(৩৫)
“মিস্ মুখার্জিকে অস্কার দেওয়া উচিত স্যার। উনি যে শেষে অমন মারাত্মক অ্যাকটিং করবেন তা বুঝতেই পারিনি। ওঁকে দেখলে কেউ বলবে যে এত দুঃসাহস ওঁর মধ্যে আছে!”
ধবধবে সাদা প্লেটে ধোঁয়া ওঠা গরম সুগন্ধী বিরিয়ানি হাতায় করে তুলতে তুলতে অর্ণবের কথা শুনে হাসল অধিরাজ, “সেইজন্যই তোমায় বলেছিলাম, যে বাইরে থেকে দেখে কাউকে বিচার কোর না। ডোন্ট বি জাজমেন্টাল। মিস্ মুখার্জির মতো নরম সরম মানুষই শেষপর্যন্ত কাজের কাজটি করে দেখালেন। যা আমাদের কারোর দ্বারা হল না, সেটা উনি অনায়াসেই করলেন। বার্নিং শিখকে শেষ করে দিলেন।”
“আপনি ভাবতে পেরেছিলেন যে উনি কাজটা পারবেন?”
অর্ণব অধিরাজের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা ছুড়ে দেয়। সে ঠোঁট টিপে হাসল, “অনেক কিছুই তোমার আমার ভাবনাচিন্তার বাইরে থাকে ডার্লিং। এই যে এত কাণ্ড হল, তার পেছনের আসল নায়িকাকে প্রথমে দেখে কেউ ভাবেইনি যে তিনিই ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হবেন।”
“ইন্দিরা গান্ধী?”
“ইয়েস, ইনডিড!” অধিরাজ প্লেটগুলো টেবিলে সাজাতে সাজাতে বলল, “ইন্দিরা গান্ধীর প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসার একটুও ইচ্ছে ছিল না। তিনি এমনিতেই ফিরোজ গান্ধীকে নিয়ে বেজায় অশান্তিতে ছিলেন। তাঁর ওপর দুই ছেলেরও দায়িত্ব ছিল। শুরুতে শান্ত, নিরীহ, ইন্টেলেকচুয়াল গোছের একজন নারী ছিলেন। রূপসী, উচ্চশিক্ষিতা ও আধুনিকা মহিলাদের ফ্যান ফলোয়িংও প্রচুর। ওসব নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক আছে, তাই আলোচনা না করাই ভালো। মোদ্দা কথা, লাইফে অনেক হেডেক ছিল। তার ওপর এসব প্রধানমন্ত্রীত্বের গুরুদায়িত্ব আর অশান্তি আমদানি করতে চাননি। কিন্তু ওই যে, পলিটিক্স! যখন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ‘তাসখন্দ চুক্তি’ করতে গিয়ে রহস্যময়ভাবে মারা গেলেন, তখন কামরাজ নিরীহ মেয়েটাকেই পাকড়াও করে প্রধানমন্ত্রীর গদিতে বসিয়ে দিলেন।” সে বলতে বলতেই ফিক্ করে হেসে ফেলল, “তখন ইন্দিরা এমন ক্যাবলা ছিলেন যে পার্লামেন্টে বক্তব্য রাখতে গেলেও পঞ্চাশবার তোতলাতেন। বিরোধী নেতা নেত্রীদের সামনে ওঁর ‘বোলতিই বন্ধ’ হয়ে যেত। কথাই বলতে পারতেন না। বিরোধীপক্ষের সঙ্গে মিটিং এর আগে ফিট্ পড়া বাকি থাকত। ইনফ্যাক্ট, পার্লামেন্টে যেতে হবে শুনলেই তাঁর নাকি এমন পেট খারাপ হত যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাথরুমে ঢুকে বসে থাকতেন। কিংবা ওঁর জ্বর আসত বা মাথা ধরত। পলিটিক্স শব্দটাতেই অরুচি। কামরাজ, মোরারজি দেশাই, ওয়াই বি চবনের মতো সিনিয়র কংগ্রেস নেতাদের কথাতেই তিনি উঠতেন বসতেন বলে রামমনোহর লোহিয়া ওঁর নাম ‘গুঙ্গি গুড়িয়া’ও রেখেছিলেন। বোবা পুতুল। কিন্তু তখন কে জানত যে সেই গুঙ্গি গুড়িয়া-ই ভারতের ‘আয়রন লেডি’ হবেন। কেউ ভাবতে পেরেছিল? কিন্তু তিনি হয়েছিলেন। তাই কে যে কী হবে তা না ভাবাই ভালো।”
অর্ণব সেই ক্যাবলাকান্ত গুঙ্গি গুড়িয়া ইন্দিরা গান্ধীকে কল্পনা করার চেষ্টা করছিল। ওইরকম একজন তেজি জাঁদরেল ব্যক্তিত্বময়ী নারী, ভারতের শ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীদের অন্যতমা কিনা পার্লামেন্টে গিয়ে তোতলাতেন! এ ও কি সম্ভব? ওঁর চেহারা আর ব্যক্তিত্বই তো শাণিত তরোয়ালের মতো ছিল। আর চোখদুটো কী মারাত্মক! কিছু বলারও দরকার নেই। তাকালেই সামনের লোকটির বুক গুড়গুড় করবে।
“ছোটোবেলায় ছবিতে ওই চোখ দেখেই আমি বেজায় ভয় পেতাম।” অধিরাজ এবার কাবাবের প্লেট নিয়ে পড়েছে, “একে ওইরকম বড়ো বড়ো চোখ, তার ওপর ওইরকম সাদা চুল। স্যরি টু সে, তখন নিতান্তই ছেলেমানুষ ছিলাম। তাই মনে হত ওঁর হাতে একগাছি ঝাঁটা ধরিয়ে দিলে দারুণ মানাত। তবে ভয় পেলেও কৌতূহল ছিল ষোল আনা। তাই বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মহিলাকেও এক্সপ্লোর করতে শুরু করলাম। বলাই বাহুল্য ওঁর ফ্যান হতে বেশি সময় লাগেনি। যদিও তরুণী, আধুনিকা, নিখুঁত সুন্দরী ইন্দিরার চেয়েও আমার মধ্যবয়েসি, কাঁচা পাকা চুলের ডাকসাইটে ‘আয়রন লেডি’-টিকেই বেশি মনে ধরেছিল। তাই ইন্দিরা গান্ধীর সম্পর্কে যত বই ছিল, প্রায় সবই পড়েছিলাম। আর সেই শিক্ষাটাই এখানে কাজে লেগে গেল। ইন্দিরা গান্ধীকে না জানলে বার্নিং শিখকে ধরা অসম্ভব ছিল।”
বলতে বলতেই সে জোরে চেঁচিয়ে ওঠে, “সেনোরিটাজ, ডিনার ইজ রেডি। কা-ম শা-ৰ্প।”
বার্নিং শিখের কেস ক্লোজ হয়ে গিয়েছে প্রায় একসপ্তাহ হল। সেই রাতেই মিডিয়া জানতে পেরে গিয়েছিল যে বার্নিং শিখের সমাপ্তি শেষমেষ কলকাতাতেই হয়েছে। আর্বানাকে একদল রিপোর্টার, ক্যামেরা আর বুম যখন ছেঁকে ধরেছে তখন ভূপেন্দ্ৰ দত্তা আর ঘন্টুর পোড়া লাশ অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হচ্ছে। অধিরাজকে দেখতে পেয়েই যথারীতি ‘স্যার…স্যার’ করতে করতে ঘিরে ধরেছিল তারা। একের পর এক প্রশ্ন ছুটে আসছিল তার দিকে। বার্নিং শিখ কে, তার আসল পরিচয় কী, কীভাবে তার মৃত্যু হল, কেন তাকে গ্রেফতার করা গেল না, ভূপেন্দ্র দত্তা কীভাবে মারা গেলেন, হাজার প্রশ্ন তাদের। অধিরাজের চোখ তখনও সানগ্লাসেই ঢাকা। একবারের জন্যও সে ওই কালো চশমা সরায়নি। যথারীতি সপ্রতিভ ভঙ্গিতেই ‘নো কমেন্টস্’ বলেই চলে যাচ্ছিল। আচমকা এক তরুণী সাংবাদিক বেমক্কা প্রশ্ন করে বসল, “স্যার, এমনিতেই সর্বনাশিনী আর সার্জিক্যাল স’ কিলারের কেসের পর থেকেই আপনি ‘টক্ অব দ্য টাউন’। শহরের নতুন সেনসেশন। এবার তো চ্যালেঞ্জ আরও বড়ো ছিল। বার্নিং শিখ শুধু কলকাতার নয়, ন্যাশনাল প্রবলেম। খোদ দিল্লি পুলিশও তাকে থামাতে পারেনি। কিন্তু আপনি করে দেখালেন। আপনার সাহসী ভিডিও তো গোটা দেশে ঘুরছে। এখন তো অধিরাজ ব্যানার্জি গোটা দেশের ‘দুলারা’, টক্ অব দ্য কান্ট্রি হবেন। প্রোমোশন তো অবধারিত। নিশ্চয়ই দিল্লি থেকেও বিশেষ সম্মানের জন্য ডাক আসবে। গ্যালান্ট্রি মেডেল বা মেরিটোরিয়াস সার্ভিস মেডেলও পাবেন। এরপর কী প্ল্যানিং আপনার? নেক্সট কী করতে চান?”
অধিরাজ একটু থমকে দাঁড়ায়। যিনি প্রশ্নটা করেছিলেন তার দিকে সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, “আমি শুধু বাড়ি যেতে চাই। দ্যাটস্ অল।”
বার্নিং শিখের পৈতৃক পরিচয় অবশ্য পরের দিন খবরের কাগজে ছাপা হয়েছিল। লোকে তাকে মঙ্গলপুরী নিবাসী গুলশন সিং ধিলোঁ নামেই চিনল। চেহারার যা অবস্থা হয়েছিল তাতে চেনাই দায়। তবে গুলাব সিং আর যাদব বুঝতে পেরেছিল তার আসল পরিচয়। কিন্তু তারা সে রহস্য নিজেদের পেটেই চেপে রেখেছে। কাউকে বলেনি। কেউ জানতেও পারেনি যে গুল্লু আসলে সি.আই.ডি.-রই তুখোড় খবরি ঘন্টু ছিল।
পোস্টমর্টেমের পর সত্যিই ঘন্টুর লাশ দাবি করতে কেউ আসেনি। রতিবৌদি বা পুপুল কেউ ওই নৃশংস খুনির শেষকৃত্য করতে রাজি নয়। কিন্তু অধিরাজই দু-জনকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে শেষপর্যন্ত রাজি করাল। রতিবৌদি কাঁদতে কাঁদতেই বলেছিলেন, “সব কিছুই তো ঠিক ছিল। মোটামুটি ভালোভাবেই কেটে যাচ্ছিল আমাদের দিন। পুপুলটারও সামনে বিয়ে ছিল। হঠাৎ করে লোকটার মাথায় এ কী দানো ভর করল স্যার? এতদিনের চেনা মানুষটাকে আর চিনতেই পারলাম না!”
অধিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তরে নীরব থাকাই ভালো। তবে ওদের কনভিন্স করে ঘন্টুর মুখাগ্নি পুপুলের হাত দিয়েই করিয়েছে। জ্বলার আর বিশেষ বাকিই বা কী ছিল! তবু ছেলের স্পর্শটুকুই পাথেয় করে যাক্। তবে তার শেষ ইচ্ছের সম্মানটুকুও সে রেখেছে। পুপুলের বিয়েতে অধিরাজই বরকর্তা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এবং ঘন্টুর স্বপ্নের মতো ছেলের বিয়ে যাতে সম্পূর্ণ জাঁকজমকে হতে পারে তার ব্যবস্থাও করছে।
শালিনী ও সোনালির কাছেও ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে অধিরাজ। মিঃ দত্তাকে না বাঁচাতে পারার জন্য দুঃখপ্রকাশও করছিল, কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়েই শালিনী বললেন, “কর্না ইজ আ বিচ্ অফিসার ব্যানার্জি। আমি সারাজীবন লোকটার সঙ্গে ছিলাম। তাই জানি, যেটা ও ডিজার্ভ করত, সেটাই পেয়েছে। আপনার দুঃখিত হওয়ার কোনো কারণই নেই। বরং আপনাকে ধন্যবাদ যে ওর কর্মের ফল আমার নিষ্পাপ সন্তান, নাতি-নাতনিরা পায়নি। সোনালি, বিরূপাক্ষ, আয়ান আর তানিশা যে ঠিক আছে, এর জন্য আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। এখন আমি যদি বেশি শোকার্ত হই, তবে নরকে বসেও ভূপেন্দ্র হাসবে। তাই ক্ষমা চাইবেন না।”
অন্যদিকে মিডিয়া ফের নাচানাচি শুরু করে দিয়েছে অধিরাজকে নিয়ে। এবার তো তাদের সঙ্গে ন্যাশনাল চ্যানেলগুলোও যোগ দিয়েছে। শামস্ তাহির খান ওকে ‘বঙ্গাল কা শের’ উপাধি দিয়ে বসে আছেন। ক্রাইম তকের একটি এপিসোডে ইন্টারভিউয়ের ডাকও এসেছিল। অধিরাজ মৃদু হেসে নম্রভাবে এড়িয়ে গিয়েছে। কোনো টেলিভিশন চ্যানেলকেই কোনোরকম এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দেয়নি। তবে রমানাথ চক্রবর্তীকে প্রতিশ্রুতিমত একটা বিরাট ইন্টারভিউ দিয়ে ধন্যবাদ জানাতে ভোলেনি। ওঁকে চমৎকার একটা সোনা বাঁধানো পেনও গিফট করেছে। প্রেস কনফারেন্সে খুব নিস্পৃহ কণ্ঠে বলেছে, “আমরা পুলিশ। নিজেদের ডিউটিটুকুই জানি। হিরোগিরি করার বা মঞ্চে বক্তৃতা দেওয়ার অভ্যেস নেই। তাছাড়া আজ যে মিডিয়া আর জনতা আমায় মাথায় করে নাচছে, কয়েকঘণ্টা আগে তারাই আমাদের ‘অপদার্থ, ওয়ার্থলেস’ বলছিল। আমার একজন এফিশিয়েন্ট অফিসারকে বসিয়ে দেওয়ার দাবি করছিল। প্রচুর সমালোচনাও হয়েছে। আমি সেগুলোকেও গুরুত্ব দিইনি। এখন এইসব প্রশংসা, ভালোবাসা, উপাধি বা নাচানাচিরও আমার কাছে কোনো গুরুত্ব নেই। কারণ কেস ক্র্যাক না হলে এরাই আমাদের দিকে ফের আঙুল তুলতে এক সেকেন্ড সময়ও নেবে না। অতএব থাক্। নিজের ডিউটিটাই করি।”
এর ফাঁকেই প্রিয়া বাজাজের অন্তর্ধানের খবর অর্ণব তাকে জানিয়েছিল। সে একটু বিরক্ত হয়েই বলেছে, “ওঁকে আমার যে কেসে গ্রেফতার করার ছিল, সেটা ওভার। এখন উনি জেল অথরিটিকে বাঁদর নাচ নাচিয়ে ভেগে যান, কেটে পড়ুন, সরে পড়ুন, কী গোল্লায় যান, আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। আমি ওঁর পেছনে হারগিস আর দৌড়োতে পারব না।” এডিজি সেন তার এই জবাব শুনে আর কথা বাড়াননি। কেসফাইলটা আপাতত প্রণবেশ লাহিড়ীর কাছেই আছে। অধিরাজ প্রিয়া বাজাজকে মাথা থেকে সরিয়ে আপাতত ড্রাগ মাফিয়া কার্লোসের দলবলকে নিয়ে পড়েছে। আমনদীপ আর আকাশ সিংকে পিটিয়ে পাটিয়ে গোটা গ্যাংটাকেই ধরেছে ওরা। ওদের কাছ থেকেই জানা গিয়েছে যে কার্লোসের ড্রাগের আর একটা ঘাঁটি শহরের অন্যতম প্রমোদ উদ্যান ‘গ্রীন ভ্যালি পার্ক’। ইট কাঠ পাথরের শহরে প্রায় সত্তর-বাহাত্তর একর জুড়ে সবুজের ঢল নামিয়ে অতি সযত্নে পার্কটাকে তৈরি করেছেন নির্মাতারা। রবীন্দ্র সরোবরের আদলে অনেকখানি জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছে প্রকৃতির এই নির্মল শোভা। সেই প্রকৃতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ড্রাগস র্যাকেটের বিষ। তবে সেটা কে বা কারা চালায় তা ওরা কেউ জানে না।
অধিরাজ আপাতত ‘গ্রীন ভ্যালি পার্ক’ এর মিস্ট্রির পেছনেই পড়েছে। কানাঘুষোয় শোনা যাচ্ছে যে বার্নিং শিখ কেসের জন্য বড়োসড়ো গ্যালান্ট্রি অ্যাওয়ার্ডও সত্যিই তার কপালে নাচছে। এডিজি শিশির সেনের কাছে তেমন চিঠিও এসেছে। তা নিয়ে তার নিজের বিন্দুমাত্রও মাথাব্যথা নেই। কিন্তু বলাই বাহুল্য অনেকেই তাতে সন্তুষ্ট হয়নি, যাদের মধ্যে প্রণবেশ লাহিড়ী অন্যতম। তবে টুইঙ্কলকে ছেড়ে দিতে তিনি বিন্দুমাত্রও আপত্তি করেননি। নতুন টিম, নতুন বস্ পেয়ে টুইঙ্কল এখন অক্টোপাসের ষোল পা দেখছে। আর সুযোগ পেলেই ক্রিমিনালদের ওপর কুচুপুচু আর গোলুগোলু অ্যাপ্লাই করছে। আহেলির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হয়েছে। আত্রেয়ীর সঙ্গে তো গলায় গলায় ভাব। ডঃ চ্যাটার্জির টাক ফরেনসিক ল্যাবে ফিরে এসে তার শোভা আরও বাড়িয়েছে। সঙ্গে মিস্ ব্রকোলিও। যদিও তিনি এসেই দাবি করেছেন, “আমার দুটো টেস্টটিউব আর বীকার গায়েব কী করে হল?”
বার্নিং শিখ কেসের ফাইল পার্মানেন্টলি ক্লোজ করার আর কয়েকটা ফর্মালিটিই বাকি ছিল। তার আগেই একদিন অধিরাজ তার বাড়িতে সবাইকে ডিনারের নিমন্ত্রণ জানায় সাংঘাতিক বিরাট কোনো পার্টি নয়। টিমের প্রমীলাবাহিনীর সাহস, দক্ষতা ও কৃতিত্বকে সেলিব্রেট করার জন্য ছোটোখাটো একটা ঘরোয়া অনুষ্ঠান। অধিরাজ নিজের হাতেই রান্না করে এ কেসের নায়িকাদের খাওয়াতে চায়। শোনামাত্রই মিস্ দত্ত হই হই করে ওঠে, “আপনি তো ছুপা রুস্তম স্যার! রান্নাটাও জানেন?”
“আজ্ঞে মিস্ দত্ত।” সে সসম্মানে ঝুঁকে পড়ে, “আপনি যেমন রান্নায় দ্রৌপদী, আমিও তেমন ভীম। দুঃখের বিষয় ওই ট্যালেন্টটা দেখানোর আর চাখানোর সময় আর সুযোগ বড়োই কম। যদি আপনাদের আপত্তি না থাকে তো এক শাম্ বীরাঙ্গনাওঁ কী নাম। কী বলেন? হয়ে যাক?”
এ প্রস্তাবে আপত্তি জানায় কেউ? অগত্যা আজ প্রমীলাবাহিনীর অনারে পার্টি হচ্ছে।
আজ এডিজি সেন অধিরাজের গোটা দিনের ছুটিই মঞ্জুর করেছেন। তবে এক শর্তে। মেল অফিসারদের, এমনকি তাঁকেও ডাকতে হবে। এবং স্টার্টারে চিকেন পকোড়া রাখতেই হবে। প্রমীলাবাহিনীর সর্বসম্মতিক্রমে মেইন কোর্স ঠিক হয়েছে—কুলচা, ছোলে, ফিশ কাবাব, চিকেন বিরিয়ানি, মাটন নল্লি নিহারি, রায়তা আর ফিরনি। মেনুটা অর্ণবের বিশেষ পছন্দ হচ্ছে না দেখে তার কানে ফিশফিশ করে বলে অধিরাজ-“কান্নাকাটি কোরো না। তোমার জন্য স্পেশাল চাইনিজও থাকবে।”
সেই পার্টিই আজ হচ্ছে। সারাদিন ধরে আজ সব ডিশ নিজের হাতেই সযত্নে রান্না করেছে অধিরাজ। আর অর্ণব বিস্মিত দৃষ্টিতে তার এই নতুন রূপ এক্সপ্লোর করছিল। আজ ভালো করে তার বেডরুমের শিল্পকর্মগুলোও দেখল। কী অসাধারণ আঁকার হাত মানুষটার! অথচ কখনও কিচ্ছু বলেননি। কেউ জানতেও পারেনি। অবশ্য একা সে-ই নয়। আজ বাকিরাও অধিরাজকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছে। প্রথমেই তথাকথিত সিনিয়র মিঃ ব্যানার্জির তৈরি মোঘল গার্ডেনমার্কা ইন্টেরিয়র দেখে সকলেই চমৎকৃত। তার ওপর অধিরাজের শিল্পী সত্ত্বা দেখেও চক্ষু চড়কগাছ। পেইন্টিঙের রহস্যটা ফাঁস করেছে অবশ্য অর্ণবই। মিস্ বোস তো বলেই ফেলল, “স্যার, আপনি তো প্রোফেশনাল পেইন্টারদেরও হার মানাবেন!”
তার গান অবশ্য অর্ণব আগেই শুনেছিল। আজ লেডি অফিসারদের ফরমায়েশে একের পর এক গিটার বাজিয়ে বাংলা, হিন্দি, ইংলিশ গান একটানা শুনিয়ে গেল। যেমন অপূর্ব কণ্ঠ, তেমন দরদ। আহেলি, কৌশানী আর আইভি, তিনজনেই অনিমেষে মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকে দেখছিল। আহেলিও বেশ কয়েকটা গান গেয়েছে। অধিরাজের মতে, “শচীন তেন্ডুলকার গান গাইলে এমন কণ্ঠে গাইতেন। তবে বেশ গেয়েছেন। শুধু আমাকে ঝাড়ার সময়েই গলায় অত জোর আসে কী করে কে জানে।”
অর্ণব একটু লজ্জা লজ্জা করে অবশেষে নিজের লেখা শায়েরি আর কবিতা শুনিয়েছে। পবিত্র আর মিস্ অরোরা ট্যাঙ্গোর প্রদর্শনী করছিল। মিস্ আত্রেয়ী দত্ত চমৎকার ইংরেজি কবিতা লিখতে পারে। সে-ও দায়ে পড়ে কয়েকটা শোনাল। এমনকি এডিজি সেন আর ডঃ চ্যাটার্জি পর্যন্ত ‘জুম্মা চুম্মা দে দে’ গানে বলিউডি ডান্সের নমুনা দেখালেন। এখানে এডিজি সেন অমিতাভের ভূমিকায় আর ডক্ কিমি কাতকরের। তাঁর সঙ্গে একটা স্টেপ নাচতে গিয়ে শিশির সেন প্রায় উলটেই পড়েন আর কী! কোনোমতে সামলে নিয়ে বললেন, “অসীম, তুমি যদি অমিতাভের সঙ্গে এই নাচটা নাচতে তবে অমিতাভ তোমার ভার তুলতে গিয়েই ফের হসপিটালে যেতেন। ভুঁড়িটা একটু কমাও না কেন!”
চমৎকার একটা সন্ধ্যা। এখানে কেউ কারোর বস্ নয়, কেউ কারোর জুনিয়র নয়। সবাই মিলে বন্ধুদের মতো হইচই শোরগোল আর লেগ পুলিং লাগিয়ে রেখেছে। মেয়েদের সবার জন্য অধিরাজ দামি দামি সব উপহার, যেমন পারফিউম, তানিষ্কের জুয়েলারির বন্দোবস্তও রেখেছিল। মেয়েরা সবাই সেসব পেয়ে খুব খুশি। ডক্ আর শিশির সেন বোধহয় প্রায় ছেলেমানুষই হয়ে গিয়েছেন। মিস্ অরোরা সাত প্লেট স্টার্টার শেষ করে সবে আট নম্বরের দিকে ঝুঁকেছিল, এডিজি সেন কাঁচুমাচু মুখে তাকে গিয়ে বললেন, “মিস্ অরোরা, গিফ্ট তো পেলাম না। আপনি যদি অনুমতি দেন, তবে আমরাও কি একটু স্টার্টার পেতে পারি?”
ডঃ চ্যাটার্জি ঘটঘট করে টাক নাড়লেন, “আমার মনে হয় না আপনি পাবেন এডিজি সেন। মেইন কোর্সের আশাও ছেড়ে দিন৷ রাজা রান্নায় ভীম, আর এ মামণি খাওয়ায়। আপাতত জল আর কোল্ডড্রিঙ্ক খেয়েই সন্তুষ্ট থাকুন। উনি কমপ্লিট করুন। তারপর যা পরে থাকবে তাই খাবেন।”
টুইঙ্কল লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিল। কী বলবে বুঝতে পারছে না। তাকে শেষপর্যন্ত অধিরাজই উদ্ধার করল। সে নিজেই এক প্লেট স্টার্টার এনে তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এই নিন্ সেনোরিটা। নিশ্চিন্তে খান। আরও আছে। ওঁরা সেখান থেকেই নিয়ে নেবেন।”
ডঃ চ্যাটার্জি গরগর করে ওঠেন, “এরকম ইনসাল্ট করার কোনো মানে হয়?”
“ফর ইওর কাইন্ড ইনফর্মেশন ডক্…।” অধিরাজ মৃদু হাসে, “আগেই বলা হয়েছে, এই পার্টিটা প্রমীলাবাহিনীর অনারে। আপনার মধ্যে কিন্তু প্রমীলা হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। ওঁদের আর যা-ই থাক, এতবড়ো টাক, আর মোচ থাকে না।”
“অসীমের মধ্যে প্রমীলার লক্ষণ নেই।” এডিজি সেন চিন্তায় পড়েছেন, “আমার মধ্যে আছে বলছ? আমি খেতে পারি?”
মেইন কোর্স সার্ভ করার পরও রীতিমতো আড্ডা সহযোগে খাওয়া শুরু হল। অর্ণবের জন্য আগেই একপাশে মিক্সড চাউমিন, চিলি মাশরুম, কুং পাও চিকেন আর মোমো সরিয়ে রেখেছিল অধিরাজ। তাই তার বিশেষ কোনো অসুবিধে হয়নি। শুধু আহেলি ট্যারা চোখে একটু লোভ দিয়েছে, আর টুইঙ্কল খাবলা মেরে এক প্লেট তুলে নিয়েছে বলে একটু চটেছে। তবে যেহেতু আজকের সন্ধেটা বিজয়িনী নায়িকাদের নামে, তাই এ নিয়ে বিশেষ উচ্চবাচ্য করেনি।
খেতে খেতেই ফের বার্নিং শিখের কেসের প্রসঙ্গটা উঠল। এডিজি সেন জানতে চাইলেন, “ব্যানার্জি, সবই তো বুঝলাম। কিন্তু তুমি কখন বুঝলে যে ঘন্টুই আসলে বার্নিং শিখ। আর মসকুইটো লিকুইডের কেসটাই বা কী?”
“ওটা তো ডক্ আমার থেকেও বেশি ডিটেলিং একদম পি পি এম সমেত বলতে পারবেন। তবু আগে এই অদ্ভূত মার্ডার ওয়েপনের কথাতেই আসি। বার্নিং শিখ বা গুলশন সিং-এর মোটিভ বা অন্যান্য মোডাস অপারেন্ডিগুলো নিয়ে কিছু বলার নেই। আপনারা সবই জানেন। কিন্তু এই অদ্ভুত মার্ডার ওয়েপনের কথাই আগে বলা যাক। ডক্ আপনি বলবেন?”
ডঃ চ্যাটার্জি মাংসের হাড় চিবোতে চিবোতে বললেন, “ওটাতে আমার কোনো কৃতিত্ব নেই। টেকনিক্যাল ডিটেইলস্ সব রিপোর্টে লিখে দিয়েছি। শিশিরবাবু পড়ে নেবেন। আসল প্যাঁচ তুমিই আবিষ্কার করেছ। তুমিই বলো। তাছাড়া ব্রাহ্মণকে সুখাদ্য খাওয়ার সময়ে বিরক্ত করতে নেই। ব্রহ্মশাপ লাগবে।”
“সে কি আর বাকি আছে?” সে বিড়বিড় করে, “সাধে কি বলি দুর্বাসা?”
“কী?”
“কিছু না।” অধিরাজ ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে শুরু করে, “মদনের বয়ানের সাহায্যে মিস মুখার্জিই ফসজিন আর মাস্টার্ড গ্যাসের সম্ভাবনাটা প্রথম বলেন। তারপর ফার্দার ইনভেস্টিগেশনে উনিই ডেডলি কম্বিনেশনটা কনফার্মও করেন। স্যালুট টু হার। একা হাতে পুরো ল্যাব সামলানো সহজ ছিল না। কিন্তু সেটা উনি করে দেখিয়েছেন। আমরাই গর্দভের মতো ফজিন আর মাস্টার্ড গ্যাসের হিডন্ কন্টেনার কিংবা গোপন প্রবেশ পথ, হিডন্ পাইপ, চেম্বার, এইসব খুঁজছিলাম। কারণ তখনও আমাদের ধারণা ছিল যে দুটো গ্যাসই বেডরুমগুলোয় বাইরে থেকে আসছিল। মজার কথা, আসল ঘটনাটা সম্পূর্ণ উলটো। কোনো গ্যাসই বাইরে থেকে এসে ভেতরে ঢুকছিল না। বরং ওই বেডরুমের ভেতরেই ফজিন আর মাস্টার্ড গ্যাস নিজে থেকেই তৈরি হচ্ছিল।” অর্ণব আর পবিত্র দু-জনেই চমকে উঠেছে। দুটো গ্যাসের আগমনপথ খুঁজতে খুঁজতে ওদের প্রায় পাগল হওয়ার দশা হয়েছিল। এমনকি এসি খুলে, দেওয়ালের প্রত্যেকটা ইট পিটিয়ে পিটিয়ে দেখতেও বাকি রাখেনি। অথচ বাঘ কিনা ঘরেই গ্যাঁট হয়ে বসেছিল। গ্যাসটা ঘরেই তৈরি হচ্ছিল! সে আবার কী!
“সেটা তো সম্ভব নয় স্যার।” অর্ণব বলে, “মিস্ মুখার্জিই বলেছিলেন যে মাস্টার্ড গ্যাস রুম টেম্পারেচারে থাকলে লিকুইড সালফার মাস্টার্ড হয়ে যাবে, গ্যাস ফর্মে থাকবেই না। জেনারেলি দুশো কুড়ি থেকে দুশো আঠাশ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড হিট লাগে ওটাকে ভেপোরাইজ করতে। ওঁর মতে যদি অত্যন্ত কম পরিমাণেও থাকে তবুও দেড়শো থেকে একশো আশি ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড টেম্পারেচার তো লাগবেই। অথচ কোনো ঘরেই কোনো রুম হিটার ছিল না। তবে অত হিট এল কোথা থেকে ঘরের মধ্যে? আর ফসজিন রুম টেম্পারেচারেই সবচেয়ে বেশি ডেঞ্জারাস। উনি মোটামুটি একুশ ডিগ্রি সেলসিয়াস বলেছিলেন। যদি সালফার মাস্টার্ড থেকে ওই হিটে মাস্টার্ড গ্যাস রেডিও হয়ে যায়, তবে ফজিনের তো অত হিটে কাজ করার কথাই নয়। ইনফ্যাক্ট আগুনের তাপই ফসজিন নিতে পারে না। তবে দেড়শো ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে সার্ভাইভ করল কী করে? একটা ঘরের মধ্যে টেম্পারেচার একই সঙ্গে একবার একুশ ডিগ্রি আর একবার দেড়শো ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড হয় কী করে?”
“ব্রিলিয়ান্ট পয়েন্ট।” অধিরাজ অর্ণবের পিঠ চাপড়ে দেয়, “এর উত্তরটাও তুমি আমাকে নিজেই ওই হসপিটালের পাশের গলিটায় দাঁড়িয়ে দিয়েছিলে। মনে আছে? যার জন্য আমি তোমাকে জিনিয়াসও বলেছিলাম।”
মনে তো আছে। তবে সেদিনও সে কিছুই বুঝতে পারেনি। আজও যথারীতি বুঝল না। সেই একই উত্তর দিল অর্ণব, “অ্যাঁঃ?”
“হ্যাঁ।” অধিরাজ মুচকি হাসল, “সেদিন তুমি সিগারেট-গাঁজা আর ক্লোরোফর্মের কথা তুলেছিলে। সেই মুহূর্তেই গোটা ব্যাপারটা সাফ হয়ে গিয়েছিল।”
“কী রকম?” পবিত্র কৌতূহলী।
সে ইন্ডিয়া কিংসের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেটের স্টিক বের করে ঠোঁটে গুঁজেছে। অর্ণব শুনতে পেল কৌশানী বোসের ফিশফিশ, “ইন্ডিয়া কিংসের কী কপাল মাইরি!” সভয়ে দেখে আহেলি কটমটিয়ে কৌশানীর দিকেই তাকিয়ে আছে। অর্থাৎ কথাটা কানে গিয়েছে। সর্বনাশ!
ফস্ করে সিগারেটটা ধরিয়ে অধিরাজ বেশ কিছুক্ষণ রিং বানাল। তারপর পবিত্র-র দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “টেনে দেখো।”
“টেনে দেখার কী আছে?” পবিত্র কথাটা বলেও একটা সুখটান মারে, “সিগারেট যখন সিগারেটের মতোই তো লাগবে। আমিও স্মোকার। তবে হ্যাঁ, স্মুদ।”
“স্মুদকে গুলি মারো।” সে জানতে চায়, “এই যে তুমি ধোঁয়াটা আরামসে টানছ, স্টিকটাকে আঙুলে ধরেও আছ, আদৌ কি জানো যে ওটা ঠিক কতটা হিট প্রোডিউস করছে?”
“এ আবার কী কথা।” এডিজি সেন বললে, “সিগারেট আমরা রাত দিন টানছি, ঠোঁটে লাগাই, আঙুলে ধরি। তাতে যখন আমাদের ঠোঁট, আঙুল বা মুখ পুড়ে যায় না, ইভেন ছ্যাঁকাও লাগে না তখন খুব কম টেম্পারেচারই হবে। নয়তো পুড়ে যেতাম না?”
“না স্যার।” অধিরাজ মাথা নাড়ল, “ওইখানেই প্যাঁচ। আপনি সিগারেট রোজ গন্ডায় গন্ডায় স্মোক করেন। আপনার আঙুল, ঠোট, জিভ, মুখ কিচ্ছু পোড়ে না। কিন্তু আপনি জানেন না যে ওইটুকু একটা ছোট্ট সিগারেটের স্টিক প্রায় চারশো ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড হিট প্রোডিউস করে তামাকটাকে ধোঁয়া করার জন্য। আর যত বেশি জ্বলতে থাকে হিটও তত বাড়ে। সাধারণ সিগারেটের ক্ষেত্রে টিপ অবধি পৌঁছোতে পৌঁছোতে ওটা ছশো থেকে আটশো ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের বেশিও হিটেড হতে পারে। অথচ আপনি মনের আনন্দে সুখটান মারছেন। কোনো ধারণাই নেই যে আপনার দু-আঙুলের ফাঁকে একটা মিনি ফার্নেস ধরা আছে।” সে এবার অর্ণবের দিকে তাকায়, “এই সিগারেট-এর ক্লু-টা তুমি আমায় যে মুহূর্তে দিলে সে মুহূর্তেই বুঝলাম মসকুইটো লিকুইডেটরই হচ্ছে সেই পদার্থ যে ঘরের উত্তাপে থাকা নিরীহ লিকুইড সালফার মাস্টার্ডকে হিট দিয়ে মাস্টার্ড গ্যাস বানিয়ে দিচ্ছে। ফান্ডা একই। মসকুইটো লিকুইডেটরকে তুমি অন থাকা অবস্থাতেও হাত দিয়ে ছুঁতে পারো। বারো ঘণ্টা চলার পরেও খুলতে গেলে ছ্যাঁকাও লাগবে না। ওটা বাইরের পরিবেশকে গরম করে না। ওটার মুখের স্টিকটাকে যদি টাচ করো, তবে সামান্য গরম লাগবে, তার বেশি কিছু নয়। কিন্তু মজার কথা, ওটাও সিগারেটের মতোই একটা ছোট্ট ফার্নেস। ওর ভেতরে একশো কুড়ি ডিগ্রি বা তারও বেশি সেন্টিগ্রেড উত্তাপ প্রোডিউস হয়। অথচ বাইরে থেকে দেখে কখনও বুঝতে পেরেছ যে ওর মধ্যের লিকুইডটা ঠিক কতখানি হিট নিচ্ছে? ঘরে হিটার চালানোর দরকারই বা কী যখন একটা আস্ত ফার্নেস সেখানে উপস্থিত! গ্যাসটা ঘরের টেম্পারেচারে তৈরিই হয়নি, হয়েছে মস্কুইটো লিকুইডেটরের মধ্যে। শুধু সেখানে মসকুইটো কিলিং লিকুইডের বদলে সামান্য সালফার মাস্টার্ড ছিল। আর কোমল কৌরের বুদ্ধিতে মেশিনটার তাপ উৎপাদন ক্ষমতা একশো কুড়ি ডিগ্রি থেকে বেড়ে একশো পঞ্চাশেরও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যা এমনিতেই একশো কুড়ি ডিগ্রি অবধি টানতে পারে, সেটার ওপর সামান্য কারিকুরি করলেই একশো পঞ্চাশ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড হিট এসে যাবে। এর জন্য রকেট সায়েন্সের দরকার নেই।”
ডঃ চ্যাটার্জি বিরিয়ানি খেতে খেতে চোখ বুজে ‘উম্ উম্’ করতে করতে বললেন, “আমি মশা মারার যন্ত্রগুলো পরীক্ষা করে দেখেছি। ওইটুকু মেশিনের কয়েলকে এইসান কারিকুরি করেছে যে ওটা একশো আশি ডিগ্রি সেলসিয়াস অবধিও টানতে পারে। উমম্। আর ওর ভেতরে যে লিকুইডটা ছিল, তার মধ্যে একটা সালফার মাস্টার্ডই। ওটা মসকুইটো লিকুইডেটরের হিট জেনারেট করার টেকনিকে মাস্টার্ড গ্যাস হয়ে যাচ্ছিল।”
“ওই দেখো।” অধিরাজ অঙ্গুলিনির্দেশ করল, “বিশেষজ্ঞের মতামতও এসে গিয়েছে৷ সুতরাং মাস্টার্ড গ্যাস বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকেই আসছিল। ওই পুঁচকে লিকুইডেটরের অবিশ্বাস্য ক্ষমতায়।”
অর্ণব সুদ্ধ সকলেরই তখন প্রায় চোখ কপালে উঠে গিয়েছে। অর্ণব তবু জানতে চায়, “কিন্তু মেইন ওয়েপন্ তো ফজিন। সেটাও কি ওই লিকুইডেটরে ছিল? তা কী করে হয়? অত টেম্পারেচার ফজিন নিতেই পারে না!”
“ফজিন লিকুইডেটরে ছিল না ডার্লিং।” সে হেসে ফেলেছে, “কিন্তু আরও একটা শব্দ তুমি উচ্চারণ করেছিলে। ক্লোরোফর্ম। আমি তো জিজ্ঞাসাও করেছিলাম যে কখনও ল্যাবের বাইরে ব্যাঙ কেটেছ কিনা! পবিত্র সেটা ঠাট্টা ভেবে চায়না টাউন যাওয়ার বায়নাও করছিল। আসলে জিজ্ঞাস্য একটাই। ব্যাঙ কাটতে গেলে প্রথমেই ক্লোরোফর্ম লাগে ব্যাঙটাকে অজ্ঞান করার জন্য। কিন্তু কোনোদিন কাউকে ক্লোরোফর্মের শিশি নিয়ে বাইরে ডে-লাইটে খুলতে দেখেছ?”
“না।” এডিজি সেন এবার প্লেটে কাবাব তুলে নিয়ে বললেন, “আমি তো জীবনে দেখিনি।”
“আমিও না।” পবিত্র তাঁকে সমর্থন করে।
“কেউই দেখেনি। কারণ ক্লোরোফর্মকে যদি তুমি সানলাইটে নিয়ে গিয়ে খুলে দাও, তবে ওটা বাষ্পীভূত হয়ে বাতাসের সঙ্গে মিশে, সূর্যালোকের উপস্থিতিতে বিক্রিয়া করে কার্বনিল ক্লোরাইড ওরফে ফজিন তৈরি করবে। মস্কুইটো লিকুইডেটরের ওপরের অংশে ক্লোরোফর্মটাই বেশি পরিমাণে থাকত। ক্লোরোফর্ম বাষ্পীভূত হতে টোয়েন্টি নাইন পয়েন্ট ফোর কিলোজুলস্ পার মোল মানে অ্যারাউন্ড সিক্সটি ওয়ান পয়েন্ট সেভেন ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড লাগে। যে মেশিন একশো আশি ডিগ্রি অবধি তাপ উৎপাদন করছে, একষট্টি-বাষট্টি ডিগ্রি তার কাছে তো নস্যি। শুরুতেই সে ওই হিট জেনারেট করবে।”
“রাইট!” ডঃ চ্যাটার্জি কাবাব মুখে দিয়ে হুঁ হুঁ করতে করতে বললেন, “সেটাই হয়েছে। লিকুইডেটরে ক্লোরোফর্মই বেশি ছিল। লিকুইড সালফার মাস্টার্ড কম। কিন্তু মসকুইটো লিকুইডের কন্টেনারগুলোতে এই দুটোই ছিল। দেখতেও এত সাধারণ যে পার্থক্য বোঝাই দায়। অবিকল মসকুইটো কিলিং লিকুইডের মতোই। বাইরে থেকে দেখে বোঝা অসম্ভব। অথচ যে পি পি এম ফসজিন তৈরি করছিল তাতে বাঁচা অসম্ভব।”
“কিন্তু রাতের বেলায় সূর্যালোক কোথা দিয়ে এল রাজা!”
পবিত্র-র প্রশ্নের উত্তরে মিস্ আত্রেয়ী দত্তকে নির্দেশ করেছে সে, “ওই যে! ওই
জিনিয়াস লেডিটিকে জিজ্ঞাসা করো। উনিই ব্যাপারটা প্রথমে লক্ষ্য করেছিলেন। বলেওছিলেন। আমিই গাধার মতো পাত্তা দিইনি। কিন্তু এই ক্লু-টা ওঁরই আবিষ্কার। এই বাড়িতেও দেখো, দিব্যি সূর্যালোকের ব্যবস্থা আছে। ইনফ্যাক্ট রাতেও এই মোঘল গার্ডেনে সানলাইট থাকে।”
আত্রেয়ী এবার পুরোটাই বুঝেছে, “ওঃ গড। গ্রীন হাউজ স্পেশাল সাদা ভিবজিওর আলট্রাভায়োলেট এল ই ডি লাইট। প্রত্যেকটা রুমেই ওগুলো ছিল। এখানেও তো আছে দেখছি। ন্যাচারাল সানলাইটের সম্পূর্ণ এফেক্ট দেয়। এতটাই এফেক্টিভ যে ওতে গাছেরা সালোকসংশ্লেষও চালাতে পারে। ওটা ছিল বলেই ক্লোরোফর্ম ফজিনে টার্ন নিয়েছে। কী জিনিয়াস প্ল্যানিং!”
“জিনিয়াস বলে জিনিয়াস! সেইজন্যই আমরা এতক্ষণ হাতড়ে মরছিলাম।” অধিরাজ সবার প্রস্তরীভূত দশা দেখে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেয়, “আমি বুঝিয়ে বলে দিচ্ছি যে ব্যাপারটা ঠিক কীভাবে হত। ইদানিং একটু হাই সোসাইটির লোকেরা আর মশারি টাঙিয়ে শুচ্ছেন না। প্রথমত তাতে এসির শীতল হাওয়া বা পাখার হাওয়া বাধা পায় না। দ্বিতীয়ত মশারি টাঙাও রে, এদিকে বাঁধো রে, ওদিকে বাঁধো রে, গোঁজো রে, অ্যাডজাস্ট করো রে, বেশি উঁচু না হয়, বেশি নীচুও যেন না হয়, আবার খোলো রে, গুছিয়ে রাখো রে, বাই এনি চান্স ফুটো হয়ে গেলে আবার তাপ্পি মারো রে, এত ঝকমারি আজকাল লোকে আর নিতে চায় না। মানুষ সবসময়ই ইজি টেকনিক আর কমফোর্ট খোঁজে। তাই মেট্রোসিটিগুলোয় এখন আধুনিক জনগণ আর মশারি পেতে শোয় না। ইনফ্যাক্ট আমার পলাপিসিকেই যদি মশারির কথা বলো, তাহলেই তিনি পালিয়ে যাবেন। মশারির ভেতরে ওঁর নাকি দমবন্ধ হয়ে আসে। তাই মসকুইটো লিকুইডই হচ্ছে সবচেয়ে স্মার্ট ব্যবস্থা। শোয়ার আগে অন করো। দমাস করে গিয়ে শুয়ে পড়ো। মশাও নেই, মশারির ঝামেলাও নেই। অনেকে আবার এমন সাবধানী যে মশারিও টাঙায়, সঙ্গে মসকুইটো লিকুইডেটরও চালিয়ে রাখে। যাতে রাতে যদি মশারি তুলে ওয়াশরুম বা অন্য কোথাও যেতে হয়, তবে সেই ফাঁকে রক্তচোষা হতভাগারা না ঢুকতে পারে। ডাবল শিল্ড সিস্টেম। এর উদাহরণও দেখেছি অনেক। আর এই সিস্টেমটারই সুযোগ নিয়েছিল কোমল কৌর আর বার্নিং শিখ।”
সে উপস্থিত জনতার দিকে তাকায়, “প্রথমে বার্নিং শিখ কোনো-না কোনো পরিচয়ে ফ্যামিলির ভেতরেই কিংবা আশেপাশে ঢুকে যেত। লম্বা সময় ধরে ফিল্ডিংও দিত। তার এই প্র্যাকটিসের কথা আমরা সকলেই জানি। আর একটা কথা সর্বজনোবিদিত। তার মারাত্মক ম্যানিপুলেশনের পাওয়ার। সে খুব সহজেই মানুষের মন নিয়ে খেলা করতে পারত। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে প্রত্যেকটা পরিবারের কাউকে-না কাউকে প্রভাবিত করে, বিশ্বাস জয় করে নিয়ে সে এই আলোগুলো আমদানি করিয়েছিল। এর ভালো এফেক্ট সম্পর্কে জ্ঞান-ট্যান দিয়ে ঠিক কারোর না কারোর ব্রেনওয়াশ সে করত। এ বিষয়ে ও ব্যাটা অদ্বিতীয়। বিশেষ করে সিনিয়র সিটিজেনরা তো আরও বেশি স্বাস্থ্যসচেতন। উদাহরণ হিসাবে পি সি চৌধুরীর মতো একপিস্ চোখের সামনেই আছেন যিনি স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য চুনের জল থেকে শুরু করে সরষের তেল—সবই ঢকঢকিয়ে খান! তাঁকে যদি কেউ বলে এই লাইটগুলো লাগালে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়, স্কিন ভালো থাকে আর হাড় শক্ত হয়, তিনি কোনোরকম পরখ না করেই চোখ বুজে সব এই লাইটই লাগাবেন। এমন খুঁতখুঁতে বয়স্ক মানুষের বিশেষ অভাব নেই। কোভিডের সময় তো আরও সুবিধা। লোকে ঘরবন্দি, সূর্যালোকে যাওয়ার উপায়টুকুও নেই। তখন ঘরেই যাতে সানলাইটের এফেক্ট পাওয়া যায় তার জন্য এই জাতীয় আলো ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তখনও কারোর মাথায় এই আইডিয়া ঢুকিয়ে দেওয়া কঠিন ছিল না। বার্নিং শিখ প্রথমে সেটাই করত। ঘরের আলোগুলোকে বদলে দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল ফার্স্ট স্টেপ। কিন্তু সেটা আদৌ ক্ষতিকর কিছু নয়। একেবারেই নিরীহ ব্যাপার। উলটে আলোগুলো ব্রাইট বলে যাদের চোখ দুর্বল তাদের সুবিধাও হয়। স্বাভাবিকভাবেই কেউ সন্দেহ করবে না, বরং প্লিজভ্ই হবে। উপকৃতই হচ্ছে তারা। তাই সন্দেহের জায়গাই নেই। কেউ ভাবতেও পারবে না যে এখান থেকেই তাদের মার্ডার ওয়েপন রেডি হতে শুরু করল।”
আইভি রুদ্ধশ্বাসে শুনছিল। বলল, “তারপর?”
“এরপর সে সুযোগ বুঝে এয়ার পিউরিফায়ারগুলোকে নষ্ট করত। এয়ার পিউরিফায়ার যদি ঘরের মধ্যে থাকে তবে গ্যাসগুলোকে বাধা দেবে। সেইজন্যই ওগুলোকে নষ্ট করে দেওয়া বাধ্যতামূলক। মিস্ মুখার্জিও সব পিউরিফায়ারগুলোকে নন ফাংশনালই পেয়েছিলেন। তারপরই আসল মার। বার্নিং শিখ যে বেশেই থাকুক না কেন, সে দেখে নিত ঘরে মসকুইটো লিকুডেটর আছে কিনা। থাকলে সেটা কোন্ ব্র্যান্ডের? না থাকলেও বিশেষ অসুবিধে নেই। এমন কি একটাও পরিবার ছিল না যারা মসকুইটো লিকুইড ইউজ না করে মশারি ইউজ করত? নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু যে লোক বন্ধ দরজার চাবি তৈরি করে, ল্যাচ বাইপাস করে দরজা খুলতে ওস্তাদ, সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর তার জাস্ট বেডরুমগুলোয় ঢুকে একটা করে লিকুইডেটর লাগিয়ে দিতে কতক্ষণ লাগত? যখন সবাই গভীর ঘুমে থাকে তখন অজান্তে কেউ যদি একটা লিকুইডেটর ফিট্ করে দেয় কারোর পক্ষে সেটা জানাও সম্ভব নয়। তারপর মানুষগুলো মারা গেলে তো ফাঁকা মাঠ। খুলে নিয়ে গেলেই হল। তবে এ কাজটা সে একদন শেষে করত। যেদিন ঠিক করত যে এই ফ্যামিলিটাকে মারবে সেদিন কোনো-না কোনো কায়দায় ওইদিন রাত্রে একদম লাস্ট মোমেন্টে তাদের ঘরের যন্ত্রগুলোকে চেঞ্জ করে একই রকম দেখতে, সেম কালার, সেম প্যাটার্নের যন্ত্র ফিট করে দিত। যন্ত্রগুলো দেখতে এক হলেও কোমল কৌর সেগুলোর কয়েলের ওপর কারিকুরি করে হিট প্রোডিউসিং পাওয়ার বাড়িয়ে দিতেন। আর মসকুইটো কিলিং লিকুইডের জায়গায় ক্লোরোফর্ম আর সালফার মাস্টার্ড থাকত। ভেবে দেখো, আমরা পি সি চৌধুরীর বাড়িতে যখন তল্লাশি চালিয়েছিলাম তখন সেখানেও সব ঘরে ইউজড্ লিকুইডের উপস্থিত ছিল। কিন্তু সেটা নিঃসন্দেহে অরিজিনাল। তাই কোনোরকম সন্দেহও হয়নি। যখন আমরা কমলাকে আইডেন্টিফাই করলাম তার আগে সে বিছানা পাতছিল। তারপর রান্নাঘরে ঢুকেছিল। যা কারিকুরি করার ওই সময়টুকুতেই করেছে। যেই আমরা কিছু না পেয়ে বাইরে গেলাম, সে প্রত্যেকটা ঘরে ঢুকে একদম ইলেভেন্থ আওয়ারে স্রেফ মেশিনগুলো চেঞ্জ করে দিল। আমরা ওকে ত্রিসীমানা থেকে তাড়ালাম। পাহারা বসালাম। অত কাণ্ড করেও ফজিন আর মাস্টার্ড গ্যাসের অ্যাটাককে আটকানো যায়নি। এটাই ও প্রত্যেকবারই করত। মারণাস্ত্রটা প্রয়োগ করার জন্য ওকে ধারেকাছে থাকতেই হত না। তার আগেই কাজ সেরে সে বেরিয়ে যেত। ফাদার স্টেফানো মাইনো শেষদিন দিনের বেলা নয়, রাতে পবিত্র জল ছেটাতে গিয়েছিলেন। ওই সুযোগেই হাতসাফাই। ড্রাইভার কেহর সিং-এর ডিউটিও রাতেই শেষ হত। কোনো-না-কোনো বাহানায় ঘরে ঢুকে মেশিন চেঞ্জ করে দেওয়া এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। বিরজুর বন্ধু নাথুরামও নির্ঘাত এই পাঁয়তাড়াই কষেছিল। সে জানত ডিনারের পর সবাই ঘরের দরজা বন্ধ করে এগুলোকে অন করবে। সবক-টা খুনই যেহেতু শীতের রাতে, তাই কারোর ঘরের জানলা খোলা থাকার গল্পই নেই। শীতটাই তার ফেভারিট সিজন ছিল। কারণ তখন কেউ এসি চালায় না। ভেতরের হাওয়া বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সবার বাড়ির জানলা দরজাও বন্ধ থাকে। যে মুহূর্তে লিকুইডেটর অন হল, সেই মুহূর্তেই ভেতরের ক্লোরোফর্ম গরম হতে শুরু করল। তারপর বাষ্পীভূত হয়ে যেই বাইরে এসে সাধারণ টেম্পারেচারের মধ্যেই বাতাসে মিশল, সঙ্গে সূর্যালোক তথা ভিবজিওর আলট্রা ভায়োলেটের এফেক্টও পেল। মুহূর্তের মধ্যে বিষাক্ত ফসজিন বা কার্বনিল ক্লোরাইড তৈরি হল। প্রথমে ওটার অস্তিত্ব বোঝা দায়। কারণ গন্ধটা মৃদু। কিন্তু টেম্পারেচার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হুড়ছড়িয়ে ফস্জিনের মাত্রাও বেড়ে চলেছে। বাইপ্রোডাক্ট হিসাবে সামান্য হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডও। তার সঙ্গে ক্লোরোফর্মের বাষ্পে হয়তো অজ্ঞান না হলেও মানুষগুলো কিছুটা অবশ হয়ে গিয়েছিল। শেষে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা-লিকুইড সালফার মাস্টার্ডও হিটেড হয়ে মাস্টার্ড গ্যাস হিসাবে এসে হাজির। মানুষগুলো কী হচ্ছে বুঝতে না পেরে অজান্তেই প্রায় আগুন ইনহেল করত। এর কী এফেক্ট হত তা তোমরা আগেই জানো। এরপর লোকগুলো মরে গেলে সে দিব্যি ঘরের ভেতরে ঢুকে নেকলেসিং করে দিত আর মসকুইটো লিকুইডেটরগুলোকে খুলে নিয়ে চলে যেত। নেকলেসিং এর আগুনে ফজিনের ট্রেস নষ্ট হত। আর জানলা খুলে দেওয়ায় মাস্টার্ড গ্যাস আর যেটুকু ফজিন বাকি থাকে তা বাইরে বেরিয়ে যেত। বাইরের শীতে মাস্টার্ড গ্যাস হাওয়া, ফজিনও ডিজলভ। কোনো ক্লুই রাখত না। ফরেনসিকের চোদ্দ পুরুষও ওই পোড়া হাড় আর দাঁত থেকে কিছুই বের করতে পারেনি। সেদিন হতভাগা মদন গিয়ে উপস্থিত না হলে মার্ডারগুলোর পেছনের প্যাঁচটাও কিছুতেই ধরা পড়ত না। সব নষ্টের গোড়া হচ্ছে ওই ভিবজিওর আলট্রা ভায়োলেট এল ই ডি লাইট আর ক্লোরোফর্ম, সালফার মাস্টার্ড ভরা লিকুইডেটর! আমরা কোমল কৌরের বাড়িতে বা বার্নিং শিখের আড্ডায় কোনো গ্যাসই পাইনি। তবে বেশ কিছু কেমিক্যালের সঙ্গে ক্লোরোফর্মও পেয়েছিলাম। স্বাভাবিকভাবেই ভেবেছিলাম যে কাউকে অজ্ঞান করার জন্যই ক্লোরোফর্ম আমদানি করে রেখেছে সে। তখনও মাথায় আসেনি যে ক্লোরোফর্মের সঙ্গে ফজিনের একদম সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অজ্ঞান করা ছাড়া ক্লোরোফর্মের একটি বিধ্বংসী প্রোডাক্টও আছে। অর্ণব যদি সেদিন ক্লোরোফর্ম আর সিগারেট, এই দুটো শব্দ পরপর না বলত তাহলে হয়তো স্ট্রাইকও করত না। সো ক্রেডিট গো-জ টু অর্ণব। আর এটাই হচ্ছে সেই উদ্ভট মার্ডার ওয়েপন্!”
‘সেইজন্যই আপনি জানতে চাইছিলেন যে অসোউইক ফোর্ট আর ভোপাল গ্যাস ডিজাস্টার কখন ঘটেছিল? জানতে চাইছিলেন গ্যাস রিলিজের সময়ে সূর্যালোক ছিল কী ছিল না?”
“রাইট।” অর্ণবের কথায় মাথা ঝাঁকায় অধিরাজ, “এর পেছনের উদ্দেশ্য একটাই। ডক্ বিরক্ত হয়ে পুরোটা বলেননি। কিন্তু অসোউইক ফোর্টের ঘটনাটা অত মারাত্মক হত না যদি না সানলাইটের উপস্থিতি থাকত। ক্লোরিন আর ব্রোমিনের মিক্সচারটাকে চূড়ান্ত সর্বনেশে করার জন্যই জার্মানরা ওটাকে দিনের বেলায় রিলিজ করেছিল। ওরা অত বোকা নয় যে এমনি এমনিই প্রকাশ্য দিবালোকে শত্রুকে দেখিয়ে দেখিয়ে ক্লোরিনের মতো ভিজি গ্যাস রিলিজ করে দেবে। সূর্যালোক ফ্যাটালিটি রেটের জন্য মাস্ট ছিল। আর ভোপাল গ্যাস কাণ্ডে ইনস্ট্যান্ট ডেথ আরও বাড়ত যদি ওটা দিনের বেলায় ঘটত। সূর্যালোক অনেক সময় অনেক বিক্রিয়ায় হেল্প করে। সানলাইটের এফেক্ট দেওয়া আলোগুলোকে আমারও একটু সন্দেহ হয়েছিল। যেই ক্লোরোফর্মের ফান্ডাটা ক্লিয়ার হল, ঠিক তখনই বুঝলাম এখানেও সূর্যালোকের গল্প আছে। তবে অন্যভাবে। বোঝা গেল?”
“বুঝলাম।” পবিত্র মাথা নাড়ে, “কিন্তু ঘন্টুকে সন্দেহ করলে কখন? আমরা তো এখনও ভাবতে পারছি না।”
“ঘন্টু বা বার্নিং শিখ যা-ই বলো, তাকে বোঝা এবং ধরার জন্যও এক নারীই সাহায্য করেছিলেন। স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধী। যদি তাঁকে জানো, তবেই তুমি বার্নিং শিখকেও জানবে। বার্নিং শিখের ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি এই ভয়াবহ অবসেশন কেউ লক্ষ করল না কেন, সেটাই আশ্চর্য!”
“অবসেশন!” ডঃ চ্যাটার্জি মুখ লম্বা করেছেন, “তাও ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি!”
“ওটাই সবচেয়ে মজার বিষয়।” সে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলে, “ইন্দিরা গান্ধীর অ্যাসাসিনেশনের প্রভাব শিখদের ওপর দু-ভাবে পড়েছিল। কেউ ভিন্দ্রানয়ালেকে সাঙ্ঘাতিক সাধুপুরুষ, বিপ্লবী বলে মনে করত। তাই ইন্দিরা গান্ধীকে যখন বেয়ন্ত সিং আর সতবন্ত সিং উড়িয়ে দিল, তারা খুব খুশি হয়েছিল। অপারেশন ব্লু স্টার তাদের কাছে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ ছিল। ধর্মান্ধ মানুষগুলোর কাছে অকাল তখতের অবমাননা, স্বর্ণমন্দিরের ক্ষতি পাপ ছাড়া আর কিছুই না। তার ওপর ভিন্দ্রানয়ালের কৃপায় খালিস্তানের দাবি ওঠার পর থেকে দিল্লি সরকার পাঞ্জাবকে সন্দেহের চোখেও দেখছিল। ১৯৮২ সালে যখন দিল্লিতে রাজীব গান্ধী এশিয়ান গেম্স বা এশিয়াডের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, সরকার সন্দেহ করেছিল যে ভিন্দ্রানয়ালে বা তার দলবল এই বড়ো ইভেন্টে কিছু একটা তান্ডব করবে। সন্দেহ করাটা অন্যায় নয়, ভিন্দ্রানয়ালে মহাশয়ের কাণ্ডকীর্তি তেমনই ছিল। যেটা অন্যায় হয়েছিল, সেটা হল ওই একটা লোকের উৎপাতের ভয়ে বড়ো বড়ো শিখ অফিসার, আর্মির কর্তাব্যক্তিকে, সম্মানীয় ব্যক্তিত্বদেরও পাঞ্জাব থেকে দিল্লিতে আসতেই দেওয়া হয়নি। কিংবা মাঝপথেই চরম হেনস্থা আর অপমান করা হয়েছিল। এটাও তাদের গায়ে ভয়াবহ লেগেছিল। তাই ইন্দিরা গান্ধী তাদের কাছে সুপার ভিলেন আর বেয়ন্ত সিং অমর শহীদ। আবার গুলশন সিং বা ঘন্টুর মতো কিছু শিখও ছিল যারা ভিন্দ্রানয়ালেকে সন্ত মনে করত না। ওর ডায়েরিটা আমি পুরোটাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি। ইভেন জগদীপ সিং ভাট্টির মুখেও শুনেছি, নিজেরাও দেখেছি, সে মনে করত, যে লোক নিজেই পবিত্র মন্দিরের ভেতরে গোলা, গুলি, গ্রেনেড ঢোকায়, নিজেই অকাল তখতের ওপর চড়ে বসে থাকে, পবিত্র মন্দিরের সিঁড়িতে মানুষ খুন করে অপবিত্র করে, সে আবার কোথাকার সম্ভ, কোথাকার বিপ্লবী!
কিন্তু তবু ধর্মীয় ব্যাপারে হয়তো অপারেশন ব্লু স্টারে স্বর্ণমন্দিরের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াটা তাদের কাছে দুঃখজনক বিষয়ই ছিল। তারা দুঃখ পেলেও ‘ঠিক আছে’ বলে একরকম মানিয়ে নিল। এর কিছু মাস পরেই তারা শুনতে পেল যে অপারেশন ব্লু স্টারের বদলা নিতে প্রধানমন্ত্রীকেই তাঁর বিশ্বস্ত শিখ বডিগার্ডরা গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। তার এফেক্টও তারা স্বচক্ষে দেখেছিল। যার জন্য ১৯৮৪ সালকে শিখেরা আমরণ ভুলবে না। কিন্তু গুলশন সিং-এর মতো কিছু মানুষ আবার ইন্দিরা গান্ধীকে ভিলেন নয়, বেয়ন্ত সিং-এর বেইমানির শিকার হিসাবে দেখেছিল। শৈশবে তারা অত বোঝেনি। কিন্তু বড়ো হয়ে যখন ধর্মকে সরিয়ে যুক্তি দিয়ে গোটা ঘটনাটাকে দেখল, তখন বুঝল ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পেছনে ওঁর শিখপ্রজাতির ওপর সম্মান ও অতিরিক্ত বিশ্বাসই দায়ী। অপারেশন ব্লু স্টারটা এড়ানো যেত কী যেত না সেটা তর্কের বিষয় হতে পারে। এটা বাস্তব যে ভিন্দ্ৰানয়ালেকে সঞ্জয় গান্ধী আর জ্ঞানী জৈল সিঙের কৃপা এত বেশি বাড়িয়েছিল যে ভারত সরকারকেও সে অবজ্ঞা করত। কথা বলে সমস্যা সমাধান করার চেষ্টাও ইন্দিরা চালিয়েছিলেন। কিছুতেই কিছু হয়নি। তার ওপর যেভাবে পাঞ্জাবের হিন্দুদের সে কচুকাটা করছিল সেটাও সমর্থনযোগ্য নয়। তাই শেষমেষ অপারেশন ব্লু স্টার ছাড়া আর কোনো রাস্তা ইন্দিরা খুঁজে পাননি। তাতে ধর্মান্ধ শিখরা ভয়াবহ খেপল। সব জেনেও অতবড়ো একজন দূরদর্শী, বুদ্ধিমতী নারী ভাবতেও পারেননি যে তাঁর শিখ বডিগার্ডরাই তাঁকে খুন করতে পারে। অথচ এমন ষড়যন্ত্রের আঁচ গোয়েন্দাবাহিনী আগেই পেয়েছিল। তবু বেয়ন্তকে তিনি সরাতে দেননি। উলটে পুনর্বহাল করেছিলেন। বিশ্বাস তাঁর এতটাই অটুট! তাই ইন্দিরা তাদের কাছে ভিলেন নন্, ভিকটিম হলেন। আর বেয়ন্ত সিং, সতবন্ত সিং মূল ভিলেন। ভারতবর্ষের প্রতি চিরবিশ্বস্ত শিখপ্রজাতির কলঙ্ক। এই সহানুভূতি থেকেই গুল্লুর ইন্দিরা গান্ধীর ওপর এতটাই অবসেশন তৈরি হল যে সব কিছু ছাপিয়ে সেই অবসেসড্ মনটাই বারবার বেরিয়ে আসছিল। পুলিশ সেটা লক্ষই করেনি।”
“পুলিশ কেন, আমরাও কেউ লক্ষ করিনি। তুমি বাপু সেটা লক্ষ করলে কীভাবে? এই সুর্মা ভোপালি মার্কা ডিডাকশন এল কোথা থেকে?”
ডঃ চ্যাটার্জির কথা শুনে অধিরাজ হাসল, “আজ্ঞে নাম থেকে।”
“নাম?”
“হ্যাঁ। বার্নিং শিখের অবতারগুলোর নামের প্যাটার্নটা লক্ষ্য করুন। স্টেফানো মাইনো, কেহর সিং, নাথুরাম, রাজেন্দ্র কুমার, মহম্মদ ইউনুস, পরমেশ্বর নারায়ণ রেড্ডি, রামেশ্বর রাও, সমা বিবি, বৌদ্ধ লামা বুদ্ধদত্ত, কমলা, ওয়ার্ডবয় স্যাম ত্রিবেদী এবং প্রিয়দর্শিনী!” অধিরাজ একটু থেমে বলল, “আপাতদৃষ্টিতে নামগুলো খুব সাধারণ। তেমন কোনো বিশেষত্ব নেই। কিন্তু আমার মতো যদি আর এক পিস্ ইন্দিরা গান্ধী স্পেশালিস্ট কেউ থাকত তবে সে বুঝতে পারত যে নামগুলোর মধ্যে অদ্ভুত একটা মিল আছে। একটা আপাতদৃষ্টিতে অদৃশ্য লিঙ্ক।”
“কী সেটা?”
“এই প্রত্যেকটা নামই ইন্দিরা গান্ধীর জীবন কিংবা মৃত্যুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। ‘স্টেফানো মাইনো’ সম্পর্কে ইন্দিরা গান্ধীর বেয়াইমশাই হন। অর্থাৎ সোনিয়া গান্ধীর পিতাশ্রী। ‘কেহর সিং” তাঁর হত্যার ষড়যন্ত্রকারী। কিন্তু সেখানেও প্যাটার্ন আছে। একমাত্র বোধহয় তাকেই গদ্দার বলা যায় না। বেয়ন্ত সবচেয়ে বড়ো বিশ্বাসঘাতক। সতবন্ত সদ্য রিক্রুটেড হলেও তার কাজ ছিল প্রধানমন্ত্রীকে রক্ষা করা, যার উলটোটাই করেছে। একমাত্র কেহর সিং মাস্টারমাইন্ড বা শয়তান যাই হোক্-না-কেন নেমকহারাম নয়। ইন্দিরার নুন সে খায়নি। তাঁর বিশ্বস্ত হওয়ার দাবিও কখনও করেনি। শত্রুতা ছিল, ডাইরেক্ট শত্রুতাই করেছে। তাই বার্নিং শিখ কেহর সিং-এর নামটা ইউজ করলেও ‘ভূলেও বেয়ন্ত, সতবন্ত বা জর্নেল সিং ভিন্দ্রানয়ালের নাম কখনও নেয়নি। এরপর….।”
“নাথুরাম। নাথুরাম গড়সে?” এডিজি সেন বিস্মিত, “কিন্তু সে তো মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী। মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে নেহরু ফ্যামিলির লিঙ্ক নেই বলেই তো জানি।”
“আপনি ঠিকই জানেন। তার সঙ্গে এটাও ঠিক যে এই ‘নাথুরামে’র সঙ্গে নাথুরাম গড্রসে-রও কোনো লিঙ্ক নেই। সবাই নাথুরাম গডসে-কেই চেনে। কিন্তু আর এক ‘নাথুরাম’ও ছিল, যে জওহরলাল নেহরুর আমল থেকে নেহরু পরিবারের অতি বিশ্বস্ত ভৃত্য ছিল। তাকে কেউ চেনে না। অথচ ইন্দিরার সবচেয়ে কাছের বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য মানুষগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল তাঁর পার্সোনাল ‘ভৃত্য’, ‘নাথুরাম’। যে ওই অভিশপ্ত দিনেও মালকিনের পেছন পেছন তাঁর অফিসের পথে চলেছিল। যার কোলেই রক্তাপ্লুত হয়ে লুটিয়ে পড়েন ইন্দিরা। ইতিহাস এই ‘নাথুরাম’কৈ মনে রাখেনি। তবে বার্নিং শিখ রেখেছে। এরপর আসুন ‘রাজেন্দ্র কুমার’-এ। রাজেন্দ্র কুমারের নাম শুনলেই আপনাদের সবার দারুণ হ্যান্ডসাম বলিউডের হিরোকেই মনে পড়বে। মজার বিষয় এই রাজেন্দ্র কুমারও তিনি নন। ইনি হচ্ছেন রাজেন্দ্র কুমার ধাওয়ন, ওরফে আর কে ধওয়ন, যিনি ইন্দিরা গান্ধীর পার্সোনাল সেক্রেটারি তো ছিলেনই, অত্যন্ত বিশ্বস্ত সঙ্গীও ছিলেন। আর কে ধওয়নকে ছাড়া ইন্দিরার চলত না। ইনিও নাথুরামের মতো ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার সময়ে ওঁর সঙ্গেই ছিলেন। অন্তিম যাত্রার সঙ্গী।”
“নেক্সট মহম্মদ ইউনুস। বাংলাদেশের নোবেল জয়ী ইকোনমিস্ট?”
“না। মহম্মদ ইউনুস খান। ইন্দিরা গান্ধীর আর এক কাছের মানুষ। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ অবধি তিনি প্রধানমন্ত্রীর সচিব ও সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শদাতা ছিলেন। ভারতীয় অ্যাম্বাসাডরও হয়েছিলেন। ‘পরমেশ্বর নারায়ণ রেড্ডির নাম থেকে ‘রেড্ডি’ পদবীটা বাদ দিন। পরে রইল ‘পরমেশ্বর নারায়ণ’। ইনি হলেন পরমেশ্বর নারায়ণ হকসর। বা পি এন হকসর। ইন্দিরা গান্ধীর কেরিয়ারের একদম প্রথম দিকের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি ছিলেন তিনি। অনভিজ্ঞ ইন্দিরা তাঁর ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রাখতেন। নির্ভরও করতেন। ‘রামেশ্বর রাও’ এর রাওটা কেটে ‘দয়াল’করে দিন। ব্যক্তিটিকে চিনতে পারবেন। রামেশ্বর দয়াল ইন্দিরা গান্ধীর পার্সোনাল সিকিউরিটি অফিসার ছিলেন। ইনিও অন্তিম মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর পেছন পেছন চলছিলেন। ‘সমা’ বিবি হলেন দূরদর্শনের বিখ্যাত সুন্দরী নিউজ অ্যাঙ্কর সমা সুলতান। যিনি সজল নয়নে সৰ্বপ্ৰথম প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুসংবাদ টেলিভিশনে পড়েছিলেন। আপ্রাণ নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করেও পারেননি। খবরটা বলতে গিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিলেন।”
“বাপ্ রে!” পবিত্র আঁতকে ওঠে, “এরকম বিটকেল প্যাটার্ন ফলো করলে কেউ ধরতেও পারবে না! নাম তো নামই। এতদিন শুনেছি নামে কী বা আসে যায়! এখন দেখছি, নামেই শালা ক্লু বসে আছে। বুদ্ধদত্ত কে ছিলেন? ইন্দিরা গান্ধী কি বুদ্ধের ভক্ত ছিলেন, না বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন?”
“কোনোটাই নয়। ওই নামটার পেছনের ইতিহাস আর বিড়ালদত্ত-র দুধ খাওয়ার রহস্য বললেই বুঝবে লোকটার অবসেশন কোন্ পর্যায়ে ছিল। আমি আগেই এই নামের প্যাটার্নটা লক্ষ করেছিলাম। তাই বার্নিং শিখকে রিড করতে সুবিধা হচ্ছিল। যখনই শুনলাম ত্রিপাঠীজির বাড়িতে বৌদ্ধ লামারা আসতেন, তখনই দুটো জিনিস মনে পড়ল। ইন্দিরা গান্ধী প্রথম পোখরানে যে নিউক্লিয়ার ওয়েপন্ টেস্টের সফল প্রোগ্রাম নামিয়েছিলেন সেটার নাম ছিল ‘স্মাইলিং বুদ্ধ’। যদিও এই ‘বুদ্ধ’ আদৌ শান্তির প্রতীক নন্। সুতরাং এই মূর্তিমান অশান্তিটি স্মাইলিং বুদ্ধের মুখোশের আড়ালের পরমাণু বোমা হতেই পারে। আর দ্বিতীয়টা আরও ইন্টারেস্টিং। হিন্দুস্তান টাইমসের একটা নিতান্তই অনামী ছোট্ট ট্যাবলয়েড ‘মর্নিং ইকো’কে ইন্দিরা গান্ধী একটি ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন। তা নিয়ে পরে বিস্তর জলঘোলাও হয়েছিল। কিন্তু সেখানে একটা মজাদার গল্প ছিল। এমার্জেন্সির পর ইন্দিরার পরাজয় নিয়ে একটা প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান ‘মাই ডিফিট কামস্ কোয়াইট লাইক দ্য বুদ্ধা স্টোরি’। বুদ্ধের গল্পটি কী? বুদ্ধদেব একটি ‘পুল’ বা পুষ্করিণী খনন করেছিলেন। তিনি গ্রামের মানুষদের কাছে আবেদন করেন যে কিন্তু পুকুরটি ভরার জন্য তারা যেন পাত্রে করে বেশ খানিকটা দুধ নিয়ে আসে। প্রত্যেকেই ভাবল যে গ্রামের বাকি লোকেরা তো দুধ নিয়ে আসবেই। সেই ফাঁকে তালে আমি যদি খানিকটা জল মিশিয়ে দিই তাহলে দেখতে কে আসছে। সেই ভেবে সকলেই জলভরা পাত্র নিয়ে গেল। বুদ্ধের দুধপুকুর মানুষজনের ফাঁকিবাজিতে জলে ভরে উঠল। এটা বলে ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘অ্যান্ড দ্যাটস্ মাই স্টোরি’। এবার স্মাইলিং বুদ্ধ আর বুদ্ধের দুধপুকুরের গল্পের পরিণাম দেখো। মৃত্যু এল বুদ্ধের হাসি দিয়ে। সেইজন্যই বলেছিলাম যে লোকটার নামের শুরুতে বুদ্ধ থাকবেই। আর প্রস্থেটিক মেক-আপ নিয়ে শক্ত খাবার খাওয়া যায় না। নরম খাবার বা অন্য লিকুইড খেতেই পারত। কিন্তু ইন্দিরার বলা বুদ্ধদেবের দুধপুকুর আর দুধের বাটি নিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা তার মনে এমন গেঁথে গিয়েছিল যে দুধ ছাড়া আর কিছু সে খেলই না। এই অবসেশন আমি শুরু থেকেই লক্ষ করেছি। আর বৌদ্ধ লামা শুনে দুটোই আমার মনে পড়েছিল। তাই আন্দাজ করেছিলাম। দেখা গেল, বাস্তবেও ঠিক তাই।”
“ওকে… ওকে…!” এডিজি সেন বললেন, “এবার বুঝতে পারছি। ‘কমলা’—কমলা নেহরু। ইন্দিরা গান্ধীর মা!”
“ঠিক তাই। এখানে যদিও কমলা আর ফিজিওথেরাপিস্ট রাজীব চন্দ—দু-জনকে নিয়ে কনফিউশন ছিল। ধরেই রেখেছিলাম হয় কমলা হবে, নয় রাজীব। একজন মিসেস গান্ধীর মা, অন্যজন সন্তান। কিন্তু কোনজন বোঝা যাচ্ছিল না। দু-জনেই হতে পারত। তাই ‘বোলে সো নিহাল’-এর সাহায্য নিতে হল। আর আর্বানায় তো আমি নিশ্চিতই ছিলাম প্রিয়দর্শিনী ছাড়া অন্য কেউ হতেই পারে না। কারণ স্বয়ং ইন্দিরারই মিডলনেম ‘প্রিয়দর্শিনী’। রবীন্দ্রনাথের দেওয়া এই নামটি ওঁর নামের মাঝখানে বসত। ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী। বার্নিং শিখের এটা প্রিয়তম নাম। তাই প্রিয়দর্শিনীই যে বার্নিং শিখ তা শুরুতেই বুঝে গিয়েছিলাম। কিন্তু প্রমাণ করার উপায় ছিল না। এই যুক্তিটা ডিডাকশনের জন্য যতই মোক্ষম’ হোক, আইনের কাছে হাস্যকর। কিচ্ছু প্রমাণ করা যেত না। তাই ব্যাটার খোঁজ জানলেও চুপচাপই থাকতে হল। যদিও মাঝখানে আমি গুরশীলের কেসটার সঙ্গে গুলিয়েছিলাম। ওটা আমারই ভুল। গুরশীল-আমনদীপের ইতিহাস অন্য ছিল। তবে গুলাব সিঞা মহাশয় এনাকেই ফলো করছিলেন।”
অর্ণবের পেটে অনেকক্ষণ ধরেই একটা প্রশ্ন সুড়সুড় করছিল। আর থাকতে না পেরে বলেই ফেলল, “তাহলে এর মধ্যে স্যাম ত্রিবেদী কোথা থেকে এসে পড়ল? স্যাম তো মিস্ দত্তের কাজিন সিস্টার!”
“আরে, কাজিন সিস্টারকে মারো গুলি।”
কথাটা একটু বিরক্তির সঙ্গে বলেই জিভ কাটল অধিরাজ, “সরি, মিস্ দত্ত। আপনার বোনকে শ্যুট করতে চাইছি না। জাস্ট বলছি, যে ওঁর এখানে কোনো ভূমিকাই নেই। অর্ণবের মিস্ দত্তের বোন স্যামকে মনে পড়ল, কিন্তু ‘স্যাম মানেক্শ’ এর নাম মনে পড়ল না। বিখ্যাত ‘স্যাম বাহাদুর’। ইন্দিরা গান্ধীর ডানহাত। অতি বিশ্বস্ত সেনাপতি। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে তিনি স্যাম মানেকশ ছাড়া আর কারোর দিকে তাকাতেন না। স্যাম মানেকশ ওঁর তুরুপের তাস। আমি প্রথমে স্যাম ত্রিবেদী না শ্যাম ত্রিবেদী, তাই নিয়ে ধন্দে ছিলাম। ত্রিবেদীর সঙ্গে ‘স্যাম’ নামটা যায় না। তবে যখনই ‘স্যাম বাহাদুর’কে মনে পড়ল, তখনই বুঝলাম শ্যাম নয় ওটা নিঃসন্দেহে ‘স্যামই’। লক্ষ্য করো প্রত্যেকটা নাম কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর কাছের মানুষদের। একমাত্র কেহর সিংকে বাদ দিতে পারো। সে শত্রু, কিন্তু শত্রুতাটাও সৎ সাহসের সঙ্গে করেছিল। ষড়যন্ত্র করলেও নিজের হাতে মারেনি, বেয়ন্ত সিং-এর মতো হত্যার পরে কাপুরুষের মতো পালানোর চেষ্টা করে গুলিও খায়নি, সতবন্তের মতো ডায়লগবাজিও করেনি। চুপচাপ ফাঁসিতে চড়েছে। বাকিরা সবাই ওঁর বিশ্বস্ত ও আপনজন। এই নামগুলোর পেছন দিয়ে বার্নিং শিখ মিথ্যে হলেও ‘ইন্দিরা মা’-এর কাছের মানুষ হতে চেয়েছিল। এটা ওর একটা মারাত্মক ফ্যান্টাসি, ইউফোরিয়া বা একরকমের লোভ। আর এই প্যাটার্নটা ঘন্টুর সঙ্গেও মিলল যখন ওর ছেলের বিয়ের কার্ডটা দেখলাম।”
“কী যে বলো!” পবিত্র মাথা নাড়ল, “বিয়ের কার্ড আমরা সবাই দেখেছি। ঘন্টেশ্বর দাস বা ঘন্টেশ্বর নামে ইন্দিরা গান্ধীর কোনো আত্মীয় বা কাছের মানুষ থাকতেই পারে না! থাকলে অ্যাসাসিনেশনের দরকার পড়ত না। উনি নিজেই জলে ডুবে মরতেন।”
“না। ঘন্টেশ্বর বলে কেউ ছিল না। কিন্তু রতি বলে থাকতে পারে, সত্যজিৎ বলেও থাকতে পারে। ইনফ্যাক্ট ছিলও। মিসেস গান্ধীর শাশুড়ির নামই ‘রতিমাই’ ছিল। ফিরোজ গান্ধীর মা। পার্শি মেয়েদের নামে ‘মাই’ বা ‘বাই’ থাকে। ছেলেদের ক্ষেত্রে ‘বাওয়া’ বা ‘বাবা’ অথবা ‘জি’। রতিমাই-এর ‘মাই’ শব্দটা ‘মা’-কে রিপ্রেজেন্ট করে। নিজের বউকে তো আর মা বলে ডাকতে পারে না। তাই ‘মাই’ বাদ দিয়ে শুধু ‘রতি’। আবার অন্যদিকে সত্যজিৎ রায় – সত্যজিৎ রায়ই হতেন না, যদি না ইন্দিরা গান্ধী থাকতেন। তিনি সত্যজিতের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক! সত্যজিতের একনিষ্ঠ ভক্তও বটে। রে’র একটি ফিল্মও উনি মিস্ করতেন না। সত্যজিতের ছবি যাতে বিদেশে প্রচার ও প্রসার পায় তার জন্য ইন্দিরার প্রচেষ্টা অনস্বীকার্য। দু-জনের মধ্যে চমৎকার বন্ধুত্বের সম্পর্কও ছিল। রতি বউদি মুসলিম ছিলেন। আসল নাম আয়েশা। ঘন্টুই আদর করে তার নাম রেখেছিল রতি। আমরা সবাই তা জানতাম। কিন্তু কখনও এ নিয়ে মাথাই ঘামাইনি। অ্যান্ড চেরি অন বটম, ঘন্টুর ছেলের ডাকনাম যে পুপুল সেটাও সর্বজনোবিদিত। অথচ বার্নিং শিখ কেসের আগে কখনও তা নিয়েও ভাবিনি। পুপুল তো ছেলেদের মধ্যে কমন নাম। হতেই পারে। তা নিয়ে চিন্তার কোনো কারণই নেই। এখনও থাকত না, যদি না এই প্রত্যেকটা নামই কোনো না কোনোভাবে মিসেস গান্ধীর সঙ্গে লিঙ্কড না হত।”
“পুপুল আবার কে। রাজীব গান্ধীর ডাক নাম নয়তো? নাকি…’
পবিত্র আরও কিছু বলতে গিয়েও থমকে গেল। এডিজি সেন প্রায় লাফিয়েই উঠেছেন।
“ওঃ গড! ওঃ গড!” তিনি প্রচণ্ড উত্তেজিত, “এটা এভাবে ভাবিনি কেন! পুপুল শুধু ছেলেদের নাম নয়, মেয়েদের নামও হতে পারে। পুপুল মেহতা বা পুপুল জয়াকর! ইন্দিরা গান্ধীর বেস্ট ফ্রেন্ড ও জীবনীলেখিকা। মিসেস গান্ধীর যে ক-জন হাতে গোণা একদম প্রিয় বন্ধু ছিল, পুপুল তাদের অন্যতম। ইন্দিরা গান্ধীর বন্ধু বললেই আমাদের তেজি বচ্চনের কথা মনে পড়ে। বাট্ ইয়েস, আই ক্যান কানেক্ট নাও। পুপুল জয়াকর! সবচেয়ে প্রিয় সখী, যাঁর কাছে ইন্দিরা নিজের গোপনতম কথাটিও বলতেন।”
“হ্যাঁ স্যার।” অধিরাজ মাথা ঝাঁকায়, “প্রথমে নামগুলো নিয়ে অত ভাবিনি। কিন্তু যখন বিয়ের কার্ডে আবার ভালো করে দেখলাম আর জানলাম যে পুপুলের ভালো নাম সত্যজিৎ তখন খটকা লাগল। একটা, দুটো নাম কো-ইনসিডেন্স হতে পারে। কিন্তু এখানে একমাত্র নিজের নামটা ছাড়া বাকি সবকটা নামই ঘন্টু রেখেছে। আপাতদৃষ্টিতে প্রত্যেকটা নামই কমন। অথচ একসঙ্গে তিনটে নামের উপস্থিতি ও তাদের মধ্যে লিঙ্ক উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না! তখন থেকেই ওর দিকে সন্দেহ গেল। তার আগেও অবশ্য বেশ কয়েকবার ইনফর্মারদেরও হালকা সন্দেহ করেছি। এরপর থেকে একে একে হিসাব মেলাতে বসলাম। মিলেও গেল!”
“ইনফর্মারদেরও সাসপেক্ট লিস্টে রেখেছিলে তুমি?”
“হ্যাঁ। কারণ প্রতিবারই বার্নিং শিখের কাণ্ডকীর্তি দেখে মনে হচ্ছিল এই লোকটা কোনো সাধারণ লোক নয়! প্রস্থেটিক মেক-আপে সিদ্ধহস্ত, একাধিক ভাষা তার দখলে, নানাবতি কমিশন-কপুর মিত্তল কমিটির রিপোর্ট অবধি সে পৌঁছোতে পারে, কোন্ লোকটা কোন্ শহরে আছে সেটা জানাও তার কাছে হালুয়া-পুরী, পুলিশ ও ইনভেস্টিগেটিং অফিসারদের অভ্যাস, দুর্বলতা, ভেতরের খবর সব জেনে বসে আছে, বে-আইনি অ্যাসিড, ড্রাগস, ওষুধ, গাঁজার র্যাকেট, বম্ব-সব তার হাতের মধ্যে, কোথায় গেলে কোন কাজটা হবে তা সে জানে, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট আমদানি করতে অসুবিধে হয়নি, কম্ব্যাটে আর মেন্টাল ম্যানিপুলেশনে ওস্তাদ আরও যা যা তার ধর্ম আমরা পেয়েছি তাতে মনে হয়েছে, লোকটা হয় ডিপার্টমেন্টেরই লোক, নিজেই কোনো পুলিশকর্তা, স্পাই, প্রাইভেট গোয়েন্দা বা আর্মিম্যান। কিংবা ওরকমই অত্যন্ত শক্তিশালী কিছু। আমরা এত কিছু ভেবে ফেলেছিলাম ঠিকই, পাশাপাশি আমার কেন জানি না বারবার সার্জিক্যাল স কিলারের কেসটাও মনে পড়ছিল। সেখানেও কিলার এমনই পাওয়ারফুল ছিল। কিন্তু তখন আমরা সুমঙ্গল পণ্ডিতকে সন্দেহ করেছিলাম যে লোকটা খবরি মহলে ‘শেয়াল পণ্ডিত’ নামে বিখ্যাত ছিল। প্রায় ‘মিথই’ বলা যায়। যদিও শেষপর্যন্ত সে নিজেই খুনির শিকার হয়েছিল। বাট, দ্য পয়েন্ট ইজ—তাকে সন্দেহ করার পেছনে এই কোয়ালিটিগুলোর কিছুও ছিল। সেই অবিশ্বাস্য মেক-আপের ক্ষমতা, যে কোনো জায়গা থেকে গোপনতম খবর বের করে আনার দক্ষতা, কম্ব্যাট স্টাইল, ভয়াবহ চাতুর্য। অফিসারদের বিশ্বস্ত তাই তাদের সব খুঁটিনাটি, সব দুর্বলতা একজন ইনফর্মার জানবেই, পেশার প্রয়োজনেই অন্ধকার দুনিয়ায় তার অবাধ যাতায়াত। যে-কোনো শহরে সে নিজের গোপনীয় কাজে চলে যেতে পারে। পরিবারের কেউ প্রশ্ন করবে না। বে আইনি ড্রাগস, অ্যাসিড থেকে শুরু করে গাঁজা, কেরোসিন কোথায় পাওয়া যায়, কালোবাজারি কোথায় হয়, সবই তার নখদর্পণে। শুনতে আপনাদের হয়তো খুব ভালো লাগবে না, কিন্তু এটাই বাস্তব যে আমাদের ইনভেস্টিগেশনে ফিফটি পার্সেন্ট মদত যোগায় এই ইনফর্মার র্যাকেট! গুল্লু, ঘন্টু বা যাদবের মতো একজন তুখোড় ইনফর্মার অনায়াসেই মদনের মতো আর্চ ক্রিমিনাল কোথায় লুকিয়ে আছে, এবং কবে, কোথায় আসবে, এমন চূড়ান্ত গোপন খবরও বের করে আনতে পারে। তাই নানাবতি কমিশনের রিপোর্টের নামগুলোর মালিকেরা এখন কোথায় আছে, সেটা বের করা তো স্রেফ জলভাত। একাধিক ভাষাও সে জানবে কারণ অপরাধীরা বা তাদের কানেকশনরা যে সবাই বাঙালি হবে এমন কোনো কথা নেই। একজন গ্যাংস্টার বা টেররিস্টের ডানহাত একজন সাউথ ইন্ডিয়ানও হতে পারে। ম্যানিপুলেট করাটা তো খবরিদের অন্যতম সুপার পাওয়ার। যে লোকটা নিজেকেও বিশ্বাস করে না, সেই লোকটারও কাছের মানুষ হয়ে উঠতে তাদের জুড়ি নেই! আন্ডারওয়ার্ল্ডের লোকজন কাউকে বিশ্বাস করে না। আর সন্দেহ করলেই মৃত্যু কপালে নাচছে। তাই ওরকম হার্ড-নাটকেও এরা দিব্যি ক্র্যাক করে বসে থাকে। কী করে? ম্যানিপুলেশন ছাড়া আর কী! যত শক্ত ঠাঁই-ই হোক, ঠিক পটিয়ে পাটিয়ে কথা বের করে আনবেই। আস্থা তৈরি করতে এরা ওস্তাদ। সবটা দেখে মনে হল, আমরা স্পাই, পুলিশ, আর্মি, প্রাইভেট ডিটেকটিভ সব ভেবে ফেললাম, কিন্তু একজন ইনফর্মার নয় কেন?
ইনফর্মারদের নিজস্ব একটা শক্তিশালী নেটওয়ার্কও থাকে। তারা দিল্লি, কানপুর, বেঙ্গালুরুর খবরও সেই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই আরামসে পেতে পারে। তারই ইনফর্মার সঙ্গী প্রয়োজনে তাকে ওখানকার পুলিশদের সঙ্গে গোপনে পরিচয়ও করিয়ে দিতে পারে, যার জন্য হয়তো সে তাদের বিশ্বাসভাজনও হয়ে উঠতে পারে। একটা জিনিয়াস ইনফর্মার কী করতে পারে তা পি সি চৌধুরীর বাড়ির গার্ডদের অবস্থা দেখেই বোঝা গেছে। একটা লোক কী সহজে অতগুলো লোককে কেটে ছড়িয়ে দিল! অন্য কেউ হলে তার হাতের জলও ছুঁত না গার্ডরা। যার দোকানে বসে স্বয়ং তাদের ওপরওয়ালারা চা খান, এমনকি আমিও খেয়েছি, তাকে অবিশ্বাস করার জায়গাই নেই! আর বাকিরা একটু হাই প্রোফাইলের লোক। চাকর-বাকর সেজে বা লো প্রোফাইলের মানুষ হয়ে সবার পায়ের তলায় থাকতে তাদের অসুবিধে হয়। একজন ইনফর্মার এতটাই সাধারণ যে কিছুতেই তার কোনো সমস্যা নেই। সে সস্তা মদের ঠেকে বা বস্তিতে গিয়ে সদ্য শহরে আগত মজুরদের সঙ্গে আলাপ করতে পারে। যতরাজ্যের মাতাল, গাঁজাখোরদের সঙ্গে ঘুরঘুর করে। শহরে একটা নতুন বাসিন্দা এলেও ঠিক জেনে যায়। পরিযায়ী শ্রমিকদের আস্তানা, রাস্তার কোন ভিখিরির ইতিহাস কী—সব সে জানে। অন্যান্য খবরিদের অ্যাক্সেসও পেতে পারে। ইসমাইল আর রকির মতো ধূর্ত খবরিকে স্পট করে খুন করা, আর যা-ই হোক্ একজন দিল্লি থেকে আগত খুনির কীর্তি হতেই পারে না। ওদের স্টক করার ক্ষমতা আনবিলিভেল্। ছায়াকেও দেখা যায়, অথচ এই দুই স্টকারকে হলোম্যানও বলা চলে। ওরা কাউকে বিশ্বাসও করে না যে আশেপাশে ঘেঁষতে দেবে। তবু মরল! তার মানে ওরাও কাউকে বিশ্বাস করেছিল। সেই লোকটির আরও একজন ইনফর্মার হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল নয় কি?”
“পয়েন্ট আছে!” ডঃ চ্যাটার্জি ন্যাপকিনে মুখ মুছে বললেন, “ইনফ্যাক্ট ভেরি স্ট্রং পয়েন্ট।”
“শুধু একটা নয়। আরও অনেক পয়েন্ট আছে।” সে বুঝিয়ে বলে, “বার্নিং শিখ অতি বড়ো ক্রিমিনাল হলেও চোর নয়, রেপিস্টও নয়। ১৯৮৪তে দাঙ্গার সঙ্গে লুটপাট, গ্যাং রেপও হয়েছিল। তার যা ভয়াবহ প্রতিশোধস্পৃহা তাতে খুনের পাশাপাশি লুটপাট আর রেপ করার সুযোগও ছিল। সবক-টা বাড়িতে যা মালকড়ি আর গয়না ছিল তা যদি সে লোপাট করত তবে কমসে কম পঞ্চাশ থেকে ষাট লাখ টাকার সম্পত্তি হয়ে যেত। অথচ সেসব কিছুই হয়নি। এর পেছনে শিখধর্মের শিক্ষা রয়েছে। বার্নিং শিখ যে ধর্মভীরু তা বুঝতে বাকি নেই। এরকম একটা লোক খুন করার পর একবার মাফ চাইতে গুরুদ্বারা যাবে না? অন্তত খুন করার আগে তো যাবেই। অথচ গুলাব সিঞা জনাব জানালেন গত একবছরে কোনো নতুন মুখ কোনো গুরুদ্বারায় দেখা যায়নি। কলকাতা দিল্লি নয় যে শিখ কমিউনিটির সংখ্যা বিশাল। এখানে শিখদের সংখ্যা কম এবং গুরুদ্বারার সংখ্যা সেই তুলনায় বেশি আর বসতিগুলোর আশেপাশেই গড়ে উঠেছে। সেই স্বল্প সংখ্যক দর্শনার্থীদের মধ্যে একটা নতুন মুখ কারোর চোখে পড়ল না? জ্ঞানী, গ্রন্থিরা যদি লক্ষ্যও না করেন, অ্যাট লিস্ট যারা গুরুদ্বারার বাইরে জিনিসপত্র বিক্রি করে তারা তো দেখবেই! তখনই খট্কা লেগেছিল, এমন নয়তো যে মুখটা একেবারেই নতুন নয়, বরং পুরোনো? বার্নিং শিখ শৈশবে দিল্লিতে ছিল। তারপর মাইগ্রেটেড হয়ে কলকাতাতেই চলে আসেনি তো? কারণ ওই ঘটনার পর অনেক শিখই কলকাতাবাসী হয়েছিল। এই বিশ্বাসটা আরও পোক্ত হল যখন গুলাবোঁ মহাত্মা গান্ধী রোডের গুরুদ্বারা মুনি লাল শিখ সঙ্গতের সামনে জনৈক সর্দারের রহস্যজনক আবির্ভাবের কথা বলল। বেছে বেছে ওই গুরুদ্বারাটাই কেন? ওই লোকটাই যে বার্নিং শিখ সেটা পরে প্রমাণিত হয়েছিল। সে কোমল কৌরের বাড়িতে থাকত। সেক্ষেত্রে ওর কাছেই ইটালগাছা গুরুদ্বারা শিখ সঙ্গত আছে। সেখানেই যাওয়া স্বাভাবিক নয় কি? সেসব ছেড়ে ব্যাটা ত্রিশ মিনিট দূরত্বে মহাত্মা গান্ধী রোডে ‘ওয়াহেগুরু’র কাছে ক্ষমা চাইতে আসে! ব্যাপারটা অদ্ভুত যদি বার্নিং শিখ শহরে নতুন এসে থাকে। সেক্ষেত্রে সে নিকটবর্তী গুরুদ্বারাটিকেই বেছে নেবে। অথচ যদি এমন হয় যে বার্নিং শিখ আদতে পশ্চিমবঙ্গেই বসে আছে, এবং হয়তো সে নিয়মিত মহাত্মা গান্ধী রোডের ওই গুরুদ্বারাটিতেই যেতে অভ্যস্ত, সেক্ষেত্রে কোভিডের পর কোনো গুরুদ্বারাতেই নতুন মুখ না আসা, আর ইটালগাছার গুরুদ্বারা ছেড়ে বার্নিং শিখের মহাত্মা গান্ধী রোড অবধি ট্র্যাভেল করাটা জাস্টিফায়েড হয়ে যায়। আর মহাত্মা গান্ধী রোডেই তো আমাদের শ্রীমান ঘন্টুর বাড়ি ও চায়ের দোকান। গুরুদ্বারা থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে।”
“হুঁ। এভাবে ভাবিনি।”
“কারণ ঘন্টু আমাদের সবার সন্দেহের উর্ধ্বে ছিল। মদন বলেছিল যে বার্নিং শিখের কথা শুনে ও বুঝতে পেরেছিল যে লোকটা দিল্লির। তার কারণ দিল্লির হিন্দিতে কিছু পেটোয়া শব্দ আর স্ল্যাং থাকে। প্রত্যেক প্রদেশের হিন্দির আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। এই জিনিসটাও আমার কানে লেগেছিল। যখন প্রথম কুড়ি লিটার কেরোসিন গায়েব হওয়ার খবরটা ঘন্টু দেয় আর আপ্তে সাহেবের বাড়িতে নিয়ে যায়, স্পষ্ট মনে আছে আপ্তেসাহেবের অর্ধাঙ্গিনী বলেছিলেন, ‘রকেল’ নেই। ‘রকেল’ হচ্ছে কেরোসিন তেল। মহারাষ্ট্রে, বিশেষ করে মুম্বাইয়ের মারাঠিরা কেরোসিনকে ‘রকেলই’ বলে। সাধারণ হিন্দিভাষীরা বলে ‘ঘাসলেট’ কিংবা ‘কেরোসিন’। কিন্তু ঘন্টু শুরুতেই মুখ ফস্কে কেরোসিনকে ‘মিট্টি কা তেল’ বলে ফেলেছিল। ‘হাম লোগ ইয়াহা মিট্টি কা তেল খরিদনে নেহি আয়ে ভাবিজি।’ সেটা শোনামাত্রই আমার কানে খট্ করে লাগে। আমি দাঙ্গার ওপর যত ডকুমেন্টারি দেখেছিলাম সবগুলোতেই অন্যরা কেরোসিন বললেও সব শিখেরাই কেরোসিনকে ‘মিট্টি কা তেল’ বলছিল। পাঞ্জাবে কেরোসিনকে ‘মিট্টি কা তেলই’ বলা হয়। দিল্লিতেও অনেকে বলে। অথচ ঘন্টু বাঙালি! এখানেই শেষ নয়৷ আপ্তেসাহেবের সঙ্গে কথোপকথনেই যখন খুচরো টাকার প্রসঙ্গ ওঠে, তখন আপ্তেসাহেব বলেছিলেন ওঁর কাছে ‘চিল্লর’ ছিল না। ‘চিল্লর-টাও মুম্বাইয়ের হিন্দি। অন্যান্য জায়গায় ‘ছুট্টা প্যায়সা’। বাঙালিরা বলে খুচরো পয়সা। অথচ ঘন্টু বলল, ‘খুল্লা পয়সা”! আবার চমক! খুল্লা পয়সা কথাটা বাঙালিরা হিন্দি বললেও বলবে না। ওটাও খাঁটি দিল্লিরই ভাষা বা কয়েনেজ। একমাত্র দিল্লিতেই খুচরোকে ‘খুল্লা প্যায়সা’ বলে। এছাড়াও কোমল সিং ভল্লার বাড়ির নতুন অতিথির শিস দেওয়া প্রসঙ্গে ও বলেছিল কেউ বুঝি মদ খেয়ে ‘ভণ্ড’ হয়ে শিস্ বাজাচ্ছে। বাক্যটা কিছুটা এরকম, ‘মদ-গাঁজা ফুঁকে ভণ্ড হয়ে অসময়ে সিটি বাজাচ্ছে’। ভণ্ড শব্দটার বাংলায় অন্য অর্থে ব্যবহার হয়। কপট, শঠ বা ছদ্ম হিসাবে। কিন্তু দিল্লিতে মাতাল বা নেশা করে উলটে পড়াকেই ‘ভণ্ড’ হওয়া বলে। এরপর যখন কোমলের প্রসঙ্গ এল, তখন লক্ষ্য করো, প্রত্যেকেই ওঁকে কোমল সিং ভল্লা বলেছে। গুল্লু বা গুলাবোঁ স্বয়ং একজন শিখ হওয়া সত্ত্বেও ওঁর নাম কোমল সিং ভল্লাই বলল। কিন্তু একমাত্র ঘন্টুই বলল, ‘কোমল কৌর’। প্রশ্ন হল একজন বাঙালির ছেলে টিপিক্যাল শিখদের এবং দিল্লির বিশেষ কয়েনেজ আর ভোক্যাবুলারি ইউজ করছে কেন! শিখনারীদের যে সম্মান দিয়ে ‘কৌর’ বলতে হয়, সেটা ক-জন বাঙালি জানে? আজকালকার শিখ মেয়েরাও ‘কৌর’ শব্দটা বিশেষ ব্যবহার করে না। যেখানে স্বয়ং একজন শিখ খবরি ‘কৌর’ শব্দটা উচ্চারণও করেনি, সেখানে একজন বাঙালি খবরি বলছে, ‘কোমল কৌর’! আশ্চর্য নয়? ঘন্টু ঠিক সেই কয়েনেজগুলো ইউজ করছিল, যেগুলো শিখ বা দিল্লিবাসীদের স্পেশ্যাল ভাষা!”
“এটা তো আমিও শুনেছিলাম।” অর্ণব এতক্ষণে মুখ খুলল, “কিন্তু আমার অদ্ভুত লাগেনি।”
“লাগা উচিত ছিল।” সে বলল, “যেদিন সনৎ-ইসমাইল-রকি মারা গেল, সেদিনও একটা আশ্চর্য ব্যাপার ঘটেছিল। বার্নিং শিখ সনৎকে ব্রুটালি খুন করল। কিন্তু দ্রিঘাংচুর অস্তিত্ব কি সে জানতে পারেনি? দ্রিঘাংচু যে পরিমাণে টকেটিভ তাতে ওর বকবক শুনেই তো লোকে ওর উপস্থিতি টের পাবে। আমরা যখন গেলাম দ্রিঘাংচু তখনও বকবক করছিল, ‘সি.আই.ডি. অফিস থেকে আসছি। তার মানে ওই ডায়লগটা সে শুনেছে ও নকল করেছে। খুনের সময়ে সে জেগেও ছিল। সনতের চেঁচামেচি শুনেও সে কোনো আওয়াজ করেনি? কোনো কথা বলেনি? যে বাক্যটা নকল করছিল, সেটাও নয়? অসম্ভব। নিশ্চয়ই ও পটর পটর করেছিল আর বার্নিং শিখও ওর উপস্থিতি নির্ঘাত টের পেয়েছিল। একটা নিরীহ মানুষকে যে অমন নিষ্ঠুরভাবে খুন করতে পারে, নৃশংস একজন খুনি, যে পাখিটা ওর ডায়লগ নকল করে বসে আছে এবং ডায়লগের মাধ্যমে ওর টেকনিক পুলিশকে জানিয়ে দিতে পারে, সে কিনা তাকে ছেড়ে দিল! এত দয়া মায়া! কেন? অন্যদিকে ওইদিন ঘন্টুর ব্যবহার দেখো। তাকে যখন ডাকলাম, সে বলল, ‘দুটো রুটি খেয়েই আসি’ এ আবার কী জাতীয় কথা। কোন বাঙালি লাঞ্চে রুটি খেতে বসে। হাই সুগার থাকলেও বাঙালিরা দুপুরে একমুঠো ভাত-ই খাবে। আর ঘন্টু যেরকম ঢকঢকিয়ে কোল্ড ড্রিঙ্ক খায়, তাতে সুগার থাকলে এতদিনে মরে যেত। তবে বাঙালির বাচ্চা লাঞ্চে ‘দুটো রুটি’ খাচ্ছে কেন? ওবেসিটির প্রবলেমও নেই! ওই তো রোগাসোগা চেহারা। অবাঙালিরাও বলে ‘খানা খাকে আতা হুঁ’। শুধুমাত্র পাঞ্জাবি এবং শিখদের এটাই লব্জ ‘দো রোটি খাকে আতা হুঁ’। ওরা যে-কোনো খাবারকেই ‘রোট-শোটি’ বলে। অর্থাৎ বাংলা ভার্সানে, ‘দুটো রুটি খেয়ে আসছি’ যতই পশ্চিমবঙ্গে কাটাক। ছোটোবেলার শোনা কথা, লব্জ আর অভ্যাস যাবে কোথায়! সে তো ওর রক্তে! এরপর ও খবর দিয়ে চলেও গেল। সনতের মৃত্যুর খবর জানল। অথচ একবারও জিজ্ঞাসা করল না যে কাকাতুয়াটা মানে দ্রিঘাংচু ঠিক আছে কিনা! দ্রিঘাংচুকে তো ও-ই নিজের হাতে করে এনে দিয়েছিল। এটাও জানত ডঃ চ্যাটার্জির পোষ্য! তাও ওর মায়া নেই? বার্নিং শিখের মতো খুনি যে ওকে মারতে পারে এমন আশঙ্কা মনে এল না! অথচ সেই বার্নিং শিখের মায়া আছে! এর থেকে একবারও মনে হয় না যে বার্নিং শিখ দ্রিঘাংচুকে এইজন্যই ছেড়ে দিয়েছিল কারণ ওই প্রাণীটাকে সে ভালোবাসত। নিজের হাতেই উপহার দিয়েছিল। আর ঘন্টু এইজন্যই প্রাণীটার খবর নেয়নি, কারণ বার্নিং শিখ যে দ্রিঘাংচুকে মারেনি তা সে আগে থেকেই জানত!”
“গ-ড!”
টুইঙ্কল অরোরা গোল গোল চোখ করে শুনছিল। এবার খালি প্লেটে আঁকিবুকি কাটতে কাটতে বলল, “তবে রোটির ব্যাপারটা কিন্তু স্যার একদম ঠিক। আমাদের বাড়িতে চাইনিজ হলেও দাদি আর বাবা বলবে, ‘রোটি-শোটি খেয়ে যা’ পাঞ্জাবের লোকেরা অকেশনালি ‘চাওয়ল’ খায়। তাও পোলাও, মিঠি চাওয়ল গোছের রাইস। প্লেন রাইস খায় না খুব একটা। রুটিটাই মেইন।”
“রাইট।” তার প্লেটে আঙুল বোলানোর ভঙ্গি দেখে অধিরাজ ফের বিরিয়ানি সার্ভ করতে করতে বলল, “আপনিও একটু রোটি-শোটি খেয়ে নিন। আই মিন বিরিয়ানি। খালি প্লেট দেখতে মোটেই ভালো লাগছে না।”
এই নিয়ে পাঁচ প্লেট হল। পরিমাণ এমনই যে বিড়ালও ডিঙিয়ে যেতে পারবে না। অর্ণব মনে মনে হেসে বলল, “এটাও আমি মিস করেছি। কোনো বাঙালি লাঞ্চে সত্যিই ‘দুটো রুটি’ খায় না, বরং ‘দু-মুঠো ভাত’-ই খায়। এটাও অদ্ভুত ছিল।”
“গুল্লু, হুলিয়ার বিষয়ে মুখ ফস্কে বলেছিল-বার্নিং শিখের হুলিয়া এমনই যে গুল্লুর নিজের সঙ্গে তো বটেই, এমনকী যাদব আর ঘন্টুর সঙ্গেও ও হুলিয়া মেলে। শুধু হুলিয়া নয়, বয়েসও মেলে। তুমি গুলাবোঁর বয়েস নিয়ে চিন্তিত হচ্ছিলে। ঘন্টুকে দেখতে বাচ্চা বাচ্চা বলে ওকে ধরোনি। কিন্তু যার পুপুলের বয়েসি বিবাহযোগ্য ছেলে আছে, তারও এজগ্রুপ ওটাই হওয়া উচিত! এছাড়া মদনের কথাও একবার মনে করো। ও ওর বয়ানে কী বলেছিল মনে আছে? বার্নিং শিখের ওকে দেখে ঠিক কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল? ওর বয়ান অনুযায়ী, ‘লোকটা দাঁত মুখ খিঁচিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হারামজাদা, শুয়োরের বাচ্চা, খানকির ছেলে’— এইসব বলে একেবারে তেড়ে গালাগালি দিতে শুরু করল। জানি না স্যার, আমি ওর কোন বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছি! সে মাল সোজা তেড়েফুঁড়ে আমায় মারতে এল! বলল, ‘তোকেও শালা জ্বালিয়ে মারব’ কোট-আনকোট। এবার প্রশ্ন হল, বার্নিং শিখ মদনকে দেখে তেড়ে এল কেন?”
“কারণ মদন ওর খুনের সাক্ষী ছিল!”
অধিরাজ হেসে ফেলে, “কীসের সাক্ষী। দিল্লির ঝাড়ুদার তো আরও বড়ো সাক্ষী ছিল যাকে বার্নিং শিখ হাতে চিঠি ধরিয়ে দিয়েছিল। কই, তাকে তো মারেনি। একা সেই ঝাড়ুদারই নয়, তার কর্মকাণ্ডের সাক্ষী, প্রত্যক্ষদর্শী, তার বার্নিং শিখ মার্কা ভৌতিক হুলিয়ার দর্শক অনেক ছিল। দিল্লিতে তো যত্রতত্র দেখা দিত। আপ্তেসাহেবকেও দেখা দিয়েছে। নিজেকে লুকোনোর চেষ্টাই ছিল না। সিসিটিভি ফুটেজেও তাকে দেখা গেছে। কোনো সাক্ষীকে সে আক্রমণ করেনি। ফুটেজও ট্যাম্পার করেনি। সাক্ষী বা প্রত্যক্ষদর্শীদের তোয়াক্কাই করে না! কারণ ও জানত, ওরা তাকে যে হুলিয়ায় দেখেছে সেই হুলিয়া থেকে আসল লোকটাকে জীবনেও বের করা যাবে না। অথচ সেই লোকটাই মদনকে তেড়ে মারতে এসেছিল। প্রশ্ন হল, কেন?”
“কেন?”
“কারণ বার্নিং শিখ মদনের মতো আর্চ ক্রিমিনালকে চিনতে পেরেছিল। ও হারামজাদা যে কোনো পাপকাজই ছাড়েনি। খুন, ডাকাতি, সুপারি কিলিং, এক্সটর্শন, কিডন্যাপিং, কিচ্ছু যে বাকি নেই। সবচেয়ে বড়ো কথা দুশ্চরিত্র, লুচ্চা আর রেপ-মার্ডারের আদল, ওই নেহরু-গান্ধী পরিবারের পেটেন্ট ফেস কাটিং, বড়ো বড়ো চোখের একটু রাগী রাগী চাউনি লক্ষ্য করেই এই প্ল্যান তৈরি করা। এমনকি ওঁর হাইট, চলার ভঙ্গিটাও হুবহু এক। শুধু ডায়লগটা ওঁকে দিয়ে বলানো যেত না। আয়রন লেডির কণ্ঠস্বর সুললিত হলেও অত রিনরিনে নয়। পার্থক্যটা ধরা পড়ত। বিশ্ব ব্যাটা এখানেই কামাল করল। শেষপর্যন্ত অডিও রেকর্ডিং আর মেক-আপের কল্যাণে ইন্দিরা গান্ধী টু পয়েন্ট জিরোর আবির্ভাব হল। মিস্ মুখার্জি অভিনয়টাও ফাটিয়ে করলেন। ওরকম ভয়ংকর নৃশংস খুনির সামনে অমন অবিচলিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে অ্যাকটিং করে যাওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু মিস মুখার্জি প্রমাণ করে দিলেন যে উনি অঘটন ঘটন পটিয়সী। ওঁর ডেডিকেশনের তুলনাই হয় না। বার্নিং শিখ ওখানেই শেষ হয়ে গেল। তারপর কী হয়েছিল তা তোমরা সবাই জানো। আ ভেরি বিগ হ্যান্ডস ফর মিস্ মুখার্জি অ্যান্ড আওয়ার টিম টাইগ্রেস।”
সবাই হাততালি দিয়ে ওঠে। আহেলির মুখ লজ্জায় সিঁদুরে। সে মাথা নীচু করে মৃদু স্বরে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ।”
ডিনার পর্বের শেষে একে একে সকলেই বিদায় নিচ্ছিল। অধিরাজ মেয়েদের প্রত্যেককেই সসম্মানে গাড়িতে তুলে দিয়ে এল। টুইঙ্কল অরোরা অত খাওয়ার পর কী করে উঠে দাঁড়াতে পারল তা নিয়ে অর্ণবের বিস্ময়ের অবধি নেই। আহেলিকে আজ বড়ো সুখি লাগছিল। কৌশানী আর আত্রেয়ীও খুশি। মিস্ চাউমিন বন্ড আসতে পারেনি। তার শরীর একটু বিগড়েছে বলে তার খাবারটা প্যাক করিয়ে নিজেরই এক নিরাপত্তারক্ষীর হাতে দিয়ে দিল অধিরাজ। ছেলেটি দৃষ্টির ঠিকানায় খাবারটা পৌঁছে দেবে। পবিত্র ও ডঃ চ্যাটার্জিও বিদায় নিলেন। তাকে কিচেন গুছিয়ে রাখতে সাহায্য করে অর্ণবও চলে গেল। শুধু শেষে সে শিশির সেনকে গাড়িতে তুলে দিতে গিয়েছিল। ফাঁক পেয়ে এডিজি সেন চাপা স্বরে জানতে চাইলেন, “রাজা, একটা কথা…।”
“স্যার।”
“সত্যিই কি ভূপেন্দ্র দত্তাকে তুমি বাঁচাতে পারতে না?”
অধিরাজ একটা শ্বাস টানল, “স্যার, টু বি ভেরি অনেস্ট, উনি যে এতদিন সবাইকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে অবশেষে মানে মানে নরকারোহণ করেছেন, তাতে আমি খুশিই হয়েছি। আমার ধারণা, ওঁর পরিবারের কেউ বিশেষ দুঃখিতও হননি। খামোখা আপনি শোকপ্রকাশ করছেন কেন? আপনার বরং খুশি হওয়া উচিত যে সব অফিসাররাই আস্ত আছে!”
“তা ঠিক!” তবু তাঁর মুখে বেদনা নেমে আসে, “কিন্তু ঘন্টু এমন করল! এত বছরের বিশ্বস্ত ইনফর্মার।”
“আপনি বুঝবেন না স্যার। আপনি ওর ডায়েরিটা পড়েননি।” সে আস্তে আস্তে বলে, “একটা আট বছরের বাচ্চা সুখে, শান্তিতে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরে দিন কাটাচ্ছিল। না সে বেয়ন্ত সিংকে চিনত, না ভিন্দ্রানয়ালেকে, এমনকি ইন্দিরা গান্ধীকেও না। হঠাৎই বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে সে সবকিছু হারাল। চোখের সামনে অসহায় বাবার যন্ত্রণা, তাঁর মাথাটা উড়ে যেতে দেখেছে। ভাইদের পুড়ে মরা-অন্তিম চিৎকার, মায়ের কান্না, অনুরোধ ও গ্যাংরেপ, দিদির শোচনীয় পরিণতি দেখেছে সেই বাচ্চাটা। নিজেও প্রায় মরতে বসেছিল। কোনোভাবে যদি বা বাঁচল তারপর বিচারের অপেক্ষা! চৌত্রিশ বছর ধরে সে দেখল যে একে একে তার অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। সে সেই সর্বহারাই রইল। অথচ তার পরিবারের খুনিরা উঁচুতলার বিলাস-ব্যসনে আরামসে পরিবারের সঙ্গে দিন কাটাচ্ছে। চোখের সামনে এই প্রহসন দেখে আর কতদিনই বা স্থির থাকতে পারত।”
“এমন দৃশ্য সব শিখ পরিবারই দেখেছে। কিন্তু সবাই বার্নিং শিখ হয়নি।”
শিশির সেনের কথায় মাথা নাড়ল অধিরাজ, “রাইট স্যার। তবে শিখরা এই ঘটনা আজও ভুলতে পারেনি। ১৯৮৪ সালের ক্ষত আজও তারা বয়ে বেড়াচ্ছে। ক্ষতবিক্ষত মানুষ অনেক থাকে। তবে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন একটাই হয়! এই ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের ডায়েরিটা আমি পাবলিশ করার চেষ্টা করব। বার্নিং শিখের পোড়ার ইতিহাস সবার সামনে আসা উচিত। এটা যাতে মানুষের কাছে পৌঁছোয়, সে চেষ্টার ত্রুটি রাখব না। অবশ্য যদি আপনার অনুমতি থাকে।”
বলতে বলতেই সে আকাশের দিকে তাকায়। আজ আকাশ সম্পূর্ণ মেঘমুক্ত। তার মনে হল, অনেক নক্ষত্রের ভিড়ে বুঝি একখানা নতুন তারা বড়ো বেশি ঝলমল করছে। তার দীপ্তিতে আগুনের জ্বালা নেই। বরং সাদা শান্ত বিচ্ছুরণে বুঝি হাসছে। তাকে ঘিরে আছে আরও অনেক ছোটো বড়ো তারা। যেন নক্ষত্রের একটা আস্ত পরিবার! আট বছরের ছেলেটা বুঝি এতদিনে নিজের হারিয়ে যাওয়া পরিবারের কাছে ফিরে গেল…!
“টিম্ টিম্ করছে নিকে নিকে তারে, লগ্ দে সানু বহোত পিয়ারে, জি করদা মৈ তোড়ি যাওয়া, অপনে ওয়াড়ি ভিচ্ বিছাওয়া…!”

চমৎকার একটা গল্প। রূদ্ধশ্বাস এবং একই সাথে হৃদয় বিদারক। বিশেষ করে ১৯৮৪ সালের সেই ভয়ংকর ৩ দিনের চিত্র যেনো জীবন্ত ভাবে উঠে এসেছে। মনকে সত্যিই নাড়া দিয়ে গেলো। একটা সং্খ্যালঘু সম্প্রদায়ের বেদনা আমরা যারা সং্খ্যাগুরু সম্প্রদায়ের তারা অনেক সময়ই উপলব্ধি করি না। ক্ষেত্রবিশেষে ব্যাক্তির অপরাধের দায় সম্প্রদায়ের উপর চাপিয়ে দেই। আর এভাবেই এক একেকজন গুল্লু হয়ে ওঠে বার্নিং শিখ। তবে কাহিনীর কলেবর আরো একটু সং্খিপ্ত হতে পারতো। লেখিকাকে শ্রদ্ধা জানাই।
চেতনায় অনেক দিন বাদে একটা বড় ধাক্কা খেলাম। শিখ সম্প্রদায় কে নিয়ে আমার একটা অটুট বিশ্বাস আছে, এনারা অসৎ কাজ করতেই পারেন না। ছত্রে ছত্রে সেই প্রমাণ। আপনার জিঙ্গেল বেল পড়ে দুদিন মানসিক কোমায় ছিলাম, আপনার লেখনী অক্ষয় হোক
সত্যই মানসিক কোমাই বটে তবে ওই ৩০, ৩১ পর্ব সম্পূর্ণ পড়ার দুঃসাহস আমি করতে পারিনি!
সত্যই মানসিক কোমাই বটে তবে ওই ৩০, ৩১ পর্ব সম্পূর্ণ পড়ার দুঃসাহস আমি করতে পারিনি!
The theme of the story is breathtaking and sometimes very sensational also. কিন্তু অর্ণব চরিত্রটিকে লেখিকা এমন বানিয়ে দিলেন কেনো …ওই চরিত্র টা কিন্তু খুব বাস্তব ছিল বরং অধীরাজ চরিত্র টা মাঝে মাঝে সুপারম্যান স্পাইডার ম্যান টাইপ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু অর্ণব চরিত্র টা বেশ ইন্টারেস্টিং ছিল।প্লীজ এরম বানিয়ে দেবেননা ওই character tike । আগের মতোই রাখুন প্লীজ