কালরাত্রি – ৩১

(৩১)

একে একে ব্লকের মধ্যে শোর-শরাবা ক্ষীণ হয়ে আসছিল। এখানকার প্রায় সব পুরুষই মরেছে। হাতে গোণা যারা বাকি ছিল তারাও একে একে জ্বলল, টুকরো টুকরো হল। তাদের পাগড়িসুদ্ধ মাথাও গুণল ওরা। পাঁচশো টাকার হিসাব অনুযায়ী ওদের একদিনের রোজগার প্রায় দশ হাজার ছাড়িয়েছে। ‘মর্’ তাতেই খুশি। ওরা তখন ভোজ-দাওয়াতের প্ল্যান করছে। পাঞ্জাবের উৎসবের উত্তরে দিল্লিতেও উৎসব চলবে! দুই উৎসবই সমান ঘৃণ্য ও নারকীয়।

তখন মনে হয়েছিল যে কৌররাও বুঝি সব মরল। পরে অবশ্য শুনেছিলাম যে অত অত্যাচার সওয়ার পরেও আধমরা হয়ে তাদের মধ্যে কেউ কেউ অ্যাসিড জ্বলা মুখ, আর ক্ষতবিক্ষত পঙ্গু দেহ নিয়ে বেঁচে ছিল। তখন টের পাইনি। মৃতবৎ দেহগুলোয় প্রাণের অস্তিত্ব এত ক্ষীণ ছিল যে দাঙ্গাইরাও ওদের লাশই ভেবে নিয়েছিল। কিন্তু কথায় আছে, ‘যকো রাখে সাঁইয়া, মার সকে না কোয়!” কয়েকজন নারীর ক্ষেত্রে এই প্রবাদটা সত্যি হয়েছিল। সত্যি হয়েছিল আমার ক্ষেত্রেও। আমাদের জান বোধহয় সবচেয়ে বেশি ‘কড়ক’ আর ‘বেশরম’ ছিল।

আমি আর বেবে অপেক্ষা করছিলাম যে মৃত্যুদূতেরা কতক্ষণে আমাদের কাছে আসবে। সবাই তো গেল। আমাদেরই বা এরা বাঁচিয়ে রেখেছে কেন! মৃত্যু নামক জিনিসটা যত তাড়াতাড়ি আসে, ততই মঙ্গল। ওই মুহূর্তে কয়েক মিনিটের অতিরিক্ত আয়ু কিছুতেই চাইছিলাম না। মনে হচ্ছিল, এবার প্রাণটা গেলেই বাঁচি। এখনই একটা তেলের ডাব্বা আর মশাল আসুক, কিংবা তরোয়াল-কাটারি।

কিন্তু তখন কে জানত, অত সহজ মৃত্যু দেওয়ার পরিকল্পনা ওদের ছিল না! এক ঝটকায় জান নিয়ে নেওয়ার মতো দয়ালু ওরা কেউ ছিল না। এখন মনে হয়, আমাদের মধ্যে বাপুই বুঝি সবচেয়ে পূণ্যবান মানুষ ছিলেন। তাই তাঁর অমন আসান আর দ্রুত মৃত্যু হয়েছিল। হয়তো সেটা জহ্লাদদেরই ভুল কিংবা ওয়াহেগুরুর আশীর্বাদ। যন্ত্রণা তিনি পেয়েছিলেন ঠিকই, তবে সেটা কয়েক মুহূর্তের জন্য। বাকিরা অত সহজে মরতেও পারেনি। জীবন তাদের জন্য কঠিন ছিল ঠিকই। শেষে দেখা গেল, মরণ তার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন।

এমনই কিছু আমাদের জন্যও অপেক্ষা করছিল। বেশ কিছু শিশুকে ওরা জ্বালায়নি। তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। এইটুকু মাথায় ঢুকেছিল যে এরা আমায় পুড়িয়ে মারবে না। অন্য কোনো উপায় নিশ্চয়ই ভেবে রেখেছে। হয়তো পবনজ্যোতের মতো অপারেশন চালিয়ে দেখবে যে আমার ভেতরে কী কী আছে, অথবা এককোপে মাথাটাই উড়িয়ে দেবে। তারপর গোটা শরীরটাকে টুকরো করবে। পেটের ভেতরে তরোয়াল, খঞ্জর, চাপাতিও ঢুকিয়ে দিতে পারে কিংবা লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়েও মারতে পারে। ওদের হাতে মারার অনেকরকম তরকিব আছে। আমার মরা ছাড়া কোনো রাস্তাই নেই। তাই তখন ভাবাই ছেড়ে দিয়েছিলাম।

দিদির পর এবার বেবের কাপড় খুলতে দাঙ্গাইরা মহা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ভূপেন্দ্ৰ দত্তা তখনও হাসি হাসি মুখে সব কর্মকাণ্ড দেখে চলেছে। ওর পেছনে দেবধর চৌবেও হাজির। একটা দৃশ্যও ছাড়তে রাজি নয়। প্রত্যেকটা মৃত্যু স্বচক্ষে দেখে তৃপ্তির আমেজ নিচ্ছে। সকালেও ওদের গায়ে উর্দি ছিল। আমি সেই উর্দির মোহে ভুলেছিলাম। কিন্তু একবারও ভাবিনি ওই উর্দির নীচে মানুষের চামড়া ছিল কিনা! এখন সন্দেহ হয়, ছিল না! থাকলে চুপ করে বসে দেখত না৷

আমার দিকে একদল লোক এবার তরোয়াল, রড, আরও সব অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসছিল। আমরা হাতে গোণা কয়েকজন জীবিত বাচ্চামানুষ হাঁড়িকাঠে মাথা দেওয়া ছাগশিশুর মতো কাঁপছিলাম। বেবে সেই দৃশ্য দেখে ফের কঁকিয়ে উঠে বলল, “তোমাদের পায়ে পড়ি, আমার ছোটো ছেলেটাকে অন্তত ছেড়ে দাও। আমার পতি, জ্যেঠ, জ্যেঠানী, মেয়ে, হবু দামাদ-তাদের পরিবার, দুই ছেলে—সবাইকে তো মেরেছ। ও একেবারেই কোলের। বড়ো মাসুম আর শান্ত। কোনোদিন কারোর ক্ষতি করেনি। আজ পর্যন্ত একটা ‘চিটি’-ও মারেনি। ওকে মেরে তোমরা কী পাবে? মাত্র আট বছর বয়েস ওর। তোমাদের নিজেদের ঘরেও তো ওর বয়েসী বাচ্চা আছে। এই উমরের সন্তান কি তোমাদের কারোর নেই? তাদের কি জি-জান সে প্যায়ার, লাড করো না? তাদের কথা ভেবে, ওকে ছেড়ে দাও। এতদিন এত অভাবে, কষ্টেও কারোর কাছে হাত পাতিনি। কিন্তু আজ ওর প্রাণ ভিখ্‌ চাইছি। তোমাদের খুদার কসম্…!”

বেবের শেষের কথাগুলো কান্নায় জড়িয়ে গেল। আমি জানতাম, বেবে সব সত্যি বলছে। আমার মায়ের মতো খুদ্দার খুব কমই আছে। কোনোদিন শত অভাব-অনটনে কারোর কাছ থেকে কোনোরকম মুফতের সাহায্য চায়নি। যদি প্রয়োজনে ধারও নিয়ে থাকে তবে সময়মতো যে করেই হোক ফেরত দিয়েছে। যতটুকু পেয়েছে, তাই দিয়েই টানাটানির সংসার চালিয়ে নিয়েছে। তার জন্য কোনো অভিযোগ ছিল না। খুব বেশি চাহিদাও ছিল না। মা চিরকাল বড়ো স্বল্পেই সন্তুষ্ট। আজীবন শুধু ঈশ্বর ছাড়া আর কারোর সামনে এই হাতদুটো প্রার্থনা বা ভিক্ষার জন্য ওঠেনি। অথচ আজ উঠল! তাও ঈশ্বরের সামনে নয়, শয়তানের সামনে। সেই শয়তান যে তার পতিকে কেটেছে, ছেলেদের জ্বালিয়েছে আর মেয়ের চরম সর্বনাশ করেছে।

তরোয়ালধারীরা থেমে গেল। উৎসুক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে ওরা। তাদের মধ্যে একজন বলল, “এটা তোর ছোটো ছেলে?”

“জি। ছেড়ে দাও ওকে।” বেবের কাতর অনুনয়, “বদলে আমার সঙ্গে যা করার করো। কিন্তু ও এখনও বড়ো ছোটো। ওকে বাঁচতে দাও।”

একটা ভারি হাত হঠাৎই আমার মাথার ওপর এসে পড়ল। চমকে দেখি, সেই মুরুব্বি নেতা আমার পাগড়ির ওপর হাত রেখে অল্প অল্প আদর করছে। চোখের দৃষ্টি যেন একটু নরম। মৃদু স্বরে বলল, “হাঁ। সহি কহাঁ তুনে। আমার নিজেরও এইরকম একটা ছেলে আছে। ছোট্ট, নিষ্পাপ। নরম স্বভাবের। অবিকল এমনই। তাকে আমি নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। তার জন্য আমি মরতেও পারি, মারতেও পারি।”

আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম এই অমানুষটার মধ্যে আচমকা বাপু মহাত্মা গান্ধী জেগে উঠলেন কী করে। আমার গোটা পরিবারের কাতিল শেষে আমার মাথাতেই হাত বোলাচ্ছে। এ কী ধরনের অচন্তা! কিন্তু আরও কিছু ভাবার আগেই তার চোখ ফের দপ করে জ্বলে উঠল। দাঁতে দাঁত পিষে সে বলল, “কিন্তু ও আমার ছেলে নয়। ও বেয়ন্ত সিং, সতবন্ত সিং আর ভিন্দ্রানয়ালের জাত! আমার ছেলে গদ্দার নয়। তবে এটা বড়ো হলে গদ্দার হবেই। তাই শাস্তি ওকে পেতেই হবে। কঠিন শাস্তি!”

বলতে বলতেই সে আমার টুটি টিপে ধরল। লোহার মতো তার হাতের ‘জকড়’। আমি ব্যথায় কাতরে উঠেছিলাম। দম নেওয়ার জন্য হাঁকপাক করছিলাম। কিন্তু তার দয়া হল না। লোকটা আমার ঘাড় ধরে বেবের সামনে বসিয়ে দিয়ে বলল, “এটা তোর মা না? কখনও ভেবে দেখেছিস্-তেরি মা অন্দর সে দিতি ক্যায়সি হ্যায়?”

সেই শিশু স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়েই থাকে। এর পেছনের গূঢ় অর্থ সে কিছুই বোঝেনি। লোকটা একদৃষ্টে সেই কচি মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ ফিরিয়ে নিল সাঙ্গপাঙ্গদের দিকে, “দেখেনি। চলো, দিখা দো। ন্যাংটো কর শালিকে। বাচ্চাও একটু মজা নিক্।”

বেবের ওপর প্রায় কুড়ি-পঁচিশজন সঙ্গে সঙ্গেই হামলে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে ছিঁড়ে গেল কামিজ। শত বাধা সত্ত্বে সালোয়ারও খুলল। আমার মা, এক অসহায় নগ্নিকা তার ধর্ষকদের সামনে এবার হাতজোড় করেছে। কতগুলো জন্তুর পায়ে ধরছে আর বলছে, “তোমরা আমার সঙ্গে যা খুশি করো। চাও তো অত্যাচার করতে করতে মেরেই ফেলো না কেন! আমি চু-চা কিচ্ছু করব না। কিন্তু আমার এই মাসুম ‘ছোটুর’ সামনে নয়। এই জিম থেকেই ও জন্মেছে! এটাই ওর জন্মভূমি। এভাবে ওর জন্মকে কলঙ্কিত কোরো না! এই কলঙ্ক নিয়ে ও যে শান্তিতে মরতেও পারবে না! আমি তোমাদের সব কথা শুনতে রাজি। কিন্তু আমার বলাৎকার ওর সামনে কোরো না। দোহাই…।” মায়ের কনিষ্ঠ সন্তান তখন চোখ বুজে ফেলেছে। বিগত কয়েকঘণ্টায় তার মাসুমিয়তের তো ধজিয়াই উড়ে গিয়েছিল। যে নারীশরীর সম্পর্কে তার ধারণাই ছিল না, আজ তার নারকীয় ঘৃণ্য দিকটাই দেখল। এতদিন তার কাছে মা শুধু মা-ই ছিল, তাইজি স্নেহময়ী মাতৃসমা, দিদি সস্নেহ অভিভাবিকা। সবমিলিয়ে বড়ো ভালোবাসার মানুষ। আজ জানল ওরা কেউ মানুষই নয়, কতগুলো মাংসপিণ্ড! যার ওপর কুত্তা, হায়নার দল হামলে পড়ে। ছিঁড়ে খেতে পারে। ওরা মা, বোনের থেকেও বেশি ভোগের সামগ্রী। কতগুলো অমানুষের দল আট বছরের শিশুকে এই পাঠ পড়িয়েই ছেড়েছিল।

“চোখ খোল্!”

কে যেন একটা ধমকে ওঠে। টের পেলাম আমার গলায় ধারালো কী যেন একটা খোঁচা মারছে। তার তীক্ষ্ণ মুখ নরম চামড়া ভেদ করে কিছুটা মাংসও কেটে ফেলল। একটা উষ্ণ তরলের গড়িয়ে পড়া অনুভব করলাম। সঙ্গে তীব্র যন্ত্রণা। গলায় ছুরি চেপে ধরেছে ওরা!

“চোখ খোল।” আবার গর্জন, “আখে ফাঁড়কে দেখ। যা যা হবে সব দেখবি। নয়তো গলার নলি কেটে দু-ফাঁক করে দেব। তোর মা-কেও জ্বালিয়ে দেব।” নিরূপায় বাচ্চাটা ভয়ে, যন্ত্রণায়, মা-কে আগুনে জ্বালানোর হাত থেকে বাঁচানোর তাগিদে বাধ্য হয়ে চোখ খুলল। তার চোখের সামনে নিজের জননী, স্নেহময়ী জন্মদাত্রী সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হয়ে শুয়ে আছে। আজ পর্যন্ত তার মুখ, ধবধবে সাদা গ্রীবা, দুটো নরম হাত আর দুটো পায়ের পাতাই শুধু দেখেছে সে। ওই পায়ের সামনে ঝুঁকেছে, হাতের আশীর্বাদ পেয়েছে। অথচ এখন গোটা শরীর নগ্ন। বারবার পায়ে পড়ছিল, পা ধরছিল বলে এখন তার হাত দুটো চার পাঁচজন জোর করে ধরে রেখেছে। পা দুটোও বীভৎসভাবে ফাঁক করা! ছোট্ট মানুষটা বুঝেছিল এরপর কী হতে পারে। এ দৃশ্য সে আগেই দেখেছে বহুবার। কিন্তু এ যে তার নিজের মা! জন্ম থেকেই বেবের কোল, স্পর্শ, ঘ্রাণ তার কাছে জীবনের আর এক নাম। এই নারীর হাত ধরে সে হাঁটতে শিখেছে। এর স্তন থেকেই অমৃতধারা পান করে বেঁচে রয়েছে। এই হাতই তার মুখে তুলে দিয়েছে অন্ন-জল। এই দেহ তার কাছে সবচেয়ে পবিত্র। হয়তো ঈশ্বরের থেকেও বেশি ‘পাক’!

বেবে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে, “আখে বন্ধ কর গুল্লু! রজির দোহাই, ওকে এখান কথাটা শেষ করার আগেই আর একজন ‘দাঙ্গাই’ বলে, “চোখ বুজলেই ছেলের গলা কেটে দু-ফাঁক করে দেব ছিনাল কঁহিকি। চিরদিনের জন্যই ছেলে চোখ বুজবে। চলবে তোর?”

বেবে কথাটা শোনামাত্রই কেমন যেন পাথর হয়ে গেল। তার দুই চোখে শুধু শূন্যতা আর অন্ধকার। আমার মনে হচ্ছিল, মা বোধহয় ওই মুহূর্তেই মরে গিয়েছিল। তার ঠোঁট বেশ কয়েকবার কেঁপে কেঁপে উঠল। কিন্তু আর একটি কথাও বলল না। একবারও প্রতিবাদ করল না। মিনতি বা অনুরোধও নয়! বাধা দেওয়ার চেষ্টাও করল না। শুধু যেন দারুণ অভিমানে, অপমানে আর লজ্জায় নিজের সন্তানের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে সে। পণ করেছে, আর কোনোদিন ফিরে তাকাবে না।

দলের নেতা নোংরা হাসি হাসল, “তুই জানিস কী করে তোর জন্ম হয়েছে? তোকে পৃথিবীতে আনার আগে তোর মা-বাপ বিস্তরে শুয়ে কী করেছিল জানিস? কীভাবে বিস্তর গরম করছিল।”

কথা নয়, যেন গরম লোহার তীক্ষ্ণ শলাকা কানের পর্দা ছিড়ে দিল। এর আগে আমি সত্যিই জানতাম না। যতবার বেবে-বাপুকে নিরীহ কৌতূহলে আমার উৎপত্তির ইতিহাস জিজ্ঞাসা করেছি, ততবারই তাঁরা বলেছেন যে আমার জন্য ওঁরা দু-জনে গুরুদ্বারায় গিয়ে অনেক প্রার্থনা করেছেন। বেবে লঙ্গর করে ভক্তদের খাইয়েছে। বাপু ঈশ্বরের ঘর ঝাঁট দিয়েছেন। অনেক প্রার্থনার পর এক পবিত্র ভোরে, স্বয়ং ওয়াহেগুরুই নাকি আমায় কোলে করে মা-বাবার বুকে দিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের মনস্কামনা পূর্তি করতেই আমার পবিত্র মানব জন্মলাভ।

কী মহামুরখ ছিলাম আমি। কিছু ঘণ্টা আগেও আমার এই ধারণাই ছিল যে আমি ওয়াহেগুরুর দেওয়া ‘তোহফা’। কিন্তু আজ খানিকটা আগেই বুঝেছিলাম যে এর মধ্যে অন্য কিছুও থাকতে পারে। মুষকোটা আমায় ঘাড় ধরে টেনে মায়ের ‘জাঙ্গ’ এর কাছে নিয়ে গিয়ে যোনিটা ওর নৃশংস আঙুল দিয়ে ফাঁক করে খুলে দেখাল। আমার গা গুলিয়ে উঠল। সমস্ত শরীর ঘিনঘিন করছে। এটা কী! কতগুলো চামড়ার ভাঁজ, লাল মাংসের স্তর! এসব দেখার আগে অন্ধ হয়ে গেলাম না কেন। মনে হচ্ছিল ওদের বলি, “ওই সফেদ পাউডার আমার চোখে ছিটিয়ে দাও। অন্তত আমি বাঁচি!”

“এই দ্যাখ, এই গর্ত দিয়ে তুই মায়ের পেট থেকে বেরিয়েছিস। ঢুকেছিলিও এইখান দিয়েই। তোর বাপু তোকে ঢুকিয়েছিল। কেমন করে দেখবি?” বলতে বলতেই সে নিজের প্যান্ট, অন্তর্বাস খুলে বেবের ওপর চড়াও হল। একা

আমার মাথার ভেতরে কে যেন তীক্ষ্ণ সূঁচ ফুটিয়েই চলেছে। ‘সরে’র ভেতর, বুকের মধ্যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। অথচ তা দেখানো যায় না! একের পর এক হায়না এসে লাফিয়ে পড়ছিল বেবের ওপরে। আপ্রাণ চোখ বুজতে চাইছিলাম। কিন্তু যতবার সে চেষ্টা করছি, ততবারই ওরা আমার গলায় ছুরি চেপে ধরেছে, বেবেকে জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। মনে মনে রজির কাছে আর্জি জানাচ্ছি, আমায় অন্ধ-বধির করে দাও এই মুহূর্তেই। এই দৃশ্য দেখতে চাই না। এই শীৎকার আর অশ্লীল শব্দ, বেবের গোঙানি শুনতে চাই না। কিন্তু আমার প্রার্থনা মঞ্জুর হয়নি। স্তম্ভিত হয়ে দেখছি, ক্রমাগতই ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে আমার জন্মস্থান। গলগল করে খুন বেরিয়ে আসছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে চতুর্দিক। তবু লোকগুলো ছাড়ছে না। একের পর এক…একের পর এক…চার…পাঁচ…ছয়…. সাত…আট…নয়…। হায়নার কী শেষ নেই!

সে নয়, আশ পাশ থেকে আরও অনেকে। আমার চোখ বোঁজার উপায় ছিল না। তাই দেখতে বাধ্য হচ্ছিলাম যে কীভাবে আমার জন্মস্থান কুকুরের মতো জিভ দিয়ে চাটছে ওরা! যে বুকের দুধ আমায় জীবন দিয়েছে, কীভাবে সেই স্তনগ্রন্থির মাংস ভীষণ আক্রোশে আঁচড়ে, কামড়ে ফালাফালা করছে। জন্তুর মতো ঠোঁট কামড়ে রক্ত বের করে দিচ্ছে। যত্রতত্র দাঁত বসিয়ে একসঙ্গে সবাই পারলে খাবলা খাবলা মাংস তুলে নেয়। কী বীভৎসভাবে জান্তব রাগে বেবেকে ছিঁড়ে খাচ্ছিল। আমি চিৎকার করে বলতে চাইছিলাম, ‘থামো, এ আমার মা! কোনো খাদ্যবস্তু নয়!” কিন্তু মুখ দিয়ে একটা শব্দও বেরোচ্ছিল না! শুধু দেখছিলাম ওদের কঠিন আর কদর্য পৌরুষ নিষ্ঠুর তরোয়ালের মতো সবেগে বিদ্ধ করছে আমার মায়ের গোপনাঙ্গকে। বেবের শরীরটা শুধু জোরদার ঝাঁকুনি দিয়ে দিয়ে উঠছে। থরথর করে কেঁপে উঠছে নগ্ন স্তন, পেট, কোমর, তলপেটের সামান্য মেদ। ওরা তার ওপরই নিষ্ঠুরভাবে ধারালো দাঁত বসিয়ে চলেছে। বেবে এখনও মুখ ঘুরিয়ে আছে। কিছুতেই তাকাবে না আমার দিকে। কয়েকজন বুকে এমন কামড় দিল যে স্তনবৃত্তই ছিঁড়ে গিয়েছে। মুখ আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু গলা, কাঁধ, ছাতি, পেট, নাভি, জাঙ্গ, নিম্নাঙ্গ। এমন কোনো জায়গাই ছিল না যেখানে কামড়ের রক্তাক্ত দাগ, ক্ষত, রক্তের ধারা নেই। বেবে চিৎকার করছে না, কাঁদছেও না। কিন্তু হালকা গোঙানির আওয়াজ শুনে বুঝলাম যে ভয়াবহ যন্ত্রণা আর কান্না চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

পুরো দুঘণ্টা ধরে চলল এই দুষ্কর্ম! নয় অবধি গিনতি করেছিলাম। তারপরও যে কত এল আর কত গেল তার হিসেব নেই। রাখা যায় না। এই গোটা সময়টা ধরে আমি মৃত্যুর পায়ে সর ঠুকছিলাম! অন্ধত্ব, বধিরত্বের কাছে গিরগিরাচ্ছিলাম। গোটা সময়টা বুঝি একটুও শ্বাস নিইনি। কিন্তু কেউ আমার কথা শোনেনি। না মানুষ, না শয়তান, না ঈশ্বর। বেবেকে মনে মনে কাতর অনুনয় করছিলাম, ‘তুইও শেষে মুখ ফিরিয়ে নিলি মা। এই দদনাক লমহায় তুইও আমার দিকে একঝলক তাকিয়ে দেখবি না? একবারও মাথায় হাত রাখবি না। ওরা তোকে চিবোচ্ছে, মরছি তো আমি। কী অন্যায় করেছি যে আর আমার মুখ দেখবি না? একবারটি তাকা না বেবে। মরার আগে একবার তোর মুখটা দেখে যাই…! বস্ একবার তো দেখ্‌ লে!”

বেবে কথা রাখেনি। ভেবেছিলাম নিষ্ঠুর অভিমানে বুঝি পাথরই হয়ে গিয়েছে। অথবা সন্তানকে তার বীভৎস রক্তাক্ত মুখ দেখাতে চায়নি। দু-ঘণ্টা ধরে বুঝি নীরবেই শুধু সয়ে গিয়েছে। কারণ একঘণ্টার মাথায় তার গোঙানিও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমি এত বড়ো নির্বোধ যে বুঝতেই পারিনি, ওই নীরবতার পেছনে অপমানের দুঃখ, লজ্জা বা অভিমান নয়, মৃত্যু ছিল। বেবে বাইরে থেকে ঠিকঠাক থাকলেও মাঝেমধ্যেই বুকে সামান্য ব্যথা, বুক ধড়ফড় করার কথা বলত। অল্প অল্প শ্বাসকষ্টের শিকায়ত’ও করত। কিন্তু সে নিজেও কখনও বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি, আমরাও এত ‘এহমিয়ত’ দিইনি। নিম্নবিত্ত ঘরের বউ-মেয়েরা যতক্ষণ না শ্বাস উঠছে ততক্ষণ ডাক্তারের কাছে যায় না। ছোটোখাটো সমস্যা নিয়ে কে মাথা ঘামায়?

তখন বুঝিনি যে বেবের হৃৎপিণ্ড দুর্বল ছিল। কিছু সমস্যা তার “দিল’-এ তো ছিলই। হয়তো শরীরে ‘খুনও কম ছিল। তার ওপর এত অপমান, এত যন্ত্রণা, অবিরাম রক্তক্ষরণ, ‘অন্দরুনি চোট’, অঙ্গগুলোর ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়ার ধকল এই দুর্বল হৃদয় আর ‘নাজুক’ নারীদেহ আর নিতে পারেনি। আমার অজান্তেই তার হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। একঘণ্টার মাথাতেই সেও আমাকে ছেড়ে রওনা দিল অসীমের পথে। এই রক্ত, জ্বালা, যন্ত্রণা, অপমান, লাঞ্ছনার হাত থেকে শেষপর্যন্ত মুক্তি পেল।

যতক্ষণে বুঝলাম ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। কাজ শেষ করে, মৃত্যুশীতল গোস্ত চিবিয়ে লোকগুলো বেশ তৃপ্ত মুখে, ঘাম মুছতে মুছতে যখন উঠে দাঁড়াল, তখন বেবের নিথর দেহটা দেখে ভাবছিলাম, এরপর আর কী বেঁচে থাকল। আজ আমার গোটা পরিবার শেষ হল, আমার নিষ্পাপ মনকে খুন করা হল, স্বপ্নকে ভেঙে চৌচির করে দেওয়া হল, মনকে অপবিত্র আর আদর্শকে কলঙ্কিত করা হল, আত্মাটাকেও অভিশপ্ত করে তোলা হল। আমি সেই পাপের ঘড়া, যে নিজের মায়ের ‘লাজ’-ও রক্ষা করতে পারেনি, শুধু বসে বসে তার বলাৎকার দেখেছে। আমার চেতনা, বিবেক, অনুভূতি, সব পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। আর কী বাকি রইল?… শেষ হওয়ার জন্য আর কী-ই বা বাকি আছে!

লোকগুলো আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে চুকচুক করে মিথ্যে শোক প্রকাশ করল। আস্তে আস্তে বলল, “তোর মা বড্ড কমজোর। এইটুকুতেই মরে গেল। তেরি বেবে তো মর গয়ি। ক-টা জোয়ান লোককে সামলাতে পারল না!”

আমি নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলাম। ওরা আমার চোখের সামনেই বেবের ছেঁড়াখোঁড়া শরীরটাকেও জ্বালিয়ে দিল। শিশু তার মৃত মাকে অন্তিমবারের মতো একটু ছুঁতেও পারল না! একবার তার ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত নগ্ন দেহটাকে জড়িয়ে ধরে শেষবারের মতো অপমানিত দেহটার লজ্জা ঢেকে দেওয়ার চেষ্টাও করতে দিল না কেউ। মুখাগ্নি, অন্তিম সংস্কারের অধিকারও পেল না হতভাগা সন্তান। তার নিষ্পাপ চোখে তখন সেই জ্বলন্ত দেহের প্রতিবিম্ব আগুনের ফণা তুলে নাচছে। শোক প্রকাশের সুযোগও নেই। সব শেষ!

“চল্, অনেক মজা নিয়েছিস।” দলের নেতা রূঢ় গলায় বলল, “এবার তুইও নরকে যা!”

আর একটা কথাও খরচ করল না কেউ। চোখের পলক ফেলতে-না ফেলতেই আমার পেটের ভেতরে ঘ্যাঁচ করে ঢুকে গেল একটা বড়োসড়ো রক্তমাখা তরোয়াল। যে লোকটা তরোয়াল চালিয়েছিল সে ধারালো অস্ত্রটাকে পেটের মধ্যে থাকাকালীনই জোরদারভাবে একবার ডানদিকে ঘোরালো, আর একবার বাঁ-দিকে! এমনভাবে ঘুরিয়ে দিল যেন অস্ত্রসহ সমস্ত অঙ্গ টুকরো টুকরো হয়ে কেটে যায়। টের পেলাম, পেট থেকে কীসব যেন বেরিয়ে আসছে। গলগলিয়ে একটা উষ্ণ তরল ফিনকি দিয়ে ছুটেছে! এই প্রথম, যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলাম আমি।

আমার ঘাতক একটানে বের করে আনল অস্ত্রটা। আর বিন্দুমাত্রও সময় নষ্ট না করে এবার বুক লক্ষ্য করে চালাল। হাড়-পাঁজর, মাংস-পেশী ভেদ করে ঢুকে গেল ইস্পাতের শাণিত ফলা। এবার আর যন্ত্রণায় চেঁচানোর অবকাশও ছিল না। চোখের সামনে শুধু ‘অন্ধেরা’… মশালের তীব্র আলো, জ্বলন্ত দেহের আগুন, সব ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছেখএকটা নিরেট ঘুম পর্দার মতো নেমে আসছিল। সত্যি বলতে কী এ ব্যথা নিতান্তই সামান্য। হয়তো কয়েকমুহূর্তের জন্য। এর আগে যা ভোগ করেছি, সেই নারকীয় যন্ত্রণার চেয়ে অনেক ভালো। হ্যাঁ, মৃত্যুও অনেক ভালো এই পৈশাচিক মন্জরের চেয়ে। আসুক সে। যত দ্রুত সম্ভব আসুক। জীবন যে বিচ্ছেদ এনে দিয়েছে, মৃত্যু তা পালটে দিয়ে সবার সঙ্গে আমার মিলন করে দিক। জীবনে তো হল না। হয়তো মৃত্যুতেই সরতাজ আর দিদির শাদি হবে। আমরা নাচব, গাইব, আনন্দ করব। সেখানে কেউ আমাদের গদ্দার বলবে না। কেউ তরোয়াল নিয়ে, আগুন নিয়ে মারতে আসবে না। কেউ রক্তচক্ষু দেখিয়ে বলবে না, “এদের শেষ কর।”

আমি আস্তে আস্তে স্থির হয়ে যাচ্ছিলাম। যেন গভীর শীতল জলের মধ্যে ডুবে যাচ্ছি। শরীর থেকে উষ্ণতার শেষবিন্দুটুকুও বুঝি বেরিয়ে যাচ্ছে। এখন মৃত্যুর শীতল শান্তিময় স্পর্শ মেহসুস করছিলাম। সে আমাকে আস্তে আস্তে দোলাচ্ছিল আর ফিশফিশ করে বলছিল, “ঘুম যা!… ঘুম যা পুত্তর। অনেক দর্দ সয়েছিস। অনেক জিল্লতের মুখে পড়েছিস। এবার আমার কোলে আয়… মেরি বাহোঁ মে সোযা… সো যা বেটা… আর ব্যথা নেই… কান্না নেই… কিচ্ছু নেই…!”

কানে এল তার মিষ্টি সুরের গান, “টিম টিম করদে নিকে নিকে তারে, লগ্‌ দে সানু

বহোত পিয়ারে, জি করদা মৈ তোড়ি যাওয়া, অপনে ওয়াড়ি ভিচ্ বিছাওয়……” মৃত্যুর গলাটা অবিকল বেবের মতো! আমি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বড়ো শান্তিতে অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে কোনো শব্দ ছিল না। শোরগোল ছিল না। শুধু নক্ষত্রের ঝিকমিক দীপ জ্বলছে চারিদিকে। মনে হচ্ছিল রাতের আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছি। মহাকাশের কোলে ঢুকে নিশ্চিন্তে ঘুম দিচ্ছি। সেখানে কেউ আমায় আর খুঁজে পাবে না। নিজের দেহে কোনোরকম কষ্ট, কোনোরকম যন্ত্রণা আর টের পাইনি। বরং খুব হালকা মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছে, ‘পঞ্জি’র মতো উড়ে বেড়াতে পারি। কাপাস তুলোর মতো ভেসে বেড়াতে পারি। পাখির পালকও বুঝি আমার চেয়ে ভারি। নিজেকে এত হালকা আগে কখনও মনে হয়নি। এত আরামের ‘নিন্দ’ আমায় ঘিরে ছিল যে চোখ খুলতেও ইচ্ছে করছে না।

“গুল্লু… পুত্তর!”

কতক্ষণ, কতঘণ্টা এভাবেই ঘুমিয়েছিলাম খেয়াল নেই। আচমকাই বাপুর শান্ত কণ্ঠস্বর শুনে ‘নিন্দ’ ভেঙে গেল। চোখের ভারি পাতা অতিকষ্টে খুলে ঘোরের মধ্যে দেখলাম, বাপু, বেবে, সরবজিত, আমনপ্রীত, তাইজি, তাওজি—সবাই আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন! ওঁদের গা থেকে সোনালি আলো ঠিকরে পড়ছে। সেই আলোয় আমার চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল। হীরের মতো দ্যুতি ছড়াচ্ছে ওঁদের দেহ। বেবের মুখখানা কী পবিত্র! যেন কোনো দেবী এসে দাঁড়িয়েছে আমার সামনে। আমি বেবের দিকে তাকাই, “তুই যাওয়ার আগে আমার দিকে একবারও ফিরে তাকালি না মা? আমি কী দোষ করেছি?”

বেবের চোখ বেয়ে মোতির মতো দানা দানা অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ে, “বেটা, একমাত্র মায়েরাই জানে যে কখন তারা সন্তানের চোখে চোখ রাখার কাবিল থাকে না। দোষ তোর নয়। দোষ আমার নসিবের। আমি কোন্ লজ্জায় এ পোড়া মুখ তোকে দেখাতাম!”

ওরা সবাই এত ঝলমল করছে যে আমার চোখে ধাঁধা লাগছিল। সবাই ভীষণ সফেদ। বড়ো উজ্জ্বল। বুঝতে পারলাম, সবাই আমাকে নিতে এসেছে। ওদের গা থেকে মোগ্রার সুবাস আসছিল। সহস্র তারার কুঁচি বোধহয় সাদা পোষাকে লেগে ‘জগমগাচ্ছে’। বেবে আর বাপুর মাথার পেছন থেকে চাঁদ উঁকি মারছে। এত বড়ো রুপোলি ‘চন্দা’ আমি জীবনে কখনও দেখিনি। ক্ষীণ স্বরে বললাম, “যস্যিদিদি কই? আমি কি মরে গেছি? তোমরা আমায় নিতে এসেছ?”

“যস্যি এখনও আসেনি।” বাপুর মুখ বিষণ্ণ, “তবে চলে আসবে। কিন্তু তোর এখনও আসার সময় হয়নি বাবা। তোকে এখনও অনেকখানি লড়তে হবে। তাই আমরা সবাই সাহস জোগাতে এসেছি। হিম্মত সে কাম লে অব্।” “তবে কি আমি মরিনি বাপু?”

তিনি মাথা নাড়লেন, “না পুত্তর। তোর খুশনসিবি বল্ কী বদ্‌সিবি, তুই এখনও বেঁচে আছিস। আমরা বাঁচিনি। যস্যিও বাঁচবে না। লেকিন তুই বাঁচবি। তোর সাঁস এখনও চলছে। দুশমনরা চলে গেছে।”

“ওরা আমায় পোড়ায়নি?”

আমি হতবাক। ওরা তো কখনও এমন ভুল করে না। তরোয়াল দিয়ে কেটেই তো জ্বালিয়ে দিচ্ছিল! আমাকে ভুলে গেল কী করে?

“মাচিসের পর এবার ওদের তেলও খতম হয়ে গিয়েছিল।” তিনি সস্নেহ হাসলেন, “তাই আর কাউকে জ্বালায়নি। শুধু কেটেই শেষ করেছে। আর তোর যা অবস্থা হয়েছে গুল্লু, তাতে ওরা ভাবতেও পারেনি যে তুই বেঁচে আছিস। কিন্তু তোকে আরও কিছুদিন বাঁচতে হবে যে।”

“তোমাদের সঙ্গে আর দেখা হবে না আমার?”

“হবে।” বাপুর চোখদুটো ভীষণ শান্ত, “যখন সময় হবে তখন আমরা সবাই মিলে আবার আসব তোকে নিতে। লেকিন এখনও সময় হয়নি বাপ। তাই শুধু দেখা দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের দেখতে না পাস্, সঙ্গে সঙ্গেই থাকব। মিথ্যে লাশের ভিড়ে খুঁজতে যাস না। এখন একলাই বাঁচ।”

আমি কেঁদে ফেললাম, “এ কেমন কথা বাপু। আমি তোমাদের কাউকে ছাড়া বাঁচব কী করে? এই চোখদুটো যা যা দেখেছে, তারপর বেঁচে থেকে কী করব? এই জীবন এখন সাজা। সবকিছু যে আমার শেষ হয়ে গেছে। ঘর নেই, আপনজন নেই, পড়োসি নেই, গোটা দেশটাই নেই। বিশ্বাস নেই, বাঁচার কারণ নেই…!”

“বাঁচার জন্য যখন কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন এমন কোনো ‘ঠোস্ ওয়াজাহ’ খুঁজে নিতে হয় যার জন্য অন্তত তুই মরতে পারিস।” বাবার মুখে সেই প্রশান্ত হাসিটা লেগে আছে, “আর কিছু না থাক হিম্মত তো আছে। তোকে উঠে দাঁড়াতেই হবে গুল্লু। রবৃক্তি যখন জিন্দা রেখেছেন, তখন নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। কোনো মনজিল্‌ তোর জন্য নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে। আর ঘুমিয়ে থাকিস্ না। ওঠ গুরু। জা-গ!” “লেকিন্…।”

“কোই লেকিন নেহি।” তিনি দৃঢ় স্বরে বললেন, “এই জঙ্গটা তোর। মনে রাখিস, যন্ত্রণাকে মাত না দিতে পারলে তুই বাজি জিতবি না। তোকে ‘দর্দ’ জিনিসটাকেই ভুলে যেতে হবে। তুই সাচ্চা শিখের ঔলাদ। হেরে যেতে শিখিসনি। উঠে দাঁড়া গুল্লু। ও-ঠ! ড-ট্-কে স-র্দা-রা!”

বাপুর মুখে এই লজটা যে কতবার শুনেছি। এবার যেন প্রচণ্ড জোরে ওঁর কণ্ঠস্বর অনুরণিত হতে হতে আমার কানে এল। এত জোরে এল যে আমি ধড়মড় করে উঠে বসি। কোথায় বাপু, কোথায় বেবে, কোথায় কী! এক লহমায় সমস্ত ঘোর, মৃত্যুর নেশা কেটে গিয়েছে। আবার সেই পোড়া কেরোসিনের গন্ধ, রক্তের বদবু সবকিছু ফিরে এসে ধাক্কা মারল আমাকে। তার সঙ্গে সঙ্গেই জাগ্রত হল ভয়াবহ যন্ত্রণা! পেট, বুক থেকে এখনও রক্ত ঝরে চলেছে। কী ভয়ংকর ‘দর্দ।’ বুঝলাম, বাপু ঠিকই বলেছে। জান আছে বলেই যন্ত্রণাও আছে। মওত জিন্দগির থেকে অনেক বেশি দয়ালু। সমস্ত কষ্ট মুছে দেয়। কিন্তু জীবন প্রতি পদে পদে ব্যথা দেয়, বুঝিয়ে দেয়, তুমি জিন্দা আছ!

আমার চতুর্দিকে তখন শুধু লাশের পাহাড়। কিন্তু কে যে কোনটা তা চেনার উপায় নেই। কোথায় বেবে, কোথায় বাপু, কোথায়ই বা সরবজিত বা আমনপ্রীত কে জানে! শুধু কতগুলো কাটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ভিড়ের মধ্যে আমি শুয়েছিলাম। দাঙ্গাইরা তখন আশেপাশে নেই। অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে ওদের হালকা গুজগুজ ফুসফুস কানে এসেছিল ঠিকই। ওরা আমাকেও জ্বালাতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের হতাশ কণ্ঠস্বরও শুনেছিলাম, “তেল খতম হো গয়া রে!”

অন্য একজন একটু চুপ করে থেকে বলল, “চল্, ছোড় দে। হাল দেখেছিস? পেটের নাড়িভুঁড়ি সব বের হয়ে গেছে। বুকও ফুটো। মর গয়া ইয়ে। আর মাত্র কয়েকটাই বাল-বাচ্চা বাকি আছে। সেগুলোর ঘাড় থেকে গলা নামিয়ে দে। একবারেই মরুক। তাড়াতাড়ি কর। হাতে আর বেশি সময় নেই।”

কে যেন একটা হাসল, “হ্যাঁ। ওদিকে তো শুনলাম কয়েকজন রূপসী নাকি সুহাগরাতের অপেক্ষায় আছে। তাড়াতাড়ি না গেলে সুযোগ পাওয়া যাবে না। সেইজন্যই এত তাড়া ভায়ার।”

“নেহি রে।” আগের গলাটাই আবার বলে, “সুহাগরাত তো হয়ে যাবে। কিন্তু তিন তারিখ যে পড়ে গেছে সে খেয়াল আছে? আর একপ্রহর পরেই ভোর হবে। আজই তো শুনেছি আর্মি নামবে। তারপর কী করবি? ঘন্টা? জলদি জলদি কাম নিপ্‌টা।” তারপর আর কিছু কানে আসেনি। বেহোঁশ হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু ওরা আমাকে মৃত ভেবে ওই লাশের স্তূপের মধ্যেই ফেলে গিয়েছিল। যখন হুঁশ এল, বুঝলাম বেঁচে আছি, তখন দেখি অন্ধকার বেশ কিছুটা ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে। আলো ফোটেনি তখনও আকাশে হাল্কা হাল্কা মেঘ। পূবদিক এখনও আঁধার। তবে বুঝতে বাকি রইল না যে খুব শীগগিরিই ভোর হবে। হয়তো সেজন্যই তাড়াহুড়োয় চলে গিয়েছে ওরা। আই.পি.এস. দত্তা আর তার দলবলও নেই। ভালো করে ‘মোয়ায়না’ করেনি যে সবগুলোই লাশ ছিল, না তার মধ্যে একটা ছোট্ট দেহে তখনও ধুকপুক করছিল প্রাণের স্পন্দন।

আমি একবার ঘাড় ঘুরিয়ে ব্যর্থ ‘তালাশে’ চারদিকটা দেখে নিলাম। চতুর্পাশে কারোর হাত, কারোর “টাঙ্গ’, কারোর শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পড়ে আছে। একটা আস্ত মৃতদেহও ছিল না ওখানে। একটা পূর্ণাঙ্গ লাশও চোখে পড়েনি যাকে আলাদা করে চেনা যায়! যেগুলো আস্ত ছিল সেগুলো আপাদমস্তক পোড়া। বীভৎস তাদের রূপ। জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া কয়েকটা হাড় গোড় ছাড়া কিচ্ছু নেই। বাপু ঠিকই বলেছিলেন। এর মধ্যে কাউকে চেনা সম্ভবই নয়। খুঁজে মরাই বৃথা!

আমার পিঠের নীচটা চটচটে আর পিছল! কোথাও এমন একটু জায়গা ছিল না যেখানটা শুকনো! তেল, রক্তে গোটা কলোনির মাটি পিচ্ছিল হয়ে আছে। আমি সন্তর্পণে উঠে বসার চেষ্টা করতে গিয়েই বেশ কয়েকবার পড়ে গেলাম। বুঝতে পারছিলাম না কী করে এখান থেকে বেরোব। হাতে ভর দিয়ে উঠতে গেলেই স্লিপ করছে। আবার দড়াম করে আছড়ে পড়ছি! পেটের ভেতর থেকে কেটে যাওয়া নাড়িভুঁড়ি থেকে রক্ত পড়ছে। সেগুলো অবাধ্য হয়ে ক্রমাগতই বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তবু হাত দিয়ে সেগুলোকে ভেতরে ভরে পেট চেপে ধরে ওঠার ‘কোশিশ’ করছি। অথচ কিছুতেই ‘কাময়াব’ হচ্ছি না! ব্যথায়, কষ্টে, মরণযন্ত্রণায় ভুল করেই একবার কঁকিয়ে উঠলাম, “উঃ!”

“গুমনাম হ্যায় কোই… বদনাম হ্যায় কোই… কিকো খবর, কৌন হ্যায় উয়োহ… অনজান্ হ্যায় কোই…!”

কানের কাছে আবার সেই তীব্র শিস্। হৃৎপিণ্ডটা এত জোরে লাফিয়ে উঠল যে মনে হল গলা দিয়েই বুঝি বেরিয়ে যাবে। সেই সঙ্গে খটখট করে শক্ত বুটজুতোর শব্দ। এ আওয়াজ আমার অত্যন্ত চেনা। এই জুতো পুলিশের। আর যে শিসটা বাজছে সেটা আগেও শুনেছি। নিঃসন্দেহে এই সেই উর্দিওয়ালাই। কিন্তু ওরা আবার ফিরে এল কেন?

“কে রে? আওয়াজ কে করল?”

শিসের শব্দ থেমে যায়। শুনলাম একটা চাপা স্বর বলছে, “এখান থেকেই কে যেন শব্দ করল না? কোই অভি ভি জিন্দা হ্যায় ক্যায়া?”

এবার বুঝতে পারলাম কী ভুলটাই না করেছি। ভেবেছিলাম, ওরা বুঝি একেবারেই চলে গিয়েছে। কিন্তু জানা ছিল না রাতের শেষ প্রহরে কয়েকজন ফের ফিরে এসেছে। তদন্ত করতে এসেছে যে সবাই মরে গিয়েছে কিনা। যদি কোনোভাবে বুঝতে পারে যে একজনও বেঁচে আছে, তবে তৎক্ষণাৎ শেষ করে দেওয়ার ‘মনসা’ নিয়েই এসেছে ওরা। হয়তো এখন ওদের সঙ্গে পর্যাপ্ত তেল আর দেশলাইও আছে। একটা মানুষকেও বেঁচে থাকতে দেবে না। নিস্তব্ধ মঙ্গলপুরীর এই ব্লকে কোনোরকম প্রাণের সাড়া না পেলে হয়তো চলে যেত। অথচ আমি বোকার মতো কাতর শব্দ করে ওদের এদিকেই ডেকে এনেছি।

ওই আট বছরের বাচ্চা ছেলে বুঝতে পেরেছিল যে কিছুতেই ওদের আভাস দেওয়া চলবে না যে সে বেঁচে আছে। সঙ্গে সঙ্গেই টানটান হয়ে ওই চটচটে রক্ত মাখা, লাল টকটকে ভেজা মাটিতেই চোখ বুজে শুয়ে পড়লাম। বুকের ভেতরে যেন ঢোল-নাগাড়া একসঙ্গে বাজছে। নাকে রক্তের আঁশটে গন্ধ! তবু নিজেকে একদম স্থির রেখে দম বন্ধ করে পড়ে রইলাম লাশের মতো। শিকারীরা যেন বুঝতে না পারে যে শিকার এখনও মরেনি। কিছুতেই ওদের বুঝতে দেওয়া যাবে না! মনে মনে নিজেকেই বললাম, “গুল্লু, তুমি এখন মৃত… তুমি একটা লাশ…!”

চোখ বন্ধ থাকার দরুণ কিছুই দেখতে পাইনি। কিন্তু সেই পুলিশি বুটের খটখট্ আর আরও কয়েকটা পায়ের আওয়াজ একেবারে আমার কাছেই এসে থামল। বুকের ভেতরের নাগাড়া এখন আরও তীব্র! ভয় লাগছে যে আমার হৃৎপিণ্ডের আওয়াজ না শুনে ফেলে। দাঁতে দাঁত চেপে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ করে একগাদা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন দেহাংশের মধ্যে অবিকল একটা লাশের মতোই পড়ে রয়েছি। তবু মনে হচ্ছে, ওরা ঠিক ধরে ফেলবে।

“আওয়াজ তো ইধর সে হি আয়া।” এবারের কন্ঠস্বর একটু ভারি, “পর কিয়া কিনে? সব তো পুড়ে-ধুড়ে ঝামা হয়ে আছে। স্রেফ হাড়ই সার। জিন্দা থাকা নামুমকিন। হাড় কিংবা লাশের টুকরো আওয়াজও করে না। তবে কে শব্দটা করল?”

আমি দমবন্ধ করে উৎকর্ণ হয়ে শুনছি। জুতোর আওয়াজ আমার চতুর্দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার সঙ্গে একটা তীব্র আলোর আভাসও পাচ্ছিলাম। টর্চের আলো। ওরা টর্চ জ্বেলে দেখছে যে কোনো দেহ একটুও নড়াচড়া করছে কিনা। লাশের ভিড়ে কোনো জীবন্ত মানুষ লুকিয়ে আছে, না নেই। জুতো দিয়ে খোঁচা, লাথি মেরে প্রত্যেকটা শবদেহ সরিয়ে সরিয়ে দেখছিল যে প্রাণের সাড়াটা এল কোথা থেকে! মৃত মানুষ কখনো ‘উঃ’ বলে না। তবে বলল-টা কে!

কিছুক্ষণ বাদেই চড়া আলোটা আমার মুখ ছুঁয়ে যায়। বুঝতে পারলাম, কাটা ছেঁড়া শবের মধ্যে একটা আস্ত মানুষের দেহকে আবিষ্কার করে ফেলেছে। নিঃসীম আতঙ্কে সারা শরীরের রক্ত হিম! এবার বুঝি রে রে করে তেড়ে এল। খটাস্ খটাস্ শক্ত বুটের শব্দ ঠিক আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। সঙ্গে অন্য পদধ্বনিও। দম নিতে না পেরে বুক ফাটছিল। তবু একটুও নড়লাম না। একটা বিরাট ভুল অজান্তেই করে ফেলেছি। এখন যদি ভুলক্রমে একটুও নড়ি তবে যেটুকু শ্বাস আর আশ বাকি আছে, সেটুকুও যাবে।

“ইয়ে দেখো!” ভারি স্বর বলে উঠল, “এই পাবলিক এখনও এক পিসে আছে। এটাই কাতরাচ্ছিল না তো? মানুষের টুকরো আওয়াজ করে না, কিন্তু আস্ত মানুষ তো করতে পারে।”

ভেতর থেকে আতঙ্কে কে যেন ‘রি রি’ করে উঠল। কিন্তু বাইরে নৈঃশব্দ কায়েম। কোনো ‘হলচল’নেই। ওই অবস্থায় কী করে যে স্থির হয়ে পড়েছিলাম তা শুধু আমার অন্তর্যামীই জানলেন।

“এক পিসে কোথায় আছে?” এবার আর একজন হালকা প্রতিবাদ করে উঠল, “পেটের অবস্থা দেখেছিস? আতেঁ নিকল গয়ি হ্যায় ইসকি তো! কট ভি গয়ি। রক্তে ভিজে আছে। বুকেও বিরাট ঘা। এইটুকু বাচ্চা এরপরও জিন্দা থাকতে পারে? উহুঁ, বেঁচে থাকা নামুমকিন। ওর মুখের দিকে তাকা। পুরো ফ্যাকাশে। অনেকক্ষণ হল প্রাণ বেরিয়ে গেছে।”

ওই শত্রুবাহিনীর ঘেরাটোপের মধ্যে এই একটা লোককেই ওই মুহূর্তে পরম বন্ধু বলে মনে হয়েছিল! ওই একটা লোকই আমায় নিঃসন্দেহে মৃত ঘোষিত করেছিল। এককথায় ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছিল। আমি জানতাম ও বিরাট ভুল করছে। কিন্তু তখন ওই ভুলটাই মনে প্রাণে চাইছিলাম।

“ডাগদরসাব!”

পাশ থেকে এবার যে ব্যঙ্গতীক্ষ্ণ আওয়াজটা এল এটা আমার পরিচিত। ইনিই সেই উর্দিওয়ালা যিনি শিস্ দিচ্ছিলেন। একটু ব্যঙ্গ মিশিয়ে বলল সে, “আপনি নাড়ি দেখতে পারেন? না স্রেফ মুখ দেখেই বলে দিতে পারেন যে কৌন জিন্দা হ্যায় ঔর কৌন মর গয়া? আওয়াজটা কিন্তু আমিও শুনেছি।”

‘ডাগদরসাব’ উপাধি পাওয়া ব্যক্তি এবার রেগে গিয়েছে, “তোমার কী মনে হয়? নাড়ি দেখতে পারলে কি গুন্ডা হয়ে ঘুরতাম? লেকিন তজুরবা নাম কি ভি কোই চিজ হ্যায়। এ জীবনে খুন কম করিনি। তাই লাশও বহুত দেখেছি। এ বাচ্চাটা জিন্দা নয়, লাশই।”

“দেখ লেতে হ্যায়…।”

আমার নাকের সামনে দুটো আঙুলের অস্তিত্ব টের পাচ্ছিলাম। নিঃশ্বাস পড়ছে কিনা সেটা কেউ ‘জাঁচ’ করে দেখছে। ফুসফুস দুটো তখন প্রায় ফাটতে বসেছিল। এ কী বিষম যন্ত্রণা। লোকটা তো নাকের সামনে থেকে হাতও সরানোর নাম করছে না। সেই কতক্ষণ থেকে দম বন্ধ করে আছি। এরকম চলতে থাকলে তো এই ‘ঘুটনে’-ই শেষ হয়ে যাব।

“সাঁস চলছে না।” সেই ব্যক্তি বলল, “দাঁড়া, আরও একটু দেখে নিই।”

এরপর আরও কিছুক্ষণ ওরা আমার গলা আর ঘাড়ের মাঝখানের শিরা, হাতের ‘নস্’ পরীক্ষা করে দেখল। ততক্ষণে এত রক্ত বেরিয়ে গিয়েছে যে বোধহয় কোনোরকম স্পন্দনই পাচ্ছিল না ওরা। বেশ কিছুক্ষণ পর হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, “কুছ ভি তো মালুম নেহি পড় রহা”

“অভি মালুম পড়েগা। দেখ।”

সিপাহীর গলা ভেসে এল। সঙ্গে সঙ্গেই আমার এলিয়ে পড়া ডানহাতের ওপর দুটো শক্ত বুটের বীভৎস চাপ! জুতোর তলায় আমার হাতটাকে নির্মমভাবে পিষছে। তাতেও ক্ষান্ত হল না। একজোড়া শক্তিশালী ভারি পা, আর নিষ্ঠুর বুট এবার ওই শিশুর নরম কচি হাতের ওপর ধুপধাপ লাফাতে শুরু করল। তার দেখাদেখি আরও কয়েকটা পা ওইটুকু হাতের ওপর উঠে এসেছে। কতগুলো পূর্ণবয়স্ক ষাঁড়ের মতো চেহারার ভারি মানুষ একটা ছোট্ট নরম অঙ্গের ওপরে ধপাধপ করে প্রায় তাণ্ডব করতে শুরু করল। আমি এবার সত্যিই নিদারুণ কষ্টে চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিলাম। এ কী ধ্বংসাত্মক অত্যাচার। সে বেদনা বর্ণনা করা সম্ভব নয়। নিজের কানেই নিজের হাড়ের মড়মড় শুনতে পাচ্ছি। বুঝতে পারছি হাড় গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। ওঃ মা গো …. আমার হাত… আমার হাত…।

কিন্তু আট বছরের শৈশব চেঁচিয়ে উঠতে চাইলেও তার এক ধাক্কায় বেড়ে যাওয়া বয়েস, মনের অন্দরের অকালবার্ধক্য বুঝতে পেরেছিল যে ‘চুঁ’ শব্দ করলেই সব শেষ। এমনকি এই বিষব্যথায় চোখ থেকে জলও গড়িয়ে পড়া চলবে না। সে বুঝি কানের কাছে ফিশফিশ করে বলল, “ক্কাকে … চুপ….একদম চুপ! এ ‘পীড়া’, এ ‘তক্‌লিফ’ কিছু নয়। কিন্তু এখন যদি চেঁচিয়ে উঠিস, চোখ দিয়ে একফোঁটাও জল গড়িয়ে পড়ে, তবে প্রাণে বাঁচবি না। বাপু কী বলেছে মনে কর। তুই শিখের বাচ্চা। যন্ত্রণাকে জয় না করতে পারলে বাঁচা যায় না। তোর পেট কেটে দু-ফাঁক হয়ে গেছে। বুকের নস্ কেটে গিয়ে রক্ত পড়ছে। তারপরও তুই বেঁচে আছিস। হাতটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেলেও খুব বেশি কিছু ক্ষতি হবে না। যে জ্বালা তুই ‘পল্ পল্’ সয়েছিস্, তার কাছে এ নিতান্তই সামান্য। চুপ করে থাক ক্কাকে। সহ্য করে যা। চোখকে শুকিয়ে খাঁ খাঁ মরুভূমি কর। আঁখে নম্ ভি না হো। সব ঠিক হয়ে যাবে…”

যন্ত্রণা কীভাবে সহ্য করতে হয় সেদিন সেই শিশু শিখে গিয়েছিল। তার ডান হাতের হাড়কে দুরুমুশ করার পরেও ওরা সন্তুষ্ট হল না। তার কানে একটা পেন ঢুকিয়ে সেটাকে এক জোরালো লাথি মেরে ফট করে প্রায় মস্তিষ্কেই ঢুকিয়ে দিয়েছিল। কানের পর্দা ফেটে গলগলিয়ে রক্ত বেরিয়েছিল। তবে পেনটা মস্তিষ্কে আঘাত করতে পারেনি। সেই শিশু নীরবে, চোখ বুজে সব ‘সহন্’ করে গিয়েছে। একটা শব্দও করেনি। তার মৃত্যুকঠিন মুখে একটা যন্ত্রণার রেখাও পড়েনি।

“নেহি রে। ইয়ে মর হি গয়া।” খাঁকি বলল, “নেহি তো জরুর চিখতা, চিল্লাতা। এইটুকু বাচ্চা এত বড়ো অভিনেতা নয় যে এত কিছু সহ্য করেও মরার অ্যাকটিং করবে। আমরাই বোধহয় ভুল শুনেছি। শায়দ কান বজ রহা থা…!”

বলতে বলতেই তার বুট খটখট করে ওঠে। টর্চের আলোও মুখের ওপর থেকে সরল। পায়ের আওয়াজগুলো এবার দূরে চলে যাচ্ছে। আরও একবার শোনা গেল সেই বিভীষিকাময় সুর,

“গুমনাম হ্যায় কোই… বদনাম হ্যায় কোই…।”

ওরা ভুল বুঝেছিল। শুধু যন্ত্রণা সহ্য করা বা অ্যাকটিংই নয়, সেদিন সেই শিশু অনেক কিছু শিখে গিয়েছিল। আর সে শিক্ষা ওরা নিজেরাই হাতে ধরে দিয়েছিল আমায়। সে ওই একদিনেই শঠতা, ক্রুরতা, নৃশংসতা—সব শিখেছিল। কীভাবে প্রয়োজনে দানব হতে হয় তাও তার জানা হয়ে গিয়েছিল। নিষ্পাপ মনের অন্দরে একটা পাপী মানুষ ঢুকে বসেছিল সেদিনই। কতগুলো রাক্ষসই আমায় রাক্ষস হওয়ার পথ বাতলে দিয়েছিল। সে ব্যথাকে হারাতে শিখেছিল, অনুভূতিহীন হতে শিখেছিল, চোখের জল না ফেলতেও শিখে গিয়েছিল। সেদিনের পর আর কোনোদিন অতি বড়ো দুঃখেও গুলশন সিং কাঁদেনি।

তার সঙ্গে দায়ে পড়ে শিখেছিল বাঁ হাতের ব্যবহারও। লোকগুলো চলে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে অবশেষে যখন সে ফের উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন টের পেল যে ডান হাতটা আর কোনো কাজের নয়। একটু নড়লেই ব্যথায় প্রাণ যাচ্ছে। অথচ আঙুলগুলো মুঠো করার সাধ্যও তার নেই। স্রেফ একতাল মাংস হয়ে লগবগ করছে ওই হাত। তবু হিম্মত হারেনি। পেট থেকে ‘আঁত’ আবার বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে অনেক কষ্টে বাঁ হাত দিয়ে সব মালপত্র ফের ঠেলে চেপে ধরে পেটের ভেতরে পাঠাল। রক্তবন্ধ করার জন্য অতিকষ্টে নিজের কুর্তাটাকে ওই একহাত দিয়েই পেটে বেঁধে সে কোনোমতে দৌড়োল। ওই গলিতে একটা পা ঠিকমতো রাখারও জায়গা ছিল না। গোটা পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কারোর মাথা, কারোর কবন্ধ, কারোর কাটা অঙ্গ! রক্তে এতই পেছল যে বারবার আছাড় খাচ্ছিল বাচ্চাটা। কিন্তু সে জানত যে করে হোক, এখান থেকে তাকে দিনের আলো ফোটার আগেই বেরোতেই হবে। তাই ‘গিরতে-পড়তে’, লহঁলুহান হয়ে, পায়ের তলায় লাশ মাড়াতে মাড়াতেই শিশুটি ছুটল গৌরী বিশ্বাসের বাড়ির দিকে। সে জানত, এখন গৌরীদিদিই একমাত্র তাকে বাঁচাতে পারে। দাঙ্গাইরা এদিকের কাজ ‘খতম’ করে অন্যদিকে চলে গিয়েছিল। তাদের কাছে খবর ছিল যে তিন তারিখই আর্মি নামবে। তাই লাশ পাহারা দেওয়ার সময় নেই। গৌরীদিদিদের কলোনি পুরোটাই হিন্দুদের। তাই দাঙ্গাইরা ওদিকে ছিল না। যদি থাকত, তবে সেই শিশু আজ ডায়েরি লেখার জন্য বেঁচে থাকত না।

তবু আমি প্রাণ হাতে নিয়ে এস ব্লকের দিকেই দৌড়চ্ছিলাম। প্রতি পদে বিপদ ছিল। রাস্তায় শয়তানগুলো ধরে ফেলতে পারত। এবার ধড় থেকে মাথাও নামিয়ে দিতে পারত। কিন্তু ওয়াহেগুরু আমার সাথ দিলেন। কোনোমতে বিনা বাধায় গৌরীদিদির বাড়ি পৌঁছে গেলাম। অত রাতে দরজা খুলে উনি তো অবাক। আমাদের তিনজন ভাইকেই জন্ম থেকেই দেখেছেন, তাই ভালোভাবেই চিনতেন। আমার অবস্থা দেখে ওঁর মুখ শুকিয়ে গেল। মনে মনে সবই বুঝে গেলেন। বুঝলেন, আমার এ পৃথিবীতে এখন আর কেউ নেই! তখনই আমাকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া দরকার ছিল। অথচ তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা খুব খারাপ। তিনি জানতেন, কোনো হসপিটাল শিখদের চিকিৎসা করবে না।

“গুল্লু, বেটা…।” গৌরীদিদি কান্নাভেজা গলায় বললেন, “তোর ওয়াহেগুরুকে বলিস, যেন আমার অপরাধ ক্ষমা করে দেয়। জানি, অনেক বড়ো পাপকাজ করতে যাচ্ছি। কিন্তু এছাড়া আর উপায় নেই। আমি মজবুর।”

তিনি আর একটুও সময় নষ্ট না করে আমার পাগড়ি খুলে ফেলেছিলেন। আমি ক্রমশই নিস্তেজ হয়ে পড়ছিলাম। তার মধ্যেই টের পেলাম, গৌরীদিদি কাঁচি দিয়ে ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে আমার লম্বা চুল কেটে ছোট করে দিচ্ছেন। হাত থেকে টান মেরে কড়াটাও খুলে নিলেন। এইটুকুই টের পেয়েছিলাম। তারপর আবার সব অন্ধকার…

আজও গৌরীদিদির প্রতি কৃতজ্ঞতায় আমার মাথা হেঁট হয়ে আসে। আজ তিনি আর ইহলোকে নেই। কিন্তু নিশ্চয়ই দেবদূতী হয়ে ‘সিতারা’ হয়েছেন। গৌরী বিশ্বাস না থাকলে আমি বেঁচে থাকতাম না। উনিই এক এক করে আমার দেহের সমস্ত শিখ হওয়ার চিহ্ন মুছে দিয়েছিলেন। আমার অচেতন, রক্তাক্ত দেহটাকে নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন হাসপাতালে। গুরু নানক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন যে আমি তাঁর বোনপো। অন্য কলোনির শিখদের বাচ্চাদের সঙ্গে খেলা করার সময়ে দাঙ্গাইরা ভুল করে আমার ওপরও আক্রমণ চালিয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবার কোনো আপত্তিই করেনি। হিন্দু শিশুকে বাঁচানোর জন্য সঙ্গে সঙ্গেই তৎপর হয়েছিল। তারা একটার পর একটা অপারেশন করে আমার ছেঁড়াখোঁড়া নাড়িভুঁড়ি, জখম বুক ঠিক করে দিয়েছিল। ফাটা কানের পর্দার পরিচর্যা হল। ভাঙা হাতে রডও বসল। কিন্তু বহুবছর ওই হাতটা অকেজো হয়ে পড়েছিল। ডান হাতে কোনো কাজ করতে পারছি না দেখে গৌরীদিদিই শিখিয়েছিলেন, বাঁ হাতের সমান ব্যবহার কীভাবে করতে হয়। ওই মানুষটির জন্যই আমার নতুন জীবন শুরু হল। সম্পূর্ণ নতুন পরিচয়ে, নতুনভাবে এবং কিছু নতুন মানুষদের সঙ্গে। আমার শিখ পরিচয় লুপ্ত হল। আর কোনোদিন চুল রাখিনি, কড়া পরিনি, পাগড়িও পরিনি।

তিন তারিখ ‘দোপহরে’ সত্যি সত্যিই আর্মি নেমেছিল। ওইদিন রাজঘাটে ইন্দিরা গান্ধীর পার্থিব দেহের অস্তিম সংস্কারও করলেন রাজীব গান্ধী। কিন্তু ততক্ষণে দাঙ্গাইরা যেন বেবাক ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে। একজন দাঙ্গাইকেও আর পাওয়া যায়নি। যেমন হঠাৎ করে তারা এসেছিল, তেমনই হঠাৎ করে মিলিয়ে গেল। যেন একত্রিশ তারিখে কেউ একটা সুইচ অন করে দিয়েছিল। তিন তারিখে সেটা আবার টুক করে অফও হয়ে গেল। এতে অবশ্য একটুও আশ্চর্য হইনি। আমি জানতাম যে ওদের কাছে আগে থেকেই খবর ছিল যে তিন তারিখেই আর্মি নামবে। দিল্লির মাটি থেকে শিখদের সাফায়া করার জন্য বাহাত্তর ঘণ্টাই বরাদ্দ করেছিল কোনো অদৃশ্য শক্তি। গোটাটাই প্রি-প্ল্যানড্। আসলে ওটা দাঙ্গা ছিলই না, একতরফা ষড়যন্ত্র বলা যেতে পারে। আর তিন তারিখে যতক্ষণে আর্মি নামল, ততক্ষণে দিল্লিতে বোধহয় কোনো শিখ পুরুষই বেঁচে নেই। তার সঙ্গে কৌরদের লাশ উপরি পাওনা।

যসমিত দিদিও তাদের মধ্যে একজন। তার নাঙ্গা লাশও পাওয়া গিয়েছিল রাজপথের ওপরে। গৌরীদিদিও খবরের কাগজে ওর ক্ষতবিক্ষত দেহের ছবি দেখে চিনতে পারেননি। কিন্তু আমি পেরেছিলাম। জেনেছিলাম, দিদিকে একশোরও বেশি লোক বারবার লাগাতার ধর্ষণ করেছিল। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণেই তার মৃত্যু হয়। শুধু তাই নয়, মৃত্যুর পরও তার লাশটাকে আততায়ীরা বহুবার জন্তুর মতো বলাৎকার করে গিয়েছিল। আমার যসমিত দিদি। ফুলের মতো কোমল… নরম…. শান্ত…।

আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে গেল। আমার ডানহাতটাও সেরে গেল। নতুন পরিবারের সঙ্গেও মানিয়ে নিলাম। তবু মনের মধ্যে তখনই বার্নিং শিখের বিষাক্ত বীজ পোঁতা হয়ে গিয়েছিল। বাপুর মুখে শুনতাম, শক, হুণ, পাঠান, মোগল, আফগান, ইংরেজ এমনকি ফিলহালের পাকিস্তান, চীনও শিখদের আন-বান-শানকে ধ্বংস করতে পারেনি। কিন্তু আমি নিজে বুঝেছিলাম বৈদেশিক শক্তি যা পারেনি, তা আমাদের আপনজনেরাই করে দেখাল। দুশমনদের দিয়ে যা হয়নি, খোদ ভারতবাসীদের দিয়েই হল। দিল্লি শিখদের রক্তে ভাসল। তারপরও নেতারা অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, “যথেষ্ট মাত্রায় শিখদের মারতে পারিনি আমরা।”

“হামেঁ তো অপনোঁ নে লুটা, গ্যায়রোঁ মে কহাঁ দম থা

হমারি কশতি উস জগাহ্ ডুবি, জহাঁ পানি কম থা…।”

আমার ওই আট বছরের জীবন আগাগোড়া মিথ্যায় ভরা ছিল। পোড়া কেরোসিন তেলের মিষ্টি গন্ধে নেশা হত, আজ বমি আসে। আগে পুলিশেরা আমার নায়ক ছিল, এখন তাদের ঘৃণা করি। ওই উর্দি দেখলেই ‘নফরত’ হয়ে যায়। তখন এই দেশটার আইনের ওপর অগাধ বিশ্বাস ছিল, আজ নেই। তখন আমি ‘মাসুম’ গুরু ছিলাম, আজ জ্বলতে জ্বলতে বার্নিং শিখ হয়ে দাঁড়িয়েছি। যে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনকে লোকে আজ ‘রাক্ষস’, ‘দরিন্দা’ বলছে, তাকে এই দেশ, এই কানুন, এই সিস্টেমই সযত্নে বানিয়েছে। যা অর্জন করেছি, তাই তো ফেরত দেব

এখন আমার যুদ্ধের ‘আখরি ঘণ্টা।’ অস্ত্র কম পড়ছে। উলটোদিক থেকে ক্রমাগতই বাধা। বেশ কয়েকবার নিজেও ব্যর্থ হয়েছি। তবে ওরাও আমাকে ধরতে পারেনি। এখনও আমার চোখের সামনে সেই লোকটা আর তার পরিবার জিন্দা আছে। আই.পি.এস. ভূপেন্দ্র দত্তা। আজও ওকে দেখলে আমার রক্ত গরম হয়ে ওঠে। তবু –ডকে সর্দারা। বার্নিং শিখের ‘কহর’ কলকাতা এবার সূর্যাস্তের পর দেখবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *