটি, সব কিছু নিয়ে ভীষণ আপন ছিল। কিছুদিন পরে সে এ বাড়িরও পুত্রসম হতে যাচ্ছিল। আমরা সবাই তাকে সাদরে গ্রহণ করে নিয়েছিলাম। অথচ আজ সেই মানুষটাই নেই। কেন নেই—এ প্রশ্নেরও কোনো যথাযথ উত্তর নেই! ওই পড়ে আছে এক শান্ত, ভদ্র, নিরীহ প্রেমিক মানুষের দেহ! কোন্ অপরাধে? কেউ জানে না!

আমাদের কান্না যতই উচ্ছ্বসিত হোক না কেন, দিদির মোমের মতো অচ্ছাভ মুখ ভীষণ শান্ত ও প্রতিক্রিয়াহীন। সে আলতো করে তার সদ্য মেহেন্দি পরা রাঙা হাতদুটো দিয়ে নভজ্যোতের খোলা চোখদুটো আস্তে করে বন্ধ করে দিল। নভজ্যোতের দেহের রক্তের ধারা তার হাতের মেহেন্দিতে এসে মিশেছে। সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। শুধু তার হিমশীতল মৃত্যুকঠিন মুখ শেষবারের মতো স্পর্শ করল সে। তারপর উদাসীনভঙ্গিতে ফের উঠে এসে আস্তে আস্তে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। অন্যান্যদের মতো হাতের চুড়ি ভাঙল না, কাঁদল না, বিলাপ-হাহাকার করল না। নিশ্চুপে উঠে চলে গেল সেখান থেকে!

তখন আমরা কেউই দিদির এই অদ্ভুত ব্যবহারের পেছনের কারণ বুঝিনি। বুঝেছিলাম অনেক পরে। শুধু আমরা কেন, ওই মুহূর্তে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মানুষও বোঝেনি। হয়তো অন্য কোনো সময়ে এই জাতীয় নিরুত্তাপ ব্যবহারের জন্য দিদির সমালোচনা হত, কেউ না কেউ কথা শোনাতই। তবে তখন এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করার মতো মানসিকতা কারোরই ছিল না। সবার চোখেই তখন একটাই প্রশ্ন—এরপর কী। আর কতবার যুদ্ধ করতে হবে? আর কতগুলো লাশই-বা পড়বে।

সেদিনের প্রথম সূর্যালোক কতগুলো নিথর মরদেহের ওপর পড়েছিল। সদ্যবিধবাদের কান্নায় চকিত হয়ে গিয়েছিল ভোরের শান্ত পরিবেশ। কিন্তু তখনও আমরা জানতাম না, এই অভিশপ্ত দু-তারিখ আমাদের আরও অনেক কিছুই দেখাবে। হয়তো বা আগের থেকেও ভয়াবহ কিছু। আমি ভেবেছিলাম, সবকিছু দেখে ফেলেছি, বুঝে ফেলেছি। কিন্তু তখনও জানা ছিল না, আসলে কিছুই দেখিনি। যেটুকু দেখেছি সেটা নেহাতই ‘শুরুয়াত’।

আস্তে আস্তে বেলা বাড়ল। ভয়ার্ত মানুষগুলোর ক্লান্ত, শুকনো মুখের দিকে তাকানো যায় না। আমনপ্রীত নিজের দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে নীরবে কেঁদেই চলেছে। যসমিত দিদি চুপ করে বসে আছে পাথরের মতো। কোনো কথা বলছে না, নড়াচড়াও করছে না। সরবজিত ‘ভুখ-প্যায়াস’ কিছুর নামই করছে না। শুধু থেকে থেকে বেবেকে কাতরস্বরে বলছে, “চল্ না বেবে, আমরা এখান থেকে পালিয়ে যাই। ওরা সবাইকে মেরে ফেলছে। আমাদেরও মেরে ফেলবে। তার আগেই চল্ চলে যাই।”

সরবজিতের কথা যুক্তিগ্রাহ্য। কিন্তু ও জানত না যে যমের বাড়ি ছাড়া আমাদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা ছিল না। দিল্লিতে একটা জায়গাও তখন ছিল না যেটা শিখদের জন্য সুরক্ষিত। যারা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল তাদের কখনও তাড়া করে, কখনও ট্রেন বা বাস থেকে হিঁচড়ে টেনে নামিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল দাঙ্গাইরা। এমনকি একজন হিন্দু একটি শিখ পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছে জানতে পেরে আততায়ীরা চড়াও হয়েছিল তাদের ওপরে। শিখ পরিবারটিকে তো মেরেইছে, সঙ্গে হিন্দু আশ্রয়দাতাকেও কেটে টুকরো টুকরো করে রক্তাক্ত তরোয়াল উচিয়ে পৈশাচিক উল্লাস করেছে। পরে জানতে পেরেছি, গোটা দিল্লিতে শুধুমাত্র পাঁচটা এফ.আই.আর. লেখা হয়েছিল! অতগুলো লুট, খুন, ধর্ষণের ফলাফল মাত্র পাঁচটা এফ.আই.আর.! তাও মাত্র একলাইনের। অমুক সময়ে, ‘ফলানা’ জায়গায় ভিড় এসে অতগুলো লোককে খুন করেছে। ব্যস্, এইটুকুই। এর ওপরে কী তদন্তই বা হওয়া সম্ভব? কাকেই বা ধরপাকড় করবে আইন? ভিড়ের কোনো মুখ নেই, নাম নেই। নামগুলো প্রত্যক্ষদর্শীরা গড়গড়িয়ে বলেও দিয়েছিল। অথচ এফ.আই.আর.-এ তার কোনো উল্লেখই নেই। বাঃ রে “কানুন’।

আইন-কানুনের রক্ষকদের ঘুম ভাঙল আরও অনেক পরে। তখন মঙ্গলপুরীর শিখ কলোনির প্রায় সমস্ত ব্লকেই আগুন জ্বলে গিয়েছে। কাল অবধিও আশেপাশের ব্লকে যে ক-টা পরিবার বেঁচে ছিল, সকাল হতে-না হতেই ভিড় এসে তাদেরও কেটে, জ্বালিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছে। আমাদের ব্লকে সরতাজ, বাপুসহ পুরুষদের দলটা তখনও অক্লান্তভাবে পাহারা দিয়ে চলেছে। শুনতে পাচ্ছে আশপাশ থেকেই তীব্র চিৎকার, মরণ-আর্তনাদ ভেসে আসছে। দেখতে পাচ্ছে সর্বগ্রাসী আগুন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উগরে দিচ্ছে। বাতাসে শুধুই রক্তের গন্ধ। সঙ্গে পোড়া মাংস আর কেরোসিনের কটু বদবুর জ্বালায় চোখ জ্বলছে, নিঃশ্বাস নেওয়া দায় হয়ে উঠেছে। বুঝতেও পারছে যে ওরাও মরবে। তবু শেষ অবলম্বনের মতো লাঠি, তরোয়াল, কৃপাণ, কাটারি আঁকড়ে ধরে অপেক্ষা করছে আবার একটা আক্রমণের। এর শেষ কোথায়, কেউ জানে না। তবু লড়াই ছাড়বে না। দাঙ্গাইরা আগের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছে যে এই ব্লকের নাছোড়বান্দা লোকগুলোও হাতে অস্ত্র নিয়ে বসে আছে। তাই এখনও এদিকে আসছে না, শুধু আশেপাশের নিরীহ পরিবারগুলোকে মেরে বেড়াচ্ছে। আর আমাদের বুকের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে বিষম মৃত্যুভয়ের শ্বাসরোধ করা ভার!

তখন ঠিক কাঁটায় কাঁটায় দুপুর বারোটা। একত্রিশ তারিখ ও এক তারিখের বিভীষিকার সাক্ষী মানুষগুলো সব বিধ্বস্ত, ক্ষুধার্ত ও হতক্লান্ত। মাথার ওপরে সূর্যদেবও আগুন ছড়াতে ব্যস্ত। মেয়েদের কান্নাকাটি তখন থেমে গিয়েছে। একটা মানুষ আর কতক্ষণই বা কাঁদতে পারে। চোখের জলও একসময়ে শুকিয়ে যায়। বিনিদ্র, কালি পড়া চোখগুলো নির্বাক দৃষ্টিতে শুধু তাকিয়েই আছে এখন। এই একটি ব্লক ছাড়া গোটা কলোনিই নিশ্চুপ, নিথর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কেউ দেখলে বলবে না যে এখানে কখনও জনবসতি ছিল! ঐ ছোট্ট সঙ্কীর্ণ গলি কোথাও লাল রক্তে ভেসে গিয়েছে, কোথাও বা শুধু কালো ছাই আর হাড়গোড়ের স্তূপ! একটাও মানুষ নেই! মানুষ তো দূর, একটা কুকুর, বিড়ালও নেই আশেপাশে। তারাও বুঝে গিয়েছে, শিখদের সঙ্গে থাকলে মরতে হবে।

সেই সঙ্কীর্ণ রক্তাক্ত রাস্তাই ভরদুপুরে হঠাৎ ভারি বুটের আওয়াজে সচকিত হয়ে উঠল। দলের লোকেরা সবাই ফের অস্ত্রশস্ত্র হাতে তৈরি হল আরও একটা লড়াইয়ের জন্য। সবার ক্লান্ত দেহ যেন মুহূর্তের মধ্যেই উত্তেজনায় টানটান। ওই আবার আসছে…! আরও জোরদার যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য আসছে..! আমি ঘরের ভেতর থেকে সবই শুনতে পাচ্ছিলাম। বুকের ভেতরটা ফের আকুলিবিকুলি করছিল। আর থাকতে না পেরে সবার অলক্ষ্যে ঘরের খিড়কিটা একটুখানি খুলে উঁকি মেরে বাইরের দৃশ্যটা দেখার চেষ্টা করছিলাম। আবার সেই খুনিরা এসে উপস্থিত….?

না! এবার নৃশংস খুনি নয়, খাঁকি উর্দি চোখে পড়ল। দিল্লি পুলিশ! ওদের দেখে আশ্বস্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আটবছরের শিশুটিরও ব্যাপারটা ভারি অদ্ভুত লাগল। কাল ওদের কাছেই সাহায্যের জন্য গিয়েছিলেন বাপুরা! ওরা সাহায্য করেনি। ওদের মতে তো দাঙ্গাই হচ্ছিল না। একটা গোটা দিন মানুষগুলো দলে দলে কাটা পড়ল, আগুনে জ্বলল, চেঁচিয়ে গেল। গোটা দিল্লিতে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছিল মৃত্যুপথযাত্রীদের অন্তিম-আর্তনাদ। তখনও ওদের ঘুম ভাঙেনি। আস্ত একটা রক্তাক্ত দিন গেল, ভয়াবহ রাত গেল, রক্তাক্ত ভোর এল, তবুও পুলিশ সিনেই আসেনি। তবে হঠাৎ এখন এসে উপস্থিত কেন? একটা সিস্টেমের জেগে উঠতে এত সময় লাগে? হাজার হাজার মানুষ শূলে চড়ার পর এখন ওদের মনে হয়েছে যে আইনি হস্তক্ষেপ দরকার? কিন্তু সাহায্য করবে কাকে? কেউ তো বাকিই নেই। কালান্তক একত্রিশ তারিখ ও এক তারিখেই দিল্লির প্রায় সব শিখ পরিবার শেষ।

বুটের আওয়াজ শুনে সরতাজ ফের রাইফেল তুলে ধরেছিল। কিন্তু পুলিশের উর্দি দেখেই বন্দুকটা নামিয়ে নিয়েছে। সে হাতের ইশারায় বাকিদেরও নিরস্ত করল। উর্দিপরা যে মানুষগুলো এলেন, তাঁরা সাধারণ পুলিশ বা দারোগাদের থেকে অনেকটাই আলাদা। দেখেই বোঝা যায় ওঁরা দিল্লি পুলিশের ‘আলা অর’। চুনোপুঁটি কনস্টেবল নয়, আই.পি.এস.! আমি এবার মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। আই.পি.এস.-রা এসেছেন মানে এতক্ষণে হয়তো আইন-কানুনের কৃপাদৃষ্টি আমাদের ওপর পড়ল। এবার বুঝি আতঙ্কের প্রহর শেষ হল। ওঁরা নিশ্চয়ই আমাদের সুরক্ষা দিতে এসেছেন। যিনি ওদের মধ্যে সবচেয়ে ‘বড়া অফসর’ তিনি সরতাজের দিকে এগিয়ে গিয়েছেন।

খুব মৃদুস্বরেই বললেন, “ক্যাপ্টেন সরতাজ সিং?”

সরতাজ ঘর্মাক্ত কপাল মুছে নিয়ে বলল, “জি।”

ভদ্রলোক করমর্দনের জন্য হাত এগিয়ে দিলেন, “ভূপেন্দ্র দত্তা, ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ।”

সে তাঁর বাড়িয়ে দেওয়া হাত স্পর্শ করে একটু অভিযোগের সুরেই বলল, “আপনারা এতক্ষণে এলেন স্যার? আমরা কাল লোকাল থানায় গিয়ে কোনো হেল্প পাইনি। দারোগাসাব তো আমাদের ভাগিয়েই দিলেন। বললেন, এখানে নাকি কোনো দাঙ্গা হচ্ছে না। সবাই নাকি শান্তিতে আছে। আপনিই একবার তাকিয়ে দেখুন আমরা ঠিক কেমন শান্তিতে আছি। কাল থেকে আজ পর্যন্ত দাঙ্গাইরা বারবার আমাদের ওপর অ্যাটাক করেছে ও করছে। অনেকগুলো মানুষ মরেও গেছে তাদের আক্রমণে। লাশগুলোর ‘ক্রিয়া-করম’ এখনও করতে পারিনি আমরা। কিন্তু লোকাল পুলিশ আমাদের কোনোরকম সাহায্যই করেনি, প্রোটেকশন দেওয়া তো দূর। আমাদের এফ.আই.আর.-ও নেয়নি।”

“তাই?”

কথাটা বলে আই.পি.এস. দত্তা জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাঁর পেছনের উর্দিধারীদের দিকে তাকালেন। তাদের মধ্যে একজন নিজেকে তখন লুকোনোর চেষ্টা করছিল। সম্ভবত ইনিই সেই বিতর্কিত দারোগাসাহেব। তিনি গম্ভীরস্বরে বললেন, “পান্ডে! এসব কী শুনছি? কী বলছেন ওঁরা? কাল ওঁরা তোমার কাছে এসেছিলেন অথচ তুমি ওদের কমপ্লেইন নাওনি?”

“স্যার…।” পান্ডে রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল, “তখনও আমাদের কাছে কোনোরকম খবর ছিল না। অন্যান্য জায়গায় ছোটখাটো ‘হিংসা’ হয়েছে শুনেছি। কিন্তু এদিকে তখনও কিছু হয়নি।”

“কিছু হয়নি? হোয়াট কিছু হয়নি?” ডিসিপি গর্জন করে উঠলেন, “কিছুই যে হয়নি সে তো আসার সময়েই দেখতে পেলাম! কলোনির একটা বাড়িও আস্ত নেই। জ্বলেপুড়ে খাঁক হয়েছে সব। গলিতে পা রাখা যাচ্ছে না। লাশে লাশে ছয়লাপ। এখানে কারোর হাত, ওখানে কারোর পা, এখানে ‘আঁত’, ওখানে ‘গুর্দা’। এটাই কি তোমার “কিছু হয়নি?”

পান্ডে এবার ঢোঁক গিলল, “স্যার, আপনি তো জানেন, ‘মব’কে আটকানো একরকম অসম্ভব। তার ওপর ইন্দিরাজির মৃত্যুর পর সবাই খেপে আছে। ওরা সব হাজারে হাজারে আসছে। আমরা হাতে গোণা! কাকে ধরব? কী করব? কিছু করতে গেলে ওরা পুলিশকে ধরেই মেরে দিচ্ছে।”

“উর্দি আর মাইনের টাকাটা কি তোমাদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য দেওয়া হয়? আরে আর কিছু না পারো প্রোটেকশন দাও। ‘সুলা’ করিয়ে দাও৷ এভাবে কীভাবে চলবে? আমাদেরও তো কিছু দায়িত্ব আছে নাকি? তোমাদের এইসব ইডিয়টিক কাজকর্মের উত্তর আমাদের দিতে হয়। যত্তসব নালায়ক নিকম্মার দল। থোড়া তো শরম করো!” দত্তাসাহেব বকাঝকার কোটা কমপ্লিট করে, পান্ডেকে অগ্নিদৃষ্টিতে ঝলসে দিয়ে এবার উপস্থিত ভিড়ের দিকে তাকালেন, “দেখুন, পুলিশের এই অপদার্থতার জন্য আমি নিজে আপনাদের কাছে ক্ষমা চাইছি। আমাদের আরও আগে আসা উচিত ছিল ও আপনাদের প্রোটেকশন দেওয়া কর্তব্য ছিল। আপনারা অনেক কিছু সহ্য করেছেন। এখন আপনাদের আর কোনো ভয় নেই। আমার সঙ্গে পুলিশবাহিনী আছে। তারা সবাইকে প্রোটেকশন দেবে। তবে আমার মনে হয়, হিংসার বদলে হিংসা করাটাও খুব বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ওরা স্রেফ কিছু রেগে থাকা মানুষ, যারা ভুল বুঝে এসব কাজ করছে। আপনারা চাইলে আমরা ‘সুলা’ করিয়ে দিতে পারি। কথাবার্তা বলে মিটমাট করে নিন না।”

সরতাজ এবার শান্ত স্বরেই জানায়, “স্যার, আমরা কেউ হিংসা চাই না। এখানে সবাই খেটে খাওয়া শান্তিপ্রিয় মানুষ। আমরা সবাই শাস্তি চাই। মিটমাট করতেই তো চাইছিলাম। ওদের শুরুতেই বলেছিলাম। কিন্তু ওরা কেউ কথাই শুনছে না। যাকে পারছে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে, কেটেকুটে একসা করছে কিংবা সফেদ পাউডার ফেলে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সেলফ ডিফেন্সে আমরাও ‘পলট্ ওয়ার’ করতে বাধ্য হয়েছি।”

তিনি অন্যমনস্কভাবে বিড়বিড় করলেন, “সেলফ ডিফেন্সে আক্রমণ করাটা অবশ্য ক্রাইমের পর্যায়ে পড়ে না। তবে ক্যাপ্টেন সিং, আপনার বিরুদ্ধেও অভিযোগ আছে যে আপনি বেশ কয়েকজনের ওপর গুলি চালিয়েছেন। আপনার কপালগুণে অবশ্য তারা কেউ মরেনি।”

সরতাজ এবার ব্যঙ্গমিশ্রিত হাসি হেসে ফেলল, “ও! তবে এই শান্তিপ্রস্তাব ওদের পক্ষ থেকে নিয়ে এসেছেন আপনি। যাদের কথা বলছেন, তারা যে এখনও বেঁচে আছে সেটা আমার কপালগুণে নয় স্যার। আমার শ্যুটিং স্কিলের গুণে। গুলি করে মারতে চাইলে কপালও ওদের বাঁচাতে পারত না। আমি আর্মিম্যান। ‘শ্যুট টু কিল’ কাকে বলে তা ভালোভাবেই জানি। তাই সবকটা গুলি বুঝেই চালিয়েছি। আত্মরক্ষায় চালাতে বাধ্য হয়েছি। আপনি কি আমাকে অ্যারেস্ট করতে এসেছেন?”

“না, তা নয়। আপনি ভুল বুঝছেন।” দত্তাসাহেব খুব নম্রস্বরেই বললেন, “জাস্ট জানকারি দিচ্ছি। এই বোল্ট অ্যাকশন রাইফেলটা আপনার নিজের? লাইসেন্স আছে?”

“হ্যাঁ। এটা আমার। লাইসেন্সডও বটে।” সে জানাল, “আপনি প্লিজ নিজের বক্তব্যটা পরিষ্কার করে বলুন ডিসিপি সাব। ঠিক কী বলতে চাইছেন? আমরা শান্তি চাই। আপনারা যেমন বলছেন তেমন সমস্ত ভুল বোঝাবুঝির মিটমাটও করে নিতে চাই। অযথা নিজেদের মধ্যেই মারপিট-হাঙ্গামা চাই না। এইটুকু বলতে পারি, আপনারা যদি ‘সুলা’ করিয়ে দিতে চান তবে আমার নিজের গ্রেফতারিতে কোনো আপত্তি নেই। কথা দিচ্ছি, এই বোল্ট অ্যাকশন রাইফেলও বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। আপনারা সেন্ট্রালের অর্ডার দেখান, আমি নিজেই নিজেকে আর রাইফেলটাকে আপনাদের ‘হাওয়ালে’করে দেব। কিন্তু খামোখা আর একটা ‘মাসুম জান’ও যেন না যায়।”

ডিসিপি মাথা নাড়লেন, “আপনাকে অ্যারেস্ট করার অর্ডার এখনও সেন্ট্রাল দেয়নি। আমাদেরও তেমন ইচ্ছে নেই। তবে হ্যাঁ, আপনার হাতিয়ারটা আমরা অবশ্যই বাজেয়াপ্ত করব। সেটা অবশ্য অন্য কারণে। শুধু আপনারই নয়, সবার হাতিয়ারই আমাদের হেফাজতে নিতে হবে। নয়তো উভয়পক্ষে রফা করা সম্ভব নয়।”

এতক্ষণ সরতাজ আর ভূপেন্দ্র দত্তার মধ্যেই কথা হচ্ছিল। এবার বাপু মাঝখানে ঢুকে পড়লেন, “কেন সাব? আমাদের কাছে হাতিয়ার থাকলে ব্যাপারটা মিটবে না কেন? এমনিতেই সমস্ত শিখের ঘরে আর কিছু না থাক কৃপাণ তো থাকবেই। কিন্তু অস্ত্র থাকলেও আমরা কোনোদিন তা প্রয়োগ করিনি। এতবছর ধরে ঘরে কৃপাণ, তরোয়াল পড়ে আছে, কোনোদিন শুনেছেন যে খুনোখুনি করেছি? তবে আজ কীসের আপত্তি?”

“সর্দারজি, আপনি বুঝছেন না।” তিনি শান্তভাবেই উত্তর দেন, “আপনাদের অস্ত্রের দরকার কী? আমরা তো এখনই পুলিশ পাহারা বসিয়ে দিয়ে যাব। যেখানে স্বয়ং দিল্লি পুলিশ আপনাদের প্রোটেকশন দিচ্ছে, সেখানে তো আপনাদের ‘ঔজার’ ব্যবহার করার প্রয়োজনই নেই। কেউ আক্রমণ করতে এলে পুলিশই তাকে ঠেকাবে। তার ওপর একটা কথা ভাবুন। বেয়ন্ত সিং আর সতবন্ত সিং যা করেছে, তাতে পাবলিকের খেপে যাওয়ারই কথা। ওরা যদি দেখে আপনারাও হাতিয়ার নিয়ে ঘুরছেন, তবে ভুল বোঝাবুঝি আরও বাড়বে। আপনারা সন্ধি প্রস্তাব দিতে যাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে ‘নিহত্তা’ যাওয়াই নিয়ম। তরোয়াল নিয়ে কেউ সন্ধি করতে যায় না। বরং ‘সুলা’র আগে হাতিয়ার ফেলে দেওয়াই পরম্পরা। ওদের হাতেও যাতে কোনো অস্ত্র না থাকে সেটাও আমরা দেখব। পুলিশ প্রোটেকশন তো রইলই। কেউ আপনাদের ‘বাল বাঁকা ও করতে পারবে না। আমার গ্যারান্টি।”

সরতাজ আর বাপু দৃষ্টি বিনিময় করল। ভদ্রলোকের কথায় কিছুটা হলেও যুক্তি আছে। যদি সামনাসামনি বসে ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে তার চেয়ে উত্তম প্রস্তাব আর কী হতে পারে? যারা এমনিতেই ভুল বুঝে বসে আছে, তাদের হাতিয়ার দেখিয়ে আরও উত্তেজিত করার কোনো মানেও হয় না। তাছাড়া খোদ ডিসিপি সাহেব যেখানে নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে রাজি, সেখানে সত্যিই অস্ত্রের আর প্রয়োজনীয়তাও নেই।

কিন্তু মনের মধ্যে কোথাও একটা দ্বিধা তখনও ছিল। সরতাজ সন্দিগ্ধ স্বরে জানতে চায়, “আপনার আসল প্রস্তাবটা কী?

তিনি সেই নম্রসুরেই বললেন, “দেখুন, আমাদের সঙ্গে বড়ো বড়ো নেতাদের পার্সোনাল কানেকশন থাকে। সজ্জনকুমার বা জগদীশ টাইটলার সাবও আমার কাছের মানুষ। আপনারা ডাইরেক্ট ওঁদের সঙ্গেই আলোচনা করুন না। সজ্জনকুমার বা জগদীশ স্যারদের প্রিয় নেত্রীর এরকম মর্মান্তিক অ্যাসাসিনেশন হয়েছে বলে ওঁরা উত্তেজিত হয়ে আছেন। কিন্তু কেউই মানুষ খারাপ নন। আপনারা যদি ওঁদের সঙ্গে আমনে-সামনে ডিসকাস করেন, সমস্যাটা মিটে যাবে বলেই আমার ধারণা। আফটার অল, আপনারা তো কেউ ইন্দিরাজিকে খুন করেননি। আমি একটা মিটিং অ্যারেঞ্জ করছি, আপনারা চলুন। কথা বলে সবটাই শান্তিতে মিটিয়ে নিন। নয়তো ওরা আপনাদের কাটতে আসছে, আপনারা ওদের ঠেকাতে মারধোর করছেন, এই আক্রমণ, পালটা আক্রমণে শুধু ভুল বোঝাবুঝি আর ভায়োলেন্সই বাড়ছে। ওদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়বে, কতক্ষণ ঠেকাতে পারবেন? তার চেয়ে শাস্তিপ্রস্তাব দেওয়া ভালো নয় কি?”

সরতাজ বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। ওর চোখে একটু যেন দ্বিধাগ্ৰস্ত দৃষ্টি। কী করবে বুঝতে পারছে না। হাতের হাতিয়ার ফেলে দেওয়া আদৌ নিরাপদ কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। ওদিকে সঙ্গী সাথীদের মুখের দিকে তাকিয়েও বুঝল, তারাও এখন ক্লান্ত। এরা কেউ পেশাদার খুনি বা সৈনিক নয়। ওরা সব নুন আনতে পান্তা ফুরোনো গরীব নিরীহ মানুষ। এতক্ষণ যে টিকে আছে এই অনেক। ওদের চোখের দৃষ্টি, মুখভঙ্গিতেই স্পষ্ট কেউ যুদ্ধ চায় না, যে কোনো মূল্যে শান্তি চায়।

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “ঠিক আছে। আমরা শাস্তি প্রস্তাবেই রাজি। বলুন, কী করব।” “আগে হাতিয়ারগুলো দিয়ে দিন।” ডিসিপি বললেন, “আপনাদের দায়িত্ব এখন থেকে আমাদের।”

সরতাজ বিনাবাক্যব্যয়ে নিজের কৃপাণ আর রাইফেল ওঁর হাতে তুলে দিল। তার দেখাদেখি সকলেই নিজেদের হাতিয়ারগুলো সমর্পণ করল পুলিশের কাছে। আমি তখন ভীষণ শান্তি পেয়েছিলাম। অবশেষে যুদ্ধ শেষ! আর কারোর লাশ পড়বে না, আর কেউ আগুনে জ্বলবে না, কেউ তরোয়ালের ধারে খণ্ড খণ্ড হবে না। এই হিংস্র রক্তাক্ত অধ্যায় অবশেষে সমাপ্ত হল। আজ রাতে আমি বেবের কোলে শুয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারব। যা ক্ষতি হয়েছে, আঘাত লেগেছে তা হয়তো কখনোই পুরোপুরি সারবে না। তবু আমার পরিবার তো বেঁচে থাকবে!

ভীষণ ক্লান্তি ও আকস্মিক প্রশান্তিতে আমার ঘুম পাচ্ছিল। তবু চুপচাপ সব দেখছিলাম আর শুনছিলাম। সরতাজ ডিসিপি সাবকে জিজ্ঞাসা করল, “আমরা কথা বলব কী করে ওদের সঙ্গে? ওরা কি এখানে আসবেন?”

ভূপেন্দ্র দত্তা হাসলেন, “ওঁরা সব বড়ো বড়ো নেতা মন্ত্রী। আপনাদেরই ওঁদের সঙ্গে দেখা করতে হবে।”

“বড়ো বড়ো নেতা মন্ত্রীরা আমাদের বাড়িতে বা অফিসে ঢুকতে দেবেন?” সরতাজের মুখে ব্যঙ্গবঙ্কিম হাসি, “ওঁরা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের সঙ্গে দেখা করেন?”

“আমরা আছি কী করতে?” তিনি বললেন, “কথা যখন দিয়েছি যে সব ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে দেব, তখন আমরাই দায়িত্ব নিয়ে আপনাদের নিয়ে যাব ওঁদের কাছে। কিন্তু সবাই মিলে তো যাওয়া যাবে না। আপনাদের তরফ থেকে মাত্র তিন-চারজনকেই নিয়ে যেতে পারি। ক্যাপ্টেন সিং, আপনি চলুন। সঙ্গে যাদের নেবেন নিয়ে নিন।”

সরতাজ এবার মহাসমস্যায় পড়েছে। সে ফৌজি। যুদ্ধ করতে জানে। যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্বও দিতে জানে কিন্তু তেমন বাক্‌পটু নয়। কথার মারপ্যাঁচ সে বোঝে না। সন্ধিপ্রস্তাব তাদেরই নিয়ে যাওয়া উচিত যারা কথা বলতে জানে ও রাজনীতি বোঝে। বাপু তার সমস্যা বুঝতে পেরে বললেন, “চল্, আমিও তোর সঙ্গে যাচ্ছি। আর কেউ যাবে?”

“না!”

বাপুর কথা শুনে সকলেই এ-ওর দিকে তাকাচ্ছিল। আমাদের আর এক প্রতিবেশী নারায়ণ সিং কিছু বলতেই যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই একটা নারীকণ্ঠের তীব্র প্রতিবাদ। আমরা সবিস্ময়ে দেখলাম, আমার দিদি যমিত কৌর, যে একটু আগেই বাহ্যজ্ঞানহীনের মতো পুতুল হয়ে বসেছিল সে এবার সবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। চেঁচিয়ে বলল, “সরতাজ যাবে না। ও কোত্থাও যাবে না। তোমরা যাও। কিন্তু ওকে কেউ নিয়ে যাবে না৷”

তার এই প্রতিক্রিয়া দেখে সকলেই স্তম্ভিত! একটু আগেই ওর হবু বরের মৃত্যু হয়েছে। অথচ তার জন্য কোনো শোক-তাপ নেই। এখনও নভজ্যোতের রক্ত তার মেহেন্দিরাঙা হাতে লেগে আছে। তা সত্ত্বেও সে সবার সামনে এসে সরতাজের জন্য দরবার করছে। আমরা সবাই অবাক। এই অপ্রত্যাশিত কাণ্ডে স্বয়ং সরতাজও বিস্মিত সে শুধু অবাক হয়ে বলল, “ছুটকি!”

আর কেউ কিছু বোঝার আগেই দিদি ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছে সরতাজকে! সবেগে বক্ষলগ্না হয়ে দুই হাতে আঁকড়ে ধরেছে তার বলশালী দেহটাকে। কাঁধের ওপর মাথা রেখে উন্মাদের মতো কেঁদে বলল, “তুই যাবি না! কোথাও যাবি না। সরতাজ …. তোকে আমার দিব্যি…! তুই আমার চোখের বাইরে যাবি না…!”

সবার মধ্যে এবার অল্প হলেও ‘কানা ফুসফুসি’ শুরু হল। এ কী! যে মেয়ের মরদ একটু আগেই মরেছে, সে অন্য একজন পুরুষকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে! এ কী অনাসৃষ্টি!! এমনকি আমরাও ভাবছিলাম, যস্যিদিদির হল কী? এরকম প্রকাশ্যে সরতাজকে জাপ্টে ধরেছে কেন? হলই-বা ‘দাদা’র মতো। কিন্তু নিজের দাদা তো নয়। তাও এভাবে সবার সামনে। বাপু, তাওজি, বেবে সবাই দাঁড়িয়ে আছেন…!

“ছুটকি!” সরতাজ সস্নেহে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করল, “আমরা ‘সুলা’ করতে যাচ্ছি। যুদ্ধ করতে নয়। তুই শান্তি চাস্ না? আর কত লোক মরবে বল্? বেঁচে থাকতে চাস্ না?”

“বাঁচতে চাই না আমি।” দিদি সর্বসমক্ষে চিৎকার করে ওঠে, “আমি তোকে চাই। জিন্দা। আর মরতে হলে তোর সঙ্গেই মরব। কিন্তু তুই আমায় ছেড়ে কোথাও যাবি না… কোথাও না…!”

গোটা কলোনি যেন কেঁপে উঠল। কেঁপে উঠলাম আমরাও। শোকে-তাপে দিদির মাথাটাই কি গেল? না শরম-হায়া সব গিয়েছে। ও কী বলছে তা আদৌ জানে? আজ পর্যন্ত আমরা জেনে এসেছি নভজ্যোতের সঙ্গে দিদির শাদি হবে। ওদের দু-জনের মধ্যে প্রেম আছে। সরতাজের সঙ্গে দিদির খুব কমই কথাবার্তার আদান-প্রদান দেখেছি। বরং ওর সামনাসামনি পড়লে দিদি যেন একটু লজ্জা পেত, গুটিয়ে যেত। কখনো-কখনো সরতাজ ওর বিনুনি টেনেও বলেছে, “ছুটকি, বিয়েও করছিস তাও আমারই বাড়ির সামনে! হায় হায়, বোন-জিজার বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার, খাতির পাওয়ার সুযোগও হল না। জানলায় উঁকি মারলেই দেখা হয়ে যাবে।” দিদির গাল দুটো তখন আপেলের মতো লাল হয়ে যেত। অত লজ্জা বোধহয় ও নভজ্যোতের কথাতেও পেত না। চোখ দুটো অবনত করে বলত, “ধুৎ। তার চেয়ে বল্ না দূরে পাঠিয়ে দিতে পারলেই বাঁচিস?”

“ভূত-পেত্নী যতদূরে থাকে ততই মঙ্গল।”

সে একটু হেসে কথাটা ছুড়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল। এমনিতেই সরতাজ অল্প কথার মানুষ। সে কলোনির সবার সঙ্গেই সদ্ভাব রেখে চলে, বাচ্চাদের সঙ্গে খুনসুটি করে, বড়োদের মান্য করে, কিন্তু সবকিছুই একটা সীমারেখার মধ্যে রেখে। নিজের চতুর্পাশে একটা অদৃশ্য গন্ডী টেনে রেখেছে, যেটাকে ডিঙিয়ে কেউই তার খুব কাছে যেতে পারেনি। আমি জানতাম, শুধু বাচ্চারা নয়, অনেক মেয়েও সরতাজকে পছন্দ করে। ওর ঐ লম্বা চেহারা, চওড়া কাঁধধ-বুক, গটগটিয়ে চলে যাওয়ার উদ্ধত ভঙ্গি, টানা টানা দুটো সুন্দর কালো চোখ, সর্বোপরি ব্যক্তিত্ব এই কলোনির অনেক মেয়েকেই আকৃষ্ট করে। তারা হাবেভাবে প্রকাশ করলেও বেশি কাছে যেতে পারে না। কারণ সরতাজ কাউকেই নিজের অত কাছে আসতেই দেয়নি। তার মাথায় অল্প বয়েস থেকেই দেশপ্রেম এমন ভর করেছে যে অন্য কোনো প্রেমের ইশারা ওর কাছে পৌঁছোতেই পারেনি। সে প্রেমিকার বাহুপাশে থাকার চেয়ে বেয়নেট নিয়ে সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকতেই ভালোবাসে।

দিদি ওর থেকে বয়েসে অনেকটাই ছোট। বাপুকে ও পাজি বলে, বেবেকে ‘পরজাইজি।’নিয়মমতো দিদি ওর ভাইঝি হওয়ার কথা। কিন্তু সেটা আবার বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। তাই চিরকাল ছোটো বোনের মতোই দেখেছে। এর অন্যথা কখনোই হয়নি। অথচ নিমেষে আজ সব সম্পর্কের রসায়ন উলটে গেল। সরতাজ নিজেই বুঝতে পারছিল না কী বলবে। সে অপ্রস্তুত। তাকে কিছু বলতে না দিয়েই বাপু দিদিকে টেনে সরিয়ে দিয়ে বললেন, “ঘরে যা যস্যি। আমাদের যেতে হবে।”

বলতে বলতেই বেবের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলেন তিনি। দিদি তবু কিছুতেই সরতাজকে ছাড়বে না। সে পাগলের মতো চিৎকার করছে আর বলছে, “তুই যাবি না… তুই কোথাও যাবি না। রব্ দি কসম, আমায় ছেড়ে যাস্ না সরতাজ

বেবে আর তাইজি তাকে ওখান থেকে একরকম কোনোমতে টেনে হিঁচড়েই নিয়ে চলে গেল। আমি চুপ করে দেখছিলাম দিদির অসহায় কান্না। নিজের মানুষটার জন্যও যা সে করেনি, তা একটি অন্য মানুষের জন্য লজ্জা, ঘেন্নার মাথা খেয়ে করল। নভজ্যোতকে কখনও সে এমন ব্যাকুল হয়ে আলিঙ্গন করেনি। তার বুকে আছড়ে পড়ে এভাবে কাকুতি-মিনতি করেনি। তার লাশ দেখে কাঁদেওনি। অথচ এখন তার এ কী মূর্তি! এর কোনো ব্যাখ্যা তখন পাইনি। সে বয়েসও ছিল না আমার। শুধু দেখলাম, সরতাজ ভুরু কুঁচকে দিদির দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছিল। ডিসিপিসাহেব বললেন, “ক্যাপ্টেন সরতাজ সিং।…যাওয়া যাক?”

সে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। এবার সংবিৎ ফিরে পেয়ে মৃদুস্বরে বলল, “জি। চলুন।”

ডিসিপি সাহেবের সঙ্গে সরতাজ আর নারায়ণ সিং শত্রুদের সঙ্গে মিটমাট করতে চলে গেল। সঙ্গে বাপুও গেলেন। দেখলাম, খাঁকি উর্দিধারীরা সশস্ত্র প্রহরায় মোতায়েন হল। গোটা কলোনিটাইকেই ঘিরে ধরল ওরা। আশা করা যায়, শত্রুরা আর ফিরে আসবে না। দেখেও বড়ো শান্তি পেলাম। যাক! ‘জঙ্গ’ থেমে গিয়েছে। একটা প্রাণান্তকর যন্ত্রণা থেকে হঠাৎই যদি মুক্তি পাওয়া যায়, তবে তার থেকে বেশি আরামের আর অন্য কিছু হয় না। আরামে এবং ক্লান্তিতে আমার চোখ বুজে আসছিল। তখনও কানে আসছে বেবের মৃদু ভর্ৎসনা। বেবে দিদিকে বলছে, “এসব কী যস্যি? তুই পাগল হয়েছিস? এভাবে মেয়েদের সবার সামনে পরায়া মর্দকে জড়িয়ে ধরতে আছে? লোকে কী বলবে।…”

শুনতে শুনতেই আমার চোখ বুজে এল। বেবের চাপা ধমক আশ্বস্ত করল, সব স্বাভাবিক আছে। অনেকক্ষণ ধরেই চোখের পাতা বড়ো ভারি হয়ে আসছিল। কিন্তু উৎকণ্ঠায়, উদ্বেগে, ভয়ে ঘুম ধারে কাছেও ঘেঁসেনি। টানটান স্নায়ু, ‘নস্‌’গুলো ঢিলে হতেই একটা গভীর ঘুম আমায় ঘিরে ধরছিল। কলোনিতে এখনও নৈঃশব্দই কায়েম আছে। সেটাই স্বাভাবিক। যুদ্ধ থেমে যেতে পারে। তবে তার ভয়াবহ ফলাফল ও স্মৃতি বহুদিন মানুষকে তাড়া করে। শুধু ওই নীরবতার মধ্যেই মাঝেমধ্যে ভেসে আসছে চাপা কান্নার শব্দ। তন্দ্রাজড়িত অবস্থাতেই শুনলাম, কারা যেন ‘মাতম্’ মানাচ্ছে। ওদের কেউ মারা গিয়েছে। তাদের কপালে লেখা ছিল ‘ওয়াহিয়াত মওত’। এত আতঙ্কের মধ্যে পরিবারের সদস্যরা প্রাণ খুলে একটু কাঁদতেও পারেনি। বুকে পাথর চাপা দিয়ে অশ্রুরোধ করে বসেছিল। এখন চোখের জলে প্রিয়জনের জন্য শোক প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছে। গুঞ্জনের মতো ভেসে আসছিল সেই আওয়াজ। নিদ্রা তখন আমার কোলে তুলে দোলাচ্ছে। একটা দুলুনি টের পাচ্ছিলাম। কে যেন বলছে, “ঘুমিয়ে পড়…. ঘুমিয়ে পড় পুত্তর…। ঝড় থেমে গিয়েছে। এখন তুই শান্তিতে ঘুমো… 1

আমি অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। চোখের সামনে কখন যে অন্ধকার ছেয়ে গিয়েছে তা টের পাইনি। কান ও মস্তিষ্কের ভেতরে সম্পূর্ণ শূন্যতা। এতটাই ক্লান্ত ছিলাম যে দুঃস্বপ্ন দেখারও ক্ষমতা ছিল না। এক নির্বোধ মৃতদেহের মতো জাগতিক সমস্ত চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোথায় ছিলাম তা জানি না। শুধু নিঃসঙ্গ এক অন্ধকার তার শীতল কোলে টেনে নিচ্ছিল আমাকে… আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম… অথবা ডুবছিলাম অচেতনতার গভীরে…! ক্রমাগতই গভীর থেকে গভীরতর চোরাবালি আমায় টেনে নিচ্ছিল… আপাদমস্তক গ্রাস করে নিচ্ছিল…!

“বাঁ-চা-ও!…বাঁ-চা-ও!”

আচমকাই যেন আমার শান্ত নিদ্রার কাচের মহলে একটা বিরাট পাথর এসে আছড়ে পড়ল। কানের কাছে ঝনঝনিয়ে উঠল এক অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর। ধড়মড় করে উঠে বসে প্রথমেই বুঝে পেলাম না যে কোথায় আছি। বাস্তবে, না স্বপ্নে? ততক্ষণে গলাটা আরও স্পষ্ট হয়েছে, “গ-দ্দা-রি! গ-দ্দা-রি হয়েছে আমাদের সঙ্গে। ওরা আসছে…!” কারা আসছে! পুলিশ তো আমাদের বাঁচানোর জন্য বাইরে রয়েছে। কে-ই বা কার সঙ্গে গদ্দারি করল! হল কী? হতবাক শিশুর মনে অনেক প্রশ্ন ছিল। কিছুই বোঝার মতো অবস্থায় সে ছিল না। আরও বেশি কিছু বোঝার আগেই দুড়দাড় করে ঘরে ঢুকলেন বাপু! তাঁর সারা শরীর রক্তে ভেজা। যেন এইমাত্র রক্তের নদীতে ‘ডুবকি’ মেরে এসেছেন! এ আবার কী! তিনি তো সরতাজ আর নারায়ণ সিং এর সঙ্গে ঝামেলা মিটিয়ে নিতে গিয়েছিলেন। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম যে এখানেই এই হিংসার সমাপ্তি ঘটবে। তবে বাপু এমন করছেন কেন?

তাঁর চিৎকারে আমাদের বাড়ির সামনে ভিড় উপছে পড়ল। বাপুর ওই রক্তমাখা কলেবর দেখে সবাই আঁতকে ওঠে। তাওজি কোনোমতে বললেন, “এমন হাল হল কী করে? তোরা তো সুলা করতে গিয়েছিলি!”

“কোনো সুলা নয় প্রা’জি!” বাপু হাউহাউ করে কেঁদে উঠলেন, “ওরা জানত যে সরতাজ আর ওর বন্দুক থাকতে আমাদের হারানো মুশকিল। তাই পুলিশ স্রেক ওকে তুলে নিয়ে যেতে এসেছিল। ওই ডিসিপি মঙ্গলপুরী থেকে বেরোনো মাত্রই সরতাজকে ওই নেকড়েগুলোর হাতে তুলে দিয়েছে। নারায়ণও …!”

আমার পায়ের তলার মাটি থরথরিয়ে কাঁপছিল। এসব কী বলছেন বাপু। এমনটাও কি হতে পারে? এটা বাস্তবে ঘটছে না দুঃস্বপ্ন দেখছি? এই তো, একটু আগেও সব ঠিক ছিল। খোদ আই.পি.এস. ভূপেন্দ্র দত্তা এসে বলে গেলেন, সব ঠিক হয়ে গিয়েছে। আর কোনো দাঙ্গা-হাঙ্গামা হবে না। তিনিই তো বাপুদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিয়ে গেলেন। তবে এখন কী হল?

বাপু কথা বলতে পারছিলেন না। কখনও পাগলের মতো কাঁদছিলেন, কখনও কপালে করাঘাত করছিলেন। সবাই তাঁকে শান্ত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কারণ বাকিরাও আমার মতো কিছুই বুঝছিল না। গুরশরণ তাওজি জানতে চাইলেন, “পুত্তর, তুই একটু ঠান্ডা হয়ে বলবি যে হয়েছেটা কী?”

বাপু কোনোমতে যা জানালেন তাতে উপস্থিত সবার ‘রুহ’ কেঁপে গেল। ওঁরা গিয়েছিলেন বটে শাস্তিপ্রস্তাব নিয়েই। কিন্তু পুলিশের গাড়ি মঙ্গলপুরীর সীমানার বাইরে যাওয়া মাত্রই দেখা গেল রাস্তার ধারে শয়ে শয়ে লোক হাতে ধারালো অস্ত্র, টায়ার, মশাল আর কেরোসিন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ‘খুংখার’ মূর্তিতেই স্পষ্ট যে ওরা ‘শান্তি’ শব্দটার অর্থ বোঝে না! ওদের তরোয়াল রক্তপানের জন্য প্রস্তুত! বাপু ভয়ে কেঁপে উঠেছিলেন। তবু এইটুকু ভরসা ছিল যে সঙ্গে খোদ ডিসিপি আছেন। ডিসিপির গাড়ির ওপর হামলা করার মতো সাহস নিশ্চয়ই দাঙ্গাইরা করবে না। তাদের নিশ্চয়ই যেতে দেবে।

অথচ গাড়ির ড্রাইভার ঠিক ওই ভিড়টার সামনেই এসে সজোরে ব্রেক কষল। গাড়িটা সজোর ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে যেতেই আততায়ীরা ‘মার মার’ করে এসে আছড়ে পড়ল দরজার ওপর। সরতাজ শুধু কোনোমতে বলতে পেরেছিল, “এ কী!”

আর কিছু না বলতে দিয়েই দরজা সপাটে খুলে প্রায় পাঁজাকোলা করে তাকে তুলে নিল ভিড়টা। যেন একরকম ছিনতাই করেই নামিয়ে নিল গাড়ি থেকে। অন্যদিকে নারায়ণ সিংকেও জামা ধরে টেনে নামিয়েছে জনতা৷ বাপু সভয়ে দেখলেন, তাঁর দিকেও তেড়ে আসছে ওরা! নারায়ণ সিং নিজেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। কিন্তু একজন সাধারণ নিরীহ ও নিরস্ত্র মানুষ দশটা সশস্ত্র গুপ্তার সঙ্গে লড়বে কী করে! তাকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চেপে ধরে ওরা একটা টায়ার জোর করে ঢুকিয়ে দিল গলা দিয়ে। টায়ারটা আটকে গিয়েছে তার বুকের কাছে। ঐ পরিস্থিতিতে হাত নাড়ানোও সম্ভব নয়৷

নারায়ণ অসহায় চিৎকার করে উঠল, “পা-জি, ডিসিপিসাব, বাঁচাও!” , বাপু বিদ্যুৎবেগে ডিসিপি দত্তার দিকে ফিরলেন, “স্যার, কিছু করুন। ওদের মেরে ফেলবে তো!”

ডিসিপি খুব শান্তস্বরে জবাব দিলেন, “করছি তো। দেশের শত্রুদের মারছি। এটাই তো পুলিশের ডিউটি।”

নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তিনি। এ কী বলছেন ডিসিপি দত্তা। একটু আগেই তো কত মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছিলেন। একরকম শান্তির ধ্বজা উড়িয়েই এসেছিলেন তিনি। বলেছিলেন, সমস্যার সমাধান করে দেবেন। এই লোকটার কথাতেই ভরসা করে তাদের শেষ সম্বল অস্ত্রগুলো পর্যন্ত ওঁদের হাতে তুলে দিয়েছে সবাই। এত বড়ো দাগাবাজ! এত বড়ো বিশ্বাসঘাতকতা!

বাপু আর কিছু বলার সুযোগ পাননি। তার আগেই তাঁকেও টেনে নামিয়েছে ওরা। ডিসিপি আর তাঁর পুলিশ বসে বসে তামাশা দেখছিলেন। বাপুকে রাজপথের ওপর ফেলে মারতে শুরু করেছে ওরা। মুড়ি-মুড়কির মতো লাথি, ঘুষি এসে পড়ছিল তার ওপরে। তবু শুনতে পেলেন নারায়ণ সিং-এর প্রাণান্তকর চিৎকার! টায়ার পরিয়ে, কেরোসিন ঢেলে ওকে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দিয়েছে ভিড়। সে আপ্রাণ চেঁচাতে চেঁচাতে এদিক ওদিক দৌড়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু অগ্নিদেব ক্রমাগতই ওকে সাপটে ধরছেন। জ্বলন্ত টায়ার ওকে পুড়িয়ে মারছে। ওর চিৎকার করে ছটফট করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। বাঁচার প্রশ্নই ওঠে না।

নারায়ণের পরিণতি দেখতে পেলেও সরতাজকে তো দেখাই যাচ্ছিল না। গোটা দলটা যেন ওর ওপরেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ভিড়ের তলায় চাপা পড়া মানুষটার কী হল তা বোঝা দায়। ডিসিপি দত্তা ওকে ভিড়ের হাতে তুলে দিতে পেরে খুব তৃপ্তমনে ধূমপানে মন দিয়েছেন। বাবা পরম আফশোশে চোখ বুজলেন। এতগুলো লোকের সঙ্গে একা কী করে লড়বে ছেলেটা! যতই আর্মিম্যান হোক, ও যে নিরস্ত্র! আর আততায়ীদের হাতে লোহার রড, তরোয়াল, ছুরি, কী নেই! এরা ঠিক কী ধরনের কাপুরুষ? হিম্মত থাকলে অন্তত কৃপাণটা ওর হাতে তুলে দিয়ে দেখত

কিন্তু সরতাজের মতো একজন জওয়ানকে চিনতে বাপুরও ভুল হয়েছিল। সে প্রথমে পরিস্থিতির আকস্মিকতায় বিহ্বল হয়ে গিয়েছিল। সেই ফাঁকেই তাকে রডের বাড়ি মেরে মেরে রক্তাক্ত করে দিচ্ছিল ওরা। তীক্ষ্ণ তরবারিও উন্মত্ত রাগে তার রক্তের স্বাদ নিচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতিটা মাথায় ঢুকতেই সে সবেগে ভূপতিত অবস্থাতেই একজন দাঙ্গাইয়ের হাত থেকে কেড়ে নিল তরোয়াল। একজন প্রশিক্ষিত ও দক্ষ সেনার হাতে কথা বলার জন্য বোফর্স বা বেয়নেট লাগে না। একটা ধারালো তরোয়ালই যথেষ্ট। বাপু মার খেতে খেতেই দেখলেন, গোটা ভিড়টা যেন একটু ভয় পেয়ে পিছিয়ে এল। তার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে সরতাজ সিং। সমস্ত জখম নিয়েই রক্তমাখা দেহে উদ্ধত, অপরাহত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়েছে সে। শত্রুর তরোয়ালের ধার, ছুরির আঘাত তাকে কেটেছে-ছিঁড়েছে। আপাদমস্তক রক্তে ভেসে যাচ্ছে, ক্ষতবিক্ষতও বটে। কিন্তু সে কী ভয়াল মুর্তি তার। এতক্ষণ যে সরতাজকে দেখছিলেন, সে নিজের দেশবাসীদের প্রাণ নিতে চায়নি। এবার যেন সেই মানুষটাই মূর্তিমান কালের রূপ ধরল। যে দেশপ্রেমিক জওয়ান মাথায় শহীদির ‘কাফন্’ বেঁধে শত্রুদের ব্যুহে ঢুকে পড়ে, সরতাজ সেই নির্ভীক সেনা! তার হাতের তরোয়াল এমনভাবে ঘুরছে, যেন ওটা বহুবছরের পোষ মানা। চোখেই দেখা যায় না তার আক্রমণ। যারা এতক্ষণ আক্রমণ করছিল তাকে, এবার তারাই পালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সবাই সভয়ে দেখল, একটা লোকের সামনে হেরে যাচ্ছে একদল হিংস্র মানুষ। অস্ত্র চালানোয় প্রশিক্ষিত হাত তরোয়াল নিয়ে একরকম তাণ্ডবমূর্তি ধরল। দিল্লির রাস্তা সাক্ষী থাকল এক অদ্ভুত অসম যুদ্ধের একটা মানুষকে চতুর্দিক দিয়ে বহু লোকের ভিড় ছেঁকে ধরেছে। মানুষটা টলছে, উপর্যুপরি আঘাতে শিউরে শিউরে উঠছে, তবু হাল ছাড়ছে না।

কিন্তু ওরা ভুলে গিয়েছিল, বাঘের একটা পাঞ্জাই তাদের পেড়ে ফেলবার জন্য যথেষ্ট! গায়ে অজস্র ক্ষত নিয়ে রক্তাপ্লুত সরতাজ এবার এগোল। তার হাতে বনবন করে ঘুরছে তরোয়াল। দাঁতে দাঁত চেপে নিয়ন্ত্রণ করছে নিজের ভারসাম্যকে। কিন্তু তার শিক্ষিত হাত প্রাণ নিতে অভ্যস্ত। সে নিজে থেমে যেতে পারে, তবু তার হাত থামবে না। চোখের সামনেই এবার ধড়াধড় দাঙ্গাইদের লাশ পড়তে শুরু করল। এখন আর বিচার-বিবেচনা করার কিচ্ছু নেই। যে তার সামনে আসছে, তাকেই নিষ্ঠুরভাবে কাটছে সরতাজ। তরোয়াল তো প্রতিপক্ষের হাতেও ছিল। কিন্তু ওটা চালাতে কী করে হয় এবং ঠিকমতো চালালে কী হতে পারে, তা এক প্রকৃত যোদ্ধাই দেখিয়ে দিল।

বাপুকে এতক্ষণ যারা পেটাচ্ছিল, এবার তারাও তাঁকে ছেড়ে দিয়ে দৌড়েছে ওই একমাত্র শত্রুর দিকেই। নারায়ণ সিং-এর পোড়া মৃতদেহ একদিকে পড়ে ছিল। বাপুকে নিয়েও ওদের অত চিন্তা নেই, যত এই আর্মির ক্যাপ্টেনকে নিয়ে আছে। বুকে গুলি আর পোড় খাওয়া যোদ্ধা যে এত সহজে বাগ মানবে না তা ওরা জানত। অনেক কষ্টে, অনেক ষড়যন্ত্রের পর নিরস্ত্র লোকটাকে একা পাওয়া গিয়েছিল। তাই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে ভেবেছিল, ব্যাপারটা একেবারেই সহজ হবে। কিন্তু ভুলে গিয়েছিল, একজন জওয়ান একশোটা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে মরে পড়ে গেলেও তার হাত, দুটো জিনিস শেষমুহূর্ত পর্যন্ত আগলে রাখে- তেরঙ্গা আর রাইফেল। যার রক্তে ‘সরফরোশি’র নেশা, সে অত সহজে হার মানবে না। বাপুর মাথা ফেটে চোখ মুখ রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। তবু তিনি সবিস্ময়ে দেখলেন, সরতাজের সেই বিধ্বংসী মূর্তি। হাতে তরোয়াল নিয়ে সে প্রলয়নাচ নাচছে। সবাই মিলে তাকে ঘিরে ধরে চতুর্দিক দিয়ে কখনও তরোয়ালে, কখনও চপার দিয়ে কোপাচ্ছে। সর্বাঙ্গে অন্তত চল্লিশটা মারাত্মক ‘জানলেওয়া’ জখম। ব্যথায় থেকে থেকে কাতরে উঠছে, কাঁপছে। ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারছে না। তবু কী অদম্য তার জীবনীশক্তি! একসময়ে এমন মনে হল, একা তার সামনেই বুঝি শেষ হয়ে যাবে দাঙ্গাইদের দল! একাই বুঝি কয়েকশো লোককে কেটে রাস্তায় ছড়িয়ে দেবে সরতাজ সিং।

তার এই মারমার কাটকাট রূপ দেখে জনতা এবার ভয়ে কিছুটা পিছিয়ে গেল। বাপু কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়েছেন। সভয়ে দেখলেন, সরতাজের নাক, মুখ থেকে গলগল করে রক্ত পড়ছে। সে হাত দিয়ে মুখের রক্ত মুছে অতিকষ্টে তাকাল বাপুর দিকে। কোনোমতে বলল, “পা-জি। পালাও…!”

শুধু এইটুকুই বলতে পেরেছিল সে। পরক্ষণেই একটা জোরদার ফায়ারিং-এর আওয়াজ! বাপু বিস্ফারিতদৃষ্টিতে দেখলেন, সরতাজের কপাল ফুটো করে বেরিয়ে গেল একটা বুলেট! তার রক্তাক্ত দেহটা একটা ঝাঁকুনি খেয়ে উঠল। পরমুহূর্তেই ভারসাম্য হারিয়ে একেবারে চিত হয়ে পড়ল দিল্লির রাজপথে। দু-চোখ তখনও খোলা। কাজলকালো চোখদুটোয় মর্মান্তিক বিস্ময়! শেষমুহূর্তেও হতভাগ্য জওয়ান বিশ্বাস করতে পারেনি যে ভারতবর্ষের সে রক্ষক ছিল, সেই ভারতবর্ষেরই আর এক তথাকথিত রক্ষক এইভাবে শেষ করে দেবে তাকে! সীমান্তের শত্রু যা করতে পারেনি, নিজের দেশের লোকই তা করে দেখাল৷

“বেওকুফ, নালায়কের দল!”

ডিসিপি দত্তা এবার রিভলবারটা নামিয়ে নিয়ে গজগজ করলেন, “তোরা তোদের নেতার নামের কলঙ্ক! একটা লোককে এত কষ্টে ভুলিয়ে ভালিয়ে, ভুজুং ভাজুং দিয়ে তোদের হাতে তুলে দিলাম, তারপরও তোরা কিস্যু করতে পারলি না! ও একা আর নিরস্ত্র ছিল। আর তোদের হাতে নেই, এমন কোনো অস্ত্রই নেই! একগাদা নিকম্মা’র দল। একটা লোককে সামলাতে পারলি না? আর একটু হলেই ভয়ের চোটে ভেগে যাচ্ছিলি সালোঁ? যত বাজে কাজ আমাকেই করতে হয়!”

সরতাজের প্রাণহীন দেহটা মাটিতে পড়েছিল। পাগড়িটা খসে গিয়ে তার মাথার দীর্ঘ চুল এলিয়ে পড়েছে রাস্তার ওপরে। চোখদুটো শূন্যদৃষ্টিতে আকাশ দেখছে। হাতে তখনও মুঠো করে ধরা রক্তাক্ত তরোয়াল। জলের মতো তার রক্তে ভেসে যাচ্ছে দেশের মাটি। এটাই তো মানুষটার স্বপ্ন ছিল। দেহের প্রতিটা রক্তবিন্দু দেশের মাটির জন্য বরাদ্দ করেই সে সেনাবাহিনীতে গিয়েছিল। অবশেষে দেশ তার রক্ত গ্রহণ করল। কিন্তু এইভাবে?

ভিড় তখনও মৃতদেহের দিকে এগোতে সাহস পাচ্ছে না দেখে ভূপেন্দ্র দত্তা গর্জে উঠলেন, “আরে ভীতুর ডিম সব। লাশকে ভয় পাচ্ছিস? মর গয়া ইয়ে। যাও, টুট পড়ো।” এইটুকুই শোনার ছিল। পরাজিত শক্তিশালী শিকারের মৃতদেহের ওপর নির্লজ্জ হায়নারা যেমন করে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খায়, তেমনই এবার সবাই প্রতিশোধস্পৃহায় সবিক্রমে লাফিয়ে পড়ল সরতাজের প্রাণহীন দেহের ওপরে। সহস্র তরোয়াল, কাটারি, চপার দিয়ে তাকে সকলে মিলে কোপাচ্ছে! সেই গোলমালের মধ্যেই বাপু কোনোমতে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছেন!”

সমস্ত বৃত্তান্ত শুনে সবাই ‘থ’। এই ছিল পুলিশের মনে! বাপু আর বলতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। সকলের চোখে অবিশ্বাস। এই তো, একটু আগেও রাইফেল নিয়ে অতন্দ্র প্রহরায় ছিল ছেলেটা। সামনাসামনি তাকে পরাস্ত করতে পারেনি কেউ। দু-দুবার শত্রুপক্ষ তার ভয়ে পালিয়ে গিয়েছে। এই দেশকে সে ভালোবাসত। দেশের আইনরক্ষকদের বিশ্বাস করেছিল। সে বিশ্বাস এতটাই গভীর যে নিজের হাতিয়ারটাও চোখ বুজে তুলে দিয়েছিল ওদের হাতে। অথচ তার এমন হৃদয়বিদারক পরিণতি।

কেউ কোনো শব্দ খুঁজে পায় না। সকলের চোখে আতঙ্ক। সরতাজ নেই! যে সিংহটা ভেড়ার দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিল, তাকে শেষ করে দিতে সক্ষম হয়েছে ওরা। এখন বাকিরা কী করবে? তাদের হাতে এখন বাধা দেওয়ার মতো অস্ত্রও নেই। সব বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে চলে গিয়েছেন ভূপেন্দ্র দত্তা আর তাঁর পুলিশবাহিনী। তাঁর দেওয়া আশ্বাস যে কতখানি মিথ্যে ছিল তা এইবার মর্মে মর্মে উপলব্ধি করল সবাই। পুলিশ শুধু চোখ বুজেই বসে নেই, ওদের সাহায্যও করছে। এই বেইমানিটা বুঝতে পারার পর প্রত্যেকেরই মুখ প্রায় রক্তহীন হয়ে গিয়েছে। কারোর বুঝতে বাকি নেই যে মৃত্যু দরজায় কড়া নাড়ছে। এবার ওরা আবার ফিরে আসবে। খুব দ্রুতই আসবে। কিন্তু কেউ লড়তেই পারবে না, বাধা দিতে পারবে না। সবাই নিরস্ত্র। ঘরে লাঠি, তরোয়াল এমনকি কৃপাণটাও নেই।

“আমার সরতাজ মরে গেছে…? এক্কেবারে মরে গেছে… অ্যাঁ?”

দিদি এতক্ষণ চুপ করে বসে থেকে সব শুনছিল। এতক্ষণে ফিশফিশ করে জানতে চাইল। এই মুহূর্তে ওর কথা শুনে বিরক্ত বা বিস্মিত হওয়ার মতো অবস্থা কারোরই ছিল না। সবাই নীরব। সবার নৈঃশব্দই ওর প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিল। সে কিছুক্ষণ সবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। এতক্ষণে ওর চোখ বেয়ে জল পড়ে, “সবাই মিলে ওকে মারল। কত কষ্ট পেয়েছে… কত ব্যথা পেয়েছে…!”

বলতে বলতেই সে এক আছাড়ে নিজের হাতের সব চুড়ি ভেঙে ফেলল। আমরা সবাই এর অর্থ জানতাম…! এ ও জানতাম, আর কোনো আশা নেই…! সব শেষ এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা!… মৃত্যু আসছে। আমাদের অন্তিম সময় উপস্থিত। …

আজও ভুলতে পারি না সেই মুহূর্তগুলো। দিদির সেই ব্যাকুলতা, সেই অর্থপূর্ণ চুড়ি ভেঙে ফেলা, অকালবৈধব্য স্বীকার করে নেওয়া, সরতাজের নামের আগে ‘আমার’ শব্দটা বলা। কত বড়ো মূর্খ ছিলাম আমরা। বাইরে থেকে কিছুই বুঝতে পারিনি। ভেবেছি নভজ্যোত আর দিদি দু-জন দু-জনকে ভালোবাসে। ওদের বিয়েটা প্রেমের বিয়ে! বাপু আর বেবেও কিছু বুঝতে পারেননি। আশ্চর্য! দুই পক্ষের উদ্যোগেই বিয়েটাও নির্বিঘ্নে ঠিক হয়েছিল। ওঁরাও ভেবেছিলেন, ছেলে-মেয়েরা একে অপরকে ভালোবাসে।

এখন সবকিছুই বুঝতে পারি। ভালোবাসা নিঃসন্দেহে ছিল। তবে সেটা নভজ্যোতের দিক থেকেই বেশি। দিদি ওর ভালোবাসাটাকে মেনে নিয়ে এবং মানিয়ে নিয়ে ওকে একজন ভারতীয় ও শিখ পরিবারের আদর্শ মেয়ের মতোই ভালোবেসেছিল। কিন্তু ওর মনের প্রবল প্রেম সরতাজের দিকেই চিরকাল ধাবিত হয়েছে। আমি ওর লজ্জাবনত চোখ, রক্তিম গাল দেখেও বুঝিনি। বোঝার কথাও নয়। তবে যখনই সরতাজ স্নান করতে যেত, ঠিক তখনই দিদি জল ভরতে যেত! এই সমাপতনও কারোর চোখে পড়েনি। সদ্যস্নাত মানুষটার জলসিক্ত দেহের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। নভজ্যোত আর দিদির সামনে সরতাজ এসে পড়লে সবসময়ই ও একটু সরে যেত বা সঙ্গে সঙ্গে হাত ছাড়িয়ে নিত, যেন পাপ করছে। অথচ কোনোদিন ও লোকটা ভ্রূক্ষেপও করেনি যে ‘ছুটকি’এমন করে কেন! তার কাছে যস্যি দিদি স্নেহের ‘ছুটকিই ছিল। যখন এল.ও.সি.-তে বা ডিউটিতে চলে যেত, তখন যমিত কৌরের উদাস মুখ কারোর চোখেই পড়েনি!

তবে যস্যিদিদি বুদ্ধিমতী। ও জানত, উদ্ধত হিমালয়ের রহস্যময় পথে হারিয়ে যাওয়ার উপায় ওর নেই। তার জন্য একটা ছোট্ট সুখের ঘর, সাধারণ ক্ষেতের মেঠো পথ অপেক্ষা করছে। নভজ্যোত কাকে ভালোবাসে তা সবাই জানত। কিন্তু কেউ যসমিতকে জিজ্ঞাসা করেনি, সে কাকে ভালোবাসে। মেয়েদের কাছে বোধহয় জানতেও চাওয়া হয় না। ও জানত সরতাজকে কোনোদিনই পাওয়া যাবে না! বয়েসে বড়ো হওয়াটাও অতখানি সমস্যা ছিল না। সরতাজ কলোনির প্রত্যেকটা মানুষের কাছে এতটাই প্রিয় ছিল যে বেবে-বাপুও তাকে জামাই হিসাবে পেলে বর্তে যেতেন। ওদিকেও কোনো বাধা ছিল না। দিদির প্রেমকাহিনির সবচেয়ে বড়ো সমস্যা তার প্রিয়তম মানুষটা নিজেই। আজীবন যস্যিদিদিকে ও ‘ছুটকি’ ছাড়া কিছু ভাবলই না। ওর চোখে চোখ রেখে আবেগটুকুও দেখল না। ওর ওষ্ঠাধরের কম্পন চোখ তুলে কোনোদিন দেখেইনি। অতকিছু লক্ষ করার তার সময়ই ছিল না। ডিউটি ছাড়া জীবনে কিছুই সে বোঝেনি। তাই দিদি বাধ্য মেয়ের মতো নভজ্যোতকেই জীবনসঙ্গী হিসাবে বেছে নিয়েছিল।

কিন্তু সেদিন সব বাঁধ ভেঙে গেল। জীবন যা পারেনি, মৃত্যু করে দেখাল। দিদি বুঝেছিল, আর সময় নেই। লোকলজ্জা ওকে আর সইতে হবে না। আমরা সবাই বুঝেছিলাম, মৃত্যু আসছে! যমিতও জানত, মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে এই অসহ্য অভিনয় করার আর কোনো মানে হয় না৷ কিছুক্ষণ পরেই সব শেষ হতে চলেছে। তাই এই ভন্ডামি করার প্রয়োজন কী? তাই শেষমুহূর্তে নিজের সত্যিটা সর্বসমক্ষে দেখিয়ে গিয়েছিল সে। দিদি বুঝে গিয়েছিল ‘বেশরম, বেহায়া’ এইসব বিশেষণ শোনার জন্য ও নিজেও বেঁচে থাকবে না। বলার মানুষগুলো তো নয়ই।

এখনও মাঝে মাঝে দিদিকে দেখতে পাই। যখনই অধিরাজ ব্যানার্জির সামনা-সামনি হই, তখনই মনে হয় দিদি হাসছে। বলছে, “ভাই, এবার তুই ওকে হারাতে পারবি না! আমার সরতাজকে তোর ভেতরের বেইমান লোকগুলো আর ধোঁকা দিতে পারবে না! একবার শয়তান ওকে বোকা বানাতে পেরেছে, বারবার পারবে?”

হ্যাঁ দিদি। ও অবিকল তোর সরতাজেরই মতো! হয়তো তোর সরতাজই আবার ফিরে এসেছে দেশের টানে। আমি ঈশ্বরবিশ্বাসী। পুনর্জন্মতেও বিশ্বাস করি। তেমনই অপূর্ব চোখ, তেমনই ঔদ্ধত্য, তেমনই তেজ, জেদ। ভেড়ার সামনে দাঁড়ানো সিংহ। কিন্তু কী করব দিদি! আট বছরের শিশু যে ওইদিনই শিখে গিয়েছিল, বীরত্বের চেয়ে ছল আর কৌশল অনেক বেশি কার্যকরী হয়! শয়তানি আর বিশ্বাসঘাতকতার পাঠ যে সেদিনই সে পড়ে ফেলেছিল। সে শিক্ষা আমি কোথায় রাখি বল্! রাক্ষসের আঘাতে যে রাক্ষস তৈরি হয়েছে, তাকে নিয়ে কী করব! সে যে নিজের কাজ করবেই। এখনও একটা রাত বাকি। আর দুটো পরিবার। সময় কম। সুযোগও …!

“যো বাত কী হ্যায়, উস মেঁ সও মানে ছুপে হ্যায়,
চেহরোঁ কে পিছে কিতনে হি চেহরে ছুপে হ্যায়
ধোঁকে কা হ্যায় ধুঁয়া, ধুন্দলা ধুন্দলা সা হ্যায়, আখোঁ মে হর সমা…!”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *