কালরাত্রি – ৩

(৩)

এডিজি শিশির সেনের মুখ থমথম করছে। তিনি অধিরাজের ফোনটা পেয়েই তড়িঘড়ি বিছানা ছেড়ে এসে উপস্থিত হয়েছেন ব্যুরোয়। না এসেও উপায় ছিল না। ‘বার্নিং শিখ’ এর প্রেমপত্র ইতিমধ্যেই লালবাজারে এসে পৌঁছেছে। যথারীতি পুলিশকে ‘অপদার্থ, ‘নিষ্কর্মা’, ‘পেটমোটা ঘুষখোর’ ইত্যাদি সুন্দর সুন্দর বিশেষণে বিশেষিত করে সে জানিয়েছে, একটা মাসমার্ডার দিয়ে শুরু করলেও আগামী বাহাত্তর ঘণ্টায় সে আরও দুটো মাসমার্ডার করবে। পুলিশের বাপের সাধ্য থাকলে আটকে দেখাক। এই জাতীয় পত্রাঘাতে রাতের ঘুম উড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। শিশির সেনেরও উড়েছে। ভিকটিমদের পুলিশ প্রোটেকশন দিলে সে পুলিশদেরও ধরে ধরে কাটছে। ‘সেফ হাউসে’ সরিয়ে নিরাপত্তায় রাখলেও যে শান্তি নেই, তা বেঙ্গালুরুর ঘটনাতেই স্পষ্ট। এই পরিস্থিতিতে মাথা ঠিক রাখা কি আদৌ সম্ভব!

এবার যাঁর বাড়িতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তাঁর নাম জ্যোতিপ্রকাশ ত্রিপাঠী। তিনিও ১৯৮৪ সালে দিল্লিতেই ছিলেন। ওঁর নামও নানাবতি কমিশনের লিস্টে আছে। ইনিও যথারীতি কংগ্রেসেরই ক্যাডার ছিলেন। দিল্লি ইউনিভার্সিটিতে ইংলিশ অনার্স নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি অ্যাকটিভ পলিটিক্সেও ঢুকে গিয়েছিলেন ত্রিপাঠী। তৎকালীন তরুণ প্রজন্মের আইডল তথা ‘চিফ’ সঞ্জয় গান্ধীর অন্ধ ভক্ত ছিলেন। ১৯৮০ সালে সঞ্জয় গান্ধীর দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর পর তিনি অন্যান্য নেতাদেরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। খুব বড়ো নেতা বা পার্টির মুখ হওয়ার স্বপ্ন জ্যোতিপ্রকাশ কখনোই দেখেননি। কিন্তু কংগ্রেস পার্টিটার জন্য সব কিছু করতে পারতেন! এটা ভালোবাসা, গোঁড়ামি না অল্পবয়েসের স্পর্ধা তা বলা মুশকিল। যথারীতি ১৯৮৪ সালে তিনি শ্যাম ত্যাগীদের দলে ছিলেন। পরবর্তীকালে অবশ্য কংগ্রেসের নীতির সঙ্গে তার বনিবনা না-হওয়ায় পার্টি ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় চলে আসেন। ১৯৯০ সাল থেকে আর দিল্লির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না তার। রাজনীতি ছেড়ে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে ঢুকে যান জ্যোতিপ্রকাশ ত্রিপাঠী। এরপরের জীবন কলকাতাতেই কেটেছে তাঁর।

কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, দিল্লিকে তিনি ছেড়ে দিলেও, দিল্লির কলঙ্কজনক অধ্যায়টি ওঁর পেছন ছাড়েনি। উনি ১৯৮৪ সালকে ভুলে গেছেন। ১৯৮৪ সাল ওঁকে ভোলেনি। তখন যৌবনের উন্মাদনায় যা করেছিলেন, আজ এই বৃদ্ধ বয়েসে তার মাশুল দিতে হল। স্ত্রী বিয়োগ হয়েছিল আগেই। বর্তমানে ছেলে, ছেলের বউ, দুই নাতি আর এক নাতনিকে নিয়ে থাকতেন। তাঁর অবসর জীবনের সঙ্গী ছিল নেপালি কম্বাইন্ড-হ্যান্ড তেনজিং! বাবুর দেখাশোনা সে যত্ন নিয়েই করত। বহু বছরের ভৃত্য। বাবুর গাড়ি ড্রাইভিং থেকে জুতো পালিশ অবধি সবকিছুই সানন্দে করে দিত। কিন্তু সে বেচারির প্রাণটাও বেঘোরে গেল!

জ্যোতিপ্রকাশ ত্রিপাঠী প্রাণে বেঁচে গেলেও গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁকে আপাতত একটি হসপিটালের আই.সি.ইউ.তে রাখা হয়েছে। কিছু বলার বা প্রশ্নের জবাব দেওয়ার অবস্থায় নেই। তবে প্রতিবেশীরা ওঁর সম্পর্কে অনেক কিছুই জানিয়েছে। ‘বার্নিং শিখ’-এর ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই কেমন যেন গুম মেরে গিয়েছিলেন ত্রিপাঠীজি। অথচ ২০১৬ সালে স্ত্রী বিয়োগ হওয়ার পরও বোধহয় এতখানি মুষড়ে পড়েননি তিনি। লোকজনের সঙ্গে সমস্ত সংশ্রব ত্যাগ করেছিলেন। এমনকি ছেলের সঙ্গেও কথাবার্তা বিশেষ বলতেন না। তবে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল। আর যত প্রাণের কথা, মনের কথা—সবই হত তেনজিং-এর সঙ্গে। তেনজিং অসম্ভব শান্ত ও সুন্দর স্বভাবের মানুষ ছিল। সে শৈশব থেকেই অনাথ। একটি বৌদ্ধ মনাস্ট্রিতেই বড়ো হয়েছে। সে নিজেও বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিল। তার সৌজন্যে এ বাড়িতে অনেক বৌদ্ধ ভিক্ষু, শ্রমণদের যাতায়াত ছিল। প্রতিবেশীরা অনেকেই বৌদ্ধ লামাদের এ বাড়িতে আসতে দেখেছেন। তেনজিং-এর প্রভাবে পড়ে ত্রিপাঠীও ক্ষমাসুন্দর বৌদ্ধধর্মের তত্ত্বের দিকে ঝুঁকেছিলেন। নিজেও পণ্ডিত মানুষ ছিলেন। তাই প্রায়ই বৌদ্ধ লামাদের সঙ্গে ধর্ম আলোচনা করতেন, ধর্মকথা শুনতেন।

অর্ণব জানতে চায়, “কলকাতায় বৌদ্ধ লামা! এখানে মনাস্টারি আছে?”

“আছে বোধহয়।” একজন বলেন, “মহাবোধি সোসাইটি অব ইন্ডিয়ার মনাস্টারি তো বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিটেই আছে। এছাড়া টালিগঞ্জ সম্বোধি বুদ্ধিস্ট মনাস্টারির নামও শুনেছিলাম তেনজিং-এর কাছে। ও নিজে এই দুটোতেই যেত।”

“লামাদের চেহারা মনে আছে আপনাদের?”

এবার প্রতিবেশীরা আমতা আমতা করে বলেন, “একজন নয় স্যার, অনেকেই আসত। আর সবারই মোটামুটি একইরকম চেহারা। ন্যাড়া মুন্ডি, সাফসুতরো মুখ আর গৈরিক পোষাক। আলাদা করে চেনা মুশকিল। তবে তেনজিং-এর মোবাইল ঘাঁটলে কয়েকজনের ছবি পেতে পারেন।”

“আর সন্দেহজনক কিছু?”

“না স্যার।” ওঁরা জানালেন, “কিচ্ছু না! চিৎকার তো দূর, কোনোরকম টু শব্দটিও শুনিনি। জানলা দরজা বন্ধ ছিল বলে ধোঁয়াও দেখতে পাইনি। নয়তো আগেই পৌঁছে যেতাম!”

এডিজি শিশির সেনের সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। এসব আদতে হচ্ছেটা কী। যে-কোনো খুনের ঠিকমতো তদন্ত করতেই বাহাত্তর ঘণ্টা কেটে যায়। অথচ সেই ন্যুনতম সময়টাই নেই। এই বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে গোটা কলকাতা শহর থেকে আরও দু-জন সম্ভাব্য ভিকটিমকে খুঁজে বের করতে হবে। ওই নির্দিষ্ট সময়েই খুনিকে ধরতে হবে কিংবা ঠেকাতে হবে। তার মধ্যেই ভিকটিমদের প্রোটেকশনও দিতে হবে! কোন দিক ছেড়ে কোন দিকে যাবেন!

সি.আই.ডি. হোমিসাইডের গোটা অফিস এখন যুদ্ধকালীন তৎপরতার সঙ্গে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ডঃ চ্যাটার্জি তাঁর দলবল নিয়ে লেগে পড়েছেন ছ-টা লাশের পোস্টমর্টেমে! ভাগ্যক্রমে আহেলির সঙ্গে এখন আইভি থাকায় কাজ অনেক বেশি দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। তিনজন ফরেনসিক এক্সপার্ট এখন মৃতদেহের সঙ্গে বাক্যালাপে ব্যস্ত। পবিত্র আর কৌশানী দিল্লি, কানপুর ও বেঙ্গালুরুর থেকে ‘বার্নিং শিখ’ সম্পর্কিত যতটুকু তথ্য, বয়ান বা এভিডেন্স যোগাড় করা যায় তার পেছনেই লেগে আছে। অর্ণব ও আত্রেয়ী প্রতিবেশীদের এখনও একটানা জিজ্ঞাসাবাদ করে চলেছে। যদি এর মধ্যেই কোনো কাজের কথা জানা যায়!

“লোকটার তো দেখছি অষ্টোত্তর শতনাম! স্টেফানো মাইনো, কেহের সিং, নাথুরাম, রাজেন্দ্র কুমার, মহম্মদ ইউনুস, পরমেশ্বর নারায়ণ রেড্ডি, রামেশ্বর রাও … বলতে বলতেই এডিজি সেন আঁৎকে উঠলেন, “অ্যাঁ, এ কী! সাসপেক্ট লিস্টে তো একজন মহিলাও আছেন দেখছি। সমা বিবি! মুসলিম। কী সর্বনাশ! ইনি মহিলাদেরও ভেক ধরতে জানেন নাকি!”

“সবই চলে স্যার।” অধিরাজ চিন্তিত, “তবে আগের ভেকগুলো দেখে লাভ নেই। এখন তিনি কোন্ ভেক ধরে কোথায় আছেন, সেটা জানতে পারলেই হবে।”

দিল্লি ও বেঙ্গালুরু থেকে জোগাড় করা ফুটেজগুলো বারবার মন দিয়ে দেখছিলেন শিশির সেন ও অধিরাজ। বেঙ্গালুরুর একটি সিসিটিভিতে আবছাভাবে ধরা পড়েছে শুনশান রাস্তায় বার্নিং শিখের বীভৎস মূর্তি। তার মুখটা দেখলে যে কেউ ভয়ে হার্টফেল করবে! সত্যিই কোনোদিক দিয়েই তাকে মানুষ বলা যায় না! দিল্লির ঘটনার সন্দিগ্ধ ব্যক্তিরা, তথা ফাদার স্টেফানো মাইনো, কেহর সিং ও নাথুরামের ছবিও কারোর না কারোর মোবাইলে বা বাড়ির সিসিটিভিতে পাওয়া গিয়েছে। সেগুলোই প্রোজেক্টরের সাহায্যে কনফারেন্স রুমের পর্দায় বারবার ফিরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল ওরা। এডিজি সেন দেখতে-দেখতেই বললেন, “হোপলেস। বুঝতেই পারছি না এরা একই ব্যক্তি না আলাদা আলাদা লোক? কারা খুন হবে, কে খুন হবে, কখন, কোথায়, কিচ্ছু জানি না। আমি পুরোপুরি কনফিউজ ব্যানার্জি। বুঝতেই পারছি না কোথা থেকে শুরু করব!”

অধিরাজ ভাসা ভাসা দৃষ্টিতে পর্দার দিকে তাকিয়েছিল। তার সামনে এখন বার্নিং শিখের ফুটেজ। জুম করার পরে তার গোটা মুখটাই ধরা দিয়েছে। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “একদম কিছু জানি না তা বোধহয় বলতে পারি না। নিজের সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য সে নিজেই আমাদের জানিয়েছে।”

“যেমন?”

“যেমন তার মোটিভ জানতে আর বাকি নেই। শুরু থেকেই সে বুঝিয়ে দিয়েছে যে এই খুনগুলোর পেছনে ১৯৮৪ সালের অ্যান্টি শিখ রায়ট-ই দায়ী। খুনি তখন রায়ট-এর ভিকটিম ছিল। সম্ভবত সেই রায়ট-এর কারণে সে সম্পূর্ণ অনাথ হয়ে যায়। তার গোটা পরিবারই এই দাঙ্গায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। শুধু সে একাই সার্ভাইভ করতে পেরেছিল। এবং কিছুদিন আগেও তার দেশের আইন-কানুনের ওপর কিছুটা হলেও ভরসা ছিল যা সজ্জনকুমারের যাবজ্জীবন হওয়ার পর একেবারেই উঠে গিয়েছে। সম্ভবত লোকটি সজ্জনকুমারের ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট তথা ডেথ পেনাল্টি চেয়েছিল। তা না হওয়ায় সে প্রচণ্ড অসন্তুষ্ট।”

শিশির সেন আলতোভাবে মাথা নাড়েন, “সজ্জনকুমারের সাজাটা তার পছন্দ হয়নি তা বোধহয় ঠিক তার পরের দিনই দিল্লিতে অ্যাটাক করার জন্য আন্দাজ করতে পেরেছ। এটা আমারও মনে হয়েছে। আরও আগে সে প্রতিশোধ নিতে পারত৷ কিন্তু এত বছর অপেক্ষা করার একটাই মনস্তাত্বিক কারণ পাচ্ছি। ও শেষপর্যন্ত দেখার জন্য অপেক্ষা করছিল। হয়তো চেয়েছিল, আইনই দোষীদের সাজা দিক। যখন দেখল সাজার নামে স্রেফ প্রহসন হচ্ছে, তখনই শাস্তি দেওয়ার দায় নিজের হাতে তুলে নিল।” তিনি একটু থেমে বললেন, “তবে লোকটা ১৯৮৪ সালেই অনাথ হয়েছিল এটা তুমি কী করে বললে? ওই রায়টে মূল টার্গেট করা হয়েছিল শিখ পুরুষদের। মব কিলিংটা বা লিঞ্চিংটা তাদের ঘিরেই হয়েছিল। সব মহিলাদের প্রাণে মারেনি। এই লোকটার পরিবারে দিদি, বোন বা মা কেউ ছিল না বলছ?”

অধিরাজের চোখে অদ্ভুত একটা ঘোর, “হয়তো ছিল। তবে দাঙ্গার পর আর কেউ ছিল না তার স্যার। ‘মব’ জিনিসটা কোনো প্রিন্সিপ্‌ল্‌ মেনে চলে না। তারা নীতি, আদর্শের তোয়াক্কা করে না। সবসময়ই যে পুরুষদেরই মারবে, সব মেয়েদের ছেড়ে দেবে এমন কোনো কথা নেই। অন্তত এক্ষেত্রে দেয়নি।”

“বুঝলে কী করে?”

“তার প্যাটার্নটা দেখুন স্যার। নিজেকে খুনির জায়গায় বসিয়ে দেখুন।” তার অন্যমনস্ক আঙুলগুলো পেপার ওয়েটটাকে নিয়ে নাড়াচাড়া করছে, “সে আসল কালপ্রিটদের মারছে না। অথচ ওই বুড়ো লোকগুলো অনেক বেশি ভলনারেবেল এবং সফট টার্গেট। তাদের মারাটাই স্বাভাবিক ও সহজ। ও সাত-আট জনকে মেরে ফেলছে, অথচ পার্টিকুলার ওই ব্যক্তিটিকে ছুঁচ্ছেও না! কেন?”

শিশির সেন একটু চিন্তিত হয়ে পড়েন, “পয়েন্ট। যাকে শাস্তি দেওয়া উচিত, তাকেই ছেড়ে দেওয়ার মানে কী! বুড়ো বলে ছেড়ে দিল?”

অধিরাজ হেসে ফেলে, “অত দয়ার শরীর তার নয়। আসলে সে ওই লোকটাকেই শাস্তি দিচ্ছে। এবং সেটা ডেথ পেনাল্টির চেয়েও ভয়ংকর। সার্ভাইভারদের পরিণতিগুলো দেখুন। কেউ প্যারালাইসিজড হয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে মরছে, কেউ পাগল হয়ে গেল, কেউ আত্মহত্যা করল—এর চেয়ে তো ফাঁসিও অনেক ভালো। দিল্লি, কানপুর, বেঙ্গালুরু-সব জায়গাতেই বেঁচে থাকা মানুষদের এই তিনটে পরিণতিই হয়েছে। ওঁদের যদি মেরে ফেলত, তবে একপ্রকারের মুক্তিই পেয়ে যেতেন ওঁরা। সেটা শাস্তি হত না। এই ‘ফ্যান্টম’ তাঁদের ঘাড় ধরে দেখিয়ে দিল ‘নিজের গোটা পরিবারের এমন বীভৎস মৃত্যু হলে দ্যাখ কেমন লাগে!’ এই জ্বালা অন্য কারোর নয় স্যার। এ জ্বালায় সে নিজেই জ্বলেছে। চোখের সামনে নিজে বেঁচে থেকে পরিবারের সবাইকে মরতে দেখেছে বলেই জানে এটা মৃত্যুর চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর যন্ত্রণা। সেই যন্ত্রণাটাই সে নিজের অপরাধীদের দিয়ে বেড়াচ্ছে। লোকটাকে মিডিয়া পাগল বলছে ঠিকই, কিন্তু আমি ওর পাগলামির চেয়েও আবেগটা বেশি টের পাচ্ছি। আদৌ ও পাগল নয়। বরং খুব ঠান্ডা মাথার মানুষ যে পুরো হোমওয়ার্ক করে, আঁটঘাঁট বেঁধে, ক্রাইমটা করার ফিল্ড রেডি করেই পুলিশকে চ্যালেঞ্জ করে। এতটা কনফিডেন্ট হওয়ার একটাই কারণ, লোকটা বেসটা অনেক আগেই তৈরি করে রেখেছে। তাই ভালোভাবেই জানে আচমকা ঘুম থেকে উঠে পুলিশ কিছুই করতে পারবে না বরং চোখে মুখে অন্ধকার দেখবে। যেমন আমরা দেখছি। এত অঙ্ক করে যে খুন করে, সে আর যা-ই হোক পাগল নয়।”

“কিন্তু এটা কি আদৌ একটা লোকের কাজ ব্যানার্জি?” শিশির সেন চিন্তান্বিতভাবে বললেন, “ছ, সাত, আটজন লোককে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে টায়ার পরিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া—এ কি একটা লোক পারে! দিল্লিতে আড়াইশো-তিনশো লোকের ভিড় এই কাজটা করেছিল। একাধিক লোক তো ছাড়ো, একটা লোককেই ওভাবে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দিতে গেলে যথেষ্ট হাতাহাতি করতে হবে। ক্যাওয়াস হবে, চিৎকার চেঁচামেচি হবে, প্রতিবেশীরা টের পাবেই। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাড়িতে থাকা বৃদ্ধ লোকটিই কিছু শুনতে পাননি, প্রতিবেশীরা তো শীতের রাতে নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছিল। আমারও মনে হয় একটা গোটা গ্যাং এর পেছনে আছে। আর এরা প্রত্যেকে আলাদা আলাদা লোক! আর ওদের টিমে একজন বা একাধিক মহিলাও আছে।”

অধিরাজ নঞর্থক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ছে, “আই বেগ টু ডিফার। প্রথমত, একটা গ্যাং হলে বরং চিৎকার চেঁচামেচি বেশি হওয়ার চান্স ছিল। একজন একটা কাজ নিশ্চুপে সারতে পারে। একটা দল তা পারে না। ভিড় হলে চেঁচামেচি হবেই। এক্ষেত্রে তা হয়নি। মদন যখন দেখেছিল তখন একজনকেই ক্রাইম সিনে দেখেছিল। লাশ পাওয়ার পর গোটা বাড়ি আমি আর অর্ণব তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখেছি। ত্রিপাঠীজি ছাড়া সেখানে আর কেউ ছিল না। একটা মানুষ যত সহজে গায়েব হতে পারে, গ্যাং অত সহজে, অত কম সময়ে হাওয়া হতে পারে না। তাই আমার মনে হয় না এখানে কোনো গ্যাং আছে। দ্বিতীয়ত, এই সব ক-টা ছবিই একটি ব্যক্তির, যিনি মেক-আপে সিদ্ধহস্ত! শুধু মেক-আপ নয়, প্রস্থেটিক মেক-আপও চমৎকার জানেন। নয়তো ‘বার্নিং শিখ’-এর এই ভয়াবহ পৈশাচিক মুখটি তৈরি করতে পারতেন না! কোনো মুখের সঙ্গে কোনো মুখের কোনো মিল নেই! বার্নিং শিখের মুখ তো বোঝাই যায় না! এটা আমার দেখা হ্যালোউইন মেক-আপের এখনও পর্যন্ত সর্বসেরা দৃষ্টান্ত! শিখ ড্রাইভারের মুখও দাঁড়ি গোঁফের জঙ্গলে ঢাকা, মাথার ওপরে পেল্লায় পাগড়ি! এর পেছনের আসল মুখ শনাক্ত করে এ সাধ্য পুলিশের চোদ্দগুষ্টিরও নেই। ফাদারের মুখ দেখা যাচ্ছে। ক্লিন শেভডও বটে। অথচ নাকটা দেখুন বেশ লম্বা, চিবুকটা শার্প, খাঁজকাটা! চোখে ভারি পাওয়ারের চশমা। নাক, চিবুক, গালে প্রস্থেটিক মেক-আপ করেছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস অর্ণব ও মিস্ দত্ত একটু পরেই বেশ কিছু বৌদ্ধ লামাদের ছবি নিয়ে আসবে, যার মধ্যে অন্তত একজন সাড়ে পাঁচ ফুট থেকে পাঁচ ফুট ছ-ইঞ্চির কাছাকাছি হবেন। তিনি একজন বৃদ্ধ লামা হবেন যাঁর গায়ের রং চাপা হলেও মুখটা নেপালি ধাঁচের হবে। আই মিন চ্যাপ্টা নাকের, চওড়া গালের ও ছোটো নাকের মানুষ যার মুখ বলিরেখার জ্বালায় বোঝাই দায়! এবং মোস্ট প্রব্যাবলি তাঁর নামের শুরুটা ‘বুদ্ধ’ দিয়েই হবে। যেমন বুদ্ধভদ্র, বুদ্ধদত্ত, বুদ্ধঘোষ….!”

“বুদ্ধদত্ত স্যার! আপনি কী করে জানলেন!”

অধিরাজের কথার মধ্যেই কনফারেন্স রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেছিল অর্ণব ও আত্রেয়ী। তারা ক্রাইমসিন ভালো করে তল্লাশি করে এভিডেন্স সংগ্রহ করে, সমস্ত পড়শিদের ইন্টারোগেট করে ফিরে এসেছে। অধিরাজের কথা শুনতে পেয়ে অর্ণব অবাক হয়ে বলল, “চার পাঁচজন লামা আসতেন ও বাড়িতে। ওঁদের একজনেরই নাম বুদ্ধদত্ত, এবং স্যার যেরকম বললেন, অবিকল তেমনই দেখতে। একদমই বৃদ্ধ, মুখে প্রচুর কাটাকুটি। তেনজিং এর মোবাইলে তাঁর ছবিও আছে। নেপালিদের মতোই মুখ, কিন্তু রং চাপা! একে নিয়েই প্রতিবেশীদের কৌতূহলের সীমা ছিল না। সেজন্যই ওঁর নাম মনে আছে তাদের।”

“ছবি এনেছ? ফ্যান্টাস্টিক।” সে উত্তেজিত, “দেখি খানদানি মুখটা।”

তেনজিং-এর মোবাইল থেকে ছবিগুলো নিজের মোবাইলে ট্রান্সফার করে নিয়েছিল অর্ণব। সে এক এক করে সব লামাদেরই ছবি দেখাচ্ছিল। প্রতিবেশীরা ঠিকই বলেছিল। সবাইকেই মোটামুটি একইরকম দেখতে। তার মধ্যেই এক অতিবৃদ্ধ লামাকে দেখে অধিরাজ বলে উঠল, “ইনিই নির্ঘাৎ বুদ্ধদত্ত?”

“হ্যাঁ।” অর্ণবের বিস্ময়ের অবধি থাকে না, “কিন্তু আপনি কী করে….!”

তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই ছবিটা শিশির সেনকে দেখাল সে, “এই দেখুন স্যার! মুখের চামড়ায় পুরো ওয়ার্ল্ডের ম্যাপ তৈরি হয়ে গেছে। মাথা ন্যাড়া, চোখ প্রায় দেখাই যায় না, নাকটা চ্যাপটা, আগের ছবিগুলোর সঙ্গে কোনো মিলই নেই। ইনফ্যাক্ট কারো মুখে এত বলিরেখা ও ভাঁজ থাকলে আদতে তাকে দেখতে কীরকম তা বোঝা অসম্ভব! এত নিখুঁত প্রস্থেটিক মেক-আপ খুব কম লোকই পারে।” বলতে-বলতেই সে অপূর্ব গ্রীবাভঙ্গী করে তাকিয়েছে অর্ণবের দিকে, “বাই দ্য ওয়ে অর্ণব, ওঁকে সবার মনে আছে কেন? শুধু দুধ পান করতেন বলে?”

এবার অর্ণব এবং আত্রেয়ী-দু-জনেরই মাথা বোঁ বোঁ করে ঘুরতে শুরু করেছে। অর্ণবের মুখ দেখে মনে হল সে এখনই ফেইন্ট হয়ে পড়ে যাবে। আত্রেয়ী বিস্মিত স্বরে বলল, “অ্যাবসোলিউটলি কারেক্ট স্যার। তেনজিং আর ত্রিপাঠীজি প্রত্যেক বৌদ্ধ শ্রমণকে ডিনার বা লাঞ্চ অফার করতেন। বাকিরা তো সাধারণ নিরামিষ খাবারই খেতেন। কিন্তু ইনি আবার পিকিউলিয়ার। দুধ ছাড়া আর কিছু গ্রহণই করতেন না। ওঁর বক্তব্য ছিল, বয়েস হয়ে গিয়েছে বলে সব কিছু হজম হয় না। বিড়ালের মতো চুক চুক করে সাবধানে দুধ খেতেন! তেনজিং নিজেই এই গল্প প্রতিবেশীদের কাছে করেছিল। প্রতিবেশীরাও তেমনি তাঁকে আসতে দেখলেই বলত, “ওই যে! বিড়ালদত্ত এসেছে! কিন্তু আপনি কী করে জানলেন?”

“নাথিং মিস্ দত্ত! কারোর নাক থেকে ঠোঁটের অংশে প্রস্থেটিক মেক-আপ থাকলে সে শক্ত খাবার অ্যাভয়েডই করবে। ফলের রস, লস্যি, স্যুপ, সব লিকুইড ছেড়ে দুধকে কেন বেছে নিয়েছেন সেটা অবশ্য পরে বোঝাব।” সে মৃদু হাসল, “আসলে দিল্লির সময় থেকেই এই অপরাধীটির কীর্তিকলাপ ফলো করছি আমি। ভাবিনি যে তিনি কলকাতায়ও আসবেন। জাস্ট এমনিই কৌতূহল থেকেই স্টক করা আর কী! তাই তিনি কী করছেন, কেন করছেন, ভবিষ্যতে কী করতে পারেন, মোটামুটি একটা অঙ্ক করছিলাম। সেই অঙ্কের একটা পার্টই জাস্ট মিলে গেল, অন্য ম্যাজিক কিছু নয়।”

অর্ণব বুঝতে পারে, অধিরাজ তার থিয়োরি এখনই ভেঙে বলতে চায় না। আত্রেয়ী কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল, অর্ণব চোখের ইশারায় তাকে থামিয়ে দিয়েছে। শিশির সেন একটু চুপ করে থেকে বললেন, “বাট্ ব্যানার্জি, আমি এখনও কনফিউজড! এখনও মনে হচ্ছে এর পেছনে গোটা একটা গ্যাং কাজ করছে। তুমি শিওর যে এটা একজনেরই কাজ?”

“মেইন লোক একজনই স্যার। এসব কীর্তি তারই। সবক-টা ছবিতে যাকে দেখছেন তিনি এক ও অদ্বিতীয়।” সে বলল, “তবে হ্যাঁ, তার একটা বিরাট কানেকশন আছে। পাবলিক রিলেশন খুব স্ট্রং। যার জন্য নানাবতি কমিশনের লিস্টের নামগুলো তিনি পেয়ে যান, এবং তাদের কারেন্ট লোকেশনও অ্যাকসেস করতে পারেন। শুধু এইটুকু করার জন্যই যা কানেকশন লাগে তা একজন পাওয়ারফুল ব্যক্তিত্ব, পুলিশ-ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের লোক, আন্ডারগ্রাউন্ড এজেন্ট বা ‘র’ এজেন্টদের তথা স্পাইদের থাকে। অনেক প্রতিভাবান প্রাইভেট ডিটেকটিভও চেষ্টা করলে খুঁজে বের করতে পারে। তার ওপর এরকম মেক-আপের অসাধারণ ক্ষমতা। আমার মনে হয় না ইনি কোনো সাধারণ লোক।”

“কিন্তু তোমার কেন মনে হয় এই সবক-টা ছবিই একজনের?” এডিজি সেন কিন্তু কিন্তু করে বলেন, “এমনও তো হতে পারে এরা প্রত্যেকে আলাদা ব্যক্তিত্ব! কারণ এদের প্রত্যেককেই দেখতে আলাদা।”

“শুধু মুখটা আলাদা।” অধিরাজ বুঝিয়ে বলে, “কিন্তু হাইট, চেহারার ধরণ, গায়ের রং একই। প্রস্থেটিক মেক-আপ দিয়ে মুখ অনেকটাই বদলে দেওয়া যায়, চুল উইগ দিয়ে পালটানো যায়, চোখের রং লেন্স দিয়ে চেঞ্জ করা যায়, কিন্তু চোখের অ্যাকচুয়াল আকার কমানো বাড়ানো যায় না। তাই লামা সাজতে গিয়ে বেচারিকে এক্সট্রা বলিরেখা আমদানি করতে হয়েছে। চামড়ায় যত ভাঁজ থাকবে চোখ ততই ছোটো দেখাবে। এটা কমল হাসান ‘হিন্দুস্তানি’ ফিল্মে হাতে কলমে করে দেখিয়েছিলেন। আবার ফাদার সাজতে গিয়ে চোখদুটো বড়ো করার জন্য একটা ভারি পাওয়ারের চশমা নাকে চাপিয়েছে। ভারি পাওয়ারের চশমার পেছনের চোখ, আর অরিজিনাল চোখ এক নয়।

ভারি পাওয়ারের চশমা খুলে ফেললে তাই চোখ আর চোখের দৃষ্টি দুই-ই পালটে যায়। ফাদার আর লামাকে ছেড়ে দিয়ে বাকি ছবিগুলোতে লোকটার চোখ দেখুন—একই। শুধু তাই নয়, প্রত্যেকটা ছবিতে উনি কিছু-না কিছু ধরে আছেন বা করছেন। ফাদারের হাতে পবিত্র জলের শিশি, ড্রাইভারের হাতে স্প্যানার, লামার হাতে একটা রোজারি মালা বা নেনজু ধরা আছে, নাথুরাম ফুটেজে বিড়ি খাচ্ছে, ‘বার্নিং শিখ’ ফুটেজের ভেতরে একবার নিজের পাগড়ি ঠিক করেছে, রাজেন্দ্র কুমার সিগারেট টানছে, মহম্মদ ইউনুস লাঠি ধরে আছে, সব বাঁ-হাতে। আপনি বলতে চান কেউ এমন একটি সদস্যদের টিম তৈরি করেছে যারা একই হাইটের, একই শেপের, একই কমপ্লেক্সনের এবং একইরকম শেপের চোখের অধিকারী! সবচেয়ে মজার কথা, সবাই লেফটি।”

“নাঃ। চোখের যুক্তিটা যদি একটু দুর্বল বলে উড়িয়েও দিই, লেফটি হওয়ার ব্যাপারটা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।” তিনি একটু ভেবে নিয়ে বললেন, “তবু অন্তত কিছু তো লিড পাওয়া গেল।”

“চোখটাকে উড়িয়ে দেবেন না স্যার।” অধিরাজ বলল, “আমি যদি খুনির জায়গায় থাকতাম তবে যেখানে দাড়ি-গোঁফের ক্যামোফ্লেজ দেওয়ার উপায় নেই, সেখানে প্রস্থেটিক মেক আপ ছাড়া চোখটাকেও ছোটো বড়ো করতাম। কারণ চোখ দেখেও মানুষ চেনা যায়। যেমন সলমান খান কিংবা অজয় দেবগণকে শুধু চোখ দেখেই চেনা সম্ভব। তাই এরপর আমি হয় চাপদাড়ি বা গোঁফ দেখলে কিংবা অতিরিক্ত বলিরেখার কাটাকুটি অথবা হাই পাওয়ারের চশমা চোখে পড়লেই সন্দেহ করব। তার ওপর সে ব্যক্তি লেফটি হলে তো কথাই নেই।”

শিশির সেন কাঁধ ঝাঁকালেন, “ফাইন৷ সাসপেক্টের কিছু ধর্ম তো জানা গেল৷ সম্ভবত লোকটি হিন্দিভাষীও বটে। কলকাতায় অবশ্য প্রচুর অবাঙালি আছে। কিন্তু তারা প্রত্যেকেই অল্পবিস্তর বাংলা জানে ও বোঝে। ইনি দিল্লির লোক, বাংলা নাও বলতে পারেন।”

“এটাও পয়েন্ট হতে পারে।” অধিরাজ ফের অন্যমনস্ক, “তবে আমি অত আশাবাদী নই স্যার। দিল্লি ও কানপুরে না হয় হিন্দিতে কাজ চালিয়েছেন। কিন্তু বেঙ্গালুরুতে কাজ চালালেন কী করে? ওখানে লোকে হিন্দির চেয়ে কন্নড়, তামিল আর তেলুগুতেই বেশি কথা বলে। হিন্দিভাষী ওখানে প্রায় নেই। ইংরেজি অবশ্য চলে। কিন্তু এই ব্যক্তি সেখানেও প্রত্যেকটি কেসেই স্থানীয় বাসিন্দা এবং একটু লো প্রোফাইলের মানুষ রূপে ছিলেন। যেমন ড্রাইভার, লেবার—ইত্যাদি। স্থানীয় ড্রাইভার বা মজুর ঝরঝর করে ইংরেজি বলবে সেটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। তার ওপর পুলিশ সজাগও ছিল। ইংরেজি বলার ভুল সে করবেই না। কারণ দক্ষিণ ভারতীয়দের ইংরেজির অ্যাকসেন্ট আলাদা। তবে সে কোন ভাষায় কথা বলেছিল?”

“তাই তো।” এডিজি স্তম্ভিত, “তার মানে সে সাউথ ইন্ডিয়ান ভাষাও জানে!” “সেটাই মনে হচ্ছে।” বলতে-বলতেই তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে, “ব্যাপারটা অত সহজ হবে না স্যার। আমি যদি ভুল না করি তবে এ মক্কেল একাধিক ভাষা জানে। বাংলা অল্পস্বল্প বলতে পারলে আমি আশ্চর্য হব না। আপনি ওকে আন্ডার এস্টিমেট করছেন। এ রীতিমতো প্রতিভাবান ক্রিমিনাল। সহজে ধরা দেবে না।”

“তাহলে? কীভাবে এগোব আমরা?” তিনি চিন্তিত স্বরে বললেন, “কাদের খুন করবে অন্তত সেটাও যদি জানা যেত…!”

তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই ঝড়ের গতিতে এসে হাজির হল পবিত্র এবং কৌশানী। ওরা এতক্ষণে নানাবতি কমিশনের ফাইলের নামগুলোর মধ্যে কতজন এইমুহূর্তে কলকাতায় আছেন, সেই খবরই নিচ্ছিল। ২০১৮ সাল অবধি মামলা চলেছে বলে দিল্লি ক্রাইম ব্রাঞ্চের কাছে সমস্ত আপডেটেড রেকর্ডই ছিল। সেখান থেকে কলকাতার উড বি ভিকটিমদের তালিকা বানিয়ে ফেলেছে ওরা।

পবিত্র উত্তেজিত ভঙ্গিতে জানায়, “সর্বনাশ করেছে রাজা! ওই ফাইলের মধ্যে আটজন এই মুহূর্তে কলকাতাতেই আছেন। অবশ্য লেটেস্ট নিউজ অনুযায়ী তাদের মধ্যে দু-জন অলরেডি কোভিডে মারা গিয়েছেন। একজন বিয়ে থা করেননি। বৃদ্ধাশ্রমেই থাকেন। বাকি পাঁচজনের মধ্যে জ্যোতিপ্রকাশ ত্রিপাঠীর বাড়িতে অলরেডি অ্যাটাক হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে এই খবরটা কী করে যেন নিউজ চ্যানেলে লিক হয়ে গিয়েছে। কী করে মিডিয়ার লোকগুলো এত তাড়াতাড়ি খবর পায় কে জানে! তার পর থেকেই এমার্জেন্সি লাইনগুলোয় একের পর এক ফোন আসছে। ছ-জন ব্যক্তি এবং আটজনের পরিবার পুলিশ প্রোটেকশন চাইছেন! যারা মারা গিয়েছেন, তাদের গোটা ফ্যামিলি তো সোজা নিকটস্থ পুলিশ স্টেশনে গিয়ে বসে আছে!”

শিশির সেনের মাথায় হাত। আটজনের পরিবারকে কীভাবে একসঙ্গে প্রোটেকশন দেবেন! তাছাড়া পুলিশ প্রোটেকশন দেওয়া মানে পুলিশকর্মীদেরও জীবন বিপন্ন করা। কানপুর ও ব্যাঙ্গালুরুর ঘটনার পর এখন পুলিশও নিরাপত্তা দিতে ভয় পাচ্ছে। এই মুহূর্তে ঠিক কী করবেন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। অধিরাজ কিন্তু অদ্ভুত শান্ত। সে আস্তে আস্তে বলল, “কুল পবিত্র। এত টেনশন নেওয়ার কোনো মানে হয় না। অপরাধী চাইছে আমরা কনফিউশনে পড়ি। সেজন্যই চ্যানেলে খবরটা সে নিজেই লিক করেছে। অন্য কোনো সূত্র থেকে লিক হয়নি। এই ক্যাওয়াসটা সে চাইছিল, তাই তার কাজ সে করেছে। আমরা আমাদের কাজ করব। তুমি বরং যাদের ওপর বিপদের সম্ভাবনা নেই তাদের এই লিস্ট থেকে আউট করো এবং তাদের প্রত্যেককে নিশ্চিন্ত করো।”

“বিপদের সম্ভাবনা নেই মানে!” পবিত্র বলল, “আমি তো আটজনের ফ্যামিলির মাথাতেই যমরাজের খাঁড়া লটকে থাকতে দেখতে পাচ্ছি। আর তুমি বলছ বিপদের সম্ভাবনা নেই!”

“না। সবার মাথার ওপর খাঁড়া লটকে নেই।” সে বুঝিয়ে বলে, “যে দু-জন কোভিডে মারা গিয়েছেন, তাদের পরিবার সম্পূর্ণ নিরাপদ। খুনি যাদের চরম শাস্তি দিতে চেয়েছিল, যখন তারাই ধরাধামে নেই তখন তার পরিবারকে খামোখা মেরে সে কী করবে? শোকাহত হওয়ার লোকটাই তো নেই। পরিবার তখনই বিপন্ন যখন ব্যক্তিটি তাদের নিয়ে সুখে সংসার সাজিয়ে বসে আছেন। সেটা না থাকলে বিপদও নেই। আমার ধারণা যদি ঠিক হয়, তবে দিল্লিতে সে শেষ খুনটা এই কারণেই করেনি। পেপারে পড়েছিলাম ঠিক ওই বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যেই দিল্লির এক বিখ্যাত বয়স্থ কংগ্রেস নেতা টেঁসে গিয়েছেন। খবরটা পেপারে উঠেছিল কারণ তিনি কুখ্যাত সজ্জনকুমারের সঙ্গেই মামলায় ফেঁসেছিলেন। সম্ভবত ওই লোকটাই নেক্সট টার্গেট ছিল। কিন্তু মরে গিয়ে ভদ্রলোক গোটা ফ্যামিলিকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন।” অধিরাজ মৃদু হাসল, “ঠিক একই কারণে বৃদ্ধাশ্রমে থাকা ব্যক্তিটিরও দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। তার পরিবারই নেই তো মারবে কাকে! ভদ্রলোক বিয়ে করেননি, কোনো সংসারের ঝামেলা নেই। বৃদ্ধাশ্রমে হয়তো বন্ধু বান্ধব কিছু হয়েছে। কিন্তু তাদের ধরে কচুকাটা করলে ভদ্রলোক দুঃখেই মরে যাবেন বলে মনে হয় তোমার? আমার মনে হয় না! আর সরাসরি তাকে মেরে ফেললে সেটা শাস্তির চেয়ে মুক্তিই বেশি হবে। খুনি সেটাও চাইবে না। অতএব তিনিও এ যাত্রা বেঁচে গেলেন। বাকি পাঁচজনের মধ্যে একজনের বাড়িতে অ্যাটাক হয়ে গিয়েছে। অতএব সংখ্যাটা আরও কমল। বাকি রইল হারাধনের চারটি ছেলে। তাদের স্টেটাস কী?”

‘এর মধ্যে আনোয়ার শেখ নামের এক ভদ্রলোক আছেন। বর্তমানে প্রায় পঁচাশি বছর বয়েস। সেই সময়ে দিল্লিতে তাঁর তিনটে বিরাট পেট্রোল পাম্প ছিল। সেখান থেকেই সবরকমের জ্বালানি তেল ডিস্ট্রিবিউট করা হয়েছিল। এই মুহূর্তে তিনি ঢাকুরিয়ার একটা বিরাট প্রাসাদে চাকর-বাকরের সঙ্গে একাই থাকেন। তাঁর পুত্রসন্তান নেই। সম্ভবত ছেলে ছেলে করতে করতেই তিনজন কন্যাসন্তানের জন্ম হয়ে গিয়েছে। কিন্তু একজন মেয়েও নিজের বাবাকে দু-চক্ষে দেখতে পারে না! বাবারও তিন মেয়ে ও জামাই চক্ষুশূল। বাবার সম্পত্তি নিয়ে তিন মেয়ে কামড়াকামড়ি করছিল দেখে খেঁকুটে বাবা ডিক্লেয়ার করেছেন, সমস্ত প্রপার্টি তিনি খুব শীগগিরিই ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘে দান করে যাবেন। এরমধ্যেই যদি বার্নিং শিখ মেয়ে জামাইদের উড়িয়ে দেয়, তবে বাবা বিশেষ দুঃখিত হবেন বলে মনে হয় না। বরং সম্পর্কটা এমনই দাঁড়িয়েছে যে আনোয়ার উলটে খুশিই হবেন।”

“আমাদের খুনি কি এত বড়ো খুশির খবর প্রাণে ধরে আনোয়ার সাহেবকে দিতে পারবেন? মনে হয় না।” সে মাথা নাড়ে, “চরিত্র যা বুঝলাম যে এরকম সংবাদ শুনে আনোয়ারও হার্ট ফেল করতে পারেন। তবে সেটা আনন্দের চোটে। এত বড়ো আনন্দ তাঁকে দেওয়া যায় না। অতএব তিনিও বাদ গেলেন। নেক্সট?”

“রাজনীতিবিদ পি সি চৌধুরী। কট্টর কংগ্রেস সমর্থক। জগদীশ টাইটলারের অনুগত ভক্তদের মধ্যে অন্যতম। নিজে মরতেও পারতেন, মারতে তো পারতেনই। ইনি রীতিমতো ঘোষণা করেছিলেন পাগড়িসহ এক একজন শিখের মুণ্ডু পিছু পাঁচশো টাকা দেবেন! উনি আলিপুরে সপরিবারেই থাকেন। যদিও খুব বড়ো পরিবার নয়। তাঁর নিজের কোনো সন্তান-সন্ততি হয়নি। তাই মধ্যবয়েসে এসে একটি বাচ্চা ছেলেকে অ্যাডপ্ট করেছিলেন। তিনি, তাঁর স্ত্রী সোমলতা, দত্তক পুত্র পরিমল আর পুত্রবধূ মেঘনা, এই চারজনই থাকেন। এখনও নাতি বা নাতনির মুখ দেখেননি। সঙ্গে একজন কম্বাইন্ড হ্যান্ড, শিবু। টোট্যাল পাঁচজন।”

“এই ফ্যামিলিটার খুন হওয়ার চান্স আছে পবিত্র।” অধিরাজ অর্ণবের দিকে তাকায়, “নোট করো।”

“রাজ কানোয়ার।” পবিত্র কন্টিনিউ করে, “ইনি তৎকালীন দিল্লির একজন আই.এ.এস. অফিসার ছিলেন। দাঙ্গা অধ্যুষিত এলাকার দায়িত্ব ওঁর ওপরই ছিল। অসহায় শিখেরা সাহায্যের জন্য মিঃ কানোয়ারের সাহায্যপ্রার্থী হয়েওছিল। তিনি তাদের সুরক্ষিত রাখার আশ্বাস দিলেও আসল সময়ে কোনো স্টেপই নেননি। উলটে ভোটার লিস্ট তুলে দিয়েছিলেন আততায়ীদের হাতে, যার ফলে ভোটার লিস্ট ধরে ধরে শিখদের খুঁজে বের করে খুন করাটা জলভাত হয়ে গিয়েছিল।”

“এখন তিনি কোথায় আছেন? কী করছেন?”

“রিটায়ার্ড লাইফ লিড করছেন। স্ত্রী গত হয়েছেন কোভিডের সময়ে। ছেলে, পুত্রবধূ, নাতনি—সবাই বিদেশে থাকে। বছরে একবারও আসে কিনা সন্দেহ। ছেলে লন্ডনে ডাক্তারি করে। গ্রীন কার্ড হোল্ডার। ভারতবর্ষে আসার কোনো প্ল্যানিংই নেই।” “ইনিও সম্ভবত সেফ জোনেই আছেন। খুনি বুড়ো শয়তানকে মেরে হাত গন্ধ করবে না। ফ্যামিলি তো এখানেই নেই। বার্নিং শিখ আর যা-ই হোক, কষ্ট করে লন্ডনে গিয়ে ওঁর পুত্র-পুত্রবধূকে মারবে না। চিঠি অনুযায়ী খুনগুলো কলকাতাতেই হবে, লন্ডনে নয়। ওকেও বাদ দিতে পারো।”

“তাহলে নেতি নেতি করে ছাঁকনিতে আর একজনই রইলেন। এক্স আই.পি.এস. ভূপেন্দ্র দত্তা। ইনি ভয়াবহ মেজাজি লোক। শিখেরা ওঁর কাছেও সাহায্য আর নিরাপত্তা চাইতে গিয়েছিলেন। শোনা যায় দত্তাসাহেব তাদের শান্ত করে প্রোটেকশন দেওয়ার আশ্বাস দেন এবং তাদের কাছ থেকে শিখরা যেসব অস্ত্র ঘরে রাখে, যেমন তরোয়াল, কৃপাণ, ছুরি—ইত্যাদি নিয়ে নেন। এরপরের ইতিহাস অতি সংক্ষিপ্ত। উন্মত্ত ভিড় নিরস্ত্র শিখদের সহজেই মেরে, ধরে, জ্বালিয়ে শেষ করে দেয়। তিনি ও তাঁর টিম দূরে দাঁড়িয়ে স্রেফ তামাশা দেখছিলেন। তবে জ্বালানোর জন্য যখন দেশলাই কাঠি কম পড়ছিল, তখন নিজের লাইটারটিও ডোনেট করেছিলেন। নানাবতি কমিশন এবং কপুর মিত্তল কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী ওঁর বিরুদ্ধে অনেক সাক্ষী থাকলেও পরে তারা সাক্ষ্য পালটে দেয়। কেস টিকল না। ইনিও নিশ্চিন্তে পুলিশের চাকরির মেয়াদ শেষ করে সম্প্রতি রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন। এখন অবশ্য কংগ্রেস নয়, বিজেপি সাপোর্টার। চুটিয়ে রাজনীতি করছেন। আর্বানায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে সপরিবারে থাকেন। পরিবারে তিনি, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে, জামাই, আর তাদের দুই ছেলে মেয়ে আছে।”

“ইনি আমাদের দ্বিতীয় মক্কেল অর্ণব। নাম, ঠিকানা নোট করে নাও।”

অর্ণব মাথা ঝাঁকিয়ে লোকটির ডিটেলস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, “ইয়েস স্যার।” “ছি ছি!” এডিজি শিশির সেন এবার বিরক্তিতিক্ত কণ্ঠে বলে ওঠেন, “আমারই লোকটাকে খুন করতে ইচ্ছে করছে! পুলিশ নামের কলঙ্ক! এদের প্রোটেকশন দেওয়ার কোনো মানেই হয় না। বরং ওঁর ঘাড় ধরে বার্নিং শিখের সামনে ফেলে দেওয়া উচিত!! অন্তত আমাদের ইনোসেন্ট পুলিশকর্মীগুলো প্রাণে বাঁচে! কতগুলো ক্রিমিনালকে ফালতু বাঁচানোর চেষ্টা করছি কেন আমরা ব্যানার্জি?”

অধিরাজ পূর্ণদৃষ্টিতে এডিজি সেনের দিকে তাকায়। এডিজি সেনকে কখনোই এত উত্তেজিত ও বিরক্ত হতে সে দেখেনি। কখনও তিনি অপরাধীদের স্বপক্ষে কথা বলেন না। অথচ আজ যথেষ্ট বিচলিত। সে ওঁর মনোভাব বুঝতে পেরে বলল, “সিরিয়াসলি স্যার, যতজনের প্রোফাইল শুনলেন, অথবা বেঙ্গালুরু আর কানপুরে যাদের প্রোটেকশন দিতে গিয়ে কতগুলো পুলিশকর্মী ও অফিসার মারা গেল, তাদের একজনকেও কি মর‍্যালি আমাদের বাঁচানো উচিত? আমাদের ওঁদের প্রতি সহানুভূতি নেই। কিন্তু বার্নিং শিখ ওদের মারছে না, ওদের ইনোসেন্ট ফ্যামিলিকে মারছে। এবং এটা সে নিজের জীবন যন্ত্রণা থেকেই করছে। চোখের সামনে সে নিজের পরিবারকে মরতে দেখেছে, নিজে বেঁচে থেকে তাদের মৃত্যুর দুঃসহ ভার বয়ে বেরিয়ে হয়তো তিল তিল করে মরছে। তাই তার পে-ব্যাক করার কয়েনটাও এক। তার দিক থেকে সে হয়তো ঠিক, কিন্তু নিষ্পাপ পরিবার, বিশেষ করে ছোটো ছোটো শিশুদেরও সে খুন করছে। আমরা সেটা হতে দিতে পারি না।”

শিশির সেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “বুঝলাম। এখন কী করণীয়?”

“প্রথম কাজ আটটি পরিবারকেই প্রোটেকশন দেওয়া। যে ভুলটা কানপুর ও বেঙ্গালুরুর পুলিশ করেছিল, আমরাও সেটাই করব। বার্নিং শিখকে বুঝতে দেব যে আমরাও কনফিউজ। কে মরবে তা আদৌ বুঝিনি। আমরা প্রেস কনফারেন্সে বলব ঠিকই যে আটজনকেই পুলিশ প্রোটেকশন দিচ্ছি, সকলের সঙ্গে সশস্ত্র উর্দিধারীও থাকবে, কিন্তু আমাদের মেইন টিমের লক্ষ্য থাকবে এই বিশেষ দুটি পরিবারের দিকে। আমাদের টিম এই দুটো পরিবারকেই আসলে নিরাপত্তা দেবে। বাকিগুলো ফর শো! খুনি আমাদের যথেষ্ট কনফিউজ করে রেখেছে। এবার তাকেও আমরা একটু কনফিউজ করি। বাকি ছ-টা কেসে যারা আতঙ্কিত হয়ে উঠেছেন, তাদের পবিত্র শান্ত করে, বুঝিয়ে সুঝিয়ে একজন করে কনস্টেবল খাড়া করে ছেড়ে দেবে। আমি নিশ্চিত, তাদের কিচ্ছু হবে না, কনস্টেবলরাও সুরক্ষিতই থাকবে। কারণ এবার খুনি যেদিকে দেখছে, আমরাও ঠিক সেদিকেই দেখছি।”

“বেশ। স্ট্র্যাটেজি কী? এই বাহাত্তর ঘণ্টা ওদের প্রোটেক্ট করা?”

“না স্যার।” অধিরাজ মাথা নাড়ল, “আমরা যা করব অবিকল খুনির পয়েন্ট অব ভিউ থেকে করব। আমাদের গোটা টিমকে তিনভাগে ভাগ করতে হবে। আমি আর অর্ণব তাকে চেজ করার চেষ্টা করব। পুলিশি তদন্ত নয়, একদম তার পয়েন্ট অব ভিউ থেকে এগোব। ম্যান টু ম্যান মার্কিং এর গেম। যে পথে সে হাঁটছে বা হাঁটবে সেটা ধরতে পারলে তাকেও পাওয়া যাবে। তখন তার পক্ষে গোল দেওয়া অত সহজ হবে না। মিস্ বোস আর পবিত্র প্রয়োজনীয় ব্যাক আপ এবং ইনফর্মেশন দেবে। ওদিকে প্রণবেশ লাহিড়ীকেও চাইছি স্যার। ওই ডেয়ার ডেভিল অফিসারটিকে আমার চাই। উনি আর মিস দত্ত ইন্টারোগেশনে হেল্প করবেন।” সে একটু থেমে যোগ করল, “আর একটা সাবোর্ডিনেট টিম তৈরি করতে হবে। খবরিদের টিম। আমাদের সেরা ইনফর্মারদের এবার মাঠে নামাতে হবে স্যার। ঘন্টু, যাদব, গুল্লু, ইসমাইল এবং রকিকে একঘণ্টার মধ্যে আমি ব্যুরোয় চাই। সময় হাতে একেবারেই নেই। এই চারটে টিম নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে শহর জুড়ে ঝড়ের বেগে কাজ না করলে বাকিদের মতোই একতরফা মাত খেতে হবে। কারণ খুনিকে আটকাতে গিয়ে সেটাই হয়েছে। এবার প্ল্যান বদল। আমরা ডিফেন্সিভ না খেলে সোজা অ্যাটাকে যাব, খুনিকে ধরার চেষ্টা করব, যেটা সে একেবারেই এক্সপেক্ট করছে না।”

“তুমি যথারীতি খুনির মস্তিষ্কে ঢোকার চেষ্টা করছ দেখছি।” এডিজি ছোট্ট নড করলেন, “ওকে। তুমি লাহিড়ীকেও নিয়ে নাও। দরকার পড়লে লোক্যাল পুলিশদের হেল্পও নাও৷ যেমনভাবে প্ল্যান করছ, তেমনভাবেই এগোতে থাকো। চারটে টিমই একসঙ্গে কাজ করুক। ফরেনসিককেও এই বাহাত্তর ঘণ্টার জন্য হাই-অ্যালার্টে থাকতে হবে। তুমি ডঃ চ্যাটার্জিকে বলবে না আমি বলব?”

“তিনদিন তাঁকে ল্যাবেই কাটাতে হবে এমন সুসংবাদ হয়তো আমার মুখে শুনলেই তিনি বেশি আহ্লাদিত হবেন।” অধিরাজ হেসে ফেলে, “ইনফ্যাক্ট আমি আর অর্ণব এখন তাঁর কাছেই যাচ্ছি। আমিই না-হয় ঘণ্টাটা বেঁধে দিয়ে আসব।”

“ফাইন।” এবার শিশির সেনের কণ্ঠে একটু ব্যাকুলতা স্পর্শ করল, “তবে একটা কথা মনে রেখো। এই বাহাত্তর ঘণ্টায় তোমার যা ব্যাক আপ লাগবে সব দিতে রাজি আছি। কিন্তু কোনোরকম ক্যাসুয়ালিটি চাই না। একটা সাইকোর প্রতিশোধের ঠ্যালায় আমার কোনো অফিসার শহীদ হয়ে গেলে জীবনেও নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না আমি রাজা।”

অনেকদিন পর তিনি আবার অধিরাজকে ‘রাজা” বলে ডাকলেন। তাঁর চোখের চিকচিক করে ওঠাটাও নজর এড়াল না অর্ণবের। এই প্রথম তার মনে হল, একটা ভয়ানক যুদ্ধ লাগতে চলেছে। এবারের পরিস্থিতি প্রায় চোখ বুঁজে আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার মতো। কানপুর আর বেঙ্গালুরুতে এই আগুন অনেক জীবনকে পুড়িয়ে ছাই করেছে। এবার কলকাতায় সেই আগুন জ্বলে ওঠার পালা! অধিরাজ আবার সেই আগুনের পদচিহ্ন ধরেই এগোতে চায়। অর্ণবের মনে হল একটা অগ্নিকুণ্ডের দিকে নিজেই ছুটে যাচ্ছে অধিরাজ। ম্যান টু ম্যান মার্কিং।

তার বুকের ভেতরটা গুড়গুড় করে ওঠে। হৃৎপিণ্ডটাই বুঝি টিকটিক করে উঠে কাউন্টডাউন ঘোষণা করছে। জানান দিচ্ছে, লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছে। ওয়ান… টু… থ্রি… দ্য গেম ইজ অন!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *