কালরাত্রি – ১৩

(১৩)

ডঃ চ্যাটার্জির বাড়ির অবস্থা দেখে ওদের দু-জনেরই বাহ্যজ্ঞান লোপ পেল। অধিরাজের অবস্থা দেখলে মনে হয়, কেউ তাকে শূলে চড়ালেও বোধহয় এত কষ্ট পেত না। তার চোখের সামনে বারবার ফিরে আসছিল আরও একটা ক্রাইমসিন যার দুঃস্বপ্ন সে এখনও দেখে! আর অর্ণব নিজেই বুঝি কয়েক সেকেন্ডের জন্য বেহুঁশ হয়ে যাচ্ছিল। সামনের দৃশ্যটা দেখে আর একটু হলেই টলে পড়ে যাচ্ছিল। কোনোমতে নিজেকে সামলেছে!

রাস্তায় তখন ট্র্যাফিকের রাশ ছিল না। আটটা থেকে মোটামুটি অফিসযাত্রীদের ভিড় শুরু হয়। একেই রাস্তা ফাঁকা, তার ওপর প্রয়োজনের সময় ট্র্যাফিকের ইশারা অগ্রাহ্য করাই অধিরাজের নিয়ম। ব্যুরো থেকে ডঃ চ্যাটার্জির বাড়ি প্রায় একঘণ্টার রাস্তা। কিন্তু সেই দূরত্ব অর্ধেক সময়ে অতিক্রম করল অধিরাজ। এর মধ্যে অর্ণবের সঙ্গে তার একটি বাক্যও বিনিময় হয়নি। অধিরাজের মুখ অসম্ভব গম্ভীর। অর্ণবের অন্তরাত্মা কাঁপছে। এ কেমন খুনি যে নৃশংসতার সব মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বাড়ির মধ্যে ঢুকে সনতের মতো একজন গরীব, নিরীহ মানুষকে এভাবে খুন করার মানে কী! এবং শুধু তাই নয়, এই দেহ সে ব্যুরোর সামনেই ডাম্প করেছিল। ও জানত, ডেডবডিটা পুলিশের মাধ্যমে ডঃ চ্যাটার্জির কাছেই পৌঁছবে। এবং ওঁর সেটা বুঝতে বিশেষ সময় লাগবে না! একজন ফরেনসিক এক্সপার্টকে এভাবে ব্যথা দেওয়ার পেছনে তার উদ্দেশ্য কী? সে কি আদৌ সনৎকেই মারতে চেয়েছিল, না তার লক্ষ্য স্বয়ং ডঃ অসীম চ্যাটার্জিই ছিলেন? সনৎ হয়তো বেঘোরেই মারা গেল।

এই সম্ভাবনার কথা মনে আসতেই অর্ণবের হৃৎস্পন্দন যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে যায়৷ একটা রাতের মধ্যেই খুনি অর্ণবকে তিনবার অ্যাসিড অ্যাটাক করেছে, অধিরাজের গলা কেটে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, অর্ণবকে উড়িয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত প্রায় করেই ফেলেছিল সে, সেখানে ব্যর্থ হয়ে ইসমাইল আর রকিকে মেরেছে। এখানেও ক্ষান্ত হয়নি। হয়তো ডঃ চ্যাটার্জিকেও খুন করার পরিকল্পনা ছিল তার! মাঝখান দিয়ে মারা পড়ল সনৎ! এরকম রক্তপিপাসু খুনি সে আগে কখনও দেখেনি। এর তুলনায় হয়তো ‘সার্জিক্যাল স’ কিলারও নিতান্তই শিশু! একের পর এক তার আক্রমণ এসেই চলেছে। সে যুদ্ধে বিরতি দিতে জানে না, কাউকে ছাড়ে না, কিছুতেই তার শান্তি নেই। এ কী জাতীয় মনুষ্যরূপী দানব! সময় যত কমছে, ততই যেন লোকটা হিংস্র থেকে হিংস্রতর হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও কী কী করবে সে? সি.আই.ডি. হোমিসাইডের সঙ্গে পাঞ্জা কষতে কষতে কতদূর যাবে?

ডঃ চ্যাটার্জির বাড়ির অবস্থা ওরা যতখানি কল্পনা করেছিল তার চেয়েও খারাপ। ঢোকার মুখে দরজার সামনেই তাজা রক্তের ধারা দেখে অর্ণবের গায়ের সমস্ত রোম খাড়া হয়ে যায়। রক্তের স্রোত ভেতর থেকে বাইরে এসে পড়েছে। ঘরের ভেতরের দৃশ্য আরও ভয়ানক। একদম সামনের হলের মেঝেটা রক্তে ভাসছে। যেন মার্বেলের ফ্লোরের ওপরে লাল তরলের গালিচা। তার মধ্যেই ইতস্ততঃ টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে রয়েছে মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। দুটো হাত আর দুটো পা অজস্র টুকরোয় কেটে সাজিয়ে দিয়েছে খুনি। অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলো সবই বাইরে ছড়িয়ে আছে। অধিরাজ বুঝতে পারছিল না এগোবে কোন্ পথে! গোটা মেঝে রক্তে পিচ্ছিল। কোথাও অস্ত্র পড়ে রয়েছে, কোথাও ফুসফুস কিংবা পাকস্থলী। রক্তের দুর্গন্ধে, দৃশ্যের বীভৎসতায় অর্ণবের গা গুলিয়ে ওঠে। এমনকি সনতের মাথাটাও অক্ষত নেই। খুনি ওর মাথার ওপর কোনো ভারি বস্তু দিয়ে এত আঘাত করেছে যে মাথা ফেটে চৌচির। রক্তের সঙ্গে ওর মাথার হাড়ের টুকরো, ঘিলুও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে চতুর্দিকে। তবে মুখটা চিনতে কষ্ট হচ্ছে না। এটা সনৎ-ই। ওকে খুনি বেহুঁশ করেনি। ডঃ চ্যাটার্জিই একটু আগে বলছিলেন যে ওর পাকস্থলীতে যতটুকু মদ ছিল তাতে লোক মাতাল হয় না। ঘুমের ওষুধও পাকস্থলীতে ছিল না। সর্বোপরি ওর যন্ত্রণাবিকৃত মুখ বলে দেয়, মরার আগে ও সম্পূর্ণ জ্ঞানেই ছিল। ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, লণ্ডভণ্ড অবস্থায় থাকা আসবাবপত্র সাক্ষ্য দেয়, সে ফাইট ব্যাক করার আপ্রাণ চেষ্টাও করেছিল। আর এবার মার্ডার ওয়েপন একটা পেল্লায় হাতুড়ি সেটাও ঐ রক্ত, মাংস, ঘিলুর মধ্যেই পড়ে রয়েছে।

অধিরাজ নিশ্চিত, ইসমাইলের মতো মাথাটা সনতের হলেও দেহাংশগুলো সব ওর নয়। এর মধ্যে ইসমাইলের শরীরের অংশও আছে। এখান থেকে ইসমাইলের ডেরা মাত্র পনেরো মিনিটের দূরত্বে। খুনি দুটো খুনই পরপর করেছে। বড়োজোর মাঝখানে কুড়ি কী পঁচিশ মিনিটের ফারাক ছিল। রক্তের প্রাবল্য সাক্ষী দিচ্ছে যে দুটো বডিকে টুকরো টুকরো এখানেই বসে করেছে সে। দুটো শরীরের পিসগুলোকে মিশিয়ে একটা সেট ব্যুরোর সামনে ফেলেছে, অন্যটা ডঃ চ্যাটার্জিকে উপহার দেওয়ার জন্য বাড়িতেই রেখে গিয়েছে।

আবার তার মনে পড়ে গেল সেই ভয়ানক দৃশ্য। ‘সার্জিক্যাল স’ কিলারও প্রায় এমনই একটা নৃশংস রক্তাক্ত ক্রাইমসিন উপহার দিয়েছিল অধিরাজকে। কিন্তু সেখানে অন্তত ভেতরের অঙ্গ বাইরে ছড়ানো থাকত না! কিন্তু সেই খুনিটি আজও তাকে তাড়া করে বেড়ায়। কখনও সচেতনে, কখনও বা অবচেতনে। মৃতরা তার খুব ঘনিষ্ঠ কেউ ছিল না। ওরা তার সিকিউরিটি গার্ড ছিল যাদের হয়তো সবাইকে সে ভালোভাবে চিনতও না। অথচ সনৎ ডঃ চ্যাটার্জির নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র বিশ্বস্ত সঙ্গী! ওঁর বিয়ে ডঃ চ্যাটার্জি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দিয়েছিলেন। দেশে পাকা বাড়ি করার জন্য টাকাও দিয়েছেন। সে ওঁর সন্তানতুল্য…।

এই ভয়ানক ক্রাইমসিনের একপাশে চুপ করে বসেছিলেন ডঃ চ্যাটার্জি। তার পাশে আহেলি এবং আইভি। আহেলির একটা হাত সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে ভদ্রলোকের কাঁধ পরম মমতায় স্পর্শ করে আছে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের মুখে একটিও শব্দ নেই, অথচ চোখ বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় জল গড়িয়ে পড়ছে। ওঁর মনের অবস্থা অধিরাজ খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছিল। সে নিজেও এই যন্ত্রণার মুখোমুখি হয়েছে। এই প্রবল যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, শুধু যার ওপর দিয়ে যায়, সে-ই বোঝে! সেদিক দিয়ে অধিরাজ ডঃ চ্যাটার্জির সমব্যথী। ওঁর ভেতরে যে কী চলছে, তা একমাত্র অধিরাজই অনুভব করতে পারে। জীবিকার খাতিরে এরকম অথবা এর থেকেও বীভৎস লাশ দেখে তিনি অভ্যস্ত। শয়ে শয়ে মৃতদেহ কাটাছেঁড়া করাই তাঁর পেশা। বিকৃত মানবদেহ, কাটা ফাটা শবদেহ তাঁকে কখনোই বিচলিত করে না। কিন্তু নিজের প্রিয় মানুষ, বা স্নেহের পাত্রটি যখন আচমকা লাশ হয়ে যায়, তখন অতি বড়ো পাষাণহৃদয় মানুষও তা মেনে নিতে পারে না!

আহেলি এবং আইভি’র মুখ বিবর্ণ হলেও ওদের দু-জনেরই হাতে গ্লাভস। আইভি-র পাশে ফরেনসিক কিট বক্স আর এভিডেন্স ব্যাগও নজর এড়াল না। অধিরাজ বুঝল, ওরা দু-জনেই ইতিমধ্যে ক্রাইম সিন পরীক্ষা করেছে। কিন্তু কী বলবে, বা বলা উচিত তা বুঝতে পারছিল না। চতুর্দিকের শোচনীয় নীরবতা বুকের ওপর মারাত্মক ভার হয়ে চেপে বসছিল। সেই অসহ্য নিস্তব্ধতাকে ভঙ্গ করলেন স্বয়ং ডঃ অসীম চ্যাটার্জিই। নীচু স্বরে বিড়বিড় করে বললেন, “প্রথমে একের পর এক হাতুড়ির বাড়ি মেরেছে মাথায়। ততক্ষণ অবধি মেরেছে, যতক্ষণ না খুলি ভেঙে ব্রেইন বাইরে না আসছে। ভিকটিম ফাইট ব্যাক করার চেষ্টা করেছিল। মৃত্যুর পর কোনো ধারালো বস্তু দিয়ে টুকরো করা হয়েছে বডিটাকে। কোনো চপার বা ছুরি নয়। খুব ধারালো তরোয়াল জাতীয় কিছু। ইসমাইলের ক্ষেত্রেও তরোয়ালই ইউজ হয়েছে। অন্তত শরীরের কাটগুলো তেমনই বলে। দরজায় কোনো ফোর্সড এন্ট্রির চিহ্ন নেই। নো ফিঙ্গারপ্রিন্ট, নো ডি.এন.এ., নাথিং। তবে খুনি যখন ওর মাথায় হাতুড়ির বাড়ি মারছিল, তখন বাঁ হাত ব্যবহার করেছে। সনতের মাথার সব ক-টা আঘাত রাইট সাইডে। ভেঙেছেও ডানদিকেরই স্কাল। কিন্তু ডেডবডির কাট বা স্ল্যাশগুলো লেফট টু রাইট। তরোয়াল দিয়ে কাটার সময় ডানহাত ….।” বলতে বলতেই তাঁর স্বর কান্নাবিকৃত হয়ে ওঠে, “বড়ো কষ্ট হয়েছে ছেলেটার… বড়ো ব্যথা পেয়েছে… বারবার বলেছি, ভোর ভোর মদ গিলে বসে থাকিস না। কথাই শুনত না। বলত, এটা ওষুধ, আমার ইঞ্জিনের তেল…কতবার বলেছি অচেনা লোক দেখলে দরজা খুলবি না…! ও মরে গেল… আমার জন্য মরে গেল… ওর মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ী রাজা… দেশের বাড়িতে ওর বউ আছে… ছোট ছোটো ছেলে-মেয়ে…. বার্নিং শিখ নয়, আমিই ওকে খুন করলাম…।”

কথার সঙ্গে সঙ্গে কান্না তাঁকে দখল করে নিল। অমন জাঁদরেল মানুষটা আর সহ্য করতে না পেরে বেসামাল কান্নায় ভেঙে পড়লেন। অধিরাজ জানত, এর কোনো সান্ত্বনা নেই! এ ক্ষত’র কোনো মলম হয় না! ডঃ চ্যাটার্জিকে এখন কিছু বলার মতো সাহসও তার মধ্যে অবশিষ্ট নেই। শুধু দু-চোখে অদ্ভুত এক অনুতাপ আর রাগ! দাঁতে দাঁত পিষে বলল, “শুয়োরের বাচ্চাটাকে ছাড়ব না আমি!”

“আমি সি.আই.ডি. ব্যুরো থেকে আসছি… অ্যাঁ… আমি সি.আই.ডি. ব্যুরো থেকে এসেছি…!”

একটা কড়কড়ে গলার শব্দে সচকিত হয়ে উঠল ওরা সবাই। এতক্ষণ ভুলেই গিয়েছিল যে সনৎ ছাড়াও আরও একটি সদস্য এ বাড়িতে আছে। সে ভেতরের ঘরে ছিল বলে কারোর মনোযোগ তার ওপর পড়েনি। এবার তার কণ্ঠস্বর শুনে সবারই খেয়াল হল। অধিরাজ অস্ফুটে বলল, “দ্রিঘাংচু!”

ডঃ চ্যাটার্জির পোষ্য কাকাতুয়া দ্রিঘাংচু অবশ্য ভেতরের ঘরেই সুরক্ষিত আছে। খুনি তার কোনো ক্ষতি করেনি। হয়তো তার অস্তিত্বই জানত না। জানলে ও বেচারির প্রাণটাও যেত। সে প্যাটপ্যাট করে অধিরাজের দিকে তাকিয়ে ফের বলল, “আমি সি.আই.ডি. ব্যুরো থেকে এসেছি স্যার…!”

অধিরাজ ও অর্ণব পরস্পরের দিকে দৃষ্টি বিনিময় করে। দ্রিঘাংচু অসম্ভব বুদ্ধিমান একটি প্রাণী। তার আই কিউ-ও প্রখর। যে কোনো শব্দ বা বাক্য একবার শুনলেই সে দিব্যি কপি করে নিতে পারে। এই মুহূর্তে তার ডায়লগ স্পষ্ট করে দিল যে বার্নিং শিখ এ ঘরে প্রবেশাধিকার কীভাবে পেয়েছিল। সনৎ এমনি এমনিই তাকে দরজা খুলে দেয়নি। এটাই ফোর্সড এন্ট্রি না হওয়ার রহস্য। ও বেচারি হয়তো কলিংবেলের আওয়াজ শুনে আগন্তুকের পরিচয় জানতে চেয়েছিল। তার উত্তরে এই বাক্যটাই উচ্চারিত হয়েছে যেটা এখন দ্রিঘাংচু বলছে। সনৎ ভাবতেও পারেনি বাইরে সি.আই.ডি. নয়, তার মৃত্যু অপেক্ষা করছে।

“দ্রিঘাংচু কথাটা বাংলায় বলছে।” অধিরাজের চোখ উত্তেজনায় চকচক করে ওঠে, “তার মানে লোকটা বাংলায় কথা বলছিল। একটু আগেও মদন বলছিল যে সে হিন্দিভাষী! কিন্তু দ্রিঘাংচু শুধু কপি করতে পারে, ভাষান্তর করা ওর পক্ষে অসম্ভব। কপিড লাইনটা বাংলায়। তার মানে আমার অ্যাসাম্পশন সঠিক। লোকটা বাংলাও বলতে পারে। একাধিক ভাষা ওর দখলে!”

আইভি এতক্ষণ পেছনে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। এবার অধিরাজের মুখোমুখি এসে ক্ষীণস্বরে বলল, “কিন্তু চিঠিটা সে হিন্দিতেই লিখেছে।”

“চিঠি!” অধিরাজ বিস্মিত, “খুনি চিঠি লিখে রেখে গিয়েছে?”

“হ্যাঁ।” আইভি মাথা নাড়ল, “আমরা যখন এসে পৌঁছলাম, সনতের দেশি মদের বোতল আর গ্লাস তখনও হলঘরের টেবিলেই রাখা ছিল। বাদামের প্লেটও। চিঠিটা বোতলের নীচে চাপা দিয়ে গিয়েছিল সে। তাই প্রথমেই আমাদের চোখে পড়েছে। গ্লাস, ডিশ, বোতল, সবই এভিডেন্স হিসাবে তুলে নিয়েছি। শুধু ভাবলাম, চিঠিটা আপনার দেখা প্রয়োজন। তাই এখনও এভিডেন্সব্যাগে ঢোকাইনি।”

“কী লিখেছে?” অধিরাজ হাত বাড়িয়ে দেয়, “দেখি।”

চিঠিটা দেবনাগরী হরফে আপাদমস্তক হিন্দিতে লেখা। বক্তব্য খুব বেশি কিছু নয়। বাংলায় অনুবাদ করলে কিছুটা এমন দাঁড়ায়,

“শ্রদ্ধেয় ডাক্তারবাবু,

আশা করি আমার সারপ্রাইজ গিফট আপনার খুব ভালো লেগেছে। ‘বান্দার তরফ থেকে‘খাতিরদারিতে কোনো ত্রুটি হয়নি নিশ্চয়ই। আপনার সম্পর্কে অনেক খোঁজখবর নিয়ে জানলাম, আপনি জ্যান্ত মানুষের চেয়ে মরা মানুষ বেশি পছন্দ করেন। সেজন্যই এমন ‘ভেট’ দিলাম। তবে এটাই হয়তো শেষ নয়। এরপর আপনার জুড়ুয়া ভাই, ভাইপোও তো আছে! কে বলতে পারে, কখন কী ঘটে যায়। মানুষের জীবনের কোনো ঠিক নেই। এই আছে, এই নেই। এই ‘সওগাত’টা অবশ্য শেষও হতে পারে, যদি আপনি আমার রাস্তা থেকে সরে দাঁড়ান। আপনার বুদ্ধির ওপর আমার অগাধ বিশ্বাস।

আপনার ‘প্রশংসক

অধিরাজ চিঠিটা পড়ে আইভিকে ফেরত দিল। আস্তে আস্তে বলল, “লোকটা ইসমাইল বা সনৎকেই শুধু টুকরো টুকরো করেনি। আমাদেরও একটু একটু করে কেটে টুকরো করছে। আমার সন্দেহ আছে, ইসমাইল আর রকির অবস্থা দেখে বাকি ইনফর্মাররা কেউ কাজ করার সাহস পাবে কিনা। ইনফর্মাররা আমাদের ডান হাত। আর ফরেনসিক আমাদের মস্তিষ্ক! লোকটা আমাদের হাত আর মস্তিষ্ক, দুটোই কেটে নিল! ফরেনসিক ল্যাব সাময়িক বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই। সে যা বলেছে, সেটাই মেনে নিতে হবে। নয়তো আরও কতগুলো নিরপরাধ মানুষের প্রাণ যাবে। আর কোনো অপশন নেই আমাদের কাছে। ডঃ চ্যাটার্জির মানসিক অবস্থাও খারাপ ওঁর হেল্প আমরা অন্তত আগামী কয়েকদিনের জন্য পাব না। এক্সপেক্ট করাটাও অমানবিক।” বলতে বলতেই সে আইভি’র দিকে তাকিয়েছে, “আপনিও বাড়ি চলে যান মাদমোয়াজেল। যতদিন না এই কেসটা ক্লোজ হচ্ছে বাড়িতেই থাকুন। বেরোনোর প্রয়োজন নেই। সাবধানে থাকুন। আমরা ডক, আপনার আর মিস্ মুখার্জির পরিবারের পুলিশ প্রোটেকশনের ব্যবস্থা করছি। আপাতত ফরেনসিক ল্যাব বন্ধ থাক।”

“না!”

পেছন থেকে একটা জোরাল আওয়াজ ভেসে আসায় ওরা প্রত্যেকেই চমকে উঠে পেছন দিকে তাকায়। ঠিক তাদের পেছনে কখন যেন আহেলি সবার অজান্তেই এসে দাঁড়িয়েছে। এরকম রূপে তাকে আগে কখনও দেখেনি ওরা। চোখদুটো জলে ভেজা তবুও যেন দপদপ করে জ্বলছে। চির পরিচিত আদুরে, কোমল মুখ অসম্ভব শক্ত। সে দৃঢ় গলায় বলল, “ডঃ চ্যাটার্জির মানসিক অবস্থা খুব খারাপ ঠিকই। ওঁকে আর ফরেনসিক ল্যাবে না পাঠানোই ভালো। আইভিও চাইলে ছুটি নিতে পারে। কিন্তু ল্যাবের কাজ বন্ধ হবে না!”

অধিরাজ যতটা বিস্মিত, ঠিক ততটাই বিপন্ন, “মিস্ মুখার্জি, চোখের সামনে এত কিছু দেখার পরও আপনি এই কথা বলছেন?”

“হ্যাঁ।” আহেলির সেই পরিচিত আহ্লাদি, ন্যাকা ন্যাকা কণ্ঠস্বর কোথায় যেন গায়েব হয়ে গিয়েছে, “লোকটা স্যারকে থ্রেট করেছে। আমাকে করেনি। আমি এই ক-দিন ফরেনসিক ল্যাবের বাইরেই বেরোব না। আপনি শুধু আমার ফ্যামিলিকে প্রোটেকশন দিন। আমি স্যারের মতো জিনিয়াস নই, কিন্তু কাজটা জানি। এর শেষ দেখে তবেই ছাড়ব।”

অধিরাজ আহেলির দিকে সবিস্ময়ে অনিমেষে তাকিয়ে ছিল। তার দৃষ্টিটা দেখলে মনে হয়, আহেলি মুখার্জি নামের প্রাণীটিকে সে জীবনে এই প্রথমবারই দেখছে বা সদ্যই আবিষ্কার করেছে। অর্ণবও যেন আজ নতুন আলোয় আহেলিকে দেখল। এই মেয়েটিই ডঃ চ্যাটার্জির ধমক খেয়ে কতবার ফোঁচ ফোঁচ করে কেঁদেছে তার ঠিক নেই। এই মেয়েটাই একসময়ে ভয়ে ভয়ে কথা বলত, অধিরাজের ব্যাপারে অসম্ভব পজেসিভ, তার অবহেলায় কতবার বেদনাবিধুর হয়ে উঠেছে তার হিসেব নেই। এই মেয়েটাই ‘সার্জিক্যাল স’কিলারের তাণ্ডব দেখে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। একেই একসময় টিপিক্যাল ন্যাকা একটা মেয়ে মনে হত তার। হ্যাঁ… এই মেয়েটাই! অথচ কত আলাদা!

অধিরাজের সপ্রশ্ন দৃষ্টি এবার আইভি-র দিকে ফিরল। আইভি মাথা হেঁট করেছে, “নিজের প্রাণের ভয় পাই না স্যার। কিন্তু আমার ফ্যামিলিটা বড়ো…।”

তার কথার মধ্যেই উত্তর স্পষ্ট। অধিরাজ মাথা ঝাঁকায়, “রাইট। আই ক্যান আন্ডারস্ট্যান্ড। আপনি বরং ডঃ চ্যাটার্জিকে নিয়ে ওঁর ভাই অসিত চ্যাটার্জির ফ্ল্যাটে চলে যান। ওঁর কাছে ঐ ফ্ল্যাটের আর একটা চাবি আছে। আমি ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি। ক্যাবও বুক করে দিচ্ছি। ওখানে ডককে ড্রপ করে স্ট্রেট বাড়ি যাবেন। একঘণ্টার মধ্যে আপনাদের তিনজনের বাড়িতেই সিকিউরিটির বন্দোবস্ত হয়ে যাবে। যা-ই হয়ে যাক, বাড়ির বাইরে বেরোবেন না, অজানা কাউকে বাড়িতে অ্যালাউ করবেন না। যে গার্ডরা যাবে, সবার আইডি কার্ড দেখে নেবেন। তবে আমার ধারণা, আগামী কিছুদিন ল্যাবে না এলে ও লোকটা আপনাদের ওপর আক্রমণ করবে না।”

আইভি আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল, “ওকে স্যার।”

অধিরাজ ও অর্ণব ফের ফিরে গেল ডঃ চ্যাটার্জির কাছে। ভদ্রলোক এখনও অঝোরে কেঁদে যাচ্ছেন। কিন্তু অধিরাজের প্রস্তাব শুনে প্রথমেই প্রবল আপত্তি করলেন, “না। এটা হয় না। আমি একটা শয়তানের ভয়ে পালাব না রাজা। তোমরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও ডিউটি করবে, আর আমি ওর ভয়ে পালিয়ে যাব। আই অ্যাম নট অ্যান এসকেপিস্ট।”

সে পরম মমতায় ভদ্রলোককে বোঝানোর চেষ্টা করে, “ডক, আপনি এসকেপিস্ট নন তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু থ্রেটটা আপনার চেয়েও অনেক বেশি আপনার ভাই ও কুক্কুর ওপরে। লোকটা সব জানে। ও আমাদের ওপর রীতিমতো রিসার্চ করেই যুদ্ধে নেমেছে। সনৎ আপনার জন্য কী ছিল, তা আমরা জানি। কিন্তু আর কারোর সম্পর্কে না হোক, কুক্কুর কথা একবার ভাবুন। বার্নিং শিখ বাচ্চা ছেলেমেয়েদেরও রেয়াত করে না। কুক্কু দুনিয়ার কতটুকু দেখেছে? ওর কথা ভাববেন না আপনি?”

“এক পরিবারের জন্য আর এক পরিবারকে ছেড়ে দেব?” কোনো যুক্তিই শুনবেন না তিনি, “রিস্ক কার নেই? তোমাদের নেই? তোমার অসম্ভব ব্লাড লস হয়েছে। কাঁধে দু-বার সেলাই পড়েছে। এখন তোমার হসপিটালের বেডে শুয়ে আরাম করার কথা। তারপরও তুমি লড়ে যাচ্ছ। অর্ণব দু-বার মরতে মরতে বেঁচেছে। তাও পালায়নি। আর আমি এত সহজেই হাল ছেড়ে দেব?”

“স্যার।” সস্নেহে তার হাত জড়িয়ে ধরে অধিরাজ, “হাল ছাড়তে আপনাকে কেউ বলছে না। আজকাল ভিডিও কলে, কনফারেন্সে, ল্যাপটপের মাধ্যমে ঘরে বসেও কাজ করা যায়। তেমন দরকার পড়লে আমরা নিজেরাই আপনার শরণাপন্ন হব। কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে আপনার অসিত চ্যাটার্জির ফ্ল্যাটে চলে যাওয়াই সবচেয়ে সঠিক কাজ হবে। ওঁরা ইউ-এস-এ থেকে ফিরছেন কবে?”

“আজই ফিরবে। রাতে এসে পৌঁছোনোর কথা।” তিনি একটু দ্বিধাগ্রস্ত, “কিন্তু ফরেনসিক রিপোর্টগুলো….!”

“সব ঠিক হয়ে যাবে। আর কয়েকঘণ্টারই তো ব্যাপার।” সে নরম সুরে বলল, “আপনি ওঁদের সঙ্গে থাকুন। সাবধানে থাকুন। আর দুটো রাতই তো বাকি আছে। দেখতে দেখতে কেটে যাবে। তারপর আবার চলে আসবেন।”

যুক্তিটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সত্যিই ভেঙে পড়েছিলেন। উপর্যুপরি অধিরাজের অনুরোধে ও যুক্তির ধাক্কায় শেষপর্যন্ত একরকম বাধ্য হয়েই বললেন, “আচ্ছা।”

আইভি শোকার্ত, যন্ত্রণাকাতর ডঃ চ্যাটার্জিকে নিয়ে চলে গেল। অধিরাজই ওদের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করেছিল। ডঃ চ্যাটার্জি যেন ঠিকভাবে হাঁটতেও পারছিলেন না। ঋজু মেজাজি মানুষটা একটু ঝুঁকে পড়েছে। মাত্র কয়েকঘণ্টার মধ্যেই যেন ওঁর বয়েস অনেক বেড়ে গিয়েছে। সঙ্গে দ্রিঘাংচুও গেল। এখন সে-ই ডঃ চ্যাটার্জির একাকীত্বের একমাত্র সঙ্গী। আইভি তার খাঁচাটা ধরে সযত্নে গাড়ির মধ্যে রাখে। অধিরাজ বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল তাঁর দিকে। এই মুহূর্তে যাঁর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, সেই মানুষটার সাহায্যই হারাতে হচ্ছে। এটা যে সি.আই.ডি., হোমিসাইডের টিমের জন্য কতবড়ো ক্ষতি তা অধিরাজ ও অর্ণব দু-জনেই বুঝতে পারছিল। অধিরাজ অসহায় স্বরে বলল, “একে একে নিভিছে দেউটি। কেসটা শেষপর্যন্ত অন্ধকারেই না তলিয়ে যায় অর্ণব।” অর্ণব তার দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকাল। সে আবার একটা সিগারেট বের করে এনেছে প্যাকেট থেকে। হাবেভাবেই স্পষ্ট, ভীষণ নার্ভাস। স্নায়ুযুদ্ধে এখনও টিকে থাকলেও হয়তো কিছুটা ক্লান্তি তাকেও অধিকার করেছে। একের পর এক সিগারেট খেয়ে যাওয়া অন্তত তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে। চিরপরিচিত হাসিটা ফের গায়েব হয়ে গিয়েছে। সে গম্ভীর মুখে একটু অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে আপনমনেই বলে, “ছোটোবেলায় প্রচুর গোয়েন্দা গল্প পড়ার শখ ছিল। শার্লক হোমস, আর্কিউল পোয়ারো থেকে শুরু করে ব্যোমকেশ, ফেলুদা, কাউকে বাদ দিইনি। আমার পুলিশে আসার পেছনে এই ক্যারেক্টারগুলোরও অবদান কম নয়।” বলতে বলতেই একটু থেমে বলল, “কিন্তু আমি বোধহয় ওদের মতো সাহসী নই অর্ণব। হোমস, ফেলুদা বা ব্যোমকেশ কখনও বিচলিত হননি, কখনও ভয় পাননি। ওঁদের নার্ভের জোর অমানুষিক। কিন্তু আমি রক্তমাংসের মানুষ! আমি ওঁদের মতো অবিচলিত থাকতে পারি না! আমারও ভয় আছে, দুর্বলতা আছে…! লোকে সুপারকপ বলে ঠিকই… কিন্তু কখনো-কখনো আমিও বড্ড অসহায়….!”

অর্ণব জানে এর উত্তর দেওয়াই বাহুল্য। স্যার এখন নীরবতাই চাইছেন। সে চুপ করে থাকলেও মনে মনে ভাবে, ভাগ্যিস হোমস, পোয়ারো, ব্যোমকেশ বা ফেলুদা এই জাতীয় হিংস্র ক্রিমিনালের পাল্লায় কখনও পড়েননি। নয়তো দেখা যেত, তাঁরা ঠিক কতখানি ‘আয়রনম্যান।’ তাদের আমলের অপরাধী ও বর্তমানকালের অপরাধীদের মধ্যে আকাশ পাতাল ফারাক। এখন মানুষ অনেক বেশি ধূর্ত, অনেক বেশি নৃশংস! কথায় কথায় খুন করে বসে থাকে। মার্ডারটা যেন জলভাত। প্রোফেসর মরিয়ার্টি বা মগনলাল মেঘরাজের মতো দশটাকে এরা জল দিয়ে গুলে খেতে পারে।

“অফিসার ব্যানার্জি…!”

আহেলির মিষ্টি অথচ দৃঢ় কণ্ঠস্বরে সম্বিত ফিরল দু-জনেরই। সে আস্তে আস্তে ওদের দিকেই এগিয়ে এল, “আমি অ্যাম্বুলেন্স ডেকেছি। পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যেই এসে যাবে। ডেডবডি ল্যাবে নিয়ে যাচ্ছি। আপনারা কি আলাদা করে আর একবার লাশ বা ক্রাইমসিন এগজামিন করতে চান?”

“আপনারা কি আগে দেখে নিয়েছেন?”

অধিরাজের প্রশ্নের উত্তরে মাথা নাড়ল আহেলি, “আমরা এখানে পৌঁছোনো মাত্রই ইনভেস্টিগেট করেছি। স্যার প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেলেও উনিই গোটা স্পট তন্নতন্ন করে খুঁজেছেন। সনতের ক্ষেত্রে মার্ডার ওয়েপন ঐ হাতুড়িটাই। এবং স্যার আপনাদের যা বলেছেন, প্রতিটা শব্দই সঠিক। কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা কোনোরকম ক্লু পাওয়া যায়নি। মদের গ্লাসে একটা ফিঙ্গারপ্রিন্টের স্যাম্পল আছে ঠিকই। তবে সেটা সম্ভবত সনতেরই। মার্ডার ওয়েপনেও কোনোরকম ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ডি.এন.এ. নেই।”

“সেটাই স্বাভাবিক।” অধিরাজ মাথা নাড়ল, “ও পাবলিক ক্রাইমসিনে কোনো ক্লু ছেড়ে যাবে সেটা ভাবাই মূর্খামি। আমরাই বা নতুন করে কী ইনভেস্টিগেট করব। স্বয়ং ডঃ চ্যাটার্জিই যখন কিছু পাননি, আমরা তো আরও পাবো না। তাছাড়া ও দৃশ্য আমি অতীতেও দেখেছি, এখনও দেখছি। বারবার দেখার ইচ্ছে নেই।”

তার পিঙ্গল বিষণ্ণ মুখ বুঝিয়ে দেয় যে ‘সার্জিক্যাল স’ কিলারের ভয়াবহ ক্রাইমসিনের কথা বার্নিং শিখ তাকে ফের মনে করিয়ে দিয়েছে। আততায়ী ওদের সম্পর্কে যে পরিমাণ রিসার্চ করেছে, তাতে হয়তো এটাই তার ইপ্সিত ছিল। পুরোনো জখমে ফের আঘাত লেগেছে। লোকটা শুধু নিষ্ঠুরই নয়, আশ্চর্য একটা মনস্তাত্বিক খেলায় নেমেছে। প্রতি মুহূর্তে ওদের ওপর সাইকোলজিক্যাল প্রেশার একটু একটু করে বাড়িয়েই যাচ্ছে। যেন দেখতে চায়, কতখানি চাপ সহ্য করতে পারে তথাকথিত ‘সুপারকপ’।

“আপনি ল্যাবে ফিরবেন তো?” অধিরাজ আহেলির দিকে তাকিয়েছে, “ফিরবেন কীসে?”

“আমি অ্যাম্বুলেন্সেই চলে যাব।”

“ঠিক আছে।” সে একটু থেমে ধোঁয়া গিলে নিয়ে বলল, “আমি আর অর্ণবও আপনার অ্যাম্বুলেন্সের পেছন পেছন ল্যাব অবধি যাব। আপনি সেফলি ল্যাবে ঢুকে গেলে ব্যুরোয় ফিরব।” বলতে বলতেই এবার তার চোখ অর্ণবের দিকে ফিরেছে, “অর্ণব, কালকের ঐ অপদার্থ নাইটগার্ডটিকে অবিলম্বে সাসপেন্ড করো। তবে তার জায়গায় নতুন কোনো অপরিচিত গার্ড চাই না। ব্যুরো থেকেই কোনো দু-জন জাঁদরেল লেডি অফিসারকে ওঁর সিকিউরিটির জন্য লাগিয়ে দাও। ওঁদের অর্ডার দাও যেন আজ রাত থেকেই ছায়ার মতো মিস্ মুখার্জির সঙ্গে লেগে থাকেন। একটুও যদি ঢিলেমি দেয়, তবে ওঁদেরও সাসপেন্ড করতে আমি দু-বার ভাবব না! আমাদের টিমের লেডি অফিসারদের পাওয়া যাবে না। প্রণবেশদার টিম থেকে নিয়ে নাও। ওঁর সঙ্গে আমি কথা বলে নেব।”

“ওকে স্যার।”

কয়েক মিনিটের মধ্যেই সমস্ত ব্যবস্থা হয়ে গেল। প্রণবেশ লাহিড়ীর মতো ডেয়ারডেভিল অফিসারও সমস্ত খবর শুনে আঁতকে উঠলেন। লেডি অফিসারের ব্যাপারে কোনো আপত্তি তো করলেনই না উলটে বললেন, “আমি দুই অফিসারকেই বলে রাখছি সন্দেহজনক কাউকে দেখলে যেন এক সেকেন্ডও অপেক্ষা না করে ডাইরেক্ট শ্যুট করে দেয়। ইনফ্যাক্ট তোমরা মিস্ টুইঙ্কল অরোরাকে নিয়ে নাও৷ নামেই লেডি অফিসার, আসলে ব্যাটাছেলেরও বাবা। অনেকে ওকে আড়ালে আমার ফিমেল ভার্সানও বলে।”

“টুইঙ্কল অরোরা!” অধিরাজ আমতা আমতা করে, “ইনি তো বাঙালি নন। ইনফ্যাক্ট পাঞ্জাবি নামই মনে হচ্ছে। শিখও হতে পারেন।”

“শিখই। মহম্মদ ঘোরি বা বাবরের আমলে ওর কোনো পূর্বপুরুষ পাঞ্জাবে থাকত৷ তবে বিগত চার পুরুষ ধরে ওরা কলকাতাতেই থাকে। টুইঙ্কলের বাবা রীতিমতো কালীপুজো করেন। ওঁর মেয়েও সাক্ষাৎ চন্ডীর থেকে কম কিছু নয়। মেয়েটার চেহারায় পাঞ্জাবি ছাপ আছে ঠিকই, কিন্তু এছাড়া পাঞ্জাবের ‘প’-ও নেই। আমার মনে হয়, ওকে টিমে নিয়ে নিলে ভালোই হবে। ও মুখে বিশেষ কথা বলে না, হাতে বলে।”

“ওকে।”

অর্ণব প্রণবেশের ফোন কাটতে-না কাটতেই অধিরাজের ফোন সশব্দে বেজে উঠল। ঘন্টু ফোন করছে। ও আর যাদব কথামতো অনেকক্ষণ আগেই ব্যুরোয় পৌঁছে গিয়েছে। প্রায় ঘণ্টাদেড়েক হল, ওখানেই বসে অপেক্ষা করছে। ঘন্টু একটু সতর্ক স্বরে জানতে চায়, “স্যার, আপনারা কোথায়? সব ঠিক আছে তো? আপনি তো কখনও এত লেট হন না! তার ওপর দেখছি ব্যুরোর বাইরে প্রেসের লোক গিজগিজ করছে….!”

“কিচ্ছু ঠিক নেই।” অধিরাজ তাকে বলল, “তোরা আর একটু অপেক্ষা কর। জরুরি কথা আছে। আমাদের ফিরতে আরও একটু দেরি হবে। ততক্ষণ কোনোভাবে টাইমপাস করে নে…!”

“আপনারা যখন ব্যস্ত আছেন তাহলে দুপুরের দিকে আসি?” সে হালকা স্বরেই বলে, “বাড়ি গিয়ে, দুটো রুটি খেয়ে, একটু ঘুম দিয়ে আসি তবে। আপনারাও ফিরে আসুন।”

অধিরাজ এবার ধমক দিয়ে ওঠে, “তোর রুটি আর ঘুমের নিকুচি করেছে। ব্যুরো থেকে এক পাও বেরোবি না! তুই যে এখনও বেঁচে আছিস তা তোর চোদ্দপুরুষের ভাগ্য! রতিবৌদিকে বিধবা, আর পুপুলকে যদি পিতৃহীন না করতে চাস, তবে পেটে কিল মেরে ওখানেই বসে থাক। যাদবকেও বেরোতে বারণ কর। আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আসছি!”

“ওকে স্যার।”

ঘন্টু আর কথা না বাড়িয়ে ফোন কেটে দেয়। অধিরাজ বুঝল, এখনও ইসমাইল আর রকির খবর ওদের কানে পৌঁছয়নি। ওরা সবাই আলাদা আলাদা কাজ করে। নেটওয়ার্কও আলাদা। মুখ চেনা, ঐ অবধিই। কারোর সঙ্গে কারোর সম্পর্ক বা নিতান্তই পেশাদারি বন্ধুত্বটুকুও নেই। কেউ কারোর খবর বিশেষ রাখে না। নিজেদের কাজের পেছনেই এত বেশি ব্যস্ত থাকে যে অন্য কারোর খবর নেওয়ার সময়ও পায় না। তাছাড়া ইনফর্মারদের মৃত্যুর খবর এখনও লিকড হয়নি। মিডিয়ার কাছে হয়তো খবর আছে যে আজ ভোরে বার্নিং শিখ দুটো লাশ ফেলে দিয়েছে, সেজন্যই ব্যুরোর বাইরে অত ভিড় জমিয়েছে। কিন্তু মৃতদের পরিচয় এখনও জানতে পারেনি।

সে ফোনটা বুকপকেটে রাখে। তার চোয়াল এখন লৌহকঠিন। হোমিসাইড এক পা এক পা করে ক্রমাগতই পেছোচ্ছে! কিন্তু আর পেছোতে দেওয়া যাবে না। এবার বার্নিং শিখকে ব্যাকফুটে নিয়ে যাওয়ার পালা। অনেক ধাক্কা মেরেছে সে, এবার পালটা ধাক্কা ওকে দিতেই হবে। তার জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত অধিরাজ। ছলে, বলে, কৌশলে যে করেই হোক থামাতেই হবে লোকটাকে।

অ্যাম্বুলেন্স ততক্ষণেও এসে পৌঁছয়নি। ড্রাইভার জানিয়েছে; আরও চার-পাঁচ মিনিট হয়তো লাগবে। ওরা তিনজন ডঃ চ্যাটার্জির বাড়ির সামনেই চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। এই পরিবেশে আর যা-ই হোক, খোশ-গল্প বা খেজুরে আলাপ করা যায় না। তবু অর্ণব মিস্ মুখার্জির সঙ্গে যতটা ফ্রি, অধিরাজ একেবারেই নয়। তৎস্বত্ত্বেও সে যেন কিছু ভেবে দু-একবার মুখ খুলতে গেল। বেশ কয়েকবার ওষ্ঠাধর ফাঁক হল ঠিকই, কিন্তু কী ভেবে যেন বারবার আটকে যাচ্ছে ও। আহেলি সেটা লক্ষ্য করেই জিজ্ঞাসা করে, “আপনি কিছু বলবেন অফিসার ব্যানার্জি?”

সে একটু ইতস্ততঃ করে বলল, “যদিও এখন এসব আলোচনা করার সময় নয়। অ্যাকচুয়ালি, মাথার ওপরে বাহাত্তর ঘণ্টার খাঁড়াটা না থাকলে হয়তো বলতামও না। কিন্তু আজ সকালে মদনের স্টেটমেন্টে একটা অদ্ভুত কথা জেনেছি। সেটা আপনাদের জানাবার জন্যই ফোন করেছিলাম… অথচ…!”

“কী কথা?”

অধিরাজ একটু আড়ষ্টভাবে হলেও সবই খুলে বলল। অবিকল মদন যেমন বর্ণনা দিয়েছিল। মেঠো গন্ধ, খড় কাটার সুবাস। শুনতে শুনতেই আহেলির চোখ চকচক করে উঠল। সে জানতে চায়, “মদন যখন ক্রাইমসিনে গন্ধটা পেয়েছিল, তখন বা তার আগে কি ওর নাক-চোখে ইরিটেশন হচ্ছিল? কোনোরকম জ্বালা জ্বালা ভাব?”

বিদ্যুৎ চমকের মতো মদনের কথাগুলো ঝলসে উঠল অধিরাজের মস্তিষ্কে। সে উত্তেজিত, “হ্যাঁ। ও বলেছিল ধোঁয়ায় ওর চোখ আর নাক খুব জ্বালা করছিল। যদিও

তখন কথাটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি…..!”

“মাই গড!” আহেলি সবিস্ময়ে আপনমনেই বলল, “এটা আগে আমরা ভাবিনি কেন। ইনফ্যাক্ট মাথাতেই আসেনি!”

“কোনটা?”

“ফসজিন!”

“ফসজিন?”

“হ্যাঁ।” মেয়েটা প্রচণ্ড এক্সাইটেড, “মিঃ ব্যানার্জি, স্যার সেদিন আপনাকে অসোউইক ফোর্টের গল্প বলছিলেন না? যেখানে ক্লোরিন আর ব্রোমিনের কেমিক্যাল অ্যাটাক হয়েছিল?”

“হ্যাঁ।”

“স্যার তখনও কনফার্ম করতে না পারলেও আসল মার্ডার ওয়েপনের খুব ক্লোজ চলে গিয়েছিলেন।” সে একনিঃশ্বাসে বলে যায়, “ওয়ার্ল্ড ওয়ার ওয়ানে কেমিক্যাল ওয়েপন হিসাবে তিনটে গ্যাস বেশি ইউজ হয়েছিল। ক্লোরিন, ফসজিন আর মাস্টার্ড গ্যাস। ক্লোরিনের তুলনায় ফসজিন অনেক বেশি বিধ্বংসী। ফসজিন একাই তো প্রায় এক মিলিয়নের কাছাকাছি লোক মেরেছিল। আর একমাত্র ওর গন্ধটাই অবিকল মেঠো গন্ধ কিংবা খড়ের গন্ধের মতো! প্রথমে এতটাই হালকা আর ন্যাচারাল লাগে যে বোঝাই যায় না। যতক্ষণে বোঝা যায়, ততক্ষণে কিছু করার উপায়ই থাকে না। অলমোস্ট সাইলেন্ট কিলার।”

“এটাই তবে মার্ডার ওয়েপন! ফসজিন!”

অধিরাজ স্তম্ভিত। কী লেভেলে প্ল্যানিং করেছে খুনি! কয়েকঘণ্টা আগেও আইভি-র ধারণা ছিল যে হয়তো এটা নতুন কোনো মারণাস্ত্র। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল ‘পুরোনো চালই ভাতে বেড়েছে!’ অস্ত্রটা নতুন নয়, বরং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আমলের! এত পুরোনো অস্ত্রকে কেউ আধুনিক সময়ে ব্যবহার করবে সেটা ওদের ভাবনা চিন্তারই বাইরে ছিল। এ তো রীতিমতো জিনিয়াস প্ল্যান।”

“মেইন অস্ত্রটা ফসজিনই।” আহেলি একটু চিন্তা করে বলে, “কার্বনিল ক্লোরাইড। সেইজন্যই আইভি বডি ফ্লুইডে কার্বাময়েল ক্লোরাইডের মাত্রা বেশি পেয়েছিল। বাট, আমার আশঙ্কা ফসজিনের সঙ্গে খুনি মাস্টার্ড গ্যাসের কম্পাউণ্ডও কিছুটা মিশিয়েছে। শিওর নই। তবে শ্বাসনালীর মারাত্মক কেমিক্যাল বার্ন দেখে আমার ইনস্টিংট বলছে। ফসজিন একাই একটা মারাত্মক প্রাণঘাতী গ্যাস। লাশের যা অবস্থা দেখেছি, তাতে বোঝা যায় যে সে ফ্যাটাল ডোজের চেয়েও অন্তত কয়েকগুণ বেশি ‘পিপিএম’ ফসজিন ইউজ করেছে। খুব তাড়াতাড়ি কাউকে মারতে হলে কুড়ি বা ত্রিশ পিপিএম একেবারে ‘রামবাণ।’ কিন্তু আমি অবাক হব না, ওটার পরিমাণ যদি তারও অনেক বেশি হয়। কার্বনিল ক্লোরাইড বা ফসজিন এককথায় চোকিং গ্যাস। বার্নিং সেনসেশন দেয়। তার সঙ্গে লাংসের ভেতরে ফ্লুইডও ডেভলপ করে যার জন্য মানুষ নিঃশ্বাস নিতে না পেরে হাঁকপাঁক করতে করতে মরে। আমরা মৃতদেহের লাংসে ফ্লুইডও পেয়েছি। ওটা প্রচুর পরিমাণে ইনহেল করলে শ্বাসনালীর সফট্ টিস্যুগুলো পুড়তেই পারে। তার ওপর হাওয়ায় যদি জলীয় বাষ্প থাকে, তবে বাইপ্রোডাক্ট হিসাবে ফসজিন কিছুটা হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডও তৈরি করে, যেটা মানুষকে ভেতর থেকে পোড়াতে থাকে এবং মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে। ফসজিনের আরও একটা মারাত্মক এফেক্ট, এটা ইনহেল করলে ফুসফুস ফুলতে থাকবে, মনে হবে কেউ লাংসটাকে ছিঁড়ে নিচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই লাংসের সঙ্গে সঙ্গে ব্লাড ভেসেলগুলোও ফুলবে, এবং একসময় ফেটে গিয়ে ইন্টারনাল ব্লিডিং শুরু করবে। ফলস্বরূপ ব্লাড ভমিটিং হতে বাধ্য। কিন্তু ডেডবডিগুলোর ফুসফুস আর রেস্পিরেটরি ট্র্যাকের যা অবস্থা তাতে মনে হয়, ফসজিনকেই মাস্টার্ড গ্যাসের কিছু ইনগ্রেডিয়েন্টসের সঙ্গে সামান্য ব্লেন্ড করে আরও বেশি মারাত্মক করে ছাড়া হয়েছে। মাস্টার্ড গ্যাসও মানুষকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিতে ওস্তাদ! ইন ওয়ান ওয়ার্ড, কিলার নতুন বোতলে পুরোনো মদ পাঞ্চ করেছে। সেখানে মেইন ইনগ্রেডিয়েন্ট ফসজিন, তার সঙ্গে মাস্টার্ড গ্যাসের কিছু কেমিক্যালও রয়েছে। বাঁচার কোনো সুযোগই নেই!”

“যদি ফসজিনই লেথাল হয়, তবে মাস্টার্ড গ্যাস কেন মিশিয়েছে? আর মাস্টার্ড গ্যাসও যথেষ্ট মারাত্মক, তবে ফসজিনের দরকার কী ছিল!”

“দুটো গ্যাসই ভয়াবহ।” আহেলি বুঝিয়ে বলে, “কিন্তু মাস্টার্ড গ্যাস এক্সপোজার প্রচণ্ড পেইনফুল হলেও মর্টালিটি রেট মাত্র দু থেকে তিন পার্সেন্ট। কারণ মাস্টার্ড গ্যাস ফসজিনের মতো কালারলেস নয়। ওটার একটা ইয়েলোইশ কালার রয়েছে যেটা সাদা চোখেও ধরা পড়ে। গন্ধটাও সর্ষে, পিঁয়াজ বা রসুনের মতো ঝাঁঝালো। তার ওপর প্রথমেই ওটা চামড়ার ওপর কেমিক্যাল বার্ন দিয়ে বসে থাকে। অনেক সময় থার্ড ডিগ্রি বার্নও দেয়। তবে তার জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় লাগে। আপনিই ভাবুন, কেউ যদি হালকা মাস্টার্ড কালারের একটা ধোঁয়া চোখের সামনে দেখতে পায়, উগ্র গন্ধ পায় এবং হাত-পায়ের চামড়ায় ফোস্কা পড়তে দেখে, তবে কি সে ওখানে আরও বেশি পুড়ে মরার জন্য বসে থাকবে? দেহ কিছুটা পুড়ে গেলেও প্রাণ বাঁচাতে জায়গা ছেড়ে পালাবে। বেশিমাত্রায় যন্ত্রণাদায়ক হওয়ার কারণেই এটা মানুষকে অ্যালার্ট করে। এই কেমিক্যাল বার্ন আবার কিওর-ও করা যায়। তবে অদূর ভবিষ্যতে ঐ কেমিক্যাল বার্ন থেকে ক্যান্সার হতে পারে। তার জন্য হয়তো কয়েক বছর বা কয়েক দশক লাগবে। বার্নিং শিখ কি ততদিন অপেক্ষা করবে? কবে রাম রাজা হবে, তবে সীতা বনে যাবে!”

“না। তা সে করবে না।” সে একটু ভাবল, “তবে সেক্ষেত্রে মাস্টার্ড গ্যাসকে সিনে আনার দরকার কী? ফসজিনই তো যথেষ্ট!”

“ফসজিন যথেষ্ট। কিন্তু ওটা আবার এইরকম মারাত্মক কেমিক্যাল বার্ন দেয় না। খুনি মৃত্যুটাকে চরম যন্ত্রণাদায়ক, ফাস্ট আর গ্রুসাম করার জন্যই দুটোর কম্বিনেশন ইউজ করেছে। তবে বেসটা নিঃসন্দেহে ফসজিন। ফসজিন একটু দেরিতে কাজ শুরু করে। খুব বেশি পরিমাণ হলেও অনেক সময় মরতে কমসে কম তিন চার ঘণ্টা, ক্ষেত্র বিশেষে ছ-ঘণ্টা লাগেই। অনেক কেসে দেখা গেছে, লেথাল ডোজ এক্সপোজারের পরও ভিকটিম চব্বিশ ঘণ্টা অবধি সার্ভাইভ করেছে। সেইজন্যই মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো মাস্টার্ড গ্যাসটাকেও সে মিলিয়ে নিয়েছে। দুটো গ্যাসই পোড়ায়। মাস্টার্ড গ্যাসটাকে সে এমনভাবে ব্যবহার করেছে যাতে সেটা স্কিনের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট না করে শুধু রেস্পিরেটরি ট্র্যাকটা পোড়ায়। আমার ধারণা, সেকেন্ড গ্যাসটা তুলনায় অনেকটাই কম মাত্রায় ছিল। যার জন্য ওটা শুধু নাক আর লাংসের মিউকাস মেমব্রেন আর সফট টিস্যুকেই পুড়িয়েছে। আমাদের বডির স্কিন তুলনামূলকভাবে পুরু। তাই আউটার স্কিনে বিশেষ কিছু হয়নি। একবার ভেবে দেখুন, জ্যান্ত পুড়ছিলেন ওরা সবাই, তার মধ্যে ফসজিন লাংসে ফ্লুইড ডেভলপ্ করে পুরো চোকিং এফেক্ট দিচ্ছিল, ফুসফুসটাকে ফুলিয়ে প্রায় ছিঁড়েই ফেলছিল। আপনার ভেতরে আগুন লেগেছে, তার ওপর কেউ আপনার গলা টিপে ধরেছে। কেমন লাগবে!”

অধিরাজ প্রথমে কোনো কথাই বলতে পারল না। সমস্ত শব্দ, বিশেষণই সে হারিয়ে ফেলেছে। শুধু বলল, “গ-ড!”

“শুধু তাই নয়, ফসজিন সহজে ধরা পড়ে না। ইনফ্যাক্ট বাহাত্তর ঘণ্টায় তো প্ৰায় অসম্ভব।” সে জানায়, “নেহাৎ আপনার আই-উইটনেস স্মেলটা ডিটেক্ট করে ফেলেছে। নয়তো আমরা স্রেফ হাতড়ে বেড়াতাম, ততক্ষণে কিলার বাজি মাত করে বেরিয়ে যেত! আপনি আমায় একটু সময় দিন। আমি ল্যাবে ফিরেই আবার

ডেডবডিগুলোর ইনফেক্টেড টিস্যু ফ্লুইড এর হাই পারফরম্যান্স লিকুইড ক্রোমাটোগ্রাফি, মাস স্পেকট্রাল স্টাডি করে যত তাড়াতাড়ি আমার পক্ষে সম্ভব, আপনাকে কনফার্ম করছি। আজ রাতের মধ্যেই জানাতে পারব আশা করি।”

“ওকে ফাইন।” অধিরাজ একটু চিন্তিত স্বরেই বলে, “এর কোনো অ্যান্টিডোট আছে? আমাদের দুই লেডি অফিসার প্রবাবল ক্রাইমসিন পাহারা দিচ্ছেন। ওদের জীবনও বিপন্ন।”

“না। ফসজিনের কোনো অ্যান্টিডোট নেই৷” সে মাথা নাড়ল, “ইনফ্যাক্ট সালফার মাস্টার্ড বা মাস্টার্ড গ্যাসেরও নেই। আপনাদেরই প্রচণ্ড অ্যালার্ট থাকতে হবে অফিসার। যতদূর বুঝেছি, যদি এই ভয়াবহ কম্বিনেশন ইনহেল করার দশ থেকে পনেরো মিনিটের মধ্যেই ভিকটিমদের বের করে আনতে না পারেন, বা গ্যাসটাকে থামাতে না পারেন তবে ওদের মৃত্যু স্বয়ং ঈশ্বরও ঠেকাতে পারবেন না! গ্যাস মাস্ক ইউজ করতে পারেন ঠিকই, তবে ভিকটিমরা যদি চব্বিশ ঘণ্টাই সবাই গ্যাস মাস্ক পরে ঘুরতে শুরু করে তবে বার্নিং শিখ অন্য কোনো মার্ডার ওয়েপন বেছে নেবে। তাছাড়া ঘরের মধ্যে লোকে গ্যাস মাস্ক পরে আছে, সেটাও ঠিক প্র্যাকটিক্যাল নয়।”

“না। সেটা সম্ভবও নয়।” অধিরাজ বলে, “বরং প্রাণ বাঁচানোর জন্য আর কী কী করণীয় সেটাই বলুন।”

“প্রথমত, দশ থেকে পনেরো মিনিটের ডেডলাইনটা মনে রাখবেন। দ্বিতীয়ত, অ্যাটাক হওয়ার পর প্রথমেই ভিকটিমদের টেনে খোলা জায়গায় নিয়ে আসবেন এবং সারা গায়ে জল ঢেলে দেবেন। যাতে ওদের স্কিনে লাগা ফসজিন ক্লিন হয়ে যায়। আইদার, বাড়ির সমস্ত দরজা জানলা খুলে ফ্যান চালিয়ে দেবেন, আগে ভিকটিমদের স্ট্রেট বাড়ির বাইরে, খোলা হাওয়ায় নিয়ে যাবেন। নিজেরা মাস্ক ইউজ করবেন। ফসজিনের ডেন্সিটি আর মলিকিউলার ওয়েট ক্লোরিনের চেয়েও অনেক বেশি। ক্লোরিন যেখানে হাওয়ার তুলনায় আড়াই গুণ ভারি, সেখানে ফসজিনের ডেন্সিটি তিন, সাড়ে তিন, এমনকি তারও বেশি হতে পারে। কিন্তু ক্লোরিনের তুলনায় ফসজিন অনেক ভদ্র গ্যাস।”

“মানে?” সে একটু কনফিউজড, “আগের দিন ডকও বলেছিলেন যে ক্লোরিন ভারি বলে ওটার কিছু ড্র-ব্যাক আছে। আবার আপনি বলছেন ফসজিন ক্লোরিনের চেয়েও ভারি, অথচ ভদ্র! এক্ষেত্রে হেভি হওয়ার ড্র-ব্যাক কোথায় গেল?”

“আপনার যুক্তিও সঠিক। আবার আমার যুক্তিটাও। একটা গোদা উদাহরণ দিয়ে বললে আপনি খুব সহজেই বুঝবেন।” আহেলি একটু হাসল, “আমি জানি না, আপনারা ট্রেনে খুব একটা যাতায়াত করেন কিনা। কখনও ট্রেনের হকার, বা গানওয়ালা ভিখিরিদের দেখেছেন?”

“আজ্ঞে।” অধিরাজ জানায়, “ওটা খুবই কমন দৃশ্য। ওটা দেখার জন্য ডেইলি ট্রেনে যাতায়াত না করলেও চলে।”

“গুড।” সে বলল, “সচরাচর এইসব হকার বা গানওয়ালাদের মধ্যে দুটো প্ৰজাতি থাকে। প্রথম জাতের হকার বা ভিখারিরা খুব স্বতঃস্ফূর্ত এবং সহজে যাতায়াত করে। তারা জিনিসপত্র বিক্রি করতে করতে বা গান গাইতে গাইতে আরামসে এক কম্পার্টমেন্ট থেকে অন্য কম্পার্টমেন্টে চলে যায়। যাত্রীদের ঘাড়ে চড়ে বসে না। হয়তো চেহারায় তারা হেভিওয়েট। কিন্তু নিজের বক্তব্য বা গান শেষ হলে, উদ্দেশ্য সিদ্ধ হলে তারা নিজে থেকেই চলে যায়। এবং শেষপর্যন্ত নিজের স্টপে চুপচাপ নেমেও পড়ে।” আহেলির বুদ্ধিদীপ্ত শাণিত চোখে রোদ্দুর ঝিলিক দিল, “কিন্তু আর একদল হকার বা ভিখিরি আছে যারা হয়তো আদৌ হেভিওয়েট নয় বা তুলনামূলক কমজোরি। অথচ তারা কিছুতেই সহজে নড়তে চাইবে না! কম্পার্টমেন্টের প্রত্যেকটি মানুষের কানের কাছে চেঁচিয়ে বারবার ঘ্যানঘ্যান করে নিজের বক্তব্য পেশ করবে। পারলে ঘাড়ে উঠেই টাকা আদায় করে। যতক্ষণ না আপনি বিরক্ত হয়ে তাকে তেড়েমেড়ে গাল দিয়ে বা চড় থাপ্পড় মেরে তাড়াচ্ছেন, ততক্ষণ সে অন্য কামরায় যেতেই চাইবে না। ফসজিন হল প্রথম প্রজাতির হকার বা গানওয়ালা যারা ভারি হলেও সহজে চলে যায়। কিন্তু ক্লোরিন আবার দ্বিতীয় প্রজাতির মতো। যতক্ষণ না আপনি অতিষ্ঠ হয়ে তাকে গাল দিচ্ছেন বা অর্ধচন্দ্র প্রদান করছেন, ততক্ষণ সে নড়ার নামই করে না। মলিকিউলার ওয়েট বা ডেন্সিটি ফসজিনের তুলনায় কম হলেও ক্লোরিন সর্বক্ষণই কিছু না কিছুর সঙ্গে বিক্রিয়া করার জন্য অস্থির হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। হাওয়ায় বা পরিবেশে যতরকম যা পাবে, সবকিছুর সঙ্গেই সে কিছু না কিছু বিক্রিয়া করে বসে থাকবে। রি-অ্যাকশন দেবে। এই বদখত স্বভাবের জন্যই সে ঐ বিক্রিয়ার মাধ্যমে নিজের উপস্থিতি টিকিয়ে রাখে, এবং সেটা লোকে টেরও পায়। কিন্তু ফসজিনের সে বদভ্যাস নেই। তার বিচরণ অনেক সহজ। জানলা দরজা খুলে দিলেই সে বেরিয়ে যাবে। ফ্যান চালিয়ে দিলে তো আরও ভালো। ক্লোরিনের মতো নিজের অস্তিত্বকে যেন তেন প্রকারেণ টিকিয়ে রাখার কোনো ইচ্ছেই তার নেই। ফসজিন সহজে নিউট্রালাইজও হয়ে যায়। তার ওপর এখানে বার্নিং শিখ ডাবল মাস্টারস্ট্রোক খেলে বসে আছে।”

“কীরকম?”

“জানলা দরজা খুলে তো দিয়েইছে, উপরন্তু লোকগুলোকে পোড়ানোর জন্য সে আগুনও জ্বেলেছে। কিছুটা ফসজিন যদি ঘনত্বের জন্য মেঝের দিকে থিতিয়েও পড়ে, তবে যে মুহূর্তে আগুন জ্বলল সেই মুহূর্তে তাকেও আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ আগুনের হিটে ফসজিন ডিকম্পোজ হয়ে যায়। স্রেফ কার্বন মনোক্সাইড, সামান্য ক্লোরিন, কার্বন ডাই অক্সাইড এবং কার্বন টেট্রাক্লোরাইডে ভেঙে যায় যেগুলো বাতাসের সঙ্গে মিশে গিয়ে ওর অস্তিত্বই রাখে না!”

“ব্রিলিয়ান্ট।” অধিরাজ বলল, “হ্যাঁ। তারপর যা বলছিলেন বলুন। ফ্যান খুলে দেব। তারপর?…’

“হ্যাঁ। ফ্যান অন করবেন। ফ্যানের হাওয়ায় গ্যাসটা খোলা দরজা জানলা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাবে। পুরোটা যদি নাও যায়, তবে নীচে থিতিয়ে পড়বে। ঐ অবস্থায় ওটা হার্মফুল নয়। বার্নিং শিখের মতো আগুনও জ্বালাতে পারেন। তাছাড়া এখন শীত। ঠান্ডা হাওয়ার সঙ্গে মিশে গেলে ফ্যাটাল থাকবে না। অন্যান্য কম্পাউণ্ডের সঙ্গে মিশে নিউট্রালাইজড হয়ে যাবে। যেহেতু শীত, আশেপাশের বাড়ির জানলা দরজা বন্ধ থাকার দরুণ অন্য কোনো বাড়িতেও ঢুকবে না। এরপরই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভিকটিমদের হসপিটালাইজ করতে হবে। নয়তো ক্যাজুয়ালটি অবধারিত। আর সম্ভব হলে লেডি অফিসারদের হাতের পাঁচ, একটা করে গ্যাস মাস্ক দিয়ে দিতে পারেন যাতে প্রয়োজনের সময় তারা আত্মরক্ষা করতে পারেন৷”

“ওকে।” অধিরাজ আপনমনেই বিড়বিড় করে, “কিন্তু মালটা ঘরের ভেতরে ঢুকছে কী করে? কোন্ রাস্তায় এ জাতীয় বিষাক্ত গ্যাস ঢোকানো সম্ভব।”

“এটা আমি বলতে পারব না।” সে চিন্তায় পড়েছে, “আমিও বুঝতে পারছি না যে কেউ দু-দুটো গ্যাসকে মিক্স করে কী করে বন্ধ ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে, অথচ কেউ দেখতে পাচ্ছে না, বুঝতেও পারছে না! এটা একরকম ইম্পসিবল যার জন্য আমরা ক্লোরিনের কথা বললেও ওরকম কোনো ওয়েপনের কথা ভাবিনি। ক্লোরিন সহজলভ্য, কিন্তু বাকি দুটো অত সহজে পাওয়া যায় না! ওগুলো কেমিক্যালি তৈরি করতে হয়, কোনো গ্যাসই প্রাকৃতিক নয়! তাছাড়া মাস্টার্ড গ্যাসের কম্পাউণ্ডের অস্তিত্ব যদি থাকেও তবু সেটা রুম টেম্পারেচার বা নর্মাল টেম্পারেচারে কাজই করবে না। অ্যাকচুয়ালি রুম টেম্পারেচারে ওটা লিকুইড সালফার মাস্টার্ড হয়ে যাবে, গ্যাস ফর্মে থাকবেই না। সেক্ষেত্রে ইনহেল করার কোনো গল্পই নেই। ওর জন্য হিট মাস্ট। মেইনলি ওটাকে ভেপোরাইজ করার জন্যই দুশো কুড়ি থেকে দুশো আঠাশ ডিগ্রি সেলসিয়াস হিট প্রয়োজন। যদি ধরেও নিই যে মাস্টার্ড গ্যাসের পরিমাণ খুবই কম ছিল, সেক্ষেত্রেও দেড়শো থেকে একশো আশি ডিগ্রি সেলসিয়াস হিট তো লাগবেই। আবার ফসজিন সবচেয়ে বেশি ডেঞ্জারাস রুম টেম্পারেচারেই। সেভেন্টি ডিগ্রি ফারেনহাইটেই ওটা সবচেয়ে বেশি কার্যকরী। মানে ধরুন ওই একুশ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যেটা মোটামুটি রুম টেম্পারেচার। একটাই ঘরের মধ্যে রুম টেম্পারেচার একই সঙ্গে বাড়ছে, কমছে, এটাই বা কীভাবে সম্ভব! কলকাতার শীতে বাড়িতে কেউ হিটার জ্বালাচ্ছে, এমন তো শুনিনি। তবে একই সঙ্গে একই জায়গার উত্তাপ একুশ ডিগ্রি আর মিনিমাম দেড়শো ডিগ্রি সেলসিয়াস কী করে হয়? দুটো গ্যাস তবে মিক্স হচ্ছে কী করে?”

“মিক্স হয়তো হচ্ছেই না। খুনি আলাদা আলাদা দুটো গ্যাসকেই ঐ ঘরে ছেড়ে দিয়েছে। একটা নয়-ইন দ্যাট কেস তার কাছে দুটো গ্যাসের কন্টেনার ছিল। একটা ফসজিনের, অন্যটা মাস্টার্ড গ্যাসের।” সে একটু ভাবল, “কিন্তু তার থেকেও বড়ো চিন্তার বিষয়, লোকটা নিজে ক্রাইম স্পটে ঢুকছে কী করে?”

আহেলি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকায়, “কেন? প্রত্যেক কেসেই তো ও কোনো না কোনো রূপে ফ্যামিলিগুলোর সঙ্গে অ্যাটাচড থাকছে। ঘরের ভেতরে যার অবাধ যাতায়াত, সে তো যে কোনো সময়ে সাবানে বা অন্য কিছুতে চাবির ছাপ তুলে নিয়ে একটা ডুপ্লিকেট কী বানিয়ে নিতেই পারে।”

“নিশ্চয়ই পারে।” সে সহমত, “কিন্তু বেডরুমেরও ডুপ্লিকেট কী বানাবে? মানে বেডরুমের দরজা লোকে বন্ধ করে ঠিকই, কিন্তু একেবারে তালা চাবি দিয়ে বন্ধ করে এমন শুনিনি। এই কেসে যাদের ওপর অ্যাটাক হয়েছে, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করেছিলেন। সেটা ল্যাচের মাধ্যমে হতে পারে, পাতি ছিটকিনির মাধ্যমেও হতে পারে। ইন দ্যাট কেস, খুনি মেইন ডোর ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে খুলে ঢুকতেই পারে। কিন্তু বেডরুমের ল্যাচ বা ছিটকিনি খুলেছে কী করে! কারণ প্রতিটি ক্ষেত্রেই বডিগুলোকে এক জায়গাতেই পাওয়া গিয়েছে। বেডরুমে নয়, হয় হলঘরে, নয়তো অন্য কোনো ঘরে। মৃতদেহগুলো একসঙ্গে ছিল ও তাদের নেকলেসিং করা হয়েছিল। লাশগুলোকে টেনে এনে নেকলেসিং করতে হলে তো বার্নিং শিখকে প্রত্যেকটা বন্ধ বেডরুমের মধ্যে ঢুকতে হবে। সেটা সে করল কী করে?”

“এমনও তো হতে পারে যে ভিকটিমরা বেডরুমে ছিলেন না। বা গ্যাসটা অন্য কোথাও ছিল?”

“বোধহয় না।” অধিরাজ ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলে, “দিল্লি, কানপুর বা বেঙ্গালুরুতে যে ক-জন সার্ভাইভার ছিলেন, প্রত্যেকেরই বয়ান একইরকম। তাঁরা দেখেছিলেন যে তাঁদের পুত্র-পুত্রবধূ বা কন্যা-জামাতা, স্ত্রী ও নাতি-নাতনি ডিনারের পরেও দিব্যি ঘরের মধ্যে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছিলেন। অর্থাৎ, আফটার ডিনারও তাঁরা বেঁচে ছিলেন। জীবিত মানুষটি তাঁদের শেষ দেখেছেন, যখন তাঁরা নিজেদের বেডরুমে গিয়ে ল্যাচ, বা ছিটকিনি তুলে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করেছেন। আপনার থিওরি যদি মেনে নিই, তবে ফসজিন ও মাস্টার্ড গ্যাসের ডুয়াল কম্বিনেশন প্রথম দশ থেকে পনেরো মিনিটের মধ্যেই তাদের যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। আমার যতদূর ফসজিন সম্পর্কে জ্ঞান, তাতে ওই গ্যাসটায় মৃত্যু হতে হলে গোটা সময়টাই ওটাকে ইনহেল করতে হয়। ওটার আওতা থেকে বেরিয়ে গেলে মরার চান্স কমে যায় বা ইনস্ট্যান্ট ডেথ হয় না। সেটা হতে গেলে ভিকটিমদের জন্য বেডরুমটাকেই গ্যাস চেম্বার হতে হয়, যেখান থেকে বেরোনোর সময় বা সুযোগ কোনোটাই তাঁরা পাননি। কারণ নিশ্চয়ই তাদের হলঘরে বা সংলগ্ন অন্য কোনো রুমে এসে ঘুমোনোর কোনো প্ল্যান ছিল না। আর অন্য কোথাও গ্যাসটা থাকলে বৃদ্ধ মানুষটিও নিস্তার পেতেন না। গ্যাস তো স্থির হয়ে থাকে না। কখনও না কখনও ঐ বৃদ্ধের ঘরেও চলে যেত। তবে মৃতদেহগুলো অন্যরুমে এসে পৌঁছল কী করে? যদি ধরে নিই, যে তারা ছটফট করতে করতে কোনোমতে হলঘর বা অন্য কোনো ঘর অবধি নিজেরাই এসে পৌঁছেছিলেন, তবে অন্তত তেমন কোনো চিহ্ন থাকত! তেমন কিছুই নেই। ডঃ চ্যাটার্জির বর্ণনা যদি মেনে নিই, তবে দৌড়ে বেরিয়ে আসা তো দুর, স্পট থেকে নড়াচড়ার মতো শক্তিও তাঁদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। তাহলে একটাই সলিউশন, মরে যাওয়ার পর ডেডবডিগুলোকে টেনে আনা হয়েছিল। বার্নিং শিখ নিজেই প্রত্যেকটা বেডরুমে ঢুকে লাশগুলোকে বের করে এনেছিল। এটা কী করে সম্ভব? মেইন ডোর না হয় চাবি দিয়ে খুলল, বেডরুমের ল্যাচ, ছিটকিনি বাইরে থেকে কোন্ ম্যাজিকে সে খুলেছিল?”

“ভিকটিমরা দরজা খুলে বা ভেজিয়েও তো শুতে পারেন?”

অর্ণবের প্রশ্ন শুনে এই প্রথম একটু হাসির রেখা দেখা দিল তার মুখে, “বোধহয় না। কারণ জীবিত ব্যক্তিরা প্রত্যেকেই তাঁদের ল্যাচ টেনে দেওয়ার শব্দ স্বকর্ণে শুনেছিলেন। আর দরজা খোলা থাকলে তাঁদের মৃত্যুই হত না। গ্যাস খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেত। যায়নি বলেই বার্নিং শিখকে সমস্ত দরজা-জানলা খুলে দিতে হয়েছিল। গ্যাসটাকে বের করার যে রাস্তা জাস্ট এইমাত্র মিস্‌ মুখার্জি বললেন, সেটাই সে অবলম্বন করেছে। নয়তো ঐ ঘরে যে ঢুকত, সেই মরত। ইভেন আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বার্নিং শিখ নিজেও গ্যাস মাস্ক পরেই তবে ও ঘরে ঢুকেছে।”

আহেলি একটু ভেবে জবাব দেয়, “তবে হয়তো ল্যাচ বাইরে থেকে কেটে বা দরজা ভেঙে ঢুকেছে।”

“সরি সেনোরিটা।” অধিরাজ মাথা নাড়ল, “প্রত্যেকটা স্পটে দরজা, দরজার লক, ল্যাচ, সবই অক্ষত ছিল। নো ফোর্সড এন্ট্রি।”

“তবে?”

“এরকম অনেক তবে’র অ্যানসার আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।” অধিরাজ একটু দ্বিধাগ্রস্ত, “আপনার কোনো ভুল হচ্ছে না তো মিস্ মুখার্জি? ফসজিনটাই আপনি বেস বলছেন। কিন্তু তার সঙ্গে মাস্টার্ড গ্যাসের মিশেল আছে সে বিষয়ে কি আপনি নিশ্চিত?”

“টেস্ট না করা পর্যন্ত কোনো বিষয়েই আমি নিশ্চিত নই। হাতে সময় নেই, তাই প্রবাবিলিটিটা বলছি। আজ রাতের আগে সবটা কনফার্ম করা অসম্ভব।” এবার আহেলির মুখেও দুশ্চিন্তার ছাপ, “তবে যা-ই হোক, আপনারা জাস্ট আগুন নিয়ে খেলছেন! এভাবে দুটো মারাত্মক গ্যাসকে একদম নিখুঁতভাবে মিক্স করা কোনো সাধারণ মস্তিষ্কের মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। ইভেন গ্যাস আইডেন্টিফায়েড হলেও সেটা সবার অজান্তে কী করে একটা বদ্ধ ঘরে ঢুকে যায়, সে প্রশ্নের উত্তর আমার কাছেও নেই। যদি অন্য কোনো উপায়ে ঢোকে তবে একটা রুমের টেম্পারেচার একই সঙ্গে একুশ ডিগ্রি এবং ন্যুনতম দেড়শো ডিগ্রি সেলসিয়াস কীভাবে হয় তাও বলতে পারছি না! ওটা আপনাদেরই খুঁজে বের করতে হবে।”

অধিরাজ অন্যমনস্কভাবে আকাশের দিকে তাকায়৷ রোদটা এখন অনেকটাই প্রখর! বেলা ক্রমশই বাড়ছে এবং সময় ক্রমশই কমছে! সে আস্তে আস্তে বলে, “এই ক্লোজড ডোর মিস্ট্রির হদিশ তো একমাত্র আমাদের জিনিয়াস কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারই দিতে পারেন। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। যে করেই হোক, এই গেমটা আমাদের জিততেই হবে!”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *